কৃষ্ণেন্দু মুখার্জ্জী RSS feed

কৃষ্ণেন্দু মুখার্জ্জীএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • মন্দিরে মিলায় ধর্ম
    ১নির্ধারিত সময়ে ক্লাবঘরে পৌঁছে দেখি প্রায় জনা দশেক গুছিয়ে বসে আছে। এটা সচরাচর দেখতাম না ইদানীং। যে সময়ে মিটিং ডাকা হ’ত সেই সময়ে মিটিঙের আহ্বাহক পৌঁছে কাছের লোকেদের ফোন ও বাকিদের জন্য হোয়া (হোয়াটস্যাপ গ্রুপ, অনেকবার এর কথা আসবে তাই এখন থেকে হোয়া) গ্রুপে ...
  • আমাদের দুর্গা পূজা
    ছোটবেলায় হঠাৎ মাথায় প্রশ্ন আসছি্ল সব প্রতিমার মুখ দক্ষিন মুখি হয় কেন? সমবয়সী যাকে জিজ্ঞাস করেছিলাম সে উত্তর দিয়েছিল এটা নিয়ম, তোদের যেমন নামাজ পড়তে হয় পশ্চিম মুখি হয়ে এটাও তেমন। ওর জ্ঞান বিতরন শেষ হলো না, বলল খ্রিস্টানরা প্রার্থনা করে পুব মুখি হয়ে আর ...
  • দেশভাগঃ ফিরে দেখা
    রাত বারোটা পেরিয়ে যাওয়ার পর সোনালী পিং করল। "আধুনিক ভারতবর্ষের কোন পাঁচটা ঘটনা তোর ওপর সবচেয়ে বেশী ইমপ্যাক্ট ফেলেছে? "সোনালী কি সাংবাদিকতা ধরল? আমার ওপর সাক্ষাৎকার মক্সো করে হাত পাকাচ্ছে?আমি তানানা করি। এড়িয়ে যেতে চাই। তারপর মনে হয়, এটা একটা ছোট্ট খেলা। ...
  • সুর অ-সুর
    এখন কত কূটকচালি ! একদিকে এক ধর্মের লোক অন্যদের জন্য বিধিনিষেধ বাধাবিপত্তি আরোপ করে চলেছে তো অন্যদিকে একদিকে ধর্মের নামে ফতোয়া তো অন্যদিকে ধর্ম ছাঁটার নিদান। দুর্গাপুজোয় এগরোল খাওয়া চলবে কি চলবে না , পুজোয় মাতামাতি করা ভাল না খারাপ ,পুজোর মত ...
  • মানুষের গল্প
    এটা একটা গল্প। একটাই গল্প। একেবারে বানানো নয় - কাহিনীটি একটু অন্যরকম। কারো একান্ত সুগোপন ব্যক্তিগত দুঃখকে সকলের কাছে অনাবৃত করা কতদূর সমীচীন হচ্ছে জানি না, কতটুকু প্রকাশ করব তা নিজেই ঠিক করতে পারছি না। জন্মগত প্রকৃতিচিহ্নের বিপরীতমুখী মানুষদের অসহায় ...
  • পুজোর এচাল বেচাল
    পুজোর আর দশদিন বাকি, আজ শনিবার আর কাল বিশ্বকর্মা পুজো; ত্রহস্পর্শ যোগে রাস্তায় হাত মোছার ভারী সুবিধেজনক পরিস্থিতি। হাত মোছা মানে এই মিষ্টি খেয়ে রসটা বা আলুরচপ খেয়ে তেলটা মোছার কথা বলছি। শপিং মল গুলোতে মাইকে অনবরত ঘোষনা হয়ে চলেছে, 'এই অফার মিস করা মানে তা ...
  • ঘুম
    আগে খুব ঘুম পেয়ে যেতো। পড়তে বসলে তো কথাই নেই। ঢুলতে ঢুলতে লাল চোখ। কি পড়ছিস? সামনে ভূগোল বই, পড়ছি মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ। মা তো রেগে আগুন। ঘুম ছাড়া জীবনের কোন লক্ষ্য নেই মেয়ের। কি আক্ষেপ কি আক্ষেপ মায়ের। মা-রা ছিলেন আট বোন দুই ভাই, সর্বদাই কেউ না ...
  • 'এই ধ্বংসের দায়ভাগে': ভাবাদীঘি এবং আরও কিছু
    এই একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছে ক্রমে বুঝতে পারা যাচ্ছে যে সংকটের এক নতুন রুপরেখা তৈরি হচ্ছে। যে প্রগতিমুখর বেঁচে থাকায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠছি প্রতিনিয়ত, তাকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, "কোথায় লুকোবে ধু ধু করে মরুভূমি?"। এমন হতাশার উচ্চারণ যে আদৌ অমূলক নয়, তার ...
  • সেইসব দিনগুলি…
    সেইসব দিনগুলি…ঝুমা সমাদ্দার…...তারপর তো 'গল্পদাদুর আসর'ও ফুরিয়ে গেল। "দাঁড়ি কমা সহ 'এসেছে শরৎ' লেখা" শেষ হতে না হতেই মা জোর করে সামনে বসিয়ে টেনে টেনে চুলে বেড়াবিনুনী বেঁধে দিতে লাগলেন । মা'র শাড়িতে কেমন একটা হলুদ-তেল-বসন্তমালতী'...
  • হরিপদ কেরানিরর বিদেশযাত্রা
    অনেকদিন আগে , প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে এই গেঁয়ো মহারাজ , তখন তিনি আরোই ক্যাবলা , আনস্মার্ট , ছড়ু ছিলেন , মানে এখনও কম না , যাই হোক সেই সময় দেশের বাইরে যাবার সুযোগ ঘটেছিলো নেহাত আর কেউ যেতে চায়নি বলেই । না হলে খামোখা আমার নামে একটা আস্ত ভিসা হবার চান্স নেই এ ...

আকাটের পত্র

কৃষ্ণেন্দু মুখার্জ্জী

ভাই মর্কট,

এমন সঙ্কটের সময়ে তোমায় ছাড়া আর কাকেই বা চিঠি লিখি বলো ! আমার এখন ক্ষুব্বিপদ ! মহামারি অবস্থা যাকে বলে । যেদিন টিভিতে বলেছে মাধমিকের রেজাল্ট বেরোবে এই সপ্তাহের শেষের দিকে, সেদিন থেকেই ঘরের পরিবেশ কেমনধারা হাউমাউ হয়ে উঠেছে। সবার আচার-আচরণ খুব সন্দেহজনক । কয়েকদিন ধরেই লক্ষ্য করছি মা রোজ আমায় দেখিয়ে দেখিয়ে খুন্তি-শিল-নোড়া সব পরিষ্কার করছে আর যত্ন করে সাজিয়ে রাখছে। সেই যে আলুজেঠু, যিনি এককালে নামকরা তন্ত্রসাধক ছিলেন, তাঁর আবার এখন শুনি শবসাধনা করে পিশাচসিদ্ধ হওয়ার শখ জেগেছে। তা তিনি আজকাল আমাকে দেখতে পেলেই এমন একটা পৈশাচিক হাসি দিচ্ছেন, আমার তো ভয়েই সবকিছু শুকিয়ে যাচ্ছে । বুঝতে পেরেছি দিন ঘনিয়ে আসছে । বাবা রোজ বন্ধ ঘরের ভেতর আবৃত্তিচর্চা করে। আওয়াজ আসে , “ক্ষমা যেথা ক্ষীণ দুর্বলতা, হে রুদ্র নিষ্ঠুর যেন হতে পারি...”। এ তো ভালো লক্ষণ নয়। পরপর চার দিন ধরে বাবা একই কবিতা আবৃত্তি করে কেন ! রেজাল্টের দিনের জন্যে আগাম প্রস্তুতি নাকি ! এদিকে বাড়ির ছাগলগুলো হঠাৎ করেই আমার সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে দিয়েছে । এসব অত্যন্ত অশুভ সঙ্কেত।

বাড়ি থেকে বের হওয়াও দুষ্কর হয়ে পড়েছে। পথে ঘাটে যার সাথেই দেখা হয়, সে-ই জ্বালাতন শুরু করে। টিনটিনের কমিকসে সেই হাসিহাসি মুখওয়ালা উটগুলোর ছবি আঁকা থাকে দেখেছ ? একেবারে হুবহু সেইরকম মুখ করে সবাই আসছে আর বলে যাচ্ছে, “ কয়েকদিনের মধ্যেই রেজাল্ট তো ! হুঁ হুঁ ”। বদ্বাদুড় একেকটা ! এসব যতই শুনছি তত আতঙ্ক বেড়ে যাচ্ছে । সেদিন এঁড়েদা বলে আমি নাকি খুব মোটা হয়ে যাচ্ছি বেশি চিন্তা করে করে। “... আরে এত টেনশনের কী আছে ! মাধ্যমিক আবার একটা পরীক্ষা হল ! এই তো আমিই তিনবার দিয়ে দিলুম... ”। আমি ভয়ে পালিয়ে এলুম ওখান থেকে ।

আমাদের পাড়ায় সব রত্নদের বাস । বড়রাস্তার মোড়ে শেয়ালকাকুর বাড়ি । ওনার মেয়ে গোটা পাড়ার গর্ব। গতবার উচ্চমাধ্যমিকে, যেসব মেয়ের নাম ‘র’ দিয়ে শুরু, তাদের মধ্যে যারা কালো পেন দিয়ে সব পরীক্ষা দিয়েছিল, তাদের মধ্যে আবার যারা চশমা পরে না, সেই মেয়ে তাদের মধ্যে দ্বিতীয় হয়েছিল । ওনার ছোট ছেলেও কম যায় না । আগের বারের মাধ্যমিকে, জানুয়ারি মাসে জন্ম হওয়া ও এখনও গোঁফ না গজানো পরীক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম হয়ে সে পাড়ায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই নিয়ে শেয়ালকাকুর গর্বের শেষ ছিল না । বড়বাজার থেকে একগুচ্ছ পেখম কিনে পেছনে লাগিয়ে সারা পাড়া ঘুরে বেড়িয়েছিলেন এক সপ্তাহ। পরশ্রীকাতর লোকেরা কটাক্ষ করেছিল বটে, “ শেয়াল আবার ময়ূর হয়েছে শখ করে !” কিন্তু দুর্জনদের কথায় কান দিতে নেই ।

সেই শেয়ালকাকু গত পরশু আমাদের বাড়ি এসেছিলেন। বিচক্ষণ ব্যক্তি। অনেক জ্ঞান-ট্যান দিলেন বাড়ির সকলকে । “... এইসময় ছেলের উপর চাপ দেবেন না, এটা তেমন কোন গুরুতর পরীক্ষাই নয়। রেজাল্ট নিয়ে এত বাড়াবাড়ি না করাই ভালো” – এইরকম অনেক ভালো ভালো কথা । বাবা তখন একমনে খাঁড়ায় শান দিচ্ছিল ( সেই যে আলুজেঠুর কাছে যে খাঁড়াটা ছিল, আগেরবার দেখেছিলে। একসময় ওতে করে পাঁঠাবলি হত, এখন ওটা দিয়ে জল ছাড়া আর কিছুই কাটা যায় না) । কী শুনল বা বুঝল জানি না । খালি শেয়ালকাকুর কথা শেষ হতে খাঁড়াটা একপাশে সরিয়ে রেখে বল্লো, “হ্যাঁ নিশ্চয়, নিশ্চয় । রেজাল্ট একবার খারাপ করুক না ! ঘাড় ধরে বের করে দেব ঘর থেকে” । শেয়ালমহাশয় আর কথা বাড়ালেন না।

বাবা যে সারাক্ষণ খালি আবৃত্তিই করে আর খাঁড়ায় শান দেয় এমনটা না । কাল বিকেলে আমি খেলতে যাবো, দেখি বাবা এসেছে আমার ঘরে। ভালো করে তাকিয়ে দেখলুম, না লাঠি-ফাটি কিছু নেই হাতে । নিশ্চিন্তে একটা হাঁফ ছাড়তে যাবো, অমনি হুঙ্কার,

-“ বাবু সেজে কোথায় যাওয়া হচ্ছে ! কাল বাদে পরশু রেজাল্ট খেয়াল আছে ?

আমি মিউমিউ স্বরে জানালুম যে খেলতে যাচ্ছি। আবার হুঙ্কার ছাড়ল বাবা। “ কত পাবে মাধ্যমিকে ?”

-“ আজ্ঞে সেটা কী করে বলি আগের থেকে ?”

-“ তাও কোনো অনুমান ?”

-“ ইয়ে, অনুমান... অনুমান...” আমি বিস্তর সময় নিয়ে ভাবতে লাগলুম । “হনুমান!” বলে বিরক্ত হয়ে বাবা চলে গেল। তার একটু পরে আবার বোন এসে ফুচকা খাওয়ার অনুমতি চাওয়া মাত্রই বাবা তাকে সটান হনুমতি বলে দিল। বাবা কবি হয়ে যাচ্ছে নাকি ! সব্বোনাশ ! আর রক্ষা নেই !

মাঝে মাঝে ভাবি খামোখা এত দুশ্চিন্তা হচ্ছেই বা কেন ! পরীক্ষা তো এতটাও খারাপ দিইনি । সবকটা পরীক্ষা, যাকে বলে একেবারে টপক্লাস হয়েছে ! বাংলার কথাই ধরা যাক না । সব প্রশ্ন তো করেইছি, উপরন্তু আবার ছবি অবধি এঁকে দিয়ে এসেছি একটা । আট নম্বরের প্রশ্ন ছিল । বিভীষণ আর ইন্দ্রজিতের চরিত্রের বর্ণনা । স্যারেরা বলে বর্ণনামূলক প্রশ্নে ছবি দেওয়া মাস্ট । বাংলার স্যার বলেনি বটে এরকম কিছু। কিন্তু বাংলাই বা কেন ব্যতিক্রম হবে ! অতএব আঁকা গেল একখান ছবি । নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে বিভীষণ নতমস্তকে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা আধখাওয়া বিড়ি । ‘যজ্ঞাগারে ধূমপান নিষেধ’- এরকম একটা নির্দেশের দিকে আঙুল দেখিয়ে ইন্দ্রজিৎ তাঁকে বেদম ভর্ৎসনা করছেন । “ হায় তাতঃ , উচিত কি তব এ কাজ” ইত্যাদি। পেছনে দাঁত কেতরে পড়ে আছে লক্ষ্মণ । অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ছবি প্রশ্নের প্রেক্ষিতে । সাথে একটা কোটেশনও দিয়েছি আলবার্ট আইনস্টাইনের । যথা – “ পাবলিক প্লেসে বিড়ি খেলে একশো টাকা জরিমানা”। সব মিলিয়ে ওটায় আটে অন্তত সাড়ে সাত নিশ্চিত। প্রবন্ধটাও জম্পেশ লিখে এসেছি । ‘বাংলার উৎসব’ এসেছিল । মদন মিত্র থেকে শুরু করে চোলাই অবধি কিছুই বাদ দিইনি।

অঙ্ক নিয়েও কোন চাপের কারণ দেখছি না । বদগোপালদাদা আগেরবার নাকি পঁচিশ নম্বরের অঙ্ক ছেড়ে এসে চল্লিশ পেয়েছিল। আমি কোন ঝুঁকি নিইনি । খাঁটি পঞ্চাশ নম্বর ছেড়ে এসেছি । আশি পাবোই । সোজা ঐকিক নিয়ম । আরও বেশি ছেড়ে আসতে পারতুম, কিন্তু তাতে আবার আমার নম্বর একশো ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হত। পরীক্ষককে আমি এত সমস্যায় ফেলতে চাই না । তুমি তো জানোই, খুবুদার বালক আমি ।

ভূগোলে ম্যাপ পয়েন্টিং নিয়ে একটু খুঁতখুঁত লাগছে বটে। কিন্তু সেটাও তেমন কিছু না । পামির গ্রন্থি ম্যাপে আসলে যেখানে হত, সেখান থেকে দেড়-দু ইঞ্চি দক্ষিণে নামিয়ে দিয়েছি । মানে ওই ভারত মহাসাগরের মাঝামাঝি চলে এসেছে আরকি । তবে এতেও কি চিন্তার কোনো কারণ আছে ? তুমিই বল ? অত বড় একটা জায়গা যদি মাত্র দু ইঞ্চি সরেই আসে , তবে এমন কি আর পার্থক্য বোঝা যাবে ! আমি তো শুনেছি হিমালয় নাকি প্রতি বছর তিন ইঞ্চি করে সরে আসছে নিজের জায়গা থেকে। তা এতো বড় হিমালয়ই যখন সরে আসছে, তখন পামিরের সরতে আর বাধা কি ! তাই এতে নম্বর কাটার তো কোনো প্রশ্নই নেই, বরং আমার দূরদর্শিতার কথা চিন্তা করে আরও কিছু নম্বর বেশি না দিয়ে দ্যায় ! বাকি কয়েকটা জায়গাও ওরকম এক-দু ইঞ্চি করে সরে এসছে (একটা তো আবার ম্যাপ ছাড়িয়ে বেরিয়েই গেছে) , সে যাই হোক , ওগুলো আগের যুক্তি অনুসারেই নম্বর পেয়ে যাবো আশা রাখছি।

এসব কথা থাক । পরীক্ষার শেষ দিনে একটা মজার কাণ্ড হয়েছিল বরং সেই কথা বলি তোমায় । আমাদের শেষ দিনে পরীক্ষা ছিল জীবন বিজ্ঞান । দু-ঘণ্টার মতো কেটেছে। আমি মন দিয়ে উত্তর লিখে যাচ্ছি। বেশ মনে পড়ে, প্রশ্ন ছিল রুই মাছের অভিযোজন । বেশ একটা টসটসে রুই মাছ এঁকেছি । চোখে একটা গগলস পরিয়ে দেব কিনা ভাবছি । গগলস না পরে জলের ভেতর থাকলে খুব চোখ জ্বালা করে দেখেছি । মাছেরও করে নিশ্চয় ! মাছ বলে কি আর মানুষ নয় ! তাই চশমা পরাবো বলে পেন্সিলখানি ছুঁইয়েছি মাছের চোখে, অমনি দেখি দুজন লোক ঝুড়ি হাতে ঢুকে পড়েছে পরীক্ষার রুমে । ঝুড়িখানা বাগিয়ে ধরে রুমের মাঝামাঝি চলে এল। তারপর বলতে শুরু করল, “একটু পরেই সাব-ইন্সপেক্টর আসবেন পরীক্ষা পরিদর্শন করতে। তার আগে, যাদের কাছে টুকলি-চোতা-বইপত্র যা কিছু আছে সব এখানে দিয়ে যাও। উনি এসে ধরলে কিন্তু কেলেঙ্কারি হবে”।

অমনি ঘরের মধ্যে একটা হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেল । ছেলেপুলে দেখি যেখানে যেখানে কাগজপত্র লুকিয়ে রেখেছিল, সবকিছু বের করে ঝুড়ির মধ্যে ফেলে দিয়ে আসছে। সে যেন মেলা বসে গেছে। কী হইচই ! আমার পাশের ছেলেটা দেখি ফিরে এল কিছুক্ষণ পর। হাতে একগাদা কাগজ ! খ্যাঁকখ্যাঁক করে হেসে বলে , “ যাক ! পাঁচ আর ছ’নম্বরেরগুলোরও গতি হয়ে গেল ।”

যখন ভিড় কমল , তখন দেখি যতটা ঘন-জনবসতিপূর্ণ মেলা বসেছিল, তার তুলনায় ঝুড়িতে প্রায় কিছুই জমা পড়েনি । একদল ছেলে টুকলি জমা দিয়ে এসেছে, আর একদল সেখান থেকে নিজেদের সুবিধেমতো টুকলি হাতিয়ে এনে এখন টুকতে বসে পড়েছে। ফলে ব্যালেন্স হয়ে গেছে । ঝুড়িবাহকেরা বেশ হতাশ হয়ে ফিরে গেল । দুঃখের বিষয়, ইন্সপেক্টর সেদিন আর এলেন না ।

এসব মজার ঘটনা মনে আসছে বটে, কিন্তু আমার দুশ্চিন্তা কিছুমাত্র কমছে না । বাইরে যতবার বেরুচ্ছি, তত হতাশ হয়ে পড়ছি হে । বাজারের মধ্যে একটা কোচিং সেন্টার ইয়াব্বড়ো বিজ্ঞাপন দিয়েছে । লেখা আছে ‘একশো শতাংশ চাকরীর গ্যারেন্টি’। তার নিচেই একটা চপ তেলেভাজার দোকান । এটাকে কি তুমি কোইন্সিডেন্স বলবে ? সেই যে সেবার বাদুড়লাল পঞ্চাশখানা ঘুমের ওষুধ খেয়ে সুইসাইডের চেষ্টা করল, আর তারপর ওর ড্রয়ার থেকে ‘কথাঞ্জলি’ পাওয়া গেল - তুমি সেটাকেও কোইন্সিডেন্স বলে উড়িয়ে দিয়েছিলে। এই তোমার এক বদভ্যাস ! ধুর ভাল্লাগেনা ! আমার আবার মনখারাপ হয়ে গেল ।

এবার পরীক্ষার পরের ছুটিতে আর পিসির বাড়ি যাইনি। তবে ওখান থেকে নিয়মিতই খবর পেয়ে থাকি । পিসে গ্রাম পঞ্চায়েতে একটা কোনও একটা সদস্যপদ পেয়েছিলেন, কিন্তু গর্হিত আচরণের কারণে বিতাড়িত হয়েছেন । বিতাড়নের কারণও নাকি খুব তুচ্ছ । পিসের পঞ্চায়েত প্রধানের সাথে দেখা করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার ছিল , কিন্তু প্রধানকে তিনি চিনতেন না । পাড়ার লোকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে লোকটা বোয়াল মাছের মতো বড় পেট করে সব মিটিংয়ে সামনের সারিতে বসে থাকে, ওটাই নাকি প্রধান । সেই মতো পরের মিটিংয়ে গিয়ে পিসে প্রধানকে আইডেনটিফাই করলেন, এবং মিটিং শেষ হতেই মুখে একগাল হাসি নিয়ে এগিয়ে গেলেন । সঙ্গে মধুর সম্ভাষণ , “ নমস্কার বোয়ালবাবু...”। প্রধান গম্ভীর হয়ে গেলেন। সেদিন আর বেশি কথা হল না, তবে পরদিনই পিসে বহিস্কারপত্র পেলেন ।

ওখান থেকে আর কিছু তেমন খবর পাইনি । আর পেলেও সেরকম পাত্তা দিইনি । আজকাল নিজেকে নিয়েই চিন্তার শেষ নেই । তবে এর মধ্যে ধেড়েকাকু একটু আশার কথা শুনিয়েছেন এই যা । একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন ওনার ছেলে নাকি মাধ্যমিকে চুয়াল্লিশ র‍্যাঙ্ক করছিল । আমি তো খুবোবাক ! চুয়াল্লিশ র‍্যাঙ্ক জানা গ্যালো কী করে ! এক থেকে দশের বাইরে তো কিছু বলে না টিভিতে । না তার উত্তরে উনি যা বললেন শুনে তো আমি তাজ্জব হয়ে গেলুম হে । একেবার নিখুঁত হিসেব । সেবার মাধ্যমিকে সর্বোচ্চ হয়েছিল নাকি ছ’শো চুরাশি । আর ওঁর ছেলে পেয়েছিল ছ’শো একচল্লিশ । তা মাঝের সবকটা নম্বরও যদি পূরণ হয়ে গিয়ে থাকে, তাইলেও তো ছেলের স্থান চুয়াল্লিশই হচ্ছে , নাকি ! উনি সবাইকে একেবারে জলের মতো হিসেব করে বুঝিয়ে দিলেন । সেই থেকে আমি একটু নিশ্চিন্তে আছি হে । ফেলও যদি করি, এমনকি শূন্যও যদি পাই , তাও এক থেকে সাতশোর মধ্যে র‍্যাঙ্ক আমার আটকায় কে ! আর দশ লক্ষ পরীক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম সাতশোয় থাকা – আহা সে এক গর্বের বিষয় তো বটেই ! কী বলো তুমি ! কিয়ানন্দ, কিয়ুল্লাস ইত্যাদি !

এই বুকভরা আশা নিয়েই আপাতত ঘুমোতে চল্লুম । রেজাল্ট-ফেজাল্ট সব মিটে গেলে পিসির বাড়ি ঘুরতে যাবো। তোমার সময় হলে এসো তখন। ক্ষুব্মজা হবে।

এখন তাহলে এই অবধিই।

ইতি,
তোমার আকাট


Avatar: Mahua

Re: আকাটের পত্র

:-)

Avatar: dd

Re: আকাটের পত্র

হ্যাঃহ্যাঃ। ভাল্লাগ্লো।
Avatar: pi

Re: আকাটের পত্র

খাসা !
Avatar: রিভু

Re: আকাটের পত্র

দারুণ!
Avatar: de

Re: আকাটের পত্র

:))))))
Avatar: শঙ্খ

Re: আকাটের পত্র

বাহ সাঙ্ঘাতিক ভালো। ক্ষুব্মজা হলো।
Avatar: Suhasini

Re: আকাটের পত্র

খুব এক চোট হাসা গেল!


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন