বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

মান্টো - বোল কি লব আজাদ হ্যায়

বোধিসত্ত্ব দাশগুপ্ত

বিধিসম্মত সতর্কীকরণ
একেবারে সিকুলার লোকজন ছাড়া এই পোবোন্দোতে কারো আগ্রহ পাবার কথা না। মান্টো, দেশের খোঁজে পথ হারানো এক মাতাল মাত্র, দেশপ্রেমী নন, সুখপাঠ্য নন, এমনকি অনেক সময়েই খুব নিরীক্ষামূলক গদ্যের রচয়িতাও নন এবং আমরা যারা দুটি সাধারণ মানুষদের নিয়ে লেখা গল্প পড়ে দেশোদ্ধার করছি বলে ভাবি তাদেরও কোন উপকার করার সুখ দেবার লোক তিনি নন।রবীন্দ্রনাথ যেমন এখন ঘন ঘন 'আমার রবীন্দ্রনাথ' হয়ে উঠছেন আজকাল, যেটাতে একেকটি রচনা পাঠ বা শ্রবণ প্রতিক্রিয়ার অনুভূতির নিজস্বতার একটা স্বীকৃতি হয়েছে, কিন্তু এক ই সঙ্গে দীর্ঘ অধ্যয়নের দায় থেকে নিষ্কৃতি ও থাকছে, তেমন করে যখন তখন মান্টো র পক্ষে 'আমার মান্টো' হয়ে ওঠা একটু চাপের, স্বীকৃত মূল্যবোধের কাছে স্বীকৃতির অপেক্ষায় মান্টো এবং তাঁর সৃষ্টি বসে নেই। প্রতি মুহুর্তেই জীবন কে একেবারেই না চেনার গ্লানি আপনাকে তাড়া করবে। এই জগতে চরিত্রগুলির মহত্ত্বে উত্তরণ সম্ভাবনা শুধুই টিঁকে থাকার প্রয়োজনের/ উন্মাদ ক্রোধ বা লালসার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় প্রায়শঃ পরাজিত হয়। অন্যদিকে সংবেদনশীল কল্পনার একটা আত্মানুসন্ধানের নীচু গভীর স্বর যেটা আমরা শিল্পাদর্শ বিষয়ে নিজস্বতার অধিকারীদের কাছে পেয়েই থাকি, সেরকম মুহুর্ত যে পাবা যাবে না তা না, কিন্তু অপেক্ষায় থাকলে ঠকতে হতে পারে এবং খ্যা খ্যা শব্দে তীব্র ব্যঙ্গের ঢেউ বুকে ধাক্কা দিতে পারে। তাই মান্টোর লেখা শুধুই জ্ঞানার্জন বা মনোরঞ্জন বা সাহিত্য রস আস্বাদনের কিম্বা দার্শনিক চিন্তার একটা একাকী কোণ খুঁজে পাবার ইচ্ছা নিয়ে পুরোটা পড়ে ফেলা কঠিন। অতএব ব্যস্ত, সফল, সাফল্যের অবসাদে আত্মজীবনী রচনায় মন দেওয়া সিনিয়র পেশাদারগণ বা অন্তত মনে মনেও এমবিএ হয়ে যাওয়া মানুষেরা দয়া করে সময় নষ্ট করবেন না। মান্টো কোন সংক্ষিপ্ত বিষয় নন, পাওয়ার পয়েন্টে আঁটবেন না! এছাড়া সিনেমা যাঁদের বিষয়, যাঁরা অধ্যয়ন করেছেন, যাঁরা সিনেমা বানান বা প্রোডাকশনে জড়িত থাকেন, ব্যাপারটা যাঁদের অনেকদিন ধরে চর্চার মধ্যে রয়েছে, যাঁরা সিনেমা ভালোবাসেন, যাঁরা অভিনেতা দের কাজ খেয়াল করে দেখেন, তাঁরা কেউই এই প্রবন্ধ থেকে কিচ্ছু পাবেন না।

গোঁড়ার কথা
এই ধৃষ্টতা আগে কখনো করিনি। একটা ফিল্ম সম্পর্কে লিখতে বসেছি । অনতি দেড় দশক ধরে মামুর কলে দীর্ঘ নানা পোস্টে বৈচিত্রহীন এবং নিরন্তর ভাবে বহু ভদ্দরলোকের ছেলে মেয়েদের ধৈর্য্য পরীক্ষা করার দীর্ঘ সাধনার পথ অতিক্রম করা সত্ত্বেও, প্রকৃত বিপ্লবীরা লক্ষ্য করে থাকবেন, মহামতি দুলাল চন্দ্র ভড়ের প্রতিষ্ঠিত আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমি অন্তত সই সহ যে প্রবন্ধ গুলি লিখে থাকি তাতে একটা কাজ চালাবার মত যত্ন থাকে, কিন্তু সিনেমা সম্পর্কে হবার কারণে এখানে পরিশ্রম কইরাও কোন লাভ বিশেষ নাই।

আমি ফিল্মে গন্ডমুর্খ, হল অন্ধকার হলেই ঘুম পায়। যেখানে বড় হয়েছি, সেখানে দুটি বড় দোতলা হিসির গন্ধ ওয়ালা উঁচু ঘরকে ‘হল’ বলা হত। তাদের নাম ছিল ‘চিত্রা’ আর ‘বিচিত্রা’, দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে অ্যামোনিয়া সুবাস ও প্রাকৃতার্থে রসবোধ যথাক্রমে অপেক্ষাকৃত তীব্র ছিল। এসব হলে পয়সা ছোঁড়া, নাচা, লিঃ(২) গুরু(২) বলা, নিজের বান্ধবী কে অন্ধকারে চুমু খেতে গিয়ে দেখা সে অন্য কাউকে চুমু খেতে ব্যস্ত রয়েছে, অথচ পরে এই সামান্য মনোমালিন্য বা অল্প হাতাহাতিকে পাশে সরিয়ে রেখে সবাই মিলে গজা বা গোলাপি রংএর আইসক্রিম খাওয়া, কিংবা উত্তম দার সেলুনের শ তিনেক র‌্যালে, হিরো, বিএসএ র পেছনে এক্সক্লুসিভ পার্কিং লট থেকে সাইকেল বের করতে, “কি রে বারা গত চুল কাটার পয়সা টা কি তোর বাবা দেবে না ঐ পাড়ার তোর দাদুর কটা চোখো সেই চুঙ্কু জয়া প্রদার কাছে চাইতে হবে রে” ইত্যাদি বাণী শোনা ... দিনগত ক্রিয়াকর্মাদি সাব-অলটার্ন এর ভাষার অন্তর্গত ছিল, এবং তখনো সে ভাষা ইংরেজিতে বোবা হয়ে ওঠে নি! ‘চিত্রা’ নিয়ে অবশ্য ইয়ার্কি করা যাবে না, সেখানে আমরা সপরিবারে মৃনাল সেন দেখেছি, ‘ঘরে বাইরে’ও দেখেছি, নিখিলেশ বিমলার বেম্মো চুমু দেখে বোর হয়েছি আর বাবা কে “এ সব তো ছিল না” গোছের প্রতিক্রিয়ায় অন্ধকারেই বিব্রত হতে দেখেছি, ছোটোবেলায় স্পেশাল শো তে ‘বর্ন ফ্রি’ বা চ্যাপলিনের ‘কিড’ দেখেছি, আবার বয়সকালে একবছরে দশ বারো বার শোলে দেখে নিজেদের পপুলার কালচারের বাড় বাড়ন্তর জন্য প্রস্তুত করেছি। তার পরে এলো ‘কালিকা’ হল, সেখানে ঠাকুমা কে নিয়ে “ওং নমঃ শিবায়” বা “জয় মাতাদী” গোছের কিসু দেখতে গিয়ে একটুর জন্য “জবানী কি উওহ রাত” না দেখে বেঁচে ফেরার একাধারে উত্তেজনাপূর্ণ ও চুক-চুক আফশোসে ভরা অভিজ্ঞতা শীর্ষেন্দুর যে কোনো গল্পের থেকে কম রোমহর্ষক না। তো এই যার সিনেমা সংক্রান্ত শিক্ষা তার কপাল-ফ্যারে বিবাহজনিত নানা জটিলতায়, বই কে ছবি বলা শিখতে হয়েছে, এবং হলে ঘুমালে অন্তত নাক না ডেকে ঘুমোনো বা ঘুমোতে ঘুমোতে-ই 'এই জায়গাটা না কি অদ্ভুত রকমের ভীষণ অপূর্ব' বলার অতি সুক্ষ্ম আর্ট রপ্ত করতে হয়েছে।

এই নানা সামাজিক সমস্যা সত্ত্বেও আমি নন্দিতা দাস কৃত মান্টো দেখেছি, এবং ঘুমিয়ে পড়িনি।

৪০ এর দশক/দেশভাগ কে কিছুতেই হজম না করতে পারা/ প্রগতিপন্থী দের সঙ্গে শিল্পাদর্শ ইত্যাদি সংক্রান্ত সংঘাত/ ভারী চশমার পেছনে আশ্চর্য্য দৃষ্টি এই সব কারণে, প্রান্ত-ভাষা -সাংস্কৃতিক ভিত্তি-মাধ্যম-প্রকরণ-বিশদ সম্পূর্ণ আলাদা হলেও অন্তত আমার পক্ষে মান্টো সংক্রান্ত ফিল্ম দেখতে গিয়ে ঋত্বিক সম্পর্কে বানানো কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় কৃত ফিল্মটি মনে পড়া আশ্চর্য্য কিছু না। যদি আমাদের পূর্বপুরুষের করা আদি পাপটির নাম হয়ে থাকে পার্টিশন, তাহলে আদি পাপবোধের নাম, ঠিক ভাঙা দেশের মতই একই বৃন্তে দুইটি ভগ্নহৃদয়, ঋত্বিক ও মান্টো, যাঁদের কাজ আজ এতদিন পরেও আমাদের স্বাধীনতা উত্তর ঘুম কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে, সাহস দেখায়, রক্তাক্ত করতে ছাড়ে না।

কমলেশ্বর এর ছবিটিতে জোরটা রয়েছে মূলতঃ শিল্প সংক্রান্ত বিতর্কে যেখানে সমসাময়িক দের সঙ্গে ঋত্বিকের একটা প্রায় প্রাণান্তকর বিতর্ক চলছে, ব্যক্তিগত ঘটনাগুলি এই অনুসন্ধানে যতি চিহ্ন মাত্র। নন্দিতা দাশের মান্টো তে ফোকাস অন্যত্র, কিন্তু তবু না মনে পড়ে উপায় নেই। দুটি ই পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বায়োপিক নয়, কিন্তু নির্দেশকদের যত্নটা তুলনীয়।

ঋত্বিক এবং মান্টোর ক্ষেত্রে যেটা সবচেয়ে আশ্চর্য্য লাগে, তিরিশের দশকে এসে পড়া আধুনিকতার সঙ্গে সম্যক পরিচিতি, প্রচুর অধ্যয়ন, নিরন্তর নিজের ভাষার খোঁজ, ৪০ এর দশকের রাজনীতি, প্রগতিশীল শিল্পী দের শিল্পাদর্শ সংক্রান্ত বিতর্ক, দেশের অবস্থা, স্বাধীনতা, দেশভাগ ইত্যাদির ঘুর্ণিঝড়ে দুজনের প্রতিক্রিয়াটা কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা হচ্ছে, মান্টো শুরুর সময়ের থেকেও আরো বেশি কড়া রিয়ালিস্ট হয়ে উঠছেন, বিশেষতঃ ১৯৪৩ এর পর থেকে, অন্যদিকে ঋত্বিক লোকসংস্কৃতির একটা শিকড় সন্ধান করতে গিয়ে যে সিনেমার ভাষা তৈরী করছেন তাকে দুঃস্বপ্নতাড়িত রিয়ালিজম বলা চলে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার একটা পার্শ্বকাহিনী খুব অপ্রাসঙ্গিক হবে না। আশির দশকে ঋত্বিক মেমোরিয়াল ট্রাস্টের পক্ষ থেকে ঋত্বিকের একটি ছোটো গল্প সংগ্রহ ছাপা হয়, এবং অফ অল প্লেসেস, পৌষমেলায় পার্টির বইয়ের দোকানে আমি সেটা কিনে ফেলি এবং রুদ্ধ্বশ্বাসে শেষ করি। পরে ভেবে দেখেছি, গল্প গুলো এমন কিছু না, কিন্তু আমার কাছে ঐটেই ঋত্বিকের সঙ্গে প্রথম পরিচয় কারণ আমি ঋত্বিকের ফিল্ম দেখেছি অনেক পরে, গল্পের ঋত্বিক যাঁকে শুনতে সোমনাথ লাহিড়ির গল্প গুলোর মত অনেকটাই, যেখানে নগর একটা স্খলনের পরিসর. তিনি সিনেমার জগতে এসে ভাষা নিরুপণে সম্পূর্ণ নিজস্বতা অর্জন করছেন, সেটার কোন পূর্বাভাস গল্পগুলিতে ছিল বলে মনে পড়ছে না। ঋত্বিকের চিঠি, প্রবন্ধ আমার পড়া হয় নি, সেখানে আশা করা যায়, তাঁর শিল্প ভাবনা সংজ্ঞায়িত হয়েছে।

অমৃতসরে তিরিশের দশকের আর পাঁচটা ভাবনা চিন্তা করা যুবকরা যখন ভগত সিং এবং বলশেভিক বিপ্লবের আগুনের আঁচ অগ্রাহ্য করতে পারছেন না, সেখানে মান্টোর তৈরী হয়ে ওঠার গল্পটা আমাদের দেশের অন্যান্য ভাষা সাহিত্যের আধুনিকতার সূচনাপর্বের পর্বের ছবির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। প্রচুর পড়ছেন, অসকার ওয়াইল্ড, চেকভ, পুশকিন, মপাসাঁ, হুগো i । অমৃতসরেই সমাজবাদী 'মুসাওআত' পত্রিকায় কর্মরত আবদুল বারি আলিগ ii নামক এক সাংবাদিকের পাল্লায় পড়ে হুগো এবং অস্কার ওয়াইল্ড অনুবাদ করছেন, এবং বারি সাহেবের উদ্যোগে অমৃতসরেই এই সব অনুবাদ কিছু প্রকাশিত হচ্ছে ১৯৩৩-১৯৩৪ এর সময়টার মধ্যে।

এর পরে টিবিতে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং আমাদের সৌভাগ্য যে সেরেও উঠছেন, কিন্তু তার পরে লাহোরে চলে যাচ্ছেন একটা পত্রিকার কাজ নিয়ে। সেখান থেকে নাজির লুধিয়ানভির আমন্ত্রনে 'মুসাবিরা' পত্রিকাটিতে কাজ করার জন্য বম্বে আসছেন ১৯৩৬ নাগাদ। এর পরে কিন্তু আবার ১৯৪২ নাগাদ দিল্লী চলে যাচ্ছেন রেডিওতে নাটক আর নানা স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ নিয়ে, মন পড়ে থাকছে বম্বের বন্ধুদের কাছে। ফিরে আসছেন ১৯৪৫/৪৬ নাগাদ, ফিল্ম স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ করছেন, স্বাধীনতা আসছে ১৯৪৭ এ আগে পিছে দেশ জোড়া দাঙ্গা আর দেশ ভাগ নিয়ে, মান্টো সহ্য করতে পারছেন না, খানিকটা অভিমানেই সাম্প্রদায়িকতা আক্রান্ত বম্বে ছেড়ে লাহোর চলে যাচ্ছেন, আর শেষ দিন পর্যন্ত নাগরিক বাস্তবতাই তাঁর মূল বিষয় হয়ে উঠছে, অথচ পার্টিশনের পরে দুটো দেশের রাষ্ট্র নির্মাণ পদ্ধতি যাই হোক না কেন, নাগরিক সহাবস্থান কে অস্বীকার করেই, এক ধরণের বিশুদ্ধতা নির্মাণের রাজনীতিই সে সময়টা মানুষের কল্পনার রাজ্য অধিকার করে ফেলেছে।এ সমস্যা পাকিস্তানে বেশি বই কম না। ভোলা উচিত না, টোবা টেক সিং লেখা হচ্ছে স্বাধীনতার বেশ কিছুটা পরে, ১৯৫৩ নাগাদ (কোথাও বলা হচ্ছে ১৯৫৫ তে) প্রকাশ হচ্ছে, 'সভেরা' পত্রিকায়, লাহোর থেকেই। মান্টোর পক্ষে কোনদিন নগরের বাইরে শিকড় সন্ধান সম্ভব হচ্ছে না, তার কারণ হিসেবে আমরা বলতে পারি উর্দু সাহিত্যের যে ঐতিহ্য সেটি আদ্যন্ত নাগরিক iii , ব্রিটিশ উপনিবেশ পূর্ববর্তী উত্তর ভারতীয় নাগরিকতার চেহারাটি ই উর্দু ভাষাকে তার জঠরে ধরেছিল। পাকিস্তান গঠনের আগে উর্দু কেবল মাত্র শাসকের ভাষা হয়ে ওঠেনি। iv

শহরের নীচুতলার লোক দের জীবনকে বার লেখালিখির মূল বিষয় করেছেন প্রায় নাছোড়বান্দা হয়ে, অথচ সবসময়ে, প্রগতি সাহিত্যের আদর্শ অনুযায়ী অনেক ক্ষেত্রেই খুব আশার কথা, উত্তরণের পূর্বাভাস কিছু দিতে পারেন নি, 'সিয়াহ হাশিয়ে' র প্রতিটি অনুচ্ছেদে এক ভয়ঙকর বিরামহীন নামহীন নিষ্ঠুর বাস্তব উঠে আসে যেটা দস্তয়েভস্কির 'নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড' এর থেকেও ভয়ংকর, এমনকি ওয়ার্ল্ড ফিল্ম এর জগতের মেক্সিকোর 'আমোরেস পেরোস' বা ব্রাজিলের 'সিটি অফ গড' ফিল্মের ভয়াবহতা র সঙ্গে তুলনীয়।

নির্দেশনা প্রসঙ্গে একটা কথা বলা যেতে পারে। নন্দিতা দাশ মোটামুটি তাঁর ফিল্ম বানানোর উদ্দেশ্য নিয়ে পরিষ্কার। মান্টো বানানোর পাশাপাশি একটা শর্ট ফিলম বানিয়েছেন, নাম দিয়েছেন 'ইন ডিফেন্স অফ ফ্রিডম', মান্টোর চরিত্রের অভিনেতাকে দিয়েই একটা বক্তৃতা দেওয়ানো হয়েছে, বিষয় শিল্পীর স্বাধীনতা, মূল ফিলমটির মধ্যে একটা অসাধারণ গান ব্যবহার করা হয়েছে ফইজ আহমেদ ফইজ এর ১৯৪১ এ লিখিত ‘বোল’ কবিতাটির v কথার উপরে ভিত্তি করে, 'বোল কি লব আজাদ হ্যায়' (গেয়েছেন রশিদ খান এবং বিদ্যা শাহ, সুরকালা আমার প্রাণ ভরে গিয়েছে), নাগরিক বাস্তবতায় দেহপসারিণী দের কথা, দাঙ্গার সময়কার বিচিত্র যৌনতার কথা লিখতে গিয়েও, লড়াই টা শুধু শিল্পীর স্বাধীনতায় আবদ্ধ থাকে নি, নাগরিকের বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বাধীনতা কথাই উঠে এসেছে। নন্দিতা দাশ সময়ের দিক থেকে দেখতে গেলে, মান্টোর বম্বের দ্বিতীয় পর্যায়টিতেই ফিল্ম কে সীমাবদ্ধ রেখেছেন, ১৯৪৬-১৯৪৮ অব্দি, ৪৮ পরবর্তী আধপোড়া লাহোর এসেছে অবশ্য। বুঝতে অসুবিধে হয় না, আমাদের মত সিকুলার দের হয়েই সাম্প্রতিক বাকস্বাধীনতা বাকস্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের ধর্ম নিরপেক্ষ চরিত্রটি রক্ষার রাজনৈতিক বিতর্কে মাঠে নামছেন নন্দিতা। কিন্তু খুঁতখুঁতে হতে গেলে বলাই যায়, ফিল্মটার, বিভিন্ন কাহিনী আর মেমোয়ারের অংশ থেকে জুড়ে তৈরী করা ন্যারেটিভে একটা সমস্যা হল, অমৃত্সর, লাহোর প্রথম পর্যায়, বম্বে প্রথম পর্যায়, দিল্লীর মান্টো অনুপস্থিত, শুধুই ৪৬-৪৮ এ রেখেছেন মান্টো কে। এবং সে কারণেই বুদ্ধিজীবির অনুসন্ধানের তীব্র যন্ত্রনা র দীর্ঘ কাহিনীটি যেন এক দিকে পিরিয়ড ফিল্মের দিক গুলি অন্যদিকে সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক লড়াইটির চাপে একটু স্বল্প উ্চারিত থেকে গেছে প্রথম দিকে, যদিও ইরানী কাফেতে ইসমত এর স্বামী র সঙ্গে বিতর্কের অতি সংক্ষিপ্ত দৃশ্যটি এবং লাহোরের অশ্লীলতা সংক্রান্ত মোকদ্দমার দৃশ্যটি সেই অভাব কিছুটা পূরণ করেছে। এবং এই সমস্যা থেকেই একটা বৃহত্তর সমস্যা তৈরী হয়েছে। যদিও সমস্যাটি অন্তত এই সিনেমায় খুব প্রকট কিছু না।

ফিল্মটির মধ্যে সমস্যা প্রকট না হলেও, সমস্যাটি ছোটো না। যেহেতু ফিলম বানানো হচ্ছে 'ইন ডিফেন্স অফ ফ্রিডম', তাই আমাদের দেশের ইতিহাসে রাজ্নৈতিক ভাবে সবচেয়ে অস্থির সময়টাতেই, ৪৬-৪৮ এর বম্বের মান্টো কে সীমাবদ্ধ করতে গিয়ে গন্ডগোল যেটা হয়েছে, 'গাঞ্জে ফেরেশতে' এবং 'লাউডস্পিকার' এর উপরে স্ক্রিপ্টের অনেকটা দাঁড়িয়ে আছে। এগুলি বম্বে মহানগরী এবং বম্বে ফিলম দুনিয়া সম্পর্কে লেখা মান্টোর প্রখ্যাত মেমোয়ার। হয়তো নন্দিতা এ সম্পর্কে সচেতন তাই এটা সেই যাকে বলে ইনডাস্ট্রির পিরিয়ড ফিল্ম গুলো (যেখানে 'লুক' ই সব) হয়ে ওঠেনি। দাঙ্গা কবলিত বম্বে শহরে অশোক কুমারের গাড়িতে শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত যাওয়া, জদ্দন বাইয়ের গান, নায়ক শ্যাম চাড্ডার বন্ধুত্ত্ব প্রসঙ্গ ও মুহুর্ত গুলি এসেছে। সেটা এই ফিল্মে প্রয়োজন ও ছিল, কিন্তু বড় সমস্যাটা বোঝা যাবে নীচে দেওয়া পুস্তক তালিকা থেকে। মান্টো চর্চায় একটা বিরাট সমস্যা হল, বম্বে র এই ফিলম দুনিয়ার মেমোয়ার আর হাতে গোণা কয়েকটি গল্প বার কতবার যে প্রকাশিত হয়েছে, একাধিক নানা মাপের ও মানের সংকলনে, তার ইয়ত্তা নেই। এবং অনুবাদের দিক থেকে দেখলেও, এই সীমিত কিন্তু অতি অসাধারণ সম্ভারটিই বার অনুদিত হচ্ছে, এবং মান্টো চর্চার দেশি ইংরেজি তে একটা পপুলার সেকুলার জগতের সীমাবদ্ধতার দিকনির্দেশ করছে। আকাদেমিয়াও এই সীমিত মান্টোর চর্চা করছে। vi মান্টোর প্রায় তিনশো গল্প রয়েছে, অসংখ্য স্কেচ, চিঠি রয়েছে, রেডিও নাটক রয়েছে প্রচুর, তাঁর নিজের করা অনুবাদ বা সাংবাদিকতার কাজ রয়েছে, আমি জানিনা হিন্দী বা উর্দু বা পাঞ্জাবীর প্রকাশনার জগতের বাইরে এই গোটা সৃষ্টির সমষ্টিটার তেমন কোন পরিচিতি কেন নেই, এবং মনে রাখা দরকার সেখানেই মান্টো তাঁর পছন্দের বাস্তবতার হয়তো অনেক কাছা কাছি রয়েছেন। হয়তো এগুলোই তাঁর সেরা কাজ, কিন্তু চর্চাটার কারণ দেশী আর্বান সেকুলারিজম এর এগুলি আইকনিক চিহ্ন, দেশের যা অবস্থা তাতে এই চর্চা আমাদের আঁকড়ে ধরার মত একটা জিনিশ বটে কিন্তু মান্টো কে আরো সম্পূর্ণ ভাবে পাওয়া গেলে মন্দ হত না। জানিনা সচেতন ভাবে কিনা, নন্দিতা কিন্তু অনুবাদের আরাম না দিয়েই, ফিল্মের একেবারে শেষে পাঞ্জাবীতেই ব্যবহার করেছেন, মান্টো চরিত্রের মুখেই দিয়েছেন, টোবা টেক সিং এর সেই লেজেন্ডারি পাগলের প্রলাপ, "উপর দি গুড়গুড় দি আনেক্সে দি বেধিয়ানা দি মুঙ্গ দি ডাল দি অফ দি পাকিস্তান হিন্দুস্থান দি দুর ফট্টে মুন"।

গান
'মান্টো' ফিল্মটার সম্পদ গোটা চারেক গান, গানের তো কিছুই বুঝি না, কিন্তু গান গুলো ভালো লেগেছে। রশিদ খান, রেখা ভরদ্বাজ, সুভা যোশী, বিদ্যা শা, শংকর মহাদেবন গেয়েছেন। এবং একেবারে তরুণ বয়সী সংগীত পরিচালক স্নেহা খানওয়ালকর, সিনেমা আমার ভালো লাগে না বলে খবর ও রাখি না, কিন্তু সত্যি মনোমুগ্ধকর হয়েছে গান গুলো।

একটা গানের ক্ষেত্রে যন্ত্রানুষঙ্গে এমনি ৪০ এর দশকের ফিল্মের গানের মত সুর শোনালেও মাঝে ঐ উইন্ড ইনস্ট্রুমেন্ট দিয়ে জ্যাজের মত একটা অনুভূতি তৈরী করে দেওয়া হয়েছে। অন্য আরেকটা গানে আবার রেডিওর গানের মত যাতে শোনায় তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এগুলোর প্রাযুক্তিক বা সুরের দিক গুলো নিয়ে বলার যোগ্যতা আমার নেই, কিন্তু এই সিনেমা সকলে না দেখলেও গান গুলোর থেকে যাওয়ার কথা।

এই প্রসঙ্গে ই ডিস্ত্রিবিউশন সম্পর্কে কয়েকটি প্রশ্ন করে লেখাটি মানে মানে শেষ করব। বম্বের সিনেমা, তাবড় অভিনেতা আর ব্যক্তিত্ত্ব ফিল্ম টার সঙ্গে জড়িয়ে, কিন্তু ফিল্ম টা চলে নি। জি মিউজিক এর ব্র্যান্ড এর ছাপ রয়েছে ইনটারনেটের জিউকবক্সে। ফিল্ম না হয় চিন্তাহীনতার দেশে, ধর্মনিরপেক্ষতার চিহ্ন হয়ে ওঠা শিল্পীর নামএর সঙ্গে জুড়ে থাকা ফিল্ম আজকের রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে হয়তো না চলার ই কথা কিন্তু তাই বলে গান? আমি রেডিও স্টেশন ইত্যাদি তে বেশি শুনি নি। ইউটিউবের হিট কাউন্ট ও বেশ কম তথৈবচ। টপ টোয়েন্টি রেটিং চার্ট এ প্রচুর গান রয়েছে, যেমন হয়, উর্দু ফার্স্সী আরবিক শব্দ আরবিক সুর সহ আইটেম সং রয়েছে, কিন্তু নাগরিক সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের অবস্থা কি আমরা জানি, তার অবস্থা ঐ মান্টোর মত, সে দেশ খুঁজে বেড়াচ্ছে। মান্টো ফিল্ম টি আমার যা খবর আছে পাকিস্তানে রিলিজ করে নি। মান্টো ফিল্ম সম্পর্কে, তাঁর রচনার অনুবাদ সম্পর্কে তাঁর সর্বভারতীয় গ্রহণযোগ্যতার পেছনে উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতির একটা রাজনৈতিক জোর থাকা, অন্য ভাষার আধুনিকতার সংবাদ অঞ্চলের বাইরে সেরকম ভাবে বড় করে আলোচনা হওয়ার সুযোগ না থাকার সত্যিকারের সমস্যা আলোচনা করার সময়ে এই কয়েকটা কথা একটু খেয়াল রাখা দরকার। সমসাময়িক মতাদর্শকে মান্টো চ্যালেঞ্জ করেছেন ঠিক ই, কখনো কখনো বিবস্ত্র করে দিয়েছেন একেবারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি পরাজিত। মান্টো ফিলম টি, নেহাৎ ই ফিলমটি, প্রচুর রেস্ত না থাকলে যে ফিল্মটি বানানো ও পরিবেশন করা অসম্ভব, সেটিও শেষ পর্যন্ত আমাদের দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মনিরপেক্ষতার পুতুল নাচ থেকে গেছে, তার পক্ষে হিন্দী জাতীয়তাবাদ বা বাজারের উদারতা কারোরই সফল বিজ্ঞাপণ হওয়া এখনো সম্ভব হয় নি। ডেটা তা বলছে না। (এই জায়গাটায় এম বি এ রা আনন্দ পেতে পারেন!)

মান্টোর পুরো কাজ সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে ইংরেজিতে রচিত বইগুলোতেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আলোচিত হয় নি। আর আমাদের গর্বের নেহরুভিয়ান সেকুলারিজমের বাইরে, যেটার গুরুত্ত্ব ছোটো করা যায় না, বিশেষত আজকের ধর্মীয় সংখ্যাগুরুর আস্ফালনের দিনে, গান্ধীর জনপ্রিয়, বিশ্বাসী দের সংহতির এর যে প্রাক ঔপনেবেশিক ভক্তি বাদী চেহারা, দুটোর থেকেই একেবারে স্বতন্ত্র মান্টোর শহরের নীচুতলা আর সেখানকার সংঘাত এবং সৌহার্দ্যের প্রতিযোগিতা এবং সাম্প্রদায়িক সহাবস্থান, তার জন্য পুরো দুনিয়া রয়েছে, সারা পৃথিবীর বড় শহরের অলিতে গলিতে এই ‘আফসানে’ দের বাস, তবে তাদের একটা বেশ দেশ রয়েছে, স্বীকৃতি রয়েছে, 'মঞ্জিল, মুরাদ ও মুদ্দা' রয়েছে, নাগরিকত্ত্ব রয়েছে, এ কথাটা হলপ কইরা কওন যাচ্ছে না।

বলা বাহুল্য একটি অসম্পূর্ণ তথ্যসূত্র পঞ্জী দেওয়া হল, বহু বছর ধরে এই অনেকাংশেই বহুল পঠিত বই গুলি আমাকে ধীরে ভাষার বেড়া পেরিয়ে মান্টো এবং উর্দু সাহিত্য সম্পর্কে আগ্রহী করছে।প্রথম পাঠের সংস্করণ গুলি অবশ্যি হাতের কাছে নেই।

মান্টো সংক্রান্ত সূত্রঃ
আশ্চর্য্যের কথা, লোক-দ্যাকানি ছাড়াও, এই কয়েকজনের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে তৈরী গ্রন্থপঞ্জীর উদ্দেশ্য আদ্যন্ত রাজনৈতিক। প্রাক ঔপনিবেশিক সময় থেকেও ধর্মাচার প্রভাবিত সামাজিক জীবন ছাড়াও নাগরিক জীবনে যে আর পাঁচটা শিক্ষিত ভারতীয় দের মতই ভারতীয় মুসলমান রা অংশগ্রহণ করেছেন সেটা র কিছু প্রামাণ্য নথি পেশ একটা উদ্দেশ্য। আর একটি হল পার্টিশনের স্মৃতির যে একটা সামাজিক বর্গ প্রভাবিত চেহারা আছে তার কিছু দলিল রয়েছে এটাকে একটু নতুন করে মানুষকে ভাবানো, এ ছাড়া বারংবার প্রকাশিত বিখ্যাত এবং অসাধারণ কাহিনী গুলির বাইরেও সামগ্রিক ভাবে মান্টোর কাজকে আলোচনার মধ্যে যাঁরা আনতে চেয়েছেন, তাঁদের লেখালিখি নিয়ে একটা চর্চার প্রয়োজনীয়তার প্রস্তাব করা।

  • ব্ল্যাক মার্জিন্স, সাদাত হাসান মান্তো স্টোরিজ, সম্পাদনা মুহম্মদ উমর মেমন, কথা ২০০১,স্বল্প পরিসরে অসম্ভব ভালো তথ্যপূর্ণ একটি ভূমিকা লিখে দিয়েছেন আসাউদ্দিন
  • দিবারাত্রির কাব্য সাদাত হাসান মান্টো সংখ্যা, ২০১৩, স্বল্প পরিচিত কয়েকটি গল্পের অনুবাদ প্রকাশ করেছেন, ঈর্ষনীয় গ্রন্থপঞ্জী সংকলন করেছেন, যদিও বিশ্লেষণে অনেক প্রবন্ধের মধ্যেই এমন কিছু নতুন কথা পাইনি।কিন্তু ভালো লেগেছে, দিবারাত্রির কাব্য পত্রিকার এই সংখ্যাটি বাঙালি মান্টো প্রেমীদের সম্পদ
  • বম্বে স্টোরিজ, সাদাত হাসান মান্টো, অনুবাদক ম্যাট রেক এবং আফতাব আহমেদ, পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউজ ২০১২
  • গাঞ্জে ফেরেশতে, সাদাত হাসান মান্টো, প্রতিভাস, অনুবাদ, মোস্তফা হারুণ,ভূমিকা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, টীকা চন্ডী মুখোপাধ্যায়, ২০০৯
  • মাই ফ্রেন্ড মাই এনিমি,ইসমত চুঘতাই, অনুবাদ তাহিরা নাকভি,কালি ফর উওমেন ২০০১
  • দ্য পিটি অফ পার্টিশন, মান্টো'স লাইফ, টাইম্স, অ্যান্ড ওয়ার্ক অ্যাক্রস ইন্ডিয়া পাকিস্তান ডিভাইড, আয়েষা জালাল, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১৩
অন্য প্রগতি সাহিত্য সংক্রান্ত:
  • আ চুঘতাই কালেকশন, ইস্মত চুঘতাই, অনুবাদক তাহিরা নাকভি এবং সৈয়েদা এস হামিদ, উওমেন আনলিমিটেড, ২০০৩
  • হান্ড্রেড পোএমস বাই ফইজ আহমেদ ফইজ, অনুবাদ সর্ভত রহমান, অভিনভ প্রকাশন, ২০০৯
অন্যান্য:
  • দেশভাগ স্মৃতি আর স্তব্ধতা, সম্পাদনা সেমন্তী ঘোষ, গাঙচিল, ২০০৯, এই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত মৈনাক বিশ্বাসের 'এক অসহনীয় ইতিহাস ও সিনেমার স্মৃতি' প্রবন্ধটি সিনেমা সম্পর্কে আগ্রহহীন আমাকে কিছুটা নড়িয়ে দিয়েছিল।
  • পার্টিশন সাহিত্য, দেশ কাল স্মৃতি, সম্পাদনা মনন কুমার মন্ডল, গাঙচিল, নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়,২০১৪
  • দ্য মেডিয়েভাল ইন ফিল্ম, রিপ্রেজেন্টিং আ কন্টেস্টেড টাইম অন ইন্ডিয়ান স্ক্রিন (1920s-1960s)উর্বী মুখোপাধ্যায়, ওরিয়েন্ট ব্ল্যাকসোয়ান, ২০১৩
  • মির্জা গালিব ও তাঁর সময়, পবন কুমার ভার্মা, অনুবাদ মন্দার মুখোপাধ্যায়, সাহিত্য অকাদেমি, ২০০৬
  • পাকিস্তানের উর্দু গল্প, অনুবাদ মবিনুল হক, ভাষাবন্ধন ২০১০
  • গালিবের স্মৃতি, মৌলানা আলতফ হুসেন আলি, অনুবাদ পুষ্পিত মুখোপাধ্যায়, সাহিত্য অকাদেমি, ২০০১, ব্যক্তিগত ভাবে প্রিয় অনুবাদক
  • দ্য আওয়াধ পাঞ্চ, উইট অ্যান্ড হিউমর ইন কলোনিয়াল নর্থ ইন্ডিয়া, মুশিরুল হাসান,নিয়োগী বুকস,২০০৭, অসাধারণ একটি বই, আওয়াধি পোলিটিকাল হিউমর সংক্রান্ত আকরগ্রন্থ

  1. এম আসাউদ্দিন রচিত ব্ল্যাক মার্জিন্স বইটির ভূমিকা
  2. আয়েষা জালাল রচিত দ্য পিটি অফ পার্টিশন
  3. গালিবের স্মৃতি, মৌলানা আলতফ হুসেন আলি
  4. দ্য আওয়াধ পাঞ্চ, উইট অ্যান্ড হিউমর ইন কলোনিয়াল নর্থ ইন্ডিয়া, মুশিরুল হাসান
  5. হান্ড্রেড পোয়েমস বাই ফইজ আহমেদ ফইজ
  6. দিবারাত্রির কাব্য মান্টো সংখ্যা


1308 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ আলোচনা  বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: Tim

Re: মান্টো - বোল কি লব আজাদ হ্যায়

ভালো হয়েছে। মান্টো পাঠ নিয়ে আলাদা একটা লেখা এলেও ভালো হয়। আমার কাছে এই ব্যক্তিগত জার্নিগুলো খুব মূল্যবাণ। কীভাবে একটা লোক মান্টো পড়ছে, কেন পড়ছে, বা ঠিকঠাক পড়া হচ্ছেনা বলে অস্থির হচ্ছে বা পড়ে তার কী মনে হলো---এইসব। আতিশ তসীরের ছোট গল্পের অনুবাদের ভূমিকায় সেই কথাগুলো পড়েও মনে হয়েছিলো একই কথা। একটা লোক যার দাদু উর্দূ সাহিত্যের পরিচিত নাম, সে একবর্ণও উর্দূ জানেনা, দাদুর বই হাতে পেলে পড়ার উপায় নেই---সেই লোক বুড়ো বয়সে ক্রমে বুঝছে ব্যাপারটা ঠিক দাদু-নাতি বা পারিবারিক মিষ্টি সুখী গৃহকোণের সরলরৌখিক প্রেমের গল্প না, তাই তাকে দাদুর লেখা কবিতা ছাড়াও পড়তে হবে মান্টো, ফয়েজ, চুঘতাই--এই কথাগুলো অনুবাদক শেয়ার করলে চর্চার পরিসর বাড়ে আরো চাট্টি বাজে কথা ও লেখাপত্রও হয় এই আর কি। বাজে কেননা এইসব করেও শেষে এম্বিয়ে না করলে নির্বিঘ্নে মান্টো কিনে পড়া যাবেনা।

আমিও আজকাল কক্ষণো সিনেমা দেখতে যাচ্ছি বলিনা। বলি ফিলিম বা ছবি। মান্টো থিয়েটারে তো এলোনা, অনলাইনে কবে আসে দেখি।



Avatar: aranya

Re: মান্টো - বোল কি লব আজাদ হ্যায়

ভাল লাগল।
Avatar: সৈকত

Re: মান্টো - বোল কি লব আজাদ হ্যায়

ভাল হয়েছে লেখাটা। মান্টো সম্বন্ধে মোটমাট কী দাঁড়ায়, তার একটা আন্দাজ দেওয়া আছে, প্রথম প্যারা থেকেই। এসব জেনে বুঝেই তারপর মান্টো পড়াই ভাল।

আর মোটমাট যা দাঁড়াল, তারপর যা বাকী থাকে সেগুলো তো ডিটেল। মান্টোর জীবনে বারি সাহেবের একটা বড় ভূমিকা ছিল। মান্টোর বাবা ছিলেন দাপুটে, মান্টোর সাথে সম্পর্কটা মসৃণ ছিল না, কিন্তু মান্টো বারে সাহেবকে মূল্য দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে নাকি আবদুল বারিরই ছবি তার ঘরে ব কাজের জায়্গায় টাঙানো থাকত, এও বলেছিলেন বা লিখেছিলেন যে আবদুল বারির সাথে ঐ তিরিশের দশকের প্রথম দিকে মান্টোর আলাপ না হলে হয়ত লেখক না হয়ে ক্রিমিনাল হয়ে যেতেন, কারণ মান্টো সেই সময়ে, ঐ কম বয়সে মূলতঃ যে জীবন কাটাচ্ছিলেন সেটা ছিল মদ্যপান ও চরসের নেশা, তার সাথে জুয়াখেলা ইত্যাদি। সেখান থেকে বারি সাহেবের প্ররোচনায়, সাহিত্য পড়া, অনুবাদ আর নিজের লেখা।

অথবা টিবি হওয়ার ঘটনাটা। প্রথমে মদ খেয়েই ব্যাথা উপশমের চেষ্টা করেছেন, তারপর পরিবারের চাপে কাশ্মীর গেছেন শরীর সারানোর জন্য, খুব বেশীদূর জাননি, কাশ্মীর যা ছিল মান্টোর পরিবার ও পূর্বপুরুষদের দেশ। একটা প্রেমের সম্পর্ক তৈরী হয়েছিল একটি মেষপালক মেয়ের সাথে, যাকে মান্টোর জীবনে একমাত্র প্রেমের ঘটনা হয়ত বা।

অথবা অমৃতসর সহরটা, বিশ -তিরিশ দশকে মান্টোর বেড়ে ওঠার সময়ে, শহরটা তো স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্ঘর্ষময় এক স্থান, সেই শহর নিয়ে, ১৯১৯১এর সেইসব দিনগুলো নিয়ে তো একটা গল্পই আছে, প্রথমদিকের লেখা যেটা। ইতিহাসের ঘটনাকে প্রেক্ষিত হিসেবে ব্যবহার করে - পরবর্তীকালে যা আরও ব্যাপক্ভাবে মান্টো করবেন - সেই মিথ ভাঙ্গার ব্যাপারটা, খালি চোখে মানুষকে দেখার পদ্ধতিটা, এই প্রথমদিকের গল্পেও আছে।


Avatar: সৈকত

Re: মান্টো - বোল কি লব আজাদ হ্যায়

মান্টোকে নিয়ে কৃষণ চন্দর একটা লেখায়, মান্টোকে নীলকন্ঠ শিবের সাথে তুলনা করেছিলন।যেন সমাজ আর সভ্যতার বিষ মান্টো একাই পান করেছেন। আমি তো মান্টোর সমস্ত লেখালেখির সূত্রে প্রথম পর্বের মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা বেশী করে মনে করি, লেখায় দুজনেই নন-কনফর্মিস্ট, মানুষের অনেকটাই যে একটা অন্ধকার পিন্ড যেন, সেরকমই কিছু বেরিয়ে আসে। যা বুঝলাম, তিরিশের দশকের মান্টোর কথা সেরকম বিশদে আসেনি সিনেমাটায়, ফলে মান্টোর সেই সময়ের সেন্সিবিলিটি, ফরাসী আর রাশিয়ান সাহিত্য থেকে কী নিচ্ছেন আর কী বা নিজের চিন্তাভাবনাকে ব্যবহার করছেন লেখায়, সেসব আড়ালেই থাকে। শেষ সিনেমায় , ঋত্বিক নিজেই অভিনয় করেন, নামও তার নীলকন্ঠ, পৃথিবীটা পুড়ে যাচ্ছে, স্তোত্রপাঠের মত যেন বলে উঠছেন, এসবই যেন হতাশা থেকেই বেরিয়ে আসছে। কিন্তু আগের সিনেমাগুলোতে, অল্প হলেও আশার ছবি ছিল, দেশভাগের বেদনা থেকে যেসব সিনেমাগুলো রৈরী হচ্ছে। মেঘে ঢাকা তারা বা সুবর্ণরেখার শেষ দৃশ্য সেসবের উদাহরণ যেন, অল্প হলেও কোথাও কিছু একটা রয়ে যাচ্ছে, যতই কেননা সমাজ ও সভ্যতা সম্বন্ধে ঋত্বিক কমেন্ট করে যাচ্ছেন। তিতাস-এও, উপন্যাসের শেষটুকুকে পরিবর্তন করে নিচ্ছেন, ঐ সর্বৈব ধ্বংসের কথা যা অদ্বৈত মল্লবর্মণ লিখে গেছেন, একজন কমিউইনিস্ট হিসেবে সেটা তিনি পরিবর্তন করে নিয়েছেন, এরকম স্পষ্ট মতই ছিল ঋত্বিকের, এক সাক্ষাৎকারে। বাস্তবের ধাক্কায়, দেশভাগজনিত দুঃস্বপ্নের কারণে, যে দেশভাগই বর্তমান বাঙ্লাদেশের দুরব্স্থার জন্য দায়ী, এরকম একটা মতকে সঙ্গী হিসেবে রেখেও ঋ্ত্বিক উত্তরণের একটা আশা রাখছেন, ইঙ্গিতের বেশী হয়ত আর স্পষ্ট করতে পারছেন না। এবং মাণিকও, নন-করফিজম থেকে, প্রাণান্তকর এক নিজস্ব দৃষ্টি থেকে বেরোবার জন্যই যেন কমিউনিস্ট হওয়ার দিকে তার ঝাঁপ। মান্টো মোটামুটি নিজের জায়গায় স্থিত থাকছেন, ভগৎ সিংহ, স্বাধীনতা আন্দোলন, প্রগতিবাদীদের সাথে সখ্যতা রেখেও, কীভাবে সেটা ঘটছে এসবই মনে হয়না জানা যাবে, মান্টোর লেখা যত না প্রকাশ হয়েছে, মান্টোচর্চা সেরকম ন হওয়ার কারণেই। এই লেখা পড়ে যা বুঝলাম, চর্চার এইসব বিষয়, সিনেমাটাতেও অনুপস্থিত, নির্দেশকের মনে হয়্না কিছু করার ছিল বিশেষ।


Avatar: পাঠক

Re: মান্টো - বোল কি লব আজাদ হ্যায়

মান্টোচর্চা কিছু কম হয়েছে এটা মানা গেল না। ৬ বছর আগে পুষ্পিত মুখোপাধ্যায় লিস্ট দিয়েছেন ৪ টি পি এইচ ডি পেপারের। ব্রীজ প্রেমী (জম্মু কাশ্মীর ইউনিভার্সিটি), লেসলি ফ্লেমিং Wisconsin ইউনিভ, আলি সিনা বুখারী (পাঞ্জাব ইউনিভ) ও আরশাদ রজা (ভাগলপুর ইউনিভ)।
শোধগঙ্গা খুলে মান্টো লিখে সার্চ দিয়েই পাওয়া যায় - রিধিমা তিওয়ারি (হায়দ্রাবাদ ইউনিভ), নুসরত আসিফ আলি সৈয়দ (জেজেটি ইউনিভ রাজস্থান), দিবা হাসমি (কলকাতা ইউনিভ), রিজিয়ানা (আলিগড় ইউনিভ), ফইয়াজুর রহমান (আলিগড় ইউনিভ),প্রীতি গোয়েল (গুরু নানক ইউনিভ), মহম্মদ সালিম পুলসরাকাঠ (শংকরাচার্য ইউনিভ), রবীন্দর কুমার (হরিয়ানা সেন্ট্রাল ইউনিভ) ইত্যাদি বহু গবেষকদের গবেষনাপত্র। প্রতি বছর ইংরিজি হিন্দি উর্দু বাংলা ভাষার নানা পত্রপত্রিকায় বেশ কিছু প্রবন্ধের বিষয় মান্টো। রবীন্দ্রনাথ লেভেলের না হলেও মান্টোকে নিয়ে কম চর্চা হয়নি কিন্তু।
Avatar: ~

Re: মান্টো - বোল কি লব আজাদ হ্যায়

archive.org এ manto লিখে সার্চ দিলেও গাদা টেকস্ট ও অডিও পাবা। তাতে রেডিও থেকে নেওয়া অডিও থাকতেই পারে। এটা শুধু মেটাডেটা সার্চের কথাই বলা হল। কনটেন্ট সার্চে আরো কত কি আসবে ঠিক নেই।
Avatar: Du

Re: মান্টো - বোল কি লব আজাদ হ্যায়

ভালো লাগলো লেখাটা খুবই। কিন্ত সিনেমাটা কি হলে এসেছে?
Avatar: প্রতিভা

Re: মান্টো - বোল কি লব আজাদ হ্যায়

কি আশ্চর্য, অমৃতসরেই স্বর্ণমন্দিরের এক কোণে বিশ্রাম করতে করতে মান্টোর ওপর এই লেখাটা পড়লাম।
Avatar: প্রতিভা

Re: মান্টো - বোল কি লব আজাদ হ্যায়

কি আশ্চর্য, অমৃতসরেই স্বর্ণমন্দিরের এক কোণে বিশ্রাম করতে করতে মান্টোর ওপর এই লেখাটা পড়লাম।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন