আমাদের কথা ৫


এবার তাঁর এপিটাফ লেখা হবে। এবার তিনিও আইকন হবেন।

জীবদ্দশায় তাঁকে প্রায়ই সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হত। বিদগ্ধ ভদ্রোমহোদয় ও লেডিসগণ তাঁর নামোচ্চারণেই উঠতি লেখকদের পাকামো করতে নিষেধ করতেন। বাঁধা ছকের বাইরে পা দিলেই চোখ পাকিয়ে বলা হত , সন্দীপনী কোরোনা, সন্দীপনী কোরোনা। কতো, কতো বড়ো লেখক এই সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, যাঁর নামে সন্দীপনী বলে আস্ত একটা কথাই চালু হয়ে গেল? অজিত চৌধুরী লিখেছিলেন। সে যুগ শেষ। তাঁর নামে এবার অর্ডার দিয়ে স্মৃতিস্তম্ভ বানানো হবে। হইহই করে বিক্রি হবে উপন্যাস সমগ্র। সভাসমিতিতে বিস্তর অশ্রুবিসর্জন হবে। ফটোয় মালা দিয়ে সভাপতি অধোবদন হবেন। ধরা গলায় বলবেন, আহা কি লিখতেন। মানুষটা প্রাপ্য সম্মান পেলেন না গো। প্রেমাশ্রুবন্যায় ডুবে যাবে ডিহি কলকাতা। সেই জোয়ারে সন্দীপনের লেখালিখি ভেসে যাবে। শুধু জেগে থাকবে ফটো। চৌকো মুখ আর দড়িবাঁধা চশমা। ভদ্দরলোকের মুখ যেমন হয়। অবিকল।

কিছুকিছু মুখ আছে, যেখানে জোয়ার-ভাঁটা খেলেনা। পৃথিবীর সমস্ত ভদ্রলোকের মুখ সেরকম। সেখানে সেক্স ও ভায়োলেন্স নেই। পরকীয়া নেই। বিপরীত বিহার নেই। কেদারের মহাতীর্থে রুবির সঙ্গে অবাধ পাপাচার, মমতার সঙ্গে ডায়মন্ডহারবারযাত্রা নেই। হিরোশিমা মাই লাভকে তাঁর মহত্তম কীর্তি বলে চালানো শুরু হবে ক্রমশ:। "বিজনের রক্তমাংস'র লেখক, "ক্রীতদাস ক্রীতদাসী'র রচয়িতা, "কুকুর সম্পর্কে দুটো একটি কথা যা আমি জানি'র স্রষ্টা, "আমি ও বনবিহারী' নামক একটি অতি অখাদ্য বইয়ের জন্য ইতিহাসে নাম তুলবেন, যার জন্য তিনি একাডেমি পুরষ্কার পান, ২০০৩ সালে। এইভাবে ডানায় শব্দের সমস্ত গন্ধ মুছে ফেলা যাবে। রচিত হবে ইতিহাস। একজন মহৎ মানুষের স্তুতিগাথা।

তো, বলার কথা এই, যে, সন্দীপন "হিরোশিমা, মাই লাভ' নন, "রুবির সঙ্গে হীরাবন্দরে' নন, এমনকি "বিজনের রক্তমাংস'ও নন । তিনি সর্বত্র বিরাজমান। এই যে "তো' দিয়ে শুরু হল আগের বাক্যটি, তা সন্দীপন থেকে আপন করা। "তো' দিয়ে বাক্য শুরু করা সন্দীপনের, এবং একান্তই সন্দীপনের। আর কারো নয়। কলকাতা শহরের রাজপথে তাকিয়ে দেখুন, ঐ যুবকটি চলেছে জিন্স ও টাইট টপে শোভিত ইংলিশ মিডিয়াম তরুণীর সঙ্গে। তরুণের গদগদ প্রেমনিবেদনের উত্তরে দেখুন, মেয়েটি অব্যর্থ রূঢ়তায় বলে উঠল "তো?' অত:পর পোশাক ও মাংসপিন্ডের নিচে তার আজও ধুকপুক করা হৃদয়ে একটুকরো সন্দীপনও থেকে গেল। অগোচরে। "কি হে কেমন আছ?' এই প্রশ্নের উত্তরে, দেখুন, "এখন আমার কোনো অসুখ নেই' বলে এক চিলতে স্মার্টনেস ছুঁড়ে দিল সদ্য গোঁফ ওঠা বইমেলা-ফেরতা তরুণ। অতএব, সে সজ্ঞানে, সন্দীপনের কাছে নতজানু হল। ঐ যে "কিছু কিছু মুখ আছে, যেখানে জোয়ার-ভাঁটা খেলেনা। পৃথিবীর সমস্ত ভদ্রলোকের মুখ সেরকম' বাক্যদুটি লেখা হল আগের অনুচ্ছেদে, এরাও সন্দীপনের। এইভাবে, যখন সূর্য অস্ত যায়, চরাচর নি:স্তব্ধ, যখন মনও শান্ত হয়, শরীর প্রবেশ করে নিদ্রায়, তখনও তিনি বাংলা ভাষায় থাকেন। জ্ঞান ও নির্জ্ঞানে। চেতনে ও অবচেতনে। মর্গে ও তপোবনে।

ফলে, যা রয়েই গেল, তার জন্য এপিটাফ কিসের? এপিটাফ মূলত: অনৃতভাষণ। কনটেন্ট ও ফর্মে। তাই, এপিটাফ লিখবনা। মৃত্যুতে তোমরা কাঁদো? কমল চক্রবর্তী লিখেছিলেন। যে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে কখনও জেতা যাবেনা, তার বিরুদ্ধে লড়াই কিসের? সন্দীপন লিখেছিলেন। এই সন্ধ্যায়, তাই আসুন, আনন্দ করি। দেখুন, দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠেছে। রাজমোহন পুড়িয়ে দিচ্ছে বিশ্বের সাহিত্যসম্ভার। দেখুন, হাড়িয়ার বালতিতে ধরা পড়েছে চাঁদ। এখন পূর্ণিমা। চারদিকে গোল হয়ে বসে আছে বাউল ও আরবান কন্যারা। পাহাড় থেকে নেমে আসছে পাতার পোশাক পরা মানুষ। এখন গান হবে। নাচ হবে। মদ ও মাংস খাওয়া হবে। অন্ধকার নেমে এসেছে শহরতলীতে। কে-কার বান্ধবী ভুলে যাওয়া গেছে। তাকিয়ে দেখুন, এইখানে সরোজিনী শুয়ে আছে।

আমাদের দৃষ্টি ঝাপসা। জানা নেই, সে এখানেই শুয়ে আছে কিনা।


Avatar: শুভঙকর সান্যাল

Re: আমাদের কথা ৫

বোঝার আগেই যখন শুরু হওয়াটা হাতছানি দিয়ে যায় তখন আকাশ-পাতাল মন না ভেসে আর কী করে? খোলা মনে হয়তো কাউকে ডাকতে অথবা পেতে অথবা হারাতে চায় সে কিন্তু এই অনিত্য বস্তুগুলো যে মাঝে মাঝে প্রভাব ফেলে তা অস্বীকার করা যায় না। কিছু সময় থাকে যখন নিজেই নিজেকে বাইরে বেরিয়ে দেখি অন্যভাবে আবার কখন সময় আঁকে রঙিন বা কালো ছবি কোন এক ক্ষীন আবেগে। কিন্ত এই যে বয়ে-চলা সময় বা কাল কী নিত্য এই জীবজগৎ এ??? নাকী আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোর একটা মাপকাঠি???
বেড়ে চলা কম্পাঙ্কগুলো যখন ইন্দ্রিয়ের গতি বাড়িয়ে দেয় ওই অনিত্য রংবেরঙের ইট-পাটকেল(বস্তু) গুলোর জন্য, তখন কী আমি আমার অস্তিত্ব বুঝতে পাই??? নাকি বোঝার চেষ্টা না করে চোখে দেখা বা হাতে ছোঁয়া বা কানে শোনার মধ্যে নিজেকে ভাসিয়ে হয়েচলি একজন বিজ্ঞান-মস্তিষ্ক শিক্ষিত চল???
জানি না। সত্যিই জানিনা সত্যের কী অস্তিত্ব। খালি বুঝলাম যখন মায়ের না বেরনো চোখের জল বা আমার পেয়ে চলা ব্যর্থতা গুলো হারিয়ে চলেছ ওই না থেমে থাকা সময়ে, তখন ভবিষৎ চিন্তা কীন্তু আমার অস্তিত্ব কে ঘিরে ধরেছিল। এই অবস্থায় কেরিয়ার টা যখন নিতান্তই চিন্তার বিষয় আমার অনিত্য শরীর ও কিছু অনিত্য বস্তু এবং পরিজনের অস্তিত্বের জন্য। তখন এই ব্যর্থতায় হারানো একটা অন্তগামী ভুল কিন্তু প্রভাব ফেলেছিলও এই নিত্য মনে।
কিন্তু সত্যিই কী মন সত্যের অংশ???


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন