কিছু কবিতা


জাহানারা পারভীন


আপনার মতামত         



কিছু কবিতা
জাহানারা পারভীন




ক্ষমার পুকুর ক্রমশ ছোট হয়ে যায়

আহত মাকড়সার সামনে একটি দুপুরকে বহুদিন নতজানু হয়ে
বসে থাকতে দেখেছি। বসার ভঙ্গিটি চরে কুমিরের রোদ পোহানোর
মতো আয়েশি। নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায় এর পেছনেও আছে কোনো
শানে নযুল। মিছিলের দ্রুতগামী পায়ের নখে যতটা প্রাসঙ্গিক ধুলোবালি
তার মতোই হতে পারে এর মানে। একটি দুপুরকে বহুদিন প্রশ্রয়ে প্রশ্রয়ে
পরিণত হতে দেখেছি বিকেলে। অত:পর সন্ধ্যায়। রাত্রির কাছে অবশ্য কোনো
ক্ষমা নেই কেননা, আমাদের বনসাই মনে ক্ষমার পুকুর ক্রমশ ছোট হয়ে যায়।



আবারো নিদ্রা

যারা নিদ্রিত তাদের বলো- জেগে ওঠার পর আছে নান্দনিক ভূরিভোজ।
একদিন হেঁশেলের সব ছাই উপটানের মতো মেখে সেই যে সমবেত ঘুম!
এরপর বহুদিন উল্টো আকাশ দেখা, বহুদিন ভয়ংকর খরা এই ফসলি দেশে।
যারা নিদ্রিত তাদের বলো- তাদের কাছে হেরে গেছে কুম্ভকর্ণ, তাদের মাথার
কাছে রেখে এসো হাঁড়িভর্তি জল। যেন ভাঙা নিদ্রার পর তৃষ্ণাকে স্বাগত জানানো
সহজ হয়। তাদের জানাও- শহরের সব ডাকঘর থেকে চিঠি এসেছে তাদের নামে
দূরবর্তি জেলার প্রিয় নারীদের স্বাক্ষরিত সেসব খামে রয়েছে আঙুলের মিহিন ভাঁজের
কারুকাজ। খামের এপিঠ-ওপিঠে কাঁথা সেলাইয়ের ফোঁড়। তাদের বলো- এসব চিঠি
বহন করে নিয়ে এসেছে নিদ্রিত উপাখ্যানের সব সূত্রের প্রার্থিত সমাধান...









ডায়রি

এখানে বালিকার প্রথম প্রণাম যতিচিহ্ন হয়ে শুয়ে আছে
পাথরের গায়ে। এর নকশা অনেকটা আদিবাসি শরীরে আঁকা
উল্কির মতো। প্রথম স্নানের পর এখানেই দাফন হয়েছিল তার
কুমারি চোখের শব... এখানেই তার প্রথম অশ্রুতে নেয়েছিল
বৈশাখের তৃষ্ণার্ত দোআঁশ। এই প্রাচীন প্রত্ননগরের কোথাও মাটি
চাপা পড়ে আছে তার প্রথম অপরাধের ডায়রি। ডায়রির ওপর ইতিমধ্যে
নির্মিত হয়েছে বহুতল ভবন। যার ছাদের ঠিক ওপরের আকাশে মুদ্রিত আছে
কিছু পৃষ্ঠা পূণ্যবান শবযাত্রীরাই যা পড়তে জানবে, আর জানবে বহু ভাষাবিদ
কোনো অন্ধ বালিকার ফসিল। সেই ডায়রির ভেতর যার মৃত নখ এখনো অক্ষত আছে...


প্রার্থনা

একক গাছেরা জানে বৃক্ষের সকল আচার...

জানে- সমর্থ কাঠঠোকরার অবিরাম ঠোকর কোনো কোনো
গাছের অনিবার্য নিয়তি। ওরাল সন্ত্রাসে মুছে যায় ধূসর বাকলে
লেখা গাছের জীবনী বিপন্ন গাছের অধিবাসী পিঁপড়েরা
চোখের লেন্সে তুলে রাখে এসব তথ্যচিত্র।
দিঘল বর্ষণে ভরে গেলে গাছের সব খোড়ল
বানভাসী পিঁপড়েরাও খুঁজে ফেরে নিরাপদ আশ্রয়।
মৃত স্বজনের লাশ ভাসিয়ে দেয় বর্ষার স্রোতে।

কোনো কোনো দিন একনিষ্ঠ কাঠঠোকরা যখন শব্দ করে কেটে যায়
গাছের ত্বক। শিশুর সদ্য ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে পিঁপড়ে মা প্রার্থনা
করেন- আকাশ থেকে নেমে আসুক তেল বৃষ্টি। যেন তৈলাক্ত বাকলে পা
পিছলে পড়ে যায় তস্কর পাখি। যেন সে স্থির হয়ে দাঁড়াতেই না পারে
তার পিচ্ছিল পা যেন ভেঙে দেয় ঠোঁটের মনযোগ।

প্রত্যাবর্তনই শেষ কথা নয়
আরো যারা নেমেছিল পথে, গেছে ফিরে
প্রত্যাবর্তনের অন্য অর্থ মেনে।

পুরাতন গুহায় ডেকে এনে বান্ধব রোদ, তারা ভেবেছে-
মন্দ নয় এই স্থির বর্তমান। ফিরে যাওয়াও এক প্রস্থান বটে

কাঁধে পিঠে মধ্যাহ্নের সূর্য নিয়ে আমরা যারা হেঁটেছি, ছুটেছি,
সূর্যাস্তের দিকে করতোয়া, ইরাবতী, মহানন্দায় করেছি স্নান, পিঠে করে
সেই জল পৌঁছে দিয়েছি খরাক্রান্ত পাখিপল্লির গাছের কোটরে কোটরে
আহত পাখির শুশ্রূষায় কেটেছে নির্ঘুম রাত, আত্মজার মুখ মনে করে
বিষণ্ন হতে গিয়েও ভেবেছি জনপদের সব ঘরেই তো থাকে জায়া, কন্যা,
জননীর পদচিহ্ন তারা সবাই আজ বিপন্ন গাঙের বিরুদ্ধ স্রোতের সাতারু।
প্রচলিত জীবন কিছুটা হেলে উঠলে আমরা যারা নির্বিকার থাকি,
তাদের পথেই কাঁটা বিছিয়ে রাখেন আরবের সেই দুষ্টু বুড়ি।

অবশেষে দেখি-
আর সবার মতো নিজের ছায়াও কেমন ছেড়ে যায় নিজেকে।


কথা, স্বপ্ন, প্রবোধ...

সাপের খোলসে ভরে তারা নিয়ে গেছে ফসিলের ঘ্রাণ,
শোঁকাবে নিরন্ন শিশুদের।
গামছার খুঁটে বেঁধেছে দু:খিত উঠোনের প্রতিবন্ধী ঘাস
যেন তারা ঘাস নয়, অনুর্বর জমিতে ফসলের সম্ভাবনা।
প্রতীক্ষমাণ নারীরা এসব প্রবোধে ভোলেন,
আর বয়সীরা তাদের সমবয়সী অশ্বথের ছায়ার বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন,
গাছ ও মানুষের যুগল দীর্ঘশ্বাসে বাতাস ভারী হলে..
গোয়ালের ক্ষুধার্ত গাভিটি হঠাৎ ডেকে ওঠে...
বালকেরা তখন অন্য প্রসঙ্গ তোলে- ঘুড়ি, লাটাই, রূপকথা,
নারীরাও হাঁড়ি-কুড়ি, কাঁথার প্রসঙ্গে ভরিয়ে তোলে নিকোনো উঠোন।
গৃহের সবকটি শূন্য হাড়ি শুধু উপুড় হয়ে পড়ে থাকে হেঁসেলে..

জামের ডালে কিছু শালিক তখন মানুষের শঠতার গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়ায় অভুক্ত শিশুদের...
নিদ্রাক্রান্ত শিশুরা নিজের অজন্তেই ঠোঁটের আঘাতে কিছু খড়কুটো ফেলে দেয় নিচে।



ছবি: মৃগাঙ্কশেখর গাঙ্গুলি