Anindya Sengupta RSS feed

Anindya Senguptaএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • বাৎসরিক লটারী
    মূল গল্প – শার্লি জ্যাকসনভাবানুবাদ- ঋতম ঘোষাল "Absurdity is what I like most in life, and there's humor in struggling in ignorance. If you saw a man repeatedly running into a wall until he was a bloody pulp, after a while it would make you laugh because ...
  • যৎকিঞ্চিত ...(পর্ব ভুলে গেছি)
    নিজের সঙ্গীত প্রতিভা নিয়ে আমার কোনোকালেই সংশয় ছিলনা। বাথরুম থেকে ক্যান্টিন, সর্বত্রই আমার রাসভনন্দিত কন্ঠের অবাধ বিচরণ ছিল।প্রখর আত্মবিশ্বাসে মৌলিক সুরে আমি রবীন্দ্রসংগীত গাইতুম।তবে যেদিন ইউনিভার্সিটি ক্যান্টিনে বেনারস থেকে আগত আমার সহপাঠীটি আমার গানের ...
  • রেজারেকশান
    রেজারেকশানসরিৎ চট্টোপাধ্যায় / অণুগল্পব্যাঙ্গালুরু এয়ারপোর্টে বাসু এতক্ষণ একা একা বসে অনেককিছুই ভাবছিল। আজ লেনিনের জন্মদিন। একটা সময় ছিল ওঁর নাম শুনলেও উত্তেজনায় গায়ে কাঁটা দিত। আজ অবশ্য চারদিকে শোনা যায় কত লক্ষ মানুষের নাকি নির্মম মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিলেন ...
  • মন্টু অমিতাভ সরকার
    পর্ব-১মন্টু ছুটছিল।যেভাবে সাধারণ মানুষ বাস ধরার জন্যে ছোটে তেমনটা নয়।মন্টু ছুটছিল।যেভাবে ফাস্ট বোলার নিমেষে ছুটে আসে সামনে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিপক্ষের পেছনের তিনটে উইকেটকে ফেলে দিতে তেমনটা নয়।মন্টু ছুটছিল।যেভাবে সাইকেল চালানো মেয়েটার হাতে প্রথম ...
  • আমিঃ গুরমেহর কৌর
    দিল্লি ইউনিভার্সিটির শান্তিকামী ছাত্রী গুরমেহর কৌরের ওপর কুৎসিত অনলাইন আক্রমণ চালিয়েছিল বিজেপি এবং এবিভিপির পয়সা দিয়ে পোষা ট্রোলের দল। উপর্যুপরি আঘাতের অভিঘাত সইতে না পেরে গুরমেহর চলে গিয়েছিল সবার চোখের আড়ালে, কিছুদিনের জন্য। আস্তে আস্তে সে স্বাভাবিক ...
  • মৌলবাদের গ্রাসে বাংলাদেশ
    বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার হেফাজতে ইসলামের একের পর এক মৌলবাদি দাবীর সামনে ক্রমাগত আত্মসমর্পণ করছেন। গোটা উপমহাদেশ জুড়ে ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ক শুধু তীব্রই হচ্ছে না, তা সংখ্যাগুরু আধিপত্যর দিকে এক বিপজ্জনক বাঁক নিচ্ছে। ভারতে মোদি সরকারের রাষ্ট্র সমর্থিত ...
  • নববর্ষ কথা
    খ্রিস্টীয় ৬২২ সালে হজরত মহম্মদ মক্কা থেকে ইয়াথ্রিব বা মদিনায় যান। সেই বছর থেকে শুরু হয় ইসলামিক বর্ষপঞ্জী ‘হিজরি’। হিজরি সন ৯৬৩ থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু করেন মুঘল সম্রাট আকবর। হিজরি ৯৬৩-র মহরম মাসকে ৯৬৩ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাস ধরে শুরু হয় ‘ তারিখ ই ইলাহি’, যে ...
  • পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা কেমন আছেন ?
    মুসলিমদের কাজকর্মের চালচিত্রপশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের অবস্থা শীর্ষক যে খসড়া রিপোর্টটি ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তাতে আমরা দেখেছি মুসলিম জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে গরিষ্ঠ অংশটি, গোটা জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক দিন মজুর হিসেবে জীবিকা অর্জন করতে বাধ্য হন। ৪৭.০৪ শতাংশ মানুষ ...
  • ধর্মনিরপেক্ষতাঃ তোষণের রাজনীতি?
    না, অরাজনৈতিক বলে কিছু হয় না। নিরপেক্ষ বলে কিছু হয় না। পক্ষ নিতে হবে বললে একটু কেমন কেমন শোনাচ্ছে – এ মা ছি ছি? তাহলে ওর একটা ভদ্র নাম দিন – বলুন অবস্থান। এবারে একটু ভালো লাগছে তো? তাহলে অবস্থান নিতেই হবে কেন, সেই বিষয়ে আলোচনায় আসি।মানুষ হিসাবে আমার ...
  • শত্রু যুদ্ধে জয়লাভ করলেও লড়তে হবে
    মালদা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে পুকুরিয়া থানার অন্তগর্ত গোবরজনা এলাকায় অবস্থিত গোবরজনার প্রাচীন কালী মন্দির। অষ্টাদশ শতকে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির বিরুদ্ধে লড়বার সময়ে এক রাতে ভবানী পাঠক এবং দেবী চৌধুরাণী কালিন্দ্রী নদী দিয়ে নৌকা করে ডাকাতি করতে ...

বাংলা ছবির সম্ভাব্য সংকট: সমসাময়িক সিনেমা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

Anindya Sengupta

এই লেখাটা যখন লিখছি তখন প্রেক্ষাগৃহে অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরীর ‘পিঙ্ক’ চলছে। ছবির ট্রেলারটি ইতিমধ্যেই বেশ কৌতুহল জাগিয়েছে। সুজিত সরকার প্রযোজিত এবং অমিতাভ বচ্চন অভিনীত ছবিটি দেখে মনে হতেই পারে যে পার্ক স্ট্রিটে সুজেট জরডানের হেনস্থার উপর আধারিত ছবিটি, বা অনুপ্রানিত। তাহলে ছবিটি বাংলায় হল না কেন? অনিরুদ্ধ চৌধুরী বাংলায় যে যে ছবি পরিচালনা করেছেন তা থেকে ছবিটি মেজাজে একদমই আলাদা। ‘অনুরণন’, ‘অপরাজিতা তুমি’ ইত্যাদি ‘সম্পর্কের ছবি’ তিনি করেন বাংলায়, এবং প্রায় নারীবাদী, বিতর্কিত একটি সামাজিক বিষয় নিয়ে ছবি করতে গেলে হিন্দিতে করতে হল কেন? চিত্রনাট্যকার মুম্বইয়ের বলে? এখানে এই ছবি করার পরিকাঠামো যথেষ্ঠ নেই বলে?

ইতিমধ্যে নির্মীয়মান একটি বাংলা থ্রিলারের প্রথম পোস্টার নিয়ে বেশ বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সোশাল মিডিয়ায় প্রমাণসহ চাউর হয়ে গেছে যে পোস্টারটি একটি বিখ্যাত কোরিয়ান ছবির হুবহু নকল। পাবলিসিটি ও পি আর-এর উপর ছবির পরিচালকের যে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই আর তা বোঝা যায় এই গৌন বিতর্কটির পর প্রযোজকের মন্তব্যে। তার চৌর্যবৃত্তি যারা প্রথম ধরেছেন তাদের নিয়ে ঠাট্টা করা তো আছেই, তিনি এ’ও বললেন – পরোক্ষে – যে এই পন্থাটি না অবলম্বণ করলে তিনি পুজোর বাজারে এতটা পাবলিসিটি পেতেন না। বস্তুত, নৈতিকতাহীনতার এত অকপট স্বীকারোক্তি আগে আমরা কোথাওই শুনেছি কিনা মনে পড়েনা।

আমি বাংলা সিনেমা নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন রকমের মন্তব্য করে থাকি সোশাল মিডিয়ায় – মূলত ফেসবুকে, কখনো এক-আধটি ব্লগে। অধ্যাপনার সূত্রে প্রতি বছর অন্তত খান একশো নতুন ছাত্র-ছাত্রীর সাথে আলাপ হয় – তারা, তাদের বন্ধুরা, আন্তর্জালে পরিচিতির যে জাল বৃহত্তর হতে থাকে তাদের মধ্যে অনেকেই সেগুলি পড়েন। যেহেতু জীবিকার সূত্রে একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে জড়িত থাকি এবং বিভাগটির নাম চলচ্চিত্রবিদ্যা বিভাগ, তাই মন্তব্যগুলি যে আমারই শুধু, প্রতিষ্ঠানটির নয় তা বোঝানোর জন্য ভাষার নানাবিধ স্ট্র্যাটেজি নিতে হয়। সব স্ট্র্যাটেজি সফল হয় না তো বটেই; তাই যাদের কাছে সফল হয় তারা বোঝেন যে আমি বলছি – আর বাকিরা ভাবেন যে আমি যে ডিসিপ্লিন ও ডিপার্টমেন্টের সাথে জড়িত সেই প্রতিষ্ঠান বাংলা ছবি নিয়ে অখুশি, এবং এই অতৃপ্তিটি এতটাই প্রবল যে আমরা বাংলা সিনেমাকে ইগনোর করার বদলে সেই অতৃপ্তিকে ক্ষণে ক্ষণে, উত্তরোত্তর আরো তিক্ততর উচ্চারণের দিকে নিয়ে যাচ্ছি। এই প্রেক্ষিত ও এই প্রেক্ষিতের সাথে ডিসক্লেমারটি অতএব দেওয়া থাক – এই প্রবন্ধের সমস্ত অতৃপ্তি শুধুই আমার। আমি আবার’ও এই প্রবন্ধে এমন কোনো স্ট্র্যাটেজি নেবোনা যাতে একধরণের অ্যাকাডেমিক নৈর্ব্যক্তিকতা জ্ঞাপিত হতে পারে। একজন দর্শক ও চলচ্চিত্রপ্রেমী হিসেবে এই সারকথা দিয়ে শুরু করা যাক – বাংলা সিনেমার এমন পতন হয়েছে যে তা থেকে উত্থান অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে। এই পোলেমিকাল মন্তব্যের সাথে যাদের অসুবিধে হবে তাদের প্রবন্ধটি পড়ার প্রয়োজন থাকবে না। আমি এই লেখায় ছবির বিশ্লেষণ করে দৃষ্টান্ত দেবো না। পতনের কিছু লক্ষণ বলবো শুধু, যারা নিয়মিত বাংলা ছবি দেখেন তারা মিলিয়ে নিতে পারবেন আমি ঠিক বলছি না ভুল বলছি।

এবার বিস্তারে যাওয়া যাক। আমাদের মত যাদের সিনেমার নেশা আছে, বাংলা সিনেমার কাছে কিছু অব্যক্ত চাহিদা আছে প্রচূর – তাদের ছাড়া আপামর জনতার কাছে বাংলা সিনেমার সংকটের হয়তো বিশেষ মূল্য থাকেনা। নিশ্চয়ই রাজ্যের পানীয়জলের সংকট হলে বা চিকিৎসাব্যবস্থা ব্যয়বহুল ও ইনকমপিটেন্ট হয়ে গেলে যে সংকট তৈরী হয় সিনেমার সংকট তার তুলনায় যে শুধু গৌণ তাই’ই নয়, গৌণই থাকা উচিত। কিন্তু সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির এই অহৈতুকি অস্তিত্ব গুরুত্বের নিরিখে যে তার ক্ষেত্রের বাইরে ব্যাপ্ত নয় তা নয়। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় সিনেমা ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির একটি অদ্ভুত প্যারাডক্স আছে – খুব কম জনসংখ্যার মানুষই সিনেমা-সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেন, অথচ দিনে দিনে, উত্তরোত্তর সিনেমা, টেলিভিশনে বিনোদন এমনকি নাটকের’ও খরচা এমনভাবে বাড়ছে যে ওই ‘কম সংখ্যার’ অনেকগুণ বেশি মানুষের অংশগ্রহণ ও ক্রয়ক্ষমতা প্রয়োজন হয়ে পড়ছে সিনেমা-সংস্কৃতির অস্তিত্ত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। একটি উন্নতমানের বাংলা ছবি বানাতে ১ কোটি টাকা লাগতেই পারে; অনেক মানুষ চারশো-পাঁচশো টাকা দিয়ে সেই ছবি দ্যাখেন। জাতীয় স্তরে ও দক্ষিণে একটি তারকাখচিত ছবি যে শুধুই বহু বহু কোটি টাকায় তৈরীই হয় তাই নয়, কিছু মাত্রায় চিত্তাকর্ষক হলে তা সেই উৎপাদন-মূল্য ও অন্যান্য টাকা তুলে নেয় দুই-তিন দিনের মধ্যে। ব্যাপকতর মানুষের অংশগ্রহণ না থাকলে এটা সম্ভব হতে পারেনা। অথচ – অন্য একটি বিনোদন ইন্ডাসট্রির উদাহরণস্বরূপ – ক্রিকেটে পরাজয় বা ম্যাচ-ফিক্সিং যে আকারের গুরুগম্ভীর প্রতিক্রিয়া উদ্রেক করে, একটি ছবি যদি টুকে দেওয়া হয় বা ছবিটির প্রযোজক-কলাকুশলী জড়িয়ে পড়ে কোনোরকমের দূর্নীতিতে, তখন তেমন বহুস্বরে প্রতিক্রিয়া ঘটেনা আপামর দর্শকদের মধ্যে। বিশেষ করে বাংলা ছবির ক্ষেত্রে দর্শকদের ভূমিকা প্রায় ‘নিরাসক্ত ভোক্তা’-র মতই – তারা কনজিউম করে যাবেন ঠিকই, কিন্তু তাদের যেন কোনো চাহিদা বা দাবী নেই বাংলা সিনেমা নিয়ে। অন্তত টেলিভিশনের মেগাসিরিয়ালের ক্ষেত্রে এই দর্শক যেভাবে দৈনন্দিনে ‘আসক্ত’ বা ‘লিপ্ত’, সিনেমার ক্ষেত্রে সেভাবে নয়।

এই ‘নিরাসক্ত ভোক্তা’-দের কাছে আমরা – অহৈতুকি চলচ্চিত্রপ্রেমীরা – খানিকটা অদ্ভূত মানুষ হিসেবে প্রতিপন্ন হই। ক্রিকেট নিয়ে মত্ত মানুষ তাদের কাছে কাম্য ও স্বাভাবিক, ধ্রুপদী সঙ্গীত নিয়ে তাড়িত মানুষ’কেও তারা বোঝেন – কিন্তু সিনেমা নিয়ে পড়েন অথচ সিনেমা বানানো শেখেন না, সিনেমা নিয়ে তাড়িত অথচ শাহরুখ-সালমানের ফ্যান নয়, এমন মানুষজন তাদের কাছে বিচিত্র বটে, কিন্তু একটি বিশেষ ঐতিহাসিকতায় ও সংজ্ঞায় তারা আমাদের অবস্থিত করে বোঝেন – আমরা ‘আর্ট সিনেমা’-র লোক। তাদের বর্তমানে আর্ট সিনেমা বলে কিছুর অস্তিত্ত্ব নেই, কিন্তু তারা জানেন যে ইতিহাসে একসময়ে ‘আর্ট সিনেমা’ বলে জোরদার কিছু একটা ছিল, আমরা সেই হুংকারের মিলিয়ে যেতে থাকা প্রতিধ্বণি মাত্র, একটি বিলীয়মান প্রজাতি।

এই ধারণায় কোনো ভুলই নেই যে যাদের বাংলা সিনেমা নিয়ে এতটা অতৃপ্তি আছে, তাদের উৎস গত শতকের আর্ট সিনেমার আন্দোলনেই। কারণ ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্ট, ফিল্ম ক্লাব এবং লিটল ম্যাগাজীন সদৃশ্য ফিল্ম জার্নালের সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষেরাই আঞ্চলিক – অর্থাৎ যা ‘গ্লোবাল’ নয় – সিনেমা নিয়ে অতৃপ্তি পোষণ করতেন। তাদের মনে হত সিনেমার যে অপার সম্ভাবনা তা তাদের ভাষার ছবি ছুঁতে পারছেনা। বরং কিছু বদভ্যাসে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। সেই বদভ্যাস থেকে মুক্তি পাওয়ার সিনেমা তাদের আকাঙ্খিত ছিল বলেই তাদের আন্দোলনগুলি ছিল সংস্কারমুখী, সেই অপার সম্ভাবনা তারা নিজেদের ভাষায় পর্দায় দেখতে চাইতেন বলেই তারা ছিলেন ভবিষ্যতদ্রষ্টা, তারা আগামীকালের ছবির জন্য এখন চর্চা করতেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল সিনেমায় সামাজিক—রাজনৈতিক দায়িত্ব ও অভিব্যক্তির একটি প্রকাশের চাহিদা, তাই স্বাভাবিক ভাবেই এই আর্ট সিনেমা আন্দোলনের অনেকটাই বামপন্থী মনোভাবাপন্ন ছিল। তাই আমরা যদি বিলীয়মান প্রজাতির মতই অদ্ভূত হয়ে থাকি, আমাদের এই ঐতিহাসিক দ্যোতনাগুলিও বিলীয়মান ধাঁচেরই। এখানেই একটি মজার বিরোধাভাস তৈরী হতে থাকে – সম্ভাবনার সিনেমা, সংস্কৃত মুক্ত সিনেমা, যে অভিব্যক্তি দূর্বল সেই অভিব্যক্তির সিনেমা হয়ে পড়ে গত শতকের অভীষ্ট বস্তু, একদার ‘আর্ট সিনেমা’।

কারণ সোশাল মিডিয়ার বাইরে বাংলা সিনেমা নিয়ে এই অতৃপ্তির কোনো ছাপ নেই। আমাদের মূলধারার ছবি গতরে বহরে বাড়ছে। ইদানিং ‘রিজিওনাল মেনস্ট্রীম’-এর একটি ধাঁচা তৈরী হয়েছে যা মূলতঃ দক্ষিণের ছবির মডেলে আধারিত (যা পুরোপুরি আঞ্চলিক এটা ভাবাও গোলমেলে কারণ এই যে একটি ভাষায় ছবি তৈরী করে তা বিবিধ ভাষায় রিমেকের যে প্রক্রিয়া সেই পরবর্তী স্তরে হিন্দি সিনেমাও পড়ে) – চাকচিক্য, উন্নতমানের প্রযুক্তি, বৈভবের প্রদর্শন এইসব ছবির অন্যতম চরিত্র। শোনা যায় যে বাংলা বাজারে এইসব ছবি অনেকক্ষেত্রেই ফ্লপ করে, কিন্তু ছবির চেহারায় সেই অনটনের কোনো ছাপ আপনি পাবেন না যেভাবে ১৯৭০ বা ’৮০-র দশকের ছবিতে পেতেন। অনটনের ছাপ এই মূলধারার ছবিতে কখনোই থাকার কথা নয়, তাই রহস্যজনক ভাবে ফ্লপের সংখ্যা বাড়লেও বাজেট বৃদ্ধি পেতে থাকে, সামনের সপ্তাহে মুক্তি পাওয়া মূলধারা আরো আরো জৌলুসময় হবে এটাই কাম্য।

এই মূলধারা পশ্চিমবঙ্গে মূলত একটি-দুটি প্রোডাকশন হাউজের কুক্ষিগত থাকে। এছাড়া আরেকটি গোষ্ঠীর ছবি মুক্তি পায় যাদের এইরকম সামর্থ্য নেই, যাদের ছবিতে বড় স্টারের বদলে মূলত টেলিভিশনের অভিনেতাদেরই আপনি দেখবেন। সেই ছবির’ও কোনো চেনা চেহারা নেই, সেগুলি যে খুব বেশি চলে তা’ও নয় – কিন্তু তাই বলে সেইসব ছবির সংখ্যা কিন্তু ক্ষীয়মান নয়। পুঁজি অদ্ভূতভাবে প্রবাহিত হতে থাকে লাভের মুখ না দেখতে পেলেও।

আর এর বাইরে একধরণের ছবি থাকে যেগুলিকে একধরণের নতুন ‘আর্বান পপুলার’ বলা যেতে পারে। গত শতকের আর্ট সিনেমার সাথে এর যোগাযোগটি মূলত এই ছবির কিছু বয়োজ্যেষ্ঠ্য পরিচালক আগে হয় আর্ট ফিল্ম করতেন বা তার সাথে জড়িত ছিলেন, যেমন অপর্ণা সেন, গৌতম ঘোষ, অঞ্জন দত্ত ইত্যাদি। পরবর্তী প্রজন্মের গুরুত্বপূর্ণ নামের মধ্যে আছেন সৃজিত মুখোপাধ্যায়, কৌশিক গাঙ্গুলি, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়-নন্দিতা রায়, মৈণাক ভৌমিক ইত্যাদি, যাদের ওই পূর্ব-পরিচিতিটি নেই। এনারাই মূলত মিডিয়ার আনুকূল্য পান নতুন বিষয় ও নতুন ধারার প্রবক্তা হিসেবে। এদের ছবির আরেকটি অ্যাডভান্টেজ হল মূলধারার অন্যতম একটি প্রোডাকশন হাউজের আনুকূল্য।

ফিনান্স ক্যাপিটালিজম ও গ্লোবাইলাইজেশন-পরবর্তী যুগে বাংলা সিনেমায় পুঁজি একটি অদ্ভূত, প্রায় প্যারাডক্সিকাল চরিত্র পেয়েছে – যার ব্যাখ্যা আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়, যুগপৎ সিনেমা ও অর্থনীতির উপর যার দখল আছে তিনিই দিতে পারবেন – সেটা হল মোনোপলির। বাংলা সিনেমা এখন কার্যত ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের কুক্ষিগত। মূলত এই হাউজ এবং পাবলিসিটি ও ওপিনিয়ন-জেনারেশনের জন্য আনন্দবাজার গোষ্ঠীর প্রসাদ ছাড়া একটি ছবির বা একটি পরিচালকের কোনো সুরাহা হয়না। মুক্তি ও প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও এই হাউজ প্রায় একচ্ছত্র কারণ ডিজিটাল প্রদর্শনের ব্যবস্থা ও অধিকাংশ মাল্টিপ্লেক্স, সিঙ্গল স্ক্রিনের হল এখন’ও ওনাদের নিয়ন্ত্রণে। আমরা যারা সীমিত অর্থনীতির জ্ঞানে জানতাম যে মোনোপলি পুঁজির যুগ ছিল গত শতকে, তাদের পক্ষে এই চিত্রটি ব্যাখ্যা করা বেশ মুশকিল। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে কর্পোরেট হাউজগুলি যতটা এগোতে পারছে বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রে আগামী অনেক বছর তারাও বিশেষ দাঁত বসাতে পারবেন না কারণ পরিবেষণা ও প্রদর্শনের ক্ষেত্রে এনাদের এই সার্বিক দখল। এহেন দখল আছে বলেই, এবং মূলত আঞ্চলিক মূলধারার বাইরের ছবির ক্ষেত্রেও এদের একটি সুনির্দিষ্ট মতামত আছে বলেই বাংলা সিনেমা গত অন্তত দুই দশক ধরে একটি প্রোডাকশন হাউজ দ্বারা সংজ্ঞায়িত সিনেমা হয়েই আছে, নিকট ভবিষ্যতেও বিশেষ পরিবর্তন হবে বলে মনে হয়না।

কিন্তু আমরা – যারা ‘সিনেমা-বোদ্ধা’, ‘সিনেমা-খুঁতখুঁতে’, ‘সিনেমা-উন্নাসিক’ – আমাদের কাছে তো প্রোডাকশনের, বা বৃহত্তরভাবে ইন্ডাস্ট্রির এই জটিল কার্যপ্রণালীর বোধগম্যতা অধরা থেকে যায় মূলত তথ্যের অভাবে। আমার অন্যান্য লেখার স্বভাবসিদ্ধ অ্যাগ্রেশন উহ্য করে রেখেও বলা যেতে পারে যে আমাদের কাছে বাংলা সিনেমার প্রধান সমস্যা হল এর অনড়তা, একটি নির্দিষ্ট চরিত্র পেয়ে যাওয়ার পর তাকেই আঁকড়ে ধরে বসে থাকা এবং সম্ভাবনার দরজা বন্ধ হতে থাকা। আরো দূর্বোধ্য হওয়ার আগে আরেকটু বিস্তারিত করা যাক।

উপরের প্যারাগ্রাফে যা বললাম তা যে কোনো বাংলা ছবির দর্শক উড়িয়ে দিতে পারেন এই বলে যে ওই অনড়তা আগের দশকের বাংলা ছবির চরিত্র ছিল, এখন আর নেই। আমরা যে সত্যিই আর্ট সিনেমার যুগের ক্রমহ্রাস্যমান প্রতিধ্বণি তা এ থেকেই প্রমাণিত হয় – তারা বলতে পারেন।

তারা বলবেন যে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, তপন সিনহারা যে যুগে ছবি করতেন তখন তারা যে মূলধারার বিপ্রতীপে নিজেদের অবস্থিত করেছিলেন তার চরিত্র ছিল এই ‘অনড়তা’। রোমান্টিক ছবির একটি ধাঁচা পেয়েই সুচিত্রা-উত্তমের যুগে সেটি ছবিতে ছবিতে পূণরাবৃত্ত হত – একই চরিত্র, একই গল্প, একই সংকট, একই সমাধান, একই আবেগ। এমনকি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের ফিল্মোগ্রাফি যদি দেখি তাহলেই আমরা দুটি পর্যায় দেখবো যা ঠিক তরুণ সুপারস্টার এবং সিনিয়র সুপারস্টারের নয়। যখন নব্বইয়ের দশকে প্রায় একার কাঁধে উনি ইন্ডাস্ট্রিকে দূঃস্থতা থেকে উদ্ধার করছেন, যখন মূলত স্বপন সাহা প্রোডাকশনের খরচ কমানোর একটি কার্যকরী প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করছেন একটি সেটে, একই কাস্ট নিয়ে একাধিক ছবির শুটিং করে তখন’ও আমরা দেখেছি মূলধারার সেই ফরমুলার আধিপত্য, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একটি কুমিরছানা দ্যাখানোর মত প্রায় একই ছবি দ্যাখানো। কিন্তু গত দশ-বারো বছরে যখন প্রসেনজিৎ বাধ্য হচ্ছেন রোমান্টিক হিরোর ভূমিকা থেকে নামতে তখন কিন্তু প্রসেনজিতের ছবি মানে আর থোড়-বড়ি-খাড়া একই ভূমিকা নয় প্রতিটা ছবিতে। অতএব আমার ওই ‘অনড়তা’-র অভিযোগ – এই দর্শকের মতে – খাটছেনা আর।

অনড়তা গল্প, চরিত্র, আবেগের নয় – অনড়তা সিনেমা সম্পর্কিত ধারণার। গত শতকের মূলধারার ছবির একটি অন্যতম চরিত্রই ছিল স্টিরিওটাইপড স্টার-পার্সোনা এবং তাকে ঘিরে জঁরের। ১৯৫০-‘৬০-এ যে শুধু উত্তমকুমার একই ধাঁচের রোমান্টিক হিরো দিয়ে যাচ্ছেন তাই’ই তো নয়, বম্বেতে রাজেন্দ্রকুমার বা দেব আনন্দ’ও তাই করছেন, তাই করছেন রবার্ট মিচাম বা গ্রেগরি পেক’ও হলিউডে। আমাদের এখানে অমিতাভ বচ্চন বা মিঠুন চক্রবর্তী তো বটেই, এমনকি আমির-সালমান-শাহরুখের স্টারডমের প্রথম অর্ধ ছিল একই পার্সোনা পূণরাবৃত্তি করে। তাই গোটা বিংশ শতকে সবাক মেনস্ট্রিমের বিরুদ্ধে আর্ট সিনেমার বা বিবিধ দেশে নিউ সিনেমার জেহাদটাই ছিল গড্ডালিকা প্রবাহ ও সিনেমার সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে – কখনো তারা মুক্তি পেয়েছেন পূণরুজ্জীবিত বাস্তববাদে, কখনো বাস্তববাদ থেকেই চেয়েছেন মুক্তি। কিন্তু আমাদের সময়ের বাংলা সিনেমা (দেব বা জিৎ অভিনীত মূলধারাকে নিয়ে বলছি না) – তার আপাতভাবে ‘ফরমূলা’-র অবসান ঘটিয়ে, নাচ-গান-মারপিটের ছক থেকে নিজেকে মুক্ত করে যে ছবি আমাদের দিয়ে চলেছে তার অনড়তা আরেকটু বিপজ্জনক।

কারণ বিগত শতকের মূলধারার উচ্চাকাঙ্খা ছিল না, বরং সে বিনীতভাবেই স্বীকার করতো যে এই ছবি একমাত্র ছবি নয়, কিন্তু এই ফরমুলার বাইরের ছবি বিনিয়োগযোগ্য নয়, বিক্রয়যোগ্য নয়, বরং একক পরিচালকের প্রতিভানির্ভর বলেই নির্ভরযোগ্যও নয় – এই ছিল তার আশংকা। মূলধারার বাইরের ছবিকে ‘আর্ট সিনেমা’ তকমা দিয়েই সে স্বীকার করতো। এমনকি সেই সিনেমার রূপকারদের প্রতিও তাদের অশ্রদ্ধা, অভক্তিও থাকতো না যদি সেই ছবি পুরস্কার পেত, বা যদি সেই ছবি পর্যায়ক্রমে লাভের মুখ দেখতো।

অধুনার এই ‘আর্বান পপুলার’-এর সবচেয়ে আত্মম্ভরী দিক হল তার সীমার বাইরেও যে ছবি থাকতে পারে তা স্বীকার না করা, কারণ সে ফরমুলাকেই যেহেতু বিতাড়িত করেছে তাই সিনেমার সমস্ত সম্ভাবনাকেই সে অন্তর্গত করে নিতে পারে এমনই তার দাবী। তাই সৃজিতের ‘নির্বাক’, কৌশিকের ‘শব্দ’, অঞ্জনের ‘হেমন্ত’, অপর্ণার ‘আর্শীনগর’ – প্রথম দুটি ছবি সিনেমার শব্দপটের দিকে অভিনিবেশ করে, পরের দুটি শেক্সপীয়রের সমসাময়িক অবলম্বণ – নিজেদের যতটা না ব্যতিক্রমী হিসেবে পেশ করে, তার চেয়েও বেশি প্রকট তাদের এই নতুন আর্বান পপুলারের প্রতিনিধিত্ব করার ইচ্ছেয়। ‘নির্বাক’ বা ‘শব্দ’ পার্থপ্রতিম চৌধুরীর ‘শুভা ও দেবতার গ্রাস’ নয় – সেই ছবিটি মূলধারার সীমান্তে নিজেকে অবস্থিত করেছিল একটি বোবা মেয়ের গল্প বলে এবং একটি কবিতাকে চলচ্চিত্রায়িত করে – ‘নির্বাক’ বা ‘শব্দ’ নিজেদেরকে কেন্দ্রে অবস্থিত করতে চায় এবং এভাবে মূলধারার সীমান্ত ও সীমান্তের অপর পারে থাকা ছবির সম্ভাবনাকে অস্বীকার করতে চায়। এই ছবি বিনোদন ও গাম্ভীর্য, সবকিছুকেই অন্তর্গত করে নিয়েছে – এটাই এই ছবির দাবী।

এবার আধুনিক বাংলা ছবির তৃপ্ত দর্শক বলতে পারেন যে এইটাই তো কাম্য; যদি মূলধারাতেই এমন ছবি হতে পারে যা মুখের ভাষার দাপটকে সাউন্ডট্র্যাকে রুদ্ধ করতে পারে বা অবলম্বণ করতে পারে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নাটক তার মানে তো এই’ই যে মূলধারা আগের চাইতে অনেক বেশি ইনক্লুসিভ হয়ে উঠেছে, অন্তর্গত করে নিতে পারছে এমন অনেক বিষয় যা পনেরো-কুড়ি বছর আগেও অভাবিত ছিল। স্টার, রোমান্স, নাচ-গান-আইটেম নাম্বারের চাইতে এই নতুন ছবি অভিনব বিষয়কে গুরুত্ব দেয়, অভিনব বিষয়কে গুরুত্বের কেন্দ্রে রেখে দিতে পারে এই ছবিগুলি; সেগুলিকে প্রসেনজিতের ছবি হয়ে যেতে হয়না, প্রসেনজিৎ সেই ছবির মত হয়ে ওঠেন – এই’ই তো কাম্য ছিল।

উপরের প্যারাগ্রাফে যে প্রতি-তর্কটা কল্পনা করার চেষ্টা করলাম তাতে দুটি বিপজ্জনক শব্দ আছে – ‘ইনক্লুসিভ’ ও ‘অন্তর্গত’। এই সিনেমার বিপদের দিক এইটাই – তা বিভিন্ন ছবি বা বিষয়কে একটি তুলনামূলক বৃহত্তর উৎপাদন ব্যবস্থার অন্তর্গত করে তুলতে চায়; আলবাত সেই উৎপাদন ব্যবস্থা তো প্রোডাকশনের নেহাতই একটি প্রক্রিয়া নয়, সেটি সিনেমা, শিল্প ও সংস্কৃতি সম্পর্কিত ধারণা উৎপাদনকারী একটি সুবৃহৎ ব্যবস্থাও বটে। এই ‘অন্তর্গত’-র ডিসকোর্সের ফলে এখন’ও যারা ভিন্নধর্মী, ব্যতিক্রমী ছবি করতে চান, তাদের ছবি এই মেনস্ট্রিমের আদলে না হলে তেমন রেয়াত পায় না। এমন ছবি কি আছে? আছে, যার মধ্যে অন্যতম হল রাজনৈতিক ছবি। বাংলা সিনেমা রাজনৈতিক ছবিকে বহুদিন হল তার উঠোন থেকে বিতাড়িত করেছে। এমনকি রাজনৈতিক কন্টেন্টের ছবি, রাজনৈতিক ফর্ম তো পরের কথা, বাংলায় আর হয়না হিন্দিতে যতটা হয়। তাই এই ইনক্লুসিভনেসের দাবীটা ভ্রমাত্মক। ঠিক যেমন দ্যাখা যায় না বাস্তববাদী ছবি, যে ছবি মধ্যবিত্তের বাইরের জীবনকে তুলে ধরবে, শহরে বা গ্রামে।

কিন্তু এই প্রায় নিঃসাড়ে ‘অন্য ছবি’-র ধারণাটা পাল্টাতে থাকলো কিভাবে? মনে রাখা উচিত যে আর্ট সিনেমা, প্যারালাল সিনেমা, রাজনৈতিক সিনেমার সাথে বামপন্থার একটি যোগাযোগ ছিল। নব্বইয়ের দশকে আরেকটি মজার সমাপতন লক্ষ্য করা যায়। তখন বামফ্রন্ট সরকারের সূর্য মধ্যগগনে। বামপন্থীদের সরকার আসার পর যেন সেই সরকারের হাতে চলচ্চিত্র-সংস্কৃতির ব্যাটন তুলে দিয়ে রিলে রেসে ফিল্ম সোসাইটিগুলি খানিক ক্লান্ত। বামফ্রন্ট সরকার দূঃস্থ ইন্ডাস্ট্রির উন্নতিকল্পে খুব একটা কিছু করতে পারছেন না। শুরুর দিকে তারা বেশ কিছু ছবি প্রযোজনা করলেও মার্কেটিং-এর পরিকল্পনার অভাবে সেই হুজুগে উদ্দীপনা টানা যায়নি বেশিদিন। ফিল্ম সোসাইটির সদস্যদের গড় বয়স যখন পঁয়তাল্লিশ ছুঁয়ে গেছে এবং কমছে না, তখন প্রায় ফল্গুধারায় সিনেমা সম্পর্কিত ধারণার একটি রদবদল ঘটছে – মূলত সেই ধারণার ডিপলিটিসাইজেশন ঘটছে, এবং এক ধরণের নাগরিক বাঙালিয়ানার ধারণার সাথে যুক্ত হচ্ছে একরকম ‘সিরিয়াস’ ছবির ধারণা, যা বৈবাহিক ও অবৈবাহিক যৌনসম্পর্কের উপর আধারিত, যার পরিসর মূলত দক্ষিণ কলকাতা। এবং এই রদবদলে পশ্চিমবঙ্গের হেজিমনিক একটি প্রতিষ্ঠানের বিশেষ এবং নিরুচ্চার একটি ভূমিকা আছে, যেমন ভূমিকা আছে ফিল্ম সোসাইটিগুলির তুলনামূলক ক্লান্তি।

আনন্দবাজার পত্রিকাই নব্বইয়ের দশক থেকে ফিল্ম-সমালোচনার একটি রদবদল আরম্ভ করলো। ফিল্ম-সমালোচক নামে যে একটি বিশেষ স্পেশালাইজেশন থাকতো, লেখার একটা বিশেষ শৈলী – তা উধাও হয়ে গেল। সমালোচক নামে একজন খিটখিটে গম্ভীর মানুষ থাকতেন, যার সাথে খুব কম পরিচালকেরই সদ্ভাব থাকতো – তিনি উধাও হয়ে গেলেন। সমালোচনা লিখতে আরম্ভ করলেন কবি, সাহিত্যিক, অভিনেতা, পরিচালক, অনেক ক্ষেত্রে ইন্ডাসট্রিতে যুক্ত সেলিব্রিটিরা। এর অভিঘাত হল সুদূরপ্রসারী – চলচ্চিত্র সমালোচনা আর স্পেশালাইজেশন রইলো না, তার জন্য বিশেষ জ্ঞান, বিশেষ চোখ, বিশেষ লেখার শৈলী আর রইলো না। চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ঠ্য, তা নিয়ে লেখার ভাষা ভিন্ন হবে – এমন দাবীও আর রইলো না। এই দাবী যে সংবাদপত্রের সমস্ত সমালোচকদেরই ছিল তা বলা যায় না, অন্তত তাদের কাছে এই দাবীটা করা যেতে পারতো। কিন্তু সেই দাবী সেলিব্রিটির কাছে তো আর করা যায় না।

এ ছাড়াও – সমালোচনার লেখক ইন্ডাস্ট্রির সাথে যুক্ত থাকার হেতুই অনেক সমালোচনা দ্রুত নৈর্ব্যক্তিকতা হারাতে লাগলো; অনেক ক্ষেত্রেই লেখকের জীবিকার স্বার্থেই এই রিভিউগুলি সমালোচনামূলক রইলো না আর – পরিচালক বা প্রযোজক হয়তো প্রতাপশালী, লেখকের পরিচিত। তখন সেই লেখাগুলি হয়ে উঠলো একরকম ছবির মুক্তি-পরবর্তী বিজ্ঞাপণ।

কিন্তু সিনেমার ইতিহাসে প্রিয়জন, পরিচিতজন, সমধর্মী, সমমনস্কদের একপেশে উদযাপন করে লেখার উদাহরণ অজস্র আছে। প্রবাদপ্রতিম ‘কাহিয়ে দ্যু সিনেমা’-য় বেশিরভাগ লেখাই একপেশে, একদেশদর্শী এবং অনেক ক্ষেত্রেই বিরুদ্ধসমালোচনায় অযাচিতভাবে মারমুখী ছিল। কিন্তু তফাতটা আনন্দবাজার বা টাইম্‌স অফ ইন্ডিয়ার সাথে কাহিয়ে-র এখানেই – যে কাহিয়ের লেখকরা অচিরেই ফরাসী নবতরঙ্গের প্রবাদপ্রতিম পরিচালক হয়ে উঠবেন – ওনাদের সিনেমা নিয়ে একটি সুস্পষ্ট, বিকল্প ধারার কল্পনা ছিল যা আনন্দবাজারদের থাকতে পারেনা। একদা সাহিত্য নিয়ে আনন্দবাজার যা করে এসেছে, সিনেমা নিয়ে নব্বইয়ের দশকে এই প্রতিষ্ঠান তাই’ই করলো, আরেকটু পরোক্ষভাবে, আরেকটু বুদ্ধি প্রয়োগ করে – সমালোচনাকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়ে সিনেমা নিয়ে সাধারণ পাঠকের ধারণাগুলিকেই পালটে দিতে থাকলো। সদ্যপ্রয়াত সত্যজিৎ রায়ের সরলীকৃত মূল্যায়ণ, সাবেকী মধ্যবিত্ত বাঙালিয়ানা এবং আধুনিক উত্তর-বিশ্বায়ন কনজিউমারিজমের একটি নির্মীয়মান আত্মপরিচয়ের সাথে মিলিয়ে দেওয়া গেল সিনেমাকে, নস্টালজিয়ার বিজ্ঞাপনের সাথে বিজ্ঞাপনী নন্দনতত্ত্ব মেলালে যেমন হয় – এক প্রামাণ্য উদাহরণ পাওয়া গেল ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবিতে।

এবং এটা নেহাতই সমাপতন নয় যে এই দশক থেকেই এমন এক ধরণের বাংলা ছবির উত্থান হতে থাকলো যাকে পোলেমিকালি বলা যেতে পারে আনন্দবাজারী ছবি – অর্থাৎ গত বহু দশক ধরে জনপ্রিয় সাহিত্যের ক্ষেত্রে ‘দেশ’, এই প্রকাশনার বিবিধ পুজাবার্ষিকী, আনন্দ পাবলিশার্স যা করে এসেছে – এই প্রথম চলচ্চিত্রে তার সমধর্মী কিছু তৈরী হল, এই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেই ছবির পৃষ্ঠপোষকতা কখনোই প্রত্যক্ষ রইলো না, কিন্তু পরোক্ষেও বেশ জোরালো হয়ে উঠলো।

কেমন ধরন সেই ছবির? মূলত ঋতুপর্ণ ঘোষ এবং অপর্ণা সেনের হাতে এই ছবির মডেল তৈরী হল – উচ্চবিত্ত-অভিমুখী মধ্যবিত্তের ছবি, যে ছবি মূলত সম্পর্কের গল্প বলে, পারিবারীক ও যৌনসম্পর্কজনিত সংকট সেখানে প্রাধান্য পেতে থাকে এবং গল্পগুলি এমন একটি পরিসরে বিস্তৃত হতে থাকে যেখানে ইন্টেরিয়র ডেকরেশন, প্রচূর অবজেক্ট, অহেতুক বস্তুর টেক্সচার ভিড় করতে থাকে, অতীত ও বর্তমান পর্যবসিত হতে থাকে বস্তুর, আসবাবের, আধিক্যের সম্ভারে। বহির্দৃশ্য, বহির্সমাজ, বাস্তব পরিসর কমতে থাকে, সত্যজিতের বাস্তববাদ একধরণের ন্যাচারালিজমে পর্যবসিত হয়। এক একটি ছবি দেখে মনে হতে থাকে শারদীয় উপন্যাস পড়া হচ্ছে যেখান থেকে সত্তরের নতুন ভারতীয় সিনেমার, রাজনৈতিক সিনেমার সমস্ত চিহ্ন মুছে যেতে থাকে ধীরে ধীরে। সত্যজিতের শেষ দিকের ছবি – যা তার অসুস্থতার কারনে ইনডোরে আটকে গিয়েছিল এমন আবার হয়তো অসুস্থতার কারনেই সরলীকৃত হয়ে যাচ্ছিল – সেখানে যে আর্জেন্সি ছিল বৃহত্তর সমাজ নিয়ে তা এই ছবিতে তা একধরণের তথ্যে পর্যবসিত হতে থাকে, যেমন ‘যুগান্ত’-য় উপসাগরীয় যুদ্ধ।

বস্তুত, এমন ছবি হওয়ারই ছিল কখনো না কখনো স্বাভাবিক কারণেই। মৃণাল সেনের ‘ভুবন সোম’ পরবর্তী ছবি, ‘ভুবন সোম’ যে চলচ্চিত্র আন্দোলনের পথিকৃত হতে থাকে সেই নিউ ইন্ডিয়ান সিনেমা – এইসব ছবির পিছনে ষাট ও সত্তর দশকের ক্রমবর্ধমান বামপন্থী আন্দোলন প্রেক্ষিত হিসেবে ছিল। নব্বইয়ে সেই বামপন্থী আন্দোলন অন্তত পশ্চিমবঙ্গে জগদ্দল বামফ্রন্ট সরকার হয়ে গেছে, ক্ষমতায় থাকলে আন্দোলনের ধার কমে যাওয়ারই কথা, ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর মধ্যবিত্তের একটি নতুন পরিচিতি এসে গেছে – কনজিউমারের। নব্বইয়ে অতএব একটি মধ্যবর্তী পর্যায় – সদ্য অতীতের রাজনৈতিকতা ফিকে হয়ে আসছে, তৈরি হচ্ছে বড়জোর একরকম ইনফর্মড নৈতিকতা, আসন্ন একটি নতুন মধ্যবিত্ততা যেখানে বৈভব অভীষ্ট, অথচ ভোগবাদকে আশরীর আলিঙ্গনও করা যাচ্ছেনা – এইসময়ের মধ্যবিত্ততার ছবিতে আমরা রাজনৈতিক ইনঅ্যাকশন এবং সামাজিক সচেতনতার এক বিচিত্র মিশেল দেখতে পাই। রাজনৈতিকতা পালটে যাচ্ছে শুধুই নৈতিকতায়, অথচ আসন্ন ভোগবাদ চিহ্নিত হচ্ছে যৌনতার হাতছানিতে – এই দুইয়ের মধ্যে বিরোধাভাস থাকতে বাধ্য। লাভের মধ্যে চক্রাকার সম্পর্কের সংকট যার মীমাংসা নেই, একধরণের আবছা গিল্ট ও প্রায়শ্চিত্তের আবহ, প্রতিবাদের বদলে সহ্যক্ষমতা বাড়ানো ও মেনে নেওয়ার স্পৃহা এই ছবিগুলিতে মেঘলা আকাশের মত আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। গত এক দশকে নব্বইয়ের এই ভারি দীর্ঘশ্বাসের মত আবহ’ও আর নেই সে অর্থে – যৌনতা নিয়ে নৈতিক টানাপোড়েন কমেছে, সেট ডিজাইনিং, আলোকসম্পাত, কালার-কারেকশন, ডিজিটাল ইন্টারমিডিয়েটের কল্যানে জৌলুশ, চাকচিক্য, প্রযুক্তির প্রদর্শন বেড়েছে – ভারী দীর্ঘশ্বাস এখন অনুপম রায়ের গানে হয়ে উঠেছে সুরেলা, মিঠে ও অতিকথনে ভারী।

এই যে প্রযুক্তি ও বৈভবের অর্জন, এবং চাকচিক্য ও ক্রমবর্ধমান বাজেটের ফলে যা অতি-দৃশ্যমান, তার ফলে বাংলা ছবির ইতিহাসে অর্জিত কিছুর কি ক্ষয় হল? কেউ বলতেই পারেন যে মূলধারার ক্ষেত্রে স্বপন সাহা ও তার আগে অঞ্জন চৌধুরীর ছবির চাইতে, অন্য ধারার ক্ষেত্রে মৃণাল সেনের রঙীন ছবির বা নব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের ছবির চাইতে এখনকার ছবি তো অনেক ‘স্মার্ট’, অনেক ‘বোল্ড’, অনেক বেশি ‘টেকনিকালি সাউন্ড’ – এবং তা অনস্বীকার্য। সমস্যাটা এখানেই।

আমি মূলধারার ছবি নিয়ে খুব বেশি বলবো না, সামান্য কিছু কথা ছাড়া। আশি ও নব্বইয়ে অঞ্জন ও স্বপনের হাতে বাংলা মূলধারার ছবির নাভিশ্বাস ওঠা থেকে মুক্তি পেয়েছিল। বস্তুত উত্তমকুমারের মৃত্যুর পর যে শুন্যতা এসেছিল – আসলে তার জীবদ্দশার শেষ পর্যায়েই – সেটা ছিল নতুন যুগের নায়ক-নায়িকা ও তাদের কেন্দ্র করে নতুন আখ্যান গড়ে তুলতে পা্রায় বাংলা ছবির অক্ষমতা। সেই সময়ে বাঙালি যুবসম্প্রদায় যে নায়ক চাইছেন তা বাংলা ছবি দিতে পারছে না, হিন্দি ছবি প্রথমে অমিতাভ বচ্চন ও পরে মিঠুন চক্রবর্তীর পার্সোনায় তা দিয়ে দিচ্ছে। ‘শত্রু’-র দমনকারী পুলিস – যিনি যৌবন পেরিয়ে যাচ্ছেন – এমন এক পারিবারীক জ্যেষ্ঠপুত্রকে বহির্সমাজে হাজির করলো যার হাতে দূর্নীতিপরায়ণ জোতদার থেকে বখাটে যুবক, লুম্পেন প্রলেতারিয়ত’ও ঠান্ডা। এই পার্সোনা কখনোই বামপন্থী বিপ্লবী হবেন না, এনার পৌরুষ প্রেমিকের নয়, রক্ষাকর্তার ও কর্তৃত্বের। সত্তরে পুলিসের পতিত ইমেজকে উদ্ধার করলো ‘শত্রু’, রাজনৈতিক রাগ পরিবর্তিত হল কড়া আইনের শাসনের ফ্যান্টাসিতে এবং এরপরের ছবিগুলিতে এই কর্তা-পুরুষের যেখানে ফেরত যাওয়ার কথা সেখানেই গেলেন – বৃহত্তর পরিবারে।

ইতিমধ্যে ভূমিসংস্কার হতে থাকবে, গ্রামে একটি নতুন শ্রেণী তৈরি হবে যাদের ক্রয়ক্ষমতা আছে। ভি এইচ এস এবং টেলিভিশনের যুগে একটি ট্র্যানজিশনাল বাংলা মূলধারার ছবি তৈরি হল যা সে অর্থে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এই প্রথমবার মূলত গ্রাম ও মফস্বলকে উদ্দেশ্য করে নির্মিত। ট্র্যানজিশনাল বললাম এই অর্থে যে নব্বইয়ের পরে যখন বিশ্বায়িত বাজার নতুন নগরায়নের একটি ছবি তৈরী করে দিচ্ছে, তখন ফের পরিবারের বাইরের পরিসরটি এই মূলধারায় প্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে, জায়গা তৈরি হবে মূলত জিৎ এবং খানিকটা দেবের মত পার্সোনার – এখন মফস্বলের ছেলেটি বা মেয়েটিও এমন একটি পার্সোনা দেখতে চায় যে পরিবারের বাইরেই স্বচ্ছন্দ, বাঙালিয়ানা যার পরিচয় নয় আর, পরিবারের নিগড় যার আলগা, যার শরীরে-উচ্চারণে-বেশভুষায় একটি লুম্পেন মেট্রোপলিটান শ্রী থাকবে, মুম্বইয়া স্মার্টনেস ও অগভীরতা যার অভীষ্ট, যার কম্পিটেন্স মূলত নাচ ও কোরিওগ্রাফড ফাইটের অ্যাথিলেটিসিজম, বচ্চনের সামাজিক রাগ যেখানে যত্ন করে মুছে দেওয়া গেছে। গত দশকে এই শরীরটি তার আঞ্চলিক পরিচিতি সম্পূর্ণ হারিয়েছে, তার বাংলায় সংলাপ বলাটা নেহাতই একটি প্রয়োজনীয় বিড়ম্বনা, হয়তো আর পাঁচ বছর পরে তার অধিকাংশ সংলাপ – পারিবারীক পরিসরের বাইরে – সে হিন্দিতেই বলবে।

আপাতভাবে মূলধারায় যে বাঙালিয়ানা ও আঞ্চলিক পরিচিতির ক্ষয়, সেই বাঙালিয়ানাকে মেট্রোপলিটান মোড়কে সাজিয়ে নিতে থাকলো আমি যাকে নতুন ‘আর্বান পপুলার’ নামে অভিহিত করেছি – সেই ছবিতে – যার নায়ক হন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত, আবীর চট্টোপাধ্যায় বা যিশু সেনগুপ্ত। দক্ষিনী মূলধারা যখন এখানকার মূলধারাকে সংজ্ঞায়িত করছে, এই ছবিতে ছেয়ে গেল বিজ্ঞাপনী নন্দনতত্ত্ব। কিন্তু ছবিগুলি কিসের বিজ্ঞাপণ হয়ে উঠতে লাগলো? মূলত একটি নতুন লাইফ-স্টাইলের। যে লাইফ-স্টাইল শো-বিজ ও সেলিব্রিটি দুনিয়ায় আছে, যে লাইফ স্টাইল এফ এম রেডিওর শ্রোতাদের কাছে বিজ্ঞাপিত, যে লাইফ স্টাইলের বাইরের বাস্তব – এমনকি নাগরিক বাস্তব – এই ছবির সাথে যুক্ত কারুরই চেনা নেই, সেই লাইফ-স্টাইল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আসতে থাকে এইসব ছবিতে। পরপর ছবিগুলি দেখতে থাকলে মনে হবে একটি ছোট্ট গোষ্ঠীর হোম ভিডিও-র মধ্যে আপনি অযথা অনুপ্রবেশ করে ফেলেছেন – তারা নিজেদের ছবি তুলে নিজেদেরকেই দ্যাখাচ্ছিল, বলছিল নিজেদের গল্প – আপনি হঠাৎ অযাচিত ঢুকে পড়েছেন। তখন যেভাবে হঠাৎ অনাহুত আপনাকে দেখতে থাকবে হঠাৎ চুপ করে যাওয়া ঝাঁ-চকচকে কিছু নারী-পুরুষ – এই ছবিগুলিও আপনার দিকে ঠায় তাকিয়ে থাকে। আপনি অনাহুত হলেও আপনার হাতে মাল্টিপ্লেক্সের টিকিট, আপনাকে তাড়িয়েও দেওয়া যায় না, তখন আপনার জন্য তারা দেবেন বাঙালিয়ানার নস্টালজিয়া – একইরকম বিজ্ঞাপনী – এবং নস্টালজিয়ার পরিসর হল উত্তর কলকাতায়। দৃষ্টি থেকে দৃশ্যের দূরত্ব হল সাউথ সিটির ছাদ থেকে শ্যামবাজারের মোড়।

এখানে ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল বিড়ম্বনা একটা বড় ভূমিকা নেবে – বাংলা ছবিতে এই পরিসরগত সঙ্কীর্ণতায়; কলকাতার হাতে গোনা কিছু স্থান ছাড়া বাংলা ছবির কলকাতা বড় দ্যাখা যায় না। খুব বেশি হলে হাই-অ্যাঙ্গেলে নাগরিক রাস্তা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাত্রিবেলায়। শুনেছি রাস্তা-ঘাট, পাড়া, স্টেশন, মেট্রো রেল – এইসমস্ত স্থানে শুটিং করা বিশেষ কঠিন হয়ে যাচ্ছে অনুমতি, ঘুষ ইত্যাদির জন্যে। কিন্তু আরো বড় কারণ হল হাতে গোনা কয়েকটি জায়গার বাইরে নির্মাতাদের শুটিং করতে না চাওয়া, বিবিধ নাগরিক পরিসরকে সিনেমার পর্দায় কেন আনতে হবে তার হেতু তাদের মাথায় না আসা। প্রতি ছবিতেই স্পেস বা পরিসর তৈরি হয়, কিন্তু কিছু ছবিতেই ‘স্থান’ বিশেষ ভূমিকা নেয় ছবিতে। মৈনাক বিশ্বাস ও অর্জুন গৌরিসরিয়ার ‘স্থানীয় সংবাদ’, নবারুণ ভট্টাচার্যের কাহিনী অবলম্বনে সুমন মুখোপাধ্যায়ের ছবিগুলি, আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্ত-র ‘আসা যাওয়ার মাঝে’ – এরকম কয়েকটি উদাহরণের বাইরে স্থান যে বিশেষ ভূমিকা রাখে ছবিতে তাদের নন-ফিকশনাল দ্যোতনা নিয়ে, তাই নিয়ে ওই আর্বান পপুলার বাংলা ছবি আদপেই জ্ঞাত বলেই মনে হয়না। প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’-ও এই পরিসরের অর্থকেই ছবির বিষয় করে নেয়, বাংলা ছবিতে কিছু পরিসর যে অলীক হয়ে গেছে তার দিকে ইঙ্গিত দিয়ে। কিন্তু এই যে আর্বান পপুলার – তাতে স্থানের ভূমিকা প্রায় আর নেই – পরিসর কেবলই চরিত্রদের ধারণ করার বা চরিত্রদের একটি ফেব্রিকেটেড নাগরিক মাত্রা দেওয়ার জন্যই ব্যবহৃত হয়। নব্বইয়ের শেষে হিন্দি ছবিতে রামগোপাল ভার্মা যখন ‘সত্যা’-য় ও পরে ‘কোম্পানি’-তে স্থান ও পরিসরের মাত্রা আমূল পালটে দিলেন মুম্বইয়ের এমন অঞ্চলে গিয়ে যেখানে বলিউডের আকাঙ্খিত গ্লোবাল ইন্ডিয়ান পরিসর বহু দূরে এবং আকাঙ্খিত’ও নয়, তখন নতুন গ্যাংস্টার জঁর ওই স্থান থেকেই উঠে এসেছিল – জঁরের জন্য স্থান তৈরি করা হয়নি। বাংলা সিনেমায় এরকম সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।

আখেরে বাংলা সিনেমা একটি সংকুচিত নাগরিক স্পেসেই সীমাবদ্ধ হয়ে রইলো, একটি মেট্রোপলিটান পাড়াগাঁয়ে। পাড়াগাঁ বলতে যা বোঝায় তেমনই সংকীর্ণ তার বৈচিত্র, তার সম্ভাবনা, তার জীবনশৈলী, তার কামনা-বাসনা-চমক-সন্দেহ-নৈতিকতা। ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল কারণেই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি মহানগরে গড়ে ওঠে, অনেকক্ষেত্রেই বন্দরের কাছাকাছি মহানগরে (ব্যতিক্রম শুধু হলিউড); বিবিধ ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল কারণেই – বিশেষ করে ১৯৩০-এর দশকে, ছবিতে শব্দ আসার পর এবং আলোকসম্পাত বিশেষ মাত্রা অর্জন করার পর – ক্যামেরা স্টুডিও’র বাইরে বেরোতে পারেনা বেশ কিছুদিন। কিন্তু সব দেশের ছবিতেই তারপর বিশেষ কিছু মুহুর্ত আসে যখন ক্যামেরা সচেতনভাবে অনাগরিক স্থান, নগরের প্রান্তিক অঞ্চলকে পর্দায় নিয়ে আসে; এমন মুহুর্ত – সবাই জানেন – বাংলা ছবিতেও এসেছিল। ‘পথের পাঁচালী’-র সেই মুহুর্ত বিশ্ব-সিনেমার ইতিহাসের স্মরণীয় মুহুর্ত হয়ে উঠেছিল।

বিশ্ব-সিনেমার ইতিহাসে ক্যামেরা স্তরে স্তরে, পর্যায়ে পর্যায়ে, পর্দায় তখন’ও না আসা স্থানকে নিয়ে এসেছে, অনেক ক্ষেত্রেই উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে, অনেক সময়েই পুঁজির সাহায্য ছাড়াই। টাটকা নতুন স্থান থেকে নতুন মানুষজন, নতুন শ্রমের রকমফের, নতুন আশা-আকাঙ্খা, বেঁচে নেওয়ার গল্প, নতুন ফ্যান্টাসি, নতুন ইচ্ছেপূরণের গল্প এসেছে ছবিতে। কিন্তু আমাদের আলোচ্য সময়ের বাংলা ছবি কলকাতার কয়েকটি পাড়ার বাইরে বেরোতে পারলো না। ‘পথের পাঁচালী’ যে সাহস নিয়ে যন্ত্রপাতি নিয়ে চলে গিয়েছিল গ্রামে, তখন অনেক ছবিরই সেই সাহস না থাকলেও গ্রামকে তারা কখনোই পর্দা থেকে বিদেয় করে দেয়নি, একটি কল্পিত গ্রাম বাংলা ছবিতে থেকেই গিয়েছিল। তারপর ‘যদু বংশ’-র মত ছবিতে, এমনকি ‘মৌচাক’-এর মত ছবিতেও মফস্বল এলো। অঞ্জন চৌধুরী বা স্বপন সাহার ছবিতে পরিবেশটি গ্রাম বা মফস্বলেরই ছিল। কিন্তু গত দুই দশকে বাংলা সিনেমা আর গ্রাম বা মফস্বলে যেতে পারে না। বরং তার কাজ এখন গ্রাম বা মফস্বলে কল্পিত মেট্রোপলিসের ছবি নিয়ে যাওয়া।

অথচ ডিজিটাল প্রযুক্তির ফলে, ক্যামেরা ছোট হয়ে যাওয়ার ফলে এখন প্রযুক্তির গতি ও চলন অবাধ হওয়ার কথাই ছিল, কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিয়াল ছবিতে কল্পনা মেট্রোপলিস ছেড়ে বেরোতে পারে না আর। সেখানে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত’র ছবিতে পুরুলিয়াও একই দোষে দুষ্ট হবে – পুরুলিয়ার পরিসর সেখানে ফাঁকা টেক্সচার হয়েই থাকে যেখানে পরিচালকের ভাবনা-চিত্র আরোপিত হবে – পুরুলিয়া তার গল্প নিয়ে, তার মানুষজনকে নিয়ে পর্দায় উঠে আসেনা। বাংলা সিনেমা যতদিন না পুরুলিয়া, কৃষ্ণনগর, দূর্গাপুর, মিরিকের গল্প বলবে সেইসব স্থানে, সেইসব স্থানের মানুষকে নিয়ে – ততদিন তার এই সংকীর্ণ মেট্রোপলিটান পাড়াগেঁয়েপনা থেকে মুক্তি হবে না। একমাত্র মেট্রোপলিস থেকে ছড়িয়ে গেলেই তার পক্ষে আবার আন্তর্জাতিক মানের ছবি করা সম্ভব হবে বলে আমার মনে হয়। কলকাতার কিছু কৃত্রিম পরিসরের পক্ষে আর নতুন কোনো চরিত্র, নতুন কোনো গল্প, নতুন কোনো ইমেজ তুলে ধরা সম্ভব নয়। যত এইসব ছবি নতুন এবং অন্য বাস্তবকে দেখতে ভুলে যাবে, তাদের কাছে রয়ে যাবে দুইধরণের কুমীরছানার মত বাস্তব – এইসব ছবির কুশীলবদের লাইফস্টাইলের বাস্তবতা, এবং তাদের শরীর ও যৌনতার বাস্তবতা। এক সময়ে – সত্যজিতের ‘অপু ত্রয়ী’-তে – বাংলা সিনেমায় নতুন স্থান দ্যাখা দেওয়ায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বময়, এখন শরীরের, ত্বকের নতুন স্থান, নতুন কোনা অনাবৃত করে তারা উত্তেজনা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে – কিন্তু এই শরীর তো অচেনা ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে না আর, কোনো নতুন গল্পও বলে না – আর যখন বলার চেষ্টা করে, যেমন করেছিল কিউয়ের ‘গান্ডু’ – তা গতানুগতিক প্রথায় প্রদর্শনযোগ্য থাকেনা।

অতএব নতুন মানুষ, নতুন পরিসর, নতুন স্থান যখন পর্দায় আনা যায় না আর, তখন জনপ্রিয় ছবির হাতে একটিই উপায় থাকে স্বাদবদলের – তা হল নস্টালজিয়া। এই নস্টালজিয়া আসতে পারে দুইভাবে – এমন কোনো পরিসর চিহ্নায়িত করা যেখানে অতীত স্থির হয়ে, অনড় হয়ে আছে বলে ধার্য হয়, বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রে সেটা হয়ে ওঠে উত্তর কলকাতা; অথবা সিনেমা ও সাহিত্য ধরে অতীতচারীতা হতে পারে নস্টালজিয়ার পন্থা। কিন্তু এই দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রেও পুঁজি ও কিছু স্কিলের প্রয়োজন হয় – কৃত্রিমভাবে অতীতের পরিসর তৈরি করতে হয়, ডিটেলের প্রয়োজনীয়তা বাড়ে। সেগুলি আয়ত্ব করতে না পেরে বাংলা সিনেমা অধুনা আগের শতকের গোয়েন্দা গল্পের দারস্থ হয়েছে, বিশেষ করে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ব্যোমকেশের গল্পে। এই ছবিগুলিতে স্পেস বা ডিটেলের পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্মাণ এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে বিগত গোয়েন্দার চরিত্রকে পুনরুত্থাপিত করে, অর্থাৎ চরিত্র ও পার্সোনাই অতীতচারিতার অবলম্বণ হয়ে উঠছে। সন্দীপ রায়ের অবলম্বনে ফেলুদা-তোপসে-লালমোহনবাবু উল্টোদিকে শুধুমাত্র সত্তর ও আশি দশকের একটি চরিত্র হিসেবেই থাকছে; গল্পগুলি বিস্তৃত হচ্ছে একটি কালীক শুন্যতায়, অর্থাৎ গল্পগুলো কোন সময়ে ঘটছে তা বোঝার উপায় নেই। ফেলুদার হাতে মোবাইল ফোন এলেও তার পার্সোনাটা গল্পের বইয়ের মতই পুরোনো থেকে যায়, এবং অন্যান্য চরিত্ররাও সত্যজিতের রচনার সময় থেকে বেরোতে পারে না, অথচ পারিপার্শ্বিকে সেই সময়ের চাপ থাকেনা। পুঁজি এবং স্কিলের অভাবেই একটি বিস্তারিত অতীত নির্মাণ’ও টালিগঞ্জের হাতে নেই – যেমন হিন্দিতে চেষ্টা করতে পারে দিবাকর ব্যানার্জীর ‘ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী’-র মত একটি আদ্যন্ত খুঁতে আকীর্ণ ছবিতেও। এমনকি যেহেতু সাহিত্যের সাথে বাংলা ছবির সম্পর্ক চ্যূত হয়েছে, মেলোড্রামাও বেরিয়ে গেছে হাতের বাইরে, শুধুমাত্র সেটের অভ্যন্তরে ‘দেবী চৌধুরানী’ বা ‘দত্তা’-র মত পিরিয়ড পিস করাও তার পক্ষে আর সম্ভব নয়।

হয়তো আরো অ্যাকাডেমিক কোনো গবেষণায়, আরো ধৈর্যশীল নিরীক্ষায় খতিয়ে দ্যাখা হবে কিভাবে মেলোড্রামা বাংলা সিনেমা থেকে বেমালুম হারিয়ে গেল। নব্বইয়ের দশকের দ্বিতীয় অর্ধে অ্যাকাডেমিক চলচ্চিত্রবিদ্যা যখন দীর্ঘদিনের অবহেলার অবসান ঘটিয়ে সঠিক মূল্যায়ণ করছে বাংলা ছবির মেলোড্রামার – হয়তো ঋত্বিক ঘটককে বোঝার সূত্রেই শুরু করে – তখনই মেলোড্রামাই মুছে যাচ্ছে বাংলা সিনেমা থেকে। থেকে যাচ্ছে মেলোড্রামার বাহ্যিক কিছু ফ্যাসাড – পারিবারীক প্লট, উচ্চকিত অভিনয়, একমাত্রিক চরিত্র। মেলোড্রামা যেভাবে একটি প্রতিস্থাপিত ও গুঢ় অর্থবিশ্বের দিকে ইঙ্গিত দেয়, তা হারিয়ে যেতে থাকে অঞ্জন চৌধুরী, হরনাথ চক্রবর্তী, স্বপন সাহা, প্রভাত রায়দের ছবি থেকে। আজ যখন উত্তম-সুচিত্রার ছবিতে আধুনিকতার সাথে বোঝাপড়ার একটি ভিন্ন বয়ান গুঢ়পাঠ করে বের করে আনা যায়, এই এখনকার ছবিগুলি সেই দিক থেকে ফাঁপা হয়ে যেতে থাকে। এরপর মূলধারা যখন দক্ষিনী ছবির ভাববিশ্বের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, তখন নতুন আর্বান পপুলার’ও ঋতুপর্ণীয় স্বাভাবিকতাবাদের পর মেলোড্রামায় ফিরতে পারবে না, আবার বাস্তববাদের সামাজিক উন্মোচন’ও তার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে। ফাঁপা মেলোড্রামা সুস্থির হবে মেগাসিরিয়ালে। আগের বাংলা ছবির এই ফর্মের উধাও হওয়ার অন্যতম লক্ষণ, বা সিম্পটম (যা আমার মতে সার্বিকভাবে ভারতীয় জনপ্রিয় ছবির সমস্যা) হল গানের সীমাবদ্ধ ব্যবহার। বাংলা আধুনিক গান এবং সিনেমার গান কি ধরণের ক্রাইসিসের মধ্যে যাচ্ছে তা ভিন্ন প্রবন্ধ ও অনেক বেশি কুশলী প্রবন্ধকার দাবী করে, তা নিয়ে আমি বিশেষ বলবো না। কিন্তু এখনকার অভিনেতারা গানে লিপ দেওয়ার স্কিল দ্রুত হারাচ্ছেন, প্রেমের দৃশ্যে গানের ব্যবহারের আগের কম্পিটেন্স আর দ্যাখা যায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গান ব্যাকগ্রাউন্ডে বিবেকের মত উদয় হয়, ভাসাভাসা একধরণের মন্তাজ মুড তৈরি করতে থাকে। দেব বা জিতের ছবিতে সর্বভারতীয় জনপ্রিয় ছবির মডেলে গান এলে নাচ আসে, যে নাচ আমি যাকে আর্বান পপুলার বলছি তাতে সম্ভব নয়। প্রেমের দৃশ্যে গান তো চলে গেছেই, তাকে প্রতিস্থাপিত করছে প্রচন্ড তাড়া খাওয়া চুম্বন বা যৌনদৃশ্য, বা রাস্তা-ঘাটে সংলাপহীন হাঁটা-চলা, নায়ক-নায়িকাদের বিজ্ঞাপনী পসচার ও পোশাকের ডিসপ্লে। বাংলা সিনেমায় শেষ কুশলী গান এসেছিল সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘জাতিস্মর’-এ, আবার এই ছবিই হয়তো নিদর্শন হয়ে থাকবে কিভাবে এডিটিং ও ন্যারেটিভের তাড়ায় বাংলা ছবি একটি ভালো গানের সময়ে দুদন্ড দাঁড়াতে পারেনা গানকে তার সম্ভ্রম জানিয়ে, তার দৃষ্টান্ত হিসেবেও। অন্যদিকে, একটি ‘ভূতের ভবিষ্যত’ ব্যতিক্রম ও ক্রাইসিস হয়েই জানাচ্ছে যে অনুপম রায়ের জমানায় বাংলা সিনেমায় হাসির গান, বৈঠকী গান, রাগাশ্রয়ী গান বোধহয় চিরতরেই বিদায় নিয়েছে।

বাস্তববাদ একটা সম্ভাবনাহীন আধার হয়ে আছে; মেলোড্রামার রেটরিক’ও বিদায় নিয়েছে – বাংলা সিনেমার সংকট অতএব হয়ে দাঁড়াচ্ছে ফর্মের সংকট। ইদানিং বহু ছবি সাসপেন্স থ্রিলার বা অপরাধমূলক ফিল্ম নোয়াকে ধরার চেষ্টা করছে; কিন্তু এই দুই জঁর-ই যে ক্রাফটস্‌ম্যানশিপ, ডিজাইন ও বিশ্ববীক্ষা দাবী করে তা বাংলা সিনেমায় নেই। মনে রাখতে হবে ফিল্ম নোয়ার আলো-আধারিতে পতিত নৈতিকতার গল্পগুলি বলা হত কতগুলি বিশেষ নাগরিক প্যারানোইয়া ব্যক্ত করার জন্য, এবং হলিউডের রক্ষণশীলতা তখন যৌনতা অনুমোদন করতো না পর্দায়। অতএব সৃজনশীলভাবে ওই পাপের আবহ তৈরি করা হত পরোক্ষতায়। বাংলা সিনেমা যেহেতু এখন আনাড়িভাবে হলেও যৌনতা দ্যাখাতে পারে তাকে ১৯৪০-৫০-এর দশকের হলিউডের মত সৃজনশীল হতে হচ্ছে না; এই অন্ধকারাচ্ছন্ন জঁর যখন মূলত ডিজাইনের উপর নির্ভরশীল, শৈলী ও স্টাইলের উপর, বাংলা অপরাধমূলক ছবি হয়ে দাঁড়াচ্ছে কেবলই প্লটসর্বস্ব। আর থ্রিলারেও যেমন প্রযুক্তিনির্ভর শৈলীর উপর দখল আবশ্যিক হয়ে যায়, ভায়োলেন্সের সিরিয়াস কুশলী প্রতিরূপায়ণ বাংলা ছবির ক্ষেত্রে এখন’ও অধরা রয়ে গেছে। দেব বা জিতের ছবিতে ভায়োলেন্স দক্ষিণী ছবির মডেলে স্পেশাল-এফেক্ট্‌স নির্ভর কার্টুন অ্যাকশনে পর্যবসিত হচ্ছে, যা কখনোই ভায়োলেন্স নয় – কারণ তার সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক কনটেন্ট শুন্য – কেবলই অ্যাক্রোব্যাটিক ও অ্যাথলেটিক অ্যাকশন। নাচের মতই এই অতিকোরিওগ্রাফ্‌ড ফাইট – যেখানে অভিনয়ের বা নাটকীয়তার প্রয়োজনীয়তা ন্যুণতম – আর্বান পপুলারে হতে পারেনা। অতএব সেখানে ভায়োলেন্স, প্যারানোইয়া, সামাজিক ভীতি, অস্তিত্বর সংকট ব্যতিরেকে কিছু পড়ে পাওয়া ছকের প্লট দেওয়া হয় মাত্র। গল্পগুলো যতটা না সময় আর বাস্তব থেকে উঠে আসে, তার চাইতেও সময় আর বাস্তবের উপর এই গল্পগুলো আরোপ করে দেওয়া হয়।

বাংলা সিনেমা নিয়ে আমার অতৃপ্তি খানিকটা বিস্তারিত করলাম এতক্ষণ, এবং এখন থামছি। সত্যি বলতে কি ‘এখন বাংলা সিনেমায় গলদ কোথায়’, এহেন প্রবন্ধ লেখার উদ্দেশ্য আমার ছিল না। যাদের দৃষ্টি আরো ক্ষুরধার তারা উপরোক্ত সমস্ত সিম্পটমের অনুধাবনযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারবেন, যারা বাংলা সিনেমা নিয়ে তৃপ্ত তারা এই লেখা আর পড়বেন না, যাদের মনে হয় যে বাংলা সিনেমাতে – বা যে কোনো সিনেমাতে – তৃপ্তি পাওয়ার বা তাত্ত্বিক গুরুত্ব দেওয়ার মত কিছুই থাকতে পারেনা, তাদের এইসমস্ত লেখা অহৈতুকি মনে হবে, যাদের মনে হয় যে সিনেমার সংকট বা পতন জাতির সংস্কৃতির সংকট বা পতনের কোনো লক্ষণ হতে পারেনা তাদের মনে হবে এই লেখা বাড়াবাড়িতে জর্জরিত।

কিন্তু আমি শেষ করবো এই প্রশ্ন করে যে এই অতৃপ্তির কি ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে কোনো, অথবা এই লেখার ‘অতৃপ্ত বিষয়ী’ কি ভ্যালিড একটি অবস্থান? আমি সোশাল মিডিয়ায় আমার লেখাপত্রর আলোচনা দিয়ে শুরু করেছিলাম। সেখানেও বাংলা সিনেমা নিয়ে আমার আক্ষেপ, শ্লেষ, হতাশা নিয়ে অনেক ‘সিনেফিল’ (শুধুই চলচ্চিত্রপ্রেমী বললাম না, এই শব্দটির একটি বিশেষ ওজন আছে) বলেছেন যে এত কথা খরচা করার মানে হয়না। বাংলা সিনেমা নিয়ে কিছু প্রত্যাশা করা স্রেফ প্রত্যাশার ভাঁড়ারে ক্ষয় করা মাত্র। বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসের বয়স একশো পেরিয়েছে মাত্র, বছর কুড়ি বেশি, এর মধ্যেই উল্লেখযোগ্য ছবির তালিকা একটি জীবনকে ব্যস্ত রাখার জন্য যথেষ্ঠ। তার মধ্যে সেলুলয়েড থেকে ডিজিটাল যুগে অবতীর্ণ করার হেতু বড়সড় পরিবর্তন এসেছে ছবির জগতে। টরেন্ট ও পাইরেসির ফলে আমাদের আর হা-পিত্যেস করে বসে থাকতে হয় না ছবির জন্য। আজ থেকে বিশ-পঁচিশ বছর আগেও কলকাতার একজন চলচ্চিত্রপ্রেমীকে অধুনার উল্লেখযোগ্য ছবি বা অতীতের ক্লাসিকের জন্য অপেক্ষা করে থাকতে হত, এখন আর হয়না। শুধু স্ক্রিনের সাইজ ছোট হয়ে গেছে, নয়তো কয়েকটি বিশাল স্টোরেজের হার্ড ডিস্কে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ছবিতে ভর্তি করে ফেলাটা কার্যত কয়েক মাসের মধ্যেই সম্ভব। কলকাতার একটি ছেলের বা মেয়ের পক্ষে সম্পূর্ণ ভিন্ন দেশের বা ভিন্ন সময়ের ছবির মধ্যে নিবিড় নিমজ্জনে বসবাস করা সম্ভব। আর ডিজিটাল শিফটের ফলে সমসাময়িক ছবির জগতেও উত্তেজক বহু পরিবর্তন যেমন হচ্ছে, অতীতের ছবির আর্কাইভিং-এও এসেছে নতুন মাত্রা। স্রেফ ভালোবাসার শ্রমের ফলে আর পাগলামির ফলে এখন একটা কম্পিউটারে বিশ্ব-সিনেমার সাথে যে গভীর কথোপকথন সম্ভব সেটা আগে এরকমভাবে সম্ভব ছিল না। এই সময়ে একটা সম্ভাবনাহীন ছবির জন্য চিৎকার হা-হুতাশ করা মানে অনেকগুলি ভালো ছবি দ্যাখার, মূল্যায়ণ করতে শেখার সময় নষ্ট করা। আমার কাছে এই তিরস্কারের প্রতিযুক্তি দিনে দিনে ক্ষীণ হয়ে আসছে।

আসলে দুরকম প্রতিযুক্তি বেঁচে থাকে। এক, আমার জীবিকার প্রতিযুক্তি। আমাদের কাজ যদি হয় ছবি নিয়ে পড়াশোনা তাহলে ইরানের একজন স্কলার তার সমসাময়িক ইরানিয়ান ছবি নিয়ে বলতে পারেন, একজন চীনের স্কলার তাদের ছবি নিয়ে, একজন ফিলিপাইন স্কলার তার সমসাময়িকে নতুন ছবি পাচ্ছেন যা নিয়ে সারা পৃথিবীর ছবির গবেষকরা শুনতে আগ্রহী – শুধুমাত্র একজন বাঙালি স্কলারের তার সমসাময়িকতা নিয়ে কথা বলার মত ছবি নেই, আছে শুধু চল্লিশ বছর আগেকার ছবি – সত্যজিৎ, ঋত্বিক, অজয় কর, অসিত সেনকে কুমিরছানার মত তুলে তুলে ধরা বা ইতিহাসের পাঠের প্রক্রিয়ার রকমফের জানানো – বিশ্বকে জানানোর মত বাংলা সিনেমার সমসাময়িক আমাদের জীবদ্দশায় বুঝি আর এলোনা।

দ্বিতীয়ত, সময় ও সমাজ প্রতিনিয়ত নতুন ‘সিনেমাটিক’-এর জন্ম দেয়। ভিন্ন ভাষার ছবিতে হয়তো আমার সমাজ ও আমার সময়ের ‘সিনেমাটিক’-কে আমি পাবোনা। একটি সিনেমাটিক ইমেজ, একটি সিনেমাটিক শব্দবন্ধ, একটি সিনেমাটিক মুহুর্ত শুধু যে সময়কে ধরে রাখে তাই’ই নয়, সময়কে ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেয়, সময়ের প্রতি তা একধরণের প্রতিক্রিয়াও বটে। বাংলার ‘সিনেমাটিক’ চিরকালই হয় কপট, নয় দীর্ঘসূত্রী ছিল – খাদ্য আন্দোলনের সময়ে আমরা ক্ষুধার চিত্র বা খাবারের দাবীতে চিৎকারের চিত্র পাইনি, দাঙ্গার সময়ে আমরা ভায়োলেন্সের, ভীতির ইমেজ পাইনি। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৮ অব্দি দেশব্যাপী দক্ষিণপন্থী হিন্দুদের উত্থানের কথা বাংলা সিনেমা থেকে জানা যাবে কি? যে পরিচালককে উদ্দেশ্য করে আমরা যথেষ্ঠ রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অভাবের অভিযোগ জানাতে ভালোবাসি সেই সত্যজিৎ রায় তার ‘ঘরে বাইরে’, ‘গণশত্রু’, ‘আগন্তুক’-এ – দূর্বল ছবি হওয়া সত্ত্বেও – বারবার দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্বের উত্থানের কথা বলে গেছেন। আর কেউ বলেছেন? আর কারুর বলার মধ্যে সেই আর্জেন্সি ছিল? কোনো নান্দনিক আর্ট ফিল্মমেকারের ছবিতে চার্চ পোড়ানোর দৃশ্য আমার সেক্ষেত্রে নান্দনিক বলেই এক্সপ্লয়েটেটিভ লাগে।

অথচ একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি, বিক্রমজিৎ গুপ্তর ‘লাদেন ইজ নট মাই ফ্রেন্ড’-এ আমি কলকাতার একজন মুসলমান যুবকের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর যে ভীতির চিত্র পেয়েছি তা তো তাৎক্ষণিক ছিল। ‘স্থানীয় সংবাদ’-এর শেষে একজন এডুকেশনাল অন্ত্রেপ্রনিওরের যে অ্যাবসার্ড ক্ষমতার কাব্য – তা কি বাঙালির স্মৃতিতে থাকবে – স্মৃতিতে থাকবে যে বুলডোজার ইতিহাস গুড়িয়ে দিয়ে চলে গেলে তার শব্দ শোনা যায় না, তার শব্দ? আশিস অভিকুন্তক নামে একজন অ্যান্থ্রোপলজিস্ট, যার মাতৃভাষা বাংলা নয়, পরপর বাংলা ছবি করে চলেছেন যেগুলো মুক্তি পাওয়ার মত নয়, এতটাই এক্সপেরিমেন্টাল; ‘রতিচক্রব্যূহ’ নামে তার একটি ছবি একটি দেড় ঘন্টার সার্কুলার ট্র্যাক-শটে – হ্যাঁ, একটি মাত্র শটে – তোলা হয়েছিল। ছবিটি সেন্সর সার্টিফিকেট পায়নি কারণ একটি শটের ছবিতে কাঁচি চালানো যায়না, অথচ এখনকার রক্ষণশীল সেন্সর বোর্ড এই ছবির সংলাপে ক্ষণে ক্ষণে কাঁচি চালাতে চাইবে। এই অবাঙালির ছবি কি বাংলা ছবি? কেন সারা প্রবন্ধে আমি শুধুই পূর্ণদৈর্ঘ্যের কাহিনীচিত্রের কথা বলেছি, এবং কেন পাঠকের কাছে তা’’ই স্বাভাবিক ছিল – নন-ফিকশন ও শর্ট ফিল্ম কি বাংলা সিনেমার ইতিহাসের অন্তর্গত? যে ছবিগুলি মুক্তি পায় না, যে দৃশ্য ও শব্দে সেন্সরের কোপে কাটা যায় হয়তো সেইখানেই আমাদের কাম্য সমসাময়িক আছে? অর্থাৎ, বাংলা সিনেমার সংকট নিয়ে যে প্রবন্ধ লিখতে বসলাম, হয়তো বাংলা সিনেমা বলতে আমরা যা বুঝি তা আরো বৃহত্তর কিছু যার হদিশই আমরা রাখিনি।

আমার মনে হয় আমার এই প্রবন্ধের ভিত্তিটাই ভুল কারণ প্রবন্ধটি বাংলা সিনেমার মধ্যে ক্রাইসিস ও তার সমাধানের শুলুক-সন্ধান করে শুরু হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ‘বাংলা সিনেমার সংকট’ শীর্ষক বহু সেমিনার, সাক্ষাৎকার, প্রবন্ধমালা আমরা পড়তাম – যেখানে আর্ট ফিল্মমেকাররা আলোচনা করতেন, এবং অবধারিত আঙুল তোলা হত স্বপন সাহা, হরনাথ চক্রবর্তীদের দিকে; অর্থাৎ, নিজেদের সিনেমার পরিসরের বাইরে। ধরেই নেওয়া হত যে যেহেতু আলোচকদের নাম অমুক এবং অমুক, অতএব তারা ‘ভালো ছবি’-র কান্ডারী। সেই সময়ে ‘সুস্থ সিনেমা’ বলে একটি শব্দবন্ধের বেশ প্রচলণ ছিল। প্রথমত, এই বেসিক প্রেমিসটাই গোলমেলে যে কেউ একটা ছবি করবেন ঠিক করলেই সেটা ভালো ছবি হয়ে যায়। ছবি ভালো হতে পারে কেবল তার মুক্তির পর তার মূল্যায়ণের পর। দ্বিতীয়ত, সেই সময়ে সংকটটা ছিল শহুরে মধ্যবিত্তের নিজের ছবির, কারণ মূলধারায় তখন যে সিনেমাটিক কল্পনা বিস্তৃত হচ্ছে তা মধ্যবিত্ত ও শহুরেদের উদ্দেশ্যে তৈরীই হত না। তৃতীয়ত, ধরেই নেওয়া হত যে তথাকথিত ‘ভালো’, ‘সুস্থ’, ‘সাংস্কৃতিক’ ভদ্রলোকের আর্ট সিনেমার যেন কোনো অন্তর্গত ক্রাইসিসই নেই যা আলোচ্য, ক্রাইসিসের কারণ শুধুই সফল মূলধারার ছবি, যা অন্তত ইন্ডাস্ট্রির শ্রমিক-কর্মীদের রুটি-রুজির ব্যবস্থা সুগম করছে তখন।

আজ যখন মাল্টিপ্লেক্সে-মাল্টিপ্লেক্সে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা ছবি শুধুই মধ্যবিত্তকে উদ্দেশ্য করে তখন কি সেই সেই সংকটের সমাধান হয়ে গেছে, যা সেইসব সেমিনারে আলোচিত হত? এখন কি দেবের ছবি, রাজ চক্রবর্তীর ছবি অপর্ণা সেন বা সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবির সামনে আর বাধা? তা বলি কি করে যখন দেবই এদের ছবির নায়ক? অতএব এনারা আর সেই যুক্তিতে ভাবেন না। এতে প্রমাণ হয় যে নব্বইয়ের সেই সংকটবোধের ভিত্তিতেই ভুল ছিল। ক্রাইসিস ছিল ভদ্রলোকের সিনেমার ভিতরেই, বা ভদ্রলোকের আত্মপরিচিতির ঐতিহাসিকতাতেই।

সেভাবেই, এই প্রবন্ধের শেষে আমি বলতে চাই যে অধুনার বাংলা ছবির কোনো নিজস্ব বা অন্তর্গত ক্রাইসিস এখানে আলোচ্য নয়, কারণ তা সিনেমার ভিতরে পাওয়া যাবে না। ক্রাইসিস আপামর সংস্কৃতির। বাংলা ছবি আমাকে তৃপ্ত করছে না, এই অভিযোগ বায়বীয়। বাংলা কবিতা কি কবিতার পাঠকদের তৃপ্ত করছে? উপন্যাসের কি কোনো দিগভ্রান্তি হচ্ছে? নাটকের কি কোনো সংকট আছে? বাংলা গান কি কোনো নির্দিষ্ট দিকে এগোচ্ছে যা তৃপ্তিদায়ক? সংকট বিভিন্ন মাধ্যমের উঠোনে সীমাবদ্ধ নয়, উত্তর সংস্কৃতির পাড়াতেই খুঁজতে হবে, বা বৃহত্তর রাজনৈতিক-সামাজিক পরিসরে – হয়তো আধুনিকতার সংকটে। আর মনে হয় প্রশ্নটি আরো জটিল কারণ আদপেই সংকট আছে বলে অনেকে মনেই করেন না।

বাংলা সিনেমার অর্থনৈতিক সংকট আছে – মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি হাউজের মোনোপলিই একটি সংকট। তার মধ্যে ভেঙ্কটেশ ফিল্মস যে সিংহভাগ গলাধঃকরণ করেছেন, এটা সংকট। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কলকাতা চলচ্চিত্রোৎসবের দায়িত্বে থাকাকালীন সেই ফেস্টিভালে ইন্ডাস্ট্রির দাপট একটি সংকট। একের পর এক ফিল্ম সোসাইটি শুকিয়ে যাওয়া সংকট না হলেও সিম্পটম। যে ভাষায় রাজনৈতিক ছবি হওয়া বন্ধ হয়ে গেছে সেই ভাষার ছবির ইন্ডাস্ট্রির সম্পূর্ণ পলিটিসাইজেশন, অর্থাৎ তৃণমূল পার্টি ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পায়ে সমর্পণ একটি সংকট। এই ইন্ডাস্ট্রির নিয়ামকরা যে অনেকেই পলিটিকাল পার্টির লোক, সেটা সংকট। যে হিন্দি ছবির কলকাতায় শুটিং হয়, তাদের কৃতজ্ঞতা স্বীকারের তালিকায় একই চেনা নাম ঘুরে ফিরে আসা – সংকট। এই ইন্ডাস্ট্রির পুরোধা ব্যক্তিত্বরা যে মনে করেন যে একটি নতুন বাংলা ছবির ধারা গঠনরত, অতএব তার সমালোচনা করা অনুচিত – সেটা সংকট। ইন্ডাস্ট্রির গিল্ড যেভাবে তাদের শর্তাধীন না থাকলে একটি ছবির ডিসট্রিবিউশন ও মুক্তি আটকে দিতে পারে – সেটা সংকট। ইন্ডাস্ট্রিতে নবাগত কর্মী ও কুশলীদের ঠিকমত পারিশ্রমিক না দেওয়া, সম্পূর্ণ প্রোডাক্টিভিটি-বিরোধী ওয়ার্ক-কালচার, শুধুই প্রফেশনালিজমের অভাব নয়, প্রফেশনালিজম-বিরোধীতা সংকট। নায়ক-নায়িকারা বাংলা বলতে পারেন না, পরিচালকরা পাবলিক-রিলেশন ও ম্যান-ম্যানেজমেন্টে বেশি ব্যস্ত থাকেন পরিচালনার চাইতে, তার বর্তমান ছবি যেনতেন প্রকারেণ শেষ হোক আগামীতে শিওর ফাটিয়ে দেবেন নিজেকে ও সবাইকে দেওয়া এই প্রতিশ্রুতি, একের পর এক ছবি উতরোচ্ছে – অর্থাৎ তৈরী হচ্ছে – কর্মক্ষম ও নির্ভরশীল টেকনিশিয়ান ও প্রোডাকশন ম্যানেজারের জন্য – এইগুলি সমস্যা; কিন্তু উপরোক্তগুলি সংকট।

আমার মনে হয়, আমরা যে সিনেমা চাই, সেই সিনেমার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে এই প্রত্যয়ে যে আমাদের ভাষায় একটি ভুল যুগ্মপদ আছে – ‘শিল্প-সংস্কৃতি’, ইংরেজি করে বললে ‘আর্ট-অ্যান্ড-কালচার’। সেই যুগ্মপদের আয়ু ফুরিয়ে গিয়েছে। ‘সংস্কৃতি’ একটি কনসেন্সুয়াল ব্যবস্থা, সংজ্ঞায়িত ও সীমাবদ্ধ, সংখ্যাগুরুর দ্বারা ঐক্যমতে স্থিরীকৃত – অর্থাৎ যেখানে এইটা নির্ধারিত হয় যে কি সাংস্কৃতিক আর কি নয়, কি অনুমোদিত আর কি নয়। ‘শিল্প’ হয়তো এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধেই যাওয়ারই পন্থা, অভিব্যক্তি ও অনুধাবনের মুক্তির খাতিরে। সংস্কৃতি চেনা পথে আলো ফেলে হাঁটে, শিল্প অন্ধকারে পা ফেলে। সংস্কৃতি সাফল্যের খতিয়ান কারণ যা সফল তাই সাংস্কৃতিক, শিল্প ব্যর্থ হতে ভয় পায়না। কিউয়ের ‘তাসের দেশ’ কি সাংস্কৃতিক বাংলা ছবি? যে কারণে বিদ্দ্বজন ছবিটিকে রবীন্দ্রনাথের অসফল অবলম্বণ বলবেন, আমরা কি বলতে পারি যে সেই ভুলের রিস্ক নিয়েছিল বলেই ছবিটিতে শৈল্পিক সম্ভাবনা আছে? শিল্প সম্ভাবনার, সাফল্যের নয়। শিল্প প্রশ্ন তোলার উপায়, সংস্কৃতি উত্তরের পূনরুক্তির নিদর্শন। শিল্প সমস্যার সাথে চোখাচুখি মোলাকাত, সংস্কৃতি সমাধানের আশ্বাস। বাংলা ছবিতে শিল্প দীর্ঘদিন নেই কারণ তা সম্পূর্ণভাবে সাংস্কৃতিক হয়ে গেছে, সে সংস্কৃতি ভদ্রলোকের’ও হতে পারে, মধ্যবিত্তের’ও হতে পারে, কনজ্যুমারিস্ট সংস্কৃতিও হতে পারে, আমলাতান্ত্রিক’ও হতে পারে, প্রাদেশিক বা জাতীয়তাবাদীও হতে পারে। যে ‘শিল্প-ছবি’ – আমি আর্ট-ফিল্মের ঝটিতি অনুবাদ করলাম – সংস্কৃতিতে অন্তর্গত হতে চায়, বা যার শরীরে সাংস্কৃতিক কোনো ‘অযোগ্যতা’ নেই তা হয়তো শিল্প হতে পারেনা।

প্রসঙ্গত, আমি এই প্রবন্ধে শিল্প হিসেবে বাংলা সিনেমার কোনো আলোচনাই আমি করিনি, সংস্কৃতি হিসেবে বাংলা ছবির আলোচনা করেছি মাত্র। সবচেয়ে বড় সংকট এই যে আমরা – যারা সিনেমায় শিল্প চাই – আমরাই কেউ জানিনা আমরা কোন বাংলা ছবিকে চাই। বাঙালির কোনো অভীষ্ট সিনেমাটিক নেই, তার সিনেমাটিক চল্লিশ বছর আগে তোলা হয়ে গেছে, তার সিনেমাটিকের জন্য পিছনে ফিরে তাকাতে হয়, আগামীর বিমূর্ততাকে সে শব্দে ও চিত্রে মূর্ত করতে ভুলে গেছে – এটা একটা ভাষাগোষ্ঠীর ক্রাইসিস কিনা তা পাঠকের বিবেচ্য।



এই প্রবন্ধটি ২০১৬-য় ‘অনীক’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।


Avatar: ঈশান

Re: বাংলা ছবির সম্ভাব্য সংকট: সমসাময়িক সিনেমা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

অনিন্দ্য সেনগুপ্তর প্রায় কোনো লেখার সঙ্গেই আমি একমত হই না। কিন্তু এটার সঙ্গে বহুলাংশে সহমত। আলোচনা হোক।
Avatar: ?

Re: বাংলা ছবির সম্ভাব্য সংকট: সমসাময়িক সিনেমা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল কারণেই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি মহানগরে গড়ে ওঠে, অনেকক্ষেত্রেই বন্দরের কাছাকাছি মহানগরে (ব্যতিক্রম শুধু হলিউড);

মানে? হলিউড তো এলএতে, মহানগর ও বন্দর দুটোই
Avatar: Anindya Sengupta

Re: বাংলা ছবির সম্ভাব্য সংকট: সমসাময়িক সিনেমা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

হলিউডের পত্তনের সময়ের কথা বলছি। ইন্ডাস্ট্রি আগে ছিল ইস্ট কোস্টে, ওয়েস্ট কোস্টে থাকারও মানে হয়না - কারণ ইস্ট কোস্টে সুবিধা বেশি। অতটা দূরে চলে যাওয়ার কারণ মূলত সস্তা জমি, সস্তা শ্রম ও দিনের অনেকটা সময় আলোর মাপ এক থাকা।
এই দুটো লিংক দ্যাখা যেতে পারে -
http://www.legendsofamerica.com/ca-hollywood.html
http://www.u-s-history.com/pages/h3871.html
Avatar: কল্লোল

Re: বাংলা ছবির সম্ভাব্য সংকট: সমসাময়িক সিনেমা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

খুব ভলো লেখা। এই প্রসঙ্গে আমার বারবার মনে হয় "পূর্ণ দৈর্ঘের" ফিল্ম বানাতে যা খরচ(বাকিটা ব্যক্তিগত-র খরচ শুনেছি ১০লাখ - যা ভয়ানক কম) তাতে ভলো ফিল্মকে লড়তে হবে স্বল্প দৈর্ঘের ফিল্ম দিয়ে, যা বাঙ্গলা ফিল্মে অন্য পরিসর তৈরী করবে - ডিস্ট্রিবিউটার, প্রোডিউসার, হল মালিক, সেন্সারের খপ্পরের বাইরে।
Avatar: কল্লোল

Re: বাংলা ছবির সম্ভাব্য সংকট: সমসাময়িক সিনেমা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

খুব ভলো লেখা। এই প্রসঙ্গে আমার বারবার মনে হয় "পূর্ণ দৈর্ঘের" ফিল্ম বানাতে যা খরচ(বাকিটা ব্যক্তিগত-র খরচ শুনেছি ১০লাখ - যা ভয়ানক কম) তাতে ভলো ফিল্মকে লড়তে হবে স্বল্প দৈর্ঘের ফিল্ম দিয়ে, যা বাঙ্গলা ফিল্মে অন্য পরিসর তৈরী করবে - ডিস্ট্রিবিউটার, প্রোডিউসার, হল মালিক, সেন্সারের খপ্পরের বাইরে।
Avatar: শঙ্খ

Re: বাংলা ছবির সম্ভাব্য সংকট: সমসাময়িক সিনেমা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

দরকারি লেখা।
আমি হালাফিলের একটা সিনেমা দেখলাম, মৈনাক ভৌমিকের বিবাহ ডায়েরিজ, ভালোই লাগল। হলে প্রচুর লোকও হয়েছিল (নজরুল তীর্থ). ঋত্বিক সোহিনীর তুখোড় অভিনয়, ইনফ্যাক্ট ওদের নাম দেখেই গেছলাম। বাংলা সিনেমার এই দক্ষিণী রাজ চক্কত্তি, গিমিকি সৃজিত মুখুজ্যে আর এলোপাথাড়ি ও পুষ্টিগুণে দুর্বল ব্যোমকেশ ফেলুদা কিরীটি শবর ছাতার মাথার বাইরেও বাংলা সিনেমায় অন্য ফ্লেভার পাওয়া যাচ্ছে, তাতে এখনো আশা জাগে।
Avatar: bip

Re: বাংলা ছবির সম্ভাব্য সংকট: সমসাময়িক সিনেমা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

ইদানিং কালে যত বাংলা সিনেমা দেখি-প্রায় সবটাই কোলকাতা কেন্দ্রিক। অথচ শরদিন্দুর বোমকেশ ও মফঃশহরে যেত। এখনকার বাংলা সিনেমা গুলো দেখলে কোলকাতার সাথে বাকী বাংলার যে দূরত্ব আবহমানকাল ধরে ছিল, সেটাই আরো বেশী করে দেখতেই পাই।

বাংলা সিনেমাতে গ্রাম বাংলা, মফঃশহর বাংলা সম্পূর্ন উপেক্ষিত। বাংলা সংস্কৃতিতেও হয়ত তাই।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন