সুকান্ত ঘোষ RSS feed

কম জেনে লেখা যায়, কম বুঝেও!

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • পাহাড়ে শিক্ষার বাতিঘর
    পার্বত্য জেলা রাঙামাটির ঘাগড়ার দেবতাছড়ি গ্রামের কিশোরী সুমি তঞ্চঙ্গ্যা। দরিদ্র জুমচাষি মা-বাবার পঞ্চম সন্তান। অভাবের তাড়নায় অন্য ভাইবোনদের লেখাপড়া হয়নি। কিন্তু ব্যতিক্রম সুমি। লেখাপড়ায় তার প্রবল আগ্রহ। অগত্যা মা-বাবা তাকে বিদ্যালয়ে পাঠিয়েছেন। কোনো রকমে ...
  • বেঁচে আছি, আত্মহারা - জার্নাল, জুন ১৯
    ১এই জল, তুমি তাকে লাবণ্য দিয়েছ বলেবাণিজ্যপোত নিয়ে বেরোতেই হ'লযতক্ষণ না ডাঙা ফিকে হয়ে আসে।শুধু জল, শুধু জলের বিস্তার, ওঠা পড়া ঢেউসূর্যাস্তের পর সূর্যোদয়ের পর সূর্যাস্তমেঘ থেকে মাঝে মাঝে পাখিরা নেমে আসেকুমীরডাঙা খেলে, মাছেরা ঝাঁক বেঁধে চলে।চরাচর বলে কিছু ...
  • আনকথা যানকথা
    *****আনকথা যানকথা*****মোটরবাইক ঃ ইহা একটি দ্বিচক্রী স্থলযান। পেট্রল ডিজেল জাতীয় জীবাশ্ম জ্বালানির সাহায্যে চলে। বিভিন্ন আকারের ও বিভিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরবাইক আমরা দেখিতে পাই। কোন কোন বাইকের পাশে ক্যারিয়ার থাকে। শোলে বাইক আজকাল সেরকম দেখিতে পাওয়া যায়না। ...
  • সরকারী পরিষেবার উন্নতি না গরীবকে মেডিক্লেম বানিয়ে দেওয়া? কোনটা পথ?
    এন আর এস এর ঘটনাটি যে এতটা স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে উঠতে পারল এবং দেখিয়ে দিল হাসপাতালগুলির তথা স্বাস্থ্য পরিষেবার হতশ্রী দশা, নির্দিষ্ট ঘটনাটির পোস্টমর্টেম পেরিয়ে এবার সে নিয়ে নাগরিক সমাজে আলোচনা দরকার।কিন্তু এই আলোচনা কতটা হবে তাই নিয়ে সংশয় আছে। কারণ ...
  • জুনিয়র ডাক্তারদের ধর্মঘট ও সরকারের ভূমিকা
    হিংসার ঘটনা এই তো প্রথম নয়। ২০১৭ ফেব্রুয়ারীতে টাউনহল খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে বেসরকারি হাসপাতালের ম্যানেজমেন্ট কে তুলোধোনা করার পর রাজ্যে ১ নতুন ক্লিনিক্যাল এস্তব্লিশমেন্ট অ্যাক্ট চালু হয়েছিল। বলা হয়েছিল বেসরকারি হাসপাতাল গুলি র রোগী শোষণ বন্ধ করার জন্য, ...
  • ব্রুনাই দেশের গল্প
    আশেপাশের ভূতেরা – ব্রুনাই --------------------...
  • 'বখাটে'
    তেনারা বলতেই পারেন - কেন, মাও সে তুঙ যখন ঘোষণা করেছিল, শিক্ষিত লোকজনের দরকার নেই, লুম্পেন লোকজন দিয়েই বিপ্লব হবে, তখন দোষ ছিল না, আর 'বখাটে' ছেলেদের নিয়ে 'দলের কাজে' চাকরি দেওয়ার কথা উঠলে দোষ!... কিন্তু, সমস্যা হল লুম্পেনের ভরসায় 'বিপ্লব' সম্পন্ন করার পর ...
  • ডাক্তার...
    সবচেয়ে যে ভাল ছাত্র তাকেই অভিভাবকরা ডাক্তার বানাতে চায়। ছেলে বা মেয়ে মেধাবী বাবা মা স্বপ্ন দেখে বসে থাকল ডাক্তার বানানোর। ছেলে হয়ত প্রবল আগ্রহ নিয়ে বসে আছে ইঞ্জিনিয়ারিঙের কিন্তু বাবা মা জোর করে ডাক্তার বানিয়েছে এমন উদাহরণ খুঁজতে আমাকে বেশি দূর যেতে হবে ...
  • বাতাসে আবারও রেকর্ড সংখ্যক কার্বন-ডাই-অক্সাইড, কোন পথে এগোচ্ছে পৃথিবী?
    সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন বলছে বায়ুতে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ আবারও বেড়ে গেছে। এই নিয়ে প্রতিবছর মে মাসে পরপর কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পেতে বর্তমানে বায়ুতে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ রেকর্ড সংখ্যক। গত মাসে (মে-তে) কার্বন ডাই অক্সাইডের ...
  • ফেসবুক রোগী
    অবাক হয়ে আমার সামনে বসা ছেলেটার কান্ড দেখছি। এই সময়ে তার আমার পাশে বসে আমার ঘোমটা তোলার কথা। তার বদলে সে ল্যাপটপের সামনে গিয়ে বসেছে।লজ্জা ভেঙ্গে বলেই ফেললাম, আপনি কি করছেন?সে উৎকণ্ঠার সাথে জবাব দিলো, দাঁড়াও দাঁড়াও! 'ম্যারিড' স্টাটাস‌ই তো এখনো দেইনি। ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

সুকান্ত ঘোষ

অনেকদিন ধরে একটি ম্যানুয়াল তৈরীর কথা ভাবছি। সহজলভ্য ইন্টারনেট কানেকশনের যুগে কিভাবে ইন্টারনেট আঁতেল হিসাবে নাম করা যায়। অতীব কপচানো জিনিস, হয়ত আমেরিকা মহাদেশে এমন বই-এ বাজার ছেয়ে গেছে – কিন্তু সাহেব আর আমাদের মনস্তত্ত্ব আলাদা হবার জন্য, স্ট্রাটেজীতে কিছু ঈষৎ পরিমার্জন দরকার। আমি এটাও জানি না যে কোন বাঙালী ফেসবুক গোষ্ঠী অলরেডী তাদের গুপ্ত সমিতিতে এমন ম্যানুয়াল চালু করেছে কিনা! আবার এমনও হতে পারে যে অলরেডি আঁতেল বলে মার্কেটে নাম ছড়িয়ে ফেলেছেন এমন কেউ এই ম্যানুয়াল উল্টোলেন – কিছুটা কৌতুকে ও কিছুটা কৌতূহলে। তাঁদের আমি অনুরোধ করব তাঁরা যেন বাউলদের মত সবটা না হলেও অন্ততঃ হালকা কিছুটা ট্রেড সিক্রেট শেয়ার করেন আমাদের সাথে। আমরা তাতে সমৃদ্ধ হব।

তবে এই ম্যানুয়ালে বর্ণিত পদ্ধতি বা লিষ্টি ক্রমশঃ পরিমার্জমান বা পরিবর্ধমান। কম্পুটার চালাক হয়ে যাচ্ছে – আর তার ফলে যারা ওদের চটকায় সেই পাবলিকদের মধ্যেও অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স ঢুকে যাচ্ছে – চোর পুলিশ খেলতে থাকুন, চোখ-কান খোলা রাখুনঃ

১। প্রথম ধাপঃ পরিবেশ সৃষ্টি
একটা মহল তৈরী করতে হবে। চিরাচরিত আঁতেল লুক এখনো আমাদের বিভ্রান্ত করে – অর্থাৎ মার্কেটে চলে। এটা মনে হয় সৃষ্টিকর্তার আরোপিত শর্ত - এর ব্যতয় নেই। বাঙালী আঁতেল অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে থেকে বাহ্যিক লুকে অপরিবর্তিত থাকবে। তার হাতে গ্যাজেট আসতে পারে, কিন্তু মুখে দাড়ি, কাঁধে ব্যাগ ইত্যাদি অনুসঙ্গ থাকতেই হবে। কথা যখন বলবেন তখন দু চারটে কনফিউসিং শব্দ ব্যবহার করুন। এতদিন পর্যন্ত যা শিখেছেন বা যা জেনেছেন তার ভিতর থাকে শব্দ বাছতে শিখুন। কম্পুটার কেনার আগে এটা জরুরী – কেনার পর আর আপনাকে আলাদা করে ভাবতে হবে না। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স হেতু কম্পুটার আপনাকে সেটা নিজেই শিখিয়ে নেবে।

প্রথমতঃ আপনার চারপাশে হার্ড কপি বই না থাকারই সম্ভাবনা বেশী, আগেকার আঁতেল যারা অলরেডী কোয়ালিফাই করে গেছে, তাদের একটা সুবিধা ছিল এই যে তাদের পূর্ববর্তী আঁতেলদের কম্পুটার না থাকার জন্য কিছু বই অন্তত যোগাড় করতে হত – নিদেনপক্ষে বইয়ের মলাট। তা সে লাইব্রেরী থেকে ঝাড়া, বন্ধুর কাছ থেকে নিয়ে না ফেরত দেওয়া, পুড়ে যাওয়া বইমেলা থেকে উদ্ধার করা, বা কলেজস্ট্রীট ফুটপাথ থেকে জলের দরে কেনা যাই হোক না কেন। আপনার এখন সেই সুযোগ নেই, কারণ আপনি দেরীতে খেলতে নেমেছেন। ফলে আপনার স্মৃতি শক্তি ভালো হলে যে পর্যন্ত পড়েছেন সেই ক্লাশের পাঠ্যপুস্তক মনে করতে পারেন। যেমন আমি উপরে দশম শ্রেণী থেকে ‘অভিস্রবণ’ শব্দটা ব্যবহার করলাম। বহুল প্রচারিত সংবাদপত্র বা ম্যাগাজিন ব্যবহার করবেন না। কারণ মনে রাখবেন যে এই ম্যানুয়াল আপনি কেবল একা পড়ছেন না! শব্দ খুঁজুন অপ্রচলিত, অধুনালুপ্ত বা স্থানীয় পত্রিকা থেকে। আর কোন কোন শব্দ ব্যবহার করবেন না সেটা বুঝতে বাবা-মা বা গ্রামের বা পাড়ার বয়স্ক লোকজনের কথা মাথায় রাখুন। যেমন আমার বাবা আমার ছোটবেলায় বলত, “যার খাচ্ছিস, তারই বুকের উপর বসে দাড়ি উপরাচ্ছিস!” আমার বাবার আঁতলেমি বা দাড়ি কোনটাই ছিল না। এখানে ‘দাড়ি’ অর্থে ফিলসফিক্যাল দাড়ি। এটা আপনি যখনই বুঝতে পারবেন বা আপনার বাবা এই জাতীয় কথা বার্তা বলবেন তখনি জানবেন মহল প্রায় তৈরী হয়ে গেছে। যাঁদের বাবারা শহরের দিকে চাকুরী করেন বা যারা একটু সফিস্টিকেটেড বা মাল্টিনেশনাল কম্পানীর সাথে যুক্ত বা যাঁরা ফ্ল্যাটে বাস করেন তাঁরা মহল তৈরী হবার ইন্ডিকেশন গুলো পেতে পারেন যখন তাঁদের বাবারা এই ভাবে কথা বলা শুরু করেন, “তুমি তো এখন নিজের ভালো নিজেই বুঝতে শিখেছো”, বা “আমি ও তোমার মা দুজনেই সমসময় তোমার জন্য যেটা ভালো, সেটা বেষ্ট সেটাই চেয়েছি” – ইত্যাদি।

মহল তৈরীতে পুরানো দিনের কিছু পদ্ধতি এখন বাতিল – যেমন কবিতার লাইন মুখস্ত রাখা বা উদ্ধৃতির খাতা মেনটেন করা। এখন যা মূল দরকার তা হল কী-ওয়ার্ড বা বাজ ওয়ার্ড। ইহা কি তা জানার জন্য আপনাকে এই বার কম্পুটার কিনতে হবে।

অনেকে ভাবতে পারেন যে কম্পুটার কেনার আগেই লুক নিয়ে ভাবাটা বাড়াবাড়ি কিনা। আমার অনুরোধ “বাঁদরের হাতে খন্তা” প্রবাদ বাক্যটি স্মরণে রাখার – নতুন মেশিন নাড়াচাড়া করতে করতে প্রথমেই ফট্‌ করে একটা প্রোফাইল পিকচার দেবার প্রবণতা থেকে। তো সেই ক্ষেত্রে আলুভাতে মার্কা ছবি মার্কেটে একবার প্রচার হয়ে গেলে নিজের ইমেজ পুনুরুদ্ধারে সময় লাগবে। অনেক সময় ড্যামেজিং এফেক্ট অনেকদূর প্রসার হতে দেখা গেছে। সেই সব অ্যানালেসিস করেই রেকমেন্ড করা হচ্ছে যে ঠিক ঠাক লুক নিয়েই ময়দানে নামুন। আবার দেখা গেছে নিজের লুক ঠিক, কিন্তু পিকচার অ্যাঙ্গেল সম্পর্কে ধারণা না থাকায় ব্যাকগ্রাউন্ডে জাঙিয়া ঝুলতে দেখা গেছে প্রফাইল পিকচারে। আপনি যদি বিনয় মজুমদারের মত জীবন বেছে না নিতে চান তো সে ক্ষেত্রে ব্যাকগ্রাউন্ডে ঝোলা জাঙিয়া আপনাকে হন্ট করবে, আপনার ইমেজকে হন্ট করবে। এই সব ছোটখাট টোটকা পরের ধাপে বিস্তৃত করা হবে।

অনেকে আবার প্রশ্ন তুলবেন লুক নিয়ে কি হবে – ইন্টারনেটে ফেক্‌ জিনিস আর কে ধরবে! তাদের উদ্দেশ্যে বলি আমার এই ম্যানুয়াল ফেক্‌ প্রোফাইল তৈরী করে লোকেদের গালাগাল দেবার জন্য নয়। নিজের আইডেন্টিটি সঠিক রেখে কিভাবে বিভ্রম তৈরী করা যায় সেই নিয়ে – অ্যাটলিষ্ট বইমেলায় বা লিটিল ম্যাগ মেলায় তো মিলতে হবে ফিজিক্যালি। তবে একই সাথে ডিসক্লেমার, এই ম্যানুয়ালের ব্যাপ্তি কেবল দেখা করে মুখ খোলার আগে পর্যন্ত – মুখ খুললে কি হবে বা কিভাবে মুখ খুলতে হবে তা এই ম্যানুয়ালে লেখা নেই। আমার অন্যান্য ম্যানুয়াল গুলি কনসাল্ট করা বাঞ্ছনীয়।

২। দ্বিতীয় ধাপঃ কম্পুটার কেনা

এই স্টেপ অপরিহার্য নাও হতে পারে। আপনার বাবা আপনাকে ডাক্তার না ইঞ্জিনিয়ার হবার সাহাযার্থ্যে অলরেডি কম্পুটার কিনে দিয়ে থাকতেই পারেন। যদি আপনার কম্পুটার না থাকে তাহলে আপনি হয়ত ছোটবেলায় তেমন পোটেনশিয়াল দেখাতে পারেন নি, বা বড় হয়ে বাস কন্ডাক্টার হব এমন কিছু একটা বাধিয়েছিলেন। সেই ক্ষেত্রে আপনাকে আঁতেল হবার জন্য আরো শতকরা ৫ ভাগ একস্ট্রা দিতে হবে। কিভাবে বাবাকে কনভিনস্‌ করাবেন সেটা আপনার উপর ছেড়ে দেওয়া থাকল। এই স্টেপে প্রবলেম হলে বুঝতে হবে মহল তৈরী হয় নি – দেন্‌ গো ব্যাক টু স্টেপ ওয়ান।
যদিও স্ট্যাটিক ইন্টারনেট আঁতেল হলে ডেক্সটপ্‌- ল্যাপটপ্‌ এর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই বিশেষ। তবে ডায়নামিক ইন্টারনেট আঁতেল হতে চাইলে ল্যাপটপ মাষ্ট। আরো কিছু কিছু ক্ষেত্রে ল্যাপটপ মাষ্ট – জয়েন্ট ফ্যামিলি হলে, আলাদা ঘর বরাদ্দ না হলে, কম জায়গা হেতু কম্পুটার স্ক্রীণ দরজার দিকে মুখ করে থাকার সম্ভাবান থাকলে বা নীচের তলার বাসিন্দা উইথ সারাউন্ডিং হাইরাইজার থাকলে। ল্যাপটপ কিনলে কী-বোর্ড প্রোটেক্টর মাষ্ট (বিশেষত ছেলে হলে)। কনফিউগারেশন বা সিষ্টেম ডিটেলস্‌ নিয়ে ভাববেন না – আর দোকানে কিনতে গিয়ে বাবার সামনে দোকানের গোমড়ামুখো সেলস্‌ম্যানকে বারাবার, “ইন্টারনেট ফাষ্ট চলবে তো!” বলে বিরক্ত করবেন না। ডেক্সটপ কিনলে বাড়তি ওয়েবক্যামটা ভালো কিনুন। ল্যাপি কিনলে ইন-বিল্ড ক্যামেরা থাকবে আর সেই ক্ষেত্রে আপনি সাইজ ছোট ও ওজন কমের দিকে নজর দিন। দয়া করে বারবার ‘ল্যাপি’ শব্দটা ব্যবহার করবেন না। আঁতেলদের ল্যাপি বলা মানায় না – ওটা আদুরে স্পয়েল্ড্‌ বাচ্ছাদের ম্যানুয়াল ডাক। কে-টে-কে-টে স্পষ্ট করে ল্যাপটপ উচ্চারণ করবেন। গোলাপী, সবুজ বা উজ্জল রঙ পরিহার করার চেষ্টা করবেন সে আপনার সঙ্গের বোন যতই দাদা ওটা, দাদা ওটা বলুক না কেন।

হেডফোন কেনা মাষ্ট। অনুমান করে নেওয়া যেতে পারে কম্পুটার কিনে দেবার পর আপনাদের বাবা আপনাকে চট্‌ করে হেডফোন কিনে দিতে চাইবে না – অন্তত দামী হেডফোন। সেই ক্ষেত্রে আপনি সাইজের উপর জোর দেবেন – মাল যেন গাব্দা হয় আর পুরো কান ঢাকা থাকে। শব্দের কোয়ালিটি নিয়ে চিন্তা করবেন না কারণ আপনি মিউসিক ব্যবসায় নামছেন না। মাঝে মাঝে শুধু এক কানে মালটাকে ধরবেন, যেমন রিয়েলিটি টিভি শোয়ে জাজ্‌-রা ধরে। তবে দুই ধরার মধ্যে ইম্পিলিকেশন আলাদা – আপনার এক কানে হেড ফোন ধরা মানে – আপনি একধারে বাস্তবে আর অন্যধারে নিবীড়তায়।

যাঁরা ভাবছেন নিজে কম্পুটার কিনে কি আঁতেল হওয়া যায় না – কেবল বাবার কথা আসছে কেন! যদি আপনি নিজের সামর্থ্যে কম্পিউটার কিনতে পারেন তা হলে জানবেন এই খেলায় আপনি অনেক পরে প্রবেশ করছেন। অনেক ক্যাচ আপ বাকি থাকবে আপনার – তবে ইহা যেহেতু বডি কনট্যাক্ট গেম নয়, তাই দেরী বলে কিছু হয় না। আপনার নিজের মাইন্ডকে কেবল টিউন করতে হবে। সেই কনসাসনেসের স্টেপ পরে বিস্তৃত করা হবে। একটু ধৈর্য ধরুন – দুম করে আবার কপালভাতি স্টার্ট করে দেবেন না যেন! আর যদি আপনার বাবা আপনাকে টাকা দিয়েই খালাস হন, তা হলে আমার সন্দেহ যে আপনাকে আমি কতটা আঁতেলগিরি শেখাতে পারব। আপনি তখন স্পয়েলড্‌ কিড্‌-র পর্যায় ভুক্ত হবেন আমার ম্যানুয়ালে।

যারা একটু লক্ষ্য করেছেন তাঁরা ঠিকই বুঝতে পারছেন যে, আমার বর্ণিত টার্গেট আঁতেল হল মধ্যবিত্ত মানসিকতার লোকের। অর্থ-টাকা নয়, মানসিকতার দিক থেকে মধ্যবিত্ত যারা। বড়লোকেরা আমার ম্যানুয়ালে ডিফাইন্ড ‘বড়লোক’ বলেই। আর তা ছাড়া তারা বাঙলা পড়বে না, তাদের জন্য ইংরাজী ম্যানুয়াল দরকার – তবে বাংলা না পড়তে না জানলে কতটা বাঙালী আঁতেল হওয়া যাবে সেই সন্দেহ আমার মনে রয়ে গেছেই। আমার আঁতেলরা স্ট্রাগেল করবে – কারন স্ট্রাগেলের সাথে আঁতলেমোর গভীর একটা সম্পর্ক এই ম্যানুয়াল অ্যাজিউম করে নিয়েছে। স্ট্রাগল না করলে আপনার ভাষা ভাণ্ডার কম হবে, আপনি ইমোশনাল আপডাউন শিখবেন না, আপনার ক্রোধ কম হবে, আপনার রাগ শুধু সীমাবদ্ধ থাকবে গ্রেগ চ্যাপেল জাতীয় জীবের উপর, আপনি বিতর্ক ভালোবাসবেন না, আপনি ছ্যাঁচড়া পাবলিক কাকে বলে জানবেন না, ইন্টারনেটে সোদপুরের নীতাকে আপনি নীতাই ভাববেন – মোদ্দাকথা আবার আপনি পিছিয়ে পড়বেন। আমি কোন ভাবেই ডিসকারেজ্‌ করছি না, তবে সেই সব ক্ষেত্রে আপনাকে আমার অন্য ম্যানুয়ালগুলি পড়তে হবে, টুগেদার উইথ্‌ দিস্‌ ওয়ান।

এখন ঘটনা হচ্ছে আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন স্ট্রাগল লাইফে না এলে কি করবেন? মনে রাখবেন স্ট্রাগল একটা অপারচুয়্যেনিটি বেস্‌ড ব্যাপার – দিমাক্‌ খোলা রেখে স্ট্রাগল তৈরী করতে হবে। ধরুণ আপনি দুপুর ৩টেয় হাওড়ায় বা শিয়ালদায় ট্রেন ধরবেন বলে গেলেন, ট্রেন অপেক্ষাকৃত ফাঁকা – তাই চাপবেন না। আরো ঘন্টা তিন ওয়েট করে স্ট্রাগল করে চাপুন। কিংবা পয়সা থাকলেও ট্যাক্সিতে মিটারে যাব বলে ঝোলাঝুলি করুন – পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নিন। আলসার বাঁধানোর চেষ্টা করুন। অম্বল – আলসার ইত্যাদি থাকলে লুকটা বেটার হয়। বাড়িতে অসময়ের সব্জী খাব বলে মায়ের সাথে ঝামেলা বাঁধান – মোট কথা স্ট্রাগল করুন।


৩। তৃতীয় ধাপঃ ইন্টারনেট কানেকশন

বাড়িতে ইন্টারনেট কানেকশন ছাড়া ইন্টারনেট আঁতেল হওয়াটা সত্যাগ্রহ করে বৃটিশদের ভয় দেখানোর সাথে তুলনীয়। ব্রড ব্যান্ড কানেকশন চাই – আনলিমিটেড প্ল্যান হলে ভালো হয়। অনলাইন স্ট্রীমিং সফল হতে হবে – মাঝে মাঝে আটকে গিয়ে চাকা ঘুরতে থাকলে ডিসট্রাকশন এবং ব্রেনে চাপ পড়বে। আপনি কেন কম্পুটারের সামনে বসে আছেন সেটা ভুলে যাবেন। আপনার যাবতীয় মনসংযোগ তখন ওই ঘুরতে থাকা চাকায় নিবদ্ধ হবে –আপনি অনেক কিছু কল্পনা করবেন – হ্যালুসিনেশনে ভুগতেও পারেন। যা আপনি দেখেননি বা শোনেননি তা ভেবে নেবেন – পরীক্ষার খাতার পর এই আবার গোলের উপর আপনার ভীতি তৈরী হবে। সেই ভেবে নেওয়া অসম্পূর্ণ জ্ঞান নিয়ে আপনই আসরে অবতীর্ণ হবেন, অন্য সমকালীন আঁতেলদের ব্যক্ত ঘটনার সাথে আপনার ভাবা ঘটনা মিলবে না, কিন্তু ব্যখ্যা মিলে যেতে পারে। তবে এতো ডাউনসাইডের মধ্যেও একটা আপাত উপকার হতে পারে – তা হল আপনার কল্পনা শক্তি বাড়তে থাকবে। ঘুরতে থাকা চাকার ওদিকে কি আছে সেই নিয়ে আপনি কল্পনা খেলা খেলতে পারবেন। কিন্তু আবার ডাউন সাইড হচ্ছে কল্পনা শক্তি যত বাড়বে ইন্টারনেট আঁতেল হবার সম্ভাবনা তত কমে যাবে। আপনি নিজের কল্প জগতে ঢুকতে থাকবেন – পাবলিকের সাথে ইন্টার অ্যাকশন কমে যাবে – কম্পুটার কেনার প্রাইমারী অবজেকটিভ আপনার ডিফিট হবে।
যদি আবার ওয়াই-ফাই মডেম থাকে তো পোয়াবারো। কিন্তু ভালো টয়লেট না থাকলে ওয়াই-ফাই-এর মর্যাদা আপনি ঠিক দিতে পারবেন না। নিদেনপক্ষে ডাইনিং টেবিল চাই বা ইন্টারনেটের একাধিক ব্যবহারকারী চাই। যে বাড়িতে আপনার মা স্টার জলসা, বাবা মোহনবাগান-মমতা নিয়ে ব্যস্ত, সেখানে আপনিই সত্যজিত, আপনিই মৃণাল, আপনিই দেদার দেরিদা। তাই ওয়াই-ফাই কেনার কথা বলে বাবাকে আর বিভ্রান্ত করবেন না।

মোবাইলের মাধ্যমে ওয়াই-ফাই অ্যাকসেস করে ইন্টারনেট আঁতেল হবার খেলাটা আবার অন্যরকম। মোবাইলের মাধ্যমে টেক্‌-আঁতেল হওয়া সোজা – ইন্টারনেট আঁতেল একটু শক্ত।

৪। চতুর্থ ধাপঃ কী-ওয়ার্ড সার্চ
ফেসবুকটাই যদিও আপনার ছাড়াবার প্রধান জায়গা হবে, তবুও সমকালীন, সমগোত্রীয় আরও কিছু ছড়াবার জায়গার খোঁজ করতে ও রাখতে হবে। মনে রাখবেন আঁতেল একরকম স্বীকৃতি – আপনাকে অন্যদের কনভিনস্‌ করাতে হবে। তার জন্য কিছু টিপস্‌ পরের বার। যার মধ্যে আছে গ্রুপ তৈরী, লাইক দেবার স্ট্র্যাটিজী, স্ট্যাটাস আপলোডের ওয়ান লাইনার, কখন সহমত ও কখন জলঘোলা করতে হবে তার গাইডলাইন ইত্যাদি। কিছু দূর্জনের মতে মনুষ্যজাতি নাকি বাঁদর থেকে বিবর্তিত হয়েছে – তাই যেই সমষ্টিগত পিঠচুলকানির উপযোগীতা নিয়েও কিছু টিপস্‌ থাকবে এই স্টেপে।

[ক্রমশঃ]


ইন্টারনেটের জগতে আঁতেল হিসাবে নাম করতে হলে গ্রুপ থিয়োরী সম্পর্কে একটা স্বচ্ছে ধারণা থাকা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এমনিতে এই নীতি খুবই প্রাচীন এবং ভারত ইতিহাসে এর উদাহরণ পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। উপরের খোলস এবং ধারাভাষ্য গুলি সরালে দেখা যাবে ভিতরের মোদ্দা সারবস্তু হল ‘দল ভারী করা’।

আমি এখানে ডাইরেক্ট কোন জ্ঞান দিতে চাইছি না – তবে ‘দল’ এর অর্থটাও পরিস্কার থাকা দরকার। ইন্টারনেটে এমন দল শত শত থাকলেও, তারা যে শতদলের মত সুন্দর এবং সর্বপ্রিয় হবে এমন না হওয়াটাই স্বাভাবিক। এখানে আবার লাইটওয়েট ও হেভীওয়েট সদস্যদের দিয়ে দল বিচার করা খুবই প্রয়োজন। সফট্ওয়ারের লোক, যাদের ওয়েব পেজ্ তৈরী সম্পর্কে জ্ঞান আছে, বাংলা ফন্ট নিয়ে খেলা করতে পারে, রবীন্দ্রনাথ ও জীবনান্দের নাম শোনা আছে – এমন বৈশিষ্ট থাকলেই আপনি হেভীওয়েটের দলে প্রায় ঢুকে গেলেন আর কি! সফট্ওয়ারের জীবরা আপনার আঁতলামোকে সাজিয়ে–গুছিয়ে পরিবেশনে সাহায্য করবে – ওদের আশীর্বাদ ছাড়া আপনি অচল থাকবেন।

আপনাকে প্রথমেই ফেসবুকে ঢুকতে হবে – বন্ধু সংখ্যা বাড়াতে হবে। ফেসবুক ছাড়া আঁতেল হতে চাইলে আপনার অবস্থা সেই মেগা সিরিয়াল ছাড়া চ্যানেলগুলি্র মত হবে। ফেসবুক ছাড়া আপনি নিজের আরটিপি বাড়াতে পারবেন না – এই জন্য বহু প্রায় প্রাচীন আঁতেলকেও দেখবেন গুটি গুটি পায়ে ফেসবুকের দারস্থ হয়েছেন। এঁরাই বছর দশেক আগে কম্পুটারকে গালি দিতেন আর প্রিন্ট মিডিয়া ছাড়া যে আঁতলামো করা যায় না সেটা মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন। ভারচ্যুয়াল আঁতলামো এইভাবে দ্রুতপায়ে এসে যে তাঁদের বাড়া ভাতে ছাই ছড়াবে, এটা তাঁরা প্রেডিক্ট করতে পারেন নি। কিন্তু এদের নাম আছে – যতই নতুন কাপড়ের দোকান হোক মার্কেটে, বাড়ির গিন্নিদের যেমন ‘আদি’ ভার্সেনের উপর একটা অমোঘ টান থাকে – ঠিক তেমনই এই আদি আঁতেলদের উপর আমরা একটা টান অনুভব করি। এদের আশীর্বাদ ধন্য হলে আঁতেল মার্কেটে প্রবেশ স্মুথ হয়। তাই এদের নজরে রাখুন। কিভাবে এদের চিনবেন সেই প্রসঙ্গ পরে। প্রাচীন আঁতেলরা অনেকেই নিজেরা কম্পুটার অপারেট করতে বা টাইপ করতে পারেন না। এঁরা দারস্থ হন চাকুরী ফেরত ছেলে বা মেয়ের উপর। তাই এঁদের পোষ্ট গুলি সাধারণত রাতের দিকে হয়।

তবে কেমন করে ফেসবুক বন্ধু সংখ্যা বাড়াতে হয় সেই বিষয়ে আমার এই ম্যানুয়াল বেশী কিছু বলবে না – কারণ আমার থেকে অনেক বেশী কেপেবল্ ব্যক্তি আপনার আশেপাশেই ছড়িয়ে আছেন। তবে আমি এখানে আলোচনা করব, আপনি কি ভাবে ‘কোয়ালিটি’ বন্ধু-সংখ্যা বাড়াবেন। আলাদা করে নন্ কোয়ালিটি বন্ধু বাড়ানোর জন্য সময় দিয়ে লাভ নেই – দৈনন্দিন কাজের মাঝে সময়টা ব্যইয় করুণ। ট্রেনে যাতায়াত করলে পাশের সহযাত্রীকে জিজ্ঞাসা করুন, পেচ্ছাপখানায় লাইন দিলে ঘাড় ঘুরিয়ে সেই সময় ব্যবহার করুণ – এছাড়া কোন সরকারী কাজে গেলে হাতে যে অফুরন্ত সময় থাকবে সেই ক্ষণে অন্যকে খুঁচান। দেদার নিজের নাম বিতরণ করুণ।
এইভাবে বন্ধুদের ক্রিটিক্যাল মাস্ তৈরী হলে তারপরই স্ট্যাটাস আপডেট দেবার কথা ভাবুন। যদিও আজকাল ফেসবুক্ বলে যে চেনাশুনা না হলে বন্ধু রিকোয়েষ্ট পাঠাবেন না – তবুও আপনি ইন্টারনেট ‘বন্ধু’ ডেফিনেশন ইউজ করুণ। প্রোফাইল পিকচারে সুন্দরী মেয়ের ছবি দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে ফ্রেন্ড রিকোয়েষ্ট পাঠাবেন না। খুব বেশী সংখ্যক সুন্দরী মেয়ে ‘বন্ধু’ ফেসবুকে থাকলে তা ‘আঁতেল’ হবার পথে অন্তরায়।

আপনি নীচের পরামর্শ অনুযায়ী ডিষ্ট্রিবিউশন রাখতে পারেন ফ্রেণ্ডদেরঃ

ক) ১০% পরিবারবর্গ, ল্যাংটো বেলার বন্ধু ইত্যাদি
খ) ১০% সফট্ওয়্যারে কাজ করে এমন
গ) ২০% প্রবাসী বাঙালী
ঘ) ১০% অচেনা ছেলে আঁতেল (কলকাতা বেসড্)
ঙ) ৫% সুন্দরী মেয়ে
চ) ১৫% শিক্ষিত, ভালো পোষ্টে চাকুরীরত
ছ) ৫% চ্যাঙড়া কম বয়ষ্ক
জ) ৫% নামকরা সাহিত্যিক
ঝ) ২০% যারা অলরেডী ওয়েবজিন ইত্যাদি বার করে ফেলেছে

উপরিউক্ত প্রত্যেক প্রজাতির নির্দিষ্ট রোল আছে। এদের প্রত্যেককে নিয়ে আলোচনা করতে হলে তা এক পৃথক বই হয়ে যাবে – তাই সংক্ষেপে কিছু বিবরণ দিয়েই কাজ সারব এই ম্যানুয়ালে। ডিটেলসে যেতে হলে আমার অন্য ম্যানুয়াল পড়তে হবে।

ক) ১০% পরিবারবর্গ, ল্যাংটো বেলার বন্ধু ইত্যাদিঃ

পরিবারবর্গের উপস্থিতি আপনার প্রোফাইলে স্টেবেলিটি আনবে – মানে আপনি যে ফেক্‌ নয় সেটা এরা প্রমাণ করবে। সাধারণত এরা ওয়ান লাইনার ছাড়বে – “তুই কি করছিস ওদিন”, “মাসি কি পূজোয় আসবে এবার” ইত্যাদি। এগুলোর জবাব আপনি ওয়ালে লিখবেন না। পারশোনাল ফেসবুক ম্যাসেজের দ্বারা দেবেন। কারণ ওয়ালে মা-মাসি নিয়ে আলোচনা আঁতেলদের মানায় না। যদি চট্‌ করে ভেগ্‌ উত্তর মাথায় আসে বা আপনার উত্তরে যদি ‘আঁতলামো’ কিছু ঢোকাবার জায়গা থেকে তবেই ওয়ালে উত্তর পোষ্ট করবেন। এই জাতীয় উত্তর চলতে পারে, “আমি এখন একটা প্রুফ নিয়ে একটু বিজি আছি”, “দেবুদা ওইদিন পাঁচটায় নন্দনে থাকতে বলেছেন” ইত্যাদি। এই ধরণের উত্তর কদাপি নয় “মা সেদিন থেকে জ্বালাচ্ছিল মাসির বাড়িতে সজনে ডাঁটা দিয়ে আসার জন্য”, “পুটকির পাতলা পাইখানা হচ্ছিল বলে ডাক্তার খানা ছুটতে হয়েছিল”।

তবে এদের প্রশ্নের উত্তর কিন্তু দেবেন – এদের অবহেলা করা মানে ঘরের লক্ষীকে পায়ে ঠেলা। আপনি পোষ্ট করার সঙ্গে সঙ্গে এরাই প্রথম লাইক দেবে, এরাই বলবে অসাধারণ, এরাই বলবে আগের থেকে আপনি অনেক রোগা হয়ে গেছেন। এরাই আপনার পোষ্ট শেয়ার করবে। মনে রাখবেন এক আঁতেল অন্য আঁতেলের লেখা কখনই শেয়ার করবে না যদি না কোন ব্যাকগ্রাউন্ড রিজ্‌ন থাকে। তাই যতদিন না সেই পিছন পর্যন্ত পৌঁছতে পারছেন বা পিছনের অ্যাকসেস আপনাকে দেওয়া হচ্ছে, ততদিন সামনের জিনিসটাতেই মন দিন ও সন্তুষ্ট থাকুন।

তবে একটা কথা মনে রাখবেন – এদের কমেন্ট কিন্তু আপনাকে খুব ক্লোজলি মনিটর করতে হবে। কারণ এদের মধ্যে অনেকের বেফাঁস কথা বলার প্রবণতা থাকবে। “কি রে হোঁদলে কেমন আছিস”, “পচা, তুই কবে ফিরলি”, “কাল কাকুর সাথে জলা মাঠে দেখা হল” – এই জাতীয় কমেন্ট তুড়ন্ত মুছে ফেলতে হবে ওয়াল থেকে ঠিক যেমন ভাবে প্রবল সিপিএম কালে পাঁচিলের গায়ে আঁকা হাত চিহ্ন মুঝে যেত। বিলিভ্‌ মি – হোঁদল নাম নিয়ে আঁতেল সমাজে নাম করা খুব দুরূহ। তাই মুছে ফেলার মত সেনসিটিভ ডিসিসন শক্ত হলেও আপনাকে নির্মম ভাবে নিতে হবে নিজের ইমেজ বাঁচাতে।

খ) ১০% সফট্ওয়্যারে কাজ করে এমন

সফট্ওয়্যারদের কেন দলে দরকার তা আগেই বলেছি। এরাই পাল পাড়ার সুমিতাকে টলিক্লাবের অবন্তিকায় রূপান্তরিত করবে। আর তাছাড়া পরের পয়সায় দেদার ইন্টারনেট অ্যাকসেস করার সুযোগ এদেরই সবচেয়ে বেশী। সময়ও এদের অফুরন্ত – প্রায় ভারতীয় সময় সারাদিনই এঁদের ফ্রী – যতক্ষণ না আমেরিকায় সকাল হয়ে ‘বাগ্‌’-রা জ্বালাতন করতে শুরু করে। এঁদের কথা মাথায় রেখেই উইক এন্ডে পোষ্ট করার আগে ভাববেন। তবে উইক এন্ডে পোষ্ট করা এক প্রকার শাঁখের করাত – আপনাকে কজ্‌-এফেক্ট এন্যালিসিস করে তবেই ডিসিসন নিতে হবে। আপনি গাছের এবং তলার একই সাথে খেতে ও কুড়াতে পারবেন না। পোষ্ট টাইমিং-এর বিষয়ে পরের ধাপে আলোচনা করা হবে ডিটেলসে।

গ) ২০% প্রবাসী বাঙালী

প্রবাসী বাঙালীরা এই খেলার এক প্রধান ঘুঁটি – এঁরাই এখন বাঙালী সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। এঁদের ছেলেরা বাঙলা পড়ে না এবং এনারাও বিশেষ শেখাতে চান না। তবে স্যোসাল গ্যাদারিঙ-এ কিছু পেগ চড়বার পর ছেলেদের বাঙলা না শেখার আফশোসটা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। তাই তেড়েফুঁড়ে ছেলের ভাগের বাঙলাটাও নিজেকে পড়ে নিতে হবে এমন ভেবে ফেসবুকে ছড়াতে বসেন। আগে বই কিনতে হত পয়সা দিয়ে – এখন ফ্রীতে বই ডাউন লোড শুরু হবার পর বাংলা নিয়ে চটকানো আরো বেশী শুরু হয়েছে। আর তা ছাড়া সশরীরে এঁদের কোন বাঙালী সাংস্কৃতিক মোচ্ছবে থাকার সুযোগ কম। ইন্টারনেট এসে, বিশেষ করে ইউনিকোড বাঙলা চালু হবার পর বিপ্লবটা এঁরাই এনেছেন। আপনি কলকাতায় বসে রাতে পোষ্ট করলে এনারা দিনের বেলায় অন্য জায়গা থেকে পড়তে পারবেন – বিশেষত অফিসে থাকাকালীন – তাই এঁরা অমূল্য।

তবে কিনা বাঙলা সাহিত্যে ইদানীং প্রবাসী বাঙালীদের অবদান দিয়ে বাঘা বাঘা প্রবন্ধ লেখা হচ্ছে, আগে যেমন লেখা হত বাঙলা সাহিত্যে বিহারের অবদান নিয়ে – সব রীতিমত গবেষণা মূলক। সেই সব ডিটেলস্‌ আপনার না জানলেও চলবে – শুধু জেনে রাখুন এঁরা নড়ে উঠেছেন – টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষের মত, খাজুরাহের নতুন গুহার মত এনারা নতুন রূপে আবিষ্কৃত হয়েছেন – এঁদের ব্যবহার করুণ।

ঘ) ১০% অচেনা ছেলে-আঁতেল (কলকাতা বেসড্)

অচেনা ছেলে-আঁতেলদের প্রোফাইল পর্যালোচনা করে আপনি কলকাতার হাল হকিকত জানতে পারবেন। জীবনানন্দ সভাঘরে ‘ঘোড়ামুখী’ নামক জার্নাল বইয়ের উদ্বোধন থেকে, কাফিলা-কফিতা-কফি হাউসে পোষ্ট-পোষ্ট-পোষ্ট মর্ডান ভাবধারা পেরিয়ে নতুন – নতুনতর – নতুনতম –চরমতম কবিতা সৃষ্টি, মাণিক-মৃণাল কাটিয়ে নো-বাজেট, নো-ডাইরেকশন, নো-আর্টিষ্ট ইত্যাদি ফিল্ম। থিওরী অব্‌ এভরীথিংয়ের মত সব কলাকে কেন্দ্রীভুত করে আমার কলাই শ্রেষ্ঠ নামক বুকে মোচড় দিয়ে ওঠা বিজ্ঞপ্তি – সব কিছু সম্পর্কে আপনি অবহিত হবেন। আর তা ছাড়া আপনি গ্রামের দিকের লোক হলে এদের ফলো করেই আপনার ভাষা শুদ্ধি ঘটাতে হবে। আঁতেল সমাজে ব্যবহৃত কোড ওয়ার্ড এরাই আপনাকে বুঝতে সাহায্য করবে। এদের প্রোফাইলে লটকানো ছবি দেখে আপনি নিজের পোষাক আপডেট করবেন। পাঞ্জাবী আর শান্তিনিকেতনী ব্যাগের বাউন্ডারী থেকে বেরিয়ে গড়িয়াহাটের ফুটপাথ কিভাবে বাঙলা সংস্কৃতিকে বদলে দিচ্ছে সে সবে ইনফরমেশনের উৎস হবে এরাই।

ঙ) ৫% সুন্দরী মেয়ে

সুন্দরী মেয়েদের সাথে সাধারণত সাংস্কৃতিক আঁতলামোর বিশেষ সম্পর্ক থাকে না – যদি অবশ্য আপনি ফ্যাশন বা রবিঠাকুরের গান সমন্ধীয় আঁতেল হতে চান। তবে যেহেতু আমি ধরে নিচ্ছি আপনি মধ্যবিত্ত মানসিকতার এবং আপনার বাবা আপনাকে কম্পুটার কিনে দিয়েছে, তাই আপনি বেশী ফ্যাশন মারাবেন না। সুন্দরীরা থাকবে সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্যই। এদের ট্র্যাক করেই অনেক অজানা পাবলিক আপনার প্রোফাইল ভিজিট করবেন। অর্থাৎ আপনার নাম ছড়ানোর সুযোগ থাকবে, যদি অবশ্য আপনি ছড়ানোর মত মাল রাখতে পারেন আপনার কাছে।

বেশীক্ষণ সুন্দরী মেয়েদের প্রোফাইল ঘাঁটবেন না – ডিপ্রেশন আসতে পারে। আর সুন্দরী মেয়েদের কাছ থেকে রিপ্লাই আশা করবেন না। হয়ত জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানালেন সুন্দরীকে – দেখবেন হয়ত সে সবাইকে থ্যাঙ্কু জানাচ্ছে পরের দিন, কিন্তু আপনি বাদ! এতে কিছু মনে করলে হবে না। সুন্দরী দের ফালতু টাইপের ছেলেদের প্রতি একটা করুণা ধরণের কিছু থাকে – আপনাকেই এই ফাঁক এক্সপ্লয়েট করে তার ফেসবুক বন্ধু হিসাবে টিকে থাকতে হবে।

যদি কোন ভাবে সেই করুণার সুযোগ নিয়ে সুন্দরী মেয়ের সাথে ছবি তোলার সুযোগ পান তবে একটা-দুটো ছবি তুলে নিজের প্রোফাইলে পোষ্ট করবেন। তবে বেশী না – বেশী ছবি না থাকলে তবেই না লোকে খুঁজবে! ওই যে কথায় আছে যা চাপা দেওয়া তার উপরেই আমাদের লোভ বেশী – সানি লিওনকে এই সূত্র মেনেই জামা কাপড় পরে হিন্দী সিনেমায় নামানো হয়েছে।

চ) ১৫% শিক্ষিত, ভালো পোষ্টে চাকুরীরত

এদের আপনার দরকার প্রোফাইল ওয়েট বাড়ানোর জন্য – যতই হোক পাঁচড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের থেকে গ্ল্যাকসো রিসার্চ ল্যাবের ম্যানেজার আঁতেল সমাজেও বেশী আদৃত। যেমন ভাবে নাম করা কোম্পানীরা ভালো কলেজে ক্যাম্পাসিং করতে যায় – ঠিক তেমনই আপনাকে শিক্ষিত ভালো পোষ্টে থাকা পাবলিক হন্ট্‌ করতে হবে। এদের কিছু একটা ভুজুং-ভাজুং দিয়ে আপনাকে বশ করতে হবে। একটু মধ্যবয়সী হলে ভালো হয় – যদি তার উপর তেনার কোট-প্যান্ট পরা ছবি থাকে তা হলে তো কেল্লাফতে! এরাই আপনাকে রবীন্দ্রনাথ, উত্তমকুমার মনে করাবে পদে পদে। নিজেদের ক্রীয়েটীভিটি কম থাকার জন্য এঁরা মূলত লিঙ্ক শেয়ার করেই সময় কাটাবেন। কেরিয়ার তৈরী হেতু উচ্চমাধ্যমিক নাগাদ ‘শেষের কবিতা’ পড়ার পর বাংলার সাথে এদের আর কোন সম্পর্ক ছিল না। এখন ছেলে ক্লাস নাইন-টেনে ওঠার পর হাত খালি করে এঁরা একবার শেষ্ট চেষ্টা করতে ময়দানে নেমেছেন। “কাল ছিল ডাল খালি” – এরাই মনে রেখেছেন। কালকে কেবল ডাল থাকলেও আগামী দিনের মাছ, মাংসের স্বপ্ন দেখতে এরাই আপনার হাতিয়ার হবে।

ছ) ৫% চ্যাঙড়া কম বয়ষ্ক

এরা আপনার প্রোফাইল লাইভলি রাখবে। প্রথম দিকে যখন কেউই আপনার ওয়ালে কিছু পোষ্ট করবে না তখন এরাই কার্টুন, স্মাইলি দিয়ে আপনার প্রোফাইল কোলাপ্স হবার হাত থেকে বাঁচাবে। আপনার ডিপ্রেশনের সময় (যেটা ছোট আঁতেলদের নিত্যসঙ্গী) এরাই জোকস্‌ পড়িয়ে আপনাকে বাঁচিয়ে রাখবে। আপনার থেকেও যে কেউ অন্তসারশূন্য হতে পারে এদের দেখেই আপনি সেটা টের পাবেন।

জ) ৫% নামকরা সাহিত্যিক

এরা ফেক্‌ হবার চান্স বেশী - এঁরা আপনার প্রোফাইলে থাকলে হালকা একটা সুবিধা পাবার সম্ভাবনা থেকে যায় – গ্যারান্টি নেই। তবে রিক্সও তেমন নেই বলে এঁদের রাখার পরামর্শ দেওয়া। পোয়াবারো হয় যদি এদেরই মধ্যে কেউ আপনার পোষ্টে কমেন্ট করে। সেই ক্ষেত্রে ওই কমেন্টকে ঘিরে আপনাকে তাজমহল গড়ে তুলতে হবে – যেমন ভাবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের লোকেরা খুঁজে পাওয়া চামচ থেকে মধ্যযুগের একটা গোটা সমাজের ইতিহাস ফাঁদে। যা কিছু পাওয়া সম্ভব তার সবটুকু আপনাকে নিঙড়ে নিতে হবে – কমেন্টকে ডেড হতে দেবেন না – কমেন্টের উপর কমেন্ট করে সেটাকে বাঁচিয়ে রাখুন। “উপরোধে ঢেঁকি গেলা” আপ্তবাক্যটি স্মরণে রাখবেন। কমেন্ট করার স্ট্র্যাটীজী পরের ধাপে বর্ণনা করা হবে।

ঝ) ২০% যারা অলরেডী ওয়েবজিন ইত্যাদি বার করে ফেলেছে

মনে করুন যে এরা হেড স্টার্ট পেয়ে গেছে – এরা আঁতেল কারিগরও হতে পারেন। একটা সাগরময় ঘোষ মরে গিয়ে হাজার হাজার সাগরময় জন্ম নিয়েছে। এরা পশ্চিমবঙ্গ বামফ্রন্টের অনিল বিশ্বাস। মূল পার্থক্য এই ওয়েব ম্যাগাজিন সম্পাদকেরা আড়ালে থাকতে ভালোবাসেন না, এঁদের চাই লাইম লাইট। এরা অনেকেই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোয় বিশ্বাস করেন না – তাই ঘরের খেয়ে ঘরেই কুকুর পোষেন। তবে যাই হোক না কেন – এদেরকে আপনার দরকার হবে, প্রবল ভাবেই হবে। কারণ শুধু ফেসবুকে স্ট্যাটাস আপডেট করেই তো আর আঁতেল হওয়া যাবে না! প্রথম দিকে আপনার দরকারটা এক মুখী হবে – আপনাকে এমন একটা স্ট্রাটেজী নিতে হবে যে ওদেরো আপনাকে দরকার হয়ে পড়ে। মনে রাখবেন ওয়েবজীন হোল্ডারদের প্রধান দরকার পাঠক – তাই আপনার প্রথম ইন্টার অ্যাকশন হবে পাঠক হিসাবে। দুম করে ছোট বেলায় ঘোষ পাড়ার ডলিকে লেখা প্রেমপত্রের কবিতাটি আবার পাঠিয়ে দেবেন না যেন সম্পাদককে! প্রথমে বীজ ছড়িয়ে আপনাকে তাতে নিয়মিত বারি সিঞ্চন করতে হবে। মোটকথা ছুঁচ হয়ে ঢুকে আপনাকে ফাল হয়ে বেরোতে হবে – এবং তার জন্য ধৈর্য্য চাই।

এখন ঘটনা হল নিজের পরিবার বর্গ ছাড়া বাকীদের সাথে আপনি ফ্রেন্ড হবেন কি করে? আপনি দুম করে রিকোয়েষ্ট পাঠালে সেটা অ্যাকসেপ্ট নাও হতে পারে! সেটা যেন চার না ফেলে মাছ ধরতে বসে যাবার মত হবে! অনেক খেলার মত এই খেলাতেও আপনাকে প্রতিটা স্টেপ মেপে ফেলতে হবে – উপরিউক্ত প্রতিটা প্রতিটা ফেসবুক প্রজাতি আলাদা – প্রত্যেকের সাথে হ্যান্ডেলিং হবে কাষ্টম ডিজাইন্ড। আলুর বস্তা আর ডিমের পেটি এক ভাবে হ্যান্ডেল করতে গেলে আপনার ফাটিয়ে ছড়াবার সম্ভাবনাই বেশী।

দরকার হলে কুকুরের মত ল্যাজ নাড়তে নাড়তে হবে। মনে রাখবেন এটা একটা আর্ট – কবি বহুদিন আগেই তাই বলে গেছেন –

“কুকুরের লেজ নাড়ানো একটা আর্ট
আমি কয়েকটা নেড়ি কুকুরকে জানি
লম্বা ভারী মানুষকে দেখলেই
যারা প্রচণ্ড গতিতে লেজ নাড়তে থাকে”।
(নেড়ি বৃত্তান্ত – শ্যামল শীল)

আপনার কাছ হল সেই ভারী মানুষদের আইডেন্টিফাই করা - ম্যানুয়ালের পরের ধাপে সেই সব হ্যান্ডেলিং ও আইডেন্টিফিকেশন পদ্ধতির বিশদ বিবরণ থাকবে।

[ক্রমশঃ]

ইন্টারনেট পাবলিক হ্যান্ডেলিং পদ্ধতি স্বাভাবিকভাবেই ম্যানুয়াল হ্যান্ডেলিং পদ্ধতির থেকে আলাদা। এই জগতে আপনাকে প্রবেশ করতে হলে প্রথমেই কিছু ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে ফেলতে হবে – যেমন, “চালাকির দ্বারা মহৎ কার্য সিদ্ধ হয় না”। এটা পুরোপুরি অচল নেট জগতে – মনে রাখবেন নেটে যা কিছু মহৎ কাজ আজ পর্যন্ত সিদ্ধ হয়েছে সবই চালাকির দ্বারা। শুধু গায়ে গতরে খেটে এই ফিল্ডে টাইপ করা ছাড়া আর কিছু সুবিধা হবে না। আর যদি ছবি চালাচালি না করেন, তা হলে পোষাক নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না নেটে খেলতে হলে। আপনি এমনকি শরীরচর্চাও করতে পারেন – পেটানো বডি হতে পারে, যেটা থাকলে প্রাচীন কালে আঁতেল হওয়া একটু টাফ ছিল। কোন রোগ না থাকলেও চলবে, চোখের কোণে কালি, পেটে অম্বল, সুগার এই সব কোন অনুসঙ্গও নেট আঁতেলদের হাতিয়ার হিসাবে বিবেচিত হয় না আর।

মুখোমুখি তর্কের দিন যেতে বসেছে প্রায় – এখন যা কিছু শুরু তার সবই টেপাটিপি দিয়ে, কী-বোর্ড। তবে সব কিছুর মত এই আঁতেল খেলাতেও প্লাস-মাইনাস আছে বৈকি। মুখোমুখি প্রাচীন আঁতেলদের থেকে ইন্টারনেট আঁতেলামোর প্রথম দীর্ঘস্থায়ী ও সুপষ্ট পার্থক্য হল এরা আপনার স্বাস্থ্য দুই আলাদা ভাবে প্রভাবিত করবে। প্রাচীন আঁতেলরা সাধারণত উচ্চরক্তচাপ জনিত উপসর্গে ভুগবেন, যেখানে নেট আঁতেলদের সঙ্গী হবে উৎকন্ঠা। ওরা বুকের ব্যাথায় হাঁসফাঁস তো এরা উদ্বেগে। মুখোমুখী বা প্রাচীন আঁতেলদের ছাড়ানোর একটা নির্দিষ্ট সময় বা প্যাটার্ণ ছিল। এরা মূলত ছড়াতেন অফিস টাইমের পর – অমুক প্রকাশনীর পিছনের ঘুপটি ঘরে, তমুকের বাড়ির নীচের তলায়, ক্লাবে, কাছাকাছি চায়ের দোকানে বা চিরাচরিত কফি হাউসে। এঁদের ছড়ানোর পিক্‌ সিজন ছিল শীতকাল। শীতকালে মানুষের সহ্য শক্তি বাড়ে, মানুষ বেশী সহনশীল হয়, সকালে দেওয়া বগলের সুগন্ধ সন্ধেতেও জানান দেয়, কপালের টিপ-মুখের গোলাপী ছোপ জায়গা পালটায় না – পেট খারাপ কম, অসংখ্য মেলা প্রাঙ্গন এসে ছড়াবার জায়গার ক্ষেত্রফল বাড়ায়। বইমেলার কথা আমি আর আলাদা করে বলছি না। বইমেলার আঁতলামো ম্যানুয়াল আলাদা ভাবে কনসাল্ট করে নিতে পারেন যাদের দরকার। এই সব মিলিয়ে আঁতেল পুষ্টি ও আঁতেল বৃদ্ধির প্রকৃষ্ট কাল ছিল শীতকাল। বিকেল ছটা থেকে রাত আট-নটা পর্যন্ত ছড়িয়ে এঁরা বউয়ের আন্ডারে ঢুকতেন। কিউবিজম্‌, পোষ্ট-মর্ডান মার্কস-ইজম্‌, ইমপ্রেসেনিষ্ট নাড়াঘাঁটা শেষ করে এঁরা বউয়ের চিরাচরিত আলুপোস্ত চটকাতেন।

গরমকালে আঁতেলদের প্রকোপ সাধারণত কম থাকত। ভেজা বগল, ময়লা কলার নিয়ে পেট-ধান্দার আন্দোলন মানুষ টলারেট করতে পারে, কিন্তু সুন্দরবনের উটপাখীর গ্রীবায় অশ্বিনী নক্ষত্র চড়ে বসলে কি টুইষ্ট আসতে পারত তা সহ্য করা টাফ্‌ হয়ে পড়ে। এর ফলে প্রাচীন আঁতলদের দৈনিক ব্যবহার প্রডিকটেবল হত – অফিসে খিঁচড়ে থাকতেন ও আড্ডায় এসে উত্তাল তর্ক তুলে রক্তচাপে ভুগতেন। সন্ধেয় দু-তিন ঘন্টা এঁদের রক্ত ফুটত। এখন যদি কেউ দাবী করেন তিনি এমন আঁতেল দেখেছেন যাঁদের রক্ত ফুটত না – সেই দাবী সঠিক হলেও পুরোপুরি সত্য হবার সম্ভাবনা কম। যাঁরা উত্তেজিত হন না, তাঁদের প্রথম শ্রেণীর আঁতেল হিসাবে পরিচিত হওয়া খুব কষ্টের। উত্তেজিত হওয়া এক প্রাথমিক শর্ত। আপনার উত্তেজনা না এলে বা না থাকলে আপনি অন্য ম্যানুয়াল দেখুন। আঁতেলরা উত্তেজিত হবেন এবং সেই উত্তেজনার বহিপ্রকাশঃ ঘটবে। মিটিমিটি হাসা আর মিনিমাম কথা বলা ছিল নভিস আঁতেলদের লক্ষণ।

তো যাই হোক, প্রাচীন আঁতলরা তুবড়ির মত ছিটকে উঠতেন উত্তেজনায়, আবার দু-তিন ঘন্টা পরে নিভে গিয়ে বাড়ি ফিরে যেতেন। ফলে শরীরের উপর আঁতলামোর এফেক্টটা বেশী দীর্ঘস্থায়ী হত না। এখন নেট এসে আঁতলামোর এই সমীকরণটাই চেঞ্জ করে দিয়েছে। নেট আঁতেলরা এখন উৎকন্ঠায় ভুগছেন – টেনশনে ভুগছেন এবং সব থেকে বড় কথা সেই এফেক্ট ২৪ ঘন্টাই আপনার সাথী। ধরুন আপনি নেটে কোন আঁতলামোর ছিপ ফেললেন – তাতে কেউ ঠোকরাচ্ছে কিনা সেই নিয়ে আপনি ভাবতেই থাকবেন। ২৪*৭ – ঘুমের মধ্যে, বাথরুমে বসে, আলুপোস্ত খেতে বসে, অফিসে বসের সাথে বাক্যালাপে, ক্লায়েন্ট মিটিংয়ে – সর্বদাই। উৎকন্ঠা আপনাকে ছাড়বে না – খালি মনে হবে এই কেউ ঠোকরালো বুঝি! আপনি মিটিং থেকে বেরিয়ে টয়লেটে (বিদেশী স্টাইল) গিয়ে নেটে আপনার ছিপটাকে লক্ষ্য রাখবেন। কম্পিউটারে বসে কাজ করলে, আপনার ছিপের পেজটা মিনিমাইজ করা থাকবে স্ক্রীণে। ডেটিং-য়ে গেলে এই টেনশনের প্রকোপেই আপনি মাঝে মাঝে বেফাঁস কথা বলে ফেলবেন।

নিজের ছিপ চেক্‌ করার সঠিক সময় শিখুন। সকালে উঠেই নেট চেক করবেন না – আগে পায়খানা সারুন। না হলে উল্টোপাল্টা কমেন্টের চাপে টেনশনে এসে লাইফে কোষ্ঠকাঠিন্য ঢেকে আনবেন, এবং বিশ্বাস করুন সেটা ওয়ার্থ নয়। ঠান্ডা মাথায় চা-টা খান। এবার চেক করুন – ভাবুন কি জবাব দেবেন, অফিস যাবার বা পড়তে যাবের আগের সময়টায় ভাবুন। বেলা দশটা নাগাদ রিপ্লাই দিন। ফের লাঞ্চের আগে চেক করুন – লাঞ্চ কালীন ভাবুন – লাঞ্চ শেষ করে রিপ্লাই দিন। দিনের শেষে আবার সন্ধ্যে নাগাদ চেক – বাড়ি ফিরে রাত আট টা নাগাদ রিপ্লাই। রাত দশটার পর কখনই আঁতলামো নয় – মূল যা ভালোবাসেন তাই করুণ, টিভি বা সিরিয়াল দেখুন। আপনি হয়ত তর্ক করবেন আপনার বহু চেনাশোনা আঁতেল মেন খেলাটা খেলে রাতের বেলা – গভীর রাতে। কিন্তু এটা মনে রাখুন প্লীজ যে আমি এখানে পার্ট টাইম আঁতেলদের জন্য ম্যানুয়াল লিখছি। যারা গভীর রাতে খেলেন – তাঁরা ফুল টাইম আঁতেল – তাই আমার ম্যানুয়ালের বাইরে ওঁরা। যা বলছিলাম, দিনে তিনবারের বেশী ছিপ না চেক করাই ভালো। নতুন কাক গু খেতে শিখলে প্রথম প্রথম প্রায়শঃ খায় – দরকার না থাকলেও! আপনার অবস্থা তেমন হলে – চেক করতে পারেন, তবে রিপ্লাই ওই দিনে তিনবার। সাকসেস পেতে হলে ওয়েট করতে শিখুন। উত্তেজনার বসে রিপ্লাই দেবেন না, ‘আমি চ্যালেঞ্জ করছি’ এই জাতীয় শব্দ ব্যবহার করবেন না। খালিপেটে প্রশ্ন পড়তে পারেন কেবল – খাওয়ার সময় ভেবে, ভরা পেটে উত্তর দিন। অযথা স্মাইলি ইত্যাদি ব্যবহার করবেন না। খুব রাগ এলে বড়জোর একটা হাসিমুখ স্মাইলি চলতে পারে – অন্য কিছু কদাপি নয়।

মোটকথা নেট আঁতেল হতে গেলে আপনাকে ওই টেনশন জাতীয় হেলথ রিক্স নিয়ে মাঠে নামতে হবে – মানসিক শান্তি স্যাক্রিফাইস করতে হবে। ডাক্তাররা অনেক গবেষণা করে দেখেছেন যে উৎকন্ঠার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ক্ষণিকের রক্তচাপ জনিত উত্তেজনার থেকে অনেক বেশী – আঁতেলরাও মানুষ এমন হাইপোথিসিস থেকে এই অনুসিদ্ধান্ত টানা গেছে যে নেট আঁতেলরা প্রচীন আঁতেলদের থেকে বেশী হেলথ রিক্স নিয়ে ময়দানে নেমেছেন। যদি উৎকন্ঠা একদমই টলারেট না করতে পারেন – তাহলে আবার একটা ডিপ্‌ ব্রেথ নিয়ে ভাবুন, আশে পাশের শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে পরামর্শ চান যে আপনার এই খেলায় নামা ঠিক হবে কিনা। সেই বুঝে সিদ্ধান্ত নিন – এমনকি প্রাচীন আঁতেল ক্যাটাগরীতে শিফট্‌ও করতে পারেন। তাই আমি এই ম্যানুয়ালে আমি আপনাদের এমন সব সহজ স্টেপ বাতলাবার চেষ্টা করব যাতে করে আপনার আঁতেল জনিত উৎকন্ঠা যেন হঠ্‌ করে বেড়ে না যায়।

আপনি হয়ত এমন সব জিনিস শুনে ফেলেছেন – মানুষের মন এক গভীর, অনন্ত জিনিস – একে ট্রেন করা যায়, বিশেষ পদ্ধতিতে অভ্যাস করলে একে ইলাষ্টিকের মত বাড়ানো-কমানো যায় ইত্যাদি ইত্যাদি। এবং হয়ত আপনাকে কেউ যোগা বা শ্বাসক্রীয়া প্র্যাকটিসের হদিস দিয়ে ফেলেছে। মনে রাখবেন ওই পথ আঁতেল পথের থেকে আলাদা – আপনি যদি রাজনৈতিক আলোচনা করে আঁতেল হতে চান, তবেই শ্বাসক্রীয়া নিয়ে খেলতে ঢুকবেন। সাহিত্য, সিনেমা আঁতেলদের সাথে বাবা, তাবিজ, কপালভাতি ঠিক যায় না। আমি ওই সব সাজেশনে যাব না। সকালে উঠে উপুর বা চিৎ হয়ে ফোঁস ফোঁস খুবই আন-সফিসটিকেটেড এবং শারীরিক পরিশ্রম সাধ্য ব্যাপার। এগুলি সব রি-অ্যাকেটিভ মেজার – এক আঁতেল নেবে প্রো-অ্যাকটিভ স্টেপ। এই ম্যানুয়াল অনু্যায়ী চললে আপনার আঁতেল লাইফে টেনশন আসবেই কম, কন্ট্রোল তো তার পরের কথা! তবে এটা একটা ব্যালান্সের খেলা – রিক্স না নিলে আপনি এগোতে পারবেন না – আঁতেল মোক্ষের দিকে আপনার পদক্ষেপ হবে খুবই গুটিগুটি। আমার প্রস্তাবিত স্ট্রাটেজী হল নিজের চামড়া গণ্ডারের মত মোটা করা। প্রথমে হালকা টেনশনে নিন, হালকা গালাগাল খান, হালকা অপমানিত হন। দেখবেন যতই নেট আঁতেল ডিপ্লোমার দিকে এগোচ্ছেন ততই আপনার চামড়া মোটা হচ্ছে। একবারে শেষের দিকে দেখবেন – আপনি মোষের মত এক নোঙরা জায়গায় ঢুকে মনের সুখে কাদা ঘাঁটাঘাঁটি করছেন – আপনার গায়ে অসংখ্য মশা, মাছি, ডাঁশ, এমনকি কাকও বসেছে – কিন্তু আপনার কোন বিকার নেই। তবে সে পরের কথা – আপনি অলরেডী এমন অবস্থায় চলে গেলে আপনার আর এই ম্যানুয়াল পড়ার দরকার আছে বলে মনে হয় না। তাই তার আগে কিছু জরুরী কথা –

প্রথমেই ভারী বা বিতর্কিত কিছু পোষ্ট করবেন না – ভারী ব্যাপার হলে উত্তরে সিনিয়র আঁতেলরা আরো কিছু পোষ্ট করবে। আপনি তার বেশীর ভাগই বুঝতে পারবেন না – তাই আপনার টেনশনও বাড়বে। আর বিতর্কিত হলে আপমর পাবলিক হেদিয়ে পড়বে – ভারত গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলার দেশ হবার জ্বালা টের পাবেন। সবাইকে সন্তুষ্ট করে কি রিপ্লাই দেবেন আপনার মাথায় আসবে না। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন শত্রু তৈরী না হয় খেলতে নেমেই! আপনার অবস্থা দামী রেষ্টুরেন্টের ওয়েটারদের মত – কাষ্টমার ইজ অলওয়েজ রাইট। এই আপনার অর্ডার এল বলে – এই জাতীয় ভেগ উত্তর দিয়ে দিয়ে আপনার টেনশন বেড়ে যাবে। আবার একেবারে হালকা কিছু মার্কেটে ছাড়লে আপনি নিজেকে আলাদা করবেন কি করে? নিজের ক্ষেত্র মানে ফিল্ড বুঝতে শিখুন – আমার পরামর্শ কবিতা দিয়ে শুরু করুন। এতে পড়াশুনা কম দরকার, কোটেশন খুঁজে পেতে সুবিধা বেশী, বাঙালীরা প্রায় সবাই স্বভাব কবি, টাইপ করার কষ্ট কম। এর পর আসতে আসতে ঢুকবেন গদ্য, প্রবন্ধ, জীবনী ইত্যাদিতে – তারপর সিনেমা (আঁতেল বা আর্ট ফিল্ম), খেলা – ব্রেষ্ট ক্যান্সার, ধর্ষণ এই জাতীয় সাম্প্রতিক সমস্যা ইত্যাদি। মনে রাখবেন গ্লোবাল ওয়ার্মিং এখন লোকে খাচ্ছে না।

শুরু করা যাক কবিতা দিয়ে – দুম করে রবীন্দ্রনাথ পোষ্ট করবেন না। বড় মাছ খেলিয়ে তুলতে হয় – আর তা ছাড়া ব্র্যান্ডেড মালের যত্ন নিতে হয় বেশী। তা বলে আবার বিনয়ও পাতে দেবেন না যেন! সিনিয়র আঁতেলরা নিজেরাই এখনো বিনয় নিয়ে ধ্বন্ধে আছে। আসতে আসতে ক্ষেত্র তৈরী করতে হবে। প্রথম দিকে একটু অচেনা, কিন্তু সহজপাচ্য এমন জিনিস মার্কেটে ছাড়তে হবে। যেমনঃ

“অনুবাদ হয় না কান্নার।
নীরবতাই পারে তিন বিশ্ব পার হয়ে
দুই মেরু ছুঁতে।
একটি পোষ্টকার্ড পারে জীবনের মানে বদলে দিতে”। (মৃদুল দাশগুপ্ত)

খুব সোজা – অথচ খুব চেনাও নয়। আবার ইদানিং মুছে যাওয়া কিছু শব্দও রয়েছে এখানে, যেমন ‘পোষ্টকার্ড’। যখন উদ্ধৃতি দেবেন কোটেশন মার্ক ব্যবহার করুন, কিন্তু কবির নাম দেবেন না। যদিও আপনি যাষ্ট টুকে দেবেন বা কপি পেষ্ট করবেন – কিন্তু এমন প্রস্তাবনা দেবেন উদ্ধৃতিটি ছোঁড়ার আগে – “আজ সকালে কেন জানি না মনে পড়ে গেল এই লাইন গুলো – অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারছি না কার লেখা”!

যদি ঠিক মত চার ফেলে ফ্রেণ্ড জুড়তে পারেন – উত্তর আসতে বাধ্য। দু-তিনজন রিপ্লাই দিলে আপনি জানতে চাইবেন তাঁরা সিওর কিনা কবির নাম সম্পর্কে – কবিতার নামটাও তারা জানে কিনা এবং ততসহ ধন্যবাদ জ্ঞাপন।
প্রথমেই কনফিউশন তৈরী করবেন না। মনে রাখবেন আপনার ফ্রেণ্ড লিষ্টে ২০ ভাগ প্রবাসী, দশ ভাগ শিক্ষিত বাঙালী এবং মাত্র দশ ভাগ আঁতেল। তাই পোষ্ট মর্ডান কবিতা প্রথমেই দিলে তা এক নেগেটিভ এনার্জি বেরিয়ার তৈরী করবে। আপনাকে প্রথমে প্রমাণ করতে হবে যে আপনি উটকো আঁতেল নয়, আপনার সাথে বাঙালী ঐতিহ্যের নাড়ির যোগাযোগ আছে। মনে রাখবেন রবি আর জীবু ছাড়া আঁতেল হবার পথ এখনও সুগম হয় নি – এই নেট জগতেও! পরাত পক্ষে ছন্দ নিয়ে আলোচনায় ঢুকবেন না – ওই ধরণের আলোচনা শুধু মাত্র লাইক দিয়েই সেরে দেবান। মাত্রা বৃত্ত, স্বর বৃত্ত, দলবৃত্ত নাম কটা মনে রাখুন, এরা হল বাংলা ছন্দের নাম। বাকি জানা জরুরী নয় – এমনও বলব, না জানাটাই শ্রেয়! তবে যদি অমৃত্রাক্ষর আর পয়ার এর নাম শোনা থাকে তো আপনি অনেকটা ভিতরে ঢুকে পড়লেন আঁতেল হবার দিকে।

কিছুদিন ওয়েট করে দেখুন পাবলিক কেমন রেসপন্স দিচ্ছে – তেমন বুঝে আবার ছাড়ুন। দুই বাংলার কবিকেই ব্যবহার করতে হবে – ইন্টারনেট বাঙালীরা সেনসিটিভ। মেয়ে কবিদের নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে, মাঝে মাঝে দুই একটা ছেড়ে দেবেন – তা না হলে কেউ আবার আপনাকে পুরুষবাদী বলে দেগে দেবে! এবার দিন,

“কার স্বার্থে এই পণ্ডশ্রম? মানুষ কি ক্রমাগত
নিজেকে ধ্বংসের জন্য প্রাণপণে প্রস্তুত হচ্ছে না?” (রফিক আজাদ)

আপনি ক্যাপশন দিন, “কে বলে কবিরা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা নয়? রফিক আজাদ সেই কবেই লিখে গেছেন! হ্যাঁ কবি, আপনিই ঠিক, আমরা জেনেশুনেই ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছি – দুই বাঙলাতেই”।

এবার আনুন রবীন্দ্রনাথকে – হালকা টুইষ্ট দিয়ে,

“শুনে রাখ দৈনিক, চা খাইয়ে চৈনিক
গায়ে যদি বল থাকে হতে পারে সৈনিক
জাপানিরা আসে যদি চিঁড়ে নিক দৈ নিক
আধুনিক কবিদের যত খুশী বই নিক”।

আপনি লিখুন, “রবীন্দ্রনাথ রসিক ছিলেন এটা নতুন কিছু কথা নয়। কিন্তু তিনি নিজে জাপান ঘুরে এসেও কেমন ভাবে লিখতে পারলেন যে জাপানিরা চিঁড়ে, দৈ এই সব নিক বলে? নাকি আধুনিক কবিদের নিয়ে রসিকতা (মস্করা শব্দটা ব্যবহার করবেন না – রবীন্দ্রনাথের সাথে ওটা যায় না) করেছেন? চিঁড়ে, দৈ যেমন জাপানিদের কাছে অখাদ্য, তেমনই অখাদ্য আধুনিক কবিতা?”
এবার আপনি ছিপ ফেললেন – ওয়েট করতে থাকুন। মনে মনে প্রার্থনা করতে থাকুন আলোচনা হোক আপনার প্রোফাইলে, কিন্তু আলোচনার রাশ যেন আপনার হাতে না থাকে! কারণ আপনি তো আর জানেন না যে জাপানীরা সত্যি চিঁড়ে, দৈ খায় কিনা!

[ক্রমশঃ]

এই পর্ব থেকে প্রাচীন, ক্ল্যাসিক্যাল আঁতেলদের কেবল ‘আঁতেল’ আর ইন্টারনেট আঁতেলদের নেট + আঁতেল = নাঁতেল বলা শুরু করব, পাবলিকও কম কনফিউজ হবে।

বাঙালী নাঁতেলদের কার্যকলাপ সাধারণত সীমাবদ্ধ থেকে সাহিত্য, সংস্কৃতি, সিনেমা, রাজনীতি ইত্যাদির মধ্যে। তবে ইদানিং দেখা যাচ্ছে কিছু বাঙালী আমজনতা খেলাধূলা বিষয়ক নাঁতেল মোক্ষের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে আঁতেলদের মূল আলোচনা ফুটবলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। এই যুবক নাঁতেলরা ক্রিকেটকেও আলোচনার মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলেছে – এবং সেটা হয়েছে ৬/২ বীরেন রায় রোড বেহালার বাসিন্দা ভারতীয় ক্রিকেটকে মোটামুটি ঝঁকিয়ে দেবার পর। মাঝে একটা বিশাল জেনারেশন গ্যাপ ছিল – সুঁটে ব্যানার্জী ও পঙ্কজ রায়ের পর বাঙালী আবার ক্রিকেট নিয়ে মুখ খোলার সুযোগ পেল। তবে সেই আঁতলামো দেখার সুযোগ সবার হয় নি – সুঁটে জনিত ঘটনা এতই প্রাচীন যে ওই নিয়ে যাঁরা ফার্ষ্ট হ্যান্ড নাড়াচাড়া করছেন তাঁদের হদিস পেতে হলে আপনাকে কলকাতা গ্যাজেটের স্মরণাপন্ন হতে হবে হয়ত। যা শোনা যেত তা হল সুঁটে নাকি বঞ্চনার শিকার – এই নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামানোর কিছু ছিল না। আমরা বাঙালীরা বঞ্চনা জাতীয় আঁতলামোতে সিদ্ধি লাভ করেছি ভারত স্বাধীন হবার পর। বীরেন রায় রোডের শুরুটাও সেই বঞ্চনার ধাঁচেই শুরু হয়েছিল – আমরা সবাই স্যাটিস্ফায়েড এবং কমর্ফট জোনে ছিলাম – আঁতেলরা চাদের খোরাক পেয়ে গিয়েছিলেন।

কিন্তু কি হইতে যে কি হইয়া গেল, ভারতীয় ক্রিকেটের ব্যাটন বীরেন রায় রোডে চলে এল – বাঙালীকে আর কে আটকায়। আঁতেলরা অবশ্য বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল কিছুটা। তো সেই ব্যাটন বদলের ইমিডিয়েট এফেক্ট হল রাজু মুখার্জীর আজকাল কাগজে রিপোর্টিং ক্যারিয়ারে হালকা দোলা ও টালমাটাল। যে ঐতিহাসিকরা পরাজিত ও বঞ্চিতের ইতিহাস লিখে ক্যরিয়ার গড়ে তোলেন তাঁদের পক্ষে হঠ্‌ করে বিজয়ীর জয়গাথা লেখা সোজা নয়। আর সুদূরপ্রসারী এফেক্ট হল গৌতম বাবুর সেরা খেলার খুচরো সহ বেশ কিছু চটি বই। আঁতেলরা ঘাবড়ে গিয়েছিল এই ভেবে যে চচ্চড়ির মশলা দিয়ে কিভাবে বিরিয়ানী রাঁধা হয়ে গেল! এর উত্তর খুঁজতে কফি হাউস থেকে হারুদার চায়ের দোকান সব তোলপাড়। বীরেন রায় রোডের বাসিন্দাকে নিয়ে প্রথমে আঁতেল ও পরে নাঁতেলরা চটকালেও, আঁতেলরা প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য করেছিল ব্রাহ্মণ বংশীয় এক বাঁ-হাতি বাঙালী স্পিনারের বঞ্চনা নিয়ে। বিধর্মী অধিনায়কের আন্ডারে সদ্‌জাত ব্রাহ্মণের লাঞ্ছনা নিয়েও নাকি হালকা গুঞ্জন হয়েছিল। এর পরিপূর্ণ ইতিহাস ডকুমেন্টেড নয়, তবে কোন আঁতেল নাকি পয়েন্ট আউট করেছিল, বাঙালীর অধঃপতনের মূলে নাকি দুপুরের মাছ-ভাত। এশিয় কাপের সময় লাঞ্চের পরে ভারতের ফিলডিং ছিল – বাকি সবাই স্যাণ্ডউইচ-স্যুপ খেলেও, বাঙালী স্পিনার নাকি পদ্মার ইলিশ দিয়ে ভাতের লোভ সামলাতে পারেন নি। ফলে বল করার ডাক এলে তিনি নাকি রোদের থেকে বঙ্গবন্ধু স্টেডীয়ামের থার্ডম্যান এরিয়ার ছায়াটি প্রেফার করেছিলেন।

যাই হোক আমি ক্রিকেট নিয়ে নাঁতেল হবার পদ্ধতির দিকে যাব না। কারণ সে এক দুঃসাধ্য এবং কাঁটা সংকীর্ণ, কম্পিটিটিভ মার্কেট। ক্রিকেট নিয়ে জ্ঞান নেই এমন বাঙালী তো কোন ছাড়, কোন বিহারী পাওয়ায় অসম্ভব। তাই যেখানে সবাই আঁতেল সেই মার্কেটে ইনভেষ্ট না করে অন্য সাবজেক্টে মন দেওয়াই ভালো বলে আমার মনে হয়। ক্রিকেট নিয়ে আপনাকে আলোচনা চালাতে হবেই, সেই আপনার পাসপোর্টের রঙ যতই বদলাক না কেন! স্যোসাল গ্যাদারিং-এ আমেরিকান ফুটবল বড়জোড় দশ মিনিট, তারপরই সেই শচীন! আপনি আলোচনা চালাতেই পারেন – কিন্তু মনে রাখবেন আপনি কোনদিনও আঁতেল বা নাঁতেল হতে পারবেন না সেই বিষয়ে। আপনি বিগ্রেডের হাজার মুখের একটাই থেকে যাবেন। তাই খুচরো টাইম পাস – বিতর্ক করবেন ক্রিকেট নিয়ে নাকি অন্য খেলায় মন দেবেন সে ডিসিসন আপনার।

আমি আলোচনা করতে চাইব ফুটবল নিয়ে – এর ফলে আরো একটা সুবিধা কি হবে, আঁতেল ও নাঁতেলদের মধ্যে একটা পারস্পরিক তুলনাও করা যাবে। বাঙালীদের ফুটবলের মূলেও সেই বঞ্চনা – আই এফ এ শিল্ড পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রাচীন ফুটবল প্রতিযোগীতা আর সেখানে ভারতের ফিফা র‍্যাংকিং ১৪৪ থেকে ১৫১ এর মধ্যে ঘোরাফেরা করে। আর ফুটবলের বল ডীষ্ট্রিবিউশনের ব্যাপারটায় বাঙালী গোড়ায় গলদ করে ফেলেছিল – ২২ জন ছেলে কেবল একটা বল নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে দেখে আমাদের করুণাসাগর নাকি প্রত্যেককে একটা করে বল কিনে দেবার আদেশ দিয়েছিলেন। অতো বলে কনফিউশন থেকে বাঙালী সেই এখনো রিকভার করতে পারে নি। নাঁতেল হতে গেলে প্রথম নির্দেশ হল আন্তর্জাতিক হতে হবে। আন্তর্জাতিক অর্থে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ (ই পি এল) নিয়ে ফোড়ন কাটা মাষ্ট। নিজের ক্যাপাসিটির উপর ডিপেন্ড করে এবার এ্যাড-অন্‌ করে যান নীচের ক্রমানুসারে – স্প্যানিশ লীগ (লা লীগা), ইতালী (সেরী), জার্মান (বুন্দেশলিগ), ফ্রেঞ্চ ও ডাচ ইরেডিভিসি। আর ফুটবলের সাথে হলিউডিও মিক্স চাইলে বেকহ্যাম আর মেজর লীগ সকার (এম এল এস) এই নাম দুটি মনে রাখবেন। কেউ বেশী চটকালে এইটা বলে থেকে যাবেন, “এম এল এস হল বৃদ্ধদের বানপ্রস্থ”।

ফুটবল আঁতলেমিতে কিন্তু কোনভাবেই কোলকাতার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল না। মফস্বল এমনকি আমার নিজের মত প্রতন্ত্য গ্রামগুলিতেও ফুটবল আঁতেলে বেশ ক্রাঊডেড ছিল। আমার নিজের মেজ জ্যাঠা, কাকা ও পাড়ার কালাম কাকা ক্ল্যাসিক আঁতেল হলে আমার বাবা হাফ আঁতেল ছিল। তখনকার গ্রামের আঁতলেমিতে মোহনবাগান, ইষ্টবেঙ্গল ও মহামেডানের (তখনও মহামেডানকে বড় ক্লাব ধরা হত – আর মোবা ইবে এরা জন্মায় নি) প্রাধান্যই ছিল বেশী – মাঝে মাঝে এরিয়ান, কালিঘাট বা বি এন আর দের নাম ছুঁড়ে দেওয়া হত ফোড়ন হিসাবে।

অন্য যে কোন বিষয়ের মত এখানেও আঁতেল ও নাঁতেল দের মধ্যে প্রধান তফাত হল ইনফরমেশনের প্রতুলতা বা অপ্রতুলতা। আঁতেল সমাজের হাতিয়ার ছিল রেডিও ধারাভাষ্য, খবরের কাগজ ও আজকাল গ্রুপের ‘খেলা’ নামক পত্রিকা। টিভির আগমন অনেক পরে – আর পরিসংখ্যান/তথ্য এসব তো অনেক দূরের কথা। ইনফরমেশন সোর্স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আঁতেল হবার চ্যালেঞ্জও বাড়তে লাগল। আমার কাকা ‘খেলা’ পত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক ছিল, মেজজ্যাঠা কলকাতা লীগের অ্যাপ্রুভড রেফারী। ফলে আঁতেল হিসাবে এদের একটা হেড স্টার্ট ছিল। তবে কাকা চুপচাপ প্রকৃতির মানুষ হবার জন্য আঁতেল হিসাবে নাম করতে পারে নি। খেলা পত্রিকা, আনন্দবাজার, বর্তমান, সাথে সন্তোষ রেডিওর জ্ঞান নিয়ে কাকা চিরকাল মেজ জ্যেঠুর ছায়াতেই থেকে গেল।

সমস্ত আঁতলামোতেই আপনাকে কিছু নাম জানতে হবে – আঁতেলদের হাতিয়ার চুনী, শৈলেন, মেওয়ালাল, সুভাষ, হাবিব, বা মজিদ হলে নাঁতেলদের হাতিয়ার নেইমার, মেসী, রোনাল্ডো, রুনী। অডিয়েন্স বুঝে আপনাকে অ্যাডাপ্ট করতে হবে – অডিয়েন্স যা জানতে পারে তার থেকে এককাঠি উপরে আপনাকে পেঁচিয়ে বলতে হবে। জ্যাঠা শ্যাম থাপার ব্যাকভলীর বিবরণ দিয়ে নারাণ ময়রার চায়ের দোকান সরগরম রাখত। ওখানে কারো সেই ব্যাক ভলী দেখার সৌভাগ্য হয় নি – ফলে জ্যাঠা আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে যা খুশী বলতে পারত। থাপা যা করে নি জ্যাঠার ভাষ্যে তাও বাস্তব হয়ে যেত – থাপা তিনফুট জাম্প দিলে নিমো গ্রামে সেটা পাঁচ ফুটে দাঁড়াতো। আপনার সে সুযোগ হবে না – কেবল টিভি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে – তা ছাড়া লাইভ ম্যাচ মিশ করলে ঝট করে ইউটিউব! ফলে নাঁতেলদের কলপ্লেক্স হতে হবে – রোনাল্ডো কতটা জাম্প দিয়েছে বা মেসি কয়জনকে ড্রিবল্‌ করেছে তা উল্লেখ করে আপনি মার্কেটে পাত্তা পাবেন না – আপনাকে ছড়াতে হবে রোনাল্ডো কি খেয়ে ট্রেনিং করে, কতক্ষণ ট্রেনিং করে বা ওদের জাঙ্গিয়া কি ভাবে ঘাম শুষে ডিসপার্স করে অন্ডকোষগুলিকে ঠান্ডা রাখে সেই সব বলে। আপনি কি জানেন রোনাল্ডো কি ভিটামিন বা এনার্জি সাপ্লিমেন্ট খায়? জানেন কি কোন কম্পানীর হাত ব্যাগে করে এরা ট্রেনিং গ্রাউন্ডে নিজেদের জুতো নিয়ে যায়? একটু খুঁজতে হবে – অন্য নাঁতেলরা হয়ত যাচাই করতে পারবে। কিন্তু জ্যাঠার প্রবচন যাচাইয়ের সুযোগ ছিল না। তবে আঁতেলদের কষ্টও ছিল – জ্যাঠাকে কলকাতা ময়দানে যেতে হত ১০০ কিমি দূর থেকে ট্রেন, বাস ঠেঙিয়ে – আর আপনি লুঙি পড়ে মেসিকে জানবেন ঘরের ড্রেয়িংরুমে বসে। ফলে কমপ্লেক্সসিটি তো নাঁতেলদের আনতেই হবে!

আঁতেলরা আবার দলবদল নিয়েও ছড়াতে পারতো – তবে এই বিষয়টা এমনই যে আপনি নাঁতেল হয়েও এটা নিয়ে ছড়াতে পারবেন। আঁতেলদের প্রধান হাতিয়ার দলবদলের সময় ছিল সকালের খবরের কাগজ। আর নাঁতেলদের হাতে এসে গেছে চব্বিশ ঘন্টার খবর আপডেট, ইন্টারনেট, কেবল টিভি ইত্যাদি। তবে সেই বাঙালী চার্মটা আর নেই – কটক থেকে খেলে ফেরার পথে হাওড়া স্টেশন থেকে তমুক উধাও। পল্টু দাস শিশিরের বাড়ি গিয়ে ওর বুকে সোনার হার দিয়ে বাজিমাত করল, দলবদল নিয়ে কৃশানু-বিকাশের সম্পর্কে চিরফাট, চিমাকে গায়েব করে দিয়েছে কারা! এই সব রোমহর্ষক খবর – তখন খবরের কাগজ কেনার ক্ষমতাও সবার ছিল না – তাই যার বাড়িতে প্রথম কাগজ, আঁতেলেমির প্রথম থাবাও তার। তবে কলকাতা দলবদল নিয়ে উত্তেজনা কমে যাবার আরো একটা কারণ হল – বাঙাল-ঘটিদের মধ্যে সামাজিক মেলামেশা বেড়ে যাওয়া। এমনকি বাঙাল-ঘটিতে বিয়ের সংখ্যাও এখন বেড়ে যাচ্ছে, ফলে কাঠ বাঙাল বা আদি ঘটি বলতে কিছু থাকছে না – সব মিশ্র জাত, কনফিউজড পাবলিক। নাঁতেলরা এখনও মাঝে মাঝে একটা হালকা চেষ্টা দেয় মোবা-ইবে ঘটি বাঙাল এই নিয়ে। কিছু এদের অনেকেরই বেস থাকে না – ফেসবুকেই এদের উদয় ও অস্ত। কমেন্ট করেই এরা খালাস – সেই কমেন্টকে ফলো আপ করে সামাজিক টেনশন তৈরী করার কোন প্রচেষ্টা এদের মধ্যে দেখা যায় না। বুক ফুলিয়ে বাঙাল ভাষা বলার পাবলিকও কমছে – শখ করে বাঙাল ভাষা বলে ইবের সলিড সাপোর্টার হওয়া যায় না! অন্যদিকে আমি জনতাকেও পুরোপুরি দোষ দিতে পারি না – সফটওয়ার কম্পানিতে কাজ করে ‘মাইর‍্যা, কাইট্যা ফ্যালামু’ এই কথা মুখে মানায় না, যেখানে সারাদিন কাজের ধরণটাই অ্যাপোলোজেটিক, মানে ক্লায়েন্ট তুষ্টি। তাই প্রখর, সলিড ইবের সাপোর্টার এখনো আমাদের দিকে আছে, চাল ব্যাবসায়ী, ট্রেনের হকার, অটো ড্রাইভার ইত্যাদিরা।

তবে আমার মনে হয় আই-লিগ শুরু হওয়া, কেবল টিভি এসে বাইরের ফুটবল ঘরে ঘরে ঢুকে আঁতলামো পেপার বেস থেকে সরে গিয়ে ডিজিটাল হইয়ে পড়ে। নাঁতেলরা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। আগে আমাদের একজন-দুইজন-তিন বা চারজন বিদেশী। আমাদের মজিদ, চিমা, এমেকা – আই লীগ ঢুকে পরে আমার জ্যাঠার মত আঁতেলরা খেই হারিয়ে ফেলল। আর্মান্দো ভারতীয় নাকি বিদেশী! অমল, পিকে, নইম, সুভাষ ছেড়ে কনষ্টান্টাইন, বেঞ্চেরাফা এরা ঢুকে পরে জল ঘোলাটে করে তুলল। ভারতীয় ফুটবল কলকাতা বেস ছেড়ে গোয়া কেন্দ্রীক হয়ে গেল। আর এখানেই নাঁতেলরা খেলাটা ধরে নীল – কারণ ওদের মূল বেশ প্রথম থেকেই বিলেত কেন্দ্রীক ছিল। আমাদের ছোটবেলায় প্রিমিয়ার লীগ ছিল না – তাই আমাদের মেমারীতে ক্লাবের নাম ছিল জুভেন্তাস। নামে একটা চার্ম ছিল – আর আম পাবলিকের দৌড় ছিল পি সি আইন্দহোভেন পর্যন্ত – যদিও ওই নামে ক্লাবের নাম দিতে কেউ সাহস পায় নি!

বাঙালী ফুটবল আঁতেল ট্যাকটিক্স নিয়ে আলোচনায় বেশী যেত না – কবে অমলবাবু নিজের গ্যাঁটের পয়সা খরচ করে বিদেশে বিশ্বকাপ দেখে আসবে আর ভিডিও কিনে আনবে তার জন্য ওয়েট করত বাঙালী। আঁতেলদের ট্যাকটিক্স বলতে ছিল উইং দিয়ে দৌড় আর ডিফেন্স চেরা পাস। কোন কোন আঁতেল আবার অবশ্য টোটাল ফুটবল, কাত্তানেচী আর সুইপার এই নিয়ে মাথা ঘামাতো। প্রদীপ (মাটির) নিভে যাবার আগে জ্বলে উঠল অমলের ডায়মন্ডে। কেবল্‌ টিভি তখন সবে আসছে – বিদেশী ডায়মন্ডে বাঙালী পুরো ঘেঁটে গেল – তা না বুঝল রূপক, রাতুল – না বুঝল দেবাশিস! আদতে অমলবাবুই আমাদের বাঙালী আঁতেলদের ট্যাকটিক্স বিষয়ক আদর্শ ছিলেন। পিকে উত্তম হলে, অমল সৌমিত্র! আমজনতার পেলে-মারাদোনা থাকলে আঁতেলদের ছিল ক্রুয়েফ বা আরো এককাঠি উপরে জর্জ বেষ্ট। নাম চমকাতো আঁতেলরা। এই সব বিচার করে ফুটবল নাঁতেল হবার ইচ্ছাপ্রার্থীদের নীচের বিষয়গুলির উপর নজর দিতে বলা হচ্ছে –

প্লেয়ারদের নাম নিয়ে এখন কাউকে চমকানো প্রায় অসম্ভব। তাই আপনাকে প্রচলিত লিগের বাইরে বেরোতে হবে। নেট ঘাঁটতে থাকুন – বিদেশী ক্লাবগুলির সাইটে গিয়ে ঢুঁ মারুন – প্রবল ঠান্ডা পরার আগে রাশিয়ান লীগের, উজবেগ লীগের, বেলজিয়ান লীগের বা মধপ্রাচ্যের উঠতি প্লেয়ারদের নাম নোট করুন। এই সব লীগ নিরপেক্ষ বিশেষ কেউ ফলো করে না – স্কাউটগুলো ছাড়া। তাই আপনি মার্কেটে দিন যে অমুক মিডফিল্ডার দারুণ। তমুক ফরোয়ার্ড সিক্স ইয়ার্ডে চনমনে, বা এই প্লেয়ারটা দারুণ বল হোল্ড করতে পারে নিজের গোলের দিকে মুখ করে এই সব। এমন হালকা বিতর্কও সৃষ্টি করতে পারেন – যে গালাতাসারের এই প্লেয়ারটার খেলা ইউটিউবে বাবাকে দেখালে বাবা বলল যে নাকি প্রদীপ তালুকদারের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। ছয় গজে থাকলে এরা শরীরের যে কোন অঙ্গ ব্যবহার করে গোল করতে মরিয়া – বিশেষত হাঁটু দিয়ে। আঁতেলরা বিশ্বকাপ দেখার পর এমন বিতর্ক ছড়াতেন – যেমন চিলির জামরানো-সালাস দের দেখে শিশিরের কথা মনে পড়ে যায় – বক্সের মাথা থেকে হেড দিয়ে গোল করে!

নাঁতলামো এখন প্রায় সারা বছরের ফুলটাইম জব। আগষ্টে সিজিন শুরু হবে আর মে মাসের শেষের দিকে ক্রিশ্চিয়ানো বান্ধবীকে নিয়ে সিসিলিতে ছুটি কাটাতে গেলে তবেই আপনার বিশ্রাম। তবে মাঝে যদি আবার ইউরো বা বিশ্বকাপ পড়ে যায় তো হয়ে গেল! আফ্রীকান কাপ অব নেশনস বা কনফেডারেশন কাপ সিজিনের মাঝেই হয় এই যা রক্ষে!। প্রীমিয়ার লীগ টিম করে খেলা বা ইউ আর দি ম্যানেজার এই সব নেট বেসড্‌ গেলে বেশী সময় না দেওয়াই ভালো। কারণ টিম তৈরী করে প্রতি সপ্তাহে তা চালানো আবার এক্সট্রা চাপ অন টপ অব নাঁতলামো। আর তা ছাড়া আপনার ভার্চুয়াল টিম নির্ঘাত ছড়াবে – নিজের কনফিডেন্স নষ্ট হবে। মনে রাখবেন বিরোধী দল হওয়া শাসক দল হবার থেকে ঢের সোজা! আপনি বাইরে ফ্লোটিং থেকে জ্ঞান দিন – চট করে কিছু কমিট করবেন না – আমন জিনিস ছাড়ুন – আমি হলে ভিডিচের উপর এবার ভরসা তুলে নেবার সময় এসে গেছে বলতাম হয়ত – হি হ্যাজ পাষ্ট হিজ বেষ্ট ইট সিমস! ইট সিমসটা জুড়তে ভুলবেন না। কারণ পরের ম্যাচে আবার ভালো খেললে আপনার রিকভার করার দরজা খোলা রাখতে হবে। বা এমন বলুন – আমি আগেই বলেছিলাম টেরী শেষ হয়ে যায় নি। স্লো হয়েছে তো কি হয়েছে - মর্ডান ফুটবল শুধু দৌড়ে খেলা হয় না – পজিশন্যাল প্লে এখন ইমপর্টেন্ট – ঠিক জায়গায় ঠিক সময়ে থাকতে হবে উপস্থিত। তবে ভুলেও ‘ব্রেন’ ব্যবহার করার কথা বলবেন না – ফুটবল প্লেয়ারদের ‘ব্রেন’ ব্যাপারটা একটা প্যারাডক্স, তাও যদি সেটা ইংলিশ প্লেয়ারদের হয়!

কোচেদের সাক্ষাতকার শুনতে পারেন – পারেন বলবো না, পরামর্শ দেব শোনার জন্য। তবে পরাতপক্ষে ফুটবলারদের ইন্টারভিউ শুনবেন না। লেখার আকারে বেরোলে চোখ বোলাতে পারেন। কারণ ওদের সাক্ষাতকার শুনলে বুকের ভিতর থেকে একটা চাপা কষ্ট তৈরী হবে, আপনার ব্রেনে চাপ পড়বে – আপনি বুঝতে পারবেন না যে আপনি স্বাভাবিক নাকি ওরা! এটাও সন্দেহ করতে শুরু করবেন ফুটবলে বেশী হেড দিলে মাথায় দীর্ঘস্থায়ী কোন প্রভাব পরে কিনা। কিছু কোচেদের ইন্টারভিউ শুনবেন, যেমন মরিনহো, গুর্দিওয়ালা, ওয়েঙ্গার, আঞ্জেলত্তি, বেনিতেজ ইত্যাদি। যাদের ইন্টারভিউ শুনলেও বুঝতে পারবেন না তাদের মধ্যে ফার্গুসেন প্রধান। আর যাদের ইন্টারভিউ শুরু হলে চ্যানেল বদলে দিতে হবে তাঁরা হলেন বিগ স্যাম, ডেভিড ময়েস, মার্ক হিউজ, স্টিভ ব্রুস, ইত্যাদি। আপনি অনেকের থেকে অনেক কিছু শিখতে পারবেন – যেমন কেমনভাবে একজন ডিল্পোম্যাটের কথা বলা উচিত তা শিখতে পারেন রবার্টো মার্টিনিজের কাছ থেকে। গুর্দিওয়ালা বা আঞ্জেলত্তির কাছ থেকে আপনি শিখতে পারেন কিভাবে নিজের ডিগনিটি বজায় রেখে বেফালতু প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় যখন কিনা আপনাকে চারিদিক থেকে চিমটানো হচ্ছে। কথায় বলে সুখী লোকের কাছে থাকিও, দুঃখী লোকের কাছেও থাকিও, কিন্তু বিরক্ত লোকের কাছে কদাপি নয়। তো সেই হিসাবে আপনি ওয়েঙ্গারের আশেপাশে কেন থাকা উচিত নয় সেই মহত সত্য অনুভব করতে পারবেন। বুদ্ধিমান লোক, জ্ঞানী লোক – কিন্তু সবসময় বিরক্ত। আর তা ছাড়া আপনি শিখতে পারবেন কিভাবে কোন ঘটনা থেকে কেবল নিজের সুবিধা মত মাখন তুলে নিতে হবে। আমি এদের নাম করছি কারণ এরা প্রত্যেকে আপনাকে নাঁতেল হবার এক একটা এলিমেন্ট শিখে নিতে সাহায্য করবে। তবে যদি আপনি কিছু না শিখে, সময় ব্যায় না করে ময়দান নামতে চান তা হলে আমার পরামর্শ হবে আপনি স্রেফ মরিনহো কে ফলো করে যান। পুরো বক্স অফিস – এঁকে গালি দেবার সুযোগ প্রতিনয়তই আপনি পাবেন, একটু বুদ্ধি খাটিয়ে আপনাকে এঁকে ভালোবাসার কারণ কারণ খাড়া করতে হবে – যেমন একটা হল – ওলওয়েজ এ উইনার। আলোচনায় ঢুকুন – আপনি সাথী পেটে বাধ্য। কিন্তু মনে রাখবেন এই খেলা খেলতে গিয়ে আপনি কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা তা ঘুলিয়ে ফেলবেন। যেটা হোক একটা আঁকড়ে ধরুণ – দুমদাম চেঞ্জ করবেন না, কারণ নাঁতেলদের সবকিছুই ডকুমেন্টেড ও রিট্রিভেবল থাকে নেটে – আপনার অনিচ্ছা সত্ত্বেও! নিজের বাবার সাথে কথা খুঁজে না পেলে বিগ স্যামের ইন্টারভিউ দেখান বাবাকে – আপনার বাবার সুভাষ ভৌমিকের কথা মনে পড়ে যাবে – “এই বো----গুলো খেলাটা পুরো নষ্ট করে দিল। শু--- বাচ্ছাদের ধরে ক্যা—উচিত।“

আপনি নাঁতেল হিসাবে আলোচনা করতে পারেন ফরমেশন নিয়ে – জিনিসটা একটু আপনাকে বুঝিয়ে দিলে জলের মত – ৪-৪-২, নাকি ৪-৫-১। মানে ১০ জিনিসটা তিন-চার ভাগে ভাগ করুন যেখানে আগার দিকে ওয়েটটা থাকবে। ব্যাস! আর যেখানে দেখবেন বল যেখানে পাবলিক সেখানে, তাকে বলবে ‘টোট্যাল’ ফুটবল। কেউ হাঁফিয়ে পড়লে আর কেউ সারাক্ষণ সামনে খাড়া থাকলে ডায়মন্ড। কারো খেলা চোখকে কষ্ট দিলে সে হল সুইপার – আর নিজের পেনেল্টি বক্সে গুঁতিয়ে বল তাড়া করলে নো ননসেন্স ডিফেন্ডার। এই ভাবে মতামত ঝারুন – গোলকিপার নাড়াচাড়া করে না, তাই ওর পজিশন বিচার করবেন মাঠের প্রেক্ষিতে নয় বরং তেকাঠির প্রেক্ষিতে। বাঙালীদের মধ্যে স্টপার শব্দটি ব্যবহারের একটা প্রবণতা আছে – সেটি করবেন না – ফুলব্যাক, সেন্টার ব্যাক, হোল্ডিং মিডফিল্ডার এই সব দিয়ে কাজ সারুন। উইং জিনিস এখনও চলছে – এমন মন্তব্য বিতর্ক ডেকে আনবে – রবেন কে দেখে আমার বিকাশ পাঁজির কথা মনে পড়ে গেল!

যে বাঙালী চাঁদের পাহাড় সিনেমা বিভূতিভূষণকে ধরতে পারি নি বলে রাত জেগে মতামত দেয় – তারাই আবার আমার ক্লাব লিভারপুল বলে পাতা ভরিয়ে জাষ্টিফাই করে। এই জিনিস যে এতটাই হাস্যকর সেটার বোঝার মত ক্ষমতাও অনেক নাঁতেলের লুপ্ত হয়ে যায় – আপনি সেটা খেয়াল রাখবেন। বৃটিশ সমাজে লিভারপুলের শ্রেষ্ঠ অবদান লিভারপুল ফুটবল ক্লাব নয় – ‘বালটি রেষ্টুরান্ট’। অন্য ম্যানুয়াল পড়ে নাঁতেলরা যে স্বাভাবিক ভুল গুলো করে তা যাতে আপনি এই ম্যানুয়াল পড়ে না করেন – সেই পরামর্শ পরের বার।

[ক্রমশঃ]

সাহিত্য-সংস্কৃতি, খেলা, রাজনীতি ছাড়া ইদানিং নাঁতেলদের আরো দুটি প্রধান টার্গেট এরিয়া হচ্ছে সিনেমা ও সমাজ সচেতনতা। এমনকি পর্যালোচনা করে আমি এমন কথাও বলব যে এই দুই এরিয়াতেই বাইট খরচ হচ্ছে সবচেয়ে বেশী। তবে এটাও মনে রাখবেন এই দুই ফিল্ডে এন্ট্রি পাওয়া বা নাঁতেল হিসাবে নজর কাড়া বেশ টাফ্‌। কারণ এই ফিল্ডে গণতন্ত্র প্রকট - সবাই মতামত দেবে – ঝাঁপিয়ে পড়ে দেবে – সবাই কথাই হবে শেষ কথা – পিরিওড। সবচেয়ে বড় কথা যারা মতামত দেবে তারা নিজেরা বাইট খরচা ছাড়া প্রকৃত সমাজ থেকে এতো দূরে যে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ও আনরিয়েলেষ্টিক চাপান উতর শুরু হবে। নকল-নকল ফাইট চালু হয়ে আপনি আসলি মালের ইল্যুউশনে ভুগবেন। আপনি ভার্চুয়াল সমাজের মধ্যে থেকে ভার্চুয়াল আলোচনা করবেন। আপনি সেই কার্ভড কাঁচের পাত্রের ভিতরের রঙীন মাছ হবেন – আপনিই হবেন ছায়াকে আসল মনে করা প্লেটোর গুহামানুষ। যেমন ভাবে আমরা প্রচণ্ড বেগে ঘুরন্ত মেদেনীর উপর দাঁড়িয়েও বমি বমি ভাব অনুভব করি না, ঠিক তেমনই আপনিও অসংখ্য অপ্রাসঙ্গিক বাইট ছ্যাড়ালেও কোন রকম অস্বস্তি অনুভব করবেন না। কৃষকের জমি থেকে ঋতুপর্ণর লিঙ্গ – সব হারানোতেই থাকবে আপনার সমান কমফর্ট। তবে সমাজ সচেতন নাঁতেলদের নিয়ে আলোচনা পরের ভাগে। এই ভাগে হবে একটু সিনেমা নিয়ে নাড়াঘাঁটা।

প্রথমেই বলে নিই – অন্তত কিছুদিন ব্যাক অব্‌ দি মাইন্ড এই কথাটা মনে রাখার চেষ্টা করবেন – The industry is shit, it’s the medium that’s great. যখন দেখবেন এটা আপনার মনে আর ঘোরাফেরা করছে না বা আপনি shit কি জিনিস আলাদা করে পার্থক্য করতে পারছেন না তখনই বুঝবেন আপনি নাঁতেল হবার এন্ট্রি টিকিট পেয়েছেন। আগেও অনেকবার বলেছি, আবার পুনরাবৃত্তি করছি – শুধু নাম চমকে আজকাল নাঁতেল হওয়া যায় না। তবে নাম জানাও জরুরী – শুধু ভারতীয় নাম নয়, শুধু মার্কীন নাম নয় – মনে রাখতে হবে আরো গুটি কয়েক ইতালিয়ান, রাশিয়ান, সুইডিশ, ফ্রেঞ্চ, জাপানি ইত্যাদি দেশের সিনেমা ন্যাশানেলিটির নাম - ল্যুই বুনুয়েল, মিৎসোশুচি, কার্ল ড্রয়ের। লিওপেল্ডো তোরে নিলসন, আন্তোনিয়নি, গোদার্দ, ফেলিনি, ভিসকন্তি, রসেলিনি, কোজিন্‌ৎসভ, তারোভ্‌স্কি, বার্গম্যান। আর মনে রাখবেন সার্গেই আইজেনষ্টাইন আমাদের অন্য ধরণের বাঙলা সিনেমার বাবা। এই সব মাধুর্য আস্তে আস্তে খোলসা করা হবে –

বেশী থিওরী কপচাবেন না। বেশী থিওরী মারালে আপনি ফিল্ম অ্যাকাডেমিক বলে ট্যাগিত হয়ে যাবেন। আপনি হয়ত ট্যারা চোখে তাকাবার মতন নাম হবেন – কিন্তু আপনার অবস্থা হবে সংস্কৃত ভাষার মত – লুপ্ত হবার জন্য ধুঁকবেন, আপনাকে বুঝতে একটা নৃসংহপ্রসাদ ভাদুড়ী লাগবে। থিওরী নিয়ে কপচানো চলতে পারে – তবে তাতে থাকবে একটা ফাইন ব্যালেন্স। ভজহরী মান্না রেষ্টুরান্টের সাথে মিচলিন স্টার রেষ্টুরান্টের যে পার্থক্য, সেই ডিফারেন্স মনে রেখে আপনাকে খেলতে হবে। সেই খেলা হবে গিয়ে আপনার ক্যারাটের ব্ল্যাকবেল্ট মোক্ষলাভের মত। আপনি প্রথম নাঁতেল হবার সবুজ বা ওরেঞ্জ বেল্টের দিকে নজর দিন। আপনি ধর্মতলার মোড়ে ল্যুই ভিটন-এর শ্যো রুম হতে চাইবেন না – কে কবে আপনার দরজা ঠেলে ঢুকবে তার আশায় না বসে থেকে আপনি বরং হোন ধর্মতলারই শ্রী-লেদার্স। এমন চকমকি, সহজপাচ্য জিনিস ছাড়ুন যেন তা লোক টানে – এই ভাবে আপনার অগ্রগতী হোক – শ্রী-লেদার্স থেকে নাইকি থেকে ল্যুই ভিটন। তবে এখানেও আপনাকে গড়িয়াহাটার ফুটপাথের মালের থেকে নিজেকে একটু তফাত রাখতে হবে। এই তফাত শুরু হতে পারে একটু তফাত করা মন্তব্য দিয়েঃ

“ষাটের দশকে সত্যজিত রায় হলিউডে গিয়ে, দেখেশুনে নাকি যথেষ্ট হতাশ হয়েছিলেন এবং পরে এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলান যে আমেরিকান সিনেমায় তখন নাকি কোন কবি ছিল না”। এর সাথে জুড়ুন, “তা সেই কবিত্ব বিহীন আমেরিকান সিনেমার ধারা কি এখনো চলছে না?”

মনে রাখবেন এই এক মন্তব্য ঘিরেই কিন্তু আপনার কমেন্ট অ্যাড-অন হতে পারে যত আপনি ব্ল্যাকবেল্টের দিকে এগুবেন। সবুজ বেল্টের পর্যায়ে অ্যাড হতে পারে, “তা সত্যজিতের সেই হতাশ ভাব দেখে বিলি ওয়াইল্ডার বলেন, “Well, I guess you’re and artist, but I am not. I am just a commercial man and like it that way.”

ব্ল্যাকবেল্ট পর্যায়ের মন্তব্য হবে – “সত্যজিতের আমেরিকান সিনেমায় কবিত্বহীনতার কথা সঠিক ভাবে মানা যায় না। কারণ ঐ মন্তব্যের সমকালীন সময়েই আমেরিকায় অন্তত চারজন ছিলেন যাঁরা প্রত্যেকে একটা করে মাষ্টারপিস উপহার দিয়েছেন – The Searchers (John Ford, 1956), Vertigo (Alfred Hitchcock, 1958), Touch of Evil (Orson Welles, 1958) and Rio Bravo (Howard Hawks, 1959)” ।

তো আপনি যেহেতু নাঁতেল ম্যানুয়ালের আগের ভাগগুলি পড়েছেন তাই নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে এই সব সিনেমা আপনাকে আদপেই দেখতে হবে না – ঘাবড়াবার কিছু নেই। আপনাকে কেবল খুঁজে নিতে হবে যে এই কোটেশনগুলো কোথা থেকে ঝাড়া যায়। ইন্টারনেট যুগে সেটাও খুব একটা শক্ত নয় – আগে আঁতেলরা যেমন খাতায় টুকে রাখত, আপনি নাঁতেল হিসাবে তেমন পেজগুলিকে বুকমার্ক করে রাখবেন ফেবারিটস্‌-এ, সুযোগ মত ঠুকবেন। যতগুলি বিষয়ে নাঁতলামো করতে চান ততগুলি ফোল্ডার তৈরী করতে হবে ফেবারিটস্‌-এ। সিনেমা সংক্রান্ত লিঙ্কগুলি স্বাভাবিক ভাবেই সেভড থাকবে ‘সিনেমা’ ফোল্ডারে – এই সেভিং নিয়ে কোনরকম নাঁতলামো না করাই ভালো। সিষ্টেমেটিক থাকলে বহু বিষয় নিয়ে একসাথে নাঁতলামো করা আপনার পক্ষে স্মুথ হবে।

মনে রাখবেন ভিতরের কনটেন্টের থেকেও নাঁতেলদের বিষয়বস্তু সিলেকশনে আলাদা হতে হবে – হেডলাইন যেন ক্যাচি হয়। এইখানেই শ্রী-লেদার্স আর গড়িয়াহাটের ফুটপাথের তফাত হয়ে যাবে। যারা গড়িয়াহাটের ফুটপাথ জিনিসটা ঠিক বুঝতে পারছেন না – তাদের জন্য কতকগুলি উদাহরণ (কারণ বায়োলজির আনোয়ার স্যার বলেছিলেন যে সর্বত্রই উদাহরণ দিবে) :

• ‘মনের মানুষ’ সিনেমাটি ‘আর্ট’ ফিল্ম গোত্রভুক্ত প্রমাণের জন্য তর্ক করা
• চোখের বালি সিনেমায় ঐশ্চর্য্য রাইয়ের অভিনয় নিয়ে আলোচনা
• ‘বাইশে শ্রাবণ’ সিনেমায় প্রসেনজিতের খিস্তি চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে ঢোকানো
• সিনেমায় রবীন্দ্র সংগীতের ডি-কনস্ট্রাকটেড ফর্মের ব্যবহার নিন্দনীয়

ইত্যাদি

নাম নিয়ে বেশী না চমকাতে উপদেশ দিয়েছিলাম – মানুষ এখন নামে চমকাচ্ছে না, কিন্তু ঘটনার সন্ধান পেলে তাও যদি রসালো হয় বা গল্পের সন্ধান পেলে মাছি এখনও ভনভন করে চারিদিকে। আপনাকে সেই সুযোগ নিতে হবে। মনে রাখবেন রসালো মানে ডিম্পলের বা মন্দাকিনীর বুক, ওরা কত সাহসী ছিল এই নিয়ে যেন আবার সর্বাঙ্গীন আলোচনায় ঢুকবেন না যেন! এমন আলোচনা হল আগে উল্লিখিত গড়িয়াহাটার ফুটপাথ সদৃশ। আপনি আলচনা করতে পারেন বোল্ড বাঙালী নিয়ে – কড়া বিষের সিনেমা গাণ্ডু নিয়ে। বাঙালী ছেলে ল্যাংটো হলে বোল্ড হবে – তবে বাঙালী মেয়ে ন্যাঙটো হলে বেহায়া (আঁতেল বা নাঁতেল সবার কাছেই – কেবল নারীবাদী ছাড়া, এই নিয়ে আলোচনা পরে)। আর সেই নিয়ে বেশী নাড়াঘাঁটা করবেন না। কারণ সেই মেয়ের মা-বাপ সহ যা কিছু চটকাতে দিন আম জনতাকে। স্পেস রাখুন – পাওলীর কোথায় ছত্রাক জন্মেছে একা একাই খুঁজুন – ফেসবুকে এই বিষয়ে আপডেট বউ দেখে ফেললে আপনার নাঁতেল হবার হালকা অসুবিধা হবে। বাঙালী মেয়েদের নিজেদের মধ্যে কম্পিটিশনে স্বামীদেরই চিরকাল বলিদান হয়। বেশী নেট ঘাঁটা আপনার বারণ হয়ে যেতে পারে, বুমেরাং নিজের পিছনে নিজেই ঘুঁসাবার থেকে বিরত থাকুন।

ঘটনা কালেক্ট করুণ, গল্প কালেক্ট করুন – বহুল ব্যবহৃত গল্প, রোমন্থন এড়িয়ে চলুন যদি না তাতে কোন টুইষ্ট থাকে। উত্তম-সুচিত্রা, সৌমিত্র-উত্তম, সত্যজিত-ঋত্বিক এই গুলি সাবধানে এক্সপ্লয়েট করুণ। মৃণাল নিয়ে আপনি সাহসী হতেই পারেন – উনার সিনেমা বেশী কেউ দেখে নি বা দেখে না। মৃণাল-মানিক-ঋত্বিক এটা বলতে একটা শ্রুতি মধুর এফেক্ট আসে বলেই উনি আমাদের মধ্যে জেগে আছেন। তবে ভদ্রলোক এখনো বেঁচে – কিছুদিন আগে সিনেমায় উনার সত্তর বছর হয়েছে শুনলাম নাকি। তবে মৃত্যুর পর আশা করা যায় উনার স্ট্যাটাসটা আরো বাড়বে – মানে ঋত্বিকের সমান হবে। বাঙালীর সিনেমা জ্ঞান ঐ পর্যন্তই – এই মিলিয়ে মিশিয়ে আপনাকে মার্কেট পেতে হবে। যেমন ম্যাডাম মারা যাবার পর সব হামলে পড়ল – বহুল বাঙালী চর্চা করল – কেন তিনি কেন মুখ দেখালেন না শেষ দিন পর্যন্ত। সব চেনাশুনা থিওরী এল – এক প্রকৃত নাঁতেল কিন্তু তার লেখার মাঝে ছাড়ল টুইষ্ট – দাবী করল ম্যাডাম নাকি মুখ দেখাতেন না তাঁর কমার্শিয়াল সুবিধার জন্য! বোঝ কি প্যাঁচ – সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল ব্যখ্যার জন্য। সুপ্রিয়াদেবীকে নিয়ে কমার্শিয়াল কিছু বললে বাঙালী ঘাবড়াত না, আমাদের দাদা কি কি খেতে ভালোবাসতেন তা এখনও আমরা অপ্রকাশিত রবীন্দ্র চিঠির মত নিত্য নতুন ভাবে আবিষ্কার করে চলেছি। কিন্তু কোথাও না উদয় হয়েও কিভাবে আখের গোছানো যায় ভেবে বাঙালী বিভ্রান্ত! সলিড নাঁতলামো – ম্যাডাম যেন না থেকেও ছিলেন – ইথারের মত, ভগবানের মত, কিছুদিন আগের হিগস বোসনের মত, নিঊট্রিনোর মত, এরিয়া ৫১ এর মত, ইউ এফ ও এর মতো।

গল্প বা ঘটনা মার্কেটে ছাড়তে হলে আপনাকে সিলেকটিভ হতে হবে – জীবিত লোকেদের নিয়ে কিছু লিখতে গেলে আপনি হয়ত সেটাকে প্রায় গসিপে পরিণত করে ফেলতে পারেন। নাঁতলামোর প্রথম দিকে মৃত লোকেদের নিয়ে ডিল করুণ – নিজের ইমাজিনেশন থাকলে হার্মলেস গল্প তৈরীও করতে পারেন, সেক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখবেন যেন শুধু কেন্দ্রীয় চরিত্র নয়, গল্পের সব পাত্র-পাত্রীই মৃত হয়। আর নিজের ক্ষমতা না থাকে, ঘটনা ঝারুণ অন্য কারুর লেখা থেকে। নাম করা লোকেদের আত্মজীবনী থেকে না ঝাড়ার চেষ্টা করুণ, কারন সেইগুলি অনেকেরই পড়া থাকবে। আপনি টুইষ্ট বা ভেরীয়েশন আনতে পারবেন না। কম প্রচারিত পত্রিকা বা কম বিখ্যাত লোকদের লেখা পড়ুন বড় ব্যাক্তিদের নিয়ে – সেখান থেকে স্ক্রীণ করে মাল নামান। নীচের গল্পটার মত মাল ব্যবহার করতে পারেনঃ

১। “প্রতিদ্বন্ধী সিনেমার শুটিং করছেন সত্যজিত রায়। ধৃতিমানের একটা স্বপ্ন দৃশ্যের শুটিং হচ্ছে - অল্প বাজেটের ছবি, কিন্তু সেট তৈরী হয়েছে বিশাল। এটা শট হয়েছে, মানিকদা ওকে বলে দিয়েছেন। এমন সময় দেখা গেল এক সহকারী দৌড়ে আসছে উনার কাছে - সে কিন্তু কিন্তু করে বলছে শটটা নাকি আর একবার নিতে হবে - কারণ নায়িকার চুল থেকে একটা হেয়ার-ক্লিপ তার কানের পাশে ঝুলছিল। মানিকদা তাঁর বিখ্যাত গগন বিদারী হাসি হেসে অবলীলাক্রমে বললেন "ও ঠিক আছে, ড্রিম সিকোয়েন্স তো! দেখবে সমালোচকেরা ক্লিপের ঠিক একটা মানে খুঁজে বের করেছে।"

নীচের উদাহরণগুলিও ব্যবহার করতে পারেন সুবিধা মত, এগুলি আপনাকে হালকা বিতর্ক তৈরী করতে সাহায্য করবেঃ

২। মহান পরিচালক বলে গেছেন, “মাস এর কাছে পৌঁছবার অন্য কোন আরো পাওয়ারফুল মাধ্যম এলে আমি সিনেমার মুখে লাথি মেরে চলে যাব”। আজ বেঁচে থাকলে কি বলতেন তিনি? – ফেসবুক, ইণ্টারনেট, ইউটিউব কি ভাবে ব্যবহার করতেন? কিভাবে অ্যাডাপ্ট করতেন তাঁর নীতাকে, দাদা আমি বাঁচতে চাই? তাছাড়া টি বি এখন কিওরেবল ডিজিজ। কি রোগ দিতেন তিনি নীতাকে?

৩। চলচিত্রের দূরহতম দিক কোনটা? ঋত্বিক বলে গেছেন, “আমার অভিজ্ঞতায় চলচিত্রের দুরূহতম দিক একটাই এবং আর কিস্যু নেই। সেটা হচ্ছে পয়সা জোগাড় করা”। ভেঙ্কটেশ আর আরোরা ফিল্ম এসে যাবার পরও কি এই বক্তব্য সত্যি বলে মানব আমরা?

৪। বাঙালী চিরকালই ‘শিল্পী’ রোগে যাঁরা মারা যান তাদের প্রতি একটু ঝোলটানা। মহৎ পরিচালক বলেছেন যে তাঁর একমাত্র চিন্তার বিষয় হচ্ছে তাঁর দেশের মানুষ। তাই দেশ বিষয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে তিনি কি করলেন – সিনেমা তৈরী করা। এবং আমাদের আরো জানালেন যে ছবি তৈরীর মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের ভালো করা! আমাদের কি ভালো হয়েছে সেটাই আমরা এখনো বোঝার চেষ্টা করে যাচ্ছি। চূড়ান্ত আঁতলামোর চরম নিদর্শন – যে টার্গেট অডিয়েন্সের ভালো তিনি করতে চেয়েছেন, তারা কেউ যে তাঁর ছবি দেখে না সেটা বোঝার ক্ষমতা বিষয়ক ভ্রান্তিতে ভোগার জন্য তাঁর নিজেরই প্রতি ব্যবহৃত বিশেষণ ‘পাগল’ আমাদের মেনে নেওয়া উচিত সর্বান্তকরণে।

৫। আগেকার আমাদের সিনেমার পরিচালকেরা অনেকে আঁতেল টাইপের ছিল। অনেকে সিনেমা বানিয়ে তারপর নিজের সিনেমা নিয়েই আঁতলামো করেছে – এও ঠিক আছে – কিন্তু আগে আঁতলামো ঠিক করে তারপর সেই নিয়ে সিনেমা বানাতে গিয়ে অনেকেই ছড়িয়েছেন। ‘আগন্তুক’ থেকে ‘ইতি মৃণালিনী’ তারই নিদর্শন।

নাঁতেল হিসাবে আপনি হয়ত এই পর্যবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা করতে পারেন –

৬। বাঙালীর সাহিত্য, সংগীত এই সব চিরকালই ব্রাহ্মণদের দ্বারা ডমিনেটেড ছিল। এই সিনেমা ফিল্ডেই কিন্তু (অন্তত পরিচালকরা) বাঙালী বৈশ্য ও শুদ্ররা জেগে উঠল। রায় – ঘটক – সেন – ঘোষেরা ছিনিয়ে নিল ভারকেন্দ্র মুখার্জী-ব্যানার্জী দের কবল থেকে। স্বাধীনতা পরবর্তী রেনেসাঁর শুরু করে এরাই।

৭। ও, বাই দি ওয়ে – আমাদের মনে রাখতে হবে, ফিল্ম ইজ্‌ নট মেড। ফিল্ম মেকিং কথাটা বাজে কথা। ফিল্ম ইজ্‌ বিল্ট – ব্রিক টু ব্রিক যেমন ভাবে একটা বাড়ী তৈরী হয়, ফিল্ম তেমনি শট বাই শট কেটে কেটে তৈরী হয়। তবে আজকাল আমরা ওয়ান-রুপী, নো-বাজেট, লো-বাজেট ফিল্মে এর থেকে বেরোবার চেষ্টা করছি। আমরা আর কিছু বিল্ড করছি না – ব্রিক গুলি আলাদা করেই রেখে দিচ্ছি। দর্শক নিজেরা নিজেদের মত করে গড়ুন – আমরা শুধু মেটিরিয়াল সাপ্লাই দিচ্ছি – দিচ্ছি ওদের স্পেস।

দু-চারটে টার্ম মনে রাখবেন – ফ্রীজ ফ্রেম, উইভিং, ফেডিং, ইন্টারল্যুড, লং শট, নিওরিয়েলিজ্যম এই সব। আমার মেজো জ্যাঠাকে এই সব বোঝাতে গেলে বলবে – এক্সপ্রেশন দিবি, মুখে আলো নিবি, এমনভাবে কথা বলবি যেন সবাই শুনতে পায় আর হাত দুটোকে নিয়ে কি করবি সেটা ভাববি। মেজো জ্যাঠা যাত্রা – থিয়েটার আর সিনেমা আলাদা করতে পারে নি – আপনি এই আইডিয়াই এবার সিনেমার ছাঁচে ফেলুন।

সিনেমা বিষয়ে নাঁতেলদের অ্যাডভান্টেজ আঁতেলদের থেকে বেশ কয়েকগুণ বেশী। আঁতেলদের সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে যেতে হত, বিদেশী সিনেমা হলে বছরে মাত্র কয়েকবার, সেই সিনেমা আবার মনে রাখতে হত, সাধারণ মধ্যবিত্ত আঁতেলদের সিনেমা সংগ্রহের কোন উপায় ছিল না। আমার মেজ জ্যাঠার উপরি উক্ত অনেক কোয়ালিটি থাকলেও, কেবল মাত্র ঘটনা ফিল্টার করার ক্ষমতা ও পরিবেশনার খামিতর জন্য আঁতেল হয়ে উঠতে পারে নি। গোরা আউর কালা সিনেমার গল্পের সাথে মেমারী শহরে হেমন্ত – সুনীলের অনুষ্ঠান করতে আসা মিশিয়ে ফেললে আর যাই হোক আঁতেল হওয়া যায় না! তো যা বলছিলাম, এখন নাঁতেলদের সামনে খোলা প্রাঙ্গণ – ঘুরেফিরে, পজ্‌ করে দ্যাখো এই বিশ্ব আমার। তবে নাঁতেলদের সবচেয়ে বড় অ্যাডভান্টেজ হল ইচ্ছেমত সাবটাইটেল ব্যবহারের সু্যোগ মিডিয়া প্লেয়ারগুলিতে। আগে ইংরাজী সিনেমার উচ্চারণ সব আঁতেল ক্যাপচার করতে পারত না – ফলে আলোচনা সীমিত – ক্যামেরার মুভমেন্ট, মাল দেখছিস কেমন কাঁপছিল, তমুকের ওয়াইড অ্যাঙ্গেল শট, তমুকের এডিটিং, ছায়ার ব্যাবহার ইত্যাদি। ডায়লগ নিয়ে চর্চা বেশী ছিল না, গল্প নিয়ে ছিল। এখন সাব টাইটেলের কল্যাণে বাঙালী ইণ্ডিভিজ্যুয়াল ডায়লগ চর্চা করতে শিখেছে। সাবটাইটেল আসার পর থেকেই নাঁতেলরা সাহস পাচ্ছে ‘ট্রেনস্পটিং’ বা ‘ফুল মন্টি’ বা ‘স্ন্যাচ’ এই জাতীয় সিনেমা নিয়ে আলোচনা করার।

আগে ওথেলো দেখল বাঙালী সপ্তপদীতে, উৎপল শুনল, জেনিফার শুনল – আর তারপর আলোচনা চলল ‘ও যেন আমাকে টাচ্‌ না করে’ এই নিয়ে। ‘চ’ এর উচ্চারণের সময় জিবের ডগাটা উলটে গিয়েছিল নাকি সেই নিয়ে।

নাঁতেল ও আঁতেলদের মধ্যে নীচের বৈশিষ্ট গুলো দেখা যায়ঃ

১। যে অভিনেতা বিদেশে জন্মালে একাধিক অস্কার পেতঃ
আঁতেল – তুলসী চক্রবর্তী
নাঁতেল – তুলসী চক্রবর্তী (যারা নাম শুনেছে), না হলে সৌমিত্র

২। ই টি সিনেমার চিত্রনাট্য সত্যজিতের থেকে ঝেড়ে দিয়েছিল হলিউড:
আঁতেল – অবশ্যই, এই নিয়ে আমি অন্তত পাঁচটা রিয়ালেবল ...
নাঁতেল – ই টি আলোচনাতেই আসে না। তিলকে তাল করা আমাদের বাঙালী জাতির ...

৩। জাত অভিনেতাঃ
আঁতেল – আসতে হবে থিয়েটার ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে। শিশির, অজিতেশ, উৎপল, শম্ভুর হাত ধরে শিখতে হবে। ওই জন্যই তো ঋত্বিক যুক্তি, তর্ক, গপ্পো সিনেমায় মাধবীকে নেবে ভেবেও শেষে তৃপ্তিকে নেয়। ওই যে স্ট্রাগল, ওই...

নাঁতেল – মানছি সে কথা – কিন্তু স্ট্রাগল ফুটিয়ে তুলতে হলে নিজে স্ট্রাগল করতে হবে এ কেমন কথা! আমরা আমাদের নো-বাজেট, ওয়ান-রুপী, লো-বাজেট ইত্যাদিতে এই ধারণা থেকে বেরোতে চাইছি। লাইক বাটন দেবে অনেক কিছু করা যায় সেটা আমরা এক্সপ্লোর করতে চাইছি, মিডিয়াকে ব্যবহার করতে শিখতে হবে।

৪। সিনেমায় গল্পের ভূমিকাঃ
আঁতেল – ৯০-১০ ভাগে ভাগ। ৯০ ভাগ মনে করবে সলিড গল্পের দরকার। প্রকৃত সাহিত্য থেকেই প্রকৃত সিনেমা হয়। এমনি এমনি তো আর রবীন্দ্রনাথ, বিভূতি, প্রভাত, রাহুল, শিবরাম, সুনীল, শংকর, তারাশংকর এর কাছে হাত পাতে নি ওরা!

নাঁতেল – গল্প না হলেও চলবে। ক্যামেরা থাকলেই হবে – বক্তব্য থাকলে ভালো হয়। না থাকলেও চলবে।

৫। সমাজ ও সিনেমার মিথোজীবিতাঃ
আঁতেল – নাগরিক চিন্তা, এইখানেই মৃণাল মানিককে মেরে দিয়েছে সে তুমি যতই সীমাবদ্ধ, জনঅরণ্য...

নাঁতেল – নাগরিক চিন্তা বলে আলাদা করে কিছু হয় না। আমাদের এই কমপ্লেক্স, টুইষ্টেড জীবনকে টুইষ্টেড ভাবেই ধরতে হবে হয়ত।

৬। বাঙলা সিনেমার ভবিষ্যতঃ
আঁতেল – প্রায় নেই। ওদের পর আর কেউ নেই – খালি চটক। কিছু প্রতিশ্রুতিবান ছিল – কিন্তু কেউ কথা রাখে নি – সব বিকিয়ে গেছে।

নাঁতেল – ওদের থেকে বেরিয়ে আসাটাই বাঙালী সিনেমার ভবিষ্যত। অমুকদা বেরিয়ে আসতে চাইছে, সেদিন দেখা হতে আক্ষেপ করছিল। কিউ, আর, এস, জেড ব্রেক পেয়েছে – দেখা যাক কতক্ষণ পতাকা নাড়াতে পারে।

৭। বউয়ের প্রভাবঃ
আতেল – আঁতলামো বাড়ির বাইরে – কফি হাউস ইত্যাদি। বাড়িতে তখন আতেল সিনেমা দেখার সুযোগ ছিল না। গৃহশান্তি বজায় রাখতে বউ খুশী ও উত্তম কুমারের জিত।

নাঁতেল – নাঁতলামো বাড়িতে হলে একা একা ইণ্টারনেটে। বউ সাথে থাকলে সর্বদাই উত্তমকুমারের জিত।


ইদানিং নাঁতেলদের মধ্যে সব কলা মিশিয়ে ফেলার একটা প্রবণতা এসেছে। গ্র্যাণ্ড ইউনিফায়েড মাধ্যম নাকি তৈরী হবে – কারো কলা আর আলাদা করে পার্থক্য করা যাবে না। সবচেয়ে এফেক্টেড যারা তারাই এই ঘোলাটে জলের ফয়দা তুলতে প্রথমে নেমে পড়েছে – যেমন কবিতা আর কেউ পড়ে না। তাই দেখবেন সবচেয়ে বেশী নাড়াঘাঁটা হচ্ছে সিনেমায় কবিতার প্রভাব নিয়ে। সিনেমার কবিতাকে দরকার ছিল না বা নেই, আর কবিতা সিনেমাকে আঁকড়ে ধরে ডোবার হাত থেকে বেঁচে লাইম লাইটে আসতে চাইছে। কিছু কিছু চিত্র পরিচালক আবার একসময় কবিতা লিখেছিলেন – যেমন প্রত্যেক বাঙালীই লেখে। সিনেমায় হালকা পা পাবার পর সেই সব কবিত্বর পাঠ চুকে গেছে। কিন্তু কবিরা সেটা ভোলে নি। ভালো কাজ করলেই ও তো আমাদের কবিদের দলে বলে দাবী – যেমন ভাবে রস সাহেব, মাদার টেরেসা, রামন এরা বাঙালী হিসাবে নোবেল পেয়েছেন। সেই পরিচালকদের উইধরা বই উদ্ধার করে খুঁচানো শুরু হয়েছে –

বলুন ওই শটটায় আপনি ওই কবিতার ছায়া পাচ্ছে না? আপনার ‘চরাচর’ সিনেমার সময় ব্যাক অব দি মাইন্ডঃ

“অথচ পায়রা ছাড়া অন্য কোন ওড়ার ক্ষমতাবতী পাখী
বর্তমান যুগে আর মানুষের নিকটে আসে না।
সপ্রতিভভাবে এসে দানা খেয়ে ফের উড়ে যায়”

এটা তো আমার লেখা কবিতা নয় –
তবুও, তবুও আপনার মনে আসে নি এই কবিতা?

সাক্ষাৎকার থেকে মুক্তি পেতে পরিচালক মেনে নেন কবিতার কথা – কবিতা জড়িয়ে ধরে সিনেমাকে – আরো জাপ্টে।

[ক্রমশঃ]

-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আগের পর্বে কথা দিয়েছিলাম যে সমাজ সচেতন নাঁতেল-দের নিয়ে কিছু লিখব। কিন্তু নানা টানাপোড়েন ফলে সেই লেখা আর হয়ে ওঠে নি। এর প্রধান কারণ হল যে, বিড়ালের গলার ঘণ্টা বাঁধবে কে! যতই ভাবি, ক্রমশঃ প্রকট হয় চেনা জানা – চারিদিকের অনেকেই প্রায় এই ক্যাটাগরী ভুক্ত হয়ে পড়বেন। এদের মধ্যে অনেকে আবার এই ক্যাটাগরী ভুক্ত হয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করবেন, অনেকে বুঝতে পারবেন না যে এই বিভাগে নাম লেখানো খারাপ নাকি ভালো! কিছু পাবলিক থাকবেন যাঁদের মধ্যে মনুষ্য জাত মনুষ্যত্ব কিছুটা বজায় আছে – এঁরা প্রবল অফেন্ডেড হবেন এবং নানাবিধ কমপ্লেক্স যুক্তি খাড়া করে মারকাটারি কিছু একটা দাঁড় করানোর চেষ্টা করবেন। এই সব রিস্ক সত্ত্বেও আমি কিছু লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করব – কাউকে তো দাঁড়াতে হবে, কাউকে তো বলতে হবে রাজা তোর কাপড় কোথায়? En tierra de ciegos, el tuerto es rey.

এই পর্যন্ত ঠিক আছে – কিন্তু আমার সময় চলে গেল এটা ঠিক করতে যে, রাজা কে? কাপড়টাই বা কি? আর কোথায়ই বা দাঁড়াবো? আমি অনেক অনেক ভেবে এটা বের করলাম যে, শুদ্ধ সমাজ সচেতন আঁতেল আজকাল পাওয়া দুষ্কর। নাঁতেলদের সমাজ সচেতনার সাথে এখন জুড়ে থাকে রাজনীতি! তাই আমার এই অংশের লেখায় এই দুই প্রকৃতির নাঁতেল অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে থাকবেন। পাঠক পারলে ছাড়াবার চেষ্টা করবেন এই জড়িয়ে থাকা – কিন্তু সে প্রায় না-মুমকিন!

প্রখ্যাত গবেষক প্রোফেসর আলবার্তো মনট্রিলা নেট জগতের এই বৈশিষ্ট নিয়ে বেশ কিছু দিন গবেষণা করেছেন – তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র ছিল ভারত সহ সাউথ ইষ্ট এশিয়ার পাবলিক। গবেষণা করতে গিয়ে তিনি দেখলেন যে ভারতের জনতা এতই ডাইভার্ষ যে অন্য কোন দেশের জিনিস ভিতরে না ঘুঁষালেও চলবে। শুধু ভারতীয়দের ঘাড়ে চড়েই থিওরী নামিয়ে দেওয়া যাবে – আরো ব্যাপার তিনি ভিতরে ঢুকে বুঝলেন যে, ভৌগলিক বাসস্থান দিয়ে কিছু বিচার না করাই ভালো – ভারতে জন্মে বয়স বাড়লেই (অন্তত কিছুটা পর্যন্ত) হবে। কার্যক্ষেত্রে সে মাল এখন যেখানেই থাক, নাঁতেলত্ব বিচারে সেটা কোন বিশাল সমস্যার সৃষ্টি করবে না। ওয়ান্স এ ভারতীয়, অলয়েজ এ ভারতীয়। প্রোফেসর আলবার্তোর ভাষায় - Árbol que nace torcido, jamás su tronco endereza
তা এই প্রোফেসর নিম্ন লিখিত অন্তর্নিহিত কারণ গুলি লিষ্টি করেছিলেন যার উপর বেস করেই তাঁর সমাজ সচেতন নাঁতেল থিওরী গড়ে উঠেছে। তবে এটা বলে রাখা ভালো – নিয়মের ব্যতিক্রম তো থাকবেই, তবে সেটা কিনা আবার তাঁর থিওরীকেই মজবুত করবে পরোক্ষভাবে – এক্সসেপশন প্রুভস দি রুল –

১) হীনমন্যতা
২) নি:সঙ্গতা
৩) পরিচয়হীনতা
৪) শ্রেষ্ঠত্বের ভনিতা
৫) অযাচিত (undeserved) অর্থাগম
৬) ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড
৭) বেকারত্ব ও অবসর
৮) মানসিক সমস্যাজনিত (যেমন সাইকোপ্যাথ, বোকা, গোঁয়ার, ছল ইত্যাদি)

প্রফেস্রর আলবার্তোর প্রায় সমসাময়িক গবেষক অ্যাডাম টাব্‌ এই সব বৈশিষ্টের বেশীর ভাগের সাথে সহমত পোষণ করে হীনমন্যতা-কে সিঙ্গল আউট করেছেন প্রধান কারন বলে। অবদমিত কাম-কে নেড়ে ঘেঁটে, বেশীর ভাগ মানসিক রোগের মূলে দেখিয়ে যেমন ফ্রয়েড কালজয়ী হয়ে গেছেন, অ্যাডাম টাবের আশা আছে হীনমন্যতা-কে ঘিরে তিনি এমনই এক সাম্রাজ্য গড়ে তুলবেন।

স্বাভাবিক ভাবেই এই প্রশ্ন উঠতে পারে যে, হীনমন্যতায় ভুগে একজন হঠ্‌ করে সমাজসেবা চালু করতে যাবে কেন? এই খানেই গোড়ায় গলদ হবার সম্ভাবনা আছে জেনে তাঁদের লেখার মুখবন্ধতে প্রফেসরদ্বয় সতর্ক করে গ্যাছেন – আমাদের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, নাঁতেলদের সমাজসচেতনতা। প্রকৃত সমাজসেবার সাথে এর প্রায়শঃ কোন সম্পর্ক নেই। গোদা বাংলায় বলতে গেলে আমরা কভার করছি নাঁতেলদের থিওরী মারাবার (বা ফাটাবার) জায়গাটা – শীতকালে গরীবদের কম্বল দেওয়া উচিত কি নয় সেই নিয়ে তর্ক – অ্যাকচ্যুয়াল কম্বল কিনে বিতরণের ব্যবস্থাটা নয়! বরং প্রোফেসররা সমীক্ষা নিয়ে ডাটা উপস্থিত করে দেখিয়েছেন যে যাঁরা অ্যাকচ্যুয়াল কম্বল বিতরণ করেন, তাঁরা কম্বল দেবার ফর্ম বা বিতরণের সময় নেওয়া ভিডিও-এর কনটেন্ট নিয়ে চিন্তিত নন। তাঁরা কম্বল বিতরণেই ব্যস্ত থাকেন – Aquél es rico, que está bien con Dios.

অ্যাডাম সাহেব ব্যখ্যা করেছেন যে সেই ভাবে তলিয়ে দেখলে হীনমন্যতার সাবসেটেই আসবে বাকি অনেক অন্তর্নিহিত কারণগুলি। প্রফেসর আনিস আরো গভীরে গিয়ে বিষয়টিকে ঘুলিয়ে দিয়েছিলেন - হীনমন্যতার ফলে নি:সঙ্গতা বা পরিচয়হীনতা প্রকট হয় নাকি নি:সঙ্গতা ও পরিচয়হীনতা থেকেই হীনমন্যতার বীজ মনের গভীরে ঢুকে যায় – সে এক চিকেন এ্যন্ড এগ সিচ্যুয়েশন। আর একবার হীনমন্যতা ভিতরে ঢুকে গেলে তা শুধু সমাজসচেতনা নয়, বাকি সামাজিক বাহ্যিক প্রকাশেও তার জের চলতে থাকে। নিউক্লীয়ার ফ্যামিলি এবং ফ্ল্যাট বাড়ি নামক বহুল চর্চিত বিষয়গুলি ঢুকে পড়ে আলোচনায় গুটুগুটি পায়ে। নো বডি থেকে সামবডি – হয়ে উঠার প্রলোভন আর বাকি মানবিক বৃত্তিকে ছাপিয়ে উঠে। সমাজ সচেতনতা তো দূরে থাক, ফ্ল্যাট বাড়ি মানুষকে ক্রমশঃ সেলফিস হতে সেলফিসতর-তে নিয়ে যায় অজান্তেই। দেশের বাড়ির সাথে সম্পর্ক?- কাট। বাবা-মা বৃদ্ধ? – তুমি একা কেন ভার নেবে? ভাই-বোন তোমার মত সফল নয়? – শুধু রক্তের সম্পর্কে কি আর ফ্যামিলি হয়! ছেলে এই দেখে বড় হচ্ছে – বড় হবার পর চাকুরী কম্পুউটার হাতে পেয়ে নেটে সে কি প্রবল দাপানি! ফ্যামিলি – দুনিয়ার গে, ভাই ভাই – বাঁচা আমাদের বাঁচার অধিকার। যে কোন দিন ফ্যামিলি নিজে পায় নি, তার হীনমন্যতা থেকে বাকিদের শিখতে হয় পরিবার মানে কি। সিরিয়ার রিফিউজি থেকে আফ্রিকান গে, কুর্গ সম্প্রদায় থেকে দিল্লীর ধর্ষিত মেয়ে সবাই আমার পরিবারের অংশ। বাকিদের অধিকার নিয়ে বাইটের পর বাইট জমে। A donde fueres, haz lo que vieres

এমনকি এমনও দেখা গেছে এই নাঁতেলরা তর্ক করছে নিজের বেলায় এক নিয়ম এবং বাকিদের দের বেলায় ফিলজফি মারানো জাষ্টীফায়েড এই নিয়ে। কেউ জিজ্ঞেস করল – ভাই, আজ যদি তোমার পরিবাবের কেউ রেপ হত তাহলে কি তুমিও তখনও এত সব থিওরী মারাতে? জবাব দেওয়া হল – নিজের পরিবার হলে শালা রেপিষ্টের টুঁটি টিপে ছিঁড়ে দিতাম! কিন্তু তাবলে রাষ্ট্রের - ব্লাঃ ব্লাঃ ব্লাঃ। হেন কোন বিষয় নেই যে এঁদের সেই নিয়ে চিন্তা এবং মতামত নেই। মুম্বাইকে ২০০ জনকে গুলি চালিয়ে খুন করে দেওয়া হল – কোই পরোয়া নেই, আমাদের ভাবতে হবে মূল কারণটা কি। কে মারল সেটা বড় কথা নয় – কেন মারল সেটাই বড় কথা। দাদা তুমি কি তাহলে দরজায় তালা দাও বাড়ির বাইরে যাবার সময়? উত্তর আসে বাল-ছালের সাথে তর্ক করতে নেই – এই দুইয়ের রেফারেন্স ফ্রেম আলাদা সেটাই যার বোঝার ক্ষমতা নেই, তাদের সাথে কেন যে তর্ক করতে আসে! Costumbre adquirida en la mocedad, se deja muy mal en la vejez.

তা তর্ক করতে না এলেই হয়! কিন্তু তা এঁরা পারেন না – সেই যে হীনমন্যতা! এদের সামনের ফ্ল্যাটের লোক একে চেনে না – আজ যখন সিলিকন ভ্যালি (ব্যাঙ্গালোর, পুনে, হায়দারাবার, বা প্রকৃত সিলিকন ভ্যালি) বা ভারতের বাইরে থেকে যখন এরা নিজের বাড়িতে আসে, খুব কম লোকই এদের অপেক্ষায় থাকে। এল, কে গেল, কিছু এসে যায় না বাকি কারো – এতেও কি মনের মধ্যে হীনমনত্যা তৈরী হয় না? না হবার সম্ভাবনাটাই প্রবল – কারণ কি হারিয়েছে সেটা জানা না থাকলে কি হারিয়েছে সেটা বোঝা যায় না। ফেসবুকে, স্যোসাল সাইটে অন্যদের নানাবিধ পোষ্ট করা ছবি কি এদের কিছু মনে করিয়ে দেয়? প্রফেসর আনিস এই বিষয়ে নীরব। তবে যেটা হয়, এরা কম্পিটিশনে বেরিয়ে পড়ে – একশো ডলার খরচা করে একটা বস্তি খুঁজে সেখানকার স্কুলে গিয়ে একবেলা খাবার বিতরণ করা হয়। এদের বাচ্ছা মেয়ে/ছেলে সেই গরীবদের ছেলে-মেয়েদের হাতে খাবার তুলে দেয় – বাবা-মা ছবি তোলে, সেই ছবি ফেসবুকে আসে। একশো ডলারের বিনিময়ে সমাজ বিষয়ক আলোচনায় গম্ভীর কিছু বলার অধিকার অর্জিত হয়।

তাও সই – রবীন্দ্রনাথ বর্ণিত লোকোহিত আজকাল একজিস্ট করে না – এ কি মার্ক্সীয় নাকি সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত সেও জানি না – কেবল জানা যায় এ এক প্রবল মেটেরিলেষ্টিক ওয়ার্ল্ড। কিছু দিলে ইন রিটার্ন কিছু পেতে হবে। একশো ডলারের বিনিময়ে ফেসবুকে লাইক – সেও সহ্য করা যায়। কিন্তু অসহ্য হল সেই সব পাবলিক যারা “কোন দিন পেদেও কারো উপকার করে নি”। প্রোফেসর আলবার্তো অবশ্য স্প্যানীশ ভাষায় সেটা বলেছিলেন - A cada necio agrada su porrada. কিছু মাল ছাড়বও না, কিন্তু কি ভাবে মাল ছাড়া উচিত সেই নিয়ে ফান্ডা দেব। প্রফেসর আনিস এর মধ্যেও ফ্ল্যাট বাড়ির প্রভাব খুঁজে পেয়েছেন – ভিখারী তো গেট পারিয়ে ঢুকতে পারে না, শুধু নিবে আর নিবে – দিবে আর নিবে ভাব সম্প্রসারণ এঁদের বাবা–মা শেখায় নি কনফিউশন তৈরী হবে মনের মধ্যে বলে। এদের তর্ক আবার গরীবদের কিছু দান করার মত ছোটখাট ব্যাপারে সীমাবদ্ধ থাকে না – এরা উচ্চতর বিষয় নিয়ে মাথা ঘামায়, ব্রেন ড্রেন নিয়ে! সরকারী পয়সায় পড়াশুনা করে বিদেশ চলে গেলে কিভাবে ভারতকে রিটার্ণ দেওয়া হয় সেই নিয়ে। যারা রেপিষ্ট, টেররিষ্টকে ডিফেন্ড করতে পারে অখন্ডনীয় যুক্তির দ্বারা, তারা যে এই সামান্য জিনিস ডিফেন্ড করবে সেও বলা বাহুল্য। ভারতে নাকি সুযোগ পাওয়া যায় না! ভারত নাকি থাকার যোগ্য নয়! ভারতে নাকি বুরক্রেসী ইত্যাদি ইত্যাদি।

ফ্ল্যাট বাড়ির পাবলিক স্বার্থপর হয়ে নিজেরটা গুছিয়ে নেবে তাতে আর আশ্চর্য হবার কিছু নেই – তাই সেই নিয়ে কেউ লেখা লিখিও করেন না – এটা প্রায় এখন স্বতঃসিদ্ধ। নিজে খাব, নিজে পড়ব – নিজে গুছাব – এর মধ্যে প্রোফেসররাও অন্যায় কিছু দেখেন নি। কিন্তু তাঁরাও এই ব্যাপারে পাজলড্‌ ছিলেন যে পাবলিকদের সব ব্যাপারে নাক গলিয়ে প্রমাণ করার কি দরকার পরে যে – আমরাও সমাজের জন্য ভাবছি – এবং সেই ভাবনা মাঝে মাঝে এতই উপর লেভেলের যে তোমরা না বুঝতে পারলে সেটা হবে তোমাদের অশিক্ষা – তোমরা তেমন আলোক প্রাপ্ত নয় কিনা। প্রোফেসর আলবার্তো ফ্ল্যাট বাড়িকে এমন তুলধনা করেছেন যে মনে হতে পারে তিনি হয়ত ফ্ল্যাট বিদ্বেষী। আর সেই মনে হতে পারার সময়টায় অভিযোজন থিওরী ঢুকিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে বদ্ধ জায়গায় মানুষের মন পরিপূর্ণ বিকাশের অন্তরায় – মানে আমাদের গঠন এমন ভাবে হবার জন্য হয় নি। ন্যাচারেল সিলেকশন ছোট পরিসরের সাথে ব্রেনকে অ্যাডাপ্ট করানোর জন্য মনকে সেলফিস হতে শেখায়। Dar al diablo lo que es debido.

আর তা ছাড়া বাইরে থাকলেই যে ভারত নিয়ে কথা বলার অধিকার হারাতে হবে সেটা কে বলে। এই একটা ইন্টারেষ্টিং পয়েন্ট আলবার্তো, অ্যাডাম ও আনিস - তিন প্রফেসরই উল্লেখ করেছেন তাঁদের রেসপেক্টিভ গবেষণায়। কথায় বলে কাক কাকের মাংস খায় না – এটা কিন্তু নাঁতেলদের ক্ষেত্রে খাটে না। বিশেষ করে সমাজসচেতন এবং রাজনীতির নাঁতেলদের ভিতর গোষ্টীদ্বন্দ খুব প্রকট। তিন প্রকার গোষ্ঠী দেখা যায় ভৌগলিক অবস্থান লক্ষ্য করে – এক পশ্চিমবঙ্গে বসবাস কারী, দুই পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া বাকী ভারতে বসবাসকারী এবং তিন বিদেশে বসবাসকারী। অবশ্য এরা যে সবসময় নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ী করে তা না – অনেক সময় আবার একজোটও হয়। যেমন রাজনীতি প্রসঙ্গ এলে বামফ্রন্ট, তৃণমূল এবং বাকিসব - এই ভাবে নাঁতেল ভাগ হয় – তখন ভৌগলিক অবস্থানটা বড় বলে বিবেচিত হয় না। De noche los gatos Todos son Pardos.

উপরিউক্ত গোষ্ঠীদের মধ্যে চুলোচুলি প্রায় ক্লাসিক পর্যায়ে পৌঁছে যায় যার শেষ অস্ত্র হল – “দেশে বাস না করে বড় বড় কথা অনেকেই বলতে পারে”। তবে এদের মিথোজীবিতা এবং পারস্পরিক বিক্রিয়া এতই কমপ্লেক্স যে কোন প্রফেসরই এর বেশী গভীরে ঢুকে কোন থিওরী এখনো পর্যন্ত বের করতে পারেন নি। পশ্চিমবঙ্গে বসবাস কারীর কাছে যা হীনমন্যতা, তাই আবার বিদেশী বাঙালীর কাছে স্ট্রেন্থ – পুরো তালেগোল। কে সুযোগ পেয়েও বাইরে যায় নি আর কে সব কিছু পেয়েও দেশের জন্য কিছু করার জন্য থেকে গেছে সেই নিয়ে টিকা টিম্পন্নি চলে প্রায়ই। তবে উপরে উল্লিখিত তিন প্রোফেসরই স্ট্যাটিস্টিক্যালি দেখিয়েছেন, যে নাঁতেলরা দেশে থেকে ফুট কাটছেন, তাঁরা বাধ্য হয়েই দেশে থেকে গেছেন সুযোগের অভাবে। গোপন জবানবন্দীতে অনেকেই কনফেস করেছেন যে চান্স পাইলেই প্রথম বিমানটি তাঁরাই পাকড়াবেন। এখানেও হীনমন্যতা – যেহেতু বিদেশ যেতে পারি নি – তাই দেশে থেকে কি উদ্ধার করছি তা প্রমাণের চেষ্টা। প্রোফেসর আলবার্তোর স্প্যানীশ ভাষায় - A cabo de cien años los reyos son villanos, A cabo de ciente ydiez los villanos son reyes.

দেশে থাকা বলল – আগেই বলেছিলাম ও শুধু ফুটেজ খেয়ে চলে গেল বিদেশে পড়াশুনা করতে। আন্দোলন – ফান্দোলন ওই সব কিছু নয়। সেই ছেলে যে দলের হয়ে আন্দোলন করছিল তার বিপরীত পক্ষ বলল, আগেই বলেছিলাম! পক্ষের দল চুপ! সে ছেলে সত্যি করেই তো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ডি-অ্যাক্টিভেট করে চলে গেল! কি আর করা – একটু জিরিয়ে নিয়ে মালটাকে ট্র‍্যাক করা যাক। তাহলে হল গিয়ে দুই ভাগ – বিদেশ/দেশ কিন্তু ছেলেটির পক্ষে, বিদেশ/দেশ কিন্তু ছেলেটির বিপক্ষে। কেউ বলল ছেলেটির বীচির জোর আছে – তবে বেশীর ভাগ একমত যে ছেলেটি সৎ - ওর প্রতিবাদ প্রকাশের ফর্মটাই যা বিতর্কের! ছেলে নিজে বলল যে, আমি প্যান্ট পড়ার সময় পাই নি! ব্যাস, পাবলিক পুরো কনফিউজড। অনেক অনেক দিন বাদে কেউ টিপ্পনি দিল – কি হল ভাইয়ের? তার কিছুদিন পর এক ভিডিও এল ইউ টিউবে – সেই ছেলে গায়ে গরম জল ঢেলে কি যেন প্রদিবাদ করছে। এবার অন্যপক্ষ যারা তাকে ট্র্যাক করছিল – তারা বলল তবে, তবে, তবে? প্রোফেসর আলবার্তোর স্প্যানীশ ভাষায় - A mal nudo, mal cuno

প্রফেসর আলবার্তো আগেই এই জাতীয় চীজদের প্রোফাইলিং করেছিলেন ‘মানসিক সমস্যাজনিত’ বলে। অ্যাডাম আবার এককাঠি এগিয়ে গিয়ে ‘সাইকোপ্যাথ’ ক্যাটাগরীতে ফেলেছিলেন – প্রফেসর আনিস কিন্তু ভারতীয় বলে ভারতীয় সাইকোল্যজি ভাল বুঝতেন। এই সব সময় তিনি প্রশ্ন রেখেছিলেন যে এখানে আসল মানসিক সমস্যা কাদের? আমরা আনিসকে প্রশ্ন করতে চাইতাম যে - ছেলে নিজে বলছে প্যান্ট পড়তে সময় পাই নি, তাহলে? আমরা কিভাবে এর ব্যখ্যা করব? কিন্তু আমার মনে হয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে হবার জন্য আনিস এটা সম্পূর্ণ এড়িয়ে যেতেন ইচ্ছাকৃত ভাবে।
বাকি রইল গরম জল – নাঁতেলরা আবার নানা ভাগে বিভক্ত – কোথায় জল ঢাললে সেটা সমাজসচেতনার পরিচয়? গায়ে জল ঢেলেছে, বীচিতেই বা নয় কেন? ফ্রর্ম কেমন হওয়া উচিত, কনটেন্ট কেমন থাকা উচিত সেই নিয়ে প্রবল জ্ঞান দেওয়া হল নাঁতেলদের দ্বারা। যারা এই সব হাস্যকর জিনিস দেখে স্বাভাবিক ভাবে হাসল, তাদের বলা হল পরের বার চা খেতে গিয়ে মুখ পুড়বে আর মনে পড়বে। আসলে এই সবের পিছনে হল অধিকার অর্জন – গায়ে গরম জল ঢেলেছে, কিন্তু সমালোচনা করতে পারবে না – কারণ তুমি তো গায়ে গরম জল ঢালোনি! ফলতঃ তুমি হাস্যকরকে হাস্যকর বলার অধিকার হারিয়েছ! প্রোফেসর আলবার্তোর ভাষায় - A quien se hace de miel las moscas le comen.

গায়ে গরম জল ঢালা যদি কোনোও ভাবে চা-বাগানের অ-ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চেতনা জাগিয়ে তোলা হয়, তাহলে আমার পাঁচবার নারকেল গাছ থেকে পড়ে (হাত-পা ভেঙে বেঁচে থাকা) যাওয়া মধ্যাকর্ষনের বিষয়ে পাবলিকের সচেতনতা বাড়ানো। প্রোফেসর আলবার্তোর ভাষায় - A donde el seto es bajo todos pasan.

নাঁতেল হীনমন্যতা যে কত রকমের হয় তা নিয়ে গবেষকেরা বিস্তারে আলোচনা করেছেন – পড়াশুনা বিষয়ক, কোন কোম্পানীতে চাকুরী করছি সেই বিষয়ে, কত মাইনে পাচ্ছি সেই নিয়ে, কোথায় রয়েছি তার গভীরে, আমাকে কেমন দেখতে সেই নিয়ে, আমার বউ/বরকে কেমন দেখতে না নিয়েও। আপাত দৃষ্টিতে তে এগুলোর সাথে আমাদের আলোচ্য বিষয় সম্পর্কহীন মনে হলেও, একটু ভেবে দেখলেই অসুখ বোঝা যাবে।

মনের গভীরে এই নাঁতেলদের হীনমন্যতা, নিঃসঙ্গতা, পরিচয়হীনতা এদের বাধ্য করে নিজেকে জাষ্টিফাই করতে যে আমিও আছি! আমিও তোমাদের সমান – বা বেশী। বাকি বিষয়গুলি নিয়ে আর কিছু লিখলাম না - শ্রেষ্ঠত্বের ভনিতা, অযাচিত (undeserved) অর্থাগম, ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড, বেকারত্ব ও অবসর – এই সব বিষয়ে প্রোফেসর আলবার্তো যা বলে গ্যাছেন তা কাউন্টার আর্গু করার কোন সুযোগ আমি দেখি না। Al árbol por el fruto es conocido.
সমাজ সচেতন নাঁতেল-দের নিয়ে এতো নেগেটিভ কিছু না লিখলেও হয়ত চলত। তবু আমি লিখলাম শুধু আপনাদের বোঝাতে যে এই লাইনে যেমন সাকসেস রেট বেশী, ঠিক তেমনি গালাগাল খাবার সম্ভাবনাও প্রবল। আপনি চান না বা না চান, সমাজসচেতন নাঁতেল হতে গেলে আপনি অলরেডী প্রোফেসর আলবার্তো দ্বারা প্রোফাইলিত হয়ে যাবেন। Al amigo más amigo, no le fíes tu secreto, y así nunca te verás, arrepentido o sujeto.

তবুও যদি আপনি চান এই ভাবে চার ফেলতে পারেন –

বিষয় চ্যুজ করবেন ভেবে চিনতে – পাবলিকে এখন সাধারণ জিনিস যেমন শিক্ষার অধিকার, স্বাস্থ্যের অধিকার এই সব খাচ্ছে না। আপনি হয়ত প্রকৃত কোন ফিল্ড ওয়ার্কের সন্ধান দিলেন, বা নিজে করেছেন সেই অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন, তাহলে দেখবেন বেশী অডিয়েন্স পাচ্ছেন না। আর যদি ভুলেও ভালো কাজের জন্য সাহায্য চেয়ে বসেন তো ব্যাস, হয়ে গেলো! আপনার ব্লগে বিরাজ করবে শ্মশানের শূন্যতা। চটজলদি টাকা পয়সার সাহায্য আসতে পারে, কারণ অনেকে নিজেদের বিবেক ক্লীয়ার করে কিছু বলার অধিকার অর্জন করতে চায় – তাই ভালো কারণ থাকলে টাকা চাইতে পারেন – কিন্তু ‘সময়’ কদাপি নয়। তবে ভালো কারণ থাকলে আপনি আবার নাঁতেল ক্যাটাগরী থেকে ডিস-কোয়ালিফাই করে যাবেন। কারণ বাই ডেফিনেশন – নাঁতেলরা মেনলি তত্ত্ব মারাবেন – নিজের হাতে কাজ করবেন না।

ক্রমাগত নেট সার্ফ করুন কি বিষয় নিয়ে পাবলিক খাবে সেই ভাবতে – এখন যেমন খাচ্ছে মৃত্যুদন্ড ভালো না খারাপ, রেপিষ্টদের কি করা উচিত, টেররিষ্ট কেন টেররিষ্ট, গে-লেসবিয়ান – এই সব। তবে সবচেয়ে বেশী খাচ্ছে ইসলাম বিষয়ক কোন কন্ট্রোভার্সিয়াল আলোচনা। আপনি ব্যালেন্স রাখবেন – কোন দেশ থেকে কমেন্ট করছেন সেটা খেয়াল রাখবেন – আপনি একটা লেখায় সমর্থন করুণ, তার পরের লেখায় নিজের মতামতকেই খন্ডান। কিছু আগোছালো ব্যবহার করুণ তাহলে লোকে ভাববে আপনার এতো পড়াশুনা যে মাথায় চাপ পড়ে বাল-বীচি বকছেন। অন্যের করুণা থেকে সিমপ্যাথি নিন – স্যরি, বাক্যটা মনে হয় ঠিক হল না, বাট ইউ নো হোয়াট আই মিন!

কনফিডেন্টলি বলুন যা বলবার – দেখবেন ভাঁট সমর্থনে পাবলিকের অভাব নেই। তবে আপনাকে চমকাতে হবে – কিছু টার্ম শিখুন, ইংলিশ হলে ভালো হয়। ওই বয়ষ্ক লোকশিক্ষা কেন্দ্র, শিশু শ্রমিক – এই সব জাষ্ট লোকে খাচ্ছে না। আজ থেকে কুড়ি-তিরিশ বছর আগে পর্যন্ত গে-লেসবিয়ান বিষয়টা ট্যাবু বা রোগ বলে বিবেচিত হত। এখন পাশা উলটে গ্যাছে – আপনি ওদের জয়গান গান – পুরো ফয়দা লোটার ফিল্ড এটা। অতৃপ্ত কাম যে কি কষ্টের সেটা বোঝানোর চেষ্টা করতে পারেন, তবে গ্যারান্টি নেই আপনি বাই-ইন পাবেন কিনা। চিরন্তন সত্যে বাই-ইন কম থাকে – তাই আপনি টুইষ্ট দিন। কি ভাবে দেবেন আপনার হাতে ছেড়ে দিলাম – সব আমি বলে দিলে তো হয়েই গেল!

রাজনীতির সাথে সমাজ সচেতনতার ককটেল দিতে পারেন – তবে এ বড় চাপের জিনিস। একবার ঢুকে গেলে বেরোনো চায় না – ব্ল্যাকহোল টাইপের। তাই বুঝেশুনে ইভেন্ট হরাইজনের দিকে যাবেন। একবার যদি সাক্‌ হয়ে যান, তবে কি হবে সেটা আনপ্রেডিক্টেবল। যদি অনেক চেষ্টা করেও ফলোয়ার না পান বা বিতর্ক সৃষ্টি না করতে পারেন তাহলে সেই ব্লগ বা ওয়েবসাইটে কিছু বিশেষ দুর্বলতা আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে। যেমন কোন এক ওয়েব সাইটে আপনি এই শব্দবন্ধটি ভাসিয়ে দিতে পারেন ‘সি পি আই এম’ – ব্যাস আপনাকে আর কিছু চিন্তা করতে হবে না। আপনার লেখায় কমেন্ট পড়বে ভুরি ভুরি – রেলিভেন্ট কিনা সেই প্রশ্ন করবেন না, তা জরুরীও নয়।

যদিও বলা হয় স্বনে বিরিয়ানি রাঁধলে বেশী মেশাতে প্রবলেমটা কি – কিন্তু প্রবলেম আছে সেটা বোঝার মত বুদ্ধিটুকু আপনাকে যোগাড় করতে হবে। ব্যালেন্স ঠিক রাখতে হবে আপনাকে – সে এক বেজায় ডেলিকেট ব্যালেন্স – চীজ কেক বেকিং-এর মত। আপাত সহজ, কিন্তু ধেরিয়ে ফেলা খুব সোজা। যারা এন জি ও এর সাথে জুড়ে সমাজ সেবা করছে আপনি ভাবছেন তাদের হীনমন্যতা আছে (চাকুরী ইত্যাদি না পেয়ে এই সব করছে বলে) – কিন্তু সে নিজে ভাবছে তার নেই। বরং সে ভাবছে এন জি ও করা হেতু সব সমস্যার শেষ কথা তারই – এই নিয়ে চাপ, এবং ভজকট ব্যাপার –

ঠিক চিনতে হবে নিজের ওয়েভ লেন্থে কারা আছে এবং তাদের সাথে অ্যালাই বানাতে হবে। যদি ওয়েভ লেন্থ চেঞ্জ হয়ে যায়, তা হলে অ্যালাইও চেঞ্জ করতে হবে। মনে রাখতে হবে এই পৃথিবীতে চিরন্তন কিছুই নেই আর এমনতেই আমাদের ভারতীয় দর্শন হারিয়ে ফেলার দর্শন, খুইয়ে ফেলে নাকে কাঁদার দর্শন – তাই কেন চিরন্তন নয়, সেই নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। তবে একটা ব্যাপার মনে রাখবেন, অনেকে আপনাকে পুরানো দিন মনে করিয়ে খোঁচা দেবে – আপনি সেই খোঁচা হজম করবেন, কিন্তু ভুলেও প্যান্ডোরার বাক্সটা খুলবেন না। অ্যালাই হতে পারে মানুষ, আবার মানুষের কাছে বেশী করে পৌঁছানো সংবাদ পত্রে – যে আপনাকে বেশী করে এক্সপোজার দেবে আপনি তার গ্রুপে ঢুকবেন – ফিলসফি পরে আসবে।

মাঝে মাঝে এমন ছাড়বেন – আমি ২০ বছর আগে আমেরিকা যাবার সময় দেখেছিলাম – আমি একটা কনফারেন্সে মিট করেছিলাম তেনার সাথে – আর কিছুই জানা না থাকলে, কিন্তু নিজের উপস্থিতি জানান দিতে হলে বলবেন ‘মার্কেটই শেষ কথা’। আগে বলে দিন – পরে ভাবুন এর সাথে সমাজসচেতনতাকে কি ভাবে রিলেট করা যায়। শেষ কথা সেই প্রোফেসর আলবার্তোর - Devolver bien por mal. অর্থাৎ, জীবন যদি তোমাকে লেবু দেয়, তুমি তাই দিয়ে লেমনেড বানাও -

[ক্রমশঃ]
----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------



1350 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2] [3]   এই পাতায় আছে 30 -- 49
Avatar: Blank

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

অজ্জিত দা, রোবু আর প্পন দা কে ট্যাগ করে দিলাম।
চরম জাস্ট।
Avatar: +

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

খেয়েছে, এরপর আর ফুটবল টইতে কিছু লেখা যাবেনা দেখছিঃ( তারউপর লিভারপুল নিয়ে খোঁটা মেরে দিয়েছে
Avatar: রোবু

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

আপনার হাতে সোনার কলম হউক। কিন্তু ফুটবলের টই চিরকালের তরে ডুবিয়ে দেবার জন্য পোস্টারিটি আপনাকে ক্ষমা করবে কি?
দুটো কনফিউশন। আপনার লেখা এত ভালো, আর আপনি এত রসিক মানুষ বলেই এগুলো লিখছি।
১) পি এস ভি আইন্ডোভেন বোধ হয়।
২) 'বালটি' বারমিংহ্যামের জিনিস বোধ হয় (রেফঃ তপন রায়চৌধুরী-র রোমন্থন, গোরা রায়ের পাইট পুরাণ)

এই লেখার ছাপা হয়ে বেরোবার অধিকার আছে। যদি বেরোয়, একবার ক্রসচেক করে এইগুলো ঠিক করে নেবেন। সর্বাঙ্গসুন্দর হবে।

এ লেখা পড়তে আরম্ভ করলে ছাড়া যায় না। চালিয়ে যান।
Avatar: সুকান্ত ঘোষ

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

রোবু,
আপনার মতামতের জন্য অনেক ধন্যবাদ - আপনি যে এত খেয়াল করে পড়েছেন, এবং তার উপর সময় নিয়ে মন্তব্য করেছেন, সেটা দেখে আমি আপ্লুত।
তবে বলি কি আমার কোন কিছুকে তোলার বা ডুবানোর ক্ষমতা একেবারেই নেই - যা আছে এই এদিক ওদিক ঝেড়ে, একে ওকে টিপ্পনী কেটে দিন গুজরানো। আমার নিজের ধারণা ছিল ফুটবল ফ্যানের চামড়া আধুনিক কবিদের থেকেও মোটা। তাই আপনি নিশ্চন্ত থাকুন, কিছু ডুববে না।

এবার তথ্য প্রমাদ বিষয়েঃ

১। অবশ্যই পি এস ভি আইন্দহোভেন - টাইপো ছিল। শুধু এটা নয়, এখন পড়তে দিয়ে দেখছি আরো অনেক টাইপো রয়েছে যা ঠিক কড়ে নিতে হবে। আমি নিজে খোদ আমষ্টারডাম শহরে অনেককাল বাস করেছি - তাই আয়াক্স থেকে ফিওনুর্দ (আমষ্টারডাম থেকে রটারডাম) নিয়ে বেশ নাড়া ঘাঁটা করেছি এককালে। তাই এই টাইপোতে আমি লজ্জিত।

২। এটা নিয়ে ডাউবট আছে। তপন বাবুর বই পড়েছি (ভীমরতি প্রাপ্তর পরচরিত চর্চা) - কিন্তু অন্য সূত্র বলে 'আদিল' নামে এক ভদ্রলোক নাকি ১৯৭৭ সাল নাগাদ প্রথম বালটি জিনিসটী বৃটেন-এ ঢোকান। মনে হয় আমি উনার ইন্টারভিউও দেখেছিলাম - ছেলেরা কী চালাতে চাইছে না বলে আক্ষেপ করছিলেন। প্রসঙ্গত বলি আমি বার্মিংহাম শহরেও পি এইচ ডি করার সময় অনেক দিন বাস করেছি। মনে হয় শহরের বেশীর ভাগ বালটিই চেনা ছিল তখন, অন্তত যেগুলো বিখ্যাত ছিল।
Avatar: রোবু

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

ধন্যবাদ, ঐ জন্যই ক্রস চেক করতে বল্লুম। হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত ফুটবল ফ্যানের চামড়া যথেষ্ট মোটা, আমি নিজেই ফুটবল নিয়ে (বিদেশী) গত একঘন্টা বহুত রাজা উজীর মারলাম, ফেবুতে। লিখছিলাম আর এই লেখাটার কথা মনে করে হ্যা হ্যা করে হাসছিলাম।
তবে এই লেখা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস পাইয়াছি :-)
আমি বরাবর ফাইনুরড জানতাম, সেটা যে ফিওনুর্দ, জেনে বেশ ভালো লাগল :-)
Avatar: Abhyu

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

খাসা।
Avatar: aranya

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

ফুটবল এপিসোড-টা ফাটাফাটি :-)
Avatar: দ

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

দারুণ দারুণ :-))

আর এই নাঁতেল = নেট আঁয়্তেলটা ব্যপক হইছে।
Avatar: দ

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

*আঁতেল
Avatar: দ

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

*আঁতেল
Avatar: দ

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

*আঁতেল
Avatar: দ

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

*আঁতেল
Avatar: Abhyu

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি :)
Avatar: সুকান্ত ঘোষ

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

যাঁরা পড়ছেন তাঁদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। ফুটবল নিয়ে লেখার পর দেখলাম আমাকে কেউ 'ঘুঘু মাল' বলেছে - খুবই আপ্লুত হলাম। আমাদের গোটা গ্রামে একমাত্র ঘোষেদের অখিল কে ঘুঘু মাল বলা হয়। মনে হচ্ছে আমি ঘোষ বংশের মুখ রাখব। বাবা শুনলে খুবই খুশী হবে মনে হয়।

এই পর্বে দিলাম সিনেমা নিয়ে নাঁতলামোর কিছু কথা।
Avatar: দ

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

জবরদস্ত হচ্ছে।

কিন্তু সব বৌয়েরাই উত্তমকুমারের ভক্ত --- ইয়ে বাত কুছ হজম নেহি হুই।
Avatar: rivu

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

আপনি থাকছেন স্যার।
পড়ছি।
Avatar: সুকান্ত ঘোষ

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

'দ' - আপনি হয়ত ঠিকই বলেছেন। সবাই যে উত্তমকুমারের ভক্ত হবে এমন কোন কথাই নেই। তবে কিনা আমি বেশ কিছু চূড়ান্ত 'নাঁতেল' দেখেছি যারা বার্গম্যান থেকে ফেলেনি প্রায় গুলে খেয়ে ফেলে যাকে বলে উগড়ে দেবার মত উপক্রম করে - আবার তারাই বাড়িতে উত্তম কুমার বলতে অজ্ঞান, ইনক্লুডিং 'চিড়িয়াখানা' সিনেমার ব্যোমকেশ উত্তম!

রিভু ধন্যবাদ আপনি সময় নিয়ে পড়ছেন বলে। তবে পেপারের খবর অনুযায়ী ভারতবর্ষে নাকি এখন একটাই স্যার - রবীন্দ্র জাদেজা!
Avatar: Amitava

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

দারুন হয়েছে। অনেক দিন পর একটা ভালো লেখা পরলাম। যদি ভুল না হয়ে থাকে, আমাদের দুজনের দেখা হয়েছে ব্রুনেই তে। অপেক্ষা করব নেক্সট লেখাটার জন্য।
Avatar: সুকান্ত ঘোষ

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

অনেক দিন পর আপডেট করলাম - জানিনা কেউ পড়ছেন কিনা, তবুও দিয়ে রাখলাম
Avatar: avi

Re: ইন্টারনেট আঁতেল ম্যানুয়াল

আগে থেকেই পড়ে আসছি, আজ আবার একবার গোড়া থেকে পড়লাম ঘন্টাখানেক ধরে। দুর্দান্ত হচ্ছে।

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2] [3]   এই পাতায় আছে 30 -- 49


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন