এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    মধুবাতা ঋতায়তে - শারদা মণ্ডল | ছবি - Imagen 3এক ঘুমে রাত কাবার। ভোর রাতে ওঠা। ছোট মাতাজী ভার নিয়েছেন সকলকে ঘুম থেকে ডেকে দেবেন। পড়ি কি মরি কি করে রেডি হয়ে বাইরে এসে দেখি - সেই আবছা কুয়াশা ঘেরা মাঠাবুরুর জঙ্গলের মাঝে ফাঁকা জায়গায় সারি বেঁধে প্রার্থনা শুরু করেছে মেয়েরা। আহা সেই ব্রহ্ম মুহূর্তে ওই সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ আর প্রার্থনা সঙ্গীত এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করেছিল। সে যে না দেখেছে, না শুনেছে তার পক্ষে অনুভব করা সম্ভব নয়। প্রার্থনার পর মর্নিং ওয়াকে নিয়ে যাবেন ট্রেনার। মেয়েরা চলে গেছে আগে, আমি টুকিটাকি কাজের জন্য পিছিয়ে পড়েছিলাম। ভোররাতে বনের গন্ধ, হাওয়া সব কিছু আলাদা। সারা জীবনে যা ফিল্ড সার্ভে করেছি, গুণলে হয়তো একশো পার হয়ে যাবে। তরাই বা সুন্দরবন, মালভূমি, রাঢ় বা হিমালয়ের বরফে ঢাকা পাইনের সারি - সব জঙ্গলের আলাদা আলাদা ভাষা আছে, ভিন্ন ভিন্ন রং, গন্ধ, রূপ আছে - আর এই সবকিছু দিনের বিভিন্ন সময়ে, ভিন্ন ঋতুতে বদলে বদলে যায়। সূর্য ওঠার আগে ঊষার নরম আলো, সেই শিশিরে ভেজা বন, পাখির ডাক সব মিলিয়ে এক অপার্থিব তান যেন আমার অবয়ব ভেদ করে চরাচরে ছড়িয়ে পড়ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে মনতোষ বন্দ্যোপাধ্যায় - প্রাকৃতিক ভূগোলের এক প্রবাদ প্রতিম অধ্যাপক আমাদের বলতেন - প্রকৃতির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই ও দুহাত বাড়িয়ে দেয়, গল্প করে, ছবি দেখায়, ও কী বলছে শোনার মন তৈরি কর। সবার কপালে মনের চোখ আছে - ওটা খুলে তাকানোর চেষ্টা কর। তাঁর কথাগুলি তো কেবল কথা ছিলনা, তা ছিল বেদ - যা আমরা শ্রুতিতে বহন করে চলেছি। হবিট হাউস থেকে লাল মাটির উঁচু নিচু অপরিসর পথ গিয়েছে বেঁকে, চলেছি আমি একলা পথিক স্বপ্ন চোখে এঁকে। বন কিন্তু খুব গভীর নয়, মাঝে মাঝেই কিছুটা করে ঘাস লতাপাতা ঢাকা ফাঁকা জায়গা - মাঠের মত, পাশে কিছু ঝোপঝাড়ও আছে। কিন্তু এমন তো হবার কথা নয়। আমি ঐ ফাঁকা জায়গাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। হুম, ঘাসের মধ্যে পায়ের চাপে তৈরি হওয়া পথের মত মনে হল - একটা নয়, বেশ কিছু পায়ে চলা পথ রয়েছে নানা দিশায়। তবে আর কী - ফাঁকা জায়গাগুলি যে মানুষের নিষ্ঠুর বন কাটার ফল সেটায় কোন সন্দেহ নেই। তবে স্বীকার করছি যে শিশির ভেজা বুনো মাটির সোঁদা গন্ধে তখন আমি এতটাই মশগুল যে বন কাটা হচ্ছে বুঝেও খুব একটা মনোকষ্ট হলনা। আর একটা মজার ব্যাপার হল, যখনই বনের মধ্যে ঢুকছি, ঠাণ্ডা হাওয়ায় দোলা লেগে পাতার খসখস, নবীন আলোয় জেগে ওঠা, পশুপাখি, পোকামাকড়ের ডাক - সব মিলিয়ে এমন একটা যেন হৈ চৈয়ের আওয়াজ আর সঙ্গে একটা কেমন যেন খিল খিল আবার কখনও হা হা করে হাসির আওয়াজ - বার বার ধাঁধা লেগে যাচ্ছিল আমার মেয়েরা কি খেলাধুলো করছে? এ কি তাদেরই হাসির আওয়াজ? কিন্তু যতবারই ঐ শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে যাচ্ছি, ততবারই দেখছি অরণ্য গভীর হচ্ছে, এবারে দিক হারাব। তাড়াতাড়ি সতর্ক হয়ে সেই লাল মাটির পথে ফিরে আসতে হয়েছে। রহস্যময় মাঠাবুরু এখনও তার কুয়াশার ওড়না মুখ থেকে সরায়নি। অবগুন্ঠনের আড়াল থেকে ও আমায় এ কি যাদু শব্দ শোনাল - ও যে এখনও আমার কানে বাজছে।তখন কিছু মনে হয়নি, পরে মনে হল আমি কি হায়নার হাসি শুনলাম নাকি সত্যি সত্যি! একা একা এ কী সর্বনাশ করতে যাচ্ছিলাম। অযোধ্যা পাহাড়ের জঙ্গলে হায়না থাকে বটে, মাঠাবুরুতে থাকায় আপত্তি কি? পরে ওই কলেজের একজন স্টাফ বললেন, ‘জানেন, রাতে একদম ঘুমোতে পারিনি, খালি মনে হচ্ছে বাইরে কেউ খিল খিল করে হাসছে, ঠিক মানুষের মত নয়, ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।’ শুনে তো আমার আক্কেল গুড়ুম। রাতে হায়না এসেছিল হয়তো দেখা করতে, আমি ঘুমোচ্ছি বলে চলে গেছে। ভোরে একা পেয়ে আমার সঙ্গে আড়াল থেকে বাৎচিত করে গেছে। ফিল্ডে আসার এই হচ্ছে মজা, বিপদ চারিদিকে থাকে বটে, তবে পান থেকে চুন খসলেই হা রে রে রে বারণ শোনার আপদ থাকেনা। যাকগে খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে মেয়েদের খুঁজে পেলাম। তারা তখন মাঠাবুরুর এক উত্তুঙ্গ শিখরের সামনে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আদেশানুসারে মহানন্দে খালি হাতের ব্যায়াম করছে। দূর থেকে দেখে ভারি মজা লাগে আমার। তখনও জানিনা আরও কী অপেক্ষা করে আছে সবার জন্য। ব্যায়াম শেষে মেয়েরা যখন হুড়োহুড়ি করে ছোট মাতাজীর ফোনে পোজ দিয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত, হঠাৎ একটা লাল আভা এসে লাগে চোখের পাতায় - তীক্ষ্ণ তবু মধুর। চমকে পিছনে তাকিয়ে দেখি মাঠাবুরুর সেই চেতানো বুকের পিছে পিঠের দিক থেকে সুয্যিমামা উঁকি দিয়েছে। এই ভৌগোলিক জীবনে ভারত জুড়ে কতবারই তো দাঁড়ালাম কত সান রাইজ আর সান সেট পয়েন্টে। তবু যুগ যুগান্ত ধরে চলা এই অরুণোদয়, যতবার আসে যেন চিরনূতন। হেঁটে হেঁটে ফেরার পথে বড় মাতাজীর সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনা হচ্ছিল। আমাদের ছাত্রীরা বেশিরভাগই শহুরে। কিছু কিছু মেয়ে আছে বটে যাদের গ্রামে বাড়ি, কলেজের হোস্টেলে থাকে। তবে যেখানেই থাকুক, এই জঙ্গলে মোবাইল ফোন ছেড়ে সত্যিকারের প্রকৃতির সঙ্গে কাটানো ওদের জন্য এক দুরন্ত অভিজ্ঞতা, যা সারা জীবনের পাথেয় হয়ে থাকবে। তবে শহর ছেড়ে এসেছি বললেই কী আর শহরের ছোঁয়া বাঁচানো যায়? এই যে হবিট হাউসে আমরা আছি, এও তো শহরের মানুষের বিনোদনের জন্যই বানানো - বলা যায় ঐ পাতালঘর নামক রিসর্টটি গ্রামীণ ল্যান্ডস্কেপের মধ্যে তৈরি হওয়া একটি ‘শহুরে স্পেস’ (Urban Outpost)। এই বিষয়টাকেই ভূগোলে বলে প্ল্যানেটারি আর্বানিজম (Planetary Urbanism)। বিখ্যাত ফরাসি চিন্তাবিদ অঁরি লেফেভার (Henri Lefebvre) এবং পরবর্তীতে নীল ব্রেনার (Neil Brenner) দেখিয়েছেন যে, আজকের দিনে শহর আর কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আটকে নেই। শহরের থাবা আজ গ্রামীণ সীমানাকে গ্রাস করে নিয়েছে। প্রযুক্তির জাল এতটাই ব্যাপক, আজ গ্রামের ছেলে বা মেয়ের হাতেও স্মার্টফোন, সেও শহরের ফ্যাশন দেখছে, এআই (AI) নিয়ে ভাবছে। ফলে ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও মনস্তাত্ত্বিকভাবে গ্রাম আর শহর আলাদা কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। তাই আজ আর সেই গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার ধারণা চলেনা। শহর আজ তার পুঁজি, প্রযুক্তি আর সংস্কৃতি দিয়ে গ্রামকে ঘিরেছে। এই উল্টো প্রক্রিয়াকে আমরা বলি ‘রারবানাইজেশন’ (Rurbanization)। তবে এই রারবানাইজেশন মানেই যে খুব খারাপ হচ্ছে তা কিন্তু নয়। হ্যারল্ড কার্টারের (Harold Carter) একটা বই আছে - ‘The Study of Urban Geography’। সেখানে তিনি মূলত কেভিন লিঞ্চের (Kevin Lynch) ‘Mental Map’ বা ‘Cognitive Mapping’ (স্থানিক জ্ঞান মানচিত্র)-এর ধারণাকে ব্যবহার করে শহুরে মানুষের স্থানিক সচেতনতা ব্যাখ্যা করেছিলেন। আমি যখন প্রথমবার বইটা পড়ি বেশ চমৎকৃত হয়েছিলাম। সেখানে অনেক পয়েন্টের মধ্যে মোদ্দা যে পয়েন্টটা তোলা হয়েছিল সেটা হল জঙ্গলের আদিবাসী মানুষ মেন্টাল ম্যাপের সাহায্যে বনের যে কোন জায়গায় আপনাকে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সেই পথটা এঁকে দেখাতে পারেনা। কিন্তু আমাদের এই শহুরে কলেজের মেয়েরা একটু চেষ্টা করে পাহাড়ের ওরিয়েন্টেশন শিখে নিলে তারা কিন্তু সেটাকে কাগুজে ম্যাপে পরিণত করতে পারবে। কারণ ছোট থেকে তারা আকার, আকৃতি, রেখা এসব বিষয়ে তালিম পেয়েছে। এ হল মানুষের মনে এক ধরণের মূর্ত অভিজ্ঞতা বনাম বিমূর্ত জ্যামিতির খেলা। কার্টার বা লিঞ্চের তত্ত্বে মেন্টাল ম্যাপের মূল উপাদান পাঁচটি: Paths (পথ), Edges (প্রান্ত), Districts (অঞ্চল), Nodes (সন্ধিস্থল), এবং Landmarks (চিহ্ন)। বনের আদিবাসী মানুষের মেন্টাল ম্যাপ তৈরি হয় বনের গন্ধ, মাটির স্পর্শ, গাছের ডালের বাঁক বা পাখির ডাকের মতো সংবেদনশীল অভিজ্ঞতা দিয়ে। বলা যেতে পারে এ হল একধরণের Navigational Knowledge —যা ছোট থেকে বনের মাঝে ঘুরে ঘুরে বেঁচে থাকার তাগিদে তৈরি। তাঁরা বনে দিক হারান না, কারণ তাঁরা জঙ্গলকে বাইরে থেকে দেখেন না, তাঁরা জঙ্গলেরই অংশ। কিন্তু মানচিত্রের গ্রিড (X, Y কোঅর্ডিনেট) বা টপোগ্রাফিক্যাল চিহ্নের বিমূর্ত জ্যামিতিতে তা প্রকাশ করার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁদের নেই।অন্যদিকে আমাদের এই শহরের কলেজের মেয়েরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বড় হয়েছে। তারা যখন পাহাড়ে এসে ওরিয়েন্টেশন (ওরিয়েন্টিং ম্যাপ ও কম্পাস ব্যবহার) শেখে, তখন তারা তাদের চারপাশের বাস্তব স্থানকে (Physical Space) জ্যামিতিক স্কেল, দ্রাঘিমাংশ, অক্ষাংশ এবং চিহ্নে অনুবাদ করতে পারে। একে বলা হয় মনের মধ্যে কার্টোগ্রাফিক র‍্যাশনালিটি তৈরি হওয়া। এই র‍্যাশনালিটি আত্মস্থ হলে তারা অভিজ্ঞতাকে কাগজে প্লট করে একটি ‘অবজেক্টিভ ম্যাপ’ তৈরি করতে পারে। এই পারাটুকু খুবই ভালো। আমি বহুবার বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে পায়ে হেঁটে এইরকম ম্যাপ বানিয়েছি, তা সে বিষ্ণুপুরের তাঁতীদের পাটরাপাড়াই হোক বা অন্ধ্র প্রদেশের আরাকু ভ্যালি। আরাকুতে তো একে ক্যাডাস্ট্রাল ম্যাপে লেখা ভাষা বা হরফ বুঝতে পারছিনা, আবার স্থানীয় লোক কিছু বলতেও পারছেনা। যাই হোক এইভাবে ম্যাপ বানাতে পারলে ছেলেমেয়েরা ভীষণ আনন্দ পায়, আমিও খুশি হই। তবে আধুনিক ক্রিটিক্যাল কার্টোগ্রাফি (Critical Cartography) বলে, মানচিত্র এতটাও মঙ্গলজনক, নির্দোষ বা নিরপেক্ষ নয়। মানচিত্র হলো ক্ষমতার ভাষা (Language of Power)। আদিবাসী মানুষের নেভিগেশনাল ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও, ঔপনিবেশিক বা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তাঁদের জমি কেড়ে নিতে পেরেছে, কারণ তাঁদের কাছে ‘কাগুজে দলিল’ বা ‘ম্যাপ’ ছিল না।সভ্যতার মুদ্রার অন্য পিঠটা ঘুরিয়ে দেখলে চেনা ধারণার বদল হয়। আমাদের ছেলেমেয়েরা যে ওরিয়েন্টেশন শিখে সেটাকে কাগুজে ম্যাপে পরিণত করতে পারছে— সেই জ্ঞান আসলে যে কোন স্থানকে তার নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার এক বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার। অ্যাকাডেমিক ভূগোলে আমরা এই কাগজের ম্যাপটাকেই ‘উচ্চ জ্ঞান’ বলে মান্যতা দিই, আর আদিবাসীর মেন্টাল ম্যাপ বা মনশ্চক্ষে ভাসমান পথকে ‘সহজাত প্রবৃত্তি’ বলে খাটো করি। কিন্তু ক্রিটিক্যাল জিওগ্রাফি বলে, দুটোই সমান দামী স্থানিক জ্ঞান (Spatial Knowledge), শুধু প্রকাশের মাধ্যম আলাদা। কলেজের স্টুডেন্ট পায় এক্সপ্লিসিট জ্ঞান যা একই সঙ্গে থিওরিটিক্যাল ও টেকনিক্যাল। আর বনের মানুষ অর্জন করে ইমপ্লিসিট জ্ঞান যা প্র্যাকটিক্যাল ও ইনটুইটিভ। ইমপ্লিসিট জ্ঞান আনে প্রকৃতির সাথে একাত্মতা আর ছাত্রের আছে কোন স্থানকে ডিকোড ও মেজার করার ক্ষমতা। এখন প্রশ্ন হল, সেই জ্ঞান অর্জন করতে গিয়ে তারা কি মানুষের লক্ষ লক্ষ বছরে অর্জিত আদিম ‘পর্যবেক্ষণ, ঘ্রাণ ও স্পর্শের’ দ্বারা মেন্টাল ম্যাপ তৈরি করার অনুভব হারিয়ে ফেলছে? কিছুটা তো হারাচ্ছে বটেই। আমাদের হাতের নাগালেই এমন অনেক জায়গা আছে, যেখানে ইন্টারনেট চলেনা অর্থাৎ প্রযুক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এখনকার ছাত্রছাত্রীদের এমন দশা ফোনটি না চললে তারা ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে যায়। প্রযুক্তি নিয়ে সক্ষম হতে গিয়ে আজ তারা প্রযুক্তি ছাড়া অক্ষমে পরিণত হয়েছে। এই খামতি বা ফাঁকটুকু ভরাট করার জন্যই এই মোবাইল ফ্রি হয়ে পাহাড় চড়ার আয়োজন। নানান কথা ভাবতে ভাবতে, আলোচনা করতে করতে ফিরে এলাম হবিট হাউসে। গতরাতের পরিপূর্ণ ঘুমের পরে মন ভরা তৃপ্তি, নিজেদের রিনিউ আর রিসেট বাটন অন করে ফিরে এসেছি আস্তানায়। সামনে গামলায় ভেজানো ছোলা আর পাশের বাটিতে নির্ভেজাল আখের গুড়। চোখে পড়া মাত্র পেট গুড়গুড় - আরে এযে ভয়ানক খিদে পেয়ে গেছে - এতক্ষণ কিছু মালুমই হয়নি। কবি তো তবে ঠিকই বলেছিলেন - এই দুনিয়ার সকল ভালো, আসল ভালো নকল ভালো, কিন্তু সবার চাইতে ভালো পাঁউরুটি আর ঝোলাগুড় থুড়ি ভেজা ছোলা আর এখো গুড়। মুঠো করে নিয়ে কিছুটা পেটপূর্তির পরে পেলাম গরম ধোঁয়া ওঠা চা। পৃথিবীতে গুড়-ছোলা-দুধ চা যে অমৃত সেটা এতদিন কেন যে বুঝিনি কে জানে। এর পরে লুচি তরকারি, তার পরে সেই মোক্ষ, যার জন্য এতদূর আসা - সেই কাঙ্ক্ষিত রক ক্লাইম্বিং - মানে সত্যি সত্যি পর্বতারোহণের প্রথম ধাপ। রোদ উঠেছে ঝিলমিলিয়ে। ধড়াচুড়ো পরে লতাঝোপ সরিয়ে কাঁটা বাঁচিয়ে আর চোরকাঁটায় মাখামাখি হয়ে গিয়ে দাঁড়ালুম মাঠার এক নেড়া ঢালের সামনে।চলবে...
    দেখছে জনতা, বলছে সাবাস! - সুমন সেনগুপ্ত | অলংকরণ: রমিতনদীয়ার কালিগঞ্জে দলীয় বৈঠক চলাকালীন কৃষ্ণনগর লোকসভার সাংসদ মহুয়া মৈত্রকে লক্ষ্য করে বিজেপির গেরুয়া বাহিনী সংগঠিত সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে। সাংসদের সামাজিক মাধ্যমের হ্যান্ডেলে আমরা প্রায় ৪ ঘণ্টা ধরে এই তান্ডব প্রত্যক্ষ করলাম কীভাবে বিজেপির গুন্ডাবাহিনী দলীয় পতাকা নিয়ে সমবেতভাবে হামলা চালানোর বন্দোবস্ত করেছিল। পুলিশ প্রশাসনের একটি গাড়ি খবর দেওয়ার অনেক পর অকুস্থলে পৌঁছয়। উপস্থিত কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা ওই গুন্ডাদের উন্মত্ত ভীড়কে সরিয়ে দেওয়ার কোন চেষ্টা না করে কাঠের পুতুলের মতো আচরণ করে। যা স্পষ্ট করে দেয় যে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব ও পুলিশ প্রশাসনের নির্দেশ মেনেই কোনরকম হস্তক্ষেপ থেকে পুলিশকে বিরত রাখা হয়েছে। মহুয়া মৈত্রের সামাজিক মাধ্যমের পোষ্টগুলো এবং এক্স হ্যান্ডেলের পোস্টগুলো যদি পরপর দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে এই মহিলা সাংসদ চিৎকার করছেন, যে তিনি আক্রান্ত। তিনি যে জায়গায় তাঁর দলীয় কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলেন, সেই ঘরটা জাতীয় সড়কের ওপরে একটি বাড়ির তৃতীয় তলায়। তাঁর ফেসবুক লাইভ থেকে দেখা যাচ্ছিল, যে ঐ ঘরের জানলার বাইরে একদল মানুষ জড়ো হয়েছেন এবং তাঁরাই উস্কানি দিচ্ছে। তাঁদের মুখে সেই কুখ্যাত কিংবা বিখ্যাত ‘জয় শ্রী রাম’ শ্লোগান এবং কারো কারো হাতে বিজেপির পতাকা। তাঁরাই ঐ ৩ তলার ঘর লক্ষ্য করে ডিম এবং পচা সব্জি ছুঁড়ছেন, আর মহুয়া মৈত্র ঐ পরিস্থিতিতে ফেসবুক লাইভে নাম ধরে পুলিশের উচ্চ পদস্থ আধিকারিক, বিজেপির জাতীয় সভাপতি, লোকসভার স্পীকারের নাম ধরে ধরে বলছেন। প্রশ্ন করছেন একজন বিরোধী দলের মহিলা সাংসদের উদ্দেশ্যে কি এই ধরনের আচরণ করা যায়? প্রায় ৪ ঘণ্টা ধরে এই তান্ডব সারা দেশ শুধু নয়, সারা বিশ্ব দেখেছে অথচ আমাদের গোদী মিডিয়া এই ঘটনার বর্ণনা করার সময়ে শিরোনাম লিখেছে, ‘জনরোষের শিকার মহুয়া মৈত্র’। বিষয়টা এখানেই থামেনি। সেই গোদী মিডিয়ার চ্যানেলের পোষ্টে গিয়ে মহুয়া আবারও লিখেছেন, ‘আপনারা এটাকে জনরোষ বলে চালাতে চাইলেও, বিষয়টা পরিকল্পিত সন্ত্রাস’ তিনি আরও লিখেছেন যে এই পরিকল্পিত সন্ত্রাসের কাছে তিনি মাথা নোয়াবেন না। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন বিদেশী খবরের চ্যানেলগুলো যেমন বিবিসি, আলজাজিরা, নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং দি গার্ডিয়ানকে উদ্দেশ্য করে লেখেন, যে ভারতে একজন মহিলা বিরোধী দলের সাংসদকে কী করে হেনস্থা করা হচ্ছে, তাঁরা যেন দেখে এবং খবর করে। এই ঘটনা সারা বিশ্বের সামনে বাংলার মাথা আরো নীচু করে দিলেও, বিজেপির রাজ্য সভাপতি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ তাচ্ছিল্য সহকারে এই ঘটনাকে তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্ব বলে চালানোর চেষ্টা করেছেন। একজন মহিলা সাংসদ কে এইভাবে হেনস্থা করার চেষ্টা তার কাছে অসুবিধার মনে হয়নি। তাঁর কথা অনুযায়ী, কেউ পকেটে ডিম নিয়ে ঘুরছেন কি না, পুলিশের পক্ষে কি জানা সম্ভব? মেটাল ডিটেক্টর আবিষ্কৃত হলেও, কোনও ডিম ডিটেক্টর এখনও পাওয়া যায়নি, সেইজন্য নাকি এই ধরনের আক্রমণ বন্ধ করা যাচ্ছে না। যেখানে একটি ডিমের দাম বাজারে এখন ৮ টাকা, সেখানে মানুষের হাতে এত ডিম যদি থাকে ছোঁড়ার জন্য তাহলে তো বলতে হয়, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময়ে মানুষের আর্থিক অবস্থা বেশ সচল ছিল। কারণ এখনো তো এই সরকার ১.৩০ কোটি মহিলাকে সবে অন্নপূর্ণা যোজনার প্রতিশ্রুত ৩০০০ টাকা দিয়েছে। আগের সরকারের অসংখ্য মহিলাই নানান কারণে বাদ পড়েছেন। তাহলে মানুষ এত ডিম কিনছে কী করে? আবার যখন সেই মানুষদের হাতে আবার বিজেপির দলীয় পতাকা দেখা যাচ্ছে, সেই লোকগুলোও নিশ্চিত নতুন বিজেপি, তাহলে তাঁদের চিহ্নিত করাটা যেমন পুলিশের কাজ, তেমন তো সেটা বিজেপির রাজ্য সভাপতিরও কাজ। তা না করতে পারলে, তিনি তো ব্যর্থ হিসেবেই চিহ্নিত হবেন। বুঝতে হবে তিনি বিজেপির তৃণমূলীকরণ আটকাতে পারছেন না। নাকি সচেতনভাবেই এটা করা হচ্ছে, যাঁরা বিজেপির কাছে মাথা নোয়াবে না, তাঁদের হেনস্থা করা হবে আর কাকলি ঘোষ দস্তিদার, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, জুন মালিয়া বা সায়নি ঘোষদের মত যাঁরা মাথা নুইয়ে দিচ্ছেন, তাঁদের ওপর কোনও আক্রমণ হবে না। এই অলিখিত নির্দেশ দেওয়া আছে। আজকের সময়ে বিরোধী রাজনীতিবিদ বা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দিকে ডিম ছুড়ে মারা হলে, তাঁদের সহযোগীরা কখনও কখনও নাটকীয়ভাবে হামলাকারীদের নাৎসি আমলের সঙ্গে তুলনা করছেন। বক্তব্য বা বয়ানটি এমনভাবে সাজানো হচ্ছে যাতে এই ঘটনাকে নিছক দুর্বৃত্তপনা হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক ভীতি প্রদর্শন, রাজপথে সহিংসতা এবং ১৯৩০-এর দশকের জার্মানির কথা মনে করিয়ে দেয় এমন এক বাকস্বাধীনতা দমনের ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। যদিও আজকের বাংলার শাসকদল বিষয়টা মানতে রাজি নয়, তাঁরা বলছে এটা মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত জনরোষ, কিন্তু আদপে কি বিষয়টা তাই? বাংলার বিধানসভায় সদ্য পাশ হয়েছে বিজেপির আনা কুখ্যাত গুন্ডাদমন বিল। যেখানে যে কোনো কল্পিত 'গুন্ডামির' অভিযোগে যে কোন নাগরিককে গ্রেপ্তার করে বিনা বিচারে এক বছর জেলবন্দী করার আইনি স্বীকৃতি রাখা আছে। অন্যদিকে, পূর্বতন শাসক, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীকে ডিম ছুঁড়ে সামূহিকভাবে প্রকাশ্যে হেনস্থা ও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। আর বিজেপির সভাপতি এই ডিম্বাঘাত সংস্কৃতির প্রসঙ্গে মিঠে সুভাষিত প্রচার করে চলেছেন। এই ক্রমবর্ধমান গেরুয়া সন্ত্রাসের রাজনীতির প্রতিবাদ না জানালে আগামীদিনে কিন্তু এই আগুনে অনেককেই পুড়তে হতে পারে। যাঁরা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছেন তাঁরাও যে আক্রান্ত হবেন না, তা নিশ্চয়তা আছে কি? ঐ হামলাবাজদের ও তাদের সরাসরি উস্কানিদাতাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহনের জোরালো দাবি জ্জানানো উচিৎ সকল রাজনৈতিক দলের। তার জন্য তাঁকে তৃণমূলের সমর্থক হতে হবে না। গণতন্ত্রের স্বার্থেই এটা করা উচিৎ। সামাজিক মাধ্যমে হয়ত তা হচ্ছেও, কিন্তু শুধু বিবৃতি দিয়ে হবে না, এই বিষয়টা নিয়ে বেশী বেশী করে কথা বলার প্রয়োজন এবং তা কোনও ‘কিন্তু, এবং বা পর্যন্ত’ না ব্যবহার করেই বলতে হবে। ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের শ্লোগান ছিল ‘বদলা নয়, বদল চাই’, তা সত্ত্বেও নানান জায়গায় বামপন্থী কর্মীদের ওপর আক্রমণ হয়েছে এবং তা চূড়ান্ত সমালোচিতও হয়েছে। কিন্তু আজকে যখন কেন্দ্রে রাজ্যে একই দলের সরকার, তখন না কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা আসছে, না স্বরাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিনিধিরা আসছেন। বিষয়টা যেন ‘নিউ নরমাল’ বলে মেনে নেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে খারাপ প্রচলিত গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকা। তাঁরা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার বদলে বিরোধী দলের অন্তর্দ্বন্দ্ব নিয়েই ভাবিত বেশী মনে হচ্ছে। মনে পড়ে যাচ্ছে গুজরাটের কথা। ভারতের প্রাক্তন সংসদ সদস্য এহসান জাফরিকে উত্তেজিত হিন্দু জনতা তাঁর বাড়ি থেকে টেনে বের করে নৃশংসভাবে মারধর করে এবং পুড়িয়ে হত্যা করে। গুজরাটের আহমেদাবাদে গুলবার্গ সোসাইটি হত্যাকাণ্ডের সময় ২০০২ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি তাঁর এই মৃত্যু ঘটে। সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক গঠিত একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, বাড়ির বাইরে সমবেত ভিড়ের দিকে আত্মরক্ষার্থে জাফরি তাঁর রিভলবার থেকে গুলি চালানোর পরই সহিংসতা তীব্র আকার ধারণ করে এবং জনতা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। উদ্ধারের জন্য পুলিশ ও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে বারবার ফোন করা সত্ত্বেও কোনো সাহায্য না আসায় শেষ পর্যন্ত তাঁর এবং আরও ৬৮ জন বাসিন্দার মৃত্যু ঘটে। বাংলায় মহুয়া মৈত্রের সঙ্গে যা হয়েছে, তা যেন সেদিনের গুজরাটের ঐ নৃশংস ঘটনার একটা ছোট্ট অংশ। আগামীদিনে যে এই ঘটনা অন্য বিরোধী দলের ক্ষেত্রে বা যাঁরাই বিজেপি বিরোধী, তাঁদের বিরুদ্ধে হবে না, কে বলতে পারে? জনগণ তৃণমূলকে হারিয়েছে তাদের বহু সদস্যের বিপুল চুরি আর তোলাবাজির জন্য। অনেক বিধায়ক ও কাউন্সিলার এক শ্রেণীর সমাজ বিরোধীদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, সেই জন্যেই তাঁরা আজ পরাজিত। গত নির্বাচন যদি তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনরায় হয়ে থাকে, তাহলে ওই তৃণমূলের সবচেয়ে বড় বড় রাঘব বোয়ালরা ও মস্তানেরা এখনও কীভাবে দিব্যি তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে? এদের মধ্যে অনেকে বিশাল অঙ্কের টাকা নিয়ে অসাধু প্রমোটারদের প্রচুর বেআইনি বাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। কোনও শাস্তি তো হচ্ছে না। তাঁদের কাউকে কাউকে বর্তমান শাসকদলের বিধায়ক-মন্ত্রীদের আশেপাশে দেখা যাচ্ছে কেন? তাঁরা কি বিজেপির বি টিম গঠন করে হঠাৎ ধপধপে সাদা হয়ে গিয়েছেন? এর জন্যে কি কোনো অ্যাডমিশন ফিস দিতে হয়েছে? বাজারে কত রকমের কত কথা শোনা যাচ্ছে। বিজেপি কি বুঝতে পারছে না যে এঁদের সঙ্গে রফা করে তারা জনাদেশকে অপমান করছে ?তাঁদের রাজ্য সভাপতির কথা অনুযায়ী এরা সবাই তৃণমূল, যাঁরা মহুয়া মৈত্রকে আক্রমণ করতে গিয়েছিল, তাহলে তাঁদের গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশকে কিছু কেন বলছে না সরকার, সেটা তো রাজ্য সভাপতি বলতে পারেন। অবশ্য তাঁর একটা যুক্তি আছে, এই সরকারকে কোনও নির্দেশ দিতে তিনি পারেন না, তিনি তাঁর দলকে নির্দেশ দিতে পারেন। অবশ্যই ঠিক বলেছেন, তাহলে সেটাই তিনি করুন, না হলে তাঁর সুললিত গলায় গম্ভীর ভাষণের তো কোনও মূল্যই থাকছে না। অনেকেই উচ্ছসিত হচ্ছিলেন যখন তৃণমূলের নেতা মন্ত্রীদের ডিম ছুঁড়ে মারা হচ্ছিল। বহু সিপিআইএম কর্মী খুব উল্লাসিত হচ্ছিলেন। বেশিদিন হয়নি এখন দেখা যাচ্ছে মীনাক্ষী মুখার্জির দিকেও ওই ডিম এবং পাথর তেড়ে আসছে। আসলে জনরোষের নামে বিজেপির পরিকল্পিত মবতন্ত্র কখন যে বিরোধীদের মুখ বন্ধ করার জন্য ব্যবহৃত হবে তা বোঝা যাবে না। মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ তো সরাসরি হুমকি দিয়েছেন, এবার বুদ্ধিজীবি ও কমিউনিষ্টদের ওপর ডিম ছুঁড়তে হবে। সে তো হবেই, ওঁদের যে কোনও বুদ্ধিজীবি নেই, তা না বলে দিলেও চলত। তবে বিষয়টা মোটেও আর হাসি ঠাট্টার পর্যায়ে নেই। বিষয়টা ক্রমশ জটিল হচ্ছে। সেই জন্যই এই ডিম ছোড়ার এবং এই মবতন্ত্রের বিরোধিতা করতে হবে। কবীর সুমন এক সময়ে একটা গান লিখেছিলেন ‘একখানা ইঁট যদি পাওয়া যেত, নোংরা মুখখানা করতাম থেঁত, ভাবতে ভাবতে গেল একজন, ক্ষত বিক্ষত ছেলেটার কাছে, যেন দু’জনের শ্ত্রুতা আছে... দেখছে জনতা বলছে সাবাস। মাঝে মধ্যেই এখানে ওখানে পিটিয়ে মারার ব্যস্ত শ্মশানে পুড়ছে কে? প্রশ্ন অনেক উত্তর নেই এই অসহ্য সময়টাকেই কাঁদতে দে ’ গণপিটুনি এক সময়ে ভয়ঙ্কর বেড়ে গিয়েছিল, সেই সময়ে কবীর সুমন এই গানটা তৈরি করেছিলেন। আজকে বহু সরকার এসেছে এবং গেছে, কিন্তু অবাক হতে হয় যে অপরাধীরা কী সহজ ভাবে এক দল থেকে নতুন সরকারের দলে চলে যায়। অপরাধ তো চলতেই থাকে। শুধু পৃষ্ঠপোষক আর পোশাক পাল্টে যায়। সরকার কি বুঝছে না এই গুন্ডাশ্রেণীই তাদের ডোবাবে? শেষ করা যাক একটা আশার খবর দিয়ে। এখন বাংলায় সাধারণ মানুষ ডিম ছোড়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে! দীঘায় এক সরকারি কর্মীর মাথায় ডিম ভাঙা হলে, তাঁর পাশের সাধারণ মানুষজন বিরোধিতা করে।এই খবরটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত যাতে এই জনতা বুঝতে পারে যে সভ্য সমাজে ডিমতন্ত্র বলে কিছু হয় না! কোনো ডিম শনাক্তকারী যন্ত্রের প্রয়োজন নেই। বিজেপির রাজ্য সভাপতি বলছেন, পুলিশের কাছে ডিম শনাক্ত করার যন্ত্র নেই, আর ওদিকে বিজেপির নেতা বলছে, তার কাছে নাকি ডিম ছোড়ার নির্দেশ আছে। সরকার গুন্ডা দমন আইন আনছে, আর ওদিকে সরকারের মন্ত্রী গুন্ডাদের ভাষায় কথা বলছেন। দুটো তো একসঙ্গে চলতে পারে না। একমাত্র গণপ্রতিরোধই এই মব ভায়োলেন্স থামাতে পারে। ব্যস।
    ভোটাধিকার থেকে বাদ যাওয়া মানুষদের নিয়ে কথা কে বলবে? - সুমন সেনগুপ্ত | অলংকরণ: রমিতদ্যা টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রাক্তন মুখ্য সম্পাদক রাজাগোপালের বহুদিনের পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণ হয়নি, পুলিশ যে তথ্য যাচাই করে, সেই তথ্য যাচাইতে জানা গেছে যে তাঁর নাম যেহেতু ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় ছিল না, তাই তিনি ভারতীয় কি না, তার স্বপক্ষে তাঁরা কোনও প্রমাণ নাকি দাখিল করতে পারেনি, তাই তাঁরা বিরূপ রিপোর্ট দিয়েছে। যা বোঝা যাচ্ছে দেশের অন্যতম বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং সম্পাদক রাজাগোপালের নাম গত ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় না থাকার ফলে, তাঁর পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণ হবে কি না, তা প্রশ্নের মুখে।এই বিষয়ে তাঁর নিজস্ব একটি বয়ান সমাজমাধ্যমে ঘুরছে। সেই বক্তব্যের বেশ কিছুটা অনুবাদ করে পড়া প্রয়োজন। আমাদের মধ্যে অনেকেই হয়ত তৃণমূলের অপশাসন গিয়ে বিজেপির শাসন ব্যবস্থা আসাতে উল্লসিত, কিন্তু সেই ভোটে কি সত্যিই মানুষের রায় প্রতিফলিত হয়েছে, এই প্রশ্নও টুকটাক উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইভিএম পুড়ে যাওয়ার ঘটনা, সেই প্রশ্নে আরো ঘৃতাহুতি দিয়েছে। তিনি লিখেছেন - “এই বছরের মার্চ মাসে, কলকাতার বালিগঞ্জ নির্বাচনী এলাকার ভোটার তালিকা থেকে আমার নাম বাদ দেওয়া হয়। এর কারণ হিসেবে বলা হয় যে, ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়ায় ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আমার বা আমার প্রয়াত বাবার কারও নামই খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমার বাবা ছিলেন একজন গান্ধীবাদী ব্যক্তিত্ব, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং কেরালার ‘গান্ধী স্মারক নিধি’র প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদক। তিনি ২০১৬ সালে প্রয়াত হন। তাঁর মতো একজন সচেতন ও দায়িত্বশীল ভোটারের নাম কীভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে, তা আমার বোধগম্য নয়।পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২৭ লক্ষ বাসিন্দার মতোই, তথাকথিত ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’র (Logical Discrepancies) কারণে আমার নামও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। আমার ম্যাট্রিকুলেশন বা মাধ্যমিক পরীক্ষার নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি; বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী গঠিত ট্রাইব্যুনালগুলোর একটিতে আমার আপিলটি বিচারাধীন রয়েছে। এর ফলে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে আমি ভোট দিতে পারিনি।আরও হতাশাজনক হলো আমার পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণের আবেদনের বিষয়টি। যদিও ১৯ মার্চ, ২০২৬-এ আমি বায়োমেট্রিক সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছিলাম, তবুও পুলিশ ভেরিফিকেশন বা যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়নি কারণ ভোটার তালিকায় আমার নাম আর নেই। বেশ কিছু বিকল্প নথিপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও আমাকে জানানো হয়েছে যে সেগুলো অপর্যাপ্ত। বস্তুত, আজ (২৭ জুন, ২০২৬) পাসপোর্ট নবায়নের জন্য বায়োমেট্রিক দেওয়ার পর ১০০ দিন অতিক্রান্ত হলো। গত সপ্তাহে পাসপোর্ট প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে কলকাতা পুলিশ একটি ‘প্রতিকূল প্রতিবেদন (adverse report) পাঠিয়েছে। আমাকে অবিলম্বে কলকাতার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে (Regional Passport Office) হাজির হতে বলা হয়েছে; কিন্তু আমি যখন সাক্ষাতের জন্য সময় (অ্যাপয়েন্টমেন্ট) চাইলাম—যা ছাড়া সেখানে প্রবেশ করা কঠিন—তখন আমাকে ১৭ জুলাই, ২০২৬-এর তারিখ দেওয়া হলো।এরই মধ্যে, ক্যালিফোর্নিয়ায় কর্মরত সাংবাদিক আমাদের মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন হলো সান ফ্রান্সিসকোতে, ১৭ এপ্রিল। বলাই বাহুল্য, বৈধ দশ-বছরের মার্কিন ভিসা থাকা সত্ত্বেও, একটি সচল পাসপোর্ট ছাড়া সেই বিয়েতে আমার পক্ষে উপস্থিত হওয়া অসম্ভব ছিল।বাস্তব বিচারে, আমি এখন এক ধরণের নাগরিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি—যদিও সরকার সম্প্রতি পুনর্ব্যক্ত করেছে যে পাসপোর্ট নাগরিকত্বের কোনো প্রমাণ নয়। আমার সারাদিনের সময়ের বড় একটা অংশ এখন ব্যয় হচ্ছে পারিবারিক নথিপত্র পুনরুদ্ধার এবং কয়েক দশক আগের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জোগাড় করার প্রচেষ্টায়... আমার দিন শুরু হয় ভোটাধিকার সংক্রান্ত আবেদনের বর্তমান অবস্থা এবং পাসপোর্টের আবেদনের গতিবিধি (ট্র্যাকার) যাচাই করার মধ্য দিয়ে। এরপর আমি সেই কলেজে চিঠি লিখি যেখানে আমার মা ১৯৬৫ সালে শিক্ষকতা করেছিলেন এবং সেই স্কুলে যেখান থেকে তিনি ১৯৫৯ সালে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন; উদ্দেশ্য হলো এমন কোনো নথিপত্র জোগাড় করা যা তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়। স্কুলটি এ ব্যাপারে বেশ সহায়তা করেছে, কিন্তু কলেজটি তা করেনি। একইভাবে, আমি কেরালার মদ্যপান-বিরোধী প্রচারণায় যুক্ত কর্মীদের সাথে কথা বলি—একটি অনলাইন গ্রুপে ঘটনাক্রমে এক কর্মীর নাম পাওয়ার পর আমি যে তালিকা তৈরি করেছিলাম, তা ধরেই এগোচ্ছি। আমি তাঁদের কাছে এমন কোনো সংবাদপত্রের কাটিং বা ছবি চাইছি যাতে অবৈধ মদের দোকান ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আমার বাবার প্রচারণার প্রমাণ পাওয়া যায়।আমার এই সব প্রচেষ্টায় কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি সহায়তা করেছেন। তবে কোনো সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিক সংগঠন বা গিল্ড (যার আমি সদস্য নই) আমার এই পরিস্থিতির প্রতি কোনো আগ্রহ দেখিয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই। একজন প্রবীণ সাংবাদিক আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই ব্যতিক্রমী নয়; কারণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লক্ষ লক্ষ ভারতীয়কে নিত্যদিনের বাস্তবতা হিসেবে এই ‘প্রত্যাখ্যান’ এর মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমি সেই যুক্তি মেনে নিয়েছি।নিজেকে ভুক্তভোগী বা ‘ভিক্টিম’ হিসেবে তুলে ধরা আমার উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না। বরং আমি একটি বৃহত্তর বিষয়কে সামনে আনতে চেয়েছি: সাংবাদিকতায় পেশাগত জীবন কাটানো এবং মোটামুটি পরিচিত একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা কোনো ব্যক্তি যদি এমন সব সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন, তবে সমাজের প্রান্তিক মানুষগুলোকে কী ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা সহজেই অনুমেয়। আমি কি কোনো সংবাদপত্রের দ্বারস্থ হয়েছি? না, কারণ আমি চাই না বিষয়টি কেবল আমাকে কেন্দ্র করেই কোনো ইস্যু হয়ে উঠুক। সম্পাদক ও সাংবাদিকরা কি আমার এই সমস্যার কথা জানেন? অবশ্যই, তাঁদের অনেকেই জানেন। আর যদি না-ই জানেন, তবে তাঁদের এই পেশায় থাকা উচিত নয়—আপনারও কি তাই মনে হয় না?তবুও, এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্পূর্ণ নীরবতা আমার সেই সন্দেহকেই নিশ্চিত করেছে—যা এখন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে আরও জোরালো হয়েছে—যে তথাকথিত মূলধারার সাংবাদিকতার সাথে আমার জীবনের খুব একটা সম্পর্ক নেই। আমি এখন আর কোনো সংবাদপত্র ‘পড়ি’ না। কোনো কোনোটির ওপর হয়তো চোখ বুলিয়ে নিই, কিন্তু কদাচিৎ এমন কিছু খুঁজে পাই যা আমার আগ্রহ জাগিয়ে তোলে।’’রাজাগোপালের এই বয়ানটি হয়ত, অনেকেই পড়েছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও নির্লিপ্ত থেকেছেন, ঠিক যেমনটা ভোটের আগে, কিংবা আসামের এনআরসি’র সময়ে ছিলেন। তখন হয়ত বেশীরভাগ মানুষ ভেবেছিলেন, এই সমস্যা শুধু মুসলমানদের বা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’দের নিয়ে হবে, তাই তখন খুব বেশী শোরগোল করেননি। সেই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোও খুব বেশী সোচ্চার হয়নি, তারা সবাই ব্যস্ত ছিল নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারে। তৃণমূল কংগ্রেসের ধারণা ছিল, যে ঐ ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে বাদ গেলেও মানুষের সমর্থন তাঁদের দিকে থাকবে। সেই জন্যেই তাঁদের শ্লোগান ছিল, ‘যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা’। অথচ তাঁদের জনভিত্তি যে কমছিল, তা তাঁরা এঁচে উঠতে পারেনি। ওদিকে বামেদের একাংশ, বিশেষ করে সিপিআইএম ভেবেছিল এই প্রক্রিয়াতে তৃণমূলের ক্ষতি হবে, সুতরাং খুব বেশী হইচই না করলেও চলবে, তাই তাঁরা দায়সারা ভাবে বিরোধিতা করেছিল। এমনকি আইএসএফের পক্ষ থেকেও নৌশাদ সিদ্দিকি’র একটা বক্তব্য এসেছিল, ‘কোনও নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা নেই মুসলমানদের বেনাগরিক করার, প্রয়োজনে গোরের মাটি এনে প্রমাণ দেওয়া যাবে তাঁরা এই দেশের বাসিন্দা’।যদি ঘটনা পরম্পরা পরপর সাজানো যায়, তাহলে দেখা যাবে, প্রাথমিক যে খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়, সেখানে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ যায়, তার মধ্যে, মৃত, স্থানান্তরিত এবং অন্য ইনিউমারেশন ফর্ম জমা না দেওয়া ব্যক্তিদের নাম ছিল। যদিও সেই তালিকা নিয়েও অনেক প্রশ্ন ছিল তবুও অনেকে এই বিষয়টা মেনে নিয়েছিলেন। এরপর নির্বাচন কমিশন আসরে নামে তাঁদের ব্রহ্মাস্ত্র নিয়ে, নামের বানান, বাবার নাম বা মায়ের নাম বা পরিবারের অন্য কোনও ব্যক্তির নাম যদি ২০০২ সালের তালিকায় না থাকে, তাঁদের শুনানিতে ডাকা হয়। বলা হয়, এই ব্যক্তিদের ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ আছে, এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সামনে উপস্থিত হয়ে তাঁদের প্রমাণ করতে হবে, তাঁরা এই দেশের নাগরিক এবং ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে তবেই তাঁরা তাঁদের নাম তুলতে পারবেন।যদি খেয়াল করা যায়, এই শুনানিতে উপস্থিত হতে বলা হয়, সেই সংখ্যাটা ছিল প্রায় ১.৫ কোটি। বিভিন্ন শুনানি কেন্দ্রে তখন যাঁরা উপস্থিত হচ্ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রাদায়ের মানুষ ছিলেন। বৃদ্ধ থেকে আশীতিপর অসুস্থ মানুষজন ও ছিলেন। রাজ্যের প্রথম সারির প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রে প্রায় প্রতিদিন এই হয়রানির ছবি প্রথম পাতায় থাকলেও, একমাত্র গণশক্তি পত্রিকা প্রথম ৬ দিন সম্পূর্ণ নীরব ছিল। তাঁরা একটি কথাও বলেনি, বা একটি ছবিও প্রকাশ করেনি। শুধু তাই নয়, নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশও কোনও এক অজ্ঞাত কারণে চুপ থেকেছে। ততদিনে বিষয়টা আদালতে গেছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে শুনানি চলছে। এই প্রক্রিয়া আদৌ সাংবিধানিক কি না, তা নিয়ে নানান প্রশ্ন উঠে গেছে। এই হয়রানি নিয়েও কথা হয়েছে, কিন্তু প্রধান বিচারপতি বারংবার বলে গেছেন, কোনওভাবেই এই প্রক্রিয়া বন্ধ করা যাবে না। তিনি মেনে নিয়েছেন মানুষের হয়রানি হচ্ছে, তার জন্য তিনি বেশ কিছু পন্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেন, কিন্তু নির্বাচন কমিশন আদৌ কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব পরীক্ষা করতে পারে কি না সেই রায় তিনি স্থগিত রাখেন। অন্য আরো একজন যে বিচারপতি এই মামলা শুনছিলেন, ঘটনাচক্রে তিনি বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও এবং বাঙালির নামের পদবী সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী স্পষ্ট করলেও, এই ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ বা যৌক্তিক অসঙ্গতি যে একেবারেই অযৌক্তিক তা স্পষ্ট করে বলেননি।ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেছে চূড়ান্ত তালিকা থেকে, যাঁরা এবারের বাংলার নির্বাচনে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হল, প্রধান বিচারপতি এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেছেন, এইবার ভোট দিতে না পারলেও পরের বার দিতে পারবেন এই মানুষেরা। সঙ্গে আরো বলেছেন, যে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে নাগরিকত্বের কোনও যোগ নেই। এই ২৭ লক্ষ মানুষকে বলা হয়েছে ট্রাইবুনালে আবেদন করতে। ততদিনে কমিশন নির্বাচন ঘোষণা করে দিয়েছে। দেখা গেছে প্রায় ৩৪ লক্ষ মানুষ ঐ ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন। তারপরে নির্বাচন হয়েছে এবং বিজেপি ২০৫টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে।তারপরে আরো অনেক ঘটনা ঘটেছে। তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙেছে। যে মানুষটি নিজে একটা রাজনৈতিক দল তৈরি করেছিলেন, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দল ধরে রাখতে পারেননি। কিন্তু সেইসব বাদ দেওয়া গেলেও ঐ বাদ যাওয়া মানুষদের কথা সবাই ক্রমশ ভুলতে বসেছে। তারপরে নতুন করে আবার এই বিষয়টা এখন সামনে আসা শুরু হয়েছে। নতুন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বাদ যাওয়া মানুষদের আর কোনও সরকারি সুযোগ সুবিধা দেওয়া যাবে না। রেশন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সুবিধা কোনটাই যেন এই ভোটার তালিকা থেকে জোর করে বাদ দেওয়া মানুষেরা না পান, সেই নির্দেশিকা জারি হয়েছে। তার মধ্যে বিদেশ মন্ত্রক থেকে বলা হয়েছে, যে পাশপোর্ট থাকা মানেই সেই ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক তা প্রমাণিত হয় না। হয়ত এই আইন আগেও ছিল, কিন্তু এই সময়ে এই কথা বলা এবং টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদকের সাম্প্রতিক বার্তা দেখিয়ে দেয়, অলিখিত ভাবে হলেও দেশের সরকার ঐ ভোটার তালিকাকেই প্রামাণ্য নথি হিসেবে ধরছেন।হয়ত রাজাগোপাল তাঁর নিজের সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারবেন। তাঁর সেই সামাজিক সুবিধা আছে, কিন্তু যে অসংখ্য মানুষের নাম বাদ গেছে, তাঁদের কী হবে? তাঁদের সম্পর্কে সিপিআইএমএল এবং সিপিআইএম ছাড়া কংগ্রেসও এখনো কোনও জোরালো কিছু বলেনি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভোটার তালিকা থেকে যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের সব ধরনের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে। বাংলায় এই প্রক্রিয়াটি চলছে এবং এরপর হিন্দি-বলয়ের বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতেও এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এর ফলে কেবল মুসলিমরাই নয়, বরং বহু দরিদ্র পরিবারও মারাত্মক পরিণতির সম্মুখীন হচ্ছে। এটি কোনো সাম্প্রদায়িক সংঘাত নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি একটি শ্রেণি বা জাতিগত (বর্ণভিত্তিক) ইস্যু। তাছাড়া, রাষ্ট্র এবং তার মদতপুষ্ট শক্তিগুলো যখন সংখ্যালঘু ও সামাজিকভাবে বা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করে, তখন তাকে আর কেবল 'সংঘাত' বলা চলে না। জেনে রাখুন, বৈষম্যের মাত্রা আরও এক ধাপ বেড়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলো ছাড়া ভোটাধিকার থেকে বাদ যাওয়া মানুষদের নিয়ে কথা কে বলবে? সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতও এই বিষয়ে এখনো অবধি কোনও কথা বলেনি। তাহলে এই মানুষদের কী হবে, এই বাদ যাওয়া মানুষেরা তবে কি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়েই থেকে যাবেন? জনগণনা থেকে তাঁরা বাদ পড়বেন না তো? একটা ‘অযৈক্তিক’ যুক্তি এত মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে, আর রাজনৈতিক দলগুলো কিচ্ছু করবে না?
  • হরিদাস পালেরা...
    এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজম, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও রাত আকাশ । - Somnath mukhopadhyay | এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজম, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও রাত আকাশ। ‘এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজম’ ব্যাপারটা কি একদম নতুন ? অন্তত আমাদের দেশে? মোটেই তেমন নয় – এমনটাই জানালেন আমার এক বিশিষ্ট জ্যোতির্বিদ বন্ধু। তবে রাত আকাশ পাঠের বহু পুরনো সাবেকি ব্যাপারটাকেই আপাদমস্তক বাণিজ্যিক মোড়কে মুড়ে পরিবেশনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে বিদেশের পাশাপাশি আমাদের দেশেও। একথা মানতেই হবে যে সারা দুনিয়া জুড়েই এখন পর্যটন শিল্পের রমরমা। এই ক্ষেত্রের উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিয়োগ ঘটছে দেশে দেশে। দেশের মানচিত্র ঢুঁড়ে খুঁজে আনা হচ্ছে নিরিবিলি এবং অপরিচিত কোনো ঠিকানা, আর তারপরেই তড়িঘড়ি করে পরিকাঠামোর উন্নয়ন ও সংস্কার করা হচ্ছে যাতে র‌ইসদার পর্যটকদের বেড়াতে বেরিয়ে সামান্যতম অসুবিধা না হয়, ঘরের বাইরে বেরিয়েও তাঁরা যেন নিয়ত অনুভব করেন নিজেদের বাড়িতে থাকার অখণ্ড নিরাপত্তা ও আনন্দ, সুখ ও বিলাস। এটা তো গেল এই শিল্পের সাম্প্রতিক বিকাশধারার একটা দিক। আরও একটা দিক এর‌ই পাশাপাশি আলোচ্য, তা হলো পর্যটনের উদ্দেশ্যগত ভাবনার পরিবর্তন। কেমন ব্যাপারটা? একটু খুলেই বলি। ধরুন আপনি দিল্লি যাচ্ছেন ঘুরতে। কেন যাবেন দিল্লি ? আপনার সামনে অনেক অনেক পছন্দের জানালা খুলে যাবে – দেশের রাজধানী, ঐতিহাসিক স্থাপত্য দর্শন, পাশাপাশি আপনি ঘুরে আসতে পারেন দিল্লির যমুনা পাড়ের ঘিঞ্জি বস্তিতে, দেখে আসতে পারেন সেখানে থাকা সমাজের একেবারে প্রান্তিক স্তরের মানুষজনের নিবিড় লড়াকু জীবন যাপনের অমলিন ছবি। অনুভব করতে পারেন তাঁদের আশা -আকাঙ্খা, স্বপ্ন - ভবিষ্যতের খণ্ডচিত্রকে। অনেক অপশনের মধ্য থেকে আপনি আপনার পছন্দের একটিকে বেছে নিতে পারেন। অনেক কাল আগে শুনেছিলাম টেলর মেড ট্যুরিজমের কথা। এটা বোধহয় তেমনি একটা ব্যবস্থা। এভাবেই সময়ের হাত ধরে বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে বদলে বদলে যাচ্ছে দর্শনীয় বস্তুর অভিমুখ। আমাদের নিয়মের ঘোরাঘুরির চেনা ছন্দ – গেলাম - ঘুরলাম - দেখলাম- খেলাম- মস্তি করলাম গোছের ট্যুরিজম এখন অনেক বেশি করে বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক হয়ে উঠছে। যেমন ধরুন আপনি খুব কাছ থেকে পাখিদের দেখতে পছন্দ করেন বা রাত আকাশের তারাদের সঙ্গে পরিচিত হতে চান – সেই অনুযায়ী বেছে নিতে পারেন আপনার বেড়ানোর জায়গাকে। আর এখান থেকেই উঠে আসছে পর্যটনের নতুন ধারনা বা কনসেপ্ট। এই পর্যন্ত করা আলোচনাকে এখানেই থুক করে রেখে, অন্য একটি বিষয় নিয়ে কথা কয়ে নিই। বছর কয়েক আগের কথা। খবরের শিরোনামে উঠে এলো এক নতুন ধারার খবর। লিওনয়েড মিটিওর শাওয়ার হবে ব্যাপক মাত্রায়। সহজ কথায় সিংহ রাশি থেকে উল্কা পাতের ঘটনা ঘটবে, প্রতি ঘন্টায় প্রায় পঁচিশটি করে। ব্যস্! লাগাতার প্রচারের ঠেলায় চেগে উঠলাম সকলে। অচিরেই টেলিভিশনের পর্দার দখল নিলেন এই ব্যাপারে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞেরা। এমন উল্কাপাতের ঘটনা আকাশমণ্ডলে নতুন নয়, তবে সেবার ছিল বিশেষ জো ! ধূলি ধূসরিত কলকাতার আকাশে সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার সুযোগ মিলবে না বুঝেই জনা কুড়ি ছাত্রকে বগলদাবা করে নিয়ে আমরা তিন মাস্টারমশাই ছুটলাম কলকাতা থেকে বেশ খানিকটা দূরে থাকা এক জনপদের উদ্দেশ্যে। সারারাত জেগে,সবাই আকাশের দিকে মাথা উঁচিয়ে থেকে ঘাড়ে ব্যাথা নিয়ে যখন ভোরের ট্রেনে বাড়ি ফিরে এলাম তখন সবার মুখেই ফ্লপ স্টার শো- এর কথা। সেবার সবথেকে হতাশার শিকার হয়েছিল টেলিমিডিয়ার মানুষজন। তবে রাত আকাশ পর্যবেক্ষণের একটা মানসিকতা রাতারাতি বেশ চাগিয়ে উঠেছিল আপামর জনসাধারণের মধ্যে। এটাও কিন্তু মোটেই কম পাওয়া নয়। যদিও সেই হুজুগ সুদূরপ্রসারী হয় নি। অথচ নিয়মিত রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণের অভ্যাস বহু প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের মধ্যে প্রচলিত আছে। রাতের আকাশে গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান দেখেই মানুষ এককালে ঠিক করেছে স্থানান্তরে গমনের সঠিক কাল, কৃষির পত্তনের পর ফসল বোনার উপযুক্ত সময় এই সব। প্রাচীন ভারতীয়দের সাথে সাথে গ্রীক, রোম, মিশর, চিন প্রভৃতি দেশের মানুষের ভেতরে রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণের এক আশ্চর্য পরম্পরা গড়ে উঠেছিল। অসীম নিষ্ঠায় ও অন্তহীন ধৈর্য্য নিয়ে সেইসব নাম গোত্রহীন মানুষেরা একটু একটু করে গড়ে তুলেছেন আকাশলিপির পরিচিতি। আজ‌ও সেই খোঁজার কাজ জারি রেখেছেন জ্যোতির্বিদরা।  আকাশচিত্র পাঠের কথাই যখন উঠে এলো তখন আমাদের ঠাকুর কবির বাল্য স্মৃতির কথা ভুলি কি করে? “ বয়স তখন হয়তো বারো হবে …. পিতৃদেবের সঙ্গে গিয়েছিলুম ড্যালহৌসি পাহাড়ে, সমস্ত দিন ঝাঁপানে করে গিয়ে সন্ধ্যাবেলায় পৌঁছুতুম ডাকবাংলায়। তিনি চৌকি আনিয়ে আঙিনায় বসতেন। দেখতে দেখতে, গিরি শৃঙ্গের বেড়া- দেওয়া নিবিড় নীল আকাশের স্বচ্ছ অন্ধকারে তারাগুলি যেন কাছে নেমে আসত। তিনি আমাকে নক্ষত্র চিনিয়ে দিতেন, গ্রহ চিনিয়ে দিতেন। শুধু চিনিয়ে দেওয়া নয়, সূর্য থেকে তাদের কক্ষচক্রের দূরত্বমাত্রা, প্রদক্ষিণের সময় এবং অন্যান্য বিবরণ আমাকে শুনিয়ে যেতেন।’’ জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সখেদে বলেন শহরের রাত আকাশ চুরি হয়ে গেছে আলোকাসুরের দাপটে। রাতের আঁধার দূর করতে শহরে শহরে বৈদ্যুতিক আলো জ্বালাবার ধূম যত বেড়েছে তত‌ই আমাদের দৃষ্টি সীমার আড়ালে চলে গেছে দূরলোকের গ্রহ নক্ষত্রেরদল। এই সমস্যার কথা জানাতে গিয়ে লেখা হয়েছিল একটি বিশেষ নিবন্ধ – আলোয় দূষণ ভরা। আমাদের দেশে শহরবাসী মানুষেরা এই ব্যাপারে খুব একটা সচেতন না হলেও, বিদেশের মানুষজন কিন্তু এই বিষয়ে বেশ সচেতন। আর হয়তো এই অভাববোধ থেকেই খুব দ্রুত প্রসার লাভ করছে এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজমের মতো পর্যটনের সম্পূর্ণ নতুন ধারনা। পকেটের পয়সা খরচ করে প্রাণ মন ভরে অপার বিস্ময়ে ভরা রাত আকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য ছুটছে দূরে আরও দূরে। আর এই সূত্রেই বেড়ে চলেছে এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজমের জনপ্রিয়তা। পর্যটনের এই বিশেষ ধারাটিকে ডার্ক স্কাই ট্যুরিজম বা আঁধার আকাশ পর্যটন নামেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে দুনিয়া জুড়েই। আমাদের মাথার ওপর থাকা আকাশপটের দৃশ্য ক্ষণে ক্ষণেই যায় বদলে; ফলে তা সবসময়ই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। সূর্য বা চন্দ্র গ্রহণের মতো মহাজাগতিক ঘটনা নিয়ে সচেতন, বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের চিরন্তন আগ্রহ ডার্ক স্কাই ট্যুরিজমকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে অতিমারির সময়ে মানসিক চাপ ও অবসন্নতাকে কাটাতে আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষজন এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজমের পথে হাঁটতে শুরু করেন অনেকটাই নিরুপায় হয়ে। ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে রাত আকাশ পর্যবেক্ষণের প্রতি নতুন করে অনুরাগ জন্মায়। এঁরাই এই ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হিসেবে মান্যতা পেয়েছেন পরবর্তীতে। এদেশে আকাশ পর্যবেক্ষণের পরম্পরা যে সুপ্রাচীন এবং গৌরবময় সে কথা আগেই বলেছি। যন্তর মন্তরের কথা চিন্তা করুন। সেই কবেই রীতিমতো রাজকীয় উদ্যোগে ‘খ’ শাস্ত্র চর্চার আয়োজন করা হয়েছিল আমাদের দেশে। রাজপুত রাজা সোয়াই জয় সিং ১৭৩৪ সালে এই মানমন্দির তৈরি করান। বর্তমানে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি প্রাপ্ত এই মানমন্দিরটি হলো পজিশনাল অ্যাস্ট্রোনমি চর্চার এক‌ বিশিষ্ট কেন্দ্র। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সূর্যঘড়ি এখানেই স্থাপন করা হয়েছিল। যন্তর মন্তরের প্রতিষ্ঠা ভারতের জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার এক‌ উজ্জ্বল স্মারক। ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার এক সুপ্রাচীন ও গৌরবময় পরম্পরা রয়েছে। দূরের আকাশকে নিয়ে ভারতীয়দের নিবিড় আগ্রহ ও চর্চার ইতিহাসতো সুপ্রাচীন। দলবেঁধে পর্যটনের সূত্রে আকাশ চর্চা নয়। নিজের ঘরে থেকেই খালি চোখে অথবা সামান্য কিছু উপকরণের সাহায্য নিয়ে চলেছে তাঁদের রাত আকাশ পাঠের নিমগ্ন সাধনা। এমনি একজন নিমগ্ন জ্যোতির্বিদ ছিলেন পাঠানি সামন্ত। আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশার এক প্রত্যন্ত গ্রামে বসে তিনি আকাশকে তাঁর একান্ত গবেষণার বিষয় করে তুলেছিলেন। জ্যামিতি ও ত্রিকোণমিতির প্রচলিত সূত্রকে কাজে লাগিয়ে তিনি জ্যোতিষ্কদের দূরত্ব নির্ণয় করেছেন নিখুঁত ভাবে। বাঁশ আর কাঠের সাহায্যে তিনি তৈরি করেছিলেন বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র যা ছিল তাঁর নিমগ্ন সাধনার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সময় গণনার কাজের জন্য তিনি তৈরি করেছিলেন এক বিশেষ ধরনের সূর্যঘড়ি। নিজের আবিষ্কার ও সিদ্ধান্তের কথা তিনি লিখে গেছেন তাঁর লেখা সিদ্ধান্ত দর্পণ নামের বিখ্যাত গ্রন্থে। দেশ বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এমন অগণিত সংখ্যক নিভৃত জ্যোতির্বিদদের কথা বলতে গেলে এই নিবন্ধটির পরিসর অনেকটাই বেড়ে যাবে। তাই মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। কথা শুরু করেছিলাম এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজমের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে। বিষয়টি এদেশে এখনও পর্যন্ত শৈশব অবস্থায় থাকলেও পশ্চিমি দেশগুলোতে এই নতুন নৈশ অভিযান রীতিমতো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ভারতে ট্যুর অপারেটররা ইতোমধ্যেই সম্ভাব্য কয়েকটি জায়গাকে বেছে নিয়েছেন রাত আকাশ পাঠের আসর বসানোর জন্য। যদিও এই তালিকা একেবারে সর্বসম্মত এমন নয়। পর্যটন শিল্পের মতো একটি লাভজনক বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করে তুলতে সকলেই চাইবেন নতুন নতুন নিরিবিলি পরিবেশে এই রাত আসর পাততে। পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পছন্দের জায়গা হিসেবে উঠে এসেছে বেশ কয়েকটি জায়গার নাম। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক এমন জায়গাগুলোর নাম। ১. স্পিতি উপত্যকা – এখানে পৌঁছনো বেশ কষ্টসাধ্য। তবে একবার এই আশ্চর্য উপত্যকায় পা রাখলে এক অপার্থিব অভিজ্ঞতা হবে রাত আকাশের সান্নিধ্যে। ২.চুমাথানজেরি – হিমালয়ের বুকে থাকা লাদাখের আরও এক আস্তানা যেখান থেকে রাত আকাশ দেখা এক অবিস্মরণীয় আনন্দের উৎস। ৩. সার্চু ক্যাম্প – একবার পৌঁছলে আর ফিরে দেখতে হবেনা। এটিও লাদাখে। ৪.ইয়েরকদ – দক্ষিণ ভারতের এখানে এলে রাত‌ আকাশকে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে ফেলবেন। ৫.লেহ্ – আবার সেই লাদাখেই ফিরতে হবে তারাদের তাড়নায়। ৬. মাহুলি – মহারাষ্ট্রের থানে জেলার অত্যন্ত পরিচিত এই জায়গায় বহু পর্যটকের নিয়মিত আনাগোনা হাইকিং এর উদ্দেশ্যে। ক্লান্ত শরীরে সন্ধ্যার পর ওপরের দিকে তাকালেই সব ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে যাবে। ৭. কুর্গ – কুর্গের খ্যাতি খুব সুস্বাদু খাবার আর গার্ডেন ফ্রেশ কফির জন্য। সন্ধের পর আরাম কেদারায় শরীর এলিয়ে দিয়ে উপভোগ করতে পারবেন রাত সামিয়ানার সৌন্দর্য। ৮.রাজস্থান – বর্ষার মেঘের চাদর যখন ঢেকে দেয় ভারতের বাকি অংশের আকাশ, তখন পৌঁছে যান রাজপুতানায়। রাতের আকাশ আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। ৯.গোয়া – রাত আকাশের টানে একবার ঘুরেই আসা যায়। ১০. ভূপাল – ইতিহাস প্রসিদ্ধ ভূপালে এসে রাত আকাশ না দেখে যাবেন না। এখানেই তালিকায় ইতি এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। আরও অনেক জায়গায়, যেখানে এখনও আলোর দাপট সেভাবে নেই, রাত আকাশের অপার ঐশ্বর্যের শরিক হতে পারবেন আপনারা। কেবল একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, আর তা হলো এই বিষয়ে জানার ইচ্ছে ও আগ্রহ। আজ থেকে সাড়ে পাঁচ দশক আগে এমন‌ই ইচ্ছে আর আগ্রহে ভর করে আমরা হাজির হয়েছিলাম এক রাতের ক্লাসে। তখন আমাদের সপ্তাহে পাঁচদিন করে ক্লাস হতো, শনি আর রবিবার ছিল ছুটির দিন। একদিন শুক্রবার ক্লাস শেষের আগে আমাদের শনিবার বিকেলে হাজির হতে হবে। উপলক্ষ রাতের ক্লাস। স্কুল ছুটির পর হাজারো জল্পনা করতে করতে দলবেঁধে বাড়ি ফিরলাম আমরা। ….. বাতাসে এখন হালকা শীতের আমেজ। জল ঝরানোর পর্ব শেষ করে বর্ষা বিদায় নিয়েছে। মেঘমুক্ত আকাশ এখন মখমলি কিংখাবের মতোই উজ্জ্বল। অসংখ্য জ্যোতিষ্কের দ্যুতিতে আকাশ এখন দীপ্যমান। জলদগম্ভীর কন্ঠে হেডমাস্টার মশাই তার কথকতা শুরু করেন – “রাতের আকাশে তারা দেখা একটা সুন্দর খেয়ালী অভ্যাস। তারাদের সাথে পরিচয় হতে হতে অবাক বিস্ময়ে মন চলে যায় লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে থাকা এক আশ্চর্য জগতে! ভাবতেও যেন কেমন শিহরণ জাগে শরীরে!...... আকাশে আমরা যে সব তারাদের খালি চোখে দেখতে পাই তাদের সংখ্যা দু- হাজারের মতো এবং সারা বছরে সব মিলিয়ে মোটামুটি পাঁচ থেকে ছয় হাজারের মতো তারা দেখা যায়।…. আজকে এই রাতের তারা দেখার আসরে তোমাদের ডেকে আনার উদ্দেশ্য‌ই হলো তোমাদের মধ্যে এই ইচ্ছে আর ভালোবাসাকে জাগিয়ে তোলা যাতে করে অনন্ত দূরত্বে থাকা ওই অগণিত জ্যোতিষ্কদের সাথে তোমরা আত্মার সম্পর্ক, আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তুলতে পার।”  গুটিসুটি মেরে আমরা সকলেই গায়ে গা লাগিয়ে ঘন হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। সকলেই উৎসুক হেডমাস্টার মশাই এরপর কী বলেন তা শোনার জন্য।……এমন অভিজ্ঞতা উপস্থিত সকলের কাছেই একেবারে নতুন। হেডমাস্টার মশাইয়ের কন্ঠ আবার সরব হয়ে ওঠে। হাতের লম্বা টর্চটা জ্বালিয়ে আকাশপটে নিক্ষেপ করে তিনি নতুন করে কথা শুরু করেন – “অক্টোবর মাসের আকাশের পূর্ব দক্ষিণ ভাগ জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সিটাস বা জলদানব। এর পশ্চিমে দেখা যাচ্ছে কুম্ভ রাশিকে। উত্তর পশ্চিম আকাশে দেখতে পাবে হারকিউলিস নক্ষত্র মণ্ডলীকে। ড্রাকো বা ড্রাগনের মাথায় পা দিয়ে মহা যোদ্ধা হারকিউলিস দাঁড়িয়ে আছেন বিজয়ীর উদ্ধত ভঙ্গিমায়।” কথা বলতে বলতে হেডমাস্টার মশাই টর্চ নেড়ে আকাশপট উজ্জ্বল করে উদ্ভাসিত নক্ষত্রমন্ডলীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন আমাদের। আমাদের নজর এখন উত্তর পূর্ব আকাশে। সেখানে দিগন্তের সামান্য উপরে একখণ্ড হীরের দ্যুতিতে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে ক্যাপিলা বা ব্রহ্মহৃদয়,অরিগা মণ্ডলীর সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার‌ই সামান্য কিছু দূরে আকাশের পূর্ব কোল ঘেঁষে একগুচ্ছ তারা ভিড় করে রয়েছে। এটিই হলো কৃত্তিকা নক্ষত্রমন্ডলী। ….. …… আমাদের কারো মুখে কোনো কথা নেই। অপলক দৃষ্টিতে ঘাড় উঁচিয়ে সুদূর জ্যোতিষ্কলোকের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে চলেছি আমরা। এতোদিন ব‌ইয়ের পড়ায় মন আটকে ছিল আমাদের। রাতের এই ক্লাসের হাতধরে আমরা পৌঁছে গেলাম সুদূর জ্যোতিষ্কলোকের আঙিনায়। তারকা লেখনি পাঠ আমাদের কাছে এক নতুন অজানা জগতের দুয়ার খুলে দিল। কথায় কথায় রাত বেড়েছে, কঠিন হয়েছে হিমের কামড়। তবে এইসব চলতি অনুভবের সীমানা এড়িয়ে আমাদের মন তখন পৌঁছে গিয়েছে অন্য এক অনির্বচনীয় আনন্দের অনুভূতির জগতে। হুঁশ ফিরে এলো হেডমাস্টার মশাইয়ের কথাতে – “ আজকের এই রাতক্লাসে তোমাদের ডেকে এনেছি কেবলমাত্র একটা অচেনা, অজানা জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব বলে। …. কেবল ব‌ইয়ের পাতাতে নয়, এই বিপুলা পৃথিবীর সবকিছুর মধ্যেই ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র বিস্ময়। মনের ক্ষুদ্র সীমাকে টপকে এই অসীম জ্ঞানের জগতে ঢুকে পড়াই হলো মানুষের জীবন সাধনার মহত্তম লক্ষ্য। তোমাদের মন যাতে সেই অসীমের সাধনায় মগ্ন হবার জন্য উন্মুখ হয় সে জন্যই আমরা তোমাদের এই রাতের আসরে ডেকে এনেছি।” হেডমাস্টার মশাই তাঁর কথা শেষ করেন। তারপর এক সময় উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে ওঠেন –  আকাশ ভরা, সূর্য তারা, বিশ্ব ভরা প্রাণ তাহার‌ই মাঝখানে, আমি পেয়েছি মোর স্থান বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান …….. হেডমাস্টার মশাইয়ের সুরে সুর মেলাই আমরা সকলে। আমাদের মিলিত কন্ঠের সুর চেনা জগতের ব্যস্ত সীমানা ছাড়িয়ে দূর থেকে দূরান্তরে সেই সুদূর জ্যোতিষ্কলোকের আঙিনায় ছড়িয়ে পড়ে। হেডমাস্টার মশাইয়ের হাত ধরে, রাতের তারা দেখার ক্লাসের মধ্যে দিয়ে,জানার মাঝে অজানাকে খুঁজতে খুঁজতে আমরা সকলেই সুরলোকের দিশারী, সুদূরের পিয়াসী হয়ে উঠি।   ** এই নিবন্ধটি বন্ধুবর জ্যোতির্বিদ শ্রী সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের করকমলে উৎসর্গ করা হলো। ** তথ্য সূত্রের জন্য ঋদ্ধি পত্রিকার “গ্রহ তারা” সংখ্যার সাহায্য নেওয়া হয়েছে। আমার ঋণ স্বীকার করছি বিনম্রতার সঙ্গে।   সোমনাথ মুখোপাধ্যায় জুলাই ১০.২০২৬.শুক্রবার।
    মেসি মোর্চা বনাম রোনালদো সমিতি  - সৈয়দ তৌশিফ আহমেদ | খ্রিষ্টাব্দ ৩৯৮৭। মহাশূন্যের আগন্তুকরা পৃথিবীর পূর্বাঞ্চলে পশ্চিমবঙ্গ নামক এক লুপ্ত প্রদেশের ধ্বংসাবশেষ খুঁড়ে বের করল। এখানে বাস করত এমনই এক বিচিত্র মানবগোষ্ঠী, যারা অবান্তর বিষয়ে দিবারাত্রি কোন্দল করাকে নিজেদের সাংস্কৃতিক চর্চা বলে মনে করত। এবং নানান বিষয়ে খোপবাজি করে অতিষ্ঠ করে তুলত অন্যের জীবন। জীবজগতে ছারপোকা যেমন অতি তুচ্ছ প্রাণী হয়েও বিছানায় সেঁধিয়ে থেকে মানুষের ঘুম ও রতিক্রিয়ার বারোটা বাজানোর ক্ষমতা রাখে, তেমনই এই অদ্ভুত জনগোষ্ঠীও তাদের অবিরাম নাকগলানো স্বভাব ও অনন্ত মতামত-উৎপাদনের মাধ্যমে গোটা পৃথিবীকে ক্লান্ত, বিরক্ত এবং ক্ষিপ্ত করে রাখত।ঠিক কী হেতুতে এই বিচিত্র জাতির বিদায়ঘণ্টা বাজে, তা নিয়ে ভিনগ্রহী গবেষকদের মনে ছিল উদগ্র কৌতূহল। তাঁরা আন্দাজ করেছিলেন, এত প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু এক সভ্যতার পতনের পিছনে নিশ্চয়ই মহামারি, খাদ্যসংকট কিংবা জলবায়ু-বিপর্যয়ের মতো কোনও অবশ্যম্ভাবী কারণ নিহিত থাকবে। কিন্তু বিস্তীর্ণ সমভূমির ছাতি বরাবর কোপাকুপি করতেই মাটির নিচ থেকে উঠে আসতে থাকে এমন সব নমুনা, যা দেখে ভিনগ্রহী প্রত্নতাত্ত্বিকদের চক্ষু চড়কগাছ।পলির আস্তরণ ভেদ করতেই মিলল: তিন কোটি ফর্দাফাঁই হওয়া আকাশি-সাদা জার্সি, দেড় কোটি শতচ্ছিন্ন লাল-সবুজ হেডব্যান্ড এবং কোটি কোটি স্মার্টফোনের কঙ্কাল। তবে সবচেয়ে বড় চমকটি অপেক্ষা করছিল মাটির আরেকটু গভীরে। গভীর পলি খুঁড়ে উদ্ধার হলো একটি অবিনশ্বর প্লাস্টিকের ঝান্ডা - যাতে লেখা, “মেসি মানে কাব্য, রোনালদো মানে মাংসপেশি”। তার ঠিক পাশেই, পুঁতে রাখা ছিল প্রতিপক্ষের পাল্টা ধ্বজা- “রোনালদো মানে শ্রম, মেসি মানে জোচ্চুরি”।লিপি উদ্ধার করা গেলেও, এই গূঢ় বাক্যের অর্থ বুঝতে গিয়ে এলিয়েন গবেষকদের রীতিমতো ল্যাজেগোবরে হওয়ার জোগাড়! এই 'মেসি' বা 'রোনালদো' বস্তুটি আসলে কী? এরা কি প্রাচীন কোনও দেবতা? ভয়ংকর কোনও দলপতি? নাকি কোনও প্রতাপশালী সামন্তপ্রভু?এতকিছু শুরুতেই বোধগম্য না হলেও, অন্তত এটুকু জলের মতো সাফ হয়ে গেল যে, এই লুপ্ত জাতিটি ছিল ঘোরতর 'প্লাস্টিক-পাগল'। তারা যেমন প্রতিবাদের প্যামপ্লেটে প্লাস্টিক ব্যবহার করত, তেমনই মুখেভাতের মেনুকার্ডেও। এত শতাব্দী পরেও মাটির নিচে অক্ষত ঝাণ্ডার মূল কারণ এই অবিনশ্বর পলিমার যৌগটি।ডিজিটাল ধ্বংসাবশেষ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গবেষকেরা প্রথম দিকটায় মুহুর্মুহু “GOAT” শব্দের ব্যাপক অভিঘাতে রীতিমতো ভিরমি খাচ্ছিলেন। তাঁদের স্থির বিশ্বাস জন্মেছিল, এই 'GOAT' নিশ্চয়ই মিশরীয় শেয়াল-দেবতা আনুবিসের মতোই ছাগল-মুখো প্রাচীন কোনও স্থানীয় উপাস্য। কারণ এত উত্তেজনা, এত খেয়োখেয়ি, এমন অনন্ত খিস্তি-খেউড়, প্রকাশ্য ল্যাং-মারামারি, এমনকি অনায়াস বন্ধুত্ব-বিয়োগ -এসব প্রলয়কাণ্ড যে স্রেফ চামড়ার একটি বল লাথানোর বিনোদন থেকে জন্মাতে পারে, সে কথা আকাশচারী গবেষকদের সুস্থ প্রত্ন-মস্তিষ্কে কিছুতেই ধরছিল না।পরবর্তী গবেষণায় অবশ্য আরও বিচিত্র সব তথ্যের হদিশ মেলে। ডিজিটাল ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার হয় “ফেসবুক” নামের এক প্রকাণ্ড ভার্চুয়াল খোঁয়াড়, যেখানে আক্ষরিক অর্থেই বাঁধা পড়েছিল গোটা জনজাতি। সেখানকার 'লাইক'-মুদ্রা অর্জন করে তারা খরিদ করত সামাজিক প্রভাব ও প্রতিপত্তি। হাসিল করত বন্ধু বান্ধবী। এছাড়া “হোয়াটসঅ্যাপ” নামের এক নর্দমা-সদৃশ গোপন পরিসরের শিলালেখ পরীক্ষা করে গবেষকেরা বুঝতে পারেন, এই ভয়ংকর গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আদপে মানুষের পায়ে লাথির নানারকম কৃৎকৌশল ও তার বিন্যাসকে ঘিরেই আবর্তিত। অর্থাৎ, বিষয়টি ‘ফুটবল’ নামক এক আদিম ক্রীড়া মাত্র!এই ফেসবুক-খোঁয়াড়ের সবচেয়ে মূল্যবান আবিষ্কার ছিল “কমেন্ট থ্রেড”। গবেষকেরা প্রথমে ভেবেছিলেন, এগুলি হয়ত এই জাতির প্রাচীন কোনও বংশলতিকা। পরে বোঝা যায়, এগুলি আদপে তাদের প্রাত্যহিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গৃহযুদ্ধের জ্বলন্ত প্রামাণ্য নথি। শান্তিকামী কোনও নির্বোধ দৈবাৎ সেখানে শান্তিপ্রস্তাব দিয়ে বসলে, পরবর্তী সাতশো বিয়াল্লিশটি মন্তব্যে অত্যন্ত সযত্নে তার চোদ্দো গুষ্টি উদ্ধার করে দেওয়া হত।তাঁরা আরও জানলেন, GOAT বলতে এই জাতি বুঝত “সর্বকালের শ্রেষ্ঠ”। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের জন্য খেলার নিরেট পরিসংখ্যানের বদলে তারা ঢের বেশি ব্যবহার করত মা-বোন-তোলা গালি এবং চোয়াল-ফাঁক-করা কুৎসিত হাসি, বা রাগে-জ্বলতে-থাকা ডিজিটাল মুখভঙ্গি!লাগাতার প্রত্নখনন এবং ফেসবুক-কমেন্টের ASCII কোড ভেঙে ইতিহাসবিদেরা যে-সব দাহ্য নথি উদ্ধার করেছেন, তা থেকে জানা যায়—ফুটবলের বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এক সন্ধ্যায়, এক অখ্যাত চায়ের দোকানেই বেজে উঠেছিল সর্বনাশের প্রথম ঘণ্টা। এক মেসিভক্ত ভাঁড়ের চা’এ সড়াৎ চুমুক মেরেই বলে ওঠে, “মেসির পায়ে বল থাকলে মনে হয় ঈশ্বর অলস বিকেলে ক্যালিগ্রাফি করছেন।” পাশের বেঞ্চ থেকে তক্ষুনি পাল্টা ঝাপট মারে এক রোনাল্ডোপ্রেমী, “ক্যালিগ্রাফি না হাতি, মনে হয় ক্যানভাসে কাদা লেবড়ে দিচ্ছে”। কথার পিঠে কথা তার পিঠে কথা থেকে শুরু হয় খণ্ডযুদ্ধ। পরের দিনই গঠিত হয় “আর্জেন্টিনীয় নন্দনরক্ষা মঞ্চ”। পাল্টা নির্মাণ হয় “রোনালদীয় আত্মনির্মাণ সংগ্রাম পরিষদ”। প্রথম দল হাঁকড়ায়, ফুটবল হল অনায়াসের শিল্প। দ্বিতীয় দল চেল্লায়, অনায়াস আসলে অলসের ষড়যন্ত্র। এইভাবে ফুটবল ক্রমে খেলা থেকে জীবনদর্শনে, জীবনদর্শন থেকে গৃহযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু বাঙালির জাতিগত দুর্ভাগ্য ছিল, সে একখানা খোপে স্থির থাকতে পারত না। একটিমাত্র সাদামাটা বিরুদ্ধ খোপে নিজেকে আটকে না থেকে এদের বিভাজনের জাল বিস্তৃত হত বহুদূর। যে কোনও বিষয়কে মুহূর্তে পক্ষ-বিপক্ষ, শুদ্ধ-অশুদ্ধ, দেবতা-দানব এইসব তুচ্ছ অথচ রক্তগরম করা খোপে সাজিয়ে ফেলতে তারা ছিল সিদ্ধহস্ত। দল, জোট, মোর্চা, টিম, ফ্রন্ট, লিগ, আঞ্জুমান, পরিষদ, সভা, ক্লাব, সংস্থা, সমিতি, বৃন্দ, মণ্ডলী – কী ছিল না সেখানে।মেসি-শিবিরের ভিতরেই দ্রুত বিভাজন দেখা দিল। একদল বলল, “মেসি আসলে রবীন্দ্রনাথীয়। আরেকদল বলল, অসম্ভব! তিনি জীবনানন্দীয়।” প্রত্যেকেই নিজেকে একমাত্র প্রকৃত মেসি-পন্থী বলে দাবড়ে ঘোষণা করল। রোনালদো শিবিরেও চলছিল ধারাবাহিক অশান্তি। কেউ বলল, রোনালদো পুঁজিবাদী আত্মনির্মাণের প্রতীক। অন্যরা রায় দিল, শ্রমিকশ্রেণির ঘামকে বিশ্বমঞ্চে তোলা যুগনায়ক তিনি। এই কলহরত দলগুলি মাঝে মধ্যেই কিন্তু খেই হারিয়ে ফেলত, কেউ হয়ত মেসিপন্থী, অথচ সে সত্যজিৎ ফ্রন্টের চেয়ারম্যান। তখন অন্য এক মেসিপন্থীর মাথায় সে মুগুর বসিয়ে দিতেই পারে। কারণ মুগুর খাওয়া যে আবার ঋত্বিক পরিষদের সভাপতিও বটে। এভাবেই একদিন শ্যামবাজার পাঁচমাথায় চলছিল ‘বিশ্ব মেসীয় সম্মেলন’। ঠিক তখনই পাশের রাস্তা দিয়ে ‘রোনালদীয় ইচ্ছাশক্তি যাত্রা’ কুচকাওয়াজ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিল। দুই শিবিরের সদস্যরা একে অন্যকে উপেক্ষা করলেই ল্যাঠা চুকে যেত। কিন্তু বাঙালি আরও অনেক কিছুর মতই উপেক্ষা করার বিদ্যেটি তেমন রপ্ত করতে পারেনি। রাজ্যজুড়ে শুরু হল গৃহযুদ্ধ ; অতঃপর প্রশাসনিক অচলাবস্থা। আগে বিষয়টি চায়ের দোকান, ফেসবুক, পাড়ার ক্লাব এবং জামাইষষ্ঠীর টেবিল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ক্রমে দেখা গেল, হাসপাতালের আউটডোরে ডাক্তার প্রেসক্রিপশন দেওয়ার আগে জিজ্ঞেস করছেন, আপনি মেসি না রোনালদো? স্কুলে ভর্তি হওয়ার ফর্মে নতুন ঘর: অভিভাবকের ফুটবল-আদর্শ। এমনকি পাড়ার মুদি বাকিতে চাল দেবে কি না, তা নির্ভর করছে ক্রেতা ৭ বলছে, না ১০।অতএব প্রশাসন বাধ্য হয়েই গঠন করল “GOAT নির্ধারণ কমিশন।” কমিশনের কাজ ছিল বৈজ্ঞানিক ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া - কে বড়। কমিটিতে রাখা হল এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, দুই প্রাক্তন ফুটবলার, চারজন কবি, চারজন জিম ট্রেনার, সাতজন পাড়ার ক্লাবসচিব, বারোজন ইউটিউব-বিশেষজ্ঞ, এবং একজন মানুষ যিনি জীবনে কোনোদিন ফুটবল দেখেননি - তাঁকেই নিরপেক্ষ সদস্য বলা হল। অনেক বিচার-বিশ্লেষণ, নথিপত্র, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও সাত কাপ লাল চা খরচের পর কমিশন শেষমেষ এক আপশ-প্রস্তাব দিল: মেসি শিল্প, রোনালদো শ্রম; দু’জনেই মহৎ। এই বিপজ্জনক নিরপেক্ষতা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যের নানা প্রান্তে আগুন জ্বলে ওঠে, এবং প্রশাসন বাধ্য হয় জরুরি অবস্থা জারি করতে।কারণ, এই জনজাতি ছিল জন্মগতভাবে আপোশহীন। “দু’জনেই বড়”—এই মধ্যপন্থা মেনে নেওয়ার অর্থ হলো এতদিনের জমানো খিস্তিখেউড়, সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্লক-আনফ্রেন্ড, শ্বশুরবাড়ি বর্জন, পাড়ার ক্লাব ভাগ, এমনকি বাপ-ব্যাটার বাক্যালাপ বন্ধ—সবই যে চূড়ান্ত বৃথা! তাদের চিরায়ত দর্শনই ছিল: একজনকে ভালোবাসলে অপরজনকে ঘৃণা করতেই হবে। সোশ্যাল মিডিয়ার ময়দানে এরা প্রত্যেকেই ছিল একেকটি ভয়ংকর কাগুজে বাঘ, যারা রক্তক্ষয়ী তর্কে ঝাঁপিয়ে পড়তে বিন্দুমাত্র পিছপা হতো না।তাই, আপোশ-প্রস্তাবের পরদিনই ওই লুপ্ত প্রদেশে নতুন আন্দোলনের বীজ রোপিত হলো—“আপোশ মানি না।” ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মেসি ও রোনালদো-পক্ষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে মিছিল করল শান্তি-কমিশনের বিরুদ্ধে। তাদের আকাশভেদী যৌথ স্লোগান ছিল: “শত্রু চাই, শান্তি নয়!” আসলে, শত্রু ছাড়া এই জাতিটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই মণিহারা ফণীর মতো দিশেহারা।এলিয়েন গবেষকদের অনুমান, সেই অভূতপূর্ব যৌথ মিছিলটি মোড়ের মাথায় গিয়ে বাঁয়ে ঘুরবে নাকি ডানদিকে—তা নিয়েই সম্ভবত নতুন করে অশান্তির সূত্রপাত হয়। ফলস্বরূপ, শুরু হয় গৃহযুদ্ধের অন্তিম পর্যায়। এই সমস্ত ডিজিটাল ও পারিপার্শ্বিক ঘটনাচক্র বিশ্লেষণ করে গবেষকরা এই অকাট্য সিদ্ধান্তেই উপনীত হন যে, নিছক এই 'খোপবাজি' বা আত্মঘাতী মেরূকরণের ফলেই আস্ত জাতিটি পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে নিকেশ হয়ে গেছে।ধ্বংসস্তূপের একেবারে তলদেশ থেকে উদ্ধার হওয়া সর্বশেষ প্রাসাশনিক বিজ্ঞপ্তিটিই ছিল এই ট্র্যাজেডির সর্বশেষ পুনরুদ্ধারিত নথি। তাতে জনস্বার্থে লেখা ছিল:"নাগরিকদের জানানো যাচ্ছে, প্রদেশের সার্বিক শান্তি রক্ষার স্বার্থে প্রত্যেকে আগামী সোমবারের মধ্যে নিজের জন্য অন্তত একজন স্থায়ী শত্রু নির্বাচন করুন। উল্লেখ্য, যাঁরা 'আমি কারোর সাতে-পাঁচে নেই' বা 'সবাই আমার বন্ধু' গোছের সমাজবিরোধী মনোভাব পোষণ করেন, তাঁদের অবিলম্বে মনোবিদদের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত্ব নেওয়া হয়েছে।” 
    ভাগবত পুরাণ - ১/৯ - Kishore Ghosal | এর আগে আমরা সত্যযুগের সূচনায় “সত্য” নামক কোন তেজস্বী সৎ-ব্রাহ্মণের পরিচয় পাইনি। “ত্রেতা” ও “দ্বাপর” যুগেও “ত্রেতা” বা “দ্বাপর” নামে কোন মহাবীর ক্ষত্রিয় অথবা মহাবণিক বৈশ্যর নাম পাইনি। অথচ কলিযুগের শুরুতেই পেয়ে গেলাম “কলি” নামের একজন রাজবেশধারী শূদ্রকে! শ্রীসূত কিন্তু কলিকে রাজবেশধারী শূদ্র বলেছিলেন, তাঁকে ললিতকান্তি অথবা কুৎসিত – এমন কোন কথাই বলেননি। কিন্তু ঋষি শৌণক গায়ে পড়েই বলে বসলেন, “অতি কুৎসিত শূদ্র”। "ভাগবত পুরাণ"-এর প্রথম স্কন্ধ - নবম পর্বভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৯
  • জনতার খেরোর খাতা...
    যে কথা না-বললেই নয় : ৫ - অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায় | ২০০ পুলিশের এসকটের মধ্য দিয়ে ওই ছোকরাকে থানা থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মধ্যরাতে। এই বিশাল বাহিনীর মধ্য থেকে কেউ পালাবার চেষ্টা করবে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে তাঁকে পয়েন্ট ব্ল‍্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করা হয়েছে এবং গুলি লেগেছে পিঠে। অর্থাৎ অতর্কিতে পিছন দিকে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছে। অথচ এক শ্রেণির মিডিয়া বলছে অন্ধকারের মধ্যে পুলিশকর্মীর কী অব্যর্থ নিশানা! বীর উপাধি দেওয়া হচ্ছে তাঁকে। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে পিছনে গুলি করলে কারোকে বীর বলা যায় কি না জানা নেই। অভিযুক্তের সঙ্গে পুলিশের সংষর্ষ বা গুলি বিনিময় হওয়ার ন্যূনতম সম্ভাবনা নেই। তারপরেও প্রথম দিন থেকে উপর্যুপরি বলা হচ্ছে এনকাউন্টার। এই এনকাউন্টার শুনে অনেকেই আবার যারপরনাই খুশি, মুখ্যমন্ত্রী কথা রেখেছে -- সকালে জমা বিকেলে খরচ। অথচ প্রমাণ হয়নি প্রভাস মণ্ডল প্রকৃত দোষী। তবুও বলা হচ্ছে মূল অভিযুক্ত। পাশাপাশি সে যে এ ঘটনার একমাত্র সাক্ষী ছিল, সেটাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে গণপিটুনিতেতে ইন্দ্রজিৎকে বলা হচ্ছে নির্দোষ। মুখ্যমন্ত্রী বলছেন। নির্দোষ কীভাবে প্রমাণ হল? ইন্দ্রজিৎ নির্দোষ হলে প্রভাস নয় কেন? কারোর বিরুদ্ধেই তো দোষ প্রমাণ হয়নি। প্রভাস নিজের মুখে বলেছে আনন্দ মেয়েটার গলায় পা দিয়ে মেরে বস্তায় ভরে পুকুরে ফেলে দিয়েছে। সেই আনন্দ কিন্তু এখনো "এনকাউন্টার" হয়নি। এনকাউন্টার হয়নি দিবাকরও। পুলিশ ফাঁড়িতে প্রভাস আর আনন্দের কথোপকথনে রাজা নামে এক টোটোচালকের নাম উঠে আসে। এই টোটোচালক রাজার ভূমিকা কী? যে মুসলিম ছেলেটিকে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ ধরে এনেছে, তার নাম কিন্তু একবারের জন্যেও প্রভাসের মুখ থেকে শোনা যায়নি। যে ছেলেটি ঘটনায় জড়িত সবার নাম এক এক করে বলে দিচ্ছিল, তাকে খুন করা হল কার স্বার্থে? বারুইপুরের নাবালিকা কি তাহলে বিচার পেল না?
    গোয়ালঘরে বিভ্রান্তি - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | গোয়ালঘরে এত বিভ্রান্তির কী আছে জানিনা। আপনারা কি ভেবেছিলেন, এত কান্ড করে এসআইআর, নির্বাচন-কমিশন, কেন্দ্রীয় বাহিনী এইসব দিয়ে ক্ষমতা দখল হল আপনাদের জন্য? আজ্ঞে না। বৃহত্তর স্বার্থ বলে একটা ব্যাপার আছে। বড় বড় পরিবারের বড়বড় ব্যাপার। বড়দার ছেলে টি-টোয়েন্টি চালায়, মেজদার ছেলে ই-টোয়েন্টি। সেজদা চালান এনটিএ, মানে নিট-টিট আরকি। বোম্বের বিগবসের ছেলে কোথায় যেন চিড়িয়াখানা চালায়। এই সমস্ত জমিদারিগুলো তো চিরস্থায়ী করতে হবে। ওদিকে এপস্টাইনও নাকি মাথার উপর ঝুলে, বিদেশে গিয়ে-টিয়ে সেটাও সামলাতে হবে। সেইজন্য নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা চাই, যাতে কেউ ট্যাঁফো না করতে পারে। তাই চাই সাংসদ। যেকোনো মূল্য। ওইটাই বৃহত্তর স্বার্থ। তাতে আপনারা ক্ষুব্ধ হলেন কি হলেন না, তাতে ঘন্টা। মনে রাখবেন, আপনাদের কিন্তু হাত-পা বাঁধা। তাই আপাতত বড়দাদের নির্দেশে কাজ করুন। গতকাল যাদের গরুচোর বলেছেন, তাদের নেতা হিসেবে গৈরিক অভিনন্দন জানান। বড়দা বলেছে বলে হকার উচ্ছেদ করুন। অন্নপূর্ণায় নাম কাটুন। ক্রমশ স্বাস্থ্যসাথী তুলে দেবার দিকে এগোন। সরকারের কাজ তো আর খয়রাতি নয়, বড়দারা বলে দিয়েছেন। হ্যাঁ, এর মধ্যে, পারলে একটু গুছিয়ে নিতে পারেন। তবে দেখবেন, নব্যরা ঠেঙিয়ে না দেয়। দু-একটা এনকাউন্টার করে দিতে পারেন। নেহরুকে দু-চারবার দোষ দিতে পারেন। এই যেমন, কলকাতায় জল জমছে কেন? নেহরুর দোষ। বা, এত হিংসা কেন? বিরোধীদের দোষ। কোনো সমস্যা নেই, ডিম্মিডিয়াকে সঙ্গে পাবেন। তবে এর বাইরে যাবার চেষ্টা করবেন না। কারণ ভেড়া লড়ে খুঁটির জোরে। আপনাদের খুঁটির নাম কেন্দ্র। ওটা না থাকলে, রাজ্য কেন, কোনো ক্লাবেও জিততে পারতেন না, চালানো তো পরের কথা। তাই বাহিনী রাজ্যে মজুদ থাকবে, বেশি ট্যাঁফোঁ করলে কিন্তু আপনার পিছনেও চলে আসতে পারে।
    সাহিত্যপ্রেম  - Srimallar | আপনারা তো বৃষ্টি নিয়ে জল ছিটিয়ে লিখতে পারেন...বর্ষা শুধু বর্ষা যেমন অন্ধমেঘের অভিশ্রুতি!এমন যদি শিল্প আসেই, কল্পনা তাও মৌনসখী...আপনারা তো বৃষ্টি নিয়ে ফুটপাথে ঘুম ভাঙতে পারেন...গহন কেবল গহন কথায়, বান্ধবী চুপ। সখ্যনালিশ!এবার দেখি বিচ্ছেদে আর মন রাখেনি শ্রীমল্লারও...আপনারা তো বৃষ্টি নিয়ে মেঘ ভাঙিয়ে নিন্দে করেন...বলুন দেখি বান্ধবীকে এমন কী দিই সাহিত্যপ্রেম? 
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত