বিপ্লব রহমান RSS feed

biplobr@gmail.com
বিপ্লব রহমানের ভাবনার জগৎ

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর
    পর্ব ১-------( লালগড় সম্প্রতি ফের খবরের শিরোনামে। শবর সম্প্রদায়ের সাতজন মানুষ সেখানে মারা গেছেন। মৃত্যু অনাহারে না রোগে, অপুষ্টিতে না মদের নেশায়, সেসব নিয়ে চাপান-উতোর অব্যাহত। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে বোধ হয় বিতর্কের অবকাশ নেই, প্রান্তিকেরও প্রান্তিক এইসব ...
  • 'কিছু মানুষ কিছু বই'
    পূর্ণেন্দু পত্রীর বিপুল-বিচিত্র সৃষ্টির ভেতর থেকে গুটিকয়েক কবিতার বই পর্যন্তই আমার দৌড়। তাঁর একটা প্রবন্ধের বই পড়ে দারুণ লাগলো। নিজের ভালোলাগাটুকু জানান দিতেই এ লেখা। বইয়ের নাম 'কিছু মানুষ কিছু বই'।বেশ বই। সুখপাঠ্য গদ্যের টানে পড়া কেমন তরতরিয়ে এগিয়ে যায়। ...
  • গানের মাস্টার
    আমাকে অংক করাতেন মনীশবাবু। গল্পটা ওনার কাছে শোনা। সত্যিমিথ্যে জানিনা, তবে মনীশবাবু মনে হয়না মিছে কথা বলার মানুষ। ওনার বয়ানেই বলি।তখনও আমরা কলেজ স্ট্রীটে থাকি। নকশাল মুভমেন্ট শেষ। বাংলাদেশ যুদ্ধও শেষ হয়ে গেছে। শহর আবার আস্তে আস্তে স্বভাবিক হচ্ছে। লোকজন ...
  • বিজ্ঞানে বিশ্বাস, চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিশ্বাস বনাম প্রশ্নের অভ্যাস
    এই লেখাটি চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবম্যাগে প্রকাশিত। এইখানে আবারও দিলাম। যাঁরা পড়েন নি, পড়ে দেখতে পারেন। বিজ্ঞানে বিশ্বাস, চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিশ্বাস বনাম প্রশ্নের অভ্যেসবিষাণ বসু“সোমপ্রকাশ। - স্বয়ং হার্বাট স্পেন্সার একথা বলেছেন। আপনি হার্বাট স্পেন্সারকে ...
  • অতীশ দীপংকরের পৃথিবী : সন্মাত্রনন্দের নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা
    একাদশ শতকের প্রথমদিকে অতীশ দীপঙ্কর বৌদ্ধধর্ম ও সংশ্লিষ্ট জ্ঞানভাণ্ডার নিয়ে বাংলা থেকে তিব্বতে গিয়েছিলেন সেখানকার রাজার বিশেষ অনুরোধে। অতীশ তিব্বত এবং সুমাত্রা (বর্তমান ইন্দোনেশিয়া) সহ পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃর্ণ ভূভাগে বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শনের ...
  • the accidental prime minister রিভিউ
    ২০০৫ সালের মে মাসে ইউপিএ সরকারের প্রথম বর্ষপূর্তিতে হঠাৎ একটা খবর উঠতে শুরু করল যে প্রধাণমন্ত্রী সব ক্যাবিনেট মিনিস্টারের একটা রিপোর্ট কার্ড তৈরি করবেন।মনমোহন সিং যখন মস্কোতে, এনডিটিভি একটা স্টোরি করল যে নটবর সিং এর পারফর্মেন্স খুব বাজে এবং রিপোর্ট কার্ডে ...
  • উল্টোরথ, প্রসাদ ও কলিন পাল
    ছোটবেলা থেকেই মামাবাড়ির 'পুরোনো ঘর' ব'লে একটি পরিত্যক্ত কক্ষে ঝিমধরা দুপুরগুলি অতিবাহিত হতো। ঘরটি চুন সুরকির, একটি অতিকায় খাটের নীচে ডাই হয়ে জমে থাকত জমির থেকে তুলে আনা আলু, পচা গন্ধ বেরুত।দেওয়ালের এক কোণে ছিল বিচিত্র এক ক্ষুদ্র নিরীহ প্রজাতির মৌমাছির ...
  • নির্বাচন তামসা...
    বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়ে গেছে। এবার হচ্ছে একাদশ তম জাতীয় নির্বাচন। আমি ভোট দিচ্ছি নবম জাতীয় নির্বাচন থেকে। জাতীয় নির্বাচন ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেখার সুযোগ পেয়েছি বেশ কয়েকবার। আমার দেখা নির্বাচন গুলোর মাঝে সবচেয়ে মজার নির্বাচন ...
  • মসলা মুড়ি
    #বাইক_উৎসব_এক্সরে_নো...
  • কাঁচঘর ও ক্লাশ ফোর
    ক্লাস ফোরে যখন পড়ছি তখনও ফেলুদার সঙ্গে পরিচয় হয়নি, পড়িনি হেমেন্দ্রকুমার। কিন্তু, যথাক্রমে, দুটি প্ররোচনামূলক বই পড়ে ফেলেছি। একটির নাম 'শয়তানের ঘাঁটি' ও অপরটি 'চম্বলের দস্যুসর্দার'। উক্ত দুটি বইয়ের লেখকের নাম আজ প্রতারক স্মৃতির অতলে। যতদূর মনে পড়ে, এই ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

আমার বন্ধু কালায়ন চাকমা

বিপ্লব রহমান

প্রথম যৌবন বেলায় রাঙামাটির নান্যাচরের মাওরুম গ্রামে গিয়েছি সমীরণ চাকমার বিয়েতে। সমীরণ দা পরে শান্তিচুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ’র সঙ্গে যুক্ত হন। সেই গ্রুপ ছেড়েছেন, সে-ও অনেকদিন আগের কথা।

এরআগেও বহুবার চাকমাদের বিয়ের নিমন্ত্রণে গিয়েছি। কিন্তু ১৯৯৩ সালের শেষের দিকে, সমীরণ দা’র ওই বিয়েটি ছিলো খুবই জাঁক-জমকপূর্ণ। একদম আদি চাকমা সংস্কৃতির কোনো বিয়েতে অংশগ্রহণ সেই প্রথম।

কয়েকটি গ্রামের নানা বয়সী নারী-পুরুষ এসেছে সেই বিয়ের নিমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে। বলতে দ্বিধা নেই, ঢাকা থেকে নিমন্ত্রিত তো বটেই, এমন কি পুরো বিয়ের অনুষ্ঠানে একমাত্র বাঙালি অতিথি আমি একাই। বরের বাড়িটিকে সাজানো হয়েছে রঙিন কাগজ, ফুল, লতা-পাতায়। পাশের মাঠে নিমন্ত্রিতদের বসার জন্য টাঙানো হয়েছে বিশাল সামিয়ানা। সেখানে পাতা হয়েছে সারি সারি মাদুর। এক দল ছেলেমেয়ে গিটার বাজিয়ে মাইকে গান করে চলেছে অবিরাম।

আমার পাহাড়ি বন্ধুরা জানান, এই গ্রামটি হচ্ছে ‘নতুন মাওরুম’। অবশ্য আনুষ্ঠানিক বাংলায় এর নাম ‘মহাপ্রুরম’। আর নান্যাচর থানাটি কাগজ-পত্রে ষোলআনা বাঙালিয়ানায় হয়েছে ‘নানিয়ারচর’। তো আদি মাওরুম গ্রামটি এখন কাপ্তাই বাঁধের ফলে জলের তলায়। সেখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন জুম্ম
(পাহাড়ি) জাতির মহান নেতা এমএন লারমা।

নয়া মাওরুম গ্রামের একটি ছোট্ট এক চালা বেড়ার ঘরের প্রাথমিক বিদ্যালয় দেখিয়ে আরকজন বন্ধু কল্পনার জের টেনে বলেন, এমএন লারমার সেই বিলুপ্ত গ্রামটিতেও হয়তো একই রকম স্কুল ছিল। যেখানে তিনি পড়াশুনা করেছিলেন। আবার বড় হয়ে ওই স্কুলেই শিক্ষকতা করেছেন।...

এরই মাঝে বিয়ের কনে চলে আসে। কনেটি ঐতিহ্যবাহী পিনন-খাদি (লুঙ্গি-ওড়না), সোনার গহনায় মোড়া একদম পরীর মতো। বরের বাড়িতে ঢুকতে হলে তাকে আবার ছোট্ট একটি পরীক্ষা দিতে হবে। প্রধান ফটকের দুপাশে পোঁতা হয়েছে দুটি কলাগাছ। গাছ দুটির দুপাশে রাখা হয়েছে জলভর্তি মাটির কলস। আর কলস দুটির দুমুখে সাদা সুতো বেধে তৈরি করা হয়েছে একটি ব্যারিকেড। চাকমা রীতি হচ্ছে, কন্যাকে এক লাফে এই সুতো পেরিয়ে কলা-গেট দিয়ে প্রবেশ করতে হবে ছেলের বাড়িতে।

তো মেয়েটি গ্রামের হলেও বেশ চটপটে। ওই জবর-জং সাজ-পোশাকসহ, পিননটি একটু উঁচু করে ধরে একলাফে পেরিয়ে যায় পুলসেরাত। চারিদিকে তুমুল উল্লাস ধ্বনী উঠে।

সামিয়ানায় মাদুর পেতে বসা অতিথিদের জন্য সেচ্ছা-সেবকরা দেন পান-সুপারি-সিগারেট। আসে ‘চোয়ানি’ নামক কড়া স্বাদের মদের বোতল, ছোট্ট ছোট্ট কাঁচের গ্লাস। এরপর একটি আশির্বাদের ট্রে ঘুরতে থাকে। সেখানে যার যেমন সামর্থ সে অনুযায়ী নগদ টাকা উপহার দেন। এরই মধ্যে বরপক্ষের লোকজন বিয়ে উপলক্ষে কাটা শুকরের মাথা কলাপাতায় মুড়ে এসে অতিথিদের দেখান। অর্থাৎ মান্যবরগণ, দেখুন, আমরা কিন্তু সব চাকমা সংস্কৃতি-রীতি-নীতি মেনে এই বিয়ের আয়োজন করেছি, ইত্যাদি।

বলা ভাল, বিয়ের আসরে প্রবীনদের পাত পড়েছে একদিকে। আর নবীনরা বসেছে অন্যদিকে। আমি যেন, বিয়ের আচার-অনুষ্ঠান সব ভাল করে দেখতে পাই, এ জন্য আমার বন্ধুরা আমাকে বসিয়েছে সামিয়ানার সামনের সারিতে, ওই বয়স্কদের মাঝেই।

আমি চোয়নি খেতে খেতে মঞ্চের দিকে তাকাই। কয়েকজন ভান্তে (বৌদ্ধ পুরহিত) মন্ত্র পাঠ করে বিয়ে পড়ান। মাইকে আবারও বাজতে থাকে আধুনিক চাকমা গান। এরই মধ্যে ছেদ ঘটান হাড্ডিসার কালো মতো এক পাহাড়ি ছেলে। তার গলায় গামছা বাধা একটি সিঙ্গেল রিডের হারমোনিয়াম। নাম শুনতে পাই ‘কালায়ন চাকমা’। এক সময় পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) করেছেন। এখন গান-বাজনা নিয়েই আছেন।

কালায়ন দা মাইক টেনে নিয়ে বলেন, আজ এই আনন্দের দিনে অনেক আনন্দ সঙ্গীত তো হলো। এবার একটি অন্যরকম গান হোক। আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা নিয়ে গান লিখেছি, তারই একটি আপনাদের শোনাতে চাই। এরপর তিনি বাংলা গানে শোনান রোমহর্ষক নান্যাচর গণহত্যার কথা। তার গানের প্রথম কলিটি এরকম:


"১৭ তারিখ নভেম্বর/ ৯৩ ইংরেজী..".

ওই তারিখেই নান্যাচর বাজারে পাহাড়িদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলা চালায় সেটেলার বাঙালিরা। খুব ঠাণ্ডা মাথায় দা দিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয় অন্তত ২৯ জন পাহাড়িকে। সেনা সমর্থিত ওই হত্যাযজ্ঞে আহত হয়েছিলেন আরো অনেকে। ধর্ষিত হতে হয়েছে কয়েকজন পাহাড়ি নারীকে। ...কালায়ন দা গানে গানে বর্ণনা করেন গণহত্যার কথা। মনে করিয়ে দেন লংগদু, লোগাং, বরকলসহ আরো
অনেক হত্যাযজ্ঞ, অগ্নি সংযোগ, ধর্ষণ এবং জুম্ম নিধনের কথা।...

পুরো বিয়ের অনুষ্ঠানটি যেন একটি গানেই পরিনত হয় শোক সভায়। শত শত নিমন্ত্রিত অতিথি শব্দহীন কান্নায় আকুল হন। বার বার গামছায় চোখ মোছেন তারা। কেউ কেউ বুক ফাটা আর্তনাদ চাপা দিতে মুখ চেপে ধরেন গামছায়, কি খাদির আঁচলে।

আমি আর থাকতে না পেরে সামিয়ানা ছেড়ে উঠে পড়ি। বিয়ের অনুষ্ঠানের বাইরে, মাঠ পেরিয়ে একটু দূরে এক কাঁঠাল গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাই। দূর মাইকে তখনো ভেসে আসে কালায়ন দা’র গানের বোল:

"১৭ তারিখ নভেম্বর/ ৯৩ ইংরেজী..."

খানিক পরে আমাকে খুঁজতে বের হওয়া পাহাড়ি বন্ধুরা দেখা পায় আমার। তারা বলেন, খাবার দেওয়া শুরু হয়েছে। এখনই খেয়ে নেওয়া ভাল। এই খাবার-দাবারটিও আদি চাকমা বিয়ের রীতি মেনে করা হচ্ছে।

আবার সামিয়ানার নীচে মাদুর পেতে বাবু হয়ে বসি। টুকরো কলাপাতায় আতপ চালের ভাত, কয়েক রকম পাহাড়ি সব্জি, মাছ, শুকর ও মুরগীর মাংস পরিবেশন করা হয়। সবশেষে দই-মিষ্টি।

...আমি অনেকটা খাবার ছড়াই। প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত হলেও ভাল করে কিছুই খেতে পারি না। পরে সামিয়ানার বাইরে এসে একটি ঝোপের পাশে বসে হরহর করে সব খাবার বমি করে দেই। অদেখা নান্যাচর গণহত্যা, আর ঠিক আগের বছর একদম ভেতর থেকে দেখা লোগাং গণহত্যার ফিনকি দিয়ে ছোটা রক্ত যেন আমার পোষাক-আশাকে, চোখে-মুখে লেগেছে বলে ভ্রম হয়। এমনকি আমি খানিকটা জুম্ম রক্তের ঘ্রাণও যেন পাই।


কালায়ন দা, তুমি কি নিষ্ঠুর গো!...
*আরো দেখুন: একটি রোমহর্ষক গণহত্যার কাহিনী http://biplobcht.blogspot.com/2013/06/blog-post_1234.html

বন্ধ হয়ে গেল ‘কনসার্ট ফর বাঘাইহাট ভিক্টিমস’ http://biplobcht.blogspot.com/2013/06/blog-post_7901.html
*মুল লেখাটি লেখকের "পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ", সংহতি প্রকাশন, একুশের বইমেলা, ২০১৫, বইয়ে সংযুক্ত।

99 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: Prativa Sarker

Re: আমার বন্ধু কালায়ন চাকমা

মাঙ্গলিক রীতি, গণহত্যা, কনের সাজ, কালায়নের গান সব যেন খোলা এলবামের পাতা। বড় ভালো লাগল মন ভারী করা এই লেখা।
Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: আমার বন্ধু কালায়ন চাকমা

দূর পাহাড়ের কান্না শুনতে পেয়েছেন, এটিই এ লেখার সার্থক! 👍
Avatar: ।

Re: আমার বন্ধু কালায়ন চাকমা


Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: আমার বন্ধু কালায়ন চাকমা

আঁ! 🤔


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন