বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ভাষা-ভীমরতি, সমালোচক ও হ-য-ব-র-ল (প্রথম পর্ব)

সৌরভ মিত্র

শব্দের মূলে নাকি ক্রিয়া, সেই ক্রিয়াই নাকি ঠিক করে শব্দের অর্থ! এই মতে বাংলাভাষার সংস্কৃত-ঘেঁষা শব্দগুলির হিল্লে হলেও শব্দভাণ্ডারের ‘দ্রাবিড়ীয়’, দেশী, বিদেশী শব্দগুলির অর্থ বাতলাতে গিয়ে চটকদার কিন্তু রহস্যময় কিছু বিষয়/ গল্প/ ধারণা উঠে আসে। উঠে আসে অদ্ভুত সব প্রায় অসম্ভব তত্ত্ব, -কৃষ্ণ আসলে কালো টাকা, বিষ্ণু আসলে পুঁজি (‘সেপারেশন অফ্ সারপ্লাস্’ বোঝানোর সময় এ’ কথা অবশ্য মার্কসসাহেবও তার ‘ক্যাপিটাল’-এ বলেছেন 1 ), জগন্নাথ হল ‘যন্ত্ররাজ বিভূতি’ - কি আশ্চর্য্য, ‘ইংলিশ ফ্যাক্ট্রি অ্যাক্টে’র আলোচনা করতে গিয়ে এ’ কথাও মার্কসসাহেব বলে গেছেন! 2 এরপর ‘শিক্ষিত’ শব্দের অর্থে যখন পাওয়া গেল ‘কোনও একটি বিষয়ে অল্পবিস্তর বিদ্যে আর বাকি ৯৯৯টি বিষয়ের আকাট মূর্খামির যোগফল’ –এমন জায়গায় আঘাত লাগে যে জনসমক্ষে বলা দায়!... এই পদ্ধতির নাম ‘ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধি’।
পড়তে পড়তে প্রচলিত ধ্যান-ধারণাগুলি এমন ভাবে দুমড়ে মুচড়ে যায় যে কখনও মনে হয় ‘এই বুঝি জীবনের এক ইউরেকা মুহূর্ত’, আবার কখনও মনে হয়, -‘পুরোটাই আজগুবি অধিবিদ্যা বুঝি বা!’ বিষয়টি কতটা সাবেকি ‘শাস্ত্রসম্মত’ জানা নেই। এদিকে আধুনিক ভাষাতত্ত্বের ফোনিম-মরফিমের ডেফিনেশনের তোয়াক্কাও করে না! (ফলে) যথেষ্ট বিতর্কিতও বটে। কিন্তু একেবারে ফেলে দিতেও যে মন চায় না।... যাই হোক, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটাতে বাংলা মানেতত্ত্বের এই ‘সোনার হরিণ’টির পিছু ধাওয়া করেই দেখা যাক কিছুদূর। -কিন্তু, গন্তব্যের বদলে যাত্রাপথটিই যেখানে মূখ্য, ঝোলায় গুটিকয় বিজ্ঞানের পুঁথি নিলে কেমন হয়?... সঙ্গে এক দুঁদে সমালোচকও রইলেন অবশ্য, -লীলাখেলায় জটিলা-কুটিলা না থাকলে কি আর রগড় জমে! (নইলে ‘সংসারে’র নিয়ম-কানুনের দোহাই তুলে পদে পদে ভুল ধরবে কে!)

শোনা যায়, মহান দার্শনিক সক্রেটিস নাকি তার এক শিষ্যকে প্রশ্ন করেছিলেন, - ‘মানুষ কোনও বস্তুর যখন প্রথমবারের জন্য নামকরণ করেছিল, তখন সে’ মানুষের মনে যে বস্তুটি সম্পর্কে নির্ভুল ধারণা ছিল, তার নিশ্চয়তা কোথায়?’ –সঙ্গত প্রশ্ন। সত্যিই তো, ‘ব্যাঘ্র’ শব্দের ব্যুৎপত্তি বিচার করে জানলাম যে জন্তুটি ‘বিশিষ্ট রূপে আঘ্রাত হয়’, আবার ‘মৃগেন্দ্র’ শব্দের বুৎপত্তি বিচার করে জানলাম যে সে’-জন্তু মৃগদের ওপর প্রভুত্ব-ট্রভুত্ব করে। সুতরাং, তাদের সামনে মানুষের কোনও বিপদ নেই। কিন্তু বাগে পেলে তারা দু’জনেই যে নিবন্ধলেখকের নিরেট মুণ্ডু চিবিয়ে সজনেডাঁটা করে ছাড়বে, -সেই জ্ঞানটুকু হল না। ফলে মিছেই অমন গুরুগম্ভীর বচনবাচন। হতভাগার জীবনের পনেরআনাই বৃথা! এত যে পরিশ্রম করে শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্ণয়, তার ধাতু ‘নিষ্কাশন’, ধাতু থেকে তার ক্রিয়া বুঝে সে’ শব্দের ‘ক্রিয়াভিত্তিক অর্থ’ নিয়ে (প্রায় দ্বিতীয় অষ্টাধ্যায়ী রচনা করে ফেলার মতো) এত ঢক্কানিনাদ, সব মিছে? তখন দিস্তে-দুয়েক উদ্ধৃতি আর পাল্টা উদ্ধৃতি বিনিময়ের পর সমালোচক বলবেন, পাণিনির যুগে ঢাক চোদ্দবার বেজেছিল, আর বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা। সুতরাং, নিপাতনে সিদ্ধ গণতন্ত্রের প্রথা মেনে সে’ তত্ত্ব ‘ধ্বনিভোটে’ খারিজ করা হল।...

(মানুষের ইন্টেলেক্টের এই এক দোষ। কোনও বিষয়কে ক্রমাগত ব্যবচ্ছেদ করতে করতে সে বিষয়টির সম্বন্ধে অনেক অনেক তথ্য খুঁড়ে আনার বেলায় সে ওস্তাদ, কিন্তু জোড়ার বেলায় অপারগ!... জুড়তে লাগে অনুভব। আসলে ইন্টালেক্টের স্বভাব চরিত্র অনেকটা ধারালো ছুরির মতো। আর ছুরি দিয়ে তো সেলাই করা যায় না!)

ঠিক তখনই যেন রক্তকরবীর পাতা থেকে নন্দিনী বলে উঠল, ‘এসব তোমাদের বানিয়ে—তোলা কথা।’ অধ্যাপক উত্তর দিলেন, ‘বানিয়ে তোলাই ত। উলঙ্গের কোনো পরিচয় নেই, বানিয়ে তোলা কাপড়ে কেউ বা রাজা কেউ বা ভিখিরী।’... বেশ, তাহলে উলঙ্গ কে আর তার কাপড়ের স্বরূপটিই বা কেমন? তারা হল প্রকৃতি আর আকৃতি। সত্যতা আর বাস্তবতা। একটি বিমূর্ত হলে অন্যটি মূর্ত। এতদূর লিখতে না লিখতেই নিবন্ধলেখকের মাথায় সমালোচকের চাঁটি পড়ল, -‘আরে এই হতভাগা, ফের গোল-গোল ভাববাদী কথা! সত্যকে বাস্তবতার থেকে আলাদা করবি কী করে, অবাস্তব-সত্য বলে কিছু শুনেছিস জীবনে? বিজ্ঞান যা আবিষ্কার করে বা করেছে তার বাইরে দর্শনের আবিষ্কারের জন্য নতুন কোনও ফ্যাক্ট নেই। কোনও তত্ত্ব দেওয়া দর্শনের কাজ নয়। এমনকি ‘দার্শনিক উপস্থাপনা’ নামে উপস্থাপনার আলাদা কোনও শ্রেণী অবধি নেই।’ 3
কথাটি সত্য না হলেও আপাতগ্রাহ্য। কারণ, ভাষার উৎপাতেই বেশির ভাগ দার্শনিক সমস্যার উদ্ভব হয়। 4 যেমন ধরুন, কেউ একজন বলল –‘শুশ্রুষা’ শব্দটির অতীত অর্থ ছিল ‘শোনার ইচ্ছে’, পরে তা বিকৃত হয়ে ‘সেবা’ হয়েছে। তক্ষুণি কেউ না কেউ প্রশ্ন তুলবেন –বিষয়টি ‘বিকৃতি’ না ‘পরিবর্তন’? শুরু হবে এক নতুন দার্শনিক তর্ক, -‘অর্থ-পরিবর্তন’কে ‘অর্থ-বিকৃতি’ বলা উচিৎ কিনা! এত কিছু না হয় বাদ থাকুক, এই যে বিশ শতকের শেষ দশক থেকে (সর্বত্র না হলেও অন্ততঃ পশ্চিমবঙ্গের) জনমানসে ‘তৃণমূল’ শব্দটির অর্থ যে ‘রাজনৈতিক দল বিশেষ’-এ পরিণত হয়েছে, -সেই ‘পরিবর্তন’কে ‘বিকৃতি’ বলে বসলে –তা আর যাই হোক, ‘পলিটিকালি কারেক্ট’ হবে না। তাহলে ওই প্রকৃতি আর আকৃতি, বিমূর্ত আর মূর্ত, সত্যতা আর বাস্তবতার সম্পর্ক কি এতটাই রহস্যময়? –হয়তো তাই। হয়তো সেই কারণেই যে একাকী মানুষ ‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল’, তার জন্য স্রেফ কারো ‘শোনার ইচ্ছে’টুকুও ‘সেবা’ হয়ে ওঠে।
‘সে যে চমকে বেড়ায় দৃষ্টি এড়ায়’ –পদটি কাব্যগুণে উৎকৃষ্ট হতে পারে, তা শব্দার্থের ধরনধারণ হলে কথা চালানো দায়! ভেবে দেখুন না, রোজের মতো কেজো সংলাপ, দীর্ঘ বক্তৃতা, দেদার আড্ডা বা তুমুল তর্ক সেরে ওঠার পর যদি শুনতে হয়, - উচ্চারিত প্রতিটি শব্দের আকৃতি-প্রকৃতির ছাঁদ মোটেই একরৈখিক নয়, বরং প্রতিটি শব্দের মধ্যে এমন সম্ভাবনা আছে বক্তার মনোভাবের বদলে অন্যকিছু প্রকাশ করে ফেলার, -অস্বস্তি ও বিরক্তি, দুই-ই জাগতে পারে। এখন ভেবে দেখার বিষয় হল, তেমনটাই হয় না কি? নইলে জীবনের বেশিরভাগ দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কারণ হিসেবে ‘communication gap’ –কথাটি উঠে আসে কেন! অর্থাৎ, এমন অনেক কিছু আছে যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সেই সীমাবদ্ধতা কি ভাষার নাকি ভাষীর?

ঘটনাচক্রে বিশ শতকের গোড়া থেকে যাবতীয় জাগতিক আস্তিত্বের ধরনধারণ নিয়ে এমনই কিছু মৌলিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। মাক্স প্লাংক, নিল্‌স বোর, ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ, লুই দ্য ব্রয়ি, এর্ভিন শ্র্যয়েডিন্‌গার, প্রমুখ বিজ্ঞানীরা দাবি করেন, সুবিশাল গ্রহ-নক্ষত্র থেকে ঘরের কোণে জমে থাকা ধুলোময়লা, জীব, জড় সবকিছুকেই আমরা যেমনটা দেখি (আকৃতি), তাদের ভেতরটা (প্রকৃতি) তেমনটা নয়। নিউটনীয় ব্যাখ্যা 5 অনুসারে দুনিয়ার সবকিছুরই হাবভাব যে অলস, নাছোড়বান্দা, যশোলোভী কবিদের মতো (অর্থাৎ ‘না নড়ালে নড়ব না, এদিকে না থামালে থামবও না’, ‘যেমন যেমন ঠ্যালা খাব তেমন তেমন চলব’ আর ‘ঢিল মারলে পাটকেল ছুঁড়ব’) – সে’ ভাবনায় (কবির ছন্দজ্ঞানের মতোই) প্রচুর গলত আছে। জগতের বস্তুগত আকারনিষ্ঠতার কল্পনা করা সহজ। কিন্তু শুধু তেমন একটি কল্পনা জগৎকে প্রতিভাত বা প্রকাশিত করতে পারে না। 6
শেষ কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গে সমালোচক মশায় একটি জবরদস্ত ঘুঁষি হাঁকালেন, ‘মামদোবাজি! কথা হচ্ছিল ‘ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধি’ নিয়ে, আর এখন ধান ভানতে শিবের গীত 7 শোনানো হচ্ছে?’
আঁজ্ঞে, মানুষের অবচেতন মন ভাষার উপলব্ধি, মৌলিক কিছু আইনকানুন, ইত্যাদি ধরে রাখে জানতুম। 8 এই অবচেতন মন আসলে যে তার ‘জেনেটিক কোয়ান্টাম নকশা’।... - কথাটুকু কোনওমতে উচ্চারণ করে চোয়ালে হাত বুলোতে বুলোতে নিবন্ধলেখক বিড়বিড় করতে শুরু করে, -হাত আর চোয়াল, এই দুই আকৃতির বস্তুনিষ্ঠ গঠনের সবচেয়ে ছোট খণ্ড হল পরমাণু। কিন্তু, সেই পরমাণুর নাকি ০.০০১ শতাংশেরও কম হল নিরেট কণা (ইলেকট্রন, প্রোটন, ইত্যাদি) আর বাদবাকিটা ‘শূন্যতা’। এখন ০.০০১ শতাংশের কম নিরেট দুটি আকার মুখোমুখি ভিড়লে তাদের কণায়-কণায় ঠোকাঠুকি লাগার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। (বরং খানিকটা ‘মন দেওয়া-নেওয়া’র মতো কিছু হওয়ার কথা।) -তাহলে চোয়ালখানা অমন টনটন করে কেন!... আসলে ওই বাকি ৯৯.৯৯ শতাংশ আপাত-শূন্যতা জুড়ে থাকে কণাগুলির উপস্থিতির ‘প্রতিশ্রুতি ও সম্ভাবনা’! 9 –এই প্রতিশ্রুতি ও সম্ভাবনা তাদের ‘নিরবিচ্ছিন্ন সক্রিয়তা’র সাক্ষ্য দেয়, আ-কৃতি বা আ-কার সেখানে ‘ম্যাটার’ করে না। এই হল ‘কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানে’র গোড়ার কথা।
শুনে সমলোচক বললেন, ‘এর মানে-টা কী? আমি উত্তরে দাঁড়িয়ে বললাম, দক্ষিণেও থাকতে পারি, আর আপনি দক্ষিণে দাঁড়িয়ে বললেন, উত্তরেও থাকতে পারেন। কেউ জানে না কোনজন কোথায় আছে। আবার তার ফলে একই সময়ে আমাদের পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ সবদিকেই দেখা হল অথবা কোনওদিকেই দেখা হল না! –বাপের জম্মে শুনি নি বিজ্ঞান এমন গাঁজাখুরি কথাবার্তা বলে!’ নিবন্ধলেখক মাথা চুলকে বলে, -কিন্তু, মৌলিক কণার যে শুধু কণা-ধর্ম নয়, তরঙ্গ-প্রকৃতিও থাকে! তার কণার ধারণায় আছে বিন্দুর উপমা, শক্তি আর ভরবেগের সেই বিন্দুতে মিলে যাওয়ার সম্ভাবনা। আর তরঙ্গের ধারণায় আছে অসীম ব্যাপ্তি, অনন্ত পর্যায়বৃত্তি, নিরবিচ্ছিন্ন বিস্তার। ইঁট-কাঠ-পাথরের বাস্তবতার সাথে পরিচিত আমাদের বোধবুদ্ধি এটি বুঝতে গেলে প্রথমে খেই হারায় বটে, কিন্তু এই ‘কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান’ যে রসায়ন, আণবিক জীববিজ্ঞান, ইলেকট্রনিক্‌স, কণা পদার্থবিজ্ঞান, ন্যানোপ্রযুক্তি আর প্রযুক্তিবিদ্যার যাবতীয় আধুনিক উন্নয়নের ভিত্তি। ...

এবার সুকুমার রায়ের ‘হ-য-ব-র-ল’–এ ফিরে তাকানো যাক; (তাঁর লেখাকে স্রেফ্ ছেলেভোলানো ‘পানিং’ ভাবেন যারা, তাদের কাছে বিসমিল্লায় মার্জনা চেয়ে রাখা ভাল।)
...“কি মুশকিল! ছিল রুমাল, হয়ে গেল একটা বেড়াল।”... অমনি বেড়ালটা বলে উঠল, “মুশকিল আবার কি? ছিল একটা ডিম, হয়ে গেল দিব্যি একটা প্যাঁকপেঁকে হাঁস। এ তো হামেশাই হচ্ছে।”... “তা হলে তোমায় এখন কি বলে ডাকব? তুমি তো সত্যিকারের বেড়াল নও, আসলে তুমি হচ্ছ রুমাল।”... বেড়াল বলল, “বেড়ালও বলতে পার, রুমালও বলতে পার, চন্দ্রবিন্দুও বলতে পার।”... আমি বললাম, “গেছোদাদা কে? তিনি থাকেন কোথায়?”... বেড়াল বলল, “গেছোদাদা আবার কোথায় থাকবে? গাছে থাকে।” আমি বললাম, “কোথায় গেলে তার সঙ্গে দেখা হয়?” ... বেড়াল খুব জোরে মাথা নেড়ে বলল, “সেটি হচ্ছে না, সে হবার জো নেই।” ... আমি বললাম, “কিরকম?” ... বেড়াল বলল, “সে কিরকম জানো? মনে কর, তুমি যখন যাবে উলুবেড়ে তার সঙ্গে দেখা করতে, তখন তিনি থাকবেন মতিহারি। যদি মতিহারি যাও, তা হলে শুনবে তিনি আছেন রামকিষ্টপুর। আবার সেখানে গেলে দেখবে তিনি গেছেন কাশিমবাজার। কিছুতেই দেখা হবার জো নেই।” ... “তা হলে তোমরা কি করে দেখা কর?” ... “সে অনেক হাঙ্গাম। আগে হিসেব করে দেখতে হবে, দাদা কোথায় কোথায় নেই, তার পর হিসেব করে দেখতে হবে, দাদা, কোথায় কোথায় থাকতে পারে, তার পর দেখতে হবে, দাদা এখন কোথায় আছে। তার পর দেখতে হবে, সেই হিসেব মতো যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছবে, তখন দাদা কোথায় থাকবে। তার পর দেখতে হবে-”...

এই সমালোচক মশায়ের নাকখানির গৎ অনেকটা ইতালীয় রূপকথার পিনোকিও-র 10 মতো। সেটিকে তিনি যতটা সম্ভব উঁচুতে রেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার এই বলদবুদ্ধি না বলবিদ্যা কি যেন, সে বস্তুবাদকেই অস্বীকার করে নাকি?... নিবন্ধলেখক আমতা-আমতা করে, ঠিক অতটা না হলেও ‘বস্তু-বোধে’র ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক প্রশ্ন তো তোলে বটেই। না, এখানে ‘realism’ আর ‘materialism’ গোলানো হচ্ছে না। শিল্পবিপ্লবের সময় যে ‘লেট্ মডার্ন ইংলিশ’ ভাষার সূত্রপাত হয় 11 , তখন খাঁটি বেনিয়া মতলবে, রীতিমত নতুন অভিধান ছাপিয়ে, আরও হাজার হাজার শব্দের সাথে ‘reality’ শব্দটিরও অর্থ ‘সংকুচিত করে দেওয়া হয়’। 12 তখন ‘real’ আর ‘material’ শব্দদুটির মধ্যে কার্যতঃ কোনও তফাৎ রাখা হল না। প্রায় জোর করে ভুলিয়ে দেওয়া হল, ‘সকার্য্য’ বা ‘সক্রিয়তা’ ছাড়া কোনও কিছুই ‘রিয়েল’ হয় না। 13 (এই ক্রিয়া কর্ম, প্রক্রিয়া, ঘটনা, অবস্থানের যে কোনও কিছুই আবার সবকিছুই।) এমনকি যেখানে ‘material’ শব্দটির বাংলা ‘বস্তু’, সেখানে ‘realism’-এর তর্জমা করা হল ‘বস্তুবাদ’!
প্রায় মধ্যযুগ থেকে আমাদের মুখের ভাষাকে এমনভাবে অভিধান ও ব্যাকরণের বস্তুগত আকারনিষ্ঠ শেকলে বেঁধে ফেলার চেষ্টা চলছে। ফলে যে ‘বৈজ্ঞানিক সত্য’ নিয়ে পাতার পর পাতা অঙ্ক কষা যায়, তাকেও ভাষায় প্রকাশ করলেই চূড়ান্ত বিদ্‌ঘুটে শোনায়! সেই জ্বালায় রিচার্ড ফেইনম্যানের মতো নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীও বলে ফেলেন -আপেক্ষিকতার তত্ত্বটি মাত্র এক ডজন লোকে বুঝেছিল, আর কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান কেউ বোঝে নি। 14 সত্যিই তো, যে তত্ত্ব আকারের মূল ধারণাকেই ‘অনিশ্চয়তার সুতো’য় ঝুলিয়ে দেয়, আকারনিষ্ঠ ভাষায় তাকে প্রকাশ করা কী ভাবে সম্ভব!
এখন প্রশ্ন হল, ভাষার (শব্দার্থের) এমন দশা হল কেন, কার/ কী স্বার্থে! নমুনা হিসেবে বাংলাভাষার দিকে নজর দিতে গিয়ে প্রথমেই হোঁচট! –ভদ্রলোকের ভাষা, ছোটলোকের ভাষা, গ্রাম্য ভাষা, শহুরে ভাষা, কাব্যের ভাষা, বিজ্ঞানের ভাষা, প্রবন্ধের ভাষা, বটতলার ভাষা, বাঙালের ভাষা, ঘটির ভাষা, হাজারটা উচ্চ-নিম্নভেদ। (মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে যা শ্রেণীসংগ্রামের ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কিছু নয়।) আর সবার ওপরে (হ্যাঁ, ওপরেই) চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘প্রমিত ভাষা’ আর তার প্রমিত অভিধান। তার প্রভাবে নিজের অজান্তেই কিছু কিছু শব্দকে (আসলে ধারণাকে) বসানো হয়েছে প্রভুর আসনে। আর সদা-লাঞ্ছিত কিছু শব্দের অবস্থা হয়েছে অচ্ছুত নারীদের মতো, -যাকে প্রকাশ্যে ছুঁলে মান যায়, কিন্তু লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকি তার বুনো আবেদনের প্রতি। -এই হল শব্দব্রহ্মবাদী ‘ভোকাবিউলারি’র-এর আসল চেহারা।... কয়েকটি উদাহরণ নেওয়া যাক;

একজন গড়পড়তা বাঙালি পথেঘাটে ‘খানকি’ শব্দটি শুনলেই নাক সিঁটকে ওঠে, -এহ্, ছোটলোকের ভাষা/ ইশ্ কি বিশ্রী গালাগাল! প্রশ্ন হল, শব্দটি বিশ্রী নাকি সুশ্রী -তা কোন্ মাতব্বর ঠিক করেছে? আর করলেও মুখ বুজে তা মেনেও বা নেওয়া কেন? প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দুই বাংলায় বেশ কয়েকটি ‘খানকা-শরীফ’ নামের প্রতিষ্ঠান আছে। বাউল, ফকির, সুফী, আউলিয়াদের বসবাস ও দরবারের স্থানকে বলা হত ‘খানকা’। 15 হিন্দু, মুসলিম, পুরুষ, নারী, সবার জন্য সেখানে ‘অবারিত দ্বার’। এই বাউল-সুফীদের দর্শন প্রচলিত ধর্মীয় সংগঠনের সমালোচনা করত, সমাজে বামুন-পুরুৎ ও মোল্লার কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলত। ফলে তারা ওই দু’পক্ষেরই মারধোর, গালাগালির পাত্র ছিল (এবং এখনও আছে)। (সমষ্টিগত) বামনাই, মোল্লাতন্ত্র আর শস্তা পুরুষতন্ত্রের ঘোঁটে ‘খানকা’য় বসবাসকারী/ যাতায়াতকারী ‘খানকি’ (অথবা ‘খানকী’)-দের ‘দেহ-উপজীবি’ হিসেবে দাগানো শুরু হয়।
নাৎসিদের (তৃতীয় রাইখ্) প্রচারণা বিভাগের মন্ত্রী জোসেফ্ গোবেল বলেছিল –একটি মিথ্যেকে হাজারবার বলা হলে মানুষ তাকেই সত্যি বলে ভাবে। -তার একটি আদর্শ উদাহরণ এই ‘খানকি’ শব্দটি। যদিও এখনও আমরা স্থান বোঝাতে ‘এখানকার’/ ‘সেখানকার’ –জাতীয় শব্দগুলি ব্যবহার করে থাকি। আর প্রমিত ভাষা তাতে আপত্তি তোলে না। আরও একটু পিছিয়ে গেলে দেখা যাবে, পুরুৎতন্ত্র বিরোধী চৈতন্য শুধু খুন হয়েই নিস্তার পান নি, ভাষার মাঝে তাঁকে ‘ন্যাকা চৈতন্য’ হিসেবে উপহাসের পাত্র বানিয়ে ফেলা হয়েছে। ‘বুদ্ধ’ হয়ে গেছেন ‘বুদ্ধু’! হতেও পারে যে ওই সময়ের পুরুৎদের বা সমাজেরও এইসব কর্মকাণ্ডের পেছনে কোনও বৈধ কারণ ছিল। কিন্তু, শব্দগুলির আরোপিত ইতরতা ঘুরপথে বামুন-মোল্লার কর্তৃত্বের কথা শোনায় না কি?
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যদি শব্দগুলির উৎসের দিকে না তাকাই (মহান সক্রেতিস, -ব্যুৎপত্তির শুদ্ধতা নয়, ব্যুৎপত্তির ইতিহাস এখানে বিচার্য্য), এই ভাষাগত ‘এক-ঝোঁকামি’ থেকে মুক্ত হই কোন পথে? আর কে না জানে –মানুষের ভাষা তার চিন্তাপদ্ধতিকে প্রভাবিত করে! 16
(এতদূর শোনার পর সমালোচক মশায় প্রায় বলতে যাচ্ছিলেন যে অত ঝামেলায় কাজ কি, গোলমেলে শব্দগুলিকে ব্যক্তিগত ভোকাবিউলারি থেকে বাদ দিলেই তো হয়! কিন্ত সে’ পথে হাঁটলে ঠগ্ বাছতে গাঁ উজার হওয়ার সম্ভাবনা বুঝে সংযত হলেন।) শব্দের (ভাষাচিহ্নের) অর্থের ‘প্রকৃতি’ না চিনে তার ‘আকৃতি’টুকু ধরে বসে রইলে শব্দ এভাবেই ‘প্রতিষ্ঠানে’ পরিণত হয়। ‘খানকি’, ‘ঈশ্বর’, ‘reality’, ইত্যাদি শব্দের ক্ষেত্রে সেই প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক ভাবে সহজে চেনা যায়, এই যা। এখন সমস্যা এই যে প্রতিষ্ঠানের অন্দরমহল জুড়ে থাকে ‘hegemony’। ‘hegemony’ এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় নয়, তাকে পেরিয়ে যেতে হয়। কিন্তু চিনতে না পারলে তাকে ‘পেরিয়ে যাওয়া’টা হবেই বা কোন্ উপায়ে! ফলে মানুষের প্রাকৃতিক ও কাঙ্খিত ‘harmony’ রয়ে যায় অধরা। নিজের ধর্ম অনুসারেই প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতা খর্ব করে। আগেই বলা হয়েছে যে মানুষের চিন্তা-ভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করে তার ভাষা, -তার ব্যাক্তিগত শব্দভাণ্ডার। সেই শব্দভাণ্ডারের প্রতিটি শব্দ-প্রতিষ্ঠানের খপ্পরে পড়ে মানুষের চিন্তা-ভাবনা চিরকাল ‘dominion status’-এই আটকে থাকে, ‘পূর্ণ স্বরাজে’র স্বাদ পায় না।... কে জানে, একটি শিশুর শব্দভাণ্ডার তুলনামূলক ভাবে ক্ষুদ্র বলেই হয়তো একজন প্রাপ্তবয়ষ্কের চেয়ে সে অনেক বেশি অনুভূতিপ্রবণ হয়!
আগের অণুচ্ছেদে ‘dominion status’ ও ‘পূর্ণ স্বরাজ’ -শব্দগুলির মুখোমুখি হতেই যে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ‘ছবি’ বা আলোচ্য বিষয়ে শব্দগুলির ব্যবহারের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে যে সন্দেহ মুহূর্তের জন্য উঁকি দিয়ে গেল, - তার কারণ শব্দগুলির প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি।… তবে প্রতিষ্ঠান যে একবারেই ‘ভাঙা’ হয় না, তা নয়। যেমন ‘সবুজ’ শব্দের প্রাতিষ্ঠানিক ‘আকৃতি’ বাচক যে অর্থই মাথায় জমে থাকুক না কেন, ‘সবুজ হৃদয়’ কথাটির ব্যাঞ্জনা তার ‘প্রকৃতি’র দ্বারাই ব্যক্ত। আকৃতি নিজেই সেখানে ‘অবাস্তব’ ও হাস্যকর!
“...আহারান্তে সত্য বলিল – ‘ওঃ কি মুশকিলেই পড়া গেছে।’... নিবারণ বলিল – ‘আবার কি হ’ল রে?’... আমি বুঁচকীকে বে করব।... বাপ না হয় রাজী হ’ল, কিন্তু মেয়ে কি বলে?... বড় গোলমেলে জবাব দিচ্ছে।... কি বলে বুঁচকী?... বললে-যাঃ।... দূর গাধা, যাঃ মানেই হ্যাঁ।...” (‘বিরিঞ্চিবাবা’ – রাজশেখর বসু)

‘বিরিঞ্চিবাবা’ গল্পটিতে বুঁচকী সামান্য ‘হ্যাঁ’ শব্দের ‘প্রতিষ্ঠান’ ভেঙে দেওয়ায় আর সত্য ‘যাঃ’ শব্দের ‘প্রতিষ্ঠান’ ধরে বসে থাকায় সত্যের মানসিক যন্ত্রণা/ উৎকন্ঠা একবার ভেবে দেখুন! (ভাগ্যিশ নিবারণ ছিল!)... সত্যিই, শব্দের প্রতিষ্ঠান একেবারেই না থাকলে সমাজ-সংসার চালানোই দায় হয়। - তখন (বাক্যের) ‘পদে-পদে’ মানসিক যন্ত্রণা! না, প্রতিষ্ঠানকে পুরোপুরি অস্বীকার করার মতো ‘নাস্তিক’ হয়ে ওঠা কোনও সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। ‘প্রতিষ্ঠান’কে বি-নির্মাণ করে যাওয়াই হল উপায়।
(নাস্তিক = ন+অস্তি+ইক, অস্তি = অস্তিত্ব।) আগের অণুচ্ছেদে ‘নাস্তিক’ শব্দটির প্রাতিষ্ঠানিক ‘বেদ-বিরোধী’/ ‘ঈশ্বরে অবিশ্বাসী’ গোছের অর্থগুলির পরিবর্তে এই যে ‘অস্তিত্বে অবিশ্বাসী’ বা (কোনও ল্যাজা-মুড়ো ছাড়া) শুধুই ‘অবিশ্বাসী’ অর্থে প্রয়োগ করা হল, -এই হল ‘প্রতিষ্ঠানের বিনির্মাণ’। তার মানে কখনই এই নয় যে আজ অবধি যে বস্তুকে ‘টেবিল’ বলে জানি, কাল তাকে ‘চেয়ার’ বলা যাবে। খেয়াল করে দেখার বিষয়, নাস্তিক-শব্দটির অর্থের বিনির্মাণ করা হল কিন্তু ‘ন+অস্তি+ইক’ -এই পথ ধরেই। অর্থাৎ শব্দটির ব্যুঃপত্তিগত গঠনকে বিকৃত না করেই, 17 - তার ভিতরের আকারহীন ‘ক্রিয়া’ (এ’ক্ষেত্রে ধাতু)-কে আশ্রয় করে।

সমালোচক মুচকি হেসে বললেন, - এবার নিজের কথার ফাঁদে নিজেই জড়িয়েছ ভায়া! প্রতিষ্ঠান যদি হেজিমনি-ই পয়দা করে, তাহলে নতুন করে আরেকখানা শব্দার্থবিধি নিয়ে চেল্লামেল্লি জুড়েছ কেন হে? এই আগরম-বাগরম শুনতে শুনতে এক-এক সময় মনে হচ্ছে, বাংলাকে সংস্কৃতায়নের অপচেষ্টা বুঝি! সে কি আরেকখানা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা নয়? আর যে’ সব শব্দের ‘ধাতু’ জানা নেই তদের বেলা? ... এই সব ক্রিয়াভিত্তিকতা, ব্যুৎপত্তি-নির্ণয়, ব্যাকরণ, -তারা আগে, না ভাষা আগে? পুরো বিষয়টাই একটি ‘পোস্ট-ট্রুথ্’ -এর মতো শোনাচ্ছে না কি?...


(চলবে...)
পরের পর্বে থাকছে, - খোকীর ‘সোস্যুর'-বাড়ি গমন ও বিশৃঙ্খলায় অন্বয়সাধন...!!!
1 …Enough, that the world still jogs on, solely through the self-chastisement of this modern penitent of Vishnu, the capitalist… - ‘Section 3: Separation of Surplus-Value into Capital and Revenue. The Abstinence Theory’, Capital, Volume – 1 (Karl Marx)

2 …they transform his life-time into working-time, and drag his wife and child beneath the wheels of the Juggernaut of capital… - ‘Section 4: Different Forms of the Relative surplus population. The General Law of Capitalistic Accumulation’, Capital, Volume – 1 (Karl Marx)… [juggernaut (n.) : “an idea, custom, fashion, etc., that demands either blind devotion or merciless sacrifice,” 1854, a figurative use of Juggernaut, 1630s (Iaggernat), “huge wagon bearing an image of the god Krishna,” … devotees allowed themselves to be crushed under its wheels in sacrifice. Altered from Jaggernaut, a title of Krishna (an incarnation of Vishnu), from Hindi Jagannath, literally “lord of the world.” This is from Sanskrit jagat “the world, men and beasts” (literally “the moving, all that moves,” present participle of *jagati “he goes” (from Proto-Indo-European root *gwa- “to go, come”) + natha-s “lord, master,” from nathate “he helps, protects,” from Proto-Indo-European root *nā- “to help.” The first European description of the festival is by Friar Odoric (c. 1321). – Online Etymology Dictionary]

3 The object of philosophy is the logical clarification of thoughts… Philosophy is not a theory but an activity… A philosophical work consists essentially of elucidations… The result of philosophy is not a number of “philosophical propositions”, but to make propositions clear… – ‘Tractatus Logico – Philosophicus’ (1921) by Ludwig Wittgenstein

4 For philosophical problems arise when language goes on holiday – ‘Philosophical Investigation’ (1953) by Ludwig Wittgenstein

5 নিউটনের গতিসূত্রসমূহ: (১) বাহ্যিক কোন বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু স্থির এবং গতিশীল বস্তু সুষম গতিতে সরল পথে চলতে থাকে। (২) কোন বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনের হার প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক এবং বল যে দিকে ক্রিয়া করে বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তন সেদিকেই ঘটে। (৩) প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।

6 The world is a construct of our sensations, perceptions, memories. It is convenient to regard it as existing objectively on its own. But it certainly does not become manifest by its mere existence… – ‘Mind and Matter: Cambridge University Lectures (1974)’ by Erwin Schrodinger

7 প্রসঙ্গ ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ প্রবাদ: আপনার-আমার কাছে যা ‘অপ্রাঙ্গিক’, স্থান-কাল পাত্র ভেদে তা-ই চূড়ান্তরকম প্রাসঙ্গিক। ইতিহাসকার সতীশচন্দ্র মিত্রের কথায়, “এই যুগে (শশাঙ্কের যুগে) সমতট ও কলিঙ্গের মত কতস্থান হইতে কত লোক সমুদ্র পথে বালি, লম্বক ও সুমাত্রা প্রভৃতি দ্বীপে গিয়া শৈবমত প্রচার এবং বহু সংখ্যক শিবমন্দির প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। এই নব ঔপনিবেশিক বাঙালীর শক্তি বৃদ্ধি করিয়াছিল। শিবের লিঙ্গ মূর্তি সব জাতীয় লোকে স্পর্শ করিতে ও পূজা করিতে পারে। শিবপূজা সকলের কর্তব্য, এতে অধিকারী ও অনাধিকারীর ভেদ নাই, দীক্ষিত না হইলেও বালক বালিকায়ও ইচ্ছামত জলে, ফুলে, বিল্বফলে শিব পূজা করিতে পারে। -এই উদার পদ্ধতি হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের সমন্বয় করিয়া দিয়া ছিল। ক্রমেক্রমে এ অঞ্চলের লোক এত শৈব মতবলম্বী হইয়াছিল যে সকলে শিব পূজা করিত। শিব কথা কহিত, শিব গীত গাইত এবং শিবের তত্ত্বকথা এমনভাবে সকল বর্ণে প্রবেশ লাভ করেছিল যে, ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ এদেশের একটি প্রবাদ বাক্য হইয়া রহিয়াছে।” - যশোহর-খুল্‌নার ইতিহাস (১৯২২)

8 দ্রষ্টব্য: ‘Langue and parole’ (‘language and speaking)’ – ‘Course in General Linguistics’ by Ferdinand de Saussure

9 তথ্য ও তত্ত্বসূত্র: কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের যে কোনও পাঠ্যপুস্তক! Dr. Lothar Schäfer-এর ‘Infinite Potential: What Quantum Physics Reveals about how We Should Live’ অথবা Dr. David Bohm-এর ‘Wholeness and the Implicate Order’ –জাতীয় ‘জনপ্রিয় বিজ্ঞানে’র বইগুলিও পড়ে দেখা যেতে পারে।

10 পিনোকিও ছিল এক দুষ্টু পুতুল। সে ভাল কাজও দুষ্টুমি বাদ দিয়ে করতে পারতো না। কারণে-অকারণে মিথ্যে বলতো। তবে, এক পরীর শাস্তিতে সে যখনই একটি মিথ্যে কথা বলতো, তার নাকটি একটু করে লম্বা হয়ে যেত। এভাবে বাড়তে বাড়তে তার নাক একদিন অদ্ভুত আকার ধারণ করে। তারপর বিস্তর কান্নাকাটি করে সেই নাক কাটাতে হয়। তখন পিনোকিও শপথ করে আর কখনও মিথ্যের ধারে কাছেও যাবে না, কারণ সে আর পুতুল হয়ে থাকতে চায় না।

11 ইংরেজি ভাষার ওপর শিল্পবিপ্লবের প্রভাব –বিষয়ে বেশ কিছু স্বীকৃত গবেষণাপত্র আছে। সেগুলি একটু খুঁটিয়ে পড়লে বোঝা যায় যে শুধু উপস্থিত শব্দভান্ডারের অর্থ পরিবর্তনই নয়, সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ আর ভোগবাদের স্বার্থে ও পরিণামে অগণিত ‘বিদেশী’ শব্দকে ইংরেজি অভিধানে ঠাঁই দেওয়া হয়। লেখক ও সাংসদ শশি থারুরের কথায়, ইংরেজরা সেই সময়েই হিন্দী ‘লুট’ (লুন্ঠন) শব্দটিকে তাদের অভ্যেসের পাশাপাশি ভাষাতেও স্থান দেয়। (কথাটুকু শুধু তথ্য হিসেবেই পড়ুন। তার মধ্যে ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদে’র গন্ধ খুঁজবেন না। -দোহাই!)

12 ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত ‘Webster's complete dictionary of the English language’–এ Real শব্দের অর্থ হিসেবে পাওয়া যায় “Actual; true; genuine; authentic - Real, Actual... Actual refers to it as acted or performed... Actual, from this reference to being acted, has recently received a new signification, namely, present: as, the actual posture of affairs; since what is now in action, or going on, has, of course, a present existence. Actual is opposed to suppositions; real is opposed to imaginary, feigned, or artificial. An actual fact; a real sentiment.... ‘Bloomsbury Dictionary of Word Origins’ অনুসারে “Real and its various derivatives (such as realism, reality and realize) go back ultimately to Latin rēs ‘thing,’ a word of uncertain origin related to Sanskrit rās (√রস্) ‘riches.’ It had a post-classical derivative reālis, which English originally acquired via Anglo-Norman real and used strictly in the legal sense of fixed property (as in real estate).” - …. এই √রস্ ধাতুর অর্থ ‘আস্বাদন’। -রস, রসনা, রসুই, রসুন, ইত্যাদি।

13 ‘It is interesting that many languages have several words for what we call reality. In the German language, for example, there are two words, Wirklichkeit and Realität, that both have the meaning of reality, but they aren’t synonymous. Rather, they describe different modes of being real. The first is derived from the German verb wirken (to have an effect) and the second from the Latin word for things, res. ... The entities of the realm of potentiality in nature are of that kind; they are not things but forms. Nevertheless they are real, because they have the potential to manifest themselves in the empirical world and to have an effect in it.’ – ‘Infinite Potential: What Quantum Physics Reveals about how We Should Live’ by Prof. Lothar Schäfer

14 সূত্র: ‘The Character of Physical Law’ (1965) by Dr. Richard Feynman

15 তথ্যসূত্র: ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ (আনন্দ) – নীরদচন্দ্র চৌধুরী।

16 নৃতাত্বিক-ভাষাতত্ত্ববিদ এডওয়ার্ড স্যাপিরের মতে - মানুষ ভাষাকে নয়, ভাষাই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। একজন মানুষের সামাজিক আচার ব্যবহার, দৈনন্দিন অভ্যেস থেকে শুরু করে তার চিন্তা, চেতনা ও মনন অবধি সবকিছু নির্ধারিত হয় তার মাতৃভাষা আর ভাষা প্রয়োগের নিয়মকানুনের দ্বারা।... কন্টিনেন্টাল দর্শনের অন্যতম প্রবক্তা মার্টিন হাইডেগার আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, -মানুষ তার ভাষার সাহায্যে নিজেকে প্রকাশ করে না। সত্তার উপাদান হিসেবে ভাষা নিজেই মানুষের মাধ্যমে কথা বলে!

17 ‘দেরিদার বিনির্মাণতত্ত্ব কোনো অবস্থাতেই মানুষের ভাষার ঐতিহাসিক সংগঠনকে বিনষ্ট করতে পারে না।’... - ‘ইহা শব্দ’ (দিব্য প্রকাশ) – অধ্যাপক মঈন চৌধুরী।



86 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন