ফরিদা RSS feed

প্রচ্ছন্ন পায়রাগুলি

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • মানবিক
    এনআরএস-এর ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এরকম ঘটনা বারেবারেই ঘটে চলেছে এবং ভবিষ্যতে ঘটতে চলেছে আরও। ঘটনাটি সমর্থনযোগ্য নয় অথবা ঘৃণ্য অথবা পাশবিক (আয়রনি); এই জাতীয় কোনো মন্তব্য করার জন্য এই লেখাটা লিখছি না। বরং অন্য কতগুলো কথা বলতে চাই। আমার মনে হয় এই ঘটনার ...
  • ডিগ্রি সংস্কৃতি
    মমতার সবৈতনিক শিক্ষানবিস শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগের ঘোষণায় চারপাশে প্রবল হইচই দেখছি। বিশেষ গাদা গাদা স্কুলে হাজার হাজার শিক্ষক পদ শূন্য, সেখানে শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ সংক্রান্ত ব্যাপারে কিছুই না করে এই ঘোষণাকে সস্তায় কাজ করিয়ে নেওয়ার তাল মনে হইয়া খুবই ...
  • বাংলাদেশের শিক্ষিত নারী
    দেশে কিছু মানুষ রয়েছে যারা নারী কে সব সময় বিবেচনা করে নারীর বিয়ে দিয়ে। মানে তাদের কাছে বিয়ে হচ্ছে একটা বাটখারা যা দিয়ে নারী কে সহজে পরিমাপ করে তারা। নারীর গায়ের রং কালো, বিয়ে দিতে সমস্যা হবে। নারী ক্লাস নাইন টেনে পড়ে? বিয়ের বয়স হয়ে গেছে। উচ্চ মাধ্যমিকে ...
  • #মারখা_মেমারিজ (পর্ব ৫)
    স্কিউ – মারখা (০৫.০৯.২০১৮)--------...
  • গন্ডোলার গান
    সে অনেককাল আগের কথা। আমার তখন ছাত্রাবস্থা। রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের টাকার ভরসায় ইটালি বেড়াতে গেছি। যেতে চেয়েছিলাম অস্ট্রিয়া, সুইৎজারল্যান্ড, স্ট্রাসবুর্গ। কারণ তখন সবে ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকাল শুনতে শুরু করেছি। মোৎজার্টে বুঁদ হয়ে আছি। কিন্তু রিসার্চ ...
  • শেকড় সংবাদ : চিম্বুকের পাহাড়ে কঠিন ম্রো জীবন
    বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমি অধিগ্রহণের ফলে উচ্ছেদ হওয়া প্রায় ৭৫০টি ম্রো আদিবাসী পাহাড়ি পরিবার হারিয়েছে অরণ্যঘেরা স্বাধীন জনপদ। ছবির মতো অনিন্দ্যসুন্দর পাহাড়ি গ্রাম, জুম চাষের (পাহাড়ের ঢালে বিশেষ চাষাবাদ) জমি, ...
  • নরেন হাঁসদার স্কুল।
    ছাটের বেড়ার ওপারে প্রশস্ত প্রাঙ্গণ। সেমুখো হতেই এক শ্যামাঙ্গী বুকের ওপর দু হাতের আঙুল ছোঁয়ায় --জোহার। মানে সাঁওতালিতে নমস্কার বা অভ্যর্থনা। তার পিছনে বারো থেকে চার বছরের ল্যান্ডাবাচ্চা। বসতে না বসতেই চাপাকলের শব্দ। কাচের গ্লাসে জল নিয়ে এক শিশু, --দিদি... ...
  • কীটদষ্ট
    কীটদষ্টএকটু একটু করে বিয়ারের মাথা ভাঙা বোতল টা আমি সুনয়নার যোনীর ভিতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছিলাম আর ওর চোখ বিস্ফারিত হয়ে ফেটে পড়তে চাইছিলো। মুখে ওরই ছেঁড়া প্যাডেড ডিজাইনার ব্রা'টা ঢোকানো তাই চিৎকার করতে পারছে না। কাটা মুরগীর মত ছটফট করছে, কিন্তু হাত পা কষে বাঁধা। ...
  • Ahmed Shafi Strikes Again!
    কয়দিন আগে শেখ হাসিনা কে কাওমি জননী উপাধি দিলেন শফি হুজুর। দাওরায় হাদিস কে মাস্টার্সের সমমর্যাদা দেওয়ায় এই উপাধি দেন হুজুর। আজকে হুজুর উল্টা সুরে গান ধরেছেন। মেয়েদের ক্লাস ফোর ফাইভের ওপরে পড়তে দেওয়া যাবে না বলে আবদার করেছেন তিনি। তাহলে যে কাওমি মাদ্রাসা ...
  • আলতামিরা
    ঝরনার ধারে ঘর আবছা স্বয়ম্বর ফেলেই এখানে আসা। বিষাদের যতো পাখিচোর কুঠুরিতে রাখিছিঁড়ে ফেলে দিই ভাষা৷ অরণ্যে আছে সাপ গিলে খায় সংলাপ হাওয়াতে ছড়ায় ধুলো। কুটিরে রেখেছি বই এবার তো পড়বোই আলোর কবিতাগুলো।শুঁড়িপথ ধরে হাঁটিফার্নে ঢেকেছে মাটিকুহকী লতার জাল ফিরে আসে ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

২০১৯ - জার্ণাল

ফরিদা

এ বছরের শুরুতে ভাবলাম জার্ণাল লিখে রাখি। কতদিন এ ভাবনা আর লেখা একসঙ্গে থাকবে জানি ন। তবু থাক, যতটুকু রাখা যায়, থাকে…

এ লেখার সবটুকু তারই, যদি সে মনে রাখে।



২ জানুয়ারি ১৯

খানিক পুরনো হলে ঘটনার গায়ে মায়ার প্রলেপ লাগে
সামান্য সুগন্ধ — ডালে হিং ফোড়ণের এলে
বাধ্যতামূলক নিরামিষ দিন মনেও থাকে না।

যেন পলি পড়া উর্বর মাঠ এতদিন কর্ষণবিহীন
আচমকা উড়ে আসা বীজ বুকে ফলের বাগান ফলাতে চায়
সামান্য চিঠির বাক্স খুলে প্রজাপতিগুলি উড়ে উড়ে
ভিতর বাগানের ফুলের পাপড়ি খুলে দেখে —
চিঠি আছে কি না।

কতটা পুরনো হ’লে, কতটা দূরত্বে থাকলে
স্নিগ্ধতা বেশি পাওয়া যায় –
চাঁদ জানে। আমিও শিখতে চাই তার মানে।



কখনোই ভাবিনি এতখানি বাঁচব এভাবে
শিকড় ছিঁড়ে দোল খেতে খেতে
কখনও ভাবিনি মাটি পাব কোনওদিন।

ভাবিনি এইভাবে এখানে কেউ টবে বসিয়ে দেবে
বারান্দায় টাইমকলের জলের মতো রোদ্দুর
মাপা সার সকালে বিকেলে সব্জীসেদ্ধ আর
দু'টো টোস্ট, ডিমপোচ —

বিনিময়ে বরাদ্দ ফুল, ঋতু আনন্দ দুঃখ ব্যাতিরেকে
ফোটালেই হ'ল।
আমার বাপ পিতামো মহীরুহ দের সঙ্গে দেখা হ'লে বোলো
এখন আবেগের বশে একসঙ্গে সব পাতা ঝরাই না আর
সব ফুল একসঙ্গে ফুটিয়ে হরিলুঠ করি না বলে টিকে গেছি
জায়গাও কম নিই।
চিন্তা যেন না করে ওরা। ভালো আছি।
শুধু কোনও পাখি এদিকে আসে না, তাই চিঠি নেই।



৩ জানুয়ারি, ১৯

দেখনি কি লেখার সময়ে ঘাড়ের পিছনে কে ঝুঁকে থাকে অহোরাত্র —
অনেকের কথা একসঙ্গে বলে ওঠে বিভিন্ন ভাষায়?
আস্তে আস্তে নির্জন হয় তাও,
মিলে মিশে একটাই সুর শেষ অবধি গুণগুণ করে।
কবিতায় কখনও বাধা পড়ে, কখনও সে
সেই সুর জড়িয়েই ঘুমিয়ে পড়ে।


ঘুমের মধ্যে সাঁকো দোলে খুব আজকাল
পিছলে পড়ে যেতে যেতে হাত ধরে ঝুলতে ঝুলতে
একসময় পড়ে যাই, পড়তেই থাকি, পায়ে ক্র‍্যাম্প ধরে।
পরীক্ষার সময়ে কোনও প্রশ্নকে চিনতে পারি না
সমুদ্রের কাছাকাছি গেলে সে ছুটে এসে ডুবিয়েছে কতবার।

তবু দেখি, মাঝে মাঝে দৌড়ই, দৌড়তেই থাকি
চোখে মুখে সে কী তীব্র হাওয়া লাগে,
একটুও হাঁফাই না, সামান্য কোমরের এক ঝটকায় দেখি
সাঁই সাঁই ভেসে বেড়াচ্ছি মাটি থেকে ফুট খানেকের উচ্চতায়

কিছু একটা হয়, এমন কিছু সহজে ভাবতেও পারি না।


একটুও অসম্ভব নয়
বারান্দা থেকে অনায়াস উড়ে গিয়ে
প্রিয় বন্ধুর বাড়ি কড়া নেড়ে
ভাতের থালা থেকে খাওয়া ভাত ডাল আধখানা মাছও।

আবার জন্ম নিয়ে ফের প্রথম থেকে শেখা বাংলা সহজ পাঠ
প্রথম কুয়াশা দেখে রাস্তা হারান ইস্কুলের পথে
ভুল বাসে উঠে বাড়তি পয়সার গুণাগার।

এখনও অসম্ভব নয় কাউকে চমকে দিতে
বাস টার্মিনাসে অনন্ত ক্ষণ।
সে যদি আসে এই পথে, এখনও

একটুও অসম্ভব নয়।


৫ জানুয়ারি ২০১৮

যতই দূরত্ব রাখ, ভাবি ততখানি আমার পৃথিবী
খুঁটে খুঁটে রং করি প্রতি ঘাসে, মাঝে মাঝে
কয়েকটি ফুলের পাপড়ি, কয়েকটি ঘরে গ্রাম
একখানি বটগাছ ঘিরে মাটির চণ্ডীমণ্ডপ।
শিরা উপশিরা রাস্তারা, যাতে রক্তচলাচল।
শীতের বাজারে প্রতিটি মটরশূটি এঁকে দিন কাটে।

নদী থাকে, একলা জ্যোৎস্না রাতে ভেসে যেতে
বাসী ফুলমালা গুলি নিয়ে কলার মান্দাস ধীরে
মাঝে মাঝে বাণিজ্যপোত মাঝনদীতে নোঙর বেঁধে
ঘুমোচ্ছে দেখা যাবে। এদের চিঠিই ভেব, একমুখী
ভোর ভোর খবরের কাগজওলা ছুড়ে মারে বারান্দায়
যাবতীয় বিজ্ঞাপনগুলি। লিখি — আজকে কোথায় কী
কোন সেতু নির্মিত, কোথায় দূরত্ব বাড়াল মানুষ আজকাল
আমাদের মাঝখানে এ পৃথিবী শুয়ে, বোনে ষড়যন্ত্র জাল।

৬ জানুয়ারি

হঠাৎ দেখি অন্ধকার হয়ে গেছি
এক আলোর রাস্তায় — রশ্মিকণাগুলি
পাশ কাটিয়ে সাঁই সাঁই বেরোচ্ছে
গালাগাল দিতে দিতে।

দেখলাম পকেট খেকে প্রিয় খুচরো মুহূর্তরা
যা আমার সঙ্গেই ছিল বলে জানতাম — মনে নেই আর।
হারালে যা প্রথমেই মনে হয় —
সব কিছু চুরি গেছে, চারিদিকে দেখি ঠিক তাই
সারা পৃথিবীর লোকে, গানে কবিতায়
সেইসব খুচরোকে হীরকখোচিত করে গয়না বানিয়েছে।

আশ্চর্যের কথা, এখনও অনেকে মাঝরাস্তায়
অন্ধকার হয়ে দাঁড়িয়ে পকেট হাতড়াচ্ছে,
কবিতা পড়ছে, গান শুনে অস্থির হচ্ছে
আলোর রশ্মিগুলি গাল দিয়ে তাদের কাটিয়ে এগোচ্ছে।


প্রস্তরমূর্তি ভাব যাকে, সে এই পৃথিবীতে
কমপক্ষে হাজার বছর ধরে রয়ে গেছে।
তারও আগে তাকে পাথর বলা যেত
বা তারও আগে সে ছিল যখন তার
পরিভাষা অবধি জন্মায়নি।

তুমিও তোমার অণু-পরমাণু সমেত
তারই সমবয়স্ক। এই কয়েক মুহূর্ত
তুমি তাকে দেখে কী বল কী ভাব
সামান্য নেশাতুর হয়ে দপদপ করে
তাতে কারও কিছু এসে যায় নি।



চেটেপুটে খাই, যতটুকু পাই চারিদিকে
যতটা রেস্ত কুলোয়, খিদে বা লোভের বশে
পেট ভরলেই ঘুম আসে, তবু —
কচ্চিত পরিপাকে বিপাকও ঘটেছে।

এযাবৎ, যত কথা, গান কবিতা শুনেছি
(অখাদ্য গালিগালাজও সমেত), গন্ধপুষ্পে যত সুঘ্রাণ ছিল
তারও বেশি আনন্দ দিয়েছিল হাইওয়ে পেট্রল বাতাস
তাও সব খেয়েদেয়ে ভ্রমণকাহিনীর ঢেঁকুর উঠেছে।

যতখানি দেখেছি সম্পূর্ণ অন্ধকার কেটে ভোর হয়ে
ফুল ফুটে কাঞ্চণজঙ্ঘা পরিস্ফুট হ'তে — জাবর কেটেছি।

আজকাল বয়সের চাপে হবে হয়ত,
সবকিছু সহ্য হয় না পোড়া পেটে —
সভ্যতার ঝকঝকে আলোয় বড় নুন কম, অবিশ্বাস, বিস্বাদ
বাঁচার স্বার্থে ওষুধের মতো খেতে হয় চেটে।




বিনামূল্যে বৃষ্টি এল আজ
হয়ত সুকর্মফল, হয়ত পূর্বসূরী পুণ্যফল
আশির্বাদ ঝরে পড়ে রবিবাসরীয় ভোরে।

আলো কিছু কম, বৃষ্টি ধরে এলে
কনকনে হাওয়ায় ভিত নড়ে ওঠে
যেন গৃহ একা নৌকা হয়েছে।

এক ঝাঁক পায়রা একসঙ্গে ঝাপটে উড়ল
আকাশ এখনও ভিজে জুবজুবে।

এত সুখ। মরে যাব চায়ের গেলাসে
টোস্ট বিস্কুটের মতো ডুবে।



আরও কিছু জুড়ল দেখছি। সব হয়ত দেওয়ার মতো ছিল না। তবু একসঙ্গে থাকুক, সাধারণেরা, সাধারণতরদের সঙ্গে।

যারা পড়ছেন, জানাচ্ছেন প্রতিক্রিয়া বা চুপ থাকছেন সবার প্রতিই আমি কৃতজ্ঞ।

৭ জানুয়ারি, ১৯


টারজান জঙ্গলে গাছের ঝুরি ধরে
দোল খেতে খেতে চলতেন আমাদের ছোটবেলায়
গাছপালা কম হতে স্পাইডারম্যান
স্কাইস্ক্র‍্যাপারের গায়ে নোঙর বাঁধেন।

তৃতীয় বিশ্বে লোকাল ট্রেনের ভিড়ে লোকজন
বহুদিন ধরেই কামরার হাতল ধরার জন্য হাতড়ান।


জামার বোতাম লাগাতে মাথা নিচু করতে হয়
এইভাবে প্যাণ্ট গলান, বেল্ট আটকান, মোজা পরা বা
জুতোর ফিতে বাঁধতেও নিচু না হয়ে উপায় নেই।
এতে সারাদিন মাথা তুলে কাটিয়ে দেয় লোকে।

পর্ণকুটিরে মাথা নিচু করে এক আধবার গেলে
এ গণতন্ত্রের নাতজামাই পাঁচবছর মাথায় রাখবে তাকে।


ভাল গল্পের মধ্যে একটা প্লট ঘিরে কয়েকটি সাবপ্লট
স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করে এক জায়গায় গিয়ে থামে।
পাঠক সে স্টেশনে নেমে হাওয়া টাওয়া খান।
নিজেও দু'লাইন চারলাইন মনে মনে হাঁটেন আর একটু।
প্রত্যাশিত ঝালমুড়ি ওলার সঙ্গে অপ্রত্যাশিত ভাবে
দুর্লভ পরিযায়ী খুঁজে পান রাস্তার ধারের সামান্য ডোবায়।


পুরোন শাড়ি জুড়ে ছাতে কাঁথা পাততেন ঠাকুমা
শীতের রোদ্দুরে, অদূরে কুলের আচার হাঁ করে
রোদ খায়, উল্টোন কুলোয় সাদা হলদে বাড়িরাও।
অর্ধসমাপ্ত কাঁথায় গল্পের বইয়ের বাকিটুকু পড়ি।
কান খাড়া কতক্ষণে প্রিয় টোপাকুলওলা আসে —
অথবা বন্ধুদের খেলতে যাওয়ার ডাক।

এখনও ঘুমের মধ্যে আমি ওইখানে দিই গড়াগড়ি।



এক একটা ছবি হাত ধরে ঠিক গন্তব্যে পৌঁছিয়ে
চোখের বাঁধন খুলে দেয়, তখন আর উপায় থাকে না
পিঁপড়ের মতো ছবিটার ধার ঘেঁসে চলি,
আড়াআড়ি হাঁটি, সীমান্তে এসে কোণাকুণি উল্টোদিকে
গিয়ে আর আগের জায়গায় ফিরতে পারি না —
ফের শুরু করি, সে ততক্ষণে ত্রিমাত্রিক হয়ে গেছে
এবার ডানদিক বাঁদিক ওপর নিচে যথেচ্ছ চলাফেরা হয়
দু'পাশে হজমিওলা, ফুচকা চুরমুর ফুলবাগান মোড়ের
ক্যাসেট দোকান থেকে সুমনের গান শোনা যায়।

এক একটা ছবির সামনে পৌঁছলে দেখেছি
হাত ছাড়িয়ে অত্যন্ত বাধ্য প্রিয় পোষা কুকুর হারায়।


৮ জানুয়ারি

পাখিরা মুহূর্তমাত্র,
ফিরে আসে অসংবৃত চেতনায় আচমকা —
উত্তরের দরজা হাট করে খুলে গেলে
কাজের কাগজপত্র দমকা হাওয়ায় পাঠশালা পালায়।

“দিন কয়েকের ছুটি নেবে কি” —
লেখা নেমন্তন্ন চিঠি সারাঘর নেচে বেড়ায়।


লিফটে একজন অদৃশ্য মানুষ থাকে, জানি
সকালের দিকে স্কুলগামী বাচ্চাদের টিফিন বাক্সে
অদৃশ্য ঢুকে খাবার চেখে দেখে সে।
কারও কারও গাড়িতে উঠে পড়ে স্কুলব্যাগ চেপে
রাস্তায় ষাঁড় তাড়া করা কুকুরের কানে বসে দোল খায়।

এইবার খুব শীত। জানি সে নিশ্চয়
অদৃশ্য হারমোনিয়াম গলা ঝুলিয়ে সে
অশ্রুত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গায়।


বাড়িতে বন্ধুরা এসেছে
একসঙ্গে বেরোনর ছিল, এত বৃষ্টি শুরু হল
অনেক ইলিশ ছিল ফ্রিজে, কেউ আর কোথাও গেলাম না।

বাড়িতে বন্ধুরা এসেছে
এখানে শীতের রোদ্দুর, সমুদ্রের হাওয়া গায়ে লাগে
পর্দা সরালে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যেত —
আড্ডার চোটে তা আর কারো খেয়াল হ'ল না।

বাড়িতে বন্ধুরা এসেছে। জানি,
বাড়িভর্তি উষ্ণ স্বাদু গন্ধ পাওয়া যায়, সেইসব ফিরিস্তির
প্রিয় কথাগুলো নিশ্চয় সারা বাড়ি প্রজাপতি হয়ে নাচে
শুয়েছিলাম। কিছু শোনা যাচ্ছিল না।



রাতের এক্সপ্রেস বাস অনন্তের দিকে যেতে যেতে
একবার থামে। ড্রাইভার চা-জল খায়।
সেবার এত ঠান্ডা, কেউ নামলই না,
সামান্য দো-চালা দক্ষিণী ধাবায় তারস্বরে গান বেজে যায়।
চা কফি ছাড়া আর কিছু কেনা বেচার নেই বলে
একটা বাচ্চা ছেলে ছাড়া ত্রিসীমানায় আর কেউ নেই।
হাওইওয়ের পাশে হাওদাখোলা প্রান্তরে একটাই আলো
কিছুদূরে গিয়ে রাস্তা হারিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে,
জগঝম্প বাজনার গানও।

রাতের বাস বেশিরভাগ যাত্রীর অজান্তে একবার থামে।
সেই বারই নেমে দেখেছিলাম। আর ফিরিনি কখনও।



সব কিছুতেই বড় মুখ করত হাবিজ্যেঠু। বিশ্ববিরক্ত।
বেঁটে কালো ক্ষয়া চেহারা। একটা সাদাটে হাফশার্ট
কালো প্যান্টের বাইরে ঝুলত। চটির সাইজ বাচ্চাদের মতো
আমরা সেই চটি পায়ে গলিয়ে বড় হয়ে যেতাম তখন।
কোথায় একটা চাকরী করত, নাইট ডিউটি রোজ।
জ্যেঠিমা একটা অ্যালুমিনিয়ামের টিফিন কোটোয়
রুটি আলুভাজা দিত। অন্যকিছু দেওয়া নিয়ে কথা হয়নি—

সে চাকরী চলে গেলে দেখেছিলাম আমাদের বাজারে
ফল নিয়ে বসতে। ফল-ওলা-জ্যাঠা এত অবাক করেছিল
কিছু না ভেবেই একটা আপেল তুলে নিই।
দাদুর সঙ্গে ছিলাম। দাদু রেখে দিতে বলেছিল, মনে আছে।

গাছের শখ ছিল। বাবার পিসতুতো দাদা,
আমাদের বাড়িতেই থাকত। পরে বাগুহাটির দিকে
বাড়ি করে চলে যায়। আমরা কয়েকবার গিয়েছিলাম
খুব খুশি হ'ত বোঝা যেত। কেন এতদিন পরে আসি —
আমরা কিছু বলতাম না তাতে। যা মুখ করত!



মনে রাখতে না পারলে হারায় না কিছুই
কখনও কি ছিল বলে মনে পড়ে না
গাছের ডালে বসে দোল খায় পাখি
সে ঠিক কী কারণে এখানে এসেছে, মনে নেই
খিদে নেই, মেঘলা আকাশ বলে সে বুঝতে পারছে না
কখন বাসায় ফেরা যায়- কোথায় বাসাটি?
কিছুই হারায় নি, হারায় না, দোল খায় ত্রিশঙ্কু পাখিটি।


৯ জানুয়ারি ১৯

স্বাদ ছিল শ্বাসমূলে
প্রিয় সুগন্ধ এসে দরজা খুলে দেয় বলে
ঢুকে পড়ি ভিতরবাড়িতে।

“এ সময়ে ওরা কেউ বাড়ি থাকে না” —
কেউ বলে, কোনও দরজা সাড়াও দেয় না
কোথাও দরজাই নেই, যেখানে থাকার কথা
সরে গেছে হয়ত আবহবিকারের ফলে —

কিছু উত্তর মেলে, কিছু নতুন প্রশ্ন জন্মায়
পুরোন বাড়িতে নিজেকে খুঁজতে এলে।



জিনিস হারায় আংশিক স্মৃতিতেই শুধু
সারাটা রাস্তা, তার চারপাশ যত্নে এঁকে রং করেছিলে
পরে ব্যস্ততায় কিছুটা বাকি থেকে গেল বলে
সে জিনিসটি এ পর্যন্ত পৌঁছতে পারল না।

কেন কোনও ছবি শেষ হয় না সহজে?
তাড়া ছিল বাড়ি ফেরার, নাকি বড় বেশি দীর্ঘায়িত
করেছিলাম কিছুক্ষণ? নাকি নেশা বেশি ছিল?
সবকিছু নিয়ে ঠিকঠাক ফেরা যায় না, অনেকেই ফেরে না
ভ্রমণের দুই তৃতীয়াংশের ভ্রমে তারা অন্যদিকে চলে গেল।


জলবালকেরা মনে হয় এখনও ইস্কুলের নিমগাছতলায়
ক্লাস ফাঁকি মেরে বর্ষায় ব্যাঙাচি তুলে শিশিতে ভরছে
মাথা তোলা ঘাসের শীষে ফড়িং এর বসা উড়ে যাওয়া
তারা সারাদিন ধরে দেখে। বাকিরা ফুটবল পেটায় পাশে।

ক্লাসে থেকেও যায় অনেকে, বেরোতে পারে নি, ক্লাসে
থাকতেও পারে নি তখনও ভেবেছে, দেখেছে জানলার
পাশে ওইসব ছেলেখেলা ইস্কুলের মাঠে সাদা জামায়
জলবালকদের প্রায় বড় ডালিয়ার মতো ফুটে, অসময়ে।



১০ জানুয়ারি, ১৯

ভাবি, পৃথিবী ভরে আছে এত সম্পূর্ণতায়
সামান্য শূন্যতা, আর কোত্থাও অবশিষ্ট নেই
মাটি আর আকাশের মাঝখানের অঞ্চলে
হাওয়া চলাচলের জায়গা দেওয়া আছে
অভিকর্ষ টানের পাহারায়। যাতে সহজে
সে গাড়ি চালিয়ে তোমার সুগন্ধ পৌঁছয়।

তবু দেখি রচিত হয়, অজস্র সাহিত্য, ছবি,
মুহূর্তমাত্র তুলে এনে ঘরে টাঙিয়েছে যা নিয়ে—
বলবে দু'কথা নিজেরা, শোনাবে অনেক কিছু
বরাদ্দ আলোর থেকে বেশি টেনে বৈষম্যসঙ্কুল
করে পৃথিবীতে জটিল কৃষিকর্মের সূচনা হ'ল।
লাগাতার ধানচাষে প্রকৃতি বিমুখ, চর্বিতচর্বনে
কী যে সুখ, সহজেই ঘুম আসে। অক্ষর লিখে
ধানকাটা খাতায় বৃষ্টি, সে জ্যোৎস্নাও ভালবাসে।


লিখি কীভাবে শুধু রোদ্দুর খেয়ে বাঁচে জীবনকথারা,
কীভাবে অঙ্কুরোদ্গম থেকে সাতকাহন খড় হ'ল
এ মহাজীবন। কোথায় বীজ ফেলে কোন কথা,
কেই বা পাখির ঠোঁটে মহাদেশ পার। বেরোতে
পারে নি কেউ কখনোই, নিজগৃহে গেঁড়ে বসে
স্থানসঙ্কুলান ঘটাল। কোন কথা সুর ডিঙি পেয়েছিল।

লিখি যেভাবে ঘটনারা মাঝে মাঝে নিজেরাই জোড়ে
গোল হয়ে বসে আড্ডায় মেতেছে যেন, চেনেই না যেন
ভাব করে স্মিত হেসে অন্য কার কথায় উজ্জীবিত হয়।
কাছাকাছি নারকেল গাছে ডাবের মধ্যে শাঁস, জল জমে
চাঁদের আলো যেই পাতার ছাকনি হয়ে গায়ে পড়ে তার।
এমন অহংকার সেই গাছ বেয়ে ওঠানামা করা পিঁপড়েরও
লিখি আমি পৃথিবীতে এত সুদৃশ্য মায়া, এত যত্ন আত্তি জল
সারাক্ষণ ছুঁয়ে থাকে যেন। প্রতি প্রাণ উল্লাসে সমুজ্জ্বল।




কখনোই রাজদরবারে পৌঁছবে না জেনেও
অনেকেই সারাদিন হাঁটে
নিতান্ত পেটের দায়ে, প্রেমে, অপ্রেমে শব্দ জিজ্ঞাসায়
হেঁটে হেঁটে অনেক দূর অবধি চলে যায়
বারোয়ারী চণ্ডীমণ্ডপ, দিঘির ঘাটের রাণা হয়ে
কখনও বা একা একা শ্মশানে বসে থাকে কিছুক্ষণ-

দেখে, দেহ থেকে পাখি উড়ে গিয়ে গাছে বসে
গভীর জঙ্গলে একেবারে হারায়।

পৌঁছতে হবে – বলে কিছু নেই, দু-চার লাইন
শখের লেখালেখি খেলা – কেউ কেউ হয়ত দূর থেকে
দু’একবার দেখেছে তাকে –
একা একা নির্জনে হেঁটে যায়।




যেহেতু কথার কথা, উদ্বায়ী উচ্চারিত হয়ে মিলিয়েছে
তবু কারও মনে থাকে। বাইরের ঘরে সাজিয়ে রাখে সে।
কারও ঠাঁই অস্ত্রাগারে। পরে নিকুম্ভিলা থেকে বেরোবে
সমরসজ্জায়। কারও ঘরে বিদ্যুৎসংযোগ, কত আলো
প্রতি কথাপিছু হরিলুট, নগর সংকীর্তণ অষ্টপ্রহরব্যাপী।
গলায় পাথর বেঁধে আত্মহত্যা কথা, তার বিষ মাপি।

কথা বীজধান, তোলা থাকে লক্ষ্মীর হাঁড়িতে, এদিকে
রাস্তা হবে বলে জমি চলে গেলে সে কথা অধরা থাকে।
এক দশক পরে তক্ষকের ভাষা শোনা গেল অন্ধকারে।
জ্বলনশীল থেকে উচ্চফলনশীল ফসল হয়ে বদলায় সে
কখন যে পোশাক বদলায়। শহর ঘুরে আসা নদী গাঁয়ে
যেভাবে নিজের মতো এঁকে বেঁকে যায়। এর ঘর ভাঙে
ওর কিছু ধানী জমি হাতে তুলে দেয়। এ কথা সে কথা
আনন্দে কেউ পুনরুচ্চারিত। কারও নেশা স্বেচ্ছা নীরবতা।




236 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: ফরিদা

Re: ২০১৯ - জার্ণাল

#
Avatar: সুকি

Re: ২০১৯ - জার্ণাল

বাহ, খুব সুন্দর লাগ লাগলো
Avatar: Prativa Sarker

Re: ২০১৯ - জার্ণাল

অনবদ্য কবিতামালা। ডালে হিং ফোড়নের সুবাস, কলার মান্দাসে বাসী ফুল, চায়ে ডুবন্ত টোস্ট বিস্কুট -- আশ্চর্য সব চিত্রকল্প !
Avatar: ফরিদা

Re: ২০১৯ - জার্ণাল

থ্যাঙ্ক্যু.... সুকি ও প্রতিভা দি।
হয়ত আরও জুড়বে। জার্ণাল যেমন আস্তে আস্তে বাড়ে। দেখি..
Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: ২০১৯ - জার্ণাল

মুগ্ধতা। উড়ুক। 💔


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন