উজ্জ্বলকুমার দে'র অন্যায় ও শাস্তি


বিক্রম পাকড়াশি


আপনার মতামত         


উজ্জ্বলকুমার দে'র অন্যায় ও শাস্তি
বিক্রম পাকড়াশি


উজ্জ্বলকুমার দে চোর। সে যদি আজকে নবীনা সিনেমার ফুটে থাকতো, তাহলে মাজারের পাশের গলি দিয়ে দৌড়ে দশ গলির এক গলির মধ্যে লুকিয়ে পড়তে পারতো। নিদেনপক্ষে যদি যোগেশচন্দ্র চৌধুরী ল কলেজের সামনে থেকে বক্তিয়ারশা রোডে ঢুকে পড়তো, তাহলেও ধরা না পড়ার একটা আশা ছিলো। কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে, যে সে এর কোনওটাই করে উঠতে পারে নি। আর সময়টাও এমন, যে অসময়ে টিউশানি পড়তে আসা ছেলেপিলের বড্ড উপদ্রব। এখন আমাদের মনে হচ্ছে, যদি তুষারবাবুর ওখানে এই ভরদুপুরে পড়তে আসা চারটের বদলে দুটো ছেলে থাকতো, এমনকি সঙ্গে যদি একটা মেয়েও থাকতো, তাহলে আর ধরা খেতে হতো না। যাহোক, এখন সে কথা ভেবে আর কোনও লাভ নেই।

উজ্জ্বলকে যে ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে নারকেলদড়ি দিয়ে বাঁধা হয়েছে সেটার পাশে একটু ফাঁকা জায়গা আছে যেখানে একটা ট্যাক্সি এই আনোয়ারশা লেন এ ঢুকে পড়লে ঘুরিয়ে নিতে পারে। এইসব ল্যাম্পপোস্টের গোড়ায় রাস্তার পিচের মধ্যে থেকে অনেক সময় অল্প কয়েক টুকরো ফ্যাকাশে ঘাস গজায় যাতে কুকুর বেড়ালে হিসি করতে পছন্দ করে। ঘাসের পাশে থামের গোড়া, চারিদিকে সিমেন্ট বাঁধানো, একটা কোনা অল্প ভাঙা। এর ওপর থেকে পোস্টের লোহাটা শুরু হয়েছে - লোহার গায়ের রঙ উজ্জ্বল ধূসর, আর তাতে সবসময় একটা ধুলো আর মরচে মেশানো গন্ধ লেগে থাকে,ট্রেনের স্লীপিং বার্থে সারারাত শুয়ে থাকার পরে জামায়, প্যান্টে, মাথার চুলে আর টাকরার ভেতরদিকে লেগে থাকা গন্ধের মতন। অবশ্যই, আমরা এই ল্যাম্পপোস্টে লেগে থাকা বিজ্ঞাপন, বিভিন্ন ছোপ এগুলিকে ধর্তব্যের মধ্যে নিলাম না, আর ওপরে পেরিস্কোপের মতো আগ্রহভরে বেরিয়ে থাকা বাল্বের কালচে হলুদ আলো নিয়েও কিছু বলা হলো না কারন এই ভরদুপুরবেলায় আলো জ্বলে না। কিন্তু কোলকাতার সব আলো এমন নয়। যখন অনেক রাত করে আমরা ট্যাক্সি নিয়ে বাড়ি ফিরি এবং ট্যাক্সিতে যখন আমরা নেহায়েতই একা, তখন কোলকাতায় নানান রকমের ল্যাম্পপোস্ট দেখতে পাওয়া যায়। তাদের কারও আলো রঙমশালের মতো, কেউ জ্বললে গভীর রাতকে মনে হয় দুপুর, কারওর মাথায় সন্ধ্যেবেলা পাখি বসে, কারওর গা সবুজ, মাথা ব্যাঙের ছাতার মতো সাদা, আর ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালকে ফোকাস করে সামনে আবছা যেসব ল্যাম্পপোস্টের ছবি তোলা হয়, তাদের মাথাটা অনেকটা ঘষাকাঁচ বসানো ঈষদচ্ছ ফুটবলের মতো। অর্থাৎ ,এরা হলো আমাদের ঐতিহ্য। খালি চোখে এসব আলো হয়তো জরাগ্রস্ত লাগে, কিন্তু ফটো তুললে আমরা দেখতে পাই রাস্তার মধ্যে দিয়ে কতোগুলো রঙিন লাইন হুহু করে ছুটে যাচ্ছে, এবং সেইসব ফটো উঠলে ল্যাম্পপোস্টের আলোকে খুব স্নিগ্ধ মনে হয়। এভাবে তীব্র গতিবেগে তারাবাতির মতো ছুটে যাওয়া গাড়ির ছবিই হলো শহরের ছবি। আচ্ছা, মানুষের মাথার পেছন দিকটাতে ছোটা দিমাগ থাকে, না? ওখানে কিন্তু কাউকে মারতে নেই। ওখানে কিন্তু কাউকে মারতে নেই।

উজ্জ্বলকুমার দে'র জন্য হয়তো আমাদের একটু চিন্তা, বা সহানুভূতি আসা উচিত - কিন্তু এর বিপক্ষে অনেকগুলি প্রামাণ্য যুক্তি আছে। ওর বিদ্যেবুদ্ধি কম থাকলেও, চোর হবার দরুন নিজের শরীরটাকে কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অনুশীলনের মাধ্যমে ধরা পড়ার উপযুক্ত করে নিয়েছে। মারধোর সব চোরই ধরা পড়লে খেয়ে থাকে এবং সেসব মিটে গেলে তারা আবার চুরি করতে বেরোয়। অনেকেই হয়তো জানে না, যে চোরের শরীরের ভেতরটা পুরোপুরিভাবে আর পাঁচটা লোকের শরীরের মতো নয়। এদের কব্জি, কনুই, গোড়ালি ও হাঁটু সম্পূর্ণভাবে ঘুরে যেতে পারে, এরা প্রয়োজনে নিজেদের পেটের পেশী এবং চোয়াল প্রায় লোহার মতো শক্ত করে ফেলতে পারে এবং খুব দরকার পড়লে নিজেদের অণ্ডকোষ শরীরের ভেতরে প্রায় কুড়ি মিনিট অবধি লুকিয়ে রাখতে পারে। জিনগত তারতম্যের প্রভাবে এদের চামড়া মানুষের চামড়ার তুলনায় অধিক পিচ্ছিল। বহুদিন আগে সরকার থেকে উদ্যোগ নিয়ে শিক্ষাদীক্ষার ব্যবস্থা করে, কাজ শিখিয়ে ও হাতখরচা দিয়ে এদের পরিবর্তন করার চেষ্টা হয়েছিলো। কিন্তু একাধিক সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে দেখা গেছে যে এদের মস্তিষ্কের গঠন ও আর্থসামাজিক পরিবেশ এই সুযোগ নেবার উপযুক্ত নয়। এটা কোনও রোগ নয় যে এর প্রতিকার হবে, কারণ প্রকৃতি এভাবেই এদের গড়ে তুলেছে। বৌদ্ধিক বিকাশের অভাব এরা পুষিয়ে নিয়েছে কিছু অতিমানবিক শারীরিক ক্ষমতার বিকাশের মাধ্যমে।

এখানে এখন যদি পুলিশ আসে, তাহলে প্রথমে দেখতে হবে আমরা আনোয়ার শা রোডের কোন ফুটে আছি। একদিক কলকাতা পুলিশ বা কপু এবং অন্য দিকের জিম্মা পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ বা পপু। কপুর গায়ের পোষাক সাদা, বেল্ট কালো, গাড়ি দামী, আর অফিস ভবানী সিনেমার পাশে। পপুর পোষাক ম্যাটকা, বন্দুক গাদা, জীপ পুরনো, আর অফিস যাদবপুর থানার মোড়ে। কপু ও পপু একসঙ্গে যাত্রা শুরু করলে কপুর পৌঁছনো উচিত আগে। কারণ কপু ও পপু যথাক্রমে ট্রামলাইনের মোড়ে ও সাউথ সিটিতে জ্যাম পাবে। কে না জানে, ভবানী সিনেমার দূরত্ব অনেক কম এবং ট্রামলাইনের মোড়ে জ্যামও অনেক ছোট। তাছাড়া একথা এখন জানা গেল, যে রাস্তার এদিকটা কপুর হাতেই। এখন যা হতে পারে তা হলো থানার পুলিশ হয়তো খুব ব্যস্ত। ফলে ডাকলেই সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যাবে না। আমাদেরও বিশেষ কোনও তাড়া নেই। কপুর গাড়ি দেখতে সবচেয়ে সুন্দর নন্দনের পাশে ও সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে। এছাড়া এদের কাছে আছে রয়েল এনফিল্ড বুলেট মোটরসাইকেল। এমন একটা মোটরবাইক লেক গার্ডেন্সের মোড়ে পার্ক করে রাখলে মনে হয় একবার হাত বুলিয়ে দেখি।

চোরেদের অতিমানবিক শক্তি সম্বন্ধে যা শোনা যায় তার পুরোটা সত্যি নয়। কিছু কিছু তথ্য অতিরঞ্জিত। পেশী যদিওবা লোহার মতো শক্ত হতে পারে, কিংবা চামড়া তেলতেল আর ইলাস্টিক হলেও তারা অমর অজর অক্ষয় নয়। সেরকম ক্ষমতা থাকলে ধরা পড়তো না। আসল কথা হলো কেউ তো আর ধরা পড়ার জন্য সত্যি সত্যি তৈরি হয়ে আসে না, ধরা পড়ে যায়। আর একজন চোর যত কম ধরা পড়ে, তার ততো বেশি করে ধরা পড়ার অভ্যেস চলে যায়। তখন কিন্তু তাদের শারীরিক ক্ষমতায় খানিকটা ঘাটতি হতে শুরু করে। তাই, ধরা পড়ে গেলে অনেকে থতমত খেয়ে যায়। আরও একটা কথা হলো যে বাইরেটা যেমনই হোক, চোরের শরীরের নানান রকম অংশে অন্যান্য মানুষের মতো পার্টস থাকে, যেমন ঝিল্লি, হাড্ডি, ফুসফুস, পিত্ত, যকৃত, পাকস্থলী, রক্ত এইসব। যখন কোনও ভোঁতা জিনিস স্নায়ু বা রক্তের ঝিল্লিতে যথেষ্ট জোরে আঘাত করে তখন সেটা হাড়ের ওপর থেঁতলে গিয়ে রস ধরনের একটা ব্যাপার বের করতে শুরু করে, ফলে সেই জায়গাটা ফুলে যায়। দেখতে হয়তো খারাপ লাগে, কিন্তু নরম জায়গা বলে এগুলোকে সহজেই বরফ দিয়ে সারিয়ে তোলা যায়, কারুর একটু কম আবার কারুর একটি বেশি সময় লাগে। হাড় ভেঙে যাওয়াটা অনেক বেশি সিরিয়াস। হাড়ের মূল অসুবিধে হলো যে যতই শক্ত হোক না কেন, এটি একটি ভঙ্গুর দ্রব্য। যাদের সত্যি সত্যি ঠিকঠাকভাবে হাড় ভাঙে, তারা সেই শব্দ নিজের কানে শুনতে পায়। এই সমস্ত কথা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে কি উজ্জ্বলকুমার দে'র খুব কষ্ট হচ্ছে? কতটা কষ্ট হচ্ছে? যা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে তার কতটা সত্যি, কোন কোন জায়গাগুলো বাড়িয়ে তোলা, আর কোন কোন জায়গাগুলো লুকিয়ে রাখা? যদি এই সমস্ত কথা জানতে হয়, তাহলে দূর থেকে দেখলে চলবে না, আমাদের ওর মুখে, ক্লোজ-আপ এ ফোকাস করতে হবে। সেই সময়টুকু আমরা ও চারপাশে যা যা ঘটছে, তা দেখতে পাবো না।

কিছু কিছু প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই, বা উত্তর হয় না। যেমন, উজ্জ্বলকুমার দে কেন চোর? শর্মিলা ঠাকুর "কাশ্মীর কি কলি' সিনেমায় সারাদিন খেটে খেটে পাঁচ টাকার ফুলের টুকরি বেচতে পারছে না বলে? সে কি চম্পাকে শম্পা বলে ডাকে? শাম্মী কাপুর মদ খেয়ে হাহাকার করলে কি ব্যাকগ্রাউন্ডে মনোহারী সিং এর স্যাক্সোফোন চালানো উচিত? রুপোলি পর্দা ও রুপোলি ল্যাম্পপোস্টের মধ্যে পার্থক্য কী? সামাজিক সিনেমা শেষ হবার ক মিনিট আগে মেলায় হারিয়ে যাওয়া ছেলের ফিরে আসা উচিত? এমন অনেক প্রশ্ন ইতিপূর্বে করা হয়েছে। সুতরাং এর পরে যা যা হতে পারে এই সমস্ত সম্ভাবনা আমরা বিভিন্ন ছায়াছবিতে দেখে ফেলেছি। এখুনি তার সবকটা মনে না করতে পারলেও, অনেকগুলিই পারবো, আর শেষমেষ যা হবে তা এখন মনে না পড়লেও তখন মনে পড়ে যাবে। অর্থাৎ এই আফৎ এ খুদা মেহফুজ রখ্‌খে হর্‌ বলা সে।

আসলে আমরা যেটা চাইছি সেটা হলো ওকে কোনওরকম জানতে না দিয়ে ওর অভিব্যক্তিগুলোকে উপভোগ করতে। এই দেখাটা অনেকটা কোনও প্রতিযোগিতায় একজন অ্যাথলীটকে যেভাবে দেখা হয়ে থাকে, তেমন। মানুষ যখন খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করে বা একমুখী হয়ে কিছু পাওয়ার চেষ্টা করে তখন তাদের দেখতে খুব ভালো লাগে। পাশের বাড়িতে হয়তো সন্ধ্যেবেলায় কেউ নিবিড় মনে একটা বই পড়ছে, তখন তাদের মুখের চারিদিকে পেশিতে যে শান্তি থাকে সেই শান্তির একটা ভাগ তো আমরা চোখে দেখেই পাই। কিন্তু যখন একজন অ্যাথলীট কোনও দৌড়এ জিতে যায়, যখন একজন ভারোত্তোলক সবথেকে বেশি ওজন তুলে তাকে সপাটে মাটিতে আছড়ে ফেলে, একজন সাঁতারু যখন সেকেন্ডের ভগ্নাংশে সুইমিং পুল এর শেষ প্রান্তটা আঙুলের ডগায় ছুঁয়ে ফেলে তখন তাদের চোখে একটা শূন্যতা দেখা যায়। চ্যাম্পিয়ানদের ফটোগ্রাফ অমনই হয়ে থাকে। তাদের চোখ আর আমাদের চোখের মধ্যখানে যে বাতাস, তার মাঝামাঝি তাদের দৃষ্টিটা যেন কোথাও একটা আটকে থাকে, যেখানে আসলে কিছুই নেই - কিন্তু সেই চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে যে ওরা কী যেন একটা দেখতে পাচ্ছে যেটা আমরা পাচ্ছি না। এই মুহূর্তগুলো আমরাও বাঁচতে চেয়ে এইসব ছবি দেখি। তাই উজ্জ্বলের চোখে সেই একই অভিব্যক্তি ও শূন্যতার খোঁজে আমরা তার মুখের চারিদিকে চোখ বোলাচ্ছি। যখন ও পালাচ্ছিলো,তখন ওর চোখে চোখ রাখল আমরাও সেসব মুহূর্তের উত্তেজনা বাঁচতে চাইতাম। কিন্তু ধরা পড়ার পরে, ওর চোয়ালের পেশিতে এত শক্তি, কিন্তু তাতে কোনও টানটান ভাব নেই, যেন মনোযোগ দিয়ে একটা বই পড়ছে। ওর চোখের দৃষ্টি আমাদের স্পর্শ করার আগে বাতাসেই কোথাও একটা থেমে আছে - এখন এমন কোনও ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল পড়ে নেই যেখান থেকে ওকে খুঁটিয়ে দেখা যাবে। ওর চেহারার মধ্যে যে শান্তি আর ওর অভিব্যক্তির মধ্যে যে বিস্ময়ের অভাব তাতে আমাদের মন ভরছে না।

উজ্জ্বলকে একটা বড়ো ভীড় ঘিরে ধরে আছে। দূর থেকে একটা ঢেউয়ের মতো লাগছে। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে সেই মানুষের ঢেউ দুলছে। যেন ঐ ল্যাম্পপোস্টের চারিদিকে ঘিরে থাকা অজস্র পায়ের ফাঁকে একটা অদৃশ্য বল আটকে আছে। হঠাৎ করে কারও একটা পাস আর এক টানে সেই বল নিয়ে অন্য একজন দৌড় দেবে। এই ল্যাম্পপোস্ট থেকে নবীনা সিনেমা একটা পাস। সেখানে থেকে রাস্তা পেরিয়ে, গাড়ি থামিয়ে একটা সোজা দৌড় ইন্দ্রানী পার্ক, সেখান থেকে স্টেট ব্যাংক অবধি একটা চিপ,পথে দুশোচৌত্রিশ বাই এক বাসের গায়ে ধাক্কা লেগে কালীবাড়ির উল্টোদিকে অরেকজনের পায়ে। আর তারপরে ঢাকা কালীবাড়ির দরজা দিয়ে একটা সপাট লাথিতে সেই বল সোজা গোল-এ। এখন তার মহড়া চলছে। যারা ঘিরে আছে, তাদের মুখের দিকে যদি আমরা এবারে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো এদের সকলের চোখও উজ্জ্বলকে স্পর্শ করার আগেই বাতাসে নিরালম্ব হয়ে রয়েছে। যেন বিন্দু বিন্দু চাউনি এসে বাতাসে মেঘের মতো করে উজ্জ্বলের চারিদিকে জমছে। এরা সকলেই কি তবে অন্ধ?

এই ভীড়ের মধ্যে যারা আছে তাদের মধ্যে মাত্র কয়েকজনের উজ্জ্বলের গায়ে হাত দেবার অধিকার আছে। কোচিংএ পড়তে আসা ছেলেগুলো এখন আর তাই তেমন পাত্তা পাচ্ছে না। ল্যাম্পপোস্টের পেছনে সাদা বাড়ির মাসীমা একা থাকেন, ফলে উনি অবস্থা বুঝে জানলার শাটার নামিয়েছেন। এগুলো কাঠের শাটার, পুরনো দিনের জানলা। সামনে জজবাড়ির শাটারও সোজাসুজি দেখা যাচ্ছে বলে নামানো আছে, তবে ওপাশে কচিকাঁচারা উৎসুক হয়ে যে ভিড়টি বানিয়েছে তা গোপন করার উপায় নেই। নারানদা গায়ে হাত দেবে না কারণ নাকি ওদের বাড়ি ল্যাম্পপোস্টএর খুব কাছে। পরে ঝামেলা হবে। প্রফেসার বোসও গায়ে হাত দেবেন না, ওনার রুচিতে বাধবে। মন্টার দিদির বিয়ে সামনের মাসে, সে এসময় কোনও লাফড়া চায় না। সৌরভ ফার্স্ট বয় এবং সে টেস্ট পেপার কষতে কষতে পথে বেড়িয়ে ভিড়ে আটকে গেছে মাত্র,ওকে যেতে দিলেই হলো। দীপ্তেন চাকরি পাওয়ার পর থেকে এসবে নেই। সানি মোবাইল ফোনে ভিডিও করছে, একসঙ্গে দুটো কাজ করা ওর পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এরকম অনেক লোক আছে, যারা কেউ উজ্জ্বলের গায়ে আজ হাত দেবে না।

উজ্জ্বলকুমার দে যেখান থেকে পালাতে শুরু করে, আমরা চাইলে সেখানে একটা স্টার্ট সাইনবোর্ড বসাতে পারতাম। কারণ ওখানে হলো আমাদের মধুরেণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। ফি-দিন এখানে জিলিপির গন্ধে গন্ধে লোকে গুটিগুটি পায়ে এসে যাত্রা শুরু করে। আর উজ্জ্বলকুমার দে যেখানে ধরা পড়ে সেটা হলো এই প্রিন্স আনোয়ারশা লেন এর বাদামতলার ল্যাম্পপোস্ট, যে এলাকার আশেপাশে আমরা গত কয়েক পরিচ্ছেদ ঘুরঘুর করছি। আমরা যদি চাইতাম, বা পরে চাই, তবে টেপফিতে ফেলে দেখে নিতে পারি যে এই দুই বিন্দুর দূরত্ব ছিলো ঠিক দুশো মিটার। উজ্জ্বল যখন এক ঝটকায় দৌড়তে শুরু করে তখন বাঁ দিকে ডান দিকে সামনে পেছনে অজস্র লোকের হাতে অজস্র ঘড়ি ছিলো। কিন্তু কেউ তার সময় দেখার প্রয়োজন বোধ করে নি। বা যারা দেখেছে, তারা জানেও না যে উজ্জ্বলকুমার দে, চোর, ঠিক ঐ মুহূর্তে পালাতে শুরু করে। আর জানে না বলেই আমরা এ কথা এখনো কেউ জানি না যে ঐ দূরত্ব সেদিন অতিক্রান্ত হয় ঠিক উনিশ দশমিক এক আট সেকেন্ডে। এবং, পথে বাদামতলায় ঢোকার মুখে একটা বাঁক পর্যন্ত ছিলো।


ছবি: মৃগাঙ্কশেখর গাঙ্গুলি