বিপ্লব রহমান RSS feed

বিপ্লব রহমানের ভাবনার জগৎ

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • বাৎসরিক লটারী
    মূল গল্প – শার্লি জ্যাকসনভাবানুবাদ- ঋতম ঘোষাল "Absurdity is what I like most in life, and there's humor in struggling in ignorance. If you saw a man repeatedly running into a wall until he was a bloody pulp, after a while it would make you laugh because ...
  • যৎকিঞ্চিত ...(পর্ব ভুলে গেছি)
    নিজের সঙ্গীত প্রতিভা নিয়ে আমার কোনোকালেই সংশয় ছিলনা। বাথরুম থেকে ক্যান্টিন, সর্বত্রই আমার রাসভনন্দিত কন্ঠের অবাধ বিচরণ ছিল।প্রখর আত্মবিশ্বাসে মৌলিক সুরে আমি রবীন্দ্রসংগীত গাইতুম।তবে যেদিন ইউনিভার্সিটি ক্যান্টিনে বেনারস থেকে আগত আমার সহপাঠীটি আমার গানের ...
  • রেজারেকশান
    রেজারেকশানসরিৎ চট্টোপাধ্যায় / অণুগল্পব্যাঙ্গালুরু এয়ারপোর্টে বাসু এতক্ষণ একা একা বসে অনেককিছুই ভাবছিল। আজ লেনিনের জন্মদিন। একটা সময় ছিল ওঁর নাম শুনলেও উত্তেজনায় গায়ে কাঁটা দিত। আজ অবশ্য চারদিকে শোনা যায় কত লক্ষ মানুষের নাকি নির্মম মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিলেন ...
  • মন্টু অমিতাভ সরকার
    পর্ব-১মন্টু ছুটছিল।যেভাবে সাধারণ মানুষ বাস ধরার জন্যে ছোটে তেমনটা নয়।মন্টু ছুটছিল।যেভাবে ফাস্ট বোলার নিমেষে ছুটে আসে সামনে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিপক্ষের পেছনের তিনটে উইকেটকে ফেলে দিতে তেমনটা নয়।মন্টু ছুটছিল।যেভাবে সাইকেল চালানো মেয়েটার হাতে প্রথম ...
  • আমিঃ গুরমেহর কৌর
    দিল্লি ইউনিভার্সিটির শান্তিকামী ছাত্রী গুরমেহর কৌরের ওপর কুৎসিত অনলাইন আক্রমণ চালিয়েছিল বিজেপি এবং এবিভিপির পয়সা দিয়ে পোষা ট্রোলের দল। উপর্যুপরি আঘাতের অভিঘাত সইতে না পেরে গুরমেহর চলে গিয়েছিল সবার চোখের আড়ালে, কিছুদিনের জন্য। আস্তে আস্তে সে স্বাভাবিক ...
  • মৌলবাদের গ্রাসে বাংলাদেশ
    বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার হেফাজতে ইসলামের একের পর এক মৌলবাদি দাবীর সামনে ক্রমাগত আত্মসমর্পণ করছেন। গোটা উপমহাদেশ জুড়ে ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ক শুধু তীব্রই হচ্ছে না, তা সংখ্যাগুরু আধিপত্যর দিকে এক বিপজ্জনক বাঁক নিচ্ছে। ভারতে মোদি সরকারের রাষ্ট্র সমর্থিত ...
  • নববর্ষ কথা
    খ্রিস্টীয় ৬২২ সালে হজরত মহম্মদ মক্কা থেকে ইয়াথ্রিব বা মদিনায় যান। সেই বছর থেকে শুরু হয় ইসলামিক বর্ষপঞ্জী ‘হিজরি’। হিজরি সন ৯৬৩ থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু করেন মুঘল সম্রাট আকবর। হিজরি ৯৬৩-র মহরম মাসকে ৯৬৩ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাস ধরে শুরু হয় ‘ তারিখ ই ইলাহি’, যে ...
  • পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা কেমন আছেন ?
    মুসলিমদের কাজকর্মের চালচিত্রপশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের অবস্থা শীর্ষক যে খসড়া রিপোর্টটি ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তাতে আমরা দেখেছি মুসলিম জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে গরিষ্ঠ অংশটি, গোটা জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক দিন মজুর হিসেবে জীবিকা অর্জন করতে বাধ্য হন। ৪৭.০৪ শতাংশ মানুষ ...
  • ধর্মনিরপেক্ষতাঃ তোষণের রাজনীতি?
    না, অরাজনৈতিক বলে কিছু হয় না। নিরপেক্ষ বলে কিছু হয় না। পক্ষ নিতে হবে বললে একটু কেমন কেমন শোনাচ্ছে – এ মা ছি ছি? তাহলে ওর একটা ভদ্র নাম দিন – বলুন অবস্থান। এবারে একটু ভালো লাগছে তো? তাহলে অবস্থান নিতেই হবে কেন, সেই বিষয়ে আলোচনায় আসি।মানুষ হিসাবে আমার ...
  • শত্রু যুদ্ধে জয়লাভ করলেও লড়তে হবে
    মালদা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে পুকুরিয়া থানার অন্তগর্ত গোবরজনা এলাকায় অবস্থিত গোবরজনার প্রাচীন কালী মন্দির। অষ্টাদশ শতকে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির বিরুদ্ধে লড়বার সময়ে এক রাতে ভবানী পাঠক এবং দেবী চৌধুরাণী কালিন্দ্রী নদী দিয়ে নৌকা করে ডাকাতি করতে ...

কারফিউ

বিপ্লব রহমান

[এক-এগারোর (২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি) পর সেনা সমর্থিত অস্বাভাবিক তত্ত্ববধায়ক সরকার সারাদেশে বিক্ষোভ দমনে কারফিউ জারি করেছিল। এর দমন-পীড়নের শিকার হতে হয়েছিল সাংবাদিক, শিক্ষক, ছাত্র, দিনমজুরসহ সাধারণ জনতাকে। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে সে সময়ের একটি ব্লগ নোট। লেখাটি এখনো প্রাসঙ্গিক]

এক.
বুধবার রাত সাড়ে ৮ টা। কারফিউ শুরু হয়েছে মাত্র। ধানমণ্ডির ২৭ নম্বর রোডে আমার (সে সময়ের) কর্মস্থল বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম অফিসের সামনে দুজন সহকর্মি পারভেজ ও লেনিন দাঁড়িয়ে দেখছিলেন কারফিউ পরিস্থিতি। যেহেতু প্রেসনোটে বলা হয়েছিলো, আইডি কার্ডই কারফিউ পাস হিসেবে চলবে, তাই সন্ধ্যার মধ্যেই সবার গলায় আইডি কার্ড ঝোলানো হয়েছে।

তো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেনা বাহিনীর দুটি জিপ অফিসের সামনে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে। লাফিয়ে নামে পাঁচ -- সাত জন সেনা। লেনিন আইডি কার্ড উঁচিয়ে ধরে শুধু বলতে পেরেছিলেন, বিডিনিউজ।...ওরা বলে, সো হোয়ট! এরপরই শুরু হয়, রাইফেলের বাট দিয়ে এলোপাতাড়ি মারপিট।

আমি তখন মিরপুর - কলেজগেটের সর্বশেষ আপডেট নিউজ লিখতে ব্যস্ত। আগের দিনের নাইট ডিউটি, বুধবার দিনভর মিরপুর বাংলা কলেজ আর আগারগাঁওয়ের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র -- জনতার সহিংস বিক্ষোভের স্পট কাভারের ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসতে চায়। যে টাইপ স্পিড নিয়ে মনে মনে আমার অহংকার, সেই স্পিড স্লথ থেকে স্লথতর হয়ে আসে।...

একজন অফিস পিয়ন দৌড়ে এসে নিউজ রুমে পরভেজ - লেনিনকে মারপিটের খবর জানায়। সবাই কাজ ফেলে নীচে দৌড় দেই পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে। লিফট ওপরে উঠতে দেরী দেখে আমি সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামতে থাকি। দোতলা পর্যন্ত নামতেই দেখি লেনিন সিঁড়িতে বসে কোঁকাচ্ছেন। তাকে পরিচর্যা করছেন আরেক সহকর্মি। আমি জিজ্ঞাসা করি, পারভেজ কোথায়? লেনিন, মাথা নেড়ে জানান, তিনি জানেন না।

নীচে নেমে পারভেজকে না পেয়ে আবার সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে ওপরে উঠি। আফিসের ফ্লোরে পৌঁছে দেখি লিফটের দরজা খোলা। পারভেজের মোটা আর ভাড়ি শরীর ঘামে ভিজে একাকার, মুখ হা করেও শ্বাস নিতে পারছেন না। ওর হাত ধরে টেনে লিফট থেকে নামাতে চাই, পারি না। আমাকে সাহায্য করেন আরো দুজন সহকর্মি।

ধরাধরি করে পারভেজকে ফ্রন্ট ডেস্কের সোফায় বসানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক তানভিকে কাছে পেয়ে বলি, আপু দৌঁড়ে একটু পানি নিয়ে এসে ওকে খাওয়ান তো। বুঝতে পারি, বিশ্রাম নিলে পারভেজ সুস্থ হয়ে উঠবেন।

সময় নষ্ট না করে আমি স্বার্থপরের মতো আমার নিউজের আপটেড লেখায় মন দিতে চেষ্টা করি। ... এর মধ্যে পারভেজ - লেনিনকে সেনা - অত্যাচারে বিষয়েও একটি ছোট্ট নিউজ তৈরি করা হয়।

দুই.
প্রেস নোটের বয়ান অনুযায়ী, সাংবাদিকদের কারফিউ পাসের বদলে আইডি কার্ডই যথেষ্ট -- এই নিয়ে অফিসের সাংবাদিকরা বিভ্রান্তিতে পড়েন। পারভেজ - লেনিন অত্যাচারিত হওয়ার ঘটনাকে অনেকে বলেন, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সেনা নওজোয়নরা হয়তো অতি উৎসাহী হয়ে এই কাজ করেছেন।

তারপরেও পাসের বিষয়টি নিশ্চিত হতে অফিসের পিএবিএক্সের টেলিফোনগুলো ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সন্ধ্যা ৭ টা থেকেই সবগুলো মোবাইল টেলিফোন অচল করে দেওয়া হয়েছে। শুধু সিটিসেল থেকে সিটিসেলে ফোন করা যাচ্ছে। তাও নেটওয়ার্ক সব সময় কাজ করছে না।

আমি নিজেই পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করে ডিউটি অফিসারের সঙ্গে কথা বলি। তিনি জানান, এখনো তারা কোনো কারফিউ পাস ইস্যু করছেন না। আমি বিষয়টি অফিসের বসদের জানাই। তখন সকলে বলেন, ইলেভেন/ ওয়ানের সময়ও সাংবাদিকদের পাস প্রয়োজন হয়নি। এবারো প্রয়োজন হবে না। তাছাড়া প্রেসনোটে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আছেই।

তিন.
এইসব বৃত্তান্তের পর রাত ৯ টারদিকে আমি ও আমার আরো দুই সহকর্মি লিটন ও রম্যভাইসহ অফিসের সিএনজি চালিত বেবি ট্যাক্সিতে বাসার উদ্দ্যেশে রওনা দেই। আমাদের তিনজনের বাসাই মোহাম্মাদপুরে। এর আগে নিশ্চিত হই, সবাই আইডি কার্ড আর বেবী টেক্সির সামনে সংবাদপত্রের লাল ব্যানারটি সম্পর্কে। বেবি ট্যাক্সি চালককে বার বার বুঝিয়ে বলা হয়, কেউ থামার সিগনাল দিয়ে যেনো সঙ্গে সঙ্গে থামে; তার গতি যেনো থাকে মন্থর।

শুনশান নিরবতার ভেতর বেবী টেক্সি শঙ্কর বাস স্যান্ড মোড়ে পৌঁছাতেই অন্ধকারে ঘাপটি মেরে থাকা সেনা বাহিনীর তিনটি সবুজ রঙের খোলা জিপ সচল হয়। হেড লাইটের তীব্র আরো ফেলে দ্রুত গতিতে গাড়িগুলো ঘিলো ফেলে আমাদের ছোট্ট যানটিকে। সৈনিকেরা বন্দুক উঁচিয়ে তেড়ে আসে, শার্টের কলার চেপে টেঁনে হিঁচড়ে নামায় আমাদেরকে।

সেই সাথে চিৎকার চলতে থাকে, থাম! ধর শালাদের! শুয়রের বাচ্চারা কই যাস!
দলপতি এক তরুন ক্যাপ্টেন, লোহার শিরস্ত্রানের নীচে তার গোল্ড রিমের চশমাটিতে ল্যাম্পপোস্টের আলো ঠিকরে পড়ে। তার পোষাকে নেমব্যাজ নেই।

আমি গলায় ঝোলানো আইডি কার্ড উঁচিয়ে বলি, সাংবাদিক। প্লিজ!...
ক্যাপ্টেন ধমক দিয়ে বলেন, প্লিজ কি? প্লিজ মানে?
আমি বলি, প্লিজ মানে হচ্ছে, আপনার সোলজারদের গায়ে হাত দিতে না করুন। আমরা সাংবাদিক।
কারফিউ পাস আছে?
নেই। প্রেসনোটে বলা হয়েছে, আইডি কার্ডই যথেষ্ট। পাস লাগবে না।
আমরা প্রেসনোট পাইনি। আপনারা গাড়িতে উঠুন!

তার ইশারায় সৈনিকেরা শার্টের কলার ধরে আমাদের টেনে হিঁচড়ে পিক আপে তোলে। এরমধ্যে অন্যান্য সেনারা পথচারি কয়েকজন দিনমজুরকে রাইফেলের বাট আর গজারি কাঠের লাঠি দিয়ে মারতে মারতে জিপগুলোতে তোলে। গাড়িতে উঠতে একটু দেরি করলেই আবারো মারধোর, বুটের লাথি।

গাড়ির বহর এগিয়ে চলে মোহাম্মাদপুর শাররীক শিক্ষা কলেজের সেনা ক্যাম্পের দিকে। আমার মনে পড়ে যায়, এখানেই পাকিস্তানী সৈন্য আর তাদের সহযোগি আলবদর, আল শামস, রাজাকাররা ১৯৭১ এ জল্লাদখানা বানিয়েছিলো!

চার.
সামান্য এগুতেই গাড়ি থেকে সিগনাল দেওয়া হয় এক মটর সাইকেল আরোহীকে থামার জন্য। সে আবার সিগনাল না বুঝে এগুতে চেষ্টা করলেই জিপ নিয়ে তাকে ধাওয়া করে ধরে ফেলা হয়। ঝুপঝাপ করে লাফিয়ে নামে সেনারা।

আমাদের পাহারায় থাকে একটি দল। আর বাদবাকীরা দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে মটর সাইকেল আরোহীকে ঘিরে ধরে। এক দল রাইফেল দিয়ে তার মটর সাইকেল ভাঙতে থাকে। আর আরেকদল রাস্তায় ফেলে রাইফেলের বাট, গজারির লাঠি ও বুটের লাথিতে আঘাতের পর আঘাত করতে থাকে আরোহীকে।

বয়স্ক মতোন সেই লোকটি তার আইডি কার্ড দেখানোর সুযোগও পাননি। তিনি শুধু অমানুষিক চিৎকারে বলতে থাকেন, আমাকে মারবেন না! সাংবাদিক! সাংবাদিক!

রাতের নিরবতার ভেতর তাঁর আর্তনাদ, মাংস থেতলানোর ধুপধাপ ভোঁতা শব্দ আর সৈনিকদের উন্মত্ততা ছাড়া পৃথিবীতে যেনো সমস্ত দৃশ্য থমকে সিনেমার স্লাইডের মতো আটকে গেছে। মূহুর্তের মধ্যে সেই সাংবাদিক পরিনত হন একটি থেঁতলানো মাংস পিন্ডে। তাকে কোথায় যেনো চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাওয়া হয়। বাতিল লোহা লক্করে পরিনত হওয়া তার মটর সাইকেলটিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়ার কসরত করেন কয়েকজন। আর পুরো অপারেশনটি এক পাশে দাঁড়িয়ে তদারকি করেন গোল্ডরিম ক্যাপ্টেন।

এক সময় তিনি বলেন, সাংবাদিক তিনজন নেমে আসুন। আমাদের মেজর স্যার আসছেন।
অনামিকা কালো মতো মেজরটিকে মনে হলো খানিকটা টেন্স ও ক্লান্ত। তিনি সব শুনে বলেন, দেখেছেন তো সাংবাদিকের পরিনতি। আপনাদের তো সে তুলনায় কিছুই করা হয়নি।

হঠাৎ আমার কাঁধের ব্যাগটিকে দেখে মেজর বলেন, সঙ্গে ক্যামেরা আছে না কি? ছবি তোলেননি তো?
আমি তাকে নিশ্চিত করি, ব্যাগে জরুরি কিছু কাগজপত্র - কলম ছাড়া আর কিছুই নেই। মেজর আদেশ করেন সবাইকে মোহাম্মাদপুর থানায় নিয়ে যেতে।

আমরা নিজেরা ফিসফিসিয়ে বলা বলি করতে থাকি, যাক। থানায় নিলে অন্তত মারধোর করবে না। সেনা ক্যাম্পে নিলে তো হাড়গোড় ভাঙার বিষয়টি নিশ্চিত ছিলো!

মোহাম্মাদপুর থানায় দেখা মেলে আরো কয়েকজন বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীর সঙ্গে। এরমধ্যে বৈশাখী টেলিভিশনের হেড অব দা নিউজ আনিস আলমগীর ভাইয়ের অবস্থা বেশ করুন। সৈন্যরা তাকে চেলা কাঠ দিয়ে দুই পায়ে ইচ্ছে মতো পিটিয়েছে। তার মোটা জিন্সের প্যান্ট এখানে - সেখানে ছেঁড়া। থানার ওসি তাকে কয়েকটি প্যারাসিটামল দিয়েছেন। সেগুলো হাতে নিয়ে আনিস ভাই বসে আছেন, পেট খালি বলে অষুধ গিলতে সাহস পাচ্ছেন না।

কারফিউ পাসের অভাবে আরো সাংবাদিকের দল ধরা পড়তে থাকে। এক সময় ওসির কক্ষটিতে আর স্থান সংকুলান না হওয়ায় আমাদের দুই গ্র“পে ভাগ করে পাশের সেকেন্ড অফিসারের রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি ল্যান্ড ফোন পেয়ে আমি প্রথমেই ফোনটি দখল করে আমার অফিসে চিফ রিপোর্টারকে ফোন করে সংক্ষেপে পুরো ঘটনা বলি। তাকে বলি, এখুনি এ বিষয়ে বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমে নিউজ করতে। একটু পরেই ওই কক্ষের ছোট্ট একটি টেলিভিশনে দেখি, আমাদের আটক, মারপিট ও হয়রানী করার খবরটি দু

- তিনটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচার হচ্ছে। বুঝতে পারি, আমার টেলিফোনে কাজ হয়েছে।
অবস্থা বেগতিক দেখে সেকেন্ড অফিসার টেলিফোনটির তার খুলে সেটটি তার ড্রয়ারে তালাবদ্ধ করে রাখেন। তার কাছেই শুনতে পাই, রাস্তায় যাকে সেনারা তুলোধুনো করেছে, তিনি একটি সাপ্তাহিকের সাংবাদিক। তাকে গুরুতর অবস্থায় ভর্তি করা হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তার বাইকটি জমা আছে থানায়।
সেকেন্ড অফিসার নিজের অসাহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, ভাই, আপনাদের জন্য ওসি সাহেব ডিসি - এসপিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু তারা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।

পাঁচ.
রাত সাড়ে ১০ টার দিকে জনা ত্রিশেক সাংবাদকর্মীর নাম ধাম রেজিস্টার খাতায় লেখা হয়। সেই মেজর আর ক্যাপ্টেন থানায় এসে ওসিকে ধমকে বলেন, এরা সবাই আপনার রুমে কেনো? এরা কি আপনার গেস্ট না আসামী? যদি আসামী হয়, তাহলে এক্ষুনি এদের ঘাড় ধরে লক আপে ঠোকান! স্যার, স্যার বলা ছাড়া ওসির কোনো গত্যান্তর থাকে না। একে একে নাম ধরে ধরে সবাইকে লক আপে ঢোকানো হয়।

ঘুপচি লক আপে ঘুমোট গরম আর ঘামের দুর্গন্ধে বমি আসতে চায়। এরই মধ্যে পরিচিত সব সাংবাদিক হিসেব করে ফেলেন, কার কাছে কয়টি সিগারেট আছে। কারণ সারা রাতের ব্যাপার। কারফিউ বলে দোকান পাট বন্ধ; পুলিশকে টাকা দিয়ে সিগারেটও আনা যাবে না। আমরা সিদ্ধান্ত নেই যদি কেউ একটি সিগারেট ধরায়, তাহলে তা একা খাওয়া যাবে না, অন্য একজনের সঙ্গে শেয়ার করতে হবে; ব্রান্ড কোনো বিষয় নয়।
ইরাক যুদ্ধ কাভার করা সাংবাদিক আনিস ভাই, সকলকে অভয় দিয়ে বলেন, জেল খাটার একটা অভিজ্ঞতা বাকি ছিলো, সেটাও হতে যাচ্ছে। কি বলেন সবাই! সকলে হইচই করে তার কথায় সমর্থন দেই। রম্য ভাই গান গাওয়ার চেষ্টা করেন, আমি বন্দি কারাগারে।...

রাত ১২ টার দিকে একজন এসআই এসে খবর দেন, সুখবর আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের ছেড়ে দেওয়া হবে!

আরো কয়েক মিনিট পর একে একে নাম ধরে ডেকে, আইডি কার্ড মিলিয়ে সেনা কর্তারা আমাদের ছাড়তে শুরু করেন। আমরা মোহাম্মাদপুর গামি তিন সাংবাদিক বাসার পথ ধরি। রম্য ভাইয়ের বাসায় ল্যান্ড ফোন আছে। সিদ্ধান্ত হয়, তিনি বাসায় পৌঁছে অফিসে টেলিফোন করে আমাদের মুক্ত হওয়ার খবরটি পৌছে দেবেন।

*পুনশ্চ: সাংবাদিকদের আটক ও হয়রানীর বিষয়ে নিন্দা ও প্রতিবাদ করে যেসব সহব্লগার পোস্ট দিয়েছেন, মন্তব্য করেছেন, এই লেখার মাধ্যমে তাদের সকলের কাছে জানাচ্ছি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ।
২৪ আগস্ট ২০০৭, ঢাকা।
---
আরো দেখুন: http://biplobcht.blogspot.com/2007/08/blog-post_24.html



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন