বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

পক্ষে

মতামত দিয়েছেন - পূবালী দত্ত, সায়ক দত্ত, দ্বৈপায়ন মজুমদার, মৃণালকান্তি দাস এবং জারিফা জাহান।


পক্ষে | বিপক্ষে | অপাক্ষিক


সিঁদুরের শেড
পূবালী দত্ত


দাদু মারা যাবার আগে অবধি মহালয়া মানে ভোরবেলা উঠে রেডিও চালিয়ে মা বাপির ঘুম ভাঙানো, তারপর টিভিতে আরেকপ্রস্থ দুর্গা অসুরের লড়াই, তার-ও-পর ছুটির আমেজে গা-টা একটু আলসেমিতে মুচড়ে নেয়া- ব্যাস এই। রুটিনে অল্পস্বল্প বদল ঘটেছে বয়সের সাথে সাথে, কিন্তু দিনের মূল তানটা “উৎসব এলো ভাই, পড়ে থাক কাজ” – এর সুরে যেন টান টান করে বেঁধে দেয়া। যারা ভাবছেন ‘এ আবার কোন ছড়া, ছোটবেলায় সব পড়লুম, এটা পড়লুম না !’ – তারা চিন্তা করবেননা, এ নেহাতই ফাঁকিবাজ বাপের ফাঁকিবাজ মেয়েকে আস্কারা দেয়া বই আর কিছু নয়। এমনকি দাদু মারা যাবার পর-ও বাপি জেঠুর তর্পণ করতে যাওয়া ছাড়া খুব আলাদারকম বদলে যায়নি কিছুই। এদিকে এবছর দেখি দেয়ালে দেয়ালে সে কি তর্ক! মহালয়া কেন “শুভ” হবে, লম্বা চওড়া সংস্কৃত শ্লোক, তার অনুবাদ, তত্ত্ব, সারাংশ, ভাবসম্প্রসারন কিছুই বাদ নেই। কখনো “শুভ”-র দল ভারি, কখনো “অ-শুভ”-র দল। এইসব চলতে চলতেই আবার নতুন প্যাঁচাল - সবেতে অত শুভ বলার আছে কি রে বাপু?! একদল তেড়ে আসে, অন্যদল মুচকি হাসি তাচ্ছিল্য, একদল একপাতা স্ট্যাটাস লেখে, তো অন্যদল মীম বানায় – প্রায় শুম্ভ নিশুম্ভের যুদ্ধ। এইসবের ফাঁকে দেখি কখন যেন কারা খাতায় অদৃশ্য নিয়ম লিখছে – ১। “শুভ অমুক” বলা যাবে না। ২। সিঁদুর খেলা যাবে না। ৩|... আমরা অমুক ব্যান তমুক ব্যানের বিপরীতে ফাটিয়ে ঝগড়া করে সামান্য “শুভ অমুক” নিয়ে আপত্তির বন্যা বইয়ে দিই। সোশাল সাইটে অচেনা লোককে নিমেষে একটা রূঢ় কথা বলে দেয়াই প্রায় যখন দস্তুর, সেখানে “শুভ অমুক” কি করে এত অসহনীয় হয়ে ওঠে না ভেবে পেয়ে ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে যাই- আমিও যে সেই দলেরই লোক, মহালয়া দিয়ে যার “উৎসব” এর শুরু, “কাজে ফাঁকি” দেবার শুরু।

এতো তবু কমে কমে চলছিল, পুজো মিটে গেলে শুরু হল আসল ধুন্ধুমার। “সিঁদুর খেলে ছবি? হ্যাঁ? সারাবছর সিঁদুর ছোঁয়ায় না কপালে, আজ এত সতীপনা?” কিম্বা “সিঁদুরের অতীত ইতিহাস তো জানেই, তারপরেও এসব তোল্লাই দিচ্ছে!” নেহাতই পাকেচক্রে সিঁদুর আজ অবধি খেলা হয়ে ওঠেনি, সুযোগ পেলে তো খেলতাম আমিও! কি জ্বালাতন রে বাবা! মেয়েদের দল দোষের মধ্যে এর ওর গায়ে সিঁদুর লেপালেপি করেছে, কেউ কারোর নামে কুচ্ছো গায়নি, এমনকি রামচিমটি অবধি দেয়নি! হ্যাঁ রে বাপু, আমিও জানি সিঁদুর ইত্যাদি নিয়ে আদিখ্যেতার মানে নেই। কিন্তু সুয়োরানী দুয়োরানীর গল্প, মাসিকের সময় মেনে চলার নিয়ম কানুন, লক্ষ্মীপ্রতিমার মত বাড়ির বৌ হয়ে ওঠার সহজ উপায় শুনে শুনে বড় হয়েছে যে মেয়েরা, তারা যখন বলে যে – ‘ দেখেছিস, অমুক প্যান্ডেলে বিধবাদেরও সিঁদুর খেলতে ডেকেছে, বেশ ভালো বল?’, ভালোই তো লাগে বেশ। একটু একটু করেই কি বদলায় সব? এই লিখতে লিখতে মনে হল, মেটে সিঁদুর দিয়ে সিঁদুর খেলা হলে বুঝি লোকজন খুব বেশি খেলত না, বুঝি বা রংটা লাল বলেই এত মাতামাতি। এ-ওর গায়ে লাল রং লাগিয়ে ঠেলাঠেলি হুড়োহুড়ি করে খুব একচোট হুল্লোড়; ছবি তুলে মুহূর্তটাকে আরেক্টুক্ষণ বাড়িয়ে তোলা, “ও মা, কি মিষ্টি দেখাচ্ছে তোকে!” প্রাণের সইকে এটুকু বলে তার হাসিমুখের ভাগীদার হওয়া, যাদের এতদিন আগলের বাইরে রেখেছিলাম, নিয়মকানুনকে ঘেঁচুকলা দেখিয়ে তাদেরকেও ডেকে আনতে শেখা - পুজোর শেষদিনে আনন্দের শেষটুকু এইভাবে চেটেপুটে নেয়া ছাড়া আজকের দিনে আলাদা করে সিঁদুরখেলার মাহাত্ম্য আছে কি আর কিছু? চিরকাল ভুলক্রমে গুরুতর বলে জেনে এসেছে যে জিনিসকে মেয়েরা, তাকে হালকাচালে নিতে শিখলে খুব ক্ষতি কি কিছু? বরং সেই নিয়ে হাজার ঝগড়া করে কি উলটোটাই করে ফেলছি না আমরা? এক কথা নিয়ে বলতে গিয়ে খাপছাড়া ভাবে আরেক কথা মনে পড়ে। এতোলবেতোল লিখতে লিখতে আমার থেকে বাহাত্তর বছর বয়সে বড় দাদুর কথা ভাবি, যাকে নিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম। ইংরিজি শেখাচ্ছে দাদু- ট্রান্সলেশনটা কর দেখি-“পূবালী সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। সে পড়ায় ফাঁকি দিয়ে পাড়ায় ছেলেদের সাথে ক্রিকেট খেলে বেড়ায়। ” ( কি কঠিন! ) পরদিন সকালে দাদু জানলার ফাঁক দিয়ে রেডিও শুনে শুনে লিখে জড়ো করা অঙ্কের ধাঁধা লেখা চিরকুটটা গলিয়ে দিয়ে গেল- “ করে রাখিস। ওবেলা দেখবো। একশো পেতে হবে তো নাকি? মেয়েরা অঙ্ক পারে না? ধুস কে বলে সে কথা?” কালো থেকে সাদায় যেতে মাঝে আরও দুশো চুয়ান্নটা পা ফেলতে সময় দিতে হয় তো নাকি?

সত্যি বলতে কি, পঞ্চাশ নয়, দুশো ছাপ্পান্ন নয়, আরও অনেক অনেক ধূসর শেডের এক একটা ধাপে দাঁড়িয়ে আছে এক একটা মানুষ। কিছুজন আছি যারা হয়তো অন্য বেশিরভাগের থেকে সংস্কারের কালো পোঁচ বেশ কয়েক লেয়ার হাল্কা করে ফেলতে পেরেছি, ফেলেছি বলেই কি বাকি সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর ক্ষমতা জন্মায়? তুচ্ছ তাচ্ছিল্য দোষারোপ হোলিয়ার দ্যান দাউ মনোভাব – নিজেদের আলোকপ্রাপ্ত হনু ভেবে আশেপাশে গণ্ডিটা আরেক্টু মোটা করে টেনে দিচ্ছি না কি আমরা? গণ্ডি টানতে টানতে এমন না হয় যে আমরা কথা বলেই যাচ্ছি, উচিত কথাই বলে যাচ্ছি, অক্লান্ত – কিন্তু গণ্ডির ওপারের কেউ শুনছে না আর। গণ্ডির ভেতর নিজেরাই নিজেদের বলে চলি ক্রমাগত – তমুকটা তো রিগ্রেসিভ, অমুকটা মানুষে আজও করে?, ছি ছি, লজ্জা লজ্জা। একই রকম দেখতে কয়েনের উল্টোপিঠের মতই যেন শোনায় – “সধবা মেয়েমানুষ সিঁদুর পরেনি? ছি ছি লজ্জা লজ্জা। ”


ক্যাজানে
সায়ক দত্ত


কেন রে বাপু, এই হল গে সব্বজ্ঞানীদের সমস্যা। বিতক্ক ঠিক টেনে আনবেই। যেন ফুত্তিফাত্তা মহা অপরাধের ব্যাপার। রেললাইনের ধারে ফুলি বউদির ঠেকে সুড়ুৎ করে দু গেলাস মেরে পড়ে থাকলেও বিতক্ক। চিত হয়ে শুলে অশ্লীল না উপুড় হয়ে শুলে বিপজ্জনক। পুজো হল গে পুজো। আসল কতা হল মুক্তি। সে কেউ গোমড়াথেরিয়াম হয়ে ভয়ংকর সিরু সিরু ভাব করুক, বা ছোকোদার মত খিল্লি। অ্যায় তো, কোন ছোকোদা ঠাহর করা যাচ্চে না। হেমন্তের হিমেল ভোরে যে ছোকোদা গায়ে নামাবলি জড়িয়ে, লম্বাআআ ছিপে চুনো নাচিয়ে শোলমাছ ধরতো, আমি তার কথা বলছিলাম। ধম্মিয়, সামাজিক, শুধু পুজো না উৎসব, সব শব যদি চোখটা ঠিক মটকাতে না পারো, ডানা দুটো ছড়াতে না পারো সটান। সামনে আসচে আরো কত কান্ড, জ্যায় মা, সব লন্ড ভন্ড করে দে।


তর্ক, প্রথা আর দাম্ভিকতা ??
দ্বৈপায়ন মজুমদার


আমাদের সবারই একটা ছোটবেলা থাকে, থাকে কিছু মিষ্টি, কিছু মেলোডি । পেলব মুহূর্তগুলো থাকে খুব যত্নে, এক গোপন সিন্দুকে । সেগুলো ফিরিয়ে মাঝে মধ্যে স্মৃতি সমুদ্রে একটা ছোট্ট ডুব সাঁতার, এটাই লালচে আলোর কালচে বর্তমানে এক সিলিন্ডার মুক্ত বাতাস । এখন এই স্মৃতির ভল্টে সামলে রাখা এই মুহূর্তগুলো বিশেষ ব্যাকরণ মানে এমন না, তার যুক্তি, তার ইতিহাস নিয়ে টানাটানিতে রক্তাত্ব হয় শৈশব স্বপ্ন রাজ্য ।

ধরা যাক আমরা যারা মফস্বলে মানুষ, যাদের ছোটবেলার আইসক্রিম মানে 'কোয়ালিটি' না । যারা ছোটবেলাতে বাড়ির লাল চোখকে জাস্ট উপেক্ষা করে রাস্তার ধারে ওই রঙিন কাঠি আইসক্রিম চুষে মুখ রাঙিয়েছে, কখনও 'লাল' তো কখনও 'সবুজ', তাদের এই স্মৃতি মেদুরতা আছে ওই রঙিন বরফকাঠি নিয়ে । আমাদের বাড়ি বলত ওগুলো নাকি ড্রেনের জলে তৈরি, আমরা বিশ্বাস অবিশ্বাসকে বাউন্ডারির বাইরে ফেলে পাকস্থলীর সুস্থতা পাত্তা না দিয়ে দিব্যি মুখ রাঙিয়েছে । এখন সেই হিসেবে দেখতে গেলে আমরা হাত ধুয়ে খাওয়া, পরিষ্কার শুদ্ধ জলের বরফ এসব তো ভাবিনি, এখন যদি চর্চা হয় তাহলে নস্টালজিয়া আর জন স্বাস্থের একটা লড়াই তো হবেই ।

খাওয়ার কথাই যখন হল তখন আমাদের অনেককেই বাড়িতেই এক গ্লাস দুধ খাওয়ানো হত । দুধে প্রোটিন আছে, গায়ে জোর হয়, কপিলদেব খায় এসব যুক্তি দিয়ে বড়রা পাকস্থলীতে পাঠাত গ্লাস ভরা দুধ এবং আমাদের সব বিদ্রোহ ওই গলার নিচেই আটকে যেত । আজ এত বছর পর ওই দুধের গ্লাসকে কী আমরা গাল মন্দ করি ? ওগো দেখ, এক শিশুর উপর তার মতের বিরুদ্ধে কী অত্যাচার ??

আসলে এই দুটো উদাহরণ এই জন্যই দেওয়া যে চলে আসা সব কিছু হয়ত যুক্তি তর্কের বিচারালয়ে ভিন্ন ফলাফল দেবে । প্রথম ক্ষেত্রে যতই স্মৃতি মেদুরতা থাকুক এটাকে জনস্বাস্থ্য কর্মীরা ক্ষতিকারক বলবেন, আবার দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ফল হবে উল্টো । তাই প্রথা, নস্টালজিয়া ইত্যাদি শব্দগুলোর সাথে বস্তু বিজ্ঞান যুক্তি তর্কের একটা লড়াই চলবেই ।

কিন্তু লড়াইটা শুধু লড়াই বা তর্ক করে নিজের মত প্রতিষ্ঠা করা এবং জিতে যাবার জন্যই শুধু যদি যুক্তি তর্ক হয় তাহলে সেই তর্ক গুলোতে থাকে শুধুই অহংকার, আর কিছুই না । আর এটা পুজোর আচার বিচারের ক্ষেত্রেও সত্যি ।

আমি পুজো নিয়ে তিনটে প্রসঙ্গে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছি, না হলে অতি দীর্ঘ এবং বিরক্তিকর (হয়ত এখনই তাই হয়ে গেছে) হতে পারে ।

১) আমিষ নিরামিষ বিতর্ক ...

এটা অতি সম্প্রতি শুরু হওয়া গল্প । শুরুর দিকটা ছিল 'নবরাত্রি'র সময় বাঙালির আমিষ খাওয়া নিয়ে নিরামিষ ভোজীদের কাগজ কলম আক্রমন । শাস্ত্র মতে আমিষ খেয়ে বাঙালিরা কী মহা পাপ করছে তার ন্যারেটিভ । এখন আমাদের বেশিরভাগের ছোটবেলা এই সময়কে নবরাত্রি না, দুর্গাপুজো জেনেছে । আর পুজো মানেই ব্যাপক খাওয়া । তাই প্রতিষ্ঠিত লেখক থেকে উঠতি লেখক জমিয়ে কাউন্টার ন্যারেটিভ নামিয়ে দিল । তারপর আর লেখার লম্বা খাটনিতে না গিয়ে এল 'মিম' বর্ষণ । এ বছর আবার দেখলাম আগে থেকেই 'আমিষি' আক্রমণ । এমন একটা ন্যারেটিভ যেন পুজোতে বিরিয়ানি ছাড়া বাঙালি গত একশ বছরে কিছু চিনত না । বিরিয়ানিকে পারলে বাঙালির স্টেপেল ফুড বানিয়ে দেয় । আসলে এই কাউন্টার ন্যারেটিভ অনেক সময় কলকাতা কেন্দ্রিক, আরও বেশি করে বললে গত তিন, চার দশকের কলকাতা আর তাকে ঘিরে থাকা মফস্বল কেন্দ্রিক । একটু দূরের মফস্বল, গ্রাম ইত্যাদির গত তিরিশ চল্লিশ বছরকে জাস্ট ভুলিয়ে দিল । কলকাতা আর তার সংলগ্ন মফস্বলকে হোমোজেনাস বাংলা করা হল, গ্রামের অনেক পুরনো পুজোতে এখনও নবমীর বলির আগে আমিষ নেই । রাস্তার ধারের বিরিয়ানি স্টল এই বেশিদিন আগে না, নব্বই দশকেও বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার মত মফস্বলে অন্য গ্রহের চিড়িয়া ছিল । অথচ বাঙালি মানেই বিরিয়ানি এমন সরল সমীকরণের ন্যারেটিভ তৈরি হল । তার সাথে দুর্গা পুজো মানেই এগরোল, আমিষ খাবারের হোমোজেনাস বাঙালি এই তত্ত্ব তৈরি করে কলকাতা আর তার সংলগ্ন বাঙালিয়ানাকে সার্বিক বাঙালিয়ানার রূপ দেওয়া হল । আর এই অষ্টমীর নিরামিষ বা ক্ষেত্র বিশেষে অন্য দিনেও যারা এত বছর নিরামিষ মেনে এসেছেন তাদের এই মানার সঙ্গে কিছু আচার বিচার আছে, উৎসবের নামে সেগুলোকে ধুলোর মত উড়িয়ে দেওয়া মহানগর কেন্দ্রিক দাম্ভিকতা । কিন্তু এই আচার বিচারের বিভিন্নতা নিয়েই তৈরি হয়েছে পুজোর অনেক স্মৃতি মেদুরতা । এগুলোকে কাউকে অহেতুক না খুঁচিয়ে বেশ চলছিল । যুক্তি, উত্তর আধুনিকতা, সমাজতন্ত্র ইত্যাদির ককটেলে না ঘেঁটে দিলে এগুলো নিয়েই ছিল সামগ্রিক উৎসব ।

২) সিঁদুর খেলার ইতিহাস টেনে চচ্চড়ি বানালে বর্তমানকেও বাদ দেওয়া যায় না । সিঁদুর মানেই নারী পরাধীনতা এই ন্যারেটিভ দিলে ওই এক দিনের খেলাটাকে কেন টার্গেট ?? বিয়ের দিনের সিঁদুর পরা ছবিতে হাউ কিউট, ছবিতে কমেন্ট আর লাইকের ফ্লাশ ফ্লাড হবে আর যত দোষ ওই পুজোর দশমী । এত কিছুতে ব্যাক্তি স্বাধীনতা শোনা যায় আর সেচ্ছায় সিঁদুর রাঙা গাল দেখলেই হঠাৎ বিশেষ এক ন্যারেটিভ নামানো ?

৩) স্যানিটারি ন্যাপকিনকে পুজোর চলচিত্রে নিয়ে আসা শিল্পীর স্বাধীনতা, দুর্গা আসলে এক মহিলা এই উদারতা মানলে সেই মহিলাকে যারা মায়ের মত ভালবেসেন, যারা প্রাচীন কিছু রীতি মানেন, সে কুমারী পুজো হোক বিশেষ দিনে নিরামিষ, এটাও তাদের ব্যাক্তি স্বাধীনতা, তাদের স্বাধীনতাকে অসম্মান করার অধিকার আপনি কথা থেকে পেলেন ??

যে রীতি লোকাচার মানুষ হিংসা, বিদ্বেষ না ছড়িয়ে বছরের পর বছর আনন্দে মেনে চলেছে তাকে আঘাত করায় বিশেষ জ্ঞানের প্রতিফলন থাকে না, থাকে জ্ঞানের বিশুদ্ধ দাম্ভিকতা ।


উৎসব না পূজো, সাংস্কৃতিক সামাজিক না ধর্মীয় আচারবিচার
মৃণালকান্তি দাস


প্রশ্নটা যখন উৎসব না পূজো, সাংস্কৃতিক সামাজিক না ধর্মীয় আচারবিচার, তখন একথা বললে মনে হয় খুব একটা ভুল হবে না যে, বাঙালি হিন্দুরা, অন্তত যাদের নিজেদেরকে হিন্দু বলতে কুণ্ঠাবোধ নেই , তারা কখনোই আগমার্কা ধার্মিক বা ধর্মীয়ভাবে কট্টর গোঁড়া ছিল না । তাদের কাছে দূর্গা, কালী, লক্ষ্মী, সরস্বতী সবাই নেহাতই ঘরের মেয়ে , মহাদেব গাঁজা ভাঙ খাওয়া আত্মভোলা জামাই ।

বাঙালির প্রতিটা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের সঙ্গে বিভিন্ন রকম সামাজিক বা বাহ্যিক ক্রিয়াকলাপ যুক্ত থাকে, যা মোটের ওপর একটা কার্ণিভালের রুপ দেয় । তাই মহালয়ার সময় একদল যেমন গঙ্গার ঘাটে গিয়ে পূর্বপুরুষের জন্য তর্পণ করে , আরেক দল তেমনি রাত জেগে কারনসুধা সহযোগে দিনটাকে অন্য রকম ভাবে পালন করতে মেতে ওঠে । এক কথায় বলতে গেলে বাঙালি ধর্মেও আছে, জিরাফেও আছে ।

কিন্তু এত আনন্দ , ফুর্তি ও উদযাপনের মধ্যেও কিছু কটু কথা শোনা যায়, যেমন - কুমারী পূজো একটা খারাপ বা কু-প্রথা, এটা পরোক্ষে বাল্যবিবাহকেই উৎসাহ দেয় । সিঁদুরখেলা বা সিঁদুর পরা নারীর অবমাননা এবং পুরুষের দাসত্বের প্রতীক । এরপরে হয়তো আসবে, বিজয়ার কোলাকুলি , বড়দের পা ছুঁয়ে প্রণাম করা, ভাই ফোঁটা, সবই মানবতার কলঙ্ক । কিন্তু মজার ব্যাপার হোল, এসব ফালতু কটুকচালী নিয়ে আম বাঙালি কখনোই বিশেষ মাথা ঘামায় না বা পাত্তা দেয় না ।বরং বাঙালি এই সব নিন্দুকদের নিরাশ করে প্রতিটি উৎসবের রং ও রস যথাসম্ভব চেটেপুটে আত্মস্থ করতেই মগ্ন থাকে ।

তবে কারা এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে ? একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে যে, কোন বিধর্মী নয়, বরং একদল স্বঘোষিত প্রগতিশীল, যুক্তিবাদী নাস্তিক , যাদের জন্ম হিন্দু পরিবারেই, তারাই নাওয়া খাওয়া ভুলে এই বিপ্লবে নেমেছে । এখন কথা হচ্ছে, যারা ধর্ম মানে না, ধর্ম সম্পর্কে তাদের এইসব জ্ঞানগর্ভ' তত্ত্বকথার গ্রহনযোগ্যতা কতটুকু ? পৃথিবীতে সমস্ত জাতি বা গোষ্ঠীরই উদযাপনের জন্য কিছু না কিছু ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসব ও রীতিনীতি থাকে । এখন সবার পেছনেই যদি যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক কারন খুঁজতে হয় , তবে তো জীবনে বেঁচে থাকার মজাটাই মাটি । জানি না যারা এসব করে, তাদের জীবনের কোন নিরাশা এর পেছনে কাজ করে কিনা !

পরিশেষে একটা কথাই মনে হয় যে, যতই বিরুদ্ধ মত উঠুক বা অপপ্রচার চলুক , বাঙালির বারোমাসে তেরো পার্বণের কার্ণিভাল কখনোই থামবে না । বাঙালির উৎসব/ পূজো আর সামাজিক মিলন মেলা সমান্তরাল ভাবে চলতে থাকবে, যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে ।

এই তো জীবন ।


জারিফা জাহান
তামাশা


আহা! চার্জড হইয়াও হইল না শেষ....।

কোন সে জুলাই মাসে সলতেয় আগুন ধরায় পুজোবার্ষিকী, আর তাতেই কাঠির পেটে ঢাক গুড়াগুড় সবজান্তা অতি বোদ্ধা বাঙালির নিম্নবর্গীয় চায়ের দোকান টু উচ্চমার্গীয় ফেসবুকতুতো আঁতলামোর বারোয়ারিকাল। দুগ্গা, মেরী মাতা গণেশ কাঁখে ('ফেমিনিস্ট'রা দলাদলি করতেই পারেন সূচনাপর্বে, শুধু গণেশই মায়ের কোলে, আরও সোজা করে বললে, ধারে কাছে ঘেঁষার সুযোগ পেয়েছে, লক্ষ্মী-স্বরস্বতী কিনা পেত‍্যয়! স্কেপটিক্যাল মোড়কে তর্কের আগাপাশতলার ঝুঁটিটুকুও যদি না নড়িল তবে কীসের তুমি কুলীন আঁতেল, হে?!) এসব চর্বিতচর্বণের কুলকুচিতে সর থিতোলেই মুশকিল! মহা মুশকিল! টপিকের অভাবে তো আর জ্ঞানের নদীতে চর ফেলা যায় না।

১৭ তারিখে ঘুড়ি টুড়ি উড়িয়ে ( অবশ্য না উড়লেও ক্ষতি নেই, ছবি উঠলেই কেল্লাফতে) ল্যাদ খেতে খেতে পকেট যখন পুঁচকি, তখনই সুজয়দা হয়ে আসে বাজারে, 'আমার দুর্গা-তোমার দুর্গা'। আর সনাতন গুরুকুল তো আছেই; মহালয়া কেন 'শুভ' নয়, নবমী কেন নির-ভেজ-আল নবরাত্রি নয়...লিস্টি বড় লম্বা।

তবে, এসবের সাথে মার্কা মারা একটা লেজুড় থাকেই, বরাবর। সে হল উৎসব না পুজো, পুজো না উৎসব। প্রচুর তর্ক, হেঁইয়োপূর্বক বিতর্ক। আদতে তো পুজো, তাহলে বাঙালির উৎসব কেন বাপু? বাঙালিয়ানা কি 'হিন্দু'র বাপের সম্পত্তি? 'মুসলমানে'রা কি বানের জলে ভেসে এসেছে?অমনি টান, টান...বাংলাদেশ আন। লাখে লাখে মুসলমানে বাংলায় কথা কইছে, চোখে ঠুলি এঁটে রয়েছ বলদি'কি বাপু? তা ভাল কথা, মিথ্যে বলবনা, এই যে সেপ্টেম্বর পড়লেই 'মুসলমান' নাম থাকা সত্ত্বেও মনে যে একটা পুজো পুজো ফিলিং..সে মেঘের কেত না জ্ঞান হওয়া অব্দি পুজোর ছুটির বরাদ্দ রুটিনে মাথায় প্রোগ্রামিং হয়েছে...এত জটিলতা বুঝিনে, এসব জ্ঞানের পারফিউমে আমার থোড়িই হাততালি মাপা বরাদ্দ, হুঁ! যাগ্গে, যা বলছিলাম, জনে জনে থলে হাতে নেমে তো পড়েন, সমস্যা হল টপিকের কারিকুরিতে এ ক্যাঁচাল মাছবাজারের জাতীয় লজ্জা। জানেন নিশ্চয়ই, সেক্যুলারিজম মহারোগ। মুসলমান 'সেক্যুলার' হিসেব দেন, এ পুজোয় মুসলমান ক'টা ঢাকি কাঠি করতে এসছে কিংবা ক'টা প্যান্ডেলের বাঁশ, ঝাড় ছেড়ে আলাদা; যেন কাঠি বা বাঁশ পেছনে রেখে ধর্ম-ধর্ম খেললে পেট চলবে না, দৌড়বে। হাঙ্গামা সপ্তমে পৌঁছানোর আঁচ পেলে ড্যামেজ কন্ট্রোলে বাঙালির পেট ভরসা। অগত্যা রোল-ঘুগনি-চাউমিনের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতেও যদি আড্ডার খোশমেজাজ থিতিয়ে যাচ্ছে ভেবে একটু আধটু পেটব্যাথা-বুকজ্বালা শুরু হয়, তখনই চলে আসেন কিছু হিন্দু 'সেক্যুলার'। বিফাহার এবং ঈদের সেমাইই যে সেক্যুলারিজম প্রমাণের একমাত্র এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী নিধান; তা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে এ বিষয়ে উচ্চবাচ্য - ছিঁটেফোঁটা সন্দেহের দাগ পড়লেও তা তাবৎ আক্রমণকারীর চোদ্দগুষ্টির মগজচৌকাঠের সারবত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অব্দি দ্বিতীয় বিষয় নয়। সংখ্যার প্যাঁচে গুরু-লঘু সমাজে এগোল কদ্দুর? এত জানতে ভারি বয়েই গেল! আমি তো এককাঠি ওপরেই, ওসব দেখনদারি সেক্যুলারদের কারবার (যতই হোক বাকিরা মূর্খ আমি বোদ্ধা- এটা ভাবার মধ্যে একটা স্বর্গীয় আরাম আছে। পয়েন্ট টু বি নোটেড: সেক্যুলার বলে কি স্বর্গ নেই, যত্তসব ইঁচড়ে পাকা জনগণ?!), এসব ছেড়ে প্রশ্ন করেছি; পুজোবার্ষিকীই কেন? উৎসব কি শুধুই দুর্গাপুজো? ঈদবার্ষিকী কার পাকা ধানে মই দিয়েছে?! তা বাবা, একটু আগেই বাংলাদেশ গপচাচ্ছিলে, আবার ব্যাটাকে কান ধরে টান দেখি! সেখানে ঈদবার্ষিকী কেন? পুজোবার্ষিকী কারও পিঠ চুলকায় না কেন?

অ.....হ্যাঁ....মানে....ইয়ে....জানি যে ধর্মীয় উৎসব আসলে সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুর ইকিরমিকির চামচিকির, কিন্তু খবরদার ওসব কি আর জনসমক্ষে স্বীকার করা যায়?! বাংলাদেশ; বেশি বললে মুসলিম 'সেক্যুলার'দের ভারী গোঁসা হলেও হতে পারে...ওখানে না হয় গুরু এখানে যে লঘু, তার বেলা? এখানে গো-সন্তানেরা হা রে রে রে করলে তেনাদের চাপ, ওপারে চাপাতিরাজ বুক ফুলিয়ে ন্যাংটা হলে কে ওখানে লঘু বাবা? আমি তো জানিনা...এর চেয়ে বরং ফেসবুকীয় স্ট্যাটাসের বারবেলা : তুমি বাপু আদতে হিন্দু-মুসলমান, আমাদের ন্যাজে পা না-দেওয়া অব্দি সেক্যুলার।

এত মৌল বাদানুবাদের বগলদাবা যদি নাই বা হল, উৎসব উৎসবই। সে সমাজের না ধর্মের না সংষ্কৃতির সেসব কচকচির হাতাহাতিতে খামোখা মাথার ব্যামো। দেখুন দিকি, ক্রিস্টমাস ক্রিস্টানের 'পুজো'। সাগর পেরিয়ে সে জিনিস বলা নেই কওয়া নেই, নেকুপুষু বড়দিন হল কীভাবে?! প্লিজ, ঔপনিবেশিকতা, প্রাদেশিকতা এসব ওজনদার কথার বিনির্মাণ হওয়ার আগেই বলে রাখা ভাল, দুনিয়া তার জোর যার। মানে সেই গুরু-লঘুর ভিত, গ্লোবালাইজেশন আর আইটিকুলিদের বদান্যতায় জোয়ারের হাল লাগামছাড়া। সবাই জেনেছে, যীশু জন্মে(?) জগৎ উদ্ধার করেছে ওইদিন, অতএব আমিও কেক খাইলে জাতে উঠিয়া গিয়া সাহেব সাজিতে পারিলেও পারিতে পারি (পিওর দাঁড়কাক-ময়ূরপুচ্ছ কেস)। দেশের উৎসবেও একই গল্প। মুসলমানের ঠাকুর আর হিন্দুর লাচ্ছা-বিরিয়ানি দর্শন হলেই সেক্যুলারিজমের পরীক্ষা পাশ, আঁতেল সমাজে জাতে উঠিলেও উঠিতে পারি। তবে যে যুগে যুগে 'উন্নতি'র এমন তফাৎ?...ছাড়ুন তো মশাই চারটে বিয়ে আর কুড়িটা বাচ্চা...তাদের আবার উন্নতি!

অতএব বুঝেই গেছ, উৎসব, টুকরোটাকরা খুচরো লোকাচার কাটালেও ধর্মীয় দোষে দুষ্ট এবং সে দোষের পাল্লা ভারী হলেই গুরু-লঘু-তর্ক-বিতর্ক-ক্যাঁচাল-বানচাল সব মাঠে হা ডু ডু ডু করতে নেমে আসবে। আমি চাইলে তাদের সাথে ডাংগুলি খেলতেই পারি, শখ হলে পেছনে আগুন ধরিয়ে কালীপটকাও ফাটাতে পারি আর নিতান্তই আঁতেল(বাঁ - তেল ও হতে পারে) কিংবা পেছনপাকা নির্বিকার হলে উৎসবের নামে ফুক্কুড়ি-হুল্লুড়িতে প্রেমসে গা ভাসাতে পারি। দিনশেষে আমি সিনিক্যাল হয়ে নিজেকে বিশ্বসেরা (বাংলা নয়) তাত্ত্বিক ভাবব না পুজোর গানে নেচে বহাল তবিয়তে যুগের সাথে বকরি ঈদের অপ্রয়োজনীয়তা কনভিন্স করাব, সে ঠিক করার দায় একান্তই আমার। উৎসব চিরকালই আনন্দের, তত্ত্ব আর পেসিমিজমের জিগির তুলে, যে অজুহাতেই হোক না কেন, সবার মিলনোৎসবের রঙে কালো দাগ টানা আদতে বেআব্রু অভদ্রতা, মনুষ্য নামের অ'সমাজিক'তার তামাশা।
পক্ষে | বিপক্ষে | অপাক্ষিক



359 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ মোচ্ছব  আলোচনা  বুলবুলভাজা  উৎসব ইস্পেশাল ২০১৮  কূটকচালি 
শেয়ার করুন


Avatar: প্রতিভা

Re: উৎসবের বিতর্ক

প্রত্যেকটিই সুলিখিত।
Avatar: Tim

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

প্রচুর পয়েন্টে অ-সহমত, কিন্তু লেখাগুলো সবকটাই ভালো হয়েছে।
Avatar: দ

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

আচ্ছা জয়ার লেখাটা পড়ে আমার বিপক্ষে মনে হল, ভালও লেগেছে বেশ। সার্কাস্টিক বলে কি মিসপ্লেসড হয়ে পক্ষে চলে এসেছে?
জয়া কী বলে? কিসে লিখেছিল?

Avatar: dd

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

সব লেখাই সুখপাঠ্য ও সহজপাচ্য।
Avatar: খ

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

সেই ঘিসাপিটা, বনাম এলিট পজিশন, একেবারেই হয়নি😊


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন