Anamitra Roy RSS feed

Anamitra Royএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • শেষ ঘোড়্সওয়ার
    সঙ্গীতা বেশ টুকটাক, ছোটখাটো বেড়াতে যেতে ভালোবাসে। এই কলকাতার মধ্যেই এক-আধবেলার বেড়ানো। আমার আবার এদিকে এইরকমের বেড়ানোয় প্রচণ্ড অনীহা; আধখানাই তো ছুটির বিকেল--আলসেমো না করে,না ঘুমিয়ে, বেড়িয়ে নষ্ট করতে ইচ্ছে করে না। তো প্রায়ই এই টাগ অফ ওয়ারে আমি জিতে যাই, ...
  • পায়ের তলায় সর্ষে_ মেটিয়াবুরুজ
    দিল ক্যা করে যব কিসিসে কিসিকো প্যার হো গ্যয়া - হয়ত এই রকমই কিছু মনে হয়েছিল ওয়াজিদ আলি শাহের। মা জানাব-ই-আলিয়া ( বা মালিকা কিশওয়ার ) এর জাহাজ ভেসে গেল গঙ্গার বুকে। লক্ষ্য দূর লন্ডন, সেখানে রানী ভিক্টোরিয়ার কাছে সরাসরি এক রাজ্যচ্যুত সন্তানের মায়ের আবেদন ...
  • ফুটবল, মেসি ও আমিঃ একটি ব্যক্তিগত কথোপকথন (পর্ব ৩)
    ফুটবল শিখতে চাওয়া সেই প্রথম নয় কিন্তু। পাড়ার মোড়ে ছিল সঞ্জুমামার দোকান, ম্যাগাজিন আর খবরের কাগজের। ক্লাস থ্রি কি ফোর থেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়তাম হি-ম্যান আর চাচা চৌধুরীর কমিকস আর পুজোর সময় শীর্ষেন্দু-মতি নন্দীর শারদীয় উপন্যাস। সেখানেই একদিন দেখলাম ...
  • ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি
    অনেক সকালে ঘুম থেকে আমাকে তুলে দিল আমার ভাইঝি শ্রী। কাকা দেখো “ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি”। একটু অবাক হই। জানিস তুই, কাকে বলে ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি? ক্লাস এইটে পড়া শ্রী তার নাকের ডগায় চশমা এনে বলে “যে বৃষ্টিতে ইলিশ মাছের গন্ধ বুঝলে? যাও বাজারে যাও। আজ ইলিশ মাছ আনবে ...
  • দুখী মানুষ, খড়ের মানুষ
    দুটো গল্প। একটা আজকেই ব্যাংকে পাওয়া, আর একটা বইয়ে। একদম উল্টো গল্প, দিন আর রাতের মতো উলটো। তবু শেষে মিলেমিশে কি করে যেন একটাই গল্প।ব্যাংকের কেজো আবহাওয়া চুরমার করে দিয়ে চিৎকার করছিল নীচের ছবির লোকটা। কখনো দাঁত দিয়ে নিজের হাত কামড়ে ধরছিল, নাহলে মেঝেয় ঢাঁই ...
  • পুরীযাত্রা
    কাল রথের মেলা। তাই নিয়ে আনন্দ করার বয়স পেরিয়ে গেছে এটা মনে করাবার দরকার নেই। তবু লিখছি কারণ আজকের সংবাদপত্রের একটি খবর।আমি তাজ্জব কাগজে উকিলবাবুদের কান্ডকারখানা পড়ে। আলিপুর জাজেস কোর্ট ও পুলিশ কোর্টে প্রায় কোন উকিলবাবু নেই, দু চারজন জুনিয়র ছাড়া। কি ...
  • আমার বন্ধু কালায়ন চাকমা
    প্রথম যৌবন বেলায় রাঙামাটির নান্যাচরের মাওরুম গ্রামে গিয়েছি সমীরণ চাকমার বিয়েতে। সমীরণ দা পরে শান্তিচুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ’র সঙ্গে যুক্ত হন। সেই গ্রুপ ছেড়েছেন, সে-ও অনেকদিন আগের কথা। এরআগেও বহুবার চাকমাদের বিয়ের নিমন্ত্রণে গিয়েছি। কিন্তু ১৯৯৩ সালের শেষের ...
  • শুভ জন্মদিন শহীদ আজাদ
    আজকে এক বাঙ্গালি বীরের জন্মদিন। আজকে শহীদ আজাদের জন্মদিন। মাগফার আহমেদ চৌধুরী আজাদ। মুক্তিযুদ্ধে ঢাকার কিংবদন্তীর ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য, রুমির সহযোদ্ধা এবং অবশ্যই অবশ্যই মোসাম্মাৎ সাফিয়া বেগমের সন্তান। শহীদ আজাদ হচ্ছেন এমন একজন মানুষ যার কথা বলতে গেলে ...
  • রামায়ণ, ইন্টারনেট ও টেনিদা (পর্ব ২)
    ঘুগনীটা শেষ করে শালপাতাটা আমার দিকে এগিয়ে টেনিদা বললে, "বলতো, রামায়ণ কাকে নিয়ে লেখা?"আমি অনেকক্ষণ ধরে দেখছিলাম শালপাতায় কোণায় এককুচি মাংস লেগে আছে। টেনিদা পাতাটা এগোতেই তাড়াতাড়ি করে কোণে লেগে থাকা মাংসের কুচিটা মুখে চালান করে দিয়ে বললুম, "কেন, রামচন্দ্রকে ...
  • এক উন্মাদ সময়ের স্মৃতিকথন
    দেশভাগ, বাটওয়ারা, পার্টিশান – উপমহাদেশের চুপচুপে রক্তভেজা এক অধ্যায় নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা, নির্মম কাটাছেঁড়া এই সবই ভারতে শুরু হয় মোটামুটি ১৯৪৭ এর পঞ্চাশ বছর পূর্তির সময়, অর্থাৎ ১৯৯৭ থেকে। তার আগে স্থাবর অস্থাবর সবকিছু ছেড়ে কোনওমতে প্রাণ নিয়ে পালানো মানুষজনও ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

সেটা কোনো কথা নয় - দ্বিতীয় পর্ব

Anamitra Roy

প্রথম পর্বের লিঙ্ক - http://www.guruchandali.com/blog/2018/02/26/1519595113328.html


- ছিল মানুষ হয়ে গেলো বমি! তাই তো? সুকুমার রায় পড়েছেন অনেক ছোটবেলায়, তাই না?
- স্যার আমি সত্যি বলছি, আমি সারারাত ওখানেই ছিলাম।
- কোথায়? ঘরের ভেতরে?
- না, বাইরে।
- আপনি লোকটাকে ঘরে ঢুকতে দেখেছিলেন?
- দেখেছিলাম। স্যার দুটো লোক ছিল।
- বেশ। দ্বিতীয় লোকটি কে?
- সেটা কি করে জানবো স্যার? উনি তো নিজের নাম লিখে প্লাস ওয়ান করে দিয়ে ঢুকে গেলেন!
- হুম! এবং আর বেরোলেন না?
- না। তারপর সকালবেলা...
- সকালবেলা... আচ্ছা, উল্টোদিক দিয়ে বেরোনো যায় না?
- না স্যার। পুলিশ তো এসে সব দেখেই গেছে। উল্টোদিকে তো দেওয়াল, আর একটা ছোট্ট জানলা।
- আর বমিটা পড়েছিল ঠিক এইখানটায়। খাট থেকে ফুটখানেক দূরে, অলমোস্ট একটা মানুষের শেপে, তাই তো?
- স্যার বলছিলাম কি...
- না! আপনি কিছুই বলছিলেন না।
- না মানে পুলিশ তো সবকিছু দেখেই গেছে...
- দেখুন ম্যানেজারবাবু, যে লোকটি মিসিং সে আমার বন্ধু ছিল। না মানে বন্ধু হয়তো নাও হতে পারে, তবে পরিচিত ছিল ভালোরকমই। এখন পুলিশ পুলিশের কাজ করবে। কিন্তু আমি তো টিকটিকি, আমারও কাজ টিকটিক করে যাওয়া। ওরা বোধহয় আপনাকে আমার সাথে কো-অপারেটও করতে বলে রেখেছে যদি ভুল না করি।
- আমি কিছু লোকাইনি স্যার। আমার হোটেলে খুনখারাপি কি আমি চাইবো? আপনিই বলুন।
- হুম। ঠিকাছে। আজ আসি তাহলে।

অভিমন্যু চ্যাটার্জীকে পুলিশে অনেকেই চেনে আজকাল। সাড়ে ছয় বছর আগে একটা প্রাইভেট গোয়েন্দা সংস্থায় খোচড় হিসাবে কাজ শুরু করেছিল সে। বছর দুয়েকের মধ্যেই তার অ্যানালিটিকাল মাইন্ড সংস্থার বড়োকর্তাদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়। তবে পদোন্নতির পর পুরনো এজেন্সিতে বছরখানেকের বেশি কাটায়নি অভিমন্যু। গোয়েন্দা সংস্থারা একে অপরের উপর গোয়েন্দাগিরি চালাবে না এমনটা তো আর হতে পারে না। অন্য এজেন্সি থেকে ভালো অফার পেয়ে গিয়েছিলো সে। জ্যোতিষে বিশ্বাস করে অভিমন্যু। তার হাতে অনেকগুলো আংটি। ঠিক সাতমাস আগে তার সাড়ে সাতি কেটেছে। আর এই সাতমাসে সে বারোটা হাই প্রোফাইল কেস সল্ভ করতে সক্ষম হয়েছে।প্রত্যেক ক্ষেত্রেই কাগজে নাম বেরিয়েছে তার। শুধু ফুলমামাই তাকে কোনোদিন পাত্তা দিলো না। সে যাই হোক, আজ সকালে একটা অদ্ভুত কেস আসে অভিমন্যুর কাছে। কেসটা দিনদশেকের পুরোনো। যদ্দুর বোঝা যাচ্ছে, দুই বন্ধু ঘুরতে গিয়েছিলো দিঘায়। এখন বন্ধুও হতে পারে আবার বিজনেস পার্টনারও। কিংবা হোমো পার্টনারও। সেসব বোঝার উপায় নেই তবে দুজনেই পুরুষ। রাত্রে হোটেলের ঘরে ঢোকে দুজন এবং পরদিন কেউই আর বেরোয় না। পাওয়া গেছে বলতে দুটো হুইস্কির বোতল। তাও ফাঁকা। এছাড়া খানিকটা বমি যেটা কিনা মেঝেতে পড়েছিল। বমির শেপটা কিছুটা মানুষের শেপের সাথে মেলে। মানে মাথা, বডি, পা, সবই আছে, শুধু হাতদুটো বোঝা যাচ্ছে না স্পষ্ট করে। পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার ফোন করেছিলেন অভিমান্যুকে। ঘটনাটা হোটেল রজনীর। সোজা পুলিশ সুপারের কাছেই প্রথম গিয়েছিলো অভিমন্যু হোটেলে যাওয়ার আগে। আলাপ পরিচয়ের পর চা খেতে খেতে কেসের ডিটেল সমস্ত বুঝিয়ে দিলেন তিনি। তারপর ঠিক যখন অভিমন্যু বেরোতে যাবে ওখান থেকে, জিজ্ঞেস করলেন, "খালি একটা জিনিসই বুঝলাম না মিস্টার চ্যাটার্জী। আপনার এরকম ফেলুদা-ব্যোমকেশ মার্কা প্রোফাইল, কিন্তু হাতে এতগুলো আংটি কেন"? মুচকি হেসে অভিমন্যু জানায়, "শনি, সুপারবাবু, শনি! শনি যে কি কেড়ে নিয়ে গেছে আমার থেকে তা শুধু আমিই জানি"!


সেদিন মৌসম বহুত বেঈমান। ভালো করে সন্ধ্যে হওয়ার আগেই মেঘের আবদারে আলো নিভে এলো। শনশনিয়ে জালিম শীতল হাওয়া এসে থেকে থেকে উড়িয়ে দিতে লাগলো রুচিরার ওড়নাখানি। আর সেই ওড়নার প্রান্তটি ব্যাটাচ্ছেলে ঢুকবি তো ঢোক ঢুকে গেলো নওলকিশোরের চোখ ও চশমার মাঝখানে। নওলকিশোর তাতে বললো, "আ:! সরাও না"! রুচিরা কাতর গলায় আপত্তি জানালো, " ছি:! মাঝরাস্তায় কেউ অমন করে সরাতে বলে বুঝি?"
--- ঠিক ধরেছেন। এই সেই দুরন্ত সেক্সের উপাখ্যান যার বিষয়ে আপনাকে আগেই অবহিত করা হয়েছিল। এক্ষুনি এখানে চূড়ান্ত সেক্স শুরু হয়ে যাবে নওলকিশোর আর রুচিরার মধ্যে। তাতে আপনার অবশ্য বিশেষ লাভ নেই। আপনি দেখতে কিছুই পাবেন না। কিন্তু তাই বলে যাবেন না। কারণ প্রচুর সেক্স হবে এক্ষুনি।অথবা হতে হতেও হবে না।কিন্তু আপনি খুঁটি গেড়ে বসে থাকুন। কারণ এর চেয়ে বেশি পাঠক টানার কারসাজি আমার জানা নেই।

তো, ইফ জালিম হাওয়া ইজ দেয়ার, কাতিল বরষা কি ফার বিহাইন্ড হইতে পারে? রুচিরার নিচের ঠোঁটে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে চিকচিক করতে থাকে। রুচিরা সেটাকে ওপরের ঠোঁট দিয়ে চেটে নেয়। ঢোঁক গেলাটা দেখতে পায় নওলকিশোর, গলার মাঝখানের অংশটার ওঠানামা। ঠিক তখনই গলার ওপর দিয়েও একটা জলের ফোঁটা বেয়ে নেমে যাচ্ছিলো রুচিরার জামার ভিতর। ওড়নাটা ভিজে গেছে। আর উড়ছে না। লেপ্টে আছে বুকে। নওলকিশোরের বাড়ি কাছেই। সে বলে, "তুমি বরং দুটো মিনিট বসে যাও"।

রুচিরা খুব ঘন ঘন ঢোঁক গিলছে আজকে। খুব ঘন ঘন ঠোঁটও চাটছে। তার চোখদুটো খুব চঞ্চল হয়ে আছে। অবশ্য অন্যদিনও এরকমটাই হয় কিনা নওলকিশোর বলতে পারবে না। এমনিতে মেয়েটা দেখতে ভালোই। তারা প্রেমও করছে দুবছর হয়ে গেলো প্রায়। কিন্তু নওলকিশোর এই ব্যাপারগুলো ঠিক খেয়াল করে দেখেনি।কিছুটা ইচ্ছে করেই। দেখলেই লোভ হবে। আর লোভে পাপ। পাপে মৃত্যু তো সত্যযুগে হতো, আজকাল জিন্দেগী ঝন্ড হয়ে যায়। ওইসব ফাঁদে পা দেওয়ার মাল নওলকিশোর নয়। তবে আজ একটু বেশিই যেন চোখে পড়ছে এসব। এইমাত্র রুচিরা আবার যে ঢোঁকটা গিললো, ওই যে গলার মাঝখানের উঁচু জায়গাটা উঠলো আর নামলো, যেন পুরো মাধুরী দীক্ষিত। আড়চোখে তাকিয়ে হাসলো রুচিরা। হয়তো অন্যদিনও এরকমই হয়, রুচিরা ঢোঁক গেলে, তাকায়, হাসে, ঠোঁট চাটে, আরও কি কি করে কে জানে; সেসব নওলকিশোরের চোখে পরে না। কিন্তু আজ পুরো বিপাশা বসু আবহাওয়া। ফিকে বেগুনীর উপর সাদা ফুল ফুল ওড়না ভিজে লেপ্টে আছে রুচিরার বুকে। আর সবকথায় সে অন্যরকম মানে বার করার চেষ্টা করছে জেনেশুনে; যে মানেটা খুব দুষ্টু মতো, আবার খুব পাপীও বটে। বৃষ্টি বেশ ভালোই জোরে নেমে গেছে। অসময়ের বৃষ্টি। তাদের কারোকাছেই ছাতা নেই। নিষিদ্ধ ওই মানের হাতছানিতে পা পিছলে পরে যাওয়া ঠিক হবে কিনা ভাবতে থাকে নওলকিশোর। রাস্তা থেকে উঠে আসছে সোঁদা প্রাইমাল গন্ধ। বাড়ি এসে পড়েছে প্রায়।

নওলকিশোরদের বাড়িটা অদ্ভুত। শোনা যায় একসময় সেটা গোটা একটা পাড়া ছিল। বাঁড়ুজ্যেপাড়া, যে পাড়ায় সবাই বাঁড়ুজ্জ্যে আর সবাই সবার আত্মীয়। সে প্রায় শ'দুয়েক বছর আগেকার কথা। ভাগ হতে হতে হতে এখন তার আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এতো ভাগাভাগির ফলে এই বাড়ির প্রায় প্রত্যেকটা অংশেরই চেহারা দাঁড়িয়েছে ভাগশেষের মতো। কোনও মানে নেই ! উদ্ভট আকার-আকৃতি সবকটার। নওলকিশোরদের
অংশটা যেমন; ছোট কাঠের মূল দরজা দিয়ে ঢুকে সামনের দিকে তিন পা আপনি যেতেও পারেন, আবার নাও যেতে পারেন। কারণ যাওয়ার কোনো মানে হয় না। সামনে একটা দেওয়াল! বাঁদিকে তো যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না কারণ শুরু থেকেই দেওয়াল সেদিকে। একমাত্র যেদিকে যাওয়ার একটা মানে দাঁড়ায় সেটা হলো ডানদিক। সেদিকে আপনি যত এগোবেন পথ ক্রমশ চওড়া হবে। তারপর পনেরো-কুড়ি পা পরে, এটা আপনার পায়ের মাপের ব্যাপার, উঠে গেছে সিঁড়ি। বাড়ির সবাই দোতলাতেই থাকেন। তবে সিঁড়ি দিয়ে না উঠে তার ডানদিকের একহাত চওড়া ফাঁকটায় আপনি যদি সেঁধিয়ে যেতে পারেন তাহলেই অন্য এক জগতের সন্ধান পাবেন। সেখানে আরও একটি দরজা আছে। তার ওপারে একটি ঘরও। নওলকিশোরের ঘর। সেই ঘরে না ঢুকে পড়া অবধি বাইরের কারুর বোঝার উপায় নেই যে ঘরের ভিতর কি চলছে। ঘরটির কোনোদিকে কোনো জানলা নেই। রাস্তার দিকে মাথার ওপর একটা ঘুলঘুলি রয়েছে বটে তবে সেটা বছর পাঁচেক হলো খবরের কাগজ ও ন্যাকড়া গুঁজে বন্ধ করে রাখা হয়েছে।

রুচিরা ভিজে সপসপে হয়ে গেছে। "ইস! তোমার ঠান্ডা লাগছে নিশ্চয়ই", নওলকিশোর বলে তাকে মূল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। "সে তো বাইরে", রুচিরা ছেনাল গলায় উত্তর দেয়। বৃষ্টি এখনও পড়ে চলেছে। নওলকিশোর দরজা খোলার জন্য লোহার হাতলে হাত রাখে। খুট করে আওয়াজ হয় একটা। "কে? নকুল এলি নাকি?" --- দোতলা থেকে আওয়াজ আসে। এমন বৃষ্টির দিনে পট করে মাথার ভিতর আগুন জ্বেলে দিতে মা ছাড়া আর কেই বা পারে ! "আজ বরং বৃষ্টিতে ভিজি", পিছন ফিরে রুচিরাকে বলে নওলকিশোর।



রংলিরা উদ্বাস্তু। চিরকালের উদ্বাস্তু। তাদের দেশের বাড়ি বলে কিছু নেই। তবে উদ্বাস্তু শব্দটা শুনলেই যে ধরণের ছবি মাথায় আসে তার সাথে এই ব্যাপারটার কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ এই ভিটেহীনতা মুক্তিযুদ্ধ বা দেশভাগের অনেক আগে থেকেই চলছে। এতটাই আগে থেকে যে এই কাহিনীর সমস্ত চরিত্রদের নামও কেউ মনে করে বলতে পারবে না আর।

যতদূর জানা যায়, ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে কোনো একটা সময় রংলির ঠাকুরদার ঠাকুরদা বাংলাদেশ থেকে ত্রিপুরা চলে আসেন। কেন তিনি এসেছিলেন সেটা বলে উঠতে পারার মতো কেউই আর জীবিত নেই আজ। তাঁর ছেলে, অর্থাৎ রংলির ঠাকুরদার বাবা চাকরিসূত্রে তেজপুরে বাসা বেঁধেছিলেন বলে শোনা যায়। ব্রিটিশ সরকারের চাকরি করতেন তিনি। এই তেজপুরের জ্ঞাতিদের সাথে রংলির ছোটবেলা অবধি তাদের পরিবারের একটা যোগাযোগ ছিল। যোগাযোগ বলতে তার আসতো দু-তিন বছরে একবার। শোকসংবাদ। নিরামিষ রান্না হতো কয়েকদিন। এটুকুই। রংলির ঠাকুর্দাই প্রথম পা রেখেছিলেন এপার বাংলায়। যুবক বয়সে কলকাতায় এসেছিলেন তিনি ট্রেনিং নেওয়ার জন্য। তিরিশের দশকের দ্বিতীয় ভাগ তখন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখনও শুরু হয়নি। কিসের ট্রেনিং বড়জ্যেঠু জানতো। তিনিও মারা গিয়েছেন তাও দশ বছরের বেশিই হবে। রংলির বাবারা ন'ভাইবোন। বাবার ছোটবেলায় মারা গিয়েছিলো ঠাকুরদা ধনুষ্টঙ্কার রোগে। বাবা ঠাকুরদার কথা বলতো না কখনও। জানতে চাইলে বলতো, "আমি পিছনদিকে তাকাতে শিখিনি। আমি শুধু সামনের দিকে তাকাতে শিখেছি।আমি চাই তুমিও তোমার ভবিষ্যতের ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী হবে।"

প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতো রংলির বাবা আর সিপিএমকে গালাগাল করতো খবরের কাগজ পড়ে। চাকরি চলে যেত মাঝে মাঝে, জুটেও যেত আবার। বাবা তন্দুরি রুটি আর মাটন কষা নিয়ে বাড়ি ঢুকতো প্রথম মাইনের দিন। এরকম অন্তত পাঁচটা দিনের কথা রংলি মনে করতে পারে। বেশ উৎসবের মতো লাগতো সেইসব দিনগুলো। খানিকটা রুটি মাংস থেকে যেত পরের দিন সকালেও। সেইটা খেয়ে ইস্কুলে যেত রংলি। ওরকম মাটন কষা বোধহয় আর কেউ বানাতে পারেনা। মা কালী সহায় হিন্দু হোটেল। ঠিকানা - হুগলী স্টেশন। বাক্সের গায়ে পড়ে জেনেছিলো রংলি। একটু বড় হবার পর সাইকেল চেপে গিয়ে একদিন দেখেও এসেছিলো হোটেলটা। তারপর বাবা একদিন মরে গেলো।

শেষ তিন বছর বাবার সাথে খুব একটা কথা হয়নি রংলির। তার ততদিনে নিজের একটা জগৎ তৈরী হয়ে গেছে। আর কয়েকমাস বাদে থার্ড ইয়ারের ফাইনাল। বাবার চাকরি ছিল না, রংলি জানতো। চাকরি পাচ্ছিলো না বাবা আর। বাবা ব্যবসার চেষ্টা করছিলো। কিন্তু বিশেষ কিছু করে উঠতে পারছিলো না। বাড়িতে আর ছিল বলতে মা আর এক পিসি। পিসি গান শেখাতো বাড়ি গিয়ে গিয়ে। পিসির গানের গলাটা ভালো। মা সংসার সামলাতো। বাবা নাকি খুব মদ খাচ্ছিলো ইদানীং। সন্ধে হলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত বাবা। ফেরার পর কারোর সাথে বিশেষ কথা বলতো না। শুয়ে পড়তো। কোনোদিন অল্প কিছু খেত, কোনোদিন খেত না। বাবা একদিন তাকে জানোয়ারের বাচ্চা বলেছিলো খেতে বসে। রংলি বুঝতে পারছিলো এমন কিছু একটা হচ্ছে যেটা সে আগে কোনোদিন দেখেনি। মারা যাওয়ার সময় বাবার বয়স হয়েছিল সাতচল্লিশ বছর।

রংলির বাবাকে পোড়ানো হয়েছিল কনকশালী ঘাটে। ত্রিবেণী যাওয়ার মতো পুন্য করেনি বাবা। সেদিন নাটা আর নকুলও ছিল রংলির সাথে। শুভঙ্করও। নাটা বলছিলো ঐসব ন্যাড়া-ট্যারা হওয়ার কোনো মানে হয় না। রংলির অবশ্যই প্রতিবাদ করা উচিত। নকুল নাটাকে থামতে বলছিলো। নাটা থামছিলো না। রংলি কি বলবে বুঝতে পারছিলো না। তার নাকে তখন একটা তীব্র ঘি-এর গন্ধ লেগে আছে, আর থেকে থেকে গা গুলিয়ে উঠছে। ঘি-এর গন্ধ যে এতো ভয়ানক হতে পারে রংলির জানা ছিলো না। সে আলুসেদ্ধ দিয়ে ঘিভাত খেতে ভালোবাসতো, আর কোনোদিন বোধহয় মুখে তুলতে পারবে না। রংলি বমি করে ফেলে। কে যেন একটা বলে ওঠে, "আসলে সারাদিন যা যাচ্ছে ছেলেটার ওপর দিয়ে..."। শুভঙ্কর কোথা থেকে এক বোতল জল নিয়ে আসে। সেটা এপ্রিল মাস। সামনের ডিসেম্বরে শুভঙ্করও মারা যাবে।


- নিশ্চিতভাবেই জটিল কেস। না হলে আপনারা আর আমাকে ডেকে পাঠাতেন কেন!
- জটিল বলে জটিল। এ তো আলফ্রেড হিচককের গল্প মশাই। বন্ধ ঘরের ভিতর থেকে দু'দুটো মানুষ হাওয়া? কোনো মানে আছে!
- মানে আছে, সুপারবাবু, মানে আছে! সেই মানেটাই আমাদের খুঁজে বার করতে হবে। বমিটা অ্যানালাইজ করে কিছু পাওয়া গেলো?
- বিশেষ কিছুই না ! মাছভাজা আর মদ। তাছাড়া বমির দু-তিনঘন্টা আগে রুটি-মাংস খেয়েছিলো যা বোঝা যাচ্ছে। তা এতে তো আর...
- মানে মদ খেয়ে বমি ! সে তো অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। রোজই কেউ না কেউ করছে। আচ্ছা, দ্বিতীয় ব্যক্তিটি সম্পর্কে আমরা এখনও অবধি ঠিক কি জানি? কেউ খোঁজ করতে এসেছিলো তার?

হোটেল রজনীতে আসলে বিশেষ কিছুই দেখার ছিল না। সেটা আর পাঁচটা সাধারণ সস্তা হোটেলের মতোই। তিনতলা একটা বাড়ি। রাস্তার দিক থেকে ঢুকলে সোজা ম্যানেজারের বসার জায়গা, মাথার উপর গণেশ, ডানদিকে টিভি, বাঁদিকে গোপালের আসন দেওয়ালে আটকানো। ম্যানেজারের বসার জায়গার আগে ডানহাতে দেওয়ালে ঠেসানো গদি আঁটা লো বেঞ্চ খানদুয়েক পাশাপাশি। তার ঠিক উল্টোদিকে করিডোর। করিডোর বরাবর এগোলে বাঁহাতে সিঁড়ি দোতলায় যাওয়ার। সিঁড়ি পেরিয়ে এগোলে ডানহাতে দরজা, ম্যানেজারের থাকার ঘর; তার ঠিক উল্টোদিকে বড় ঘর একটা বাকি স্টাফদের থাকার। স্টাফদের ঘর পেরোলে ডানদিকে স্টোররুম। বিছানা, বালিশ, কম্বল; সব এখানেই রাখা থাকে, মায় এক্সট্রা জলের জগ কিংবা অ্যাশট্রেও। আর একটু এগোলেই করিডোর শেষ হয় রান্নাঘরে। তবে তার আগে বাঁদিকে একটু ঢুকে গিয়ে একটা বাথরুম আর একটা পায়খানা রয়েছে। বাথরুমটা চলনসই। পায়খানাটা বেজায় ছোট।
- পায়খানার যা সাইজ করেছেন জীবনে কোনোদিন কোনো মোটা লোককে তো কাজে রাখতে পারবেন বলে মনে হয় না!
- অ্যাঁ?
- কিছু না। রান্নাঘরের ওপাশে কি আছে?
- চলুন।

রান্নাঘরটা বেশ বড়। তার মাঝামাঝি একটা কাঠের ডাইনিং টেবিল। স্টাফরা এখানে খাওয়াদাওয়া করে। মূল রান্নার জায়গাটা ডানদিকে। আর বাঁদিকে একটা ফ্রিজ; কোল্ডড্রিঙ্ক, বিয়ার, এসব রাখার, কোকাকোলা কোম্পানির লোগো দেওয়া। তার ঠিক পাশে বেশ বড়সড়ো একটা ফ্রীজারও রয়েছে। ফ্রিজারের ঢাকা সরিয়ে হাতড়ে হাতড়ে দেখতে থাকে অভিমন্যু। মাছ, মাংস, আইসক্রিম, সবজি, সব একসাথে রাখা রয়েছে। জিনিসপত্র সরাতে সরাতে হঠাৎ সোনালী কি একটা চকচকে জিনিসে চোখ পরে তার। ঝুঁকে ধরতে যেতেই জিনিসটা আরো তলায় ঢুকে যায়। অভিমন্যু মাটি থেকে শূন্যে পা তুলে কোমরের ভরে শরীরের গোটা উর্ধাংশটাই ফ্রিজারের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। তবু জিনিসটা হাতে আসে না তার। আরও খানিকটা ঝোঁকার চেষ্টা করে অভিমন্যু। ব্যাস ! সাথে সাথে আরেক কান্ড ঘটে যায়। গোটা বডিটাই ফ্রিজারের ভেতর ঢুকে যায় তার। উল্টোভাবে। বলা যায় মাথার ভরে একরাশ কাঁচা সবজি, মাংস, আইসক্রিম, দই, মাছ --- এসবের মধ্যে পড়ে যায় সে। কিন্তু অভিমন্যু স্মার্ট। ব্যাপারটা কাউকে বুঝতে দিতে চায় না। ভাবে হাঁটু মুড়ে পা ভাঁজ করে উল্টো দিকে একটা ফোর্স দিলেই হাতের ভরে বেরিয়ে আসা যাবে। কিন্তু মানুষ যা ভাবে খুব কম সময়ই সেটা ঘটে থাকে। পা টা ভাঁজ করতেই ফ্রিজারের দরজাটা নিজে থেকেই সরে এসে আটকে যায়। অভিমন্যু পা ছোঁড়ে। ধূপ ধুপ আওয়াজ হয়। কিন্তু দরজাটা খোলেও না, ভাঙেও না। ওদিকে বাইরে তখন হইচই শুরু হয়ে গেছে। অভিমন্যুর সাথে এক এএসআই এসেছিলো। সে বলে, "এটা কিরকম হলো ! ওনাকে তো বার করার একটা ব্যবস্থা করতে হয়, ম্যানেজারবাবু"। ম্যানেজার বলে, "দেখেছো কান্ড! এই ফ্রিজারের দরজাটা আবার নিজে থেকে লক হয়ে যায়। ওরে সুবল, শিগগির চাবিটা নিয়ে যায়। লোকটা তো ঠান্ডায় জমে যাবে রে"! এসব কিছুই অবশ্য অভিমন্যুর কান অবধি পৌঁছয় না। সে তখন ভাবছে সাইডের দিকে কায়দা করে নব্বই ডিগ্রি ঘুরতে পারলেই কেল্লা ফতে ! কিন্তু দিনটা বোধহয় তার ভালো ছিল না। ঘুরতে গিয়ে সে এবার কোনাকুনিভাবে আটকে গেলো। ফুলমামা কতবার বলেছে ব্যায়াম করতে রোজ। ওতে নাকি শরীর ফ্লেক্সিবল হয়। হায় ! ফুলমামার কথা কেন সে শোনেনি আগে ! এভাবে অপদস্থ হতে হতো না তাহলে আজ। সে ফ্রিজারের মধ্যে উল্টো হয়ে কোনাকুনিভাবে আটকা পড়ে ভাবতে থাকে যে বেরনোর পর বাকিদের সামনে ঠিক কিভাবে ব্যাখ্যা করবে ব্যাপারটা।


কন্ডোম কেনা অত্যন্ত ঝামেলার ব্যাপার।পাড়ার পরিচিত দোকান থেকে কন্ডোম কেনা যায় না। এটা অবশ্য আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কোনো সমস্যা নয়; বেশ কিছু বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু কথা হচ্ছে শূন্য দশকের প্রথমার্ধের, যখন যাবতীয় দ্রব্য সশরীরে দোকানে উপস্থিত হইয়া খরিদ করিতে হইতো। যে সে দোকানে কন্ডোম রাখে না, অন্তত সবধরণের লোকালয়ে। যেখানে নিশ্চিতভাবেই বস্তুটি মিলবে সে স্থান হলো ওষুধের দোকান। এই ওষুধের দোকান আবার এমন একটা জায়গা যেখানে মালিক থেকে কর্মচারী সবাই-ই সাধারণভাবে মহা খাজুরে মার্কা পাবলিক হয়। ফলত সবার বাড়ির লোককেই তারা চেনে। তুলনায় প্রথম সিগারেট কেনা অনেক সোজা। দোকানদার জিজ্ঞেস করলে যা হোক কিছু একটা বানিয়ে বলে দেওয়া যায়। কিন্তু কুড়ি বছর বয়সে কন্ডোম কিনতে গিয়ে বাবা পাঠালো তো আর বলা যায় না। আর না তো সেটা ভালো শোনায়। বাবার কাছে খবর পৌঁছনোটাই বরং আরও নিশ্চিত হয় তাতে। এতকিছু ভেবেচিন্তে নওলকিশোর লঞ্চে চেপে গঙ্গা পেরিয়ে গিয়ে উঠলো পাশের জেলায়। নৈহাটী। নওলকিশোর না চিনলেও সে জানে এখানে ধারেকাছেই কোথাও দেহব্যবসায়ীদের বাস। তাছাড়া এখানে তাকে কেউ চেনেও না। ফলে এখানে তাকে মনে হয় না কেউ কিছু জিজ্ঞেস করবে।

- কন্ডোম? কেন? কি করবে?
মারাত্মক রাগ হলো নওলকিশোরের। এই প্রশ্নটা এড়ানোর জন্য সে এতকিছু ভেবে প্ল্যান করে এতটা পথ এলো। আর এখানেও সালা ! মানুষের এতো কৌতূহল কেন !
- মুখে বেঁধে ফুঁ দিয়ে ফোলাব। তারপর পুলিশের কানের কাছে ফাটিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাবো। আপনার কি মশাই? কন্ডোম দিয়ে আপনি কি করেন? স্যাক রেস খেলেন না মাঙ্কিটুপি বানিয়ে মাথায় পড়েন? --- এরকমই কিছু একটা বলার ইচ্ছা হচ্ছিলো নওলকিশোরের। কিন্তু সে ভেবে দেখলো এতে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে। একে তো অচেনা পাড়া। তায় লোকটা কে সেটাও তো সে জানে না ! খেপে গেলে পুলিসে দিতে পারে। বা পাবলিকের ধোলাইও খাইয়ে দিতে পারে চেঁচামেচি করে। তাই সে বললো, " না, মানে কখনও দেখিনি তো" !
--- এর চেয়ে বাজে উত্তর বোধহয় আর কারুর পক্ষেই দেওয়া সম্ভব ছিল না। এই মূহুর্তে নওলকিশোর প্রমান করলো যে তার বন্ধুরা যতবার তাকে আতাক্যালানে বলেছে প্রত্যেকবারই তারাই ঠিক ছিল। সেই মূহুর্তে তারা উচ্চারণ করছিলো মহাবিশ্বের এক অমোঘ সত্য যা কিনা সার্বজনীন। অথবা আতাক্যালানে শব্দটিই যথেষ্ট নয় নওলকিশোরের বীরত্বের উপমা হওয়ার জন্য। সে আরো তুলতুলে। তার অন্ডকোষ যেন তুলো দিয়ে তৈরী। তাকে বরং কচিআতা বা এমন কোনো ফলের সাথে তুলনা করা চলে যা মাটিতে পড়ার কথা চিন্তা করা মাত্র ফেটে যায়। অদৃশ্য হয়ে যেতে ইচ্ছা করলো নওলকিশোরের, হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে। ইস ! কেন সে ম্যাজিক শেখেনি কোনওদিন !

"ভাইয়ের কি প্রথমবার নাকি"? পান চিবোনো দাঁত বার করে লোকটা জিজ্ঞেস করে। "না, মানে ওই আর কি !" কি বলবে বুঝতে পারে না নওলকিশোর। লোকটা বেশ রসিক মনে হচ্ছে। ইয়ার্কি মারছিলো বোধহয়। অন্তত খুব কঠোর বা জাঁদরেল টাইপের কেউ নয়। "নিয়ে যাও, নিয়ে যাও। তা কোন্ টা দেব?" --- এ আবার কি প্রশ্ন ! কন্ডোম তো কন্ডোমই। তার আবার কোন্ টা কি ! নওলকিশোর ঘেঁটে যায়। মনে রাখতে হবে যে সময়ের কথা হচ্ছে তখন টিভি কমার্শিয়ালের মধ্যে কন্ডোমের বিজ্ঞাপন চট করে দেখা যেত না। বা দেখা গেলেও নওলকিশোর কখনও দেখেনি। সে এমনিতেও টিভি দেখে না খুব একটা , বা তার এসব বিষয়ে বিশেষ ধারণাও নেই। থাকলে সে জানতো যে সরকারী কাউন্টারে কোথাও কোথাও শুধু হাত গলিয়ে দিলেই কন্ডোম পাওয়া যায়। আমরা এমন এক ব্যক্তির কথা বলছি যে কিনা জীবনে প্রথমবার সম্মতিপূর্বক তার দু'বছরের পুরোনো প্রেমিকার সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হবে বলে নিরোধের সন্ধানে বেরিয়েছে। তার কাছে এ এক অভিযান ! তাছাড়া তার বয়স মাত্র কুড়ি। পৃথিবীকে দেখার ও চেনার এ তার কাছে আরেক পর্যায়ও বটে। "দাদা থাকতে আমায় বলে দিতে হবে কোন্ টা ?" নওলকিশোর তার সেয়ানাত্বের শিখরে উঠে জবাব দেয়। দোকানদার একটা ছোট চৌকো মতো বাক্স খবরের কাগজে মুড়ে গার্ডার মেরে এগিয়ে দিয়ে বলে "কুড়ি টাকা"।

যাক বাবা! পাওয়া গেলো শেষ অবধি। চেনা লোকের কাছে ধরা না পরে, পাবলিকের মার্ না খেয়ে, হাজতে না গিয়ে এক প্যাকেট কন্ডোম কিনতে পারা গেছে। এ কি বিশ্বজয়ের চেয়ে কম? নওলকিশোরের নিজেকে আলেক্সান্ডার মনে হয় ! যত তাড়াতড়ি সম্ভব হেঁটে গিয়ে টিকিট কেটে সে ফেরার লঞ্চটা ধরে ফেলে। একদম বাড়ি গিয়ে নিজের গুহায় ঢুকে প্রথমবার প্যাকেটটা খুলবে নওলকিশোর এবং আবিষ্কার করবে হিন্দি সিনেমার গানের ক্যাসেটের মতো কন্ডোমের প্যাকেটেরও ইনলে হয়। রীতিমতো ছবিটবি দেওয়া। তার সাথে এও জানবে যে মাত্র তিনটে কন্ডোম রয়েছে প্যাকেটটিতে। এর অর্থ তাকে শিগগিরই আবার তীরধনুক কাঁধে শিকারে বেরোতে হবে। একা ! তবে এবার অন্তত সে জানে কোন্ গাছের ফল পাড়া সোজা।


রংলির বাবা শুধু সামনের দিকে তাকাতে শিখেছিলেন। রংলিও তাই ইউনিভার্সিটির ফর্মটা তুলে জমা দিয়ে ফেললো।পড়াশোনায় অবশ্য তার মন ছিল না আর। ছাত্রজীবন শেষ হয়ে আসছে, রংলি বুঝতে পারছিলো। আর এটাও বুঝতে পারছিলো যে মা আর পিসি আশা করে আছে সে একটা কিছু করবে। এমন কিছু একটা যাতে সংসারটার হাল ফেরে। পোস্টাপিস থেকে মাসে মাসে একটা টাকা মা পায় বটে কিন্তু সে আর কতই বা। কষ্ট হতো রংলির।নিজের জন্য নয়। মা আর পিসির জন্য। বিশেষ করে মা। জীবনটা বেশ অন্যরকমও তো হতে পারতো ! নকুলের মতো তার বাবাও ইঞ্জিনীয়ার হতে পারতো বড় মাপের। অথবা শুভঙ্করের বাবার মতো স্কুল টিচার। কিংবা নাটার বাবার মতো জুটমিলের লেবার সুপারভাইজারও যদি হতো, বেঁচে থাকতে পারতো বাবা অন্তত ! মরে যেতে গেলো কেন ওভাবে ! কিসের তাড়া ছিল? আর কয়েকবছর বাদে পড়াশোনা শেষ হবে রংলির। তারপর চাকরির পরীক্ষা দেবে সে। হয়তো সরকারি চাকরি জুটেও যাবে তার, মা যেরকমটা চায়। তারপর একদিন বিয়ে করবে সে মা'র দেখে দেওয়া মেয়ের সাথে। বৌ চা করে দেবে তাকে সকালে ঘুম থেকে উঠে। একটা স্যান্ডো গেঞ্জি আর সাদা পাজামা পরে বিছানায় বসে খবরের কাগজ পড়তে পড়তে চা খাবে রংলি। পূর্বদিকের ঘুলঘুলিটা দিয়ে তখন তাজা সূর্যের আলো তেরছাভাবে এসে পড়বে রংচটা আলমারিটার গায়ে। আলোর সেই মসৃন সরলরেখাটার মধ্যে চকচক করবে সকালের ঘুমভাঙা ধুলো। রংলি চায়ে চুমুক দিয়ে "আ:" শব্দ করে তাকিয়ে থাকবে সেদিকে। নিজেকে রাজা মনে হবে তার। এসব তো দেখে যেতে পারতো বাবা ! মরে গিয়ে খুব লাভ হলো বুঝি?

টাকার অভাব কোনোদিন হবে না রংলির, তা সে চাকরি পাক আর নাই পাক। কেন হবে না সেটা সিক্রেট। কাউকে কোনোদিন বলা যাবে না সেটা। বলে দিলেই পদ্ধতিটা আর কাজ করবে না। ইউনিভার্সিটির ক্লাস শুরু হয়ে মাসতিনেক কেটে গেছে প্রায়। একদিন বাড়ি ফেরার সময় রংলি হাতে করে মাছ নিয়ে এলো। ট্যাংরা মাছ। পেটের ভিতর ডিম। বড়ি দিয়ে ঝোল করলে অমৃতর মতো লাগে। অমৃত অবশ্য খেয়ে দেখেনি রংলি। তার ধারণা জিনিসটা তেতোই হবে খেতে। "তুই টাকা কোথায় পেলি?" মা জানতে চাইলো। এককিলো ট্যাংরা মাছ তো খুব কম কথা নয় ! "গত মাস থেকে কলকাতায় পড়াচ্ছি দুটো ইংলিশ মিডিয়ামের বাচ্চাকে। হাজার টাকা দিচ্ছে। আজই হাতে পেলাম।" মাকে একটা পাঁচশো টাকার নোট এগিয়ে দেয় রংলি। "ওদের বলেছি আরও তিন-চারটে বন্ধু জোগাড় করতে। একসাথে পড়াবো। দেখি এইমাসেই হয়তো..."হাজার টাকা তো অনেকগুলো টাকা রে !" মা'র মুখটা আলো হয়ে ওঠে, আবার উদ্বিগ্নও দেখায়, "সাবধানে বাবা, ট্রেনে-বাসে যাতায়াত করতে হয় তো !" "কি যে বলো না!" রংলি বলে, "লোকে রোজ কত লাখ লাখ টাকা নিয়ে যাচ্ছে আসছে জানো? এই ক'দিন আগে পার্ক স্ট্রিট মেট্রোতে একজন ধরা পড়লো পুলিশের হাতে। সাথে সুটকেস, তার ভেতর বত্রিশ লাখ টাকা ক্যাশ !"
- "বত্রিশ লাখ !" মা'র চোখ কপালে উঠে যায়।
- "ভাবো তাহলে, আর লোকে নাকি আমার হাজার টাকার পিছনে পড়বে !"
- "সাবধানের তো মার নেই বাবা, যা দিনকাল !"

সেদিন খেতে বসে মাছের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে যায় মা আর পিসি। এতো ভালো মাছ নাকি বহুদিন বাড়িতে আসে না। রংলির বাবা আনতো, বেঁচে থাকতে। পিসি বলে রংলির বাবা মাছ চিনতো খুব ভালো। আর টাটকা মাছ নাকি কাটার সময় রক্ত দেখে বোঝা যায়। সন্ধের বাজারে এতো ভালো মাছ যে সে লোক পায় না। রংলি তার বাবার চোখ পেয়েছে মাছ চেনার ব্যাপারে।
খাওয়াটা বেশ জমিয়ে হলো সেদিন। খাওয়ার পর খাটে শুয়েছিল রংলি। মা বিলি কেটে দিচ্ছিলো চুলে। পিসি পারাপার পড়ছে, শীর্ষেন্দুর, নীচে মাদুরে বসে। মা জানতে চায়, "হ্যাঁ রে, হঠাৎ পেয়ে গেলি?" - "কি?" রংলি বুঝতে পারে না। "ওই যে পড়ানোর ব্যাপারটা।" - "ও ! না, এক বন্ধু দেখে দিলো। ওর পাড়ায় বাড়ি।" - "তা তোর বন্ধুকে নিয়ে আসিস না একদিন," মা বলে। তারপর জানতে চায়, "জায়গাটা কোথায় রে?" - "কসবা !" মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায় রংলির। "তোর কলেজের কাছে?" - "কলেজ নয় মা, বিশ্ববিদ্যালয়। কলেজ আগেরটা ছিল। না, কাছে নয়। এটা নর্থে, ওটা সাউথে। গড়িয়াহাট থেকে বাইপাসের দিকে যেতে। এতো প্রশ্ন করো কেন বলো তো?" মা কি মিথ্যেটা ধরে ফেললো, ভাবে রংলি। মনে তো হয় না, মুখটা এখনও আগের মতোই উজ্জ্বল হয়ে আছে। " বা: রে ! তা জানতে ইচ্ছা করবে না? আমার তো কলকাতা যাওয়া বলতে তোর বাবার সাথে যে ক'বার। শুনতেও তো ভালো লাগে"। চুলে বিলি কাটা থেমে যায়। "আচ্ছা, গড়িয়াহাট মানে ট্রেডার্স অ্যাসেম্বলী যেখানে, তাই না"? রবিবার বিকেলের সিনেমার সময় বিজ্ঞাপন দেখে দেখে মুখস্থ হয়ে গেছে মা'র। "হ্যাঁ।" রংলি বলে। পাশ ফিরে শোয় তারপর মা'র দিকে পিঠ করে। " আর আমার ইউনিভার্সিটি মোহিনীমোহন কাঞ্জিলালের কাছে।" - "আচ্ছা!" খুব যেন বুঝতে পারলো মা। এরপর বেশ কিছুক্ষনের নীরবতা। ঘুমটা প্রায় এসেই গিয়েছিলো রংলির। "একটা কথা বলবো বাবা?" - "কইয়া ফ্যালাও", জড়ানো গলায় উত্তর দেয় সে। "অত মাছ না আনবি না একসাথে রে। আমাদের তো তিনজন মাত্র। পাঁচশো থেকে ছ'শো হলেই চলবে। বুঝলি?" --- আর উত্তর আসে না। অবশেষে ঘুমিয়েই পড়েছে রংলি। ঘুমের মধ্যে ট্রামের আওয়াজ শুনছে সে তখন। আর মনে হচ্ছে যেন লোকাল ট্রেনের ফুটবোর্ডে দাঁড়িয়ে রয়েছে।


ট্রেনটা চলছে।


- গোয়েন্দাবাবু, শুনতে পাচ্ছেন? ও গোয়েন্দাবাবু!
- মি: চ্যাটার্জী, আপনি ঠিক আছেন তো?
চোখ খোলে অভিমন্যু। তার চোখের পাতায় বরফকুচি লেগে আছে এখনও। ঠান্ডার প্রকোপে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো সে। মানে পুরোপুরি অজ্ঞান হয়নি সে হয়তো, শুনতে- টুনতে পাচ্ছিলো সবই। কিন্তু তার মনে হচ্ছিলো সে অজ্ঞান হয়ে গেছে বোধহয়। তাই সবাই মিলে ধরাধরি করে যখন তাকে ফ্রিজারের ভিতর থেকে বার করছিলো টুঁ শব্দটিও করেনি সে। তাছাড়া জ্ঞান থাকলে ব্যাখ্যা করার দায় এসে যায় একটা। অজ্ঞান হয়ে গেলে লোকজন বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়বে সেটা নিয়েই। তাতে খানিকটা সময় পাওয়া যাবে আরও। ধীরে ধীরে চোখদুটো খোলে অভিমন্যু তাই। কোনও তাড়াহুড়ো করে না। যেন সে মৃতদের দেশ থেকে ফিরে এলো এইমাত্র এক চক্কর কেটে। দেখে ম্যানেজার দুধের গ্লাস ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আরও পাঁচ-ছ'জন লোক ঘরে। তাকে চোখ খুলতে দেখে আশ্বস্ত হয় সবাই। ফ্রিজারের গায়ে হেলান দিইয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে তাকে। লোপাটের তদন্ত করতে এসে সে নিজেই লোপাট হয়ে যাচ্ছিলো আরেকটু হলে।

"দুধটা খেয়ে নিন স্যার, গায়ে জোর পাবেন", ম্যানেজার বলে। "হ্যাঁ স্যার। চোখ খুলেছেন উনি। সুস্থই আছেন মনে হয়", এএসআই ব্যাটা ফোনে বলছে কাউকে। সুপারকেই হবে নিশ্চয়ই। "আমি দুধ খাই না। ওতে গ্যাস হয়", অভিমন্যু বলে। "কথাও বলছেন উনি। ঠিকই আছেন মনে হয়। আমি স্যার আপনাকে পরে করছি আবার। ওকে স্যার", ফোন রাখে এএসআইটা। "চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলেন মশাই", বলতে বলতে এগিয়ে আসে অভিমন্যুর দিকে। অভিমন্যু পাত্তা দেয়না আলাদা করে। সে এখানে এসেছে পুলিশ সুপারের অতিথি হয়ে। জীবিকার প্রয়োজনেই একটু ডাঁট রেখে চলতে হবে তাকে। এইসব ছুটকো ঘটনায় আত্মবিশ্বাসে আঘাত লাগতে দিলে চলবে না।
- ম্যানেজারবাবু, একটা কথা বলুন তো ! আপনাদের এই ফ্রিজারটা এরকম অপ্রয়োজনীয় রকমের বড় কেন?
- খুব বড় তো নয় স্যার !
- বড় নয় ! গোটা মানুষ সেঁধিয়ে যাচ্ছে ভেতরে আর আপনি বলছেন বড় নয়?
- দোতলা আর তিনতলা মিলিয়ে স্যার ষোলোটা ঘর। ফুল সিজনে প্রায় পঞ্চাশ জনের রান্না হয় দুবেলা। জিনিসপত্র কিনে জমিয়ে রাখতে স্যার...
- এই তোমার নামটা কি যেন, শুভাশীষ, না?
ম্যানেজার কথা শেষ করার আগেই তুড়ি মেরে আঙুল নাচিয়ে এএসআইকে জিজ্ঞেস করে অভিমন্যু। সে বেচারা একটু দমে যায় তাতে।
- "হ্যাঁ স্যার"।
- "তা তুমি এক কাজ করো। এই ফ্রিজারের ভেতর যতরকম মাংস আছে সব স্যাম্পেল তুলে ল্যাবে পাঠিয়ে দাও। মানুষের মাংসও আছে কিনা চেক করতে হবে"।--- উঠে দাঁড়ায় অভিমন্যু।
- "কি বলছেন স্যার"! --- ম্যানেজারবাবু হাঁ !
- নয়তো আর বলছি কি। আপনার কি মনে হয়, আমি ওর ভেতর হাডুডু খেলতে ঢুকেছিলাম? মাংসগুলো হাতড়ে শুঁকে শুঁকে দেখছিলাম কিছু বোঝা যায় কিনা। দরজাটা লক কে করলো বলুন তো? আপনারা কি আমাকেও খুন করে দেবার চেষ্টায় ছিলেন নাকি? পুলিশের সামনেই?
- এ বাবা ! না না ! ছি ছি ! ও তো নিজে থেকে বন্ধ হয়ে যায়। আসলে আমাদের সুবলের তো খুব ভুলোমন। না, ওর রান্নার হাত ভালো। কিন্তু সবকিছু ভুলে যায় থেকে থেকে। তো বারকয়েক এমন হয়েছে যে ও ওইরম দরজা খোলা রেখে ভুলে গেছে আর আমি এসে দেখি সে প্রায় হপ্তাখানেকের জিনিস পুরো পচে গোবর। তাই আমার ভাইপোকে দিয়ে ওই দরজাটা বানানো করিয়েছি।খুব নাম করা মিস্ত্রি স্যার আমার ভাইপো।কাঁথিতে ওর বড় দোকান আছে। বাসস্ট্যান্ডের কাছেই।

অভিমন্যু হাঁটতে হাঁটতে রান্নাঘর পেরিয়ে পিছনের বাগানটায় এসে পড়েছে। তার সাথে সাথে ম্যানেজার আর শুভাশীষও। সে ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে চোখদুটো ছোট করে ফেলে। মুচকি হাসে তারপর।
- শিল্পীমানুষ !
- অ্যাঁ?
- আপনার ভাইপো ! শিল্পীমানুষ ! হাতের কাজ খুব ভালো। তার কাকা হিসেবে আপনি কত বড় শিল্পী সেটাও আশা করছি কয়েকদিনের মধ্যেই জেনে যাবো।

ম্যানেজারের মুখটা ছোট হয়ে যায়। "আমাকে সন্দেহ করছেন স্যার?" আক্ষেপের সুরে বলে সে। অভিমন্যু তাতে পাত্তা দেয়না।
- শোনো শুভাশীষ, এই বাগানটা খোঁড়াবার ব্যবস্থা করো।
- গোটাটা স্যার?
- হ্যাঁ। গোটাটা।
- কিন্তু স্যার ফুলগাছগুলো?
- ফুল তো কবরের উপরেও ফোটে। তার মানে কি নিচে লাশটা থাকে না তখন আর?
- না স্যার আমি বলছিলাম...
- বলো বলো। নিশ্চয়ই বলতে হবে। আপত্তি আছে কি তোমার কোনো? তাহলে সুপারসাহেবকে আমি সেরকমটাই জানিয়ে দেব, যে ফুলগাছ উপড়ে বাগান খুঁড়তে শুভাশীষবাবুর সমস্যা রয়েছে। বলে ফেলো।
- স্যার, রেগে যাচ্ছেন কেন? আমি কি সেরকম বললাম? চলুন, চা খাবেন চলুন।



নওলকিশোরের আর মাথা কাজ করছিলো না। উত্তেজনায় সে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারতো। মাথা কাজ করার জন্য মাথায় অক্সিজেন পৌঁছনো জরুরি।আর মানবদেহে অক্সিজেন বয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজটি করে রক্ত। কিন্তু নওলকিশোরের শরীরের সমস্ত রক্ত তখন অন্যদিকে ছুটছে। গলা আর বুকের মাঝামাঝি কোথাও একটা বিস্ফোরণ ঘটছে ভিতরে ঘন ঘন। বাস্তব এতটা অবাস্তবের মতো লাগতে পারে সে এই প্রথম জানলো; যখন সে দেখলো, ঠিক যেমন কথা ছিল, নির্দিষ্ট সময়ে পূর্বনির্ধারিত জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে রুচিরা। তার অঙ্গে একটি নীল জিন্সের শার্ট। জিন্স নাও হতে পারে, তবে রাস্তার এপার থেকে জিন্সই মনে হচ্ছে। দিব্যচক্ষে ওই শার্টের বোতামগুলো খুলে যেতে দেখতে পেলো নওলকিশোর। তার মনে হলো নীল কোনো শীতল তরলে ডুবে যাচ্ছে সে আর তার গলা দিয়ে শরীরের ভিতরে ঢুকে পড়ছে ঠান্ডা স্বপ্নিল মৃত্যু। মৃত্যু এতো নরম হতে পারে? রাস্তা পেরিয়ে এগিয়ে আসছে রুচিরা। মৃত্যু এতো কাঙ্খিত হতে পারে? নওলকিশোরের গলা শুকিয়ে গেছে। মৃত্যু একটি নীল জিন্সের শার্ট পড়া মেয়ে!
- "কি হলো?" চটক ভাঙে নওলকিশোরের। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। রুচিরা একেবারে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
- "মৃত্যু !" বিড়বিড় করে সে।
- "কি? কার মৃত্যু?" রুচিরা জানতে চায়।
- " না ! মৃত্যু? কই না তো? কার মৃত্যু হতে যাবে এখন?"
- "তুমি বললে মনে হলো !"
নওলকিশোর ঢোঁক গেলে, "কই? না তো ! আমি তো কিসব যেন ভাবছিলাম !" কি বলবে সে বুঝে উঠতে পারে না। এটা আবার সেই কন্ডোমের দোকানের মতো হয়ে যাচ্ছে, সে ভাবে। "কি ভাবছিলে? আমাকে বলা যাবে?" রুচিরা যেন না জেনে ছাড়বে না পণ করেছে আজকে। বলা কি আর যায় এসব ! একটি নাভির গভীরতায় একটি সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ বালক যে জ্যোৎস্না রাতের পাতকুয়ো খুঁজে পেয়ে তার জলে দেখে ফেলে পূর্ণচাঁদের প্রতিফলন; সে সব কি আর ভেঙে বলার কাউকে !
রুচিরা নওলকিশোরের হাত ধরে। "এ কি তোমার হাতটা এরম ভিজে কেন?" পরক্ষনেই আঁতকে ওঠে সে আর প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয় সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে। নওলকিশোর কোনো উত্তর খুঁজে পায় না। রুচিরার প্রশ্নটা যেন অনন্তলুপে পুনরাবৃত্ত হয়ে চলেছে। আর সমবেত পথচারীগণ উত্তরের আশায় যেন নওলকিশোরেরই দিকে তাকিয়ে সমস্বরে বলে চলেছে বারবার --- কেন? কেন? কেন?
ইস ! হাতটা সত্যি বড্ডো ভিজে ! ঘামে চপচপ করছে এক্কেবারে ! রুচিরা সেই হাত এখনও চেপে ধরে তার চোখের দিকে চেয়ে।
হঠাৎ রুচিরার দৃষ্টি বদলে যায়। নরম একটা হাসি খেলে যায় চোখে। নওলকিশোরের হাতটা আলতো করে ছেড়ে দিয়ে মৃদুস্বরে সে বলে ওঠে --- "পাগল !"

হাত বেচারার দোষ ছিল না কোনো। আর খানিকক্ষণ ওই দিব্যচক্ষুটি কর্মরত থাকিলে গোটা নওলকিশোরটিরই পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হইতে পারতো। কেবল সময়ের অপেক্ষামাত্র আর। না, পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হেতু নয়। সে তো সকলেরই চিরকালীন অপেক্ষা সেভাবে ধরলে। তবে কিনা এখান থেকে নওলকিশোরদের বাড়ি পায়ে হেঁটে মিনিট পনেরো মতো। মা বাড়ি নেই। কোথায় গেছে সেটা বড় কথা নয়। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে দোতলা থেকে কোনো অবাঞ্ছিত স্বরের হামলায় উপদ্রুত হতে হবে না আজ। বাবা ফিরতেও অন্তত ঘন্টাতিনেক। এবং এই সমস্তকিছুই রুচিরার জানা। নওলকিশোর গতকালই ফোনে জানিয়েছিল যে মা দুপুরে খাওয়ার পর আশ্রমে যাবে। কি একটা অনুষ্ঠান আছে যেন। ফিরতে রাত ন'টা অন্তত। " আমি আসবো?" --- রুচিরা নিজেই জিজ্ঞেস করেছিল। "তুমি আসবে?" --- নওলকিশোরের বিশ্বাস হয়নি। বিশ্বাস যে হয়নি তার কারণও আছে বৈকি ! নওলকিশোর জানতো যে রুচিরা জানে তার কাছে তিন তিনটে কন্ডোম আছে। সে নিজে প্যাকেটটা দেখিয়েছিলো রুচিরাকে। রুচিরাও খুব মনোযোগ দিয়ে দেখেছিলো। এমনকি ইনলের গোটা লেখাটা অবধি পড়েছিল। "হঠাৎ কিনলে কেন?" জানতে চেয়েছিলো তারপর। নওলকিশোর তার স্বভাবোচিত নওলকিশোরেস্ক বজায় রেখে জবাব দিয়েছিলো, "না, কিনতে তো হতোই একদিন। ভাবলাম অভ্যাস করা ভালো।" "তোমায় দিলো?" নিষ্পাপ জিজ্ঞাস্য ছিল রুচিরার, অবিশ্বাসমিশ্রিত, নওলকিশোরের দাড়িগোঁফবিহীন শিশুসুলভ মুখটির দিকে তাকিয়ে। "না দেওয়ার কি আছে। আমি কি বাচ্চা নাকি?" --- এর বেশি কিছুই বলেনি নওলকিশোর এই প্রশ্নের উত্তরে।
অতএব, ঘটনাপরম্পরা বিচার করলে, এই যে আজকে রুচিরা এলো, এ আসা কিন্তু যে সে আসা নয়। এ আসা শুধুই রুচিরার আসাও নয়। বরং বলা যায় এক মাহেন্দ্রক্ষণ এসে উপস্থিত হয়েছে নওলকিশোরের জীবনে আজ। সে রুচিরার দিকে তাকায়। ভাবে, আর মিনিটদশেক বড়জোড়। সে বুঝতে পারে না রুচিরার পক্ষে এতো নিরুত্তেজিত থাকা সম্ভব হচ্ছে কিভাবে ! তাকে দেখে মনে হচ্ছে আর পাঁচটা দিনের মতোই আরও একটা সাধারণ দিন বুঝি আজ। তবে কি তার মাথায় এসব কিছুই চলছে না? তাহলে নওলকিশোরকে সে অমনভাবে পাগল বললো কেন? হালকা একটা গলাখাঁকারি দিয়ে গলাটা পরিষ্কার করে নেয় নওলকিশোর। একটা ঢোঁক গেলে। তারপর বলে, "হাত না ঘামার কি আছে? গরম লাগছিলো তো আমার"। রুচিরা তার দিকে ফেরে। নিজের বামহাতের কনিষ্ঠাটি মুখে পুরে কামড়ে ধরে আলতো করে। ডানদিকে অল্প কাত করে মাথাটি। তারপর গলায় কুহক মিশিয়ে বলে ওঠে, "গরম বুঝি তোমার একারই লাগছে আজ সোনা?" --- ঠিক সেই মুহূর্তে নওলকিশোর আবিষ্কার করে রুচিরার চোখদুটির অনেক ভিতরে আরও একজোড়া চোখ রয়েছে, মোহনায় জেগে থাকা ব-দ্বীপের মতো। এই পৃথিবীর কোনোকিছুই স্পর্শ করতে পারে না ওই জগতের কনিষ্ঠতম নক্ষত্রটিকেও। নিজেকে নিয়ে হতাশ লাগে তার। মনে হয় সে মাটিতে মিশে যাবে এখনই। তারপর ছোট্ট একটা পিঁপড়ে হয়ে উঠে পড়বে রুচিরার পায়ের পাতায়। অথবা হাঁটুমুড়ে বসে পড়বে সে। তারপর মাথা ঠুকে ঠুকে বলবে, " হে দেবী, আমায় মুক্তি দাও!" অথবা এ জীবন রেখেই বা কি লাভ আর। তার চেয়ে গণধোলাই খেয়ে মরে যেতে পারলে একটা কাজের কাজ হতো। হঠাৎ নওলকিশোরের একটা হাত টেনে নিয়ে ঠিক বুকের মাঝখানটায় চেপে ধরে রুচিরা, "আমার হার্টবিট বেড়ে গেছে টের পাচ্ছো?" --- টের পাওয়া তো দূর, নওলকিশোর নিজে বেঁচে আছে কিনা সেটাই বুঝে উঠতে পারে না আর ! তার মনে হয় বোঁ বোঁ করে দৌড়োতে শুরু করবে সে। একদৌড়ে চলে যাবে চুঁচুড়ার ঘড়ির মোড়ে। ল্যাংটো হয়ে বড়ঘড়িটার মাথায় উঠে পড়বে তারপর। আর চিৎকার করে বলবে, "ওরে তোরা কেউ আমাকে ধরে ক্যালা ! চ্যাংদোলা করে গঙ্গার জলে ছুঁড়ে ফেলে দে ! থানইঁট তুলে বাড়ি মেরে দে মাথায় আমার ! আমি জ্যান্ত নরখাদকের বাচ্চা ! আমার যে কি হয়ে গেলো ! হায় ! আমার যে কি হয়ে গেলো ! তোদেরকে কি বলবো রে আর শালা !"

এইটুকু পথ পেরোতে বড্ডো বেশি সময় লেগে যাচ্ছে আজ।


রংলির এখন সব মিলিয়ে দশজন ছাত্র। মানে মা কে সে সেরকমটাই বলেছে। সবই বানিয়ে বলা কথা। হাতে টাকা দিতে একটা অজুহাত তো লাগে। নাহলেই হাজারটা প্রশ্ন ! আর সত্যিটা যে বলতে পারবে না রংলি কাউকে। রংলি আসলে কাউকেই পড়ায় না। এমনকি পড়াশোনাও করে না সে আগের মতো আর। ইউনিভার্সিটির নাম করে রোজ সকালে বাড়ি থেকে সে বেরোয় বটে কিন্তু ক্লাসে তাকে দেখা যায় না সচরাচর। রংলি দেখতে ভালোবাসে। ঘুরে ঘুরে কলকাতা দেখে বেড়ায় সে তাই। কলকাতা বড় অদ্ভুত শহর। কলকাতার দুটো দরজা। রোজ সকালে সেই দরজাদুটো খুলে লাখে লাখে লোক ঢুকে পড়ছে শহরে। আবার ফিরেও যাচ্ছে রাত্রের আগেই। একদিন ওই ভীড়ের মধ্যে রংলির বাবাও ছিল। এখন আর নেই। এরকম কত লোক রোজ রোজ শহরে আসাযাওয়া করতে করতে নেই হয়ে গেছে একদিন। কলকাতায় ট্রাম চলে, বাসে-বাসে রেষারেষি হয়। হলুদ ট্যাক্সি চেপেছে রংলি ছোটবেলায়, বাবার সাথে কলকাতায় এসেছিলো যখন। বড়দিনের ছুটি ছিল ইস্কুলে। খুব মজা হয়েছিল সেইদিন। ছোটবেলার কথা মনে পড়লে বড় রং রং লাগে রংলির। সেইসব দিনের আলোদের গায়ে যেন গন্ধ লেগে থাকতো কোনো; হাওয়াদের চোখে ফিল্টার চশমা পরানো ছিল বুঝি ! পৃথিবীটা একই আছে, একই সূর্য, একই হাওয়া। তবু কিছু একটা ছিল অতিরিক্ত, যা আজকে রংলি আর খুঁজে পায় না। সে বুঝতেও পারে না সেটা কি হতে পারে ! মাঝে মাঝে হাঁটুমুড়ে বসে চোখ ছোট ছোট করে চারিপাশটা দেখে রংলি। তবু বুঝতে পারে না পার্থক্যটা কিসের ! এমনটা কি শুধু তারই মনে হয়? নাকি যারা বড় হয়ে যায় তাদের সবারই? রাস্তায় মানুষ দেখে রংলি। কেউ কি বুঝতে পারছে? পৃথিবীতে পনেরো বছর আগে কিছু একটা ছিল যেটা আজ আর নেই ! কেউ কি টের পাচ্ছে না? সূর্যের আলোর গায়ে রং কমে গেছে ! বিকেলের হাওয়ার গন্ধ পাল্টে গেছে একদম !

একশো ষাট টাকা লাগে রংলির মান্থলি করাতে। হুগলী ঘাট স্টেশন থেকে করাতে হয়। হাওড়া শিয়ালদা দুই লাইনেই যাতায়াত করা যায় তাতে। কলকাতায় এসে থাকতে গেলে তার খরচ বেড়ে যাবে অনেক। কিন্তু টাকাটা রংলির কাছে কোনো সমস্যা নয়। তাই সে কথাটা একদিন পেড়েই ফেললো মা'র কাছে।
- ভাবছি কলকাতায় গিয়ে থাকা শুরু করবো। টিউশনিতে আরও সময় দিতে পারবো তাহলে। আরও বেশি ছেলে পরানো যাবে। কি বলো?
মা ঠিক রাজিও হয়না আবার আপত্তিও করে না। একবার বলে পাঁচ হাজার তো হচ্ছেই; আর না হলেও তো চলে। আবার বলে, রংলির যা ভালো মনে হয়। হপ্তায় হপ্তায় দিনদুয়েকের জন্য বাড়ি এলেই চলবে। রংলি বুঝতে পারে না ঠিক করছে কিনা, কিন্তু কলকাতা তাকে ডাকছে। সেখানে সে ভীড়ে মিশে থাকতে পারবে। সে ওই জীবনটা চায়। একজন পিছুটানহীন একা মানুষের জীবন। এছাড়া আর কিই বা চাইতে পারে সে ! তার শুধু দেখে যেতে ভালো লাগে দিনগুলি রাতগুলির বদলে যাওয়া। এক জায়গায় অনেকটা সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকলে অনেক কিছু দেখা যায়। সেই প্রবাহমানতার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে রংলি বুঝতে পারে মহাবিশ্বের সারসত্যগুলি। একদিন রংলির বাবা ছিল। একদিন ঠাকুরদা এসেছিলো কলকাতায়। একদিন তেজপুরে ঘর ছিল তার পূর্বপুরুষের। একদিন সেও থাকবে না। যতটা সময় আছে সে শুধু স্বাদ নিয়ে যেতে চায়। পৃথিবীর ভালোমন্দ সে বোঝে না। মিছিলে হাঁটেনি সে কোনোদিন। মিছিলটি চলে গেলে সে কেবল ওই চলে যাওয়াটুকুর দিকে তাকিয়ে থেকেছে। দৃশ্য বদলে গেছে আবার। আগের দৃশ্যের মায়া গ্রাস করতে পারেনি রংলিকে। এই বদলে যাওয়াটুকুই তার সত্যি মনে হয়। বাদবাকি সব ভ্রম। কিছুই থাকবে না। মা আর পিসিও না। এতো মৃত্যু দেখার চেয়ে দূরত্ব বাড়িয়ে নেওয়া ভালো। কষ্টটা কম হবে তাতে। ছোটবেলায় রংলি পড়েছিল উত্তেজনায় সাড়া দেওয়া প্রাণের লক্ষণ। উত্তেজনা ছিল একদিন তারও প্রাণে। আজ মনে হয় যত সাড়াশব্দহীন বসে থাকা যায় তত ভালো। সে কি তবে জড়বস্তু হয়ে যাওয়ার দিকে এগিয়ে চলেছে? তাতেই বা কি? একটি মানুষের থাকা না থাকায় কিই বা এসে গেছে পৃথিবীর কবে !

বাঘাযতীন স্টেশনের কাছে ছোট একটা ঘর পেয়ে গেলো রংলি। ঘরটায় আলো-পাখা লাগানোই আছে। একটা খাটও রয়েছে ভিতরে। দেড় হাজার টাকা মাসভাড়া। খাই-খরচ আলাদা। "তুমি নর্থের দিকে ঘর নিলে না কেন? রোজ এই সাউথলাইনের ভীড় ঠেলে যাতায়াত শরীরে পোষাবে?" বাড়িওলা জিজ্ঞেস করেন তাকে। "আমি রোজ ট্রেনে আড়াই ঘন্টা কাটানো পাবলিক যাতায়াত মিলিয়ে। এখান থেকে শিয়ালদা আর কতক্ষণের পথ !" রংলি বলে। " আসলে সেশনের শুরুতে খোঁজ নিইনি তো। ওই সময় হয়তো পেয়ে যেতাম। এখন তো মেসগুলো সব ভর্তি। তাছাড়া আমারও একটু একা থাকতেই ভালো লাগে।"

"থাকতে পারবি একা?" মা জিজ্ঞেস করে, "খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা কি ওখানেই?" - " তোমার চিন্তার কিচ্ছু নেই।" রংলি আশ্বস্ত করে মাকে। "বাড়িওলা আর ওনার স্ত্রী ওখানেই থাকেন, পাশের ঘরে। অসুবিধা কিছু হলে ওনারাই দেখবেন। উনি বলেছেন ওনাদের কাছেও খেতে পারি যেকোনোদিন। শুধু আগে থেকে জানিয়ে দিলেই হবে। অথবা বাইরে থেকে খেয়েও ফিরতে পারি। ওনারা কিছু মনে করবেন না। মাসের শেষে সব একসাথে হিসেবে করা যাবে।"
- কবে যাবি?
- সামনের সোমবারই চলে যাবো ভাবছি। তুমি চিন্তা করো না। প্রত্যেক শুক্রবার রাত্রে আমি বাড়ি চলে আসবো। সোমবার সকালে চলে যাবো আবার।
- বাড়িওলার ফোন নম্বর রেখে যাস।

একটা ব্যাগে কিছু জামাকাপড় গুছিয়ে নেয় রংলি রোববার সন্ধে থাকতে থাকতেই। তারপর পিঠের ব্যাগটা খুলে দেখে নেয় খুচরোর বাক্সটা ঠিক জায়গায় রয়েছে কিনা। বাবার জিনিসগুলো ফেলে দেওয়া - বিক্রি করে দেওয়ার সময় এই একটা জিনিস সে তুলে নিজের জন্য রেখে দিয়েছিলো। বাবার স্মৃতিচিহ্ন বলতে তার কাছে এটুকুই।
১০

ডাবের জলটা বেশ মিষ্টি। বহুদিন এতো ভালো ডাব খায়নি অভিমন্যু। স্ট্রয়ে চুমুক দিতে দিতে ভাবছিলো সে। তাকে এখন দেখতে লাগছে গম্ভীর এবং চিন্তামগ্ন। আর থেকে থেকে "হুম" বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে সে। যেন কত রহস্য উন্মোচিত হয়ে যাচ্ছে তার অর্ধোন্মিলিত চোখের সামনে। কত জটলার জট ছাড়িয়ে সে বুঝে যাচ্ছে যেন এরপরে ঠিক কি ঘটতে চলেছে। আসলে গোটাটাই ভাঁওতা। শুভাশীষকে চাপে রাখার উপায়। সে ভাবছে বলতে মূলত ওইটাই --- আহা রে! কি মিষ্টি ডাবের জল! রোজ যদি এরকম পাওয়া যেত!
জলটা শেষ হয়ে যেতে ওইভাবেই না তাকিয়ে কোনোদিকে না ফিরে বাঁহাতে শুভাশীষের দিকে খালি ডাবটা এগিয়ে ধরলো অভিমন্যু। স্ট্র সমেত! "শাঁস খাবেন তো স্যার, শাঁস? এই, ডাবটা ছাড়িয়ে দাও। স্যার শাঁস খাবেন।" -- অভিমন্যুকে হ্যাঁ না কিছু বলতেই হলো না। মানুষকে চাপে রাখার এই এক সুবিধা। পটাপট কাজ হয়ে যায়। তা না হলে এক্ষুনি খাজুর করতে হতো। আপনার কোথায় বাড়ি ! হেঁ হেঁ ! বাড়িতে কে কে আছে ! হেঁ হেঁ ! আজকে গরমটা কেমন পড়েছে বলুন ! হেঁ হেঁ ! যত্তসব ! জেমস বন্ড কোনোদিন করেছে ওসব? --- বন্ড! হেঁ হেঁ ! জেমস বন্ড! --- ওরকম করলে কেউ আর কোনোদিন তাকে সিরিয়াসলি নিতোইনা। লোকে শুধু হাঁ করে দেখবে কিন্তু শিখবে না কিছুই। এইজন্যেই বাঙালির কিচ্ছু হলো না !

- "স্যার, শাঁস!" শুভাশীষ মাঝখান থেকে ভাগ করা ডাবটা অভিমন্যুর দিকে এগিয়ে ধরেছে।
- " হ্যাঁ? ও!" বলে হালকা করে একবার তাকিয়ে ডাবটা নেয় অভিমন্যু অন্যমনস্কভাবে। তারপর আবার যেদিকে তাকিয়ে ছিল সেদিকেই ফিরে চিন্তামগ্নভাবে শাঁস খেতে থাকে। আদতে সে অন্যমনস্ক নয় মোটেই। তার গোটা মন জুড়ে একটি কচি ডাব, তাহার শাঁস ও তাহার জল। মন থেকে গোটা ব্যাপারটার ধীরে ধীরে পেটে স্থানান্তর ঘটছে। জলটা আগেই চলে গেছে। শাঁসটাও যাচ্ছে এবার। চিন্তা বলতে একটাই। এমন নরম শাঁস, আশেপাশে কেউ না থাকলে বেশ সপাৎ সপাৎ আওয়াজ করে খাওয়া যেত। ভদ্রতার খাতিরে সেটা করা যাচ্ছেনা আপাতত। ওয়েট কমে যাবে ওরকমটা করলে। শুভাশীষের ওপর থেকে চাপটাও কমে যাবে সেক্ষেত্রে। বড় মানুষরা ওরকমটা করেন না। রাষ্ট্রপতি সুড়ুৎ সুড়ুৎ শব্দে চা খান না। প্রজাতন্ত্র দিবসের ভাষণ দিতে উঠে হাঁচি পায় না প্রধানমন্ত্রীর। বা পেলেও তিনি কাউকে বুঝতে দেন না। কারণ এরকমটাই চলে আসছে। এটাই নিয়ম। রাষ্ট্রপুঞ্জে বৈঠক চলাকালীন পুতিন আসলে টেকো কিনা সেই নিয়ে ফিসফাস আলোচনা জুড়ে দেয় না কেউ। সিরিয়াস ব্যাপারস্যাপারে এইসব ফচকেমির কোনো স্থান নেই। এখানে দু'দুটো লোক ভ্যানিশ হয়ে গেছে। মরেও গিয়ে থাকতে পারে, বলা যায় না। সেই ঘটনার তদন্তে এসে ডাবের শাঁস খেতে খেতে শব্দ করাটা উচিত হবে না মোটেই।

শাঁসটা শেষ হয়ে এসেছে। ডাবের খোলা কেটে বানানো চামচটা দিয়ে শেষ টুকরোটা তুলে মুখে দিতেই ওই জায়গাটায় চোখ পড়লো অভিমন্যুর। এতক্ষন শাঁসের আড়ালে থাকায় প্রাকৃতিক আঁকিবুকি মনে হচ্ছিলো। জিনিসটা দেখে একটু চমকেই গেলো অভিমন্যু।এটা কি ডাবওলার কাজ? শুভাশীষকে দেখানো কি উচিত হবে? নাকি সেও জড়িত থাকতে পারে এই চক্রান্তে? কিন্তু ডাবওলার হাতে তো দা ! দা-এর মতো জিনিস দিয়ে তো এটা করা সম্ভব নয়! স্পষ্ট মনে হচ্ছে ডাবের খোলার ভিতরের দিকের গায়ে ছুরি দিয়ে কেউ একটা "না" খোদাই করে রেখেছে। একটা বন্ধ ডাবের খোলার ভিতর শাঁসের নিচে কিভাবে সম্ভব হয় এটা?
-"আরেকটা ডাব কাটুন তো", ডাবওলাকে বলে অভিমন্যু। ডাব কাটার পদ্ধতিটাকে সে ভালোভাবে লক্ষ্য করে এবার। না, কোনও গোলমাল নেই সেখানে। ডাবটা হাতে পেতেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জলটা খেয়ে নেয় অভিমন্যু। তারপর ডাবটা ডাবওলার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, "শাঁস খাবো"। ডাবওলা সেকেন্ড দশেকের মধ্যে ডাবটা চিরে খোলা কেটে চামচ বানিয়ে অভিমন্যুর হাতে ফিরিয়ে দেয়। গোটাটা ভালো করে লক্ষ্য করে অভিমন্যু। এখানেও কোনো চালাকি নেই। গপগপ করে শাঁসটা খেয়ে ফেলে সে মিনিট দেড়েকের মধ্যে। এবারেও একই কেস। অক্ষরগুলো একটু ছোট, কিন্তু বার্তাটি আরও স্পষ্ট। "একদম না" লেখা আছে ডাবের ভিতরে !
- "আরও একটা কাটুন!" অভিমন্যু বলে।
- "আপনি একটাও খাবেন না স্যার? কচি ছিল কিন্তু!" ডাবওলা বলে শুভাশীষের দিকে তাকিয়ে।
- "হ্যাঁ! স্যারের তো মনে হচ্ছে বেশ মনে ধরেছে। দিন আমাকেও একটা। কিন্তু ওই একটাই।" শুভাশীষ বলে।
- "আচ্ছা। আমি আমি জোর করতে যাবো কেন? ভালো মাল আছে, একটাও খাবেন না? তাই বললাম। চিনির মতো মিষ্টি!"
- "সে কি! পিঁপড়ে ধরে যাবে তো!" শুভাশীষ মনে হয় মনের মতো লোক পেয়েছে এতক্ষনে।
- "কি যে বলেন স্যার!" ডাবওলাটি বেশ লাজুক ধরণের।
- "আচ্ছা হয়েছে! আমারটা তাড়াতাড়ি কাটুন তো!" অভিমন্যু বাগড়া দিয়ে রসভঙ্গ ঘটিয়ে বলে ওঠে।
- "হ্যাঁ হ্যাঁ! ওনারটা কেটে দিন আগে", শুভাশীষ বলে।
- "এই তো। হয়ে গেছে।" ডাবওলা তৃতীয় ডাবটি এগিয়ে দেয়।

তারপর শুভাশীষ আর ডাবওলার মধ্যে কি কথা হয় না হয় সেসব কিছুই কানে ঢোকে না অভিমন্যুর। সে কোনোমতে জলটা শেষ করে ফিরিয়ে দেয় ডাবটা। কিছু বলতেও হয় না তাকে। ডাবওলা বকবক করতে করতেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো ডাবটাকে ফাঁক করে ফেলে মাঝখান থেকে। একপ্রকার ছিনিয়েই নেয় অভিমন্যু ডাবটা তার থেকে। ওদিকে শুভাশীষও তখন ডাব খাচ্ছে। কিন্তু অভিমন্যুর সেদিকে নজর দেওয়ার সময় নেই। সে ভাবছে এবারেও কি একই ঘটনা ঘটতে চলেছে? কি লেখা থাকতে পারে এবার? কিসের "না"? কেনই বা "একদম না"? উত্তর মেলে তাড়াতাড়িই !

"খবরদার !" লিখে সাবধান করা রয়েছে তৃতীয় ডাবটির ভিতরে, একদম বিস্ময়বোধক চিহ্ন সহকারে ! কেন কেউ অভিমন্যুকে সাবধান করতে চাইছে? কি থেকেই বা? কেন কেউ তাকে বারণ করতে যাবে কোনোকিছু করতে? তাও এরকম অদ্ভুত উপায়ে? কিভাবেই বা এটা সম্ভব! বিস্ময় কাটতে চায় না অভিমন্যুর। তারই মধ্যে সে শুনতে পায় শুভাশীষ বলছে, "ও বাবা, এ তো জাদুডাব গো! ভেতরে কি লেখা আছে দেখেছো?" আর ডাবওলা উত্তর দিচ্ছে, "কই, দেখি দেখি! ওমা! সে কি! তাজ্জব ব্যাপার তো! এতদিন ধরে ডাব বেচছি, কই, আগে তো কখনও এমনটা দেখিনি!"
- "ও স্যার! দেখেছেন কান্ড? ডাবের ভেতর লেখা ফুটছে!" শুভাশীষ তাকেই বলছে এবার, অভিমন্যু বুঝতে পারে। চা খেতে যাওয়াটাই কি উচিত ছিল তবে? ডাব খেতে আসার সিদ্ধান্তটাই কি তাহলে ভুল? শুভাশীষের ডাবে আবার কি লেখা আছে কে জানে ! গলাটাকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করে এনে অভিমন্যু বলে, "কি যা তা বকছো? গরম লেগে গেলো, নাকি?" শুভাশীষ ডাবের খোলাটা হাতে করে নিয়ে এগিয়ে আসে, "এই দেখুন!" স্পষ্ট দেখতে পায় অভিমন্যু, লেখা রয়েছে "বলে ফ্যাল্"; য-ফলা, আকার, এবং হসন্ত, তিনটিই ব্যবহার করা হয়েছে "ফ্যাল্" লিখতে।
- তুমি কি কিছু লুকোচ্ছ শুভাশীষ আমার কাছে?
- লুকোতে তো চাইনি স্যার, কিন্তু আপনি আর বলতে দিলেন কোথায়!
- আমি তো বাধা দিইনি! আমি তো বললাম বলে ফেলো!
- ওইভাবে বললে স্যার বলা যায়! আপনিই বলুন!
- তা এবার তো বলবে, নাকি?
- চলুন, যেতে যেতে বলি...
১১

কথাটা কিছুতেই আর ওইদিকে এগোচ্ছে না। ঠেলে দিতে পারলে হয়তো এগিয়ে যাবে, কিন্তু সেটা বর্বরোচিত হয়ে যাবে না তো আবার? একবার বাথরুমে যেতে পারলে মনে হয় ভালো হতো। পেটের ভিতরটা কিরকম একটা যেন করছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে বাথরুমে যাওয়াটাও কি ভালো দেখাবে?

ভুলটা নওলকিশোরেরই। তার উচিত ছিল রুচিরাকে নিয়ে সোজা সিঁড়ির নিচের ঘরে ঢুকে যাওয়া। এইসব বাড়ি দেখানো-ফেখানোর কোনও দরকারই ছিল না। আসলে সে বুঝতে পারেনি ব্যাপারটা এইদিকে চলে যাবে। নওলকিশোরের বাবা-মা'র ঘর এটা। রুচিরা একবার বসছে, একবার উঠছে। আর নানান জিনিস নিয়ে প্রশ্ন করে যাচ্ছে। এই ছবিটা কার, ওই স্মারকটা কিসের, কে পেয়েছিলো, কেন; এইসব! আরে বাবা তোর অত খবরে দরকার কি! আধঘন্টা হতে চললো এসেছিস। একটা চুমু তো খাওয়া যায় অন্তত এবার। কিন্তু না! রুচিরার প্রশ্ন আর ফুরোচ্ছে না। যেন সে মিউজিয়াম দেখতে এসেছে। কোনও ফোকাস নেই মেয়েটার। "এই খাটটা কি তোমার বাবা-মা'র বিয়েতে পাওয়া?" --- কোনও মানে আছে এসব প্রশ্নের! "আমি এ প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই। উত্তরটা আমি জানি, চাইলে বলতেও পারি, কিন্তু বলবো না। অনেক হয়েছে এসব!" --- ঠিক এটাই বলতে চেয়েছিলো নওলকিশোর। কিন্তু রুচিরাকে চটিয়ে ফেললে গোটা ব্যাপারটাই ভেস্তে যাবে। তাই সে বলে - "হ্যাঁ। মশারী খাটানোর ডান্ডাগুলো অবশ্য পরে লাগানো। শুরুতে ওগুলো ছিল না।" রুচিরা আবার বিছানা থেকে ওঠে। হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যায় টিভিটার দিকে। নওলকিশোরও তাই করে। ঠিক টিভির সামনে গিয়ে দাঁড়ায় রুচিরা। বলে, "ফ্ল্যাটস্ক্রিন ! এটা তো বেশ নতুন মনে হচ্ছে।" কেন রে বাবা ! তুই কি মাঝরাত্তিরে চুরি করতে আসবি নাকি আমার বাড়িতে? --- গা জ্বলে যাচ্ছে নওলকিশোরের! "তাও বছর চারেক হয়ে গেলো। আগেরটা বিপিএল ছিল। চোদ্দ ইঞ্চি। এটা একুশ।"

এই চলেছে এসেত্থেকে! রুচিরা প্রশ্ন করছে, নওলকিশোর উত্তর দিচ্ছে। রুচিরা বসছে, নওলকিশোর বসছে। রুচিরা উঠে হাঁটতে শুরু করছে, নওলকিশোরও যাচ্ছে পিছন পিছন। গোটা ব্যাপারটাই ঘটছে শরীরের মধ্যে ছ' থেকে দশ ইঞ্চি ব্যবধান রেখে। একধরণের শৈল্পিক মানসিক অত্যাচারের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে ব্যাপারটা এতক্ষণে। আর কতক্ষণ? পিছনফিরে নওলকিশোরের দিকে তাকিয়ে হাসে রুচিরা। ফুটখানেকেরও কম দূরত্ব তাদের ঠোঁটদুটির মধ্যে। নওলকিশোরের ইচ্ছা হয় রুচিরার কোমরে আর পিঠে তার হাতদুটো রেখে ঠোঁটে চুমু খেয়ে ফেলতে। কিছুটা বলপ্রয়োগ করেই। তারপর চুমু খেতে খেতে নিজের শরীরের ভারে রুচিরার শরীরটাকে কোমর থেকে বেঁকিয়ে পিছনদিকে ঝুঁকিয়ে দিতে; ভি জে ডে ইন টাইম স্কোয়ার ছবিটার মতো। কিন্তু সে করে না। কারণ নওলকিশোর নাবিক নয়। জাপান আত্মসমর্পণও করেনি আজ ভারতের কাছে। কোনো যুদ্ধই চলছে না কোথাও, বিজয়-ফিজয় তো পরের কথা। অন্তত ক্রিকেট বিশ্বকাপটাও যদি চলতো না হয় একটা কথা ছিল। রুচিরা যদি কিছু মনে করে এরকম করলে।চুমু যে তারা আগে খায়নি তা নয় কিন্তু আজ তো চুমুটা শুধু শুরুয়াৎ। অন্তত সেরকমই তো হওয়ার কথা ! কিন্তু কথা সেদিকে এগোলে তো !

- "আমার ঘরটা দেখবে না"? ব্যাপারটাকে ত্বরান্বিত করার একটা বুদ্ধি খেলে যায় নওলকিশোরের মাথায়।
- "তোমার ঘর? কোথায়?"
- "নিচে।"
- "নিচে ঘর আছে? ওঠার সময় দেখলাম না তো"?
- "সিঁড়ির আড়ালে। যাবে?"
- "যাবো। আগে জল খাওয়াও একটু।"
নওলকিশোর ফ্রিজ থেকে একটা ঠান্ডা জলের বোতল এনে দেয় রুচিরাকে। ঢকঢক করে অনেকটা জল খেয়ে ফেলে রুচিরা।গোটা সময়টা জুড়ে নওলকিশোর তার গলার দিকে তাকিয়ে ছিল। আর দেখছিলো ওই মাঝখানের হাড়টার ওঠানামা। তার ইচ্ছা করছিলো কামড়ে ধরতে। অথবা গলার একদম নিচ থেকে থুতনি পর্যন্ত জিভ বুলিয়ে দিতে। কেন তার অনেক বড় একটা জিভ নেই !

জল খাওয়া শেষ হলে রুচিরা বলে, "চলো"। মা'র কথা এতো বাধ্য ছেলের মতো কোনোদিন শোনেনি নওলকিশোর। রুচিরা চলো বলতেই সে চলতে শুরু করে দেয়। নিজের বুদ্ধির প্রশংসা করতে ইচ্ছে হয় তার। এই ব্যাপারটা এতক্ষন কেন মাথায় আসেনি ! সত্যিই তো ! তার ঘরটাই তো দেখানো হয়নি রুচিরাকে। যদিও দেখার মতো বিশেষ কিছুই নেই সেখানে। দেওয়ালে একটা পোস্টার লাগানো আছে বেশ পুরোনো। শচীন আর সৌরভ একসাথে। আরেকদিকে দেওয়ালের মধ্যে তাক করা রয়েছে তিনটে। সেখানে বইখাতা রাখা থাকে। ওই তাকগুলোর একটাতেই একটা টেপরেকর্ডারও রয়েছে। তার পাশে কিছু ক্যাসেট। ক্যাসেটগুলো এখন আর চলে না। রেকর্ডারটাও খারাপ হয়ে গেছে। তবে এফএম ধরে বেশ পরিষ্কার। তাই রেখে দেওয়া আছে এখনও। গ্রাজুয়েশন-এ ফার্স্ট ক্লাস নিয়ে বেরোতে পারলে একটা আইপড পাওয়া যাবে; বহুবছরের আন্দোলন-অনশন শেষে বাবাকে রাজি করানো গেছে। তখন বিদায় করা যাবে টেপরেকর্ডারটাকে। এছাড়া আর আছে বলতে একটা খাট, একজন মানুষের শোওয়ার মতো। আজ সকাল অবধি সেই খাটের এককোণে ডাঁই করে একগাদা জামাকাপড় রাখা ছিল। সেই জামাকাপড়ের স্তূপটা বেশ দেখার মতো হয়েছিল বটে। ওরকমটা অবশ্য প্রায়ই হয়। কিন্তু আজ রুচিরা আসবে বলে নওলকিশোর সব জামাকাপড় একটা বালতিতে ভরে ওপরে মা'র বাথরুমে রেখে এসেছে।

দরজা খোলে নওলকিশোর। রুচিরা এক পা এক পা করে ঢোকে ঘরটাতে। গরমকালে দিনের এই সময়টা ঘরটায় একটা ভ্যাপসা গন্ধ হয়ে থাকে সাধারণত। আজ অবশ্য অতটাও নেই। কারণ রুচিরাকে আনতে যাওয়ার আগে প্রানভরে সেখানে প্রায় একবোতল পারফিউম ছেটানো হয়েছে। রুচিরা পুরোপুরি ঘরে ঢুকে গেলে নওলকিশোরও ঢোকে। তারপর দরজাটা বন্ধ করে দেয়।
ছিটকিনি তুলে পিছন ফিরে সে দেখে রুচিরা তার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু একটা বলা দরকার, ভাবে সে। কিন্তু কি বলবে বুঝতে পারে না। আচ্ছা, রুচিরা কেন কিছু বলছে না? কেন সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে? তবে কি সে নওলকিশোরের এগোবার অপেক্ষায়? এগোতে তো পারেই নওলকিশোর। কিন্তু রুচিরা যদি সেটার অপেক্ষায় না থেকে থাকে তাহলে? যদি অন্য কোনো কারণ থেকে থাকে তার চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকার? মেয়েরা এতো জটিল কেন; ভাবে নওলকিশোর। মাথায় কি চলছে বললেই তো পারে ! এমনটাতো নয় যে সে বুঝতে পারছে না তারা এই ঘরে কেন এলো, দরজা কেন বন্ধ করা হলো, ইত্যাদি। এতো জটিলতা সৃষ্টি করার কি আছে কে জানে বাবা !

- " বসবে না?" হাতের ইশারায় খাটটা দেখিয়ে বলে নওলকিশোর। রুচিরা তাও কিছু বলে না। পায়ে পায়ে এগোতে যায় খাটের দিকে। ঠিক এই সময় বুদ্ধিটা চকিতে খেলে যায় নওলকিশোরের মাথায়। সঠিক মূহুর্তে রুচিরার পায়ের সামনে একটা পা এগিয়ে দেয় সে। রুচিরা পড়ে যেতে যেতে খাটটাকে ধরে ফেলে ঠিকই, কিন্তু পুরোপুরি টাল সামলাতে পারে না। পরক্ষণেই কিছু একটাতে হোঁচট খেয়েছে এমন একটা ভান করে নওলকিশোর তার গায়ের ওপর এসে পড়ে। খানখান শব্দে হেসে ওঠে রুচিরা। সেই হাসির আওয়াজে নওলকিশোরের কানের পর্দা গলে গিয়ে গলা দিয়ে নেমে পাঁজরে এসে জমা হয়। তার ফুসফুসের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরতে থাকে রুচিরার হাসি। কে তাকে এই হাসির মানে বলে দেবে !

- "এরকম জোর করে মোমেন্ট ক্রিয়েট করার না কোনও মানে হয় না", বলে রুচিরা। নওলকিশোরের শরীরের নিচ থেকে সরে যাওয়ার কোনও চেষ্টা দেখায় না সে। তার চোখের অভিব্যক্তি পড়ার চেষ্টা করে নওলকিশোর। তারপর চুমুটা খেয়েই ফেলে। বেশ জোরেই। - " কি করবো? নিজে থেকে তো কিছুই ক্রিয়েট হচ্ছিলো না !"
- "তুমি একদম ধৈর্য্য ধরতে পারো না, না?" --- এই প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়না নওলকিশোর। সে তখন রুচিরার গলার মাঝখানের ওই হাড়টায় চুমু খেতে ব্যস্ত। তাছাড়া উত্তর হয়ও না। কতটা ধৈর্য্য সে ধরেছে তা একমাত্র সেই জানে। অন্য কেউ বুঝবেও না। রুচিরার শার্টের বোতামগুলো খুলতে যায় নওলকিশোর। কিন্তু এ কি ! বোতামগুলো খুলছে না কেন?
- "ওভাবে নয় !" বলে রুচিরা, "ওগুলো হুক।" তা হুকই যদি হবে তাহলে ওপরে ওরকম ফলস বোতাম বসিয়ে লোকজনকে বিভ্রান্ত করার কি মানে ! মেয়েদের ব্যাপারস্যাপার একদম বুঝতে পারে না নওলকিশোর। রুচিরা তার জন্য ওপর থেকে তিনটে হুক খুলে দেয়। নওলকিশোরের মাথার ভিতর তখন সূর্যাস্তের আলোয় একটি গোল্ডেন রিট্রিভার সমুদ্রের পাড়ে বালি খুঁড়ে চলেছে। সে রুচিরার জামাটাকে একদিকে টেনে ধরে তার কাঁধে আলতো করে একটা কামড় বসায়।

- " উফ! নকুল !"

শক খেয়ে ছিটকে সরে আসে নওলকিশোর। কেসটা কি হলো ! সে ঠিক শুনলো কিনা এটা বুঝে ওঠার আগেই আরও ভয়ানক একটা ঘটনা ঘটে যায়। দরজায় খুট করে আওয়াজ হয় একটা। ইস ! মূলদরজার ছিটকিনিটা ভিতর দিক থেকে তুলে রাখা উচিত ছিল। কেন যে মাথায় আসেনি ! নির্ঘাত মা। মা না মাওবাদী কে জানে ! হাতের ইশারায় রুচিরাকে চুপ থাকতে বলে ঘর থেকে বাইরে বেরোয় নওলকিশোর। দেখে মাওবাদী নয়, এক্কেবারে আমেরিকার আক্রমণ ঘটে গেছে অতর্কিতে।
- তুমি এতো তাড়াতাড়ি?
- কেন তোর আপত্তি আছে নাকি?
- না, এই সময় তো ফেরো না কখনও।
- "শরীর খারাপ লাগছিলো। তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়েছি।" --- জুতো খুলতে খুলতে বলে বাবা। তারপর সিঁড়ি দিয়ে সোজা উপরে উঠে যায়। ভাগ্যিস রুচিরার জুতোটা খেয়াল করেনি ! নওলকিশোর জানে, ঠিক দশমিনিট বাদে বাবা বাথরুমে যাবে। সেই ফাঁকে রুচিরাকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে। নাহলে তার কপালে যে আজ কি নাচছে সেকথা আর স্পষ্টভাবে ভেবে উঠতে পারে না নওলকিশোর। ভাবতে চায় ও না সে সত্যি বলতে। হাতের পাতার উল্টোদিকটা দিয়ে কপালের ঘাম মোছে নওলকিশোর। তার সাথে বারবার এরকমটা কেন হয় কে জানে !
১২

একজন সত্যকাম লেখক প্রকৃত অর্থেই সত্যলিপ্সু। স্বভাবতই তিনি সত্যনিষ্ঠও বটে। তাঁর বয়ান কোনওভাবেই পক্ষপাতদুষ্ট নয়। নির্দিষ্ট একটি চরিত্রের পক্ষ নিতে তিনি অপারঙ্গম। তবে তার অর্থ এই নয় যে এই আখ্যানের চরিত্রদের প্রতি তিনি নির্দয়। বরঞ্চ প্রতিটি চরিত্রের মস্তিস্ক, হৃদয় এবং প্রতিটি দৃষ্টিকোণের মনঃসমীক্ষণগত উৎসবিন্দুতে তাঁর অবাধ গতায়াত বললে মিথ্যা বলা হয়না। ঠিক সেই কারণেই একই সাথে তিনি প্রত্যেকেরই পক্ষ নিয়ে ফেলেন। ফলতঃ তাঁর বিবরণীতে নির্মিত হয়ে ওঠে না কোনও নায়ক অথবা খলনায়ক, স্থাপিত হয় না কোনও বিজয়ী-বিজিতের সম্পর্ক। আখ্যানের প্রতিটি চরিত্র পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও নিজ নিজ কাহিনীতে একে অপরের নিরপেক্ষভাবে অগ্রসর হয়ে চলে। তাঁর বিবরণী, প্রকৃতপ্রস্তাবে, প্রকৃতের সর্বাপেক্ষা নিকটতম প্রতিলিপি। এই গুরুদায়িত্বের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে তাঁকে সাহায্য নিতে হয় আপাতভাবে অবাস্তব অনেকানেক উপাদানের।অবাস্তব শব্দটির অন্দরের মূল উপাদান বাস্তবের ধারণা। আবার বাস্তবের চেয়েও বেশি অবাস্তব আর কোনওকিছুই কি? বাস্তব এবং অবাস্তব আদপেই দুটি সমান্তরাল ধারণা নয়। বাস্তবের ধারণা হতেই অবাস্তবের ধারণার উৎপত্তি। সর্বোপরি, দুটিই ধারণামাত্র। ধারণা এবং প্রকৃত, কোনোভাবেই অভিন্ন নয়। প্রকৃত হতে ধারণার আহরণ ও নির্মাণ ঘটে। প্রকৃতের নিকটে পৌঁছতে তাই বাস্তব অবাস্তব ইত্যাদি অবান্তর ধারণাগুলোকে অগ্রাহ্য করাই অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায়।
১৩

অবশেষে আমরা দ্বিতীয় পর্বের অন্তিমভাগে এসে উপস্থিত হয়েছি। অন্তিমভাগ, কারণ এরপর আমাদের তৃতীয় পর্বে চলে যেতে হবে। লেখা কখনও শেষ হয় না। লেখা জোর করেই শেষ করতে হয়; সেসব আমরা আগেই আলোচনা করেছি।তবে গল্পগুলো শেষ করে যাওয়া প্রয়োজন কারণ এই পর্বের কিছু গল্প পরবর্তী পর্বে আর ফিরে আসবেনা। কেন আসবেনা তার যথাযথ কারণ রয়েছে যা কিনা কাঠামোগত। পঠনকারীর সেসব না জানলেও চলবে। যদি কোনো সমালোচকের হাতে পরে থাকে এই আখ্যান আশা রাখছি তিনি যথেষ্ট দুঁদে এবং কারণটি খুঁজে নিতে সক্ষম হবেন। আর তিনি যদি তা না পারেন সেক্ষেত্রে আগে থেকেই তাঁকে দুয়ো দিয়ে রাখা গেলো।

প্রথমে আসা যাক রংলির কথায়। এই পর্বে তার গল্প ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছে। কলকাতায় ঘরভাড়া নিয়ে চলে গিয়েছে সে। সপ্তাহান্তে যখন সে ফেরে হুগলীর বাড়িতে হাতে করে কোনোদিন মাছ কোনোদিন মাংস নিয়ে ফেরে। কখনও ফিরতে না পারলে পাড়ার পিসিওতে জানিয়ে দেয় ফোন করে। ঘটনাচক্রে পিসিওটি একটি মুদির দোকানও বটে যার মালিকের নাম চন্দন। চন্দন মুদির সাথে রংলির ইতিহাস অনেক পুরোনো। এরপর যত দিন যাবে রংলির না ফেরা সপ্তাহগুলোর সংখ্যা বাড়তে থাকবে। তারপর একদিন আসবে সেই পার্সেল যার কথা আমরা তৃতীয় পর্বে পড়বো। আপাতত এটুকুই।

এই পর্বে অসমাপ্ত গল্পদুটির একটি নওলকিশোরের এবং অপরটি অভিমন্যুর। অভিমন্যুর গল্পটি পরবর্তী পর্বেও চলতে থাকবে। তবে তার মানে এই নয় যে এই পর্বে তার গল্পটিকে একটি মোক্ষম জায়গায় নিয়ে গিয়ে শেষ করা হবে না। নিশ্চয়ই হবে। কিন্তু পরে। তার আগে আমরা জেনে নেবো ঠিক কিভাবে ভেঙে গেলো নওলকিশোর আর রুচিরার সম্পর্ক।


১৩|ক) নওলকিশোর :
এসব আমাদের একেবারেই উচিত হচ্ছে না। নওলকিশোরের ব্যক্তিগত ব্যাপারস্যাপারে আমরা একটু বেশিই নাক গলিয়ে ফেলেছি।মাথায় রাখতে হবে যে, খিল্লি করাটা কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য নয়। এটা মূলত একটা ট্র্যাজিক লেখা যার একটা কাব্যিক পরিণতিও রয়েছে। সেখানে একটা উঠতি বয়সের ছেলের হাঁকুপাঁকু অবস্থা দেখে ফ্যাকফ্যাক করে হাসা বা তাকে জাজ করা মোটেই উচিত হচ্ছে না। অন্যের ব্যাপারে জাজমেন্টাল হওয়া মানুষের স্বভাব। বিশেষত কাউকে নিয়ে যদি বিস্তারিত আলোচনা হয় তাহলে তো কথাই নেই। এই অবিচারের হাত থেকে নওলকিশোরকে বাঁচাতে তাই আমরা এবার ঘটনাবলীর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পেশ করা থেকে বিরত থাকবো এবং কাহিনীটি শেষ করার দিকে মনোনিবেশ করবো।এর ফলে আমাদের মূল আখ্যানটির সাইজ দু-তিন চ্যাপ্টার মতো ছোট হয়ে যাবে হয়তো, কিন্তু তা হলেই বা; নওলকিশোরও তো আমাদেরই গড়ে নেওয়া একজন। তার মুখটি আপনি যেরকম দেখতে কল্পনা করে নিয়েছেন আমি হয়তো ঠিক সেরকমটা করিনি। তার ওই অনির্দিষ্ট মুখটির দিকে চেয়ে এইটুকু সুবিচার তো আমরা করতেই পারি। তাই না? ভাবুন নওলকিশোর আপনাকে বলছে, " না হয় আমার বয়স মাত্র কুড়ি, না হয় আমার জন্ম একটি মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে, তাই বলে কি আমার কোনো যৌনচাহিদা থাকতে পারে না? কোনো যৌনজীবন থাকতে পারে না? থাকলেই বুঝি সেসব পাঁচকান করে আপনাকে কেচ্ছা বানাতে হবে? রাষ্ট্র কিন্তু আমাকে এই অধিকার দেয়। সেদিন আমার আর রুচিরার মধ্যে কি হয়েছিল তা নিয়ে জলঘোলা করার আপনার কোনো অধিকার নেই ! "

না, ঘাবড়াবেন না। আমরা পশুপ্রেমী।বেড়াল আমাদের ভারী প্রিয়। বেড়ালকে আমরা সাধারণত আদর করে থাকি। তাই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের "বেড়া" গল্পটিতে আক্ষরিক অর্থে যা ঘটেছিলো এখানে সেরকম কিছু ঘটানোর অভিসন্ধি আমাদের নেই। তাছাড়া পর্বের শুরুতে ম্যাও যখন শোনা গেছে তখন নিশ্চিত থাকুন, বেড়াল আছেই। আমরা ফাঁকা আওয়াজ দিই না। তবে কিনা সেই বেড়ালের কেমন রং, কত বয়স, এবছর কটা বাচ্চা দিলো, সেইসব আলোচনা থেকে আমরা বিরত থাকবো। এতে খানদুয়েক সুবিধা হবে। আপনার যা জানার আপনি জেনে গেলেন, আবার আব্রুও রইলো। নইলে নওলকিশোরের পর এবার যদি স্বয়ং রুচিরাদেবীও এসে মুখ খোলেন তাহলে কিন্তু আমাদের আর মুখ লোকানোর জায়গা থাকবে না। বিশ্বাস করুন, রুচিরার পেলব স্তনযুগলের একটা পরিপাটি বর্ণনা লিখতে আমারও ইচ্ছা করছে, সেই প্রথম দিন থেকেই করছে, কিন্তু রুচিরাও ঠিক তারই অপেক্ষায় আছে কিনা বুঝতে পারছি না। যদি না থেকে থাকে তাহলে কিন্তু লেখাটা একেবারেই উচিত হবে না। মেয়েরা বড়ই জটিল। একশভাগ নিশ্চিত না হয়ে ওইসব ফাঁদে পা দেওয়ার মাল এই শর্মা নয়।

অনেককিছুই এর ফলে রসিয়ে বলা হবে না। নওলকিশোরের দ্বিধা, নওলকিশোরের উত্তেজনা, সবই ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে যেতে হবে। না হয় অন্য কোনো সময় অন্য কোন লেখায় বলা যাবে সেসব। এমনিও বলা হয়নি সবকিছু। মোক্ষম সময়ে ফস্কে গেছে। যেমন ঘরের দেওয়ালে শচীন-সৌরভের পোস্টারটার কথা বলা হলেও বইয়ের তাকে নীললোহিতের বইগুলোর কথা বলা হয়নি। জন লেনন আবিষ্কারের কথা বলা হয়নি। রুচিরা চলে আসায় ফোকাস নড়ে গেছে। যাই হোক ! এমনিও কোন শালা নোবেল পাবে বলে লিখছে !

সেদিনকার কথা থেকেই শুরু করা যাক। রুচিরাকে সেফলি বর্ডার পার করে দেওয়া গেছিলো । আমেরিকা টেরও পায়নি। কিন্তু নওলকিশোরের ৯/১১ যে পুরোপুরি সফল হয়নি সে তো বোঝাই যাচ্ছে। তো এরকম কেসে যা হয় আরকি, আবার প্ল্যানট্যান করা শুরু হয়ে যায়। এই প্ল্যান করতে গিয়েই সেদিন রাত্রে নওলকিশোর এক কান্ড করে বসলো। আমরা জানি যে লাভমাত্রেই জিহাদ, আর জঙ্গিমাত্রেই পুরুষ। তার ওপর কিশোর যখন নওল তখন জঙ্গ যে একদিন ছেড়বারই ছিল সে তো জানা কথা। কিন্তু সে যে এরকম ফাঁকা ময়দানে ফিদায়েঁ হবে কে জানতো ! সকলের স্মরণে থেকে থাকবে যে নওলকিশোরের কাছে ছিল তিনটি কন্ডোম। সেদিন রাত্রে সবাই শুয়ে পড়ার পর সে ভাবলো, মানে সে যেরকম ভেবে থাকে আরকি, "একদিন তো পরতেই হবে"! এইকথা ভেবে সে তার এরোপ্লেনটিকে কন্ডোম পরালো। তারপর সেই কন্ডোমাচ্ছাদিত এরোপ্লেন দেখে তার যে কি হয়ে গেলো কে জানে ! গোটা শরীরে সে এক আজব শিহরণ ! তার ওপর আবার মাথায় "লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান" কি "কাশ্মীর মাঙ্গে তো চিড় দেঙ্গে" টাইপ আলবাল চিন্তা তো ছিলই। তার এরোপ্লেন হঠাৎ টাওয়ার টাওয়ার টাওয়ার চাই / টাওয়ার ভেঙে বাঁচতে চাই বলে স্লোগান দিতে লাগলো। এগুলো বেশি এসএফআই করার ফল ! কিন্তু নওলকিশোর তখন টাওয়ার কোথায় পায় ! টাওয়ার চাইলেই যদি টাওয়ার মিলতো তাহলে কি আর এতো বাওয়ালি থাকতো পৃথিবীতে ! ফলতঃ যা হওয়ার তাই হলো; মরুভূমিতে প্লেনক্র্যাশ ! জগতের প্রভু শ্রী শ্রী জগন্নাথদেব যা করতে পারেন না তাই করলো নওলকিশোর নিতান্তই জীবনে প্রথমবার কন্ডোম পরার আনন্দে।

এইখান থেকে একটা নতুন গল্প শুরু হতে পারতো। ধরা যাক রুচিরা পরদিন দেখলো যে প্যাকেটের ভিতর থেকে একটি কন্ডোম উধাও। সেখান থেকে তার মনে দানা বাঁধলো সন্দেহ। সেই থেকে ব্রেক-আপ। কিন্তু না! সেরকম কিছু ঘটেনি। কারণ সেরকম কিছু ঘটলে তা অতি সাধারণ ঘটনা হতো। তার মধ্যে কোনো নওলকিশোরেস্ক থাকতো না। সেক্ষেত্রে আমরা বলতেও যেতাম না অমন তুচ্ছ ঘটনার কথা। এই কন্ডোমানন্দ মহোৎসবের রাত্রির মাসখানেক পরেই ব্রেক-আপটা হয় তৃতীয় কন্ডোমটির ব্যবহার যেদিন হওয়ার কথা ছিল সেই দিনে।

নওলকিশোর রুচিরাকে জানিয়েছিল তার আপত্তির কথা। প্রায়ই ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে তাকে নকুল বলে ডেকে ফেলছিলো রুচিরা। এই নিয়ে তাদের মধ্যে খানিক আলোচনাও হয়। রুচিরার অন্যতম যুক্তি ছিল এই যে, ওইরকম সময়ে উচ্চারণ করার পক্ষে নওলকিশোরের গোটা নামটি রীতিমতো বড়। শুধু কিশোর বলে তার পক্ষে ডাকা সম্ভব নয় কারণ ওই নামে তার এক পাতানো ভাই রয়েছে ছোটবেলা থেকেই। আর শুধু নওল তো কোনোভাবেই বলা সম্ভব নয় কারণ ওই নামটা কিরকম যেন ওল ওল শুনতে। ফিলিং ড্যামেজ হয়ে যাবে। আর তাছাড়া নকুল নামে নওলকিশোরের কিই বা আপত্তি থাকতে পারে সেটা যখন তারই ডাকনাম? "জানি না ! নামটা আমার কোনোদিনই পছন্দ ছিল না ", বলেছিলো নওলকিশোর। তার সাথে এটাও জানিয়েছিল যে প্রবলেমটা কিন্তু সিরিয়াস। রুচিরা আশ্বাস দিয়েছিলো সে ব্যাপারটা মাথায় রাখবে। কিন্তু এতেও শেষরক্ষা হয়নি। ধৈর্যচ্যুতিটা ঘটে রুচিরার তরফেই। ভেবে দেখলে সেও কিন্তু বানিয়ে বলছিলো না। "উঃ নকুল" আর "উঃ নওলকিশোর", এই দুইয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক। বিশেষ করে কোন সময় উচ্চারিত হচ্ছে সেই মুহূর্তটির কথা মাথায় রাখতে হবে। নকুল আমাদের আপনজন, আর নওলকিশোর যেন ঊনবিংশ শতকের বিলেতফেরত ব্যারিস্টার; মিলিয়ে যাওয়া দূরবর্তী ছায়াপথের কোনো নবীন নীহারিকা, অথবা গত শতকের গোড়ার দিকে ব্যবসার কাজে পর্তুগাল গিয়ে আর ফিরে না আসা কোনও নাবিক। মোট কথা সে যেই হোক না কেন তার সাথে আমাদের কোনও কানেকশনই নেই।
তাছাড়া এফোর্টটার কথাও ভাবতে হবে। সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। "উঃ নওলকিশোর" বলাই যায় অস্ফুটে, শুনতে ভালোও লাগে। কিন্তু সেটা একটা শান্ত মুহূর্তে বলার ব্যাপার। উথালপাথাল সময়ে যখন কিনা নওল একদিকে কিশোর আরেকদিকে, গোটাটা একসাথে বলে উঠতে পারা ভারী মুশকিলের কাজ।

এই কারণেই শীৎকার সর্বদাই খুব সহজ শব্দের মাধ্যমে নির্গত হয়, সাধারণত একটি স্বরবর্ণ এবং বিসর্গ। ভিনদেশীরা অবশ্য দুইটি স্বরবর্ণ এবং বিসর্গও ব্যবহার করে থাকে, সে ওদের ব্যাপার আলাদা; কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে পৃথিবীর কোনোও নর বা নারীই শীৎকারের সময় জটিল ব্যঞ্জনবর্ণসমূহ ব্যবহারিয়া চিৎকারে না। প্রাঞ্জলতাঃ, কুঝ্ঝটিকাঃ, অথবা রঁদেভুঃ, দেজাভুঃ, কিংবা ডেক্সটারিটিঃ, অ্যানোনিমিটিঃ, এসব বলিয়া কোনো জাতির পুরুষ বা স্ত্রীলোকই শীৎকারেন না। এর মধ্যে একমাত্র রঁদেভুঃ আর দেজাভুঃ এইদুটির ব্যাপারে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ফরাসীরা সব পারে। ওরা রুচিরার চেয়েও বেশি জটিল। যাই হোক, ঠিক এই কারণেই যৌনরোমাঞ্চের সময় কাউকে "নওলকিশোর" উচ্চারণ করতে বাধ্য করতে চাওয়াটা একপ্রকার স্যাদিসম। আর আমাদের নকুল ঠিক সেইটাই করতে গিয়েছিলো রুচিরার সাথে। বলাবাহুল্য, ফল ভালো হয়নি। এইধরণের নির্যাতন রুখতেই বোধ করি আগেকার দিনে ভারতীয় নারীদের স্বামীর নাম মুখে আনা পাকাপাকিভাবে বারণ করে দেওয়া ছিল। হায় সেই বিধান যদি আজও কার্যকর থাকতো সম্পর্কটা বেঁচে যেত হয়তো বা !

এই কাহিনীর ক্লাইম্যাক্স কিছুটা এরকম যে, তৃতীয় কন্ডোমটির অস্তিত্ব যখন তার সার্থকতা খুঁজে পাচ্ছে সেরকম অবস্থায় রুচিরা যথারীতি ওই নিষিদ্ধ উচ্চারণটি করে বসে। করে অবশ্য সাথে সাথেই সে সরি ও বলে। কিন্তু ততক্ষনে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। বাসুদেব দাশগুপ্তর "বাবা" গল্পে সঙ্গমরত অবস্থায় বাচ্চাকে বৌ দুধ খাওয়াতে শুরু করায় পরিতোষের যা হয়েছিল আমাদের নকুলেরও ঠিক সেটাই হয় রুচিরার মুখে পুনর্বার নিজের ডাকনামের উচ্চারণ শুনে।

কন্ডোমটি ভিতরেই রয়ে যায়।

রুচিরা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি। তারপর যখন সে নকুলের ঝুলে পড়া মুখ এবং এরোপ্লেন চাক্ষুষ করে সে বুঝে উঠতে পারেনি তার কি প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত। কয়েক সেকেন্ডের কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার পর সে "তুমি বাঁড়া সাইকো" বলে বিছানা ছেড়ে উঠে জামাকাপড় পরে বাড়ি যাওয়ার জন্য তৈরী হয়ে নেয়। সেদিন সে আর তাকে অটোস্ট্যান্ডে ছেড়ে দিয়ে আসার জন্য নকুলের অপেক্ষা করেনি।
নকুল অবশ্য নওলকিশোর। রুচিরার মুখে কাঁচা গালাগালি শুনে ক্ষনিকের জন্য মুষড়ে পড়লেও সেদিনের পরও সে নওলকিশোর হয়ে বেড়ানো বন্ধ করেনি। এই ঘটনার দিনদশেকের মাথায় সে আবার রুচিরার সাথে দেখা করতে চায়। তাতে রুচিরা জানায় যে সে আপাতত পড়াশোনায় মন দেওয়াই পছন্দ করবে। এর মাসখানেক পর অন্য বন্ধুদের থেকে নকুল জানতে পারে যে রুচিরাকে নাকি অন্য কোন ছেলের সাথে দেখা গেছে চন্দননগর স্ট্র্যান্ডে ফুচকা খেতে। তার হপ্তাখানেক পর সে নিজেও দেখে ছেলেটিকে। তার থেকে অনেক সুন্দর দেখতে। দেখেই মনে হয় বড়ঘরের ছেলে। একে তো পেটানো চেহারা তায় বাইকও আছে। ওই বাইকেরই পিছনের সিটে বসে ছিল রুচিরা। নকুলকে সে খেয়াল করেনি। সেটা অবশ্য ভালোই হয়েছে। কারণ নকুল তখন নাক খুঁটে খুঁটে রাস্তার ধারের বেদীতে মুছছিলো। বাইকটা ঘ্যামা দেখতে। সেটা দেখতেই তাকিয়েছিলো সে। রুচিরার ওপর বাই চান্স চোখ পড়ে যায়। হতেই পারে যে এই নতুন ছেলেটা হয়তো তার থেকে সবদিকেই ভালো, কিন্তু আমাদের নওলকিশোরও কি যে সে ! বোকা মেয়েটার জানাও হলো না যে সে ঠিক কি হারালো। রুচিরার ভাগ্যে যা লেখা ছিল না সেটা রুচিরা পেলো না। লসটা রুচিরার। ব্যাস ! পিরিওড !

১৩|খ) অভিমন্যু :

- "পুলিশের লোক হয়ে তুমি কিনা শেষে ভূতে বিশ্বাস করো"?
গাড়ির দরজা বন্ধ করে শুভাশীষের দিকে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলো অভিমন্যু। বোঝাই যাচ্ছে ব্যাখ্যাটা তার মনঃপূত হয়নি। শুভাশীষের বক্তব্য এরকম যে হোটেল রজনী নাকি একটা প্রাচীন কবরস্থানের জমিতে বানানো। মানে হোটেলটা যখন হয়েছে তখন কবরস্থানটা চালু ছিল না ঠিকই, কিন্তু পুরোনো বাসিন্দারা অনেকেই জানতেন ব্যাপারটা। কবে ছিল, কতটা জায়গা জুড়ে ছিল, সেসবের কোনো হিসেব না থাকলেও খবরটা লোকমুখে ছড়িয়ে পরে। ফলে জমিটা বিক্রি করতে মালিককে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। কেউ কেনেনি শেষ পর্যন্ত। তাই হোটেলটা উনিই বানান। তখন নাম ছিল হোটেল বেলাভূমি। দীঘার বুকে চালু হোটেল দেখে পরে একজন কিনতে রাজি হয়ে যায়। হোটেল রজনী নামটা এই নতুন ভদ্রলোকেরই দেওয়া। ওনার মায়ের নাম ছিল রজনী।
- "এবার তো তুমি বলবে লোকদুটো ভ্যানিশও হয়েছে ভূতের খপ্পরে পরে! "
- "হতেই পারে, স্যার, হতেই পারে। না হওয়ার কিছুই নেই। আপনিই বলুন না, এই ডাবের খোলার ভিতর লেখা ফুটে ওঠার আর কি ব্যাখ্যা হতে পারে ?"
শুভাশীষ বসেছে সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে। অভিমন্যু মাঝের সিটে একা। বড় এসইউভি গাড়ি। ডাবের খোলার ভিতর লেখা ফুটে ওঠার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা এই মুহূর্তে পাওয়া যাচ্ছে না বটে, কিন্তু তাই বলে শুভাশীষের এইসব আজগুবি মেনে নিতে অভিমন্যু একেবারেই নারাজ। সে বাগান খোঁড়াবার বন্দোবস্ত করছিলো বলে ভূতেরা বিপন্ন বোধ করে তাকে ডাবের খোলার মাধ্যমে বার্তাপ্রেরণ করেছে এমন চূড়ান্ত ভিত্তিহীন তত্ত্ব তার মতো পোড় খাওয়া টিকটিকির পক্ষে বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। উল্টে তার এখন মনে হচ্ছে গোটা ব্যাপারটায় এই শুভাশীষের মতো পুলিশের দু-একটা ছোটোখাটো অফিসারের হাত থেকে থাকলেও থাকতে পারে। তাই বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে মনে হয়।
- হয় তোমার মাথার ঠিক নেই, আর নয়তো তুমি নিজেও এসবে যুক্ত।
- এটা কি বলছেন স্যার! সে তো আপনিও জ্যোতিষে বিশ্বাস করেন।
- না না না না না না। আমি জ্যোতিষে বিশ্বাস করি কারণ আমি জ্যোতিষে বিশ্বাস করে ফল পেয়েছি।
- সে তো আমিও পেয়েছি।
- কি?
- কেন? ফল!
- ভূতে বিশ্বাস করে?
- হ্যাঁ !
- কিরকম?
- তাহলে শুনুন, সে অনেককাল আগের কথা। তখন আমার ধরুন ওই সাত আট বছর বয়স হবে। আমার মামাবাড়ি ছিল মালদা থেকে একটু ভিতরে, গ্রামের দিকে। তা সেখানে তো আবার অনেক আমগাছ । এইরকম একটা আমবাগানের মধ্যে দিয়ে একবার আমি আর মা ফিরছি । সন্ধে পেরিয়ে গেছে তখন। সে কি গা ছমছমে অন্ধকার ! আমি খালি ভাবছি এখানে যদি ভূত থেকে থাকে তো এক্ষুনি কিছু একটা হবে। আর মা খালি বলছে পা চালিয়ে চলতে। বলছে দিনকাল ভালো নয়। আমি তো বুঝতে পারছি মায়েরও ভূতের ভয় করছে। আর আমি ভাবছি ভূত যদি থেকে থাকে কিছু একটা তো হবেই। একটা ডাল নড়বে, কি কেউ হেসে উঠবে, কি ওরকম কিছু। ভাবতে ভাবতেই আমার ঠিক সামনে একটা আম পড়লো। আমি নিচু হয়ে আমটা তুলতে গেছি অমনি একটা ঝুপ করে আওয়াজ। পিছনফিরে দেখি, মা নেই ! আমি তো পড়ি কি মরি করে দে দৌড়। ছুটে এসে মামাদের সব কথা বললাম। সবাই মিলে লাঠিসোঁটা নিয়ে, আলো নিয়ে আমার সাথে গেলো ওই জায়গাটায়। কিন্তু মা কে আর খুঁজে পাওয়া গেলো না। তারপর থেকে আমার মাকে আর কেউ কোনোদিন দেখেনি, জানেন ! কেউ না !

অভিমন্যুর মুখটা হয়ে গেছে থম মেরে যাওয়া প্যাঁচার মতো। কি বলবে সে বুঝে উঠতে পারছে না।
- "ভাই তুমি কি বলছো বলো তো? আমার গায়ে ফায়ে কাঁটা দিচ্ছে। কিন্তু আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না ! তোমার মা মিসিং হয়ে গেলেন, আর তুমি বলছো ফল পেয়েছো? এটা কি ওই আমটার কথা হচ্ছে, নাকি "?
- "না না, আমের কথা হতে যাবে কেন? আমি বলতে চাইছি যে ভূত আছে। আমি নিজের জীবনে প্রমান পেয়েছি সেটার"।

এরপর গাড়ি এসপির অফিসে পৌঁছনো অবধি অভিমন্যুর আর কিছুই বলার ছিলো না। তার হতাশ লাগছিলো। মনে মনে শুভাশীষকে চোদু বলে গাল পারছিলো সে। "তুই সালা বালভোদুয়া। তোর পুলিশে আসাই উচিত হয়নি" বলতে ইচ্ছে করছিলো তার। গোটা ব্যাপারটাই বুঝতে পেরে গিয়েছিলো সে, কিন্তু শুভাশীষের মুখের দিকে তাকিয়ে তার এতবছরের ভুল ধারণাটা আর ভেঙে দিতে ইচ্ছা করলো না । এখনও এতটাও পেশাদার সে হয়নি।

এসপি অফিসে অভিমন্যু নেমে যাওয়ার পর শুভাশীষ একটা হাত বাড়িয়ে দিয়ে হাসিমুখে বললো, "ওক্কে স্যার! তাহলে আসি?" কতরকমের মানুষ হয়, ভাবছিলো অভিমন্যু। হ্যান্ডশেক করতে করতে সে উত্তর দেয়, "আসুন। ভালো লাগলো আপনার সঙ্গে কাজ করে"। "সেম হিয়ার, স্যার, সেম হিয়ার" বলতে বলতে গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিলো শুভাশীষ। তার এই হাসি লেগে থাকা মুখটা ভুলতে অভিমন্যুর মনে হয় অনেকদিন সময় লেগে যাবে। কতরকমের মানুষ হয়। তাদের জীবনের কত ঘটনা। আর একেকটা ঘটনা ঘিরে কতরকম ধারণা গড়ে নেয় মানুষ। সত্যিই !


- নিশ্চিতভাবেই জটিল কেস। না হলে আপনারা আর আমাকে ডেকে পাঠাতেন কেন!
- জটিল বলে জটিল। এ তো আলফ্রেড হিচককের গল্প মশাই। বন্ধ ঘরের ভিতর থেকে দু'দুটো মানুষ হাওয়া? কোনো মানে আছে!
- মানে আছে, সুপারবাবু, মানে আছে! সেই মানেটাই আমাদের খুঁজে বার করতে হবে। বমিটা অ্যানালাইজ করে কিছু পাওয়া গেলো?
- বিশেষ কিছুই না ! মাছভাজা আর মদ। তাছাড়া বমির দু-তিনঘন্টা আগে রুটি-মাংস খেয়েছিলো যা বোঝা যাচ্ছে। তা এতে তো আর...
- মানে মদ খেয়ে বমি ! সে তো অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। রোজই কেউ না কেউ করছে। আচ্ছা, দ্বিতীয় ব্যক্তিটি সম্পর্কে আমরা এখনও অবধি ঠিক কি জানি? কেউ খোঁজ করতে এসেছিলো তার?
- না, খোঁজ কেউ করতে আসেনি, তবে একটা স্কেচ করিয়ে রেখেছি আমরা ম্যানেজারের বিবরণ অনুযায়ী। স্কেচটা অবশ্য হুবহু মেলেনি, প্রায় কাছাকাছি আরকি। আপনি চাইলে সেটা দেখতে পারেন।
- বেশ তো, দেখান না।

এসপি ছবিটি আনানোর ব্যবস্থা করেন এবং তুলে দেন অভিমন্যু-র হাতে।
- সুপারবাবু, আপনাদের আর্টিস্টকে একবার পাওয়া যাবে?
- কেন বলুন তো?
- আমি সম্ভবত বুঝতে পারছি ঠিক কোথায় কোথায় মেলেনি। সাথে ম্যানেজারকেও আনার ব্যবস্থা করবেন। সেই তো বলবে, মিললো কিনা।
- নিশ্চয়ই।

এরপর আর্টিস্টের সাথে একটা ঘরে ঘন্টাদুয়েক কাটায় অভিমন্যু। মাঝখানে একবার শুধু তাকে জানানো হয় যে ম্যানেজার এসে গেছে। খানিক বাদে সে ম্যানেজারকেও ডেকে নেয়। তার ঠিক মিনিটদশেক পরে ম্যানেজার আর অভিমন্যু হাতে ছবিটা নিয়ে সুপারের ঘরে আসে আবার।
- "মিলে গেছে স্যার। পুরোটা মিলে গেছে এবার", ম্যানেজার বলে।
- "বাবা! আপনি তো ম্যাজিক জানেন দেখছি", সুপার বলেন অভিমন্যুর উদ্দেশ্যে। ছবিটা সুপারের টেবিলে রেখে অভিমন্যু বলে, "তাহলে সুপারবাবু, এবার আমায় কলকাতা ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিন"।
- সে কি ! এখনও তো লোক ধরাই পড়লোনা।
- ধরা যদি পড়ারই হয় তাহলে এখানকার চেয়ে কলকাতায় ধরা পড়ার সম্ভাবনাই বেশি।
- কেন?

ছবিটার ওপর একটা আঙ্গুল রেখে ঝুঁকে দাঁড়ায় অভিমন্যু। কিছু একটা বলে খুব নিচু গলায় যা আমরা শুনতে পাইনা, কিন্তু এসপি শুনতে পান, এবং বলেন, "বাবা! আপনার তো বিশাল নেটওয়ার্ক মশাই ! ঠিক আছে, তাহলে আপনাকে আর আটকাবো না।"
এরপর আরও কিছু কথা হয় সুপার আর অভিমন্যুর মধ্যে। তারপরে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের গাড়িতে চেপে বেরিয়ে পরে অভিমন্যু, কলকাতার উদ্দেশ্যে।

(দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত)


(চলবে)

শেয়ার করুন


Avatar: dc

Re: সেটা কোনো কথা নয় - দ্বিতীয় পর্ব

শুরুটা ভালো হয়েছে। একটা ভালো হরর গপ্পো চাই।
Avatar: Anamitra Roy

Re: সেটা কোনো কথা নয় - দ্বিতীয় পর্ব

একটা মারকাটারি হরর গপ্পো লিখবো একদিন নিশ্চয়ই। নাম দেব "হরর মহাদেব"! :D
Avatar: kiki

Re: সেটা কোনো কথা নয় - দ্বিতীয় পর্ব

বেশ লাগল। আগেরটাও ভাল লেগেছে। যদিও বিশেষ বুঝেছি এমনটা নয়। সেজন্য আরো ভাল।ঃ)
Avatar: সিকি

Re: সেটা কোনো কথা নয় - দ্বিতীয় পর্ব

চালিয়ে যাও দোস্ত, আমরা তোমার সঙ্গে আছি।
Avatar: Anamitra Roy

Re: সেটা কোনো কথা নয় - দ্বিতীয় পর্ব

কিকিদি, বোঝার বিশেষ কিছুই নেই সেভাবে। সমস্তটাকে বাস্তব বলে মেনে নিলেই চলবে। :D

সিকিদা, উৎসাহ পেলাম। আজ বিকেলের দিকে আরও যোগ হবে আশা করছি। :-)
Avatar: kiki

Re: সেটা কোনো কথা নয় - দ্বিতীয় পর্ব

কেলো করেছে!! তাড়াতাড়ি বার করো বাপু..........ঃ)
Avatar: Anamitra Roy

Re: সেটা কোনো কথা নয় - দ্বিতীয় পর্ব

না না। আপাতত থাক। আগে নওলকিশোর আর রংলির দিক থেকে ঘুরে আসি। তারপর ভাবা যাবে। :D
Avatar: kiki

Re: সেটা কোনো কথা নয় - দ্বিতীয় পর্ব

ঃ)
Avatar: kiki

Re: সেটা কোনো কথা নয় - দ্বিতীয় পর্ব

তারপর, তারপর???
Avatar: Anamitra Roy

Re: সেটা কোনো কথা নয় - দ্বিতীয় পর্ব

তারপর আরও খানদুয়েক পোস্ট দেওয়ার ইচ্ছা ছিল আজকে। জানি না পারবো কিনা। বিচ্ছিরি কাজের চাপ :(
দেখি, সন্ধ্যের দিকে যদি সামলে উঠতে পারি...
Avatar: kiki

Re: সেটা কোনো কথা নয় - দ্বিতীয় পর্ব

কী অদ্ভুত টিকটিকি।:DD
Avatar: pi

Re: সেটা কোনো কথা নয় - দ্বিতীয় পর্ব

সবে আজ ধরতে পেরেছি এবং খাসা লাগছে। আপাতত এটুকুই জানিয়ে গেলাম।
Avatar: Anamitra Roy

Re: সেটা কোনো কথা নয় - দ্বিতীয় পর্ব

:) পরের চ্যাপ্টার আসছে শিগগিরই তাহলে :)
Avatar: শঙ্খ

Re: সেটা কোনো কথা নয় - দ্বিতীয় পর্ব

ফাটাফাটি!!
Avatar: Anamitra Roy

Re: সেটা কোনো কথা নয় - দ্বিতীয় পর্ব

:)
Avatar: aranya

Re: সেটা কোনো কথা নয় - দ্বিতীয় পর্ব

ভাল হচ্ছে। প্রথম পর্ব-ও আজই পড়লাম
Avatar: Anamitra Roy

Re: সেটা কোনো কথা নয় - দ্বিতীয় পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব শেষ হয়েছে কাল। তৃতীয় পর্ব আসবে, তবে কবে থেকে এখনো জানি না। চলে এলে হইচই জুড়ে দেব। খবর পৌঁছে যাবে আশা রাখি। :)


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন