Indranil Ghosh Dastidar RSS feed

Indranil Ghosh Dastidarএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • সুইডেনে সুজি
    আঁতুরঘরের শিউলি সংখ্যায় প্রকাশিত এই গল্পটি রইল আজ ঃদি গ্ল্যামার অফ বিজনেস ট্রাভেল সুইডেনে সুজি#############পিও...
  • প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজঃ সর্বজয়া ভট্টাচার্য্যের অভিজ্ঞতাবিষয়ক একটি ছোট লেখা
    টেকনো ইন্ডিয়া ইউনিভারসিটির এক অধ্যাপক, সর্বজয়া ভট্টাচার্য্য একটি পোস্ট করেছিলেন। তাঁর কলেজে শিক্ষকদের প্রশ্রয়ে অবাধে গণ-টোকাটুকি, শিক্ষকদের কোনও ভয়েস না থাকা, এবং সবথেকে বড় যেটা সমস্যা, শিক্ষক ও ছাত্রদের কোনও ইউনিয়ন না থাকার সমস্যা নিয়ে। এই পর্যন্ত নতুন ...
  • চিরতরে নির্বাসিত হবার তো কথাই ছিল, প্রিয় মণিময়, শ্রী রবিশঙ্কর বল
    "মহাপৃথিবীর ইতিহাস নাকি আসলে কতগুলি মেটাফরের ইতিহাস"। এসব আজকাল অচল হয়ে হয়ে গেছে, তবু মনে পড়ে, সে কতযুগ আগে বাক্যটি পড়ি প্রথমবার। কলেজে থাকতে। পত্রিকার নাম, বোধহয় রক্তকরবী। লেখার নাম ছিল মণিময় ও মেটাফর। মনে আছে, আমি পড়ে সিনহাকে পড়াই। আমরা দুজনেই তারপর ...
  • বাংলা ব্লগের অপশব্দসমূহ ~
    *সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: বাংলা ব্লগে অনেক সময়ই আমরা যে সব সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করি, তা কখনো কখনো কিম্ভুদ হয়ে দাঁড়ায়। নতুন ব্লগার বা সাধারণের কাছে এসব অপশব্দ পরিচিত নয়। এই চিন্তা থেকে এই নোটে বাংলা ব্লগের কিছু অপশব্দ তর্জমাসহ উপস্থাপন করা হচ্ছে। বলা ভালো, ...
  • অ্যাপ্রেজাল
    বছরের সেই সময়টা এসে গেল – যখন বসের সাথে বসে ফর্মালি ভাঁটাতে হবে সারা বছর কি ছড়িয়েছি এবং কি মণিমুক্ত কুড়িয়েছি। এ আলোচনা আমার চিরপরিচিত, আমি মোটামুটি চিরকাল বঞ্চিতদেরই দলে। তবে মার্ক্সীস ভাবধারার অধীনে দীর্ঘকাল সম্পৃক্ত থাকার জন্য বঞ্চনার ইতিহাসের সাথে আমি ...
  • মিসেস গুপ্তা ও আকবর বাদশা
    এক পার্সি মেয়ে বিয়ে করলো হিন্দু ছেলেকে। গুলরুখ গুপ্তা তার নাম।লভ জিহাদ? হবেও বা। লভ তো চিরকালই জিহাদ।সে যাই হোক,নারীর ওপর অবদমনে কোন ধর্মই তো কম যায় না, তাই পার্সিদেরও এক অদ্ভুত নিয়ম আছে। ঘরের মেয়ে পরকে বিয়ে করলে সে স্বসম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ ...
  • সমবেত কুরুক্ষেত্রে
    "হে কৃষ্ণ, সখা,আমি কীভাবে আমারই স্বজনদের ওপরে অস্ত্র প্রয়োগ করবো? আমি কিছুতেই পারবো না।" গাণ্ডীব ফেলে দু'হাতে মুখ ঢেকে রথেই বসে পড়েছেন অর্জুন আর তখনই সেই অমোঘ উক্তিসমূহ...রণক্ষেত্...
  • আলফা গো জিরোঃ মানুষ কি সত্যিই অবশেষে দ্বিতীয়?
    আরও একবার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের এই চিরন্তন প্রশ্নটার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে -- আমরা কিভাবে শিখি, কিভাবে চিন্তা করি। আলফা গো জিরো সেই দিক থেকে টেকনোক্র্যাট দের বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ।দাবার শুধু নিয়মগুলো বলে দেওয়ার পর মাত্র ৪ ঘণ্টায় শুধু নিজেই নিজের সাথে ...
  • ছড়া
    তুষ্টু গতকাল রাতে বলছিলো - দিদিভাই,তোমার লেখা আমি পড়ি কিন্তু বুঝিনা। কোন লেখা? ঐ যে - আলাপ সালাপ -। ও, তাই বলো। ছড়া তো লিখি, তা ছড়ার কথা যে যার মতো বুঝে নেয়। কে কবে লিখেছে লোকে ভুলে যায়, ছড়াটি বয়ে চলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। মা মেয়েকে শেখান, ...
  • ঘিয়ে রঙের চৌবনি বা ভ্রমরগাথা
    বাতাসের গায়ে লেখা (Wriiten on the Wind) নামে ছবি ছিল একটা। টসটসে রোদ্দুরের মতন ঝাঁ আর চকচকে মতন। বাতাসের গায়ে লেখা। আসলে প্রতিফলকের চকচকানি ওটা। যার ওপরে এসে পড়বে আলোর ছটা। বা, সঙ্গীতের মূর্ছনা। কিছু একটা সাজানো হবে মনে কর। তার মানে তার পোয়া বারো। এবারকার ...

গুরুচণ্ডা৯র খবরাখবর নিয়মিত ই-মেলে চান? লগিন করুন গুগল অথবা ফেসবুক আইডি দিয়ে।

দেশভাগঃ ফিরে দেখা

Indranil Ghosh Dastidar

রাত বারোটা পেরিয়ে যাওয়ার পর সোনালী পিং করল। "আধুনিক ভারতবর্ষের কোন পাঁচটা ঘটনা তোর ওপর সবচেয়ে বেশী ইমপ্যাক্ট ফেলেছে? "
সোনালী কি সাংবাদিকতা ধরল? আমার ওপর সাক্ষাৎকার মক্সো করে হাত পাকাচ্ছে?
আমি তানানা করি। এড়িয়ে যেতে চাই। তারপর মনে হয়, এটা একটা ছোট্ট খেলা। নিরাপদ। এর মধ্যে কোনো বিস্ফোরক নেই। নীল তিমি নেই। গৌরী লঙ্কেশ নেই ( না, গৌরী লঙ্কেশ তখন ভাবিনি, গৌরী লঙ্কেশ তো তার পরে ঘটল)।আমার নিমসুখী মধ্যবিত্ত জীবনে এমন ছোটখাটো খেলা সস্তা ও পুষ্টিকর। বিপর্যয়হীন। যে বিপর্যয় মানুষকে, লক্ষ লক্ষ মানুষকে এক উপমহাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জল-জঙ্গল-কাঁটাতার পেরিয়ে , সন্তানের পচা লাশ পেরিয়ে তাড়িয়ে বেড়ায়, এর মধ্যে তার আভাস নেই। আমি বলে যাবো। ও শুনবে। প্রতিপ্রশ্ন করবে। আমি হাবিজাবি আরো কিছু বলবো। তারপর ঘুম পেলে -চল, কাটি- বলে কম্পিউটার বন্ধ করে দেবো। ঘুম দেবো। ক্লোনাজেপাম দিয়ে কেনা ঘুম।
আমি আমতা-আমতা করে বলি ঃ
এই মনে কর, ভারতের স্বাধীনতা দিয়ে শুরু করি। শুধু স্বাধীনতা নয়, তার সঙ্গে দেশভাগ। দেশভাগকে ধরতেই হবে।
তারপর ... জরুরী অবস্থা আর নকশাল আন্দোলন। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা। গোধরা রায়ট।
আর সবশেষে, হ্যাঁ, সবশেষে নরেন্দ্র মোদী। পাঁচটা হল না?
-কিন্তু দেশভাগ কেন? দেশভাগ তো তুই চোখে দেখিস নি। তার এমন ইমপ্যাক্ট কিসের?

সোনালী ইচ্ছে করে নাইভ হচ্ছে। ও আমার কাছ থেকে কিছু শুনতে চায়। যা ওর কাজে লাগতে পারে। তখন কি আর জানি, সোনালী ওর নতুন নাটক নিয়ে রাত জাগছে?

সোনালী আমার বোন। পেশাগত কাজ সামলে ও একটি ছোট নাটকের দল চালায়। ওর নতুন নাটক-যা এতদিনে তৈরী হয়ে গিয়েছে- নাম "ভাঙ্গন"- আসলে এখনকার সাম্প্রদায়িক ঘৃণা নিয়ে বানানো। ও এসবের শেকড় খুঁজতে চায়।আর আমাকে ও বোধ হয় কিছু একটা ভাবে। আমি কিছু একটা বললে, কিম্বা এখান -ওখান থেকে কুড়িয়েবাড়িয়ে কিছু যোগাড় করে আনলে যদি ওর কাজের কিছু সাহায্য হয়।

বলিঃ এ সব কথা কি আর এমন চটজলদি বলা যায়? এমন মেসেঞ্জারে টাইপ করে ? সামনাসামনি কথা বলতে হবে।

কিন্তু কী কথা বলবো? কিছু কি আমি জানি, বলবার মত? অচলায়তনের আচার্যদেবের মত কি আমি বলবো-"আমার তালু যে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে " ! আমি কি স্মৃতির আশ্রয় নেবো- সেই শৈশবের ভোরে, সব তারারা তখনো নেবে নি, বাইরের রাস্তা দিয়ে বোষ্টম গান গেয়ে চলেছেন-জয় জয় রাধে, কৃষ্ণ-মধুসূদনো, আমি ঠাকুমার কোলের কাছে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছি, আর ঠাকুমার মনে পড়ে যাচ্ছে বরিশাল; মনসাপুজোয়-রয়ানী গানে মা-ঠাকুমার মনে পড়ে যাচ্ছে বরিশাল; মুসলমান ফকির আসছেন বিচিত্র -রঙা তাপ্পিমারা আলখাল্লা পরে, আপদ-বালা-মুসিবত দূর হয়ে যাবার মন্ত্র পড়ে মাথায় ফুঁ দিয়ে ঝেড়ে দিচ্ছেন চামর দিয়ে, আর মা-ঠাকুমা-পিসিমার স্মৃতি আমার মধ্যে দিয়ে কবে চারিয়ে গেছে বুঝতে না-পারা আমি মনে আনছি বরিশাল, যদিও সেদেশ কখনো চোখে দেখিনি আমি।আমি কি ছবি খুঁজবো সেলুলয়েডে, ঋত্বিক ঘটক আর নিমাই ঘোষ আর রাজেন তরফদারে? আমি কি তুলে আনবো তারাপদ রায়ের চারাবাড়ি-পোড়াবাড়ি আর শঙ্খ ঘোষের সুপুরিবনের সারি? তাছাড়া শুধু পরোক্ষই বা খুঁজতে হবে কেন, আমার আগের প্রজন্মই তো দেশভাগের সাক্ষাৎ ভুক্তভোগী, ঠাকুর্দা জলে ভাসমান শ্যাওলার মত এজায়গা-ওজায়গা করে বেড়ালেন কতকাল, সুস্থিতি এল না তাও, পিসিরা কেউ গোটা জীবনটা কাটিয়ে দিলেন অভাবে-অন্নকষ্টে। আমার রাঙা পিসিমা সেই সেকালে বাবা'র মুখের উপর বলেছিলেন- ভাত দেতে পারেন না, জন্ম দেছেন ক্যান? আমি কল্পনা করি আমার দীর্ঘদেহী ঠাকুরদা কেমন নুয়ে পড়েছেন এই করাল প্রশ্নের সামনে, কিভাবে তাঁর কর্ণমূল লাল হয়ে উঠছে চল্লিশের দশকের সেই শেষবেলায়, দেশভাগ-কলি যখন প্রবেশ করছে লাখ লাখ ভাগ্যহত নলের শরীরে। মা আজো বলেন, সেই শেষবারের মত ছেড়ে আসার কথা- ঘাটে নাও ঠেলে দিয়ে দাদু কিভাবে পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলেন পাড়ে, সঙ্গে দিদিমা, যতক্ষণ চোখ যায় ততক্ষণ। উমা চলে গেল দেশান্তরে, আর কোনো দিন তার দেখা হবে না গিরি ও গিরিজায়ার সঙ্গে। দাদু মারা গেলেন, ছোট ছোট তিন ছেলে মুখাগ্নি করল, ঐ মৃতমুখে খড়ের আগুন ছোঁয়ালো, নাভিপিণ্ড ত্রাণহীন জলে ভাসিয়ে এসে কোরা ধুতি পরে শূন্য ঘরে ঢুকলো, অভিভাবকহীন। একটা পরিবার-একটা প্রজন্ম কেটে ছড়িয়ে গেল দুই কিম্বা তিন দেশে। এখনো প্রান্তিক মানুষের অভিশাপ মাথায় নিয়ে বড় হচ্ছে আমার নিকটজনেরা। আমারই প্রজন্ম। দেশভাগের পরিণাম বয়ে-বেড়ানো তিন নম্বর প্রজন্ম। সব রক্তপাত চোখে দেখা যায় না।
সোনালী আমাকে কেমন নাড়িয়ে দিয়ে গেল। ছোট্ট খেলা। সূচের মত। অন্তর্ঘাতী। তাই কতকাল পরে আমি পড়তে বসলাম। পার্টিশন দলিলসমূহ। এই মুহূর্তে পড়ছি-ইয়াসমিন খানের ঠে রেঅত অর্তিতিওন। পড়তে চাই আরো। আর, এমনিতেই দুর্বল অশ্রুগ্রন্থি, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরো। জলপড়া থামাতে লেখার আয়োজন। অনেকদিন পরে। যখন-যেমন পারি।
-----

১৯৪৫ এর ৭ই মে ইওরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল।
জুন মাস নাগাদ কংগ্রেস নেতারা একে একে জেল থেকে বেরিয়ে এলেন। গান্ধী তার আগের বছর স্বাস্থ্যের কারণে ছাড়া পেয়েছেন। নেতারা ক্লান্ত ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে দড়ি-টানাটানি করে। ক্লান্ত বয়সের ভারেও। গান্ধীর বয়স তখন ৭৭, বল্লভভাই প্যাটেল ৭১, নেহরু ৫৭। জেলের মধ্যে বাইরের পৃথিবীর খবর এসে পৌঁছত না। জেল থেকে বেরিয়ে তাই দেশের হালচাল কেমন, বুঝে উঠতে সময় লাগছে। নেতারা, তাই কিছুটা হতভম্বও। গান্ধী তাঁর অতীতের ছায়া -একথা বললে যদি বাড়াবাড়িও হয়, এটুকু অন্ততঃ নিরাপদে বলাই যায়, ভারতের জনমানসে গান্ধীর অহিংসার আবেদন স্তিমিত হয়ে এসেছে। কংগ্রেস ততদিনে বিরাট এক ডাইনোসরসদৃশ দলে পরিণত হয়েছে। দল না বলে নানা মতের , নানা পথের গোষ্ঠীর ঘোঁট বললেও কিছু ক্ষতি নেই। দলের মাথা আছে, কিন্তু তার সঙ্গে হাত-পায়ের কোনো কোঅর্ডিনেশন নেই। নীচুতলার কর্মীরা-ছোট- মাঝারী নেতারা প্রায়শই কেন্দ্রীয় নেতাদের পাত্তা দেন না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারকে সাহায্য করতে অরাজী হয়ে কংগ্রেস ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ডাক দেয়। জনযুদ্ধের তত্বে বিশ্বাসী কমিউনিস্ট পার্টি এই আন্দোলনের বিরোধিতা করে। আর বিরোধিতা করে মুসলিম লিগ, যারা মুসলিম সুরক্ষার শর্তে ব্রিটিশকে সাহায্য করতে রাজী হয়ে যায়। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় প্রায় ষাট হাজার কংগ্রেস নেতা- কর্মী গ্রেপ্তার হন। গোটা বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন জাতীয় রাজনীতির পরিসর থেকে কংগ্রেস নেতাদের এই অনুপস্থিতির সুযোগ মুসলিম লিগ দুহাত ভরে নিয়েছিল। উপমহাদেশের মুসলমানদের ক্রেডিবল প্রতিনিধি হিসেবে তরতর করে উঠে আসে মুসলিম লিগ। লিগের এহেন প্রতিপত্তিকে আন্দাজ করতে পারেন নি জেলের মধ্যে থাকা কংগ্রেস নেতারা। ভবিষ্যতে স্বাধীনতা আর দেশভাগ নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসে দর-কষাকষি করতে গিয়ে সে ভুল তাঁদের ভাঙবে।
যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ সিংহও খুব ক্লান্ত। জয়ী, কিন্তু বিধ্বস্ত। হাওয়ায় ভাসছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা, যদিও কংগ্রেস নেতারা অনেকেই সে কথা তখনো বিশ্বাস করে ওঠেন নি। নেহরু দেশকে আসন্ন সংগ্রামের জন্য তৈরী হতে বলছেন।
'৪৬ সালে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন দিকে মোড় নিল। সুভাষ চন্দ্র বোস আর আই এন এ-র যুদ্ধপ্রয়াস নিয়ে দেশে প্রবল উত্তেজনা। ৪৫ এর নভেম্বর মাসে শাহ নওয়াজ খান, প্রেম শেহগল আর গুরবক্স সিং ধিলোঁর প্রকাশ্য বিচার শুরু হয় লাল কেল্লায়। জনমতের জোয়ারে ভেসে গিয়ে কংগ্রেস বাধ্য হল আই এন এ নিয়ে নতুন স্টান্স নিতে। কংগ্রেস ও লীগ যৌথভাবে "লাল কেল্লা ট্রায়াল"এর বিরুদ্ধে অন্দোলন শুরু করে-সেই শেষ যৌথ আন্দোলন। মহল্লায়-মহল্লায় কংগ্রেসী তেরঙ্গা আর লীগের সবুজ পতাকা একসাথে ঝুলতে দেখা যায়। তুমুল জনপ্রতিরোধের মুখে ফিল্ড মার্শাল অকিনলেক বাধ্য হন তিনজনকেই মুক্তি দিতে।

ভারতে ইংরেজ শাসনের কফিনে এই সেই শেষ পেরেক। কলোনিয়াল স্টেটের শেষ স্তম্ভ সেনাবাহিনী-কে ১৮৫৭ র পরে কোনোদিন আর এত নড়বড়ে দেখায় নি।

তপন রায়চৌধুরী লিখছেন - "আই এন এ-কে ঘিরে উত্তেজনা আমাদের কাছে নতুন সম্ভাবনার পথ দেখাল। জাতীয় ফৌজে নেতাজীর অন্যতর অবদান জাতীয়তাবাদী চেতনাকে সম্পূর্ণভাবে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত করা। যুবনেতারা দেখলেন ঐ আদর্শে এক সত্যিকার জাতীয় আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব। এ ব্যাপারে বামপন্থী ছাত্র আন্দোলন, বিশেষ করে ছাত্র ফেডারেশন যে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, সে কথা অস্বীকার করা যায় না... নভেম্বর মাসে আই এন এ দিবসে কয়েক হাজার ছাত্র ওয়েলিংটন স্কোয়ারে জমা হয়েছিল। সেখান থেকে মিছিল বের হয়ে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবেই ডালহাউসি স্কোয়ারের দিকে এগুচ্ছিল। কিন্তু ধর্মতলা স্ট্রীটে পুলিশ শোভাযাত্রাকে বাধা দিল....শোভাযাত্রীরা রাস্তার ওপর বসে পড়ে। পুলিশ শোভাযাত্রীদের ছত্রভঙ্গ হওয়ার আদেশ দেয়। সে কথায় কেউ কর্ণপাত না করায় গুলি চলে। বেশ কয়েকটি ছেলে খুনজখম হয়।....উপরিউক্ত ঘটনার প্রতিবাদে ছাত্রদের বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যৌথভাবে সভা, মিছিল, এবং ডালহাউসি অভিযানের আহ্বান হল....এবারকার প্রতিবাদ ছেলেখেলা না, মনে মনে সংগ্রামের প্রস্তুতি নিয়ে ময়দানে নামা। এসব সময় মিছিলে কত লোক শামিল হয়েছিল তার সঠিক হিসাব কখনও পাওয়া যায় না। যদি বলি কয়েক লাখ লোক মিছিলে যোগ দিয়েছিল তাহলে বোধ হয় অতিরঞ্জন হবে না। এদিনের প্রতিবাদের আর এক বৈশিষ্ট্য, সভা এবং মিছিলে ছাত্র মুসলিম লিগের এক অংশের সক্রিয় অংশগ্রহণ। ফেব্রুয়ারি মাসে রশিদ আলি দিবসে মুসলিম লিগ সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। নভেম্বর মাসে আই এন এ দিবসের পরদিন ওয়েলিংটন স্কোয়ারের সভায় কংগ্রেসের তেরঙ্গা ঝাণ্ডার সঙ্গে মুসলিম লিগের সবুজ পতাকা আর ছাত্র ফেডারেশনের লাল ঝাণ্ডা এক সঙ্গে বাঁধা হল। সেই তিন ঝাণ্ডা নিয়ে মিছিল ধর্মতলা স্ট্রিট দিয়ে কিছুটা এগুতেই , সশস্ত্র পুলিশ পথ আটকাল। শোভাযাত্রীরা পথ জুড়ে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ পরে ফরওয়ার্ড ব্লকের পক্ষ থেকে শরৎ বসু এবং কংগ্রেসি নেতা কিরণশঙ্কর রায় এলেন। তাঁরা ছাত্রদের কাছে আবেদন করলেন, "আপনারা ফিরে যান। আপনাদের দাবী যাতে যথাস্থানে পৌঁছায় তার দায়িত্ব আমরা নিচ্ছি।" কিন্তু এই আবেদনে কেউ সাড়া দিল না। নেতারা ফিরে গেলেন। তার কিছুক্ষণ পর পুলিশ ছত্রভঙ্গ হওয়ার হুকুম দিল। কিন্তু যে যেখানে বসেছিল বসেই রইল। বোধ হয় একজনও নড়ে নি। তারপর গুলি চলল-সম্ভবত একাধিকবার। কারণ পরবর্তী হিসাব অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা পঞ্চাশের উপরে, আহতের সংখ্যার ঠিক হিসেব কখনও শুনি নি।“

-----


স্বাধীনতাপূর্ব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রবলতর স্রোত যদি হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা, অন্যটি অবশ্যই হিন্দু জাতীয়তাবাদ। মুখে সেকুলারিজমের কথা বললেও কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানসিকতা যে হিন্দুত্ববাদী, সে নিয়ে খুব একটা সন্দেহের অবকাশ ছিল না। এর শুরু কোথায় জানি না, তবে বাল গঙ্গাধর তিলক ছিলেন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নরম হিন্দুত্ববাদের একজন বড়মাপের প্রবক্তা। গনেশ চতুর্থী পালন কিম্বা গোহত্যা রদের দাবী তিলক ব্রিটিশবিরোধী হিন্দু জাতীয়তাবাদকে সংহত করা কাজে লাগালেন। উপমহাদেশের মুসলিমদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রান্তে ঠেলে দেওয়ার সেই গালা সূচনা। তিলকের পথ ধরে বহু নরম হিন্দু কংগ্রেসী নেতা এসেছেন-গিয়েছেন। মদনমোহন মালব্য,বল্লভভাই প্যাটেল, পুরুষোত্তম দাস ট্যান্ডন, গোবিন্দবল্লভ পন্থ, বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদ- অনেকের নাম করা যায়।কংগ্রেসের অনেক চার-আনা'র কর্মী তো স্বরাজ বলতে বুঝতেন স্বাধীনতা প্লাস গোহত্যা রদ। স্বাধীনতার কিছু আগে গোহত্যানিবারণ নিয়ে সাধারণ কর্মীরা নেতাদের কাছে-মূলতঃ গান্ধী ও রাজেন্দ্রবাবুর কাছে-হাজারে হাজারে পোস্টকার্ড পাঠিয়ে রীতিমত চাপ সৃষ্টি করেন। তার পেছনে কোনো সাংগঠনিক মাথা কাজ করছিল কিনা, না কি তা নিছকই স্বতস্ফুর্ত, বলা মুশকিল।
আর্যসমাজের প্রভাব একটা বড় ব্যাপার ছিল। হিন্দু মহাসভা একদা কংগ্রেসের মধ্যেই প্রেসার গ্রুপ হিসেবে কাজ করত। ১৯১৫ সালে হরিদ্বারে অল ইন্ডিয়া হিন্দু মহাসভার কনফারেন্সে গান্ধী উপস্থিত ছিলেন এবং হিন্দু মহাসভার স্থাপনাকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। আর এস এস এর প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের রাজনৈতিক গুরু ছিলেন বি এস মুঞ্জে, একজন হিন্দু মহাসভা তথা কংগ্রেস নেতা। হেডগেওয়ার নিজেও অল্প সময়ের জন্য কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন। কংগ্রেস নেতা-কর্মীরা দীর্ঘকাল ধরেই আর এস এস -এর প্রতি নরম ছিলেন। স্বাধীনতার পরে নেহরুর অনুপস্থিতিতে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি সিদ্ধান্ত নেয় আর এস এস কর্মীরা যুগপৎ আর এস এস ও কংগ্রেসের সদস্য থাকতে পারবেন। নেহরু বিদেশ থেকে ফিরে এসে তা রদ করেন। বলাই বাহুল্য, তখনো গান্ধী হত্যা হয় নি।
এবং মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। সত্যিকারের সেকুলার এই মানুষটি মুখে কোনোদিন হিন্দু জাতীয়তাবাদের কথা না বললেও তাঁর কথা ও কাজে বারেবারে মুসলিম জনমানসে অন্য বার্তা পাঠিয়ে গেছেন। গান্ধীর রামরাজ্যের রেটোরিক কিম্বা ভারতমাতার মন্দির স্থাপনা মুসলিমদের কাছে টানতে খুব সহায়ক হয়েছিল মনে হয় না।
শুধু তো কংগ্রেস পার্টি নয়। অনুশীলন ও যুগান্তর সমিতির মত সশস্ত্র বিপ্লববাদী দলগুলি গোড়াতেই মুসলিম বালাই চুকিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে রেখেছিল। একজন ধর্মপরায়ণ মুসলমানের পক্ষে গীতা ছুঁয়ে শপথ গ্রহণ করা যে কতখানি অসম্ভব, তা কি অরবিন্দ ঘোষ ও তাঁর সঙ্গীসাথীরা কখনো ভেবে দেখেছিলেন? এ কি নিছকই বালসুলভ সারল্য না রক্তের গভীরে ঢুকে যাওয়া ধর্মীয় সংস্কার? সম্ভবতঃ কোনোটাই না। অরবিন্দ তাঁর বিখ্যাত উত্তরপাড়া বক্তৃতায় জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বললেন-"সনাতন ধর্মই আমাদের জাতীয়তাবাদ। এই হিন্দু রাষ্ট্র সনাতন ধর্মকে সঙ্গে নিয়েই জন্মগ্রহণ করেছে, সনাতন ধর্মের বৃদ্ধির সঙ্গেই তার বৃদ্ধি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।" বঙ্কিমচন্দ্র ও তাঁর আনন্দমঠের (অ)প্রচ্ছন্ন মুসলিম-বিরোধিতা অজস্র জাতীয়তাবাদী হিন্দু তরুণকে আবিষ্ট করেনি, কে জোর দিয়ে বলবে?

মুসলমানরাও নিছক হাত গুটিয়ে বসেছিলেন না। উনিশ শতকের শেষদিকে স্যার সৈয়দ আহমদ খান অল ইন্ডিয়া মহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্স ও আলিগর মুসলিম ইউনিভার্সিটি স্থাপন করেন। উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব, তাদের ব্রিটিশ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা এবং ব্রিটিশ প্রশাসনে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো। এরই পথ ধরে ১৯০৬ সালে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগ স্থাপিত হয়। প্রসঙ্গতঃ, ঐ একই বছরে কিছুদিনের মধ্যে হিন্দু মহাসভারও জন্ম; মুসলিম লিগের প্রতিষ্ঠা ও মুসলিমদের জন্য সরকারের তরফ থেকে পৃথক ইলেকটোরেট গঠনের প্রতিবর্ত ক্রিয়া ।
শুরুর বছরগুলিতে মুসলিম লিগের হিসেবের মধ্যে পৃথক জাতি-রাষ্ট্রের কোনো ভাবনা ছিল না। মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকারসচেতনতা বাড়ানো, অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে ইন্টার অ্যাকশন, ধর্মীয় হিংসা রোধ-এইসবই ছিল প্রায়োরিটি। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতে না হতে চাকা অন্যদিকে ঘুরতে শুরু করে। খিলাফত আন্দোলনের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সোনার দিন ফুরিয়ে এল। আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির একদল তরুণ ইংরেজী-শিক্ষিত, পলিটিসাইজড মুসলিম ক্যাডারের উদ্যোগ পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের পালে হাওয়া দিতে শুরু করে। সেই সময় নাগাদ মুসলিমদের মধ্যে একটি ছোটোখাটো কিন্তু তৎপর, অধিকারসচেতন শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্ম হয়েছে। যে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনে এরাই দিশা দিয়ে থাকে। দুঃখের বিষয় এই মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণী আত্মনির্মাণের জন্য র‌্যাডিক্যাল ইসলাম-কেই আইডেন্টিটি হিসেবে বেছে নিলেন। হিন্দুসমাজকে খাড়া করা হল "অপর" হিসেবে। হিন্দুরাই যে মুসলমানের যাবতীয় দুর্দশার জন্য দায়ী,হিন্দুদের কারণেই সমাজে ও অর্থনীতিতে-ব্যবসাবানিজ্য হোক কিম্বা প্রশাসনিক পদে- মুসলমানদের পিছিয়ে পড়া -সে কথা জোরগলায় প্রচার করা শুরু হল। উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অংশে হিন্দু জমিদারের শাসনাধীন মুসলমান রায়তদের সেকথা বোঝানো কঠিন হল না। যে জরুরী তথ্য চেপে যাওয়া হল তা হল, মুসলমান জমিদারের অধীনেও ঐ একই মুসলমান রায়ত একই রকম নির্যাতন ভোগ করে থাকে। মহান ইসলামিক সাম্রাজ্যের স্মৃতি রোমন্থন ওরফে প্রাচীন মোগলাই পোলাওয়ের ঘি-শোঁকা সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে উস্কে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হল। বাতাসে ইতিউতি শোনা যেতে থাকল খিলাফৎ আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে একযোগে হিন্দুদের ষড়যন্ত্র। এর অন্তত একটি সরাসরি পরিণতির সাক্ষী হল মালাবার উপকূল। ১৯২১ এর সশস্ত্র মোপলা বিদ্রোহ, যা শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন হিসেবে, তা সহসা পরিণত হল হিন্দু-বিরোধী দাঙ্গায়।
ঠিক একইভাবে হিন্দুমননে গেঁথে দেওয়া হতে থাকল মুসলিম "অপর" এর ভাবনা। হেডগেওয়ার, সাভারকর এবং পরবর্তীতে গোলওয়ালকরের মত তাত্বিকরা হিন্দুত্বের একটি এক্সক্লুশনারি নির্মাণ বানিয়ে তুললেন তিরিশ ও চল্লিশের দশক ধরে। মুসলমান-খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীকে মহান হিন্দুরাষ্ট্রের বুকে বিঁধে থাকা ফরেন বডি-র সঙ্গে তুলনা করা হল, যে কাঁটাকে সমূলে উপড়ে ফেলাই বাঞ্ছনীয়। জাতীয় আন্দোলনে গান্ধীর মুসলিম-তোষণের (!) তীব্র বিরোধিতা করা হল। হিন্দুত্ব নির্মাণের এই প্রকল্প থেকে ব্রিটিশ বিরোধিতাকে সযত্নে পরিহার করা হল। অহিংস অসহযোগ কিম্বা ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগদান করা থেকে আর এস এস সদস্যদের বিরত করা হল। শুধু এ-ই নয়, হিন্দু মহাসভার মহান নেতা, বাঘের বাচ্চা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ব্রিটিশ প্রভুদের সতর্ক করলেন- "ভারত ছাড়ো" আন্দোলনে কংগ্রেস নানা ভাবে আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে সচেষ্ট হবে; সরকার বাহাদুর যেন যথাবিহিত ব্যবস্থা নেন।
এমন অবস্থায় যা হওয়ার তাই হয়। নিয়মিত ব্যবধানে ছোট-বড় দাঙ্গা বাধা (অথবা বাধানো)শুরু হল। হোলি/গোহত্যা/নামাজের সময় মসজিদের সামনে হিন্দু ধর্মীয় সঙ্গীত বাজানো- নানা কারণের নানা মাপের হাড়-হিম করা দাঙ্গায় মানুষ অভ্যস্ত হতে শুরু করে ১৯২২-এর পরের বছরগুলি থেকে। তবলিগি জামাত, আর্য সমাজ, জামাত উল ইসলামের সদস্য সংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকে। ধর্মের রাজনীতিকরণ ও রাজনীতির সাম্প্রদায়িকীকরণ যদিও নতুন ঘটনা নয়, তবু দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানের সময়ে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে। এব্যাপারে শাসক ব্রিটিশের উৎসাহ কম ছিল না। কলোনিয়াল স্টেটের কাঠামোয় নিপুণভাবে ধর্মীয় বিভেদের চিহ্নগুলিকে মোটা অক্ষরে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলতে থাকে। রেল স্টেশনে হিন্দু-মুসলিম পৃথক রিফ্রেশমেন্ট রুম, প্ল্যাটফর্মের জলের কল "হিন্দু ওয়াটার"-"মুসলিম-ওয়াটার" বলে ভাগ করা, "হিন্দু- চা" , "মুসলিম-চা"-এর মত হাস্যকর কিন্তু নিদারুণ কার্যকরী বেড়াগুলির পরিণাম অচিরেই ভয়ানক হয়ে উঠবে। শুধুমাত্র ইচ্ছাকৃত বদামো-ই নয়, ব্রিটিশ শাসকরা সম্ভবতঃ অন্তর দিয়েই বিশ্বাস করতেন না হিন্দু-মুসলিম-শিখ জনগোষ্টির মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও একতা সম্ভব। এরই অনিবার্যতায় ধর্মভিত্তিক জনগোষ্ঠীগুলির জন্য প্রাদেশিক আইনসভাগুলিতে পৃথক পৃথক ইলেকটোরেটের ব্যবস্থা করা হল। বিষবৃক্ষের মূলে শুধু একরকম নয়, নানবিধ সারের বন্দোবস্ত হয়েছিল দেখাই যাচ্ছে।

-----

"ঘেটো"করণের একটা নতুন রকম দেখা যেতে থাকল শিগগিরই। মুসলিম রোগী কেবলমাত্র মুসলিম ডাক্তারের কাছেই যাবে, হিন্দু মক্কেল হিন্দু উকিলের শরণ নেবে, বাজারহাটের মত ছোটখাটো ব্যাপারেও মানুষ ধর্মীয় লক্ষণরেখার বাইরে পা ফেলবে না, এরকমটা আগে কখনো এত তীব্রতার সঙ্গে দেখা যায় নি। ভারতে হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থানের কমবেশী ৮০০ বছরের ইতিহাসে সাম্প্রদায়িক বিষ এই প্রথম এমন কার্বঙ্কলের মত ফুটে বেরোলো।

ইয়াসমিন খান প্রফেসর মহম্মদ মুজিবের উদাহরণ দিয়েছেন। আপাদমস্তক সেকুলার, আগাগোড়া কংগ্রেসী পরিবারের সন্তান প্রফেসর মুজিব ছিলেন জামিয়া মিলিয়া ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর। নেহরু-র ব্যক্তিগত বন্ধু এই মানুষটিও কালের প্রভাব এড়াতে পারেন নি। সে সময়কার অন্যান্য মুসলিম এলিটদের মত তিনিও ঠিক করেছিলেন, কেবলমাত্র মুসলিম ব্যবসায়ী-দোকানীদের কাছ থেকেই জিনিষপত্র কেনাকাটা করবেন। বাড়ির জেনানামহলের কাছে কিন্তু এহেন সুপ্রস্তাব ধোপে টিকল না। যেখানে ভালো জিনিষ, কম দাম আর ভালো ব্যবহার মিলবে, বেচাকেনা সেখানেই, সে হিন্দু হোক কি মুসলিম-গৃহকর্ত্রীর এই কথার পরে আর বাহাস চলে না। সংসার যাঁদের চালাতে হয়, তাঁরা জানতেন ধোঁয়াটে সাম্প্রদায়িক চেতনার চেয়েও বেশী জরুরী বাস্তববুদ্ধি।

এই সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও কিছু ব্যতিক্রম ছিল-শ্রেণীগত সহাবস্থান অন্ততঃ কিছুটা হলেও, কিছুকালের জন্য হলেও সাম্প্রদায়িক বিভেদকে আটকে রেখেছিল। গরীব হিন্দু-মুসলমান চাষী কিম্বা কলের মজদুর সেই ভাঙনের মধ্যেও সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে চারপাইয়ে বসে সম্প্রদায় ভুলে নিজেদের মধ্যে সুখদুঃখের গপ্পো করতেন, উচ্চবিত্ত হিন্দু-শিখ-মুসলিম ব্যবসায়ী-জমিদার-চা বাগানের মালিকরা কেউ কেউ একে অন্যের সাথে পুরনো দোস্তির সুবাদে দামী হোটেলে-বারে নৈশভোজন বা মদ্যপান করতে যেতেন, কলেজের ছেলেছোকরারা হিন্দু-মুসলিম-শিখ ভেদাভেদ ভুলে একসাথে ক্লাসে যেত, আড্ডা-তকরার করত। কিন্তু এই শ্রেণীঐক্যও খুব বেশীদিন আর টিকবে না। কালো দিন বড় তাড়াতাড়ি ঘনিয়ে আসছিল।

জঙ্গী আন্দোলনের উর্বর ভূমি, শিল্প-সংস্কৃতির পীঠস্থান বাংলার অবস্থাও খুব একটা ভালো কিছু ছিল না। তপন রায়চোধুরীর অ্যানেকডোটগুলি উদ্ধৃত করার লোভ সামলানো মুশকিল- অতএব সে চেষ্টাও করছি না; চৌধুরীমশায় লিখছেনঃ
"সাম্প্রতিক কালের গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে যে, বাংলায় জাতীয়তাবাদী রাজনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। এই কথা বোঝার জন্য আমরা যারা সেই সময় সাবালক হয়েছি তাদের গবেষণার আশ্রয় নিতে হয় না। তথাকথিত জাতীয়তাবাদী পত্রপত্রিকায় মুসলমানদের রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্খা নিয়ে যেভাবে নিষ্ঠুর বিদ্রূপ করা হত, তা সাম্প্রতিক কালের সঙ্ঘ পরিবারের ভাষার থেকে খুব কিছু আলাদা নয়.... এরকম একটি পত্রিকা সম্বন্ধে ফজলুল হক সাহেব একদিন মন্তব্য করেছিলেন, "দ্যাখ , আমি হিন্দুবিদ্বেষী, ছালান্নিয়া পাডা [ .... মানে যার নির্বুদ্ধিতায় কোনও ভেজালের স্পর্শ পড়ে নি....] ছাড়া এ কথা কেউ কইবে না। কিন্তু সকালে উড্ডিয়া ঐ কাগজখান পড়লে আমারও ইচ্ছা করে হিন্দুগো মুণ্ডু চিবাইতে।" ঐ পত্রিকার এক পূজা সংখ্যায় 'ছহি হকনামা' বলে একটি রসরচনা বের হয়েছিল। সেটি পড়ে সমস্ত শিক্ষিত মুসলমান যদি ক্ষেপে উঠে থাকেন তো বলার কিছু নেই....।"

কিম্বা কলকাতার দাঙ্গা সম্বন্ধে যখন লিখছেন-".... বীভৎস সব কাহিনী রটিয়ে কিছু লোক এক ধরণের বিকৃত আনন্দ পায়। তার চেয়েও অবাক হলাম যখন দেখলাম কয়েকজন তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত লোক মুসলমানদের উপর নানা অত্যাচারের সত্যি বা কল্পিত কাহিনী বলে বা শুনে বিশেষ আনন্দ পাচ্ছেন। এঁদের মধ্যে দু-তিনজন রীতিমত বিখ্যাত লোক। প্রয়াত এক পণ্ডিত ব্যক্তি, যাঁর নাম শুনলে অনেক নিষ্ঠাবান হিন্দু এখনও যুক্তকরে প্রণাম জানায়, তাঁকে এবং সমবেত অধ্যাপকদের কাছে নিকাশিপাড়ার মুসলমান বস্তি পোড়ানোর কাহিনী বলা হচ্ছিল। যিনি বলছিলেন তিনি প্রত্যক্ষদর্শী এবং বিশ্বাসযোগ্য লোক। বেড়া আগুন দিয়ে বস্তিবাসীদের পুড়িয়ে মারা হয়। একজনও নাকি পালাতে পারে নি। ছেলেটি বলছিল-কয়েকটি শিশুকে আগুনের বেড়া টপকে তাদের মায়েরা আক্রমণকারীদের হাতে দেওয়ার চেষ্টা করছিল, যাতে ওদের প্রাণগুলি বাঁচে। বাচ্চাগুলিকে নির্দ্বিধায় আবার আগুনে ছুঁড়ে দেওয়া হয়। আমরা শুনেছিলাম এই কুকীর্তির নায়্ক কিছু বিহারী কালোয়ার। তাই ভয়াবহ বর্ণনাটি শুনে সুশোভনবাবু মন্তব্য করেন, " এর মধ্যে নিশ্চয়ই বাঙালি ছেলেরা ছিল না?" শুনে সেই পণ্ডিতপ্রবর গর্জে উঠলেন, "কেন, বাঙালি ছেলেদের গায়ে কি পুরুষের রক্ত নেই?"


শনিবারের চিঠি-ই তপনবাবু কিম্বা হক সাহেব বর্ণিত পত্রিকাটি কিনা জানি না; নাহলেও দৌড়ে সেটি খুব একটা পিছিয়ে ছিল না। নানাবিধ ছদ্মনামের আড়ালে শিক্ষিত মুসলমানের আকাঙ্খাকে যেভাবে ব্যঙ্গ করা হত, তাকে অশ্লীল বললে কম বলা হয়। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন এইসব হিঁদু চামচাদের চাঁদমারির মুখ্য বুল'স আই। একটি উদাহরণ দিই-
"তখন সভাপতির আদেশে হাজী ভীমরুল বেসামাল নামক একটি বাবরীকাটা চুলওয়ালা যুবক বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করিলেন। ইনি বলিলেন "বেরাদরগণ ও বেরাদরিণীগণা, বিটকেলউদ্দীন এতক্ষণ যা চিল্লালেন তা আপনাদের আলবাৎ কানে ঢুকিয়াছে। একবার হিন্দুদের বদমায়েসীত্ব নজর করুন, আজ হইতে আমরা জান্পনে উর্দোস্কৃতের চর্চা করিব। বড়ই আফশোষের বাত যে আজ বেহেস্তীয় দিলবাহার দাস মহাশয় এখানে হাজির নাই। তিনি জানবন্ত থাকিলে কংগ্রেসকে দিয়া বাংলা বাতের মধ্যে শতকরা ৮০টি উর্দুবাত দিবার প্ত করিতেন। মরদসিংহ সার জলদি-খোশ ছাড়া আর কারুর তাঁকে বাধা দিবার মত ছাতির জোর ছিল না। কিন্তু হায় দাস ছাব আজ ভেস্তে গিয়াছেন। তাঁহার কাম আমাদেরই করিতে হইবে। ইহাতে টেংরীপশ্চাৎ হইলে চলিবে না। আপনারা না করিলে আমি কখনও কসুরাপবাদগ্রস্ত হইব না। আমিও লেখার মধ্যে উর্দোস্কৃত ঢুকাইয়াছি। বিনয় ছরকারের কেরামতিতে বাংলার অঙ্গে পয়জার পড়িয়াছে আমিও উহাকে জিঞ্জির পরাইয়াছি। আমিই বা কম কিসে?"

-------

"১৯৪৬ সালের ওপর আমার বিশেষ একটা ভরসা নেই" -ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল তাঁর ৪৬-র নিউ ইয়ারের ডায়েরিতে লিখছেন-"খুব অবাক হব, খুশিও হব, যদি বছরটা ভালোয় ভালোয় কাটে।"

ওয়াভেল কোনো হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার কথা ভেবে ভয় পাচ্ছিলেন না। যদিও পরিস্থিতি তখন যথেষ্ট বিষাক্ত, সাম্প্রদায়িক গন্ধে ভরপুর; যদিও পাকিস্তানের দাবী জোরালো ভাবে উঠে আসছে, কংগ্রেস আর মুসলিম লিগ কেউ কাউকে একটুও জমি ছাড়তে রাজী নয়।

কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে ব্রিটিশ রাজ তখনো দোটানায়। পূর্ণ স্বাধীনতা, নাকি ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস দিয়ে বাবা-বাছা বলে মাথায় হাত বুলিয়ে আরো কিছুকাল ভুলিয়ে রাখা!

সাধারণ ভারতবাসী আর এই দোনোমোনো সহ্য করতে রাজী হচ্ছিলেন না। না হিন্দু, না মুসলিম। ক্ষমতার ভাগ নিয়ে নেতাদের হাত কচলানো চলছে; আবার একই সঙ্গে মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ছেন যে কোনো ছুতোনাতায়। প্রায়শঃই নেতৃত্বহীন। মানুষের লড়াইয়ের পেছনে পেছনে বিপদ বুঝে নেতারা ছুটছেন। আর এই লড়াই থেকে জন্ম নিচ্ছে সাময়িক এক সম্প্রীতি। কিছু সময়ের জন্য হলেও সাম্প্রদায়িক ঘৃণা প্রশমিত হচ্ছে। ধর্মের কারবারীরা প্রমাদ গুণছেন। লাল কেল্লায় আই এন এ সৈনিকদের বিচার চলছে। তাঁরাই তখনকার মত সাধারণ ভারতবাসীর চোখের মণি; কংগ্রেস-লিগ নেতারা নন। বাধ্য হয়ে সুবোধ বালকের মত প্রতিষ্ঠিত নেতারা আই এন এর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হচ্ছেন। দিল্লির রাস্তায় রাস্তায় লাল কালিতে আঁকাবাঁকা হাতে লেখা পোস্টার ছড়িয়ে পড়ছে- একজন আই এন এ সৈন্যের প্রাণের বদলা নিতে কুড়িটা ব্রিটিশ কুত্তা খুন করুন ।" বম্বে-কলকাতা-করাচির রাস্তায় ইওরোপীয়ানদের গা থেকে জোর করে হ্যাট-টাই খুলে ফেলা হচ্ছে, সাইকেল থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। "জয় হিন্দ" বলতে বাধ্য করা হচ্ছে তাঁদের। পাঞ্জাবের গভর্নরের গাড়িতে পাথর ছুঁড়ে মারা হচ্ছে। ওয়াভেলের আশংকার যথেষ্ট কারণ ছিল।

এরই মধ্যে '৪৬ এর ফেব্রুয়ারি মাসে বম্বেতে নৌ-বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেল। সাধারণ ভারতীয় নৌ-সেনাদের নিত্যকার দুর্দশা আর বৈষম্য থেকে ক্ষোভের শুরু। তারই রাজনীতিকরণ ঘটাল ব্রিটিশ-বিরোধী গণচেতনা আর কমিউনিষ্ট মতাদর্শ। আই এন এর বিচার আগুনে ঘি ঢালার কাজ করেছিল। বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ল করাচি থেকে কলকাতায়। বিদ্রোহী জাহাজে-জাহাজে কমিউনিষ্ট পার্টির লাল পতাকা কংগ্রেস আর লিগের পতাকার সঙ্গে একসাথে উড়তে থাকল। মাদ্রাজ ও পুনায় ভারতীয় স্থলবাহিনীর মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিল। বম্বে-র গুর্খা সৈন্যরা বিদ্রোহী নৌবাহিনীর দিকে গুলি ছুঁড়তে অস্বীকার করল।সে বড় সুখের সময়। মোচ্ছব-কার্নিভালের মত হালকা, ফুরফুরে। স্বাধীনতার প্রথম ছোঁয়াচ লাগা হো হো হাসির দিন। সে বড় সুখের সময় নয়। দমবন্ধ করা, অস্থির দিন। চারিদিকে শত্রুর গণ্ডি ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। বি সি দত্ত, নৌবিদ্রোহের অন্যতম কারিগর, সেই দিনগুলির কথা লিখেছেন-

" সমাজের সব স্তরের মানুষ খাবারের প্যাকেট, জলের ঘড়া নিয়ে আসছেন। গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার সামনের সমুদ্রমুখী রাস্তা ভিড়ে ভিড়াক্কার। রেস্তোরাঁ-মালিকরা লোকজনদের অনুরোধ করছেন যত খুশি খাবার নিয়ে বিদ্রোহী নাবিকদের পৌঁছে দিতে।এমন কি রাস্তার ভিখিরিরাও ছোট ছোট খাবারের পুঁটলি নাবিকদের জন্য বয়ে নিয়ে চলেছেন।বন্দরের সামনে সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। সশস্ত্র ভারতীয় সৈন্যরা গোটা এলাকা টহল দিচ্ছেন। ব্রিটিশ ফৌজ দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে। কাঁধে রাইফেল ঝোলানো ভারতীয় সৈন্যরা নাবিকদের জন্য আনা খাবার নৌকায় তুলে দিতে সাহায্য করছেন; এই নৌকা যাবে বন্দর থেকে বিদ্রোহী জাহাজে , রসদ বয়ে নিয়ে। ব্রিটিশ অফিসাররা অসহায় দর্শকের মত দাঁড়িয়ে।"

বিদ্রোহ যদিও বেশীদিন টিকল না। কমিউনিষ্ট পার্টি ছাড়া জাতীয় স্তরের বড় নেতারা কেউ সমর্থন করলেন না। উল্টে বিরোধিতা করলেন।পরিস্থিতি হাতের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার ভয় ছিল। শ্রেণীলাইন বরাবর মানুষের ভাগাভাগি হয়ে গেলে কমিউনাল তাস খেলা যাবে না। লিগ-কংগ্রেস দুপক্ষেরই অসুবিধে। তাছাড়া তখন সরকারের সঙ্গে টেবিলে বসে বোঝাপড়া চলছে; এই অবস্থায় সরকারকে চটাতে কেউই চায় না। জিন্না ও প্যাটেল, লিগ আর কংগ্রেস নৌবিদ্রোহের বিরোধিতায়, কমিউনিষ্ট-বিরোধিতায় একসাথে হাত মেলালেন । কংগ্রেসের একমাত্র নেতা যিনি নৌবিদ্রোহকে সমর্থন করেছিলেন, তিনি অরুণা আসফ আলি। গান্ধী তাঁকে তীব্র ভর্ত্সনা করলেন। ক্ষুব্ধ অরুণা আসফ আলি সি পি আইয়ে যোগ দিলেন। ৪৭৬ জন বরখাস্ত নৌসেনার একজনকেও পরবর্তীতে স্বাধীন ভারত কিম্বা পাকিস্তান - কোনো দেশের সেনাবাহিনীতে পুনর্বহাল করা হয় নি।

'৪৫-এর শেষ, '৪৬ এর শুরুর সেই সময় বিপ্লবের সম্ভাবনায় ভরপুর। শুধুমাত্র ব্রিটিশ-বিরোধিতা নয়, যে কোনো রকম স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধেই জঙ্গী মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন। ট্রেনচালক থেকে প্রেসকর্মী, পোস্টম্যান থেকে কটন মিলের শ্রমিক সকলেই ন্যায্য দাবীর জন্য আন্দোলন করছেন। মুহূর্মুহু বন্ধ ডাকা হচ্ছে। '৪৬ এর মার্চে বিহারে বড়সড় পুলিশ বিদ্রোহ ঘটে গেল। সেনা নামিয়ে তা থামাতে হল। দিল্লিতে বিদ্রোহ করলেন ৩০০ পুলিশকর্মী।'৪৬-এর গ্রীষ্মে সারা ভারত রেল স্ট্রাইক ডাকার বন্দোবস্ত প্রায় পাকা। শেষ মুহূর্তে তা রদ হল।'কমিউনিষ্ট পার্টির কৃষকসভা যেখানে যেটুকু শক্তি আছে তাই দিয়ে কৃষকদের সংগঠিত করছেন। জমিদার-মহাজন-দেশী রাজাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা হচ্ছে। '৪৬-এই তেলেঙ্গানার সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহের শুরু। কমিউনিষ্ট পার্টির নেতৃত্বে প্রায় চার হাজার গ্রামে বিদ্রোহের আগুন পৌঁছে গেল। এই আগুনের আঁচ নিভতে সময় লাগবে আরো পাঁচ বছর। সামন্ত-জমিদার-রাজাকার-নিজামের সৈন্যবাহিনীর যৌথ অত্যাচার আর পরবর্তীতে নেহরু-প্যাটেলের নির্দেশে স্বাধীন ভারতের সেনাবাহিনীর অভিযান এই বিদ্রোহকে শেষমেশ প্রশমিত করবে। '৪৬ এর সেপ্টেম্বরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কিষাণ সভার ডাকে বাংলার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে তেভাগা আন্দোলন শুরু হল। যশোর-দিনাজপুর-রংপুর-ময়মনসিংহ-জলপাইগুড়ি -চব্বিশ পরগনায় তেভাগার ডাক উঠল। আন্দোলন থামতে খুব বেশী সময় লাগে নি। কিন্তু এর আবেদন বহুদিন ধরে রয়ে যাবে বিদ্রোহী বামপন্থী মননে,গানে-গল্পে-কবিতায়-ওরাল ন্যারেটিভে।

রুজির লড়াই, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই যখনই দানা বেঁধে উঠেছে, তখনই পিছু হটে গেছে সাম্প্রদায়িকতা। কলকাতা ট্রাম কোম্পানির লড়াই এর আর এক উজ্জ্বল উদাহরণ। '৪৬ এর ১১ই ফেব্রুয়ারি রশিদ আলি দিবসের মিছিলে গুলি চালানোর প্রতিবাদে(যার কথা আগেই উল্লিখিত হয়েছে) পরদিন ১২ই ফেব্রুয়ারি কমিউনিষ্ট পার্টি সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়। বন্ধ সফল করতে ট্রাম কর্মচারী ইউনিয়ন বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল। নৌ-বিদ্রোহের সমর্থনেও সবচেয়ে বড় মিছিল ডাকেন তাঁরাই। এই মিছিলে বাঙালী হিন্দু-বিহারী মুসলমান এক সঙ্গে পা ফেলেছেন। '৪৬এর অগাস্ট মাসে দাঙ্গার কালো দিনগুলিতে, যখন সাম্প্রদায়িক হানাহানিতে সব সংহতি ধুয়ে-মুছে যাচ্ছে, তখনো ট্রাম কর্মচারী ইউনিয়নের বাঁধন ছিল অটুট।





---
মসজিদ ঢা দে, মন্দর ঢা দে, ঢা দে যো কুজ ডেহন্দা
পর কিস দা দিল না ঢাঁভি, রব দিলাঁ ভিচ রেহন্দা।।

(মসজিদ ভাঙো, মন্দির ভাঙো, যা যা ভাঙার সব ভাঙো
কখনো কারো হৃদয় ভেঙো না, ঈশ্বর হৃদয়ে বসত করেন।।)

-বাবা বুল্লে শা ( ১৬৮০-১৭৫৭)



বাপি অসুস্থ থাকায় একদিন সেন্টার থেকে একজন নতুন ড্রাইভার নিতে হয়েছিল। ভদ্রলোক ওপার বাংলার মানুষ, বর্তমানে থাকেন বরিশাল কলোনিতে। বরিশাল কলোনি? তেঘরিয়ার মাঝখানে? আমার আগ্রহ বাড়ে। উনি বলেন-হ্যাঁ, ঐ বরিশাল কলোনি, অশ্বিনী দত্ত রোডের পাশে। (শুধু স্থান-নাম নয়, বাস্তুচ্যুত মানুষ তাঁদের জননেতার কথাও ভুলে যান নি!) উনি অবশ্য বরিশালের লোক নন, ঢাকার পোলা। কথায় -কথায় হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের কথা উঠল। মানুষটি দেখা গেল কট্টর মুসলিম-বিরোধী, বললেন-অগো বিশ্বাস করন যায় না (না, একবারও সমন্বয়ের কথা, মিলনের কথা বললেন না )। অরা অইন্য জাত একখান। আমি বললাম-তা কি করে হবে? ওঁরা তো সকলেই হিন্দু ছিলেন একসময়। পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তফাৎ তো এইটুকুই! উনি দেখা গেল ধর্মান্তরের ব্যাপারে একেবারে ওয়াকেবহাল নন। বললেন-হেয়া হইল কবে? হইলেও অনেক আগে হইছে।

বল্লভভাই প্যাটেল অবশ্য এমন নাইভ ছিলেন না। স্বাধীনতা-দেশভাগ নিয়ে আলোচনার টেবিলে উনি জোর দিয়ে বলতেন-"ভারতীয় মুসলমানরা তো সবাই ধর্মান্তরিত মুসলমান।" অর্থাৎ কিনা মুসলিম লিগ তাহলে উপমহাদেশের মুসলমানদের একমাত্র প্রতিনিধি হয় কিভাবে!

প্যাটেলের এই উক্তিটি, যা আমাদের অনেকেরই জানা, পুরোপুরি না হলেও অনেকটা সত্যি তো বটেই। কিন্তু এই তথ্যটি তার ধারালো সত্যের ওপর ভর দিয়ে দাঙ্গা-রক্তপাত-বিদ্বেষময় উপমহাদেশে এমন বিপজ্জনক ভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে, যে একচুলও এদিক-ওদিক হলে ভয় করে। তবে কিনা ঘৃণার ব্যাপারীরা, এবং আমরাও, ভুলে যাই এটি একটি দুদিকে ধার-ওয়ালা তরবারী- এ দিয়ে দেশকে টুকরো করা যায় যেমন, একে মৌলবাদের বিপক্ষেও ব্যবহার করা যায় তেমনি স্বচ্ছন্দে।


ভারতবর্ষে ইসলাম প্রথম এসে পৌঁছয় সপ্তম শতাব্দীতে আরব ব্যবসায়ীদের হাত ধরে। গুজরাট-কোঙ্কন ও মালাবার উপকূলে। শুরুর দিনগুলিতে আরবী ইসলাম একেবারেই গোঁড়া নয়, দিতে ও নিতে সমান আগ্রহী। আরব ব্যবসায়ীদের হাত ধরে ভারতীয় দশমিক গণনা -পদ্ধতি পৌঁছে যাবে আরব বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের কাছে। বেশ কিছু সংস্কৃত টেক্স্ট আরবীতে অনুদিত হতে থাকবে। কখনো কখনো আরব বণিকেরা বিয়েশাদী করে ভারতেই থেকে যাবেন। উল্টোদিকে ভারতীয়দের মধ্যে এই নব্য ধর্মের প্রতি উৎসাহ বাড়বে। অনেকেই সাম্যের টানে নতুন ধর্মে দীক্ষিত হবেন। পত্তন হবে নতুন এক ইন্দো-আরবী সংস্কৃতির।

ছবিটা পাল্টাতে থাকবে অষ্টম শতাব্দী থেকে। মহম্মদ বিন কাশিম সিন্ধ দখল করবেন। তার প্রায় শ'তিনেক বছর পরে গজনীর মামুদের বারে বারে ভারত আক্রমণের কথা সবার জানা। ১১৯২ সালে মহম্মদ ঘোরী পৃথ্বীরাজ চৌহানকে হারিয়ে দিল্লী সুলতানী প্রতিষ্ঠা করবেন। ইসলাম রাজধর্ম হবে। এর পরের আটশো বছর ধরে হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্কে নানান টানাপোড়েন আসবে, শুরুর দিনের রক্তপাত ও বিদ্বেষ মুছে দিয়ে সমন্বয়ের নতুন ধারণা তৈরী হবে। যে সমন্বয় ও মিলনের ভাবনা আবার ভাঙতে শুরু করবে ব্রিটিশ শাসনের প্ররোচনায়, বিশ শতকের শুরুর দিকে।

আধুনিক ইতিহাসের কল্যাণে আমরা এইসব বহিরাগত আরবী-তুর্ক আক্রমণকারীদের মুসলিম বলে চিহ্নিত করি। সে সময়কার মুলস্রোত ভারত কিন্তু সেভাবে দেখেনি। মধ্যযুগের সংস্কৃত লিপিতে এই মধ্য-এশীয় বহিরাগতদের বলা হয়েছিল "তুরুষ্ক"-তুর্ক। ধর্ম নয়, তাদের ভাষাগত -জাতিগত সত্ত্বাকেই বড় করে দেখা হয়েছিল। আসলেই তা ছিল জাতিগত বিরোধ। আরো বেশী করে রাজনৈতিক। এইসব আক্রমণ- রক্তপাত-মন্দির-ধ্বংস ছিল যত না ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত, তার চেয়ে অনেক বেশী রাজনৈতিক প্রাধান্যস্থাপনের এক তরিকা। বিরুদ্ধধর্মের উপাসনাস্থল ধ্বংসের এই প্রবণতা অবশ্য ভারতের ইতিহাসে নতুন কিছু নয়, ইসলামোত্তর তো নয়ই। বৌদ্ধ স্তূপ ও সঙ্ঘ ধ্বংসের কাজে হিন্দু রাজারা পিছিয়ে ছিলেন না। কাশ্মীরের রাজা হর্ষ তো দেবোৎপাটন-নায়ক নামে একটি বিভাগই তৈরী করেছিলেন।

দিল্লীর সুলতানী শাসন এক নতুন সংস্কৃতির পত্তনের সময়। যাকে আমরা সঠিক টার্মিনোলজির অভাবে ইন্দো-ইসলামিক সংস্কৃতি বলে ডাকবো, আসলে যা ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে তুর্কী-আরবী ও পারসিক সংস্কৃতির এক ফিউশন। শিল্প-সাহিত্য-স্থাপত্য-সঙ্গীত-পোষাক-রাজনীতি সবক্ষেত্রেই সেই মিলনের ছাপ দেখতে পাওয়া যাবে। এবং ভাষা। উর্দু নামে একটি সংকর ভাষার উৎপত্তি হবে, যা আসলে প্রাকৃত'র সঙ্গে তুর্কী-আরবী ও ফার্সী ভাষার মিলন। এক হাজার বছরের অর্থনৈতিক জড়তা কাটিয়ে ভারত মুসলিম নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে অ্যাফ্রো-ইউরেশীয় জগৎসভায় এসে দাঁড়াবে। প্রথম এক হাজার খ্রীষ্টাব্দে ভারতের জিডিপি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। এই প্রথম তা বাড়তে শুরু করল।

কিন্তু এহ বাহ্য। মিলনের আসল ক্ষেত্রটি তৈরী হল ধর্মে। তৈরী করলেন শহর-রাজধানী থেকে দূরে, রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রান্তে থাকা ছোট ছোট মানুষেরা। তাঁদের সেই মিলনের ভাষা দিলেন সুফী সাধকেরা। দিলেন কবির জোলা। সুফীবাদের জন্ম আরবে হলেও ভারতের জল-হাওয়ায় এসে তা মঞ্জরিত হল। ব্রাহ্মণ্যবাদের তাপে পোড়া অন্ত্যজ মানুষরা দলে দলে এসে সুফী খানকায় ভিড় জমালেন। যেখানে তারা অন্ন পেলেন, সেবা পেলেন। জানলেন ঈশ্বরের সন্তানেরা সকলেই সমান(তা যে পুরোপুরি সত্যি নয়, সেটা অবশ্য কালেকালে বোঝা যাবে। উপমহাদেশীয় ইসলামের মধ্যেও "আরজাল(অচ্ছ্যুত)" মানুষের ধারনা গেঁড়ে বসবে। এ নিয়ে প্রশান্ত ত্রিবেদী-শ্রীনিবাস গোলি-ফাহিমুদ্দিন-সুরিন্দর কুমারের বড়সড় স্টাডি রয়েছে)। গোঁড়া ইসলামের কঠোরতা থেকে দূরে, সুফী কাওয়ালি আর সমা নাচ, ধামালে-র আনন্দ আর পাগলামির মধ্যে এসে এঁরা ইসলাম গ্রহণ করলেন। ভারতে হিন্দুদের ধর্মান্তরকরণের পেছনে আসল অবদান সুফী সন্তদের, রক্তমাখা তরোয়ালধারী কট্টর মুসলিম বাদশা-সুলতানদের নয়, এ কথা মনে রাখলে হিন্দু উগ্রবাদীরা ভালো করবেন। আর অবদান হিন্দু ধর্মের ( ঠিকঠাক বলতে গেলে জাতপাত-ছোঁয়াছুঁয়ি বদ্ধ "ব্রাহ্মণ্যবাদের"- কারণ আধুনিক যুগের পত্তনের আগে "হিন্দুধর্ম" বলতে কোনো কিছুর ধারণা ছিল না-ছিল শৈব, বৈষ্ণব, শাক্ত, স্মার্ত ইত্যাদি নানারকম সেক্ট), কেননা আজকের উগ্র হিন্দুত্ববাদী- মনুবাদীদের বাপ-পিতেমোরাই প্রান্তিক মানুষদের ইসলামের দিকে সবলে ঠেলে দিয়েছেন।

ইসলামের মনোলিথিক ধারণাটিও এসে ধাক্কা খেল উপমহাদেশে। উপমহাদেশ তার জল-মাটি বাতাস মিশিয়ে ইসলামকে আলাদা করে গড়ে-পিটে নিল। সুফী সন্তরাই এই প্রক্রিয়ার সামনে রইলেন। হিন্দু ধর্মগ্রন্থকে এঁরা বললেন ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণাসঞ্জাত। কেউ হিন্দু সাধকদের যোগাভ্যাসের ধারাটিকে গ্রহণ করলেন। হিন্দু-মুসলমানের বিরোধকে অস্বীকার করে এঁরা কাঠমোল্লাদের চ্যালেঞ্জের সামনে ফেলে দিলেন। উভয় সম্প্রদায়ের লাখ লাখ সাধারণ মানুষ খাজা মইনুদ্দিন চিস্তি, নিজামুদ্দিন আউলিয়া, বাবা ফরিদ, "ঝুলেলাল" শাহবাজ কলন্দরের দরগায় এসে ভিড় জমালেন। এবং সেই ট্রাডিশন আজো চলছে, যতই না মৌলবাদী সন্ত্রাস তার চোখ রাঙাক (২০১৭-র ফেব্রুয়ারিতেই সিন্ধ-এর সেহওয়ানে লাল শাহবাজ কলন্দরের দরগায় আত্মঘাতী হামলায় একশো জন মারা যান। হামলার পরদিন ভোরে ঠিক নিয়মমতই সাড়ে তিনটের সময় দরগার তত্বাবধায়ক ঘন্টা বাজিয়ে দরগা খুলে দেন। নিয়মমত সুফী ধামাল চলে, আগেরদিন যা ১৫ মিনিট চলবার পরেই বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল লাল সয়িঁর গোর। এত সহজে হেরে গেলে চলবে না)। সিন্ধ-এর হিন্দুরা শাহবাজ কলন্দরকে তাঁদের ইষ্টদেবতা বরুণদেব (ঝুলেলাল)-এর রি-ইনকার্নেশন বলে মনে করতেন। সেই থেকে তাঁর ডাকনাম হয়ে যাবে ঝুলেলাল-যে নামে তিনি হিন্দু-মুসলিম উভয়ের কাছে পরিচিত হবেন। তাঁর নামে কাওয়ালি লিখবেন আমীর খুসরু, তাকে পরিমার্জনা করবেন বাবা বুল্লে শা- সেই কাওয়ালি-দমাদম মস্ত কলন্দর- গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের আত্মার সঙ্গীত, যা গীত হবে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানের অজস্র খ্যাত-অখ্যাত গায়কের দ্বারা।


ইসলামের মধ্যে যদি অন্তর্ঘাত চালায় সুফীবাদ, হিন্দুধর্মের মধ্যে সেই কাজ করে ভক্তি আন্দোলন। কবীর জোলা, চামার রবিদাস,
শুদ্র তুকারামের দোহা-পদ আর কীর্তনে ব্রাহ্মণ্যবাদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছিল। পাশাপাশি এই দুই আন্দোলন হিন্দু- মুসলিম দুই ধর্মের মধ্যের বিভাজনকেই প্রায় ধোঁয়াটে, অস্পষ্ট করে তুলবে। দুই ধর্মের মাঝখানের এক নো ম্যান'স ল্যান্ডে এসে ভিড় করবেন উভয় ধর্মের প্রান্তিক মানুষেরা-শরন নেবেন সদ্গুরু অথবা পীরের। পীর/সদ্গুরুর ভক্তরা তাই সকলেই সমান, হিন্দু হোন কি মুসলিম।

ইসলামকে আর এক ভাবে ভাঙলেন এর আশ্রয় নেওয়া অজস্র ধর্মান্তরিত মানুষ। নতুন ধর্মের মধ্যে এঁরা নিয়ে এলেন তাঁদের ফেলে-আসা ধর্মের রিচুয়াল। রাজস্থানের মিও মুসলমানেরা ইদ-মহরমের পাশাপাশি দশেরা-দিওয়ালি-হোলিও পালন করতেন (এখনও করেন, তবে তেমনভাবে আর নয়।পার্টিশন রায়টে মিওরা যেভাবে রক্তাক্ত হয়েছেন, তার পরে অবশ্য এ আর অস্বাভাবিক কিছু নয়)। কচ্ছ-কাথিয়াবাড়ের মুসলমানদের বিয়েতে কাজির সঙ্গে সঙ্গে সারস্বত ব্রাহ্মণেরও উপস্থিতি জরুরি। পোখরানের কাছে রামদেওরাতে রামদেব পীরের সমাধিতে লাখ লাখ মানুষ এসে জমায়েত হন রাজস্থান-গুজরাট-মধ্যপ্রদেশ-পাঞ্জাব-হরিয়ানা থেকে।রাজস্তান জুড়ে এ হেন হিন্দু পীরের সংখ্যা অনেক। আরো নানান উদাহরন দেওয়া যায়, কিন্তু সেসব ধান ভানতে শিবের গীত হবে। হাতের কাছে সুন্দরবনের বনবিবি-দক্ষিণরায়ের কথা তো বলাই বাহুল্য। উত্তরবঙ্গে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে মাঝিরা গঙ্গাপুজো করে তবে নাও জলে ভাসান। সত্যপীর/সত্যনারায়ণ-মানিক পীরের কথা ছোটবেলা থেকে শুনতাম। শনিঠাকুরের সঙ্গে একসাথে সত্যপীরের সিন্নি খেয়ে বড় হয়েছি। মেদিনীপুরের মুসলমান পটশিল্পীদের কথাই বা বাকি থাকে কেন। হিন্দু নামের আড়ালে এঁরা হিন্দু দেবদেবীদের পট আঁকেন, পট বলেন। আর তো আছেনই আমাদের বাংলার একান্ত আপন বাউল-ফকিরেরা, আমাদের প্রাণের লালন।

শুধু যে তলায় তলায় প্রাণের মিলনের কাহিনী রচিত হচ্ছিল , তাও নয়। এই মিলনের ছোঁয়াচ কিছুটা হলেও এসে লাগছিল সমাজের এলিট অংশটিতে। মধ্যযুগীয় দক্ষিণ ভারতের হিন্দু টেক্সটে দিল্লীর সুলতানকে বলা হল ভগবান বিষ্ণুর নবরূপ। মুঘল সম্রাট আকবরের সমন্বয়ের আকাঙ্খার কথা নতুন করে বলবার নেই। শাহজাদা দারা শিকোহ পঞ্চাশটি উপনিষদ ও ভগবদ্গীতা ফারসী ভাষায় অনুবাদ করিয়েছিলেন; নিজে তিনি হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের একটি তুলনামূলক ধর্মতত্বের বই লিখেছিলেন, যার নাম দেন মজমা-উল-বাহরাইন (দুই মহাসাগরের মিলন)।দারার অতি-নিন্দিত ভ্রাতা ঔরঙ্গজেব এই সমন্বয়বাদের আগ্রহী পৃষ্ঠপোষক ছিলেন না অবশ্যই। কিন্তু হিন্দুত্ববাদীদের বিষাক্ত গালিগালাজও তাঁর প্রাপ্য নয়। ঔরঙ্গজেব মন্দির যেমন ভেঙ্গেছেন, মসজিদও ভেঙ্গেছেন তেমনই। এবং যত না ভেঙ্গেছেন, তার চেয়ে বেশী মন্দিরের জন্য জায়গীর দান করেছেন। কট্টর হিন্দুত্ববাদী হলে তাঁর বাহিনীতে এত অজস্র রাজপুত সেনাপ্রধান থাকতেন না। বেশ কিছু হিন্দু সাধকের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও তিনি নিয়েছেন।
তাছাড়া বলতে কি, হিন্দুহৃদয়রাজ শিবাজীও কিন্তু আদতে ছিলেন এক সেকুলার রাজা। শিবাজীর প্রধান সেনাপতিরা অনেকেই ছিলেন মুসলিম। হায়দরাবাদের নিজাম ছিলেন তাঁর মিত্রপক্ষ। ইয়াকুৎ বাবা নামে এক মুসলিম সাধক ছিলেন তাঁর অন্যতম আধ্যাত্মিক গুরু। কোরাণের অবমাননা,মসজিদ ধ্বংস কিম্বা মুসলিম নারী-শিশুর ওপর অত্যাচারে তাঁর কড়া বারণ ছিল। শিবাজী হোন কি ঔরঙ্গজেব-সেসময়কার রাষ্ট্রনায়কদের এই ধ্বংস ও যুদ্ধ ছিল একান্তই রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত-ধর্মকে মাথায় তুলতে গিয়ে রাজনৈতিক প্রাধান্য খর্ব করবার মত অপরিণত তাঁরা ছিলেন না।

১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কাছে এক প্রবল ধাক্কা। সাম্রাজ্যবাদ টিকিয়ে রাখার মূল শর্ত একটি দক্ষ ও অনুগত সেনাবাহিনী; এবং সেই সেনাবাহিনীর আসল স্তম্ভ যে "নেটিভ" সৈন্য, শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ অফিসাররা নন, সেটা দিনের আলোর মত পরিষ্কার ছিল। এই নেটিভ বাহিনীতে হিন্দু-মুসলিম সৈন্যদল এক হয়ে ব্রিটিশ প্রভুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরলে যে কী মারাত্মক ঘটনা ঘটতে পারে, মহাবিদ্রোহ তার জ্বলন্ত উদাহরণ। কোথায় ভুল হয়ে গিয়েছিল, কী কী পদক্ষেপ নিলে ভবিষ্যতে এহেন বিপদ ঠেকানো যেতে পারে, তা যাচাই করবার জন্য দু-দুটি কমিশন বসানো হয়েছিল-১৮৫৯ সালে পীল কমিশন এবং তারও কুড়ি বছর পরে ইডেন কমিশন। এইসব কমিশনের বিভিন্ন সাক্ষ্যবয়ান থেকে একটাই মোদ্দা কথা উঠে এসেছিল -দীর্ঘদিন পাশাপাশি একই বাহিনীতে থাকার ফলে হিন্দু ও মুসলমান সৈন্যদের মাঝের ধর্মীয় বিভাজন কমে এসে একটি একতার ভাব সৃষ্টি হয়েছিল। ব্রিটিশ-ভক্ত স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের লেখা থেকে উদ্ধৃত করি-

"সরকার দুটি বিরুদ্ধ গোষ্ঠীকে একই রেজিমেন্টে ঠাঁই দিয়েছিলেন, কিন্তু অনবরত আন্তঃক্রিয়ার ফলে তারা এক হয়ে যায়।.... যদি হিন্দু ও মুসলমানের পৃথক পৃথ্ক রেজিমেন্ট গড়ে তোলা যেত, তাহলে তাদের মধ্যে এই ভ্রাতৃত্বের বোধ জাগ্রত হত না"(The Causes of the Indian Revolt. Sir Syed Ahmed Khan.)

এমনটা যে ঘটতে পারে, তা অবশ্য বেশ কিছু ব্রিটিশ রাজপুরুষ আগে থেকেই আঁচ করেছিলেন। এবং ব্রিটিশ স্বার্থে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন জিইয়ে রাখা যে জরুরী, তাও তাঁদের কাছে পরিষ্কার ছিল। মহাবিদ্রোহের কয়েকবছর আগেই জেনারেল স্যার চার্লস নেপিয়ার মন্তব্য করেছিলেন -

"যে মুহূর্তে এই সাহসী ও দক্ষ নেটিভরা এক হতে শিখবে, সেই মুহূর্তেই তারা একত্রে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে; তেমনটা হলে খেল খতম, আমাদের আর কিছুই করার থাকবে না"(Life of General Sir Charles Napier.W.N. Bruce)

পীল কমিশনে সাক্ষ্য দিতে এসে এসে বেশ কিছু হোমড়াচোমড়া ব্রিটিশ রাজপুরুষ বলেন একমাত্র সাম্প্রদায়িক বিভাজনই ভারতবর্ষে ব্রিটিশ স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখতে সক্ষম। বম্বের গভর্নর লর্ড এলফিনস্টোন কমিশনের মিনিটে লেখেন-

"... আমি অনেকদিন ধরেই এই বিষয়টি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করেছি এবং আমি নিশ্চিত যে সাম্প্রদায়িক আত্মীকরণের যে নীতি আমরা বর্তমানে অনুসরণ করছি তার ঠিক উল্টোপথে হাঁটলেই ভারতবর্ষে আমাদের সামরিক সুরক্ষা বজায় রাখা সম্ভব।প্রাচীন রোমের Divide et impera নীতি আমাদেরও অনুসরণ করা উচিৎ।"

বাদবাকি প্রশাসক ও সেনাপ্রধানেরাও এই একই মত দেন এবং বলেন যে শুধুমাত্র ধর্মীয় নয়, জাতিগত বিভেদও যতদূর সম্ভব বজায় রাখা জরুরী। তারই ফল হিসেবে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ঢেলে সাজানো হয়। মহাবিদ্রোহে অতিসক্রিয়তার জন্য ব্রিটিশ শাসকরা মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর বেশী ক্ষিপ্ত ছিলেন; হিন্দুদের কম সিডিশাস বলে ভাবা হয়েছিল(ব্যতিক্রম অবশ্যই মুসলিমদের মধ্যে পাশতুন ও পাঞ্জাবী মুসলমান-এঁরা মহাবিদ্রোহে ব্রিটিশপক্ষে ছিলেন- এবং হিন্দুদের মধ্যে বিহার-আউধের হিন্দু ব্রাহ্মণ, যাঁরা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন)। সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে বৈধতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে "মার্শাল রেস"-এর ধারণার আমদানি করা হবে। গুর্খা, কুমায়ুনী-গারোয়ালী, শিখ, পাঠান, ডোগরাদের বেশী করে নিয়োগ করা হতে থাকবে বাহিনীতে।

সেনাবাহিনীতে সাম্প্রদায়িক এই বিভাজনের সাফল্য প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করতে ব্রিটিশ সরকারকে উৎসাহী করে। প্রাত্যহিকের জীবনযাপনের ক্ষেত্রে ছোট ছোট সব বিভেদের বেড়াজাল বানিয়ে তোলা হয়, যার কিছু উদাহরন আগেই দিয়েছি। ধর্ম-ভাষা-সম্প্রদায়ে বিভক্ত বিভিন্ন গোষ্ঠীগুলিকে নিয়ে বস্তুতঃ পুতুলনাচের খেলা চলতে থাকে; দক্ষ হাতের জাদুতে কখনো একে তোল্লাই দেওয়া, কখনো তাকে তোল্লাই দেওয়ার নীতি বেশ ফলদায়ক হয়। মহাবিদ্রোহের পরবর্তী সময়ে বিশেষভাবে ভারতীয় মুসলমানদের ওপর সরকারী উষ্মা ও নিপীড়ণের কারণে এবং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় মুসলিম সম্প্রদায় বেশ কোণঠাসা হয়ে পড়ে। সে সময় ছিল হিন্দুদের এগিয়ে যেতে দেওয়ার পালা। কিন্তু প্রশাসনিক বাধ্যতায় সরকার যেটুকু শিক্ষা সংস্কার করে, তারই ফলে এক শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত "এলিট" শ্রেনীর (বিশেষ করে বাঙালী হিন্দু ) জন্ম হয়, যারা পশ্চিমী শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমী জাতীয়তাবাদও আত্মস্থ করে এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বর্শামুখ ব্রিটিশের বিরুদ্ধে তাক করে। এই অব্স্থায় বিভাজন ও শাসনের সেই পুরনো খেলাটি খেলা ছাড়া আর উপায় ছিল না। হিন্দুদের রাশ টেনে ধরবার দরকার পড়ে। প্রশাসনিক সুবিধার নাম করে ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা করেন। উদ্দেশ্য ছিল দুটো-মুসলিম-প্রধান পুর্ববঙ্গে বাঙালী হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে, এবং ওড়িয়া ও বিহারীপ্রধান(বিহার, ওড়িশা ও আসাম তখন বাংলা'র সঙ্গে সংযুক্ত ছিল) পশ্চিমবঙ্গেও তাদের একই দশা ঘটবে।তুমুল প্রতিবাদের মুখ পড়ে কার্জন বঙ্গভঙ্গ রদ করেন ঠিকই, কিন্তু হীনবল ও পিছিয়ে-পড়া মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক চেতনা ও নিজস্ব হোমল্যান্ডের আকাঙ্খা উসকে দেওয়ার কাজটি বেশ ভালোভাবেই সম্পন্ন করা হয়।

অন্তর্মুখী মুসলিমদের পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রয়োজন সবার প্রথম অনুভব করেন স্যার সৈয়দ আহমেদ খান। এঁর সম্বন্ধে আর একটু বলা প্রয়োজন। অ্যাংলোফিল এই মুসলিম পন্ডিত ঠিকই বুঝেছিলেন শুধুমাত্র ইসলামিক শিক্ষার কুয়োতে মুখ গুঁজে বসে থাকলে ভারতীয় মুসলমানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। বিশেষ করে যখন মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক অশিক্ষা ( খোদ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সন্তানদের মধ্যেই কেউ কেউ ছিলেন অতি অল্প-শিক্ষিত, বাদবাকি সাধারণ মুসলিমদের কথা সহজেই অনুমেয়) ও হীনম্মন্যতা। স্যার সৈয়দ এও বুঝতে পেরেছিলেন , দেশে যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দানা বাঁধছে তার ফলে নিকট/দূর ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও হিন্দু মেজরিটি রাষ্ট্রের পত্তন হতে চলেছে। সেক্ষেত্রে মুসলিম স্বার্থরক্ষার একমাত্র উপায় ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।

১৯০৬ সালের পয়লা অক্টোবর ৩৫জন সম্ভ্রান্ত মুসলমান (of 'noble birth, wealth and power') লর্ড কার্জনের উত্তরসুরী ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান। এঁদের নেতা ছিলেন আগা খান। এঁরা "সহানুভুতিহীন হিন্দু সংখ্যাগুরু"দের হাত থেকে বাঁচবার জন্য বড়লাটের সাহায্যপ্রার্থনা করেন। সেই প্রথম এমন একটি বাক্যবন্ধ ব্যবহার করা হবে, যা বিশ শতকে উপমহাদেশের রাজনীতিতে বারে বারে প্রতিধ্বনিত হবে এবং তার চরিত্রটিকেই বদলে দেবে-the 'national interest' of Indian Muslims। তাঁরা খুব বিনীতভাবে চাকরীর ক্ষেত্রে আনুপাতিক হারে নিয়োগের অনুরোধ করেন। কাউন্সিল, মিউনিসিপ্যালিটি, বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট, হাইকোর্ট বেঞ্চ ইত্যাদিতে মুসলিমদের জন্য পৃথক প্রতিনিধিত্বের অনুরোধও করেন তাঁরা। লর্ড মিন্টো খুব আনন্দের সঙ্গে তাঁদের প্রস্তাবে সায় দেন। বিভাজনের এমন সুযোগ তিনি হাতছাড়া করেন নি। এর তিন বছর পরে ১৯০৯ সালে মর্লে-মিন্টো রিফর্মে আরো নানান অ্যাক্টের সঙ্গে একটি বিশেষ অ্যাক্ট কার্যকরী করা হবে- মুসলিমদের জন্য পৃথক ইলেকটোরেটের ব্যবস্থা। উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে ত্বরাণ্বিত করার ক্ষেত্রে এই আইনটি বিশেষ ভূমিকা নেবে।

জনৈক মুসলিম নেতা, ভারতীয় রাজনীতিতে তখনো ততটা পরিচিত মুখ নন- আগা খান ও সম্প্রদায়ের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন। বলেন- কে এই আগা খান? কে তাঁকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মুখপাত্র হওয়ার দায়িত্ব দিয়েছে? তিনি তো কোনো নির্বাচিত নেতা নন ! (ভাষা আমার, বক্তব্যের স্পিরিট জিন্নার)। জিন্না মনে করেছিলেন, এই ঘটনা হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের একতা নষ্ট করবে। আগা খান ও তাঁর অনুগামীরা অবশ্য হিন্দু-মুসলিম একতা নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবিত ছিলেন বলে মনে হয় না। তাঁদের কাছে মুসলিম স্বার্থই ছিল প্রথম ও প্রধান।

আগা খান পরে লিখবেন যে এটি একটি আশ্চর্য পরিহাস যে 'our doughtiest opponent in 1906 was Jinnah who came out in bitter hostility towards all that I and my friends had done.... He said that our principle of separate electorates was dividing the nation against itself.'

পরিহাসই বটে। যে জাতীয় একতার ব্রিফ সেসময় নিয়েছিলেন জিন্না, তারই মূলে কোপ মেরে পরে তিনি পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের জন্য সওয়াল করবেন এবং সফল হবেন।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে ১৮৮৬ সালে স্যার সৈয়দ আহমদ 'মহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্স' নামে একটি সংগঠন স্থাপন করেছিলেন। সংগঠনটির বিষয় ছিল মুসলিম জনগণের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তার। ইচ্ছাকৃতভাবে সংগঠনের অ্যাজেন্ডায় রাজনৈতিক আলোচনা নিষিদ্ধ রাখা হয়েছিল। ১৯০৬ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকা কনফারেন্সে সংগঠনটি সেই ব্যান তুলে দেয় এবং নতুন নাম নেয় 'অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগ'। তিন হাজার ডেলিগেটের সামনে কনফারেন্সটি চেয়ার করেন ঢাকার নবাব সলিমুল্লা। সভাপতি নিযুক্ত করা হয় সার সুলতান মহম্মদ শাহ ওরফে আগা খানকে (আগা খান ৩)।জন্ম নেয় মুসলিম স্বার্থরক্ষায় নিবেদিত একটি নতুন রাজনৈতিক দল, যদিও শুরুর দিনগুলিতে দলটি কেবলমাত্র মুসলমান এলিটদের স্বার্থই দেখবে, উপমহাদেশের সকল শ্রেণীর মুসলিমদের মধ্যে জনভিত্তি পেতে তার তখনো অনেক সময় লাগবে।

ঠিক সেই একই সময় কাছেই কলকাতায় ত্রিশ বছরের যুবক জিন্না ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সম্মেলনে ব্যস্ত। কংগ্রেসের সভাপতি তখন ভারতীয় রাজনীতির Grand Old Man দাদাভাই নৌরজি-জিন্নার অন্যতম রাজনৈতিক গুরু। নৌরজি তখন খুবই অসুস্থ, নিজের ভাষণটিও পাঠ করতে পারেন নি। সেটি অংশতঃ লিখে দেন জিন্না, পাঠ করেন গোপাল কৃষ্ণ গোখলে-জিন্নার অপর রাজনৈতিক গুরু। সেই সভায় সরোজিনী নাইডু জিন্নাকে প্রথম দেখেন। জিন্নাকে তিনি মনে রেখে দিয়েছিলেন ‘দেশপ্রেমের দৃপ্ত পৌরুষ'-এর প্রতীক’ হিসেবে।

১৯০৬ সালের কলকাতা কংগ্রেস সেশনে তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তিন চরমপন্থী-লাল- বাল-পাল। তাঁদের চাপেই নরমপন্থীরা ( সেই দলে জিন্নাও ছিলেন) গোখলের নেতৃত্বে "স্বরাজ" নিয়ে একটি রেজোলিউশন পাশ করেন, যদিও ভাষার কারিকুরিতে স্বরাজের দাবীটিকে কিছুটা লঘু করে দেখানো হয়। কংগ্রেসের এই ক্রমবর্ধমান চরমপন্থী ঝোঁকের মোকাবিলা করতে গিয়ে ব্রিটিশ সরকার অনিচ্ছাসত্ত্বেও ১৯০৯ সালে মর্লে -মিন্টো রিফর্ম আনবেন। বেশ কিছুকাল ধরেই ভাইসরয় ও প্রাদেশিক সরকারগুলিকে বিভিন্ন বিষয়ে উপদেশ দেওয়ার জন্য একটি লেজিস্লেটিভ কাউন্সিল চালু ছিল, যদিও তার সদস্যরা সকলেই ছিলেন মনোনীত, এবং অধিকাংশই ছিলেন রাজকর্মচারী। মর্লে-মিন্টো রিফর্ম এই কাউন্সিলে সামান্য সংখ্যক নির্বাচিত প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করলেন। এবং ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতিকে মাথায় রেখে মুসলিম জনসাধারণের জন্য পৃথক ইলেক্টোরেটের ব্যবস্থা করা হল (আগা খান ও সম্প্রদায়ের দৌত্য, দেখাই যাচ্ছে, বিফলে যায় নি)।

১৯১০ সালে গোখলে, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী ও মতিলাল নেহরু'র সাথে সাথে জিন্নাও কেন্দ্রীয় লেজিস্লেটিভ কাউন্সিলে নির্বাচিত হলেন।লর্ড মিন্টোর আকাঙ্খা ছিল কাউন্সিলকে দিয়ে ইচ্ছেমত যে কোনো বিষয়ে যে কোনো নীতি পাশ করিয়ে নেবেন; এক কথায় লেজিস্লেটিভ কাউন্সিলকে তিনি সরকারের রাবার স্ট্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। জিন্নার প্রথম বক্তৃতা মিন্টোর সেই আশায় জল ঢেলে দিল। তাঁর বক্তৃতার বিষয় ছিল সাগরপারে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আর এক কলোনিতে আর এক গুজরাটীর সাম্রাজ্যবাদ -বিরোধী আন্দোলন। সেই ব্যক্তির নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। দক্ষিন আফ্রিকার ভারতীয়দের উপর চালু সরকারী দমননীতিকে তুলোধোনা করেন জিন্না তাঁর বক্তৃতায়। ভাষাটি এইরকম -" The highest pitch of indignation and horror at the harsh and cruel treatment meted out to Indians in South Africa". লর্ড মিন্টো cruel treatment’ শব্দবন্ধে আপত্তি জানালে জিন্না বলেন-"My Lord! I should feel much inclined to use much stronger language." মিন্টো আর কথা বাড়ান নি।

১৯১২ সালে বাঁকিপুরে জিন্না প্রথম মুসলিম লিগের কনফারেন্সে উপস্থিত হন, যদিও তিনি তখনো লিগের সদস্য নন। বাঁকিপুরে কংগ্রেসের সম্মেলন উপলক্ষে জিন্না সেসময় সেখানে গিয়েছিলেন। এর কিছুদিন বাদে লক্ষ্ণৌ-য়ে লিগের বিশেষ সম্মেলনে জিন্নাকে বিশেষ অতিথি হিসেবে ডাকা হয়, সে সম্মেলনে সরোজিনী নাইডুও ছিলেন। এর পরের বছর জিন্না মুসলিম লিগে যোগ দেন; খুব যে ইচ্ছুক ছিলেন , তা বোধ হয় নয়, কেননা যোগদানটি ছিল শর্তসাপেক্ষ-"that his 'loyalty to the Muslim League and the Muslim interest would in no way and at no time imply even the shadow of disloyalty to the larger national cause to which his life was dedicated' (Jinnah: His Speeches and Writings, 1912-1917, edited by Sarojini Naidu)." গোপালকৃষ্ণ গোখলে সেই বছরই জিন্নাকে বলেন "the best ambassador of Hindu-Muslim unity."

সময়টা তখনো বেশ কিছুটা অন্যরকম। আরো বছর তিরিশেক বাদে ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক ঘৃণার যে ভয়ঙ্কর চেহারা দেখা যাবে, তখনো তার তেমন কিছু ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না। ১৯১৪ সালে মৌলানা আজাদ ও হাকিম আজমল খান মুসলিম লিগ সম্মেলনে যোগ দেবেন( এঁরা পরে জাতীয় কংগ্রেসের ভাবধারায় দীক্ষিত হন); পরের বছর লিগের সম্মেলনে উপস্থিত থাকবেন মদন মোহন মালব্য, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, সরোজিনী নাইডু , অ্যানি বেসান্ত ও মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে গান্ধি ফিরে এলে গুজরাটি সোসাইটি-র সভাপতি হিসেবে জিন্না তাঁকে অভ্যর্থনা জানাবেন। সেই বছরই বম্বেতে কংগ্রেস ও লিগের সম্মেলন একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। কংগ্রেস সভাপতি সত্যেন্দ্র সিনহা ও মজহারুল হকের ( কংগ্রেস নেতা যিনি সেবছর লিগের সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন) সঙ্গে জিন্না অক্লান্ত পরিশ্রম করেন যাতে একটি যৌথ সভা থেকে লিগ ও কংগ্রেস একসঙ্গে তাদের প্রস্তাব পাশ করে। লিগের সভায় কাঠমোল্লারা জিন্না ও হককে গালিগালাজ করেন। সভা মুলতুবি রাখতে হয়।

পরের বছর ১৯১৬ সালে লক্ষ্ণৌতে জিন্না স্বয়ং লিগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এবং কংগ্রেস সম্মেলনের সভাপতি এ সি মজুমদারের সঙ্গে একযোগে "লক্ষ্ণৌ চুক্তি" সই করেন। জিন্নার চেষ্টাতেই এই চুক্তিটি সম্ভব হয়েছিল, এ কথা অনস্বীকার্য। চুক্তিটির কয়েকটি মূল বিষয় ছিল-
১।ভারতবর্ষে সেল্ফ গভর্নমেন্ট প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
২। কেন্দ্রীয় সরকারে মুসলিমদের এক-তৃতীয়াংশ প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
৩। প্রতিটি সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক ইলেকটোরেটের ব্যবস্থা রাখতে হবে, যতদিন না তারা সংযুক্ত ইলেক্টোরেটে রাজী হয়।

হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পথে ১৯১৬-র লক্ষ্ণৌ চুক্তি একটি মাইলফলক। অদূর ভবিষ্যতে ভারত যে অবিভক্তভাবে স্বাধীনতা অর্জন করবে সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মনে কোনো সংশয় নেই। উল্লসিত এ সি মজুমদার বললেন- all differences had been settled, and Hindus and Muslims would make a 'joint demand for a Representative Government in India'."








১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হল।বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকেই ভারতীয় নেতাদের মনে স্বরাজ নিয়ে আশা-আকাঙ্খার জন্ম হয়েছিল। মর্লে-মিন্টো রিফর্ম তার একটি কারন। দ্বিতীয়তঃ ব্রিটিশ সরকারের চারটি বড় কলোনি,-অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা ও দক্ষিন আফ্রিকা ততদিনে ডোমিনিয়নের মর্যাদা পেয়ে গেছে। অতএব ভারতেরও না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। সেই আকাঙ্খাকে আরো উস্কে দিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এডউইন মন্টেগু (ভারতবিষয়ক সেক্রেটারি অফ স্টেট) ঘোষণা করেন-ব্রিটিশ সরকারের নীতি হল-'Gradual development of self-governing institutions , with a view to the progressive realization of responsible government in India as an integral part of the Empire'। সম্ভবতঃ সেটি ছিল ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সামনে গাজর-ঝোলানো, কেননা বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয়দের অংশগ্রহণ ব্রিটিশ সরকারের জন্য খুব জরুরী হয়ে পড়েছিল। গান্ধি তখন ক্রমেই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠছেন ( এবং জিন্না বেশ খানিকটা গান্ধির ছায়ায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছেন)। স্বরাজ নিয়ে একটি ভাসা-ভাসা প্রতিশ্রুতির বদলে গান্ধি ভারতবাসীদের উদ্দেশ্যে আবেদন রাখেন বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ পক্ষের হয়ে যোগদান করবার জন্য। প্রায় দশলক্ষ ভারতীয় সৈন্য ইংরেজের হয়ে বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করেন। এঁদের মধ্যে প্রায় ৬২০০০ মানুষ মারা যান; আরো ৬৭০০০ জখম হন। ১৯১৪ সালে ভারত ১০০ মিলিয়্ন পাউন্ড ওয়েস্টমিনস্টারকে এককালীন যুদ্ধগ্রান্ট হিসেবে দান করে। শুধু তাই নয়, এরপরেও দফায় দফায় ভারত থেকে টাকা পাঠানো হবে ব্রিটেনের যুদ্ধপরিস্থিতিতে সহায়তা করবার জন্য। এর মধ্যে বেশ বড় একটি অংশই হল নানান ধরনের কর। বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয় সেনা নিয়োগে সহায়তা করবার জন্য গান্ধিকে কাইজার-ই হিন্দ খেতাব দেওয়া হবে।

১৯১৮ সালে যুদ্ধ শেষ হল।হাজার হাজার ভারতীয় সেনা বিকলাঙ্গ হয়ে দেশে ফিরে এলেন, আরো হাজার হাজার ভারতীয় সেনার মৃত্যুর খবর এল । কিন্তু স্বরাজ এল না। পরিবর্তে এল মন্টেগু-চেমসফোর্ড রিফর্ম। দুধের বদলে ঘোলের চেয়েও স্বাদহীন কিছু। এই রিফর্মের একটি মুল বিষয় হল ডায়ার্কি অথবা দ্বৈত শাসনব্যবস্থা। প্রাদেশিক আইনসভাগুলিকে বড় করা হল, নির্বাচকদের সংখ্যা বাড়ানো হল, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা-র মত কিছু কিছু বিষয় প্রাদেশিক আইনসভার হাতে তুলে দেওয়া হল। কিন্তু আইনসভার মাথার ওপরে রইলেন গভর্নর; আইনশৃঙ্খলা, অর্থ-র মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির ওপর তাঁর পূর্ণ অধিকার বলবৎ রইল। সবচেয়ে বড় কথা, ভাইসরয় চাইলেই প্রাদেশিক আইনসভার যে কোনো সিদ্ধান্ত রদ করতে পারবেন, এমন বিধান রইল।

স্বভাবতই এহেন নাকের বদলে নরুন পেয়ে গান্ধি ও কংগ্রেস নেতারা খুশি হলেন না। গান্ধি অহিংস সত্যাগ্রহ-র ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। ততদিনে সরকারের কংগ্রেস তথা ভারতীয়দের খুশি করার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। ব্রিটিশ সরকার রাউলাট আইন জারি করলেন। এই আইনের জোরে বিচারক যেকোনো রাজনৈতিক মামলা জুরিদের সাহায্য ছাড়াই নিষ্পত্তি করতে পারবেন; এবং তার চেয়েও বড় কথা, প্রশাসন চাইলে যেকোনো মানুষকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিনাবিচারে বন্দী রাখতে পারবে।

ক্ষিপ্ত কংগ্রেস গান্ধির নেতৃত্বে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করল। ১৯১৯-এর ৬ই এপ্রিল গান্ধি দেশব্যাপী হরতাল ঘোষণা করলেন। সারা দেশে বিপুল সাড়া পড়ল; সম্ভবতঃ সবচেয়ে বেশী সাড়া পড়ল পাঞ্জাবে। ১০ তারিখ দুই কংগ্রেস নেতা সত্যপাল আর সইফুদ্দিন কিচলুকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে অমৃতসরে ডেপুটি কমিশনারের বাড়ির সামনে আন্দোলনকারীরা ধর্নায় বসলেন। ধর্নাকারীদের ওপর সেনাবাহিনী গুলি চালালে বেশ কিছু মানুষ মারা গেলেন। প্রতিবাদ হল সর্বাত্মক। অমৃতসরে সরকারী বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হল, আন্দোলন হিংসাত্মক চেহারা নিল। পাঁচজন ইউরোপীয় খুন হলেন। জনৈক ইংরেজ মিশনারি মহিলাকে জখম করা হল।পরদিন সকালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ার জলন্ধর থেকে এসে অমৃতসরের দখল নিলেন। ১৩ তারিখ সকালে অমৃতসরে মার্শাল ল জারি হল। দিনটি ছিল 'বৈশাখী'- শিখ ও হিন্দুদের উৎসবের দিন। হরমন্দির সাহেবের কাছে জালিয়নওয়ালাবাগে কয়েক হাজার হিন্দু-শিখ ও মুসলিম জড়ো হয়েছিলেন উৎসবের উদ্দেশে। এঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন চাষী ও ছোট ব্যবসায়ী, অমৃতসরের বাইরে থেকে এঁরা এসেছিলেন বাৎসরিক বৈশাখী মেলায় (গবাদি পশু/ঘোড়া কেনাবেচার মেলা) যোগ দিতে। স্বভাবতই এঁরা কার্ফিউ জারি'র ব্যাপারটি জানতেন না। বেশ কিছু লোক ছিলেন স্বর্ণমন্দির ফেরত। বাগের এক কোণে নেতাদের গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদসভার আয়োজনও হয়েছিল, যদিও সভাটি ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। এই প্রতিবাদসভাটির কথা শুনেই ডায়ার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন।

বিকেল সওয়া পাঁচটা নাগাদ ডায়ার ১০০ জন গুর্খা, শিখ , পাঠান ও বালুচ বন্দুকধারী সৈন্য নিয়ে জালিয়নওয়ালাবাগ পৌঁছলেন। তাঁর সঙ্গে দুটি মেশিনগানবাহী গাড়িও ছিল। একজনকে পাঠানো হল জমায়েতে কত মানুষ রয়েছে, তার একটা আন্দাজ নিতে। সে এসে জানালো সংখ্যাটা প্রায় ৫ হাজার, যদিও আসলে প্রায় কুড়ি হাজার মানুষ সেসময় জালিয়নওয়ালাবাগে উপস্থিত ছিলেন। বাগটি চারদিকে বাড়িঘর দিয়ে ঘেরা, দুটিমাত্র সরু নির্গমনপথ রয়েছে। ডায়ার সে পথদুটি বন্ধ করে দিলেন। জনতাকে কোনোরকম আগাম সতর্কবার্তা না দিয়ে ডায়ার তাঁর সেনাবাহিনীকে বললেন গুলি চালাতে। খুব নির্দিষ্টভাবে বললেন, জমায়েতের সবচেয়ে ভরাট অংশটিতে গুলি চালাতে হবে, মারবার উদ্দেশ্যে গুলি চালাতে হবে এবং যারা পালাবার চেষ্টা করবে , তাদের বেছে বেছে গুলি চালাতে হবে। দশ মিনিট ধরে ডায়ারের সৈন্যরা ১৬৫০ রাউন্ড গুলি চালাল।

পালাবার চেষ্টা করে অবশ্য কোনো লাভ ছিল না। কেননা পালাবার কোনো রাস্তাই ছিল না। প্রচুর মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেলেন, অনেকে মারা গেলেন হুড়োহুড়িতে পদপিষ্ট হয়ে। কমপক্ষে ১২০ জন মারা গেলেন গুলির হাত থেকে বাঁচতে কুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে। অনেক আহত মানুষ ব্রিটিশ হাসপাতালে যেতে ভয় পেলেন। কার্ফিউ জারি থাকার ফলে চাইলেও অনেককে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া গেল না। বেশ কিছু আহত মানুষ সে রাতেই বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন। সরকারী হিসেবে ৩৭৯ জন পুরুষ-নারী-শিশু ও বৃদ্ধ মারা গিয়েছিলেন, যদিও অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেন আসল সংখ্যাটি এর চেয়ে অনেক বেশী। জাতীয় কংগ্রেসের তদন্ত কমিশনের হিসেবে মৃত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১০০০, আহত আরো পাঁচশো।

ডায়ার বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত হন নি। পরবর্তীকালে যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয় কেন তিনি জনতাকে ছত্রভঙ্গ হওয়ার সুযোগ দেন নি, তখন তাঁর উত্তর ছিল সোজাসাপটা-যে, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল "not to disperse the meeting but to punish the Indians for disobedience." ঘটনার পরে তিনি তাঁর ওপরওয়ালাকে রিপোর্ট পাঠান যে তাঁকে একটি বিপ্লবী সেনাদলের মোকাবিলা করতে হয়েছিল; প্রত্যুত্তরে মেজর জেনারেল উইলিয়াম বেনন জানালেনঃ "Your action correct and Lieutenant Governor approves." গণহত্যার পরের কয়েকদিন প্রকাশ্য বেত্রাঘাতের নির্দেশ জারি থাকে। যে রাস্তায় মিশনারী মহিলাকে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল, সেই রাস্তায় যে কোনো ভারতীয়কে দেখা গেলেই মাটিতে শুয়ে পড়ে দন্ডি কাটতে বাধ্য করা হয়; ডায়ার পরে বলবেন-"Some Indians crawl face downwards in front of their gods. I wanted them to know that a British woman is as sacred as a Hindu god and therefore they have to crawl in front of her, too."

জালিয়নওয়ালাবাগের খবর যাতে বৃহত্তর ভারতীয় জনতা ও আন্তর্জাতিক মহলে ছড়াতে না পারে, তার জন্য কড়া সামরিক সেন্সরশিপ জারি হল। তাসত্ত্বেও এরকম দানবিক একটি ঘটনার খবর চাউর হতে দেরী হল না। ২২শে মে রবীন্দ্রনাথ খবর পেয়ে কলকাতায় একটি প্রতিবাদসভার আয়োজন করতে চেষ্টা করলেন; কিন্তু কংগ্রেস নেতারা রাজী হলেন না। সম্ভবতঃ তাঁরা সরকারের তরফে এহেন কড়া প্রত্যুত্তরের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। সম্ভবতঃ ঘটনার অভিঘাতে তাঁরা ভীত ও শকড্ হয়ে পড়েছিলেন। আহত রবীন্দ্রনাথ ভাইসরয়কে চিঠি লিখে নাইট উপাধি ত্যাগ করলেন-"The enormity of the measures taken by the Government in the Punjab for quelling some local disturbances has, with a rude shock, revealed to our minds the helplessness of our position as British subjects in India ... [T]he very least that I can do for my country is to take all consequences upon myself in giving voice to the protest of the millions of my countrymen, surprised into a dumb anguish of terror. The time has come when badges of honour make our shame glaring in the incongruous context of humiliation..."

ব্রিটেনে এই ঘটনার একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেল। অভিজাত ও দক্ষিনপন্থীরা ডায়ারকে হিরো হিসেবে দেখলেন। হাউজ অফ লর্ডসে তাঁর স্বপক্ষে মোশন পাশ করা হল। মর্নিংপোস্ট খবরের কাগজের পক্ষ থেকে তাঁর রিটায়ারমেন্ট ফান্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হল; ২৬০০০ পাউন্ড জমা পড়ল। রুডইয়ার্ড কিপলিং, ডিউক অফ সমারসেট থেকে শুরু করে সাধারণ ব্রিটিশ, অনেকেই তহবিলে দান করলেন। পার্লামেন্টে সার এডউইন মন্টেগু উঠে দাঁড়িয়ে যখন ডায়ারকে 'সন্ত্রাসবাদ' ও 'ভারতীয়দের বিরুদ্ধে জাতিবিদ্বেষী অপমানের' দায়ে অভিযুক্ত করলেন, তখন কনজারভেটিভরা চিৎকার করে তাঁকে দাবিয়ে দিলেন। মন্টেগুকে বলশেভিক বলা হল, বাছা বাছা অ্যান্টি সেমিটিক গালাগাল দেওয়া হল( মন্টেগু ছিলেন ইহুদী); বলা হল ডায়ার ভারতকে আর একটি মিউটিনির হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।

আশ্চর্যজনকভাবে কনজারভেটিভদের শিরোমণি স্যার উইনস্টন চার্চিল কিন্তু উল্টো সুর গাইলেন। যে চার্চিল একদা বলবেন-"I hate Indians. They are a beastly people with a beastly religion"; অথবা গান্ধি সম্বন্ধে বলবেন-".. ought to be lain bound hand and foot at the gates of Delhi, and then trampled on by an enormous elephant with the new Viceroy seated on its back", সেই চার্চিলই জালিয়নওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নিন্দা করলেন। বললেন, "It was an extraordinary event, a monstrous event, an event which stands in singular and sinister isolation". ডায়ারকে শেষমেশ চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হল, তাঁকে দেশে ফেরত আনা হল। হাউজ অফ কমন্সে তাঁর বিরুদ্ধে নিন্দাপ্রস্তাব আনা হল। ঘটনার তদন্ত করবার জন্য হান্টার কমিশন গঠন করা হল (যদিও সে তদন্ত তাঁকে সরাসরি দোষী সাব্যস্ত করবে না)। কিন্তু ততদিনে যা ক্ষতি হবার হয়ে গেছে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় জনমত এককাট্টা হয়ে উঠল। আবেদন-নিবেদনের নীতিতে যে কাজ চলবে না, সে কথা অধিকাংশ কংগ্রেস নেতার কাছে স্পষ্ট ।


শেয়ার করুন


Avatar: Indranil Ghosh Dastidar

Re: দেশভাগঃ ফিরে দেখা

আমাকে এমনি একটা উদ্ভট সংখ্যা বানিয়ে দিল কেন? ও পাই !
Avatar: dd

Re: দেশভাগঃ ফিরে দেখা

"ঔরঙ্গজেব মন্দির যেমন ভেঙ্গেছেন, মসজিদও ভেঙ্গেছেন তেমনই।" তাই?

ঔরংগ্জীবের কোনো মসজিদ ভাঙার খবর কখনো দেখি নি। অব্শ্য খুঁজেছিও খুব কম। এই তথ্যের রেফারেন্স জানতে চাই।
Avatar: সিকি

Re: দেশভাগঃ ফিরে দেখা

আহা! বরিষ ধরামাঝে শান্তির বারি।
Avatar: I

Re: দেশভাগঃ ফিরে দেখা

B N Pandey(1996):Aurangzeb and Tipu Sultan:Evaluation of their religious policies
ডিডি,এই ন্যান।
Avatar: dd

Re: দেশভাগঃ ফিরে দেখা

বোঝো।

তৃষ্ণার্ত্ত হয়ে চাইলেম আদঘটি জল, তাড়াতাড়ি এনেদিলো এক ধামা বেল।

B N Pandey(1996):Aurangzeb and Tipu Sultan:Evaluation of their religious policies - এ লইয়া আমি কী করিবো? কোথায় পাবো এরে? আর পেলেই বা কি? রিটায়ার্ড মানুষ, সময়ের বড়ো অভাব। পড়বো কখন?

বলি ঔরংজীব কোন মসজিদ(গুলো) ভেঙেছেন, তার কোনো হদীশ আছে ? নাম ধাম সুদ্দু। এটুকুই তো জানতে চাই।
Avatar: I

Re: দেশভাগঃ ফিরে দেখা

গোলকোণ্ডা-র জামা মসজিদ ভেঙ্গেছিলেন।
Avatar: I

Re: দেশভাগঃ ফিরে দেখা

এর বেশী বলতে হলে আমাকে বইটা পড়তে হবে।ওটা নেট এর আর্টিকল থেকে সাইটেসন ছিল।ভালো ই হবে,পড়া হয়ে যাবে।কিন্তু এত খরচা বাড়ান ক্যান?একেই পার্টিশন নিয়ে গুচ্ছের বই কিনতে হচ্ছে।
Avatar: Tim

Re: দেশভাগঃ ফিরে দেখা

নেটে খালি এইটুকুই পাওয়া যাচ্ছে। ইন্দোদা লেখা খুব ভালো হচ্ছে। পড়ছি।

"Dr. Pande has cited instances, which show that Aurangzeb ordered destruction of temples and mosques and the mention may be made of Vishvanath Temple at Varanasi and the Jama Masjid at Golkunda. But the reasons have to be viewed and investigated in proper historical perspective. The aforesaid temple had become the centre of conspiracy against the state and similar was the case with the mosque as highlighted by Dr Pande. On further investigation, it is reported that Aurangzeb had ordered raid of the temple in order to rescue women members of the family of a Minister of Rajasthan who had gone there on pilgrimage. The ruler of Golkunda after collecting revenue of the state, did not pay his dues to the Empirial Authority at Delhi. He buried this Khazana and erected a Jama Masjid over it. When Aurangzeb came to know of it, he ordered the demolition of the mosque. Dr. Pande refuted the charge against Aurangzeb that he was an anti-Hindu monarch and had established that Aurangzeb did not make any distinction between temples and mosques so far as state administration was concerned. Thus Dr. Pande has thrown new light on the role, character and personality of one of the brightest of the Mughal rulers."

http://www.iosworld.org/ebk7.htm
Avatar: modi

Re: দেশভাগঃ ফিরে দেখা

বিশ্বনাথ মন্দির ধ্বংস নিয়ে পান্ডের লেখা অনেকেই খুব ডিটেলে কোট করেছেন, মনিশংকর আইয়ার সহ। কিন্তু পান্ডের সোর্সটা ক্লিয়ার না। আরএসএসের লোকেরা দাবী করে পান্ডে এক অনামা মুল্লার মুখের কথা থেকে এই গল্পটা বানিয়েছেন।

পান্ডের সোর্সটা জানা দরকার।
Avatar: Indranil Ghosh Dastidar

Re: দেশভাগঃ ফিরে দেখা

আমি পোস্ট করলেই আমার নামের জায়গায় কিসব বিদঘুটে নাম দেখাচ্ছে। পাই কি এয়ার কিছু এট্টা বন্দোবস্ত করে উঠতে পারে না? শুধুমুধুই কি কম্পিউটারোলা হয়েছে?
Avatar: π

Re: দেশভাগঃ ফিরে দেখা

আরে অ্যাপেণ্ড করলে সবার জন্যই আপডেটে এরকম আসে। ঘাবড়িও না ঃ)
Avatar: Indranil Ghosh Dastidar

Re: দেশভাগঃ ফিরে দেখা

একটা বিষয় নিয়ে খটকা আছে। যদ্দুর মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ নাইট উপাধি ত্যাগের পরদিন সম্ভবতঃ স্টেটসম্যান পত্রিকার সম্পাদকীয়-তে বিদ্রুপ করা হয়েছিল-বাঙালী 'বাবু' থাকে, কি 'স্যার' হয়, তা নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের কিছু এসে যায় না।

ব্যাপারটা নেটে পেলাম না। কেউ আলোকপাত করবেন?
Avatar: শিবাংশু

Re: দেশভাগঃ ফিরে দেখা

এই লেখাটা দেখতে পারো,

http://www.guruchandali.com/blog/2016/04/23/1461398354071.html?author=
somashiban

Avatar: I

Re: দেশভাগঃ ফিরে দেখা

শিবাংশুদা,ধন্যবাদ। লেখাটা আগে পড়া হয় নি।খুব ভালো লাগলো।তবে একটা জিনিষ পরিস্কার হল না,ডায়ার কিভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধতা করেছিলেন।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন