বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

কাঠপাতার ঘর

কুলদা রায়

আমার বাবা আর ঠাকুরদা দুজনে মিলে কাঠ-পাতার ঘর বানিয়েছিল। ছোটখাটো ঘরটি। মাটির মেঝে। চালে কাঠ-পাতা। নতুন গাঁ থেকে বাঁশ এনে তিনটি মাচাও বানানো হয়েছিল। বড় মাচায় বাবা মা আর ভাইবোনগুলো। মাঝারি মাচায় বড়দিদি আর জামাইবাবু। ঘরটির একটি বারান্দাও ছিল। সেখানে আমার ঠাকুরদা আর পাগল ঠাম্মা। দরমার বেড়া দিয়ে হু হু করে হাওয়া ঢুকত। মাঝে মাঝে কাঠ-পাতার ফাঁকা দিয়ে বৃষ্টি।

বাড়ির পেছন দিকে ছিল একটা এঁদো ডোবা। আর ঘন ঘাস। এই ঘাস শুকিয়ে হয়েছিল আমাদের প্রিয় বিছানা। এই নরম গরম বিছানায় আমরা জড়াজড়ি ঘুমাতাম। আবার ঘুমের মধ্যে স্বপ্নও দেখতাম। সে সময় আমাদের একটি ছোটো বোন আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ও স্বপ্ন দেখতে জানত না।

কাঠপাতার ঘরটির সামনে খোলা জায়গায় ঠাকুর্দা একদিন ফুলকপি আর পাতা কপি লাগাল। পাগল ঠাম্মা লাগাল কটি মরিচ গাছ। রোজ সকালে গাছগুলিকে বকাঝকা করত, অ মরিচ গাছ, তুই ধরিস না ক্যান। তুই ধরিস না ক্যান। ঠাম্মার এই ধমকে বেশ কাজও হল। কদিনে গাছগুলোর একটা চেকনাই খুলল।

দিদির ছিল কয়েকটি ঢেঁড়স গাছ। আর বাবা পালংশাকের আঁটি ফেলল। জামাইবাবুর ইচ্ছে ছিল কাঁঠালগাছ লাগাবেন। কিন্তু সাহস পেলেন না। তবে কয়েক সারি টমেটো গাছ লাগিয়ে বেশ যত্ন আত্তি করা শুরু করলেন। এর আগে পর্যন্ত টমেটোর নাম ছিল টক বাগুণ। দাদা বিকেলে গাছগুলোকে জলদান করত। আর বুড়ি দির পছন্দ ছিল গোল আলু। বাবা পুবধারে একটা আলু ক্ষেতও করল। পরের বোন দুটি অপর্ণা আর অর্চনা। অর্চনা তখন বেশ দৌড়ে বেড়ায় টলোমলো পায়ে। আর অপর্ণা ছিল বেশ ডাকাবুকো। অপর্ণা এসে বলল, আমরা কী লাগাব?
অর্চনা ঘুরে ঘুরে বলল, আমাল গাত কই। আমাল গাত কই।

তখন আমাদের কাঠ-পাতার বাড়িটির সঙ্গেই ছিল ইছামতী নদী। ওপাড়ে ঘন গাছ—আর গাড়ির শব্দ। নদীর এপারে পেয়েছিলাম একটি লাউ চারা। জলে ভেসে এসেছিল। জলে ভাসা মানুষের মত রোগাভোগা। বেনামা।
এই লাউ চারাটিই তুলে এনে লাগালাম কাঠ-পাতার ঘরের এক কোণে। অপর্ণা শুকনো ঘাস আর পচা কচুরিপানা এনে গাদা করল। তার উপর লাউ চারাটি।

দেখে বাবা রেগে গেল। চারাটি লাগাতেই দেবে না। বড় হলে চালের কাঠপাতা নষ্ট হয়ে যাবে। গাছটি উপড়ে ফেলতে যাবে—তখন ছোটো বোনটি অর্চনা গড়াগড়ি খেয়ে কেঁদে পড়ল। বলতে লাগল, আমাল গাত। আমাল গাত।
গাছটি রয়ে গেল।
আমরা তিনজন প্রতিদিন গাছটিতে জলদান করতাম।

আমাদের লাউ গাছটি বেশ কদিন ছোটমোটো হয়ে থাকল। নড়ে না। নড়ে না। বাড়ে না। আর আমাদের বাগানের বেগুন, টমেটো, ফুল কপি, সিম বরবটি বেশ ফালিয়ে ফালিয়ে বাড়তে লেগেছে। লতায় পাতায় ডগায় বেশ ডগডগে সবুজ হয়ে হয়ে উঠছে।

এ জন্য অপর্ণার মুখ কালো। আর অর্চনা গাছটির কাছে ঘুরে ঘুরে বলে, ও গাত, তুমি বল হবা কবে?
আমার ঠাকুরদা একদিন গাছটির গোড়ার মাটি খুঁচিয়ে দিল। আর দিল একটু গোবর পচা। এর কদিন পর থেকেই গাছটির চেহারা ফিরতে শুরু করল। নতুন পাতা ছাড়ল। সবুজ হল। আঁকশি বেরুল। কটা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে গাছটির চারদিক ঘিরেও ফেলা হল।

তখন আমাদের বাগানের ঢেঁড়স খেতে শুরু করেছি। লাল শাক খাচ্ছি। পালং শাক খাচ্ছি। মরিচ গাছে ফুল আসছে। ওলকপি গোল হচ্ছে। কাঠ-পাতার ঘরটির চারিদিকে একটা ছিরিছাঁদ ধরেছে।

আমাদের কাঠ-পাতার বাড়িটির সামনে একটি কলেজ ছিল। নাম খয়রামারি কলেজ। এইখানে খয়রা পাখি নামত বলে এই নাম। বিকেলে কলেজ মাঠে কেউ কেউ ব্যাডমিন্টন খেলত। খেলত ভলিবল। আর ক্রিকেট। চার ছয় হলে ক্রিকেট বল আমাদের বাগানে এসে পড়ত। টমেটো গাছ, বেগুন গাছ, আলু গাছের ডগা ভেঙে দিত। কোনও কোনও বল তারা খুঁজে পেত। কোনওটি পেত না। আমরা পেতাম। এগুলো ছিল আমাদের হাওয়ায় পাওয়া বল।

লাউ গাছটির সামনে তখন হাত তুলে অপর্ণা অর্চনা আর আমাদের পাগল ঠাম্মা দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। অপর্ণা বলত, অ বল, তুই ইদিকে আসিস না। অর্চনা বলত, বল, তুই পতা। আর ঠাম্মা বলত, তফাৎ যা। তফাৎ যা। বল সত্যি সত্যি তফাৎ যেত। আমাদের লাউ গাছটির ধারে কাছেও ঘেষত না।
লাউ গাছটি এক সময় অর্চনার মাথার উপরে চলে গেল। তারপর অপর্ণার। তারপর আমার। একদিন পাগল ঠাম্মার মাথাও ছাড়িয়ে গেল। কাঠ-পাতা ছুঁই ছুঁই হয়ে যাবে আর কিছু দিনের মধ্যেই। একদিন মা ডালে ফোড়ন শেষে গাছটি ঘুরে ঘুরে দেখল। মায়ের মুখে হাসি। অর্চনার মুখেও হাসি। অর্চনা বলে, আমাল গাত। মা বলে, হু।
অপর্ণা বলে, হু কী মা?
--কুঁড়ি আসতেছে।
--ফুল আসবে?
--ফুল আসবে। লাউ ধরবে।

ফুল আসার সময় হতে হতে ইছামতীর ওপাড় দিয়ে ঘড় ঘড় করে ট্যাংক যাওয়া শুরু করল। আমাদের মাথার উপর দিয়ে কামানের গোলা ছুটে যেতে শুরু করল। আকাশ জুড়ে উড়তে লাগল প্লেন। আর রাতে সব আলো নিভে যেত। বাইরে কন কনে হাওয়া। বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ত। এর মধ্যে আমরা শুকনো ঘাস গায়ে দিয়ে ঘুমিয়ে থাকতাম। বাইরে লাউ গাছ বাড়ত। ঠাম্মা শ্বাস ফেলত। ঠাকুরদা বারান্দার ঘরে থেকে থেকে বলত, জয় বাংলা আইতাছে। জয় বাংলা আইতাছে।

সত্যি সত্যি একদিন জয় বাংলা এল কড়া শীতের মধ্যে। তখন ডিসেম্বর মাস। আমাদের বাগান ভরা শাকসবজি ফলতে শুরু করেছে। একদিন ট্রাক এল। আমরা ট্রাকে উঠে পড়লাম। মা সামান্য একটু কাঁদল কাঠ-পাতার ঘরটির জন্য। ভর ভরন্ত সবজি বাগানটির জন্য। হারিয়ে যাওয়া বোনটির জন্য। অপর্ণা ফিরে ফিরে দেখতে লাগল লাউ গাছটিকে। গাছের কাছে একটি চড়ুই পাখি। কঞ্চির উপরে চুপ করে বসে আছে। অর্চনা বাবার কোলে গলা ফাটাল, আমাল গাত। আমাল গাত।
যশোর রোডে আমাদের ট্রাকটি ঢুকে পড়লে পাগল ঠাম্মা অদ্ভুতভাবে বড় বড় শিরিশ গাছগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখতে লাগল, আমাদের লাউ গাছটি কাঠপাতার ঘরের চালে উঠে গেছে। তারপর কাঠ-পাতার ঘরটি ছেড়ে হাওয়া বেয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করছে। সত্যি সত্যি হাওয়া বেয়ে আকাশে উঠে গেছে। উঠে লাউ গাছটি বলছে, অ ঠাম্মা, বলো তো, কেডা আমি?
ঠাম্মা অর্চনার মতো করে বলে, আমাল গাত। আমাল গাত।
 

-----------------------------------------------------------------------------------------

গল্পটি কুলদা রায়ের গল্পসংগ্রহ 'কাঠপাতার ঘর' ( গুরুচণ্ডা৯ প্রকাশনা) থেকে নেওয়া।



42 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ নববর্ষ ইস্পেশাল ২০১৩  গপ্পো 
শেয়ার করুন


Avatar: রূপঙ্কর সরকার

Re: কাঠপাতার ঘর

এ লেখাটা আগে পড়েছি। তবু গুরুতে কিছু লিখতে হয়, কিন্তু কিচ্ছু লেখা যাবেনা, একটা ভারি নিঃশ্বাস ফেলা ছাড়া। তবে কুলদা রায় সুররিয়ালিস্টিক লেখা ছাড়াও গোদা বাংলাতেও একই রকম সাবলীল - এটা বলা যেতে পারে।
Avatar: কৃশানু

Re: কাঠপাতার ঘর

ভালো লাগলো।
Avatar: I

Re: কাঠপাতার ঘর

অসাধারণ! আর কি বা বলি !
Avatar: kk

Re: কাঠপাতার ঘর

কুলদা রায় আমার বড় প্রিয় লেখক। এরকম স্বপ্নময় কলম খুব বেশি দেখিনি। এই লেখাটিও ব্যতিক্রম নয়। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয় পড়লে। এক একটা কথা বুকের মধ্যে ধাক্কা দেয়, মনের এক্কেবারে ভেতরে সেঁধিয়ে যায় ...."সে সময় আমাদের একটি ছোটো বোন আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ও স্বপ্ন দেখতে জানত না।" .....অনবদ্য !!
Avatar: Tapas

Re: কাঠপাতার ঘর

আমি 'কাঠপাতার ঘর' এবার বই মেলায় কিনেছিলাম। পড়া শুরু করে কিছুটা এগোনোর পরেই বইটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। আমার আস্তানাটি ছোটই, কিন্তু খুব আগোছালো, কোনটা কোথায় থাকে তার একটা তালিকা থাকলে খুব ভাল হত। কিন্তু ওই যা চাই তা পাইনা। সেই জন্যে এত মন ভরানো লেখাটা পড়তে এত দেরী হয়ে গেল। আমার ঘরেও যে একটা লাউ মাচা আছে তা ওই লেখা ছিলনা বলে জানতামনা। আজ পড়লাম, আজ জানলাম।
Avatar: hu

Re: কাঠপাতার ঘর

বড় ভালো
Avatar: সুকি

Re: কাঠপাতার ঘর

আপনার লেখা আমার ভালো লাগে - বড় মায়াবী মনে হয়।
Avatar: Abhyu

Re: কাঠপাতার ঘর

খুব ভালো লেখা
Avatar: Tim

Re: কাঠপাতার ঘর

ভালো লাগলো। অনেকক্ষণ চুপ করে বসিয়ে রাখলো এই লেখা।
Avatar: de

Re: কাঠপাতার ঘর

বাঃ!! খুব ভালো লাগলো!
Avatar: nina

Re: কাঠপাতার ঘর

কুলদাভাইর লেখা বড় ভাল লাগে--অন্যরকমের ভাল---যেন এক স্বপ্নের বাঁশীওয়ালার সুরের পেছন পেছন এক স্বপ্নময় জগতে চলে যাই----
Avatar: vikram

Re: কাঠপাতার ঘর

উফ কি লেখা


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন