ভোটের গরম


লিখছেন --- ইন্দ্রনীল ঘোষদস্তিদার


আপনার মতামত         



(মুখবন্ধ :
মানে নিন্দুকদের মুখ বন্ধ করা আর কী। যারা বলে অমুক লোকটা খালি ভাটের মজা মারে, গুরুর ক্ষীর-খাওয়া পাবলিক, কিন্তু কিচ্ছু কাজ করে না, তাদের মুখ সেলাই। অথচ আমি কোডও জানিনা,কম্পুটারে ছবি আঁকাও জানিনা। তাহলে সেলাইটা হবে কি দিয়ে?

ঈশেনমামু কপ করে ধরে বলল-লেখা দিয়ে। সে ছিল এক বুধবারের বারবেলা। সেদিনই ছানাবাঁদর-টাদরদের যার যার নিজের জায়গায় পাঠিয়ে দিয়ে শান্তি ও বির্‌হাতে (পরশুরাম দ্রষ্টব্য) ভোঁ হয়ে, বুঁদ হয়ে আছি। ঝোলমাখা গরমে রাত্তিরে বাড়ি ফিরে নেট খুলতেই ঈশেন। মেছোপেত্নীর মত হাতছানি দিয়ে বলে-লেঁখা দেঁ না, লেঁখা দেঁ ! নাকি! এই কাঁঠালপাকানো গরমের মধ্যে ভোট নিয়ে লিখতে বসতে হবে? ইনিয়েবিনিয়ে কত করে গরম ও বৌ-বিহীনতার বেদনার কথা বললাম। তা, সে কিছুতেই শুনতে চায় না। বলে বৌ-বৌ করেই মোলো। নিশিডাকের মতন করে ডাকছে, তাই। রাজিই হয়ে গেলাম।

পরে ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখেছি, এসবই ঈশেনের ষড়যন্ত্র। গুরুর টি আর পি বাড়ানো না ছাই! সেই যে ঈশেনের চন্ডালী কবিতার নিন্দে করেছি, তখন থেকেই তক্কে-তক্কে আছে। আমায় দিয়ে লেখাবে, লোকে তাই পড়ে খিল্লি করবে , তাতেই ওর শান্তি। কম চালু! স্পষ্ট দেখতে পেলাম, লীলা মজুমদারের মাদুলিওলা গুপে'র মত ঈশেনেরো চোখ ছোট হয়ে হয়ে আলপিনের ডগার মত হয়ে যাচ্ছে, ঢোঁক গিলে , গলা খাঁকড়ে -মাকড়ে আঙুল তুলে বলছে-তুই আজকে ক্লাশে দাঁড় খাবি।

বরাবরের হতচ্ছেদ্দা করে আমায় , ঈশেন। আজকের কথা না। সেই আমাদের আইসাবেলা থেকে। ঈশেন শিবপুরে আইসা করতো, আমি এন আর এস-এ। পার্টি অফিসে ছাত্রদের মিটিং হচ্ছে, রাজ্য নেতা বসে আছেন, যে যার ইনস্টিটিউটের সমস্যা নিয়ে কথা বলছে-কী ভাবগম্ভীর পরিবেশ ! তারি মধ্যে আমাদের টার্ন এলে সবে বলেছি কী বলিনি- SFI আমাদের চরিত্রহননের চেষ্টা করছে ( চরিত্রহনন বলেছিলাম কী না, ঠিক মনে নেই; আমি-ই বলেছিলাম কী না, তা-ও মনে নেই, দীপাংশু বলে থাকতে পারে, ডাব্বুদা বলে থাকতে পারে। তবে সুমনদা বলেনি হলফ করে বলতে পারি, সে ছিল গ্যাঁড়া), অমনি ঈশেনের (কিম্বা ওর বন্ধুর, কিম্বা দুজনার-ই) কী খ্যাকখ্যাক করে হাসি ! বলে কিনা-আমাদের চরিত্র নিয়ে টানাটানি করলে আমরা ভোট বেশী পাই ! একে তো বাজে হ্যাটা করলো, তার উপর অমন পবিত্র অ্যাম্বিয়েন্সে হাসির হররা ছুটিয়ে আত্মবিশ্বাসেরও বারোটা বাজিয়ে ছেড়ে দিল। বাবা! যে ছেলে অমন জায়গায়-অজায়গায় অমন ছ্যারছ্যার করে হাসতে পারে, সে তো বড় হয়ে ভ্যাটিক্যানের গীর্জেঘরে ক্রিসমাস ক্যারলকালে পোপের সামনে নাদব্রহ্ম পর্দন করবে , লং-মার্চ থামিয়ে মাওয়ের টুপির তলা থেকে বের করে আনবে কাচ্চাবাচ্চা ও ডিমসমেত আস্ত উকুনের সংসার-কিন্তু মাওয়ের তো চুলই নেই, কী আনন্দ !

কিন্তু আসল কথাটা হল ভোট। ভোটই আমাদের সর্বভূতে বিরাজমান সর্বশক্তিমান শেষ ঈশ্বর। এবং হ্যাঁ, ভোট বিজ্ঞানও বটে। সায়েন্টিফিক ই ভি এম, সায়েন্টিফিক রিগিং ও সায়েন্টিফিক সেফোলজি। ঈশেনের গল্পও শেষ হল, লক্ষ করবেন, ভোট দিয়েই। ভোট দিই আর না দিই, তাকে এড়িয়ে যাবো, মরমানুষ, সে কি আমার সাধ্যি !

তবে ঈশেনকে ক্ষমা করবো না। নো পাসারন। ও ব্যাটা ক্যাটালিস্ট, এজেন্ট প্রোভোকেটর। হায় ঈশেন, তোমার দিল কী দয়া হয় না ! )


তোমার দিল কী দয়া হয় না
----------------------------

প্রথমে ভেবেছিলাম নাম দেবো Vote টি কাব্য; কিন্তু কাব্য? এই কাগদেশান্তরী গরমে কাব্য? অগত্যা ভোটের গরম-ই সাব্যস্ত হল। নাম বাবদ মডারেটরের কাছে কিছু কর্জ হল।

হ্যাঁ, কেউ যেন সিরিয়াস লেখার আশায় বসে না থাকে (অ্যাজ ইফ , কেউ বসে আছে)। এ ঘোর নিদাঘে আমি শুধু চাট্টি কুচ্ছো করবো, কিছু পি এন পি সি , কিঞ্চিৎ বিলাপ ও বাদবাকি প্রলাপ। হনুদা পড়ে রাগে-দু:খে মুখ ভেটকে উঠে যাবে, কেউ-কেউ পড়বেই না, কিন্তু তাতে আমার কচু। সরি, কচুপোড়া; ৪২ ডিগ্রির কথা মনেই ছিল না।

আগেকার দিনের গরম, সে ছিল এক অন্য জিনিষ। সারাদিন সারাগায়ে রসগোল্লার রস মেখে ঘুরে বেড়ানো (শরদিন্দুর টুকলি), ট্রেনে ও বাসে ঘাম বিনিময় করতে করতে যাওয়া (সুনীল গাঙ্গুলীর টুকলি), ভালো কথা শুনেও খেঁকি কুত্তার মত খিঁচিয়ে ওঠা। কিন্তু সেদিন গিয়াছে। বাঙ্গালী আজ সর্বভারতীয়, সকল বিষয়ে সে মেইনস্ট্রীম ভারতবর্ষের অনুসারী; খুশীতে সে বিন্দাস থাকে, দিল পে কিছুই নেয় না, "শিকর'-রঞ্জিত থুৎকার গায়ে পড়িলেও না; এবং বলিলে বিশ্বাস করিবেন না, সেই অস্থিচর্মসার চক্ষুকোটরাগত ছা-পালক করণিক বাঙালীও আর নাই, সে-ও আজিকাল খাতেপিতে ঘরকা। কতদিন সে সহযাত্রীকে শ্যালক সম্বোধনে ডাকে নাই।
তো, এই মূলস্রোতের "ভাই বাঙালীর" আর সে ঘামে ভ্যাপসানো,ভাপেসেদ্ধ গরম ভালো লাগবে কেন । তার এখন চাই রোদ ঝলসানো, কাবাবপোড়া গরম। তার চাই বিহারখন্ডী, ঝাড়খন্ডী লু। মানুষ যা চায় , তাই পায়; বাঙালী পাবে না? সে কি মানুষ নয়? হামারে পাস ভী কেয়া ""দাদা'' অওর ""দিদি'' নেহি হায়?

প্রাকৃতিক বিপর্যয় কি না জানিনা; উষ্ণায়নকালে ঋতুটিতুর ভোল বদলে ""একজাতি একপ্রাণ একতা'' শ্লোগান হয়ে গেল কিনা তা-ও জানিনা। শুধু এইটুকু জানা গেল গত চোদ্দবছরে কোলকাতায় এরম গরম পড়ে নি। এপ্রিলের শেষে আপেক্ষিক আর্দ্রতার এমন ঘাটতি জনগণ শেষ কবে দেখেছে কে জানে। প্রতিদিনই আবহাওয়ার পূর্বাভাষ কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছে। প্রতি আটচল্লিশ ঘন্টার পূর্বাভাষে ছিঁটেফোঁটা বৃষ্টির কোনও সম্ভাবনা নেই। সোনার বাংলায় ছ'জন এখন অবধি হিটস্ট্রোকে মারা গেছেন, তাঁদের একজন সোদপুরে। রাত্তিরে আলোর চারপাশে শ'য়ে শ'য়ে শ্যামাপোকা,এই অকালে, অনেকেই আবার উড়ে এসে কামড়ে দিচ্ছে, ভাবা যায় ! এদের নাম ব্রাউন হপার, জানা গেল। এরা পাতাখোর,গাছের পাতা খেয়ে বাঁচে; পাতাফাতা এবার সব শুকিয়ে যাওয়ায় ক্লোরোফিল না পেয়ে এদের সবুজ বন্ন শুকিয়ে খয়েরী হয়ে গেছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বুড়ীমা, মাথায় ডাব পড়ে তাঁর মাথা ফেটে গেছে। ভাবুন একবার ! পাকা তাল নয়, ঝুনো নারকেল নয়,একটি নধর নবশ্যাম নবোদ্ভিন্নযৌবন ডাব অকালে ঝরে পড়ে গেল। কী অপচয় !

বিজলীকে নিয়ে অনেক আশা ছিল। সে এলে সব দু:খদুর্দশা দূর হয়ে যাবে,নবজলধরপটলসংযোগে ঘোর ভেকরবে ধরণী রসসিক্ত হবে, কপিলা গাইয়ের দুধ হবে, গিন্নীর ফাঁদি নথ হবে, রাত্রিবেলা বহুদিনের মুলতুবী দাম্পত্যকলহের নিষ্পত্তি হবে। কিন্তু সকল আশার মুয়ে আগুন দিয়ে বাংলাদেশ তাকে পথের মাঝখানে ফুসলে নিয়ে চলে গেল। আর গেলো তো গেলো,আলমারী চেঁচেপুঁছে সাফ করে সব জলীয় বাষ্প নিয়ে চলে গেল, হারামজাদী। হায় ! বঁধুয়া আনবাড়ি গেল আমার আঙিনা দিয়া, শুধু তাই-ই নয়, আঁচলে বাঁধিয়া আমার পরাণ নিয়া। হে বিপত্তারণ হরি, হাতকাটা জগন্নাথ্‌অ, পারবে কি তুমি ফেরাতে আর, বিজলীকে? এদিকে কয়লা বাড়ন্ত, ওদিকে জলস্তর নামছে হু হু করে। বক্রেশ্বর ডুবুডুবু, সাঁওতালডি খাবি খায়।

বেলা বারোটার পর রাস্তায় কেবল গুটিকয়েক গাড়ি; পথচারী হাতে গোনা যায়। রোদপোড়া শৃণ্বন্তু বিশ্বে শুধু অমৃতের একজন পাগল পুত্র ছাতা মাথায় না দিয়ে দিব্য দাঁড়িয়ে আছে রথতলার মোড়ে। ট্রাফিক তাড়াচ্ছে না, রাজাকে ন্যাংটো বলছে না,কিচ্ছু না; সে শুধু মুচকি হাসছে। পাশেই সিপিএম-এর লাল ছাতা, সে তার তলাতেও যাচ্ছে না। যাক, একটা সান্তনা পাওয়া গেল। গরমে পাগল হওয়ার দশা যদিও, কিন্তু একবার পাগল হয়ে যেতে পারলে আর গরম লাগে না, পরিষ্কার দেখা গেল। এইখানে একটা সুযোগ ছিল। পাগলকে নিয়ে জটপড়া চুল, সাপ-লুডো ও সরকারে দরকার ইত্যাদি করে ভোটে ফিরে আসার। কিন্তু হায়, সে গানও নেই,সে চাটুজ্জেও নেই। আছেন কবীর, আছে যদুপুরপ্রাঙ্গণ। সুজনকুজনে বিজনে দুজনে দেখা। হঠাৎ রাস্তায়। এইট বি বাসস্ট্যান্ডের মোড়ে। এইখানে এসে ছন্দ ফেটে গেল। যাবেই। কেননা, আগেই বলেছি, এ কোনো পদ্য নয়। কাব্য নয়। নির্বাচন এক মহাসংগ্রাম। এক বাঁচার লড়াই। গরমের বিরুদ্ধে।

সত্যি বলছি, প্রার্থী আর যাবতীয় ক্যাডারকুলের প্রতি চাহিয়া আমার বিস্ময়ের সীমা নাই। ঠাঠাপোড়া রোদ্দুরে গরমবিরোধী এই যে তাঁদের লং-মার্চ, লাল-নীল-সবুজ-গেরুয়া নির্বিশেষে-এ এক ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকপ্রতিম রিভিলেশন। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের কঠোরতম ঋতুতে dance of democracy । লাইট অ্যান্ড সাউন্ড দেখতে চান? এই ধরে নিন কালাহান্ডি, বোলাঙ্গির, পুরুলিয়া কি বুন্দেলখন্ডের কোনো খাঁ খাঁ প্রান্তর। গরমে ফুটিফাটা। এবার তাতে জুড়ে দিন বয়লারের ধোঁয়ার মত হু হু গরম হাওয়া। আঁকুন মাটির খোঁদল থেকে উঠে আসা পাতালের সাপের নি:শ্বাসের মত বিষবাষ্প। দৃশ্যপট সম্পূর্ণ,এখন স্টেজের ওপর দিয়ে ছুটিয়ে দিন হুডখোলা জিপ, তাতে শোভা পাচ্ছেন পাজামা-পাঞ্জাবি শোভিত যুক্তকর টাকলা প্রৌঢ়, মোমমাখানো মুচ, ঠোঁটের কোণে দ্বিতীয়ার চাঁদের মত মুচকি হাসি, গলায় গাঁদাফুলের মোটকা মালা। উনি প্রার্থী। সূজ্জিমামা স্ট্র দিয়ে সরসরিয়ে টেনে নিচ্ছেন ওঁয়ার সব মাসমজ্জা । আশে পাশে হল্লা করছে যতসব ক্যাডারকূল, তাদেরো রেহাই নেই। এখন, এই ছবিতে কী রঙের পতাকা গুঁজে দেবেন, সে আপনার ব্যক্তিগত রুচির ব্যাপার, নিজস্ব প্রতিবেদকের তাতে কিছু বলবার নেই।

বলবার শুধু এই যে, হা ভোটার, এতেও কী তোমার মন গলল না ! তোমার দিল কী দয়া হয় না ! বলছো- বছরভর , জীবনভর এই রৌদ্রাতপ তুমি সহ্য করে আসছো, ওঁয়াদের তো পাঁচ বছরে একবার? কিন্তু বাছা, গরীব তৃণ, তুমি কী কবির কথা কখনোই শোনো নাই? জানো নাই, কবি বলিয়াছেন -"" হে অদৃষ্ট, তুমি যে তৃণকে তৃণ করিয়া গড়িয়াছ, ইহাতে তোমার নিষ্ঠুরতা প্রকাশ পায় না, কিন্তু তুমি যে অশথ গাছকে অশথ গাছ করিয়া গড়িয়া অবশেষে ঝড়ের হাতে তাহাকে তৃণের সহিত সমতল করিয়া শোয়াও ইহাতেই আন্দাজ করিতেছি, তোমার মনটা পাথরে গড়া !'' না:, তুমি দেখিতেছি ইস্কুল-কালেজের পথ এক্কেবারে মাড়াও না। নির্বাচন কাটিয়া যাউক, তোমার মিড-ডে মিল বন্ধ, তোমার জওহর-রোজগার-যোজনা বন্ধ, তোমার ভিটা-মাটি-চাঁটি। তোমার হিসাব হইতেছে।

বাজে সেন্টু দেওয়ার চেষ্টা করে বিশেষ লাভ নেই, গুরুজন খাবে না । বরং আঁখো দেখি প্রতিবেদন দিয়ে যাই। আমরা রোড-শো আর পদযাত্রায় ফিরি। গরমে লাল-সবুজ নির্বিশেষে সবাই সাদা পাঞ্জাবী। সুজনবাবু অবশ্য জামা,কবীর সুমনও তাই। সুজন আবার পাতায় পাতায় চলেন, মাথার চুলও সব সাদা করে ফেলেছেন। কিন্তু আমার প্রাণটা ব্রতীনবাবুর জন্যে বড় কাঁদে গো ! ব্রতীন সেনগুপ্ত,একদা ডি ওয়াই এফ আইয়ের ডাকসাইটে নেতা, অধুনা বিজেপি প্রার্থী তাঁর গ্রুমিং কনসালটেন্সির নির্দেশমত সফেদশুভ্র ("সফেদ' অর্থে কাচার সাবান বোঝেন জনগণ) সামার স্যুট পরে নির্বাচনী কেন্দ্র চষে বেড়াচ্ছেন; এবং বলে বেড়াচ্ছেন, যতই উঠুক পারা, স্যুট হবে না ছাড়া। ওদিকে জনতার কথা ভেবে ভেবে আমাদের পুং প্রার্থীরা সকলেই প্রায় গাঞ্জে ফেরেশতে। অগত্যা রোদ্দুরে চাই টুপি ; ছত্রধর কী আর গন্ডায় গন্ডায় মেলে? গান্ধীটুপি তো আউট অফ ফ্যাশন, এই গরমে বারান্দাওলা সুভাষটুপির বরং বেশ চল হয়েছে। আর কেউ না পরুন, অমিতাভ নন্দী তো পোচ্চুর পরছেন :)। এতেও কী নবীর (পড়ুন বেলগাছিয়া পূর্বের মহাবিধায়ক) দিল কিছুমাত্র দয়া হয় না?

দাদাদের অ্যাটায়ার নিয়ে এত রাশি রাশি কথা হল, দিদিরা কী বানের জলে ভেসে এসেছেন গা? কিরণ উত্তম ঘোষ মহাশয়া, ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের দেবদূত, আনন্দবাজারে এ নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন, আমার মত ফুলমূর্খের তা নিয়ে কিছু বলা বিপজ্জনক। আমি শুধু ওঁর বক্তব্যের সামারি করে দিই, কেউ যদি মিস করে গিয়ে থাকেন ! দিদির সেরা দিদি হলেন কালীঘাটের মমদিদি; শ্রীমতী ঘোষ তাঁর সম্বন্ধে বলেছেন -ঠিকই আছে, তবে উনি কাঁথা স্টিচের দিকে কিছু নজর দিলে পারেন। আমাদের অবশ্য মনে আছে বাংলার এক বিখ্যাত ড্রেস ডিজাইনার শ্রীসুব্রত মুখোপাধ্যায় মহাশয় একদা দিদির ড্রেস সেন্সের বিলক্ষণ অভাবের কথা জানিয়ে বিস্ময়প্রকাশ করে বলেছিলেন-উনি নতুন শাড়ীগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে কেন যে পরেন ! বাদবাকী দিদিরা- জ্যোতির্ময়ী দিদি, কাকলিদিদি ইত্যাদি-ঘোষের মতে -একদম ঠিকঠাক। শুধু মৌসম নূর বোনটি যদি একটা লাগসই ল্যাপটপ ব্যাগ বইতেন -শ্রীমতী ঘোষের আক্ষেপ।

ঝিনচ্যাক সানগ্লাশ-টাশ পরে কেউ পথে বেরিয়েছেন, এরকম অবশ্য কোনো খবর নেই। তবে সব্বাই জল খাচ্ছেন প্রচুর। খনির জল, ডাবের জল, গ্লুকোজের জল। সাথে দেদার চলছে তরমুজ। ভালো কথা, তরমুজ সুব্রত এবার বেদের মেয়ে জোছ্‌নার ক্যাম্পে। দাঁড়িয়েছেন বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্রে। রাহুল সিনহা বলেছেন, হাইব্রিড তরমুজ। ওঁর মুখে ফুলচন্দন পড়ুক। হাইব্রিড না হলে পারা যেত? বাঁকুড়ায় ৪৪ ডিগ্রী। আর এক রাহুল এসেছিলেন সুব্রতর ক্যাম্পেনে। টিপিনে তরমুজ খেয়েছিলেন কিনা, তা নিয়ে নিজস্ব প্রতিবেদন নীরব। অবশ্য হাবেভাবে মনে হল খান নি। মেজাজ বেশ গরম। পুরুলিয়াকে কালাহান্ডির সঙ্গে তুলনা করে গেলেন। বুদ্ধবাবু শুনে বলেছেন, ওঁর পড়াশোনার দরকার আছে।

তবে লেখাপড়ার দরকার নিয়ে ভিন্ন মুনির ভিন্ন ভিন্ন রকম সব মত। শ্রীরামপুর কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী কল্যাণ ব্যানার্জী যেমন বুদ্ধবাবুর শিক্ষাদীক্ষার অভাবের কথা জানিয়েছেন .... বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মত একটা মিথ্যুক, নাটুকে একটা থার্ড ক্লাশ মুখ্যমন্ত্রী সারা ভারতবর্ষে কখনো আসে নি। .... .যখন ও ফিরে গিয়েছিল আলিমুদ্দিন স্ট্রীটে, ওর পার্টির লোকেরা ওকে ধরেছিল। বোধ হয় চড়-চাপাটি খেয়েছিল ..... ও শিল্প বোঝে না, শিক্ষা বোঝে না, ও কিচ্ছু বোঝে না।''

এই পর্যন্ত মনে হয় অনেকেই জানেন। কিন্তু এমন সব মণিকণা নিয়ে চব্বিশ ঘন্টা চ্যানেল সেরাত্তিরে যে অমূল্য জড়োয়ার সেটটি তৈরী করেছিল, তা বোধ হয় কেউ কেউ দেখেন নি। বাপ ! কী দাপট! এক ডাকে সন্তোষপুর টু লন্ডন নিদ্রিত বাঙালীবিবেকের নবজাগরণ ঘটে গেল। প্রতিবেদকগণ কেউ হাঁই লাপ দিয়ে শ্রীরামপুরের ভোটারকূলকে ধচ্ছেন তো পরক্ষণেই অন্যজন হুঁই লাপে পৌঁছে যাচ্ছেন যাদবপুরে। আর সকলে একবাক্যে ছি ছি করছেন । যে ভদ্রলোক ধরা গলায় বললেন: রামমোহন-বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্তের শিক্ষায় শিক্ষিত আমাদের মুখ্যমন্ত্রী .... তিনি খুব সম্ভবত: একজন পোড়-খাওয়া মাস্টারমশাই। এক প্রতিবেদক জানালেন-এই অশালীন মন্তব্য শুনে এই এলাকার জনগণ শুধুমাত্র বিস্মিতই নয়, অত্যন্ত অবাক হয়ে গেছেন। স্টুডিওতে বসে বসে আমাদের বুদ্ধিষ্ট ফেমিনিষ্ট কবি ফাঁকেফোঁকড়ে টিনটিন তেলে সুরভিত ফোড়ন দিয়ে রসের ভিয়েন আরো ঘন করলেন। যদিও তাঁর ছড়াকার স্বামীটিকে ধারেকাছে দেখতে পাওয়া গেল না । এমন কী পরদিন কাগজে বিবৃতি দিয়ে নিন্দাটুকু অবধি করলেন না, এতদূর অধ: পতন। তা হোক, মিসেস কিন্তু ওভারটাইম খেটে দিয়েছেন। পরে যখন সবকিছুর হিসেব হবে, আমি সাক্ষী দিতে রাজী আছি।

বেশী রাতে অন্য একটা বাংলা চ্যানেলে গেলাম। সেখানে রক্তলাল মঞ্চ আলো করে বসে আছেন বাছা বাছা সব সুশীলগণ। মহাশ্বেতা দেবী, সুজাত ভদ্র, শুভাপ্রসন্ন, সুনন্দ সান্যাল ও আরো কয়েকজন স্বল্পপরিচিত সুশীল। যদিও বুদ্ধবাবু সম্প্রতি দু:খ করে গান গেয়েছেন- ফিরাইয়া দে , দে, দে মোদের সুশীল বন্ধুরে-বলে, কোনো কোনো সুশীল যে সে গান শোনেন নি স্পষ্ট বোঝা গেল। যা বলছিলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম বিতর্কসভা বুঝি, মিনিটপাঁচেক বাদে ভুল ভাঙল। আসলে কবীর সুমনের নির্বাচনী প্রচার, সৌজন্যে কলকাতা টিভি। মহাশ্বেতা দেবী বললেন, ওঁর গণনাট্য সঙ্ঘের দিনগুলির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে; তাই উনি খুব ভালো আছেন। বাকিরাও সকলেই যে যাঁর সাধ্যমত কবীরসাহেবের স্তবস্তুতি করলেন, কিন্তু স্বর্গ হইতে কিচ্ছু তবু পুষ্পবৃষ্টি হইল না। প্রত্যুত্তরে বিনয়ী, নম্র, মৃদুভাষী সুমন গলায় মধু ঢেলে বললেন : আমি আসলে ঠিক রাজনীতির লোক নই তো ! মিথ্যে কথা বলতে পারিনা-হ্যাঁ, প্রেম করে মিথ্যে কথা অনেক বলেছি, সে তো আপনারা সকলেই বলেছেন-কিন্তু বড় বড় মিথ্যে বলা ঠিক আমার দ্বারা হয়ে ওঠে না ..। আরো বললেন -""... মমতাকে নিয়ে এত লোকে এত কথা বলে.... আমি একবার মমতাকে বলেছিলাম-মমতা, সি. পি. এম-এর তো এতগুলো চ্যানেল আছে, আমাকে একটা চ্যানেল দেবে, .. সেটা হবে অ্যান্টি সি. পি. এম , কিন্তু তাই বলে প্রো-মমতা নয়... তোমার পঞ্চায়েত নেতা যদি দুর্নীতি করে তাহলেও কিন্তু বলবো... তো, মমতা বললো- ও সুমনদা, তাতে কত টাকা লাগবে? আমি বললাম, সে তো অনেক টাকা গো, প্রায় তিরিশ-চল্লিশ কোটি। মমতা আর কিছু বলল না... পরে একদিন আমায় ডেকে পাঠাল... মমতার একটি ছোট্ট ঘর, আপনার সকলেই জানেন-সেই ঘরে একটি দেবীমূর্তি আছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে মমতা বলল, সুমনদা, আপনি এই মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে আদেশ করুন-মমতা, তুমি রিলায়েন্স -জিন্দালদের বিরুদ্ধে আন্দোলন এই মুহূর্তে প্রত্যাহার করে কাগজে বিবৃতি দাও-আমি কালকেই আপনাকে ১২০ কোটি টাকা এনে দেবো... তা, আমার আবার এইসব সময়ে বড্ড সিগারেট খেতে ইচ্ছে করে, চায়ের তেষ্টা পায়-আমি বললাম, অ্যাই মমতা, কী হচ্ছে কী? মমতা বলল-কী , পারলেন না তো? জানতাম, পারবেন না। এইজন্যেই আপনি কবীর সুমন আর আমি মমতা ব্যানার্জী-চলুন বাইরে গিয়ে চা খাই....... তো, এই হচ্ছে মমতা ব্যানার্জী.... এইরকম অসম্ভব ইনোসেন্স !!!!!''

শুনে আমি শুধু বিস্মিতই নয়, অত্যন্ত অবাক হয়ে গেলাম।

সেদিন রাত্তিরেই চ্যানেলে চ্যানেলে খবর ছড়িয়ে পড়ল-কবীর সুমনের বিরুদ্ধে আয়ের অসঙ্গতির অভিযোগ এনে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে সিপিএম ও পিডিএস। নাকি রয়ালটির টাকার হিসেব দেখান নি, স্ত্রীর সম্পত্তির হিসেব দেখান নি ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রত্যুত্তরে উনযুধিষ্ঠির সুমনসাহেব জানিয়েছেন (আবারো সেই মধুবর্ষী কন্ঠ) , গত সাত (আটও হতে পারে, আমার ঠিক মনে নেই) বছর ধরে উনি রয়ালটিতে কাজ করেন না; ওঁর স্ত্রী ক্যান্সার রোগিণী, তাঁর নিজস্ব কোনো বাড়ি পর্যন্ত নেই, বাংলাদেশের মানুষের দানের টাকায় তাঁর
চিকিৎসা চলে; বাংলাদেশে অবশ্য নয়, সিঙ্গাপুরে।

আরো একদিনের মধ্যেই চব্বিশ ঘন্টা চ্যানেলের দৌলতে বাঙ্গালী জেনে যাবে, কবীর সুমন কতবার বিবাহ করেছেন, কতবার ধর্মান্তরিত হয়েছেন বিবাহের প্রয়োজনে। টিপু সুলতান মসজিদের ইমামের প্রতিক্রিয়া-ও জানিয়ে দেওয়া হবে,বিবাহের উদ্দেশ্যে এই ধর্মান্তর তিনি সমর্থন করেন না। অবশ্য এসবকে ব্যক্তিগত কুৎসা বলা যাবে না, এ তো সত্য উদ্‌ঘাটন, সাংবাদিকের ধর্মপালন। বলা গেলেও অন্তত: কোনো সিপিএম নেতা তো আর এসব কথা তোলেন নি ! যেমন বলেছেন রূপা বাগচী, রাজনৈতিক সৌজন্য নিয়ে এক টিভি শো-য়ে (সেই চব্বিশ ঘন্টায়, আহা!), অনুরাধা তলোয়ার যখন প্রশ্ন তোলেন অসৌজন্য নিয়ে কথা বলার বামপন্থীদের নৈতিক অধিকার নিয়ে , যখন এককালে তাঁরাই চক্ষুহীন অতুল্য ঘোষকে কানা-অতুল্য বলে ডাকতেন। আরো জানালেন , প: বঙ্গ বিধানসভায় প্রথম জুতো ছুঁড়ে মারেন যিনি, তাঁর নাম মণিকুন্তলা সেন। প্রত্যুত্তরে রূপা বাগচী অনুরাধাকে প্রতিপ্রশ্ন করে বসবেন-আপনি কী এইসব কথা তৃণমূল -সঙ্গী হিসেবে বলছেন, না তৃণমূলের বাইরে গিয়ে ? প্রশ্ন খুবই প্রাসঙ্গিক, সন্দেহ নেই। এর উত্তর না পেলে কী করে আর অন্য সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাবে ! তাই ,হে জনগণ, আগে বলো : উন্নয়ন নিয়ে - সন্ত্রাস নিয়ে, শিল্পায়ন- সাপ-ব্যাং-আগাছা-সিপিএম-দুধের চাঁছি নিয়ে তুমি যখন প্রশ্ন করো, তখন কোন দল, তুমি কোন দল?

না:, ভোটের গরম সত্যি বাড়ছে। কাল রাতে এবারের প্রথম নির্বাচনী জনসভা শুনতে ও (যাতায়াতের পথে) দেখতে বাধ্য হলাম। দুর্দিনের প্রথম পঙ্গপালের ঝাঁকের মত।খুব শিগ্গিরই আমাদের আকাশ ছেয়ে ফেলবে মাইকবাহিত শব্দপালের গোল্লা গোল্লা মেঘ, হায়, তাতে বৃষ্টি হয় না। উল্টে চিক্কুরের চোটে কান ভোঁ ভোঁ করে, মাথা গরম হয়ে ওঠে, গা গুলোয়, একটা শব্দকেও আর অন্যটার থেকে আলাদা করে চেনা যায় না-কংগ্রেসশব্দ-কম্যুনিসশব্দ-দাবীশব্দ-প্রার্থনাশব্দ-ভালোবাসাশব্দ-রাত্রিশব্দ-ধিক্কার ও ঘৃণাশব্দ... শুধু বাংলার ত্রস্ত নীলিমাকে ঘিরে ঘিরে, বাংলার ধানমাঠ-আলপথ-অন্ধগলি-পুকুরঘাট ঘিরে ঘিরে নেচে বেড়ায় দেখে নেওয়া-হিসাবনিকাশ করা-লাইফ হেল করে দেওয়ার গান-আমাদের নতুন গণনাট্য, নবনাট্য।

কাল রাতে অবশ্য স্পষ্ট শুনতে পেয়েছি; আমাদের কমরেড গলা ফাটিয়ে বলছেন: ""তাপসী মালিককে কারা খুন করেছিল?.... হিটলার বলেছিলেন, একটা মিথ্যাকে বারবার বলতে বলতে .....''
আমি আর বিস্মিত হলাম না। অবাক তো নয়ই।

মে' ৩, ২০০৯