বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

হিন্দুস্তান পেপারমিল : দুটি চালু ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ করে দেবার গল্প

পার্থ প্রতিম মৈত্র

পর্ব ১


১৩ই নভেম্বর ২০১৭ উদ্যোগমন্ত্রী চন্দ্রমোহন পাটোয়ারী ঘোষণা করেছিলেন কাছাড় এবং নওগাঁ পেপার মিল বন্ধ তো হচ্ছেই না এমনকি বেসরকারী হাতেও যাচ্ছে না। সরকার নিজেই মিল দুটি চালাবে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে মিল দুটি চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় ১৮০০ কোটি টাকার প্রস্তাব রয়েছে, শীগগিরই ইতিবাচক বার্তা আসবে। আগামী নয় ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক ভাবে এই দুটি কাগজকল কে দেউলিয়া ঘোষণা করা হবে। এ বিষয়ে সবপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে নির্দেশিকাও জারী হয়েছে। ইনসলভ্যন্সি অ্যাণ্ড ব্যাঙ্করাপ্সি বোর্ড অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে ন্যাশনাল কোম্পানি ল ট্রাইবুনাল এর কাছ থেকে তারা কাগজকল দুটিকে দেউলিয়া ঘোষণা করার আদেশ পেয়েছে। তাই সঙ্গে সঙ্গে হিন্দুস্তান পেপার কর্পোরেশনের গভর্নিং বডি ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। অতএব প্রত্যক্ষ ভাবে ১৬০০ কর্মী তাদের পরিবার, এবং পরোক্ষ ভাবে আরও কয়েক সহস্র পরিবারের ভবিষ্যত অন্ধকারের গহ্বরে নিমজ্জিত হলো।

প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি। মার্চে কাগজকলের সামনে বিধানসভা নির্বাচনী ভাষণে এবং এপ্রিলে রহা-য় ভাষণে বলেছিলেন ক্ষমতায় এলেই কাগজকল খুলে দেবেন। সুর মিলিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল,একবার নয়, বহুবার। আর সঙ্গে সঙ্গত করেছেন উদ্যোগমন্ত্রী চন্দ্রমোহন পাটোয়ারী। কেন্দ্রীয় ভারী শিল্পমন্ত্রী অনন্ত গীতে আর তার প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়-র সাথে বৈঠক করে জানিয়েছিলেন এই দুটি মিল খোলার জন্য ১৮০০ কোটি টাকার প্যাকেজ তৈরী করেছে কেন্দ্র। তারপর ঠিকাদার লবি, আর সর্বভারতীয় পেপার লবির সামনে এই অসহায় আত্মসমর্পণ।

হিন্দুস্তান পেপার মিল কারও নয়, অনাথ। নাথবতী অনাথবৎ।
আমাদের সদ্য যৌবনে কাছাড় কাগজকল গড়ে উঠতে দেখেছি। তখন শুনেছিলাম এশিয়ার বৃহত্তম কাগজকল হতে চলেছে আমাদের গর্বের এইচ.পি.সি,পাঁচগ্রাম। একটা ধুঁকতে থাকা চিনি কল ছাড়া আমাদের কর্মসংস্থানের একমাত্র ভরসাস্থল তখন এই কাগজকল। বিজেপি তখনও জন্মায়নি। আমাদের যৌবনের স্বপ্নস্থল পাঁচগ্রাম পেপার মিল। একটা মিলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে একটা জনপদ। তার যাপন ক্রিয়া।

এখন মাসের পর মাস পেপার মিলের কর্মীরা মাইনে পায়না। অন্নচিন্তা চমৎকারা। কপর্দক শূণ্যতা সহস্রাধিক সংসারকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। জনপদ ধ্বস্ত। রাঙা অধর নয়ন কালো, ভরা পেটেই লাগে ভালো। এত দিনের স্বপ্ন ভেঙ্গে চূরচূর। এক্সোডাস শুরু হয়ে গেছে। এই অশনি সংকেত সূদূর কল্পনাতেও ছিল না কাগজকল ঘিরে গড়ে ওঠা জনপদের। উজাড় করে তারা ভোট দিয়েছে, ক্ষমতায় এনেছে বিজেপিকে। তারপরই বন্ধ হয়ে গেল পাঁচগ্রামের মিল কর্মীদের মাসমাইনে। প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি, তারপর আশার ছলনে ভুলি....। শুধু কর্মহীন স্টাফদের হিসেব নিলে চলবে? ক্যাজুয়াল কর্মী রয়েছে আরও সহস্রাধিক। তাদের উপার্জন বন্ধ ষোল মাস। তাদের ঘিরে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য দোকানী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এক্সোডাস, এক্সোডাস। রোজ শোনা যাচ্ছিল মিল বিক্রী হয়ে যাচ্ছে প্রাইভেট চত্বরে। তারা যে পুরোনো কর্মীদের বহাল রাখবে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। আর সরকারের হাতে মাসমাইনের টাকাটুকুও নাকি অবশিষ্ট নেই।

অথচ কিছুদিন আগেই কোটি কোটি টাকা উড়িয়ে সম্পন্ন হয়েছে নমামি বরাক নদী উৎসব। সেটি কীভাবে সম্পন্ন হলো? এর আগে হয়েছে নমামি ব্রহ্মপুত্র। সেখানেও কোটি কোটি টাকা উড়েছে। কাগজকলের কর্মীরা মাত্র কুড়ি কোটি টাকা ধার চেয়েছিল বিজেপি সরকারের কাছে, কয়েকমাসের মাইনের জন্য। বেঁচে থাকতে হবে তো। কিন্তু সরকারের তো টাকা নেই। উপত্যকার রাস্তাঘাট চলাফেরার অযোগ্য। একদিকে বিদেশী বিতাড়ণ যজ্ঞ, এন.আর.সি, ডিটেনশন ক্যাম্প। অন্যদিকে নিরন্ন অভুক্ত শ্রমিক কৃষকও তাদের পরিবার। কিন্তু সর্বে দুঃখানি নিরাময় সন্তু, সর্বে আনন্দ (সর্বানন্দ) ভবন্তু।

পর্ব ২

অনেককাল আগে,পাঁচগ্রাম স্টেশনের ঠিক পাশেই ছিল বি.এস.এফের একটি ক্যাম্প। পাঁচগ্রাম পাহাড় তখন জঙ্গলে ভর্তি এবং মাঝেমাঝে ফেঁচি বাঘ বেরিয়ে কলোনী থেকে ছাগলটা মুরগীটা খেয়ে পালিয়ে যেতো। হনুমানকুল তখনও বদরপুরে নামেনি। রাজনীতি বলতে কংগ্রেস এবং ছুটকোছাটকা সিপিএম।
সেই বি.এস.এফের ক্যাম্প একদিন উঠে গেল। শুরু হলো পেপার মিলের যুগ। পাহাড় কেটে টাউনশিপ আর নীচের এবরোখেবরো মাটি সমান করে মিল তৈরী শুরু হলো। সেই প্রথম আমাদের পে লোডার দেখা। আমাদের বয়সে বড় বন্ধুরা, বয়সে ছোট বন্ধুরা, সব হৈহৈ করে ঢুকে পড়লো মিল কর্মী হয়ে। আর বাইরে থেকে পণ্য বিলাস, তাদের ঘিরে পাহাড়ের ঢালে ঢালে আলোকমালায় সাজানো টাউনশিপ, শিফটের বাস, কারখানার ভোঁ, কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়। ছোটবড় মিলে অজস্র বন্ধু। আমি পেপার মিলে কোনদিন রাজনীতি করতে যাইনি। প্রায়ই যেতাম নিখাদ আড্ডা মারতে। সবাই মন খুলে, প্রাণের কথা বলতো। অনেক গূহ্য সত্যকথন।

সে সত্যকথন জাগিরোড পেপারমিল নিয়েও আছে। ভৌগলিক অবস্থানগত সুবিধার জন্য জাগিরোড ছিল এইচপিসিএলের নয়নমনি। আজ যে দুর্নীতিকে দায়ী করা হচ্ছে মিল বন্ধ হয়ে যাবার কারণ হিসাবে, সেই ভ্রষ্ট রাজনীতির দুর্নীতির পাঁকেই এ দুটি মিলের জন্ম। সেই অর্থে এই মিল দুটি পঙ্কজ। কাগজকলের কর্মীরা সবাই দুর্নীতির ঊর্ধে সেটা প্রমাণ করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু তাদের ক্ষমতা কতটুকু। সাপ্লায়ারের কাছ থেকে কাটমানি খাওয়া একটি ভারতীয় অসুখ। কোনও ক্ষেত্র তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু সমস্যা অন্যত্রে। সেটা প্রথমে অনুধাবন করা দরকার। হাজার হাজার কোটি টাকা যে মিল মুনাফা দেয়, যে দুটি মিলের মিলিত প্রোডাকশন টার্গেট বছরে দু লাখ টন সেই মিল দুটির সারা ভারতবর্ষের পেপার ইনডাষ্ট্রিতে সুনামি এনে দেওয়ার কথা ছিল। তার তোড়ে ব্যক্তি মালিকানাধীন কাগজকলগুলির পঞ্চত্ব প্রাপ্তির কথা। অতএব জন্মাবধি মিলদুটিকে লড়তে হয়েছে, বিশেষতঃ কাছাড় পেপার মিলকে, (তার ভৌগলিক অবস্থানগত দুর্গমতার কারণে) সারা ভারতের পেপার লবির বিরুদ্ধে। তাদের বাহুবল এবং অর্থবলের বিরুদ্ধে এই পেপার মিলকে বাঁচিয়ে রেখেছে মিল শ্রমিকরাই।

কাগজকলের দুর্নীতির দুটি পর্যায়, একটি উচ্চতর (অদৃশ্যপ্রায়), অন্যটি ক্ষুদ্রতর এবং দৃশ্যমান। আজ বিজেপি সরকারের মন্ত্রীরা ঘটা করে নদী উৎসবে ঘোষণা করেছেন এবার বরাকে ড্রেজিং শুরু হবে এবং তারপরেই নদীপথে বাণিজ্য চালু। তখন আমাদের মত কিছুই ভুলিনা শ্রেণীর কিছু মানুষের মনে পড়ে যায় কাগজকলের ভবিষ্যতের কথাও শুনেছি ঢের। এই নদী খনন বাৎসরিক প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয় বাৎসরিক বন্যার প্রেক্ষিতে। নদীখাত ভরাট হয়ে গেছে বলে বন্যা, আর খনন করলেই বন্যা বন্ধ, পরিবহন চালু। মন্ত্রী হলেই সব জেনে যায়। ফলে চন্দ্রমোহন পাটোয়ারীর নদী বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হয় না খননের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে। এর জন্য যে একটা টেকনো-কমার্শিয়াল সার্ভের প্রয়োজন, সেই সার্ভে পেপারটা দেখাতে বলুন, দেখবেন পলিটিকাল সার্কাস শুরু হয়ে গেছে। কোলকাতাতেও মাঝে মাঝেই হুগলী নদীখাত খনন করে কোলকাতা বন্দরের নাব্যতা বাড়ানোর ধুয়ো ওঠে। তারপর সব থিতিয়ে যায়। এখানেও তাই হবে তবে বাতেলাগুলি একটু প্রলম্বিত হবে, কেননা উনিশে ইলেকশন যে। টুপিটা সেই সময় পর্যন্ত পরিয়ে রাখতে হবে তো।

পর্ব ৩

কেউ কেউ দাবী করেছেন কাগজকলের কর্মীদের দুর্নীতির কারণেই মিলের দুরবস্থা। কেউ কেউ দুর্নীতির উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেছেন বাঁশের মধ্যে কাদা ঢুকিয়ে, ওজন বাড়ানো হয়েছে, কয়লা ভিজিয়ে দেওয়া হয়েছে, সাপ্লায়ারের কাছ থেকে কাটমানি খাওয়া হয়েছে। এখানে কাটমানির বিষয়টি বাদ রাখছি কারণ ওটা সর্বভারতীয় রোগ। ডিফেন্স পারচেজেও কাটমানি খাওয়া হয়, এমনকি সততার পরাকাষ্ঠা মোদী সরকারের আমলেও। মনে করুন দীর্ঘকাল ধরে বরাকে ব্রডগেজ লাইনের গল্প বাতাসে উড়ছিল। কখনও ফিসফাস কখনও সোচ্চার ঘোষণা। ব্রডগেজের কাজ শুরু হয়েছিল বিজেপি সরকারের আসার আগেই। ব্রীজ বানানো থেকে টানেল খোঁড়া রেল পাতা সব কাজই এগিয়ে গিয়েছিল অনেকদূর। কিন্তু কাজটা কিছুতেই সম্পূর্ণ হচ্ছিল না। সবাই জানে এর পিছনে ছিল রোড-লবির খেলা। নতুন সরকার এসে ফাইন্যালি সবুজ পতাকা নাড়ালো আর মোদীর দল স্যুইপিং মেজরিটি নিয়ে জিতলো বরাকে। হ্যাঁ, প্রাক্তন আসু তাত্বিক, অসমীয়া উগ্রজাতীয়তাবাদের প্রতিনিধি সর্বানন্দ সোনোয়ালের খপ্পরে পড়ার জন্য, এনআরসির খাঁড়া মাথায় নিয়েও। কিন্তু আমরা যারা মনে রাখতে তাড়িত হই তাদের মনে আছে ব্রডগজেরও আগে বাড়ানো হয়েছিল পাহাড়লাইনের রেলের মালবহন ক্ষমতা। হেভিয়ার চালানোর কথা ছিল, একসঙ্গে অনেক কম খরচে অনেক বেশী বাঁশ ও কয়লা পরিবহনের জন্য। রোড লবির প্রতাপে হেভিয়ার চালানোর ফ্রিকোয়েন্সি কমিয়ে দেওয়া হলো। যখন চলতো তখনও বগি ভাড়া পাওয়া দুষ্কর। সড়ক পথেই বাঁশ কয়লা আসা অব্যাহত রইলো বহুগুণ বেশী খরচে। এবং এসব ডিল সেটেলমেন্ট হতো দিল্লীতে। এখনও তাই হয়।

কাগজে দেখেছি চন্দ্রমোহন পাটোয়ারী কাগজকল নিয়ে প্রভূত বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন ২০১০ সালে যখন কাছাড় কাগজকল যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন এরা অনশনে বসেন নি কেন? ২০১০ সালে কাছাড় কাগজকল বন্ধ হয়ে যায়? এরাই দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী? বছরওয়ারী উৎপাদনের একটি হিসেব দেখা যাক।
সাল কাছাড় নওগাঁ
২০১০-১১ ৫২,৭৮১ টন ১০২,০০২ টন
২০১১-১২ ৮০,০৬১ টন ১০০,২০১ টন
২০১২-১৩ ৫২,৬৮৩ টন ৮৬,২৭৯ টন
২০১৩-১৪ ৬৪,০৩৭ টন ৮০,০২৩ টন
২০১৪-১৫ ৭৪,৬৭০ টন ৯২,৬৫১ টন
২০১৫-১৬ ১২,৭৭৯ টন ৭২,২২০ টন
২০১৬-১৭ উৎপাদন বন্ধ ৩৫,৫৪৬ টন

এখানে দেখা যাচ্ছে ২০১৪ সালে মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পরেও কাছাড় কাগজকল মোটামুটি উৎপাদন কম হলেও টার্গেটের খুব দূরে ছিলনা (দুটি মিলের ক্ষেত্রেই টার্গেট প্রোডাকশন ১০০০০০ টন)। মনে রাখতে হবে এ সময় থেকে কাগজের দাম বিপুলভাবে বাড়তে শুরু করে। আগে যে কাগজ ৪০০০০ টাকায় বিক্রি হতো এখন তার দাম ৮০০০০ টাকা। অর্থাৎ দ্বিগুণ। মুনাফাও তার অনুপাতেই হবার কথা। কিন্তু দেখা গেল উৎপাদন কমছে। সর্বা সরকার ক্ষমতায় আসীন হবার পরই উৎপাদন চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হলো। মিলশ্রমিকদের দুর্নীতি যদি উৎপাদন বন্ধ হবার কারণ হয়, তবে রাজ্য এবং কেন্দ্র সরকার উভয়ে মিলে সে দুর্নীতি বন্ধ করতে অক্ষম হলো কেন? দু লক্ষ মানুষের অন্নসংস্থান শুধু নয়, একটা সময়ে হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব এনে দিয়েছে এই দুটি মিল। কিন্তু একথা সত্য যে এই দুটি রাষ্ট্রায়ত্ব কাগজকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সারা ভারতবর্ষের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন কাগজকল গুলি হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। এ সরকার তাদের সরকার। এখন উৎসবের সময়।

পর্ব ৪

২০০৮-০৯ সাল থেকে কাছাড় এবং নওগাঁ এই দুই পেপার মিলে উৎপাদন কমতে শুরু করে। কেননা কাঁচামাল মানে বাঁশ এর যোগান হঠাৎই কমতে শুরু করে। বাঁশ থেকে তৈরী পেপার পাল্প এই দুই কাগজকল এর উৎপাদন এর মূল উপাদান। কাছাড় এবং নওগাঁ পেপারমিল দুইই মূলতঃ মিজোরামের বাঁশের ওপর নির্ভরশীল।

সেই মিজোরামের বাঁশ সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায়। কেন?

বাঁশগাছে ফুল আসে প্রায় পঞ্চাশ বছর পরপর। এই বাঁশগাছে ফুল আসার সঙ্গে দুর্ভিক্ষ এবং মড়কের একটা নীবিড় যোগাযোগ রয়েছে বলে উত্তর পূর্বাঞ্চলের মানুষ মনে করেন। না, এটাকে ঠিক সেই অর্থে কুসংস্কার বলা যাবে না, কারণ সত্যিই বাঁশগাছের ফুল আসার সঙ্গে মড়কের সংযোগ আছে, এটা প্রমাণিত। ১৯৫৯ সালে যখন মিজোরামের বাঁশ গাছে ফুল আসে, তার একবছর আগে ১৯৫৮ সালের ২৯শে অক্টোবর মিজোরাম ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল ভারত সরকারকে আগামী দুর্ভিক্ষের কথা জানায় এবং অর্থনৈতিক রিলিফের জন্য আগাম আর্জি পেশ করে। কিন্তু আর্থিক অনুদানের বিষয়টি ভারত সরকার নাকচ করে দেয় কেননা তাদের ধারণায় এই পর্যালোচনাটি সার্বিকভাবে অবৈজ্ঞানিক। ১৯৫৯ সালে বাঁশ গাছে ফুল আসতে শুরু করে, লক্ষ লক্ষ ইঁদুরে ছেয়ে শেষ পর্যন্ত সরকার বাধ্য হয় প্রতিটি ইঁদুর মারার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করতে। ২০.৫ লক্ষ ইঁদুর মারে গ্রামবাসীরা। দেশের প্রথম বাম্বু পলিসি তৈরী হয় মিজোরামে। ২০০৪-০৫ সাল থেকে মিজোরাম শুরু করেছিল পরবর্তী সাইকল এর বাম্বু ফ্লাওয়ারিং সতর্কতা সংকেত পাঠাতে। অথচ হিন্দুস্থান পেপার কর্পোরেশন লিমিটেড সময়মত কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। গবেষণায় দেখা গেছে বাঁশের ফুল বিপুল পরিমাণ ইঁদুরকে আকৃষ্ট করে, তাদের বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করে, এবং ক্ষিধের তাড়ণায় তারা ফসল খেতে শুরু করে। তাই বাঁশগাছে ফুল হওয়ার উপক্রম হওয়া মাত্র, মিজোরামের মানুষ নিজেরাই বাঁশ গাছ নির্মূল করতে শুরু করেছে। তার চাপ এসে পড়েছে কাগজকলে। উৎপাদন কমতে শুরু করেছে। মাঝখানে কর্তৃপক্ষ বিদেশ থেকে পাল্প কিনে এনে মিল চালানোর চেষ্টা করায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে সাংঘাতিক ভাবে। এই একই রাষ্ট্রায়ত্ব কোম্পানির নাগাল্যাণ্ড এর ইউনিটটি (তুলি) পেপার পাল্প উৎপাদন করতো, সেটিকেও বন্ধ করে রাখা হয়েছে।

নতুন যে সমস্যাটি এবারে উপরিতলে আসবে, তা হলো দীর্ঘদিন বসে থাকায় একটা কেমিকাল বেসড শিল্পকারখানায় যন্ত্রাদি অকেজো হয়ে পড়ার আশংকা প্রবল। এই মিল খুলে উৎপাদন চালু করতে বহু কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বারংবার পরিদর্শনের পরও কোনও ব্যক্তিমালিকানার শিল্পপতি এখনও মিল চালানোর আগ্রহ প্রকাশ করেননি বলেই মিল বেসরকারী হাতে না দেবার জিগিরটাকেও পাশাপাশি ঘোষণা ফুঁকতে হচ্ছে। সরকারের উদ্দেশ্য দুটো। এক, কিছুদিনের জন্য (মানে ইলেকশান পর্যন্ত) মিল খোলা রাখা। সামান্য কিছু লোকের পাওনাগণ্ডা মেটানো। তারপর মিল বন্ধ ঘোষণা করা। বিনিময়ে শিল্পপতিরা জমি পাবেন, একটা বিরাট টাউনশিপ পাবেন, অনেক যন্ত্রাংশ পাবেন, প্রায় মুফতে। যেগুলি বিক্রয়যোগ্য বা অন্যত্র ব্যবহারযোগ্য। কর্মীদের পুনর্নিয়োগ বাধ্যতামূলক থাকবে না। জেসপ, ডানলপ থেকে কানোরিয়া জুট পর্যন্ত এমনতরো বহু খেলা আমরা দেখেছি। দুই, প্রথম প্ল্যান সফল না হলে স্মার্টলি প্ল্যান বি তে চলে যাওয়া। অর্থাৎ ব্যক্তিমালিকানাধীন পেপার ইনডাস্ট্রি মালিকদের সঙ্গে ডিল এ চলে যাওয়া। রাষ্ট্রায়ত্ব সব পেপার মিলকে পার্মানেন্টলি বন্ধ করে দেওয়া হবে, তার বিনিময়ে...। ডিল টি অবশ্যই দিল্লীতে বা দিসপুরে সম্পন্ন হবে। প্রায় আট মাস আগেই বন্ধমিলের কর্মীরা এই ভবিষ্যতবাণী গুলো করছিলেন। খতিয়ে দেখবেন, সব অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে মিল বন্ধ হওয়ার কথা ঘোষণা করার জন্য ঠিক এই সময়টিই বেছে নেওয়া হলো কেন? উত্তরটি সহজ। ৩১শে জুলাই এনআরসি ড্রাফ্ট বার হবার দিন। গোটা আসাম আশা-আশংকার দোলাচলে। এর মধ্যে প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া পেপার মিলের দেউলিয়া ঘোষণা এবং পার্মানেন্ট ক্লোজার নোটিশ নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় কোথায়? সবার অলক্ষ্যে সংবাদটিকে গিলে ফেলবে আরও বড় সংবাদের মাৎস্যন্যায়। পেপার মিলের অভুক্ত, নিরণ্ণ মানুষগুলির হাহাকার ছাপিয়ে উঠবে মোদির নামে জয়ধ্বনি। সর্বানন্দ, হিমন্ত, চন্দ্রমোহন পাটোয়ারীরা গদির লোভে শিল্পের শ্বাসরোধ করবে, করেই চলবে, যতদিন না পর্যন্ত তেরঙ্গা ঝাণ্ডা সরিয়ে বিজেপির ভাগোয়া ধ্বজ পতপতিয়ে উড়বে ভারতের উত্তর-পূর্বের ভাগ্যাকাশে। নমামি মোদি, নমামি গদি।



5 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: শক্তি

Re: হিন্দুস্তান পেপারমিল : দুটি চালু ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ করে দেবার গল্প

স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি লেখা ।কাগজকলটি উত্তরপূবাঞ্চলের গর্ব ছিলো ।পাঁচ গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে ওখানে অনেক পিকনিক হোতো ।
Avatar: সিকি

Re: হিন্দুস্তান পেপারমিল : দুটি চালু ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ করে দেবার গল্প

পড়তে পড়তে মাথা নিচু হয়ে আসে। আমরা জাতি হিসেবে নিজেরাই নিজেদের ব্যর্থতার কারণ।

আচ্ছা, এই পাটোয়ারী, সোনোয়াল - এরা কি অসমের ভূমিপুত্র?
Avatar: ।

Re: হিন্দুস্তান পেপারমিল : দুটি চালু ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ করে দেবার গল্প


Avatar: debu

Re: হিন্দুস্তান পেপারমিল : দুটি চালু ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ করে দেবার গল্প

এটার এক টা pdf ভার্সান পাওয়া যাবে? দিল্লি তে পাঠাবো



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন