Sakyajit Bhattacharya RSS feed

Sakyajit Bhattacharyaএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • সাম্মানিক
    বেশ কিছুদিন এই :লেখালিখি'র কচকচানিতে নিজেকে ঝালিয়ে নেওয়া হয়নি। নেওয়া হয়নি বলতে ইচ্ছে ছিল ষোল'র জায়গায় আঠারো আনা, এমনকি, যখন আমাদের জুমলাবাবু 'কচি' হতে হতে তেল-পয়সা সবাইকেই ডুগডুগি বাজিয়ে বুলেট ট্রেনে ওঠাচ্ছেন তখনও আমি 'ঝালিয়ে নেওয়া'র সুযোগকে কাঁচকলা ...
  • তোত্তো-চান - তেৎসুকো কুররোয়ানাগি
    তোত্তো-চানের নামের অর্থ ছোট্ট খুকু। তোত্তো-চানের অত্যাচারে তাকে স্কুল থেকে বের করে দিয়েছে। যদিও সেই সম্পর্কে তোত্তো-চানের বিন্দু মাত্র ধারনা নেই। মায়ের সঙ্গে নতুন স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য সে চলছে। নানা বিষয়ে নানা প্রশ্ন, নানান আগ্রহ তার। স্টেশনের টিকেট ...
  • চলো এগিয়ে চলি
    #চলো এগিয়ে চলি#সুমন গাঙ্গুলী ভট্টাচার্য প্রথম ভাগের উৎসব শেষ। এরপরে দীপাবলি। আলোর উৎসব।তার সাথে শব্দবাজি। আমরা যারা লিভিং উইথ অটিজমতাদের ক্ষেত্রে সব সময় এই উৎসব সুখের নাও হতে পারে। অটিস্টিক মানুষের ক্ষেত্রে অনেক সময় আওয়াজ,চিৎকার, কর্কশ শব্দশারীরিক ...
  • সিনেমা দেখার টাটকা অভিজ্ঞতা - মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি
    চট করে আজকাল সিনেমা দেখতে যাই না। বাংলা সিনেমা তো নয়ই। যদিও, টেলিভিশনের কল্যাণে আপটুডেট থাকা হয়ে যায়।এইভাবেই জানা যায়, এক ধাঁচের সমান্তরাল বাংলা ছবির হয়ে ওঠার গল্প। মধ্যমেধার এই রমরমার বাজারে, সিনেমার দুনিয়া আলাদা হবে, এমন দুরাশার কারণ দেখিনা। কিন্তু, এই ...
  • কিংবদন্তীর প্রস্থান স্মরণে...
    প্রথমে ফিতার ক্যাসেট দিয়ে শুরু তারপর সম্ভবত টিভিতে দুই একটা গান শোনা তারপর আস্তে আস্তে সিডিতে, মেমরি কার্ডে সমস্ত গান নিয়ে চলা। এলআরবি বা আইয়ুব বাচ্চু দিনের পর দিন মুগ্ধ করে গেছে আমাদের।তখনকার সময় মুরুব্বিদের খুব অপছন্দ ছিল বাচ্চুকে। কী গান গায় এগুলা বলে ...
  • অনন্ত দশমী
    "After the torchlight red on sweaty facesAfter the frosty silence in the gardens..After the agony in stony placesThe shouting and the crying...Prison and palace and reverberationOf thunder of spring over distant mountains...He who was living is now deadWe ...
  • ঘরে ফেরা
    [এ গল্পটি কয়েক বছর আগে ‘কলকাতা আকাশবাণী’-র ‘অন্বেষা’ অনুষ্ঠানে দুই পর্বে সম্প্রচারিত হয়েছিল, পরে ছাপাও হয় ‘নেহাই’ পত্রিকাতে । তবে, আমার অন্তর্জাল-বন্ধুরা সম্ভবত এটির কথা জানেন না ।] …………আঃ, বড্ড খাটুনি গেছে আজ । বাড়ি ফিরে বিছানায় ঝাঁপ দেবার আগে একমুঠো ...
  • নবদুর্গা
    গতকাল ফেসবুকে এই লেখাটা লিখেছিলাম বেশ বিরক্ত হয়েই। এখানে অবিকৃত ভাবেই দিলাম। শুধু ফেসবুকেই একজন একটা জিনিস শুধরে দিয়েছিলেন, দশ মহাবিদ্যার অষ্টম জনের নাম আমি বগলামুখী লিখেছিলাম, ওখানেই একজন লিখলেন সেইটা সম্ভবত বগলা হবে। ------------- ধর্মবিশ্বাসী মানুষে ...
  • চলো এগিয়ে চলি
    #চলো এগিয়ে চলি #সুমন গাঙ্গুলী ভট্টাচার্যমন ভালো রাখতে কবিতা পড়ুন,গান শুনুন,নিজে বাগান করুন আমরা সবাই শুনে থাকি তাই না।কিন্তু আমরা যারা স্পেশাল মা তাঁদেরবোধহয় না থাকে মনখারাপ ভাবার সময় না তার থেকে মুক্তি। আমরা, স্পেশাল বাচ্চার মা তাঁদের জীবন টা একটু ...
  • দক্ষিণের কড়চা
    দক্ষিণের কড়চা▶️অন্তরীক্ষে এই ঊষাকালে অতসী পুষ্পদলের রঙ ফুটি ফুটি করিতেছে। অংশুসকল ঘুমঘোরে স্থিত মেঘমালায় মাখামাখি হইয়া প্রভাতের জন্মমুহূর্তে বিহ্বল শিশুর ন্যায় আধোমুখর। নদীতীরবর্তী কাশপুষ্পগুচ্ছে লবণপৃক্ত বাতাস রহিয়া রহিয়া জড়াইতে চাহে যেন, বালবিধবার ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

অনন্ত লেকের জলে চাঁদ পড়ে আছে/১

Sakyajit Bhattacharya

(দক্ষিণ কলকাতা নিয়ে এই সিরিজটা শুরু হল। চলবে নিজের মর্জিমাফিক। নিয়মিত, এবং অনিয়মিত, যখন যেটা ইচ্ছে)


“ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্চে মানুষের সাজানো বাগান"

দক্ষিণ বাংলা থেকে বাঘের গর্জন ভেসে আসে। নৌকো দোলে উনিশশো সাতাত্তর সালে। ধরা যাক, এভাবেই শুরু। ধরা যাক, বাঘের হুংকার অথবা নৌকোবিলাস, এ সমস্তই একটা ছক বন্দী ক্লাসিফিকেশনের ঘেরাটোপ, যে অবয়বের মধ্যে বন্দী হয়ে ছিল এক মিথিকাল অস্তিত্ব। তার নাম দক্ষিণ কলকাতা। কেন বাঘের গর্জন? কেন না, এই ভৌগোলিক সীমানার দক্ষিণে থাকুক বেহালা, যা কিনা একসময়ে সুন্দরবনের অংশ ছিল। ডায়মন্ড হারবারের নোনা জলের ঝাপটা কোনও অবসন্ন বর্ষার বিকেলে সরশুনা সখেরবাজারের নাগরিক পাননি কি? তাহলে দক্ষিণ রায়ের হুংকার দিয়ে আমাদের কাল্পনিক ভূগোল তার পদতলের পরিধি চিহ্নিত করে দিল। উত্তর দেওয়া যাক, টেনে টুনে পার্ক স্ট্রিট? পছন্দ হল না? অনেকটা বেশি হয়ে গেল, যাতে করে একান্ত ব্যক্তিগত নিভৃতিটুকুর আর অবকাশ থাকবে না বলেই মনে হচ্ছে? তাহলে এক্সাইডের মোড় থেকে শুরু করে পার্কসার্কাসেই থেমে যাওয়া যাক। আড়াআড়ি এক্সাইড থেকে দক্ষিণে নাক বরাবর লম্বালম্বি তাকালে টালিগঞ্জের উত্তমকুমারের মুর্তিতে ধাক্কা খাওয়া অবধারিত। কিন্তু থেমে গেলে চলবে না। চলে যেতে হবে গড়িয়া অবধি। কারণ কলোনি ছাড়া দক্ষিণের আলেখ্য অসম্পূর্ণ। এবং শুধু কলোনিও নয়। মফস্বল যেখানে ঠিকরে পড়তে গিয়েও থমকে রয়েছে, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা এক পা তুলে দ্বিধাগ্রস্ত ভাবছে যে তার সাম্রাজ্য বিস্তার অপ্রতিহত রাখবে না কি রাখবে না, ঠিক সেই টোয়াইলাইট অঞ্চলকেই সীমানা না ধরলে দক্ষিণ কলকাতার অন্তর্গত অন্তর্ঘাতকে বোঝা সম্ভব নয়। এর পরেই অবধারিত যে প্রশ্নটা আসবে এবং যার উত্তর লেখবার জন্য কলম এতটাই উদ্যত যে প্রশ্নটি আসবার আগেই উত্তর উপচে দেবার মতলব আঁটছে মনে মনে, তা হল--বাঘের গর্জন বোঝা গেলেও নৌকো কেন দুলবে? উনিশশো সাতাত্তর সালেই বা কেন? তার আগে কি দক্ষিণ কলকাতা ছিল না? প্রথম প্রশ্নের উত্তর একটা শব্দেই দিয়ে দেওয়া যায়। আদিগংগা। চেতলা কালীঘাট সিরিটি পুঁটিয়াড়ি না থাকলে যাবতীয় মিথ মিথ্যের মীথঃস্ক্রীয়ায় গড়ে ওঠা এই আখ্যানের ম্যাজিকবিলাস মাঠে মারা যাবে অর্ধেক। আর উনিশশো সাতাত্তর? মুখফোড় মিচকি এবং অন্তঃশিলা কিছু অট্ট সহযোগে মৃদুলীয় গাম্ভীর্য্যেই বলে দেওয়া যেতে পারে, উহা একটি সংখ্যা মাত্র। কাব্যিক ব্যঞ্জনা বাড়াতে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে, সবার কিছু কথন আছে কথক যদি নাই বা থাকে। তাই দক্ষিণ কলকাতার কথনে উনিশশো সাতাত্তরই বা কেন আসল, আটাত্তর বা ছিয়াত্তর নয় কেন, এমত বেয়াড়া কৌতূহলের জবাবদাতার পরোয়া না করেই বলে দেওয়া যেতে পারে যে দক্ষিণ কলকাতা উনিশশো সাতাত্তরকে আবিষ্কার করে নিয়েছিল তার আখ্যানের মধ্যেই। গড়ে তুলেছিল । এটা তার ব্যক্তিগত নির্মাণ। আর কে না জানে, শুধু সেটুকুই পবিত্র, যার বাকিটা ব্যক্তিগত !


তাহলে বাঘ এবং আদিগংগা দিয়ে যার অস্তিত্ব প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করে নেওয়া গেল, তার শরীরের জন্মদাগগুলো কী কী হতে পারে? মনে রাখতে হবে, এ আখ্যান এগোবে এক ডিটেকটিভ কাহিনীর ধাঁচা ধরে ধরে। ধরে নেওয়া যেতেই পারে যে দক্ষিণ কলকাতা হল এক নিহত শব, যার শারীরিক চিহ্নগুলিকে খুঁজে খুঁজে নির্মাণ করে নিতে হবে লুপ্ত অবয়ব। হৃত অভিজ্ঞান অঙ্গুরীয় থেকে রাজা দুষ্মন্ত চিনে নিয়েছিলেন শকুন্তলাকে। আমাদের খুঁড়ে খুঁড়ে বার করতে হবে সেই অভিজ্ঞান অঙ্গুরীয়, যা আপাতত এক অতিকায় বোয়াল মাছের পেটের মধ্যে হারানো ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট এবং মৃত মসজিদের জঙ্গলের সঙ্গে শুয়ে রয়েছে। ডিটেকটিভ যেরকম ভাবে অপরাধকে রিকন্সট্রাক্ট করেন সেরকমভাবেই আমরা পুনর্নির্মাণ করে ফেলব একটা অকথিত ক্রাইমের। সেই পুনর্নির্মাণ হবে এক হারানো নগরীর আখ্যান, যাকে একসময়ে খুন করে ফেলা হয়েছিল। অর্থাৎ, কাহিনীর শুরুতেই বলে দেওয়া গেল যে এই দক্ষিণ কলকাতা আসলে নেই। কখনো ছিল বা। তার মৃতদেহ কথা বলুক এখন থেকে, এবং আমরা আখ্যানের হস্তান্তর করে দিয়ে দায়মুক্ত হয়ে পপকর্ণ হাতে গ্যালারিতে বসি।


বেহালা, টালিগঞ্জ, বিজয়গড়, গড়িয়াহাট, ঢাকুরিয়া লেক, বালিগঞ্জ, হাজরা, চেতলা--না, এতকিছু দিয়েও বোঝা সম্ভব নয় স্থানিক অস্তিত্বে দক্ষিণ কলকাতা কীরকম ছিল। কালচেতনায় ঢুকতে হবে বলছ? তাতে হরেক ঝামেলা। আবার চলে আসবে উনিশশো সাতাত্তরের ব্যাগড়া। আর সবথেকে বড় কথা, সেটাও সবটা দেখাতে পারবে না। কেন, সেটা কিছুদূর এগোলেই বোঝা যাবে। তার থেকে বরং শুরু করা যাক নিরাপদভাবে। একটা বাসের গল্প দিয়ে। যেখানে কোনও কালচেতনা বা স্থানবিভ্রাট জাতীয় জটিল দার্শনিক কচকচিতে পড়তে হবে না।

ফোর-সি একটি সরকারী বাস। তার রুট হল হরিদেবপুর থেকে বিবাদি বাগ। যাবার সময়ে সে ছুঁয়ে যায় করুণাময়ীর কালীমন্দির, সিরিটি শ্মশান, কলাবাগানের লুপ্ত খাটাল, মহাবীরতলা এবং টালিগঞ্জ ফাঁড়িতে অধুনাসভ্য প্রদীপ সিনেমা হল। যখন হরিদেবপুর মুচিপাড়া সিরিটি সংলগ্ন এলাকা ছিল ধু ধু নির্জন এবং সত্তরের দশকের কংগ্রেস বনাম নক্সাল সন্ত্রাসে অঞ্চলের জংগলাকীর্ণ ডোবাগুলিতে মাঝে মাঝেই স্বেচ্ছাচারী লাশেদের ঝলসে ওঠা মিলত, সেই সময় থেকেই অঞ্চলের একমাত্র বাস ছিল ফোর-সি। ইদানীং খুব কম চলে। দিনে হয়ত দুই কি তিনখানা। কিন্তু আশি এবং নব্বই দশকের গোড়াতে এই বাসের যাতায়াত ছিল খুবই নিয়মিত। সরকারী লম্বা বাস। লাল রঙ। দুখানা দরজা ছিল। শক্ত সিট, যার কভারগুলি ভ্যান্ডালেরা ছিঁড়ে-খুঁড়ে নিয়েছে সম্ভবত জন্মলগ্ন থেকেই। ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে সেই বাস চলত, যেন কোথাও কোনও তাড়া নেই। দুই ঘণ্টার কমে ট্রিপ শেষ হয়নি কখনো। যখন করুণাময়ী ব্রিজকে পাকা করার কাজ চলছে আশির দশকের শেষভাগে, তখন খোঁড়া রাস্তা এড়াবার জন্য বাসের স্টপেজ ছিল সিরিটি মোড়। তখনো কাঠের চুল্লিতে দাহ করা হচ্ছে। সকালের অফিসযাত্রীরা নিয়মিত সিরিটি শ্মশানের পাশে অপেক্ষমান থাকবার সময়ে অথবা বাসের জানালার ধারে বসে নাকে পাচ্ছিলেন মড়া পোড়াবার কটু গন্ধ।

এই মড়া পোড়াবার প্রশ্নে একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার যেটা না বললেই নয়। এবং যেহেতু এই আখ্যানের একটা নির্দিষ্ট গন্তব্য আছে কিন্তু সেখানে পৌঁছোবার জন্য ফোর-সি বাসের মতই বিশেষ তাড়াহুড়ো নেই, তাই মাঝে মাঝেই ডিট্যুর করে অন্ধগলিতে ঢুকে যেতেই পারে। ওই অঞ্চলের পুরনো দিনের মানুষজনের এটাও মনে থাকবে যে ফোর-সি বাসও কখনো কখনো খামখেয়ালে মহাবীরতলা থেকে ডানদিকে টালিগঞ্জ ফাঁড়িতে না বেঁকে সোজা ঢুকে যেত সামনের গলিতে, বর্তমানে যার নাম হয়েছে 'কবি দীনেশ দাস সরণী'। সেখান দিয়ে সোজা গেলে কালীঘাট শ্মশান। মানে, শ্মশান থেকে শ্মশানে ঘোরবার একটা বাসনা তার সম্ভবত মাঝে মাঝেই হত। অন্তত ড্রাইভার যে নিজের খেয়ালে এমন দুমদাম উলটো বাঁক নিত না এটা তারাও হলফ করে পরে বলেছে।

তো, মড়া পোড়াবার আখ্যানটি একটু কিম্ভুত। ঠাকুরপুকুর বেহালা থেকে শুরু করে ক্যাওড়াপুকুর হয়ে পুঁটিয়াড়ী অবধি গোটা অঞ্চলটায় একটাই শ্মশান। টালিগঞ্জের বাসিন্দাদের অবশ্য এই দখলদারির মধ্যে ঢোকানো যাবে না কারণ গড়িয়ার শ্মশান তখনো এত নাম না করলেও ষাটের দশকের শেষদিককার কংগ্রেসি মস্তানদের মতই উঠতি ও সম্ভাবনাময়। কাজেই, এই বিশাল অঞ্চলের সমস্ত মৃতদেহকে পোড়াতে হলে সবথেকে কাছাকাছি হয় সিরিটি শ্মশানই। আর কে না জানে, মানুষ সবসময়েই শীতের রাত্রিবেলা মরতে সবথেকে বেশি ভালবাসে। এই পৃথিবীর কোনও এক অসংজ্ঞায়িত স্থায়ী কুয়াশা যাদের মগজে চিরতরে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে পড়েছে তাদের বাদ দিলেও যারা সুস্থ স্বাভাবিক মানুষজন, যারা উত্তম-সুচিত্রার সাদাকালো সিনেমা দেখে এখনো দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবং মাঝরাতে বাথরুমে যায়, তারাও কুয়াশাঘেরা রাত্রিবেলাকেই এক অতন্দ্র নিদ্রার ভেতর ঢুকে যাবার জন্য বেছে নেয় । আত্মহত্যা হোক অথবা হার্টফেল। ফলস্বরূপ যেটা হয়, গভীর রাত্রে সমস্ত পাড়া লেপের ভেতর ঘুমজলে আর্ধেক ডুবে, কুয়াশার পাতলা দুধের সর ভেসে রয়েছে এ চরাচরে, এমনকি পুকুরের জলও বরফ হয়ে গিয়ে নিস্পন্দ, ঠিক এমন সময়েই গম্ভীর গলাতে হাঁক আসে 'বলো হরি হরিবোল!" একবার না। সারা রাত ধরে অজানা কারা যেন খাটে করে একটার পর একটা মৃতদেহ বয়ে নিয়ে যায় শ্মশানের দিকে। মধ্যরাত্রে সেই আওয়াজে কি বুক কেঁপে ওঠে? না, এবং এখানেই গল্পটা ইন্টারেস্টিং। শ্মশানের লাগোয়া অঞ্চলের পাড়াগুলিতে বহু মানুষ আছেন, যাঁদের কানে দিনরাত এই শব্দ ঢুকে ঢুকে এমনই অভ্যাস হয়ে গিয়েছে যে কোনও রাতে মড়া না গেলে তাঁদের ঘুম হয় না। উৎকর্ণ হয়ে বালিশে কান চেপে থাকেন, কখন হরিবোলের আওয়াজ শোনা যাবে। হয়ত আধো তন্দ্রাতে আছেন। হঠাৎ কানে গেল আওয়াজ, সেই সঙ্গে ঘুমভাঙা ভীত কুকুরের ডাক। নিশ্চিন্ত হয়ে ওপাশ ফিরে বালিশ জড়িয়ে ধরলেন। এই স্বর ভেসে আসা মানে, পাড়াটা এখনো ঠিকঠাক আছে। স্বাভাবিক নিয়মেই চলছে, যেমন চলার। মৃত্যুর আওয়াজে নিদ্রার নিশ্চিন্তির এই জটিল সমীকরণকে বুঝতে গেলে তোমাকে সিরিটি শ্মশানের ধারে থাকতেই হবে।


আবার ফিরে আসি ফোর-সি প্রসঙ্গে। ক্রমে ক্রমে এলাকায় অটো আসল। অন্যান্য বাস বাড়ল। একুশ নম্বর বাস আগেও ছিল, খুব অল্প চলত। সেটাকে নিয়মিত করা হল। প্রাইভেট বাসের রুট তৈরি হল কিছু। এবং সরকারী বাসের পেছনে আর পুরনো কায়দায় অনুদান দেওয়া সম্ভব নয় বুঝেই কমতে লাগল ফোর-সি বাসের সংখ্যা। মাঝে কয়েকবার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আবার চালানো হয়েছে। এখন তার চেহারা বেশ ঝাঁ চকচকে। সিটের কভার আস্তই থাকে। নিয়মিত রঙ করা হয়। শোনা যাচ্ছে কয়েকটা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িও নাকি রাখা হবে, বেশি ভাড়াতে। মানে যে ভাড়াতে বাসের গায়ে পা দিতেই অনেক চোর বেশ্যা ভিখিরির দল ভয় পাবে। কিন্তু মুশকিলটা হল, বাসের সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছে। প্রাইভেট বাস, অটো এবং মেট্রোর কল্যাণে অনেকেই আর দুই ঘণ্টা সময় ব্যয় করে বিবাদি বাগ যাওয়াতে আগ্রহী নয় এটা যেমন সত্যি, তার থেকেও বড় সত্যি হল, বিবাদি বাগে অফিস কমে গেছে। এখন বেশির ভাগের গন্তব্যই সেক্টর ফাইভ। ফোর-সি বাস স্বভাববশতই ডিট্যুর মাঝে মাঝে করেছে সত্যি, কিন্তু দক্ষিণ কলকাতাকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা। এখন দুম করে বাইপাসগামী স্বপ্নউড়ানের সঙ্গে তাল রাখতে না পেরে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে । ফলত, দিনে দুই তিনখানার বেশি চলে না।


তুমি এবার অবধারিত প্রশ্ন করবেই, যদি এত বাস কমে যায় আর সেগুলোও নতুন মডেলের হয়, তাহলে পুরনো বাসগুলো গেল কোথায় ! তারা আছে। ভাঙাচোরা একলা কঙ্কালগুলো এখানে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের গা থেকে অ্যালুমিনিয়ামের পাতগুলো খুলে খুলে আস্তে আস্তে বিক্রি করা শুরু হয়ে গিয়েছিল বহুদিন। নিশ্চুপ প্রতিবাদে তারা মেনে নিয়েছে সব। এরকমই একটা বাস তার অন্ধকার শরীর নিয়ে সারাদিন সিরিটি শ্মশানের উল্টোদিকে রোদে ভিজছে, বৃষ্টিতে পুড়ছে। শুধু মাঝে মধ্যে রাত বাড়লে কোনও কোনও দিন সেই বাসের ভেতর একটা আলো জ্বলে ওঠে। না, ইলেকট্রিকের আলো নয়। ব্যাটারি বহুকাল হল জং ধরে নেই হয়ে গিয়েছে। এই আলো জুয়াড়িদের টর্চ থেকেও আসে না। এ কথা সত্যি যে বাস এবং তার লাগোয়া মাঠ ও ঝোপঝাড় ঘিরে তারা রাত্রিবেলা সাট্টার ঠেক বসায়। কিন্তু বাসের ভেতর বিকট গরম এবং খাঁজে খোঁজে জমে থাকা বৃষ্টির জলে চাষ হওয়া ম্যালেরিয়ার মশাদের কারণেই ঢোকবার আগ্রহ তাদের বিশেষ নেই। আসলে এই আলো আসে শ্যামলের মোমবাতি থেকে।


শ্যামল ফোর-সি রুটের স্টার্টার ছিল। মানে, বাসের গুমটিতে সারাদিন বসে থাকত, হিসেবের খাতা সামলাত এবং সময় এলে পিঁ করে বাঁশিতে টান দিয়ে বলে দিত কোন বাসের কখন ছাড়বার সময় হয়েছে। আগে ছিল মেটালবক্সের কর্মী। চাকরি চলে যাবার পর বৌ ওকে ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে যায়। মেয়েটার তখন সাত-আট বছর বয়েস ছিল। এখন সেই মেয়ের বিয়েও হয়ে গিয়েছে। শ্যামলের এই কাজটাও যথারীতি থাকেনি। ক্যাজুয়ালে ঢুকয়েছিল। সরকার যখন ঠিক করল যে গভর্নমেন্ট বাস আর বেশি রাখবে না, তখন স্টার্টারদের চাকরি আগে চলে যায়। বাসের কন্ডাক্টর বা ড্রাইভারদের দিয়েই এই কাজটুকু করিয়ে নেওয়া হতে থাকল। শ্যামলের এই কাজটা চলে যাবার পরে সে কিছুদিন বাজারে বসল কাঁচা সবজি নিয়ে। সেটাতেও সুবিধে করতে পারেনি কারণ মোটা আড়তদারকে জপাতে পারেনি সে। শ্যামলের ফেরবার রাস্তা ছিল না। বউ বহুদিন হল নেই। তার নিজের ভাড়াবাড়িও টানতে পারে না আর। দেশে একটা বাড়ি সম্ভবত আছে, কিন্তু তার বহু শরিক। শ্যামল মাঝে মাঝে সেখানে গিয়ে থেকে আসে। কিন্তু এই জায়গাটার মায়া ও সম্ভবত কাটাতে পারেনি। অথবা নেই হয়ে যাওয়া বাসগুমটির মায়া। এখন সেই জায়গাতে একটা মোবাইল সারাবার দোকান হয়েছে। মূলত স্মার্টফোন, যেখানে হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কল করা যায়। শ্যামলের একটা মোবাইল আছে। গার্ডার জড়িয়ে কাজ চালাতে হয়। পুরনো দিনের নোকিয়া সেট। যখন অবস্থা ভাল ছিল, একটা সেকেন্ড হ্যান্ড স্কুটার কিনেছিল। মাঝে মাঝে মেজাজ থাকলে বউকে পেছনে বসিয়ে কুদঘাট হয়ে বামে টার্ন নিয়ে ওয়ারলেসের মাঠ, রাণিকুঠির মোড় দিয়ে সোজা বাঘাযতীন পর্যন্ত ছুটে যেত। ফেরবার সময়ে এগরোল খেয়ে বাড়ি ফিরত দুজনে। সেই স্কুটার স্বাভাবিকভাবেই বেচে দিতে হয়েছে। আজকাল শ্যামল কখনো কখনো শ্বশুরবাড়িতে যায়। কয়েকদিন থাকে। বউয়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসে টুকটাক। বাকি সময়ের কিছুটা পুরনো আলাপীদের বারান্দা অথবা বাইরের ঘরে কাটিয়ে দেয়। যখন নিতান্ত চক্ষুলজ্জার খাতিরেই আর কোথাও থাকতে পারে না, তখন একটা বড় ব্যাগ, এটা বহুকাল আগে চোরাবাজার থেকে সস্তায় কিনেছিল, এটার মধ্যে তার বালিশ, টুথব্রাশ, পেস্ট, জামা প্যান্ট কয়েকটা এবং আরো কিছু টুকিটাকি থাকে, সেই ব্যাগ নিয়ে এসে শ্যামল ওঠে পুরনো বাসের একলা কঙ্কালের পেটে। মোমবাতি কেন? কারণ শ্যামলের খুব ভূতের ভয়। এবং কে না জানে, মৃত শহরের জীর্ণ বাসের শবদেহ হল ভূতেদের শেষ আশ্রয় !


বাসের সঙ্গে শ্যামল কথা বলে কি না এরকম অযথা রোমান্টিক আখ্যানে আমরা যাব না। কারণ দক্ষিণ কলকাতার কোনও দায় নেই পাঠের মধ্যে অকারণ সহানুভূতি জাগাবার। আমরা শুধু জানি যে শ্যামল মোমবাতি জ্বালিয়ে বসে থাকে চুপচাপ। বিশেষত সেই সব দিনে যখন রাত্রে বৃষ্টি নামে। ভাঙা কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। দমকা হাওয়ায় মোমবাতি মাঝে মাঝে কেঁপে ওঠে। শ্যামল একটু পরে শুয়ে পড়ে। তার ব্যাগের মধ্যে একটা চাদর এবং বালিশ থাকে সবসময়ে। অন্ধকার বাসের মধ্যে মোমবাতির আলো ঠিকরে পড়ে চকচক করে ওঠে ড্রাইভারের সিট, ভেঙে যাওয়া গিয়ার, কন্ডাকটরের ঘণ্টির তার। শ্যামল ঘুমোতে যাবার আগে ভেবে নেয়, কোনও মায়াবী আখ্যান নয়, বা হেরে যাওয়া কবিতার বিষণ্ণ লাইনও তার মনে আসে না, সম্ভবত সে কবিতা পড়েই নি কোনওদিন, সে মনে মনে ঠিক করে নেয় যে এবার একটা ওডোমস কিনবে। নাহলে মশার কামড়ে তার যদি ম্যালেরিয়া বা ডেংগি হয়, তার পরিবারকে কেউ দেখতে আসবে না।


যেটা বলতে ভুলে গিয়েছি, শ্যামলের টাকমাথা, মোটাসোটা চেহারা। অল্প একটু ভুঁড়ি আছে। আর একটা পুরুষ্টু কাঁচা পাকা গোঁফ। দিনে কয়েকবার বিড়ি খায়। আর কোনও নেশা নেই। সম্ভবত সুগার ধরেছে, কারণ আজকাল তার জিভের তলায় একটা স্থায়ী তেতো ভাব সারাক্ষণ ঘাপটি মেরে থাকে।


আরো যেটা বলবার ছিল, নাহলে আজকের আখ্যান তার আলো নিভিয়ে পর্দা ফেলতে পারবে না, প্রতি রাত্রে পাকাপাকি ঘুম এসে যাবার একটু আগে মনে করে শ্যামল ফুঁ দিয়ে মোমবাতিটা নিভিয়ে দেয়। যতই ভূতের ভয় থাকুক, এই বাজারে মোমবাতির দাম অনেক!




39 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: দ

Re: অনন্ত লেকের জলে চাঁদ পড়ে আছে/১

...
Avatar: π

Re: অনন্ত লেকের জলে চাঁদ পড়ে আছে/১

তুললাম। পড়ব।
Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: অনন্ত লেকের জলে চাঁদ পড়ে আছে/১

গুমটি ঘরের সাবেক স্টার্টার, হেরে যাওয়া শ্যামলকে ভাল লেগে গেল। তার মুখোচ্ছবির বর্ণনা চরিত্রের আগমনে দিলেই মানানসই হতো।

পরের পর্বের অপেক্ষায়। চলুক
Avatar: সৈকত

Re: অনন্ত লেকের জলে চাঁদ পড়ে আছে/১

শাক্যজিতের এখনকার লেখা ভাল লাগছে না, নিজের লেখা ছড়াতে গিয়ে যেন অন্যের ছাপ চলে আসছে।

এই লেখাটা যেন নবারুণীয়, প্রাক ফ্যাতাড়ু পর্ব, অটোর বদলে বাসের স্টার্টার !
Avatar: কৌশিক

Re: অনন্ত লেকের জলে চাঁদ পড়ে আছে/১

কেমন শিব্রামী ভাব। বাসের মধ্যে আবাস তো সেই অর্ধশতাব্দী আগেই তিনি লিখে গেছেন, ভৌতিক পরিমণ্ডল শুদ্ধ।
"নতুন কিছু কর"


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন