বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

গানের ঝর্ণাতলায় - প্রথম কিস্তি

দীপঙ্কর বসু

কিছুদিন আগে এক সংগীত রসিক ভদ্রলোক কোন ঘরোয়া আসরে আমার গান শুনে আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল ই-মেলের মাধ্যমে। সেই বৈদ্যুতিন আলাপচারিতার ফাঁকে এক সময়ে তিনি আমার সংগীত শিক্ষানবিশীর দিনগুলির কথা বিশদে জানতে চেয়েছিলেন। ভদ্রলোকের আগ্রহের কথা জেনে খুব অবাক হয়েছিলাম। কারণ আমার মত এক অখ্যাত গায়কের সংগীতচর্চার ইতিবৃত্তে যে কারো কোনরকম আগ্রহ থাকতে পারে তা আমার ধারণার অতীত ছিল। আমার শ্রোতাবন্ধুর অনুরোধ আমাকে একদিকে যেমন বিস্মিত করেছিল,তেমনি আবার খুশীও হয়েছিলাম "পূর্বাচলের পানে' ফিরে চইবার একটা অবসর পেয়ে। বন্ধুর কাছে স্মৃতির অর্গল খুলে দিয়েছিলাম। সেই স্মৃতিচারণের উজ্জ্বলতম অধ্যায়টি আজ সর্বসাধারণের সামনে মেলে ধরতে উস্কানি জুগিয়েছেন আমার অপর এক বন্ধু। অতএব আত্মপ্রচারের পাপ আমার খাতায় জমা হবেন বলেই আমার ধারণা।

ঠিক কবে থেকে গান শিখতে শুরু করেছিলাম তা নির্দ্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। কারন খুব ছোটবেলা থেকেই অবসর সময়ে বাবা বাড়িতে অথবা নিজের পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে আয়োজিত ঘরোয়া আসরে যে সমস্ত গান গাইতেন সেগুলি কেমন করে জানি আপনা থেকেই আমাদের দুই ভাইয়ের গলায় উঠে যেত। যে সমস্ত গান তখন আমাদের দুই ভাইয়ের গলায় ফিরত তার সবকটিই যে আমাদের বয়সের উপযোগী ছিলনা সে কথা বলাই বাহুল্য। একদিন তো বাবার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমার গলায় "চৈত্রদিনের ঝরাপাতার পথে, দিনগুলি মোর কোথায় গেল' শুনে হাসি চেপে রাখতে পারেননি। সেই অপরাধে(?) তাঁকে বহুকাল গান শোনাইনি!

আর একটি কৌতুককর ঘটনার কথায় আমার বন্ধু বিশেষ মজা পেয়েছিলেন। সেটি এখানে উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারলাম না। বাবাকে নকল করে গান গাওয়াটা সম্পূর্ণতা পাচ্ছিলনা বাবার হারমোনিয়ামে হাত দেবার অধিকার অর্জন না করা অবধি। কাজেই একটা বিকল্প ব্যবস্থার খোঁজে চোখ গেল বাবার বইয়ের তাকে দিনেশ্চন্দ্র সেনের "বৃহৎ বঙ্গ' বইয়ের একটি খণ্ডের দিকে। বইটি আয়তনে বেশ স্বাস্থ্যবান অতএব সবার অগোচরে সেই হয়ে উঠল আমার খেলার হারমোনিয়াম। বইটিকে মাটিতে পেতে তার শক্ত বোর্ডের মলাটটিকে বাঁ হাতে হারমোনিয়ামের বেলোর মত চলানা করতে করতে বইয়ের ভেতরের পাতায় কল্পিত রীডের ওপরে এলোমেলো আঙুল চালিয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে ছুটতে লাগল আমার গানের ফোয়ারা। একদিন বাবা আবিষ্কার করলেন বইটির জীর্ণ দশা। অবশেষে বইটিকে বাঁচাতে তাঁকে আপোষ করতেই হল - তাঁর উপস্থিতিতে হারমোনিয়ামটি ব্যবহার করার অনুমতি পেয়ে গেলাম। সামান্য চেষ্টায় যন্ত্রটি বাজানও রপ্ত হয়ে গেল। আমার উৎসাহ দেখে বাবা কিছুকাল পরে আমাদের দুই ভাইকেই রবীন্দ্রসংগীত শেখার জন্য গানের ক্লাসে ভর্তি করে দিলেন। আমার জীবনে যেন একটা নতুন জানলা খুলে গেল। সেই খোলা জানলা দিয়ে খুব কাছ থেকে দেখতে পেলাম সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, শৈলজারঞ্জন মজুমদার, শান্তিদেব ঘোষ, সুবিনয় রায়, মায়া সেন, আরো অনেক বিখ্যাত পণ্ডিত মানুষদের। পরবর্তীকালে তাঁদের কারো কারো স্নেহচ্ছায়ায় আশ্রয় পেয়েছিলাম,পেয়েছিলাম অফুরন্ত প্রশ্রয়।

গান শেখার একটা পর্যায়ে সকলেরই ইচ্ছে জাগে পরিচিতদের ছোট্ট বৃত্তের বাইরে যে বিশাল সংখ্যক শ্রোতৃমন্ডলী আছে তার কাছে পৌঁছতে। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। রবীন্দ্রসংগীতের শিক্ষাক্রমের অন্তিম কয়েক বছরে মায়াদির বিশেষ স্নেহের পাত্র হয়ে উঠতে পেরেছিলাম। তাই আকাশবাণী কলকাতা থেকে অডিশনের ডাক পেয়ে শরণপন্ন হয়েছিলাম মায়াদির, অডিশনের জন্য আমাকে প্রস্তুত করে দিতে হবে। সেই প্রস্তুতি নিতেই মায়াদির নির্দেশ মত তাঁর বালিগঞ্জ প্লেসের বাড়িতে হাজির হয়েছিলাম বাবার সঙ্গে। কে জানত সেখানে একরাশ বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে আমার জন্য।

ঘটনাচক্রে সেই দিনই আবার জর্জদাও কোন কাজে অথবা নিছকই আড্ডার টানে এসেছিলেন মায়াদির বাড়িতে। বসেছিলেন মায়াদিদের বসার ঘরের একটা দরজামুখো সোফায় সাধারণ একটা লুঙ্গি আর গায়ে ফতুয়া মত কিছু একটা পরে। সম্ভবত কোন মজলিশি আড্ডায় মেতেছিলেন মায়াদি এবং গৃহকর্তা ত্রিদিব সেনের সঙ্গে। আমরা পিতা-পুত্র অকুস্থলে পৌঁছনতে ছেদ পড়েছিল সে আড্ডায়।

প্রাথমিক অভ্যর্থনাপর্ব চুকিয়ে মায়াদি যতক্ষণ অডিশনের জন্য আমার প্রস্তুতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছিলেন তখন লক্ষ্য করেছিলাম জর্জদা সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে বসে নীরবে আমাদের কথপোকথন শুনছেন। তাঁর মুখে চোখে লেগে আছে হাসির আভাস। কিছুটা সঙ্কোচ বোধ করছিলাম অপরিচিত ভদ্রলোকটির উপস্থিতিতে। একে তো জর্জদাকে আমি কখনও সামনাসামনি দেখিনি। তদুপরি ঐ রকম ঘরোয়া পোশাকের কারণেই মানুষটি যে প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস, তা আমার মাথাতেই আসেনি। ব্যপারটা সম্যক উপলব্ধি করতে পারলাম যখন মায়াদি ভদ্রলোককে আমার আগমনের কারণ এবং আমার সম্পর্কে দুইএকটি প্রশংসাসূচক মন্তব্য করে আমাকে নির্দেশ দিলেন তৈরি করে আনা গানগুলি "জর্জদাকে' শুনিয়ে দিতে!



বেজায় ঘাবড়ে গিয়েছিলাম মায়াদির প্রস্তাবে। এমন একজন প্রথমসারির জনপ্রিয় শিল্পীর সামনে বসে তাঁকে গান শোনানোটা খুবই চাপের কাজ বলে মনে হয়েছিল। কী জানি হয়ত আমার মত এক অখ্যাত শিল্পী যশপ্রার্থী নবযুবকের গান তেমন মন দিয়ে শুনবেন না অথবা শুনলেও "বাহ, বেশ হয়েছে, অথবা কিস্যু হয়নি' জাতীয় কোন সাধারণ মন্তব্য করে দায় সারবেন। কিন্তু এমন একটা অশ্রদ্ধেয় চিন্তা মাথায় এসেছিল জর্জদাকে চিনতামনা বলেই। তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হবার পর তাঁরই মুখে গল্প শুনেছিলাম ঢাকায় কোন একটি আসরে গাইতে বসে কলকাতার মোটামুটি জনপ্রিয় এক গায়িকাকে শ্রোতাদের একাংশের অসৌজন্যমূলক ব্যবহারের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। জর্জদারও সেই আসরে গান গাইবার কথা ছিল। কিন্তু একজন শিল্পীর প্রতি দর্শক-শ্রোতাদের এ হেন দুর্ব্যবহারে ক্ষুব্ধ জর্জদা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। আয়োজকদের বলেছিলেন যে আসরে শিল্পীদের এভাবে অপমানিত হতে হয় সে আসরে তিনি গান গাইবেন না। জর্জদার প্রতিবাদে কাজ হয়েছিল - অনুষ্ঠনের উদ্যোক্তারা সংশ্লিষ্ট গায়িকার কাছে মার্জনা চেয়ে নিয়ে কোনমতে অনুষ্ঠানটি চালাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

জর্জদার সামনে গান গাইতে হাজারও সঙ্কোচ থাকলেও না গেয়ে উপায়ও ছিলনা আমার। একদিকে মায়াদির নির্দেশ তার ওপর জর্জদা ততক্ষণে হাতের কাছেই মজুদ হারমোনিয়ামটাকে টেনে নিয়ে প্রস্তুত হয়ে বসেছেন - "কই, শুনি কি গান করবেন'



দুটি গান গেয়েছিলাম সেদিন - কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে এবং আমার শেষ পারানির কড়ি কন্ঠে নিলেম গান। আমার যাবতীয় আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণিত করে সেদিন জর্জদা মন দিয়ে শুনেছিলেন গান দুটি, নিজে গেয়ে কিছু কিছু পরিমার্জনাও করে দিয়েছিলেন এবং সর্বশেষে মন্তব্য করেছিলেন আকাশবাণীর অডিশনে পাশ করা আমার হয়ে উঠবে বলে তিনি মনে করেন না। কারণ আমি নকি "পাঁসালি' (পাঁচালি)গাইতে পারি না! আমার হতচকিত ভাব লক্ষ্য করে মায়াদি রহস্য উন্মোচন করে দেন। জর্জদার মতে প্রকৃত রসবোধের অভাবেই হোক, বা তথাকথিত "রাবীন্দ্রিকতা'র প্রতি অন্ধ আনুগত্যের কারনেই হোক পাঁচালি পড়ার মতই স্বরলিপির বৈচিত্র্যহীন নিষ?প্রাণ আবৃত্তিই আকাশবাণী তথা রবীন্দ্রসংগীতের অভিভাবকদের চোখে বিশুদ্ধ রবীন্দ্রসংগীত হিসেবে স্বীকৃত!

যে কাজে গিয়েছিলাম তা মিটে যাবার পর ঐ "পাঁচালি'র মত করে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন নিয়েই জমে উঠেছিল আড্ডা। সে আড্ডায় অবশ্য প্রায় সারাক্ষণই আমি ছিলাম নীরব শ্রোতা। কাউকে অনুরোধ জানাতে হয়নি- পাঁচালির ব্যপারটা ব্যখ্যা করতে গিয়ে জর্জদা বেশ কিছু গানের অংশ গেয়ে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন গান কীভাবে জীবন্ত হয়ে ওঠে। একটি গানের কথাই শুধু মনে পড়ছে এখন। সেটি হল "উদাসিনী বেশে বিদেশিনী কে সে, নাই বা তাহারে জানি।' মনের কোন খোলা জানালা পথে অনির্দিষ্ট কোন অচিন লোক থেকে কে আসা যাওয়া করে, কে তার ক্ষণিক স্পর্শে মনকে জাগিয়ে দিয়ে যায় কে তা বলতে পারে! তাই "নাইবা তাহারে জানি' আমারি মনের রঙে রসে তাকে আমার মত করে সৃষ্টি করব এই প্রত্যয় যেন মূর্ত হয়ে ওঠে নাইবা শব্দটির উচ্চারণ ভঙ্গী থেকে। এক লহমায় জমে ওঠে গান। স্তম্ভিত হয়ে শুনেছিলাম গানটি। সেদিন সেখানে বসে মনে হয়েছিল এতদিন যাবৎ যা কিছু শিখেছি তা কিছুই না - গান শেখা শুরু করেছি মাত্র। নিজের গায়ন সম্পর্কে আমার মনে একটা গভীর অতৃপ্তি জাগিয়ে দিলেন সেদিন জর্জদা। ফলে গিয়েছিল জর্জদার পূর্বাভাস। সেবারে আকাশবাণীর অডিশনে আমি উত্তীর্ণ হতে পারিনি।তবে সত্যের খাতিরে স্বীকার করতেই হয় আমার অসাফল্যের কারণটার সঙ্গে "পাঁচালি' গাইতে পারা-না পারার কোন সম্পর্ক ছিল না। আকাশবাণীর স্টুডিওতে মাইক্রোফোনের সামনে বসে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে সব কিছু ওলোটপালট করে ফেলেছিলাম। বেশ মুষড়ে পড়েছিলাম। তাবে মনের সেই মুষড়ে পড়া ভাব বেশীদিন স্থায়ী হয়নি। সময় সর্ববিধ যন্ত্রণার উপশমের খুব বড় ওষুধ। সর্বোপরি জর্জদার সঙ্গ লাভের সুখ স্মৃতি তো ছিলই।



(ক্রমশ)

138 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ ধারাবাহিক 
শেয়ার করুন


Avatar: pi

Re: গানের ঝর্ণাতলায় - প্রথম কিস্তি

এটাও তুলি।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন