আপনার মতামত         



পাগল নয়

দময়ন্তী




---- "অ বৌদি, কি কর গো? ভাবলাম যাই দেখে আসি, তোমরা কেমন আছ?"
---- "আরে এসো এসো, আয় রমা, এই তো এখানে এসে বস।"
---- "এই তো এখেনেই বসি, আর ভেতরে যাব না। এই তো বেশ জায়গা।"
---- "আরে না না বাইরে কেন বসবে, ভেতরে এসো। এসো এসো।"
---- "না গো কিচ্ছু অসুবিধে হবে না। এই বেশ। ভেতরে তোমার ছেলে বসে আছে , থাক না, পাগল মানুষ, ওকে বিরক্ত করার দরকার কি। এই বেশ বসেছি তো।"
---- "তোরা সবাই বলিস, কিন্তু পাগল নয় ও। ডাক্তার বলেছে, কতবার। ভয় পাস নারে অত।"
---- " না না বৌদি ভয় কেন পাব? এই রমা যা না এগিয়ে....... কথা বল বাবাইদাদার সাথে।"
---- "তা আজ কি রাঁধলে গো বৌদি? ছেলে তোমার কি খায়?"
---- "আমরা যা খাই সেইসবই খায়। আলাদা কি খাবে!"
---- "না তাই বলছি আর কি! কত্তাকে দেখলাম বাজার থেকে ফিরতে"
---- "হ্যাঁ ঐ তো ঝিঙে এনেছে ---- ঝিঙে পোস্ত করলাম। আর ডাল, আলুভাজা,, মাছের ঝোল। তোমার কত্তা আপিস যান নি আজকে?"
---- "না আজ ওঁর শরীরটা তেমন জুৎ নেই। গা ম্যাজম্যাজ করছে -- তাই বললেন একটু বিশ্রাম নেবেন। রমা যা না গল্প কর --- দাদাকে জিগ্যেস কর দিকি .... "
---- "অ্যাঁ ........... এই ... ইয়ে ........ তোমার নাম কি বাবু? বল না নামটা বল আমাকে "
---- "ঠাকুমাকে ল্‌লাত্থিইইইইইইইইইইইইইইইই "
---- "ওরে-এ-এ বাবা গো-ও-ও-ও-ও। ..................................................... আমরা যাই বৌদি ................ পরে একদিন আসবো"

---- "যাহ!! ওরা এখন সবাইকে বলে বেড়াবে এটা। হতচ্ছাড়া ছেলে তোর আর মাথায় ছিট ওঠার সময় হল না!! আর কখনও এরা বিশ্বাস করবে যে তুই পাগল নয়? কতসময় তো শান্তভাবে কথা বলিস, গান করিস! সেসব কি হল শুনি?

---- "মা আ বাবাই দুধসুজি খাবে"
---- "হ্যাঁ সে তো খাবেই। কবেই বা না খাও। দিচ্ছি দাঁড়াও"
---- "সোজা বাথরুমে যাবে। এদিক ওদিক কিছু ধরবে না, কেমন।হয়ে গেলে বলবে আমি জল ঢেলে দেব।"
---- "বাবাই ঠাকুমার কাছে শুবে-এ-এ।"
---- "ঠাকুমাকে না লাত্থি দিবি, তা আবার ঠাকুমার কাছে শুবি কেন? তোর যে কবে একটু বোধবাস্যি হবে!"

---- "চা খাবে?"
---- "গা ধুয়ে আসি ..... বাবাই কি করছে?"
---- "কি আবার করবে! সেইরকমই বসে আছে চুপ করে! আর থেকে থেকে চেঁচানি। আজ রমাকে নিয়ে ওর মা এসেছিল। রমা যেই কথা বলতে গেছে অমনি চীৎকার। আর রমাটাও এমন নেকি -- তুই গেছিস কেন অমন একই কথা গায়ে পড়ে বারবার বলতে।"
---- "তা স্বাভাবিক লোকে অমনি করেই কথা বলে ------ বুঝেছ!"

---- "উফ্‌ জীবনটা শেষ হয়ে গেল। সারাদিন খেটেখুটে এসে কোথায় একটু চা টা খেয়ে ছেলেকে পড়াতে বসব!! আর লোকেরই বা দোষ কি? বারেবারে অমন করলে "পাগল" বলবে না তো কি!!!'

---- "আচ্ছিলা-আ-আ-আ-ল্‌ল্‌ল ............. । বড়জেঠুকে ল্‌লাত্থি!!"
---- "চুপ কর্‌ একদম চুপ। কেন বড়জেঠু কি করসে শুনি? আর একবার চীৎকার শুনলে চাবুক নামাব"
---- "মারবে না, মারবে না, মারবে না-আ-আ, মারবে না।"
---- "চুপ করে বোস তাহলে মারবো না।"
---- "উঁ উঁ উঁ বড়জেঠুর কাছে ঘুমাবো'
---- "কাঁদে না বাবাই, কেঁদো না। আসবে তো বড়জেঠু।'

---- "ও কি আর কখনও ভাল হবে না?'
---- "কি জানি!! "ভাল হবে না", এটা ভাবতে দমবন্ধ হয়ে আসে। অথচ একটু আশাও তো দেখি না কোথাও'
---- "কত ডাক্তার তো দেখানো হল। ছোটবেলায় পোলিও না হলে হয়ত.....'
---- "হ্যাঁ না হলে, বা ঠিক সময়ে ঠিক চিকিৎসা টা হলে.....'
---- "যাও আরো তোমার সাধের বালুরঘাট। ঐ তো ছব্বার ডাক্তার সব!!!'
---- "তারপরে তো কলকাতার সব বড় বড় ডাক্তারদেরই দেখানো হল ---- তোমার ভাইরাও যদি একটু চেষ্টা করত; আমার ভাইরা তো জান দিয়ে করল।'
---- "আমার ভাইরা কি করবে শুনি? তোমার ঐ বালুরঘাটের ডাক্তার জন্মের সময় গন্ডগোল করল ... তারপরেও তুমি গেলে ওখানেই। এমন গরু ডাক্তার সব, ধরতে পর্যন্ত পারল না যে পোলিও হয়েছে!! এখনও পা টা সরু হয়ে আছে। মনে আছে কিরকম বেঁকে গেছিল? বসতে পর্যন্ত পারত না ছেলেটা।'
----.......
----.......
----.......
----.......

----- "থাক আর কেঁদে কি করবে!! যা হবার তো হয়েই গেছে। যা কপালে আছে তাই হবে। '


----- "জানিস ওদের বাড়ীতে সেই পাগলটা এসেছে।"
----- "কে? সেই মেজছেলের পাগল ছেলেটা?"
------ "হ্যাঁ। আবার বলে ও নাকি পাগল নয়। আচ্ছা বল তুই, ঐভাবে চীৎকার করে যখন তখন। সেদিন নাকি হাত ধোবার বেসিন ধরে এমন হ্যাঁচকা মেরেছে যে বেসিনটা দেওয়াল থেকে খুলে এসেছে।"
----- "অ্যাঁ!! বল কি? এমন আসুরিক শক্তি কোত্থেকে হল?"
----- "হ্যাঁ: হবে না কেন! রাতদিন মেজবৌ যা গেলায়। কোন ক্ষয় তো নেই শরীরের। সারাদিন বসা আর শোয়া। খেলাধুলা, হাঁটাচলা কিছুই তো নেই!"
----- "অথচ আগে কিন্তু ছেলেটা খেলতে বেরোত। এই ধর ৬-৭ বছর বয়স তখন ওর, তখনও দেখতাম তো।'
---- " হ্যাঁ সে আমিও দেখেছি। কিন্তু কি মার মারত অন্য ছেলেগুলোকে। সেবারে খগেন দত্তের ছোট ছেলের চোখে এমন খোঁচা মারল; ওরা তো পুলিশে ডায়েরী করবে বলেছিল, শেষে অনেক করে ওরা চাপা দেয়। একেবারে খুনে টাইপের।'
---- "তা, পাগল যদি হয়, তার কি কোন জ্ঞানগম্যি আছে গো! সে কি আর খুন করবে বলে মারে; অমনি অমনিই মারতে থাকে।'
---- "আরে ছেলে যখন পাগল, তখন তাকে অমনি ছেড়েই বা দেওয়া কেন? আবার জোর দিয়ে বলবে 'ও পাগল নয়!' তা পাগল না হলে তো খুনেই বলতে হয় অমন মারকুটে ছেলেকে।'
---- "আহাগো মা হয়ে কোন প্রাণে ছেলেকে পাগল বলবে বল দিকি! অনেক ছেলেই তো অমন গুন্ডামত হয়। শুধু এ যে দিনে দিনেই কেমনতাড়া হয়ে যাচ্ছে ....... মায়ের প্রাণটা কেমন করে বল দিকি!"
---- "তা ঠিক বলেছিস রে! সত্যি ছেলে যদি চোক্ষের সামনে অমনি হয়ে যেতে থাকে, মায়ের হয়ত ঐটুকুই সান্ত্বনা। কিন্তু, কোন ডাক্তারে কিছু করতে পারে না? আজকাল কতকি ই না বেরিয়েছে।"
---- "পারলে কি আর করত না! কতশত ডাক্তার তো দেখায়। ঐ যতবারই এখেনে আসে, জানবে ডাক্তার দেখাতেই এসেছে।এক তো বাঁধা ডাক্তার আছে। তাকে ক'মাস পর পর যেন দেখাতে আসে। এইসময় অন্য কোন ডাক্তারের খবর পেলেও একেবারে দেখিয়ে যায়।"
---- "তা অত ডাক্তার দেখছে কোন উন্নতি তো অন্তত হবে একটু!"
---- "আসলে ডাক্তারের ওষুধেই একটু শান্ত থাকে। নাহলে ঐ চীৎকার গড়াগড়ি দিয়ে কান্না আর দাপাদাপি প্রচন্ড বেড়ে যায়। দিনে ২-৩ বার করেও নাকি হয়। ভাবো দিকি কি অশান্তি বাবা মায়ের!।"
---- "তবু বলবে পাগল নয়! আশ্চজ্জ! মরুক গে। তবে ওদের বাড়ীসুদ্ধু সক্কলের খুব গুমোর।"
--- "হ্যাঁ তা গুমোর আছে বটে। তা থাকবেই বা না কেন বল; সক্কলে তো লেখাপড়ায় অত্ত ভাল। তাপ্পর গে তোমার দেখতেও একেকজনা দিব্বি। তা গুমোর থাকতেই পারে।"
---- "হুঁ: একমাত্তর নাতি, পাগল। একমাত্তর মেয়ে, বিধবা। তাও কিসের অত দেমাক।"


---- "রিনির কান্ড দেখছিস দিদি! একটা হাঁচি দিসে কি দেয় নাই, অমনি কানমাথা জড়াইয়া মাফলার পরাইয়া দিসে। এই করে করে ছেলেটা আরো কেমন হয়ে যাচ্ছে।"
---- "তাছাড়া আবার কি! ছোটবেলায় বাবাই কত কবিতা বলত, দিব্বি পড়তে শিখছিল, অথচ এখন দ্যাখ অবস্থা।"
---- "গানটাও যদি শিখত ঠিক করে ....... গান তো এখনও কি ভাল গায়। বাড়ীতে মাস্টার আসত ... হঠাৎই এমন মারতে শুরু করল; সে মাস্টারকে শুদ্ধ মার, মাস্টার তো আর এলই না, উল্টে ঠাকুরপোকে রাস্তায় ধরে কত কথা শোনাল। সব শেখাই বন্ধ করে দিতে হল।"
---- "পরের ছেলে সে অত মার খাবেই বা কেন বল! আমরাই তো পারি না সহ্য করতে। আর গায়ে কি জোর রে বৌদি! আমারে সেদিন একখান গুঁতা দিল; উফ্‌ মাথা ঘুইর‌্যা গেসিল গা। মেজদারই শাস্তি! ঘরেবাইরে কোথায়ও একটু শান্তি নাই।"
---- "আর, আমি বুঝি না দিদি, এই যে এত ডাক্তার দেখছে, কেউ কি কিচ্ছু করতে পারে না? পাগল হলে বুঝতাম, যে হ্যাঁ পাগল তো অনেকসময়ই ভাল হয় না। কিন্তু ডাক্তার তো নাকি বলেছে যে পাগল নয়; তাহলে সেই অসুখ কেন ভাল করতে পারে নারে?"
---- "ডাক্তার নাকি বলেছে যে ও তো ফরসেপ্‌স্‌ বেবী, ওর জন্মের সময় বালুরঘাটের যে ডাক্তার ফরসেপ্‌স্‌ করে, সে বের করার সময় মাথার পাশে অসাবধানে চোট লাগিয়ে দেয়। তাতেই নাকি বাবাই অমন মেন্টালি রিটার্ডেড। ভাল হতেও পারে নাও হতে পারে।"
---- "হ্যাঁরে মনে আছে, জন্মের পর বাবাইয়ের মাথার একপাশে কেমন টোল খাওয়া ছিল। ডাক্তার নাকি বলেছিল ও কিছু না, বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে। হা ভগবান!!! আসলে ওটাই ছিল সব সব্বনাশের মূল! কি শয়তান ডাক্তার, ভাব একবার।"
---- "ডাক্তার কেন স্বীকার করতে যাবে যে ভুল করেছে। লোকে ঠ্যাঙাবে না ধরে তাহলে! কেন যে মেজবৌদি বালুরঘাট গেল! ঐ গ্রামদেশে কি আর ভাল ডাক্তার পাবে।"
---- " আসলে প্রথম পোয়াতি তো মায়ের কাছেই যেতে চাইবে। কেউই আর সেরকম জোরও করে নি সেইজন্য। সবই কপাল!"
---- "সেই, কপালের ভোগ ছাড়া আর কি! যতদিন ভোগ আছে ভুগতে হবে।"

---- "ছোটবেলায় আমরা দুই বোন মোটামুটি আদরের ছিলাম বাড়ীতে। বাবা ছিলেন বালুরঘাটের ডাকসাইটে উকীল, কাকারাও তাই। বাড়ী সবসময় জমজম করত লোকজনে। বিয়ে হল কলকাতার কাছেই। সে বাড়ীতেও ওরা চার ভাই, এক বোন। কিন্তু শাশুড়ীর চাপা টান ছেলেদের প্রতিই। বড় জায়ের এক মেয়ে। তাই আমার যখন ছেলে হল, এক ধাক্কায় যেন আকাশে উঠে গেল সম্মানটা। কত আদর-যত্ন, বড়জায়ের হিংসা ---- এ সবই বেশ লাগত। অথচ প্রথম হল পোলিও। সে ছেলে একেবারে যায়-যায়। প্রতিটা লোক আমাকে দোষী করল কেন বালুরঘাটে গেলাম। ছেলের একটু কিছু হলেই যে ফুলকাকীমার কথাই মনে হয়; আমাদের ছোটবেলা থেকে সব হ্যাপা তো মায়ের চেয়েও বেশী সামলেছে ফুলকাকীমা। কির'ম মনে হয় ফুলকাকীমার কাচে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিছুই ঠিক হল না, আরো খারাপ হয়ে গেল। ছেলে যদি বা প্রাণে বাঁচল --- বুদ্ধিশুদ্ধি আরো বিগড়ে গেল। ওর বাবার অত মাথা লেখাপড়ায় ---- ছেলে তার কিছুই জানল না। আমারও ঠিক করে গান শেখা হয় নি, বাবাইয়েরও হল না। কি ভাল গায়, সোনা আমার। অন্তত গানটাও যদি শেখানো যেত; কত লোক তো রেডিওতে গান গায়; ও-ও নাহয় অমনি করেই গাইত এখানে ওখানে। আমরা যখন থাকবো না, কি করে বাঁচবে ছেলে, কে দেখবে ওকে; ওর বাবা কত টাকা রাখতে পারবে ওর জন্য; তা দিয়ে কি ওর গোটা জীবন চলতে পারবে, নাহলে কি হবে! --- জানি না জানি না কিচ্ছু জানি না; ভাবতেও পারি না; ওর বাবা এইসব ভেবে ভেবেই আরো খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। একে তো চার ভাইয়ের মধ্যেই ও-ই সবচেয়ে রাগী। এখন এক্কেবারে সবকথায় খ্যাঁক করে ওঠে। কিন্তু আমিই বা কি করি! হা ভগবান আর যে পারি না!"

---- "কমল, বাবাইয়ের কি একটু উন্নতি হয়েছে রে? একটু যেন শান্ত লাগে। সেই হুঙ্কার দেওয়াটা বন্ধ হয়েছে মনে হয়।"
---- "একটু থুম ধরে থাকে আর কি! হয়ত ওষুধের রিয়কশান এটা।"
---- " অলকেন্দু তে আর পাঠাবি?
---- "না দাদা, ওখানে আর পাঠাব না। ছেলেটা বেরিয়ে চলে গেল ..... আর ওরা কিছু জানতেই পারল না!! তারপরও কোন হেলদোল নেই! বাবাইকে যদি আর কোনদিন ফেরত না পেতাম! চিকিৎসা তো কিচ্ছু হয় নি, বরঞ্চ অন্যরা ওকে আঁচড়ে কামড়ে দিয়েছে। এখনও সমস্ত দাগ রয়ে গেছে। মাইনে করা লোক আছে গন্ডা গন্ডা। কেউ একটু দেখেও না।"
---- "অথচ পয়সা তো দিব্বি কাঁড়ি কাঁড়ি নেয়! এদের তো বেশ নাম ও আছে!"
---- " সেটাই তো কথা! এত নাম আছে। রিটার্ডেড বাচ্চাদের ওরা নাকি স্বনির্ভর হবার শিক্ষা দেয়, সাহায্য করে। এই যে রইল, একটা কিছু নিজে করতে শেখে নি। খাবার না খেলে, না খেল, কেউ দেখেই না। আরে ও কি আর পাঁচটা স্বাভাবিক বাচ্চার মত, যে ক্ষিদে পেলে ঠিক নিজে নিজে খাবে! বাড়ীতে পারি নি কিছুতেই শেখাতে, তাই ভাবলাম ওখানে শিখে যাবে। সবাই তো বললও। ভর্তি করার সময়েও ওরা সেরকমই বলল। কিসের কি!"
---- "কোন ডাক্তার দেখতেন না ওখানে? তাঁদের সাথে কথা বলেছিলি? কি বললেন? আর এই দেখাশোনা না করা নিয়েও তো কমপ্লেন করতে পারতিস। হয়ত কেউ কমপ্লেন করে না বলেই আরো দায়সারা ব্যবস্থা।"
---- "সপ্তাহে একদিন করে ডাক্তার দেখতেন। অন্য কোনবড় অসুখ কিছু না হলে সপ্তাহের মাঝখানে দেখেন না। আছেন নাকি বেশ কয়েকজন ডাক্তার। বাবাইকে তো একজনই দেখতেন। তিনি কিছুই বলেন নি পরিস্কার করে। কি যে ওষুধ দিতেন তাও কখনও বলেন নি। বাবাইয়ের পুরোন প্রেসক্রিপশানগুলো নিয়ে একটু নেড়েচেড়ে মুচকি হেসে ফেরত দিয়েছেন। ব্যাস! অভিযোগ তো করার সময়ই পাই নাই। মাত্র ১ মাস হয়েছে; ভাবলাম আরেকটু দেখি। রিনি গেছে ভিজিটিঙ আওয়ার্সে; গিয়ে দেখে ছেলেই নেই; কেউ জানে না পর্যন্ত! একটা আয়া আবার বলে চেঁচাবেন না, এক্ষুণি এসে যাবে।-- তাই শুনে তো আরো ১৫-২০ মিনিট অপেক্ষা করল। রিনি যেই বাথরুমে দেখতে গেছে অমনি তাদের কি রাগ! পারলে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়"
---- "শুনেই তো ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়। তখন সুপারের কাছে গিয়েছিলি? কি বলে?"
---- "রিনি তো কানতে কানতে আমায় ফোন করেছে মোড়ের দোকান থেকে। ভাগ্যিস অফিসের অরূপ, ওরা আমার সঙ্গে এলো। ওরাই তো পুলিশে ডায়েরী, কাছাকাছি চায়ের দোকানে জিজ্ঞেসবাদ, খোঁজ সব করল; রিনি কেঁদেই একশা, আমারও মাথা কাজ করছিল না তখন।"
---- "কি রকম বদমাইশ এরা। ছেলেটা যদি গাড়ীচাপা পড়ত!!! ওর তো কোন বোধ নেই; চলে গেল রাস্তার মাঝখানে -- তখন? এই শয়তানের দল তখন মুখ মুছে বলে দিত "আমরা তো জানি না; আপনার ছেলে পালিয়ে গেসল'; বা এরকম কিছু একটা। ওদের আর কি! যার যায় তারই যায়।"

---- "বাড়ীর মেজছেলে হওয়ায় ছোটবেলা থেকে অনেক কিছুতেই বঞ্চিত হতাম দাদা হল বড়ছেলে, তাই মা'র যত আদর যত্ন দাদাকে; ছোট ভাই অমল পড়াশোনায় ভীষণ ভাল; তাই বাবা জ্যাঠাদের সব স্নেহ ওর প্রতি। বোনটা সব জ্যাঠা কাকাদের ছেলেমেয়ে মিলিয়ে একমাত্র বোন, তাই আমাদের সকলেরই খুব আদরের; আমি তো সবেতেই মাঝারী। লেখাপড়ায় ঐ কোনরকমে ফার্স্ট ডিভিশান। ঢুকেছিলাম এ জি বেঙ্গলে; ঘষটে ঘষটে সেখানেই একটু উঁচুতে চড়া। অমলও ঢুকেছিল এ জি বেঙ্গলে; কবেই ছেড়েছুড়ে প্রাইভেট কোম্পানিতে গেল; কস্টিং পড়ল; বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে এসে তখনও আমরা সেট্‌ল হতে পারি নি ঠিকভাবে --- বাবা কোনমতে একটা স্কুলে কাজ পেল; অমলের তাই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া হয় নি। খুব ইচ্ছে ছিল ওর; ম্যাট্রিকে ফিফ্‌থ হল ....... অথচ ওরও তো এমন ভাগ্যের ফের ঠিক আই এস সির অগেই, প্রথমে হল চিকেন পক্স তার পরেই ম্যানেঞ্জাইটিস। তাও আই এস সিতে ফার্স্ট ডিভিশান, বেশ ওপরের দিকে নম্বর পেল। আমি হলে তো কোনমতে টায়েটোয়ে পাশ করতাম অমন অবস্থায়। দাদার বিয়ে হল,মেয়ে হল, একমুঠো ফুলের মত ফুটফুটে বুকু। অমলেরও মেয়ে, খুকু। অমন ফুটফুটে নয়; কিন্তু লেখাপড়ায় অমলের মত না হলেও রীতিমত ভাল। বাবাই হবার পর মা জীবনে বোধহয় সেই একবারই আমাকে দাদার চেয়েও বেশী ভালবাসল। অথচ .......... কীভাবে যে সব গোলমাল হয়ে গেল! ................. মাসে সাড়ে চার হাজার টাকার ওষুধ লাগে বাবাইয়ের। রিটায়ার করে গেলাম; পেনশান যদিও পাই; জিনিষপত্রের দাম দিনে দিনে বাড়ছে; কি করে কি হবে জানি না ............ আমরা মরলেই বা বাবাইয়ের কি হবে! রিনি বলে ভোমলা, মানে খুড়তুতো ভাইকে এই বাড়ীটা আর সব টাকাপয়সা লিখে দিয়ে যেতে ..... বাবাইকে দেখবে এই শর্তে। কিন্তু রিনি বোঝে না ভোমলাও তো একদিন বুড়ো হবে, মারাও যাবে ভোমলা আর আমাদের চেয়ে কতই বা ছোট -- রিনির চেয়ে বছর দশেকের। আর কে কবে মরবে সে কি আর কেউ জানে ......... বাবাইয়ের চেয়ে বয়সে ছোট কাউকে যদি সব লিখে দিয়েও যাই সে যে দেখবেই তার কি ঠিক আছে! সব নিয়ে ওকে রাস্তায় বের করে দিলেও তো কিছু করতে পারবে না! ............... এখন রিনি সব কিছু করে দেয় বাবাইকে; দাড়ি কামিয়ে নখটখও কেটে দেয়। ঐ ৩০ বছরের ছেলে; সুস্থ হলে এখন বিয়ের খোঁজ করার কথা; সে ছান করে সম্পূর্ণ উদোম হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, রিনি গিয়ে গা মুছিয়ে জামা পরিয়ে দেয়। সাবান শ্যাম্পুও মাখিয়ে দিতে হয়। এমনকি রিনিকেও বলতে পারি না .... কিন্তু আমার তখন বাবাইকে দেখতে বড় ঘেন্না হয়; নিজের ওপর, ওর ওপর, রিনির ওপর। লোক রাখলে তো মেরেধরে একশা! কিন্তু ........ কিন্তু ঈশ্বর না করুন ...... আজ যদি হঠাৎ রিনির কিছু হয়! জীবন-মৃত্যুর কথা কেউ তো বলতে পারে না ......... আমি কি করব! আমি ........ আমি ....... ঐ জগদ্দল পাথর নিয়ে ......... উফ্‌ ভগবান!"

---- "হ্যালো, খুকু?"
---- "হ্যাঁ মেজমা, বল। কেমন আছ তোমরা?"
---- "হ্যাঁরে তোর বড়কাকু এসেছে তোদের ওখানে?"
---- "বড়কাকু? না তো ..... কিন্তু বড়কাকুর তো এই শনিবার ছোটকাকুর ওখানে যাবার কথা ছিল না?"
---- "তাই বলেই তো গেল। বলল সোমবার ফিরবে। কাল সারারাত আমি ভেবে ভেবে হয়রান। ভাবলাম হয় ওখানে নয়ত রাস্তায় আটকে গেছে ...... শেষে আজ এতবেলা অবধিও কোন খবর না পেয়ে বাচ্চুকে অফিসে ফোন করেছিলাম। বাচ্চু তো একেবারে আকাশ থেকে পড়ল। তোর বড়কাকু নাকি ওখানে আদৌ যায়ই নি। আমি এখন কি করি?
---- "অ্যাঁ!! সেকীই?? ও বাবা তাহলে কোথায় গেল .......? এই নাও বাবার সাথে কথা বল। উফ্‌ আমি তো কিচ্ছু ভাবতে পারছি না।"
---- "হ্যাঁ মেজবৌদি, মেজদা কবে রওনা হয়েছে? সেদিন কি শরীর টরীর ঠিক ছিল, নাকি একটু একটু খারাপ লাগছিল? এরম কিছু বলেছিল কি?"
---- "না ঠাকুরপো ও তো একদম ফিট ছিল। ভাইয়ের ওখানে যাবে বলে বেশ খুশী খুশীও ....... শনিবার সকাল সকাল বেরিয়ে গেল, বলল বিকেলের মধ্যেই যাতে বাচ্চুর ওখানে পৌঁছে যায়। আমি জনে জনে ফোন করেছি গো, কোথায়ও যায় নি। ও ঠাকুরপো আমি এখন কি করি গো - ও-ও-ও-ও"
---- "কি সাংঘাতিক!! দাঁড়াও এক্ষুণি অত অধৈর্য্য হয়ে পড়লে চলবে কি করে। এখন মাথা ঠান্ডা করে পাশের রঞ্জিতবাবুদের কাউকে সঙ্গে নিয়ে থানায় গিয়ে ডায়েরী কর। ভোমলা বা লাকী যদি আসতে পারে তো খুব ভাল হয়। আমি দেখছি কালকের ফ্লাইটে যদি বুকিং পেয়ে যাই তো খুব ভাল, নাহলেও পরশু শিওর।


---- "হ্যাঁগো কাকী, ঐ পাগলটার বাবার কোন খবর পাওয়া গেল? শনিবারে নাকি বেরিয়ে গেছে ভায়ের বাড়ী যাবে বলে, আর কোন খবর নেই।"
---- "হ্যাঁরে রমা। খবর তো পাওয়া গেছে, কিন্তু সে কি আর ভাল কোন খবর রে ....। এমন হলে তো কোনকালেই দেখলাম না ভাল খবর আসতে।"
---- "কিগো? পাওয়া গেছে? জ্যান্ত, অসুস্থ? নাকি .....?"
---- "আর কি .... অন্তত শেষ অবস্থায়ও যদি পাওয়া যেত, তো স্বান্ত্বনা থাকত যে শেষ দেখাটা হল। কিন্তু ভাগ্যে না থাকলে আর কি হবে!"
---- "কি বলছ কাকী!? কোথায় পাওয়া গেল? পুলিশ কি বলছে? কি হয়েছিল? ছেলেটার কি হবে গো!"
---- "পুলিশ ঠিক নয়। ঐ তো আন-আইডেন্টিফায়েড লাশ হিসাবে মর্গে ছিল। সবাই মিলে খুঁজতে গিয়ে অনেক কষ্টে পেয়েছে। আর একদিন দেরী হলে পুলিশ পুড়িয়ে দিত। পুরো পচ্‌ ধরে গেছে, কিচ্ছু চেনা যাচ্ছিল না ..... ঐ হাতের পলার আংটি দেখে কোনমতে সনাক্ত করেছে। এই তো আজকেই ছাড়িয়ে আনবে। নাকি, শেয়ালদার একটা হোটেলে পাওয়া গেছে। বেগন স্প্রে খেয়েছিল। আর .... আর ....."
---- "উফ্‌ মাগো! কেন কাকী কেন? বাড়ী থেকে ভুল বলে বেরিয়ে হোটেলে গিয়ে .... বেওয়ারিশ লাশ হিসাবে মর্গে ..... কেন?"
---- "কি করে জানব! ঐ শনিবার সকালেই নাকি শেয়ালদার ঐ হোটেলে গিয়ে চেক-ইন করেছিল। ঠিকানা দিয়েছিল বালুরঘাটের শ্বশুরবাড়ীর। তারপর আর বেরোয় নি। হোটেলে কোন খাবার নেবে না আগেই বলে দিয়েছিল। পরেরদিন দুপুরেও দরজা না খুলতে দেখে হোটেল থেকে দরজা ভাঙে। দেখে বিছানা থেকে নীচে পড়ে আছে। বিছানায় নতুন চাদর পেতেছিল, একেবারে তছনছ। বেগন স্প্রে পুরো শেষ, একটা অরেঞ্জ স্কোয়াশের বোতল হাফ খালি। তখনও প্রাণটা নাকি ধুকধুক করছিল। হোটেল থেকে পুলিশ ডাকে, পুলিশ এসে মেডিকেলে ভর্তি করে, সেখানেই রাতের দিকে মারা যায়। পুলিশ তারপরেই মর্গে নিয়ে যায়। পোস্টমর্টেম বলছে আন্দাজ শনিবার দুপুর ১২ টা নাগাদই বেগন স্প্রে খেয়েছিল।"
---- "কিন্তু কেন? কিছু লিখে রেখে যায় নি? মাগো মাগো কি বীভৎস কষ্ট পেয়েছে বলত!"
---- "সারা ঘরে অজস্র কাগজ পাওয়া গেছে যাতে লেখা "রিনি আমাকে ক্ষমা কোরো", শেষের দিকে আর লিখতেও পারে নি, কেবল জড়ানো আঁকিবুকি।"
---- "বাবাইয়ের মাকে বলা হয়েছে? ছেলেটা কি করছে?"
---- "না একেবারে বডি এনেই বলা হবে। ভাই বোনদের বলা হয়েছে। পাগলটার কথা ভাব দিকিনি ..... কিচ্ছু বুঝবেই না .... এই যে ওর বাবা চলে গেল, এইভাবে ..... কি অভিশপ্ত জীবন!"

---- "বাবাই বিছানায় উঠে শোও। মাটিতে শুয়েছ কেন?"
---- "বাবা আসবে। মা, বাবা আসবে! বাবাই লুচি খাবে বাবার সাথে"
---- "ব্যাব্যা অ্যাসবে! আহাহা কি ভাল ব্যবহারই করছিস বাবার সাথে! তোর জন্য, তোর যন্ত্রনায় এমনভাবে চলে গেল মানুষটা। লুচি রে, পায়েস রে কোনটা না খাও শুনি? ৪০ বছর বয়স হতে চলল এখনও সর্বস্ব করিয়ে দিতে হয়! দামড়া কোথাকার।"
---- "বাবা আসবে। বা-আ-বা-আ আসবে-এ-এ-এ। আচ্ছিলা-আ-ল! অ্যাঁ অ্যাঁ অ্যাঁ অ্যাঁ!!!"
---- "চুপ! একদম চুপ! বলেছি না মরে গেলে কেউ আর আসে না। চেল্লাবি না। মনে আছে, ওপরের রঞ্জিতকাকুরা উঠে যেতে বলেছিল, চেঁচানিতে ওঁর হার্টের প্রবলেম বেড়ে যায় বলে!! ...... আমিই বা কাকে বলছি! তোর কি আর কোন বোধ আছে! কে, কি, কার হার্টের কি, কোনকিছুই যদি বুঝতিস! কেঁদো না বাবাই। চল খেয়ে নেবে। আর বিছানায় উঠে বোসো তো বাবা। মাটিতে ঠান্ডা লাগবে।"
---- "না-আ-আ-আ বাবা মরে যাবে না-আ। বা-আ-বা-আ আসবে-এ-এ-এ। রঞ্জিতকাকুকে লাত্থিইই!"
---- "বা-আ-বা-আ-ইই! চুপ করতে বলেছি না। এরম কল্লে আমিও মরে যাব। দেখি কে তোরে রোজ চান করিয়ে খাইয়ে দেয়।"
---- "না মা মরবে না। মা থাকবে। আর বলবো না।"

---- "রিনি কেমন আছিস রে? বাবাই কেমন আছে?"
---- "দিদিই? এই তো ... কি বলব বল! আছে নিজের খাঁচার মধ্যেই থাকে। বাবাইয়ের তো আবার চেঁচামেচি বেড়েছে। মাঝে মাঝে 'বাবা আসবে' বলে খুব কান্নাকাটি দাপাদাপি করে, খাঁচার গ্রীল ধরে এমন ঝাঁকায়, মনে হয় উপড়ে আসবে। বোঝাতেও তো পারে না ঠিক করে ...... কিন্তু খোঁজে যে, সেটা বেশ বোঝা যায়।
---- "সেই তো, ও আর কিভাবে বোঝাবে! অথচ কোনরকম বোধ তো নিশ্চয়ই আছে। আর ঐ অত স্মরণশক্তি! ওর তো প্রতিটা মূহুর্ত মনে আছে, বেচারা বোঝাতে পারে না কাউকে। হ্যাঁরে, তোর বিল্ডিঙের অন্যরা যে তোকে বাড়ী ছাড়তে বলছিল, সেটা মিটেছে তো?"
---- "সেই যে ভোমলা, লাকী, ঠাকুরপো সব এসে কথা বলল, তারপর থেকে তো আর কিছু বলে নি। কোথাও দেখা হলে কথা কয় না, মুখ ঘুরিয়ে নেয়। আর দেখ ওদেরও কি আর খুব দোষ দিতে পারি? রঞ্জিতবাবু হার্টের রুগী, বাবাই এমন আচমকা চেঁচিয়ে ওঠে যে আমাদের সুস্থ মানুষদেরই পিলে চমকে ওঠে ........ ওঁর নাকি বুক ধড়ফড় এত বেড়ে যায় যে ওষুধ খাওয়াতে হয়। অথচ আমিই বা কোথায় যাই বল দিকি?
---- "না না তুই যাবি কেন। বাড়ীটা তো মেজদা কিনেছিল। এখন ওঁদের অসুবিধা হচ্ছে বুঝি ..... কিন্তু একটু তো মানাতেই হবে! তুই কি শখ করে ওঁদের বিরক্ত করছিস? না এটা তোর হাতে? এইটুকু তো বুঝতে হবে। কিজানি হয়ত মেজদা থাকলে আজ এরা এমন করে ধেয়ে আসত না! তোকে দেখেছে একলা মহিলা ............ মানুষ তো সবসময়ই দূর্বলের ওপরেই অত্যাচার করে। কি যে করল মেজদাটা ........ ছেলেটার কথা ভাবল না!?"
---- "হয়ত ছেলের কথা বেশী করে ভাবল দেখেই এমন করে চলে গেল। হয়ত ভাবল কিছুই তো করতে পারল না ছেলের জন্য ........ এত ডাক্তার, ওষুধ কিছুতেই কিছু হল না। কোথায়ও দেওয়াও গেল না ....... শেষের দিকে বারবারই বলত আমি যদি আগে মারা যাই, তাহলে ও কি করে সামলাবে বাবাইকে .... সবকিছু। হয়ত ওটাই ভয় ধরেছিল। আমি আগে গেলে তো ওকেই বাবাইয়ের চান খাওয়া, দাড়ি কামানো এমনকি পেট খারাপের সময় তো পায়খানাও পরিস্কার করতে হয় ......... আর ঐ অত বড় চেহারা ....... আমাদের কাছে ছেলে হলে কি হয় আসলে তো ৩৫ পেরোন দামড়া লোক। আমি "মা' তাই করি ....... আমার কেমন মনে হয় এই ভয়েই ও আরো অমন করে চলে গেল।
---- "তাই হবে হয়ত। কিন্তু .... কিন্তু, নিজে নাহয় পালিয়ে বাঁচল। তোর কি হবে, ছেলেটারই বা কি হবে, এইগুলো ভাবল না। হ্যাঁরে রাঁচি বা মানকুন্ডু, দু জায়গার একজায়গাতেও জায়গা হল না?"
---- "জায়গার জন্য তো নয় রে দিদি; ও দুটো জায়গাই পাগলাগারদ। বাবাই তো পাগল নয়। ওরা বলে একেবারে ভায়োলেন্ট পাগল না হলে ওরা রাখতে পারে না। বাবাই যে মাঝেমাঝে ভায়োলেন্ট হয়ে ওঠে, সেটা যথেষ্ট নয়। ওরা মেন্টালি রিটার্ডেডদের রাখে না। রাঁচি তে তো আমি হাতের একটা দাগও দেখালাম, বাবাইয়ের কামড়ের ....... কিন্তু সব ডাক্তারদের রিপোর্টই তো বলছে ও পাগল নয়। আগে আগে, ভাল লাগত, স্বস্তি হত, পাগল নয় শুনলে। কিন্তু কি লাভ হল বল? বাবাই ভালও হল না ............"

---- "হ্যাঁগো, রিনি আসে নি, তোমার মেয়ের বিয়েতে?"
---- "হ্যাঁ মাসীমা, এসেছিল দুপুরের দিকে, এই তো সন্ধ্যে লাগতে লাগতে চলে গেল, অতটা যাবে, বেশী রাত হয়ে গেলে মুশকিলে পড়বে।"
---- "বাবাইকে নিয়ে এসেছিল? আহা একটা রাত থাকলে আর কি এমন হত! তোমরা কি আর একটা ঘর ছেড়ে দিতে পারতে না?"
---- "না: বাবাইকে আনে নি, আনা সম্ভবও নয়। আজকাল ওকে গাড়ী করেও আনা যায় না। গাড়ীতেই হঠাৎ যদি শুরু হয়; তাহলে সামলানো যায় না। ওর কাজের লোককে বসিয়ে রেখে এসেছিল।তাতেই তো তাড়াতাড়ি করে চলে গেল। সে লোক আবার রাত ন'টার পর থাকতে হলে ডবল টাকা চায়। ঘরের অসুবিধা কি মাসীমা, ওকে আনতে পারা গেলে আর কথাই ছিল না।"
---- "সেকীগো! ডবল টাকা মানে? ঐ ক'ঘন্টা ঐ অসহায় ছেলেটার কাছে থাকবে বলে আবার পয়সা নেয়? আজকালকাল ছোটলোকগুলোর এত খাঁই বেড়েছে .... মাগোমা।"
---- "হ্যাঁ বাবাইয়ের কাছে থাকতে ঘন্টায় ২০০ টাকা করে নেয়। মোটামুটি যাওয়া আসা নিয়ে ৮-১০ ঘন্টা তো হয়েই যায়। আর ওদেরই বা দোষ কি মাসীমা, ওরা তো ঐসময়টায় কাজ করলেই দুটো টাকা বেশী পাবে। তাই এমনি বসতে বললে মুখের ওপরে "না' তো করে না, কিন্তু অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে যায়।"
---- "ওমা বাবাই এমন ভয়ঙ্কর হয়ে গেছে!! বাড়ীতে রিনি একা সামলায় কি করে? ওকে মারধোর করে না?"
---- "ঐ তো খাটটাকে দরজার কাছে এনে, খাটের চারপাশে খানিকটা জায়গা গ্রীল দিয়ে ঘিরে দিয়েছে গ্রীলে তালা দিয়ে রাখে সারাদিন। চান, পায়খানা করার সময়ে খুলে দেয়। বাবাই একদম যন্ত্রের মত বেরিয়ে সোজা বাথরুমে চলে যায়।"
---- "আর খাওয়াদাওয়া? নিজে হাতে খায় না এখনও রিনি খাইয়ে দেয়?"
---- "ভাতটাত রিনিই খাইয়ে দেয়। শুকনো কিছু হলে কখনও সখনও হাতে দেয়। ও তো এখনও ফেলেছড়িয়ে এমন করে,শেষে রিনিরই শাস্তি!"
---- "ঐ করে করেই ছেলেটাকে আরো নষ্ট করল। সেই ছোটবেলা থেকে দেখছি 'আহা বাবাই পারবে না, নষ্ট করবে'। আশ্চজ্জি!! ছেলেপুলে একটু নষ্ট করবে না? ফেলেছড়িয়ে খেয়ে, তবেই তো ওরা খাওয়া শেখে। আমি তো বলব ছেলের পাগল হবার পেছনে মায়েরও অনেক শিক্ষার দোষ আছে।"
---- "সে আর কি বলব মাসীমা ......... এই তো আমার বুকু ছোটবেলায় সব্বস্ব মেঝেতে ঢেলে ফেলে তবে খেত। তখনও রিনি একেবারে আঁতকে উঠত। তা আমি কান করি নি ছেলেপুলেরা অমন কতকিছু করে। বাবাইকে কোন বাইরের বাচ্চা একটু মারল, তো ও আর ওদের সাথে খেলতে দিল না। অথচ ছোটবেলায় কিন্তু বাবাই দিব্বি খেলাধুলো করত।
---- "সেই তো বলছি। আরে অন্যরা মারে মারুক, তোমার ছেলেও তো তাদের মারে বাপু। ছেলেপুলে অমন মারপিট করে করেই বড় হয়। যবে থেকে অত মারহাত হল, তবে থেকে যদি অত আতুপুতু না করে ওকে একটু ছেড়ে দিত, ও নিজেই অন্য বাচ্চাদের কাছে মার খেয়ে সিধে হয়ে যেত। ইশ বংশের একটা মাত্র ছেলে! কমলটার কি ভাগ্য! জীবনে এতটুকু সুখ পেল না!"
---- "আর ছেলে! অত ছেলে ছেলে করে হবেই বা কি! বাবাই জন্মের পর তো মা দেখতাম একেবারে আকাশে হাঁটছেন। কেমন হইসে এখন। হুঁ:"
---- "সে তুমি যাই বল বাপু, আমি দিদির কোন দোষ দেখি না। তোমাদের আর সব বৌদেরই তো মেয়ের ঢিপি ... ঐ এক ছেলে হলে আনন্দ করবে না! তখন কে জানত এমন হবে!"
---- "তবে আর কি!! সেই ছেলের পাহাড় এখন মাথায় নিয়ে বসে থাকুন! পাহাড় বলে পাহাড়, এক্কেরে জগদ্দল পাথরের পাহাড় নড়ায় কার সাধ্য।"

---- "আজ কদিন কেউ ফোন টোন করে নি; এদিকে বাবাইয়ের যা অবস্থা ; একটা কিডনী নাকি ঠিক কাজ করছে না, ওষুধের ওপরেই নির্ভর। ভগবান এবার ওকে মুক্তি দাও; আর যে পারি না। কমল তো কেমন নিজেরটুকু ভেবেই পালালো। কতবার বলেছি আর একটা ছেলেপুলে যদি থাকত! ওর এক ভয়; যদি বাবাইয়ের মত হয়! আমিও তাই ভাবলাম, যদি .... যদি ...। অথচ সুস্থ-স্বাভাবিকও তো হতে পারত। যা অভিশপ্ত ভাগ্য। জীবনে কোনোদিন কোথায়ও বেড়াতে গেলাম না। বাবা অতবড় উকীল; ছুটি বলতে কিছু নেই; কোনোদিন নিয়েও গেল না, বিয়ের পরও হল না; ও ছুটি পেল না; পরের বছর ছেলে হল; আর তারপর তো আস্তে আস্তে সব আশা আকাঙ্খাই শেষ। ভাইদের, ভাশুরদের ছেলেমেয়েদের বিয়ে হয়, আমি গেলেও ক ঘন্টার মধ্যেই ফেরৎ আসি। সকলের আহা-উহুই বা কত ভাললাগে! ছোটবেলায় কবিতা পড়তে ভালবাসতাম; গান গাইতাম; বাবাই তো আমার থেকেই পেয়েছে অমন গানের গলা, কমলদের বাড়ীতে গানের কোন চর্চাই নেই। অথচ সেদিনে সব কবিতার বইগুলো বার করে দেখি ..... কেমন পোকা ধরে ধরে কেটে গেছে বইগুলো, দিয়ে দিলাম ।দিদিরা ফোন করলেই কেবল নিজের ছেলেমেয়েদের কথা সাতকাহন করে বলবে। একবার ভাবে না আমার কেমন লাগে। বলতে গেলে বলবে হিঁসকুটি, অথচ আজ তো বাবাইয়েরও চাকরী করে, বিয়ে টিয়ে করে, এখন আমার নাতিনাতনী নিয়ে ঘর করার কথা। আজ বাবাই মুক্তি পেলে, আমি নিজের মত করে কটাদিন বাঁচতাম। বুকুর মামাশ্বশুরের দুই ছেলেই এরকম মেন্টালী রিটার্ডেড ছিল। একজন ১৬ বছরে, একজন ১৯ বছরে মারা গেছে। বাবাইয়ের ডাক্তারও বলেছিল এরকম বাচ্চাদের নাকি অনেকসময়ই একটা একটা করে ইন্দ্রিয়ের কাজ বন্ধ হয়ে যায় .... আর তারপর মারা যায়। কিজানি ডাক্তারী কথাবার্তা তো বুঝিনা, কি যে বলেন, আমাদের প্রস্তুত হতেই বলেছিলেন; কি ভয় পেয়েছিলাম, বাবাইকে ছাড়া যে আমার আর কিচ্ছু নেই ; অথচ কই ও দিব্বি এতগুলো বছর তো রইল .... একইভাবে বেঁচে। কাউকে বলতে পারি না ....... বলবে মা না রাক্ষুসী! নিজেরও নিজেকে রাক্ষুসীই মনে হয় ,..... কিন্তু ইচ্ছেও যে করে এদিক ওদিক একটু যেতে ............ ইচ্ছে করে কোন কোনদিন সারাদিন শুয়ে বই পড়তে ; অথচ আমায় তো উঠতেই হবে। বাবাইয়ের যে যন্ত্রের মত সবকিছু করা চাই। ওকে যদি অন্য ওষুধগুলো আর না দিই, কি হয় তাহলে, আর যে ওষুধটায় ঝিমিয়ে থাকে, সেটা যদি পুরো পাতাটা খাইয়ে দিই ....... খুব পাপ হবে? সামনের জন্মেও কি আবার এরম হবে? পুলিশ ধরতে পারে ........... কি হবে? জেলে নিয়ে যাবে? সেখানেও তো অনেক লোক আছে , একটা অন্যরকম জীবন ......... কি করব ....... যদি ......... যদি ..........