শিবাংশু RSS feed

শিবাংশু দে-এর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • মসলিন চাষী
    ঘুমালে আমি হয়ে যাই মসলিন চাষী, বিষয়টা আপনাদের কাছে হয়ত বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে না, কিন্তু তা সত্য এবং এক অতি অদ্ভুত ব্যবস্থার মধ্যে আমি পড়ে গেছি ও এর থেকে নিস্তারের উপায় কী তা আমার জানা নেই; কিন্তু শেষপর্যন্ত আমি লিখে যাচ্ছি, যা থাকে কপালে, যখন আর কিছু করা ...
  • সিরিয়ালচরিতমানস
    ‘একটি বনেদি বাড়ির বৈঠকখানা। পাত্রপক্ষ ঘটকের সূত্রে এসেছে সেই বাড়ির মেয়েকে দেখতে। মেয়েকে আনা হল। বংশপরম্পরা ইত্যাদি নিয়ে কিছু অবান্তর কথপোকথনের পর ছেলেটি চাইল মেয়ের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলতে। যেই না বলা, অমনি মেয়ের দাদার মেজাজ সপ্তমে। ছুটে গিয়ে বন্দুক এনে ...
  • দেশ এবং জাতীয়তাবাদ
    স্পিলবার্গের 'মিউনিখ' সিনেমায় এরিক বানা'র জার্মান রেড আর্মি ফ্যাকশনের সদস্যের (যে আসলে মোসাদ এজেন্টে) চরিত্রের কাছে পিএলও'র সদস্য আলি ঘোষনা করে - 'তোমরা ইউরোপিয়ান লালরা বুঝবে না। ইটিএ, আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস, আইরিশ রিপাব্লিকান আর্মি, আমরা - আমরা সবাই ...
  • টস
    আমাদের মেয়েবেলায় অভিজ্ঞান মেনে কোন মোলায়েম ডাঁটির গোলাপ ফুল ছিলনা যার পরিসংখ্যান না-মানা পাঁচটাকা সাইজের পাপড়িগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে সিরিয়ালের আটার খনি আর গ্লিসারিনের একটা ইনডাইরেক্ট প্রোপরশন মুখে নিয়ে টেনশনের আইডিয়ালিজম ফর্মুলায় ফেলবো - "He loves me, he loves ...
  • সান্ধ্যসংলাপ: ফিরে দেখার অজ্যামিতিক রুপরেখা
    গত রবিবার সন্ধ্যেবেলা সাগ্নিক মূখার্জী 'প্ররোচিত' 'সাত তলা বাড়ি'-র 'সান্ধ্যসংলাপ' প্রযোজনাটি দেখতে গিয়ে একটা অদ্ভুত অনুভব এসে ধাক্কা দিল। নাটকটি নিয়ে খুব বেশি কিছু বলার নেই আলাদা করে আমার। দর্শকাসনে বসে থেকে মনের ভেতর স্মিতহাসি নিয়ে একটা নাটক দেখা শেষ ...
  • সান্ধ্যসংলাপ: ফিরে দেখার অজ্যামিতিক রুপরেখা
    গত রবিবার সন্ধ্যেবেলা সাগ্নিক মূখার্জী 'প্ররোচিত' 'সাত তলা বাড়ি'-র 'সান্ধ্যসংলাপ' প্রযোজনাটি দেখতে গিয়ে একটা অদ্ভুত অনুভব এসে ধাক্কা দিল। নাটকটি নিয়ে খুব বেশি কিছু বলার নেই আলাদা করে আমার। দর্শকাসনে বসে থেকে মনের ভেতর স্মিতহাসি নিয়ে একটা নাটক দেখা শেষ ...
  • গো-সংবাদ
    ঝাঁ চকচকে ক্যান্টিনে, বিফ কাবাবের স্বাদ জিভ ছেড়ে টাকরা ছুঁতেই, সেই দিনগুলো সামনে ফুটে উঠলো। পকেটে তখন রোজ বরাদ্দ খরচ ১৫ টাকা, তিন বেলা খাবার সঙ্গে বাসের ভাড়া। শহরের গন্ধ তখনও সেভাবে গায়ে জড়িয়ে যায় নি। রাস্তা আর ফুটপাতের প্রভেদ শিখছি। পকেটে ঠিকানার ...
  • ফুরসতনামা... (পর্ব ১)
    প্রথমেই স্বীকারোক্তি থাক যে ফুরসতনামা কথাটা আমার সৃষ্ট নয়। তারাপদ রায় তার একটা লেখার নাম দিয়েছিলেন ফুরসতনামা, আমি সেখান থেকে স্রেফ টুকেছি।আসলে ফুরসত পাচ্ছিলাম না বলেই অ্যাদ্দিন লিখে আপনাদের জ্বালাতন করা যাচ্ছিলনা। কপালজোরে খানিক ফুরসত মিলেছে, তাই লিখছি, ...
  • কাঁঠালবীচি বিচিত্রা
    ফেসবুকে সন্দীপন পণ্ডিতের মনোজ্ঞ পোস্ট পড়লাম - মনে পড়ে গেলো বাবার কথা, মনে পড়ে গেলো আমার শ্বশুর মশাইয়ের কথা। তাঁরা দুজনই ছিলেন কাঁঠালবীচির ভক্ত। পথের পাঁচালীর অপু হলে অবশ্য বলতো কাঁঠালবীচির প্রভু। তা প্রভু হোন আর ভক্তই হোন তাঁদের দুজনেরই মত ছিলো, ...
  • মহাগুণের গপ্পোঃ আমি যেটুকু জেনেছি
    মহাগুণ মডার্ণ নামক হাউসিং সোসাইটির একজন বাসিন্দা আমিও হতে পারতাম। দু হাজার দশ সালের শেষদিকে প্রথম যখন এই হাউসিংটির বিজ্ঞাপন কাগজে বেরোয়, দাম, লোকেশন ইত্যাদি বিবেচনা করে আমরাও এতে ইনভেস্ট করি, এবং একটি সাড়ে চোদ্দশো স্কোয়্যার ফুটের ফ্ল্যাট বুক করি। ...

ক্রমাগত মন্তাজ: ক্যামেরা ও এক প্রবীণ শিশু

শিবাংশু

দৃশ্য ১. একটি আট বছরের বালক প্রথম সিনেমা দেখতে গেছে। বাবার সাইকেলের সামনে বসে ফেরার সময় অসংখ্য প্রশ্ন করে যায় তারাপদকে নিয়ে। কেন সে ফিরে যায়। সে যায়ই বা কোথায়, ফেরেই বা কোথায়? বালক তখনও পথের পাঁচালি দেখেনি।
দৃশ্য ২. বাবা মা আলোচনা করছেন। সত্যজিৎ না তপন, কে দর্শককে বেশি কাছে টেনে নিতে পারেন। বালক বোঝেনা, কেন মা ক্ষুধিত পাষাণ আর ঝিন্দের বন্দীর জাদুর কাছে এতো নিবেদিত। তাঁরা কিছু আগে মহানগর দেখে এসে নীরবে মুগ্ধ হয়ে বসে আছেন। না, মহানগরকে নিয়ে কোনও প্রশ্ন নয়। কিন্তু মা বলেন, সত্যজিৎ দর্শককে একটু দূর থেকে ঘিরে থাকেন, তপন দর্শককে হাত ধরে নিয়ে যান ছবির অন্দরমহলে। বাবা নীরবে মাথা নাড়েন। বালক প্রশ্ন করে, 'বাবা কে বড়ো পরিচালক? সত্যজিৎ না তপন...'। বাবা একটু চুপ করে থেকে বলেন, দুজনেই বড়ো, খুব বড়ো।
দৃশ্য ৩. স্কুল কলেজে খিল/ রাস্তায় মিছিল/ ক্র্যাকারে কাঁপে রাজপথ/ কিনু গোয়ালার গলি/ হিরের টুকরো ছেলেরা সব/ অশ্বমেধের বলি/ ওরে মন/ পৃথিবীর গভীর গভীরতর / অসুখ এখন.... বালক ততোদিনে ক্লাস সেভেন এইটে উঠেছে। বন্ধুরা বলে একটা সিনেমা এসেছে। শমিত ভঞ্জ 'ছোনে'। ফাটিয়ে দিয়েছে।
দৃশ্য ৪. বালক ততোদিনে কলেজে। কিশোর হয়ে উঠেছে। বহু কিছু জেনে ফেলেছে এই দুনিয়ার। সে ভাবে আর কেউ তাকে চমকাতে পারবে না। ক্লাবে দেখলো হারমোনিয়াম। এভাবে যে একটা ছবি বানানো যেতে পারে সে তখনও জানতো না। তখনও পোস্ট মডার্ন কোন জন্তুর নাম, কারও জানা হয়নি।
দৃশ্য ৫. কিশোরটি তরুণ তখন। সদ্য চাকরিতে ঢুকেছে। মাকে বললো, চলো তপন সিনহা মনোজ মিত্রের 'সাজানো বাগান' থেকে ছবি করেছেন, দেখে আসবে। মায়ের প্রিয় পরিচালক তিনি, কোনও ব্যস্ততাই যথেষ্ট নয়। মানুষের স্বপ্ন, বাস্তব , অতি বাস্তব, সফলতা, ব্যর্থতা, কতো ছেলেখেলায় গভীরে ছড়িয়ে দিতে পারেন তিনি।
দৃশ্য ৬. যুবকটি জীবনের সব থেকে বেদনাদায়ক ছবিটি দেখে একা একা বাইকে বাড়ি ফিরছিলো রাতে। প্রাত্যহিক জীবনে মনোজ মিত্রর মতো যুদ্ধ করা যায় কি? কতো দূর যাওয়া যায় এভাবে । হ্যাঁ, আদালত ও একটি মেয়ে।
দৃশ্য ৭. ছবিটি দেখে আমগ্ন শিক্ষক যুবকের পিতৃদেব বেশ কিছুক্ষণ বেদনাদীর্ণ নীরবতায় অপেক্ষা করে বললেন, "তবে এটাই কি সত্য? তা কখনও হতে পারে?" ছবিটির নাম, আতঙ্ক।
দৃশ্য ৮. ২০০৮ সালের পঁচিশে বৈশাখ। থমথমে গ্রীষ্ম। যুবকেরর শাশুড়িমাতা ঘোর অসুস্থ, যুবকের কাছে আছেন এখানে। তাই সন্ধেবেলা আর কোথাও বাইরে যায়নি। হঠাৎ মনে হলো একটা ছবি দেখে। তাঁকে বলল যদি একটু ভালো লাগে তবে কি তিনি ছবিটি দেখবেন? তিনি প্রশ্ন করলেন কোন ছবি? নামটি বলতে তিনি সানন্দে রাজি হলেন। শুয়ে শুয়ে পুরো ছবিটি দেখলেন নাতনিদের সঙ্গে নিয়ে । মনে হলো ফিরে গেলেন তাঁর তারুণ্যের অববাহিকায়। শেষ হতে বললেন সময়টা খুব ভালো কাটলো। তাঁর রোগপান্ডুর মুখে ফুটে ওঠা হঠাৎ আলোর ঝলকানি বুঝিয়ে দিলো তিনি তৃপ্তি পেয়েছেন। পরের পঁচিশে বৈশাখ তিনি আর আমাদের মধ্যে ছিলেন না। ছবিটির নাম কাবুলিওয়ালা।
এই মন্তাজগুলি ব্যক্তি আমার জীবনে এসেছে আরও হয়তো অনেক ঘটনার ধারাবাহিকতায়। তপন সিংহ পঞ্চাশ বছরে চল্লিশ-বিয়াল্লিশটি ছবি করেছেন। তার মধ্যে কয়েকটি এখনও আমার দেখা হয়নি। সত্যজিতের যেমন প্রতিটি ছবি দৃশ্য ধরে, সংলাপ ধরে আমার ভিতরে জেগে থাকে, হয়তো তেমন নয়। কিন্তু তপন সিংহের কাছে শিখেছি ফলিত কলার জাদুকে কতো সফলভাবে উপভোক্তার চেতনায় সঞ্চারিত করে দেওয়া যায়। তাঁর সৃষ্টির ধারাকে যদি তাঁর গুরু'র ভাষায় ধরতে চাই, তবে বলা যায়, "দুহাত দিয়ে বিশ্বেরে ছুঁই শিশুর মতো হেসে..."।
-------------------------------
তিনি ছিলেন ছবির কথক। যেমন ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ । কোন ঠাকুর? অবন ঠাকুর... যে ছবি লেখে? তেমনই বোধ হয়, কোন তপন... যে গল্প দেখায়? তরুণ মজুমদার বলেছিলেন, যখন ত্রিমূর্তি অর্থাৎ, সত্যজিৎ, মৃণাল ও ঋত্বিক পূর্ণ শক্তিতে সৃজনশীল, তখনও রোদের মধ্যে, বৃষ্টির মধ্যে, হলের বাইরে কাতার দিয়ে দর্শক দাঁড়িয়ে থাকতেন তপন সিংহের ছবি দেখতে। এই দর্শকরাই কিন্তু ঐ ত্রিমূর্তির কোর দর্শক মন্ডলী। কিন্তু তাঁদের বৃহৎ অংশ ত্রিমূর্তিকে অবিমিশ্র শ্রদ্ধাশীলতায় গ্রহণ করেছেন মেধার মঞ্চে। তপন সিংহের জন্য আলাদা করে হয়তো হৃদয়ের কোনও একটা কোণ সংরক্ষিত থেকে গিয়েছিলো।
----------------------------------------
মানুষের চিরকালীন আবদার 'গল্প ভালো আবার বলো'। সমস্ত ফলিত শিল্প তো গল্পই বলে। এমনকি গল্পহীন যে প্রতিগল্প, তারো তো গল্প লাগে, নয়তো সে স্রোতের বিপরীতে যাবে কী করে?
ঊনিশ শো পঞ্চাশে পশ্চিমে গিয়ে ছবির কারিগরী কুশলতার সব পাঠ নিয়ে ছিলেন তিনি। নিও রিয়ালিস্টদের কাছ থেকে ছবি করতে দেখেছেন তিনি। প্রিয় ছবিকর, বিলি ওয়াইল্ডার, জন ফোর্ড, ক্যারল রীড বা ফ্র্যাংক কাপরা। ছোটবেলায় ভাগলপুরে হলে বসে দেখা রনাল্ড কোলম্যানের আ টেল অফ ট্যু সিটিজ, তাঁর কাছে চিরকাল ছবি তৈরির আদর্শ প্রতিবিম্ব হয়ে থেকে গেছে। অথচ সবার উপরে তাঁর চিত্তাকাশ আবৃত ছিলো রবীন্দ্রনাথ নামে এক সৃষ্টিপর মূল্যবোধে, যা তিনি আজীবন কারণে অকারণে বারম্বার উচ্চারণ করে গেছেন। এজন্যই হয়তো বিংশ শতকের বাঙালির মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ ও পরিপ্রেক্ষিতকে তিনি অতো সহজে ছবিতে নিয়ে আসতে পারতেন। তা বলে তাঁর সৃষ্টিশীলতা সীমাবদ্ধ ছিলো, একথা তাঁর অতি বড়ো শত্রুও বলতে পারবে না। ভাবা যায় ১৯৫৫ র আগে ১৯৫৪তে ছবি করলেন অঙ্কুশ, একটি হাতি যার নায়ক। কিন্তু তারও একটি গল্প আছে, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের। আমার বিচারে বিষয়বৈচিত্র্যের দিক দিয়ে তাঁর তুলনা তিনি নিজে। অন্তত এই ডিপার্টমেন্টে সত্যজিৎও তাঁর থেকে ঈষৎ পিছনে। যদিও সে বিষয়ে হয়তো কেউ কেউ অন্যমতও হবেন।
যাঁরা চলচ্চিত্রের আপোসহীন ভিজ্যুয়াল শুদ্ধতায় আস্থাধারী, তাঁরা অবশ্যই স্বীকার করবেন না যে এই চলচ্ছবি শুধু গল্প পৌঁছে দেবার মাধ্যম। সেটা অবশ্যস্বীকার্যও বটে। কিন্তু প্রাচ্যের আবহমান সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে এপিক মাত্রার প্রভাব এতো বেশি যে সব ধরণের কলামাধ্যমই কোনও না কোনও প্রোটাগোনিস্ট কেন্দ্রিক। সে রাম বা গোরা বা সাগিনা মাহাতো, যেই হোকনা কেন। সিনেমার মূল উদ্দেশ্য যদি উপযুক্ত দর্শকের কাছে নিজের বোধকে সঞ্চারিত করার আকাঙ্ক্ষা থেকে আসে, তবে তপন সিংহের সাফল্যকে কেউ খর্ব করতে পারবে না। যতই তাঁকে লিনিয়ার ট্রিটমেন্ট দোষে অভিযুক্ত করা হোকনা কেন।
------------------------------------
কোন রাতের পাখি গায় একাকী
সঙ্গী বিহীন অন্ধকারে
বারে বারে.......
তপন সিংহ সম্পর্কে বলা হয় তিনি ছিলেন একজন quintessential ( 'আদত' বলা যায় কী? ঠিক বাংলাটা জানিনা) বাংলা ছবিকর। এই বিশেষণটি প্রয়োগের কারণ এমন নয় যে তাঁর ছবি গ্রাম বাংলা বা তৎকালীন নাগরিক বাঙালির কথাই শুধু বলে । তিনি বাঙালি ছিলেন তাঁর সংবেদনশীলতার পরিপ্রেক্ষিতে ও রবীন্দ্র-সহজাত ন্যায়-অন্যায়বোধে । তাঁর আন্তর্জাতিকতার ভিত্তি ছিলো একজন গড় বাঙালির বিশ্ববীক্ষার মাপদন্ড যা সত্যজিতের থেকে খানিকটা ভিন্ন। ছবির বিষয় বৈচিত্র্যে তিনি অনন্য, আগেই বলেছি, কিন্তু গঠনকৌশল ও সৌন্দর্যবোধের নিরিখে তিনি ক্ল্যাসিসিস্ট। তিনি কেন ছবি করছেন সেই ধারণাটি খুব স্পষ্ট ছিলো তাঁর কাছে। দর্শককে তাঁর যেকথাটি বলার আছে সেটি তিনি এক গল্পের আধারে বলবেন। গল্পটিকে সঠিক মাত্রায় গ্রহণযোগ্য করতে যা যা প্রয়োগকৌশলের আশ্রয় প্রয়োজন, সব নেবেন তিনি সমস্ত উৎস থেকে, কিন্তু চমক লাগানো প্রয়োগকৌশলের মোহকে দূরে সরিয়ে রাখবেন এক সন্ন্যাসীর নির্লিপ্তিতে। একটি নির্মাণ যখন সৃষ্টি হয়ে ওঠে, তখন তার নিবেদন(dedication) ও বিনোদনের (entertainment) কোনও পৃথক মাত্রা (dimension) থাকেনা। একই সঙ্গে একটি ছবি সিরিয়াস ও বিনোদন-উচ্ছল হয়ে উঠতে পারে। একজন প্রকৃত চলচ্চিত্র শিল্পীকে আলাদা করে exploitation আর entertainment এর ছবি করতে হয়না। প্রকৃষ্টতম উদাহরণ চ্যাপলিন। অবশ্যই তপন চ্যাপলিন নন, কিন্তু ঘরানাটি একই। এই জাদুটিই তপনকে এতো জনবরেণ্য শিল্পী করে তুলেছিলো। তিনি গৌতম বুদ্ধ কথিত চিরন্তন ভারতীয় মধ্যপন্থার পথিক।
---------------------------------------------
সংবেদনশীলতায় তিনি দৃঢ়, অশ্রুসজল সেন্টিমেন্টকে বর্জন করেন , আবার প্রতিবাদে তিনি কঠোর, কিন্তু উচ্চকিত স্ট্রীটফাইটার নন। যখন পিরিয়ড ছবি বানাচ্ছেন, তখন তিনি তাঁর প্রিয় ছবিকর কোলম্যানের মডেলটি অনুসরণ করছেন, অনেক বেশি জনপ্রিয় ও উচ্চকিত সিসিল ডি'মেল তাঁর অভীষ্ট নন। 'ঝিন্দের বন্দী' বা 'ক্ষুধিত পাষাণ' তৈরি করার সময় তিনি জাঁকজমকের চেয়ে বঙ্গীয় sensibilityকেই অনেক বেশি প্রাধান্য দিয়েচেন। এর সব চেয়ে বড়ো উদাহরণ আমরা দেখি রবি'ছবি বানাবার সময় তাঁর অবস্থান থেকে। সে সব ক্ষেত্রে আমরা দেখি তাঁর ক্যামেরা মূলতঃ কাঁধের উচ্চতায় থাকছে। সেখানে তিনি গল্পটি বলছেন একজন কথক হয়ে এবং দর্শক ভাগ করে নিচ্ছেন কথকের দৃষ্টি। পরিচালক হিসেবে তাঁর ভূমিকা ভরতের মতো, যে জানে দর্শকের হৃদয়ের সিংহাসনে তিনি নেই, আছে সেই মূল স্রষ্টার পাদুকা। তিনি শুধু তাঁর গুরুর নামে এই ছবিটি তৈরি করেছেন। শিল্পী হিসেবে নিজের সব অহমিকা তিনি ডুবিয়ে দিয়েছেন দর্শককে আরও কাছে পেতে। তাঁর অতি উচ্চকোটীর সৃজনশীলতার ফুলঝুরিকে সংযত করে রেখেছেন যাতে তা সাধারণ দর্শকের চোখ ধাঁধিয়ে না দেয়। তাঁর একান্ত কামনা ছবিটির অধিরাজ যেন রবীন্দ্রনাথই থাকেন, তপন নয়। এই সৃষ্টির আনন্দে পরিচালক ও দর্শক একাত্ম হয়ে পড়েন। এখানেই তাঁর সিদ্ধি। এখানেই তিনি সত্যজিতের থেকে পৃথক হয়ে যান। কারণ সত্যজিতের 'রবীন্দ্রনাথ' তাঁর নিজস্ব সৃষ্টি। একান্ত ও ব্যক্তিগত।
------------------------
যাবতীয় বৈচিত্র্য সত্ত্বেও তাঁর প্রকৃত খেলার মাঠ ছিলো আমাদের চারপাশের জীবন থেকে উঠে আসা ঘটনা-দুর্ঘটনার ভাসমান জলছবিগুলি। জলছবির অনুপ্রেরণা থেকে অজন্তা বা আলতামিরার গুহাচিত্র সৃষ্টি করে ফেলা তাঁর ক্ষমতার রাজপাট । লৌহকপাট, হাটে বাজারে,আরোহী, আপনজন, সাগিনা মাহাতো, রাজা, আদালত ও একটি মেয়ে, আতঙ্ক, এক ডক্টর কি মৌত, অন্তর্ধান, হুইলচেয়ার, সব তো এই সূত্রেই আমরা পেয়েছি। এই প্রসঙ্গে কেউ বুনুয়েলের নাম করে, কিন্তু আমি ডি'সিকার নামও নেবো। এমনকি আমাদের নিজেদের মৃণাল সেনও অবশ্য স্মর্তব্য। একই ঘটনাক্রম যখন বিভিন্ন বড়োমাপের শিল্পী নিজেদের মতন করে ভিজ্যুয়ালাইজ করেন, তা সব ভিন্ন ভিন্ন রাগরাগিণী হয়ে ওঠে। আমাদের মতো ইতর দর্শকদের এটাই বৃহৎ প্রাপ্তি। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, যদি বিষয়বৈচিত্র্যের কথা বলা হয়, তবে তপন সিংহের সঙ্গে একমাত্র সত্যজিৎ রায়ের নামই নেওয়া যেতে পারে। তিনি কখনও পুনরাবৃত্তি করেননি। সর্বদা নতুন নতুন বিষয় নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করে গেছেন। তিনি ছিলেন একজন আদ্যন্ত, গভীর মানবতাবাদী। তাই 'স্টোরিটেলার' হিসেবে শুরু করেও তিনি একজন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ছবিনির্মাতা হয়ে যেতে পেরেছিলেন। তিনি সচেতনভাবেই তাঁরা স্বভাবসিদ্ধ সরলরৈখিক ন্যারেটিভ শৈলিকে চিরকাল আশ্রয় করে থেকেছেন। কোনও 'আভাঁ-গার্দ' আঙ্গিককে আমল দেননি। তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো সরাসরি দর্শকের হৃদয়ের তন্ত্রীকে স্পর্শ করা। কোনও শৈল্পিক ঘোরা পথে তিনি স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। একেবারে চলিত নাটকীয় টেকনিকগুলিকে সফলভাবে ব্যবহার করে বিভিন্ন সূক্ষ্ম শিল্পমুহূর্ত তৈরি করে ফেলার সিদ্ধি তাঁর আয়ত্ত ছিলো।
তপন যখন ব্যক্তিমানুষের গভীরতম অনুভূতি থেকে উঠে আসা ছোটো বড়ো তরঙ্গগুলিকে নিয়ে ছবি করেন, সেখানেও কেন্দ্র থেকে পরিধির বৃত্তে দোলাচলিত সূক্ষ্মতম অনুভবগুলিকে অবলীলায় পর্দায় তুলে আনেন নির্জন সৈকতে, জতুগৃহ, এখনই বা শতাব্দীর কন্যায়। মৃণাল সেন ব্যাপারটি খুব গভীর তাৎপর্যের সঙ্গে অনুধাবন করতে চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তপন সিংহ আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠ 'মধ্যপন্থী' চিত্রকার। একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তিনি, " We differed in many ways and I did not agree with him all the time, but that does not mean that I do not consider him one of the finest directors in India. I have also never found a human being as good and as powerful as Tapan Sinha,”
বাংলা ছবির ফ্যান্টাসি শাখার এখনও পর্যন্ত সফলতম স্রষ্টা তপন সিংহ। (আমি গুপী-বাঘা সিরিজকে এই গোত্রে রাখছি না)। গল্প হলেও সত্যি, এক যে ছিলো দেশ, বাঞ্ছারামের বাগান, আজব গাঁয়ের আজব কথা, তো এখনও বেঞ্চমার্ক। এর আগে যমালয়ে জীবন্ত মানুষ বা এ জাতীয় দুচারটে ছবি ছাড়া এই শাখায় বাংলা ছবিতে উল্লেখ্য কিছু নেই। সবার শেষে নাম নিচ্ছি আদমি অওর আওরতের। এই ছবিটি পৃথক উল্লেখ দাবি করে। যদিও এটি টেলিছবি, তবু একটি অনন্য সৃষ্টি।
--------------------------------
তাঁদের যাবতীয় স্ববিরোধ, মূর্খামির কথা মনে রেখেও বাঙালি সমাজের চালিকাশক্তি যথারীতি মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়। তাঁদের মানসিক গঠনটি সম্বন্ধে বিনয় ঘোষ মশাই একসময় লিখেছিলেন 'মেট্রোপলিটান মন, মধ্যবিত্ত বিদ্রোহ' নামক সন্দর্ভটি। ইংরেজের নিয়ে আসা সংস্কারমনস্কতার সঙ্গে মধ্যবিত্তের ক্রোমোজোমে প্রকট যে সামন্তবাদিতা, উভয়ের সংঘর্ষের ক্ষেত্রে কিন্তু তাঁরা শেষ পর্যন্ত সংস্কারের প্রতিই পক্ষপাত দেখিয়ে থাকেন। উত্তম-সুচিত্রা মাথায় থাকলেও সামন্ততান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে তৈরি করা বাংলা বাজারধন্য ছবিগুলির ঊর্ধে গিয়ে তাঁদের অন্য কোথাও একটা পৌঁছোনোর টান চিরকাল থাকে। তপন সিংহ এই টানটিকে তাঁর সৃষ্টির মূলস্রোত করে তুলেছিলেন। মধ্যবিত্তের মধ্যচিত্তে তোলপাড় সাধ ও সাধ্যের টানাপড়েন, যার নিয়ন্ত্রণ থাকে তাঁদের উদারনৈতিক সংস্কারী প্রবণতাগুলিতে, চিরকাল তপনকে ভাবিয়েছে। তাই সে অর্থে কখনও আপোস না করেও তাঁর ছবি দর্শকের অনাবিল আনুকূল্য লাভ করেছে চিরকাল। নিছক বিনোদন বা মেধাচর্চার মাঝখানে যে বিপুল সিনেমাটিক স্পেস, সেটিকে তিনি খুব সফলভাবে কাজে লাগিয়েছেন। সিনেমা যে শুধুমাত্র মেধাচর্চার আখড়া নয়, তা একটি গণমাধ্যম, সে বিষয়ে তাঁর ধারণাটি খুব স্পষ্ট ছিলো। সিনেমার হিস্ট্রি বইয়ের থেকে মানুষের মগজের মহাফেজখানাটা যে অনেক বড়ো আশ্রয়, তাও তিনি প্রথম থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন। এই উপলব্ধিটি তাঁকে কখনও ছেড়ে যায়নি। তাঁকে অনুসরণ করে অন্যান্য বাঙালি পরিচালকদের কাফিলা বহুদিন ধরে এগিয়ে গেছে। সফলও হয়েছে। দর্শকদের ঝুলিও কখনো খালি যায়নি।
".... খুঁজতে যারে হয়না কোথাও চোখ যেন তায় দেখে
সদাই যে রয় কাছে তারি পরশ যেন ঠেকে।
নিত্য যাহার থাকি কোলে
তারেই যেন যাইগো ব'লে-
এই জীবনে ধন্য হলেম তোমায় ভালোবেসে ।।"
---------------------------
সৌজন্যেঃ অবসর


Avatar: Rit

Re: ক্রমাগত মন্তাজ: ক্যামেরা ও এক প্রবীণ শিশু

আগেও পড়েছি। আবারো পড়লাম। অপূর্ব।
Avatar: কান্তি

Re: ক্রমাগত মন্তাজ: ক্যামেরা ও এক প্রবীণ শিশু

খুব ভাল লাগল। তপন সিংহ কে নিয়ে এই বিশ্লেষণ মন ছুঁয়ে গেল।
Avatar: শিবাংশু

Re: ক্রমাগত মন্তাজ: ক্যামেরা ও এক প্রবীণ শিশু

Rit, কান্তি,

অনেক ধন্যবাদ........ :-)


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন