bilkis mousumi RSS feed

bilkis mousumiএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের শিক্ষা দিবস
    গত ১৭ই সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে ‘শিক্ষা দিবস’ ছিল। না, অফিশিয়ালি এই দিনটিকে শিক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি বটে, কিন্তু দিনটি শিক্ষা দিবস হিসেবে পালিত হয়। সেদিনই এটা নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু ১৭ আর ১৯ তারিখ পরপর দুটো পরীক্ষার জন্য কিছু লেখা ...
  • বহু যুগের ওপার হতে
    কেলেভূতকে (আমার কন্যা) ঘুড়ির কর (কল ও বলেন কেউ কেউ) কি করে বাঁধতে হয় দেখাচ্ছিলাম। প্রথম শেখার জন্য বেশ জটিল প্রক্রিয়া, কাঁপকাঠি আর পেটকাঠির ফুটোর সুতোটা থেকে কি ভাবে কতোটা মাপ হিসেবে করে ঘুড়ির ন্যাজের কাছের ফুটোটায় গিঁট বাঁধতে হবে - যাতে করে কর এর দুদিকের ...
  • ভাষা
    এত্তো ভুলভাল শব্দ ব্যবহার করি আমরা যে তা আর বলার নয়। সর্বস্ব হারিয়ে বা যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে যে প্রাণপণ চিৎকার করছে, তাকে সপাটে বলে বসি - নাটক করবেন না তো মশাই। বর্ধমান স্টেশনের ঘটনায় হাহাকার করি - উফ একেবারে পাশবিক। ভুলে যাই পশুদের মধ্যে মা বোনের ...
  • মুজতবা
    আমার জীবনে, যে কোন কারণেই হোক, সেলিব্রিটি ক্যাংলাপনা অতি সীমিত। তিনজন তথাকথিত সেলিব্রিটি সংস্পর্শ করার বাসনা হয়েছিল। তখন অবশ্য আমরা সেলিব্রিটি শব্দটাই শুনিনি। বিখ্যাত লোক বলেই জানতাম। সে তিনজন হলেন সৈয়দ মুজতবা আলী, দেবব্রত বিশ্বাস আর সলিল চৌধুরী। মুজতবা ...
  • সতী
    সতী : শেষ পর্বপ্ৰসেনজিৎ বসু[ ঠিক এই সময়েই, বাংলার ঘোরেই কিনা কে জানে, বিরু বলেই ফেলল কথাটা। "একবার চান্স নিয়ে দেখবি ?" ]-- "যাঃ ! পাগল নাকি শালা ! পাড়ার ব্যাপার। জানাজানি হলে কেলো হয়ে যাবে।"--"কেলো করতে আছেটা কে বে ? তিনকুলে কেউ আসে ? একা মাল। তিনজনের ঠাপ ...
  • মকবুল ফিদা হুসেন - জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য
    বিনোদবিহারী সখেদে বলেছিলেন, “শিল্পশিক্ষার প্রয়োজন সম্বন্ধে শিক্ষাব্রতীরা আজও উদাসীন। তাঁরা বোধহয় এই শিক্ষাকে সৌখিন শিক্ষারই অন্তর্ভুক্ত করে রেখেছেন। শিল্পবোধ-বর্জিত শিক্ষা দ্বারা কি সমাজের পূর্ণ বিকাশ হতে পারে?” (জনশিক্ষা ও শিল্প)কয়েক দশক পরেও, পরিস্থিতি ...
  • আমি সংখ্যা লঘুর দলে...
    মানব ইতিহাসের যত উত্থান পতন হয়েছে, যত বিপদের সম্মুখীন হয়েছে তার মধ্যে বর্তমানেও যা প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে এমন কিছু সমস্যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শরণার্থী সমস্যা। হুট করে একদিন ভূমিহীন হয়ে যাওয়ার মত আতঙ্ক খুব কমই থাকার কথা। স্বাভাবিক একজন পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে ...
  • প্রহরী
    [মূল গল্প – Sentry, লেখক – Fredric Brown, প্রথম প্রকাশকাল - ১৯৫৪] .......................
  • ইতিহাসের সঙ্কলন, সঙ্কলনের ইতিহাস - একটি বইয়ের প্রেক্ষাপট, উপক্রমণিকা
    ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের তরফ থেকে, বেশ কিছু লেখালিখি একসাথে সাজিয়ে, একটা সঙ্কলন প্রকাশিত হলো।নাম, ইতিহাসের সঙ্কলন, সঙ্কলনের ইতিহাস।একটা উদবেগজনক আর দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিতে আমরা এই বই প্রকাশ করেছি। সত্যি বলতে কি, এই বইয়ের জন্মের কারণই আমাদের উদবেগ, ...
  • সতী
    সতী : প্রথম পর্বপ্রসেনজিৎ বসুমেয়েটা মাসতিনেক হল এসেছে এই পাড়ায়।মেয়ে ? এই হয়েছে শালা এক মুশকিল ! বিয়ের পর মেয়েরা বউ হয়, কিন্তু ডিভোর্সের পর তারা কি বউই থাকে ? নাকি ফের মেয়ে বনে যায় ? জল জমে বরফ হয়। বরফ গললে আবার জল। কিন্তু এক্ষেত্রে ? ডিভোর্সি মহিলারা ঠিক ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

মহিনের ঘোড়া

bilkis mousumi

মহিনের ঘোড়া
মৌসুমী বিলকিস

ঘোড়াটা উড়ছে। ওকে ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। ওর চারপাশে শুধু রঙ। দ্রুত গতিতে বেরিয়ে যাচ্ছে রংগুলো। সবুজ, হলুদ কত রঙ পার হচ্ছে ঘোড়াটি। ধানের খেত, সর্ষে খেত তুলি বোলানো রঙ হয়ে যাচ্ছে কেবল। নাকি আকাশের কোনো রঙ? মনে হচ্ছে ওর ডানাও দেখতে পাচ্ছি। আমি চেঁচিয়ে বলি,

: নিশি, আমাকে নিয়ে চল।

ও মুখ ঘুরিয়ে তাকায়। তারপরেই আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। আমি লাগাম টেনে ধরে ওর পিঠে ওঠার চেষ্টা করি। চেষ্টা করে করে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আসলে ও আমাদের নিশি। মা বলেছে ও নাকি বেহেশত্‌ থেকে নেমে এসেছে। যখন নেমে আসে তখন ওর ডানা ছিলো। পৃথিবীতে নামার পর ওর ডানা আর দেখা যায় না। কিন্তু এখনো আমি মাঝে মাঝে দেখতে পাই ওর স্বচ্ছ্ব ফিনফিনে ডানা। ডানার ভেতর দিয়ে তাকালে ওপারটাও দেখা যায়। ও মাঝে মাঝে ডানা ঝাঁপটায়। তখন ডানা দুটি বাতাসে ফিনফিন করে ওড়ে। তবুও পিঠে হাত দিয়েও কেউ বুঝতে পারে না। আমি কিন্তু বুঝি। আমার মা হেঁসেল থেকে চেঁচাচ্ছে,

: কামলা, কুনঠে গেলি? হ্যারে আই।

আমার নাম কামাল। মা কোনোদিন ঠিক নামে ডাকবে না। মাকে কতদিন বলেছি, কথা বলা ঠিক কর, ভদ্রভাবে কথা বল। তাও মা ‘কুনঠে’, ‘হ্যারে আই’ এইসব বলবে। আমার পেরাইমারি ইশকুলের মাস্টারমশাই প্রাণতোষবাবু। আমি তাঁর কথাগুলো হাঁ করে গিলি। সব সময় তাঁর মতো কথা বলার চেষ্টা করি। উনি আমাকে খুব ভালোবাসেন। মুশকিলটা হল মার সঙ্গে আর আব্বার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমার কথাও ওদের মতো হয়ে যায়। আমি আপাতত মায়ের ডাকে সাড়া দিই,

: ক্যানে মা, কী বুলছো?

মা কাঁচা পিঁয়াজ দিয়ে বাসি ভাত খাচ্ছিলো। আমার আর আব্বার খাওয়া হয়ে গেছে আগেই। আমি হেঁসেলের পাটকাঠির বেড়া দেওয়া দরজাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। বেড়াটা পাশে সরিয়ে দেয়ালে ঠেস দেওয়া। মা আমাকে দেখেই ভাত খেতে খেতে বলে,

: খ্যাপা কুন্‌ঠে গেল?

: আব্বা লিয়ে যায়নি?

: না। দেখ আবার কুন্‌ঠে যায়ে বসে আছে।

খ্যাপা নিশির ছেলে। আব্বা যখন নিশিকে গাড়ির সঙ্গে যুতে শহরে যায়, খ্যাপা মায়ের পাশে পাশে তাল মিলিয়ে দৌড়ায়। নিশির খুরের সঙ্গে মাটি লেগে লেগে টগ্‌বগ্‌ শব্দ হয়। খ্যাপা অত শব্দ করতে পারে না। বাচ্চা তো। আব্বা বলেছে ও আরেকটু বড় হলে ওকে লোহার খুর কিনে দেবে, ওর মায়ের যেমন আছে। আব্বা সন্ধ্যেবেলায় গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরে নিশিকে আর খ্যাপাকে কী আদর করে! আব্বা ওদের সঙ্গে কথা বলে। আমি লুকিয়ে শুনেছি। মাও খাবার দিতে গিয়ে ওদের সঙ্গে মাঝে মাঝে কথা বলে। বিশেষ করে যেদিন খাবার কম হয় ওদের।

: তুরা আমার বাচ্চা রে। বেশি করে খাতে দিতে পারি না। আমাধেরও এখন চাল নাই। কী করে চলবে ভাবছি।

মা নিজের সুখ দুঃখের কথা বলে চলে ওদের। আর আমি ইশকুলে যাবার আগে ওদের জন্য মাঠ থেকে ঘাস কেটে আনি, মুথা-হ্যাটকা-শ্যামা ঘাস। এখন ওদের ঘাস খাওয়ার জন্য ছেড়ে দেওয়া যায় না। কার ফসলে মুখ দিবে। খোঁয়াড়ে দিলে তখন ছাড়ানোর পয়সা থাকবে না। আব্বা বুলেছে এ হপ্তায় আমাকে একটা প্যান্ট কিনে দিবে। আমার প্যান্টের গার্ডার ঢিল হয়েছে। মাঝে মাঝে মাজা থেকে খুলে পড়ে যায়। এই এখন আমি খ্যাপাকে খুঁজছি। ওকে দেখতে পাচ্ছি। ধান খেতের সবুজ, সর্ষে খেতের হলুদ, তিল খেতের সাদা ফুল সব দ্রুত গতিতে পার করে ও দৌড়াচ্ছে। ও কি আকাশে উড়ে যাবে? ওর ফিনফিনে ডানা দেখতে পাচ্ছি। ও ক্রমশ দিগন্তের দিকে চলে যাচ্ছে। আমার প্যান্টটা মাজা থেকে খুলে পড়ছে। মুখ হা হয়ে গেছে। বাঁ হাত দিয়ে পান্টটা একদিকে তুলে ধরে আছি আর খ্যাপাকে দেখছি। ওর মায়ের মতো হাজার রঙের মধ্য দিয়ে উড়ছে খ্যাপা।


মর্জিনা বিবির শরীরে অভাবের ছাপ। চোখে রক্তাপ্লতার চিহ্ন স্পষ্ট। কাঁচা পেঁয়াজ কামড়ে বাসি ভাত খাচ্ছে সে। পাটকাঠির বেড়া দেওয়া রান্নাঘর। দরজা বন্ধ করার জন্য একটা পাটকাঠির বেড়া, পাশের দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা। খড়ের ছাউনি মাটির ছোট্ট দাওয়া পর্যন্ত নেমে এসেছে প্রায়। মাথা নীচু করে ওঠানামা করতে হয়। দাওয়াতেই মাটির উনুন। মর্জিনার মন খারাপ হলে দাওয়ার তিনটে বাঁশের খুঁটির একটায় হেলান দিয়ে আনমনা হয়ে বসে থাকে। একটা ঘর হেঁসেল হলেও ঘরের একপাশে বাঁশের মাচায় সে মাঝে মাঝে ঘুমায়। এই ঘরের পাশেই ‘L’ আকারে আরো একটি ঘর। একইভাবে খড়ের ছাউনি আর পাটকাঠির বেড়া দেওয়া। এই ঘরের পাশ থেকে খড়ের ছাউনি নেমে এসেছে। তার একদিকে পাটকাঠির বেড়া দেওয়া। তাও ভেঙে পড়েছে। নিশি আর খ্যাপার ঘর এটি। ওদের বাড়ির লাগোয়া আফাজুদ্দিন মিয়ার বাঁশ ঝাড়। নিশিকে মাঝে মাঝে ওই বাঁশ ঝাড়ে বেঁধে দেওয়া হয়। ওরা দেখলে মাঝে মাঝে তেড়ে আসে। তখন খুলে নিয়ে ঘরে বাঁধা হয় নিশিকে। বড় উঠোন নেই তাদের যে নিশির জন্য একটু জায়গা হবে উঠোনে। আসলে সারাদিন তো নিশির নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই। মানে বাড়িতে তো থাকে না। কাউকে শহরে পৌঁছে দাও, কাউকে শহর থেকে গ্রামে নিয়ে এসো। আগে পুরো গাড়ি ভাড়া করতো কেউ কেউ। অনেক দূরের গ্রামে মেয়ে আনতে যাবে, বউ আনতে যাবে, বিয়ে করতে যাবে, নতুন বর সস্ত্রীক যাবে শ্বশুর বাড়ি তখন নিশিকেই দরকার হয়। আফাজুদ্দিন মিয়াও মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন অজ গাঁয়ে। নিশিকে ছাড়া তার চলে না। কিন্তু নিজের বাঁশ ঝাড়ে নিশিকে বাঁধতে দেবে না।


আমি কামলার মা। ঘরের কাজ খুব বেশি করতে হয় না আমাকে। কাজ আর কী। বিকালের আগে আগে একবার রান্ধি। ওই ভাত বিক্যালে খাই, রাতে খাই, সকালে খাই। থাকলে তারপরেও খাই। এখুন বেশ জাড় পড়ে গেলছে। বাপ-ব্যাটায় কড়্‌কড়ে ভাত খায়। আমার লেগে একচিন ভাত পড়ে থাকে। আসলে আমি একচিন করেই ভাত খাই। অধের যদি কম পড়ে। ওই ভাতে এক মগ পানি ঢালি। ভাতগুলা কাঁধা উচা থালির নীচে চলে যায়। আমি দাওয়ায় বসে কখনো খাই না। হেঁসেলের মধ্যে খ্যাতে বসি। যাতে বাপ ব্যাটা না দেখতে পায় আমি কম খাই। ঘর দুয়ার ক’বার আর ঝাড় দিবো। যতডা পারি পইস্‌কার করি। রাস্তাঘাটে গরুর গবোর পালে তুলে আনি। গবোর দিয়ে ঘর ছাঁচ দিই। ছেলেডা ঘাস ক্যাটে আনে বেশ কতকগুলান। বাড়ি ঢুকে উঠানে ঝপ্‌ করে ফেলে দেয়। সেগুলান গুছিয়ে রাখি। নিশিকে খাওয়াবো। খ্যাপা বাড়িতে থাকলে অকে খ্যাতে দিবো। সারাদিনে যা টাকা হবে তাই দিয়ে কামলার বাপ বুট কিনে আনবে। যতডা পারা যায় তুঁষের গুঁড়ে কিনে থুই। গুঁড়ে দিয়ে বুট ম্যাখে নিশিকে আর খ্যাপাকে খ্যাতে দিই। মানুষডা সারাদিন খ্যাটেখুটে আসে। বদনায় পানি দিই। হাত মুখ ধুয়ে উসরাখানে বসে। আমি তখন ভাত রান্ধা সবে শেষ করি। দড়ে দড়ে গরম ভাত আগিয়ে দিই। তরকারি বেশি কিছু থাকে না। বেশিরভাগ দিন শাগ আর ডাল হয়। মানুষডার সামনে বসে থাকি। বধনায় খাবার পানি দিই। গপ্‌গপ্‌ করে খায়। মাঝে মাঝে ঢকঢক করে পানি খায়। আহা রে, সারাদিন কিছু খায়নি। চারডে ভাত লিয়ে যাতে বললে কিছুতেই লিবে না। সময় পালে বাড়ি আসে গোসল করবে, খাবে। কিন্তু পরপর ভাড়া থাকলে কী করেই বা বাড়ি আসে। ভাড়া ছ্যাড়ে দেওয়া তো বুদ্ধিমানের কাজ না। টাকা তো লাগবে, ছেলেডা বড় হচে। ও কী বড় হয়ে গাড়্‌হি চালাবে নাকি? পড়াশুনা করছে, সরকারি চাকরি পাবে। অর আর দুঃখ থাকবে না। ইশকুলের মাস্টাররাও অকে ভালোবাসে। বাসবে না ক্যানে? পড়াশুনায় ভালো যে। মা বুলে বুলছি না, পাড়ার সবাই বুলে কামলার বেরেণ ভালো। বড় হবে, শহরে চাকরি করবে। আমি কুনুদিন শহর দেখিনি। আমাকে কামলার বাপ বুলেছে গাড়্‌হিতে চাপিয়ে শহরে লিয়ে যাবে, ছিনিমা দেখাবে। গাঁয়ের ভিডিও হলে যাতে চাহালে লিয়ে যায় না। বলে যে, মেয়েছেলেরা বেশি যায় না উখানে। সেদিন ভিডিও হলের লোক মাইকে বুলছিলো, ‘নাচে গানে ভরপুর, ফাইটিং-এ জমজমাট রোঙ্‌গিন বাংলা ছবি ‘অন্যায় অত্যাচার’’। এই ছিনিমাডা শহরের হলে কবে ফেলবে সেদিন দেখতে যাবো। কামলাকেও সঙ্গে লিয়ে যাবো। তার আগে অকে প্যান-জামা কিনে দিতে হবে। আমি কুন শাড়িডা পর্‌হে যাবো? যে কুনু একটা শাড়ি সিলাই করে পর্‌হে গেলেই হবে। ওই দেখো, ছিনিমা দেখার কথা ভাবতে শুরু করনু। বুলছুনু কামলার বাপের কথা। তো মানুষডা খ্যায়ে দায়ে নিশিকে আর খ্যাপাকে লিয়ে ব্যস্ত হয়। অধের চুল ছাঁটা, খুরে নুংরা ঢুকেছে কিনা দেখা, গা পরিষ্কার করা, সব করে। আর অধের সাতে কথা বুলে। কত কথা। মাঝে মাঝে আমিও শুনতে পাই। নিশির গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে বলে মানুষডা,

: ঘুড়ার গাড়্‌হি উঠে গেলে তোকে কী খাওয়াবো?

এখুন আমাধের গেরামে লাল মাটির রাস্তা হয়েছে। কিছুদূর গেলেই নাকি পাকা রাস্তা শহর পর্যন্ত চলে গেলছে। কুনুদিন দেখিনি পাকা রাস্তা। আমার উদিকে যাবার দরকার হয় না। গেরামের মাঠের দিকে, নদীর দিকে গেলেই আমার চলে যায়। বাড়িতে একটা পায়খানা ঘর করে ফেলতে পারলে উ কাজের লেগে আর মাঠে যাওয়ার দরকার হবে না। কিন্তু টাকা কুথায়? অনেক খরচ। অসব বড়লোকদের বাড়িতে থাকে। এত টুকুন উঠ্যান। পায়খানা ঘর করার জমিও নাই। যা হবে হবে। কামলা বড় হলে দেখা যাবে। খুদাতালার যা ইচ্ছা তা করবে। খুদাতালা সব বুঝে। না হলে কী আমার তিন বাচ্চা মরে যায়? কামলার বড় ভাইটা জন্মেই মরে গেলো। কাঁদেনি পর্যন্ত। এত টুকুন, একবারে হাতের তালুর সুমান। দেখে মুনে হল অর ভিতরে কুনো শক্তিই ছিলো না। জন্ম দেওয়া তো না, সুময়ের আগেই তো হয়ে গেল। তখন শুধু কান্দছি। কামলার পরের দুই মেয়েও গেলো মরে। তাই বুলছি খুদাতালার বিচার আছে। না হলে একখান ঘুড়ার গাড়্‌হির উপর ভর করে এতগুলা মুখ চলতো কী করে? যদিও খুব মুন খারাপ হত। মার কাছে গিয়ে ছিনু কিছুদিন। মার বাড়ি কতদিন যাই না। সে গেরামও এই গেরামের পাশেই। তাও যাই না। মা-বাপ মরে যাবার পর ভায়েধের কাছে আর যাতে মুন সরে না। বাপের জমিজমা তো তেমুন ছিলো না। কিন্তুক একখান ঘটি বাটি, এমুনকি গাছের লাউডা, কলাডা পর্যন্ত দেয়নি আমাকে। বছরকার পরবে একখান শাড়ি, লুঙ্গি কী কামলার লেগে একখান জামা পর্যন্ত দেয় না কুনুদিন। বাপের গেরামের কাঁচা রাস্তা এখুনো। আমাধের রাস্তায় এখুন ইঞ্জিন লাগানো ভ্যান চলে। ঘুড়ার গাড়্‌হি বেশি জনের আর নাই। নিশির কাছে কামলার বাপ তার লেগেই বোধহয় আক্ষেপ করে। আমি আর কী করতে পারি। মাঠ ঘাঠ থেকে শাগপাতা তুলে আনে রান্ধি। কাহুরির জমিতে সবজি লাগালে চেহেচিন্তে কিছু কিছু পাওয়া যায়। কেহু বা দেয় না। আলু তুলার পর ভুঁয়ে ছোট ছোট আলু পড়ে থাকে। আমি আর কামলা অনেকগুলা আলু কুড়্‌হিয়ে আনি। এখন যেতে লজ্জা লাগে কামলার। ইশকুলে পড়্‌হে কিনা। যখন কুনু কাজ থাকে না শীতল পাটি বুনি। ছিঁড়া জামাকাপুড় দিয়ে ক্যাঁথা পাড়ে সুতে দিয়ে নকশা করি। এই শীতে বাপ-ব্যাটার জাড় ভাঙাবে এই ক্যাঁথা। মাঝে মাঝে লোকের ক্যাঁথা সিলাই করে চাল, ডাল, তেল পাওয়া যায়। সংসারের কাজে লাগে। পাটের সুময় চেহেচিন্তে পাট লিয়ে আসি। বর্ষায় গাড়্‌হি ভাড়া তেমুন থাকে না। তাই কামলার বাপ পাট ধুতে যায়। সেও কিছু কিছু পাট আনে। শুকিয়ে বিক্কিরি করি। সুময় পালে পাটের শিকে বানাই। মাটির হাড়িগুলা ঝুলিয়ে রাখা যায় শিকেতে। ভাত তরকারি শিকেয় ঝুলিয়ে রাখলে ছাগল কুকুরে মুখ দিতে পারে না। একটা ধাড়ি ছাগল আছে আমার। বাচ্চা হলে পালপোষ করে বিক্কিরি করি। পাঁচ ছটা মুরগি হয়েছে। সেগুলার যত্ন করি। মুরগির ডিম বেচে পয়সা পালে মাটির হাড়ির মধ্যে রাখে শিকেতে ঝুলিয়ে রাখি হাড়িডা। কামলা পা উঁচু করে হাড়িগুলা হাতে পাএ গেলে মাঝে মাঝে চুরি করে। আমি ধরে ফেলি অবশ্য। আমার গুণতি থাকে। গুণতিতে কম হলেই বুঝি উ লিয়েছে। বকতে গেলেই বলে,

: ভদ্রভাবে কথা বলতে পারো না?

ইশকুলে পড়্‌হে ভদ্দর হয়েছে, ভদ্দর লোকের কথা বুলতে শিখেছে। আমি একচিন ব’কে চুপ করে যাই। ওই একখান ছেলেই তো ভরসা। অরও ঘুড্ডি, লাটাই কিনতে পয়সা লাগে। ডাংগুলি অবশ্য নিজেরাই গড়্‌হিয়ে লেয় গাছের ডাল কেটে কেটে। বিড়ি খাওয়া ধরেছে কিনা কে জানে!


মহসিন অনেকক্ষণ ধরে বসে আছে গ্রামের নির্দিষ্ট জায়গায়। এখান থেকে লোকে গাড়িতে উঠে শহরে যাবে, আত্মীয়র বাড়ি যাবে। পাশেই সার দিয়ে দাঁড়িয়ে ইঞ্জিন লাগানো ভ্যান। লোককে তাড়াতাড়ি শহরে পৌঁছে দেয়। ভাড়াও লাগে কম। আর কেরোসিনে চলে। সব মিলিয়ে খরচ কম। মহসিন অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছে প্যাসেঞ্জার পাওয়ার আশায়। সে দেখছে দুজন বাবু ইঞ্জিন লাগানো ভ্যানে করে শহর থেকে এসে নামলো। ওদের ঝকঝকে চেহারা আর পোশাক দেখলেই বোঝা যায় বাইরের লোক। এখানকার বড়লোকরাও এত ঝকঝকে নয়। ওদের কাঁধে ছোট বড় কয়েকটা ব্যাগ। হাঁ করে দেখে মহসিন। লোকগুলো নেমেই এদিক ওদিক তাকাতে থাকে। মহসিনের গাড়ি দেখতে পেয়ে তাদের মুখে এক উজ্জ্বলতা ফুটে ওঠে। যেন যা খুঁজছিলো পেয়ে গেছে এবার। মহসিনের দিকে এগিয়ে আসে তারা। একজন বলে,

: যাবে?

আমি ঠিক বুঝতে পারি না। আমাকেই বুলছে তো? আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। লোকটা আবার বলে,

: যাবে?

এবার আমি বুঝতে পারি আমাকেই বলছে। দড়েদড়ে বলি,

: হ্যাঁ বাবু, যাবো।

সত্যি অবাক লাগছে। এত ঝকঝকে মানুষজন আমার গাড়্‌হিতে চড়ভে? আর উরা তো শহর থেকে আলো, আবার শহরে যাবে নাকি! শুধাই,

: কুথায় যাবেন বাবু?

: শিবডাঙা। যাবে তো?

: শিবডাঙা? সি তো অনেক দূর।

: টাকা নিয়ে চিন্তা কোরো না। তোমার যা প্রাপ্য ঠিক দেবো।

আমি দুনামুনা করি। তারপর দাম হাঁকি।

: দু’শ টাকা লাগবে বাবু।

: ঠিক আছে। চল।

ভাবি, আর একটু বাড়্‌হিয়ে বুললেই ভালো হত। তিনশ কী চারশ। না, থাক। যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। অত লোভ ভালো না। এমনিই যা বুলেছি তাথেই রাজি হয়ে গেলছে। এখানকার মানুষ হলে এত টাকা চাহাতাম না। হা খুদা, পাপ করনু নাতো? মাফ কর খুদা। তুমি তো সবই জানো আমার অবস্থা। এই কডা টাকার লেগে পাপী সামঝিও না আমাকে। কামলার প্যান্টুল দুটে দেখেছো? বাড়িতে পর্‌হার প্যান্টুল দুটে? পাছার দিকে দু’খেন ফুঁটে। ফেঁসে গেলছে। দেখলেও আমার অশান্তি হয়। ভালুই যে ইশকুল থেকে ডেরেস দেয় অকে। না হলে কী পর্‌হে ইশকুলে যাতক কে জানে। আমার বিবিজানের কাপুড় দেখেছো খুদা? মাথায় দিবে না গতর ঢাকবে ওই সাত ছিঁড়া কাপুড়ে? তুমার ইসব না দেখাই ভালো। তাই বুলছি টাকা কডার লেগে গুস্তাকি মাফ কর।

দুই বাবু ব্যাগপত্র নিয়ে গাড়িতে চড়ে বসে। একজন আর একজনকে বলে,

: বুঝলে বিমল, ঘোড়ার গাড়ির মজাই আলাদা। সময় একটু বেশি লাগবে। কিন্তু মোস্ট রোম্যান্টিক।

উরা গল্প করে। আমি নিশিকে বুলি, আস্তে আস্তে চল। তকে তো রোজ রোজ পেট ভরে খাতে দিতে পারি না। তাই অত তড়বড় করিস ন্যা। বাবুগুলা কার বাড়ি যাবে কে জানে। কথা শুনে মুনে হচ্ছে কুনো কাজে আসেছে। হাতে ক্যামেরা। আমাধের গঞ্জের সালাউদ্দিনের ইস্‌টুডিওতে দেখেছি ওরকম যন্তর। আমি অবশ্য কুনুদিন ছবি তুলিনি। ইচ্ছা যে হয়নি তা না। অনেক খরচ। কিন্তুক কামলা বুলেছে যেদিন আমরা বিবিজানকে লিয়ে ছিনিমা দেখতে যাবো সেদিন ফটোক তুলবো। ফটোক তুলে বান্ধিয়ে আনে ঘরের মধ্যে পাটকাটির দেয়ালে টাঙিয়ে থুবে বুলেছে। কী শক ছেলের! একটাকা ইনকাম নাই আর...

বাবুগুলা ছবি তুলছে। গাড়্‌হি থামিয়ে আমার আর নিশিরও ছবি তুললো একবার। এবারে আমি সাহস করে শুধালাম,

: আপনারা কী কাজে আসেছেন?

যা শুননু তাথে আমার হাসি পালো। আমাধের চাষিরা ধান কাটার সুময়, ধান বুনার সুময়, জমিতে ঘাস নিড়াতে নিড়াতে যে সব গান করে তাই লিখে নিতে আসেছে। চাষিধের ছবিও তুলবে। উ গান আবার লিখার কী আছে? আমিও জানি। যখুন তখুন গাহাতে পারি। তার লেগে আবা শিবডাঙা যাতে হবে ক্যানে? গাড়্‌হির কাজ না থাকলে আমিও ধান বুনতে যাই, ধান কাটতে যাই। তখুন আমিও গান করি। কিন্তুক আমাকে গাহাতে না বুললে আমি গাহাবো ক্যানে? তবেএএ..., অরা শিবডাঙা যাছে তো আমারই লাভ। খ্যাপার খুর কিনতে হবে। আর একচিন বড় হলে উও গাড়্‌হি টানবে। তা নালে আবার কুনদিক দিয়ে টাকা খরচ হয়ে যায়। বোডাকে বুলেছি ছিনিমা দেখাতে লিয়ে যাবো শহরে। কী করে লিয়ে যাবো? একজুড়া জুতে আর একখান শাড়ি কিনতে হবে। সেই বিহের সুময় একজুড়া সস্তার চামড়ার জুতে কিনা হয়েছিলো। সে তো কবেই ছিঁড়ে গেলছে। তারপর যে ক’খান হাওয়াই চপ্পল কিনা হয়েছে সে তো শীতকালের লেগে। গরমকালে আমাধের বিটিলোকরা খালি পায়েই তো থাকে দেখি। জাড় পড়লে চালের বাতায় গুঁজা চটি নামিয়ে পরে। অত জাড়ে কী আর খালি পায়ে হাঁটা যায়। বিটিলোকধের নরম পা। সহজেই জাড় লাগে। কামলার তো সবসময় জুতে চায়। পড়্‌হাশুনা করছে। চাষাধের মুতন থাকলে কী চলবে? এই বাবুধের জুতে গুলান কী চকচকে। পা ঢাকা জুতে। আমার চটির অবস্থাও ভালো না। কিন্তুক শীতকালটা কুনুরকমে চলে গেলে বাঁচি। এখুন গাড়্‌হি লিয়ে সারাদিন বসে থেকেও লোক মিলে না। কেহু আর ঘুড়ার গাড়্‌হিতে চড়তে চায় না। লোকে চড়ভেই বা ক্যানে? আমি কম ভাড়া লিতে পারি ন্যা। ইঞ্জিন ভ্যানের মুতন ভাড়া লিলে আমার চলবে ক্যানে? নিশিকে আর খ্যাপাকে খাওয়াতেই আমার ইনকাম শেষ হয়ে যায়। মাঝে মাঝে খালি গাড়্‌হি লিয়ে আমি শহরে চলে যাই লোক পাওয়ার আশায়। অনেক ঘুরাঘুরি করে দু’চারজন লোক পাই। বাড়ি ফিরার সুময় বাজার করে আনি মাঝে মাঝে। মাঝে মাঝে ভাবি গাড়্‌হিডা বিক্রি করে দিবো। কিন্তু মায়া হয়। নিশিকে আর খ্যাপাকেই বা ছাড়বো ক্যামুন করে? গাড়্‌হিডা না বেচলে লছিমনও কিনা যাবে না। আর লছিমন কিনলেই তো হবে না। আমি তো চালাতেই জানি ন্যা। মহা ঝামেলা। জুয়ান ছেলেপিলেরা লছিমন চালায়। অরা আমার ইয়ার দোস্ত না যে শিকিয়ে দিবে। বুয়াসও হল আমার এক কুড়ি পুনেরো। উরাই বা আমার সাথে মিশবে ক্যানে। কী করবো মাঝে মাঝে ভাবে পাই না। দক্ষিণ খাটতে যাতে হবে নাকি? সে তো অনেক দূর। কল্যানী বা কলকাতা। আমাধের গেরামের অনেক মানুষ যায়। রাজমিস্তিরির কাজ করে, জুগাড়ের কাজ করে। ওইসব শহরে নাকি কত পাকা বাড়ি। রোজ নাকি বাড়ি তৈয়ার হয়। কত কত গেরামের লোকেরা নাকি কাজ করতে যায়। উখানে নাকি রাস্তাঘাটে শুধু মটর গাড়্‌হি আর মটর গাড়্‌হি। একটাও নাকি ঘুড়ার গাড়্‌হি নাই। আমার দোস্ত আনসারি কতদিন থেকে দক্ষিণ খাটতে যায়। সে তো এখুন পিরায় বাবু হয়ে গেলছে। শহরের হাওয়া লাগে গেলছে। আমাকে কতবার বুললো অর সাথে শহরে যাতে। আমি গেনু না। গেলেই বোধহয় ভালো হোতক। কিন্তুক বিবিজানের বারুণ। কিছুতেই চাহায় না আমি দক্ষিণ খাটতে যাই। আসলে ভয় পায়। গাঁয়ের অনেক লোক নিকা করেছে শহরে যায়ে। গেরামে পড়ে আছে বিবি বাচ্চা। ওই, মাঝে মাঝে টাকা পাঠিয়ে খালাস। কেহু কেহু তো তাও পাঠায় না। উখানে নাকি অনেক মেয়েলোকও কাজ করতে যায়। কুন গেরাম থেকে আসে কে জানে। একসাথে কাজ করতে করতে...
আর সাচা কথা হল আমিও গেরাম ছাড়তে পারবো না। গেরামের মাটির গন্ধ না পালে, নদীতে গোসল করতে না পালে আর বিবিজানের হাতের রান্ধা না খালে আমার চলবেই না। কিন্তুক গেরামে থেকে যে কী করে সংসার চালাবো। আসছে বর্ষার আগে ঘরের চাল লতুন করে ছাহাতে হবে। ছেলেডার শরীল খারাপ হয়ে যাছে। বোডার শরীল শুকিয়ে যাছে। রোজ রোজ শাগভাত খ্যায়ে কী শরীল ভালো হয়? তবে কী ছেলেডার ইশকুলে মাঝে মাঝে খিচড়ি খাতে দেয়। হপ্তায় একদিন কী দু’দিন। সেদিন বাড়ি থেকে কেটলি লিয়ে যায়। যদি সবাইকে দিবার পর থাকে তখন কেটলিতে করে বাড়ি লিয়ে আসে। আমরাও খাই। খাতে দোষ কী? অনেক ছেলেপিলেই বাড়ি লিয়ে আসে। কামলা যখন কেটলিতে খিচড়ি লিয়ে বাড়ি ঢুকে দেখলে হাসি পায়, মনে হয় যেনো লিজে ইনকাম করে আমাধের লেগে খাবার কিনে আনেছে। আমি পস্ট বুঝতে পারি আমার পাশে শুয়ে শুয়ে ছেলেডা নিশি আর খ্যাপাকে লিয়ে স্বপ্ন দ্যাখে। আমিও তখুন অর সাথে স্বপ্ন দেখি। আমার নিশি আর খ্যাপা অনেক রঙের মোধ দিয়ে উড়ে যাছে। আমি অর মা আর উ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি। আর আমাধের চারপাশ দিয়ে তখুন মেঘগুলা উড়ে যায়। লাল আসমানের মোধ্‌খানে আমরা দাঁড়িয়ে থাকি।

মহসিন গাড়ি নিয়ে পাকা রাস্তায় উঠে আসে। একজনও প্যাসেঞ্জার নেই। শহরে গেলে সন্ধ্যের মুখে মুখে লছিমন বা ইঞ্জিন ভ্যানগুলো গ্রামে ফিরে এলে দু’একজন প্যাসেঞ্জার মিলতেও পারে। সেই আশায় পাকা রাস্তা ধরে শহরে যাচ্ছে মহসিন। তার হাতে একটা সরু লাঠি। লাঠির প্রান্তে সরু পাকানো দড়ি লাগানো। দড়িটা মাঝে মাঝে নিশির পিঠে এসে পড়ে। মহসিন অবশ্য জোরে মারে না। আলতো করে ছুঁইয়ে দেয় পিঠে। নিশিকে কী করে মারবে ও? নিশিও তো তার মতো সারাদিন খেটে তবে চারটে খেতে পায়। ওকে কী কখনো মারা যায়? মহসিন নিশিকে আরো জোরে ছোটার প্ররোচনা দেয়। হাতের লাঠির দড়িহীন প্রান্ত ছুটন্ত চাকায় আলতো করে স্পর্শ করে। এক ধরণের শব্দ উৎপন্ন হয়। তাতে উৎসাহিত হয়ে নিশি আরো জোরে দৌড়তে থাকে। খ্যাপা নিশির পাশে পাশে দৌড়ায়। মাঝে মাঝে পিছিয়ে পড়ে। আবার সঙ্গ ধরে দৌড়তে থাকে গাড়ির সমান্তরালে। উল্টোদিক থেকে গাড়ি এলে ঠিক সরে পিছনে চলে যাবে। মহসিন তখন রাস্তার বাঁদিক ঘেঁষে গাড়ি চালাবে। রাস্তা ফাঁকা হলে আবার খ্যাপা আগের অবস্থানে ফিরে যাবে। এভাবেই খ্যাপা শিখে নিচ্ছে গাড়ি টানার রকম সকম। তবে রোজ রোজ যে খ্যাপাকে নিয়ে আসে মহসিন তা নয়। খ্যাপা যেদিন থাকে নিশি আনন্দে গাড়ি টানে। ঠিক বুঝতে পারে মহসিন। সেও যেন খানিক খুশি হয়। মনে মনে ভাবে বউ ছেলেকে শহরে নিয়ে এসে সিনেমা দেখাবে। মহসিন আবার শব্দ তোলে চাকায়।

আজ বউডার শাড়ি জুতে আর ছেলের জামা প্যান্টুল কিনতে হবে। কী জানি এখুন বউডা কী করছে। হয়তো ক্যাঁথা লিয়ে বসেছে। সিলাই করে নকশা গড়ছে। আমার এখুনো হাসি পাছে সেই শহরের বাবুধের গান লিখার কথা মুনে পড়লে। আর রাগও হচে খুব। আমার ঘুড়াকে মহিনের ঘুড়া বুলবে ক্যানে? বুললেই হল মহিনের ঘুড়া? এ ঘুড়া যখুন ছোট ছিলো তখুন থেকে আমার। আমি নগদ দাম দিয়ে কিনেছি। আর বলে কিনা ঘাসের লোভে নাকি ঘুড়াগুলাকে জোছ্‌না রাতে ছেড়ে দিয়ে আসি। বাজে কথা। আমি কেন রাতে ঘুড়া ছাড়তে যাবো? আর আমার ঘুড়ার অত ঘাসের লোভ নাই। আমার ছেলে রোজ অধের লেগে ঘাস ক্যাটে আনে লোকের ভুঁই থেকে। মুথা, হ্যাটকা, শ্যামা কত রকম ঘাস। বিদেশী লোক বলে কিছু বুলিনি। খুব রাগ হয়েচিলো আমার। কাল কামলা আর অর মাকে শহরে আনবো। শহরের জামান টকিজ হলে অন্যায় অত্যাচার বইডা ফেলেছে। দেখাবো অধেরকে। কতদিন ছিনিমা দেখিনি। কতদিন আগে শত্রু বইডা দেখেছিনু। টিকিটের কত দাম কে জানে।


দু’পাশ দিয়ে গাছপালা ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে। নিশি ছুটছে। খ্যাপা ছুটছে তার পাশে পাশে। মহসিন মুখে শব্দ করছে, হুর-র-র-র। চাকায় লাঠি স্পর্শ করে শব্দ তুলছে কখনো। মাঝে মাঝে ফিসফিস করে চলেছে,

: তুরাই আমার সব। তুরা না থাকলে আমি...

নিশি এবং খ্যাপা এত জোরে ছুটছে টগবগ টগবগ শব্দ তুলে যেন একটু পরেই ওদের ফিনফিনে পাখনা মেলে মহসিনকে সহ গাড়িটা নিয়ে মেঘের মধ্যে উড়ে যাবে। আর ঠিক তক্ষুণি শরীরটা খারাপ হয়েছে বলে দুপুরবেলা দাওয়ায় ছেঁড়া আঁচল পেতে ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে মর্জিনা দেখলো, মহসিন নিশির লাগাম ধরে গাড়িতে বসে। তার পাশে সুন্দর এক আনকোরা শাড়ি পরে বসে আছে সে আর অনেকদিন পর লজ্জা পাচ্ছে। লজ্জায় ঘোমটা টানছে নিবিড় করে। পিছনে কামাল বসে আছে নতুন জামা প্যান্ট পরে। তার হাতে এক রঙিন ঘুড়ি, ছোট্ট সুতোর প্রান্তে পতপত করছে। নিশি কত রঙ পার হয়ে গাড়িটা উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পাশে পাশে উড়ছে খ্যাপা। ওরা তিনজনে হাসছে। নিশি আর খ্যাপাও উড়তে উড়তে ওদের হাসিতে সাড়া দিচ্ছে,
: চিঁহি!



প্রকাশিত: ভাষাবন্ধন, তৃতীয় বর্ষ, সপ্তম সংখ্যা, জুলাই, ২০০৫




1 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: মহিনের ঘোড়া

কামাল, মর্জিনা, মহসিন বা নিশি, খ্যাপার গল্প ক্রমেই মহসিন-নিশির খোয়াবনামা হয়ে আসে যেন।

অনবদ্য 💔
Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: মহিনের ঘোড়া

কামাল, মর্জিনা, মহসিন বা নিশি, খ্যাপার গল্প ক্রমেই মহসিন-নিশির খোয়াবনামা হয়ে আসে যেন।

অনবদ্য 💔


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন