বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

আব্বু, তুমি কান্না করতেছ যে?

বিপ্লব রহমান


বাংলাদেশের দৃষ্টি এখন দেশের পূর্ব-দক্ষিণের সর্বশেষ প্রান্তে, সাগরপাড়ে কক্সবাজারের টেকনাফে। আ্ওয়ামী লীগ সরকারের চলমান মাদক বিরোধী অভিযানে গত ২৬ মে রাতে সেখানে র‌্যাব-পুলিশের কথিত ‘ক্রসফায়ারে‘ নিহত হয়েছেন সহযোগি সংগঠন যুবলীগ নেতা ও পৌর কমিশনার একরামুল হক। ৩১ মে একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, তার স্বামীকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে। এরপর তিনি গণমাধ্যমে উপস্থিত করেন মৃত্যুর একেবারে শেষ সময়ে একরামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে তার ও কিশোরী কন্যার কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ। রক্ত হিম করা এই অডিও ক্লিপ এখন ভাইরাল হয়ে নড়িয়ে দিয়েছে, এদেশের মানবিক রাষ্ট্রের ধারণাকে।

লাইভ অডিও ক্লিপটিতে শোনা যায়, একটি টেলিফোন কলে মেয়েটি বাবার কাছে জানতে চাইছে, আব্বু, তুমি কখন আসবে? একরাম কান্না ভেজা গলায় বলছেন, চলে আসবো মা, মেজর সাব (র‌্যাব অধিনায়ক) ডেকেছেন, হ্নিলা যাচ্ছি। মেয়েটির প্রশ্ন, কেন? একরাম কান্না ভেজা গলায় বলছেন, জরুরি কাজে যাচ্ছি।... মেয়েটি বলে, আব্বু, তুমি কান্না করতেছ যে?...

এরপর এ প্রান্তে টেলিফোন ধরেন স্ত্রী আয়েশা। বলেন, হ্যালো, আমি কমিশনারের সাথে কথা বলতে চাচ্ছি।আমি উনার মিসেস বলতেছি, হ্যালো? হ্যালো? ...অপরপ্রান্তের স্বর অনুচ্চ। এর খানিক পর গুলির শব্দ, উহ্...গোঙানি...একটু পর আবার গুলির শব্দ। এপারে স্ত্রীর আর্ত চিৎকার, ও আল্লা!...’

চাল-ডাল-তেল-নুন-যানজট-জলজট ইত্যাদি নিত্য সমস্যাকে ছাপিয়ে এখন লোকমুখে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় বোধহয় এই ‘ক্রসফায়ার‘। কমিশনার একরামের এই 'ক্রসফায়ার' অনেক দেরীতে হলেও মানবিক দৃষ্টিকোন থেকেই যেন জাগ্রত করেছে জনতার বিবেক, একরাম মাদক ব্যবসায়ী হলেও একজন জনপ্রতিনিধিকে রাতের বেলা এভাবে পরিবারের কাছ থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে খুন করতে হবে কেন? একরামও কেন আইনের সুবিধা পাবেন না? মাদক ব্যবসার শাস্তি তাহলে বিনাবিচারে গুলিতে খুন? এসব প্রশ্নও এখন ক্রমেই সামনে চলে আসছে।


https://www.youtube.com/watch?v=SjiWNA8BO6M

খবরে প্রকাশ, গত ১৯ দিনে সারাদেশে মাদক বিরোধী যৌথ বাহিনীর অভিযানের সময় ‘ক্রসফায়ার‘ এ মারা গেছেন ১২৯ জন। যৌথ বাহিনীর দাবি, নিহতরা সকলেই মাদক ব্যবসায়ী। বলা ভাল, এই ১২৯ আসলে কেবল শুধু সংখ্যা নয়, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় বা অপরাধমূলক পরিচায় যা-ই হোক না কেন, তারা প্রত্যেকেই আসলে একেকজন কমিশনার একরাম। প্রত্যেককেই কী একই রকমভাবে ঠাণ্ডা মাথায় বিনা বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়নি?

একরামের মৃত্যুর পর সরকার বাহাদুর খানিকটা নড়েচড়ে বসেছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল সাংবাদিকদের বলেছেন, একরামের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করে দেখা হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলি বর্ষনের ঘটনা যেভাবে তদন্ত করা হয়, সেভাবেই তা তদন্ত করা হবে। আর সরকারের আরেক মুখপাত্র, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আরেক কাঠি সরেস। তিনি বলেছেন, দেশজুড়ে চলমান অভিযানে দু-একটি ঘটনা হতেই পারে! তার দাবি, দেশের সাধারণ মানুষ এই অভিযানে খুশী। তবে তিনিও বলেন, একরামের মৃত্যুর ঘটনা খতিয়ে দেখা হবে।


সম্প্রতি ভারত সফর শেষে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে চলমান ‘ক্রসফায়ারের‘’ পক্ষেই কথা বলেছিলেন। তিনি স্পষ্ট বলেন, আমি যখন ধরি, ভাল করেই ধরি। তিনি খানিকটা দৃঢ় কণ্ঠেই তখন বলেছিলেন, আপনারা দেখান, একজনও নিরীহ ব্যক্তি এর (‘ক্রসফায়ারের‘) শিকার হচ্ছে কি না?’

এরপর মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে ‘ক্রসফায়ারের‘ যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বলেন, অপরাধীরও আইনের আশ্রয় নেওয়া সুযোগ দিতে হবে। মাদকের উৎসমুখ বন্ধ না করে এরকম অভিযানে মাদক বন্ধ হবে না। জবাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, অভিযানে মাদক ব্যবসায়ীরা যখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর গুলি ছুড়ছে, তখন আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছুড়লে তারা মারা যাচ্ছে। মাদক ব্যবসার সাথে অস্ত্রও জড়িত রয়েছে। তাই এই অভিযানে বিপুল সংখ্যক মাদক দ্রব্যের সাথে বেশ কিছু অস্ত্রশস্ত্রও উদ্ধার হচ্ছে। আর অভিযানে যাতে কোনো নিরীহ ব্যক্তি হয়রানীর শিকার না হন, সেদিকে লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য কথিত ‘ক্রসফায়ারে‘ এ পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কতোজন সদস্য পাল্টা হতাহত হয়েছেন, তার কোনো চিত্র বা পরিসংখ্যান তুলে ধরেননি। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মিডিয়া সেল থেকেও এখনো এ সম্পর্কিত কোনো তথ্যই দেওয়া হয়নি। কারণ দৃশ্যতই, বানোয়াট ‘ক্রসফায়ার‘ গুলো বরাবরই এক পক্ষীয়।

আরো লক্ষ্যনীয়, কমিশনার একরামের মৃত্যুর খবর ফাঁস হওয়ার পর চলমান মাদকবিরোধী অভিযান যেন কিছুটা ভাটা পড়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতি সকালে সংবাদ সম্মেলনে ‘রাতভর অভিযানের সাফল্য‘ তুলে ধরতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যেন আগের মতো তৎপর নয়। সবচেয়ে বড় কথা, ‘সেইম সাইড অ্যাকশনে‘ একরামের মৃত্যু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভেতরেও সমালোচনার ঝড় তুলেছে।

আর মিডিয়া প্রথম থেকেই ‘ক্রসফায়ারের‘ সংবাদ ফলাও করে প্রচার করলেও এসব ঘটনাকে উদ্ধৃতি চিহ্নবন্দি বা কথিত অভিধায় প্রশ্নবিদ্ধ করে রেখেছে। সংবাদপত্রের মতামত বিভাগে বা টিভির টক-শোতে বিচার বহির্ভূত এসব হত্যা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছেই। কমিশনার একরাম হত্যাকাণ্ড এতে ঘি ঢেলেছে মাত্র। অনেকেই উদাহরণ টেনে বলছেন, এর আগে মেক্সিকো-থাইল্যান্ড-কলম্বিয়া বা ফিলিপাইনে মাদক নির্মূলে এরকম যথেচ্ছ বন্দুকের ব্যবহার হয়েছে। মারা পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। এসব অভিযানে প্রায়ই নিরীহ মানুষও হত্যার সুযোগ সৃষ্টি হয়। আর শেষ পর্যন্ত মাদকও নির্মুল হয়নি। মাদক ব্যবসার নতুন নতুন সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে আবারো।


স্মরণ করা ভাল. বাংলাদেশে তথাকথিত ‘ক্রসফায়ার‘ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ‘ বা ‘এনকাউন্টার‘ এর ইতিহাস খুব নতুন নয়। বলা যায়, স্বাধীনতার পর পরই এটি এ দেশে চালু হয়। ওপারে নকশাল নিধনের নামে এটি চালু করে ইন্দিরা গান্ধি সরকার। একই সময় এপারেও নকশাল বা সর্বহারা নিধনে ব্যবহৃত হয় ‘ক্রসফায়ার‘। আর সম্ভবত এ দেশে প্রথম ‘ক্রসফায়ারের‘ শিকার হন– পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টির প্রধান সিরাজ সিকদার। আলোচিত এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, কোথায় আজ সিরাজ সিকদার? অর্থাৎ ‘ক্রসফায়ারের‘ অমোঘ শক্তিটিকে বৈধতা দিতে চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

এরই জের টেনে জিয়াউর রহমান, এইচএম এরশাদ ও খালেদা জিয়া সরকার বিচারবহির্ভূত রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধিন বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে গঠিত হয় এলিট ফোর্স – র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ান, র‌্যাব। ২০০৩-০৪ সালে র‌্যাব সন্ত্রাস বিরোধী ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট‘ অভিযানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুরু করলে সাধারণ মানুষ চমকে উঠেছিলেন। লোকমুখে র‌্যাবের নাম করণ হয়েছিল – ‘রক্ষীবাহিনী (মুজিব সরকারের আমলে গঠিত বিশেষ বাহিনী) এগেইন ব্যাকড!‘ সে সময় বিরোধী দলকে দমনে র‌্যাব ব্যবহৃত হচ্ছে বলেও অভিযোগে প্রকাশ। আর এতোদিন পর একই রীতি মেনে এখন শেখ হাসিনার সরকার জঙ্গি দমনের পর মাদক দমনের নামে র‌্যাব-পুলিশের ‘ক্রসফায়ার‘ আবার চালু করেছে।

দেখা গেছে, ওপারে এসব ‘ক্রসফায়ার‘ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ‘ বা ‘এনকাউন্টার‘ করে নকশালদের দমন করা যায়নি, যারা এখন মাওবাদী নামে পরিচিত, জনতার শক্তিতেই তারা বেশকিছু অঞ্চলে বিকশিত, তেমনি এপারেও এসব ‘ক্রসফায়ার‘ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ‘ বা ‘এনকাউন্টার‘ করে কোনো রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক অপরাধও শেষ পর্যন্ত দমন করা যায়নি। কারণ, রাজনৈতিক সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান হতে হবে। আর সামাজিক-অপরাধ মূলক সমস্যার প্রতিকার রয়েছে সমাজের ভেতরে ও জনসচেতনতায়। নইলে ‘চুরির শাস্তি কব্জি কর্তন‘ হচ্ছে মধ্যযুগীয় বর্বর শাস্তি, আর যাই হোক তা সভ্য সমাজের বিধান হতে পারে না। আর কে না জানেন, ‘চোখের বদলে চোখ‘ পন্থা আবার চালু করা হলে এক সময় হয়তো পুরো সমাজই অন্ধ হয়ে যাবে!

তাছাড়া সমাজ বিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মীরা সব সময়ই মানবিক সমাজ গড়ার জন্য অপরাধীকে সংশোধনের কথা বলেন। এমনকি মানবদেহের জন্য খুব ক্ষতিকারক নয়, নিম্নমাত্রার এমন ভেষজজাত মাদককে বিশ্বের বেশ কিছু অঞ্চলে সীমিত পরিসরে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। তাই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মহাকাশ বিজয়েরকালে ‘মাথা ব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলা‘ মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।


একটি পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে এখন মাদকের বিস্তার খুব ভয়াবহ। সর্বত্রই ইয়াবা নামক নেশার ট্যাবলেটের ছড়াছড়ি। অলিগলি, মুদি দোকানেও এখন ইয়াবা পাওয়া যায়। এমনকি টেলিফোন করলে বাসায় ইয়াবা পৌঁছে যাবে, এমনই অবস্থা। কয়েক বছর আগেও ফেন্সিডিল ছিল জনপ্রিয় মাদকের মধ্যে শীর্ষে, এরপর আসে হেরোইন, আর এখন সব মাদককে ছাড়িয়ে গেছে ইয়াবা। যুব সমাজের বিশাল একটি অংশ এখন ইয়াবা আসক্ত, শুধু ছেলেরা নন, মেয়েরাও ইয়াবাতে আসক্ত হচ্ছেন। নেশার ছোবলে একটি প্রজন্মই যেন এখন কর্মহীন হতে বসেছে।

শিক্ষিত ও নিরক্ষর বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, সামাজিক অনাচার ও নারী নির্যাতনও বাড়ছে, এসব থেকে তৈরি হচ্ছে হতাশা। আর হতাশা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অনেক তরুণ মাদেকের আশ্রয় নিচ্ছেন। বিনোদনের অভাবে অনেকে মাদককেই গ্রহণ করছেন বিনোদন হিসেবে। আর আসক্তি শেষ পর্যন্ত তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তিল তিল মৃত্যুর গহব্বরে।

সর্বজন বিদিত, মাদকের সঙ্গে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা জড়িত বলে সর্বত্রই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সয়াহতা ও রাজনৈতিক আশ্রয় ছাড়া মাদক ব্যবসা হতে পারে না। তাহলে মাদকের এই ওপর মহলের সিন্ডিকেট ঠিকঠাক রেখে শুধুমাত্র তৃতীয় বা চতুর্থ সারিতে ধরপাকড়-ক্রসফায়ারে খুব বেশী সাফল্য আসবে কী? মাদকের গডফাদাররা থেকেই যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদেরকেও নিরপেক্ষভাবে আইনের আওতায় আনা জরুরি।

এছাড়া বরাবরই অভিযোগ, ’সফায়ারে’ দেওয়ার হুমকি দেখিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতে ভাল ধরণের বাণিজ্য হয়। আর চলতি ‘ক্রসফায়ার‘ ব্যক্তি বা রাজনৈতিক স্বার্থে যে শেষ পর্যন্ত ব্যবহৃত হবে না, তারই বা গ্যারান্টি কী?

লক্ষ্যনীয়, এতো কিছুর পরেও কোনোভাবেই সমাজের এক নম্বর সমস্যা মাদক নয়। বিদ্যুত-পানি-গ্যাস সংকট, চাল-ডাল-তেল-নুন, চলাচল, নিরাপত্তা ইত্যাদি নিত্তদিনের বড় বড় সব সমস্যাকে কোনোভাবেই মাদকের সুনামি ছাপিয়ে যায়নি। তাহলে হঠাৎ করেই কেন এই ‘ক্রসফায়ারের‘ আমদানী?

বলা ভাল, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটার বিহীন সহিংস নির্বাচনে দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ইমেজ সংকট থেকে রেহাই পাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে তাদের দরকার হয়ে পড়েছিল প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার।

আর আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটের বাজারে সুনাম কুড়াতে সাবমেরিন ক্রয়, ফোর-জি নেটওয়ার্ক চালু, মহাকাশে নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সাক্ষাতের পাশাপাশি সরকার কিছু সস্তা হাততালির জন্য হয়তো মাদক বিরোধী ‘ক্রসফায়ার‘ চালু করেছে। এছাড়া জনজীবনের বড় বড় সমস্যা থেকে জনতাকে ভোলাতে হঠাৎ করেই হয়তো তাদের ‘ক্রসফায়ার‘ চালাতে হচ্ছে।

প্রগতিশীল রাজনৈতিক মহল, সুশীল সমাজ, লেখক-সাংবাদিক-শিল্পী, পেশাজীবী, সামাজিক-সাংস্কৃতিক গোষ্টী বা প্রজন্ম শাহবাগ-- কেউই এতোদিন সত্যিকার অর্থে নির্বিচারে সিরিজ হত্যাকাণ্ড বা ‘ক্রসফায়ারের‘ জোর প্রতিবাদ গড়ে তোলেননি। তাছাড়া লাল মওলানা ভাষানীর মতো নেতাও তো আর নাই। যিনি সাতের দশকে মুজিব সরকারের ‘নকশাল দেখামাত্র গুলির নির্দেশের‘ প্রতিবাদ করে একাই বুক চিতিয়ে বলবেন, ‘খামোশ! নকশাল কারো গায়ে লেখা থাকে না!‘

আর কে না জানেন, শোষণ যতোটা না আতঙ্কের, তারচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে-- শোষণ গা-সহনীয় হ্ওয়া।

তবে আশার কথা, কমিশনার একরামের নির্মম মৃত্যু ক্ষমতাসীন-ক্ষমতাহীন, ডান-বাম-মধ্যপন্থা সর্ব মহলে ব্যপক আলোড়ন ফেলেছে।রাজপথেও জড়ো হচ্ছেন, ছাত্র-শিক্ষক-জনতা। মূল ধারার গণমাধ্যমে সদ্য প্রতিবাদ হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে তো বটেই। অনেকেই একরামের কিশোরী কন্যার সেই প্রশ্নবোধক বাক্যটিকে করেছেন ব্যানার, আব্বু, তুমি কান্না করতেছ যে?...

সবচেয়ে বড় কথা, সরকারকে খুব বড় ধরনের অস্বস্তিতে ফেলেছে একরাম-হত্যাকাণ্ড। তাদের হয়তো ‘ক্রসফায়ারের‘ বিপদ ভেবে দেখার সুযোগ তৈরি হবে এখন। আর পুরো পদ্ধতিটিই যে বেআইনী ও বর্বর পন্থা, তা-ও প্রকাশ্য হলো হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে।


ছবি: নিহত টেকনাফের পৌর কমিশনার একরামুল হক ও তার দুই কন্যা তাহিয়াদ ও নাহিয়ান, ফেসবুক থেকে নেওয়া।


সংযুক্ত: টেকনাফে নিহত কমিশনার একরামের মেয়ের লেখা চিঠি।

প্রিয় বাবা,
কেমন আছো তুমি! নিশ্চয় অনেক ভালো আছো। আমরা কিন্তু ভালো নেই। কারণ আমাদের পুরো পৃথিবীটা যে তোমাকে ঘিরেই ছিলো। সকালে ঘুম থেকে উঠার পর থেকে তোমার কাজ ছিলো তোমার রাজকন্যাদের রেডি করা। বাইকে করে প্রাইভেট পড়তে নিয়ে যাওয়া। স্কুলে পৌঁছে দেয়া।

জানো বাবা, বাড়িতে অনেক মানুষ চাচা-চাচী,জেঠু-জেঠিমা,ফুফি-ফুফা আর বাড়ি ভর্তি কাজিনরা। সবার মাঝে তোমার ছায়া খুঁজে চলছি আমরা দুই অনাথ রাজকন্যা। বার বার রাজকন্যা বলছি কারণ তোমার চোখে আমরা রাজকন্যাই ছিলাম।

হয়তো খুব বেশী প্রাচুর্যপূর্ণ ছিলোনা আমাদের জীবন,কিন্তু কখনো কোন কিছুর অভাব তুমি বুঝতে দাওনি আমাদের। আমাদের ছোট বড় সব চাওয়া তোমার কাছে প্রাধান্য পেয়েছে সবার আগে।

সবার মুখে শুনেছি তোমার জানাজাতে প্রচুর মানুষের জমায়েত হয়েছিলো,ইসলাম ধর্মে মেয়েরা সেখানে যেতে পারেনা,তাই আমাদের দেখা হলো না স্বচক্ষে,তুমি কতটা জনপ্রিয় ছিলে সবার কাছে।

হয়তো ঈদের পর থেকে আমাদেরকে স্কুল বাস নিয়ে যাতায়াত করতে হবে। সে সময় তোমাকে অনেক মিস করবো। তোমার শরীর থেকে বাবা-বাবা একটা ঘ্রাণ আসতো, খুব মিস করবো সে ঘ্রাণ।

তোমার গানের গলা যথেষ্ট প্রশংসনীয় ছিলো,আমাদের আবদারে সব গান গেয়ে শুনাতে। মিস করবো সে দরাজ ভরা কণ্ঠের গান।

তোমার ভালো মানের চশমার প্রতি লোভ ছিলো, তোমার রেখে যাওয়া সে সব চশমা আমাদের দিকে জ্বলজ্বল করে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে।

এই কিশোর বয়সে হারিয়ে ফেলবো তা কল্পনাতীত ছিলো।কিন্তু আল্লাহ্‌ তোমাকে নিয়ে গেলেন,হয়তো উনি তোমাকে আমাদের চাইতে বেশী ভালোবাসেন।

বাবা তোমার অসমাপ্ত স্বপ্ন আমরা পুরা করবো,তোমার দেখিয়ে দেওয়া পথে আমরা আজীবন চলবো।

তোমাকে কথা দিলাম,আমরা তোমার সত্যিকার রাজকন্যা হয়ে তোমার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবো। ওপারে অনেক ভালো থেকো বাবা।

-- তোমার রাজকন্যাদ্বয়
তাহিয়াদ/নাহিয়ান।।



34 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ অপার বাংলা 
শেয়ার করুন


Avatar: প্রতিভা

Re: আব্বু, তুমি কান্না করতেছ যে?

কি মর্মান্তিক !


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন