বিপ্লব রহমান RSS feed

biplobr@gmail.com
বিপ্লব রহমানের ভাবনার জগৎ

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের শিক্ষা দিবস
    গত ১৭ই সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে ‘শিক্ষা দিবস’ ছিল। না, অফিশিয়ালি এই দিনটিকে শিক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি বটে, কিন্তু দিনটি শিক্ষা দিবস হিসেবে পালিত হয়। সেদিনই এটা নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু ১৭ আর ১৯ তারিখ পরপর দুটো পরীক্ষার জন্য কিছু লেখা ...
  • বহু যুগের ওপার হতে
    কেলেভূতকে (আমার কন্যা) ঘুড়ির কর (কল ও বলেন কেউ কেউ) কি করে বাঁধতে হয় দেখাচ্ছিলাম। প্রথম শেখার জন্য বেশ জটিল প্রক্রিয়া, কাঁপকাঠি আর পেটকাঠির ফুটোর সুতোটা থেকে কি ভাবে কতোটা মাপ হিসেবে করে ঘুড়ির ন্যাজের কাছের ফুটোটায় গিঁট বাঁধতে হবে - যাতে করে কর এর দুদিকের ...
  • ভাষা
    এত্তো ভুলভাল শব্দ ব্যবহার করি আমরা যে তা আর বলার নয়। সর্বস্ব হারিয়ে বা যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে যে প্রাণপণ চিৎকার করছে, তাকে সপাটে বলে বসি - নাটক করবেন না তো মশাই। বর্ধমান স্টেশনের ঘটনায় হাহাকার করি - উফ একেবারে পাশবিক। ভুলে যাই পশুদের মধ্যে মা বোনের ...
  • মুজতবা
    আমার জীবনে, যে কোন কারণেই হোক, সেলিব্রিটি ক্যাংলাপনা অতি সীমিত। তিনজন তথাকথিত সেলিব্রিটি সংস্পর্শ করার বাসনা হয়েছিল। তখন অবশ্য আমরা সেলিব্রিটি শব্দটাই শুনিনি। বিখ্যাত লোক বলেই জানতাম। সে তিনজন হলেন সৈয়দ মুজতবা আলী, দেবব্রত বিশ্বাস আর সলিল চৌধুরী। মুজতবা ...
  • সতী
    সতী : শেষ পর্বপ্ৰসেনজিৎ বসু[ ঠিক এই সময়েই, বাংলার ঘোরেই কিনা কে জানে, বিরু বলেই ফেলল কথাটা। "একবার চান্স নিয়ে দেখবি ?" ]-- "যাঃ ! পাগল নাকি শালা ! পাড়ার ব্যাপার। জানাজানি হলে কেলো হয়ে যাবে।"--"কেলো করতে আছেটা কে বে ? তিনকুলে কেউ আসে ? একা মাল। তিনজনের ঠাপ ...
  • মকবুল ফিদা হুসেন - জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য
    বিনোদবিহারী সখেদে বলেছিলেন, “শিল্পশিক্ষার প্রয়োজন সম্বন্ধে শিক্ষাব্রতীরা আজও উদাসীন। তাঁরা বোধহয় এই শিক্ষাকে সৌখিন শিক্ষারই অন্তর্ভুক্ত করে রেখেছেন। শিল্পবোধ-বর্জিত শিক্ষা দ্বারা কি সমাজের পূর্ণ বিকাশ হতে পারে?” (জনশিক্ষা ও শিল্প)কয়েক দশক পরেও, পরিস্থিতি ...
  • আমি সংখ্যা লঘুর দলে...
    মানব ইতিহাসের যত উত্থান পতন হয়েছে, যত বিপদের সম্মুখীন হয়েছে তার মধ্যে বর্তমানেও যা প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে এমন কিছু সমস্যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শরণার্থী সমস্যা। হুট করে একদিন ভূমিহীন হয়ে যাওয়ার মত আতঙ্ক খুব কমই থাকার কথা। স্বাভাবিক একজন পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে ...
  • প্রহরী
    [মূল গল্প – Sentry, লেখক – Fredric Brown, প্রথম প্রকাশকাল - ১৯৫৪] .......................
  • ইতিহাসের সঙ্কলন, সঙ্কলনের ইতিহাস - একটি বইয়ের প্রেক্ষাপট, উপক্রমণিকা
    ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের তরফ থেকে, বেশ কিছু লেখালিখি একসাথে সাজিয়ে, একটা সঙ্কলন প্রকাশিত হলো।নাম, ইতিহাসের সঙ্কলন, সঙ্কলনের ইতিহাস।একটা উদবেগজনক আর দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিতে আমরা এই বই প্রকাশ করেছি। সত্যি বলতে কি, এই বইয়ের জন্মের কারণই আমাদের উদবেগ, ...
  • সতী
    সতী : প্রথম পর্বপ্রসেনজিৎ বসুমেয়েটা মাসতিনেক হল এসেছে এই পাড়ায়।মেয়ে ? এই হয়েছে শালা এক মুশকিল ! বিয়ের পর মেয়েরা বউ হয়, কিন্তু ডিভোর্সের পর তারা কি বউই থাকে ? নাকি ফের মেয়ে বনে যায় ? জল জমে বরফ হয়। বরফ গললে আবার জল। কিন্তু এক্ষেত্রে ? ডিভোর্সি মহিলারা ঠিক ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

আমার বন্ধু কালায়ন চাকমা

বিপ্লব রহমান

প্রথম যৌবন বেলায় রাঙামাটির নান্যাচরের মাওরুম গ্রামে গিয়েছি সমীরণ চাকমার বিয়েতে। সমীরণ দা পরে শান্তিচুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ’র সঙ্গে যুক্ত হন। সেই গ্রুপ ছেড়েছেন, সে-ও অনেকদিন আগের কথা।

এরআগেও বহুবার চাকমাদের বিয়ের নিমন্ত্রণে গিয়েছি। কিন্তু ১৯৯৩ সালের শেষের দিকে, সমীরণ দা’র ওই বিয়েটি ছিলো খুবই জাঁক-জমকপূর্ণ। একদম আদি চাকমা সংস্কৃতির কোনো বিয়েতে অংশগ্রহণ সেই প্রথম।

কয়েকটি গ্রামের নানা বয়সী নারী-পুরুষ এসেছে সেই বিয়ের নিমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে। বলতে দ্বিধা নেই, ঢাকা থেকে নিমন্ত্রিত তো বটেই, এমন কি পুরো বিয়ের অনুষ্ঠানে একমাত্র বাঙালি অতিথি আমি একাই। বরের বাড়িটিকে সাজানো হয়েছে রঙিন কাগজ, ফুল, লতা-পাতায়। পাশের মাঠে নিমন্ত্রিতদের বসার জন্য টাঙানো হয়েছে বিশাল সামিয়ানা। সেখানে পাতা হয়েছে সারি সারি মাদুর। এক দল ছেলেমেয়ে গিটার বাজিয়ে মাইকে গান করে চলেছে অবিরাম।

আমার পাহাড়ি বন্ধুরা জানান, এই গ্রামটি হচ্ছে ‘নতুন মাওরুম’। অবশ্য আনুষ্ঠানিক বাংলায় এর নাম ‘মহাপ্রুরম’। আর নান্যাচর থানাটি কাগজ-পত্রে ষোলআনা বাঙালিয়ানায় হয়েছে ‘নানিয়ারচর’। তো আদি মাওরুম গ্রামটি এখন কাপ্তাই বাঁধের ফলে জলের তলায়। সেখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন জুম্ম
(পাহাড়ি) জাতির মহান নেতা এমএন লারমা।

নয়া মাওরুম গ্রামের একটি ছোট্ট এক চালা বেড়ার ঘরের প্রাথমিক বিদ্যালয় দেখিয়ে আরকজন বন্ধু কল্পনার জের টেনে বলেন, এমএন লারমার সেই বিলুপ্ত গ্রামটিতেও হয়তো একই রকম স্কুল ছিল। যেখানে তিনি পড়াশুনা করেছিলেন। আবার বড় হয়ে ওই স্কুলেই শিক্ষকতা করেছেন।...

এরই মাঝে বিয়ের কনে চলে আসে। কনেটি ঐতিহ্যবাহী পিনন-খাদি (লুঙ্গি-ওড়না), সোনার গহনায় মোড়া একদম পরীর মতো। বরের বাড়িতে ঢুকতে হলে তাকে আবার ছোট্ট একটি পরীক্ষা দিতে হবে। প্রধান ফটকের দুপাশে পোঁতা হয়েছে দুটি কলাগাছ। গাছ দুটির দুপাশে রাখা হয়েছে জলভর্তি মাটির কলস। আর কলস দুটির দুমুখে সাদা সুতো বেধে তৈরি করা হয়েছে একটি ব্যারিকেড। চাকমা রীতি হচ্ছে, কন্যাকে এক লাফে এই সুতো পেরিয়ে কলা-গেট দিয়ে প্রবেশ করতে হবে ছেলের বাড়িতে।

তো মেয়েটি গ্রামের হলেও বেশ চটপটে। ওই জবর-জং সাজ-পোশাকসহ, পিননটি একটু উঁচু করে ধরে একলাফে পেরিয়ে যায় পুলসেরাত। চারিদিকে তুমুল উল্লাস ধ্বনী উঠে।

সামিয়ানায় মাদুর পেতে বসা অতিথিদের জন্য সেচ্ছা-সেবকরা দেন পান-সুপারি-সিগারেট। আসে ‘চোয়ানি’ নামক কড়া স্বাদের মদের বোতল, ছোট্ট ছোট্ট কাঁচের গ্লাস। এরপর একটি আশির্বাদের ট্রে ঘুরতে থাকে। সেখানে যার যেমন সামর্থ সে অনুযায়ী নগদ টাকা উপহার দেন। এরই মধ্যে বরপক্ষের লোকজন বিয়ে উপলক্ষে কাটা শুকরের মাথা কলাপাতায় মুড়ে এসে অতিথিদের দেখান। অর্থাৎ মান্যবরগণ, দেখুন, আমরা কিন্তু সব চাকমা সংস্কৃতি-রীতি-নীতি মেনে এই বিয়ের আয়োজন করেছি, ইত্যাদি।

বলা ভাল, বিয়ের আসরে প্রবীনদের পাত পড়েছে একদিকে। আর নবীনরা বসেছে অন্যদিকে। আমি যেন, বিয়ের আচার-অনুষ্ঠান সব ভাল করে দেখতে পাই, এ জন্য আমার বন্ধুরা আমাকে বসিয়েছে সামিয়ানার সামনের সারিতে, ওই বয়স্কদের মাঝেই।

আমি চোয়নি খেতে খেতে মঞ্চের দিকে তাকাই। কয়েকজন ভান্তে (বৌদ্ধ পুরহিত) মন্ত্র পাঠ করে বিয়ে পড়ান। মাইকে আবারও বাজতে থাকে আধুনিক চাকমা গান। এরই মধ্যে ছেদ ঘটান হাড্ডিসার কালো মতো এক পাহাড়ি ছেলে। তার গলায় গামছা বাধা একটি সিঙ্গেল রিডের হারমোনিয়াম। নাম শুনতে পাই ‘কালায়ন চাকমা’। এক সময় পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) করেছেন। এখন গান-বাজনা নিয়েই আছেন।

কালায়ন দা মাইক টেনে নিয়ে বলেন, আজ এই আনন্দের দিনে অনেক আনন্দ সঙ্গীত তো হলো। এবার একটি অন্যরকম গান হোক। আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা নিয়ে গান লিখেছি, তারই একটি আপনাদের শোনাতে চাই। এরপর তিনি বাংলা গানে শোনান রোমহর্ষক নান্যাচর গণহত্যার কথা। তার গানের প্রথম কলিটি এরকম:


"১৭ তারিখ নভেম্বর/ ৯৩ ইংরেজী..".

ওই তারিখেই নান্যাচর বাজারে পাহাড়িদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলা চালায় সেটেলার বাঙালিরা। খুব ঠাণ্ডা মাথায় দা দিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয় অন্তত ২৯ জন পাহাড়িকে। সেনা সমর্থিত ওই হত্যাযজ্ঞে আহত হয়েছিলেন আরো অনেকে। ধর্ষিত হতে হয়েছে কয়েকজন পাহাড়ি নারীকে। ...কালায়ন দা গানে গানে বর্ণনা করেন গণহত্যার কথা। মনে করিয়ে দেন লংগদু, লোগাং, বরকলসহ আরো
অনেক হত্যাযজ্ঞ, অগ্নি সংযোগ, ধর্ষণ এবং জুম্ম নিধনের কথা।...

পুরো বিয়ের অনুষ্ঠানটি যেন একটি গানেই পরিনত হয় শোক সভায়। শত শত নিমন্ত্রিত অতিথি শব্দহীন কান্নায় আকুল হন। বার বার গামছায় চোখ মোছেন তারা। কেউ কেউ বুক ফাটা আর্তনাদ চাপা দিতে মুখ চেপে ধরেন গামছায়, কি খাদির আঁচলে।

আমি আর থাকতে না পেরে সামিয়ানা ছেড়ে উঠে পড়ি। বিয়ের অনুষ্ঠানের বাইরে, মাঠ পেরিয়ে একটু দূরে এক কাঁঠাল গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাই। দূর মাইকে তখনো ভেসে আসে কালায়ন দা’র গানের বোল:

"১৭ তারিখ নভেম্বর/ ৯৩ ইংরেজী..."

খানিক পরে আমাকে খুঁজতে বের হওয়া পাহাড়ি বন্ধুরা দেখা পায় আমার। তারা বলেন, খাবার দেওয়া শুরু হয়েছে। এখনই খেয়ে নেওয়া ভাল। এই খাবার-দাবারটিও আদি চাকমা বিয়ের রীতি মেনে করা হচ্ছে।

আবার সামিয়ানার নীচে মাদুর পেতে বাবু হয়ে বসি। টুকরো কলাপাতায় আতপ চালের ভাত, কয়েক রকম পাহাড়ি সব্জি, মাছ, শুকর ও মুরগীর মাংস পরিবেশন করা হয়। সবশেষে দই-মিষ্টি।

...আমি অনেকটা খাবার ছড়াই। প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত হলেও ভাল করে কিছুই খেতে পারি না। পরে সামিয়ানার বাইরে এসে একটি ঝোপের পাশে বসে হরহর করে সব খাবার বমি করে দেই। অদেখা নান্যাচর গণহত্যা, আর ঠিক আগের বছর একদম ভেতর থেকে দেখা লোগাং গণহত্যার ফিনকি দিয়ে ছোটা রক্ত যেন আমার পোষাক-আশাকে, চোখে-মুখে লেগেছে বলে ভ্রম হয়। এমনকি আমি খানিকটা জুম্ম রক্তের ঘ্রাণও যেন পাই।


কালায়ন দা, তুমি কি নিষ্ঠুর গো!...
*আরো দেখুন: একটি রোমহর্ষক গণহত্যার কাহিনী http://biplobcht.blogspot.com/2013/06/blog-post_1234.html

বন্ধ হয়ে গেল ‘কনসার্ট ফর বাঘাইহাট ভিক্টিমস’ http://biplobcht.blogspot.com/2013/06/blog-post_7901.html
*মুল লেখাটি লেখকের "পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ", সংহতি প্রকাশন, একুশের বইমেলা, ২০১৫, বইয়ে সংযুক্ত।

1 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: Prativa Sarker

Re: আমার বন্ধু কালায়ন চাকমা

মাঙ্গলিক রীতি, গণহত্যা, কনের সাজ, কালায়নের গান সব যেন খোলা এলবামের পাতা। বড় ভালো লাগল মন ভারী করা এই লেখা।
Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: আমার বন্ধু কালায়ন চাকমা

দূর পাহাড়ের কান্না শুনতে পেয়েছেন, এটিই এ লেখার সার্থক! 👍
Avatar: ।

Re: আমার বন্ধু কালায়ন চাকমা


Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: আমার বন্ধু কালায়ন চাকমা

আঁ! 🤔


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন