এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    বিষণ্ণ আলপনা - মোনালিসা চন্দ্র | মূল ছবি: লেখিকা আট বছর আগের কথা। জীবনে প্রথমবার উত্তর আমেরিকায় পা দিতে চলেছি। ভিতরে উত্তেজনার গুরুগুরু রব। মহাদেশটি আমেরিকা হলেও গন্তব্য আমাদের কানাডা।দিল্লি থেকে চড়ে বসেছি বিমানে। সে পক্ষীরাজ ননস্টপ ষোল ঘন্টা উড়ান শেষে আমাদের নিয়ে গিয়ে ফেলবে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে। সেখান থেকে দ্বিতীয় এক পক্ষীরাজ পৌঁছে দেবে আমাদের ফাইন্যাল গন্তব্যে। ভোর ছটায় দুগ্‌গা দুগ্‌গা করে দিল্লি থেকে শুরু হলো উড়ান। প্লেনে উঠে জানলার ধারে বসতে না পেলে আকাশে ওড়াই মাটি হয় আমার। ফলে টিকিট কাটার সময় আলাদা পয়সা গুণে জানলার ধারের সিট বাগিয়েছি। সেখানে গুছিয়ে বসে চোখ সেঁটে দিই জানলায়। প্লেন ছাড়লে কয়েক মিনিটের মধ্যেই দিল্লি দূর অস্ত হয়ে গেল। প্লেন ঢুকে গেল মেঘের রাজ্যে। এইখানে পৌঁছে গেলে বেশিরভাগ মানুষ জানলা থেকে মুখ ফিরিয়ে সামনে রাখা টিভি স্ক্রিনে মন দেয়। আমার উলটোটা হয়। জানলায় মনযোগ তখন আরও বাড়ে আমার। জানলার বাইরের সাদা মেঘের রাজ্যটাকে দেখে মনে হয় রূপকথার দুধসাগর। আর নিজেকে লিটল মারমেইড। হ্যাঁ, পঞ্চাশ পেরিয়েও এই ফ্যান্টাসিটুকু ধরে রাখতে পেরেছি বলে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়াই। পক্ষীরাজ স্বদেশের সীমা পার হলেন উত্তর-পশ্চিম দিকে মুখ করে। তারপর পাকিস্তানকে বাঁদিকে রেখে, আফগানিস্তানের সীমানা ছুঁয়ে, তাজিকস্তান আর কিরিঘিজস্তান নামের ছোট ছোট দুটো দেশকে পার হয়ে পড়লেন গিয়ে তিনি কাজাখস্তানের আকাশে। বলছি বটে, এটা পার হলেন, ওটা পার হলেন, তবে সেসব চোখে দেখে বোঝা নয়। টিভির মনিটরে যাত্রাপথের ম্যাপ খুলে রেখেছি বলে জানতে পারছি। ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকলে দুধসমুদ্র একসময় সম্পূর্ণ হাপিস হয়ে যায়। চারদিকে তখন শুধুই মহাশূন্যের গাঢ় নীলিমা, আর নিচে তাকালে তিরিশ বত্রিশ হাজার ফুট নিচে পৃথিবীর পৃষ্ঠপট। আমাদের যাত্রার দিনে ভাগ্য বড় সহায় ছিল। নিচে তাকিয়ে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম ‘পৃথিবীর ছাদ’ পামিরকে। আকাশপথে পামির গ্রন্থিকে এমন স্পষ্ট দেখতে পাওয়া এক লাইফটাইম অভিজ্ঞতা। তবে সে দৃশ্যের বর্ণনা করে এখন ফোকাস-চ্যুত হতে চাইছি না। আজ অন্য একটা জিনিসের কথা বলতে বসেছি। কাজাখস্তান এক বড় দেশ, আয়তনে ভারতেরই মতো। তাকেও দু-আড়াই ঘন্টায় পার হয়ে পক্ষীরাজ এবার চললেন সাইবেরিয়ার ওপর দিয়ে। কখনো না গিয়েও এই সাইবেরিয়া বড় চেনা জায়গা আমার। ছেলেবেলায় সোভিয়েত দেশের (বর্তমান রাশিয়া) নানান বই আর পত্রিকার অনুবাদ হাতে আসত আমাদের। দামে সস্তা, অথচ ছবিতে লেখাতে অসাধারণ সেই সব বইয়ের কল্যাণে সাইবেরিয়া বড্ড পরিচিত হয়ে গেছিল আমার। সেই সাইবেরিয়ার ওপর দিয়ে উড়ে চলেছি ভেবে এই বয়সেও গায়ে কাঁটা।একসময় সেই সাইবেরিয়াকেও পার হয়ে পক্ষীরাজ পা দিলেন আর্কটিক সার্কল বা উত্তর মেরুবৃত্তে। নিচে তখন আর্কটিক ওশান বা সুমেরু সাগর। যাত্রাপথের মাঝামাঝি সময় সেটা। এই সময়েই দেখা পেয়েছিলাম সেই জিনিসের যার কথা আজ বলতে বসেছি। সুমেরু সাগর যখন পার হচ্ছি চারিদিকে তখন ‘চোখ যায় যদ্দূর, সোনা সোনা রোদ্দুর...’। নাহ, একটু ভুল হল, আসলে রুপো রুপো রোদ্দুর। ঝকঝকে নীলাকাশ থেকে ঠিকরে আসা রজতবর্ণ আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে চরাচর। বিমানের ডবল কাচের জানলা চুইয়ে সে আলোর বন্যা ঢুকে যাচ্ছে বিমানের অন্তঃস্থলে, যেখানে তখন সুষুপ্তির রাজ্য। সেই রাজ্যে আলো এক উপদ্রব। লম্বা লম্বা ফ্লাইটের যাত্রীরা সাধারণত বিমানযাত্রার সময়টুকুর সদব্যবহার করে নিদ্রা দিয়ে। যাদের নিতান্ত ঘুম আসে না তারা চোখের ওপর আই মাস্কটি বেঁধে কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করার পর ‘ধুত্তোর’ বলে নিজস্ব টিভি মনিটর খুলে বসে সেখানে বেড়ে রাখা পঞ্চাশ ব্যঞ্জনের কোনও একটাকে ধরে খেতে থাকে। বাইরের তীব্র আলোর বন্যা যাত্রীদের সুষুপ্তির ব্যাঘাত ঘটায় বলে সবাই জানলার শাটার ফেলে দেয়। কিছু কিছু ‘হাইফান্ডা’র প্লেনে শাটারের বদলে জানলার নীচে থাকে একটা করে বোতাম, যেটাকে টিপে কাচটাকে প্রয়োজন মত হালকা থেকে গাঢ় নীল করে নেওয়া যায়। এতে করে বাইরেটা খানিকটা দেখাও যায় আবার বিমানে বেশি আলো ঢুকে পড়াটা আটকানোও যায়।কিন্তু আমার মত একজন ‘অকেশনাল ফ্লায়ার’, দুচোখে যার সর্বগ্রাসী খিদে, তার অমন ‘কম্প্রোমাইজড দেখা’-য় চলবে কেন? যেটার যে রঙ তাকে সেই রঙেই যে দেখতে হবে আমাকে। অতএব জানলার কাচ নীল করি না আমি। বিমানবালারা বার তিনেক এসে আমাকে ‘অনুরোধ’ করে যায় জানলা নীল রাখার জন্যে। কিন্তু নীল কাচের মধ্যে দিয়ে বাইরেটা দেখে সুখ হচ্ছে না বলে প্রতিবারই আমি কাচের রঙ ফের সাদা করে দিই। মনে মনে ঘুমন্ত লোকগুলোকে বলি, আর কত ঘুমুবি বাপু? ওঠ না এবার। মাটিতে থাকলে এখন তো কাজের জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করতিস। বারকয়েক বিমানবালাদের সঙ্গে জানলা নীল সাদা করার লুকোচুরি খেলার পর দেখি আমার জানলা আর সাদা হচ্ছে না। বুঝলাম মুখের কথায় কাজ হচ্ছে না দেখে এবার তাঁরা অন্যভাবে টাইট দিলেন আমায়। এ জিনিস কন্ট্রোল করার একটা মাস্টার সুইচ জাতীয় কিছু নিশ্চয় তাদের কাছে আছে, সেখানেই কলকাঠিটি তাঁরা নেড়েছেন। অতএব উপায়ান্তর না দেখে নীল জানলা নিয়েই খুশি থাকতে হয় এবার আমার দুখী মনুয়াকে। বিমানবালাদের দোষ দিই না আমি। সবাই চায় নিজের কাজ কমাতে। লোকে পড়ে পড়ে ঘুমুলে ‘চা খাব, জল খাব’ বলে জ্বালায় কম। অতএব আমার মত একটি দুষ্টু মধ্যবয়সিনীকে ঢিট করার জন্য ওটুকু ভদ্র চেষ্টা তারা করবেই। নীলকাচ সাদাকাচ নিয়ে এত ব্যাখ্যান কেন দিতে গেলাম, এবার সেই কথায় আসি। বিমানবালাদের প্যাঁচে পড়ে নীল কাচের মধ্যে দিয়েই বাইরেটা দেখতে দেখতে চলেছি। হঠাৎ দেখি নিচে পৃথিবীর বুকে বিরাট এক আলপনা! নিচে তো সমুদ্র, সেখানে আলপনা দেবে কে! চশমার কাচ মুছে টুছে আবার দেখি। নাঃ, আলপনাই বটে! কাকে শুধোই। সঙ্গীটিকেই ঠেলে তুললাম। দুজনে মিলে অনেকক্ষণ ধরে দেখেশুনে বুঝলাম ওগুলো আলপনা নয়, ওগুলো আসলে বরফ। সমুদ্রে ভাসমান বরফ। গাঢ় নীল সাগরজলে ভাসছে সাদা সাদা বরফের ডেলা। হয়ত স্রোতের কারণে কিংবা বাতাসের প্রভাবে অথবা ‘সী আইসে’র মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া জাহাজের কারণে সমুদ্রে তৈরি হয়েছে ওইসব ‘আলপনা’। ওই আলপনার শোভা দেখতে দেখতে আর জিনিসটা আসলে কী বুঝতে বুঝতে এতটা সময় চলে যায় যে ছবি তোলার কথাটাই মাথা থেকে হাওয়া হয়ে যায়। মনে যখন পড়ে তখন হুমড়ি খেয়ে নীল কাচের মধ্যে দিয়ে যা পারি ছবি তোলার চেষ্টা করি, কিন্তু ততক্ষণে বহু ভাল ভাল আলপনা পেছনে ফেলে এসেছি। এইবার ওই ‘সী আইস’ বিষয়ে কিঞ্চিৎ কথা। আজকের নিবন্ধে আসলে সী আইসের কথাই বলতে বসেছি। তার আগে এতক্ষণ যা করলাম তাকে বলে ধান ভানার আগে শিবের গীত। অবস্থানগত বিশিষ্টতার জন্য সুমেরু সাগর বছরের অনেকটা সময় বরফে ‘সরে’ ঢাকা থাকে। বরফের সেই সরই হল - সী আইস। এ সরের বেধ সাধারণত দু থেকে চার মিটার হয়ে থাকে। সুমেরুতে যখন ‘সামার’, অর্থাৎ জুন থেকে আগস্ট, তখন সী আইস একটু একটু করে গলে গিয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। সেই ভাঙা টুকরোগুলো ভেলার মত ভাসতে থাকে সমুদ্রে। ভাসমান এই সী আইস কিন্তু আইসবার্গ নয়। আইসবার্গ বা হিমশৈল সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। মেরুপ্রদেশে জমে থাকা বরফের পাহাড় থেকে একটা চাঙড় কোনও কারণে ভেঙে সাগরের জলে ভাসতে থাকলে সেটা আইসবার্গ। আইসবার্গের খুব কম অংশ সমুদ্রের ওপর জেগে থাকে, বেশিরভাগটাই ডুবে থাকে সমুদ্রের নিচে। এই কারণেই বহু পরিচিত প্রবাদবাক্যটির জন্ম, ‘এ আর কী দেখছ? এ তো জাস্ট ‘টিপ অব দা আইসবার্গ।’ অর্থাৎ বিপদের খুব অল্পই দেখতে পাচ্ছ, আসল বিপদ আরও অনেক বেশি ইত্যাদি। টাইটানিক ফিল্মের দৌলতে আইসবার্গ আজ আমাদের খুব চেনা শব্দ। কিন্তু সী আইস ততটা নয়। এবার আনতে হবে সেই ক্লিশে শব্দখানা - ‘বিশ্ব উষ্ণায়ন’। কোনও শব্দ, তা সে যত ধারালো হোক, হাজার ব্যবহারে তার ধার কমবেই। এই শব্দটার হয়েছে সেই দশা। শুনে শুনে কানে এমন ঘ্যাঁটা পড়ে গেছে আমাদের যে বুকে আর ধাক্কা মারে না। কিন্তু বুকে ধাক্কা মারুক বা না মারুক, বিপর্যয় যা ঘটার তা ঘটেই চলেছে নীরবে নিভৃতে। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন বিগত চল্লিশ বছর ধরে সুমেরু মহাসাগরের বরফের পরিমান ক্রমাগত কমছে, কমছে সী আইসের পরিমানও। কমার হার প্রথম দিকে যা ছিল শেষের দশকে তা বেড়ে হয়েছে বিপজ্জনক রকম বেশি। সী আইসের যে আলপনা আমরা দেখতে পেলাম, আর দু একটি দশক পরে লোকে তা দেখতে পাবে এমন সম্ভাবনা নাকি খুব কম। আলপনা, সৌন্দর্য এসব হল গিয়ে ‘ভাবের কথা’। ভাবের কথা নিয়ে মাথা ঘামানোর লোকের সংখ্যা জগতে বড় কম। লোকে তাই এখনও নির্বিকার। তবে সী আইস বস্তুটি আদপেই ‘ভাবের কথা’ ছিল না, বরং অত্যন্ত কাজের কথা ছিল। সমুদ্রপৃষ্ঠের এই বরফ আস্তরণ আসলে একটা আয়নার মত। সে আয়না খুব বড় একটা কাজ করে। সূর্যের তাপকে সে প্রতিফলিত করে ফেরত পাঠিয়ে দেয় মহাশূণ্যে। ফলে তেতে উঠতে পারে না সুমেরুসাগরের জল। গ্লোবাল ওয়ার্মিঙের ফলে সবচেয়ে বেশি ভুগছে মেরু অঞ্চল। সাগরে বরফের সর আর জমতে পারছে না তেমন করে, কিংবা জমলেও তত পুরু হচ্ছে না। ফলে যূর্যের তাপে তেতে উঠছে সুমেরুসাগরের জল। সাগরজলের সেই বর্ধিত তাপমাত্রা একটু একটু করে গলিয়ে দিচ্ছে যুগ যুগ ধরে উত্তরমেরুতে জমে থাকা প্রাচীন বরফ ভাণ্ডারকে। ন্যাশনাল স্নো এন্ড আইস ডেটা সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী ২০১২ সালে সুমেরু সাগরের এই সী আইস এর পরিমাণ নাকি নেমে গিয়েছিল সর্বকালীন তলানিতে। ২০২৬ এর জুন মাস অবধি যা গ্রাফ, তাতে সী আইসের পরিমাণ এখনো ২০১২ থেকেও পিছিয়ে আছে, যদিও বছর এখনো বাকি। কিন্তু সেই কমতির বছরেও মার্চ-এপ্রিল-মে মাসে এই বছরের তুলনায় অনেক অনেক বেশি সী আইস ছিল সুমেরু সাগরে। এ বড় সুখের কথা নয়। এ ভবিতব্য আটকানোও সহজ কাজ নয়। যাঁরা চেষ্টা করলে এ বিপর্যয় খানিকটা কমাতে পারতেন, অর্থাৎ যাঁদের হাতে এই মুহূর্তে পৃথিবীর রাশ, তাঁরা কেউ এখনও নড়েচড়ে বসছেন না। কেন বসছেন না সে উত্তর খুঁজতে বসলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোবার সম্ভাবনা। অতএব ও প্রসঙ্গ থাক। রাজনীতিকদের মাথা ঘামানোর বিষয়ের তালিকায় ‘পরিবেশ’ সবসময়েই একেবারে শেষের দিকে থাকে এটা একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়। গ্রেটা থুনবার্গেরাই কেবল গলা ফাটিয়ে মরে।জানিনা আজ আবার যদি পক্ষীরাজের পিঠে চেপে জুন মাসে সুমেরুসাগর পেরোতে যাই, সমুদ্রের বুকের সেই চোখজুড়োনো আলপনা আবার চোখে পড়বে কিনা, কিংবা পড়লে কতটা পড়বে। সঙ্গে রইল নীল কাচের বাধা ডিঙিয়ে বিমান থেকে তোলা বিষণ্ণ সুন্দর সেই ছবিগুলোর কয়েকটি...
    হারিয়ে যাওয়া টিলার গল্প - অদিতি দাশগুপ্ত | ছবি: রমিত আমি এখন যতটা বেঁটে, ছোটবেলায় তো তার চেয়েও বেঁটে ছিলাম, তাই নদীর সাদাটে হলুদ বালি পেরিয়ে যে লাল কাকরের টিলাগুলো ঢেউ এর মত ওঠানামা করতে করতে নীল আকাশের দিকে রওনা হত, সেগুলির উপর উঠতে পারতামনা। চড়ুইভাতির দাদারা কেউ না কেউ পিঠে নিত। ওগুলি মাথায় দাঁড়ালে দূরে নীল আকাশের গায়ে সাদা হলুদ ছোট ছোট বাড়ী, ইলেকট্রিকের পোস্ট,টানা চলে যাওয়া তার, তারের উপর বিন্দু বিন্দু কালো পাখি দেখা যেতো। খুব ঘন করে আসা মেঘের দিনে তো চড়ুই ভাতি হতোনা, তখন যদি বেড়াতে যাওয়া হত তারের উপরে গাছের উপরে সাদা সাদা বিন্দু দেখা যেত। হঠাৎ তারা একসাথে ঝপ করে ঘন নীল মেঘের গায়ে ভেসে উঠত। আকাশে উড়িছে বক পাতি। শ্যামলী দি ইস্কুলে ‘নীল অঞ্জন ঘন পুঞ্জ ছায়ায়’ শিখিয়েছিলেন। টিলার উপর দাঁড়িয়ে দু-হাত ছড়িয়ে নাচ করতে ইচ্ছে হত। এখন আর সেই টিলাগুলো তেমন উঁচু দেখায় না। আমি মাথায় একটু, আর চওড়ায় বেশ অনেকটা ছড়িয়েছি বলে নয়, সেগুলি কাটা পড়েছে বলে। রাস্তা আর বাড়ী-ঘর তৈরিতে ওরা ধীরে ধীরে মাটিতে মিশে গেছে। ওদিকে রিং রোড হয়েছে। শান্তিনিকেতনের মত এখানেও এখন হাট বসছে। কিছু মাটির গয়না,গামছার সাথে চীনদেশের প্লাস্টিকের সস্তা পুতুল,গাড়ি, মাথার ক্লিপ ও পাওয়া যায়। জিলিপির পাশেই মস্ত বড় চিপসের প্যাকেটে র মালা ঝোলে। মোটর গাড়ি, মোটর সাইকেলে চড়ে অনবরত মানুষ ছুটে আসে ফি শনিবার। পথের ধারে বুনো ফুলের গন্ধ আর তাই তেমন পাওয়া যায়না। লাল ধুলোয় থার্মোকলের গুঁড়ি, ছেঁড়া প্লাস্টিকের টুকরো মিশে থাকে। ওদিকে নদীর ধারটি আলিশান সাদা পাথরে বাঁধিয়ে আলোর মালায় সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে গঙ্গা আরতি শুরু হবে কদিন পরেই--- যদিও নদীটি গঙ্গা নয়। তার মাসতুতো বোনও নয়। শহরের মোড়ে, রাস্তায় আলোচনা চলে এ নিয়ে। এই উন্নতি নিয়ে। তাহলে জাতে উঠল এ শহর --- উন্নয়নের পথে। নদীর ধারে ঝুপড়ি ঘরের মানুষগুলি আর মাছ ধরেনা তেমন, গান টান ও তেমন ভেসে আসেনা ওদিক থেকে সন্ধ্যার পর। পাকা বাড়ি উঠেছে নদীর বাঁধানো পাড়ের একটা দিক জুড়ে গায়ে গায়েই। ওদিকের ছেলেমেয়েরা এখন ডেলিভারি বয় এর কাজ করে অনেকেই। রাত দিনের ফারাক ঘুচেছে। রিল বানায় পাশাপাশি। টাকা আসে ভালো। নদী শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকে ধুধু করা কালচে লাল পাথুরে জমি আর দেখায় যায়না। দেখা যায় না তাকে ভেদ করে যাওয়া কু- ঝিকঝিক রেলগাড়ির আলো। ফ্ল্যাটবাড়ি উঠেছে অনেক, রিসর্ট হয়েছে একটা – রিভার ভিউ। সুইমিংপুল আছে। পাথরের ফাঁকে ফাঁকে তির তির করে যে জলের ধারাগুলিতে আমরা মেঘলা দুপুরে বসে বসে আঙুল ছোঁয়াতাম, সেই ভূমিজল হারিয়ে গেছে কবেই। নদীতে নামতে ভয় হয়। বালি চোরেরা না জানি কোথায় মরণ কুয়ো খুঁড়ে রেখেছে! এইতো সেদিন, ষোলো বছরের নওল কিশোর মামাবাড়ি এসে নদীতে নামলে, তারপর গিয়ে পড়লে সেই মরণকূপে! হায়!আমরা আর আমাদের অনেক পরে জন্ম নেওয়া ওই ‘ওরা’ একই শহরের ঠিকানা লিখি। ঠিকানায় রাস্তা, বাড়ী, শহর, জেলা, পিন কোড লিখতে হয়। কিন্তু, তাতেও কি পুরো ঠিকানা বোঝা যায়? সময়? সে যদি বাদ পড়ে তাহলে কি সত্যি সত্যি পুরো ঠিকানা হলো? যে রাস্তায় আমরা ইস্কুলের,পাড়ার বন্ধুরা খেলা করেছি সেই রাস্তার নামটি লিখে দিলেই সে কি একই থাকে বছরের পর বছর? না। থাকেনা। এই না থাকার কতকটা ভালো দিক আছে। কাঁচা নর্দমা, কাঁচা রাস্তা, রাতে অন্ধকার মোটেও ভালনা। চওড়া সুন্দর রাস্তাগুলি, উন্নত পয়ঃপ্রণালী দেখেই তো আমরা সিন্ধু দেশের সেই কবেকার জীবনকে উন্নত সভ্যতা বলে এখনো মানছি। কিন্তু পাড়ার মাঠটি যদি হারিয়ে যায়? যদি মস্ত বড় সেই বটেশ্বর লুটিয়ে পড়ে কোনো আসমান ছোঁয়া হোটেলকে জায়গা করে দিতে? যদি পাশের বাড়ির আম কাঁঠাল ছাওয়া বাড়িটি ভেঙে এমন এক ফ্ল্যাটবাড়ী ওঠে যে আমার জানলার উপর হামলে পড়ে এসে এক বিন্দু সবুজকেও জায়গা না দিয়ে? যদি বাড়ির দাম ঠিক হয় কেবল বর্গফুটের হিসেবে? তাহলে কোনো পাড়ার, তার রাস্তাঘাটের প্রকৃতি, পরিবেশ কি একই থাকে? হারিয়ে যাওয়া মাঠ, বটেশ্বরের সাথে সাথে যদি ছোটদের বিকেলের খেলা, নিজেদের ঝগড়া ঝাঁটি ভাব ভালোবাসার জগতটাও হারিয়ে যায় শ্রেষ্ঠ হবার অসম্ভব নেশায়? থাকে কি তখনও তাদের একই ঠিকানা? ঠিকানা আর মন দুটোরই প্রকৃতির পরিবর্তন হয়না কি? সে রাস্তায় তো আর শিশু রইলোনা – বোকা, চালাক, হিংসুটে, হাসকুটে, শান্ত, মারকুটে – যারা হাসে, কাঁদে, চেঁচায়, মন মরা হয়, ঝগড়া করে নিজেদের মর্জিমত? কই তারা? সেই তারা, যারা ইস্কুলে ক্লাসঘরের জানালা দিয়ে হাঁ করে বাইরে তাকিয়ে থাকত কোনও এক আশ্চর্য পাখি দেখে, যারা পথের পাশের পুকুরটিতে সোনা ব্যাংদের খেলা দেখতো অবাক হয়ে, মাঠে চরে বেড়ানো নাদুস নুদুস কালো ছাগলের কুচি কুচি ছানা জন্মানোর দৃশ্য দেখে বিস্ময়, ভয় আর আনন্দের এক জগাখিচুড়ি অনুভূতিতে কেঁপে কেঁপে উঠত? চনমনে গাছপালা, তড়বড়ে জীবজন্তু, কিলবিলে পোকা মাকড়ের সাথে চলতে ফিরতে গল্প করতে করতে জীবনের খেলাকে গ্রহণ করত সহজ ঔদাসীন্য আর ভালোবাসায়? একটি ঠিকানা কি কেবল একটা রাস্তা, একটা বাড়ি, একটা শহর একটা দেশ মাত্র? তার প্রকৃতির রং নয়? শিশুর রং নয়? বাড়ির রং নয়? হয়তো নয়। কিম্বা আবার হয়তো। কিছু কিছু ঠিকানা, শিশুর রং, বাড়ির রং পাড়ার রং এর কথা বলে তো! তবে সে রং স্বাভাবিক, সাবলীল জীবন যাপন থেকেই যে সবসময় উঠে আসবে- এমন ভাবলে ঠকতে হবে! সে রঙ বিষাদের। কত কত দেশ, শহর, রাস্তার ঠিকানা খুঁজতে গিয়ে তুমি গিয়ে দাঁড়াবে ধ্বংস স্তূপের সামনে। সেখানে শিশুরা রাস্তায় বাগানে ছুটে বেড়ায় না, রক্তাক্ত ব্যান্ডেজে ঘা ঢেকে চোখে জল, হাতে বাটি আর এক পেট খিদে নিয়ে এসে দাঁড়ায় ত্রাণের গাড়ির সামনে। যারা খুব বড় বড় হোমরা চোমরা মানুষ, যারা প্রকৃতি নিয়ে সম্মেলনে উঁচু চেয়ারটিতে গিয়ে বসে, তারা জানে ওই চেয়ারটা ধরে রাখতে গেলেও বাহুবল সবচেয়ে দরকারী --- প্রাকৃতিক সম্পদ, মানব সম্পদকে নিজের কব্জায় আনতে। আর তাই নিজের স্বাভাবিক ঠিকানাতে কোনো কোনো জায়গা আর তার মানুষ জনকে আর ধরা যায়না! ইউটিউবে তাদের ‘একদা’ হিসেবে মন খারাপ করে খুঁজতে হয়। আফগানিস্তান, সিরিয়া, প্যালেস্তাইন…কত কত ঠিকানা আর কতই না সব ভূ-রাজনীতি!হয়তো আমরা কোনোদিন খুঁজতে যাবো এভাবেই গ্রেট নিকোবরের ঠিকানা! কত কী না হবে সেখানে! আচ্ছা, কাদের জন্য হবে ? সেখানের মানুষদের জন্য? কি সুন্দর ছিল গাড়ওয়ালের সেই শহরটা- তেহরি। ভাগীরথী আর ভিলাঙ্গনা ঘিরে রেখেছিল তাকে। ইস্কুল, কলেজ, ঘড়িঘর -তার বাজার,দোকান! সব গিলে খেলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। চোখে জল নিয়ে বাড়িঘর আর জীবনকে ডুবে যেতে দেখলে মানুষ, একটু দূরের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে। তাদের পুনর্বাসন হল নিউ তেহরিতে। সে ঠিকানা আর পুরোনো তেহরির ঠিকানা কি এক হয়? হয়েছে এমন কোনোদিন? তেহরি লেকে জেগে ওঠে ঘড়িঘরের চূড়া। কাপ্তাই লেকের তল থেকে মাঝে মাঝে উঁকি মারে পুরোনো চাকমা রাজার বাড়ির মাথা খানি। তেহরি বা কাপ্তাই লেকে বোটিং করতে করতে কারুর কারুর হয়তো মন খারাপ হয়।তবে সব মানুষ নিজেদের ছেড়ে দেয়না খড়গধারী উন্নয়নের হাতে। তারা কখনো ‘চিপকে’ ধরে তাদের গাছপালাকে, প্রাণ ও দেয় কত জনা – সেই যে সতেরশো তিরিশ সালে বিষ্ণোইদের মত। তারা জানে সাধারণ মানুষের জীবন- জীবিকা, আচার- বিচার, ভাষা, জ্ঞানভান্ডার আর সর্বোপরি তাদের খুশি কেড়ে নিয়ে সত্যি কোনো উন্নয়ন হয়না। যেটা হয় সেটা অন্য কারো আরাম আর খুশির স্বার্থে বলিদান। যেমন দিল্লিতে আরও বিদ্যুৎ দিতে গিয়ে ঘর ছাড়া হল তেহরির মানুষ। কর্ণফুলীর উপর বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ বানাতে ঘর ছাড়া হোল চাকমারা। এ ট্র্যাডিশন তো সেই কবে থেকেই চলছে! সেই যে গ্রাম আর অরণ্যের মধ্যে একটা বিভাজন করে দেওয়া হলো! ‘গ্রাম’ মানে উন্নত, শিষ্ট লোকের আবাদ। আর ‘অরণ্য’ মানে যাকে রণে জয় করা যায়না, ‘সভ্যতার’ হাতের বাইরে, অন্ধকার অশিষ্ট লোকের আড্ডা। তাই খান্ডব দহনে অরণ্যের পশুপাখি, সাথে সাথে বনের মানুষ গুলো পুড়ে মরলেও সেটা নিতান্তই স্বাভাবিক ঘটনা। জতুগৃহে পঞ্চ পাণ্ডব পুড়ে মরেনি শুনে আমরা খুশি, ‘অন্য’ কারা পুড়ে মরলো - তাই নিয়ে কে আর চোখের জল ফেলে? আসলে প্রকৃতির প্রতি প্রভুর মনোভাব, প্রকৃতি আঁকড়ে থাকা মানুষের প্রতি মনোভাবেও নিজেকে বুঝি বিস্তার করে। অরণ্যের অধিকার তাদের নয়, অরণ্যের সম্পদ তাদের নয়! নদী- সমুদ্র আমরা যেমন খুশি ব্যবহার করব, তাতে নদীর ধারের, সাগর পাড়ের মানুষের কী ক্ষতি হল, বা, এ নিয়ে তারা কী ভাবে – তা জানতে আমাদের ক্ষমতাধারীদের বয়েই গেছে! সাহেবরা তো রেলপথ আর নানান লাভজনক কাজে আমাদের বনগুলি উজাড় করে ফেললে। আবার বন সংরক্ষনের নামে আইনও চালু করলে- বনের মানুষের অভিজ্ঞতা বা মতামতের ধার না ধরে! উল্টে আবার কেবল বনের ফলমূল,পশুপাখির উপর নির্ভর করে থাকা শবরদের মত বনবাসী কিছু গোষ্ঠীকে ‘জন্ম অপরাধী’ বলে দাগিয়ে দেওয়াও হোল। কাজ তাতে আরও ভালো এগোলো! যে গাছ যে উপায়ে লাগিয়ে বন সাজালে তারা, তার সাথে এতদিন ধরে চলে আসা প্রকৃতি- মানুষের জীবনচক্রের যোগ তেমন কই? দেশ স্বাধীন হলেও সেই মনোভাবই কাজ করতে থাকলো। বনের মানুষ উচ্ছেদ হল সংরক্ষণের নামে, এদিকে চোরা শিকারির লুণ্ঠন ও চলতে থাকলো। উন্নয়নের স্বার্থে গাছ লাগানো থেকে নদীর জল ব্যবহার -কোনোটাই তেমন স্থানীয় প্রকৃতি-মানুষ নির্ভর জীবন আর জীবিকার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগালোনা। সেই মানুষদের ‘পবিত্র অরণ্য’ বা ‘পবিত্র জলাভূমি’ আগের জমানার মত স্বাধীন জমানার হর্তা কর্তাদের কাছেও অশিক্ষিতের প্রাচীন সংস্কার হয়েই রয়ে গেল। ধান গমের নানান দেশীয় রকম কেমন ভাবে হারিয়ে গেলো, সাথে সাথে হারিয়ে গেলো সেই লম্বা লম্বা খড়, যা দিয়ে ছাওয়া মাটির বাড়ি শীতে গরম আর গরমে ঠান্ডা থাকে – তার গল্প ও তো মুখে মুখে ফেরে। এদিকে বাজার ভরানো সস্তা কাপড় চোপড় তৈরির নেশায় দূষিত হল জল, হারালো মাছ আর জেলেদের জীবন! ওদিকে যারা জীবনে লাঙল ছোঁয়নি সেই শবরদের ইটের খুপরিতে তুলে এনে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো চাষবাসের সরঞ্জাম! গল্প কি একটা? ধুনো, ধূপ আর রূপটানের ভেষজ উৎপাদনের কারখানাগুলিতে সরবরাহ করতে গিয়ে যথেচ্ছ ভাবে লুন্ঠন চলল অরণ্য সম্পদের। আমরা ভেবে বসলাম আমরা খুব- খুব- প্রকৃতিকে মর্যাদা দিচ্ছি হার্বাল মেখে, আর মাটির উপর হিউমাসের চাদর এলো পাতলা হয়ে। এর উপরে জন্ম নেওয়া ছত্রাক আর ব্যাং এর ছাতা --- যা বনের মানুষকে সহজ পুষ্টির জোগান দিত তারা আর ফুটবে কোথায়? ছোট, ছোট প্রাণীগুলো মরতে থাকলো চোরা শিকারীর হাতে। মুশকিল হল গরিব মানুষের প্রোটিনের চাহিদা মেটানো। কখন কোন গাছ থেকে কী সংগ্রহ করলে তাদের ক্ষতি হয়না, বা খাদ্যের জন্য কোন পশু কখন মারা যায় আর কোনটা যায়না -সে নিযে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা মানুষদের জ্ঞান ভাণ্ডার কাজে লাগলো কই? প্রকৃতির সাথে জড়িয়ে মড়িয়ে বাঁচা মানুষ প্রকৃতিকে কাজে লাগায় ঠিক তেমনি ভাবে, যেমন করে আমাদের কাজে লাগে নিকট আত্মীয়রা। এ সম্পর্ক দমনের নয়। অধিকার স্থাপনের নয়। কে না জানে অধিকার করে সব কিছু পাওয়া যায়না? প্রকৃতি, নারী কাউকেই না। বরং ভয় থাকে সেখানে- কোনোদিন সে হয়তো প্রতিশোধ নেবে! তাই বুঝি বারে বারেই উঠে আসে আমাদের সৃজনশীল সত্তাটির প্রসঙ্গ। সে নিজের প্রয়োজন মেটাতে নতজানু হয়ে বসে প্রকৃতির সামনে, বলগায় বাঁধে সেই প্রয়োজনকেও। প্রকৃতির অনুমতি নিয়ে, তার সাথে পরামর্শ করেই সে এগোয় নিজের বিকাশে। অরণ্য, পাহাড়, নদী, সাগর, পশু, পাখি এবং ‘অপর’ মানুষ- এদের কেবল বিচ্ছিন্ন গবেষণার স্পিসিস হিসাবে দেখার পথটি যে ভুল পথ, বরং আমার ‘আমি’- টার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আর অর্থ যে অনেকটা তাদের সাপেক্ষেই উঠে আসে- সেই আদিম কৌম ভাবনাটিকেও ফিরে দেখার সময় এসেছে। পশ্চিমী বিজ্ঞান চর্চার নিস্পৃহতা-বিলাসী কাঠামো প্রান্তবাসী মানুষকে তার নিজস্ব অবস্থান ও নিজস্ব উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে নিজের কাঠামোয় রেখে দেখতে চেয়েছে। সেই প্রকৃতির সাথে জড়িয়ে বাঁচা মানুষদের যে একটা নিজস্ব অবস্থান আর সেই অবস্থান থেকে নিজস্ব উদ্দেশ্য আছে, সেই জায়গা থেকে তাদের যে নিজস্ব বিশেষ জ্ঞান-প্রণালী বা দেখার, ভাবার চোখ তৈরি হয়েছে -তাকে মন থেকে সে স্বীকৃতি দিতে পারেনি। প্রকৃতি ও জীবনকে এই ‘অপর’ মানুষেরা দেখে তাদের মত করে – একের সাথে অপরকে জড়িয়ে। তাদের গাছপালা, পশুপাখির শ্রেণী বিন্যাস তাই পশ্চিমী ঢঙে পরস্পর বিচ্ছিন্ন আকার বা অঙ্গসংস্থানগত নয়। কে কী ভাবে কার প্রয়োজনে লাগতে পারে – অনেকটা সেই হিসেবেই তার শ্রেণী-সাজ। নিজেদের তৈরি করা মাপকাঠি দিয়ে তাদের যুক্ত করতে গিয়ে তাই আধুনিক বিজ্ঞান মাঝ মাঝেই পিছিয়ে পড়েছে! আর তাদের সেই পুরনো পথেই তাই ‘অপর’ কে দেগে দিয়েছে ‘অবোধ্য’ বলে। ঠিক যেমন নারীর জীবন থেকে উঠে আসা তার নিজস্ব জ্ঞান-প্রণালীকে পাত্তা দেয়নি তথাকথিত মূল ধারার পিতৃতান্ত্রিক ভাবনা। আধুনিক পাশ্চাত্য বিজ্ঞান চর্চা মেয়েদের যুক্ত করতে চেয়েছে, কিন্তু খোঁজ নেয়নি তাদের বিশেষ দৃষ্টিকোণ ও তার থেকে উঠে আসা উপাত্ত ও উপলব্ধিকে! কোনটা প্রয়োজনীয়, কোনটা অপ্রয়োজনীয় আর কোনটা বিপজ্জনক তাই গুলিয়ে গিয়েছে বারে বারেই -জীবন থেকে আলাদা করে প্রকৃতি চর্চায়। উন্নয়ন ও উন্নতির প্রসঙ্গ তাই বুঝি আজ সুস্থিতিহীন এক নিরানন্দ দৌড় হয়ে উঠেছে! এই দৌড়ে নীতি নির্ধারক হয়ে উঠেছে পুঁজি! আমরা প্রতি নিয়ত হারিয়ে ফেলছি আমাদের ঠিকানা!কেমন করে বাঁচবো আমরা ঠিকানাহীন হয়ে? শুধু বন থেকে, পাহাড় থেকে, নদী আর সমুদ্রের ধার থেকে উচ্ছেদ হয়েই বুঝি মানুষ ঠিকানা হারাচ্ছে? আমরা, যারা নিজেদের মূল ধারার বলে মনে করে নিশ্চিন্ত -তারাও তো হারিয়ে ফেলছি নিজেদের। শুধু খামখেয়ালি প্রকৃতির দাপটে হারিয়ে যাওয়া নয়, শরীরে বেঁচে থেকেও তরুহীন, পাখপাখালিহীন, বন্ধুহীন, আবেগহীন আত্মউন্নতির যে অসুস্থ পরিকল্পনা –তার প্রতিস্পর্ধী কোনো পরিকল্পনা তেমন দাপটের সাথে দাঁড় করাতে পারছি কই? হয়তো এতদিন যাদের ‘অপর’ বলে ভাবতে শেখানো হয়েছিল -সেই সভ্যতার পুঁজিহীন মানুষরাই আমাদের মসীহা হয়ে উঠবে। উৎকট উন্নয়নের দাপটের আঁচ তাদের সরাসরি আঘাত করে কোণঠাসা করছে, আর তাই দেওয়ালে পিঠ থেকে যাওয়া মানুষেরা বাধ্য হয়েছে সরাসরি লড়াইয়ে নামতে! লড়াই দেওয়া ছাড়া আর যে অন্য কিছু করার নেই তাদের! ওড়িশার নিয়মগিরি পাহাড়ে নিয়মরাজার অধিষ্ঠান ভাঙতে গিয়ে তাই বেদান্তের মত কর্পোরেট সংস্থাকে হার মানতে হয়। ভাইজাক হাইপার স্কেল ডেটা সেন্টার প্রকল্প, রাজস্থানের অবৈধ খনি মাফিয়া, নদীর বালি মাফিয়াদের বিরুদ্ধে এ ভাবেই হয়তো দানা বাঁধতে থাকবে আন্দোলন। অন্য স্বর সরব হবে গ্রেট নিকবরেও! আমরা পাড়ার বটগাছটি, থর্মোকল আর অন্য আবর্জনার দাপটে হারিয়ে যেতে থাকা পুকুরগুলি, খেলার মাঠ ফিরিয়ে আনতে কি চেষ্টা করবোনা? আমাদের হারিয়ে যাওয়া ঠিকানাগুলি নতুন করে ফিরিয়ে দিতে পারিনা সন্তানদের? যাতে আমরাও না হারিয়ে যাই?
    গুরুচণ্ডা৯-র পাঠ: স্বকন্ঠে - গুরুচণ্ডা৯ | ছবি: রমিত'নিমো গ্রামের গল্প' থেকে পাঠে লেখক সুকান্ত ঘোষ। চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।
  • হরিদাস পালেরা...
    আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস - আজ সংকল্প গ্রহণের দিন  - Somnath mukhopadhyay | সাতসকালে হৈ চৈ শুনে বাইরে বেরিয়ে আসতেই মালুম হলো হট্টগোলের কারণটা। আমার প্রতিবেশী এক মায়ে–পোয়ে আলাপন চলছে, তবে কিনা একটু উচ্চগ্রামে। আর সে জন্যই কথাগুলো ঘরের চৌহদ্দি উপচে এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ছে ঢেউয়ের মতো। অন্যের কথা শোনা গর্হিত জেনেও বলছি, আসুন চুপচাপ ওদের কথায় কান পাতি। – “সব কিছুই একটা নিয়ম মেনে চলে। সেই নিয়ম ভাঙার খেলায় যদি তুই এখন থেকেই মেতে উঠিস, তাহলে তো আমাদের বাড়ির কোনো শৃঙ্খলাই আর অবশিষ্ট থাকবে না। প‌ইপ‌ই করে তোকে কতবার বারণ করেছি, অথচ তুই রোজ নিয়ম করে এই শৃঙ্খলা ভেঙে চলেছিস। আমার‌ও তো সহ্য করার একটা সীমা আছে! কত কষ্ট করে একটা ছোট্ট বাগান করেছিলাম, তোর খেলার জায়গা ছোট হয়ে যাচ্ছে বলে সেখানকার গাছগুলোকে সব ছারখার করে ফেললি। বাগানের একপাশে কায়দা করে রাজমিস্ত্রিকে দিয়ে ছোট্ট সুন্দর একটা বাঁধানো পুকুর মতো করেছিলাম যাতে কয়েকটা রঙিন মাছ ছাড়বো ভেবে। সেটাকেও নষ্ট করে ফেলেছিস। রাজ্যের আবর্জনা ফেলে তার হাল এখন রীতিমতো বেহাল, অমন নোংরা পচা জলে মাছেরা বাঁচে কখনো? বাড়িতে দু দুটো নীল আর সবুজ রঙের বালতি রাখা রয়েছে ময়লা আবর্জনা তুলে ফেলার জন্য। সেসবে কোনো হুঁশ নেই। সামান্য ময়লা তুলে ফেলতে গিয়ে তুই এই বালতির ময়লা ওই বালতিতে আর ওই বালতির ময়লা এই বালতির ভেতর ফেলছিস। এগুলো কি তুই ইচ্ছে করে করিস? কেন বুঝতে চাস না যে নিয়ম অনুযায়ী চললে আমরা সবাই ভালো থাকি, সুস্থ থাকি, স্বস্তিতে থাকি। যতদিন সত্যিকারের ছোট ছিলি, কাঁথায় মোড়া অবস্থায় শুয়ে থাকার বয়সে, ততদিন বেশ শান্তিতে ছিলাম সবাই। সকাল সকাল ভরপেট দুধ খাইয়ে, দুটো আলতো চাপড় দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতাম। কোনো চাপ ছিলনা। বাড়তি কাজের জন্য কত সময় থাকতো হাতে। আর এখন? তোর্ এই দস্যিপনার দাপটে সবকিছু তোলপাড়! আজ এটা ভাঙছিস্ তো কাল ওটা! তোর এই দস্যিপনার জ্বালায় বাড়িসুদ্ধ সব লোকজনের একেবারে পাগলপারা অবস্থা। আশপাশের বাড়িতেও যে তোর্ মতো দাদাগিরি করার ছেলেপুলেদের ভিড়! সবার মুখেই এক কথা – আর তিষ্টোতে পারছিনা। সব নিয়মকানুন নেড়ে ঘেঁটে একসা করে দিচ্ছে ! কেন তোরা বুঝিসনা যে এতোদিনের নিয়ম শৃঙ্খলার বাঁধন টুকু থাকার জন্য‌ই তো আমরা বেঁচে বর্তে আছি।” উচ্চগ্রামের কথোপকথন একতরফা হলেও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, আজ মায়ের মেজাজ একেবারে তুঙ্গে চড়ে আছে। আমরা কানাকানি করি – “সত্যিই ছেলেটা বড্ড বাড় বেড়েছে। বসুধার মতো রীতিমতো শান্ত শিষ্ট, সর্বংসহা মহিলার এমন রূপান্তর তো ভাবাই যায়না।”   ২.প্রভাতী আখ্যানের আপাতত এখানেই পরিসমাপ্তি। এবার যে যার কাজে লেগে পড়ি ঝটপট। তবে মাথার মধ্যে পাক খেতে থাকে মা বসুধা আর ছেলে মানবের কথোপকথনের খণ্ড খণ্ড পর্বগুলো। এই মুহূর্তে আমাদের পৃথিবীর সামনে সবথেকে বড়ো সমস্যা হলো বদলে যাওয়া বাতাবরণের সমস্যা। বসুধার কথা মতো মানব যতদিন কাঁথায় মোড়ানো জীবনে অভ্যস্ত ছিল, ততদিন বাড়ির শৃঙ্খলা ভঙ্গের মতো কোনো সমস্যার অস্তিত্ব ছিলোনা। গোল বাঁধলো সেদিন থেকে যেদিন ছোট্ট অসহায় মানব নিজের ইচ্ছে অনুসারে সবকিছুর ওপর নিজের দখলদারি কায়েম করতে উদ্যোগী হলো। এই এগিয়ে যাবার প্রবণতাটা একদমই সহজাত। প্রতিবেশী মানবকটি যে কারণে তার মায়ের কায়েম করা শৃঙ্খলার বেড়ার ভেতরে থাকতে চায়না, মায়ের দেওয়া বিধি নিয়মের বাইরে বেরিয়ে আসাতেই বুঝি তার আনন্দ, ঠিক একই ভাবে মানুষের অগ্রযাত্রার ইতিহাস তৈরি হয়েছে ওই নিয়ম ভাঙার খেলার মধ্য দিয়েই। এটাই যদি স্বাভাবিক হয়ে থাকে তাহলে হৈচৈ করছে কেন সবাই?    ৩.এখানেই নিহিত আছে আরও এক আখ্যান। বাড়ির মানবকটিকে নিজের নিয়মের বশে রাখতে মা প্রয়োজনমতো শাসনের শস্ত্র ধরেন, তাতে করে মানব কিছুদিনের জন্য সমঝোতার পথ বেছে নেয় বটে, কিন্তু তার মন পড়ে থাকে নিয়ম ভাঙার খেলার অলিগলিতে। কিন্তু প্রকৃতি মা তো তেমনটি করেন না। আমাদের কাজের ঔচিত্য আর অনৌচিত্য নিয়ে মুখর হননা। তাহলে? তিনি নিরন্তর সংকেত পাঠান আমাদের উদ্দেশ্যে। তার তন্ত্রগুলোর বিচলন তাঁকেও বিচলিত করে।আর তাই আমাদের সতর্ক করেন নানান উপায়ে, নানান আঙ্গিকে। বাড়ির মায়ের মনোগতির হদিস যেমন পাই তাঁর মুখ ভঙ্গিমায়, ভ্রু যুগলের বিচিত্র বিভঙ্গে, চোখের গহীন চাউনিতে ঠিক তেমন‌ই প্রকৃতির মনের অবস্থার ইঙ্গিত মেলে গ্রীষ্মের অসহনীয় দাবদাহে, বর্ষার বিলম্বিত আগমনে, অতি বর্ষণের কারণে নদীর কুলপ্লাবি বন্যায়, বৃষ্টিহীনতার কারণে সংঘটিত প্রলম্বিত খরায়, বিধ্বংসী অরণ্যগ্নির উদ্দাম বহ্ন্যুৎসবে, যুগ যুগ ধরে মেরু অঞ্চলের সঞ্চিত সুবিশাল হিম স্তূপের আকস্মিক গলনে,আপন স্ফূর্তিতে বেড়ে ওঠা সমুদ্র সলিলের উন্মত্ত তরঙ্গে। আমরা এই সব সংকেতকে বুঝেও না বোঝার ভাণ করে এড়িয়ে যেতে চাই নিজেদের অবিমৃষ্যকারিতার কারণে। আর তাই দিকে দিকে ভাঙনের মাতন। প্রাকৃতিক তন্ত্রের বিনাশী বিশৃঙ্খলা।  ৪.বহু সহস্র বছর ধরেই আমাদের ধরিত্রী মা প্রত্যক্ষ করছে বাতাবরণের পরিবর্তন। একটা জ্বলন্ত অগ্নি পিণ্ড ধীরে ধীরে শীতল হলো। বাইরের আবরণীটি কঠিন হলেও তার ভেতরের অংশ আজ‌ও অগ্নিগর্ভা। এই শীতলীকরণের ফলে বেরিয়ে আসা গ্যাসীয় উপাদানগুলো নানান পরিবর্তনের পথ বেয়ে একসময় প্রাণবিকাশের উপযোগী হয়ে উঠলো। এই বিবর্তনের প্রতিটি পর্বেই পৃথিবীর গ্যাসীয় আবরণীর বিচিত্র লীলাখেলা প্রত্যক্ষ করেছে পৃথিবী। তাকে সমঝে চলার জন্য সতর্কবার্তা, কার্যক্রমের লক্ষ্য আর লক্ষ্য পূরণের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে বারংবার। আমরা সে সব কথায় কান দিইনি। অনর্থক হৈচৈ করেছি, গড়িমসি করেছি, কোন্ পথে সমস্যার সমাধান হবে তা নিয়ে অযথা বাগারম্বর করেছি, অবহেলা করেছি বাতাবরণের ভারসাম্য রক্ষার কাজকে। আর এসবের কারণেই আজ বিপদের প্রান্ত সীমায় এসে পৌঁছেছে আমাদের বাসভূমি, আমাদের সবার পৃথিবী।  ৫.আজ কিন্তু আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে, সত্যিকারের ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে বলা হয়েছিল যে আমরা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বেঁধে রাখবো শিল্প বিপ্লবের সময়ের তাপমাত্রার সাপেক্ষে। সেই সীমারেখা অতিক্রম করে আমরা এগিয়ে চলেছি নতুন এক লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করতে। এই পরিস্থিতি আমাদের বিপদের ঝুঁকিকে যে আরও বাড়িয়ে তুলবে তা বলা বাহুল্য। জলবায়ুর শৃঙ্খলা বিপর্যস্ত হ‌ওয়ার অর্থ‌ই হলো আমাদের বাসভূমির এতো কালের প্রাণময় জীবনধারা স্তব্ধ হয়ে যাওয়া – এমন পরিণতি কখনোই আমাদের কাছে কাম্য নয়।  ৬.পৃথিবীর বর্ধমান উষ্ণতার আশু বিপদের কথা মাথায় রেখে প্রকৃতি পরিবেশের হাহাকার ধ্বনির প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে, আরও নিমগ্ন হয়ে শুনতে হবে, বুঝতে হবে প্রকৃতির অনুচ্চারিত সংকেতবার্তা। পরিবেশকে পরিশোধনের আয়োজন শুরু হয়েছে গোটা দুনিয়া জুড়েই। নতুন বিধিনিয়মের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একটু করে এক সমান্তরাল বিকল্প যাপনে অভ্যস্ত হচ্ছে বিশ্ববাসী। এদেশেও তার আভাস মিলছে ধীরে ধীরে। প্রথাগত জীবাশ্ম জ্বালানি উৎসের পরিবর্তে টেকস‌ই সবুজ শক্তিকে কাজে লাগানো হচ্ছে – বাড়ির ছাদে ছাদে বসছে সৌর বিদ্যুতের প্যানেল, দিগন্ত রেখায় মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করেছে আধুনিক বায়ুকল। নতুন নতুন পরিবেশ বান্ধব চিন্তা ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে আধুনিক বসতি, যার ভিত্তি হলো বাস্তুতান্ত্রিক সহাবস্থানের মৌলিক আদর্শ। এই ব্যবস্থা হয়তো আগামীদিনে শহুরে তাপ দ্বীপের পরিসরকে অনেকটাই সংকুচিত করবে। বিকাশ আর উন্নয়নের নামে উজাড় হয়ে যাওয়া ধূসর প্রান্তরগুলো আবারও ফিরে পাচ্ছে তাদের হারিয়ে যাওয়া হরিয়ালি। এক্ষেত্রে ব্যষ্টিক প্রয়াস কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাপিয়ে যাচ্ছে সামুহিক উদ্যোগকেও। এ বড়ো আশার কথা, এ বড়ো সুখের কথা। দেরীতে হলেও দুনিয়া জুড়েই এক ইতিবাচক অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। সবটাই শেষ হয়ে যাবার মতো নয়। ৭.আজ ৫ জুন, ২০২৬। সারা পৃথিবী জুড়েই আজ উদযাপিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এই বছর ( ২০২৬ ) বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক দেশ হলো রিপাবলিক অফ আজারবাইজান। রাজধানী বাকুতে এই অনুষ্ঠানের সূচনা করা হবে। পূর্ব ও পশ্চিম গোলার্ধের সন্ধিস্থলে অবস্থিত মধ্য এশিয়ার এই দেশটি তার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জলবায়ুগত বৈচিত্র্যের কারণে এক সম্পন্ন জীববৈচিত্রের অধিকারী। ২০১৫ সালের প্যারিস পরিবেশ চুক্তির শর্তগুলো যথাযথ রূপায়ণের ব্যাপারে এই দেশটি অত্যন্ত সদর্থক প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। পারস্পরিক দ্বন্দ্বের নীতিকে দূরে সরিয়ে রেখে এক সুস্থিত, টেকস‌ই জীবন যাপনের অবসর তৈরি করার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে এই দেশটি। বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক হিসেবে আজারবাইজানকে বেছে নেওয়ার পেছনে পরিবেশ রক্ষায় দেশটির অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকার খুব বড়ো ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ৮.হালফিল সময়ে আজারবাইজানের সরকার দেশটিকে এক নতুন সাজে সাজানোর কাজ করে চলেছে নিরলসভাবে। দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের বৈচিত্র্যময়তাকে অক্ষুন্ন রেখেই চলছে আগামীদিনের সুস্থিত রাষ্ট্র গড়ার কাজ।দেশটিতে খণিজ তেলের বিপুল ভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও দেশে সবুজ অর্থনীতি এবং অচিরাচরিত শক্তি উৎসকে আরও বেশি করে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে সে দেশের সরকার। পরিবহন পরিষেবায় আনা হয়েছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। পেট্রোল বা ডিজেল চালিত ইঞ্জিনের বদলে আনা হয়েছে ইলেকট্রিক ভেহিকল। কৃষি, শিল্প, নগরায়ন – সব ক্ষেত্রেই আধুনিক টেকস‌ই পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এইসব কার্যক্রম দেশের সার্বিক উন্নয়নের সাথে সাথে পরিবেশ বান্ধব যাপনের অঙ্গীকারকে সত্যি সত্যিই অর্থবহ করে তুলছে। দুনিয়াজোড়া পরিবেশ আন্দোলনের ক্ষেত্রে আজারবাইজান আজ এক সম্ভ্রান্ত রাষ্ট্রের নাম। যোগ্য দেশের হাতেই ব্যাটন তুলে দেওয়া হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। ৯.পরিবেশ নিয়ে সারা বিশ্বে আজ যে নতুন করে ভাবনার মন্থন তার পেছনে ভারতের একটা বড়ো ভূমিকা রয়েছে। ১৯৭২ সালের ১৪ জুন তারিখে সংযুক্ত রাষ্ট্রসংঘের উদ্যোগে সুইডেনের স্টকহোম শহরে আয়োজিত পৃথিবীর প্রথম পরিবেশ সম্মেলনে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী এক মর্মস্পর্শী ভাষণ দিয়েছিলেন। তার সূত্র ধরেই পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে পৃথিবীর রাষ্ট্রনায়কদের পরিবেশ ভাবনা নতুন খাতে ব‌ইতে শুরু করে। পরিবেশের অবনমন নিয়ে টনক নড়ে গোটা দুনিয়ার।এই বছর কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবেশ দপ্তর মিশন লাইফ শীর্ষক যে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তার অন্যতম অঙ্গ হলো এক পেড় মাকে নাম অর্থাৎ মায়ের নামে একটি করে গাছ লাগানোর উদ্যোগ। নাগরিকদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানানো হয়েছে ওই দিনটিতে মায়ের নামে একটি করে গাছ লাগানোর। আশা করছি এই কর্মসূচি সফল হবে। রেকর্ড সংখ্যক গাছ লাগানো হয়েছে – এমন ঘোষণা করেই যদি কর্মসূচির সফল রূপায়ণের দাবি তোলা হয় তাহলে কিন্তু এই মহতী উদযাপনের মূল উদ্দেশ্যটাই বিফলে যাবে। মাথায় রাখতে হবে এই দেশের মায়েরাই একদা ঘাতকদের কুঠারের সামনে দাঁড়িয়ে গাছের গুঁড়ি আঁকড়ে ধরে রেখে চিপকো আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। আজ পৃথিবী বিপন্নতার প্রান্ত সীমায় এসে পৌঁছেছে। পৃথিবীর বাতাবরণ আজ কলুষিত। আমাদের কৃত কর্মের ফলেই পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের তাপ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তাকে আবার বসবাসের উপযোগী করে তুলতে হলে প্রকৃতির শাশ্বত অনুশাসনের নিবিড় অনুশীলন করতে হবে। এর বিকল্প কিছু নেই। ১০.শেষ করবো মহাভারতের অনুশাসন পর্বের কথা দিয়ে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। লোকক্ষয়,প্রিয়জন হানি, বিপুল পরিমাণ সম্পদের অপচয় – এসবের মধ্য দিয়ে। শাসনের অধিকার অর্জন করেও একফোঁটা শান্তি নেই যুধিষ্ঠিরের মনে। ব্যাসদেবের পরামর্শে যুধিষ্ঠির শরশয্যায় শায়িত পিতামহ ভীষ্মের কাছে গেলেন সদুপদেশ লাভের জন্য। তিনি তখন‌ও দক্ষিণায়ণের শেষে উত্তরায়ণ পর্বের সূচনার অপেক্ষায় ছিলেন। ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে কতগুলো অনুশাসনের কথা বললেন। আমাদের বেহিসেবী জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আজ নতুন অনুশাসনের শৃঙ্খলায় বাঁধতে হবে। প্রিয় ধরিত্রী আজ সংকটের শরশয্যায় শায়িত। এমন পরিণতির জন্য দায়ী আমরাই।তাই তাকে আবার বসবাসের উপযোগী করে তুলতে হলে যথার্থ পরিবেশানুগ যাপনে নিজেদের অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। আজ কান পেতে ধরিত্রীর মর্মবাণী শোনার সময় এসেছে। আমরা যেন সজাগ হ‌ই। সোমনাথ মুখোপাধ্যায় বিশ্ব পরিবেশ দিবস ৫ জুন, ২০২৬
    আরবিআই কি সোনা বিক্রি করেছে? তথ্য, ফাঁক, এবং প্রশ্ন - উদ্দালক | কী ঘটেছে?২ জুন ২০২৬ - ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের সিনিয়র ইন্ডিয়া ইকোনমিস্ট অভিষেক গুপ্ত একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেন। তাঁর অনুমান মে মাসের শেষ দুই সপ্তাহে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সোনা বিক্রি করেছে, একই সাথে প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা সম্পদ কিনেছে। কারণ হিসেবে বলেছেন পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতজনিত চাপে টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকানো। [1]৩ জুন, আরবিআই পাল্টা বিবৃতি দেয় যে এই প্রতিবেদন সঠিক নয়। সোনার "physical stock" ৮৮০.৫২ টনে অপরিবর্তিত। সরকারের তরফেও পিআইবি ফ্যাক্ট চেক এই খবর "মিথ্যা" বলে চিহ্নিত করে। আরবিআই-এর দাবি বৈদেশিক মুদ্রা মজুতে সোনার অনুপাত বরং বেড়েছে: সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ ১৩.৯২%, মার্চ ২০২৬-এ ১৬.৭০%, মে ২০২৬-এ ১৬.৮৫%। [2]যেখানে প্রশ্ন থেকে যায়আরবিআই-এর মাসিক বুলেটিনে বৈদেশিক মুদ্রা মজুতের তথ্য আছে ২৪ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত। ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণ ৮ থেকে ২২ মে পর্যন্ত। মাঝখানে প্রায় একমাসের তথ্যগত ফাঁক।[3]আরবিআই অবশ্য বলেছে ৮৮০.৫২ টন "as on date" — অর্থাৎ আজকের তারিখেও অপরিবর্তিত। কিন্তু এটি একটি বিবৃতি, প্রকাশিত ডেটা নয়। পাশাপাশি, আরবিআই-এর ২৯ মে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২২ মে সপ্তাহে মোট বৈদেশিক মুদ্রা মজুত ৭.৫১ বিলিয়ন ডলার কমে ৬৮১.৩৮ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে।[3]আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় - আরবিআই সুনির্দিষ্টভাবে "physical stock" শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সোনা "physically" না বিক্রি করেও গোল্ড সোয়াপ, গোল্ড লেন্ডিং বা ডেরিভেটিভের মাধ্যমে ডলার লিকুইডিটি জোগাড় করতে পারে। ফিজিক্যাল টন অপরিবর্তিত থাকা আর সোনা দিয়ে কোনো আর্থিক লেনদেন না হওয়া এই দুটি এক কথা নয়।যদি সত্যি হয়, তাহলে এর তাৎপর্য কী?সোনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শেষ আশ্রয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মুদ্রা রক্ষায় আগে বৈদেশিক মুদ্রা সম্পদ বিক্রি হয়। সোনায় হাত পড়া মানে ডলারের বাফার আর যথেষ্ট নয়।গত কয়েক বছরে ভারত ডলার-নির্ভরতা কমাতে ধারাবাহিকভাবে সোনা কিনে মজুত বাড়িয়েছে। সেই প্রবণতা উলটে গেলে বার্তাটি গুরুতর। অর্থনীতি যতটা স্বাভাবিক দেখানো হচ্ছে, বাস্তব ততটা স্বাভাবিক নয়।লক্ষণীয়, আরবিআই এবং অর্থ মন্ত্রণালয় উভয়েই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে।আরবিআই এর মে মাসের বুলেটিন প্রকাশিত হলে ছবি স্পষ্ট হবে।সূত্রনির্দেশ[1] Bloomberg — "RBI May Have Sold Gold to Save FX Reserves" (২ জুন ২০২৬) — https://www.bloomberg.com/news/articles/2026-06-02/rbi-may-have-sold-gold-to-save-foreign-reserves-be-report-shows[2]Business Standard — "RBI dismisses gold sale rumours" (৩ জুন ২০২৬) — https://www.business-standard.com/economy/news/rbi-dismisses-gold-sale-rumours-physical-reserves-steady-at-880-52-tonnes-126060300452_1.html[3] Upstox News — "RBI rejects reports of gold reserve sale" (৩ জুন ২০২৬) — https://upstox.com/news/business-news/financial-regulations/rbi-rejects-reports-of-gold-reserve-sale-says-physical-stock-unchanged-at-880-52-tonnes/article-194723/
    রটন্তী কুমার এবং ভারতীয় ও পাশ্চাত্য দর্শনে প্রমাণঃ পর্ব ৫  - রানা সরকার | প্রথমেই দুটি বাক্য লিখছি –‘পড়লে কথা সবার মাঝে / যার কথা তার বুকে বাজে’।এই ধরুন যারা যারাই নানা দেশে বহুদিন ধরে সাহিত্য রচনা করেছেন, তাঁরা তারাই সেই সাহিত্যের উপাদান সংগ্রহ করেছেন জীবন থেকে। সাহিত্য জীবনেরই প্রতিফলন। কিন্তু সাহিত্য জীবনের ১০০% প্রতিফলন নয়।ইদানীং নানান এলাকায় একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই ব্যাপারটা আগে ছিল না। নেটে লেখা বা অডিও স্টোরি শুরু হতেই কিন্তু ব্যাপারটা পরিলক্ষিত হচ্ছে।কারণ মানুষ টাকা দিয়ে সাহিত্যের বই কেনেন না। তাঁরা মনে করেন সাহিত্যের বই হল আবর্জনা। এমনিতেই বেশিরভাগ বাড়িতে কোনোরকমে পড়াশোনা শেষ করে সেই বইগুলো বেচে দিতে পারলে অনেকেই বেঁচে যান। আর বাড়ির জায়গায় তো আজকাল ফ্ল্যাট। স্থান সংকুলান হয় না। ফলে কারুর বই রাখবার ইচ্ছে থাকলেও তিনি বা তাঁরা রাখতে পারেন না।একসময় মানুষ এর বই তার বই নিয়ে, নোটস নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। বাড়িতে বাড়িতে স্কুলের বাংলা ও ইংরেজি গ্রামার, অভিধান ইত্যাদি মানুষ রেখে দিতেন। আজ নেট, কম্পিউটার তদুপরি এ.আই. এসে সেসব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।সারাজীবনের নামে সামান্য ৫০টাকা দিয়ে স্থানীয় গ্রন্থাগারেও মানুষ যান না। কেন? না, সময় নষ্ট! হায় রে! সেই মানুষদের যখন দেখি বাড়িতে বসে গোগ্রাসে হাড় হাভাতের মতো রদ্দি সিরিয়াল গিলতে বা ইন্সটা বা ফেবুতে রীল গিলতে তখন মনে হয় যে নেতাদের আর দোষ কী?ওপরে যে ব্যাপারটার কথা বললাম, সেটা কী?নেটে, ফেসবুকে বা অডিও স্টোরি হিসেবে কোনও গল্প বা উপন্যাস রিলিজ হলে সেইসব বই না পড়া মানুষজন কিন্তু আবার সেসব পড়ে বা শুনে নেন। কারণ সময় অঢেল আর বাড়তি টাকা লাগছে না। বাড়ি বয়ে বই আনতে হচ্ছে না বা বই পড়তেই হচ্ছে না; খালি শুনতে হচ্ছে।এখন, বেশিরভাগ উপন্যাস বা গল্পে চরিত্র থাকে। চরিত্রহীন উপন্যাস আছে, তবে সেসব আবার সাধারণ মানুষ বোঝেন না। সাধারণ মানুষ এমনকি প্রতীকী বা সংকেতমূলক উপন্যাসও বোঝেন না। কারণ তাঁরা অতো মাথা খাটাতে চান না। খাটাতেই চান না।এখন ধরুন, সুকান্তদা, আমাদের এখানকার স্বনামধন্য লেখক শ্রী সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় উপন্যাস লিখবেন। তা, তিনি কি উপন্যাসে কোনও চরিত্র বা সেই চরিত্রের কোনও নাম দেবেন না? নিশ্চয়ই দেবেন।এখন, পরে সেই উপন্যাসের অডিও স্টোরি শুনে সুকান্তদা যে এলাকায় বসবাস করেন সেখানকার লোক যদি দুম করে মনে করেন বা করতে থাকেন যে ওমা! দেখো সুকান্তদা আমাদের নিয়ে লিখছেন? বা তাদের মতো কাউকে নিয়ে লিখছেন? দেখা গেল, এলাকায় কেউ হয়তো রটিয়ে দিল। বলল, শুনেছেন? সুকান্তদা তো অমুকের তমুককে নিয়ে লিখেছে। এহ! ঠিক করে নি!এই কথা যারা রটিয়েছেন তারা তো হারামী বটেই, আর যারা যারা অডিও শুনে শুধু কিছু চরিত্রের নাম তাদের নামের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে বলে এটা ভেবে ফেলছেন যে লেখক তাদের কথাই লিখছেন, তাঁরা হলেন খাঁটি উপহাসাস্পদ। এমনকী লেজ বিশিষ্ট প্রাণীদের বুদ্ধি তাঁদের থেকে বেশি। যদিও মানুষেরও লেজ আছে; তবে সেটা অপ্রকাশ্য!!! ওদিকে সারাটা ভারতবর্ষ জুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেলে, খেলার মাঠে ফ্ল্যাট হয়ে গেলে, জলাশয় ভরাট করা হলে, জঙ্গল পাহাড় সাফ হয়ে গেলে, ওষুধের দাম বেড়ে গেলে, নেতা ক্ষনে ক্ষনে মিথ্যা কথা বললেও কিন্তু দেশের বহু মানুষ চুপ করে থাকেন। আর দূর্নীতি তো হরদম চলছেই। বিরোধী থাকাকালীন রাজনৈতিক দল গুলোর এক রকম কথা আর শাসক হলেই আরেকরকম। এখন, তাহলে কি উপন্যাস বা গল্প লেখবার আগে সুকান্তদাকে ভোটার লিস্ট চেক করে জেনে নিতে হবে, কোন কোন নামের কোন কোন লোক এলাকায় বসবাস করছেন, আর কোন কোনও নামের লোক এলাকায় বসবাস করছেন না! তারপর তাকে জানতে হবে যে কোন কোন নামের লোক এলাকা ছেড়ে চলে গেলেন, মারা গেলেন আর কোন কোন নামের লোক এলাকায় আসতে পারেন। তারপর এইসব হিসেব নিকেস করে যখন লিখতে বসলেন, তখন আবার কিছু লোক এলাকায় বসবাস করতে এলেন। সুকান্তদা লেখা ফেলে তাঁদের নাম জানতে দৌড়ে গেলেন।আর এইভাবে, হ্যাঁ, আর লেখাই হল না।দারুণ! গল্প না? (গল্পটা আমার লেখা আছে। পরে প্রকাশ করবো) অনেক লেখক আছেন যারা ‘গল্পে গরুকে গাছে তুলে দেন’। এই যেমন, সমরেন্দ্রনাথ পাণ্ডে ওরফে স্বপন কুমার লিখিত দীপক চ্যাটার্জী পড়লে এরকম মনে হয়। আবার এলাকায় এলাকায় অনেক ততোধিক নির্বোধ পাঠক বা শ্রোতা আছেন যারা যারা কোনও উপন্যাসের কয়েকটা নামের সঙ্গে তাঁদের নাম মিলে গেলে বা তাঁদের চেহারার বর্ণনার সঙ্গে তাঁদের চেহারার বর্ণনা মিলে গেলেই ভাবতে থাকেন যে লেখক মনে হয় তাঁদের নিয়েই লিখচ্ছেন। ফলে তাঁদের কাজের মাধ্যমে তাঁরা গরুকে গাছে না তুলে, গাছকে গরুর ওপর তুলে দেন! এলাকায় এলাকায় কত রকমের যে ইয়ে আছে সেটা না অনুভব করলে বোঝাই যায় না। আর যারা যারা তার পরেও মনে করবেন যে সুকান্তদা তাঁদের নিয়েই লিখেছেন, তাঁদের জন্য বলতে হয়, ‘পড়লে কথা সবার মাঝে / যার কথা তার বুকে বাজে’।সুকান্তদা যদি এই লেখাটা পড়ে থাকো বা পড়ো, তোমার নাম ব্যবহার করার জন্য তোমার কাছ থেকেই আগাম জামিন নিয়ে রাখছি (হা হা হা)। কারণ আমরা জানি যে ‘মাঝেরপাড়া’ জায়গাটা কোথায়? আর একজন লেখক কোন সমস্যায় পড়লে তিনি এইসব নাম ব্যবহার করতে বাধ্য হন। এই প্রসঙ্গে, শ্রী সুবোধ ঘোষের একটা গল্পের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। যাই হোক, আমরা অনেক সময় বলি, নিরপেক্ষ মতামত দিন। আবার অনেকেই বলেন যে রাজনীতিতে নিরপেক্ষ থাকাই যায় না।যেমন ডেসমন্ড টুটু একবার বলেছিলেন – হাতির পা ইঁদুরের লেজে থাকলে আর আপনি নিরপেক্ষ থাকলে, ইঁদুর কিন্তু আপনার শংসা করবে না। অথবা মার্টিং লুথার কিং বলেছেন – নরকের সবচেয়ে উচ্চতম স্থান তাঁদের জন্য সংরক্ষিত, যারা নৈতিক দ্বন্দ্বের সময়ে নিরপেক্ষ থাকেন।আবার কেউ মজা করে বলেন – দুজন ঝগড়া করলে, যে নিরপেক্ষ থাকে, সে সাধারণত পপকর্ণ খায়! গত কোনও একটি পর্বে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দলবদলুদের অন্তত ১০ বছরের জন্য নতুন কোনও রাজনৈতিক দলে প্রার্থী করা থেকে বিরত রাখা আর বিধায়ক ও সাংসদ নির্বাচনে দ্বিতীয় স্থানাধিকারিদেরও শেষ দেড় বছর যথাক্রমে বিধায়ক ও সাংসদ রূপে কাজ করবার আইনি অধিকারের কথা বলেছিলাম।আজ আর একটা গল্প বলছি। এই গল্পটাও আপনারা পড়েছেন। কিন্তু ভুলে গেছেন।একজন জাদুক্ষমতা সম্পন্ন মানুষের কাছে একদিন একটি ইঁদুর গিয়ে বলল যে তাকে কিছু কুকুর খুব ডিস্টার্ব করছে; তাড়া করছে। সে ইঁদুর হয়ে অনেক কিছু কাজও করতে পারছে না। তাই তাকে কুকুর করে দেওয়া হোক। জাদুকর হেসে বললেন, তথাস্তু। এর কয়েক মাস পর সেই ইঁদুর থেকে কুকুর হওয়া সেই কুকুরটা আবার সেই জাদুকরের কাছে এসে হাজির হল। এবার বলল, তাকে এখন শেয়ালেরা খুব ডিস্টার্ব করছে; তাড়া করছে। সে কুকুর হয়ে অনেক কিছু কাজও করতে পারছে না। তাই তাকে শেয়াল করে দেওয়া হোক। জাদুকর হেসে বললেন, তথাস্তু। এর কয়েক মাস পর সেই কুকুর থেকে শেয়াল হওয়া শেয়ালটা আবার সেই জাদুকরের কাছে এসে হাজির হল। এবার বলল, তাকে এখন বাঘেরা খুব ডিস্টার্ব করছে; তাড়া করছে। সে শেয়াল হয়ে অনেক কিছু কাজও করতে পারছে না। তাই তাকে বাঘ করে দেওয়া হোক। জাদুকর হেসে বললেন, তথাস্তু।এবার সেই বাঘ প্রথমেই জাদুরকরকে খেতে এলে জাদুকর তার জাদুর সাহায্যে তাকে আবার ইঁদুরে রূপান্তরিত করে দিল।আমরা, জনগণ আমাদের ভোটের মাধ্যমে প্রার্থীদেরকে চলতি আইন মোতাবেক নির্বাচিত করে নানান ক্ষমতা প্রদান করি। কিন্তু যদি দেখা যায় তাঁদের মধ্যে নির্বাচিত অনেক নেতা (সবাই নন) জনগণের ভালো করার বদলে, খারাপ করতে থাকেন, তখন যেন জনগণের হাতে সেই সেই ক্ষমতা থাকে (ঐ ৫ বছর পরে নয়; তার আগেই), যাতে সেই নির্বাচিত নেতাকে তৎক্ষণাৎ পুনরায় ক্ষমতাহীন করে ফেলা যায়। সেটিই হবে কিন্তু আসল গণতন্ত্র। জনগণের ভোটে জিতে কোনও নেতা বা দল যদি তৎক্ষণাৎ জনবিরোধি কাজ করেন তাহলে দেশের সংবিধান ও আইন মোতাবেক যেন সেই নেতা বা সেই দলকে যেন সেই সেই জনবিরোধি কাজ তৎক্ষণাৎ রদ করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং সবার সঙ্গে কথা বলে সকল বা বেশিরভাগ মানুষের সহমতের ভিত্তিকে অন্য কোনও যুক্তিযুক্ত উপায় অবলম্বন করা হয়, যাতে সবাই বাঁচে। নয়তো সেই নেতাকে যেন জনগণের বহিষ্কার করার অধিকার সংবিধান দেয়। কারণ জনগণের কল্যানই হল শেষ কথা। জনগণের অকল্যাণ করার জন্য নিশ্চয়ই জনগণ কাউকে নির্বাচিত করেন না। ফিরে আসি দর্শনে। এখন, পাশ্চাত্য যুক্তিতে নিরপেক্ষ বা শর্তহীন বচন কেমন?যখন কোনও উক্তি কোনও শর্তের উপর নির্ভর করে না, তখন সেই বচনকে নিরপেক্ষ বা শর্তহীন বচন বলে।এইসব বচনের ৪টি অংশ।পরিমানক – উদ্দেশ্য – সংযোজক – বিধেয়।সকল – মানুষ – হয় – মরণশীল জীব।এখন এই উদ্দেশ্য আর বিধেয়ের স্বরূপ কী?এক্ষেত্রে আবার ৪টি মতবাদ আছে-১) ব্যক্তর্থ ভিত্তিক বা শ্রেণিভিত্তিক মতবাদ। - উদ্দেশ্য ও বিধেয় দুটিকেই গ্রহণ করতে হবে ব্যক্তর্থ-এর দিক দিয়ে। উদাঃ কোনও কোনও ফুল হয় লাল। রাসেল একজন বড় দার্শনিক ছিলেন। ২) ব্যক্তর্থ-ভাবার্থভিত্তিক মতবাদ। - একটি বচনের উদ্দেশ্য কোনও ব্যাক্তি বা বস্তুকে বোঝায় আর বিধেয় বলতে বোঝায় তাঁর গুণ বা ধর্মকে। উদাঃ সমস্ত তরলের গতি হয় নিম্নগামী।৩) ভাবার্থভিত্তিক মতবাদ - উদ্দেশ্য ও বিধেয় দুটিকেই গ্রহণ করতে হবে ভাবার্থ-এর দিক দিয়ে। উদাঃ- ক্ষমা হল পরম ধর্ম।৪) সমন্বয় ভিত্তিক বা ব্যপক মতবাদ। - এক্ষেত্রে উদ্দেশ্য ও বিধেয়কে ব্যক্তর্থ ও ভাবার্থ – দুদিক দিয়েই গ্রহণ করা যেতে পারে। উদাঃ- বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানী আমাদের সকলকে নতুন দৃষ্টি প্রদান করে। এই নিরপেক্ষ বচন আবার দুই প্রকার। সদর্থক ও নঞর্থক। নিরপেক্ষ বচনের চতুর্বর্গের পরিকল্পনা –অ্যারিষ্টটল সমস্ত বচনকে সাপেক্ষ ও নিরপেক্ষ এই দুইর শ্রেনীতে ভাগ করেছেন। আবার গুণ অনুসারে সদর্থক ও নঞর্থক। আর পরিমাণ অনুসারে সার্বিক ও বিশেষ।সামান্য সদর্থক – সকল মানুষ হয় মরণশীল। (A)সামান্য নঞর্থক – কোনও মানুষ নয় অমর। (E)বিশেষ সদর্থক – কোনও কোনও লোক হন জ্ঞানী। (I)বিশেষ নঞর্থক – কোনও কোনও লোক নয় শিক্ষিত। (O)ল্যাটিনে Affirmo এবং Nego - এই শব্দ দুটি থেকে যথাক্রমে A,I ও E,O নেওয়া হয়েছে।এখন এই ৪টি বচনের উদ্দেশ্য ও বিধেয় পদের ব্যাপ্যতার জন্য একটি ফর্মুলা আছে। - AsEbInOp (s- সাবজেক্ট ব্যাপ্য। b- দুটোই ব্যাপ্য। n – কোনটাই ব্যাপ্য নয়। আর p- বিধেয় ব্যাপ্য)AsEbInOp মানে?As Ebony Opposes Indigo. অনুমান নিয়ে আমি আগেই লিখেছি; তবে সেটা ভারতীয় দর্শনের কথা। এখানে পাশ্চাত্য দর্শনের অনুমান ব্যাপারটা সংক্ষেপে অনুধাবন করার চেষ্টা করবো।দামী জামা জুতো পরে কেউ সামনে এলেন। আমরা অনুমান করলাম যে উনি দারুণ কেতাদুরস্ত। সঙ্গে ভাবলাম বুঝি এলেমও আছে। কিন্তু কথা বলতেই বুঝলাম ভুটভাট! একেবারে অশিক্ষিত!! আবার, কোনও বিশেষ রাজনীতির লোকের সঙ্গে কেউ তার বাড়িতে গিয়ে কথা বললেই আমরা ধরে নিই, ও তার মানে…। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তারের সঙ্গে কথা বললে কি ধরে নিই যে আমরা ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তার হয়ে গেছি? না।তাহলে উপরের অনুমান গুলো হল আসলে গেরিমান! গেরিলা আর হনুমান মিলিয়ে গেরিমান! (কৃতিত্ব – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়)কোনও জানা বিষয় থেকে সাধারণত অজানা বিষয়ে পৌঁছানোর মানসিক প্রক্রিয়ার নাম হন অনুমান।এই অনুমান আবার দু’ভাগে ভাগ করা হয়। আরোহ আর অবরোহ।অবরোহে সিদ্ধান্ত কখনো হেতুবাক্যকে অতিক্রম করে না। অর্থাৎ বেশি ব্যাপক হয় না।আর আরোহে কিন্তু সিদ্ধান্ত সর্বদাই হেতুবাক্যের থেকে বেশি ব্যাপক হয়।দুটি অনুমান পদ্ধতিই কিন্তু আমরা প্রত্যহ ব্যবহার করি।এখন অবরোহ অনুমানকে আবার দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। অমাধ্যম ও মাধ্যম।অমাধ্যম অবরোহ অনুমান – সকল মানুষ হয় প্রাণী। অতএব, কোনও কোনও প্রাণী হয় মানুষ।মাধ্যম অবরোহ অনুমান – সকল দার্শনিক হন পণ্ডিত ব্যাক্তি। লক হন একজন দার্শনিক। অতএব, লক হন একজন পণ্ডিত ব্যাক্তি।এই মাধ্যম অবরোহ অনুমানে বহু সংখ্যক হেতুবাক্য ব্যবহার করা যায়। আর তাকে বলে ন্যায় শৃঙ্খল (Train of Syllogism)যদি ক হয় খ, খ হয় গ, গ হয় ঘ, আর ঘ হয় ঙ, তবে, ক হয় ঙ। অনেক দার্শনিক কিন্তু আবার অমাধ্যম অনুমানকে প্রকৃত অনুমান হবেন না। মিল এবং বেইন এই মতের প্রবক্তা। কারণ এখানে কোনও নতুন বক্তব্য বা তথ্য পরিবেশিত হয় না। যেমন – সব গোলাপ হয় সুগন্ধী। অতএব, কোনও কোনও সুগন্ধী বস্তু হয় গোলাপ। এই অমাধ্যম অনুমানকে আবার সূত্রের সাহায্যে একধরণের থেকে অন্য ধরণ করে ফেলা যায়।১) আবর্তন২) ব্যাবর্তন৩) সমবিবর্তন৪) অন্তরাবর্তন (চলবে)
  • জনতার খেরোর খাতা...
    মাননীয় স্বপন দাশগুপ্ত মহাশয়(Member of the West Bengal Legislative Assembly) - albert banerjee | মাননীয় আপনি শুধু B.J.P নয় ট্রটস্কিবাদী হিসাবেও নাকি পরিচিত।[প্রাথমিকভাবে ট্রটস্কিবাদে আকৃষ্ট পরে ইংল্যান্ডে থাকাকালীন থ্যাচারপন্থী হয়ে ওঠেন।*]আমি নিজে ট্রটস্কিবাদী এবং ভারতে যে মূল সমস্যা গুলো দেখা যায় এর সাথে আপনি ও আশা করছি একমত হবেন ১. ব্যাংক, বীমা, এবং বৃহৎ শিল্পের জাতীয়করণ।২. ভূমি সংস্কার ও কৃষি সমবায় গঠন।৩. নারী শ্রমিকদের সমান মজুরি ও কাজের সমান সুযোগ।৪. বেকারত্ব দূরীকরণ ও কর্মের গ্যারান্টি।৫. বিনামূল্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ও নূন্যতম খাবারে যোগান। এই সমস্যা সমাধানের জন্য আপনিকি চেষ্টা করবেন? যদি করেন তাহলে SOP টা কি হবে তা কি পাবলিকলি প্রকাশ করবেন? যদি না করেন তাহলে বলবেন কি কারণে এই মৌলিক সমস্যা গুলো এড়িয়ে যাচ্ছেন ?না কি সাবাল্টার্ন স্টাডিজ এর উপর একজন লেখক নিজেই ................“Adivasi Politics in Midnapur, c. 1760-1924” (সাবাল্টার্ন স্টাডিজ IV, রণজিত গুহ সম্পাদিত, ১৯৮৫), এখানে আপনার ​​​​​​​লেখা ​​​​​​​টা ​​​​​​​আছে। জিস্ট[এখানে আপনি পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর (বিশেষ করে জঙ্গল মহল অঞ্চল — গড়বেতা, গোপীবল্লভপুর, ঝাড়গ্রাম ইত্যাদি) এর আদিবাসী (প্রধানত সাঁওতাল, মাহাতো, ভূমিজ প্রভৃতি) রাজনীতির স্বায়ত্তশাসিত ঐতিহ্য ও প্রতিরোধের ইতিহাস তুলে ধরেন। এবং দেখান যে, এই অঞ্চলের আদিবাসী রাজনীতি শুধু গান্ধীবাদী/জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অংশ নয়, বরং তার থেকে আলাদা, স্বতন্ত্র একটি ধারা — যা উপনিবেশিক শাসন, জমিদারি শোষণ, দিকু (বহিরাগত) শোষক ও বাণিজ্যিক বেনিয়া গিরির বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছে। এবং অভিজাত জাতীয়তাবাদী ও ঔপনিবেশিক ইতিহাসচর্চার সমালোচনা করেন, কারণ এই ইতিহাসচর্চা আদিবাসী বিদ্রোহগুলোকে “আদিম,” “স্বতঃস্ফূর্ত,” বা “অপরাধমূলক” বলে খারিজ করে দেয়। এর পরিবর্তে, আপনি প্রান্তিক আদিবাসীদের সচেতন রাজনৈতিক সক্রিয়তা, সংগঠন এবং স্বায়ত্তশাসিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে তুলে ধরেন।] এবং উপরোক্ত ৫ টি সমস্যা কে মৌলিক সমস্যা ধরে নিয়েই আপনার কাজ আরম্ভ হয়েছে। কিছু মনে পড়ে ?* https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%AA%E0%A6%A8_%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%B6%E0%A6%97%E0%A7%81%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%A4
    এক নবীন সাহিত্য প্রতিভার আত্মপ্রকাশ  - Sandipan Majumder | THE SNOW OF THE DYING century still lay on the edge of the dark forest when Lajos von Lázár, the translucent child with water-blue eyes, first glimpsed the man he would believe to be his father for his whole life and beyond.ভাতের হাঁড়ি থেকে একটা ভাত টিপেই যেমন হাঁড়ির খবর পাওয়া যায়, তেমনই ভালো উপন্যাসের মণিমুক্তোর মত ছড়িয়ে থাকা এক আধটা লাইন কিংবা অনুচ্ছেদ থেকেই বোঝা যায় তার গুণমান। অনেক সময় উপন্যাসের প্রথম লাইনেই তার ঈঙ্গিত থাকে।যেমন ওপরের লাইনটি।নেলিও বিডেরম্যান। বয়স মাত্র বাইশ। সুইজারল্যান্ডের বাসিন্দা। জন্মসূত্রে হাঙ্গেরিয়ান। উপন্যাসটি লিখেছেন জার্মান ভাষায়। না,প্রথম নয়। জানা যাচ্ছে এর আগেও তিনি একটি উপন্যাস লিখেছেন যেটি এখন ইংরেজিতে অনুবাদ হচ্ছে। উপরের উদ্ধৃতিটি যে বইয়ের প্রথম লাইন, সেই ‘লাজার' উপন্যাসটি প্রকাশের পর ৩১টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। শতিনেক পাতার উপন্যাসে আছে হাঙ্গেরির এক ধনাঢ্য অভিজাত পরিবারের তিন প্রজন্মের কাহিনী। দু দুটি বিশ্বযুদ্ধ, হলোকাস্ট ও অভিজাতদের দায়,কম্যুনিস্ট শাসন,অভিজাতদের সম্পত্তিহানি,সোভিয়েত হস্তক্ষেপ, লাজার পরিবারের দেশত্যাগ —- বিস্তারিত বর্ণনা ছাড়াই শুধু তাদের ঘনীভূত উপস্থাপনে আমরা যেন সহযাত্রী হয়ে পড়ি এই পরিভ্রমণের। না, শুধু বড় ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতের জন্য নয়, জীবনবোধের গভীরতায় সমৃদ্ধ এত পরিণত লেখা এই বয়সে কী করে লিখেছেন নেলিও,ভাবলে অবাক হতে হয়। ভাবনার গভীরতায়,যাদু বাস্তবতার মায়াঞ্জন মাখানো ভাষার নিপুণ কারিগরিতে নেলিও আবিষ্ট করে রাখেন। এইরকম ধ্রুপদী ও গথিক ধাঁচার উপন্যাস লিখছেন জেন জি প্রজন্মের এক লেখক– এটাই অনেককে বিস্মিত করেছে। বইটির একমাস আগেও কোনো পেপারব্যাক সংস্করণ ভারতে প্রাপ্তব্য ছিল না। সুখের কথা,সেটি এখন এসেছে।পড়লে ঠকবেন না,আমার বোধবুদ্ধি অনুসারে এটুকু সুনিশ্চিত করেই বলতে পারি।
    অ-কবিতা  - Srimallar Speaks | কেন, কারণকঠিননালিশ কাজল দিলিকাজল দিলি বান্ধবীকেহতে পারিস পছন্দঝোঁকআমাকে নে নিজের কোরে।জব্দহন্যে মেঘ মোছালিমেঘ মোছালি বৈঋণীকেযেমনভাবে আহাদারুণবলিস চ’লে যাওয়ার পরে।গতিশীতল চোট লেখালিচোট লেখালি নবীনফাঁদেকারণ জানা উচিত ছিল,‘কেন’ হওয়ার অনেক আগেই... চলো, এক্ষুনিদাওদরিদ্র, পাওদরিদ্রসাধ্য মতোই ভরিয়ে দাওনাওআনন্দ, যাওআনন্দশিক্ষা দেওয়ার সাহস নাওখাওঅপূর্ব, চাওঅপূর্বসময় মতোই খাবার খাওদাওদরিদ্র, যাওআনন্দ—রোদের মধ্যে লাইন দাও
  • ভাট...
    comment. | বেডরুম সিরিজ চলছে।
    comment. | কুরুচি সংঘ ক্লাব লাইভ এখন টিভিতে।
    comment~L~ | মানালি একটা করে কমলকুমারের গল্প পড়ে উঠে একটা করে পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখে রাখতে পারে তো টইতে। এমনিতেই লোকে পড়ে না। সে যখন পড়ছেই। কোনো কোনোটা পড়তে পড়তে কঠিন লাগলেও লিখতে লিখতে এগোতে পারে।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত