বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

একের মধ্যে বৈচিত্র্য কিম্বা মিলমিশের ১লা বৈশাখ

কৃষ্ণকলি রায়

-- এই শোন, পরশু সন্ধেবেলা না তোরা সবাই আমার বাড়িতে আসিস হ্যাঁ? নেমন্তন্ন।

-- নেমন্তন্ন! ডিনার? কেন রে? কেন রে? পরশু কী আছে? তোর তো জন্মদিন নয়।

--তাহলে কি অন্য কোনো অকেশন? কী অকেশন, বলো না, বলো না।

-- আরে না না, তেমন কোনো অকেশন নয়। আসলে ঐদিন আমার স্টেটে নতুন বছর পালন করা হয়। তাই আর কী।

-- ওমা, তাই বুঝি? বা: তোদের দেশে তাহলে জানুয়ারীতে নতুন বছর নয়?

-- আরে আমাদের দেশের কথা বলছিনা বাপ। আমার যে স্টেটে জন্ম সেই স্টেটের কথা বলছি।

-- ও:, তোমাদের প্রত্যেক স্টেটেও বুঝি আলাদা আলাদা তারিখে বছর শুরু হয়? বা রে!

-- আচ্ছা, তাহলে আমরাও কিছু রান্না করে নিয়ে যাই?

-- ওমা, না না। আমিই তো তোদের নেমন্তন্ন করছি। কিছু আনতে হবেনা।

-- আহা, তা কেন, সপ্তাহের মধ্যিখানে, কাজের মধ্যে তোকে আর অত গুলো ডিশ বানাতে হবেনা। আমরা প্রত্যেকে একটা করে কিছু বানালেই চমৎকার পাঁচ কোর্সের ডিনার হয়ে যাবে।

-- কিন্তু সবাই একেকটা খাবার আনলে একটা মুশকিল আছে যে। কোন খাবারের সাথে কোনটা ম্যাচ করবে তা দেখতে হবে তো? মেনু থীম .....

-- আরে বাদ দাও তোমার মেনু থীম। আমি একটা নতুন আইডিয়া দিচ্ছি। আমরা প্রত্যেকে নিজেদের ফ্যামিলির একেকটা ট্র্যাডিশনাল ডিশ আনবো। তোমার ঐ দিন ডিনারের থীম হোক নানা স্বাদের ইউনিশন। নতুন বছরে নানা কালচার এক হয়ে যাক।

-- ওয়াও, গ্রেট আইডিয়া এমিলি।

-- সাউন্ডস্‌ রিয়ালি গুড।

-- হ্যাঁ হ্যাঁ, দারুণ বলেছিস তো।

অগত্যা .... -- আচ্ছা তাহলে কে কোন কোর্সটা বানাবো ঠিক করে নিবি নাকি? আমি আন্ত্রেটা বানাই।

-- না, আন্ত্রে আমি বানাবো।

-- হ্যাঁ, গালেনা আন্ত্রে বানাক। আমি একটা সাইড ডিশ আনবো, ভেজিটারিয়ান। আর ক্যাথরিন তাহলে তুই আরেকটা সাইড আনিস। আর এদ্রিয়ান আনবে ডেসার্ট।

-- ওকি? তাহলে আমি কী করবো?

-- কেন, তুমি অ্যাপিটাইজার বানাও না।

-- সেকি? আমি হোস্টেস হয়ে শুধু অ্যাপিটাইজার? তা বললে কী করে হয়?

-- আরে রাখ তো। হোস্টেস তো কী? সবাই যে নিয়ম মেনে চলে তাই করতে হবে নাকি সব সময়ে? আমরা অন্য রকম করব। ব্যস!

অগত্যা .......

**************************************************************
ডিং ডং ....... ঠক ঠক ঠক ঠক।

-- এই যে আমরা এসে গেছি।

-- হ্যাপি নিউ ইয়ার। হ্যাপি নিউ ইয়ার।

-- শোন আমরা তোর জন্যে আরেকটা জিনিষ এনেছি, সবাই মিলে।

-- বা: বা:, কী জিনিষ রে?

-- এই যে একটা ভোটিভ ক্যান্ডেল হোল্ডার। এটা দেখ পেতলের। আমি আগের ল্যাবের একজনের বাড়িতে দেখেছিলাম ইন্ডিয়ানরা তো স্পেশ্যাল অকেশনে পেতলের বাতি জ্বালায়। "দিয়া' বলে, না? তাই এতে আজ আমরা একটা মোমবাতি জ্বালাই?

-- হ্যাঁ জলদি জ্বালাও। আমার খুব খিদে পেয়ে গেছে। চলো তাড়াতাড়ি শুরু করা যাক।

--আচ্ছা। এই যে আমি অ্যাপিটাইজারের জন্য বানিয়েছি অরেঞ্জ-রাফি মাছের চপ।

-- উম্‌ম্‌ম্‌ম্‌ম্‌ম্‌ম। এটা কি তোমাদের ফ্যামিলি ট্র্যাডিশন?

-- না ট্র্যাডিশন ফ্র্যাডিশন নয় বাপ। আমার জানা বেস্ট ইন্ডিয়ান রাঁধিয়ে এই চপকে খুব ভালো বলেছিলো। তাই এটাই বানিয়েছি। মাছের চপ বানানোও তো খুব সোজা। এর মধ্যে আমি স্পেশ্যাল টাচ হিসেবে শুধু একটু মরোক্কান স্পাইস দিয়েছি।

-- রও। মরোক্কান স্পাইসটা আবার কী? কোথায় পাওয়া যায়?

-- পাওয়া তো যায় মিড্‌ল ইস্টের দোকানে, ইন্টারনেটেও পাওয়া যায়। তবে আমি এটা বাড়িতে বানিয়েছি, স্রেফ জিরে গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো, হলুদ, গোলমরিচ, নুন, চিনি, প্যাপরিকা, অলস্পাইসের গুঁড়ো (গরম মশলাও চলবে) আর জায়ফলের গুঁড়ো মিশিয়ে নিলেই হলো।

-- আচ্ছা, এইবার দেখা যাক দু নম্বর কোর্সে কী আসছে। এমিলির জুয়েল্ড ভেজিটেব্‌ল্‌স। আরে ঘাবড়াসনা। নামেই অমন বাহারী আসলে বানানো বেজায় সোজা।

-- তাই বুঝি? জুয়েল্ড নাম কেন? দেখতে বেশ হয়েছে তো।

-- নাম কেন তা বাপু জানিনা। কিন্তু এ স্রেফ রোস্টেড সব্জি। খোসা সমেত আলু, গাজর, ফুলকপি সব ছোট টুকরো করে কেটে, একটু নুন গোলমরিচ আর শুকনো রোজমেরী দিয়ে, আর খানিক অলিভ অয়েল মিশিয়ে চারশো ডিগ্রী ফারেনহাইটের আভেনে ঢুকিয়ে দাও। কুড়ি মিনিট পরে একটু নেড়ে চেড়ে, আবার কুড়ি মিনিট। ব্যস।

-- বা রে, সোজাই তো। কিন্তু গালেনা অমন ছটফট করছে কেন?

-- ছটফট করছি কেননা আমার আন্ত্রেটা আমি এখানে বানাবো। এখন।

--অ্যাঁ!! সেকি!!!

-- হ্যাঁ, অবাক হচ্ছো কেন? আমার হলো গ্রীল্‌ড ফিশ। আগে থেকে করে আনলে মোটেই ভালো লাগতো না খেতে। করে সঙ্গে সঙ্গে খেতে হয়। দেখছো কী? গ্রীল প্লেটটা বার করো? হ্যাঁ এইবার, এই যে আমি পার্চ মাছ ম্যারিনেড করে এনেছি। প্রথমে মাছের স্কিন সাইডটা ছুরি দিয়ে চিরে চিরে দিতে হয় জানো তো? নাহলে গরম প্যানে নিলেই গুটিয়ে যাবে। ম্যারিনেড কী দিয়ে করলাম? এই তো আধ কাপ ফ্রুটি অলিভ অয়েল, রসুন কুচি, তেজপাতার গুঁড়ো, আর যা হার্বস তোমার হাতে থাকবে। আমি দিয়েছি পার্সলে, রোজমেরী, আর বেসিল। যত বেশিক্ষণ ম্যারিনেড করতে পারবে ততই ভালো। তবে সময় কম থাকলে আধ ঘন্টাতেও হবে। এইবার দেখো একেকটা মাছ নিয়ে শুধু গরম গ্রীল প্লেটে বসিয়ে দিলেই হলো। তেলে ডোবানোই ছিলো তাই নতুন করে তেল আর লাগবেনা। আহা হেলথি কিনা তাই বলো? এই বার তিন মিনিট করে একেক পিঠ সেঁকলেই ব্যস, তৈরী।

-- এইবার অন্য সাইডটা। ক্যাথরিন?

-- দেখ বাপু, আমি লুইসিয়ানার মেয়ে জানিসই তো। কাজেই আমার সাইড হলো ডার্টি রাইস।

-- এ:, নামটা কেমন ইয়ে মত, না?

-- চুপ এমিলি। সব তাতে তোর ফাজলামী! একে কেজান রাইসও বলে তা জানিস?

-- আহা রাগ করে না। কেজান রাইসই সই। কী করে বানালি রে?

-- এই তো প্রথমেই কিছুটা চিকেনের কিমা একটা প্যানের মধ্যে নিলাম তো? তেল টেল কিছু লাগবে না। এতে একটু রসুন গুঁড়ো আর গোলমরিচ দিয়ে মাঝারীর থেকে একটু বেশি আঁচে নেড়ে নেড়ে ব্রাউন করে নিতে হয়। এবার এটা তুলে নিয়ে ঐ পাত্রেই তেল ঢাল। গরম হলে,তেলের মধ্যে দিতে হবে, হ্যাঁ রাইট গেস, ট্রিনিটি।

-- অ্যাঁ: !! ট্রিনিটি!!

-- কি জ্বালা, তোরা দেখি কিছুই জানিস না। পেয়াঁজ, সেলেরী আর ক্যাপসিকামের কুচি, এই কম্বিনেশন তো যেকোনো কেজান রান্নায় লাগে। একে ট্রিনিটি বলে তাও জানিস না? আচ্ছা, এই ট্রিনিটি একটু ভাজা হলেই দে অল্প উস্টারশিয়ার স্যস, একটু লাল লঙ্কার স্যস, নুন, প্যাপরিকা। কিম্বা দোকানে যে কেজান সীজনিং কিনতে পাওয়া যায় সেই দিলেও হয়। তাহলে নুন আর দিস না। ওতেই অনেক নুন থাকে। আগে তুলে রাখা চিকেন এবার মিশিয়ে দে। নেড়ে চেড়ে এর মধ্যেই চাল দিয়ে দে। আরেকটু কষে যত চাল তার দ্বিগুণ জল। আমি অবশ্য আদ্ধেক জল আদ্ধেক চিকেন স্টক মিশিয়ে দিলাম। এবার ঢাকা দিয়ে মাঝারী আঁচে রাখলে পনেরো মিনিটের মধ্যেই চাল সেদ্ধ হয়ে সব জল টেনে নেবে। হয়ে গেলো ডার্টি, ইয়ে, কেজান রাইস।

-- বা:, চমৎকার। ডেসার্ট কোর্সের আগে কিন্তু আমি এই একটা সেমি ডেসার্ট বানিয়েছি। তোরাই যতই বল। হোস্টেস হয়ে আমি শুধু একটা জিনিষ বানিয়েই ক্ষান্ত থাকতে পারিনা। এ হলো মিষ্টি ফিগ চাটনী।

-- ফিগ চাটনী কিন্তু কোনদিন শুনিনি। ইন্টারেস্টিং। খুব ঝামেলার বুঝি?

-- একেবারেই না, দুনিয়ার সহজতম চাটনী যদি কিছু থেকে থাকে তো এই। প্রথমে না সামন্য তেল গরম করে আধ চামচ সর্ষে দানা দিতে হয়। সেগুলো একটু চিড়বিড় করলেই আধ কৌটো ফিগ প্রিসার্ভ এতে ঢেলে দাও। এক চিমটি নুন দাও। আমি গোটা তিনেক কাঁচা লংকাও চিরে দিই। এবার চামচ দিয়ে একটু নেড়ে মাঝারী আঁচে রাখতে হয়। দেখবে গরম পেয়ে গাঢ় প্রিসার্ভ আপনিই গলে যাবে। মিনিট দশ পরে নামিয়ে নিলেই হলো। এই ভাবেই আনারসের প্রিসার্ভ দিয়ে চমৎকার প্লাস্টিক চাটনীও হয়। আপেলের জেলি দিয়ে আপেল চাটনীও হয়।

--সত্যি, বেজায় সোজা তো রে। আচ্ছা, এড্রিয়ান ডেসার্ট কি এবার বল তো।

-- লেমন স্কোয়্যার।

-- ভালো শোনাচ্ছে তো। কির'ম জিনিষ সেটা?

-- এই যে, ময়দা, চিনি আর ঠাণ্ডা মাখন মিলিয়ে ঝুরো ঝুরো করে নিয়েছি হ্যাঁ? এটা একটা কাঁচের বেকিং ডিশে ভালো করে ছড়িয়ে হাত দিয়ে চেপে চেপে দিলাম। এই হলো ক্রাস্ট। এবার এক টিন মিষ্টি কন্ডেন্সড মিল্কে আধ কাপ লেবুর রস মিশিয়ে নিলাম তো? আর নারকেল কোরা। এটা সমান করে বিছিয়ে দে এই ক্রাস্টের ওপরে। এবার পুরোটা তিনশো পঞ্চাশ ডিগ্রীতে মিনিট কুড়ি বেক করে নিলেই হলো। বার করে ছোট ছোট চৌকো করে কেটে নিই। এই হলো লেমন স্কোয়্যার।

-- চমৎকার! আয় রে তবে খাওয়া যাক?

মণ্ডা মিঠাই আর কী চাওয়ার আছে? ছ রকম খাবার এই এসে হাজির। আমরা টেবিলের ওপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ি। লুইসিয়ানা, পশ্চিমবঙ্গ, মিসিসিপি, ইউক্রেন, কেন্টাকী সব এক প্লেটে হয় লীন। পেতলের মোমদানে বাতি জ্বলজ্বল করে। তৃপ্তিতে, আনন্দে সবার চোখ।

-- আচ্ছা, এবার সবাই শোনো। এই নতুন বছরের আনন্দে, এই সব্বার মিলেমিশে একে আরো স্পেশ্যাল বানানোর জন্যে এসো গ্লাস তুলে একবার সমস্বরে বলা যাক চীয়াআআআর্স!

তাই তো, কটা গ্লাস লাগবে তাহলে? কটা আবার? একটাই।

হুঁ একটাই। শুধু আমার জন্যে। এমিলি, ক্যাথরিন, গালেনা, এড্রিয়ান, ওরা কেউ মোটেই আসেনি। আমি কারুক্কে নেমন্তন্নই করিনি। সপ্তাহের মধ্যিখানে আসতে বয়ে গেছে কারুর। তাহলে? তাহলে আর কী? একটু বানিয়ে বানিয়ে খেললাম আর কী, যাতে আমার এই দিনটা একলা বৈশাখ না হয়ে থেকে যায়।

আর,এই নানা রকম খাবার? ও তো আমিই করেছি সব। ঐ যে আহা নববর্ষে মায়ের লাল পাড় শাড়ি, শুক্তো, মোচার ঘন্ট, বাটি চচ্চড়ি, রুই মাছের কালিয়া - এই সব নস্টালজিয়ায় ভিজে চুপচুপে হয়ে যেতে আমার মোটেই ভালো লাগেনা। আমার সব উৎসব, সব আনন্দ, সব সময় আমার মনের মধ্যে থাকে, আমার সঙ্গে যায়, যেখানে যাই আমি। বাংলা নববর্ষতে আনন্দ করার জন্য তাই খাস বাঙালী খাবারই খেতে হবে কেন? আমি চেয়েছিলাম আমার আজকের দিনটা মজায় কাটুক, বৈচিত্র্যে ভরা হোক। তাই হাজির করলাম এই একার মধ্যেই বৈচিত্র্য। কত মজা হলো বলো দেখি?

আমি একা একা গেলাস তুলে জোর গলায় বলি চীয়াআআআর্স! পেতলের মোমদানে বাতি জ্বলজ্বল করে। তৃপ্তিতে, আনন্দে আমার চোখ।




১৫ই এপ্রিল, ২০১০

48 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ টুকরো খাবার 
শেয়ার করুন


Avatar: শঙ্খ

Re: একের মধ্যে বৈচিত্র্য কিম্বা মিলমিশের ১লা বৈশাখ

বাঃ কলিদি। খুব ভালো লাগল। সব চরিত্র কাল্পনিকের আইডিয়াটাও খুব ভালো। আর রেসিপি নিয়ে তো কিচ্ছুটি বলবো না। ঃ-))

Avatar: siki

Re: একের মধ্যে বৈচিত্র্য কিম্বা মিলমিশের ১লা বৈশাখ

আবার ফিরে পড়লাম। যখন লেখাটা বেরিয়েছিল, তখন লেখার নিচে কমেন্ট করা যেত না। আজ ভালোলাগাটা নথিবদ্ধ করে গেলাম।
Avatar: ব্যাং

Re: একের মধ্যে বৈচিত্র্য কিম্বা মিলমিশের ১লা বৈশাখ

ওমা কলি কী সুন্দর লেখাটা! একদম তোমার মতন। খুব ভাল্লাগলো। আমি তো এই প্রথম পড়লাম লেখাটা, কিন্তু ঠিক জানি আরো যতবার পড়ব লেখাটা, কক্ষনো পুরনো হবে না।
Avatar: kiki

Re: একের মধ্যে বৈচিত্র্য কিম্বা মিলমিশের ১লা বৈশাখ

ইয়াম ইয়াম!!! আগেও পড়েছি মনে হচ্ছে। আবার পড়তে একইরকম ভালো লাগলো। বলতে কি আমি তোমার লেখার ভীষন পাখা।ঃ)


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন