বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

নেতাজি ও তিনটি আলুর দম - একটি ইতিহাসের বাইরের ঘটনা

নীনা গাঙ্গুলি

বিহারের একটি ছোট্ট শহর মজ:ফরপুর। অনেক ইতিহাসে ফেমাস ও ইনফেমাস বাড়ী ও লোকজনের শহর ছিল এই মজ:ফরপুর। কবিগুরুর বড় জামাই শরৎ চক্রবর্তী এই শহরের বিহারীলাল চক্রবর্তীর ছেলে। আবার ভাওয়ালের সেই বিখ্যাত (নাকি খুখ্যাত) রানীর বোনঝির বাড়ীও, এবং সেখানে নাকি রানী কিছুদিন ছিলেন (জানিনা, শোনা কথা)।

সময়, পরাধীন ভারত। বাংলা থেকে অনুশীলন /যুগান্তর দল এক তরুণ বিপ্লবী সৈনিক কে পাঠিয়েছে বিহারে দল গড়তে এই শহরে। সেই সুপুরুষ তরুণ খুব অল্প সময়েই হয়ে উঠেছেন সবার প্রিয়। চোট শহরে ইয়াং জেনারেশনকে দেশ উদ্ধারের মন্ত্রে দীক্ষা দেওয়া তাঁর কাজ। তাদেরকে তৈরী করা নানাবিধ ভাবে -- শুরু করেছিলেন একটি ক্লাব ও আখড়া। ব্যায়াম কুস্তি ও নানারকম খেলাধুলা, ক্লাবে নাটক গান ইত্যাদি ছিল ওপরের মলাট -- ভেতরে হত আসল ট্রেনিং। নানা বয়েসের কিশোর ও তরুণের প্রাণে জাগল দেশ স্বাধীনের চেতনা -- কিছু কিশোরী ও এগিয়ে এলেন অতি সাবধানে, বাড়ীর শাসনের আড়ালে, কোনওমতে যতটুকু করা যায়।

সেই শহরের আর একটি পরিবার। আগে যেমন হত অনেকগুলি ভাই, একসঙ্গে থাকেন। সচ্ছল ব্রাহ্মণ পরিবার। সেই পরিবারের দুই তরুণও যোগ দিয়েছেন আখড়ায়। তাদের বড় দিদিও থাকেন সঙ্গে। স্বামী হারিয়েছেন খুব অল্প বয়সে, চারটি মেয়ে নিয়ে -- তাই ভাইয়েরা তাঁকে একলা থাকতে দিতে মোটেই রাজী হননি। অতএব এই চারটি মেয়ের গার্জেন এই মামারা। বড়টির দেখেশুনে ভাল বিয়ে দিয়েছেন। সেজ মেয়েটি তখন কিশোরী ও ছোটটি নেহাতই ছোট, সে সেজদির ছায়া, পেছু পেছু ঘোরে। সেজটির ঋজু স্বভাব, বেখাপ্পা লম্বা আর তার গায়ের রঙও চাপা (সারা বাড়ীতে) তাই তাকে মামারা ডাকে কালিন্দী। খুব অল্প কথা বলে, পড়াশোনয় খুব ভাল -- বই পড়ার নেশা -- যে বই পায় পড়ে ফেলে। তা এই মেয়েও চুপিচুপি গিয়ে দীক্ষা নিয়েছে দেশ স্বাধীনের মন্ত্রে। বাড়ীতে কেউ জানেনা -- শুধু ঐ ছোট বোনটি ছাড়া। দরকারি কাগজপত্র এমনকি একটু আধটু গোলাগুলি-পিস্তল লুকিয়ে রাখা ও যথাসময় যথাস্থানে পৌঁছে দেওয়া -- আপাতত এই তার কাজ। বাড়ী থেকে বেরোলে সঙ্গে ছোটটি থাকলে কেউ সন্দেহ করে না। অমনিতে এই দুটি বোনেরই চমৎকার গানের গলা, তাই তারা ক্লাবের ফাংশানে গান গায় -- এই ছিল তাদের মলাট!

(এই সময় এই কিশোর-কিশোরীরা এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন -- বয়েসে ছোট বলে অনেক সহজে অনেক জায়গায় গলে যেতে পারতেন -- এই নির্ভীক টিনএজারসরা জোরকদমে পা মিলিয়ে চলতেন তরুন সেনানীদের সঙ্গে।)

যা বলছিলাম, ছোট বোনটি ছিল বেজায় ভীতু। তার চোরে ভয়, ভুতে ভয়, সাপে ভয় -- রাজ্যের জিনিষে ভয়। সে যায় সেজদির সঙ্গে অন্ধকার রাস্তা দিয়ে ঝোপঝাড়ের পাশ দিয়ে কখনো কোনো কাগজ কিম্বা কীসব কাপড়ে মোড়া ভারীমতন জিনিষ দেওয়ানেওয়া করতে। সারা রাস্তা "রাম রাম' জপে এই বুঝি ভূত, কি চোর কি সাপ, কীসের খপ্পরে যে পড়বে, আর কাকুতি-মিনতি করে, ও সেজদি তুই এসব করিস না। মা কিম্বা মামারা জানতে পারলে রক্ষে রাখবে না -- কিন্তু সেপাই-দিদি অচল-অনড়। তার দীক্ষা দেশ স্বাধীনের মন্ত্রে। আর সেই তরুণ সৈনিক -- তাঁকে সে দেবতা জ্ঞানে ভক্তি করে। তাঁর ডাকে দেশের জন্য কিছু করতে পারার জন্য সে সদাই ব্যাকুল। তিনি কিছু করতে বললে আর সেটা নিখুঁত করে, করে দিতে পারলেই যেন তার জীবন ধন্য হয়ে যায়।

মজ:ফরপুর শহরে হৈ চৈ -- নেতাজী আসছেন মিটিং করতে সে শহরে। সাজ সাজ রব। সেই তরুণ বিপ্লবীর ওপর ভার সবকিছু তদারকির। নেতাজী সকালে আসবেন, জলখাবার খাবেন, ও তারপর মিটীং।

তরুণ, সেই কিশোরীকে ডেকে বললেন, শোন, নেতাজী লুচি আলুরদম খেতে খুব ভালবাসেন। তুই ওটা বেশ ভাল করিস। তুই ওটা রাঁধবি আর ওনার জলখাবারের দেখাশোনা ব্যবস্থা সব করবি।

সে তো ভয়ে অস্থির -- নেতাজী এক ব্যাঞ্জন খাবেন আর সে রাঁধবে সেটা? যদি খারাপ হয়, যদি ওনার না ভাল লাগে -- ভয়ে ঘামতে থাকে বেচারী। অন্ধকার পথে বনে বাদাড়ে গোলা-বারুদ নিয়ে নির্ভয়ে চালাচালি করে এই মেয়ে -- কিন্তু নেতাজীর জন্য আলুর দম রাঁধবে ভেবেই সে ভয়ে অস্থির।

কাঁপা গলায় বলে, আপনি বড়দের কাউকে বলুন যাঁরা ভাল রাঁধেন--

তরুণের তখন হাজারটা কাজ -- বেশ বকে বলে ওঠেন, যা বল্লাম তাই করবি। কাল সক্কালবেলা যেন সব রেডি থাকে।

সক্কালবেলা উঠে সে রাঁধে একপ্রস্থ -- ছোটবোনকে চাখতে দেয়। মুখে দিয়েই সে বলে, এ কীরে সেজদি, এত মিষ্টি দিয়েছিস কেন?

আবার নতুন করে রাঁধে সে -- বোন চাখে, এম্যা! তোর কী হলরে এটা তো কেয়ং যেন ফ্যাকাসে মতোন --

আবার সে গোড়া থেকে শুরু করে। বোনের মন্তব্য--তোর হাতে যেমনটি হয় তেমনটি হয়নি তো--কিন্তু এটা চলে যায়।

ততক্ষণে সময় হয়ে গেছে, তরুণ আসেন -- কী রে, হল? দে, দেখি কেমন করলি।

ছোটবোন বলে, হি হি হি কোনটা খাবেন আগে --

সেকী? কোনটা মানে? একটাই তো শুধু আলুর দম ?!

কিশোরী ভয়ে ভয়ে বলে, চোখ ভর্তি জল -- ভাল হয় নি, তাই তিনবার করেছি।

তরুণ দরাজ গলায় হা হা হা হা করে হাসেন -- এই হাসিটি আর এই কন্ঠস্বর, এই সুপুরুষ তরুণ -- কিশোরীর বুকের মধ্যে ধুকপুকুনি সবসমই বাড়িয়ে দেয় এই মানুষটি!!

তিনি চাখলেন তিনটি -- মুখটা কি গম্ভীর -- ভ্রুটা কি কুঁচ্‌কালেন -- কিশোরী করুণ গলায় বলেন, কী হবে ! সব কটা বাজে হয়েছে। কেঁদে ফেলে সে।

উনি বলেন -- কী রে, তোকে না কত বড় কাজ করতে হবে জীবনে, আর আলুর দমেই তোর দম বেরিয়ে গেল? আবার সেই হা হা হাসি! বলেন তিনটে তিনরকমের ভাল হয়েছে -- তিনটে মিলিয়ে দিলেই অনেক লোকে খাবে তো।

কিশোরী হাঁ হাঁ করে ওঠে, কিন্তু ততক্ষণে মিষ্টি, ফ্যাকাসে, আর চলে-যায় -- এক পাত্রে এক হয়ে গেছে।




নেতাজী খাচ্ছেন লুচি আলুর দম, জলখাবার। কিশোরী ভয়ে ভয়ে দাঁড়িয়ে ঘেমে যাচ্ছে, লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছে -- না জানি কী অখাদ্য হল আজ এই দেবতার ভোগ!

নেতাজী বলেন -- বাহ:, খুব ভাল হয়েছে আলুর দম। আর একটু আছে?

কিশোরীর জীবন সার্থক! এই স্মৃতি হয়ে ওঠে তার জীবনের এক অমূল্য স্মৃতি।

স্বাধীন ভারত! কিশোরী এখন গিন্নি--আলুর দম যেদিনই রাঁধেন, কত্তা বলেন আজ কোনটি করেছ--এক নম্বর না দুই নম্বর না তিন নম্বর? :-)

হ্যঁ¡, সেদিনের সেই কিশোরী ঘর বেঁধেছেন স্বাধীন ভারতে সেই তরুণ সেনানীর সঙ্গে -- সেও বেশ একপ্রকার যুদ্ধ করেই -- অব্রাহ্মণ যে সেই তরুণ! -- তা সে এক অন্য গল্প!!

2 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ গপ্পো 
শেয়ার করুন


Avatar: amarnath

Re: নেতাজি ও তিনটি আলুর দম - একটি ইতিহাসের বাইরের ঘটনা

বাহ খুব সুন্দর তো লেখা তা। নেতাজি কে আলুর দম খাওআনো চাত্তিখনি কথা!!
Avatar: amarnath

Re: নেতাজি ও তিনটি আলুর দম - একটি ইতিহাসের বাইরের ঘটনা

খুব ভালো লাগলো লেখা তা পরে। আপনার জীবন সার্থক।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন