আপনার মতামত         


যে শিল্পের ভাষা নেই
বৈজয়ন্ত চক্রবর্ত্তী

অজ্ঞানতিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জনশলাকয়া।
চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নম:।।

গুরু কয়েছেন স্যাভেজের মধ্যে যেমন সেজ, ঠিক তেমনি জানার মধ্যে জান লুকিয়ে আছে। এই যে গুরুর কাছে সমাদ্দারস্যার আসেন, ওনার কাছ থেকেই না জানলাম কিভাবে তিরুপতির থেকে কাটাচুল এনে উনি "বালকুন্তল" ব্র্যান্ড উইগ বানিয়ে বাজারে ছাড়েন। স্পেশাল মাল ওনলি ফর টেকো বাচ্চাস। এই সমাদ্দার স্যারের থেকে কম জেনেছি! মধ্যমগ্রামে ফ্ল্যাটের পার স্কোয়ার ফিট হাজার হয়ে গেছে, অশোকনগর হরিদাস নিম্ন বুনিয়াদী বিদ্যালয়ের হেডমাস্টারের গরুভাড়া দেওয়ার সাইড বিজনেস আছে, চাম্পাহাটি স্টেশনের এক মাসির কাছে বেস্ট সবরিকলা পাওয়া যায়, মায় "যাহাদের লিঙ্গে তিল থাকে তাহাদের কামভাব প্রবল হয়" এত অব্দি। কিন্তু জানতে গেলে যে সময় খর্চা করতে হয় তার রিটার্ন দেবে কে? গুরু আমার এই ব্যাপারে বড়ো সাবধানী। গুরুর থেকে জ্ঞান বের করা ইজিকল্টু পিঁপড়ের পোঁদ টিপে চিনি বের করা। গুরু বলে যখন নিবি তখন দুহাত ভরে নিবি, আর ছাড়বি যখন তখন নিক্তি মেপে ছাড়বি। তুই তো আর সাংবাদিক নস যে সক্কাল সক্কাল তিনটাকা দিলেই শায়া তুলে দিবি। গুরুর জ্ঞান দেবার কেৎই আলাদা। সকালে নিয়ম করে খবরের কাগজ হাতে পেট খোলসা করতে যাবার মতো মেপে গুছিয়ে দিনে একবার। সেখানে আমার কুত্তার ধাত, ল্যাম্পোস্ট পেলেই হল। নইলে কি করে ভুলে যাই লোকটা "এম এল এ ফাটাকেষ্ট" দেখতে গিয়ে থাইতে হাত বুলিয়ে কতবার বলেছিল-

“একটু চেপে থাকবে ভাই। দুনিয়ায় কাঠি করার লোকের তো আর অভাব নেই। এই যে বিজনেস করছি, বুড়ো বাপ মার চিকিৎসার খর্চা দিচ্ছি, বৌকে একটা বিউটি পার্লার খুলে দিয়েছি, ছেলেটা হোলি জিসাস ইস্কুলে যাচ্ছে- এতেও তো লোকের চোখ টাটায়! মছলন্দপুরে গরীব চাষার ছেলের এতো ইমপ্রুভমেন্ট তো কেউ দেখবে না, সবাই খালি দেখবে কোন ফুটো দিয়ে কখন হুড়কো দেওয়া যায়। তার উপর শালার গর্মেন্ট তো আছেই। মাল দেবার নাম নেই, কিল মারার গোঁসাই। যদি জানে আমার বিজিনেসের ট্যাক্সের হিসেব নেই, অমনি শালাদের জিভ দিয়ে লাল পড়তে লাগবে। কিন্তু আমি সরকারের খাই না পরি, যে সরকারকে ট্যাক্স দেবো? শালা বাঙালী জাতটাই এইরম দুনম্বরী। বুঝলে ভাই সবই কপাল! আমার এক্সপোর্টের এত বড়ো বিজনেস, বিলেতে মাল পাঠাচ্ছি, অথচ নিজে একদিনও ফরেন যেতে পারলাম না। নইলে কোন শুওরের বাচ্চা এই দেশে থাকে? তার উপরে আমাদের বর্ডার সাইডে যা লোক বাড়ছে, কারও সন্দেহ হলেই হয়েছে। ওপারের লোক জানই তো কিরকম বেইমান। হয় তো পয়সাও খেল এদিকে পুলিশে গিয়ে একটু কাঠি করে এল। তোমার গুরুদেবকে রেসপেক্ট করি বলে তোমাকে বলছি ব্রাদার। তোমার দিক থেকে তুমিও কিন্তু একটু সামলে থেকো। নইলে কেস বহুত বিলা হয়ে যাবে।”

ল্যাম্পোস্ট যখন পেয়েছি তখন মাঝপথে তো আর থামা যাবে না। কিন্তু মাই গড প্রমিস করেছি। কাজেই সব কিছু ডিটেল দেওয়া যাবে না। তাই বলছি না এই লোকটার বিজনেসটা একজ্যাক্ট কোথায় আছে। তবে সেই গলিটা ইলেকট্রিক তারের মত সরু আর সেইরকম ব্যাঁকাত্যাড়া! গলিটার ভিতরে একটাও দোকানফোকান নেই। সকালে গেলে গলির গন্ধটা পচা মাছভাজা, চম্পাকলি ব্র্যান্ডের ধূপ আর লাইফবয় সাবান। গলিটায় বেশির ভাগ ব্যাটাছেলের দাঁত হলুদ আর বেশির ভাগ মেয়েছেলের মুখে মেচেতার দাগ। বাচাকাচ্চার কান্না শোনা যায় কিন্তু গলিতে একটাও বাচ্চা দেখা যায় না। রাত হলে দশ বিশটা বিহারী রিক্‌শাওয়ালা চুল্লু খেয়ে পোঁদ উলটে পড়ে থাকে। একটা ভাঙা টিউকল আছে যেটা দিয়ে জল পড়ে না। রাস্তাটায় পুরো থান ইঁট পাতা কি রকম খড়খড়ে ভাব। একটাও ল্যাম্পোস্ট নেই, একটাও কুকুর নেই তবে গুচ্ছ ঘেয়ো বেড়ালকে দেখা যায় বাড়ির কার্নিশে কার্নিশে ওঁত পেতে বসে আছে। এই গলিটা একুশ নম্বর বাঁকের পর যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে একফালি ধুলোট জমি যাতে একটা ঘাসও নেই। জমিটার একপাশে সবসময় জংধরা লোহালক্কড় পড়ে থাকে। শালা এমন বাঁজা জমি যে বর্ষাকালেও এই লোহালক্কড়ের গায়ে একটুকরো শ্যাওলা জন্মায় না। অন্যদিকে পাঁচ হাত উঁচু একটা এবড়োখেবড়ো পাঁচিল। লোকটা এমনি হাঁটে ল্যাটর প্যাটর কিন্তু পাঁচিলের ফাঁক দিয়ে ঢুকল পুরো জ্যাকি চ্যান। পাঁচিলের অন্যপারে একটা কেলেকুষ্টি লজ্ঝড়মার্কা গুদামঘর।

“অভ্যেস না থাকলে প্রথম প্রথম একটু অসুবিধে হবে ভাই। কিছু লেবার তো প্রথমদিকে অজ্ঞান হয়ে গিয়ে, এক যাচ্ছেতাই অবস্থা! তবে এ হল আমার মা লক্ষ্মীর বাসা। গলিটা দেখেছো তো কেমন শুনশান। খাস কলকাতায় এইরকম গলি পাওয়া যায় বিজনেস শুরু করার আগে আমিই কি শালা জানতাম। কেউ কারো সাতেপাঁচে নেই। দু পা গেলেই কিন্তু মা গঙ্গা। কিন্তু এইখেনে মা গঙ্গার ছিঁটেফোঁটা হাওয়াও পাবে না। আর হাওয়া বইলে তো আমার এমনিতেই সাড়ে সব্বোনাশ! বিজনেসের খবর হাওয়ায় হাওয়ায় ছড়িয়ে গেলে বহুৎ কিচাইন। রাত্তিরের দিকে যে একটু গা ছম ছম করে না তা বলব না। তবে সে সব কাজেই কিছু না কিছু আপদ বিপদ তো আছেই। তাই পাড়ায় প্রতিমাসে একটা শনিঠাকুরের পুজো দিই। পুরো ডোনেশন আমার। এবার আমার কি করবি কর শালা! তুমি আবার এইরকম ছমছমে গলি দেখে ভয় পেয়ো না ভাইটি। একদম সেফ এন্ড সাউন্ড লোকেশন। কাকের ডাকও শুনতে পাবে না। আর এটা জানো তো? আমার মেশিনে কোনো আওয়াজ নেই?”

বলে লোকটা গা খলবলিয়ে হিস্‌হিসিয়ে কি হাসি! গুদামের আবার রিসেপশন ঘর! দুটো ছেঁড়া বেতের চেয়ার, দেওয়ালে লটকে আছে সাদা বরফপাহাড়ের একটা প্রিন্ট, পাহাড়ের নীচে সবুজ ঘাস, নীল নদী আর লাল ফুল, কাউন্টারে রাখা একটা ছাইরঙা প্লাস্টিকের জগ, উপরে ঘিট্‌ঘিটিয়ে ঘুরছে ঊষা কোম্পানীর ঝুলকালিমাখা একটা পাখা। দিনের বেলাতেও একটা মনমরা টিউবলাইট জ্বালিয়ে রাখতে হয়েছে। ঐ বরফপাহাড়ের পাশের ছোটো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে যাবার আগে লোকটা বলল রুমাল দিয়ে মুখ-নাক-মাথা আচ্ছাসে জাপটেজুপ্টে জড়িয়ে নিতে। বাইরে থেকে ভেতরটা ঘুট্‌ঘুট্টি অন্ধকার। ঢুকতেই ও মা গো:! জম্মের পচা মাংসের গন্ধ ধাক্‌ করে হিট করল। পুরো বডিটা টাল্লি খাচ্ছে। শরীরে আর রক্ত চলছে না। একটু সইয়ে নিলে বুঝলাম অন্ধকার ঘরটায় তিন চারটে চল্লিশ পাওয়ারের ডুম জ্বলছে। মেঝেটা লালচে কালো থক্‌থকে কাদা কাদা। চারটে লোক ভীষণ মন দিয়ে দুটো মড়ার গায়ের পচা মাংস ছাড়াচ্ছে যেমন লক্ষ্মীপুজোর আগে নারকেলকুড়ুনিতে নারকেল কোরা হয়। আর এ কোন মড়া রে বাপ্পো! মানুষকে মানুষ বলে চেনা যাচ্ছে না! হাত পাগুলো বাজপাখির নখের মতো বেঁকে এবড়োখেবড়ো হয়ে গেছে। চোখের জায়গায় শুধু কালো হাঁ, আর মুখটা একটা দশ নম্বরী ফুটবলের মত বড়ো মাংসের দলা। সারা গায়ের মাংস কালো কালো, এখানে ওখানে বেখাপ্পা ফুলে রয়েছে, কোথাও গোলাপী রস গড়াচ্ছে আবার কোথাও মাংসের মধ্যে দিয়ে হাড় দেখা যায়। বেটাছেলে না মেয়েছেলের মড়া বলবে কোন শালা!

“এই দেশে দুটো জিনিষের সাপ্লাইতে কোনো প্রবলেম নেই ভাই- জ্যান্ত মানুষ আর মরা মানুষ। লো কস্টে র মেটিরিয়ালের কোনো অভাব নেই। শুধু কোয়ালিটি নিয়ে যত প্রবলেম! ডোমগুলো এমন গান্ডু যে লাশগুলো ঠিকঠাকভাবে রাখতে পারে না। শকুনের জাত তো শালা! পয়সা নেওয়ার সময় রক্ত চুষে নেবে, এদিকে মাল সাপ্লাই করার সময় যত পচাধচা মাল। ইনপুটের কোয়ালিটি কিন্তু আমাদের বিজনেসে হেবি ইমপর্টেন্ট। হাড়গুলো মামা পারফেক্ট হওয়া চাই। জোয়ান বডিগুলোর ম্যাক্সিমাম অ্যাক্সিডেন্ট কেস। জোয়ান হাড় হলে হবে কি, পুরো ছেতরেমেতরে গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে গেছে। আবার বুড়োবুড়ি হলে হয় ফোকলা, নয়তো দাঁতগুলো ক্ষয়ে ক্ষয়ে বারোটা বেজে গেছে। তুমিই বলো ভাই কোন ডাক্তার ফোকলা কঙ্কাল সাজিয়ে রাখবে? বেস্ট হল জোয়ান ব্যাটাছেলে কি মেয়েছেলে অথচ মরেছে কোনো অসুখে। এই ধর রক্তের ক্যান্সার কি হার্ট অ্যাটাক। কিন্তু যে কোনো অসুখ হলে আবার চলবে না। পোলিও কি গোদ হওয়া মানুষের লাশ পেলে পুরো পয়সাটাই গচ্চা! সবথেকে হারামী হল বাঁড়া সিফিলিস। হাড়গুলো গুঁড়ো করে রেখে দেয়। ঐ বুলাদি ঠিকঠাক কাজ করলে আর কারো হোক না হোক, আমাদের কিন্তু বহুত উপকার। সুস্থ দেহ, সতেজ কঙ্কাল- ঠিক কিনা?”

এবার লোকটা আরও জোরে জোরে খ্যালখেলিয়ে হাসে। ঐ চারটে লোক যারা মড়ার গা থেকে শাঁস ছাড়াচ্ছিল তারা ফিরেও তাকাল না। এই লোকগুলোর মুখে কোনো রুমাল বাঁধা নেই। এত মনোযোগ যেন মা দুগ্গার চক্ষুদান করছে। প্যান্টের তলায় কাদা কাদা চর্বিমাংস না কাদা কি লেগেছে কে জানে? পুরো প্যান্টটা ফেলে দিতে হবে। পরের ঘরটাতেও কোনো জানলা নেই। সার সার বিরাট লোহার গামলা রাখা আছে। ছাল ছাড়িয়ে শাঁস ছাড়িয়ে কঙ্কালগুলো এই গামলাভরা অ্যাসিডে ভেজানো হয়। লোকটা এখন কিরকম ছটফট করছে নিজের বিজনেস দেখানোর জন্য। কুতকুতে ছটফটে চোখগুলো আর নড়ছে না। ঐ থ্যাবলা বডি নিয়ে ঘরের এপাশ ওপাশ লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। যেন এই ঘর ওর নিজের হাতে গড়ে তোলা মহল্লা, ওর মেহনতে তৈরি করা কঙ্কালের সংসার। ঠিক যেমন লোকে কারখানা ঘুরিয়ে দেখায় এক টুকরো লোহা থেকে তৈরি হল একটা কাস্তে আর একটা হাতুড়ি, ঠিক তেমন লোকটা দেখাচ্ছে একটা বদবুওয়ালা পচা মড়ার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে এক একটা ধব্‌ধবে সাদা কঙ্কাল।

“আর্টিস্ট ভাই, আর্টিস্ট! ওদের ভাই পাতি লেবার বলে হেলাফেলা কোরো না(১)। দেখলে তো কি মনোযোগ। আসলে বুঝলে কিনা ছেলেগুলো নিজের কাজটাকে ভালোবাসে। তাই মায়ের দিব্যি, একদিনের জন্যও লেবার ট্রাবল হয় নি। এই যে অ্যাসিডের গামলায় ফেলা হল, এটা সব থেকে কঠিন স্টেপ। এক মিনিট বেশি ফেলে রাখলেই অ্যাসিড হাড় খেয়ে নেবে। এর জন্য বহুত স্কিল লাগে রে ভাই। কিন্তু সেই স্কিলের কি কোনো দাম দেয় হারামির বাচ্চারা? এক সময় জানো দুনিয়ার এইট্টি পার্সেন্ট কঙ্কাল এই ইন্ডিয়া থেকে এক্সপোর্ট হত? প্রথমে ইন্দিরা গান্ধী আর পরে রাজীব গান্ধী। মায়ে পোয়ে বিজনেসের বারোটা বাজিয়ে দিল। হাতে যখন পাওয়ার যা খুশি ব্যান করে দিলেই হল! এবার বাঁড়া তুমি নিজেই নিজের হ্যাপা সামলাও। নইলে আমাদেরও ভাই এক্সপোর্ট বিজনেস, আর আমরাও কিন্তু সরকারকে ফরেন এক্সচেঞ্জ এনে দিই। মোষের চামড়ার জুতো পাঠালে সে হল গে এক্সপোর্ট আর মানুষের হাড়ের কঙ্কাল পাঠালে সে হল গে বেআইনী! ওদের লেবার পেল রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার আর আমার আর্টিস্ট ধরা পড়লে তার রোজগার বন্ধ! এ কি কোনো ন্যায্য যুক্তি হল, তুমিই বলো ভাই। এই ইন্ডিয়াতে সব কিছুতে শালা গরমেন্টের পোঁদ চুলকোয়। মার্কেটে ডিম্যান্ড আছে বলেই না আমরা সাপ্লাই করছি। আর যাই হোক কোক পেপসি তো বিক্রি করছি না।”

লোকটা অতো ভ্যান ভ্যান করছে কেন? পচা মাংসের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে হাই হয়ে গেল নাকি? ওর মাথার শিরাগুলো কেমন দপ্‌দপ্‌ করছে। এর পরের ঘরটায় গন্ধটা একটু ফিকে হয়ে এসেছে। কিন্তু খালি মনে হচ্ছে এ গন্ধ আমায় ছাড়বে না! অ্যাসিডে প্রথমবার মাংসচর্বি মোটামুটি খসে গেলে এখানে আবার অ্যাসিডের চৌবাচ্চায় কঙ্কালগুলো ডুবোনো হচ্ছে। এরপরে ব্লীচ দিয়ে মালগুলো সাদা ফক্‌ফকে করে তুলতে হবে। ঘরের কোণে শার্ট প্যান্ট পরা একটা বেচারা লোক খুব মন দিয়ে একটা খুলির মধ্যিখান থেকে লেগে থাকা টুকরোটাকরা পরিষ্কার করছে। এ নিশ্চয় আরও বড়ো আর্টিস্ট! এর হাতে আর গোদা খুরপি নেই। কি সব সরু সরু ছুরিকাঁচি দিয়ে কংকাল চেঁছে যাচ্ছে। শালা কে জানত আমাদের মাংস খুবলে একটা ডিসেন্ট হ্যান্ডসাম কঙ্কাল বের করতে এত খাটনি! পচা মাংসের গুদাম থেকে বেরিয়ে আসায় লোকটাও মনে হয় একটু ধাতস্থ হয়েছে। মুখে আবার সোয়াস্তিতে ধান্দা করতে পারার হাসি। এ হাসি আমি ঢের চিনি।

“তোমার মুখটা এমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল কেন গো? গন্ধে? তাইলে একবার ভেবে দেখো। এই সব পচা লাশ এখানে সেখানে পড়ে থাকলে ডিজিজি ছড়াতো, ঠিক কিনা? আমরা এই যে পরিবেশদূষণ বন্ধ করছি এই ব্যাপারটা ভেবে দেখেছ? সব পচাধচা মাল রিসাইকেল করে বাজারে ছাড়ছি একদম পিওর মাল। একেই তোমাদের এনভায়রন ফ্রেন্ডলি না কি যেন বলে না? তবে এ সব শিক্ষা কিন্তু আমাদের দেশেই ছিল। তান্ত্রিকেদের ডিনার কি ছিল জানো তো?(২) চিতার আগুনে এক কলাপাতা ভাত ফুটিয়ে তারপর মড়ার খুলি ফাটিয়ে একবাটি গরম গরম ঘিলু তাতে ঢেলে একেবারে সাবড়ে সুবড়ে। খাবারের জন্য মড়া মানুষ ছাড়া কাউকে কোনো বিরক্ত করা নেই। আমি শুনেছি মানুষের পোড়া লিভার খেলে নাকি হেব্বি নেশা হয়? শুনেছ কখনও? এইবার এদিকে এসো। এবারের কাজ হল সব থেকে সায়েন্টিফিক। মেন জিনিষ হল খুলি আর দাঁত। ঐ দুটো জিনিষে গড়বড় হয়েছে কি তোমার মাল কেউ কিনবে না। কোয়ালিটি ক®¾ট্রাল চাই ভাই, কোয়ালিটি ক®¾ট্রাল চাই।”

এইবার মনে হচ্ছে আমি লাট খেয়ে পড়ে যাব। হাত পাগুলোতে আর একফোঁটা জোর নেই। বুকের ভেতরটা কেমন ঠান্ডা মেরে গেছে। লোকটা শালা রেহাই দিচ্ছে না। এইবার শেষ খুপরি। এই খুপরিটায় একটুকরো আলো আসছে উপরের ঘুলঘুলি দিয়ে। এই খুপরিটাই একদম ফ্রেশ চুনকাম করা। এখানে লাশগুলোর হাড় ড্রিল করে পিন আটকে একদম কঙ্কালের মত সেট করা হয়। তারপর শিরদাঁড়ায় আর হাত পায়ের জয়েন্টগুলোতে নকল কার্টিলেজ লাগালেই মাল তৈরি। এই ঘরে এখন কোনো লোক নেই। শুধু দু চারটে ফিনিশড মাল ডালাখোলা বাক্সে কেলিয়ে পড়ে আছে। ওদের গায়ে হাত দিলে বোঝা যায় কি শক্ত, পিছল আর ঠান্ডা হয় কঙ্কাল! ঐ দুটো মাল দেখে এতক্ষণে লোকটার হাঁড়িমুখ গর্বের হাসিতে ভরে উঠেছে। মনে হচ্ছে মানুষের ভেতরের এই সাদা রঙের সৌন্দর্য্য দেখে লোকটা আর চোখ ফেরাতে পারছে না। আমার কিন্তু কঙ্কাল দুটোকে দেখে আরও হাঁফ ধরে যাচ্ছে। গুদামের পেছনের দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যেই একঝলক আলো চোখে পড়েছে আমি পুরো লটকে গেলাম। এত তাজা হাওয়ায় ফুসফুসে চাপ ধরছে। উবু হয়ে বসে পড়েছি। চোখের সামনে দেখছি জংলা গাছের পাতা, ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের ব্যাগ, টুথপেস্টের খালি খাপ, রক্তমাখা তুলো, আমার মুখের লালাতে ভিজে যাওয়া কালো মাটি।

তারপর থেকেই পুরো জন্ডিস। ঘুমোতে গেলে মনে হয় গোলাপী রস গড়ানো ফুলো ফুলো কালো মাংস চোখনাকমুখ পিষে দিচ্ছে। মাল খেতে গেলে পচা মড়ার গন্ধ পাই। গুরুর ঝক্‌ঝকে মোজেইক মেঝেতে মনে হয় প্যান্টে পচা চর্বির কাদা লেগে গেল। পুরো বিচি কেস! জিন্দেগীতে এই সিচুয়েশন ফেস করি নি। এই সব কেলো শুনে গুরু কইল বাপি বাড়ি যা। এইসব মালফাল পেঁদিয়ো না, আর মাংসটাংস খাওয়া ছাড়। সকালে ক্র্যাকার আর সুগারলেস চা, দুপুরে ভাত রুটি ডাল সব্জি, বিকেলে ফল আর রাত্তিরে খৈ দুধ চিনিছাড়া। প্রতিদিন সকালে রেগুলার ব্যায়াম আর ধ্যান। মাঝে মাঝে মন্দির টন্দিরে পেন্নাম ঠুকে এসো। আর এই বইটা পড়ো- শ্রী গুরুপদ দত্তের “আত্মা সজীব রাখার সাতটি উপায়”, প্রকাশক বি সি লাইব্রেরি, এলাহাবাদ। এতে মাইরি কেসটা আরও লেবড়ে গেল। এখন শালা দিনদুপুরে ড্যাব্‌ডেবিয়ে খুলে রাখা চোখের সামনেও দেখি দশ নম্বরি ফুটবল মাথার এপাশ ওপাশ লাল স্পঞ্জের মত ফুলে গেছে। রোগা ছেলেমেয়ে দেখলে ভাবি অ্যাসিডে ধোয়া হয়েছে কি হয় নি? যেদিন গুরুর কথামত পাড়ার শিবমন্দিরে ফুল চড়াতে গেলাম সেদিন তো কেলোর কীর্তি! মন্দিরে ঢুকতেই ঐ ধূপ, ফুলপাতা আর বাসি প্রসাদের গন্ধে মনে হল গর্ভগৃহে কেউ পচা মাংসের আড়ত বানিয়েছে। বেরিয়ে রাস্তার উপরেই হড়হড়িয়ে বমি। তারপর আর দুপায়ে উঠে দাঁড়াবার শক্তিটাও পাই না।

বুঝলাম নিজের টোটকা নিজেকেই চালাতে হবে। আফটার অল জেনারেশন গ্যাপের ব্যাপারটাও তো আছে! একই ওষুধ কি আর সবাইকে কাজ দেয়! তাই একদিন সন্ধেবেলা জয় মা বলে আড়াইশো মিলি নীট ডিরেক্টর স্পেশাল, দু বোতল গুরু বীয়ার, এক প্লেট ঝাল মেটেচচ্চড়ি আর হাফ তন্দুরি চিকেন। শরীর থেকে মনে হল সব ভার নেমে গেল। আবার ফুল মস্তি, কলকাত্তা মেরি জান। ঐ লোকটার কথা ভুলে না গেলে আর কয়দিন পরে হয়তো মালটার ফ্যাকট্রিতে আমারই শাঁস ছাড়ানো হত। কিন্তু ঐ যে, জিন্দেগী কা সফর হ্যায় সুহানা, ভুলতে ভুলতেও ভুলতে পারি না। কাগজের সামনের পাতায় দেখি লোকটা থ্যাবলা বডির উপর হাঁড়িমুখ আরও হাঁড়ি করে, উস্কোখুস্কো চুলে লকাপের ভেতর। খবরের কাগজে রোমাঞ্চকর কঙ্কালরহস্য নিয়ে জম্পেশ কেচ্ছা লিখেছে। সব পড়েটড়ে মোদ্দা কথা যা বোঝা গেল তা হল দুই পার্টি উদ্দাম ক্যালাকেলি করায় দুপক্ষেরই বেশ কিছু লাশ পড়েছিল। সেখানে এতই গন্ডগোল ছিল যে কোনো পার্টিই নিজেদের লাশগুলো বের করে আনতে পারে নি। গোলমাল থামার পরে দেখে লাশগুলো জাস্ট গুপি হয়ে গেছে। তাই নিয়ে দুই পার্টি একই দিনে সকাল বিকেল থানা ঘেরাও করেছিল। পুলিশ প্রচুর চাপ খেয়ে তদন্ত শুরু করতে। তারপর এটার থেকে ওটা হতে হতে পুলিশের গাড়ি গিয়ে পৌঁছেছে লোকটার “সেফ অ্যান্ড সাউন্ড” গলির ভেতরে। লোকটা “দলমতজাতিধর্মবর্ণনির্বিশেষে” লাশের শাঁস ছাড়িয়েছে বলে পুরো গন কেস। সব পার্টিই বহুৎ খচে আছে। বুদ্ধিজীবীরা লোকটার ফাঁসি হওয়া উচিত কি উচিত না তাই নিয়ে কাগজে ব্যাপক তক্কো করছে। সবথেকে বড়ো কথা পাবলিক বহুত খার খেয়েছে। আমি কিন্তু জানি হারামিটা থানার সিড়িঙ্গে ও সিকে কি ঢপ দিচ্ছে।

“কি আর বলব স্যার! যখন সময় খারাপ যায়, পোঁদ মারলেও বাচ্চা হয়। নইলে কেউ ভেবে দেখল না যে আমি কি করছি। এই বিজনেস কি শুধু আমার বিজনেস স্যার? কতগুলো লোকের সংসার চলছে আমার টাকায় ভাবুন দেখি। টাটারা এত ইনভেস্ট করে কটা লোককে চাকরি দিচ্ছে স্যার? আর আমার দিকে দেখুন। সরকারের থেকে একপয়সাও নিই নি। শুধু নিজের বুদ্ধিতে আর পয়সায় এতগুলো লোককে চাকরি দিয়েছি। এইরকম শিল্পই কি ভালো নয় স্যার? প্রভিডেন্ট ফান্ড ছিল না, কিন্তু লেবারদের আমার ফ্যামিলির মত দেখতাম স্যার। কোনোদিন ডিপ্লোম্যাটের কম কিছু খাওয়াই নি। চাষাভুষোর এক ছটাক জমিও নিই নি স্যার। একটা লোককেও খুন করি নি স্যার। সবাই যা ফেলে দিয়েছে তা নিয়ে কারবার চালিয়েছি। লোকের ফেলে দেওয়া গোডাউন আর পচে যাওয়া বডি। একবার বলবেন স্যার এতে কি অপরাধ হয়েছে? ঐ লাশগুলো নিয়ে কার কি লাভ হত বলুন তো? এই পার্টি বলত আমার চারটে তো অন্য পার্টি বলত আমার চল্লিশটা। তারপর আবার এক রাউন্ড খুনোখুনি, আরও কয়েকটা লাশ পড়ত। ওদের বাড়ির লোক দেখতে পেলো না ঠিকই। কিন্তু ঐরকম থেঁতলে যাওয়া বডি দেখেই বা কি করত স্যার? যে লোকটার যাওয়ার সে তো কেটে পড়ল। এবার যাতে মরে যাওয়ার পরেও যেন সে দেশের কাজে লাগে সেইটাই দেখা উচিত নয় কি স্যার? পরিবেশ নোংরা করছি না, জমি নিচ্ছি না, লোক খুন করছি না, বরং লোককে কাজ দিচ্ছি আর সরকারকে ফরেন এক্সচেঞ্জ দিচ্ছি। এর পরেও সবাই আমাকে খিস্তিখাস্তা করছে। এইভাবে কি শিল্পায়ন হয় স্যার, আপনিই বলুন?”




১। যাদের সত্যি সত্যি মানুষের হাড়ের শিল্প নিয়ে আগ্রহ আছে, তাঁরা এই দুটো সাইট দেখতে পারেন- http://www.kostnice.cz/ এবং http://www.cappucciniviaveneto.it/cappuccini_ing.html

২। তান্ত্রিক ডায়েট নিয়ে কৌতূহল থাকলে অথেন্টিক সোর্স হল শ্রী প্রমোদকুমার চট্টোপাধ্যায়ের “তন্ত্রাভিলাষীর সাধুসঙ্গ”