বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় কুপ্রথার উদযাপন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা

অপাক্ষিক

মতামত দিয়েছেন - শুচিস্মিতা, সুমন মান্না, সৃজিতা সান্যাল শূর, সম্রাট আমীন।


পক্ষে | বিপক্ষে | অপাক্ষিক


কলহপক্ষ
শুচিস্মিতা


- হ্যাঁ, এই কচি বাচ্চাদের নিয়ে কুমারী পুজো, বিজয়ার পর সিঁদুরে চোবানো মুখ এগুলো দেখলে আমার গা রি রি করে। কিন্তু তা বলে কি আইন করে সিঁদুর পরা বন্ধ হয়ে যাক চাইব, নাকি পুজো-আচ্চা উঠিয়ে দেবার আর্জি জানাব? এটা তো বোঝ, আমাদের দেশের সেকুলারিজম সব ধর্মকে সমান জায়গা দেয়। নিজস্ব ধর্মাচরণের অধিকার সব মানুষের আছে। আমার দেখতে খারাপ লাগছে বলেই আমি অন্যের ধর্মাচরণের অধিকারে বাধা দিতে পারি না।

- ওরে ওরে ওরে, ধর্মাচরণের অধিকার! তোদের বাড়িতে পুজোর সময় পুরুত আসে? দুর্গাপুজোয় প্যান্ডেলে গিয়ে অঞ্জলি দেয় তোর বাড়ির লোকজন?

- আসে। পুজোর সময় অঞ্জলিও দেয়।

- প্রত্যেকবার একটা পৈতে পরা লোককে দিয়ে পুজো করিয়ে কাস্ট সিস্টেমকে তোল্লাই দিচ্ছিস না? মুখে বলবি আমরা জাতিভেদ মানি না, তারপর বামুন ডেকে পুজো করাবি, বিয়ে দিবি, পৈতেবাড়ি গিয়ে ন্যাড়ামুণ্ডির সাথে সেলফি তুলবি, সব এক সাথে হয়?

- আরে পুজোয় অঞ্জলি দেওয়া, রিচুয়াল মেনে বিয়ে করা মানেই কি সে জাতিভেদে বিশ্বাস করে ? পিত্ৃtতন্ত্রে বিশ্বাস করে? এগুলো তো লোকাচার। উৎসব ছাড়া বেঁচে থাকায় মজা আছে? আজকালকার মেয়েরা মোটেই নিজেকে স্বামীর সম্পত্তি ভেবে সিঁদুর পরে না। শাঁখা-সিঁদুর বাঙালী মেয়ের লোকাচারের অঙ্গ। দেখতে ভালো লাগে। তাই পরে। "পরনে ঢাকাই শাড়ী, কপালে সিঁদুর" পড়িস নি? সিঁদুর একটা সাজের জিনিস। কসমেটিক্স।

- হা হা হা! সিঁদুর কসমেটিক্স! বিয়ের আগে কাউকে সিঁদুর পরতে দেখেছিস? বা বর মারা যাওয়ার পরে? ঐ লোকটাও লিখেছে "আমার স্মরণ শুভ-সিন্দুরে একটি বিন্দু এঁকো তোমার ললাটচন্দনে"।

- হুঁ, সেই জন্য তো এবারে মুভমেন্ট হয়েছে সিঁদুর খেলায় অবিবাহিত এবং বিধবারাও অংশ নেবে।

- আর ছেলেরা?

- হ্যাঁ, ছেলেদের ইচ্ছে হলে তারাও খেলবে।

- দ্যাখ, আমি তোদের এসব বিপ্লব বুঝি না। একটা রিগ্রেসিভ জিনিসকে ভ্যালিডেশন দিতে সেটা সবাই মিলে উদযাপন করলেই কি তার ইতিহাসটা নষ্ট হয়ে যায়? আজকে সিঁদুর খেলায় অংশ নিলেই কাল থেকে বিধবারা সিঁদুর পরতে শুরু করবে? আর খামোখা পরবেই বা কেন? কোন ফ্যাশন সেন্স থেকে? এই যে এখন হয়েছে শবরীমালা। আয়াপ্পার ব্রহ্মচর্য নষ্ট হয়ে যাবে মেয়েছেলের মুখ দেখলে। আরে! ধর্ম জিনিসটাই পেট্রিয়ার্কিকাল। তুই আয়াপ্পাতেও বিশ্বাস করবি, সমানাধিকারেও করবি দুটো এক সাথে হয় না।

- এখন আর কেউ বিশ্বাস করে না কৈলাস পর্বতে একটা গাঁজাখোর বসে দম দিচ্ছে আর পৃথিবী কন্ট্রোল করছে। সবার মনের জোর তো সমান নয়। কারোর যদি পুজোআচ্চা করে ভালো লাগে, মনে জোর পায়, তাতে বাধা দেব কেন?

- দিবি কারন রিলিজিয়ন ইজ হার্মফুল। এই ইনসিকিওরিটির জায়গাটা থেকেই মব মেন্টালিটি তৈরি হয়। অন্যের ফ্রিজে কি আছে সেটা দেখার নৈতিক দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে নিতে ইচ্ছে হয়। এই জায়গাটা থেকেই মনে হয় হিন্দু খতরে মেঁ হ্যায়।

- না, সবাইকে এক ভাবে দেখা ঠিক না। আমার দেখা অনেক মানুষ আছে যারা ধর্মপ্রাণ এবং উদার। তারা কখনোই প্রতিবেশীর বুকে ছুরি বসাবে না। তারা নিজের ধর্মকে ভালোবাসে ঠিকই। কিন্তু অন্য ধর্মকে ঘৃণা করেনা।

- হতে পারে। সেই উদারতা তাদের গুণ। কিন্তু সেটা তাদের স্টুপিডিটি আর অন্ধবিশ্বাসের সাফাই হতে পারে না।

- তারা বিশ্বাসী এটা ঠিক। এটাও মেনে নিতে পারি যে সে বিশ্বাস অন্ধবিশ্বাস। কিন্তু স্টুপিডিটি? নাহ! একটা মানুষ যদি অন্য কারোর ক্ষতি না করে নিজের মত করে কিছু বিশ্বাস করে, অন্য মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হয় তাহলে আমি তাকে তোর মত নির্দয় ভাবে সমালোচনা করতে পারব না।

- এই তো ভুল করলি! নিজের মত করে বিশ্বাস বলে কিছু হয় না। অর্গানাইজড রিলিজিয়ন ইজ নট আ প্রাইভেট প্র্যাকটিস। এটা আপন মনে উপনিষদ আওড়ানো নয়। বিশ্বাস, সে ধর্মে হোক বা বা উড়ো অভিযোগে, দ্য মোস্ট ডেন্জারাস পার্ট ইজ, এতে কোন প্রমাণ লাগে না। প্রমাণ চাওয়ার অভ্যাসটাই এখানে ব্লাসফেমি। দুয়েকজন উদার মানুষ কি করছে সে অন্য কথা, বেশির ভাগ ধর্মাচরণে বিশ্বাসী মানুষকে ম্যানিপুলেট করা খুব সোজা। তাদের দিয়েই রায়ট লাগানো হয়। কেউ সক্রিয় অংশ নেয়। কেউ চুপ করে থেকে পরোক্ষ সমর্থন করে।

- হুঁ, সেটা ঠিক। কিন্তু তা বলে ধর্মাচরণ উঠে যাবে এটা তো কোন প্র্যাক্টিকাল কথা হল না। বিশেষ করে আমাদের উপমহাদেশের সংস্কৃতির সাথে ধর্ম এমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে! এখানে ধর্মীয় আচার আর লোকাচার আলাদা করবি কি করে? জোর করে ধর্ম বাদ দিলে সোভিয়েত ইউনিয়ানের মত কেস হবে। সব কটা এক্স সোভিয়েত দেশে এখন পুরোদমে ধর্ম ফিরে এসেছে। চাইনীজরা আমেরিকায় এসেই দলে দলে ক্রিশ্চান হয়।

- আরে ওটা ওরা ফ্রিতে খাওয়ার তালে করে। আমরাও করেছি।

- সে হোক। ওভাবে শুরু হয়। তারপর ঐ সানডে চার্চ, একটা কমিউনিটি তৈরি হওয়া, তার সুবাদে কিছু সুযোগ-সুবিধেও পাওয়া যায়, আর বাইবেলের ট্রেনিং তো আছেই। বছর ঘোরার আগেই ব্যাপারটা আর শুধু ফ্রি ফুডের আকর্ষণ থাকে না। জানিস, ইয়ান জ্যাং আমায় কি বলছিল? - "ইউ হ্যাভ টু ট্রাস্ট হিম শুচি, এভরিথিং উইল বি ফাইন"। আমি সরল মনে বলেছি - "অফ কোর্স আই ডু। আই ট্রাস্ট মাই অ্যাডভাইসরস জাজমেন্ট"। তখন বলে - "নো, ইউ হ্যাভ টু ট্রাস্ট গড। জাস্ট পুট ইউর ট্রাস্ট ইন দ্য রাইট প্লেস। লাইফ উইল বিকাম পিসফুল"। তুই ভাব একবার, পাঁচবছর আগে এই মেয়ে ধর্ম, ভগবান কি জিনিস কিস্যু জানত না। কি বদলেছে ওর জীবনে? মা কালী এসে দেখা দিয়েছে? মানুষ একটা সুপার পাওয়ারকে বিশ্বাস করতে ভালোবাসে। তাতে নিজের স্ট্রেস বাঁচে।

- সে তো লোকে মোদিকেও বিশ্বাস করে!

- হ্যাঁ, করে। তবু তো মোদি লোকটা একজিস্ট করে। আর গণতন্ত্র যেহেতু আছে তাই বেশি মানুষ চাইছে বলে মোদিকে ভালো না লাগলেও মেনে নিতে হয়। ঠিক তেমনই ভালো না লাগলেও অন্য মানুষের পছন্দকে সম্মান করতে সিঁদুর খেলা, পিঠে শূল বেঁধানো, রাজপথে বুক চাপড়ে কান্না সবই মেনে নিতে হবে।

- ইউ নো, মাই অ্যাডভাইসার ইউজড টু সে ..

- হ্যাঁ, জানি কি বলত। লোকটা বলত শিক্ষাগত যোগ্যতার ওপর ভোটের আপেক্ষিক গুরুত্ব নির্ভর করা উচিত। একটা পোস্টগ্র্যাজুয়েটের ভোট চারটে হাইস্কুল পাশের ভোটের সমান হওয়া উচিত। বিশ্বাস কর, এমন ভাটের কথা আমি জীবনে খুব বেশি শুনি নি। আরো একটা কথা শুনে নে, যদি তোর অ্যাডভাইসরের কথা মেনে ভোট হত তাহলেও একই লোক ভোটে জিতত। পিএইচডি করে অ্যানালিটিকাল স্কিল তৈরি হয় না। ওটা তৈরি করার জন্য মানসিক আলস্য ত্যাগ করতে হয়। নিজের ধ্যানধারণাকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করতে হয়। আপাতত কানে তুলো গুঁজে টলারেন্স প্র্যাকটিস কর। খুব অসহ্য হলে ফেসবুক থেকে বিদেয় নে। ঝগড়ুটে কোথাকার!


সংস্কারের যুদ্ধ
সুমন মান্না


১ - সংস্কার
যে সব সামাজিক রীতি প্রথা যা মোটামুটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়েও টিকে থাকে বহাল তবিয়তে অনেক দিন ধরে সমাজে, যেমন সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে নিরামিষ খাওয়া থেকে ধর্মস্থানের চিহ্ন দেখলেই হাত কপালে চলে যাওয়া তাকে সংস্কার বলি এক কথায়। প্রায় যুক্তিহীন এক একটা বিশ্বাস মানুষ নিজের ইচ্ছেমতো লালন করে জ্ঞানত অজ্ঞানতা প্রসূত। এখন “প্রায়” শব্দটা বললাম এই কারণে যে প্রতিটি বিশ্বাসী মানুষেরই নিজস্ব সাফাই সাধারণত থেকে থাকে, তা যতই অবিশ্বাসীর কাছে হাস্যকর মনে হোক না কেন।

সংস্কার সহজ। এইটা করতে হবে, এমনটা করতে হবে তা হলেই সব ঠিকঠাক থাকবে চারদিকে। পাঁচালি গ্রন্থের গল্পগুলো এইরকম সোজাসুজি, একমাত্রিক। তা সেইসব পালন করা সত্ত্বেও বিপদ আপদ ঘটলে বলা হয় — নিশ্চয় ত্রুটি কিছু হয়ে থাকবে উপাচার পালনে, এরও বড় হ'ল — নিশ্চয় মন বিক্ষিপ্ত ছিল, একমনে মন্ত্রোচ্চারণ হয় নি, পাঁচালি শোনার সময়ে দু'একবার মনে হয়েছিল আজ ওই “রাসমণি” র এপিসোড মিস হয়ে গেল, অন্তর্যামী তাতে রুষ্ট হয়েছেন।

যাঁরা এইসব সংস্কার মানছেন, মেনে চলেছেন প্রশ্নহীন আনুগত্য নিয়ে তাঁরা সকলেই যে নির্বোধ বা অশিক্ষিত তা মনে করছি না। অনেক গ্রহ নক্ষত্র অনুকূলে রাখার আঙটি পরা বৈজ্ঞানিক ডাক্তার আকছার দেখি নি কি আমরা? তবে সংস্কারের সামনে এলে এরা সেইসব অধীত জ্ঞানগম্যিকে বিসর্জন দিয়ে পরিবারের বড়রা যা বলছেন তাকে “বেদবাক্য” ধরে নেন। এই লাইনটা উচ্চারণে “বেদ’’ এর প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যের চিহ্ন আরও পরিষ্কার হয়ে গেল।

এ তো গেল সংস্কারের কথা, সমাজ কিন্তু এইসব সংস্কার নিয়ে টিকে আছে অনেকদিন। এটাও দেখতে হবে এই সংস্কারসমূহের মধ্যে ভয়ানক কু-প্রথা গুলির অনেকগুলোই আজ আর মানা হয় না। মানুষ তথা সমাজ সেটা মেনেও নিয়েছে। তবে গোলমালটা কোথায়?

২ - যুদ্ধ ও সঙ্কট
গোলমালটা যুদ্ধঘোষণায়।

সংস্কারপন্থী ও সংস্কার-বিরোধীদের একে অপরের দিকে রে রে ওঠার মধ্যে গোলমাল দেখতে পাচ্ছি। অফিসে সহকর্মী কপালে টিকা কেটে অফিস পৌঁছলে বা তার হাত ভর্তি আংটি থাকলে সেটা প্রত্যক্ষ ভাবে তার সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় না, যদি না এইসব চিহ্ন দেখে তার বিষয়ে একটা পূর্বনির্ধারিত ধারণা না করে নিচ্ছি। এটা বিপরীতভাবেও সত্য। তাঁরও অসুবিধা হওয়ার কথা নয় কফি ব্রেকে যদি সে জানে যে দুর্গাপুজোয় আমরা পারলে দিনে চারবেলা মদ মাংস সাঁটিয়ে থাকি। ঠিক যে মুহূর্তে সংস্কার বিরোধী পন্থীরা ধরে নিচ্ছেন যে সংস্কারে বিশ্বাসী মানুষ মানেই সে একেবারেই খাজা, বুদ্ধিশুদ্ধি নাই, বাপ মামা ধরে, করে কম্মে খাচ্ছে — সেও এক নতুনতর সংস্কার বই তো নয়।

এই যুদ্ধ ঘোষণা, মনে করে দেখুন খুব বেড়ে গেছে ইদানীং। ইদানীং দুটো ব্যাপার চোখে পড়েছে যা বছর কুড়ি আগে ছিল না। এক নম্বর হল — প্রকাশনার পরিসর। আর দুই নম্বর হ'ল — ক্ষমতাবানের ভাষা।

প্রকাশনার পরিসর বলতে বোঝাতে চাইছি যে এখন মানুষ খুব সহজে অনেকের কাছে তার বা সে যাকে সমর্থন করে তার কথাবার্তা মতামত অনেকের কাছে পৌঁছে দিতে পারছে বৈদ্যুতিন সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে। আগে কষ্টেসৃষ্টে এক পাতা লিখে সাইক্লোস্টাইল বা ফোটোকপি করে একতাড়া সেই কাগজ নিয়ে ইউনিয়ন রুমের সামনে একঘন্টা দাঁড়িয়ে বিলি করত মানুষ তাঁদের দাবীদাওয়া, কতৃপক্ষের অন্যায় অবিচার জানাতে। এ ছাড়াও ছিল দেওয়াল লিখন অথবা পোস্টার ছাপিয়ে সাঁটা। যা অনেকটাই খরচসাপেক্ষ মায় শ্রমসাপেক্ষ। আর এখন আঙুলচালনা করেই কাজ হাসিল। এর ফলে আগে যাঁরা লিখতে পড়তে অনেকের থেকে পটু ছিলেন তারাই লেখালেখিটা করতেন। বাকিরা মই বইতেন, আঠার বালতি সামলাতেন। এখন এরা সবাই লিখছেন। আর যেহেতু লিখেছেন তাই তা অবশ্যপাঠ্য করতেও উঠে পড়ে লেগেছেন। আর যা লিখেছেন সেটাই যে অব্যর্থ শেষকথা — সেটাও জানিয়ে দিচ্ছেন। আর তাকেই এই পরমত অসহিষ্ণুতার প্রধাণ কারণ বলে দেখছি।

দ্বিতীয় কারণটিতে “ক্ষমতাবান” বলতে বোঝাতে চাইছি সমাজ যাকে মানে টানে আর কি (মমতাব্যান এর সঙ্গে একে মেলালে সে দায় আপনার)। মনে পড়ছে আগে বাবা, পিসি, জ্যাঠা, কাকা রা বাড়ির ছোটদের কারোর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়ার সময়ে বলতেন — “জানো, ইনি কত বই পড়েছেন”! এখন আর বলতে হয় না, বড় গাড়ি থেকে নামলে, বা তার সাজপোশাকে বোঝা যায় লোকটি সমাজের মাথা না হয়ে যায় না। এর সঙ্গে তার পড়শোনা বা শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রসঙ্গ বর্তমান প্রধাণমন্ত্রীর ডিগ্রীর কাগজের মতো প্রহেলিকা হয়ে থাকে। বরং তথাকথিত বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দি না মাড়িয়েও সমাজের মাথা হওয়া অধিকতর গৌরবের বিষয়। আগেকার দিনে রেডিও র কমেন্ট্রিতে তাড়ু মেরে বাউন্ডারি পেলে বলা হ'ত — ব্যাকরণ বহির্ভূত শট, তাও চার চারটে রান যোগ হল। আজ বলে হয় — হোয়াট অ্যান ইম্প্রোভাইজেশন!

এখন এই “অশিক্ষার গৌরব” তথা ক্ষমতাবানের ভাষার পরিবর্তন ও প্রকাশনার সুলভতা মানুষকে ঠেলে দেয় নিজের মতকে প্রতিষ্ঠা করতে। যে প্রতিষ্ঠা সংকল্প সংস্কার পন্থী ও তার বিরোধীদের যুযুধান করে তোলে। অথচ এ কথা আমরা সহজে মনে রাখি না — যে লোকটা আমার বিরুদ্ধাচারণই করে যায়, আমার কথা শোনে না, তার একটা কথাও আমি বিশ্বাস করি না।

এর সঙ্গে আরও একটা ব্যাপার চোখে পড়েছে, তা হ'ল অধুনা সংস্কার এর ধারক বাহক হয়ে দাঁড়িয়েছেন সরকার বাহাদুর নিজে। তাঁরাও আশ্চর্যজনকভাবে প্রশ্ন পছন্দ করেন না, সেই কারণেই বোধ হয় তাঁদের এই বেদ-প্রীতি! এর ফলে এইসব সংস্কারকে কিছু মানুষ দেশভক্তি প্রকাশের সমার্থক করে প্রচার করে চলেছে। এর ফলে যেটা দাঁড়াচ্ছে তা ভয়ানক। একে তো সংস্কার বিশ্বাসীর কাছে “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর” — তাঁরা এবার অবিশ্বাসীদের ওপর জোর খাটাতেও চাইছেন। ফলতঃ দেখা যাচ্ছে নবরাত্রি র সময়ে কাঁচা মাছ মাংসর বাজার বন্ধ করার মধ্যে দিয়ে, পুজোপ্যাণ্ডেলে আমিষ চলবে না— ধরণের ফতোয়া জারী করে।

জানি, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভোটে জেতার অঙ্ক। কিন্তু এই বিভাজনের রাজনীতি তথা নিজের মত অন্যপক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় সংস্কার বিরোধীদের ধৈর্য্য কমে আসছে। তাঁরা যত সঙ্কটে পড়ছেন তত বেশি হতাশ হয়ে আসছেন আর তত কামান দাগছেন সংস্কার পন্থীদের ওপর। তাঁদের করে তুলছে প্রায় লড়াই-খ্যাপা খিটখিটে। আগে তাঁরা মা -জেঠিমার সিঁদুর খেলায় বিপদ দেখতেন না, এখন প্রসাদের সন্দেশটিকেও সন্দেহের চোখে দেখছেন। এই প্রবণতা ও সাংঘাতিক।

মজার কথা হ'ল, নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার জন্য যাঁরা সংস্কারের পৃষ্ঠপোষণ করছেন, তাঁরাও চান বিরোধীরা বিরুদ্ধমতে সোচ্চার হোন। এতে এক, তাঁদের চিহ্নিত করা সহজ হবে আর দুই, তাতে সংখ্যাগুরু লোককে আরও সহজে বোঝান যাবে সেই মহান মন্ত্র — তোমার ধর্ম বিপন্ন।

৩ - তবে, উপায়?
মুক্তির উপায় কিন্তু যুদ্ধ নয়। যাঁরা বিভাজনের খেলাটা খেলছেন, যাঁরা সংস্কারের পরিধি বাড়িয়ে চলেছেন টিভির চ্যানেলে চ্যানেলে তাঁরা যেহেতু যুদ্ধ চান কারণ একমাত্র যুদ্ধে শুধু সংখ্যাগুরু জেতে, দেখা হয় না, কোন পক্ষ সঠিকভাবে মনুষ্যত্বের পক্ষে ছিল।

যেটা করতে পারলে ভাল হ'ত তা হ'ল খেলাটাকেই বদলে দেওয়া। সংস্কার পন্থীরা তো সবাই আর ধান্দাবাজ নন, তাদের ত্যাজ্য করার বদলে তাদের আরও কাছাকাছি যেতে পারলে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের রাস্তাটা আরও পরিষ্কার করলে লাভ হ'ত বেশি। আর হ্যাঁ, এই কাজটা মোটেও সহজ নয়, সেইজন্যই আরও এই পথকেই সঠিক বলে মনে হয়।

আরও মনে হয়, সমাজ বদলের দায় কেউ কাউকে তুলে দেয় না। লোকে মাথা পেতে নেয়, কিন্তু তা করতে গিয়ে সংস্কার-মুক্ত যুক্তিবাদী সমাজ গড়তে গিয়ে সংস্কারপন্থী দের শত্রু ভাবলে তা শিব গড়তে গিয়ে বাঁদর গড়ে দেয়। বৈদ্যুতিন মাধ্যমে সিঁদুর খেলার ছবি পোস্ট করলেই যে মানুষটির আর সব পরিচয় মুছে গিয়ে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের অত্যাচারের সমর্থনকারী বলে দাগিয়ে দেওয়া ভুল। যাঁরা সিঁদুর পরার অধিকার চাইছেন ট্রান্সজেন্ডার মানুষের জন্য, কুমারীদের জন্য, বিধবাদের জন্য, তারাও সেই অধিকার চাওয়ার অধিকারী। নির্দ্বিধায় তাদের ছবিতে লাইক দিতে থাকুন, বিজয়ার পরে দেখা করে মুড়কি নাড়ু খান আর কথা বলতে থাকুন। আর শুনতে থাকুন তাদের কথা ধৈর্য ধরে। দেখুন, সংস্কার তো কেউ আর শিখে নিয়ে জন্মায় নি, যে যেমন পরিবেশে থেকেছে, বড় হয়েছে, লেখাপড়া শিখেছে বা শেখেনি যা ঠিক বলে মনে করেছে তাই করে চলেছে, বিরোধীদের আরও বলার, (একই সঙ্গে নিজেকেও) যে যাঁরা সংস্কার বিরোধী তাঁরা তো ‘'শিক্ষিত”। কারণ “শিক্ষা” ই মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়। কাজেই এই বিভাজনের খেলা বন্ধ করার উপায় হ'ল মেলামেশা বাড়ান। যার ইচ্ছে সিঁদুর খেলুন, যার ইচ্ছে না খেলে অন্য কিছু খেলুন কিন্তু দিনের শেষে যে সিঁদুর খেললেন আর যিনি খেললেন না তারা নিজেরা আড্ডায় মেতে উঠুন। একে অপরের আরও কাছে থাকুন। অপরের কথা মন দিয়ে শুনুন। ব্যস। এইটাই চাই।


উৎসব না পুজো?
সৃজিতা সান্যাল শূর


উৎসব না পুজো? সাংস্কৃতিক সামাজিক না ধর্মীয় আচারবিচার?
ধর্মীয় তো বটেই,তিথি নক্ষত্র দেখে পুজোপাঠ। আজ উপোষ, কাল বলি। সব তো অদেখা, নাদেখা সব দেবতা ইত্যাদিদের প্রসন্ন করতে। সারাবছর হুলিয়ে বাঁশঝাড়ের চাষ। সুবিধে মত জনগণকে দান। তার জন্য কোনো বছর অষ্টমীর ভোগ, তো কোনো বছর প্রতিমার স্পনসর। ধর্ম, মানে যা কিনা আচার বিচার দিয়ে আমার পাপটুকু ধারণ করে ফেলে দিয়ে আমাকে ফিল্টারড পূণ্যাত্মা বানিয়ে দেয়। ধর্ম বাদ দিয়ে শরতকালের এই মেগা উৎসব হবে না।

সামাজিক ও। একা একা সেজেগুজে পুজো করে কি লাভ? যদিনা নতুন মফ চেন পরে কম্পলেক্সের পুজোয় অঞ্জলী দেওয়া গেল। এত হাত মকশো করে ঢাক বাজানোর পরে পাশের ব্লকের সেএএইই বৌদি যদি " আপনি তো দারুণ! " না বলে। দু একখানা স্টল হত বছর কুড়ি তিরিশ আগে পুজো প্যান্ডেলের আশেপাশে। ধর্মকে অস্বীকার করা একদল মানুষ সামাজিক উতসবে বই এর স্টল দিতেন। এখনো স্টল হয় দেখলাম একই জায়গায়। একজনের লেখা বইতে ঠাসা। মিতাঞ্জলী ইত্যাদি বই টই।

তবে আজকাল একটু বেশি হলেও উতসব উপলক্ষ্যে হাত বাড়ানো বেড়েছে।

একটু পিছিয়ে পড়া লোকজনের কথা ভাবনা চিন্তায় আসছে। পাড়ার ক্লাবের বস্ত্রবিতরণ একটু একটু করে ছড়িয়ে যাওয়ায় মানুষ আরেকটু সামাজিক হয়ে যাচ্ছে মনে হয়।

আর সাংস্কৃতিক? ওই নিয়ে কথা হবে না। আগে বিজয়া সম্মেলনী হত। রিহার্সাল রিহার্সাল। গল্প, উপন্যাসের বন্যা বয়ে গেছে তাই নিয়ে। পুজোর লেখা আসতো পুজোর আগে। এখন পুজোর পাঁচ দিন মেগা সংস্কৃতি। একদিন ডান্ডিয়া, একদিন মাতা কি চৌকি,একদিন মহিষাসুর মর্দিনী। কালচার টা বাঙালী পারে। ভাল মত পারে৷ রথ শেষ হতেই আছড়ে পড়ে পুজোর লেখা। শারদীয়া। এখন তো আবার অনলাইন শারদ সংখ্যাও। সংস্কৃতি নিয়ে কোনো ব্যাটা আমাদের টেক্কা দিক দেখি।

এই ত্তো পুজো শেষ।পেরেছে কেউ থামাতে? পোস্ট-পুজোর জন্য এ লেখা লিখে যাচ্ছে সেই আরেক বাঙালী। মশাই, ধর্ম কর্ম বুঝিনা, নবমীতে পাঁঠা আমরা খাবই। আর সমাজের প্রতি দায় আছে তো একটা নাকি?! সংস্কৃতিকে বাঙালী না দেখলে আর কে দেখবে!


ধর্ম কি আদৌ আঞ্চলিক সংস্কৃতির পথে বাধা ?
সম্রাট আমীন


বাংলায় বসবাসকারী বাংলাভাষী মুসলমানের দুটি পরিচিতি। প্রথমটি বিশ্বজোড়া প্যান-ইসলামিক পরিচিতি, আর দ্বিতীয়টি সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক ক্ষেত্রে আবদ্ধ আঞ্চলিক পরিচিতি। প্রথমটি রোমান্টিক ফ্যান্টাসি আর দ্বিতীয়টি মেঠো বাস্তব। বাংলার মুসলিম জনমানসের একটা বড় অংশের প্যান-ইসলামিক রোমান্স মেকি একটা ব্যাপার। এই রোমান্সই সৌদি আরবের পেট্রোডলারপুষ্ট শেইখদের ভাই বলে মনে করায় বাংলার রিক্সাওয়ালা রহিম সেখকে। কিন্তু তাকে বোঝানো হয় না যে শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচিতির একটা মিল ছাড়া ভৌগোলিক অবস্থান, মনন, মানসিকতা ও সামাজিক জীবনযাপনে কোন মিলই নেই তাদের। প্যান ইসলামিক পরিচিতি যদি বাস্তব হত তাহলে ইরান ও সৌদির বিলাস বৈভবের পরও রোহিঙ্গা মুসলিম বা সিরিয়ার মানুষদের এত করুন শোচনীয় দশা হত না। সারা বিশ্বের মুসলিম জাতি বলে কিছু হয় না। বাংলায় বসবাসকারী বাঙালী রহিম সেখের আত্মীয় আরবের অভিজাত শেইখরা নয়, বরং তার আত্মীয় পাশের পাড়ার জিতেন সাহা, রাখহরি বাগদী, সনৎ বাউরী, পরেশ ধীবররা।

বাঙালী মুসলিমদের অনেকে শুধুই মুসলমান ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেন না। কিন্তু ধর্মীয় পরিচিতি ছাড়া তাদের ভাষাগত ও আঞ্চলিক পরিচিতি আছে -- বাঙালী। তাদের ধর্ম, ভাষা ও নিজস্ব সংস্কৃতি সব গুলো নিয়ে তারা একটি স্বতন্দ্র সামাজিক গোষ্ঠী ও জাতি। এই স্বতন্ত্রতার সঙ্গে আরবের মুসলমান তো অনেক দূর, উত্তর ভারতের গোঁড়া উর্দুভাষী মুসলমানকেও মেলানো যাবে না। বাঙালী মুসলমান এমন একটি সামাজিক গোষ্ঠী যাদের একটি জটিল ইতিহাস এবং ভূগোল রয়েছে। রয়েছে ত্যানা প্যাচানো জটিলতর রাজনৈতিক অবস্থান। সেটাও এত জটিল যে সমস্যার নিরিখে অন্যান্য সংখ্যালঘু ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায় না। নির্দিষ্ট অঞ্চল আবহাওয়া জলবায়ুর উপর ভিত্তি করে একটা জাতির বিশেষত্ব গড়ে ওঠে। ভাষা ও সংস্কৃতিই হল সেই জাতির প্রাণভোমরা। সেই সংস্কৃতি যে খাপেখাপ প্যান ইসলামিক ধর্মীয় দর্শনের সঙ্গে মিলবে সেটাও নয়। কিন্তু ধর্মীয় সংস্কারের নামে সেই জাতির প্রাণভোমরা অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির উপর যদি কুঠারাঘাত নেমে আসে তাহলে জাতির অস্তিত্বের সংকট।

"তবলিগ জামাত" মুসলমান সমাজে 'শুদ্ধিকরণ' আন্দোলন শুরু করেছে। পীর ফকির মাজার দরগাকে কেন্দ্র করে গ্রামীন বাংলার প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তাদের কাছে 'শির্ক'। পিরের মাজারে গিয়ে পীরবাবাকে শ্রদ্ধা জানানোকে তারা 'শেরিকি' হিসাবে গণ্য করে। 'শেরিকি' হল আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করা, যা 'ইসলামবিরোধী'। কারোর ভাল কাজের জন্য কাউকে শ্রদ্ধা জানানো মানেই তাকে আল্লাহর সাথে শরিক করা, এই সমীকরণ হাস্যকর রকমের সরল বলেই ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়। তবলীগ জামাতের প্রচারকগণ গ্রামে গ্রামে ঘুরে এহেন 'বেহুদা' কাজ থেকে বিরত থাকার নিদান দিয়ে বেড়াচ্ছে। এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একদল শিক্ষিত মানুষও। সারা বিশ্বে দেড়শোটি দেশে প্রায় পাঁচ কোটি তবলিগি প্রচারক রয়েছেন। ইজতেমার মধ্য দিয়ে নীরবে আঞ্চলিক পরিচিতি বর্জিত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বর্জিত 'শহী মুসলমান' বানানোর কাজে এরা নিবেদিত। এই আন্দোলন অহিংস শান্তিপূর্ন ও নীরব হলেও বাংলার মুসলিম সমাজকে অনুদার কোরানিক লিটারেলিজমের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এরা।

এক কথায় বাংলার মুসলিম সমাজসাংস্কৃতিক জীবনের বিরুদ্ধে নীরবে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে তবলিগ জামাতিরা। ইসলামের 'সালাফি' মতধারায় অনুপ্রাণিত এই সংগঠন যেমন জেহাদি মুসলিমদের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের তীব্র বিরোধী, তেমনি উদার সুফী মারফতি মতধারার প্রতিও এরা চক্ষুশূল। 'সালাফি' শব্দের অর্থ 'অতীতচারিতা' বা 'পূর্বপুরুষকে নিঃস্বার্থভাবে অনুসরণ'। এরা নবী ও তাঁর সাহাবিদের অনুসৃত ইসলাম অনুসরণ করতে চান। ইসলামের নির্ভেজাল রূপের ব্যাপারে obsessed সালাফিরা বিধর্মীদের এমন কিছু টিকিয়ে রাখতে চাই না যা মুসলিমের মনে শেরেকের ( পৌত্তলিকতা) জন্ম দেয়। এই জায়গা থেকেই এরা পীরবাবার কবরে চাদর চড়ানোর বিরোধিতা করে। কেবল বিশ্বাসে নয়, পোশাকে আচরণে, ব্যবহারে নির্ভেজাল মুসলিম ব্যাক্তিত্ব নির্মাণই এদের কর্মসূচী। সেটা করতে গিয়ে এরা মুসলিমদের আঞ্চলিক, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতাকে অস্বীকার করে চলেছে। অঞ্চলভেদে মানুষের মনন মানসিকতা সমাজসাংস্কৃতিক জীবনধারা পোষাক পরিচ্ছদ সব কিছুর যে ভিন্নতা রয়েছে সেটা এরা মানতে চায় না। উল্টে খাঁটি মুসলমানের মহাবয়ান দিয়ে সব জায়গার মুসলমানকে হোমোজেনাইজ করতে চাই, সবাইকে এক ছাঁচে ঢালতে চাই। তথাপি, কোন মতধারার উপর তবলীগ জামাত প্রতিষ্ঠিত তার থেকেও এখন গুরুত্ব দিয়ে ভাববার বিষয় যে কোন ধরনের রিগ্রেসিভ প্র্যাকটিসের দিকে এরা মুসলিম সমাজকে নিয়ে যেতে চাইছে।

যে গ্রামীণ বাংলা এতদিন বাউল ফকিরের একতারা দোতারার সুরে মজেছিল সেই সুর তাদের কাছে 'হারাম' 'বেশরিয়তি'। আমাদের রাখাল, চাষী, মাঝি, সাপ ধরা বেদে থেকে ছাদ পেটানো শ্রমিক পর্যন্ত্য প্রায় প্রতিটি পেশা নিজস্ব মৌলিক গানে সমৃদ্ধ। কিছু বছর আগে অব্দি মুর্শিদাবাদ বীরভূমের গ্রামের মেয়েরা বিয়ের এক সপ্তাহ আগে থেকে ঢোল বাজিয়ে মুসলিম বিয়ের গান গাইত -- "জামাইয়ের লেগে বিটি রেখেছি আসমনের চাঁদ, জামাই আমার জান" বা গাইত "আমি লাল লাল ফিতের লেগে কেঁদেছিলাম মা, স্বামী আমায় কিনে দিলো না"। গ্রামীণ মুসলিম জীবনের খ্ণড চিত্র ভেসে আসত সে সব গানে। কিন্তু সব নাকি আজ হারাম। বহু মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামে বিভিন্ন উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে নাটক যাত্রাপালাসহ নানা ধরণের সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ চোখে পড়ত। এখন সেই ঐতিহ্য আসতে আসতে ফিকে হয়ে আসছে। গ্রামে গ্রামে অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত মানুষের মধ্যে ফিসফিসানি শোনা যাচ্ছে এগুলো সব 'হারাম'। সেই ফিসফিসানি গুলোই একসময় তবলিগী হাফেজের মুখের নির্দেশ হয়ে যাচ্ছে। এসব 'বিজাতীয়' সংস্কৃতি নাকি সহী মুসলমান হওয়ার পথে অন্তরায়।

হাজার বছরের উদার সুফীবাদী মারফতি মাজহাবকে কেন্দ্র করেই গ্রামীণ ও শহর বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনের নির্মাণ। যে সুফীবাদের বিরুদ্ধে তবলিগীরা খড়গহস্ত সেই সুফীবাদীদের হাত ধরেই একাদশ শতকে বাংলায় ইসলামের আবির্ভাব। তারা ভারতের বৈদিক দর্শনকে চ্যালেঞ্জ জানায় নি, বরং তারা ভীষণ রকম করে চেয়েছে দর্শনগত ও সাংস্কৃতিক সংশ্লেষ। তাই ভারত ভূখন্ডের ভারতীয়ত্বকে আদর করে কাছে টেনে নিতে তাদের খুব বেশি অসুবিধা হয় নি। তাদের সুরের মূর্ছনা, উদার আবেগঘন আহ্বানে অন্ত্যজ শ্রেণীর পীড়িত হিন্দুরা ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে শুরু করে। সেই উদার সুফীবাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই এতদিন ধরে বুকে করে বয়ে আনছে গ্রামীণ বাংলার মুসলিমরা। আজও আমরা দেখি পীর দরগা মাজারে শুধুমাত্র মুসলিমরা নয় সব ধর্মের মানুষ এসে ভীড় করেন। সাম্প্রদায়িক হানাহানি ধর্মীয় বিদ্বেষের যুগে এ এক অনন্য ভাললাগার চিত্র সেই সব মানুষদের কাছে যারা সর্বধর্ম সমন্বয়ের স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকেন।

অন্ত্যজ শ্রেণীর পীড়িত অপমানিত হিন্দুদের সম্মানিত করে ইসলামে আশ্রয় দিয়েছিলেন যে দানশীল উদার পীরবাবারা তাদেরই মৃত্যুর পর তাদের সমাধিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দরগা মাজার। সেই সব মাজারে গিয়ে 'কবর জিয়ারত' হিন্দুদের মহালয়ার দিন পিতৃতর্পণের মতো অনেকটা। ফি বছর পীরবাবার 'উরস' কে কেন্দ্র করে সব ধর্মের মানুষ আসেন পীরবাবার কবরে চাদর চড়াতে। মেলা বসে। কবি গানের আসর জমে। দূরদূরান্ত থেকে বাউল ফকিরেরা এসে সুরে সুরে ভাসিয়ে দিয়ে যায় মেলা ও মাজার চত্বর। গ্রামীণ বাংলার সমাজসাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে এসব কিছুই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু সেগুলো সবই 'বেহুদা' বলে ঘোষণা দিতে শুরু করেছে তবলীগ জামাতিরা। তারা মনে করে শবেবরাত থেকে শুরু করে প্রিয়জনবিয়োগের পরে চল্লিশায় (শ্রাদ্ধ) এতিম-ফকির ভোজন বা বিবাহকেন্দ্রিক আমোদপ্রমোদের অনুষ্ঠান সবকিছুই 'বেশরিয়তি'। সংস্কৃতিপ্রিয় সঙ্গীতপ্রিয় আমুদে হাসিখুসি বাঙালীর মূল সত্তাটিকেই তারা দুমড়েমুচড়ে ভেঙে দিয়ে শহী মুসলমানের কাটখোট্টা নিরস ছাঁচে ঢেলে দিতে চাই।

গ্রামবাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত আর একটি বিষয় হল মহরম নামক শোকোৎসব। চোদ্দশ' বছর আগে ফেরাৎ ( ইউফ্রেটিস) নদীর তীরে কারবালার যুদ্ধে হজরত মুহম্মদের দৌহিত্র ইমাম হুসেনকে ছলচাতুরী করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সেই তিক্ত স্মৃতিকে স্মরণ করেই মর্সিয়া, জারি আর মাতমের মতো শোকগাথার সুরেলা উচ্চারণে প্রতি বছর মহরম মাসে তৈরি হয় শোকের আবহ -- "ফেরাৎ নদী রাঙা হল লহুর ধারায়, হোসেন-শোকে মাতম করে যত মোমিনাই"। মহরমের খেলা দেখানো যেকোন চত্বরকে বলা হয় "কারবালা"। সেই কারবেলায় মর্শিয়া, জারি গান শোনানো হয়। মর্সিয়া গানে গায়কেরা বুক চাপড়ে তাল দেয়। জারি গানে তাল দেওয়া হয় হাতে তালি দিয়ে। জারিতে দোহারেরা সারিবদ্ধভাবে মুখোমুখি বসেন আর মূল গায়েন তাদের মাঝ দিয়ে এগিয়ে পিছিয়ে হেলেদুলে গেয়ে কারবালা যুদ্ধের কাহিনী বর্ণনা করেন । মুর্শিদাবাদ মালদার মতো মুসলিম অধ্যুষিত জেলা গুলিতে মর্সিয়া গানের চলটাই বেশি। এই গানে মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মূল গায়ককে ঘিরে থাকেন গায়েনরা। মূল গায়ক গাইবেন আর তাঁকে ঘিরে থাকা গায়েনরা সেই লাইনটি ফিরে ফিরে গাইবেন। মর্সিয়া গানে গায়ক বারবারই ফিরে যান গানের প্রথম পংক্তিতে।

মর্সিয়ার এই বিরহগাথা গুলো যারা রচনা করেন তারা অতি বড় সুশিক্ষিত উচ্চশিক্ষিত গোছের কেউ নয়, তারা হয়ত টুকটাক ব্যবসাপাতির সঙ্গে যুক্ত বা স্কুলজীবনে সংসারের দায়ে স্কুলছুট দিনমজুর বা কোন রকমে স্কুলের গণ্ডী পেরোনো কোন মানুষ। তাদের সৃজনী ক্ষমতায় বেরিয়ে আসে -- "আয় বুকে আয় আসগর আলী দেবী বরণে। তুই যে আমার দুধের ছেলে সইব কেমনে" কিংবা "তীর হানিয়ে কাফেরগনে কারবালায় গেলে। পানি তো পাবি না, বেটা ডাকবি মা বলে"। কখনও কখনও মর্সিয়া গানে শোনা যায় কারবালার যুদ্ধে পতিহারা অসহায় যুবতীর করুন আর্তনাদ -- "বিয়ের রাতে এই দু'হাতে মেহেন্দি আমি মাখি না/আজকে দেখ টুকটুক লাল তোমার তাজা খুনেতে"। বাংলার বধূর এই করুণ সুর আমাদের সামনে ভাসিয়ে দেয় চোদ্দশ' বছর আগের বীভৎস কারবালা যুদ্ধের পরবর্তী করুন অসহায় সমাজজীবন। । লাঠি আর বাঁশের কঞ্চি নিয়ে গ্রাম বাংলার যুবকেরা যে অসামান্য দক্ষতায় নকল যুদ্ধের মহড়া দেখায় সেগুলোর তারিফ না করে পারা যায় না। তাই বলি, মহরম বলতে যারা শুধু লাঠিলাদনা আর বিকট চিৎকার বোঝেন তারা মহরমের বিকৃত সাংস্কৃতিক রূপটা দেখেছেন, মূলগত রূপটার সঙ্গে তাদের পরিচয় নেই।

এসবের পাশাপাশি ঈদের দিনের সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মহরমের চালের রুটি গোস্থের ঝোল হালুয়া, শবেবরাতে মাগরিবের পর মোমবাতি জ্বালানো সবই নাকি 'নাজায়েজ', 'বেশরিয়তি','বেদ্বীন' । যে গ্রামীন বাংলার নারীদের ঐতিহ্যের পোষাক শাড়ি, সেটাও নাকি অনৈসলামিক, তাই পরা যাবে না, চুড়িদার পরতে হবে। কিন্ত পীর দরগায় যারা যান, শবেবরাত পালন করেন, ঈদের সন্ধেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হাজির থাকেন, কবর জিয়ারত করেন তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া থেকে শুরু করে রমজান মাসে রোজাও রাখেন, জাকাতও দেন। যাবতীয় ইসলামীয় আকিদা মেনেও পীর ফকির আউলিয়া আর মারফতিতে মজে আছে বাংলার মুসলমান। তাই বলি, ধর্ম ধর্মের জায়গায় থাক, সংস্কৃতি সংস্কৃতির জায়গায়।শুদ্ধিকরণের নামে ধর্ম থেকে এই সংস্কৃতিকে ছেঁটে ফেলা সম্ভব না,সেটা করা মানে সাংস্কৃতিক শোষণের পথ প্রশস্ত করা। অন্যদিকে আমরা মিশ্র সংস্কৃতির দেশে থাকি তাই শুদ্ধিকরণের নামে যেকোন ধরনেই ধর্মীয় কট্টরপন্থায় এখানে বেমানান, যার দরুন দিনের শেষে আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে শোষিত হতে হয়। যে জাতির কোন নিজস্ব সংস্কৃতি থাকে না, সে জাতি আত্মপরিচয়হীন কঙ্কালে পরিণত হয়। আমরা চাই না বাঙালী মুসলমান সবকিছু হারিয়ে কঙ্কাল হয়ে যাক।

পক্ষে | বিপক্ষে | অপাক্ষিক



288 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ মোচ্ছব  আলোচনা  বুলবুলভাজা  উৎসব ইস্পেশাল ২০১৮  কূটকচালি 
শেয়ার করুন


Avatar: Tim

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় কুপ্রথার উদযাপন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা

তিনটে আলাদা সেকশান হওয়ার অসুবিধে হলো তিনটে পাতায় ঘুরে ঘুরে এখন আলোচনা করতে হবে, যখন মূল বিষয়টা একই। যাই হোক, এখানকার লেখাগুলোও ভালো হয়েছে।

বিপক্ষে এবং নিরপেক্ষ লেখাগুলোর মধ্যে প্রচুর ওভারল্যাপ আছে। আমি খুবই সন্দিহান যে এই শ্রেণীবিন্যাসের কাজটা আদৌ করা সম্ভব। যেহেতু এটা নিরপেক্ষর পাতা তাই এখানেই আপাতত লিখি আমার কেন এরকম মনে হয়েছে। অচল সিকির লেখা বিপক্ষে না নিরপেক্ষ, সুমন মান্নার লেখা নিরপেক্ষ না পক্ষে? এইগুলো বিচার করা খুব কঠিন। সিকির নিজের কথাতেই আছে যে হাওয়াবদলের সম্ভাবনা দূর অস্ত তাই একপ্রকার মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। সুমন লিখেছেন দিনের শেষে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথা, যা পূবালী বা জারিফার অবস্থানের সাথে খুবই মেলে, উৎসবের আলোকিত দিকটাই সেটা মনে করিয়ে দিতে চায়, কাজেই এই শ্রেণিবিন্যাস মুশকিল।
Avatar: Du

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় কুপ্রথার উদযাপন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা

সম্রাট আমীনের লেখাটা খুবই আগ্রহ নিয়ে পড়লাম। দু দিক থেকে এই 'শুদ্ধিকরনের' প্রচেষ্টা একে অপরকে হাওয়া দিয়ে চলেছে। বাংলা এর থেকে বাঁচবে কি করে? ঃ((
Avatar: Vivek

Re: বিতর্ক - আমাদের উৎসব ধর্মীয় কুপ্রথার উদযাপন নয়, এ নেহাত নান্দনিক ফূর্তিফার্তা

নাইস থাঙ্কস ফর sharing
https://www.viiralfest.com/


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন