ফুটবলারের নাম থমাস

মৈত্রেয়, বয়স আট বছর

একটা ছেলে ছিল। তার নাম ছিল তিনু। তিনু একটা গ্রামে থাকত। গ্রামটার নাম ছিল সমস্তপুর। সমস্তপুর গ্রামটায় কোনো খেলার মাঠ ছিল না। কিন্তু সমস্তপুর গ্রামটা যেখানে শেষ হয়ে যেত, সেখানে একটা খুব বড় খেলার মাঠ ছিল। মাঠটা এত বড় ছিল যে মাঠটার অন্য দিকটায় কী আছে, সেটা দেখা যেত না। কেউ যদি মাঠটা দিয়ে হেঁটে মাঠের অন্য দিকটায় যেতে চাইত, তার হেঁটে হেঁটে পায়ে ব্যথা হয়ে যেত, কিন্তু সে অন্য দিকটায় পৌঁছতে পারত না। সমস্তপুর গ্রামের বড়রাও ভালো ছিল না। তাই সমস্তপুর গ্রামের ছোট ছেলেমেয়েরা জানত না, মাঠটার শেষে কী আছে। ওরা যদি সমস্তপুর গ্রামের বড়দের জিজ্ঞেস করত মাঠটার শেষে কী আছে, সমস্তপুর গ্রামের বড়রা ওদের খুব বকত, কিন্তু বলত না মাঠটার শেষে কী আছে।

কিন্তু তিনু আর ওর বন্ধুদের খুব ইচ্ছে করত একটা খুব বড় মাঠে ফুটবল খেলবে। ছোট্ট একটুখানি জায়গায় খেলে ওরা মজা পেত না। তাই ওরা একদিন ঐ বড় মাঠটায় ফুটবল খেলতে গেছিল। অত বড় মাঠে খেলতে পেরে ওদের এত আনন্দ হয়েছিল যে ওরা ঠিক সময়ে বাড়ি ফিরতে ভুলে গেছিল। দেরি করে বাড়ি ফিরেছিল বলে ওদের মাদের কাছে ওদের বকুনি খেতে হয়েছিল। কিন্তু বড় মাঠে খেলে ওদের অনেক বেশি ভালো লেগেছিল, তাই বকুনি খেয়েও ওদের অত বেশি দু:খ হয় নি। ওরা পরেরদিন আবার ঐ বড় মাঠে খেলতে গেল, কারণ ওরা বুঝে গেল ওখানে খেলে ওদের যত বেশি আনন্দ হবে, কোনোকিছুতেই অত দু:খ হবে না। তাই আনন্দটাই বেশি থেকে যাবে।

ওরা সেদিন যখন আবার খেলছিল তখন মাঠের অন্য দিক থেকে একটা ছেলে এসে বলল ""আমি কি তোমাদের সঙ্গে খেলতে পারি?'' তিনুরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ""তুমি ওদিক থেকে কেমন করে এলে?'' ছেলেটা বলল ""এখন বেশি কথা বললে খেলার সময় কমে যাবে, কম খেলা হবে। তাই আগে বেশি করে খেলে নিই, পরে বলব।'' সেদিন ওরা খুব খেলল, কিন্তু ওরা দেখল ছেলেটা ওদের চেয়ে অনেক বেশি জোরে শট মারতে পারে। খুব শক্ত একটা ব্যাকভলি দিয়ে এমন গোল করল, যে গোলকিপার অনেক উঁচুতে লাফিয়েও বলটা ধরতে পারল না। খেলার শেষে ছেলেটা খুব জোরে দৌড়ে মাঠের অন্য দিকটায় চলে গেল, আর চেঁচিয়ে বলল ""কালকে তোমরা আবার এস, আবার খুব খেলা হবে। আর আমাকে ভয় পেও না।'' তিনুর একটা বন্ধু রেগে গিয়ে বলল ""তুমি জোরে শট মার বলে, তোমাকে আমরা ভয় পাব কেন? কালকে আমরা আগে থেকে প্র্যাক্টিস ম্যাচ খেলে রাখব, তারপর আসল ম্যাচের সময় তুমি আমাদের সঙ্গে পারবে না।'' তিনুরা বাড়ি যাওয়ার সময় ঠিক করল, পরের দিন ওরা অনেক তাড়াতাড়ি মাঠটায় চলে আসবে, আর আগে অনেকক্ষণ ধরে একটা প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলে নেবে। সেদিনও ওদের দেরি করে ফেরার জন্য বকুনি খেতে হল। কিন্তু সেদিনও ওদের বেশি দু:খ হল না।

পরেরদিন ওরা আবার ঐ মাঠটায় খেলতে গেল। কিন্তু ওরা জানত না, সেদিন ওরা যখন মাঠটায় যাচ্ছিল, তখন ওদের গ্রামের একজন বড় মানুষও ওদের ফলো করে এসেছিল ওদের থেকে কিছুটা গ্যাপ রেখে। তারপর ওরা যখন মাঠটায় পৌঁছে গেল, তখন ঐ বড় লোকটা ওদের খুব বকল, ঐ মাঠটায় আসার জন্য। তিনু রেগে গিয়ে বলল ""এই মাঠটায় আসা যদি এতই খারাপ, তাহলে তুমিই বা এসেছ কেন আমাদের পিছন পিছন? আর আমরা এখানে রোজ খেলি, আমাদের এখানে খেলতে ভালো লাগে, আমরা এখানেই খেলব।'' লোকটা তখন রেগে গিয়ে ওদের টানতে টানতে ওদের গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। আর সবাইকে বলে দিয়ে ওদেরকে সবার কাছে খুব বেশি বকুনি খাওয়াল। সেদিন ওদের খুব বেশি দু:খ হল। তিনু রাতে ওর মাকে জিজ্ঞেস করল ""আমরা ঐ মাঠে খেলতে পারি না কেন? ঐ মাঠে কী আছে?'' ওর মা বলল ""ঐ মাঠটার শেষে একটা গ্রাম আছে, সেই গ্রামের লোকগুলো ভালো নয়, ওরা তোমাদের ক্ষতি করতে পারে, তাই তোমরা ওখানে খেলবে না।''

পরেরদিন তিনু আর ওর বন্ধুরা খুব দু:খ করে বসেছিল, কারণ ওরা প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলার জন্য ঐ মাঠটায় যেতে পারছিল না। তিনু ওর বন্ধুদের বলল " আমার মা বলেছে, ঐ মাঠটার শেষে যে গ্রামটা আছে, সেই গ্রামের লোকগুলো ভালো নয়, আমাদের ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু কাল যে ছেলেটা আমাদের সঙ্গে খেলেছিল, সে তো খুব ভালো ছিল। কথা বলে খেলার সময় নষ্ট করে নি। আমাদের থেকে অনেক ভালো ফুটবলও খেলে। আমরা কেউ অত ডিফিকাল্ট ব্যাকভলি দিয়ে গোল করতে পারতাম না।'' তখন তিনুদের গোলকিপার বলল ""আমার একটা আইডিয়া এসেছে, আমরা ঐ মাঠটায় একাটা ফুটবল ম্যাচ করব। আমাদের সমস্তপুর ভার্সাস ঐ গ্রামটা। ওরা যখন ফুটবল খেলতে আসবে, তখন আমাদের গ্রামের বড়রা দেখবে যে ঐ গ্রামের ছেলেরাও ভালো, কোনো ক্ষতি তো করেই না, কিন্তু আমাদের থেকে বেশি ভালো ফুটবল খেলে।'' তিনুদের এই আইডিয়াটা খুব ভালো লাগল। ওরা কয়েকদিন আর বড় মাঠটায় ফুটবল খেলতে গেল না, কিন্তু বড়দের থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে ফুটবল ম্যাচের পোস্টার লিখল। বড়রাও যখন দেখল ওরা আর ঐ মাঠটায় খেলতে যাচ্ছে না, তখন আর জানতে চাইল না যে ওরা কী করছে। তারপর একদিন বড়রা ভুলেই গেল যে ওরা আবার ঐ মাঠটায় যেতে পারে।

পোস্টারে ওরা ম্যাচের দিন এমন করে ঠিক করল যে বড়রা যেদিন ঐ পোস্টারগুলো দেখতে পাবে, সেদিনই ম্যাচটা হবে। কিন্তু পোস্টারে ওরা অন্য গ্রামটার নামের জায়গাটা খালি রাখল, কারণ ওরা ঐ গ্রামটার নাম জানত না। পোস্টার লেখা শেষ হয়ে যাওয়ার পর ওরা কিন্তু আগে নিজেদের গ্রামে পোস্টারগুলো দিল না। আগে ওরা লুকিয়ে লুকিয়ে ঐ মাঠটায় গিয়ে ঐ পোস্টারগুলো রাখতে গেল। গিয়ে দেখল, সেই ছেলেটা আগে থেকেই বসে আছে। ছেলেটা ওদের বলল, ""তোমরা এতদিন আস নি কেন? আমি রোজ এখানে এসে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করি।'' তিনুরা বলল "আমাদের গ্রামের বড়রা আমাদের আসতে দেয় নি, আজ আমরা লুকিয়ে এসেছি। তোমাদের গ্রাম ভার্সাস আমাদের গ্রামের ম্যাচ। তোমাদের গ্রামের নামটা কী? তুমি কি এই পোস্টারগুলোয় তোমাদের গ্রামের নামটা লিখে নিতে পারবে?'' ছেলেটা বলল ""আমাদের গ্রামের নাম সুন্দরপুর।''। তারপর ছেলেটা পোস্টারগুলো নিয়ে চলে গেল মাঠটার অন্য দিকে।

পরের দিনে ওরা ম্যাচটা রেখেছিল। আর নিজেদের গ্রামের জন্য পোস্টারগুলোতেও ওরা অন্য গ্রামটার নাম সুন্দরপুর লিখে নিল। তারপর ওরা ম্যাচ খেলতে যাওয়ার ঠিক একটু আগে ওদের গ্রামে পোস্টারগুলো লাগিয়ে দৌড়ে ঐ মাঠটায় চলে গেল ফুটবল খেলতে। গিয়ে দেখল যে আগে থেকেই অন্য টিমটা চলে এসেছে খেলতে, আর অন্য গ্রাম থেকে অনেক লোকও এসেছে ওদের ম্যাচটা দেখতে। তিনুরা তখন ওদের নিজেদের গ্রামের লোকদের আসার জন্য অপেক্ষা না করে ম্যাচটা খেলতে শুরু করে দিল। ম্যাচের সময় ওরা দেখল যে অন্য গ্রামটার প্লেয়াররা খুব ভালো ফুটবল খেলে তিনুদের থেকে। তিনুরা তখন হেরে যাচ্ছিল সুন্দরপুর গ্রামের কাছে। সুন্দরপুর গ্রাম তিনুদের পাঁচটা গোল দিয়ে দিল। ম্যাচে যখন হাফটাইম হল তখন তিনুদের গ্রামের বড়রা মাঠটায় এসে পৌঁছাল, আর তিনুদের চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল ""আর খেলতে হবে না, তোরা ফিরে আয়।'' কিন্তু তিনুরা ঠিক করল ম্যাচ না জিতে ওরা কিছুতেই ফিরবে না। ওরা তখন খুব চেষ্টা করল, ভালো ফুটবল খেলার। কিন্তু তাতেও ওরা পারছিল না সুন্দরপুরের কাছে। কিছুক্ষণ পরে তিনু একটা গোল দিতে পারল, কিন্তু তিনু বুঝতে পারল যে ও নিজে থেকে ঐ শটটা মারতে পারে নি, কেউ যেন ওর পাটা দিয়ে জোর করে গোলটা দেওয়ানো করাল। আসতে আসতে তিনুদের টিমের দশজন প্লেয়ারই একটা করে গোল দিতে পারল, গোলকিপার বাদে। কিন্তু ওরা সবাইই বুঝতে পারল কেউ একটা ওদের গোলগুলো দিতে হেল্প করল। ওরা দশ-পাঁচে ম্যাচটা জিতে গেল। অন্য টিমের প্লেয়াররা চুপ করে বাড়ি চলে গেল, ওদের সঙ্গে হ্যান্ডশেকও করল না। ওরা আর ঐ ছেলেটাকেও দেখতে পেল না, যে সুন্দরপুর থেকে ওদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে আসত। তিনুদের গ্রামের বড়রা তিনুদের খুব বকল। বলল ""তোমরা ঐ গ্রামের সঙ্গে ফুটবল ম্যাচ খেলে ভালো কর নি, এখন বাড়ি চল।'' তিনুও বলল ""ঐ গ্রামের লোকরা যে ভালো, আমাদের কোনো ক্ষতি করে নি, তোমরা সেটাও দেখেছ।'' বড়রা আর কিছুই বলল না।

পরেরদিন তিনুর বন্ধুরা বলল, আজ আমরা ফুটবল খেলব না, কাল অত খেলে আমাদের পায়ে খুব ব্যথা হয়েছে। তিনু তখন একা একাই বড় মাঠটায় গেল। গিয়ে দেখল, সেই ছেলেটা আগে থেকেই বসে আছে, আর কাঁদছে। তিনু ওকে বলল ""তুমি কাঁদছ কেন? হেরে গেছ বলে দু:খ হয়েছে?'' ছেলেটা বলল, ""না, আমার গ্রামের লোকেরা আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ আমি কাল খেলার সময়ে তোমদের জিতে যেতে সাহায্য করেছিলাম। তোমরা তো সমস্তপুরের ছেলে হয়েও আমাকে তোমাদের সঙ্গে খেলায় নিয়েছিলে। তাই তোমাদের ভালো করার জন্য আমি তোমাদের জিতিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। আমার গ্রামের লোকেরা সেটা বুঝতে পেরে আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে।'' তিনু জিজ্ঞেস করল ""কিন্তু তুমি কেমনভাবে আমাদের গোল দিতে সাহায্য করলে, সেটাই তো আমি বুঝতে পারি নি!'' ছেলেটা বলল ""আমাদের গ্রামের সবাইই এরকম অনেক কিছু করতে পারে। তোমাদের গ্রামের যেসব মানুষ মরে যায়, মরে যাওয়ার পরে তারা আমাদের গ্রামে থাকে। আমিও আগে তোমাদের গ্রামে থাকতাম, তারপর আমার খুব অসুখ হয়ে আমি মরে গেলাম, তারপর থেকে আমি সুন্দরপুরে থাকি। কিন্তু এখন তো আমাকে সুন্দরপুর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, এখন আমি কোথায় থাকব?'' তিনু তখন সব বুঝতে পেরে বলল ""তুমি আমার সঙ্গে চল, আমাদের বাড়িতে থাকবে। আর তোমাকে দেখতেও মানুষের মতই, কারণ তুমি তো আগে মানুষই ছিলে।''

তিনু ছেলেটাকে নিয়ে ওদের সমস্তপুর গ্রামে এল। তারপর নিজের বাড়িতে গিয়ে বলল "ও আমার বন্ধু, ওর কোনো থাকার জায়গা নেই। ও কি আমাদের বাড়িতে থাকতে পারে?'' তিনুর মা তো আগে ছেলেটাকে দেখে নি, তাই ""না'' বলল না। তিনুর মা বলল ""হ্যাঁ পারে, কিন্তু আমাদের বাড়িতে থাকতে গেলে ওকে আমাকে কাজে সাহায্য করতে হবে''। ছেলেটা বলল ""হ্যাঁ, আমি তোমাকে সব কাজে সাহয্য করব। আমাকে প্লিজ থাকতে দাও। আমার নাম থিমু।'' তিনুর মা বলল "ঠিক আছে।'' পরের দিন তিনুর মা ঘুম থেকে ওঠার আগেই থিমু সব রান্না শেষ করে রেখেছিল। তিনুর মা ঘুম থেকে উঠে বলল, "এত তাড়াতাড়ি রান্না হয়ে গেল! তাহলে তুমি এবার বাসন ধুয়ে দাও।'' থিমু সেটাও খুব তাড়াতাড়ি করে ফেলল।

তিনুর মা তখন বলল "এত তাড়াতাড়ি সব বাসন ধোয়া সম্ভব না। তুমি তাহলে ঘর মোছ।'' থিমু তখন বুঝতে পারল, খুব বেশি তাড়াতাড়ি করে কাজ করলে তিনুর মা ওকে আরো বেশি কাজ দেবে। তখন ও খুব আস্তে আস্তে ঘর মুছতে লাগল। তিনুর মা অত স্লো স্পিড দেখে রেগে গিয়ে বলল "বাকি সব কাজ তুমি তাড়াতাড়ি করলে, এটা তুমি এত দেরি করে করছ কেন?'' থিমু তখন বুঝতে পারল খুব বেশি আস্তে আস্তে কাজ করলেও থিমুর মা ওকে থাকতে দেবে না, তাই ও মিডিয়াম স্পিডে কাজ শেষ করল। সব কাজ হয়ে যাওয়ার পর ও তিনুর মাকে জিজ্ঞেস করল, ""আমার সব কাজ হয়ে গেছে, এখন কি আমি তিনুর সঙ্গে খেলতে পারি?'' তিনুর মা বলল, ""না, এখন তিনু পড়ছে, এখন তুমি খেলতে পার না। পড়া শেষ হলে তবে খেলতে পার।'' থিমু তখন তিনুর ঘরে গিয়ে দেখল, তিনুর জিওমেট্রি করতে অসুবিধে হচ্ছে। থিমু তখন তিনুকে কম্পাস ধরে সার্কল আঁকতে সাহায্য করল, আর খুব ভালো করে বুঝিয়েও দিল। তিনুর পড়াও তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল। তিনু তখন থিমুকে জিজ্ঞেস করল, ""তুমি লেখাপড়াও তো খুব ভালো কর। আর ফুটবল তো আরো ভালো খেল!'' থিমু বলল ""হ্যাঁ, আমি তো আমার নবছরের জন্মদিনের আগেই অসুখ হয়ে মরে গেছিলাম। তার আগে আমি চাইতাম বড় হয়ে খুব ভালো একটা ফুটবলার হতে। কিন্তু মরে যাওয়ার জন্য আর আমার বড় ফুটবলার হওয়া হল না।'' তিনু বলল ""মরে যাওয়ার জন্য অত দু:খ হওয়ারও কিছু হয় নি। তুমি এক কাজ কর, তুমি কোলকাতায় চলে যাও, সেখানে একটা খুব বড় ফুটবল ক্লাব আছে, মোহনবাগান ক্লাব। তুমি সেখানে গিয়ে ফুটবল খেল। কোলকাতায় ঐ ক্লাবটা আর তার প্লেয়ারদের নামে রাস্তাও আছে। কিন্তু রাস্তাগুলো থেকে মোহনবাগান মাঠটা অনেক দূরে। তুমি মাঠটায় আগে যেও। কিন্তু বড় মানুষ সেজে যেও, ছোট ছেলে দেখলে ঐ ক্লাবের লোকরা তোমাকে টীমে নেবে না।''

থিমু তখন একটা বড় ছেলে সেজে কোলকাতায় এল। এসে লোকদেরকে জিজ্ঞেস করল মোহনবাগান মাঠটা কোথায়। লোকরা ওকে বলে দিল কীভাবে মোহনবাগান মাঠে যেতে হয়। ও গিয়ে দেখল মোহনবাগানের প্লেয়াররা প্র্যাক্টিস করছে। ও গিয়ে একটা প্লেয়ারকে জিজ্ঞেস করল, ""আমিও কি তোমাদের সঙ্গে প্র্যাক্টিস করতে পারি?'' প্লেয়ারটা বলল ""ঠিক আছে, তবে পাঁচটার বেশি শট মারতে পারবে না।'' থিমু পাঁচটা শটের পাঁচটাতেই গোল দিয়ে দিল। তখন মোহনবাগানের ক্যাপ্টেন বলল, ""তুমি তো খুব ভালো খেল, আমাদের সঙ্গে রোজ প্র্যাক্টিসে আসবে।'' থিমু সেই রাতে মোহনবাগান মাঠের গ্যালারিতেই শুয়ে থাকল। পরের দিন আবার যখন ভোরবেলায় প্র্যাক্টিস করতে প্লেয়াররা এল, মোহনবাগানের কোচ থিমুকে দেখে বলল, ""তুমি কোথা থেকে এলে?'' ক্যাপ্টেন বলল, "ওকে প্র্যাক্টিস করতে দিন, ও খুব ভালো স্ট্রাইকার''। থিমু সেদিনও প্র্যাক্টিস ম্যাচ এত ভালো খেলল, যে কোচ ওকে বলল, ""আজ বিকেলে ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে আমাদের ম্যাচ আছে, তুমি সেই ম্যাচটা খেলছ। কিন্তু আমাকে টীমলিস্টে তোমার নাম দিতে হবে, তোমার নাম কী?'' থিমু বলল, ""আমার নাম থিমু।'' কোচ বলল ""তুমি ভালো খেল, কিন্তু নামটা খুব খারাপ।'' সেদিন বিকেলে ইস্টবেঙ্গলকে থিমু একাই ছটা গোল দিয়ে দিল। সবাই অবাক হয়ে থিমুর খেলা দেখল, আর ম্যাচের শেষে কোচকে বলল, ""এই নতুন প্লেয়ার তো খুব ভালো খেলে। ওকে তো আগে দেখি নি, ওর নাম কী?'' থিমু তখন চেঁচিয়ে বলল ""আমার নাম থমাস''। পরের দিন নিউজপেপারে থিমুর ছবি বের হল, কিন্তু নীচে নাম লেখা থাকল থমাস।

সমস্তপুরে তিনু যখন নিউজপেপারটা দেখল, ওর খুব ভালো লাগল থিমু মোহনবাগানে গিয়ে থমাস হয়ে গেছে ভেবে।

(গল্পকার বছরখানেক আগে এই গল্পটি মুখে মুখে বানিয়ে বলেছিলেন। তবে গল্পটি শুনে গল্পকারের মার ধারণা গ্রামগুলির নাম, মুখে মুখে তর্ক করার স্বভাব, শিশুশ্রমিককে (সে মানুষই হোক অথবা ভূত) দিয়ে কাজ করানো এইসব ধারণাগুলো অধিকাংশই ছোটা ভীম নামক কার্টুন সিরিজটির প্রভাব। আর মোহনবাগান ক্লাবের প্রতি অতিপক্ষপাতিত্ব হল সদ্য দেখা এগারো সিনেমাটির প্রভাব।

তবে গল্পকার এই গল্পটির রচনাকালের মাস খানেক পরে খুব ভয় পেয়ে গেছিলেন যখন জেনেছিলেন, ওনার স্কুলের ফুটবল কোচের নাম থমাস এবং তিনিও প্রায় দশ বছর কোলকাতায় ফুটবল খেলেছেন তবে মোহনবাগানে নয়, ইস্টবেঙ্গল ও মহামেডান ক্লাবের হয়ে। এরকম কাকতালীয় ঘটনা এখনো অব্দি গল্পকারের জীবনে খুব বেশি ঘটে নি।

গুরুচন্ডালির অনুরোধে গল্পকার আজ ভোর পাঁচটায় উঠেয় গল্পটিকে লিপিবদ্ধ করেছেন)



Avatar: Du

Re: ফুটবলারের নাম থমাস

আরে এগুলো আগে পড়িনি কেন? ঃ((
Avatar: +

Re: ফুটবলারের নাম থমাস

ফুটবল, মৈত্রেয় । এটা কি ব্যঙাচি??

দারুণ তো!! আর নতুন গল্প নেই ফুটবল নিয়ে? থমাসের পরের বছরের গল্প??
Avatar: de

Re: ফুটবলারের নাম থমাস

ক্ষী ভালো গপ্পো!!
আমার সবচে' ভালো লাগলো এই লাইনটা - "মরে যাওয়ার জন্য অত দুঃখ হওয়ারও কিছু হয় নি।" ঃ)))
Avatar: aranya

Re: ফুটবলারের নাম থমাস

দারুণ লাগল। ৬ বছর আগের লেখা, এদ্দিনে আরও কত বড় হয়ে গেছে ব্যঙাচি, আশা করি ফুটবলটা খেলে এখনও


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন