সিজনস অব বিট্রেয়াল – চতুর্থ পর্ব

দময়ন্তী

সিজন-১ (কন্টিন্যুড)

স্থান – কলকাতা শহর কাল – ১৯৪৮ সাল জুন মাস


-
ঝুনুর বিয়েটা যে শেষপর্যন্ত দিয়ে উঠতে পারবেন এমন ভরসা আর করতে পারছেন না প্রমদাকান্ত। সেই সম্বন্ধটা তাঁকে ভেঙেই দিতে হয়েছে, এই মুহূর্তে বিয়ের প্রস্তুতি নেবার মত ক্ষমতা তাঁর একেবারেই নেই। ছেলেটি ভাল ছিল, পরিবারটিও অত্যন্তই ভাল, তাঁরা আরো কয়েক মাস অপেক্ষা করতে রাজী হতেন। কিন্তু এক বছরের বেশি বা আরো পরিস্কার করে বললে অনির্দিষ্টকালের জন্য অপেক্ষা করা তাঁদের পক্ষে হয়ত সম্ভব হত না। অত্যন্ত আত্মাভিমানী স্বভাবের প্রমদাকান্ত তাঁদের অপেক্ষা করার কথাটুকুও বলে উঠতে পারেন নি, অতি সংক্ষেপে এই বিবাহে নিজের অপারগতা জানিয়েছিলেন শুধু। তাঁরা কী মনে করেছেন, সে খবর আর তিনি রাখেন নি। সম্বন্ধটি এনেছিলেন যে আত্মীয়া, অনিলার দেওরের শ্বশুরবাড়ির দিকের, তাকেও খুলে বলেননি কিছু, ফলতঃ ওঁরাও অসন্তুষ্ট। অনিলাবালা জামাইকে ভয় পান বিলক্ষণ, তবু দুই একবার বলবার চেষ্টা করেছিলেন এমন ভাল পাত্র হাতছাড়া করাটা ঠিক হবে না, কিন্তু সরলা যেদিন শক্তমুখে তাঁকে বললে হয় এই বিষয়ে কথা বলা বন্ধ করতে অথবা এই বাড়িতে আসা বন্ধ করতে, সেদিন থেকে তিনিও আর কিছু বলেন নি। ঝুনুকে অবশ্য তাঁরা আর স্কুলে পাঠান নি, বাড়িতেই মায়ের সাথে কাজকর্ম করে, অবসর সময়ে সেলাই ফোঁড়াই। খুব শৌখিন কিছু নয়, এই বাড়িতে পরার শাড়ি কার কোথায় একটু ফেঁসেছে সেটুকু যত্ন করে রিফু করা, একেবারে ছিঁড়ে পরার অযোগ্য হয়ে গেছে যেগুলো, সেগুলো দিয়ে গায়ে দেবার কাঁথাটা বানানো কি একটা খেতে বসবার আসন। দেশ থেকে আসা আত্মীয় পরিজনরা আস্তে আস্তে পায়ের নীচে জায়গা খুঁজে নিচ্ছেন। কেউ কেউ চলে গেছেন অনেকটা দূর বর্ধমান বা আরো দূরে বাঁকুড়ার দিকে। কেউ গিয়ে একটা পোস্টকার্ড দিয়েছেন, কেউ বা তাও না। বোঝেন প্রমদাকান্ত কেউ কেউ হয়ত কিছুটা ক্ষোভ নিয়েই চলে গেছেন, হয়ত আশা করেছিলেন তিনি কলকাতা শহরে এতদিন আছেন, ওঁদের জন্য কিছু উপায় নিশ্চয় তিনি করতে পারবেন, অন্তত আরো একটু বেশি আদর যত্ন।

সরলা রুটিকখানা বানিয়ে পাতলা কাপড় দিয়ে মুড়ে রাখেন, থালার পাশে ভেলিগুড়ের একটা টুকরো রাখেন, থালাটা হালকা বেতের ঝুড়ি দিয়ে চাপা দিয়ে টুনুকে ডেকে বলেন ‘দ্যাখ তো তোর বাবার চান হল নাকি?’ টুনু তাড়াতাড়ি সিঁড়ির কোণায় গিয়ে উঁকি মারে, কলঘরের দরজা খোলা। বাবা তারমানে ছাদে হয় সূর্যপ্রণাম করছে নয় ধুতি গামছা তারে মেলছে। টুনু এসে বলতেই সরলা তরকারির জন্য কেটে রাখা আলুর খোসাটুকু সরিয়ে নেন আলতোহাতে, তাড়াতাড়ি ধুয়ে রুটি করতে এদিক ওদিক যেটুকু আটা ছিল তাতে গড়িয়ে মাখিয়ে, একচিমটি সন্ধকনুনের গুঁড়ো দিয়ে যৎসামান্য তেলে ভেজে নেন মচমচে করে। ভাগ্যিস কাল রাতে সন্ধকনুন গুঁড়ো করে রেখেছিলেন। রুটির সাথে এমনি লবণ তো খাবেন না প্রমদাকান্ত, সব এঁঠো হয়ে যাবে তো। ভাজা হতে না হতেই প্রমদা এসে ঢোকেন রান্নাঘরে, ঝুনুর পেতে দেওয়া ফুলতোলা চটের আসনে বসেন। সরলা রুটি থেকে কাপড়ের মোড়কটা খুলে ভাজাদুইখানা রেখে থালাটা স্বামীর সামনে রাখেন। এমনিতে অফিস যাওয়ার সময় একটা শুখো তরকারি বা আলুভাজা কি পটলভাজা দিয়েই রুটি কখনো কখানা লুচি আর শেষপাতে একটা সন্দেশ খেয়ে যেতেন প্রমদা। গত বৎসরাধিককাল ধরে উপকরণ ক্রমশ কমতে কমতে এসে নিয়মিত একটুকরো ভেলিগুড়ে ঠেকেছে, এরপরেও সরলা চেষ্টা করেন ওরই মধ্যে টেনেটুনে এক আধটা ফেলাছড়া জিনিস দিয়েই কিছু একটা বানিয়ে দিতে। মানুষটা যে শুধু মিষ্টি মিষ্টি জিনিষ দিয়ে খেতেই পারে না, আর ভেলিগুড় কি মাইনসে খায় গো! ও তো দেশগাঁয়ে গরুর জাবনায় দিত! আটারও যা ছিরি! গম যা মেলে রেশনে সে যেমন বিশ্রি তেমনি পোকাওলা। তাই খোকন গিয়ে দুই তিনঘন্টা লাইন দিয়ে তুলে আনে, আবার মিশিরের ওখানে ভাঙিয়ে আনে। ডলে ডলে কতক্ষণ ধরে মাখেন সরলা, কখনও ঝুনু বা টুনুকে বসিয়ে দেন ডলতে। কিসের কি! সেই কেমন শক্ত ছাড়া ছাড়া হয়ে থাকে। বেশি তেলও খরচ করতে পারেন না, ঘিয়ের তো প্রশ্নই নেই। প্রমদা খেতে খেতেই খোকনও চান করে চলে আসে। সরলা একটু অবাক হয়ে বলেন কীরে তুই এত তাড়াতাড়ি যে? খোকন বলে আজ ইশকুলে হাপিয়ার্লির রুটিন দেবে যে, কাল ছোড়দিকে বললাম তো। সরলার ভুরু কুঁচকে ওঠে; হতচ্ছাড়া মেয়ে, একটা কথা যদি খেয়াল করে সময়মত বলে! কোথায় যে মনটা থাকে হতচ্ছাড়ির! গলা চড়ানো বা গালিগালাজ করা তাঁর অভ্যেস নয়, কঠিন ভ্রূকুটিকুটীল মুখে এদিক ওদিক তাকান কিন্তু টুনুকে দেখতে পান না, প্রমদা একমনে খাচ্ছেন বোধহয় খেয়াল করেন নি কিছু, আজকাল মানুষটা বড় অন্যমনষ্ক থাকেন, ঝুনু এককোণে বসে কটা কুমড়ো আর ঝিঙে কুটছিল ব্যপার বুঝে এর মধ্যেই সে ভাইয়ের সাথে চোখের ঈশারায় কিছু বলে আস্তে আস্তে বলে ‘মা ভাত আর ডাল তো নেমে গেছে তুমি ভাইকে দাও আমি একটা ছোট বেগুন পুড়িয়ে মেখে দিচ্ছি ঝট করে।‘ খোকনও অমনি ‘আরে আমার জামাপ্যান্টগুলো একটু চেপে নিতে হবে তো, আসছি আমি’ বলে আবার বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। গাঢ় নীল প্যান্ট আর সাদা শার্ট ওদের ইশকুলের পোশাক ধুয়ে রাখা আছে কাঠের আলমারির মাঝের তাকে, সেখান থেকে বের করে হাতে করে জোরে জোরে চেপে যতটা সম্ভব সমান করে নেবে খোকন। আরো বিরক্ত হন সরলা, প্রমদা খেয়াল করলে খুব রেগে যাবেন। উনি বারবার বলেন ধুয়ে শুকিয়ে একেবারে ইস্ত্রি করে তুলে রাখতে। এখন এই সক্কালবেলা উনুন খালি নেই এখন তো আর ইস্ত্রি করা যাবে না। ছেলে তার মানে ইস্ত্রি না করেই পরে চলে যাবে। ওই রূপের ধুচুনি মেয়ে কাল বিকেলে শুনেও ইস্ত্রিটা করে রাখতে পারল না? আশ্চর্য! প্রাণপণে ক্রোধ দমন করে ঝুনুকে বলেন ‘টুনুকে বলবি চানের আগে নীচে গিয়ে কয়লাগুলো যেন ভেঙে রাখে আর কাল গুল দিতে হবে, রাস্তায় গোবর পড়ে থাকতে দেখলে তুলে আনতে বলবি, তুই বেরোবি না’। ঝুনু ফ্যাকাশে মুখে মাথা নাড়ে, মনে মনে বোনটার হাতটা মনে করে, কয়লাভাঙার মস্ত ভারী হাতুড়িটা মনে করে, মা কি রাগের চোটে পাগল হয়ে গেল? বেগুন থেকে পট পট আওয়াজ করে আগুনের ফুলকি উঠছে, উনুনের দিকে রাখা খোসাটা জ্বলে গিয়ে রস গড়িয়ে পড়ছে দেখে তাড়াতাড়ি বেগুনটা উল্টেপাল্টে দেয় ঝুনু, ভাইকে পরে জিগ্যেস করতে হবে ও কি সত্যিই টুনুকে কাল ইশকুল খোলার কথাটা বলেছিল, নাকি বাবাকে ঘরে দেখে ভয় পেয়ে বলে দিল।


-
রাস্তায় বেরিয়ে একবার পকেটঘড়িটা দ্যাখেন প্রমদা, থানায় ন’টার ভোঁ পড়েছে অনেকক্ষণ হল, নাহ সাড়ে ন’টা বাজে নি এখনও দু’মিনিট বাকী আছে। রান্নাঘরের ঘটনাটুকু তাঁর চোখকান এড়ায় নি কিন্তু তিনি সেটা বুঝতে দেন নি। আজকাল অনেকসময়ই তিনি সাংসারিক খুঁটিনাটি বিষয়ে খানিকটা নির্লিপ্ত থাকেন। প্রকৃতপক্ষে ছেলেমেয়েদের সামনে, বিশেষত ঝুনুর সামনে তিনি বড় অপরাধী বোধ করেন। এইসব ভাবতে ভাবতেই গলির মুখে পৌঁছে যান, পাঞ্জাবীরা সকলেই মনে হয় কাজে গেছে। ওদের দেখলেই কেমন একটা অস্বস্তি লাগে যেন, না দেখে স্বস্তি বোধ করলেন, এদিক ওদিক দেখে দ্রুত রাস্তা পার হয়ে বাস স্টপে গিয়ে প্রায় দৌড়েই একটা ডবল ডেকার বাস ধরে নিলেন। লালদিঘী অবধি যাবে বাসটা, লালদিঘী নেমে আর এই তো দু’পা ওঁর অফিস। তাড়াহুড়োয় ওঠায় পেছনের দরজায় উঠে পড়েছেন, ফলে সোজা দোতলায় উঠে যেতে হল। সিঁড়িতেই টিকিট কেটে নিয়ে ওপরে এসে বসলেন প্রমদা। জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতেই মনে পড়ে গেল মাস দুয়েক আগের রানাঘাট যাবার সেই দিনটা। অনেক বাধা সঙ্কোচ কাটিয়ে, দ্বিধাদ্বন্দ্ব সরিয়ে পয়লা বৈশাখের ঠিক পরেপরে এক রবিবার সকাল সকাল জলখাবার খেয়ে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন। রানাঘাটে নেমে বেশি খুঁজতেও হয় নি, এলাকার লোকে দেখা গেল কৃষ্ণকান্তকে বেশ একডাকেই চেনে। বাড়ী পৌঁছে প্রমদাকান্তের রীতিমত তাক লেগে গেল, পাবনার মত অত বড় বাড়ি না হলেও নেহাৎ ছোটও তো নয়, বারবাড়িতেই নয় নয় করে আট নয়টা ঘর। ভেতর বাড়িতেও হবে ওরকমই আট নয়টার মত ঘর, বেশ বড় বাগান সামনে পেছনে, পুকুর একটা জল টলটলে। বৌদিদি, ছেলে মেয়েরাও সকলেই এসে গেছেন, সে অবশ্য স্বাভাবিকই, সে দেশ তো আর তাঁদের থাকার যুগ্যি নেই। মেজদিদি আর আরো এক জ্ঞ্যাতি খুড়িও রয়েছেন। কৃষ্ণকান্ত ভাইকে দেখে অবাক হয়েছিলেন কিনা বোঝা যায় নি, তবে খুব খুশী যে হন নি তা বেশ বোঝা গিয়েছিল। আপ্যায়নে কোনও ত্রুটি অবশ্য ছিল না। প্রমদা তাও আশা করছিলেন দাদা নিজেই হয়ত কিছু দিতে চাইবেন, বিশেষতঃ ঝুনুর বিবাহ সম্পর্কিত বিস্তারিত খোঁজ নেওয়ার সময়। দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর প্রমদা আস্তে করে টাকার কথাটা পাড়লেন। মুহূর্তে হাস্যময় কৃষ্ণকান্ত মুখ থেকে তামাকের নল নামিয়ে গম্ভীর হয়ে বসলেন। এরপরের আলোচনাটুকু চিরতরে ভুলে যেতে পারলেই ভাল হত প্রমদার পক্ষে।

প্রমদা হাজার তিনেক টাকা চাইলে, কৃষ্ণকান্ত প্রথমে বলেন তাঁর হাত সম্পূর্ণ খালি টাকা তিনি একেবারেই দিতে পারবেন না। আর প্রমদা ঠিক কেন, কী বাবদে টাকা চাইছেন এও তো তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না! প্রমদা দীর্ঘকাল কলকাতায় আছেন, তাঁকে সব ছেড়ে স্ত্রী সন্তানের হাত ধরে নিঃসহায় হয়ে পথে নামতে হয় নি, এমতাবস্থায় প্রমদারই কি উচিৎ ছিল না কৃষ্ণকান্তদের সকলের ভার নেওয়া? তা তো নেনই নি, কোনওরকম খোঁজখবরই নেন নি এতদিন, এখন এসে কীসের টাকা চাইছেন তিনি? অভিযোগের তীব্রতা ও আকস্মিকতায় তিনি এতই হকচকিয়ে যান যে তাঁর মুখে কথা যোগায় না, আর তাঁকে চুপ দেখে কৃষ্ণকান্ত আরো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। প্রমদা কোনওমতে একবার বলেন গত বাইশ পঁচিশ বছর যাবৎ প্রতি মাসেই তো তিনি পাবনায় টাকা পাঠিয়েছেন, পাবনার সম্পত্তি তাঁদের পৈত্রিক সম্পত্তি, তার বিক্রির টাকার কিছু অংশ যদি ----- তাতে কৃষ্ণকান্ত কঠোরমুখে জানিয়ে দেন পাবনার সম্পত্তি কিছুই বিক্রি করা যায় নি, তা সম্পূর্ণই ‘শত্রুসম্পত্তি’ ঘোষণা করে পাকিস্তান সরকার দখল করে নিয়েছে আর টাকা যা তিনি পাঠিয়েছেন তাও পরিবার প্রতিপালনের জন্যই পাঠিয়েছেন যা তাঁর কর্তব্যই ছিল। এরপরেও নিতান্ত নিরূপায় হওয়াতেই দেশ থেকে আসা মুখগুলির কথা ভেবে, নিজের ছেলেমেয়েগুলির কথা ভেবেও প্রমদা অগত্যা ধার চান, কৃষ্ণকান্ত উঠে গিয়ে একটি কাঠের বাক্স থেকে পঞ্চাশটি টাকা বের করে এনে দিয়ে জানান এর বেশি তাঁর পক্ষে আর সম্ভব নয় আর এ টাকা যেন জুন মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে দিয়ে যান প্রমদা। তাঁরও ছেলেপুলে নিয়ে সংসার, উপরন্তু মেজদিদি আর খুড়ির ভারও তাঁরই কাঁধে চেপেছে কাজেই --। সেদিন কীভাবে যে বাড়ী ফিরেছিলেন প্রমদা সে আর ঠিক করে মনে পড়ে না, রানাঘাট স্টেশনে এসে বহুবার মনে হয়েছে ওই ঘসসঘসস করে দৌড়ান ট্রেনের সামনে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়েন, বহুবার মনে হয়েছে শ্যালদায় নেমে অন্য কোনও ট্রেনে উঠে চলে যান, একবার কি পাবনায় যাবার চেষ্টা করে দেখবেন, বাড়িতে? তাঁদের সেই বাড়িটায়? ঔরঙ্গজেবের দেওয়া সেই পাঁচখানা গ্রামের অধিকার নিয়ে পাট্টাখানা? আকবরের ছাপ মারা একটা মোহর তো সরলাকেও দিয়েছিলেন মা মুখ দেখানি বিয়ের পরে। বাবা মা দুজনেই স্বর্গে গেছেন আজ কত বছর হয়ে গেল! প্রমদা চিরকাল জেনে এসেছেন দাদা আছেন মাথার উপর, তিনিই সব বিলিব্যবস্থা করবেন ঠিকঠাক। ওই পঞ্চাশটি টাকা অবশ্য তিনি আর হাতে করে তুলে আনতে পারেন নি।


-
দুই মেয়েকে নীচে এসে সিঁড়ির তলা থেকে কয়লার চাঙড়গুলো বের করেন সরলা। তিনজনে মিলে টেনেটুনে বাড়ির সামনের গলিটায় নামান, বড় হাতুড়িটা নিয়ে দরজার ধাপিতে বসে এদিক ওদিক তাকান, যদি আশে পাশের বাড়ির মানদা বা মোক্ষদাকে দেখা যায় তাহলে বলবেন কয়লাকটা একটু ভেঙে দিতে আজ। কাল উনুন ধরানোর মত আর নেই, এদিকে আজ সকান থেকে সরলার রক্ত ভাঙা শুরু হয়েছে, এ অবস্থায় কয়লা ভাঙা তো চলবে না উনুন অপবিত্র হয়ে যাবে। সাক্ষাৎ অগ্নিদেব বলে কথা। ঝুনুকে উনি এত ভারী কাজ এখন দিতে চান না, কে জানে কখন কোথা দিয়ে সম্বন্ধ চলে আসে, সবই জানেন তবু অবুঝের মতই আশা করেন তাঁর ঝুনুকে দেখে কেউ হয়ত শুধু শাঁখা সিঁদুর দিয়েই তুলে নিয়ে যাবে। রাগ করে টুনুকে কয়লা ভাঙতে বললেও ও পেরে উঠবে না জানেন তিনি, তাই খুঁজছেন কাউকে। যাবে দুআনা আর কী করা যাবে। কে যেন ডাকে ‘মাঈজি এ-এ মাঈজি’ , ডানদিকে তাকিয়েই দেখেন একটা বাচ্চা ছেলে, অসম্ভব রোগা মাথায় লালচে বাদামী এলোমেলো জটপড়া চুল, হাতেপায়ে গালে এত ময়লা মনে হচ্ছে যেন ময়লার একটা পুরু স্তর বসে গ্যাছে গায়ে। পরণে উদ্ভট ধরণের ফুলপ্যান্ট দড়ি দিয়ে বাঁধা কোমরের সাথে, গায়ে কিছু নেই। সরলা তাকাতেই কয়লার চাঙরগুলোর দিকে আঙুল দেখিয়ে হাত পা নেড়ে বোঝাল যে ও ভেঙে দেবে। কথা যা বলছে ঠিক বাঙলা নয় খানিক হিন্দি বোধহয় আর কি যেন মেশানো। সরলা ঠিক রাজি হতে পারেন না। একটু ভয়ও পান। আজকাল শহরে অনেকরকম লোক আসে, সেই যুদ্ধের সময় থেকেই শুরু হয়েছে। হিন্দি তিনি ভাল বোঝেনও না, তবে ওই পাঞ্জাবীরা বলে আর আরো দুয়েক ঘর ওই বাজারের দিকটায় আছে তাই খুব অল্প একটু বুঝতে পারেন। ঝুনু টুনুও অবাক হয়ে দেখছে ছেলেটাকে। নাম জিগ্যেস করায় নাম বলল জামু। এ আবার কেমন নাম বলতে তড়বড়িয়ে বলে ‘জামু নেহি, জামুন জামুন, বহেন কি নাম জমনা, মেরা নাম জামুন’। বাড়ি কোথায়? কানপুর। সে কোথায় সরলা জানেন না, অন্তত খোকনটাও যদি বাড়ি থাকত। ছেলেটা বলে ও কয়লাগুলো ভেঙে দেবে, ওকে শুধু একথালা ভাত আর দুটো রুটি খেতে দিতে হবে, সাথে শুধু ডাল দিলেই হবে আর কিচ্ছু চাই না। সরলা একটু অবাক হয়ে ভাবেন পয়সার কথাটা আগ বাড়িয়ে জিগ্যেস করাটা ঠিক হবে কি, ছেলেটা যখন বলছে না কিছু। সরলাদের সিঁড়ির তলার চাতালের দিকে শোভাদিদের একটা ঘরের দরজা আছে, এর মধ্যেই কথাবার্তার আওয়াজ পেয়ে শোভাদি দরজা খুলে মুখ বাড়ান ‘কে রে সরলা? কার সাথে কথা বলিস?’ শোভাদিকে দেখে সরলা ভরসা পান। ব্যপার সংক্ষেপে বলে তাঁর পরামর্শ চান। এদিকে তাঁদের কথা বলার ফাঁকেই সে ছেলে দিব্বি হাতুড়িটা নিয়ে দমাদ্দম কয়লা ভাঙতে লেগে গেছে। শোভাদি বলেন ‘তা পেটখোরাকিতে খারাপ কী? করুক না, ভেতরে ঢুকতে দিস না, রাস্তায় কয়লা ভাঙুক, তাপ্পরে এই চাতালে বসে খেয়ে সব মুছে দিয়ে যাবেখনে। ততক্ষণ তোতে আমাতে দুটো গপ্প করি।‘ টুনু গিয়ে ওপর থেকে তাড়াতাড়ি একটা বড় জলচৌকি এনে শোভামাসিকে বসতে দেয়, ঝুনু যায় ছেলেটার খাবার যোগাড় করতে। একবেলা একথালা ভাত দেওয়া এখনও অনেক সহজ বিকল্প।

কয়লা ভাঙা শেষ করে রাস্তার টিপকলে হাত ধুতে গিয়ে ছেলেটা পড়ে গেল একেবারে অমরিন্দরের মুখোমুখি। সরলারা চিনতে না পারলেও কানপুর অমরিন্দর বিলক্ষণ চেনেন। নাম আর বাসস্থান শুনেই তাঁর তীক্ষ্ণ চোখজোড়া যেন জ্বলে ওঠে, তিনি ছেলেটিকে নিজের ঘরে ডাকেন। জামু কিম্বা জামুন হঠাৎ একদৌড়ে পালিয়ে এসে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে, ভেতরে সিঁড়ির তলায় ঢুকে যেতে চায়, প্রায় পেছন পেছনই দৌড়ে আসেন অমরিন্দর সিং খোলা কৃপাণ হাতে। ততক্ষণে বাইরে বৃষ্টি নেমেছে ছোট ছোট ফোঁটায়। ঘটনার আকস্মিকতায় শোভা, সরলাও হুড়মুড়িয়ে উঠে দাঁড়ান। ইতিমধ্যে ঝুনু ছেলেটির খাওয়ার আয়োজন সম্পন্ন করেছে, কলাইয়ের থালার উপরে কলাপাতা পেতে তাতে ভাত, ডাল একটা তরকারি আর সকালের বেগুনপোড়া অল্প একটু। একপাশে দুটো আটার রুটি আর একটুকরো ভেলিগুড়। ভাত আর ডালের পাত্র ঢাকা দিয়ে একটু দূরে রাখা, দরকারমত ঢেলে দেবে। এইসব আয়োজন দেখে অমরিন্দরও একটু হকচকিয়ে যান। শোভাদিই এগিয়ে গিয়ে ঘটনা ব্যাখ্যা করে তাঁর উত্তেজনার কারণ জানতে চান। কৃপাণ কোমরে রেখে ছেলেটিকে ডেকে দিতে বলেন, শোভাদিই অনিচ্ছুক ও ভীত ছেলেটিকে সামনে আনেন। সবাইকে আশ্চর্য করে অমরিন্দর জামুনকে বলেন প্যান্ট খুলতে। জামুন জোরে জোরে মাথা নাড়ে, খুলবে না সে। বারেবারে বলে উনোনে হমে মারনে আয়া, হমে ভাগা --- আমরা আখের খেতে লুকিয়ে ছিলাম ওরা আমার কাকাকে মারল, আমার মামাকে জিন্দা জ্বালিয়ে দিল আমি আখ জড়িয়ে পড়ে ছিলাম ওরা ভাবল আমি মরে গেছি, ওরা বহেনা জমনাকে উঠিয়ে নিয়ে গেল --- বাদমে হমনে ভাগা--- ভাগতা হুয়া এক বুডঢা দাদাজি’নে মুঝে কান্ধোমে ব্যায়ঠাকে রফুজি ক্যাম্প রাখকে আয়া। বলে আর কাঁদে – কাঁদে আর বলে একই কথা ঘুরেফিরে আর শক্ত করে ধরে থাকে কোমরের কাছে প্যান্টটাকে। অমরিন্দরের চোখ আরো তীক্ষ্ণ হয় – প্যান্ট উনি খোলাবেনই। এবার ঘোমটার মধ্য থেকেই সরলার ঈষৎ কঠিন কন্ঠ শোনা যায়। অমরিন্দরের উপস্থিতিতে মাথার ঘোমটা নেমে এসেছে থুতনি পর্যন্ত, তিনি সিংজিকে বাড়ি যেতে বলেন। ছেলেটিকে দিয়ে তিনি খাবার শর্তে কাজ করিয়েছেন, এই ভর দুপুরবেলা সে তাঁর অতিথি, তাকে না খাইয়ে তিনি কোথাও যেতে দেবেন না। আর ছেলেটি বাচ্চা হলেও ছেলে বটে, চার চারটি মেয়ের সামনে তার প্যান্ট খোলার মত অসভ্য ব্যপার তাঁর বাড়ির চৌহদ্দিতে তিনি হতে দেবেন না। থমকে যান সিংজি, কী যেন বলতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত নত হয়ে অভিবাদন করে বেরিয়ে যান তিনি। সরলা এগিয়ে গিয়ে সদর দরজা বন্ধ করে হুড়কোটা তুলে দেন। জামুকে হাত ধারে বসিয়ে দেন থালার সামনে --- ছেলেটা সব সাপটে মেখে নেয় একসাথে --- খায় গবগবিয়ে --- যেন কত দিন মাস খায় নি বুঝি বা। খায় আর কাঁদে আর গল্প বলে --- এক রিফুজি ক্যাম্প (ওর ভাষায় যা রফুজি ক্যাম্প) থেকে আরেক রিফুজি ক্যাম্পে যাবার গল্প ---দিল্লি শহরের গল্প-- দিল্লির রাস্তায় একলা একলা বাচ্চাদের ঘুরে বেড়ানোর গল্প--- টোঙ্গা চড়ে এসে কারা যেন দলে দলে বাচ্চা তুলে নিয়ে যায় সেই গল্প ---জামু একটা রাস্তায় থাকত সেই রাস্তায় একশো দেড়শো বাচ্চা ছিল নানা বয়সের --- একদিন রাতে কারা এসে সত্তর আশি জনকে তুলে নিয়ে যায় --- কেউ জানে না তারা কারা – কোথায় নিয়ে যায় ---- ওরা তাই পরেরদিন সকালেই পালিয়ে যায়। খাওয়া শেষ হতেই দরজা খুলে এদিক ওদিক দেখে নিমেষে মিলিয়ে যায় জামু নাকি জামুন, ততক্ষণে চারিদিক অন্ধকার করে বৃষ্টি নেমেছে। পিছনে ফেলে যায় আখের খেতের মধ্যে দিয়ে পালিয়ে চলা বাচ্চাদের গল্প, দিল্লি শহরের রাস্তায় হঠাৎ বেড়ে যাওয়া বাচ্চাদের গল্প, হঠাৎ উবে যাওয়া বাচ্চাদের গল্পও।

#সন্ধকনুন – সৈন্ধব লবণ বা রক সল্ট




Avatar: Suhasini

Re: সিজনস অব বিট্রেয়াল – চতুর্থ পর্ব

পড়ছি।

Avatar: সিকি

Re: সিজনস অব বিট্রেয়াল – চতুর্থ পর্ব

.
Avatar: de

Re: সিজনস অব বিট্রেয়াল – চতুর্থ পর্ব

এই লেখা পড়ে বলার কিছু থাকেনা!

Avatar: dd

Re: সিজনস অব বিট্রেয়াল – চতুর্থ পর্ব

ভয়ানক
Avatar: Du

Re: সিজনস অব বিট্রেয়াল – চতুর্থ পর্ব

সহ্য করতে পারি না! ওফ।কত দাম দিল কত শিশু আর কত মানুষ!
Avatar: i

Re: সিজনস অব বিট্রেয়াল – চতুর্থ পর্ব

-
Avatar: দ

Re: সিজনস অব বিট্রেয়াল – চতুর্থ পর্ব

এহে দু'একোটা টাইপো থেকে গেছে
আর দময়ন্তী সেহ্‌গাল-এর পার্টিশান'স চিলড্রেন - ফিল্ড স্টাডিজ-এর রেফারেন্সটা দিতে ভুলেছি। সরি।
যাই হোক পরে একসাথে করলে জুড়ে দেব।
Avatar: Swati Ray

Re: সিজনস অব বিট্রেয়াল – চতুর্থ পর্ব

এইটা বই হয়ে বেরন চাই।
Avatar: দ

Re: সিজনস অব বিট্রেয়াল – চতুর্থ পর্ব

আমি তো কলকাতায় থাকি না স্বাতী কাজেই ওটার ওপরে ঠিক হাত নেই আর কি।

কিন্তু এবারে এক মাসের মধ্যেই লিখে ফেলেছি হুঁ হুঁ।
Avatar: Swati Ray

Re: সিজনস অব বিট্রেয়াল – চতুর্থ পর্ব

ভুবন গ্রামে কলকাতায় না থাকা টা কি সমস্যা নাকি? একটু সিরিয়াসলি ভাবলে নিশ্চয় উপায় বেরোবে। পেত্থম কপিটা বুক করে রাখলাম ...পুণায় ক্যুরিয়ার করিয়ে অটোগ্রাফ নিয়ে আসব।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন