বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

বিপক্ষে

মতামত দিয়েছেন - যশোধরা রায়চৌধুরী, জয়া চৌধুরী, রৌহিন ব্যানার্জ্জি, অচল সিকি, সৌভিক ঘোষাল।


পক্ষে | বিপক্ষে | অপাক্ষিক


চিহ্নধারণের দায় কেন এত?
যশোধরা রায়চৌধুরী


A garment, an automobile, a dish of cooked food, a gesture, a film, a piece of music, an advertising image, a piece of furniture, a newspaper headline—these indeed appear to be heterogeneous objects. What might they have in common? This at least: all are signs…this car tells me the social status of its owner, this garment tells me quite precisely the degree of its wearer's conformism or eccentricity.- Roland Barthes

বাঙালি কী তা যেন কতগুলো চিহ্নের ওপর দাঁড়াল অবশেষে। এই আমাদের দুর্ভাগ্য। লেবেলিং ব্রান্ডিং আর বিক্রয়যোগ্যতা। এইসবের চক্করে বাঙালির পরিচয়ই এখন প্রশ্নাতুর শুধু নয়, চিহ্ন নির্ভর।দেড় হাজার বছরের বঙ্গদেশের ভঙ্গে ভরা ইতিহাসে, চিহ্ন ছাড়া আর সবই বিস্মৃত প্রায়।

আর কত অকাতরে সোনামুখ করে আমরা তুলে নিচ্ছি নিজেদের গায়ে সেঁটে বসা লেবেলসহ নিজেদের সেলফি। এই দুহাজার পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েও, কত না মনোযোগ দিয়ে আমরা জড়ো করি আমাদের সব নানান চিহ্ন। লাল পাড় সাদা শাড়ি । পাঞ্জাবি, ধুতি। ইলিশমাছ চিংড়িমাছ। সরষের তেল। পোস্তবাটা। শাঁখা সিঁদুর। আর হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই , দুর্গাপুজো।

এই দুর্গাপুজো এখন বাঙালির শেষ আঁকড়ে ধরা… বারো মাসে তেরো পার্বণের অনেক গুলিই পুরোপুরি হারিয়ে। আমাদের উৎসব অনুষ্ঠানের মধ্যে তাই বেশ জোরালো আর জাঁকালোভাবে ঠেশে বসেছে দুর্গাপুজোর সব কান্ড, যেগুলো নাকি সেকুলার মার্ক্সিস্টদেরও ভারি পছন্দ। হিন্দুত্বের নানা চিহ্ন, শুধু হিন্দুত্ব নয়, ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের , এবং কে না জানে যে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের প্রচুর কিছুকেই আমরা আগেই মহিলাবিরোধী বলে জানি, তবু, ভারি ধুমধাম করে পালন করি আমরা।

বিগত হাজার বছর ধরে হিন্দুত্ব থেকে মার্কিজম হয়ে পথ হাঁটিয়াছে বাঙালি…আর আমাদের পুজো আচ্চা আর হিন্দুত্বচিহ্নগণ সবই নাকি বেদম সেকুলার আর প্রচন্ড সাংস্কৃতিক তাই সবকুছ চলতা হ্যায়।

‘যেমন, দুর্গাপুজোর বিজয়ার দিন সিঁদুর খেলা। ওইদিন বিসর্জনের আগে দর্পণে মায়ের মুখ দেখে, মৃন্ময়ী মাকে ঘরের মেয়ের মত সিঁদুর পরিয়ে, সন্দেশ খাইয়ে বিদেয় করা। সেই সময়ে স্ত্রী আচারে সধবা মেয়েরা অন্য সধবাদের সিঁদুর পরাতেন চিরকাল। এই উৎসবে কোন অংশগ্রহণ নেই বিধবা বা কুমারীদের। তবু আজ এ উৎসব বাঙালির সংস্কৃতিচিহ্ন। বাঙালির গৌরব। এই উৎসব এক হিড়িকের হুজুগের রূপ নিয়েছে। দোল খেলার মত সিঁদুর খেলা এক বিপুল উদ্দীপনার বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতটাই, যে সধবা ছাড়া বাকি যারা এতে অংশ নিতে পারেন না তাঁদের ডেকে এনে অংশ নেওয়ানোর ধুম পড়েছে। একটা প্রাচীন এবং প্রশ্ন-তোলাই-যায় যা নিয়ে, সে চিহ্নকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে , সেটাকে বাড়াবাড়ি রকমের এক উৎসবে পরিণত করে বাঙালি সংস্কৃতির ছাপ পরিয়ে দিয়ে নবায়ন করা , সো ভি আচ্ছা!

অভিষেক সরকার বলেনঃ পুজোয় সিঁদুর খেলতে ইচ্ছে করলে নিশ্চয়ই খেলুন, সাবধানে -- সতর্ক হয়ে। আনন্দ করুন। বুক ভরা শুভেচ্ছা। একটি কাতর অনুরোধ -- সিঁদুর খেলাকে প্রগতিশীল আন্দোলন বলে প্রচার করবেন না। একটি প্রগাঢ় হিন্দু বৈবাহিক আধিপত্যের চিহ্নকে (হ্যাঁ, তাই, সিঁদুরের এই চরিত্রটির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি) উদযাপন করার মধ্যে খুব প্রগতিশীল কিছু নেই। কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়া সিঁদুরের খুব বেশি প্রয়োগ দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না।

মেনে নিতে কি ক্ষতি যে এই চিহ্নটি অন্তত কোনভাবেই সাম্যময় নয়… কোনভাবেই সেকুলার ত নয়ই, এমনকি মেয়েদের ও কেবলমাত্র সধবাত্ব আর সিংগলহুড দিয়ে ভাগাভাগি করে দিয়ে ডিভাইড অ্যান্ড রুল করার অসভ্য এক ঐতিহ্যমাত্র।


কোনদিন সিঁদুর খেলিনি। কোনদিন সিঁদুর পরিনি। সেটা আমার নিজস্ব ব্যক্তিগত রুচিপছন্দ, যা রাঙিয়ে দিয়েছে আমার শৈশব অভিজ্ঞতা। আমার কদর্য অভিজ্ঞতা। আমার পিতৃহীনতা।

ছোটবেলায় মাকে বিধবা জেনেছি অন্য কিছু বোঝার আগেই। কারণ মা সবার থেকে আলাদা ছিলেন, অন্য মায়েদের চেয়ে কত্তো আলাদা। চিহ্ন। এখানেও চিহ্ন। মা ধবধবে সাদা শাড়ি পরতেন, আজন্মকালের এই দেখা আমার চোখে থেকে গেছে।

পরবর্তীতে বুঝেছি মায়ের কাছে ওই সাদাও ছিল এক ধরণের বর্ম। নিজেকে অন্য পুরুষের থেকে অস্পৃশ্য রাখার , এবং আলাদা রাখার বর্ম। নিজের চারিদিকে স্টিলের বলয় বানাবার জন্য যথেষ্ট ভাল চিহ্ন।

তাছাড়া, মা কোথাও গেলে মাছ মাংস খেতেন না। বৈধব্য বৈধব্য এবং আরো বৈধব্যের চিহ্ন দিয়ে উপুড়ূ হস্ত ছিল আমার ছোটবেলাটা। মা বাড়িতে মাছ মাংস খেতেন কিন্তু সমাজ নামক একটি জুজু ছিল আমাদের ছোটবেলায়। হয়ত আরো বেশি মায়েদের অল্পবয়সে। যাকে শতহস্ত দূর থেকে গড় করবেন বলেই মা এই নাটকটা করতেন। এই ছলনাটা।

সত্যি বলছি এতে কিন্তু আমার বিস্তর অসুবিধা হত। কেন না মা বাড়িতে মাছ মাংস সব রান্না করতেন এবং অনেক বাচ্চার মতই আমি মাছের কাঁটা বাছার ব্যাপারটা পছন্দ করতাম না, মাংস অনেক বেশি আনন্দদায়ক লাগত। কিন্তু , আমার মাছ খেতে ভাল লাগত না, সেটাও আত্মীয়দের চোখে একটা চিহ্ন হয়ে দাঁড়াল। কোন বাচ্চা কেন মাছ খাবে না, সেটা তাঁদের কাছে বেশি বিসদৃশ ছিল, না, অর্থপূর্ণ ছিল এই তথ্যটি, যে এ এক বিধবার কন্যা! ছিঃ, ভাবতেও এখন গা গুলিয়ে ওঠে, আমি নিজ কর্ণে শুনেছি, তখন মাত্র পাঁচ কি ছয়, বিয়ে বাড়িতে মায়ের কোল ঘেঁষে থাকব বলে মায়ের সঙ্গে বসেছি খাবার জায়গায় এবং সেখানে কেবল নিরিমিষ সার্ভ করা হচ্ছে এবং আমাকে টেনে আমিষ অঞ্চলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে এবং সেই সব কাকিমা জ্যেঠিমারা উচ্চস্বরে বলছেন, ওর মা নিজে মাছ খায়না তাই মেয়েদেরও খাওয়ায় না।

আপনাদের কজনের এই অভিজ্ঞতা আছে জানি না, বাঙালি ( অবশ্যই হিন্দুর) যে কোন উৎসব অনুষ্ঠানের খাওয়াদাওয়ার মূল জায়গায় বিধবাদের বসার জায়গা রাখা হত না। আমিষ আর নিরামিষ অঞ্চলের ছোঁয়াছুয়ির ব্যাপার সেই শরত চাটুজ্জে থেকে আশাপূর্না হয়ে এসে ১৯৬৮-৬৯ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আজ পরিস্থিতি কত পাল্টেছে জানা নেই। এবং মেনু তেও ছিল আশ্চর্য বিভেদ। মাছের পদ যদি দুটি কি তিনটি, মাংস দুরকম… নিরিমিষে একটি ঘ্যাঁট ও হয় ছানার ডালনা নয় ধোঁকা … নয়ত ফুলকপি।

সেই আমিষ অবসেশনের পাপেই বোধ হয় আজ বাঙালির জীবন এত নিরিমিষবাদীদের অত্যাচারে আক্রান্ত । রেস্তরাঁ থেকে শপিং মল অজস্র জায়গায় নিরিমিষের ধাক্কায় প্রাণ ওষ্ঠাগত… জাস্ট জোকিং…

আমি সিঁদুর পরেছিলাম বিয়ের দিন। তারপর একদিন ও না। শ্বশুরকুলের মুখ ম্লান করে দেওয়া হাসি দিয়ে , বলেছিলাম পরব না। কারণ একদিন পরলে তার পরেরদিন, তার পরেরদিন, না করার আর সুযোগ থাকত না। পরলে কী হয়, না পরে কী আনন্দ পাও এসব প্রশ্ন তুলতেই দিইনি কারুকে। বিবাহ চিহ্ন ধারণের দায় একা মেয়েদের কেন, এ নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য রেখেছিলাম। বিবাহ সভায় সিঁদুর পরাতে গিয়ে শাশুড়ি জায়ের লাফঝাঁপ লক্ষ করেই ঠোঁট টিপে বাধা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই অবিশ্যি।

আমি, কারুর সিঁদুর খেলার ছবিতে আজো লাইক দিইনা। আমার অ্যালার্জি আছে। বিধবারাও সিঁদুর খেলুন... অমুকেও খেলুন, তমুকেও খেলুন... এসবে বিশ্বাস করিনা। এই বস্তুটিকে এত গুরুত্ব দেওয়াটাই আমার কাছে হাস্যকর।

এই ব্যক্তিগতটি কি খুবই ব্যক্তিগত? নাহ বোধ হয়। আশৈশবের শেখা লেখা পড়ার মধ্যেও ত ছিলই এই ধারণা যে বিবাহ চিহ্ন একটাই চিহ্নই মাত্র। আর কিছু নয়। তাকে গুরুত্ব দিইনি শুধু নয়, এক পেশে এই চিহ্ন ধারণ আমার কাছে অবান্তর… একটি পুরুষকে দেখে যদি না বোঝা যায় সে বিবাহিত কি অবিবাহিত, এক মহিলাকে দেখে কেন বোঝা যেতে হবে?

হয়ত এই দৃষ্টিটি আমার পরম্পরাগত প্রাপ্তিও... আমার আত্মীয়া একজন, অধ্যাপিকা ও স্বাধীনতা সংগ্রামী। তাঁর হাত থেকে পাওয়াও হয়ত বা।

তিনি শান্তিসুধা ঘোষ। প্রথম মহিলা ঈশান স্কলার। গণিত বিষয় নিজে অধিগত করেছিলেন, তাইই, নারীর বিদ্যাচর্চার প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, "গণিতশাস্ত্র অধিগত করবার মত সূক্ষ্ম প্রতিভা তাদের আদৌ নেই, এই জাতীয় একটা অপবাদ নারীজাতি সম্পর্কে ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি, সেটা আমার কোনোদিনই হজম করতে ইচ্ছে হয়নি। আজ আত্মপ্রত্যয় বশে আই এ পরীক্ষায় অঙ্কে ভালো কয়ায় তার একটা হাতেকলমে পাল্টা প্রতিবাদ করার ইচ্ছে মনে জাগলো।"

এরপর তিনি যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাট্রিকুলেশনের নতুন পাঠ্যতালিকায় জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে ছেলেতে-মেয়েতে বিষয়ভিত্তিক পার্থক্য দেখেন, তাঁর মনে হয়, যে মেয়েদের বেলায় উচ্চশিক্ষা সঙ্কোচের গূঢ় অর্থ কেবল এটাই হতে পারে, যে সমান শিক্ষা আর জ্ঞানলাভের অধিকারী হলে নারীর স্বাধীনতা খর্ব করার উপায় আর সমাজের হাতে থাকবে না।

শান্তিসুধারই একটি প্রবন্ধের বিষয়, ‘বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার’। তিনি কেন বিষয়টি বেছে নিলেন? "কেননা, এ কথা সত্য , যে, আমাদের সমাজে বহু বিবাহিত জীবনে অশান্তির কালো ছায়া স্ত্রীর জীবনকে লক্ষ্যে বা অলক্ষ্যে আচ্ছন্ন করিয়া রহিয়াছে এবং ইহার প্রতিকার প্রয়োজন"

তিনি সওয়াল করেছেন, "নারীকে যদি বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার আইনতঃ কাগজপত্রে দেওয়াও যায়, তবুও তাহা কার্যত সফল হইবে না – যদতিন পর্যন্ত নারীকে সম্পত্তি ও উপার্জনক্ষমতায় পুরুষের সমান সুযোগ না দেওয়া যায়।"

এই শান্তিসুধাই, তাঁর উপন্যাসের এক চরিত্রের মুখ দিয়ে বলান, বিয়ে করলেই মেয়েদের মস্তিষ্ক চর্চার পক্ষে অলঙ্ঘ্য বাধা পড়ে। পৃথিবীতে যত কিছু বড় কাজ, তার খুব কমই বিবাহিত মহিলাদের করতে দেখা যায়। "আইনস্টাইন দরজা ভেজিয়ে নিরালা ঘরে নিজের গণিত গবেষণার বিপ্লব তরঙ্গে যখন দিশেহারা হয়ে থাকেন, তাঁর স্ত্রীকে তো তখন লক্ষ্মী বৌটি সেজে গৃহস্থালীর বন্দোবস্তে মন দিতে হয় – স্বামী তাঁর বিজ্ঞানমন্দির থেকে উঠে এসে কী খাবেন। ... আমার খুব বিশ্বাস এর অভাবেই আইনস্টাইন তাঁর প্রথমা গণিতজ্ঞা স্ত্রীকে বরদাস্ত করতে পারলেন না।"

তিনি নিজের প্রবন্ধেও বলেছেন, ‘আমাদের সমাজে নারীর শুধু নারীরূপে কোনো স্থান নাই, সে হয় কুমারী, নয় সধবা, নয় বিধবা।‘ ‘শাঁখা- সিঁদুর- ঘোম্‌টা’ নামের একটি প্রবন্ধে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ স্বীকার করি, এগুলি দেখিতে সুন্দর লাগে... যদি বা তর্কের খাতিরে স্বীকার করিয়া লই, তবে সে সৌন্দর্য্যবৃদ্ধি কুমারীকালে করিলেই বা দোষ কী?কারণ, কুমারীকালে লাল টিপ পরার রীতি আছে...বিবাহ হওয়ামাত্রই এগুলি এক অভিনব রূপ ধারণ করে, অন্যথা করে না, ইহার কোন অর্থ হয়না। বধূবেশে এগুলিকে আমরা যে অনির্বচনীয় শ্রী বলিয়া মনে করি, ইহা আমাদের মনের সংস্কার। ‘...শাঁখা, সিঁদুর, অবগুন্ঠন, ইত্যাদি অশেষ প্রকারের নিদর্শন দ্বারা প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে তাহাকে বিবাহিত জীবন স্মরণ করাইয়া দিবার সূক্ষ্ম কৌশল উদ্ভাবিত হইয়াছে। পতির জীবনের অনুসারেই তাহার সমগ্র জীবন – এই ভাবটি নারীর মনের উপরে দুরপনেয়ভাবে বিস্তার করিতে ইহা বাস্তবিকই একটি অপরূপ মায়াজাল, স্বীকার না করিয়া সাধ্য নাই। ...নারীমনকে স্বতন্ত্র মনুষ্যত্ব বিস্মরণ করাইয়া পতিসর্বস্ব করিয়া রাখিবার জন্যই প্রধানতঃ শাঁখা-সিঁদুরাদি প্রথার প্রবল প্রভাবের প্রবর্তন করা হইয়াছিল।‘

অন্য একটি কারণও তিনি তীক্ষ্ণ ধীশক্তিতে শনাক্ত করেছেন।

“অবিবাহিতকালে যে কোনও পুরুষ তাহার প্রতি লোভ করিতে অধিকারী...বিবাহ হইলেই সে গুড়ে বালি পড়ে, আর তাহার কেশাগ্র স্পর্শ করিবার অধিকার নাই, কারণ সে এখন অপরের সম্পত্তি। ...। কাজেই কে কুমারী এবং কে সধবা, ইহার অতি পরিস্ফুট পরিচয় নারীর সর্বাঙ্গে না থাকিলে পুরুষের পক্ষে অসুবিধায় পড়িবার সম্ভাবনা – অর্থাৎ লোলুপ হইবার অধিকার আছে কিনা তাহা সে বুঝিয়া উঠিতে পারে না। সুতরাং শাঁখা সিঁদুর প্রভৃতি ট্রেডমার্কের প্রয়োজন একান্তই হইল।“
১৯৩৮ অর্থাৎ আশির বেশি বছর আগের এই লেখা...ভাবতে স্তম্ভিত লাগে না কি?


পাঁচতারা হোটেলের লবি ও সিঁদুর
জয়া চৌধুরী


সিঁদুর নিয়ে লিখতে বসে আমার কেবল খুন ভরি মাঙ্গ সিনেমাটার কথা মনে পড়ছে। ওই যে রেখা রাকেশ রোশনের জম্পেশ ছবিটা। সিঁদুর বলতে খুন ভাবব আমি তেমন মারকুটে নই রে বাবা। আসলে সিনেমাটায় দেখেছিলাম কিনা সিঁথির সিঁদুরের মত “পবিত্র” ব্যাপার স্যাপারের মধ্যে প্রতারণা খুন প্রতিশোধ ইত্যাদি আগড়ুম বাগড়ুম চমৎকার পাঞ্চ করে দিয়েছিলেন পরিচালক মশাই। আর বাংলায় অঞ্জন চৌধুরী স্বপন সাহারা ব্যাপারটাকে একটা এপিকের পর্যায়ে নিয়ে গেছিলেন। আর পরে আধুনিক মোড়কে একতা কাপুর ঘর ঘর কী কাহানী গুলোয় উহার আম্রিকীকরণ করেছেন। সেই সিঁদুর স্পর্শ করছি কলমে ভাবতেই কেমন গায়ে কাঁটা লাগা... মশয়। যাগগে। উইকি ঘেঁটে দেখছি সিঁদুর খেলা হল- Sindur Khela symbolizes the power of womanhood in protecting her husband and children from all evil ... মানে অঞ্জন বাবু বা স্বপন সাহাদের ব্যাখ্যাটিই তেনাদের গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। কিন্তু প্রাচীন গল্প কাহিনীতে মানে রামায়ণ মহাভারতের মত সাহিত্য বাদ দিন বাস্তবে মৌর্য গুপ্ত নন্দ ইত্যাদি ঐতিহাসিক কাহিনীগুলোতেও রাজারাজড়ার বাড়ির মেয়েরা বিবাহিত হলে সিঁদুর পরত কি না তার কোন সূত্র কিন্তু পাই নি। সিরিয়ালের মেক আপে তো পোশাক আশাক বেশ বক্ষবন্ধনী কাঁচুলিতে ডিটেইলিং দেখলেও সিঁদুর পরা কুন্তী কিংবা মন্দোদরীকে দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।

সিঁদুর পরা বা পরানো প্রথাটি কত প্রাচীন তা নিয়ে প্রচুর মতভেদ এবং এ বিষয়ে সকলেই নিজেকে “আসল দুলাল চন্দ্র ভড়ের তালমিছরি” বলে দাবী করাতে আমার মত অজ্ঞ মানুষ সন তারিখ নির্ধারণ করার সাহস পেলাম না। কিন্তু সিঁদুর দান বিষয়টা বরাবরই বস্তুর ওপর চিহ্নিতকরণ হিসাবেই ব্যবহৃত হয় বলে দেখেছি। গড়ের মাঠে যে ভেড়া চরাতে আসে লোকজন তাঁদের দেখেছেন খেয়াল করে? ভেড়াদের গায়ে রঙ দেওয়া থাকে। অনেকটা কোন পশুচারকের ভেড়া সেগুলি সেটির নির্ণায়ক হিসাবে। মানে চরতে চরতে অন্য কোন পালের ভেড়ার সঙ্গে গুলিয়ে যাতে না যায় তাই এই ব্যবস্থা। শুনেছি নারীও আদিম যুগে যখন শারীরিক বলে পুরুষের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারে নি এবং একজন পুরুষের সঙ্গে থেকে তাঁর সন্তানের জন্ম দেওয়া সহ বাকী সব সেবা করে তার “পরিবার” হিসাবে অন্তর্ভুক্ত জীবন কাটানো শুরু করল তখন থেকেই তাকে “দাগানো” শুরু হল। আগে নাকি পাথর দিয়ে মাথায় রক্ত বের করে শুরু হয়েছিল পরবর্তীতে সেটাই বদলে “সিঁদুর” রূপে আবির্ভূত হয়।

কিন্তু এ সবই শোনা কথা বাস্তবে কেউ বলে সিঁদুর পরানো- দুর্গা পূজার সমবয়সী রিচুয়াল। অর্থাৎ ২০০ বছরের আশপাশে এর ঐতিহ্য। তখন জমিদার বাড়িগুলিতে পূজা হত, দশমীর দিন প্রতিমাকে সিঁদুর পরিয়ে বরণ করে নেওয়া হত এবং তখনই বাড়ির সধবা মহিলারা একে অন্যকে সিঁদুর পরিয়ে দিত। একেই সিঁদুর খেলা বলা হয়। আবার কোনো মতে প্রথাটি বঙ্গদেশে হওয়া দুর্গা পূজার সমবয়সী মানে প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন এবং তখন থেকেই এটিরও উৎপত্তি। আবার কেউ কেউ ৫০০ বছরের বেশি বলে দাবী করেন। কিন্তু ২/৪/৫০০ বছরের বেশি হলেই বিষয়টিকে “আবহমানের” তকমা দেওয়া হয়ত ঠিক হবে না। যাক সেকথা।

সিঁদুরের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক বরাবরই ছিল। তন্ত্র সাধনা যারা করেন সেখানে বলি রক্ত সিঁদুর ইত্যাদি অত্যন্ত সাধারণ বিষয় বলেই দেখা যায়। বিবাহিত বা অবিবাহিত- এই ধারণা সেক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তন্ত্রসাধনা যারা করেন নারী পুরুষ নির্বিশেষে তাদের দেখা যায় কপালে সিঁদুরের ত্রিপুন্ডক কাটতে। সিঁদুর একটি অতি পবিত্র বিষয় তাঁদের কাছে। যে কোন শক্তিপীঠে গেলেই দেখা যায় সিঁদুরের গুরুত্ব। একবার আমি এক ধর্মীয় সঙ্ঘে একটি নাট্যাভিনয় করতে যাই। রেডিও নাটকের অবিসংবাদিত জগন্নাথ বসু সহ দলবল যখন আমরা গেলাম যথাসময়ে আমাদের সেই সঙ্ঘের “গুরু মা” এর ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। প্রণাম করার পরে তিনি সবার কপালে একটি সিঁদুরের ফোঁটা এঁকে দিলেন। অর্থাৎ দলটিতে নারী পুরুষ সকলেই সিঁদুরের আশীর্বাদ অর্জন করল। কে বিবাহিত কে নয় সেটা কোন বিষয়ই ছিল না এক্ষেত্রে। অনেক ছোটবেলায় দেখেছি পাড়ার এক বউয়ের ভর হত। সে এক্কেবারে আলুলায়িত কেশ ও বিশ্রস্ত বসন হয়ে যে সব ভয়াল কাজকম্মো করত তা দেখে খুব ছোটবেলাতেই বুকের মধ্যে আতংক দাগ কেটে বসে গেছে। সেই থেকে আমি “ভর” টর ব্যপার গুলো থেকে সাত হাত দূরে থাকি। তো সেখানেও মনে পড়ে বউটির মাথা ভর্তি গোবর লেপার মত সিঁদুরের স্তূপ আর পাড়া বেপাড়া ঝেঁটিয়ে এসে তাকে ঢিপ ঢিপ করে প্রণাম করছে, সিঁদুরের কৌটো আর সাধ্যমত টাকা প্রণামী নিবেদন করছে আর কিছুক্ষণ পরে পরে সে বাড়ির একজন ষণ্ডা মত পুরুষ সেই সিঁদুর মাথায় ছুঁইয়ে কৌটো পবিত্র করে ফেরত দিচ্ছে। অতএব সিঁদুর জিনিসটা আগমার্কা ধর্মীয় বিষয়ই ছিল। এ প্রসঙ্গে বউটির বাড়ির লোক কেমন ক্যাশ পিটেছিল সে ক’বছর সেসব নিন্দামূলক আলোচনায় যাব না।

কিন্তু সিঁদুর পরা আর সিঁদুর খেলা দুটোর মধ্যে যথেষ্ট ফারাক। প্রথমটি ব্যক্তির বিষয় ও পরেরটি সামাজিক। আর যেখানেই ব্যক্তি ছাপিয়ে ‘সমাজ’ চলে আসে বিষয় হতে থাকে জটিল। আমরা সবাই জানি এই বিপদসংকুল ভবে ব্যক্তি মানুষকে ‘সমাজ’ যেমন অনেক ক্ষেত্রে রক্ষা করে এসেছে অনাদিকাল ধরে, ঠিক তেমনই আধিপত্য বজায় রাখতে মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতার সীমা লঙ্ঘন করাও তার প্রাচীন বদ অভ্যাস। তাই যা শুরুতে ছিল ধর্মীয় রীতি কালধর্মে সেটাই আবার ‘স্বামী’-র কল্যাণ ইত্যাদির সঙ্গে জুড়ে গেল। ওই যে শুরুতেই বললাম ব্যক্তি মালিকানার প্রবণতার দাগানোর অভ্যাস। দেখুন সব প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে চেঁচানো আমার না পসন্দ বাস্তব কারণে। অনাদিকাল ধরে যা যা প্রথা চালু সমাজ মাতৃতান্ত্রিক থেকে পিতৃতান্ত্রিক হয়ে ফের মাতৃ তে ব্যাক করা উচিৎ কি না এসব দৃষ্টি কোণ আমার নয়। কেননা অনেকটা পথ এগিয়ে গেলে আবার শুরু থেকে শুরু করা বর্তমান কে অস্বীকার করার মতই বোকামি। কিছু বদলাতে হলে ছোট ছোট বদল আনা দরকার। অনেকগুলো ছোট জড় করে একটি বৃহৎ বদল করা সহজে সম্ভব। নাহলে গোটা জিনিষটাই ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যায়। হ্যাঁ সিঁদুর পরা ব্যাপারটা যতক্ষণ পরিবারে মা দিদিমা ঠাকুমার কপালে পরা এবং বাবা মায়ের মধুর দাম্পত্যের খুনসুটির স্মৃতির সঙ্গে জুড়ে ততক্ষণ মধুর। কিন্তু সেই সিঁদুরের সঙ্গে দুর্গাদশমীকে জুড়ে যখন থেকে “ সিঁদুর খেলা” নামক প্রথা চালু হল, তখন ব্যাপারটা ঘন্ট পাকিয়ে গেল। আর ব্যক্তি রুচির মধ্যে আটকে রইল না। এইবার মঞ্চে “সমাজ” –এর প্রবেশ ঘটল। সিঁদুর কে ঘিরে স্পষ্টতই ক্ষমতার আস্ফালন শুরু হল। যারা বিবাহিতা তারা সিঁদুর খেলবে এবং যারা খেলতে পারবে না তারা কিছুটা হলেও নিচের ধাপে রইল। যারা “স্বামী সৌভাগ্যবতী” তারা তখন “জাতে” উঠে যায় ও ক্ষমতা ও সম্মমান দুইয়েরই দাবীদার হয়ে যায়। এবং যাদের স্বামী নেই তারা ততটা সম্মানের যোগ্য বলে বিবেচিত হয় না। ব্যাপারটা অনেকটাই সামাজিক একঘরে করে দেওয়ার মত প্রভাব ফেলে দেয়। সেই একাকীত্ব কজন সইতে পারে? আর ক্ষমতার সুযোগ শিক্ষিত অশিক্ষিত সকলেই নিতে চায় একথা প্রমাণিত। না হলে উচ্চশিক্ষিত পরিবারের মেয়েদেরও আজও সিঁদুর না পরা নিয়ে পরিবারের নানা কটাক্ষ শুনতে হত না। ব্যক্তি অভিজ্ঞতায় কত দেখেছি যে মহিলাটি সিঁদুর খেলেছে সদর্পে বছরের পর বছর- হ্যাঁ সদর্পেই। ওই যে বললাম সিঁদুর ক্ষমতার চিহ্ন হয়ে যাওয়াতে ক্ষমতার দর্প ঢুকে গেল। একসময়ে সেইই আবার বিধবা হয়ে যাওয়াতে পাড়ায় তার প্রতিপত্তি ফুস করে নিভে গেছে। তখন তার মুখে নানান ধরনের দার্শনিক কথা সিঁদুর পরা না পরার যাথার্থ্য নিয়ে আলোচনায় আগ্রহ দেখেছি। যতদিন সে ‘সমাজের’ হেঁ হেঁ পেয়েছে, ততদিন তার মনে পড়ে নি সিঁদুর একেবারেই ব্যক্তিগত একটা অভ্যাস, এর সঙ্গে অহংকারের কোন কারণের যোগসূত্র থাকতে পারে না।

এখন এরই বিপ্রতীপে নতুন ধুয়ো শুরু হয়েছে। ১/ শুধু সধবারা খেলবে কেন? সব মেয়েরাই খেলবে, ২/ সিঁদুর একা মেয়েদের নয় অতএব পুরুষও খেলবে। আপাত দৃষ্টিতে দুটো সমাধানই জব্বর মনে হয়। কিন্তু এর ভেতরটা তলিয়ে ভাবা দরকার। শুরুতে সিঁদুর ধর্মীয় প্রথাই ছিল। এবং নারী পুরুষ সকলেই পরত। পরে সংকুচিত হয়ে যায় । তখন স্রেফ বিবাহিতা মেয়েদের সম্পত্তি হয়ে যায় ব্যাপারটা। এখন আমাদের ভাবা উচিৎ আমরা কী চাই? ধর্মে “পাঁঠাবলির সময় খাঁড়ায় সিঁদুরের ফোঁটা দেওয়া হয়”- অতএব সিঁদুর পরা মেয়েদের পক্ষে অসম্মানের। এমন কথা যারা ভাবে তাদের সিঁদুর খেলার ব্যাপারেও উদাসীন হওয়া উচিৎ। কিন্তু আমি দেখেছি সারা বছর সিঁদুর পরে না অথচ দশমীতে একগাদা সিঁদুর মেখে স্বামীসৌভাগ্যবতী হবার ক্ষমতার সুখ উপভোগ করতে। এটাই দ্বিচারণা। যারা ধব- যুক্ত নয় তারা কেন হ্যাংলার মত ভিক্ষা করে সিঁদুর খেলার বিষয়ে ঢুকতে চায় সেটা আমার কাছে বোধগম্য নয়। যা সহজ সাবলীলভাবে এল না তাকে চেয়ে নিলে কি আমার সম্মান থাকে? ধর্মীয় কারণেই যদি মাকে বরণ করি সিঁদুর পরিয়ে আর নিজেই নিজের কপালে সিঁদুর আঁকি- সে বরং অনেক সম্মানীয়। তখন “সমাজে”র নিন্দায় পাত্তা দিলে চলবে কেন? আমি কিছু বদলাতে চাইব আর ভাবব বাকীরা হেসে হেসে বদল ঘটিয়ে দেবে- জগতে তাও কি হয়? বদল চাইলে নিজেকেই সাহস করে গন্ডী ভাঙতে হয়। অধিকার কেউ কাউকে ছেড়ে দেয় না দেয় নি দেবেও না।

আবার যারা প্রচলিত প্রথা গুলি মানে বিবাহিতা মহিলা সিঁদুর পরে, সিঁদুর খেলে ... ইত্যাদি ব্যাপার পাল্টাতে চায় তারা পুরুষদেরও টেনে নেয় এর মধ্যে। যার ফলে এখন দু গালে খামচা খামচা আবিরের মত সিঁদুর মেখে পুরুষদের ছবি দেখি। গোটা ধারণাটাই আজকালকার সংজ্ঞায় “মেট্রোসেক্সুয়াল” হয়ে গেছে। পুরুষ ও নারী সকলে সমান সমাজে এটা যেমন সত্যি, ঠিক তেমনই তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য-র জন্যই তারা আকর্ষণীয় সেটাও বজায় রাখা দরকার। সব কিছুর সাধারণীকরণ মাথা গুলিয়ে দেয়। সমাজটাকে দুনিয়ার সব পাঁচতারা হোটেলের লবির মত একরকম দেখতে লাগে। আমার মনে হয় দ্বিতীয় অপশানটা এক্ষুনি বর্জন করা দরকার। সবাই সমান- কথাটার অর্থ সবার সম্মান, গুরুত্ব, বেড়ে ওঠার সুযোগ সব কিছু সমান। কিন্তু তাদের প্রত্যেকের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য সমাজটাকেই আরও সুন্দর আকর্ষণীয় করে তুলবে। এখন চারপাশে যেভাবে ৭ মাস থেকে ৭০ বছরের বৃদ্ধা ধর্ষিত হয়, কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা চলে, সফল নারী মানেই সে শয্যায় কম্প্রোমাইজ করে সাফল্য পেয়েছে ইত্যাদি নোংরা অপবাদ দেওয়া, “মিটু” আন্দোলনের নগ্ন ছবিগুলো ভেসে আসতে থাকে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি, রাতে বারে মেয়েটা একা যাবে কেন, গেলে তো ধর্ষিতা হতেই পারে ইত্যাদি ইত্যাদি বচন ও কাজ চলে... সেগুলো বরং কঠোর ভাবে বন্ধ করা দরকার।

সিঁদুর খেলা একলা মেয়েরা খেলবে কেন, ছেলেরাও নয় কেন – এই প্রশ্নগুলো সেই পরিপ্রেক্ষিতে স্রেফ ভাঁড়ামিই থেকে যায়। সমাজ বদলের লক্ষ্যে সিরিয়াস বিষয় ভাবা দরকার এখনই।


উৎসব ও প্রথাঃ কিছু চর্বিতচর্বণ
রৌহিন ব্যানার্জ্জি


প্রায় বছর চারেক আগে গুরুর ফেসবুক পেজে একটা পোস্ট করেছিলাম সিঁদুরখেলা নিয়ে। খুব বড় পোস্ট কিছু নয়, ফেসবুক স্ট্যাটাস টাইপেরই, বক্তব্য ছিল চারিদিকে এত এত সিঁদুরখেলার পোস্টে আমায় ট্যাগিত না করলেই ভাল হয় ইত্যাদি। যত সহজে বললাম, বলার ভাষা অবশ্যই তত অনাড়ম্বর এবং বিনয়ী ছিল না, কারণ বয়সটা চার বছর কম ছিল। হয়তো আরো কিছু কারণ ছিল। এই পোস্টটার কথা মনে আছে এই কারণে যে এটাতে বিতর্কের ঝড় উঠেছিল, হাজারের ওপর কমেন্ট হওয়ায় শেষে ফেবু কমেন্টিং বন্ধ করে দিয়েছিল (এই ফিচারটা এখনো আছে কি না জানিনা কারণ তারপরে আর আমার কোন পোস্টে কখনো হাজারের ধারে কাছেও কমেন্ট হয়নি)। এবং সেই প্রবল বিতর্কের সময়ে দেখেছিলাম তথাকথিত প্রগতিশীল মানুষের একটা বড় অংশ সিঁদুরখেলাকে বিভিন্নভাবে ডিফেন্ড করেছিলেন। এরপরে আমি নিজে না করলেও ফেবুগুরুতে, ক্যালকমে বা বিভিন্ন ব্যক্তির দেওয়ালে সিঁদুরখেলা নিয়ে বিভিন্ন পোস্ট দেখেছি এবং সেখানে একটা বড় অংশ এটাকে নির্মল খেলা হিসাবেই মনে করেন এবং সমর্থন করেন। এবং শুধু সিঁদুর খেলা না, এ ধরণের বেশ কিছু প্রথা বা প্র্যাকটিসকে তারা (এখানে সবটা একই সেট এমন নয়) সমর্থন করে থাকেন। যেমন কালিপুজোয় বাজী ফাটানো, গণেশ পুজোয় প্রসাদ খাওয়া, হনুমান চালিশা পড়া, যেখানে জনগণমন শুনবে সেখানেই দাঁড়িয়ে যাওয়া, “রকশা বন্ধন” করে বোনকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং পাওয়া – এ সবই বেশ বহুল সমর্থিত। আরও অনেক এরকম আছে, কয়েকটা উদাহরণ দিলাম মাত্র। একই লোক যে সবগুলোকে সমর্থন করেন এমনটা নয় (অনেকে তাও করেন বই কি), কিন্তু এই সব প্রথারই বেশ জোরালো সমর্থন আছে মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক শ্রেণীর মধ্যে। এই শ্রেণীটাকে বিশেষীকরণের উদ্দেশ্য এই যে ফেসবুকে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় তর্কাতর্কিতে যারা অংশ নেন তারা মূলতঃ এই শ্রেনীভুক্তই, ফলে এখান থেকে যে ডেটা ডিরাইভ করা হবে তা এই শ্রেণীর ভিত্তিতেই আলোচিত হবে।

এখন কথা হল এই তথাকথিত প্রগতিশীল শ্রেণী, যারা আধুনিক শিক্ষায় ডিগ্রি এবং সেই সূত্রে “আলোক”প্রাপ্ত, যারা ধর্ষণ এবং শিশুশ্রমের বিরোধিতা করেন, গরীব মানুষের জন্য কিছু করা দরকার বলে মনে করেন, শিবু নন্দিতার ছবি দেখে যাদের মনের ভিতর রিয়ালাইজেশনের বোধ ফুটে ওঠে, অথবা যারা বামপন্থী রাজনীতি করেন, অথবা যারা আরো বেশি আধুনিক হয়ে বামপন্থাকে গালাগালি দেন, তারা এই ধরণের প্রথাগুলিকে সমর্থন করেন কেন? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে যে কারণগুলি আমার মনে হয়েছে (এগুলি সব যে খুব তথ্যসমর্থিত বা অথেন্টিক এমন দাবি করছি না) – প্রথমতঃ এরা মনে করেন, শত দুঃখ সত্ত্বেও আমাদের জীবনে উৎসবের প্রয়োজন রয়েছে, বিভিন্ন রিচুয়ালের মাধ্যমে সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করার প্রয়োজন রয়েছে। ফলে যে রিচুয়ালগুলি অন্ততঃ সরাসরি ক্ষতিকারক নয় (যেমন সিঁদুরখেলা বা রকশাবন্ধন) তাদের মাধ্যমে উৎসব পালন করা উচিৎ। দ্বিতীয়তঃ যেহেতু এতে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বাড়ানো যায় এবং কার পিছনে পৌরাণিক কারণ কী আছে, কবে কী হত সেইসব ভেবে এখন বসে থাকাটা বোকামি, এখন সেরকম কিছু হচ্ছে কি না সেটাই বিবেচ্য। তৃতীয়তঃ একদল মনে করেন আপাতদৃষ্টিতে কোন রিচুয়াল খারাপ মনে হলেও তার আসল কারণ হল আমরা তার অন্তর্লীন শুভচিন্তাটা অনুধাবন করতে পারিনা, “আ ম্যাজিক ডীপার দ্যান দ্য ডীপেস্ট” যাকে বলে সেটা ধরতে পারিনা তাই খারাপ মনে হয়। অনেকটা অঘোরীদের মত। সুতরাং সবটা না জেনে একটা প্রথাকে অমান্য করা আসলে হঠকারিতা। চতুর্থতঃ আরো এক দল, যাদের একটা বড় অংশ তৃতীয় দলেরও সদস্য, মনে করেন যে এতদিন ধরে এত লোক যে প্রথা মেনে আসছে, তার পিছনে কিছু কারণ তো নিশ্চইয়ই আছে – অতএব এটা খারাপ হতেই পারেনা। আমার চোখের সামনে যা দেখছি তা যতই খারাপ মনে হোক আসলে এর মধ্যে কোন মঙ্গলদায়ক ব্যপার লুকিয়ে রয়েছেই রয়েছে। আজ হঠাৎ করে সব মানিনা বলে দিলেই হয় না। মহাজনপথই শ্রেষ্ঠ পথ, সে পথে যতই খন্দ থাক না কেন।

প্রশ্ন হল আমি এই সব রিচুয়ালকে সমর্থন করি না কি বিরোধিতা? কলমেই হোক বা বন্দুকে, শেষ পর্যন্ত লড়াই যদি বাঁধেই, আমি তবে কোন দিকে? নাকি শ্রীনিরপেক্ষ - ডুডুও খাই টামুকও খাই? আরও গভীর জরুরি প্রশ্ন হল আমার এই মহামূল্যবান মত জেনে আপনারা করবেনটা কি? দিল্লী চলো বলে আমার ঘোড়ার পিছনে লাইন লাগাবেন? তা যদি না লাগান, তাহলে বড়জোর একটু আলোচনা করবেন, পক্ষে বিপক্ষে আপনাদের মূল্যবানতর মতামত জানাবেন। অতএব বুঝতেই পারছেন, নেহাৎ আপনাদের কথা ভেবেই, আপনাদের মূল্যবান মতামতকে যথোপযুক্ত স্পেস দেবার অভিপ্রায়েই আমার এই মূল্যবান মতামত। তো প্রথমেই জানাই, নিরপেক্ষ হতে মন চায় বটে, কিন্তু প্রকৃত নিরপেক্ষ হবার জন্য যে অপরিসীম ঢ্যামনামোর প্রয়োজন হয় তা এখনো আয়ত্ত্ব করে উঠতে পারিনি বলে আমাকে পক্ষ নিতেই হয়। অতএব বাকি রইল প্রথম দুই অপশন – পক্ষে না কি বিপক্ষে। বা যারা আরেকটু জানেন, তারা বলবেন, চার বছর আগে তো বিপক্ষেই ছিলেন, এখন পালটি খেয়েছেন কি না সেটা বলুন।

ঠিকই, চার বছর আগে আমি বিপক্ষেই ছিলাম। এবং একথাও ঠিক যে এখনও তেমন কোন আমূল পালটি খাইনি যে এখন আমাকে পক্ষে বলা চলে। তবে একটা তফাৎ অবশ্যই হয়েছে – চার বছর বয়স বেড়ে গেছে, সেই সূত্রে কিছু অভিজ্ঞতাও। দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন না এলেও অ্যাপ্রোচ পাল্টেছে। যেমন ধরুন, সিঁদুরখেলার চিত্র প্রদর্শনীতে ট্যাগিত না হবার ইচ্ছা আজও আছে কিন্তু সেই কর্কশভাবে বারণ করার ইচ্ছাটা আর নেই। বাজি পটকা ফাটাবার আজও বিরোধিতা করি, কিন্তু যে যেখানে ফাটাচ্ছে আমাদেরই ফাটা বলে আর ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়িনা – সোজা কথায় সংশোধনবাদী হবার বিভিন্ন লক্ষণ আমার মধ্যে আমি দেখতে পাচ্ছি। তবে কিনা আত্মস্মালোচনা, ঐতিহাসিক ভুল ইত্যাদি প্রভৃতি এই লেখার বিষয়বস্তু নহে – তাই ভ্যান্তাড়া ছেড়ে কাজের কথায় ফিরে আসি। না, সিঁদুর খেলা, রাখীবন্ধন (রকষা বন্ধনটাই ব্যবহার করব এক্ষেত্রে কারণ ওটাই টার্গেট), বাজি পটকা বা কুমারী পুজো বা উপরিউল্লিখিত এবং অনুল্লেখিত এই ধরণের তথাকথিত “হার্মলেস” প্রথাগুলির সমর্থন তখনও করতাম না, এখনো করিনা। কিন্তু যারা সমর্থন করেন তাদের এক কথায় আর এস এস বলে উড়িয়ে দেবার ধৃষ্টতা এখন আর নেই। কারণ এটুকু শিখেছি যে বহু মানুষ আকেশ হইলেও সকলেই তাহা এমন ধরিয়া লওয়াও এক প্রকারের আকেশতা। অতএব ওপরের চারটি কারণ, যা আমার মনে হয়েছে সমর্থনের কারণ হিসাবে পেশ হয় তা ধরে আলোচনার চেষ্টা করব। এর বাইরেও কোন সমর্থনের কারণ থাকতে পারে নিশ্চই যা আপাততঃ আমার নজর এড়িয়ে গেছে – সেগুলি সামনে এলে সে নিয়েও আলোচনা, ভাবনা-চিন্তা হতেই পারে। এবং এই আলোচনায় ঢোকার আগে একটা ডিসক্লেইমার অবশ্যম্ভাবী – দয়া করে কেউ ভাববেন না যে এই সব আলোচনার মাধ্যমে আমরা কোন সমাজ বিপ্লবে অংশ নিচ্ছি। পক্ষে বিপক্ষে সবাই মিলেও আমরা অংশগ্রহণকারীরা প্রকৃতপক্ষে সংখ্যায় নগণ্য এবং সেই অর্থে কাউকেই রিপ্রেজেন্ট করি না। আমার এতটা লেখার সময় আছে, আপনার পড়ার, অতএব একটু বুদ্ধির কুস্তি করে আত্মপ্রসাদ লাভ – এটুকুই এই রচনার আয়ত্ত্বসীমা।

উত্তর দেওয়া শুরু করি পিছন দিক থেকে – মানে সহজতর থেকে কঠিনতরতে গমন করব আর কি। “এতদিন ধরে এত লোক যে প্রথা মেনে আসছে, তার পিছনে কিছু কারণ তো নিশ্চইয়ই আছে – অতএব এটা খারাপ হতেই পারেনা। আমার চোখের সামনে যা দেখছি তা যতই খারাপ মনে হোক আসলে এর মধ্যে কোন মঙ্গলদায়ক ব্যপার লুকিয়ে রয়েছেই রয়েছে। আজ হঠাৎ করে সব মানিনা বলে দিলেই হয় না। মহাজনপথই শ্রেষ্ঠ পথ, সে পথে যতই খন্দ থাক না কেন” – এ যুক্তি অতি প্রাচীন, যাকে বলে টাইম টেস্টেড, বাট নানদেলেস ছেঁদো। এই একই যুক্তিতে কোন সমাজ সংস্কারই অপ্রয়োজনীয়, বিজ্ঞানের প্রধান আবিষ্কারগুলি বর্জনীয়, কারণ অন্যথা “বহু মানুষ বহুদিন ধরে মেনে আসছেন”। মেনে আসছেন বলেই তাকে প্রশ্ন করব না, প্রশ্নের উত্তর না মিললে মনে করব আসলে আমরা বুঝতে পারছি না, এ অ্যাপ্রোচ আমায় সুখে রাখতে পারে, স্বস্তিতে নয়। এই অ্যাপ্রোচ থাকলে আমরা আজও আফ্রিকার জঙ্গলে দল বেঁধে মোষ মারতাম। বিশ্বাসেই বস্তু মিলিয়ে দিলে তর্কে বহুদূর যাবার সম্ভাবনা মাঠে মারা যায়।

তৃতীয় যুক্তি, “আপাতদৃষ্টিতে কোন রিচুয়াল খারাপ মনে হলেও তার আসল কারণ হল আমরা তার অন্তর্লীন শুভচিন্তাটা অনুধাবন করতে পারিনা, “আ ম্যাজিক ডীপার দ্যান দ্য ডীপেস্ট” যাকে বলে সেটা ধরতে পারিনা তাই খারাপ মনে হয়” – এটাও আসলে ওই চতুর্থ আর্গুমেন্টেরই একটু সফিসটিকেটেড ভার্সান – আমরা “অন্তর্লীন শুভচিন্তা”টা ধরতে না পারলেও তা আসলে আছেই এটা বিশ্বাস করতে হবে, তবেই “প্রকৃত সত্য”র সন্ধান পাওয়া যাবে। এই “প্রকৃত সত্য” এক বিষম বস্তু, ইহা কী ও কিরূপ, তা আমি আপনি শ্যাম থাপা হিটলার মেরিলিন মনরো প্রভুপাদ কেউ জানে না – কারণ আমার সত্য আমার কাছে সত্য, আপনার সত্য আপনার কাছে। চরম সত্য বলে কিছু হয় বলে আমাদের ধারণা, যার কোন প্রমাণ এখনো কেউ দিতে পারেননি – কারণ সেই প্রমাণটাই সেলফ ডিফিটিং হয়ে যাবে। ডীপার দ্যান দ্য ডীপেস্ট – যেমন শোনাচ্ছে ঠিক তেমনই – সোনার পাথরবাটি। কাজেই এ নিয়েও যেহেতু তর্কই চলেনা, চালালাম না।

দ্বিতীয় এবং প্রথম যুক্তিদুটি আবার আগের দুটির থেকে আলাদা, কিন্তু এরা দুজনে মূলতঃ একই যুক্তিমালার দুটি ফুল – তাই এদের উত্তর একসাথেই দেবার প্রয়াস করা যায়, এবং এইটা অপেক্ষাকৃত কঠিন প্রশ্ন। কারণ এর মূল দুটি হাইপোথিসিস, “শত দুঃখের পরেও আমাদের জীবনে উৎসবের প্রয়োজন আছে” এবং “আগে কী হয়েছে সেটার চেয়ে এখন কী হচ্ছে সেটা বেশি জরুরি” – আমি নিজেও অস্বীকার করতে পারিনা। উৎসবের প্রয়োজন এবং অধিকার সকলেরই আছে বই কি। আর সেক্ষেত্রে “আগে কী হয়েছে” ভেবে বসে থাকলে মোটেই চলে না। যুক্তি অকাট্য, কিন্তু “এখন না হলেই হল” – এখান থেকে এই প্রশ্নে আমার অনুপপত্তির শুরু – লোহার বাসরে প্রথম ছিদ্র। বহু প্রথা, যেগুলিকে বর্জনীয় বলছি, সেগুলো এখনো, হ্যাঁ এখনো এই একবিংশ শতকের দ্বিতীয় শতকে এসেও সূক্ষ্ম বা অনেক সময় স্থূলভাবেই সেইসব সামাজিক অন্যায়গুলোই চালিয়ে যাচ্ছে এবং কোন না কোনভাবে তাকে মান্যতা দিচ্ছে, এই জায়গা থেকেই বিরোধিতার শুরু। উদাহরণ হিসাবে সিঁদুর খেলার কথাই বলা যাক – সিঁদুর খেলা আজকের দিনে, আমরা যতটা নির্দোষ এবং সার্বজনীন ভাবি সত্যিই কি ততটাই? যদি তাই হয় তবে আজও কেন বিধবারা এই খেলার অধিকারী নন? কেন সিঁদুরের রঙ টকটকে লাল – রক্তচিহ্ন, আজও? লাল রঙেরই উল্লেখ করলাম, কারণ সিঁদুর খেলা কিন্তু সেই অর্থে খুব একটা সর্বভারতীয় প্রথাও কিছু নয় – এটা মূলতঃ বাঙালীদের দুর্গাপূজা সংক্রান্ত প্রথা। ভারতের বহু জায়গায় আদৌ সিঁদুরের প্রচলনই নেই। এবং এই লাল রঙ মূলতঃ রক্তেরই – তার উৎপত্তি সম্বন্ধে যদিও বহুবিধ ব্যখ্যা পাওয়া যায়। তবে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ব্যখ্যাটি হল এই লাল আসলে রজরক্তের লাল – নারীর “উর্বরতা”কে মহিমান্বিত করার লাল। যদিও আয়রনিটি হল, রজঃস্বলা মেয়েদেরও সিঁদুর খেলার অধিকার নেই। আপাতদৃষ্টিতে এটা ধাঁধা মনে হলেও, সামগ্রিক প্রেক্ষিতে দেখলে অনুমান করা কঠিন হয় না যে রজঃস্বলা অবস্থায় যেহেতু যৌনতা অনেক পুরুষের কাছেই কাম্য নয় তাই তাদের সিঁদুর খেলা বা অন্য যে কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্রাত্য রাখা হয়। সেই একই কারণে কুমারী মেয়েরা কিন্তু এই খেলায় দিব্যি অংশগ্রহণ করোতে পারে – কারণ তারা দিব্যি “ভোগ্যা”। সিঁদুর আজও, সেই তার উৎপত্তিকাল থেকেই যেমন (সিঁদুরের উৎপত্তি একজ্যাকটলি কবে, কোথায় সে অন্য এবং বিরাট প্রসঙ্গ, সব যে জানি এমনও নয়, তা এই লেখার স্কোপের মধ্যে রাখছি না), আজও তেমনি, মূলতঃ অধিকারের চিহ্ন, নারীকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসাবে দাগিয়ে দেবার একটি মাধ্যম। প্রতিটি সিঁদুরের দাগ তাই নারীত্বের অপমানই, প্রতি মুহুর্তে। আমরা সিঁদুর খেলা মেনে নেব, কুমারী পুজো মেনে নেব, রকষাবন্ধন মেনে নেব, তাহলে শবরীমালা আর কী দোষ করল? দিনের শেষে সেটাও তো প্রথাই। আর বাকি থাকল উৎসব পালনের অধিকার – এক্ষেত্রে একটাই কথা বলার আছে – হ্যাঁ উৎসব পালন জরুরি, কিন্তু অন্য সব প্র্যাকটিসের মতই এটারও “অতি ব্যবহার” স্বাস্থ্যকর বা কল্যাণকর নহে, হতে পারে না। উৎসব পালন যেমন আমার অধিকার, তেমন আপনারও – আমি যদি এমন সব উৎসব পালনেই উৎসাহিত হই যা নিজ গঠনতন্ত্রেই ইনক্লুসিভ নয়, বরং আরেকজনের অপমানের মূল্যেই তার ভিত্তি, তাহলে সেই উৎসব পালনে আমার অধিকারও খর্ব হয় বই কি।


অচল সিকি

সিঁদুর পরা এবং খেলা নিয়ে লিখতে বলায় একটু বিপদেই পড়লাম। আমাকে শবরীমালায় মেয়েদের প্রবেশাধিকার নিয়ে লিখতে বললেও একই রকমের বিপদে পড়তাম। কিছু মানুষ তাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস টিশ্বাস নিয়ে কিছু সিদ্ধান্তে পৌঁছচ্ছে এবং সেই অনুযায়ী কিছু করছে কিংবা করছে না। তাদের ভাবনা-চিন্তা অ্যাকশন ইন্যাকশন কোনও কিছুই আমার জীবনে তেমন কোনও প্রভাব ফেলছে না। কেউ সিঁদুর পরল কিনা, খেলল কিনা, তাই নিয়ে আমার কী বক্তব্য থাকতে পাররে, আমি অনেক ভেবেও কিছু বুঝতে পারলাম না। আমি যদ্দূর দেখেছি, সিঁদুর যাঁরা পরেন বা খেলেন, তাঁরা সকলেই প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা। তাঁরা তাঁদের বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী শাঁখা পলা সিঁদুর নোয়া ইত্যাদি জীবনে ঢোকান। সে বিচারবুদ্ধি আমার বিচারবুদ্ধির সাথে না-ই মিলতে পারে, আমি খিল্লি করতে পারি, ইগনোর করতে পারি, কিন্তু গুরুর পাতায় তাই নিয়ে প্রবন্ধ লেখার বিশেষ কোনও যৌক্তিকতা আমি দেখতে পাচ্ছি না। নতুন কিছু তো লেখার নেই এ বিষয়ে, কোনও ভ্যালু অ্যাডিশন তো করতে পারব না। আমার লেখা পড়ে কেউ তাঁর নিজের বিশ্বাস বদলে ফেলবেন, এমনটাও আমি স্বপ্নে ভাবি না। অভ্যেসগুলো রিগ্রেসিভ, সেক্সিস্ট, ডিসক্রিমিনেটরি, সেটা আমার বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী, সে আমার ভাইফোঁটা বা জামাইষষ্ঠীও একই রকমের রিগ্রেসিভ, সেক্সিস্ট এবং ডিসক্রিমিনেটরি লাগে। গতকাল করবাচৌথ চলে গেল, সে-ও একই ধরণের। সবাই জানে। নতুন কিছু লেখার নেই। কিছু খিল্লি প্রতি বছরই দেখি ফেসবুকে বেরোয় এসব নিয়ে, এ বছরেও দেখেছি, তবে ফেসবুকে এবং তার বাইরে বৃহত্তর বাস্তব জগতে দেখি এসব নিয়েই মাতামাতি বেশি। কমে না, বেড়ে চলেছে। ষোল বছর আগে নিজের বিয়েতে বিদ্রোহ করে নিজেকে প্রোগ্রেসিভ ভেবে নিদারুণ স্যাটিসফেকশন পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম যুগের থেকে এগিয়ে গেছি। তারও আগে, অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় হওয়া পৈতেকে বয়ঃপ্রাপ্তি হবার পরে একদিন, দিনক্ষণ না দেখেই বাথরুমে ঢুকে কমোডে ফেলে ফ্লাশ করে দিয়েছিলাম, নিজেকে প্রোগ্রেসিভ ভেবে যারপরনাই গব্বো হয়েছিল।

আজ, সেইসব ঘটনার ষোল এবং সাতাশ বছর বাদে মাঝবয়েসে এসে সেইসব ঘটনাকে নিতান্তই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হয়। আমার চেনাপরিচিত, একই জেনারেশনের বন্ধুবান্ধব – কেউই এ পথ অনুসরণ করে নি। দেশ বিদেশ ঘুরে আসা মার্চেন্ট নেভির বন্ধুও গাড়ি কিনে কালীবাড়িতে পুজো দেওয়ার ছবি ফেসবুকে দিল এই সেদিন। বান্ধবীরা সিঁদুর খেলে ফি-বচ্ছর, তাদের ছেলের উপনয়ন করায় বয়েস হলে। আমি দেখি, এখন অভিব্যক্তিহীনভাবে দেখি। ভেবেছিলাম যুগ বদলাবে, সময়ের সাথে সাথে মানুষ এসবের অসারতা অপ্রয়োজনীয়তা অনুভব করে দলে দলে এসব অভ্যেস থেকে বেরিয়ে আসবে। তখন স্বপ্ন দেখার বয়েস ছিল। সময় বদলাতে দেখছিলাম। মেয়েরা গ্র্যাজুয়েট হয়ে চাকরিবাকরি খুঁজছে বিয়ের পিঁড়িতে বসবার আগে, ছেলেরা স্বচ্ছন্দে মিশছে মেয়েদের সাথে, মেয়েদের শরীরে জিনসের প্যান্ট দেখে ব্যান্ডেলের বয়স্কদের চোখ আর কপালে উঠছে না, দশমীর দিন ভাসানের মিছিলে মেয়েদের উদ্দাম নাচও ক্রমশ জলচল হয়ে যাচ্ছে, যে সব জিনিস, আক্ষরিক অর্থে আমাদের ছোটবেলায় ভাবা যেত না – এইসব দেখত দেখতে বড় হতে হতেই ভেবেছিলাম, এই পৈতে-শাঁখা-সিঁদুর-নোয়া-বৈধব্য-কুমারীত্ব এইসবের চক্কর থেকেও মেয়েরা হয় তো বেরিয়ে আসবে। এখন আর ভাবি না।

হ্যাঁ, কেউ কেউ এসেছেন তো বটেই, তাঁরা সংখ্যায় নিতান্তই কম, কিন্তু যাঁরা বেরিয়ে আসেন নি, স্বেচ্ছায় বা আরোপিত অবস্থায় – তাঁদের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। এক্সপোনেনশিয়ালি বেড়েছে। বাড়তে বাড়তে ব্যাপারটা এখন ফ্যাশন স্টেটমেন্টে দাঁড়িয়ে গেছে, স্বামীর কল্যাণ ফল্যাণ টাইপের কনসেপ্ট সময়ের সাথে সাথে বানের জলে ভেসে গেছে। সিঁদুর পরা বিবাহিত মহিলা এখন দিব্যি সকালে সিঁদুর কপালে ছুঁইয়ে কাজে যাবার নাম করে পরকীয়া করে বেড়ান, অন্যদিকে পৈতে পরা “গর্বিত” ব্রাহ্মণ সব রকমের ছিঁচকেমিতে পারঙ্গম হয়ে ওঠেন – এসব তো নিজের চোখেই দেখছি।

তো, কোনওই বক্তব্য নেই। পরলে পরবেন, খেললে খেলবেন, না পরলে, না খেললে না-পরবেন, না-খেলবেন। আই গিভ ইট আ ড্যাম। এই নিয়ে এত লেখার কী আছে মশাই?

ও হ্যাঁ, এই গত আগস্ট মাসে বোধ হয় কোনও একদিন আংশিক সূর্যগ্রহণ ছিল। উইকডে, সবাই অফিসে। আমার টিমের ছেলেমেয়েগুলির মধ্যে একটি আসন্নপ্রসবা মেয়েও ছিল। বাকি মেয়েরা মিলে নিশ্চিত করল যে সে গ্রহণ চলাকালীন যেন অফিসের হলএর বাইরে কোনওমতেই না বেরোয়, কেয়া পতা, আগর কুছ হো জায়ে। বাকিরাও গ্রহণের পর্বটুকু কিছু খেল না। তিনটের সময়ে গ্রহণ ছাড়ার পরে সবাই লাঞ্চ করতে গেল।

কী করব? এদের সাথে লড়ব? এদের বোঝাতে যাবো? উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়ে সব, সামাজিক নিয়মকানুন দেখে, মেনে বড় হয়েছে, ইঞ্জিনীয়ারিং ডিগ্রির পাশাপাশি এইসব শিক্ষায় বলীয়ান হয়েছে, কোনওদিন প্রশ্ন করতে শেখে নি। আমার এসব দেখলে মোজা জ্বলে। গালাগাল দিতে ইচ্ছে করে। তাই বলে গালাগাল দেব? ধুউর! আমার তো কিছু এসে যাচ্ছে না। নাঃ, কোনও বক্তব্য নেই।


জনগণের উৎসব, উৎসবের রাজনীতি
সৌভিক ঘোষাল


তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। সেই সময়ে কমিউনিস্ট সোভিয়েত রাশিয়ায় বাখতিন পেশ করলেন তাঁর গবেষণা সনদ ‘র‍্যাবেলিয়াস অ্যান্ড হিজ ওয়ার্ল্ড’। এখানে তিনি আনলেন তাঁর বিখ্যাত সেই কার্নিভাল তত্ত্ব যা পরবর্তীকালে সংস্কৃতি জগতের ভাবনা চিন্তাকে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক মাত্রায় প্রভাবিত করল। বাখতিন কার্নিভাল এর বিশেষ বৈশিষ্ট দেখিয়ে লিখলেন
All were considered equal during carnival. Here, in the town square, a special form of free and familiar contact reigned among people who were usually divided by the barriers of caste, property, profession, and age. The carnival atmosphere holds the lower strata of life most important, as opposed to higher functions (thought, speech, soul) which were usually held dear in the signifying order. At carnival time, the unique sense of time and space causes individuals to feel they are a part of the collectivity, at which point they cease to be themselves. It is at this point that, through costume and mask, individual exchanges bodies and is renewed. At the same time there arises a heightened awareness of one’s sensual, material, bodily unity and community.

নবারুণ যখন ফ্যাতাড়ুদের মত চরিত্র নির্মাণ বা ‘মসোলিয়াম’ এর মত উপন্যাস নিয়ে কথা বলেন, তখন তার প্রেরণা হিসেবে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন এর কার্নিভাল তত্ত্বের। ২০০৪ এ ভাষাবন্ধন পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত এই উপন্যাসটির আগে পরেও ফ্যাতাড়ু চাকতিদের নিয়ে লিখেছেন নবারুণ। ‘ফ্যাতাড়ুর বোম্বাচাক’ গল্পগ্রন্থে যে ধরণের চরিত্র আর আখ্যানের সূচনা হয়েছিল, সেই সূত্রেই এরপর নবারুণের বিখ্যাত ক্লাসিক ‘কাঙাল মালসাট’ লিখিত হয়। ‘মসোলিয়ম’ তারই পরবর্তী অধ্যায়। মসোলিয়ম এর পরবর্তী ধাপ হিসেবে ভাষাবন্ধন পত্রিকায় ২০১০ এর গোড়া থেকে ধারাবাহিকভাবে বেরোতে শুরু করেছিল ‘মগবগে নভেল’, কিন্তু কালান্তক ব্যাধি ও শেষমেষ নবারুণের অকাল মৃত্যুতে তা অসমাপ্তই থেকে গেল। এই জাতীয় লেখাগুলি কেন লেখেন সে প্রসঙ্গে নবারুণের কৈফিয়ৎ ছিল, “ বাংলায় যাকে বলে আমোদগেঁড়ে, আমি একটু আমোদগেঁড়ে আছি, কার্নিভাল ভালোবাসি। পুজোটুজো এলে আমার প্রচণ্ড আনন্দ হয়। এই যে এত লোক আনন্দ করছে আমি হয়ত তাদের মতো করে করতে পারি না কিন্তু আমার লোভ হয়। হিংসে হয়। এবং মানুষের সামান্যতম আনন্দে আমি খুবই আনন্দিত হই। রাস্তায় একটা ফুটবল ম্যাচ হচ্ছে – আমি দাঁড়িয়ে দেখি। এই যে মানুষের হাজার দুঃখের মধ্যেও তার বেঁচে থাকা প্রাত্যহিক সেলিব্রেশন – এইটা আমাকে অসম্ভব, মানে কী বলবে মোটিভেট করে। তার প্রাত্যহিক জীবনে সেরকম কোনও কিছু নেই, কিন্তু সে যখন একটা বিড়ি ধরায় তখন সে কিন্তু রাজা। তার এই রাজকীয় ভাবটুকু আমি তার কাছ থেকে গ্রহণ করি। এই celebration of life এইটা কিন্তু আমার কাছে খুব দরকারি একটা ব্যাপার। এইটাই মানে আমাকে অনেকদূর অবধি নিয়ে গেছে মানে কাঙাল মালসাট অবধি নিয়ে গেছে। বা মসোলিয়ম অবধি নিয়ে গেছে। এবং হাজার দুঃখ হাজার কষ্টের মধ্যেও মানুষকে যেভাবে আনন্দের সন্ধান করতে দেখেছি সেটা থেকে আমার মনে হয় আরও বড় এক সেলিব্রেশনের অপেক্ষায় এই কার্নিভালগুলো অ্যারেঞ্জ করা দরকার। যে সেলিব্রেশনের কথা সম্ভবত লেনিন প্রথম বলেছিলেন। ” [নবারুণ ভট্টাচার্যের সঙ্গে কথাবার্তা/ কবিতীর্থ/ আশ্বিন ১৪১৪, পৃ – ১৭৬]

নবারুণ কার্নিভাল প্রসঙ্গে লেনিনের কথার যে প্রসঙ্গ আনলেন তার সঙ্গে আমাদের সবারই কমবেশি পরিচয় আছে। লেনিন বলেছিলেন বিপ্লব হলো জনগণের উৎসব। আমাদের এখনকার কথাবার্তা অবশ্য লেনিন বা বিপ্লব নিয়ে নয়, তবে জনগণের উৎসব নিয়ে। আর সেই উৎসবের রাজনীতি নিয়েও। ইদানীং যে পপুলিস্ট রাজনীতির জন্ম হয়েছে, সেখানে উৎসব শুধুই জনগণের নয়। সরকারের এবং বিশেষ করে শাসক দলের। এই আমাদের পশ্চিমবঙ্গেই তো গত কয়েক বছরে উৎসবের পরিবর্তন হয়ে গেল। রেড রোডে আগে যেখানে কুচকাওয়াজ এর উৎসব হত, সেই রাষ্ট্রীয় আঙ্গিনায় ঢুকে পড়ল দুর্গাপুজোর বিসর্জনও। এক আধটা নয়। কোলকাতার বাছাই করা পঁচাত্তরটা বিগ বাজেটের পুজো কমিটিকে একত্র করে কোটি কোটি টাকা খরচ করে সে এক মহা কার্নিভাল। রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলের পপুলিজমের যদি অস্ত্র হয় এইসব কার্নিভাল, তবে দেশের শাসক দল বিজেপির আছে রামনবমী থেকে আরো হরেক আয়োজন। অবশ্য এ রাজ্যে রামনবমী থেকে হনুমানপুজো – নানা কার্নিভালের দখলদারী নিয়ে কেন্দ্র রাজ্যের দুই শাসক দলের, বিজেপি আর তৃণমূলের প্রতিদ্বন্বিতা তুঙ্গে। দল শুধু নয়, দুর্গাপুজোতে মমতা তার সরকার এবং তার অর্থভাণ্ডারকেও উজাড় করে দিয়েছেন। এবারই পুজো কমিটিগুলোকে দশ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে। এক আধটা পুজো কমিটিকে নয়। প্রসাদ পেয়েছে রাজ্যের আঠাশ হাজার পুজো কমিটি। এতে আঠাশ কোটি ব্যয় হয়েছে কোষাগার থেকে। আর রেড রোডের কার্নিভাল পালনে ব্যয় কত কোটি তার হিসেব ঠিকঠিক জানা যায় না। আমাদের এক বিজ্ঞানী বুদ্ধিজীবী সখেদে এইসব দেখে তো ফেসবুকে স্ট্যাটাসই দিয়েছেন দেখলাম – টাকা আমার আপনার, ফূর্তি মমতার।

তৃণমূলের লোকজন অবশ্যই বলবেন ফূর্তি শুধু মমতার কেন ? এত লোক যে ভিড় করছে, আমোদ পাচ্ছে, মাতামাতি করছে – তা দেখতে পান না! আর কোষাগারের টাকা সরকার এভাবে খরচ করতে পারে কীনা তা নিয়ে মামলা করেও তো মুখ চুন হল। আদালত তো বলতে বাধ্য হল সরকার কীভাবে টাকা খরচ করবে, সেটা তার এক্তিয়ার। এ নিয়ে আদালত বা অন্য কারো হস্তক্ষেপ মানাই হবে না। পপুলিস্ট রাজনীতির এমনই গুণ যে তৃণমূল বিরোধী শক্তিগুলো দু একটা বিবৃতির বাইরে মমতার এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও করতে পারল না রাস্তায় নেমে। তৃণমূলের অন্দর মহলে আওয়াজ উঠলো – দেখলে দিদির মাস্টার স্ট্রোক।

তাহলে বাখতিনের সেই কার্নিভাল থিওরি, লেনিনের জনগণের উৎসব থেকে মমতার রেড রোড কার্নিভালের ফূর্তি – আমরা কি বুঝলাম? উৎসব জনগণের বটে। তবে উৎসব ক্ষমতারও। এ ক্ষমতা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার নয়। অর্থনৈতিক ক্ষমতারও। কোলকাতার বড় বড় পুজোগুলোকে সবাই এখন জানেন কর্পোরেট পুজো বলে। যে বিপুল বাজেট এক একটা পুজোর, তা জনগণের থেকে চাঁদা তুলে তৈরি হয় না। পুরোটাই কর্পোরেট ফান্ডিং। জনগণ সামিল হয় বলে কর্পোরেট ফান্ডিং বাড়ে। কর্পোরেট ফান্ডিং বাড়ে বলে পুজোর জৌলুস বাড়ে। আরো বিপুল মাত্রায় লোকজন সামিল হয় এই জৌলুসের আকর্ষণে। কোলকাতা ছাড়িয়ে কর্পোরেট পুজো মফস্বলের এদিক ওদিকের পাড়ি দিচ্ছে আজকাল। সোনার গয়নায় মোড়া কয়েক কোটির এক পুজো, যার বিজ্ঞাপণ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় দেওয়া হল, সংবাদপত্রে চর্চিত হল, আলাদা করে থিম সং লেখা হল – আমাদের এই পানিহাটিতে তা এবার বিপুল ভিড় আর মনোযোগ টানল। আস্তে আস্তে মফস্বলের অনেক পুজোও যে তার বারোয়ারি চরিত্র হারিয়ে কর্পোরেট চরিত্র পাবে, তা বেশ অনুমান করা যায়।

এর বাইরে ছোট এক পাড়ার অনাড়ম্বর পুজোগুলি কি নেই ? বা থাকবে না ? থাকবে নিশ্চয়। পারিবারিক পুজো বা বারো ইয়ারের সঙ্গে আরো কয়েক ইয়ার, কয়েক ঘর মিলে ছোট ছোট পাড়ার পুজোগুলো নিশ্চয় থাকবে – শহরে কোথাও কোথাও আর মফস্বলের আনাচে কানাচে। কিন্তু কার্নিভাল বলতে আমরা ঐ সুরুচি সঙ্ঘ, একডালিয়া এভারগ্রিন, কলেজ স্কোয়ার, লেবুতলা পার্ক আর রেড রোডের বিসর্জন ই বুঝব। তার বাইরের ছোট পুজোগুলি সংখ্যায় যতই হোক। ঠিক যেভাবে কার্নিভাল বলতে অজস্র উৎসবের মধ্যে আমরা এখন বুঝি মূলত দুর্গাপুজোকে। কিছুটা পার্কস্ট্রিট এর বড়দিন, চন্দননগরের জগদ্ধাত্রীপুজো, বারাসাতের কালীপুজো ইত্যাদি প্রভৃতি আছে বটে কিন্তু মূলত প্রায় পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকার বিপুল বাজেটের দুর্গাপুজোই আমাদের কার্নিভাল। এই বাংলার উৎসবের বৈচিত্র্য কিন্তু কম নয়। সেগুলি তার মতো করে আছে প্রথামাফিক। সে বাঙালিরই হোক বা বিভিন্ন আদিবাসীদের উৎসব, মেলা বা পরবই হোক। এরকম কিছু নাম চটজলদি লিখে ফেলা যাক। কৃষি উৎসব আখের বাখার, উত্তরবঙ্গের মদনোৎসব, দক্ষিণ পশ্চিম বাংলার বাদনা পরব, গাজনের মেলা, মনসাদাঁড়ির মেলা ও রান্না পুজো উৎসব, উত্তর ২৪ পরগণার বাণীপুরের মেলা, কোচবিহারের বাণেশ্বর, জলপাইগুড়ির জল্পেশ মেলা, তিস্তাপারের ভাণ্ডানী মেলা, দিনাজপুরের ভুটিয়া মেলা, নদীয়ার ফতেমা মেলা, ব্রহ্মাণীতলার মেলা, পুরুলিয়ার করম পরব, অযোধ্যা পাহাড়ে সাঁওতালদের শিকার মেলা, বর্ধমানের কাটোয়া মেলা, বাঁকুড়ার মটগোদার শনি মেলা, শিকারোৎসব, গিন্নীপালন উৎসব, বীরভূমের ঘোষগ্রামের মেলা, জয়দেবের মেলা, মালদহের রামকেলি ও পাণ্ডুয়া মেলা, গঙ্গাস্নানের মেলা,মেদিনীপুরের ওড়গোঁদার মেলা, শরশঙ্কা মেলা, মহিষাদলের রথযাত্রা মেলা, মুর্শিদাবাদের ব্যারা, কালান্তরের মেলা, হাওড়ার রতনপুরের মেলা, হুগলির মাহেশের মেলা, বলাগড়ের মেলা, ডিহি বায়ড়া গ্রামের দিঘির মেলা। তালিকাকে আরো অনেক অনেক লম্বা করা যায় বলাই বাহুল্য। এগুলোর অধিকাংশ ক্রমশ ক্ষীণ হচ্ছে, তার প্রাণস্পন্দন হারাচ্ছে, খুব স্থানীয়ভাবে প্রথা হিসেবেই মূলত টিঁকে থাকছে মাত্র। কয়েকটি ব্যতিক্রম অবশ্য আছে। শান্তিকেতনের পৌষমেলা এবং গঙ্গাসাগর মেলা বিপুল জনসমাগমে প্লাবিত হয় এবং তা একটা স্বতন্ত্র মাত্রা পেয়ে গেছে। কিন্তু এই ব্যতিক্রম নিয়মকে প্রমাণ করে।

অজস্র ছোট ছোট প্রাণস্পন্দনে পূর্ণ মেলা উৎসবের বাংলায় বড় বড় দু তিনটি কার্নিভালের যে প্রাবল্য তা আসলে একটি নির্দিষ্ট রাজনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতির ফলাফল। সেটি হল কেন্দ্রীকরণ। এই প্রবণতা রাজনীতি ও অর্থনীতিতে যত বাড়বে ততই মেলা উৎসব বিনোদনের চরিত্র বদলাবে। একদিকে কার্নিভালে সরকারী ও কর্পোরেট আনুকুল্য বাড়বে, জনগণের উৎসব থেকে সরকারী ও কর্পোরেট ক্ষমতা তার পাওনা গণ্ডা বুঝে নেবে, অন্যদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে মেলা ও উৎসবের বহুত্ব আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাবে। কিন্তু এই লেখা সেই রাজনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতি চর্চার জায়গা নয়। তা নিয়ে ও তার প্রভাবে বিনোদনের চরিত্র বদল নিয়ে আলোচনা অন্য কোথাও করা যাবে।

পক্ষে | বিপক্ষে | অপাক্ষিক



563 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ মোচ্ছব  আলোচনা  বুলবুলভাজা  উৎসব ইস্পেশাল ২০১৮  কূটকচালি 
শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 8 -- 27
Avatar: dc

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

থাকবে।
Avatar: Anita Das Tandon

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

Yashodhrar lekha darun laglo pode. Boraborer motoi khub joralo jukti ,emon e joralo j one can feel the force. Rohin Bsnnerjeer lekha o bhalo.
Avatar: PT

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

"বাঙালি কী তা যেন কতগুলো চিহ্নের ওপর দাঁড়াল অবশেষে।"
Lutheran: "I give you this ring as a sign of my love and faithfulness." Roman Catholic Church: "Name., take this ring as a sign of my love and fidelity. In the name of the Father, and of the Son, and of the Holy Spirit."

"Men actually only began wearing rings after World War II to remind them of their wives at home. This is significant in the changing face of the ring."

সাহেবদের চিহ্ণ বলে জায়েজ?
Avatar: dc

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

এই না হলে কুতর্ক! :d
Avatar: PT

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

কিছু একটা দেগে দিলেই ইস্যুটা নেই হয়ে যায়না।
Avatar: রিভু

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

ওয়েডিং রিং নিয়ে আপত্তি নেই যতক্ষণ দুজনেই পরছে। কোনো একজন পরার কাস্টম তৈরি হলে (মঙ্গলসূত্র, সিঁদুর ইটিসি) উঠে যাওয়া দরকার।

Avatar: রৌহিন

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

ওয়েডিং রিং ও একই রকমের কুসংস্কার - তবে একটা তফাৎ আছে - এটা অন্ততঃ উভয়পাক্ষিক। আমি বিবাহ প্রথার স্যাঙ্কটিটি নিয়েই খুব একটা ভাবিত নই তাই ওয়েডিং রিং ও না থাকাই উচিৎ মনে করি - কিন্তু অন্ততঃ সিঁদুর, ভাইফোটা বা কুমারী পুজোর চেয়ে এটা কম রিগ্রেসিভ
Avatar: Atoz

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

"চালুনির ভিতর দিয়ে চাঁদ দ্যাখে" --- এটা যেন কোন্‌ রিচুয়াল? ঃ-)
Avatar: Tim

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

কে দেখছে তার ওপর নির্ভর করে। যদি ছুঁচ দেখে তাহলে ওর নাম সিনিসিজম। ;-)
Avatar: Tim

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

ওয়েডিং রিংয়ের কুসংস্কার বাদে আলাদা করে তেমন কোন গুরুত্ব নেই যদিও কেউ কেউ অভিজ্ঞানের কথা বলবেন, তা সেও চিহ্নই, তবে কম রিগ্রেসিভ। আর বিয়ে প্রতিষ্ঠানটাকে নিয়ে টানাটানি করলেই তার লেজুড় হিসেবে অনেক কিছু আসবে, যেখান থেকে এই চিহ্নিতকরণগুলো শুরু হয়েছে।
Avatar: Atoz

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

পিঠে কাঁঠাল আর পেটে আনারস বেঁধে বিয়ে করার রিচুয়াল যেন কাদের আছে। খুবই টাফ। ঃ-)
Avatar: S

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

শুনুন ওয়েডিং রিং কেন বাঁ হাতের ঐ আঙ্গুলটিতেই পরা হয় কেউ জানেন?

"শোনা যায়" ঐ আঙ্গুলের নার্ভটি নাকি হার্টের সাথে এক্কেবারে ডাইরেক্টলি লিন্ক্ড। ফলে অন্য নারী বা পুরুষকে দেখলে যদি আপনার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, তখন ঐ আঙ্গুলটিতে টান পড়বে, কারণ সেখানে টাইট করে একটা রিং পড়ানো আছে। হ্যা হ্যা। কি চাপের ব্যাপার।

এবারে একটা দুষ্টু কথা মাথায় আসছে। কিন্তু লিখবো না। এখানে অনেকে বড়রা রয়েছেন। তাছাড়া ছিরিয়াছ আলোচনা হচ্ছে যেখানে, ফাজলামো করবো না।
Avatar: S

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

উফ কত্ত বড় বড় লেখা। এতো পড়া যায়? একটু ছোটো করে লিখলেও তো চলে। যাগ্গে।

আমার পাশে একটা আম্রিগান ছেলে বসতো। তাকে একদিন বললাম যে তোমার পেন্সিল পড়ে গেছে। সে পা দিয়ে পেন্সিল তুলে নিলো। এই ছেলেটি পড়াশুনায় অত্যন্ত আগ্রহী ও মনোযোগী। কি বুঝলেন?

আরেকটা সমস্যা আছে। "মাই পেরেন্টস আর গ্রেট" সিন্ড্রোম। কিন্তু এই নিয়ে বেশি লিখলে সবপক্ষের লোকেরাই আমাকে মারতে আসবে।
Avatar: Atoz

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

"পেন্সিল পড়ে গেছে" শুনে কীসব ভেবে ফেললাম। এখানে বড়রা আছেন, বলা যাবে না। ঃ-)
Avatar: dd

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

অ্যাকচুয়ালি,কয়েকজনের লেখা এতোই জটিল যে পড়েও বুঝতে পারলাম না এই বিতর্কে উনি প্রস্তাবের পক্ষে না বিপক্ষে।
Avatar: S

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

ঐজন্যই তো উপরে ক্যাটিগরাইজ করা আছে।
Avatar: Atoz

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

ভাগ্যিস উপরে বলে দেওয়া আছে পক্ষে না বিপক্ষে! সেই আপেল আর কলা এঁকে নিচে লিখে দেবার মতন।
ঃ-)
Avatar: dc

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

রিভু আর রৌহিন এর সাথে একমত। ওয়েডিং রিং দুজনেই পরে, তাছাড়া পরাটা আদৌ সেরকম ভাবে বাধ্যতামূলক না যেরকম ভাবে সিঁদুর পরা বাধ্যতামূলক। সিঁদুর পরা আমাদের দেশে এখনো অবধি যেরকম রিচুয়ালাইজড সেরকম ওয়েডিং রিং না।

অবশ্য এই আলোচনায় ওয়েডিং রিং এর প্রসঙ্গটাই অবান্তর।
Avatar: খ

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

হ‍্যাঁ একটু বুলেট পয়েন আর গ্রাফ না থাগলে হয়😊😊😊😊
Avatar: bulet train

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় সামাজিক কুপ্রথার পালন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা, উদযাপন

বুলেট পয়েন্ট খুউবি ইম্পর্ট্যান্ট। সামাজিক ফাজলামির থেকেও।
ধর্মীয় সামাজিক উত্সব এলো আস্তে ধীরে নিদেন হাজার দশেক বছুর ধরে, কার কোথায় কত দম রাতারাতি উল্টে দিয়ে পাল্টে দেবার? ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া নিজের কাছে; কিন্তু সামাজিক স্তরে নেগশিয়েট তো সবাই করছে সব সময় - কোনটার জন্য কোনটা ছাড়ব, সেটা একটা ব্যাপার! জাজমেন্টাল কি হওয়া যায়, আদৌ? মানে, উচিত কি হওয়া? আর, এই ভারতবর্ষ এত গভীর ও জটিল, মনে হয় সব্বাই খেতে পেলে আর সমান বড়লোক হয়ে গেলে আর কোনো ইকনমিক সমস্যা না থাক্লেও ও সব সামাজিক দুর্নিচারিতা রয়েই যাবে! এক দেখার আছে সবাই মঙ্গলে গেলে কি হয়...

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 8 -- 27


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন