এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    বিশ-একুশ - ভবঘুরে | ছবিঃ ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক১কনকনে ঠাণ্ডা। সঙ্গে বৃষ্টি তেড়ে। দুগো আজ সকালে দোকান খুলতেই চাইছিল না। এত বৃষ্টি রাত থেকে পড়ছে তো পড়ছেই, থামার নাম নাই। ইচ্ছে ছিল, মাঠে কাল কাটা ধানের কী অবস্থা দেখে আসবে। একটু খেয়াল করে আলে তুলে না দিলে জমা জলে ধানে কল গজিয়ে যবে। খড় পচবে। ঘরের লাগোয়া দোকান। ঘরের দাওয়ায় দাঁড়াতেই দেখে দাঁড়িয়ে আছে মামুন ভাইয়ের বড় মেয়ে সালেহা। শান্ত, মেয়ে। একটু বেশি ঢ্যাঙা। কথা বলে চটপট। স্কুলে পড়ে। গাঁয়ের দুটো মেয়ে এবার ক্লাস এইটে উঠবে। একজন ও। মামুন ভাই এককালে বেশ বড়লোক ছিল। এখন পার্টি ক্লাব দান দ্যান করে মধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্ত হলেও খানদানি পরিবার। মামুন ভাইয়ের ঘর থেকে কেউ মাল নিতে আসে না। মাসকাবারি বাজার করে সাঁইদের দোকান থেকে। পাশের গ্রাম বাজার আছে। গঞ্জ। সেখানে। দুগো একটু অবাক হল। কী ব্যাপার ?দেখল, সালেহার ফ্রকের মধ্যে চাল। --চাল, কী ব্যাপার ?--পরে বলব, তুমি এটা আলাদা করে রেখে আমাকে ১০০ বিস্কুট দাও। ব্রিটানিয়া। --আচ্ছা।--আচ্ছা নয়। মনে রেখো এটা মেশাবে না। আলাদা করে রাখবে। --সালেহা যেতে না যেতেই হাজির স্বপন। সালেহার পরের ভাই। মামুন ভাইয়ের বড় ছেলে। বড় সুন্দর দেখতে। গম্ভীর ভারিক্কি চাল, খুব ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছেলে। মামুন ভাইয়ের সব কটি ছেলে মেয়ে পড়াশোনায় ভালো। ক্লাসে সবাই ফার্স্ট হয়। দুই ছেলে দুই মেয়ে। কাল রাতে নাকি আরও একটি ছেলে হয়েছে। --কী ব্যাপার রে স্বপন ?--কিছু না। --কিছু না তো---দুগো জানে, মামুন ভাই ভারি ভালো মানুষ। লোকের আপদে বিপদে ছুটে যায়। লোকে বলে সাক্ষা‌ৎ শিব। রাগও শিবের মতো। একবার রাগলে আর রক্ষে নেই। দুগো ভাবল, নিজেই যায়। গিয়ে বলে, মামুন ভাই কী হচ্ছে ?কিন্তু সাহসে কুলোল না। রাগী মানুষ চড় টড় মেরে দেবে। ১০টার সময় দোকানে এলেন, বিনয়বাবু। পাশের গ্রামের স্কুলের অংকের মাস্টার। পড়াশোনা জানা মানুষ। বিএসসি পাশ। জাতে বামুন। বড্ড শান্ত মানুষ। গ্রামে কোন কথা গোপন থাকে না। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। নবীনবাবুও ঘটনাটা শুনেছেন। সকাল থেকে মামুনের চার ছেলে মেয়ে বৃষ্টির মধ্যে পায়ে কাদা মেখে দোকানে আসছে তো আসছেই।বিনয়বাবু ইশারায় সালেহাকে ডাকলেন। --কীরে স্কুল যাবি না ?--যাবে। কিন্তু কী করবে, বাবার হুকুম। রাগ কমেনি বাবার। সকাল থেকে কিছু খায়ওনি।মামুন ভাইয়ের বিশ্বাস খেলে রাগ পড়ে যাবে। তাই খায় না। বিন্যবাবু জানেন ব্যাপারটা। দুগোকে বললেন, চালগুলো সব দিয়ে দে সালেকে।দুগো ইতস্তত করছিল, বিনয়বাবু গলা ভারি করে বললেন, আমি বলছি দে। বাকিটা আমি বুঝে নেবো। সালেহাকে লোকে সংক্ষেপে বলে সালে। ******২সালেহাকে নিয়ে বিনয়বাবু যখন মামুনের ঘরে পৌঁছালেন, দেখলেন থমথমে অবস্থা। মামুনের বউয়ের বাচ্চা হয়েছে। আঁতুড় ঘরে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। ছেলে কাঁপছে। নুরপুরের দাই ঘরে উনুন জ্বালিয়েছে। নুরপুরের দাই এ তল্লাটে বিখ্যাত। প্রায় সব ঘরের ছেলেমেয়ে হয়েছে তার হাতে। জমিলা বিবি। হিন্দু মুসলিম প্রায় সব ঘরে ক্রিটিক্যাল রোগী হলেই জমিলা বিবি মুশকিল আসান। কালো গাঁট্টাগোট্টা চেহারা। বিনয়বাবুকে দেখেই এগিয়ে এল মামুনের মা। মামুনের নিজের মা নেই সৎ মা। সৎ মা জহুরা ছেলে অন্ত প্রাণ। কী ভালই না বাসেন। বিনয়বাবুর গল্প উপন্যাস পড়ার খুব নেশা। রামের সুমতি বিন্দুর ছেলে নিষ্কৃতি বোধহয় এই সব মায়েদের দেখেই লিখেছিলেন শরৎবাবু। ভাবেন বিনয়। --চা খাবে ? --না ভাত খেয়ে বেরিয়েছি। --একটু মিষ্টি খান। নাতি হয়েছে।--পরে এসে খাবো।--মামুন কই ?বিনয়বাবুর গলা শুনে বেরিয়ে এল মামুন। --খবর কি মাস্টার মশাই ?--খবর ভালো। বোস। বলে মামুনের মাকে ডাক দিলেন, দিন মিষ্টি দিন। মামুনের মায়ের সঙ্গে এলেন মামুনের দাদি। নবিসন। রাশভারি মহিলা। স্বামীর মৃত্যুর পর চিকের আড়ালে বসে বিচার করেছেন গাঁয়ের। একা হাতে রক্ষা করেছেন ২৫০ বিঘা জমি। দানধ্যানে সুনাম আছে। বহু ছেলেকে পড়াশনা করায় গোপনে সাহায্য করেছেন। আর গরিব দুঃখির ত কথাই নেই। এই মহিলার বিচারবুদ্ধির ওপর বিনয়ের বাবার ভরসা ছিল। আসতেন পরামর্শ করতে। বিনয়কে মিষ্টি এগিয়ে দিয়ে বললেন, খাও। বিনয় হাতে মিষ্টি নিয়ে মামুনের দিকে এগিয়ে বললেন,--খা। --মামুন চুপ। --খা বলছি। --আমার ছেলে হয়েছে। আমি মিষ্টি খাব ?--কেন খাবি – সে ও তুইও জানিস আমিও জানি। বিনয়বাবু, মামুন আর কাজীপাড়ার মাস্টার মিলে ফুটবল খেলা চালু করেছিলেন। এক স্কুলে পড়তেন। মামুনকে ভালোই চেনেন। এমনিতে ভালো ছেলে। মাথা গরম হলে মুশকিল। খাইয়ে দিলেই শান্ত। দু' জনে দুটো আলাদা বোর্ডিংয়ে থাকতেন। মামুন মুসলিম বোর্ডিংয়ে। বিনয় হিন্দু বোর্ডিংয়ে। রায়নায়। স্বাধীনতা দিবসের দিন একসঙ্গে সারারাত জেগেছিলেন। আনন্দে। দুই মেস মিলে ফিস্ট হয়েছিল। জীবনে প্রথম বামুনের ছেলে হয়ে মুরগির মাংস খান। স্বাধীনতার অন্য স্বাদ ১৫ আগস্ট রাতে। বিনয়ের কথা মামুন শোনে। বিনয় কম কথা বলেন। মামুন কথা বলতে ভালোবাসে। মামুন চুপচাপ মিষ্টি খেল। তারপর বলল, তুইও একটা খা। মামুন বলল, ছেলে দেখে যাবি না। --নারে। মা জানতে পারলে ঝামেলা করবে শৌচ মৌচ নানা ঝামেলা। --যাক, ছেলের নামটা তুই দিবি। আর হাতে খড়ি। --সে তোর তো পূজারী বামুন ছাড়া পছন্দ নয়।না, এর হাতে খড়ি তুই দিবি।এই গাঁ-টা একটু অদ্ভুত। মুসলমান ছেলের হাতে খড়ি বামুন দেয়। আর বামুনের ছেলের হাতের লেখা হয়তো শেখাল কোনো মুসলমান শিক্ষিত ছেলে।বিনয়বাবু বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোর ভক্ত। একটু আধটু জ্যোতিষের চর্চা করেন। বললেন, কাল কখন ছেলে হল ? সময়টা বল। --১১টা ৫২।একটু সময় নিলেন। কাগজ কলম চাইলেন। কীসব আঁকিবুঁকি করলেন, তারপর বললেন, "শোন, তোর এ ছেলে বংশের মুখ উজ্জ্বল করবে। লেখক হবে। গাঁয়ের মুখ রাখবে। মিলিয়ে নিস। আর বাকিটা দেখে বলব। তবে যেটুকু বললুম বামুনের কথা।"ক্রমশঃ
    জোছনায় তোমার সঙ্গে ভিজবো বলে - ছুটি রায়চৌধুরী | ছবিঃ ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক*১*মঞ্জু তোমার ফোন নম্বর চাইছিল।— কে?— কৃষ্ণনগরের মঞ্জু। দেবো?— ও কোথায় আছে যেন?— দমদমে থাকে। খুব সমস্যার মধ্যে আছে। যদি তুমি কোনও সাহায্য করতে পারো।— সমস্যা ছাড়াও কি লোকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চায়? সে ঠিক বোঝে না। লোকে বোধহয় তাকে ভবঘুরে ছাড়াও পাগলও ভাবে। জানে, ওর তো কোনও কাজ নেই। ডাকলেই আসবে। খানিকটা পেট-ভাতে পেট-ভাতে ব্যাপার। কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্প।মঞ্জুর সঙ্গে তার শেষ দেখা বারো বছর আগে। আসাননগরে লালন মেলায়। একটা দলের সঙ্গে ঘুরছি। হঠাৎ দেখে মঞ্জু। — স্যার, আপনি এখানে?— এই তো লালনের গান শুনতে। বাংলাদেশের ছেউড়িয়া থেকেও বহু সাধক এসেছেন। তাঁদের গান শুনতেই বিশেষ করে আসা। মঞ্জুর কথা শোনায় বেশি আগ্রহ ছিল না। সে ব্যস্ত পায়ের ধুলো নিতে।সে আমি ধমকে উঠলাম —— কী শিখিয়েছি এতদিন? মাথা নিচু করতে বারণ করেছি না?— সব কথা শুনতে নেই স্যার। আপনি আমাদের কাছে ভগবানের মতো।সে নিজে ভগবান মানে না। কিন্তু কিছু ছেলে-মেয়ে যে কেন তাকে ভগবান বলে মনে করে!আর মঞ্জুর কাছে তো সে একেবারে ভগবান সাজতে চায় না।মঞ্জুর দিকে তাকালাম। অতলশ্যাম কালো। কাটা কাটা নাক-চোখ-মুখ। একেবারে সুন্দরী সাঁওতাল রমণী। ফর্সা হলে ওই মেয়ের জন্য লাইন পড়ে যেত। কিন্তু ভালো বলে বোধহয় কোনও প্রেমিক নেই মঞ্জুর।— আমাদের বাড়ি একবার যেতে হবে স্যার।— কোথায় তোমার বাড়ি?— বেশি দূর না। হেঁটে বড়জোর কুড়ি মিনিট।কুড়ি মিনিট মানে অনেকটা পথ। সঙ্গে আছে কলকাতার ছেলে-মেয়েরা। প্রেসিডেন্সির ছাত্র-ছাত্রীরা। সব মিলিয়ে তেরো জন। এত জনকে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। মুখ দেখে কী বুঝল কে জানে! মঞ্জু বলল, সবাই মিলে আসবেন।— দেখি।— দেখি নয়, স্যার। আসতেই হবে।— হবে না মনে হয়।ভাবছি গরিব ঘরের মেয়ে। তেরো জনকে শুধু চা খাওয়াতেও কষ্ট হবে। কলকাতার লোকদের মতো তো এক গ্লাস জল নামিয়ে বলতে পারবে না। ‘চা খাবেন’?মঞ্জুরা তা পারবে না। তাই না যাওয়াই ভালো। শুধু শুধু বেচারির বাবা-মাকে কষ্ট দেওয়া। অন্য একদিন আসব মঞ্জু। আজ মনে হয় হবে না।মঞ্জুর চোখের কোণে জল এসে গেল।দেখে মনটা নরম হলেও ঠিক করলাম যাবো না।ও বাচ্চা মেয়ে। বাবা-মার সমস্যা বুঝতে এখনও শেখেনি।*২*সব মিলিয়ে আঠারোটা মঞ্চ। বিপ্লব বলেছিল, আসুন না ইমুদা। এমন বাউল গানের আসর এই বাংলায় কোথাও পাবেন না।— ‘বলো কী?’ জয়দেব-কেন্দুলি, কল্যাণীর সতীমার মেলা—এ সব আছে না?— আছে কিন্তু, আমাদেরটা একবার দেখুন। একেবারে আলাদা।বিপ্লবের কথায় নেচে ওঠা। অবশ্য নাচাটা রক্তে আছে। মার মুখে শুনেছে, বাপ যে কোথায় কোথায় চলে যেত যাত্রা আর গান শুনতে। পাঁচ-সাতদিন পর ফিরত। চোখ বসা। মুখে রুগ্ন রুগ্ন দাড়ি। বাপের স্বভাব পেয়েছে। বাউণ্ডুলে, ভবঘুরে ভাব।ছেলে-মেয়েদের বললাম, সবাই কি একসঙ্গে থাকতে চাও? না ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গান শুনতে চাও, ইচ্ছে মতো।দলে ভোলার একটু ইচ্ছে ছিল, চূর্ণীর সঙ্গে আলাদা হওয়ার। ভোলার ভালো নাম অর্ণ। অর্ণ মানে কী? অর্ণ নিজেও জানে কি না সন্দেহ। কিন্তু অর্ণ নাম চলেনি। প্রেসিডেন্সির অদীন একবার বেড়াতে গেছিল ওদের বাড়ি। গিয়ে শোনে, অর্ণর ঠাকুরদা ডাকছেন। ভোলা। ভোলা।অদীন ভেবেছে ভোলা ওদের চাকরের নাম। কিন্তু অর্ণকে বলতে শোনে,— বলছি না, বাইরের লোকের সামনে আমাকে ভোলা বলে ডাকবে না।ঠাকুরদা বলেন, কী বলব তবে, ভোলানাথ?কিছু বিষয় থাকে একান্তই ব্যক্তিগত। ব্যক্তিগত পরিসরে থাকা বিষয় অন্যের সম্মতি ছাড়া প্রকাশ্যে আনা সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক অপরাধ। অথচ ওই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করার কোনও বিধান নেই। উল্টে এরা সমাদৃত হয়। পরদোষ অন্বেষক সমাজে এরা কেউ কেউ তালেবর হয়ে যান।অদীনও সেদিন পেল হিরোর সম্মান। কলেজের ক্যান্টিনে বসে সে অর্ণকে ডাকল, ভোলা, এই ভোলা। ক্যান্টিনে কাজ করত ভোলা নামের একটি লোক। সে তো অবাক। বাপের বয়সীকে নাম ধরে ডাকছে। এ কোন শিক্ষিত ছেলেরে বাবা!বন্ধুদের হাসির সমবেত হুল্লোড়ে আর অর্ণর বিব্রত হাসি বোঝাল, ভোলা নামের একজনের উদয় হয়েছে ইংরেজি বিভাগে।ভোলা ভালো ছবি আঁকে। গান গায়। সে প্রেমে পড়েছে চূর্ণীর।চূর্ণীকে ডেকে সে বলল—— চল না, আমরা বাউলানিদের গান শুনি।— না, বাবা আমি দলছুট হতে রাজি নই।চূর্ণীর অসম্মতিতে ভোলার চোখের আলো নিভে গেল।*৩*জীবন ছাইড়্যা যেও না মোরেতুমি গেলে বাঁচবো কেমন করে,জীবন জীবন রে…….গান গাইছিল সম্বিতি। বারাসতে বাড়ি। থাকে নৈহাটিতে। বরের সঙ্গে থাকে না। গুরুর ঘরেই বাস। গুরুর সংসার আছে। কিন্তু গুরু ও গুরুপত্নী দু-জনের সঙ্গে মিলেমিশে রয়ে গেছে। মাঝে মাঝে ফিরে যায় বরের বাড়ি। ছেলে-মেয়ে আছে। একটা ক্লাস নাইনে আর একটা ইলেভেনে। ছেলে মা গেলে রাগ করে। বলে, মা, তুমি আর এসো না।সম্বিতির সম্বিৎ ফেরে ছেলের কথায়।— কেন তোরা কি লজ্জা পাস?— লজ্জা না, মা তুমি এলেই পাঁচ কথা ওঠে, বাবাকে টিটকিরি দেয়। আমাদের দেখলে লোকের কথা বন্ধ হয়ে যায়।মেয়ে থামাতে যায় দাদাকে। দাদা অপরূপ বড়। তার মুখ অবিকল মায়ের মতো। মা-মুখী ছেলেরা দুঃখী হয় তো? সম্বিতি ভাবে। ভাবে। তাই দুঃখ পায়।দুঃখ চায় না তাই গানে ডুবে যেতে চায়। ছবি বাউল স্বপ্ন দেখায়, সম্বিতি তার সঙ্গে বাংলাদেশ যাবে। নিজের বাপের ভিটেয় বসে বাউল গান শোনাবে। যে ভিটে সে ছেড়ে এসেছে ১০ বছর বয়সে।কিন্তু কবে হবে সে যাত্রা, সম্বিতি জানে না!আর জানে না বলেই সে ডুব দেয় গানের অতলে,জীবন জীবন রে……চূর্ণীর সে গান শুনে খুব কান্না পেল। অরিত্র তাকে চেয়েছিল। সে চায়নি। বয়সে ছোট। মামার ছেলে, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ত। দিঘায় মদ খেয়ে স্নান করতে ডুবে যায়। সবাই জানে, এটা অঘটন, দুর্ঘটনা। চূর্ণী জানে, এটা আত্মহত্যা।মারা যাওয়ার ১০ মিনিট আগে সে মেসেজ করেছিল,— চূর্ণী, শেষ জিজ্ঞাসা—হ্যাঁ বলবি? (দিদি বলত না, নাম ধরেই ডাকত।)উত্তর না দিলে এই শেষ বার্তা—শেষ আলো দেখা পৃথিবীর!অরিত্র মোবাইল সমেত ডুবে গিয়েছিল সমুদ্রে। অরিত্রর এই মোবাইলটার নম্বর সে আর চূর্ণী ছাড়া কেউ জানত না।তাই চূর্ণী ছাড়া কেউ জানেনি। কেউ জানবেও না। সম্বিতির গান তাই কাঁদাবেই চূর্ণীকে। চূর্ণী একা একা কাঁদবে বলে উঠে এল। ভোলাও আসছিল পিছু পিছু। কঠিন চোখে তাকাল চূর্ণী।না, তার জীবনের সঙ্গে আর কাউকে জড়াতে দেবে না, চূর্ণী। না পাওয়া নিয়ে চলে গেছে অরিত্র।সে-ও নিজের জীবনে কোনও কিছুর নতুন স্বাদ নেবে না।ক্রমশঃ
    মধুবাতা ঋতায়তে - শারদা মণ্ডল | ছবি - Imagen 3মেয়েদের প্রস্তুতির ফাঁকে বড় মাতাজী জিজ্ঞেস করলেন - ‘তুমি কি উঠবে ভাবছ?’ বললুম - ‘হ্যাঁ মাতাজী।’ কলেজে এমনিতেই সবাই আমাকে ছিনে জোঁক হিসেবে চেনে, কোন সমস্যা সামনে এলে তার শেষ না দেখে ছাড়িনা। তাই এখানে কোন ছাড়ান ছুড়িনের প্রশ্ন নেই। সুযোগের সদব্যবহার করতেই হবে। বড় মাতাজী আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠলেন, ‘তাহলে আমিও উঠবো।’ উঠতে হবে আগের মতই চার হাত পা কাজে লাগিয়ে। পাহাড়ের মাথায় ট্রেনারদের একটি দল দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, দড়ির অন্য প্রান্তটা ধরে আছেন নিচে যে প্রশিক্ষকেরা রয়েছেন, তাঁরা। মাঝখানে সেই হারনেস আর ক্যারাবিনারের গল্প। তবে গল্পটা আগের দিনের জাল বাওয়ার থেকে কিছুটা আলাদা। মুখ্য প্রশিক্ষক বিভুজিৎ মুখোটির কয়েকটি কথা কানে গমগমিয়ে উঠলো আমার। তিনি বললেন, পাহাড়কে তোমরা যতই ভালোবাসো, মনে রাখবে আরোহণের সময়ে ও একটা obstacle and an obstacle should not be negotiated, it should be overcome. শুনে চমকে উঠলাম, মনে মনে কয়েকবার আবৃত্তি করে নিলাম বাক্যটি। সত্যিই তো নেগোশিয়েশন আর কম্প্রোমাইজের কম প্রলোভন তো এলনা জীবনে। একবার পা পিছলে গেলে পতন ও মৃত্যুই ভবিতব্য - সে কথা সব ক্ষেত্রেই খাটে - তা সে পর্বতারোহণ বা জীবন নির্বাহ যাই হোক না কেন। এইরকম জীবনের পরীক্ষা যতবার এসেছে সামনে, ততবার মন্ত্র জপেছি একতানমনে - ‘সত্যের জন্য সব ত্যাগ করা যায়, কিন্তু কোন কিছুর জন্যই সত্যকে ত্যাগ করা যায়না।’ ক্ষণিকের জন্য আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম। সম্বিত ফিরল সম্মিলিত হাঁকডাকে। জীবনে যাই হয়ে থাক, এখন এই মাঠা পাহাড়কে ওভারকাম করি কেমনে।বিভুজিৎ বাবুর নির্দেশগুলি মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করি। চার হাত পায়ে পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠার সময়ে শিরদাঁড়া থাকে ঢালের সমান্তরালে, কিন্তু শরীর ঢালের থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। ভালোবেসে পাহাড়ের দিকে ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করলে, ভারসাম্য হারিয়ে পপাত চ, মমার চ, হতে এক পলও দেরি হবেনা। আবার নামার সময়ে মেরুদন্ড থাকবে ঢালের সঙ্গে উল্লম্ব। মুখ থাকবে শিখরের দিকে। পিছনে হেঁটে নেমে আসতে হবে। তখন ডান হাত থাকবে কোমরের সামনের দিকে - এই হাতই এখন পা-গাড়ির স্টিয়ারিং। বাঁ হাত থাকবে কোমরের পিছনে, সেই হাত ব্রেকের মত কাজ করবে। বাঁ হাত দিয়ে দড়ি টেনে যোগান দিলে তবেই সামনের দড়ির অংশ বাড়বে আর আমি নামতে পারব। বাঁ হাত লক করে দিলে আটকে যাব, আর এগোতে পারবোনা। এই কৌশলের নাম হল র‍্যাপলিং। আসলে ওঠার সময়ে শিরদাঁড়া ঢালের সমান্তরালে রাখলে শরীরের ভরকেন্দ্র (Center of Mass) নিয়ন্ত্রণে থাকবে। শরীর পাহাড়ের কাছাকাছি এলে ভরকেন্দ্র পিছলে গিয়ে ভারসাম্য নষ্ট হবে। আর নামার সময়ে দড়ি, ক্যারাবিনার, কোমর আর হাত ছন্দোবদ্ধ ভাবে ঘর্ষণ বল (Friction force) তৈরি করে। আমরা যদি শুধু হাত দিয়ে দড়ি ধরে নামতে যেতাম, তবে হাতের চামড়া ছড়ে যেত অথবা আমি সোজা নিচে গিয়ে পড়তাম। কিন্তু ক্যারাবিনার, হারনেস, দড়ি এবং দুই হাতের অবস্থান—এই পুরো সিস্টেমটা মিলে একটা হিউম্যান-মেকানিক্যাল ফ্রিকশন ব্রেক (Human-Mechanical Friction Brake) হিসেবে কাজ করে। আমি শেষ পর্যন্ত নিয়ম মেনে উঠে আবার নেমে আসতে সফল হলাম। ওপরে ওঠার পর মনে হচ্ছিল বুকের খাঁচাটা বুঝি ফেটে যাবে। কিছুক্ষণ সেখানে শান্ত হয়ে বসে ধীরে ধীরে চোখ মেললাম। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই বিস্তৃত বনরাজি, মাঝে মাঝে মেঠো পথ, সেই লাল জমিনের প্যাটার্ন, দূরে দূরে বিক্ষিপ্ত গ্রাম, মাঝে কিছু চাষবাস - সব মিলিয়ে পুরুলিয়ার বন্য সৌন্দর্য বিহগ দৃশ্যে আমার চোখের সামনে ঝলমলিয়ে উঠলো। যেন আমি বঙ্কিমের আর এক নবকুমার যে ‘তালতমালীবনরাজিনীলার’ রূপে মুগ্ধ হয়েছে। তবে এই নেমে আসার পর মুহূর্তেই একটা ঘটনা ঘটল। অনেক ছোটবেলায় জুল ভার্নের টোয়েন্টি থাউজ্যান্ড লীগস আন্ডার দ্য সী এর বাংলা অনুবাদ পড়েছিলাম - সেখানে এক জায়গায় সমুদ্রের গভীরে সাবমেরিন নটিলাস আটকে যাওয়ায় বিজ্ঞানী পিয়ের, ক্যাপ্টেন নিমোকে জিজ্ঞেস করেন - ক্যাপ্টেন, নটিলাসের কি কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে? নিমো উত্তর দেন, না প্রফেসর, নটিলাসকে আপনি চেনেননা, একটা ঘটনা ঘটেছে মাত্র। গল্পটা মনে ভেসে উঠলো, তার কারণ আমাদের ঘটনাটা দুর্ঘটনা হতেই পারতো, কিন্তু হলনা। আসলে আমাদের সঙ্গে দুটি এমন মেয়ে ছিল, যাদের হার্টে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ট্রেনাররা ভরসা দিয়েছিলেন, যে কিচ্ছু সমস্যা হবেনা। হয়ওনি। মাঠার ঐ ঢালে নেমে এসে একটা সংকীর্ণ পথ দিয়ে আবার মেয়েদের জটলার মধ্যে ফিরে আসতে হচ্ছিল। আমি নেমে আসার পর, ঐ সার্জারি হওয়া একটি মেয়ের ওঠার কথা। আমি যখন ঐ অপরিসর পথে সাবধানে হেঁটে ফিরছি, ততক্ষণে ঢালে পা রেখে পজিশন নিয়ে ঐ ছাত্রীটির কোমরে ক্যারাবিনার বাঁধা হয়ে গেছে। কিন্তু মনের টেনশন চাপতে না পেরে ও পিছন ফিরে বন্ধুদের দিকে তাকাতে গেল। ব্যাস, পা ফস্কে ঘুরে আমার পিঠের ওপর পুরো ওজন নিয়ে পড়ল। আমি তো ওর দিকে পিছু ফিরে, কিছু দেখিনি। কিছু বোঝার আগেই সেকেন্ডের ভগ্নাংশে আমি ছিটকে নিচের গর্তে পড়ে গেলাম, মানে অগভীর একটা খাদ, যার জন্য ঐ জায়গাটা অপরিসর। ভিতরে ঝোপ ঝাড় ছিল। শীতের ভোরে রক ক্লাইম্বিং-এ বেরিয়েছি, সোয়েটার, জ্যাকেট, নী গার্ড, কাঁটালো জুতো - হেন তেন প্রোটেকশন সব পরাই ছিল আমার। ঝোপগুলো পুরো গদির মত কাজ করেছে। কিন্তু হাতের পাতা, চোখমুখ এগুলো তো খোলা ছিল। যাই হোক টেনে তোলার পর দেখা গেল, অবিশ্বাস্য ভাবে আমার কোন ইনজুরি হয়নি। কাটা ছড়াটুকুও নেই। হাড়ে ব্যাথা, মচকানোও নেই। আর আমার ওপরে পড়ার ফলে মেয়েটিরও কিচ্ছুটি হয়নি। যেভাবে পড়েছি, দলের কেউ বিশ্বাস করতে পারছেনা যে আমার কিছু হয়নি। একলা বসে ভাবি, যতই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকুক, সব কিছু পজিটিভ ফ্যাক্টর একসঙ্গে কাজ করা - কোন ইনজুরি না হওয়া - এটা এমনই ব্যাপার, সহজ বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলেনা। জীবনে আরও কয়েকবার ফিল্ডে এমন ন্যারো এসকেপ হয়েছিল আমার। না - আসলে আমার না বলে আমাদের বলা ভালো। আর একবার তো বলা যেতে পারে একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল। যদিও গল্প শুনতে শুনতে বেলাইনে যাওয়া মানে ডিসট্র্যাকশন আমি পছন্দ করিনা মোটে, তবুও এই পাকাচুলো বুড়ির মনে যখন কোন কথা উথলে ওঠে, তখন না বললে শান্তি হয়না। অনেক বছর আগের কথা। যৌবন তখনও শরীর ছেড়ে যায়নি। সেবার আমরা হাওড়া থেকে ট্রেনে উঠেছিলাম, গন্তব্য লখনৌ হয়ে কাঠগোদাম স্টেশন। সেখান থেকে নৈনিতাল, রানিক্ষেত, কৌশানি। সবার মনে খুশির হাওয়া। কিন্তু একটি ছাত্র এসে পৌঁছতে পারলোনা। ট্রেন যখন ছেড়ে দিয়েছে, অন্য ছাত্ররা বলে উঠলো, ঐ দেখুন ম্যাডাম, ও পাগলের মত প্ল্যাটফর্মে দৌড়চ্ছে। কী হবে ছেলেটার!! অজানা আশংকায় আমরা যে যেখানে পারলাম চেন টানলাম। কিন্তু আমরা তো আইন জানতাম না, যাত্রাপথের মাঝখানে বিপদ ঘটলে চেন টানা যায়, কিন্তু শুরুতে নয়, ওটা দন্ডনীয় অপরাধ। আর পি এফ এসে, আমাদের এত বড় দল, সহজেই আইডেন্টিফাই করল, কারা করেছে এই কাজ, আর সঙ্গে সঙ্গে বল্লরীদি, আর মধুসূদনকে নামিয়ে নিয়ে চলে গেল। তারপর ঘটনা শুনে মেয়ে বলে বল্লরীদিকে ছেড়ে দিল, কিন্তু মধুসূদনকে ছাড়লোনা। এদিকে বল্লরীদি ট্রেনে ওঠার আগেই ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। তখন আমাদের তরুণ বয়স তো, ও ছুটতে ছুটতে চলন্ত ট্রেনে আমাদের কামরার পা দানিটা ধরে ফেলল। আর আমি সেই দরজায় দাঁড়িয়ে কীকরে যে ওকে টেনে তুলেছি, বা ও উঠতে পেরেছে, ফস্কায়নি - আমরা দুজনেই জানিনা। কারণ ট্রেন ততক্ষণে স্পীড নিয়ে নিয়েছে। আমরা তো আর হিন্দি সিনেমার শাহরুক, কাজল ছিলাম না, বাস্তবটা ভয়াবহ। ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়, কী হয়ে যেত সেদিন। তারপর আর কী - কলেজ থেকে সহকর্মীদের দৌড়, বাড়ি থেকে পরিবারের সদস্যদের দৌড় - অবশেষে সেই রাতেই মধুসূদনের ছাড়া পাওয়া - রেলের কোটায়, রেলের আধিকারিকেরাই টিকিট বুক করে দিলেন। আমরা লখনৌ পৌঁছেছি ভোরে, আর মধুসূদন এসে যোগ দিল বিকেল সন্ধের মুখে। আর একবার হলদিয়া ডকে আমরা ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে জাহাজ দেখছিলাম। ডকে ঘোরার অফিসিয়াল পারমিশন ছিল। তখন কলেজে যোগ দিয়েছি, হয়তো বছর দুয়েক হবে। হঠাৎ দলের এক সদস্য একটা বিদেশি জাহাজের ডেকে দাঁড়ানো কর্মীকে জিজ্ঞেস করল - ভেতরটা দেখা যাবে? সে বলল - অবশ্যই, ওয়েলকাম। এতে যে কোন সমস্যা হতে পারে, আমাদের ধারণায় আসেনি। বয়সটা তিরিশে পৌঁছয়নি তখনও। একটা সরু লোহার সিঁড়ি বেয়ে ছেলেমেয়েরা যেই উঠতে শুরু করেছে, সঙ্গে সঙ্গে আর্মি ছুটে এসে আমাদের নামিয়ে দিল। তারপর টিচার হিসেবে আমরা তাঁদের কাছে খুবই বকুনি খেলাম, নিজেরাও মরমে মরে গেলাম। ঘটনা হচ্ছে, আমরা তো জানিনা যে, ডকে দাঁড়ানো জাহাজের ভেতরে আমাদের দেশের আইন কানুন খাটেনা। যে দেশের জাহাজ - সেই দেশের আইন চলে। ফ্ল্যাগ স্টেট জুরিসডিকশন ও টেরিটোরিয়াল ওয়াটার্স - এই আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, কোনো দেশের বন্দরে আন্তর্জাতিক জাহাজ দাঁড়িয়ে থাকলেও, জাহাজের ডেভিস বা ভেতরের অংশটি সংশ্লিষ্ট যে দেশের পতাকা বহন করছে, সেই দেশের সার্বভৌম ভূখণ্ড বলে গণ্য হয়। মাসের পর মাস জলে থাকা নাবিকেরা যদি আমাদের নামতে না দেয়, আমরা তো সরকারের অনুমতি নিইনি - সরকার তো জানবেওনা আমরা কোথায় গেলাম। আর্মিকে আজও আমি মনে মনে ধন্যবাদ জানাই। পাহাড় থেকে নিরাপদে নামার জন্য যেমন বায়োমেকানিক্স বা ‘হিউম্যান-মেকানিক্যাল ফ্রিকশন ব্রেক’-এর কারিগরি দক্ষতা শিখে রাখাটা দরকার, ঠিক তেমনই আমরা যে সমাজে এবং রাষ্ট্রে বাস করছি, করে কম্মে খাচ্ছি, তার আইনগত পরিধি সম্পর্কে সচেতন থাকাটাও ভৌগোলিকের জন্য সমান জরুরি। প্রাকৃতিক নিয়ম বা প্রকৃতির তৈরি আইন মানায় ত্রুটি হলে যেমন প্রকৃতি ক্ষমা করে না, তেমনই রাষ্ট্রের আইন না মানলে সমাজ ক্ষমা করে না। দুটি ক্ষেত্রেই ল্যাটিন প্রবাদটি সত্যি - ‘Ignorantia juris non excusat’ "আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা কোনো অজুহাত নয়"। পরের ঘটনা যেটা বলতে যাচ্ছি, সেটা হল দীঘা ফিল্ডে, আর সেইবারই সাইট সীয়িংয়ে গিয়ে উড়িষ্যার তালসারিতে। তখন সবে আগের বছর আমি আর বল্লরীদি এক মাস আগে পরে কলেজে যোগ দিয়েছি - হরিহর আত্মা। বাংলার বর্ষীয়ান অধ্যাপক শ্যামল বাবু শারদা, বল্লরী আলাদা না বলে একসঙ্গে দুজনকে শাল্লরী বলে ডাকতেন। সেবারে আমাদের সার্ভে গ্রামের নাম ছিল গোবিন্দবসান। নির্ধারিত দিনে মৌজা ম্যাপ দেখে দেখে এগিয়ে চললাম সার্ভে করতে। অর্ধেক রাস্তা গিয়ে দেখি সামনে উত্তুঙ্গ বালির পাহাড় - মানে বেশ বড়সড় একটা বালিয়াড়ি, কিন্তু সেটা ম্যাপে নেই। মানে আছে কিন্তু ঠিক সেই জায়গায় নেই। ব্যাপারটা কী দেখতে হচ্ছে। কিছুক্ষণ চেষ্টা চরিত্র করে সেই ঝুরঝুরে বালির পাহাড়ের মাথায় যেই না চড়েছি, একটা ভেজা দমকা নোনা বাতাসের ধাক্কা লাগল চোখে মুখে। ওমা! সামনে নীল সাগরের ঊর্মিমালা। কিন্তু ম্যাপে দেখাচ্ছে গ্রামের জমি আরও অনেকটা বিস্তৃত, সমুদ্র বেশ দূরে। আসলে ইংরেজ আমলে মানচিত্র তৈরির সময় যেমন ছিল সেটাই আঁকা রয়েছে। কিন্তু এখন ২০০০ সালে সেটা নেই। গ্রাম ছোট হয়ে গেছে। চোখের সামনে সিভিয়ার কোস্টাল ইরোশন দেখে সবাই হতবাক। আমরা তখন যদিওবা টীচার, স্টুডেন্টদের থেকে খুব বেশি বয়সে বড় তো নই - আর সেই আমাদের অত বড় আবিষ্কার! শাল্লরীর মন তখন ডানা মেলে উড়ছে। সী ফেসিংয়ে বালিয়াড়ি ভেঙে ভেঙে জায়গায় জায়গায় ভিতরের গঠন বেরিয়ে পড়েছে। মানে যে সময়ে যেমনভাবে বাতাস বয়েছে, সেভাবে বালি এসে জমেছে। কোথাও প্যারালাল স্ট্রাকচার, কোথাও ক্রিসক্রস বা ক্রস বেডিং দেখা যাচ্ছে। ছেলেমেয়েরা মহানন্দে সেগুলো খুঁজে বেড়াতে লাগলো, আর রিজ লাইন বরাবর আমরা দুজন এগিয়ে গেলাম একটু দূরে। একটা জায়গায় পাথর দিয়ে নিচু দেয়ালের মত সাজানো, মনে হচ্ছে ভিউ পয়েন্ট। সেখানে পৌঁছে দেখি জায়গাটা বেরিয়ে আসা স্পার, ঝুলন্ত বারান্দার মত, তলায় আন্ডারকাট আছে, মানে তলার বালি খেয়ে গেছে। হয়তো যখন পাথর সাজানো হয়েছিল, তখন বালির ঢালটা উল্লম্ব ছিল, এখন নেগেটিভ ঢাল হয়ে গেছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক যেটা, সেটা হল অনেক নিচে সমুদ্রের ঢেউগুলো এত জোরে আছড়াচ্ছে আর ঘুরপাক খাচ্ছে, যে জলের ছিটে আমাদের গায়ে লাগছে। একবার নিচে তাকিয়ে মনে হল - এ যেন যমুনার জলে হওয়া এক অবিরাম যুদ্ধ যাতে কালীয় নাগের ফণাগুলো আক্রোশে ফোঁসফোঁস করে চলেছে। আমরা সেই বালি - ছাদের পাথুরে আলসের পাশে দাঁড়িয়ে অলস গল্প জুড়লাম, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, আমার বামপাশে সমুদ্র, বল্লরীদির ডানপাশে। ক্ষণিকের মধ্যে পলক ফেলার আগেই মনে হল বাঁপাশে একটা বিশাল কালো অন্ধকার ধেয়ে আসছে, মস্তিষ্ক সময় পায়নি, সুষুম্না ক্রিয়া মানে পরিবর্ত ক্রিয়ায় আমি একটা বিশাল লাফ দিলাম ডানপাশে। এর আগে কখনও অমন লাফাইনি, পরে তো প্রশ্নই ওঠেনা। বাঁকাধে যেন একটা ভয়ানক জোরে থাপ্পড় এসে পড়ল, আমি তো পুরো বেসামাল। সম্বিৎ ফিরলে বুঝতে পারলাম, যে বিশাল একটা ঢেউ এসে আমাদের আক্রমণ করেছিল। এত ওপরে যে ঢেউ উঠতে পারবে, সেটা আমরা কল্পনা করতে পারিনি। নিজের সম্বিৎ ফিরে পাবার পর বল্লরীদির কী হল এই ভেবে কেঁপে গেলাম, দেখলাম বল্লরীদি যেখানে ছিল সেখানেই ভিজে চুপচুপে হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন একটা মূর্তি - বিশাল ঢেউটা ওর মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে। আমি কোনরকমে ছুটে গিয়ে ওকে দুহাতে ধরে ঝাঁকিয়ে দিয়েছি। তারপরে দেখি নড়ে উঠলো। আমি বললাম তুমি তখন দাঁড়িয়ে রইলে কেন? সরে যাবে তো! বল্লরীদি বলল, আমি ভেবেছি - আমি তো লম্বা, ঢেউয়ে কিছু হবেনা। আমি তো তাজ্জব, বললাম, তুমি নিজেকে সমুদ্রের চেয়ে লম্বা কীকরে ভাবলে? এইখানে কাহিনী মে কুছ টুইস্ট হ্যায় - মানে কুছ হিস্টোরিকাল ফ্যাক্ট হ্যায়। বল্লরীদি সত্যিই বাঙালি মেয়ের গড় থেকে মাথায় অনেকটাই বেশি উঁচু, এদিকে আমি উল্টো - খর্বকায়। নিজেরাই নিজেদের নাম নিয়েছিলাম পেনসিল - রবার। আর স্টুডেন্টরা আরও এক কাঠি সরেস। তারা হেসে হেসে বলেছিল, ম্যাডাম, আপনাদের আমরা নাম দিয়েছি এল. এম. আর বি. এম. - মানে হচ্ছে বল্লরী ম্যাম হলেন ল্যান্ড মার্ক আর শারদা ম্যাম হলেন বেঞ্চ মার্ক। এক্কেরে সাচ্চা ভূগোলের ছাত্র - আমরা তো হেসে খুন। তবে ফিল্ড উজিয়ে এই গল্প যখন কলেজের স্টাফ রুমে এল, তখন বিপদের আশঙ্কা, আমাদের অবিমৃশ্যকারিতা সব বাদ দিয়ে ‘বল্লরী সমুদ্রের চেয়ে লম্বা’ - এই তথ্যই মুখ্য হয়ে উঠলো। অট্টহাসির ঢেউ উঠতে লাগলো। আজ সিকি শতাব্দী পরেও আর্জি আসে - অ্যাই শারদা - ‘সমুদ্রের চেয়ে লম্বা’ টা প্লিজ বলো। আমার আবার একটু হাত পা নেড়ে, অভিব্যক্তি দিয়ে গল্প বলায় নামডাক আছে। হাজারো বার শোনা গল্প আবার শোনাই। বল্লরীদি রেগে যায়। এবার যে এই গল্পটা আমি স্টাফরুমের বাইরে ফাঁস করলাম, বল্লরীদির সজোর চাঁটি থেকে কেউ আমাকে বাঁচাতে মনে হয় পারবেনা। কিন্তু হাসি মজার আড়ালে একটি গভীর সত্য আছে - যার প্রভাবে দীঘার নোনা জলে ভেজা বালুকাবেলা আর রোদ্দুরে পোড়া মাঠা পাহাড়ের নেড়া ঢাল পাশাপাশি একই মঞ্চে দাঁড়াতে বাধ্য হয়। গ্রামবাসীরা শুনিয়েছিলেন সেই কাহিনী - মাঠে ঘাটে হাটে বাটে পাওয়া সেইসব জ্ঞান না পেলে, পুঁথির মুক্তো ফেলে ঝিলিক ঝিলিক ঝিনুক না কুড়োলে আজ আমাদের ভৌগোলিক হওয়া হতনা।চলবে...
  • হরিদাস পালেরা...
    ই-২০ - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | সোশাল মিডিয়ায় প্রবল খিল্লি হবার পর, মোদিজি রিল বানানোয় আপাতত ক্ষান্ত দিয়েছেন। ভারত জুড়ে 'ফ্রেন্ডস' বলে সে কী খিল্লি, দেখলে চোখে জল আসে। ওদিকে আরশোলাদের পরে তৈরি হয়ে গেছে নতুন আন্দোলন, ই-২০ জনতা পার্টি। তার সদস্য সংখ্যা যে গতিতে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, সংখ্যা বলার মানে নেই। এমতাবস্থায় যশস্বী প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটিই বিনতি। দয়া করে আবার ৩০ দিন ঝোলাবেন না। গড়করিকে সরিয়ে দিয়ে মাস্টারস্ট্রোকটা ঝপাঝপ নিয়ে নিন। তাহলে আর কোনো আন্দোলনই হবেনা। এক ধাপ এগিয়ে আপনারা দুজন সরে গিয়ে আরও বড় মাস্টারস্ট্রোকও নিতে পারেন। তাহলে খিল্লিও বন্ধ হয়ে যাবে। ওদিকে পশ্চিমবঙ্গের নেতারা পড়েছেন ফাঁপড়ে। একে তো কী করে জিতলেন নিজেরাই জানেন না, প্রিপারেশন কিছুই ছিলনা। তার উপর এই খিল্লি। ল্যাজে আগুন লেগে যাবার মতো অবস্থা। এদের অর্ধেকই এসেছেন আবার তৃণমূল নয়তো কংগ্রেস থেকে। অভ্যাসবশত বিজেপিকেও প্রায় ক্লাবে পরিণত করে ফেলেছেন। এ বলছেন আজাদি স্লোগান দিলেই জেল, ও বলছেন প্রধানন্ত্রীর ছবিতে অমুক আগুন লাগিয়েছে, তমুক অভিনেত্রী খারাপ ছবি নিয়ে ঘুরেছে। একজন শুনলাম ইন্টারনেটে খুব চেঁচাচ্ছেন, ভাবুন, এমন সাহস প্রধানমন্ত্রীর গালে চড় মেরেছে। আমি চমকে গিয়ে তাকিয়ে দেখি, ধুর, ও তো ছবিতে। এদের এমন ভাব, যেন ভারতবর্ষে এই প্রথম একজন প্রধানমন্ত্রী কিংবা মুখ্যমন্ত্রী হলেন। আরে দাদারা, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী যখন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, তখন ওঁর ছবিতে শিং লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মনমোহন সিং যখন প্রধানমন্ত্রী আপনাদের বদ্দারা গুচ্চ্ছের আগুন দিয়েছেন কুশপুত্তলিকায়। মমতা ব্যানার্জিকে নিয়ে যা রিল হয়েছে, তাতে আস্ত অ্যামাজনের ডেটা সেন্টার ভরে যাবে। আরজিকরের সময় জুতো-মারো-তালে-তালে স্লোগান যে কত জায়গায় শুনেছি, সে আর কী বলব। ভালো মন্দ অন্য কথা, কিন্তু এসবের জন্য কেউ কাউকে জেলে পুরেছে বলে তো দেখিনি। আপনাদের প্রধানমন্ত্রীর জন্যই আইন বদলে যাবে নাকি? ওঁদেরও কাছেও একটি বিনতি। এসব চক্করে বাড় খেয়ে জড়াবেন না। ভেড়া লড়ে খুঁটির জোরে, খুঁটিই এখন নড়বড় করছে। বেআইনী, অসাংবিধানিক কাজকর্ম করার দরকারটা কি ফালতু? অবশ্য, ওঁদের একটু রিলিফ দিতে পারেন বিরোধী নেতারা। সারা ভারতবর্ষে এই আন্দোলন নিয়ে গোদি-বাহিনীর বদনাম করার তো কোনো অন্ত নেই। কিন্তু কোত্থাও দেখবেন না, বিরোধী নেতারা এরকম বিগলিত হয়ে মাটিতে মিশে যাচ্ছেন। একদিকে ওঁদেরই ছাত্র-যুবরা ফাটিয়ে লড়ছেন, অন্যদিকে বিধায়ক আগ বাড়িয়ে কালো ব্যাজ পরে ফেলছেন। প্রধানমন্ত্রীর অপমান? ছি ছি মাপ করবেন। অপশব্দের ব্যবহার? মার্জনা করে দেবেন প্রভু। আরে, খিস্তি-খাস্তার প্রশংসা করতে কেউ বলছেনা। কিন্তু ছবি পুড়িয়েছে বলে গ্রেপ্তার, পোস্টার ধরেছে বলে বাড়িতে হামলা-এফআইআর -- এগুলো যে অপরাধ, গণতান্ত্রিক অধিকারকে পায়ে মাড়ানো, সেটা জোর গলায় বলুন অন্তত। ভারতবাসী সবাইকে নিয়ে খিল্লি করেছে, কুশপুত্তলিকা পুড়িয়েছে, ইচ্ছে হলে এই প্রধানমন্ত্রীকে নিয়েও করবে, ছবি জ্বালাবে। পছন্দ না হলে যত খুশি নিন্দে করুন, কিন্তু সেটা আটকাতে জেলে পোরা হল গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা। এই কথাটা জোর দিয়ে বলুন। পাবলিক কিন্তু বিরোধী খুঁজছে। সুকৌশলী, সবদিক বাঁচানো রাজনীতিক না।পুঃ এসব ট্যারাব্যাঁকা কথা যদি কারো মাথার উপর দিয়ে যায়, তো স্পষ্ট করে বলে দিই। যে ছেলেটিকে জেলে ভরা হয়েছে প্রধামন্ত্রীর ছবিতে আগুন দেবার জন্য, যে অভিনেত্রীর বাড়িতে হামলা হয়েছে একটা পোস্টার ধরার জন্য, তাঁরা নন, আইন বা গণতান্তিক রীতিনীতি তাঁরা ভাঙছেন, যাঁরা হামলা করছেন, বা গ্রেপ্তার করছেন। পৃথিবীর কেউ বলবে না উনি আমার সুহৃদ, হয়তো অন্য কোনো ইস্যুতে ওঁর বিপক্ষেই লিখব। কিন্তু আজ, এটা শুধু ওঁর উপরে নয়, গোটা গণতন্ত্রের উপরেই আঘাত। ঠিক যেমন ছিল ডিম ছোঁড়ার ঘটনা। এর বিচার নিশ্চয়ই একদিন হবে। চেয়ে রাখলাম।
    ক্রিস্টোফার নোলানের ইউলিসিসের স্বদেশ যাত্রা!  - মুহাম্মদ সাদেকুজ্জামান শরীফ | হোমারের অডিসি অবলম্বনে বানানো সিনেমা, আলাদা করে স্পয়লার আছে লিখে দিতে হবে? লিখে দিতে হলে দিলাম লিখে যে স্পয়লার আছে!  এই বছর বড় বড় পরিচালকের বড় বড় সিনেমার বছর। স্পিলবার্গের ডিসক্লজার ডে, ইনারিতুর ডিগার, ডুনের তিন নাম্বার পার্ট, রিডলি স্কটের দা ডগ স্টারস, এত বছর পরে রুশো ভাইয়েরা অ্যাভেঞ্জারস নিয়ে আসবে! বিশাল অবস্থা আসলেই। এর মধ্যে ডিসক্লজার ডে দেখতে পারি নাই হলে গিয়ে। একটু আফসোস ছিল এইটা নিয়ে। পরে অনলাইনে আসার পরে দেখে মনে হয়েছে খুব একটা ক্ষতি হয় নাই এতে। সিনেমা ভালো লেগেছে কিন্তু এইটা হলে না দেখলেও খুব একটা সমস্যা নাই! কিন্তু এরপরেই আসছে নোলেনর অডিসি। এবং যেটার সিনেমার গল্পর চেয়ে বেশি আলাপ হচ্ছে ৭০ এমএম ফিল্ম, মাত্র ৪০টা হলে পুরো দেখা যাবে, বাকিরা মাথা দিক, পায়ে দিক দিয়ে কাটা দেখবে ইত্যাদি! মানে সম্পূর্ণ টেকনিক্যাল একটা বিষয় নিয়ে মানুষ মাতামাতি শুরু করে দিল। নোলানের সিনেমা আসলে যা হয় আর কী! এই সব কারণে মনে হচ্ছিল এইটা ল্যাপটপের পর্দায় দেখে আসলে মজা পাওয়া যাবে না। দেখলে দেখতে হবে বড় পর্দায়। ঢাকায় এই মুহূর্তে সবচেয়ে ভালো হল হচ্ছে সেন্টার পয়েন্ট শপং মলের স্টার সিনেপ্লেক্সের পর্দা। সেখানেই টিকিট কাটলাম। সিনেমা দেখার উদ্দেশেই শেরপুর থেকে ঢাকায় গেলাম ঝটিকা সফরে!  সিনেমায় যাওয়ার আগে একটু বলি - অডিসিয়াস কিন্তু আমাদের পরিচিত না। আমাদের পরিচিত নাম হচ্ছে ইউলিসিস। গ্রীক থেকে যখন রোমানরা ল্যাটিন ভাষায় ইলিয়াড, অডিসি অনুবাদ করে তখন তারা নিজেদের মত করে অডিসিয়াসের নাম দেয় ইউলিসিস! ল্যাটিন থেকে ইংরেজিতেও ইউলিসিসই প্রচলিত হয়। আমাদের এদিকেও ইউলিসিস বেশি পরিচিত। ইউলিসিসের স্বদেশ যাত্রা একটা বইও আছে সম্ভবত। ইংরেজিতে ইউলিসিস এতই জনপ্রিয় যে জেমস জয়েস তার বিখ্যাত উপন্যাসের নাম রাখেন ইউলিসিস। এগুলাও পরে জানা আমার। আমাদের বা আমাদের বড় ভাই বোনদের পাঠ্য ছিল সম্ভবত ইউলিসিসের স্বদেশ যাত্রা, মোবারক হোসেন খানের লেখা। তখন থেকেই ইউলিসিসিই মাথায় রয়ে গেছে। অনেক পরে ইলিয়াড অডিসি যখন পড়ি তখন মূল নাম জানি অডিসিয়াস! যাই হোক, সিনেমার গল্পে ফিরে যাই। অডিসি আমাকে মুগ্ধ করেছে। এইটা হচ্ছে প্রথম কথা। এরপরের কথা হচ্ছে কিছু জায়গায় কি অন্য রকম করা যেত? যাইত। নোলান তো নোলানই, সে সব সময়ই নিজের তৈরি পথে হাঁটে। এখানেও তাই করেছেন তিনি। যেহেতু রিভিউ লিখতে বসেছি তাই এই নিয়ে দুই একটা কথা না বললেই না। নোলান গল্পটাকে নিজের মত করে বলেছে। বহুল পঠিত অডিসির মূল ভাবটাই তিনি পরিবর্তন করে দিয়েছেন বলে আমার মনে হয়েছে। এখানে আমরা যে অডিসিয়াসকে ইলিয়াড, অডিসি থেকে চিনি সেই অডিসিয়াসকে পাওয়া যায় না। এখানে তিনি অনেক মহান, ট্রয় যুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাস তাকে তাড়া করে ফিরছে। অমন একটা যুদ্ধের বিভীষিকা সে কাটায় উঠতে পারে নাই। কিন্তু অডিসিতে আমরা এই অডিসিয়াসকে দেখি নাই। সে সেখানে সাহসী যোদ্ধা, একটু ধূর্ত, এত নীতি নৈতিকতা সম্ভবত ছিল না। ( সম্ভবত লিখলাম কারণ অনেক দিন আগে পড়া, যতখানি মনে আছে এমনই ছিল) নোলান এখানে পুরো সিনেমার দৃষ্টিভঙ্গিই পরিবর্তন করে ফেলেছেন। এখানে পেনোলপির চরিত্রকে যতখানি দৃঢ় শক্তিশালী দেখানো হয়েছে, মূল অডিসিতে তেমন তিনি ছিলেন না। পুরুষতান্ত্রিক থেকে বের করে এনে নোলান একটু নারী শক্তির জয় দেখাতে চেয়েছেন। আমার কাছে ভালো লেগেছে বিষয়টা। অনেকের আপত্তি ছিল হেলেনকে নিয়ে। কেন হেলেন কৃষ্ণাঙ্গ লুপিতা? যে হেলেনের রূপের জন্য এত কিছু সে কীভাবে কৃষ্ণাঙ্গ হয়? ইতিহাস তো সমর্থন করে না। মূল অডিসি তো করেই না। অডিসিতে তো হেলেনের রূপের বর্ণনাও দেওয়া আছে, তাহলে? নোলান এখানে একটা ধাক্কা দিতে চেয়েছে আমার ধারণা। মূল অডিসিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে আগামেনোনের ট্রয় জয় করার ইচ্ছা, বাণিজ্যপথ পাওয়াটাই ছিল যুদ্ধের মূল কারণ, হেলেন ছিল একটা অছিলা, যার জন্য যুদ্ধটা শুরু করা গেছে। কিন্তু এরপরেও আজ পর্যন্ত মানুষ বলার সময় বলে নারীর কারণে ট্রয় ধ্বংস হয়েছে, যুদ্ধ হয়েছে। ও সম্পূর্ণ বিপরীত একটা চেহারা সামনে এনে দেখাতে চেয়েছে হেলেনের রূপ সৌন্দর্য এখানে মুখ্য না। যুদ্ধটার জন্য দরকার ছিল একটা ক্লিক, সেই ক্লিকটা এনে দিয়েছিল হেলেন, আর কিছু না। আর হোমার যেমন রূপ বর্ণনা করেছেন তেমনই আরও অনেক কিছুই বলেছেন, হেলেন আসলে রাজহাঁসের ডিম থেকে হয়েছেন! হেলেন অফ ট্রয় তাই আক্ষরিক অর্থে নেওয়ার কোন মানেই নাই। তাই এই কাস্টিং নিয়ে আমার তেমন আপত্তি নাই। নোলান অডিসিয়াসের নাবিকদের মধ্যেও কৃষ্ণাঙ্গ দেখাইছে, ওইটা নিয়া মানুষের তেমন আলাপ দেখলাম না। সব দোষ লুপিতার! নাবিকদের মধ্যে চাইনিজ টাইপেরও মনে হয় একজনকে দেখছি! অত বড় একটা গল্প অডিসি, স্বাভাবিক ভাবেই নানা জায়গায় কাটছাঁট হয়েছে। বাড়ি ফেরার পথে যে নানান প্রতিকুল পরিস্থিতিতে পড়েছে অডিসিয়াস সেগুলো যেন বড্ড তাড়াহুড়ো করে করেছে। সাইক্লোপ, সার্সি, সর্বশেষ ক্যালিপসো, শার্লিজ থেরন যে চরিত্রে অভিনয় করেছে সেখানে নোলান বই থেকে পুরো বের হয়ে গেছে। এখানে দেখানো হয়েছে অডিসিয়াসের মনে নাই, সে ক্যালিপসোর সাথে থাকে। মূল বইয়ে এমন ছিল না। নোলানের অডিসি অনেকটাই মানবিক, বাস্তববাদী মনে হয়েছে। এক অ্যাথেনা ছাড়া আর কোন দেব দেবীকে আমরা দেখ নাই সিনেমাতে। কিন্তু মূল গল্পে আমরা জানি পুরো যুদ্ধ এবং যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে অডিসিয়াসের বাড়ি ফেরার পথে দেবতাদের নানা ভূমিকা ছিল। মাউন্ট অলিম্পাসে ম্যালা মিটিং হইছে এই যুদ্ধ নিয়ে। এখানে তেমন কিচ্ছু ছিল না। জিউসের শুধু জিউস ল ছিল। বারবার করে আসছে জিউস ল- এর কথা। জিউস ল, তুমি কারো ক্ষতি করতে পারবা না, কেউ তোমার হুদাই ক্ষতি করলে সে জিউস ল -এ ধরা খাবে, তার শাস্তি হবে। এই লয়েই একের পর এক বিপদে পড়তে থাকে সবাই। জানে জিউস ল ভঙ্গ হচ্ছে তবুও চলতেই থাকে মানুষের জীবন! আমার কাছে গল্পের নানা পরিবর্তনসহ পুরো সিনেমাটাই দারুণ লেগেছে। শুধু একটা খটকা আমি মিলাতে পারি নাই। তা হচ্ছে নোলান কেন একবারের জন্যও একিলিসের প্রসঙ্গ আনল না? মৃত্যুপুরীতে একিলিসের সাথে অডিসিয়াসের যে কথোপকথন তা অসাধারণ না? এখানে শিনোন নামে একটা চরিত্রকে দিয়ে সেই কথোপকথন দেখানো হয়েছে। কেন? এমন না অডিসি দেখে এখানে ইলিয়াডের কিছুই দেখানো হয় নাই, দেখানো হয়েছে। প্রায়ই ফ্ল্যাশব্যাকে ট্রয় যুদ্ধ দেখানো হয়েছে। ট্রোজান হর্স থেকে শুরু করে ট্রয়ের পতন সবই এখান হয়েছে অথচ ট্রয় যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বীরের নাম উহ্য? কেন? হোমারের এই বিখ্যাত দুইটা সৃষ্টির মধ্যে আমার কাছে তো সেরাই লাগছে অডিসিয়াস আর একিলিসের এই আলাপটা। অডিসিয়াস একিলিসকে মৃত্যু নিয়ে গর্বিত হওয়ার কথা বলে, জবাবে একিলিস প্রতিবাদ করে বলে এরচেয়ে পৃথিবীতে সামান্য কৃষক হয়ে বেঁচে থাকতে চায় ও। মৃতদের এই ছায়াঘেরা রাজ্যে রাজা হওয়ার চেয়ে জীবিত থেকে পৃথিবীর কোনো দরিদ্র কৃষকের অধীনে বা দিনমজুর হিসেবে দাসত্ব করাও শ্রেয়। ট্রয়ের যুদ্ধের সেই অন্ধ ও নিষ্ফল গৌরব এবং রক্তক্ষয়ী অহংকার তাকে আর টানে না, দুনিয়ায় বেঁচে থেকে নিঃশ্বাস নেওয়া সাধারণ জীবনই তার কাছে সর্ব সেরা। এই জিনিস কেন থাকবে না অডিসি সিনেমায়? এখানে তো নোলানের সিনেমার যে মূল ভাব, যুদ্ধের চেয়ে, বীরত্বের গৌরবগাথা না হয়ে যুদ্ধের মানসিক ক্ষত আর অপরাধবোধ নিয়েই সিনেমা। সেখানে একিলিসের এই কথোপকথন বাড়তি মাত্রা যোগ করত না? সিনন চরিত্রটা নিয়ে একটু বলি। এই চরিত্রে অভিনয় করেছে এলিয়ট পেজ। এই অভিনেতা কিছুদিন আগে লিঙ্গ পরিবর্তন করে মেয়ে থেকে ছেলে হয়েছে। গুজব ছড়ায় পড়ল এলিয়ট পেজ একিলিস চরিত্রে অভিনয় করেছে! মানুষ ২০০৪ সালের ট্রয় সিনেমার একিলিস চরিত্রে অভিনয় করা ব্র্যাড পিটের ছবি আর এলিয়ট পেজের ছবি নিয়ে সেই মজা নিতে থাকল। দেখ নোলানের কাণ্ড, একটা ট্রান্সকে এনে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বীরের চরিত্রে অভিনয় করাইছে! শেষ হয়ে গেল সব! আমি এইটা দেখে একটু ধাক্কা খেয়েছিলাম। ট্রান্স আমার সমস্যা না, সে যদি অভিনয় করতে পারে তাহলেই হল। আমি একিলিস এলিয়ট পেজ করতে পারল কি না তাই ভাবতেছিলাম। এলিয়ট পেজকে চিনি নেটফ্লিক্সের আমব্রেলা একাডেমী থেকে। সিনেমায় তাকে দেখে আমি বুঝতেছিলাম না এইটা একিলিস কেমনে? এর মধ্যে সিনন চরিত্রটাই অডিসিতে নাই। তাই চরিত্রটাই চিনতেছিলাম না। পরে বাড়ি ফিরে ক্লডকে জিজ্ঞাস করলাম ইজ্জত তো শেষ, এই চরিত্রকে আমি চিনলাম না কেন? ক্লড বলল এই জিনিস অডিসিতে নাই, ভার্জিলের এনিড থেকে নোলান এনেছে। সেখানে বর্ণনা আছে সিনন কীভাবে নিজেকে অডিসিয়াসের কথার ফাঁদে পড়ে কাঠের ঘোড়ার সামনে দাঁড়ায় থাকে ট্রয়ের সৈন্যদের জন্য। এই বর্ণনা অডিসিতে নাই! আমি মূর্খ ভার্জিলও যে এই কাহিনী নিয়ে লিখে গেছে তাই তো জানি না! মানুষ এইটা নিয়ে কিছু বলে না কেন? নাকি সবার ভার্জিল পড়া? সবাই জানে আমিই জানি না শুধু! সিনেমায় আসি। দুর্দান্ত কাস্টিং করা হয়েছে সিনেমায়। ম্যাট ডেমন খুবই ভালো অভিনয় করেছেন। আনা হ্যাথওয়ে চোখে লেগে থাকার মত অভিনয় করেছেন। জন লেগুইজামো আর সামান্থা মর্টনের অভিনয়ও আলাদা করে বলার মত। জন লেগুইজামো পার্শ্ব চরিত্রের জন্য অস্কার নিয়ে টানাটানি করবে আমার ধারণা। সিনেমাটোগ্রাফি আহামরি কিছু মনে হয় নাই। যে পরিমাণ হাইপ তোলা হয়েছে সেই তুলনায় আসলে তেমন কিছু মনে হয় নাই আমার কাছে। এইটা পুরো সিনেমা আইএমএএক্স ক্যামেরায় শুট না করে নরমাল করলে ক্ষতি বা করেই কী লাভ হয়েছে আমি বুঝি নাই। আবহসঙ্গীতও খুব মনে রাখার মত মনে হয় নাই। হ্যান্স জিমারের বিজিএম শোনার জন্য ডুন থ্রির জন্য এখন থেকেই অপেক্ষা করছি। মজাটা হচ্ছে নোলান এই সিনেমায় গ্রাফিক্সের কাজ পর্যায় করেই নাই। নোলানের মুনশিয়ানাটা এখানেই ভালমত বুঝা গেছে। এমন সময়ে এসে এমন সব দুরহ শট নেওয়া। যা সহজেই গ্রাফিক্স দিয়ে করা যেত তা না করে ক্যামেরার জাদু আর নিজের মহাজাদু ব্যবহার করে সিনেমা বানানো, এইটা যে কত বড় ব্যাপার তা আসলে বলে বুঝানো সম্ভব না। এইটার জন্য স্যালুট প্রাপ্য নোলান। নোলানের সিনেমাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সহজবোধ্য সাধাসিধে সিনেমা হিসেবে অডিসি থাকবে। আর যেহেতু সহজবোধ্য তাই মানুষের আগ্রহ বেশি। মানুষ সিনেমা দেখে তৃপ্তি পাচ্ছে। এই জন্যই দুনিয়া জুড়ে জয় জয়কার চলছে এই সিনেমা নিয়ে। সময় সুযোগ থাকলে অবশ্যই সবার দেখা উচিত এই সিনেমা। আমার ব্যাক্তগত রেটিং - ৮/১০!  
    আরশোলা বিপ্লব নিয়ে দু-একটা কথা - ফরিদা | এ এক নতুন ভারতবর্ষ! আমার অচেনা এযাবৎ। ২০১৪ সালের আগে সাধারণ মানুষজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বা আলাপচারিতায় কেউ কারো ব্যক্তিগত ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিশ্বাস নিয়ে ভাবতাম না বড় একটা। সাধারণ কথাবার্তায় কোনটা বলা উচিৎ বা অনুচিৎ তা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে শিক্ষিত বা অশিক্ষিত সবারই একটা স্পষ্ট ধারণা ছিল। ২০১৪ র পরে সেই মূল্যবোধের সংজ্ঞাই গেছে বদলে। এখন অনেক কথাই বিনা প্রশ্নে হজম করতে হয় আর আশ্চর্য হতে হয় — কেন এই বিশ্রী বিভাজনের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রশ্ন উঠছে না বলে। এতে আজকাল আমার মতো ও আমার কাছাকাছি অনেকেই বিভিন্নভাবে নিজেদের জীবনযাত্রা জটিল করে তুলেছি। উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ, চলাফেরার প্রতিটি পদক্ষেপ একবার যাচাই করে নিই — এতে কোনো বিপদে পড়তে হবে না তো?কারণ জানি, এর অন্যথা হলে জীবিকা ও জীবনযাত্রায় এর যা প্রভাব পড়বে তা সামাল দেওয়ার রেস্ত নেই। না যথেষ্ট টাকাপয়সা, না সময়।এটা এখন একটা চুড়ান্ত কর্তৃত্ববাদী দেশ। আপাতত এখানে যাদের রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা আছে, তাদের সবাই সেটা টিকিয়ে রাখতে সারাক্ষণ খেটে যাচ্ছে। বাকিরা নিজের যোগ্যতার চেয়ে নিচে কাজ খুঁজে খুঁজে প্রাণপাত করেও গুটিকয় ছাড়া কেউ সুবিধা করতে পারছে না। সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান প্রায় নেই বললেই চলে। অসংগঠিত ক্ষেত্রে যা আছে তাতে খেয়ে পরে সংসার চলে না।যারা পড়াশোনা করে কিছু করবে বলে ভাবছিল, তারাও দেখতে পাচ্ছে একের পর এক মাইলফলক পরীক্ষা বাতিল হচ্ছে। তাতে দুর্নীতি সীমাহীন। দেওয়ালে পিঠ থেকে গেলে, আমরা প্রৌঢ়ত্বের দোরগোড়ায় এসে জানি ঘুরে দাঁড়াতে হয়। আর সেটা দেওয়ালের দিকে মুখ করে। সামনের চেয়ে পিছনে চাপ নেওয়াটা সুবিধাজনক বলে। আর এখনকার প্রজন্ম ঘুরে দাঁড়ানোর সঠিক অর্থ খুঁজে পেয়ে এই কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাল।দেখলাম, এদের মগজধোলাই এখনও করে উঠতে পারে নি এই রাষ্ট্রযন্ত্র। এরা দেখেছে শিখেছে জেনেছে নিজের চোখে দেখে, নিজের কানে শুনে, আর নিজে বিপদে পড়ে। আমাদের নিজের সন্তান হলেও এদের ভাষা আমাদের অচেনা, এদের প্রতিক্রিয়া আমাদের সঙ্গে মেলে না।ভাগ্যিস তাই। সেই জন্যই এরা দেশের প্রধাণমন্ত্রীকে একপ্রকার বাধ্য করে মধ্যরাতে নিজের নাকের খুঁটিনাটি দেখিয়ে এদের ইন্সটাগ্রামে পৌঁছতে।ওই ২০ তারিখের ভীষণ অত্যাচারেও যখন এরা প্রকৃত আরশোলার মতো টিকে গেল, তখনই কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের রক্ষণ ভেঙেছে। গোলটা হল বৃহস্পতিবার মাঝরাতে প্রধাণমন্ত্রীর ইন্সটাগ্রাম লাইভে। গতকালের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ তো ওই গোলের বাঁশি।এদিকে, আমাদের যন্তর মন্তরে যাওয়া হয়ে উঠছিল না। ২০ জুলাইয়ের রাষ্ট্রের ভয়ানক পীড়ন দেখে ভীষণ রাগ হচ্ছিল কিন্তু উপায় ছিল না। ফেসবুকের পাতায় আটকে বুঝতে চাইছিলাম কী হচ্ছে যন্তর মন্তরে আর দেখছিলাম ওরা বিন্দুমাত্র দমে নি। বরং ওদের প্রতিরোধ আস্তে আস্তে সংক্রমিত হিচ্ছে সারা দেশে।গতকাল দুপুরে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের খবর পেয়ে আর থাকতে পারলাম না। ওখানে পৌঁছতে রাত আটটা প্রায়। এক জায়গায় গাড়ি পার্ক করে হেঁটে যেতে গিয়ে আটকে গেলাম পুলিশের ব্যারিকেডে। ঘুরে অন্য পথে পৌঁছতে হবে। কেন এমন — সে প্রশ্নের জবাব নেই। রাস্তা বন্ধ। কারা করেছে? — ওরাই। ব্যস।তা ঘুরে অন্য পথে, সেখান থেকে আরও ঘুরে তবে পৌঁছনো গেল। দিল্লির ভ্যাপসা গরম সত্ত্বেও সেখানে তখনও দেদার আড্ডা চলছে। এক একটা ছোট ছোট জটলায় কেউ কিছু বলছে তার ভিডিও তোলা হচ্ছে। কোথায় বা জটলার মধ্যে থেকে স্লোগান ভেসে আসছে। ডাফলি সহযোগে তা গান হয়ে উঠছে। বিপুল সংখ্যক খাকি পোশাকের পুলিশ ও নীল জংলা পোশাকের অন্য ফোর্স ও দেখলাম। তবে তাদের শরীরী ভাষা উগ্র নয়। মুখচোখও ভদ্র সভ্য।রাস্ত ঝাঁট দিচ্ছিল দুজন, একজন বড় কালো প্লাস্টিকে ভরে রাখছিল উচ্ছিষ্ট খাবারের প্লেট, জলের বোতল অন্যান্য বর্জ্য।কিছুটা এগিয়ে দেখলাম রাস্তায় দুটো ধর্ণামঞ্চ। আর রাস্তার দুপাশে কয়েকটা মেডিক্যাল ক্যাম্প ধরণের ব্যবস্থা, বসার জন্য শতরঞ্চি পাতা। সেখানেও অনেকে বসে। একটু দম নিয়ে নিচ্ছেন যাতে ফের রাস্তার কোনও জটলা হয়ে যাবেন একটু পরেই আর ফের গান গেয়ে উঠবেন। বক্তব্য রাখবেন। এক জায়গায় পায়ে প্লাস্টার বাঁধা হুইল চেয়ারে বসা বন্ধুর সঙ্গে দুজন। হাতে ভগৎ সিং এর ছবিওলা পোস্টার। কিছু জলের বোতল, বিস্কুটের প্যাকেট আর ও আর এস নিয়ে গিয়েছিলাম। শতরঞ্চিতে বসা একটা গ্রুপের কেউ জল চাইছিল কারো কাছে। তাকে জলের বোতল এগিয়ে দিতে, আরও কয়েকটা হাত উঠল। শুধু জল দিতে নেই বলে বিস্কুটের প্যাকেট বের করলাম। তাও নিল অনেকে। আমাদের জায়গা করে দিল ওরা শতরঞ্চিতে। বসতে দিল। একটি ছেলে দুহাতে দুটো ফ্লেক্সের টুকরো নিয়ে দাঁড়িয়ে হাওয়া করতে লাগল। অস্বস্তি হচ্ছিল, তাকে বারণ করাতে, একটি মেয়ে পাশ থেকে বলে উঠল, আঙ্কেল, ওকে এটুকু করতে দিন। হতভাগা দিল্লি পুলিশে কাজ করে, আমার হাজবেন্ড। ওরই সহকর্মীরা আমাদের মেরেছে সেদিন। ছেলেটির মুখ তখন দেখার মতো। ওরা বিহার থেকে এসেছে, কেউ তিন চারদিন আগে, কেউ বা গতকালই পৌঁছেছে। টুকটাক কথা হচ্ছিল। একটি মেয়ে এগিয়ে এসে রেশমীর সঙ্গে কথা বলতে চাইছিল, সে নিজস্ব একটা নিউজ পোর্টাল চালায়। তার সঙ্গী ছেলেটা মোবাইলে রেকর্ড করছিল। প্রশ্ন ছিল, আমরা কে, কেন এসেছি, এই আন্দোলন কে আমরা কীভাবে দেখছি, এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে বলে আমরা মনে করি— এইসব। আর কিছুক্ষণ কথা বলার পর আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা চিকেন খাও? আমি কিছুটা চিকেন বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। তাতে সোয়া সস খানিক বেশি হয়ে যাওয়াতে নাম দিয়েছিলাম ককরোচ-চিকেন। সঙ্গে টুথপকের বাক্স নিয়ে গিয়েছিলাম খাওয়ার তুলে খাওয়ার জন্য।তা খেয়ে ওরা তো খুবই খুশি। সবাই ভাগ করে খেল দেখে এত ভাল লাগছিল!যখন পৌঁছেছিলাম ওখানে, ফোনে নেট কাজ করছিল না। ওখানে শতরঞ্চির আড্ডা ছেড়ে আর একটু ঘুরে বেড়াতেই দেখলাম দিব্য নেট কানেকশন রয়েছে মোবাইলে। পট্ট কে ফোন করা হল। অনেকক্ষণ ভিডিও কলে দেখালাম কী চলছে ওখানে। ইন ফ্যাক্ট ওইই জানাল কিছুক্ষণ আগে সিজেপি ওদের আন্দোলন তুলে নেওয়ার ঘোষণা করেছে।এর শুরুতে সন্দিহান ছিলাম, মনে হয়েছিল সিজেপি হয়ত বিজেপির সেফটি ভালভ এর দায়িত্ব নিয়েছে। এখন সে প্রশ্ন অবান্তর। এই সব ছেলেমেয়রা একটা জিনিস শেখাল তা হল ভয়ালতম শাসককে নিয়েও খিল্লি করা যায়। নেচে গেয়ে হেসে ও হাসিয়েও কঠিনতম প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়। গতকালের সাফল্য সেই প্রতিরোধের সাফল্য। ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল, কর্মসংস্থানের ঘাটতি দেশে অসুবিধা ও অভাবের অভাব নেই।এরা শেখাল — হিন্দু-মুসলমান বা পাকিস্তান-বাংলাদেশ এগুলো শাসকের প্রিয় খেলার মাঠ। মানুষের নিজের অপ্রাপ্তির দাবি জানানো ও শাসককে তার জন্য জবাব দেওয়ার জন্য বাধ্য করার নামই গণতন্ত্র।আর সে গণতন্ত্রের চর্চা কিছুতেই দেশদ্রোহিতা নয়। 
  • জনতার খেরোর খাতা...
    কালবেলার রৌদ্রছায়া - ৩০ - Anjan Banerjee | ( ৩০ )অনুমিত একাই ঘুরে এসেছে দিল্লী থেকে। মনোমিতার সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি। দুদিন ছিল ওখানে। একাই গিয়েছিল একাই ফিরল, বুকের জমিতে একটা নতুন ফসলের ক্ষেত নিয়ে। কেমন একটা লাগছে, কেমন যেন অস্থির লাগছে। সে এসব ভাবেইনি কোনদিন। মনোমিতার সঙ্গে আর দেখা হয়নি অনুমিতের। ভাবছে, দেখা হলে ভাল হত। ও তো এসব ভাল বোঝে। দিল্লী গিয়েছিল নিশ্চয়ই এর মধ্যে। তার সঙ্গে দেখা হল না কেন কে জানে। যন্তর মন্তরে হাজারো লোকের ভিড়ে দেখতে পাওয়া গেল না। সত্যিই শিরায় শিরায় দামামা বাজবার মতো ব্যাপার। জেন জি কা কামাল। সেও তো এই দলেই পড়ে কক্রোচ হোক বা না হোক। জেন জি তো নিশ্চয়ই, ' আলাদাই ব্যাপার '। একদম একদম...তার মনে হতে লাগল তারা আলাদা, একদম আলাদা। মানে, সেও আলাদা। তার বাবা অনিন্দ্য বসুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল কাল রাত্রে। তিনি অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে যন্তর মন্তরের খবরাখবর নিলেন অনুমিতের কাছ থেকে। তাকে বেশ উজ্জীবিত মনে হচ্ছিল এ ব্যাপারে। বললেন, ' তোমাকে কে সাজেস্ট করল ? '---- ' কী ব্যাপারে ? '.----- ' এই প্রোটেস্টে ইনভলভড হওয়ার ? '---- ' ও ... ওই... তেমন কেউ না... খবর শুনছিকিছুদিন ধরে ... তাই ভাবলাম... '----- ' তুমি এসব খবর রাখছ এবং ইনভলভড হচ্ছ দেখে খুব ভাল লাগছে। এসট্যাব্লিশমেন্টকে বোঝাতে হবে যে ডেমোক্রেসিতে অ্যাবসোলিউট পাওয়ার বলে কিছু নেই। মানুষই শেষ কথা বলে। ইলেকটোরাল অটোক্রেসি এক ঘৃণ্য জিনিস। মানুষের ভোটে ইলেক্টেড হয়ে নিজেকে দেশের সম্রাট ভাবার দিন শেষ করে দিতে হবে। শুধু কোয়েশ্চেন পেপার লিকের প্রোটেস্টে থেমে গেলে হবে না। ডিজেনারেটেড, ডিকমপোজড সিস্টেমকে পার্জড করতে হবে আউট অ্যান্ড আউট। শুধু একটা ইস্যুতে না। হোলিস্টিক ওয়েতে। শুধু একজন মিনিস্টারের ডিপার্টমেন্টাল ম্যালপ্র্যাকটিসেই প্রোটেস্ট থেমে গেলে হবে না। সিস্টেম তো একই থাকবে, একজন মিনিস্টারের রিপ্লেসমেন্টে তো সিস্টেম বদলাবে না। যে আসবে সেও তো এই একই সিস্টেমের অংশ। অ্যান্ড আই স্ট্রংগলি বিলিভ যে তোমরা পারবে। এ যুদ্ধে তোমাদের জয়ী হতেই হবে... ' 'তোমরা পারবে... তোমাদের জয়ী হতেই হবে...' শুনে চমকে উঠল অনুমিত। তার মানে তাকেও এই যুদ্ধের এক যোদ্ধা বলে স্বীকৃতি দিচ্ছেন জজসাহেব অনিন্দ্য বসু। তার রক্তের মধ্যে হাজারটা ঘোড়া দৌড়তে লাগল। অনিন্দ্যবাবু তারপর যেটা বললেন সেটা শুনে অনুমিত বেশ ঘাবড়ে গেল। সে যে এতটা গুরুত্বপূর্ণ মানুষ সেটা কখনও তার ভাবনাতেও আসেনি। অনিন্দ্যবাবু অনুমিতের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমাদের নেক্সট প্রোগ্রাম কী ? 'অনুমিত অবাক হয়ে তার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এর জবাবে সে যে কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। বাবা কী তাকে এই মুভমেন্টে আগাগোড়া জড়িয়ে দিতে চাইছে? মনে মনে সে বড় বিব্রত হয়ে পড়ল। সে তো এসব নিয়ে কিছু ভাবেইনি। ফেসবুকে মনোমিতার পোস্টটা দেখে একটা রোমাঞ্চ অনুভব করেছিল কী জানি কী কারণে। তারপর সেদিন সাদার্ন এভিনিউতে আচমকা ওর সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ায় কিছু কথাবার্তা হয়েছিল এ ব্যাপারে। মনে হল এরা ব্যাপারটার সঙ্গে ডিপলি ইনভলভড। একটা এক্সাইটমেন্ট তার মধ্যে সঞ্চারিত হল। মনে হচ্ছিল ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং। কৌতূহলবশত সে দিল্লী চলে গেল। গিয়ে দেখল এটা একটা ' বিলকুল আলাদাই ব্যাপার '।সে যাই হোক, অনুমিত কী বলবে ভেবে না পেয়ে বলল, ' না মানে... আমি তো অতটা জানি না... সি জে পি-র একজন অ্যাক্টিভিস্ট আছে এদিকে, তার কাছে শুনে কিছুটা জেনেছিলাম.... তারপর তো যন্তর মন্তরে গিয়ে... 'অনিন্দ্য বোস বললেন, ' সি জেপি-র মেম্বার এদিকে! কোথাকার ছেলে জান কি ? '----- ' ছেলে নয় মেয়ে ... '---- ' তাই ? '----- ' লেকের ওদিকে থাকে। মা চেনে ওকে। আর তুমি ওর বাবাকে চেন... '----- ' আচ্ছা ! কী নাম কী ? ' অনুমিত বিন্দুমাত্র কপটতা করল না। কোন গোপনীয়তার আবডাল রাখল না।বলল, ' রবীন্দ্রনাথ দত্ত। মেয়ের নাম মনোমিতা... 'অনিন্দ্যবাবু চোখ বুজে মনে করবার চেষ্টা করতে লাগলেন।---- ' উঁ... উঁ... রবীন্দ্রনাথ... কোথায় বল তো মিট করেছিলাম... চেনা চেনা লাগছে... 'অনুমিত আবার অকপটে বলল, ' ওই যে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলে ওদের বাড়ি... লেকের ওদিকটায়.... মেয়ে তখন বাড়ি ছিল না... 'এক লহমায় সব মনে পড়ে গেল অনিন্দ্য বসুর। তিনি বিস্ফারিত চোখে অনুমিতের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার মুখ অস্ফুটে বেরিয়ে আসল, ' ও মাই গুডনেস... হাউ অ্যামেজিং !রত্নাকর টার্নস টু বাল্মিকী। লঙ লিভ দা হিদারটু ইমপেরিশেবল ক্রিয়েচার অন আর্থ... কক্রোচেজ ... 'এসব কাল রাত্রের কথা। সুভাষ গিরি সকালবেলায় বারান্দায় বসে নারকেল মুড়ি খাচ্ছিলেন। বিজয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খবরের কাগজ পড়ছিল। সুভাষবাবু মুড়ি চিবোতে চিবোতে বললেন, ' যাকে চিনের দালাল, পাকিস্তানের দালাল বলছে তাকেই ফলের রস খাইয়ে অনশন ভাঙাচ্ছে... হোঃ 'সুভাষবাবু আর এক গাল মুড়ি মুখে দিলেন, ' এই এক কথা হয়েছে ডিপ স্টেট ডিপ স্টেট... ফরেন ফান্ডিং ফরেন ফান্ডিং... কচুর মাথা... খালি ভ্যানতাড়া... নে এখন সামলা... ' আর এক গাল মুড়ি মুখে দিলেন। বিজয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ' কিছু খবর পেয়েছ নাকি ? '----- ' কী ব্যাপারে ? '---- ' সেদিন ধর্মতলার জমায়েতে রিপোর্টারদের ওপর কারা হামলা করল... কোন ইনফরমেশান ছিল না পার্টির কাছে ?'বিজয় কাগজটা মেলে ধরে মন দিয়ে চোখ বোলাচ্ছিল। চোখ না সরিয়েই বলল, ' ভেতরের খবর এখনও কিছু পাইনি... অনেক অ্যারেস্ট হয়েছে শুনলাম। দেখছি... ' ----- ' তা দেখ... না না এসব তো ভাল নয়। খবর করার রিপোর্টাররা কি গদি মিডিয়ার মালিক ? সাধারণ খেটে খাওয়া কর্মচারি। ওরা কি পলিসি বানায় ? এসব তো মোটে ভাল নয়। খবর নাও দিকি। পার্টি জয়েন্ট প্রোগ্রাম করেছে, দায় তো নিতেই হবে.... না না এসব মোটে ভাল নয়... ' বিজয় মনে মনে ভাবল, খবর আর কোথায় নেবে ? আসল খবর কি আর পাওয়া যায় ? মুখে বলল, ' হ্যাঁ দেখছি... ' ( ক্রমশ ) ******************************************
    লেসার-ইভিল - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | আমাদের কোনো কোনো সাধাসিধে বালক ও বালিকারা লেসার-ইভিল ব্যাপারটা কী কিছুতেই বুঝে উঠতে পারতেন না। এমনকি এই কদিন আগে ডিম ছোঁড়া, নিগ্রহ নিয়ে বলার জন্যও অবধি তাঁরা সারা পাড়া কাঁপিয়ে আমাকে চটিচাটা বলে গেছেন। খুব সম্ভবত তাঁদের ধারণা ছিল, রামরাজ্য এসে গেছে, তাঁদের কেউ কিচ্ছু বলবেনা। তাঁরা লাহেক আলি, সৌমিত চট্টোপাধ্যায়, বা আফরোজ এর কেসগুলো একবার দেখে নিতে পারেন। আফরোজকে খালি পায়ে ধর্মতলায় হাঁটানো হচ্ছে, ডিম্মিডিয়া হুলিয়ে আনন্দ করছে। সৌমিত এর আগের মুখ্যমন্ত্রীকে 'চোর' বলেছেন, অপছন্দের লোকজনকে 'ছোটোলোক' বলেছেন, আজ স্রেফ একটা ছবি পোড়ানোর জন্য পুলিশ তুলে নিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে কৌতুহলোদ্দীপক ব্যাপার হল শ্রীলেখা মিত্রের। কদিন আগেই মাইক ধরে জনসভায় বলেছিলেন 'ডাইনি নাম নাম সালা চেয়ার থেকে... হিড়হিড় করে নামাতে হবে আমাদের, ২৬শে ইলেকশন'। ডিম্মিডিয়া খুবই আদর-আহ্লাদ করেছিল সে সময়। পুলিশ-টুলিশের কথা তো কেউ ভাবেও নি। তা, সে ইলেকশন হয়ে গেছে, নামানোও হয়ে গেছে, উনি যা চেয়েছিলেন তাইই হয়েছে। কিন্তু লাভটা হয়েছে এই, যে, এবার স্রেফ একটা পোস্টার ধরার জন্যই ওঁর নামে থানায়-থানায় এফআইআর। বাড়িতে লোক চলে যাচ্ছে হুমকি দিতে, আর সেই ডিম্মিডিয়াই তাকে বলছে জনরোষ।তো, সাধাসিধে সরলমতি বালক ও বালিকাদের বলি, এইটা হল, গ্রেটার আর লেসারের তফাত। ডিম ছোঁড়া নিয়ে যে আপত্তি করা হচ্ছিল, ডিম্মিডিয়ার গুজবের যে নিন্দা করা হচ্ছিল, সেটা তৃণমূলের পক্ষে থাকার জন্য না। গণতন্ত্রের জন্য। শ্রীলেখা মিত্রেরও জন্য। আমি চাই, শ্রীলেখা মিত্র আবার মঞ্চে উঠে মুখ্যমন্ত্রীকে অবাধে ডাইনি বলে সম্বোধন করুন। আমি নিন্দে করব, সেদিনও করেছি, কিন্তু সেজন্য পুলিশ, হুমকি, হামলা এসব শুরু হলে পক্ষেই থাকব। সেদিন যারা পাম্প দিয়ে ফুলিয়ে বেলুন করেছিল, তারা কিন্তু থাকবেনা। যদি এই ভয়াবহ দিন কাটে, তাহলে সেটা দিল্লির আরশোলা বা ইন্টারনেট জুড়ে প্রবল হল্লার জন্যই। দিল্লির আরশোলারা এই গ্রেপ্তার-টেপ্তার নিয়ে মুখ খুলেছে। আর যারা পাম্প দিয়ে ফুলিয়েছিল, লেসার-গ্রেটার বলে কিছু হয়না বুঝিয়েছিল, তারা দেখবেন চুপচাপ আছে। কেউ কালো ব্যাজ পরে নিচ্ছে, কেউ আর 'প্রতিবাদ' করে উঠতে পারছেনা, কেউ তো উল্টোদিকে নাম লিখিয়েই ফেলেছে।তাই আরও একবার স্পষ্ট করে বলি। গত কয়েকবছর ধরে ডিম্মিডিয়া যা করে চলেছে, সেটা নিছকই দালালি। যখন কাজে লেগেছে আপনাদের ব্যবহার করেছে। এখন দরকার ফুরোতেই 'জনরোষ'। অভিষেক ব্যানার্জিকে ডিম ছোঁড়া হলে ধেই ধেই করে নাচার কোনো কারণ নেই, ওটা গণতন্ত্রের হত্যালীলা। ওই জিনিস আপনার ঘাড়েই আসবে দুদিন পরে। যথেষ্ট বোকা বনেছেন, আমি তৃণমূলের থেকে কী পাচ্ছি নিয়ে গুছিয়ে কুচ্ছো করেছেন। আর বোকা বনবেন না। নিজের স্বার্থেই।
    গান শোনায় শৌখিনতা - ৩ : আসা - যাওয়ার পথে  - Tania Basu Dutta | বিকেলের ট্রেনে করে ফিরছিলাম .. বাইরে ভেজা ভেজা বৃষ্টি, জোলো ধূসর আকাশ। ।.... হালকা ঠান্ডা হাওয়া। ....ট্রেন মোটামুটি ফাঁকাই। ...আমিও বরাতজোরে জানালার ধার পেয়ে গেলাম . বোঝাই যাচ্ছে মঞ্চ কিভাবে প্রস্তুত। ...এবার "আসা-যাওয়ার পথে " playlist থেকে ( আমার ট্রেন জার্নির playlist) প্রিয় প্রিয় গানগুলো মঞ্চস্থ হলেই হয়। ...সম্প্রতি "আসা - যাওয়ার পথে " গানের তালিকায় নতুন এক গানের সংযোজন হয়েছে - Kolkata farewell। ...সেদিন সেই গানটাই শুনলাম প্রথমে - মৃদুমন্দ ইউকেলিলির তালে তালে  আমিও বেরোলাম ঘর ছেড়ে আর অভিমানী পিছুটান মুখ লুকায় এই বিষাদ স্নান কোন স্রোতের টান শুনতে চায় ঘরে ফেরার গান  এতো মায়া মাখা গলা। ...এতো আলতো আদরে গাওয়া গান। ....কি যে ভালো লাগলো কি আর বলি। ....এতদিন অবধি " আমাকে নাও " আমার কাছে এমন ধারা গানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় ছিলো। .... Kolkata farewell তা ছাপিয়ে গেলো ............... ট্রেন এ অনেকে লতা - আশা - কিশোর এঁনাদের গান শুনে থাকেন। ...ক্ষমা করবেন এঁনাদের গান আমাকে অনুপ্রাণিত করে না . Shisha ho ya dil ho akher tut jata hain। ....কেনো মশাই কেউ আমাকে ভালোবাসলো না তারজন্যে আমার মন শিশার মতো খান খান হয়ে যাবে কেনো ?? আর আমাকে সবাই ভালোবাসবে এমন মাথার দিব্যিই বা কে দিয়েছে ?? কি frustrating গান মশাই ! Kora kagaz tha iye dil mera। .....ব্যাস তুমি এসে কিসব নাম টাম লিখলে ওমনি মন একেবারে চাঙ্গা হয়ে উঠলো। ....কোনো মানে হয় ?? আমার মনের ভালো থাকা খারাপ থাকার রাস তোমার হাতে থাকবে কেনো ভাই ?? সে তো আমার একান্ত সম্পদ ! তাই ট্রেন যখন দুরন্ত গতিতে ছোটে আমি শুনি সুমনের -  তোমাকে ভাবাবোই ভাবাবো সেতুমি মুখে যাই বলোনা তোমাকে আমি পথে নামাবো যতই ঘরে বসে থাকো না  কথাপ্রসঙ্গে বলি, সম্পর্কের গানই যদি হয়, kai poche থেকে rishto ka manja আমার বেশ ভালো লাগে . Celine Dion এর that's the way it is, a new day has come ও হৈহৈ করে রয়েছে এই তালিকায়। এসবই রয়েছে " আসা - যাওয়ার পথে "র তালিকায় ......সবচেয়ে বড় প্রেমিক তো কোহেন ! ভালোবাসা তো এমনই হওয়া উচিত -  She broke your throne and she cut your hair/and from your lips she drew the hallelujah  And even though it all went wrong I'll stand before the Lord of song With nothing on my tongue but hallelujah  But all I've ever learned from love Was how to shoot at someone who outdrew ya It's a cold and it's a broken Hallelujah  আর ভালোবাসা মানেই "আসা - যাওয়ার পথে " সুমনের - " তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা " অসাধারণ লাগে শহীদ কাদরীর এই কবিতার প্রতিটা লাইন প্রতিটা শব্দ. .। .আর সুমনের গান .  ট্রেন - যাত্রার যাপনশৈলী তে "আসা - যাওয়ার পথে " নিত্য দিনের সহযাত্রীর মতো। ....যার সঙ্গে ঘন্টা খানেক কেটে যায় বেশ। ...তারপর কোনো এক রেল স্টেশনে হাসিমুখে নেমে যায় সে। ....আবার দেখা হওয়া অনিবার্য - এই আশ্বাস দিয়ে ...........
  • ভাট...
    comment | আহ এই মেয়েটা পিওর লাভ
     
    commentKshtriya Rajbanshi | সমস্ত বাংগালি ও সমস্ত ভারতবাসী এবং বিশ্ব বাসী সবাই কান খুলে শুনে রাখো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মহানায়ক বা সেনা পতি ছিলেন মহরাজা শ্রী শ্রী নিপেন্দ্র নারায়ণ ভূপবাহাদুর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহানায়ক ছিলেন মাহারাজা শ্রী শ্রী জগদীপেন্দ্র নারায়ন ভূপবহাদুর।.................জার্মানির দালাল বেইমান নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু কে হত্যা করেছেন মহারাজার ভাই কুমার ইন্দ্রজীৎ নারায়ণ ও নারায়ণী সেনা। https://www.facebook.com/permalink.php?story_fbid=pfbid023Pjv6rX4VqCDW5y1jHrm9sK7LwWXJ12pZzE4gRkqYA8FNgZcMD3xJuLCpC7m7hSdl&id=100068551760426  
    commentনর্থ গুয়াহাটি |
    "২৮ জুলাই ২০২৬ ১৫:১২"
    ওই ওই ওই। ৯৯১/- + ২০।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত