এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    ভোটাধিকার থেকে বাদ যাওয়া মানুষদের নিয়ে কথা কে বলবে? - সুমন সেনগুপ্ত | অলংকরণ: রমিতদ্যা টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রাক্তন মুখ্য সম্পাদক রাজাগোপালের বহুদিনের পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণ হয়নি, পুলিশ যে তথ্য যাচাই করে, সেই তথ্য যাচাইতে জানা গেছে যে তাঁর নাম যেহেতু ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় ছিল না, তাই তিনি ভারতীয় কি না, তার স্বপক্ষে তাঁরা কোনও প্রমাণ নাকি দাখিল করতে পারেনি, তাই তাঁরা বিরূপ রিপোর্ট দিয়েছে। যা বোঝা যাচ্ছে দেশের অন্যতম বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং সম্পাদক রাজাগোপালের নাম গত ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় না থাকার ফলে, তাঁর পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণ হবে কি না, তা প্রশ্নের মুখে।এই বিষয়ে তাঁর নিজস্ব একটি বয়ান সমাজমাধ্যমে ঘুরছে। সেই বক্তব্যের বেশ কিছুটা অনুবাদ করে পড়া প্রয়োজন। আমাদের মধ্যে অনেকেই হয়ত তৃণমূলের অপশাসন গিয়ে বিজেপির শাসন ব্যবস্থা আসাতে উল্লসিত, কিন্তু সেই ভোটে কি সত্যিই মানুষের রায় প্রতিফলিত হয়েছে, এই প্রশ্নও টুকটাক উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইভিএম পুড়ে যাওয়ার ঘটনা, সেই প্রশ্নে আরো ঘৃতাহুতি দিয়েছে। তিনি লিখেছেন - “এই বছরের মার্চ মাসে, কলকাতার বালিগঞ্জ নির্বাচনী এলাকার ভোটার তালিকা থেকে আমার নাম বাদ দেওয়া হয়। এর কারণ হিসেবে বলা হয় যে, ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়ায় ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আমার বা আমার প্রয়াত বাবার কারও নামই খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমার বাবা ছিলেন একজন গান্ধীবাদী ব্যক্তিত্ব, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং কেরালার ‘গান্ধী স্মারক নিধি’র প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদক। তিনি ২০১৬ সালে প্রয়াত হন। তাঁর মতো একজন সচেতন ও দায়িত্বশীল ভোটারের নাম কীভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে, তা আমার বোধগম্য নয়।পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২৭ লক্ষ বাসিন্দার মতোই, তথাকথিত ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’র (Logical Discrepancies) কারণে আমার নামও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। আমার ম্যাট্রিকুলেশন বা মাধ্যমিক পরীক্ষার নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি; বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী গঠিত ট্রাইব্যুনালগুলোর একটিতে আমার আপিলটি বিচারাধীন রয়েছে। এর ফলে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে আমি ভোট দিতে পারিনি।আরও হতাশাজনক হলো আমার পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণের আবেদনের বিষয়টি। যদিও ১৯ মার্চ, ২০২৬-এ আমি বায়োমেট্রিক সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছিলাম, তবুও পুলিশ ভেরিফিকেশন বা যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়নি কারণ ভোটার তালিকায় আমার নাম আর নেই। বেশ কিছু বিকল্প নথিপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও আমাকে জানানো হয়েছে যে সেগুলো অপর্যাপ্ত। বস্তুত, আজ (২৭ জুন, ২০২৬) পাসপোর্ট নবায়নের জন্য বায়োমেট্রিক দেওয়ার পর ১০০ দিন অতিক্রান্ত হলো। গত সপ্তাহে পাসপোর্ট প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে কলকাতা পুলিশ একটি ‘প্রতিকূল প্রতিবেদন (adverse report) পাঠিয়েছে। আমাকে অবিলম্বে কলকাতার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে (Regional Passport Office) হাজির হতে বলা হয়েছে; কিন্তু আমি যখন সাক্ষাতের জন্য সময় (অ্যাপয়েন্টমেন্ট) চাইলাম—যা ছাড়া সেখানে প্রবেশ করা কঠিন—তখন আমাকে ১৭ জুলাই, ২০২৬-এর তারিখ দেওয়া হলো।এরই মধ্যে, ক্যালিফোর্নিয়ায় কর্মরত সাংবাদিক আমাদের মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন হলো সান ফ্রান্সিসকোতে, ১৭ এপ্রিল। বলাই বাহুল্য, বৈধ দশ-বছরের মার্কিন ভিসা থাকা সত্ত্বেও, একটি সচল পাসপোর্ট ছাড়া সেই বিয়েতে আমার পক্ষে উপস্থিত হওয়া অসম্ভব ছিল।বাস্তব বিচারে, আমি এখন এক ধরণের নাগরিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি—যদিও সরকার সম্প্রতি পুনর্ব্যক্ত করেছে যে পাসপোর্ট নাগরিকত্বের কোনো প্রমাণ নয়। আমার সারাদিনের সময়ের বড় একটা অংশ এখন ব্যয় হচ্ছে পারিবারিক নথিপত্র পুনরুদ্ধার এবং কয়েক দশক আগের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জোগাড় করার প্রচেষ্টায়... আমার দিন শুরু হয় ভোটাধিকার সংক্রান্ত আবেদনের বর্তমান অবস্থা এবং পাসপোর্টের আবেদনের গতিবিধি (ট্র্যাকার) যাচাই করার মধ্য দিয়ে। এরপর আমি সেই কলেজে চিঠি লিখি যেখানে আমার মা ১৯৬৫ সালে শিক্ষকতা করেছিলেন এবং সেই স্কুলে যেখান থেকে তিনি ১৯৫৯ সালে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন; উদ্দেশ্য হলো এমন কোনো নথিপত্র জোগাড় করা যা তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়। স্কুলটি এ ব্যাপারে বেশ সহায়তা করেছে, কিন্তু কলেজটি তা করেনি। একইভাবে, আমি কেরালার মদ্যপান-বিরোধী প্রচারণায় যুক্ত কর্মীদের সাথে কথা বলি—একটি অনলাইন গ্রুপে ঘটনাক্রমে এক কর্মীর নাম পাওয়ার পর আমি যে তালিকা তৈরি করেছিলাম, তা ধরেই এগোচ্ছি। আমি তাঁদের কাছে এমন কোনো সংবাদপত্রের কাটিং বা ছবি চাইছি যাতে অবৈধ মদের দোকান ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আমার বাবার প্রচারণার প্রমাণ পাওয়া যায়।আমার এই সব প্রচেষ্টায় কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি সহায়তা করেছেন। তবে কোনো সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিক সংগঠন বা গিল্ড (যার আমি সদস্য নই) আমার এই পরিস্থিতির প্রতি কোনো আগ্রহ দেখিয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই। একজন প্রবীণ সাংবাদিক আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই ব্যতিক্রমী নয়; কারণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লক্ষ লক্ষ ভারতীয়কে নিত্যদিনের বাস্তবতা হিসেবে এই ‘প্রত্যাখ্যান’ এর মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমি সেই যুক্তি মেনে নিয়েছি।নিজেকে ভুক্তভোগী বা ‘ভিক্টিম’ হিসেবে তুলে ধরা আমার উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না। বরং আমি একটি বৃহত্তর বিষয়কে সামনে আনতে চেয়েছি: সাংবাদিকতায় পেশাগত জীবন কাটানো এবং মোটামুটি পরিচিত একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা কোনো ব্যক্তি যদি এমন সব সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন, তবে সমাজের প্রান্তিক মানুষগুলোকে কী ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা সহজেই অনুমেয়। আমি কি কোনো সংবাদপত্রের দ্বারস্থ হয়েছি? না, কারণ আমি চাই না বিষয়টি কেবল আমাকে কেন্দ্র করেই কোনো ইস্যু হয়ে উঠুক। সম্পাদক ও সাংবাদিকরা কি আমার এই সমস্যার কথা জানেন? অবশ্যই, তাঁদের অনেকেই জানেন। আর যদি না-ই জানেন, তবে তাঁদের এই পেশায় থাকা উচিত নয়—আপনারও কি তাই মনে হয় না?তবুও, এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্পূর্ণ নীরবতা আমার সেই সন্দেহকেই নিশ্চিত করেছে—যা এখন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে আরও জোরালো হয়েছে—যে তথাকথিত মূলধারার সাংবাদিকতার সাথে আমার জীবনের খুব একটা সম্পর্ক নেই। আমি এখন আর কোনো সংবাদপত্র ‘পড়ি’ না। কোনো কোনোটির ওপর হয়তো চোখ বুলিয়ে নিই, কিন্তু কদাচিৎ এমন কিছু খুঁজে পাই যা আমার আগ্রহ জাগিয়ে তোলে।’’রাজাগোপালের এই বয়ানটি হয়ত, অনেকেই পড়েছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও নির্লিপ্ত থেকেছেন, ঠিক যেমনটা ভোটের আগে, কিংবা আসামের এনআরসি’র সময়ে ছিলেন। তখন হয়ত বেশীরভাগ মানুষ ভেবেছিলেন, এই সমস্যা শুধু মুসলমানদের বা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’দের নিয়ে হবে, তাই তখন খুব বেশী শোরগোল করেননি। সেই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোও খুব বেশী সোচ্চার হয়নি, তারা সবাই ব্যস্ত ছিল নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারে। তৃণমূল কংগ্রেসের ধারণা ছিল, যে ঐ ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে বাদ গেলেও মানুষের সমর্থন তাঁদের দিকে থাকবে। সেই জন্যেই তাঁদের শ্লোগান ছিল, ‘যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা’। অথচ তাঁদের জনভিত্তি যে কমছিল, তা তাঁরা এঁচে উঠতে পারেনি। ওদিকে বামেদের একাংশ, বিশেষ করে সিপিআইএম ভেবেছিল এই প্রক্রিয়াতে তৃণমূলের ক্ষতি হবে, সুতরাং খুব বেশী হইচই না করলেও চলবে, তাই তাঁরা দায়সারা ভাবে বিরোধিতা করেছিল। এমনকি আইএসএফের পক্ষ থেকেও নৌশাদ সিদ্দিকি’র একটা বক্তব্য এসেছিল, ‘কোনও নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা নেই মুসলমানদের বেনাগরিক করার, প্রয়োজনে গোরের মাটি এনে প্রমাণ দেওয়া যাবে তাঁরা এই দেশের বাসিন্দা’।যদি ঘটনা পরম্পরা পরপর সাজানো যায়, তাহলে দেখা যাবে, প্রাথমিক যে খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়, সেখানে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ যায়, তার মধ্যে, মৃত, স্থানান্তরিত এবং অন্য ইনিউমারেশন ফর্ম জমা না দেওয়া ব্যক্তিদের নাম ছিল। যদিও সেই তালিকা নিয়েও অনেক প্রশ্ন ছিল তবুও অনেকে এই বিষয়টা মেনে নিয়েছিলেন। এরপর নির্বাচন কমিশন আসরে নামে তাঁদের ব্রহ্মাস্ত্র নিয়ে, নামের বানান, বাবার নাম বা মায়ের নাম বা পরিবারের অন্য কোনও ব্যক্তির নাম যদি ২০০২ সালের তালিকায় না থাকে, তাঁদের শুনানিতে ডাকা হয়। বলা হয়, এই ব্যক্তিদের ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ আছে, এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সামনে উপস্থিত হয়ে তাঁদের প্রমাণ করতে হবে, তাঁরা এই দেশের নাগরিক এবং ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে তবেই তাঁরা তাঁদের নাম তুলতে পারবেন।যদি খেয়াল করা যায়, এই শুনানিতে উপস্থিত হতে বলা হয়, সেই সংখ্যাটা ছিল প্রায় ১.৫ কোটি। বিভিন্ন শুনানি কেন্দ্রে তখন যাঁরা উপস্থিত হচ্ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রাদায়ের মানুষ ছিলেন। বৃদ্ধ থেকে আশীতিপর অসুস্থ মানুষজন ও ছিলেন। রাজ্যের প্রথম সারির প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রে প্রায় প্রতিদিন এই হয়রানির ছবি প্রথম পাতায় থাকলেও, একমাত্র গণশক্তি পত্রিকা প্রথম ৬ দিন সম্পূর্ণ নীরব ছিল। তাঁরা একটি কথাও বলেনি, বা একটি ছবিও প্রকাশ করেনি। শুধু তাই নয়, নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশও কোনও এক অজ্ঞাত কারণে চুপ থেকেছে। ততদিনে বিষয়টা আদালতে গেছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে শুনানি চলছে। এই প্রক্রিয়া আদৌ সাংবিধানিক কি না, তা নিয়ে নানান প্রশ্ন উঠে গেছে। এই হয়রানি নিয়েও কথা হয়েছে, কিন্তু প্রধান বিচারপতি বারংবার বলে গেছেন, কোনওভাবেই এই প্রক্রিয়া বন্ধ করা যাবে না। তিনি মেনে নিয়েছেন মানুষের হয়রানি হচ্ছে, তার জন্য তিনি বেশ কিছু পন্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেন, কিন্তু নির্বাচন কমিশন আদৌ কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব পরীক্ষা করতে পারে কি না সেই রায় তিনি স্থগিত রাখেন। অন্য আরো একজন যে বিচারপতি এই মামলা শুনছিলেন, ঘটনাচক্রে তিনি বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও এবং বাঙালির নামের পদবী সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী স্পষ্ট করলেও, এই ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ বা যৌক্তিক অসঙ্গতি যে একেবারেই অযৌক্তিক তা স্পষ্ট করে বলেননি।ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেছে চূড়ান্ত তালিকা থেকে, যাঁরা এবারের বাংলার নির্বাচনে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হল, প্রধান বিচারপতি এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেছেন, এইবার ভোট দিতে না পারলেও পরের বার দিতে পারবেন এই মানুষেরা। সঙ্গে আরো বলেছেন, যে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে নাগরিকত্বের কোনও যোগ নেই। এই ২৭ লক্ষ মানুষকে বলা হয়েছে ট্রাইবুনালে আবেদন করতে। ততদিনে কমিশন নির্বাচন ঘোষণা করে দিয়েছে। দেখা গেছে প্রায় ৩৪ লক্ষ মানুষ ঐ ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন। তারপরে নির্বাচন হয়েছে এবং বিজেপি ২০৫টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে।তারপরে আরো অনেক ঘটনা ঘটেছে। তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙেছে। যে মানুষটি নিজে একটা রাজনৈতিক দল তৈরি করেছিলেন, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দল ধরে রাখতে পারেননি। কিন্তু সেইসব বাদ দেওয়া গেলেও ঐ বাদ যাওয়া মানুষদের কথা সবাই ক্রমশ ভুলতে বসেছে। তারপরে নতুন করে আবার এই বিষয়টা এখন সামনে আসা শুরু হয়েছে। নতুন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বাদ যাওয়া মানুষদের আর কোনও সরকারি সুযোগ সুবিধা দেওয়া যাবে না। রেশন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সুবিধা কোনটাই যেন এই ভোটার তালিকা থেকে জোর করে বাদ দেওয়া মানুষেরা না পান, সেই নির্দেশিকা জারি হয়েছে। তার মধ্যে বিদেশ মন্ত্রক থেকে বলা হয়েছে, যে পাশপোর্ট থাকা মানেই সেই ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক তা প্রমাণিত হয় না। হয়ত এই আইন আগেও ছিল, কিন্তু এই সময়ে এই কথা বলা এবং টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদকের সাম্প্রতিক বার্তা দেখিয়ে দেয়, অলিখিত ভাবে হলেও দেশের সরকার ঐ ভোটার তালিকাকেই প্রামাণ্য নথি হিসেবে ধরছেন।হয়ত রাজাগোপাল তাঁর নিজের সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারবেন। তাঁর সেই সামাজিক সুবিধা আছে, কিন্তু যে অসংখ্য মানুষের নাম বাদ গেছে, তাঁদের কী হবে? তাঁদের সম্পর্কে সিপিআইএমএল এবং সিপিআইএম ছাড়া কংগ্রেসও এখনো কোনও জোরালো কিছু বলেনি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভোটার তালিকা থেকে যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের সব ধরনের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে। বাংলায় এই প্রক্রিয়াটি চলছে এবং এরপর হিন্দি-বলয়ের বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতেও এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এর ফলে কেবল মুসলিমরাই নয়, বরং বহু দরিদ্র পরিবারও মারাত্মক পরিণতির সম্মুখীন হচ্ছে। এটি কোনো সাম্প্রদায়িক সংঘাত নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি একটি শ্রেণি বা জাতিগত (বর্ণভিত্তিক) ইস্যু। তাছাড়া, রাষ্ট্র এবং তার মদতপুষ্ট শক্তিগুলো যখন সংখ্যালঘু ও সামাজিকভাবে বা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করে, তখন তাকে আর কেবল 'সংঘাত' বলা চলে না। জেনে রাখুন, বৈষম্যের মাত্রা আরও এক ধাপ বেড়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলো ছাড়া ভোটাধিকার থেকে বাদ যাওয়া মানুষদের নিয়ে কথা কে বলবে? সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতও এই বিষয়ে এখনো অবধি কোনও কথা বলেনি। তাহলে এই মানুষদের কী হবে, এই বাদ যাওয়া মানুষেরা তবে কি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়েই থেকে যাবেন? জনগণনা থেকে তাঁরা বাদ পড়বেন না তো? একটা ‘অযৈক্তিক’ যুক্তি এত মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে, আর রাজনৈতিক দলগুলো কিচ্ছু করবে না?
    মধুবাতা ঋতায়তে - শারদা মণ্ডল | ছবি - Imagen 3ছাঁচনপুরের আত্মবিশ্বাসের কথাই যদি উঠলো তবে আর একটা আত্মবিশ্বাসের গল্প শোনাই। ঘটনাটা আমার ভৌগোলিক জীবনে অনেক দিক থেকেই খুব স্পেশাল। প্রথম ব্যাপার হচ্ছে সেই প্রথম আমি নিজের কলেজের সঙ্গে না গিয়ে অন্য কলেজের ছাত্রীদের সঙ্গে ফিল্ডে গিয়েছিলাম ফিল্ড এক্সপার্ট হয়ে। দ্বিতীয়ত এই যাওয়াটার সঙ্গে আমার শৈশবের আশাপূরণের একটা যোগসূত্র ছিল। ব্যাপারটা একটু খুলেই বলি। আমি আসলে নিবেদিতা ইস্কুলের ছাত্রী ছিলাম। সেই কবে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হলাম - সনটা ১৯৭৭। শুধু তো আমি নই, আমার বোন, আমার মা, আমার মেজ মাসি, আমার ছোট মাসি - সব্বাই নিবেদিতা ইস্কুলে পড়েছিল। আমাকে ধরে মাতৃকুলে তা সে চার প্রজন্মের সম্পর্ক। আমরা যখন ছাত্রী, সেই সময়ে ক্লাস নাইনে মেয়েদের ইস্কুল থেকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হত। অঙ্কের শিক্ষিকা ছিলেন শুক্লাদি। তাঁর স্বামী বিখ্যাত পর্বতারোহী প্রাণেশ চক্রবর্তী। তিনি নিয়ে যেতেন পুরুলিয়ার মাঠাবুরু ক্যাম্পে। আজও আন্তর্জাল জুড়ে তাঁর অজস্র কীর্তি, বহু রোমহর্ষক পর্বতাভিযানের রিপোর্ট ছড়িয়ে আছে নানান ওয়েবসাইটে। ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজনে তাঁর লেখা একটি বইয়েরও হদিশ পেয়েছিলাম - আড়াইশো পাতার বাংলা বই - হিমালয় ভ্রমণ গাইড - পাবলিশার মিত্র ঘোষ। পড়ার খুব ইচ্ছেও হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দেশে যা হয় - প্রেজেন্টলি আনঅ্যাভেলেবল। জীবনে সব আশা পূরণ হয়না। আমারও হলনা। আমি যখন নাইনে উঠলাম, কীজানি হয়ত প্রাণেশ স্যার কোন কঠিন অভিযানে বাইরে ছিলেন। তাই আমরা গেলাম শান্তিনিকেতনে। বন্ধুদের সঙ্গে সেই প্রথম বেরোনো, আনন্দ খুবই হয়েছিল - সালটা ১৯৮৫। কিন্তু ৮৭ সালে আমার দুবছরের ছোট বোন মাঠা ক্যাম্পে গেলো। তাঁবুতে থাকল, খড়ের ওপর বাড়ির কম্বল পেতে। ক্লান্ত শরীরে একদিন ফিরে দেখল ওর বিছানায় ধেড়ে কুকুর শুয়ে আছে। তাকে বার করে দিয়ে বোন শুয়ে পড়ল। একটা মাত্র কলাই করা মগ - তাতেই চা খাওয়া, আবার তাতেই প্রাতকৃত্যের পর জল শৌচ। আসলে পাহাড়ে চড়তে গেলে ন্যূনতম লাগেজ দরকার - বাড়তি আরাম চলেনা - বোন সেটাই শিখে এলো। তার ওপরে দড়ি ধরে কেমন করে উঠলো, নামতে গিয়ে কেমন দড়িতে ঝুলে গেলো, বড় বড় চোখ নাচিয়ে তার বর্ণনা দিতে লাগলো ঘুরে ঘুরে। তার বাক্য - ঝর্নার গতি যত প্রবল হোল, তার চেয়ে দুর্বার গতিতে বেড়ে চলল আমার আফশোষ। শ্রুতির স্মৃতি আর আশার কুহক, দুইয়ে মিলে কুয়াশা ঘেরা মাঠাবুরু আমাকে কেবলই তার দিকে টেনে নিয়ে গেলো মনে মনে। সশরীরে যেতে না পারলেও, একবার প্রাণেশ স্যার ইস্কুলে পর্দা টাঙিয়ে পাহাড়ে চড়ার স্লাইড দেখিয়েছিলেন - সেদিন দেখেছিলাম। জল নেই, ইঁট সাজিয়ে তার মধ্যে শুকনো পাতা ভরে আগুন জ্বালিয়ে কেমন করে চট জলদি ডিম সেদ্ধ করা যায়। জল নেই তো কী! ডিমগুলো বালি কাদা ধুলো মাখিয়ে আগুনে ফেলে দিলেই হোল। সেই কবেকার কথা, স্মৃতি এখনও কেমন জ্বলজ্বলে। আসলে আমি এমন পাহাড় পাগল কখনোই হতাম না। দোষ আমার নয়। দুজন ভূগোলের দিদি ছিলেন, কাকলিদি আর মানসীদি। দুজনে মিলে ফাইভ থেকে টেন - ছ বছর ধরে হিমালয়, আল্পস, রকি, আন্দিজ করে করে আমার গোলা মাথা একেবারে তালগোল পাকিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর আর কী! কেরিয়ার, সংসার - নানা কাজের চাপে আর সময়ের খাপে মানাতে মানাতে মাঠাবুরুতে রক ক্লাইম্বিং ক্যাম্প আমার স্বপন থেকে অবচেতনে স্থান নিল। জীবনে কিছু প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি, গড়ন ভাঙনের গল্প না থাকলে জমেনা। ধীরে ধীরে চাকরি জীবন চলে গেলো কুড়ি কুড়ি বছরের পার, উঁহু, কুড়ি তো নয় পঁচিশ। মা বাবা গত হবার পর, আবার আমি শৈশবের স্বাদ পেতে ইস্কুলের দিকে ফিরলাম। প্রাক্তনী সভার সদস্য হলাম। নিবেদিতা হেরিটেজ মিউজিয়ামে যাতায়াত শুরু করলাম। আর সেখানেই ঘটে গেলো এক আশ্চর্য ঘটনা। অশেষপ্রাণা মাতাজী আমাকে বিবেকানন্দ বিদ্যাভবনের তিরিশজন ছাত্রীকে নিয়ে পুরুলিয়ার মাঠাবুরু ক্যাম্পে যাবার অনুরোধ করলেন। চমকে উঠলাম - এও কি সম্ভব? ১৯৮৫ সালে যা নিয়ে আফশোষ ছিল, সেই সুযোগ কি তবে চার দশক পরে মানে ২০২৫ এ সত্যি সত্যি এলো? সুযোগ ছাড়ার কোন প্রশ্নই ছিলনা। আমাদের নিবেদিতা হেরিটেজ মিউজিয়ামের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে ডানা মেলেছে একটি প্রতিষ্ঠান যা হয়তো একদিন মহীরুহ হয়ে উঠবে - নীহার - নিবেদিতা ইন্সটিটিউট অফ হিউম্যান অ্যাডভান্সড রিসার্চ। নীহার একটি প্রকল্প শুরু করেছে - লীডারশিপ কোর্স। আমাদের মেয়েগুলির মধ্যে কাদের সঠিক নেত্রী হয়ে ওঠার দক্ষতা বা মানসিকতা আছে তাদেরকে চিনে নিয়ে সঠিক ভাবে পথ দেখানোই নীহারের এই লীডারশিপ কোর্সের কাজ। এই কোর্সের কতটা সম্ভাবনা আছে, তা খতিয়ে দেখার পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু হয়েছে বিবেকানন্দ বিদ্যাভবন কলেজে। একদিন আমার মাও ঐ কলেজ থেকেই পাশ করেছিলেন। এই কলেজের পঞ্চম অর্ধবর্ষের তিরিশজন মেয়ে এই কোর্সের প্রথম ছাত্রী। দস্তুরমতো ইন্টারভিউ করে এদের বেছে নেওয়া হয়েছে। এই কোর্সের অঙ্গ হিসেবে মাঠা পাহাড়ে ক্যাম্প হোল দুদিনের। সেই ক্যাম্পেই সঙ্গে চললাম আমি। হাওড়া স্টেশন থেকে রাতে আদ্রা চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার ধরে ভোরে নামলাম বরাভূম স্টেশনে। সেখান থেকে গাড়ি করে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্যে। মাঠা পাহাড়ের পাদদেশে এই রিসর্টটির নাম হল পাতালঘর। মেয়েরা রইল তাঁবুতে। আধখানা চাঁদের মত চেনটানা তাঁবুর মধ্যে দুটি করে বিছানা পাতা। কলঘরের জায়গাটি পাশেই, একটুখানি হেঁটে যেতে হয়। আর আমরা দিদিমণিরা রইলাম তাঁবুর মুখোমুখি হবিট হাউসে। এগুলোও দেখতে আধখানা চাঁদেরই মত, তবে কিনা পাকা ঘর, লাগোয়া কলঘর। ঘরে যেটুকু না থাকলে নয়, ততটুকুই পরিকাঠামো রয়েছে। ঘরের চালে মাটির পরত, তার ওপরে ঘাসের চাষ করা হয়েছে। জনপ্রিয় পশ্চিমী শিশু সাহিত্যের কাল্পনিক চরিত্র এই হবিট, যারা মাটির তলায় গর্ত করে থাকে। বিশ্ব জুড়ে ন্যূনতম স্বাচ্ছন্দে গড়া পরিবেশ বান্ধব এই হবিট হাউসগুলি পর্যটনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ বহু মানুষই এখন প্রাচুর্য, বাহুল্য ছেড়ে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে সাধারণ ভাবে কয়েকটা দিন কাটাতে চায়। শুনলাম, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম হবিট হাউস এই পাতালঘর, বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে তৈরি করা হয়েছে। দরকার মত কম বেশি তাঁবু খাটিয়ে দেওয়া হয়, আর হবিট হাউস আছে সাতটা। সেখানেও দুজন বা তিনজন করে আরামসেই থাকা যায়। রান্নাঘর আর খাবার জায়গা আলাদা। কাউন্টার থেকে নিজেকে খাবার নিয়ে আসতে হয়। পরিবেশনের বন্দোবস্ত নেই। পানীয় জল কোন ফিল্টার ছাড়া অবিশ্বাস্য ভাবে স্বাস্থ্যকর, সমস্যা একটাই ঐ জলের গুণে খুব খিদে পেয়ে যায়। যাই হোক চারপাশের বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য ইত্যাদি দেখার সময় মিললোনা, কারণ ট্রেনিং শুরু হয়ে গেলো। মেয়েদের দেওয়া হোল পনের মিনিট সময়, যার মধ্যে যে যার তাঁবুতে ঢুকে, ব্যাগ রেখে, আর কিছু বন্দোবস্ত করে লাইনে দাঁড়াতে হবে। তবে জুতো থাকবে তাঁবুর বাইরে। কেবল রাতে জুতোজোড়া তাঁবুতে ঢুকিয়ে নিতে হবে। না না দুষ্টু মানুষের ভয় এখানে নেই, তবে কোন বন্য জন্তু ভালোবেসে যদি মুখে করে এক পাটি বা দুটো পাটিই নিয়ে যায়, তার দায় কর্তৃপক্ষের নয়। পাশে কলঘরে গিয়ে চোখেমুখে জল দিয়ে আসতেই পারে, তবে তাতে সময়ের ছাড় নেই, তাই অতটা ঝুঁকি না নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের মেয়েরা বুদ্ধিমতী, তারা ও পথ মাড়ালোনা। কিন্তু আমরা? মেয়েরা পনের মিনিট হলে তাদের ম্যামেরা কি পনের ঘন্টা সময় নিতে পারে? আমরাও ভুরু কুঁচকে তিরিশ মিনিটে মাঠে পৌঁছলাম। মাঠে ততক্ষণে খাটানো হয়েছে এক খাড়াই দড়ির জাল। নীচ থেকে প্রথমবার ওপরে তাকালে জ্যাকের বীনস্টক গাছে ওঠা মনে পড়ে যায় বটে। আমাদের মেয়েরা সারি দিয়ে দাঁড়িয়েছে একে একে সেই জাল বেয়ে আকাশের কাছে পাড়ি জমানোর জন্য। তাদের কারোর চোখে অভিযাত্রীর আহ্লাদ তো কারোর করুণ দৃষ্টিতে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচির আকুতি। দেখলাম পেল্লাই গাছেদের শরীর আর শক্ত শক্ত খুঁটির সঙ্গে বাঁধা ঐ জাল, দুপাশে দক্ষ ট্রেনারদের বজ্র মুঠি আর তীক্ষ্ণ নজরের আওতায় রয়েছে। পান থেকে চুন খসার জোটি নেই। দর্শক আমরা চারজন - বড় মাতাজী, ছোট মাতাজী, সঙ্গে বৈশাখী আর আমি দুই দিদিজী। বৈশাখীও আমার মতই আর একটি কলেজের ভূগোলের দিদিমণি। সেদিন মাঠা পাহাড়ের আকাশ বড় নীল, পাহাড় বড় সবুজ, কাঁচা হলুদ সর্ষে ফুলের মত রোদ বুঝি সবার কানেই বাঁশি বাজাচ্ছিল। একটা মিঠেকড়া ঠান্ডা বাতাস সোয়েটার চাদরের ভিতর দিয়ে খালি লুকোচুরি খেলছিল। বাতাসে বন তুলসীর ঝাঁজ - এমনি দিনে মানুষের মুখোশ খুলে মুখ বেরিয়ে পড়ে। পাকা চুলের পর্দা সরিয়ে মুখ বাড়ায় কিশোরী মন। ২০২৫ কে সরিয়ে রেখে এতদিন বাদে বেরিয়ে পড়ে ১৯৮৫। মাথার দুপাশে পুঁচু পুঁচু বেণী বেঁধে তাতে অপটু হাতে লাল ফিতে বাঁধা শারদা মেয়েদের লাইনে দাঁড়ায় জাল বাইবে বলে।হলদে রোদের মিশেল দেওয়া হলুদ রঙের মোটা আর শক্ত প্লাস্টিক দড়ির জাল। আমি প্রাণপণ চাইছিলাম সবটুকু শিখে নিতে, আসলে এমন সুযোগ আর কোনদিনও আসবে কিনা জানা নেই, তাই চাইছিলাম যা কিছু ঘটছে তার সব কিছু শুষে নিতে। তিনটি উপকরণ - হেলমেট, হারনেস আর ক্যারাবিনার। আমার মাথায় যখন লেডী ট্রেনার হেলমেট পরিয়ে দিলেন, আমার মনে মনে হাসি পেল। শিক্ষার্থীর পা পিছলে মাথা ছাতু হবার ভয় আছে ওঁদের। কিছু হয়ে গেলে জবাবদিহি করতে হবে যে। তবে নাঃ আমার একটুও ভয় করছেনা। চিরকালই পরীক্ষা সামনে এলে কেমন একটা উল্লাস হয় আমার। হেলমেটের পর হারনেস বাঁধা - মহিলা এতটাই কষে সেটি আমার কোমরে বাঁধলেন যে আমি একেবারে ককিয়ে উঠলাম। পেট - কোমরটি যে আর ১৯৮৫ র নেই, তার চারিদিকে তেল-ঘি-মাখন-চীজ - আরো কতকিছুর থাক থাক মেখলা। কোমর বন্ধনীটির একটি অংশ পাদুটোকে গোল গোল ফাঁসের মত আটকে রেখেছে। অর্থাৎ যদি কিছু ঐ পিছলানো টিছলানো (ভগবান না করুন) - তবে ওই ফাঁসে আটকে মোটামুটি পাখি হয়ে ডানা ঝাপটানো যাবে। তবে মেখলা - বন্ধনী যা কিছুই থাক, দড়ির জালের এপাশ ওপাশ টানা দড়িটি দুপাশের ট্রেনারদের হাতে বন্দী। ঐ দড়িটিই লাইফ লাইন - সেটা আবার আমার বন্ধনীটির সঙ্গে একটি মোক্ষম ক্লিপ দিয়ে আঁটা। আর এই ক্লিপটাই হল ক্যারাবিনার - যার ভরসায় আমি মেঘের দিকে মোর তনু - ক্যারাভান লয়ে পাড়ি দেব। আসলে ছাত্রীরা কেমন করে উঠছে, কী কী ভুল হচ্ছে, কোনভাবে ওঠাটা ঠিক, শিক্ষকরা কী নির্দেশ দিচ্ছেন, এগুলো আমি নিবিষ্ট মনে দেখছিলাম। কিন্তু দেখে শেখা এক, আর ঠেকে শেখা আরেক। দেখে শিখলাম যে, জালের দিকে মুখ করে দাঁড়াও, জালের ঠিক গ্রন্থিগুলোতে পা দিতে হবে, তা নইলে জোর পাবেনা। হাত দিয়ে জাল ধরবে, কিন্তু হাত থাকবে কাঁধের লেভেলের ওপরে - নইলে শরীরের ব্যালেন্স থাকেনা। এবারে উঠতে গিয়ে দেখি জাল থলথল, হাওয়া খলবল, পা টলটল, ঘাম গলগল, বুক ধকধক, হাঁটু ক্যাঁচকোচ, কাঁধ খিঁচমিচ - এমনতরো কত কী? কিন্তু নীচের ঢালু অংশটা পেরোনোর পর খাড়া অংশটায় যেতে যেতে ছন্দটা বুঝে গেলাম। একেবারে টিকটিকির মত - ডান হাত আর ডান হাঁটু তোলো, তারপর বাঁ হাত বাঁ হাটু ডানদিকের চেয়ে উঁচুতে তোল - কেল্লা ফতে। আবার উলটো দিকে একই নিয়মে নেমে এলাম কোন মতে। এদিকে হাঁফানো, ওদিকে আনন্দে লাফানো, সে আমার সসেমিরা অবস্থা। ট্রেন ধরার আগের দিন পর্যন্ত ধুঁকছিলাম - যেতে কী পারবো? এত বড় দায়িত্ব, নেওয়া কি উচিত হবে? এখন দেখছি, আমার শরীরে যত ব্যাথাবুথা সব উধাও। কতদিন পরে আমার আমিকে নিজের করে ফিরে পেলাম! সব চেয়ে বড় হল আমি পেরেছি - আমি পারি - পৃথিবীর যে কোন সমস্যা সামনে আসুক না - লড়কে লেঙ্গে মেরা খোয়াবিস্তান। মেয়েদের মোবাইল ফোন জমা দিয়ে দিতে হয়েছিল। আমরা টীচার বলে ছাড় ছিল। কিন্তু খানিকটা স্বেচ্ছাতেই দিনের বেশিরভাগ সময়ে ও জিনিসটিকে ত্যাগ দিয়েছিলাম। আর দিয়েছিলাম বলেই প্রতি মূহূর্তে ছবিছাপা দিয়ে আপডেট দেওয়া আর আপডেটেড হয়ে থাকার বালাই ছিলনা। প্রকৃতির কোলে সত্যি সত্যি শান্তি আর আরাম উপভোগ করছিলাম। শরীরে যতই পরিশ্রম হোক, এ হল “প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি”। একটা দিনে কত যে কাজ হল, আমরা নিজেরাই অবাক। এই ধরা যাক - দড়ির ব্রিজ পেরোনো। জিপ লাইনিঙের মত হারনেস ক্যারাবিনারের ভরসায় ঝুলে ঝুলে জলা পেরোনো - যার পোষাকী নাম - রিভার ক্রসিং। রাতে ঠান্ডা ঘন হয়ে আসে। অন্ধকারের হাত ধরে আকাশ মাটির সীমানা মুছে বন যেন কাছে আসে, হাওয়ার ঝোঁকে ফিসফিসিয়ে ও কী কিছু বলে যায়? শহরের মত লেট নাইটের সুযোগ এখানে নেই। ঘড়ি ধরে খেতে বসা, নিজেই কাউন্টার থেকে খাবার নিয়ে আসা, আবার খাওয়া শেষে থালা বাটি মেজে রাখা পরের দিনের ব্যবহারের জন্য। কোন দাও, লাও এর ব্যাপার নেই - “আপনা হাত জগন্নাথ, করবে ভাই বাজিমাৎ”। বিছানায় যাবার আগে অভ্যাস মত ডায়রি নিয়ে বসি। এই পাহাড়ে চড়ার ট্রেনিঙের সঙ্গে আমার জীবনে আর একটা জিনিস ঘটে গেছে। আসলে যে কলেজের সঙ্গে এসেছি সেটা তো আমার নিজের চেনা কলেজ নয়, তাই ছাত্রীদের ওপরে শিক্ষক হিসেবে সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ছিলনা। যেটা ফিল্ডে খুব দরকার। তাই আমি প্রথম পরিচয়েই বলে নিয়েছিলাম যে যেহেতু আমি এককালের রামকৃষ্ণ সারদা মিশনের ছাত্রী, তাই তোমাদের মত আমি এই ক্ল্যানেরই সন্তান। এটা বলেছিলাম যাতে ওরা আমাকে অ্যাকসেপ্ট করে নেয়। আসলে ওদের কাছে তো আমি বহিরাগত। তাই স্ট্র্যাটেজিক ইনসাইডার হয়ে ওঠার তাগিদে এই অস্ত্র প্রয়োগ করেছিলাম, আমার আর ছাত্রীদের মাঝখানের প্রাতিষ্ঠানিক ভয়ের আর অচেনার প্রাচীরটা যাতে ভেঙে যায়। দেখলাম এতে আশ্চর্য কাজ দিয়েছে। ওরা আমাকে আর ‘নজরদার’ বা নিয়ন্ত্রক ভাবছে না, বরং ভাবছে নিজেদেরই একজন। মাঠাবুরুতে দেখলাম ওরা আমাকে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর নয়, সিনিয়র দিদি ভেবে নিয়েছে। কাছে আসছে, টীচারদের কাছে যেকথা গোপন করতে হবে সেটারও সাহায্য চাইছে, তুমি তুমি করে কথা বলছে। এটা আমার কাছে একটা সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। আমার নিজের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মনের টান, তথ্য বিনিময় স্বাভাবিক ভাবেই অনেক বেশি। কিন্তু সেই সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ক্লাসরুম, যেখানে ক্ষমতার হায়ারারকি বা ধাপ আছে - শিক্ষক ওপরে, স্টুডেন্ট নিচে। ভূগোলের শিক্ষক হিসেবে আমি হয়তো এতদিন ফিল্ডে ‘কন্ট্রোল’ বা শাসনকেই সবচেয়ে জরুরি মনে করেছি। শাসনের দরকারও আছে। আজকাল যা দিন পড়েছে, ছেলেমেয়েরা প্রকৃতির কাছ থেকে কিছু শিখুক আর না শিখুক, পরিবার বা সমাজের কাছ থেকে একটা মোক্ষম কথা খুব ভালো করে শিখে যায়, যে প্রকৃতির কাছে গেলে মাদক নিয়ে নেশা করতে হয়। এই পিয়ার প্রেশার এতটাই যে যারা এর মধ্যে ছিলনা, তারাও ঢুকতে বাধ্য হয়। মুক্ত প্রকৃতি হয়ে ওঠে একধরণের লিমিনাল স্পেস' - বা ‘সীমান্তবর্তী মুক্ত অঞ্চল’ - যেখানে কেউ চেনেনা, যা খুশি করা যায় - এক ধরণের ছদ্ম স্বাধীনতার জায়গা। মিশনের এই ছাত্রীদের নিয়ে বিশেষ করে পাহাড় চড়া ক্যাম্পে এধরণের কোন আশংকা নেই। তাই ছাত্রীদের সঙ্গে শাসন নয় সখ্যতা - বেশ উপভোগ করছি। এইসব সময়ে মনে আরও আকাশ পাতাল সব চিন্তা আসে। আজকে শিখলাম দড়ির জাল বাওয়া, দড়িতে হাঁটা আর দড়িতে ঝুলে নদী পেরোনো। কোনো দুর্গম জায়গায় সার্ভে করতে গেলে অথবা কোন ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের সময়ে এইসব স্কিল খুব কাজে লাগে। একটা সময়ে খুব ভাবতাম যে আমি আমার স্যার মনতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাষ রঞ্জন বসু, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মত বা তাঁদের স্যার থর্নবারি, উলরিজ মরগ্যান বা ডেভিস, পেঙ্কের মত পাহাড় নদী চষে বেড়াতে পারিনি। নতুন কিছু আবিষ্কার করতে পারিনি। মনে খুব আফশোস হত। কিন্তু ধীরে ধীরে যতই ক্রিটিকাল বা তারও পরে পোস্ট মডার্ন ভূগোলের সংস্পর্শে এলাম তখন আবার ভাবনাটা খানিকটা বদলে গেল। অনুভব করলাম যে এবল বডিড মেল না হয়েও আমি আমার জীবনে এই পৃথিবীকে দেখেছি এক সংবেদনশীল নারীর চোখে। এটাই বা কম কী! আসলে উইলিয়াম মরিস ডেভিস, ওয়াল্টার পেঙ্ক, ডব্লিউ ডি থর্নবারি বা সি ডব্লিউ উলরিজদের মতো ভূবিজ্ঞানীরা—কিংবা আমাদের বাংলার শ্রদ্ধেয় মনতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাষ রঞ্জন বসু বা সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্যারেরা যে সময়ে ভূগোল চর্চা করেছেন, তখন বিষয়টার মূল ধারাটাই ছিল পজিটিভিসম (প্রত্যক্ষবাদ) এবং জিওমরফোলজি কেন্দ্রিক। তারও আগে উনিশ শতকে ভূগোল ছিল মূলত পুরুষালি অ্যাডভেঞ্চার এবং যেন একটা সাম্রাজ্য বিস্তারের হাতিয়ার। ধরে নেওয়া হতো, ভূগোল মানেই হলো একজন ‘এবল-বডিড মেল’ বা শারীরিকভাবে শক্তিশালী পুরুষ দুর্গম পাহাড়ে চড়বেন, নদী চষে বেড়াবেন, মানচিত্র আঁকবেন আর নতুন জায়গা ‘আবিষ্কার’ বা জয় করবেন। প্রকৃতি তখন যেন ছিল একটা জ্যামিতিক বস্তু। আর আমি যে আফশোষে ভুগছি, তা আসলে আমার ব্যক্তিগত খামতি নয়, শত বছরের তৈরি করা একটি পুরুষতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যার জন্য আমি নিজেই নিজেকে ‘অভিযাত্রী’ আইডেন্টিটি দিতে পারিনা, মানে কুণ্ঠাবোধ করি। হবিট হাউসের বাইরের আকাশ এখন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। আকাশে চাঁদ নেই, তাই হাজার তারার আলো। সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। চলবে...
    রুশ টি সেট আর পেয়ারাতলায় মেম বৌমা - স্মৃতি ভদ্র | অলংকরণ: রমিতছায়া দোলানো দুপুর হোক কিংবা নিহার জড়ানো সন্ধ্যা, বড়ঘরের লালবারান্দা আসলে কখনই বিরান হতো না। সাংসারিক কাজের অবসরে খানিক জিরিয়ে নেওয়ার অজুহাতে অথবা উনুনপাড়ের নুনতেলের গন্ধ গা থেকে মুছে নিজেকে একটু পরিপাটি করে তোলার ইচ্ছা---সেই লাল বারান্দাই হয়ে উঠতো সকলের একমাত্র গন্তব্য। নেহাতই লালমেঝের একহারা বারান্দা। তাতে ঐশ্বর্য বলতে দিনের নানাসময়ে নানারকম ছায়ার আল্পনা ছাড়া আর কীইবা ছিল। কখনও বাইরবাড়ির দেবদারু বাগানের নিছিদ্র ছায়া আবার কখনও প্রকান্ড বরইগাছের আড় পেরিয়ে পেয়ারাগাছের মাথাদোলানো ছায়া, ব্যস্ অতটুকুই। তবুও সে বারান্দা নিজ মহিমায় আমাদের বাড়ির সৌখিন স্থান হয়ে উঠেছিলো নির্দ্বিধায় তখন। কিন্তু সৌখিনতা শব্দটির সঙ্গে তখনও পরিচয় হয়নি আমার। সময়ের সরল রৈখিক পথ ধরে চলতে গিয়ে চারপাশে যা কিছু মিলতো সবই তখন আমার কাছে জীবনের নামান্তর। আর সে পাওয়ায় কখনও বাহুল্য ছিল না। তাই নকশা কাটা কাঠের দুটো থাম, দেয়ালে হেলান দিয়ে নির্ভার দাঁড়িয়ে থাকা ক'খানা পিঁড়ি আর পেতলের ঘটি ভরা জল। এতটুকুই। আমাদের বাড়ির লাল বারান্দার এক জীবনঘনিষ্ঠ ছবি। তবুও সেই সাধারণ বারান্দায় জ্বলজ্বল করতো বাড়ির সকল অন্তরঙ্গ আনন্দ। এজন্যই মনে হয় ঠাকুমা সে বারান্দার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিতেই নকশিকাটা কাঠের থামে ঝুলিয়ে দিয়েছিলো রাশিয়ান ডিম্বাকৃতির একটা আয়না।শুধু অতটুকুই সংযুক্তি। তাতেই সেই লাল বারান্দা সাজঘরের গৌরবটুকুও গায়ে জড়িয়ে নিয়েছিলো অক্লেশে। প্রতিদিন সকালে নিত্যপূজা শেষে নাকে-কপালে তিলক আঁকা ঠাকুমা উনুনের আগুনদিনে পা বাড়াবার আগে সে আয়নায় সামনে দঁড়িয়ে চুলের খোঁপায় আরেকপ্রস্ত চিরুনী বুলিয়ে নিতো বেশ যত্ন করেই। আবার আগুন ঘামে তিলক গলানো সময় ফুরালে কলঘর থেকে কসকো সাবানের ঘ্রাণ সারা উঠোন ছড়িয়ে যখন লাল বারান্দায় এসে দাঁড়াতো ঠাকুমা, তখনও ওই রাশিয়ান আয়নাই ঠাকুমার প্রতিচ্ছবি হয়ে হেসে উঠতো সারাদিনের প্রতীক্ষা শেষে। এরপর তিব্বত স্নো...তিব্বত ট্যালকম পাউডার…তর্জনীর ডগায় ভরিয়ে সিঁদুরের টিপ…উঠোনজুড়ে ঠাকুমার ঘ্রাণ। আর লাল বারান্দায় থামে ঝোলানো আয়নায় পরিমিত লাবণ্যময়তার এক টুকরো স্নিগ্ধ সময়। এরপর বারবেলার নিরালা দুপুর। লালবারান্দায় পশ্চিম আকাশের তেজ কমে আসা রোদ। বরইগাছের গায়ে উটকো বাতাস। ভুল করে উড়ে আসা ডালিমগাছের ঘরছাড়া ফুল। লো ভলিউমের রেডিওর অবিছিন্ন বার্তালাপ। আর আমাদের ভাতঘুমের অপরিবর্তনীয় রুটিন। কিন্তু কিছু কিছু দিনে গড়পড়তা হিসেবেও টান পড়তো। নিরালা দুপুরের শ্রান্ত সময়ও হয়ে উঠতো নির্বাক চালচিত্রের স্থির অবকাশ। সেসব দুপুর ঠিক অন্য দুপুরগুলোর থেকে আলাদা হতো। চিরায়ত দুপুর থেকে সময় চুরি করে ঠাকুমা কাঠের বাক্স থেকে টেনে বের করতো বেশ বড়সড় একটা এ্যালবাম। সাদাকালো ছবির এ্যালবাম। তার পাতা উল্টাতেই থেমে যেতো ঠাকুমার সময়। একদৃষ্টি। লুকোনো দীর্ঘশ্বাস। আর আড়ষ্ট আঙুলে ছুঁয়ে থাকা এ্যালবামের পাতা। দুপুরগুলো কেমন যেন নি:স্ব হয়ে উঠতো।সাহেব কাকু। সেই কবে রাশিয়ায় পড়তে গিয়েছিলেন। আর ফেরেননি। ফিরতো পোস্টাকার্ডের চিঠি, ফিরতো এ্যালবামের ছবি। সেই ছবিতে কতগুলো তরুণ তরুণী। কখনো তারা সমুদ্রের পাড়ে রৌদ্রস্নাত। কখনো পরিপাটি ঘরে আনন্দরত। প্রতিটি ছবিতেই সাহেবকাকুর পাশে পুতুলের মতো দেখতে এক তরুণী। আমার মেম বৌমা। সালটা আশির মধ্যভাগ হবে। হঠাৎ করেই পোস্টাকার্ডের কয়েকটা বাক্য আমাদের বাড়ির উৎসবের অজুহাত হয়ে উঠলো। উঠোনের অন্যপাশে সদ্য গড়ে ওঠা ঘরের দেয়াল বারবার ঝেড়েমুছে পরিস্কার রাখা, উপরের ঘর থেকে পেতলের বড় বড় হাঁড়িকুড়ি নামিয়ে সেসব ধুয়ে রোদে শুকিয়ে রাখা, ধুনুরি ডেকে শিমুল তুলায় বালিশ ভরা---সে এক মহাযজ্ঞ। কারো কথা বলার সময় নেই। দু-দন্ড বসে অবসর উৎযাপন নেই। শুধু আয়োজন আর আয়োজন। ঝুনো নারিকেলের তক্তি বয়ামে ওঠে, কুলের আচার রোদে পড়ে, তিলের কটকটি পাথরের থালে জুড়ায়---তবুও কাজ ফুরায় না।অবশেষে কিছু কাজ বাকী রেখেই বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালো সেই দিন। এসে দাঁড়ালো নীলচোখের রাশিয়ান মেম বৌমা। সৌখিনতা শব্দের সঙ্গে আমার পরিচয় ঠিক সেই মুহুর্ত থেকেই। ধানদূর্বায় বরণ আর লালঝালড়ের তালপাখায় আম্রপল্লব ছোঁয়ানো হাওয়ার আশীর্বাদ শেষে মেম বৌমা লাল বারান্দায় উঠতেই উঠোন ভরে গিয়েছিলো মানুষে। পাড়া পেরিয়ে, গ্রাম পেরিয়ে,, নদী পেরিয়ে সবাই দেখতে এসেছিলো মেম বৌকে। লম্বা জার্ণির ক্লান্তি জড়ানো চেহারায় জ্বলজ্বলে নীল চোখের মানুষটির হাসিমুখ বলে দিয়েছিলো অদ্ভুত সেই পরিস্থিতি আগে থেকেই অবগত করা হয়েছিলো তাঁকে। কেউ অকারণে হাসে, কেউ অবাক চোখে তাকায়, কেউ ছুঁয়ে দেখতে চায়, কেউ ইচ্ছে করেই টিপ্পনী কাটে---বুঝে কিংবা না বুঝেও মেম বৌমার সেই একই হাসিমাখা মুখ। কিন্তু তা আর কতক্ষণ! তাই মেম বৌ দেখার লৌকিকতা শেষে বাড়ির বৌ পা রাখলো বড় ঘরে। মধ্যবিত্ত বাঙালী ঘরে প্রবেশ হলো সীমানাহীন আন্তর্জাতিকতা। মিডি স্কার্ট পড়া মেম বৌ যখন নিত্যঠাকুরের সামনে দু'হাত কপালে ঠেকিয়ে অদ্ভুত বাংলায় উচ্চারণ করে,টাকুর...তখন হেসে গড়িয়ে পড়া নয়, আদর করে সামলে নেওয়া ঠাকুমা নিজের মাথায় ঘোমটা টেনে বলে ওঠে,রাধাগোবিন্দ...কাঁটাচামচ দিয়ে ইলিশমাছ খাবার বায়না দেখে চিতল মাছে কোরা এগিয়ে দিতে দিতে বলে ঠাকুমাই আবার ত্রাণকর্তা,নাতাশা বৌমা...ঝাল ছাড়া রান্না করেছি মিঠা করে...খাও...কিন্তু মেম বৌমা কি শুধুই বসে বসে এসব আপ্যায়ন নেবে? তা কীভাবে হয়। তাই সবার জন্য নিজে হাতে চা বানানোর বায়না ধরতেই মনিপিসি এগিয়ে এসেছিলো বন্ধু হয়ে। লালবারান্দায় কেরোসিনের স্টোভে নীল আঁচ উঠতেই তাতে বসেছিলো পেতলের খাবড়ি। জল ফুঁটে উঠতেই রাশিয়ান বিশেষ চা পাতা ঘ্রাণ ছড়িয়েছিলো বাড়ির সেই আনন্দময় দিনগুলোর গায়ে আরও একটু খুশি ছড়িয়ে দিয়ে।আর লাল বারান্দায় মহাসমারোহে বেরিয়ে এসেছিলো রাশিয়ান টি সেট। ফুলের ছবি আঁকা সেই টি সেট নাকি ছিল মেম বৌমার সৌখিন কালেকশনের একটি অংশ। বারানভকা নামের কোনো এক অচেনা জায়গা থেকে আগত সেই টি সেট আমাদের বাড়ির অন্যতন সৌখিন অনুসঙ্গ হয়ে উঠেছিলো সেদিন থেকে।তবে সত্যিকারের সৌখিনতা তো ছিল নীল চোখের রাশিয়ান মেম বৌ। কখনো লালপেড়ে গরদ শাড়ি আর কপালে সিঁদুরের টিপ পড়িয়ে বাঙালি বানিয়ে দেবার ইচ্ছা, আবার কখনো উঠোনের উনুনে আতপ চালের ঘি ভাতে কিশমিশ ছড়িয়ে দেবার অনুরোধ---সবকিছুতেই বাড়ির সকলের ছিল অন্য সংস্কৃতির মানুষটিকে বাঙালি বানিয়ে দেবার সুপ্ত আকাঙ্খা। আর মেম বৌ?নীল চোখের তারায় হাসি ভাসিয়ে ক'দিনেই হয়ে উঠেছিলো মধ্যবিত্ত বাড়ির সকলের সৌখিন আত্মীয়।
  • হরিদাস পালেরা...
    মেসি মোর্চা বনাম রোনালদো সমিতি  - সৈয়দ তৌশিফ আহমেদ | খ্রিষ্টাব্দ ৩৯৮৭। মহাশূন্যের আগন্তুকরা পৃথিবীর পূর্বাঞ্চলে পশ্চিমবঙ্গ নামক এক লুপ্ত প্রদেশের ধ্বংসাবশেষ খুঁড়ে বের করল। এখানে বাস করত এমনই এক বিচিত্র মানবগোষ্ঠী, যারা অবান্তর বিষয়ে দিবারাত্রি কোন্দল করাকে নিজেদের সাংস্কৃতিক চর্চা বলে মনে করত। এবং নানান বিষয়ে খোপবাজি করে অতিষ্ঠ করে তুলত অন্যের জীবন। জীবজগতে ছারপোকা যেমন অতি তুচ্ছ প্রাণী হয়েও বিছানায় সেঁধিয়ে থেকে মানুষের ঘুম ও রতিক্রিয়ার বারোটা বাজানোর ক্ষমতা রাখে, তেমনই এই অদ্ভুত জনগোষ্ঠীও তাদের অবিরাম নাকগলানো স্বভাব ও অনন্ত মতামত-উৎপাদনের মাধ্যমে গোটা পৃথিবীকে ক্লান্ত, বিরক্ত এবং ক্ষিপ্ত করে রাখত।ঠিক কী হেতুতে এই বিচিত্র জাতির বিদায়ঘণ্টা বাজে, তা নিয়ে ভিনগ্রহী গবেষকদের মনে ছিল উদগ্র কৌতূহল। তাঁরা আন্দাজ করেছিলেন, এত প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু এক সভ্যতার পতনের পিছনে নিশ্চয়ই মহামারি, খাদ্যসংকট কিংবা জলবায়ু-বিপর্যয়ের মতো কোনও অবশ্যম্ভাবী কারণ নিহিত থাকবে। কিন্তু বিস্তীর্ণ সমভূমির ছাতি বরাবর কোপাকুপি করতেই মাটির নিচ থেকে উঠে আসতে থাকে এমন সব নমুনা, যা দেখে ভিনগ্রহী প্রত্নতাত্ত্বিকদের চক্ষু চড়কগাছ।পলির আস্তরণ ভেদ করতেই মিলল: তিন কোটি ফর্দাফাঁই হওয়া আকাশি-সাদা জার্সি, দেড় কোটি শতচ্ছিন্ন লাল-সবুজ হেডব্যান্ড এবং কোটি কোটি স্মার্টফোনের কঙ্কাল। তবে সবচেয়ে বড় চমকটি অপেক্ষা করছিল মাটির আরেকটু গভীরে। গভীর পলি খুঁড়ে উদ্ধার হলো একটি অবিনশ্বর প্লাস্টিকের ঝান্ডা - যাতে লেখা, “মেসি মানে কাব্য, রোনালদো মানে মাংসপেশি”। তার ঠিক পাশেই, পুঁতে রাখা ছিল প্রতিপক্ষের পাল্টা ধ্বজা- “রোনালদো মানে শ্রম, মেসি মানে জোচ্চুরি”।লিপি উদ্ধার করা গেলেও, এই গূঢ় বাক্যের অর্থ বুঝতে গিয়ে এলিয়েন গবেষকদের রীতিমতো ল্যাজেগোবরে হওয়ার জোগাড়! এই 'মেসি' বা 'রোনালদো' বস্তুটি আসলে কী? এরা কি প্রাচীন কোনও দেবতা? ভয়ংকর কোনও দলপতি? নাকি কোনও প্রতাপশালী সামন্তপ্রভু?এতকিছু শুরুতেই বোধগম্য না হলেও, অন্তত এটুকু জলের মতো সাফ হয়ে গেল যে, এই লুপ্ত জাতিটি ছিল ঘোরতর 'প্লাস্টিক-পাগল'। তারা যেমন প্রতিবাদের প্যামপ্লেটে প্লাস্টিক ব্যবহার করত, তেমনই মুখেভাতের মেনুকার্ডেও। এত শতাব্দী পরেও মাটির নিচে অক্ষত ঝাণ্ডার মূল কারণ এই অবিনশ্বর পলিমার যৌগটি।ডিজিটাল ধ্বংসাবশেষ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গবেষকেরা প্রথম দিকটায় মুহুর্মুহু “GOAT” শব্দের ব্যাপক অভিঘাতে রীতিমতো ভিরমি খাচ্ছিলেন। তাঁদের স্থির বিশ্বাস জন্মেছিল, এই 'GOAT' নিশ্চয়ই মিশরীয় শেয়াল-দেবতা আনুবিসের মতোই ছাগল-মুখো প্রাচীন কোনও স্থানীয় উপাস্য। কারণ এত উত্তেজনা, এত খেয়োখেয়ি, এমন অনন্ত খিস্তি-খেউড়, প্রকাশ্য ল্যাং-মারামারি, এমনকি অনায়াস বন্ধুত্ব-বিয়োগ -এসব প্রলয়কাণ্ড যে স্রেফ চামড়ার একটি বল লাথানোর বিনোদন থেকে জন্মাতে পারে, সে কথা আকাশচারী গবেষকদের সুস্থ প্রত্ন-মস্তিষ্কে কিছুতেই ধরছিল না।পরবর্তী গবেষণায় অবশ্য আরও বিচিত্র সব তথ্যের হদিশ মেলে। ডিজিটাল ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার হয় “ফেসবুক” নামের এক প্রকাণ্ড ভার্চুয়াল খোঁয়াড়, যেখানে আক্ষরিক অর্থেই বাঁধা পড়েছিল গোটা জনজাতি। সেখানকার 'লাইক'-মুদ্রা অর্জন করে তারা খরিদ করত সামাজিক প্রভাব ও প্রতিপত্তি। হাসিল করত বন্ধু বান্ধবী। এছাড়া “হোয়াটসঅ্যাপ” নামের এক নর্দমা-সদৃশ গোপন পরিসরের শিলালেখ পরীক্ষা করে গবেষকেরা বুঝতে পারেন, এই ভয়ংকর গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আদপে মানুষের পায়ে লাথির নানারকম কৃৎকৌশল ও তার বিন্যাসকে ঘিরেই আবর্তিত। অর্থাৎ, বিষয়টি ‘ফুটবল’ নামক এক আদিম ক্রীড়া মাত্র!এই ফেসবুক-খোঁয়াড়ের সবচেয়ে মূল্যবান আবিষ্কার ছিল “কমেন্ট থ্রেড”। গবেষকেরা প্রথমে ভেবেছিলেন, এগুলি হয়ত এই জাতির প্রাচীন কোনও বংশলতিকা। পরে বোঝা যায়, এগুলি আদপে তাদের প্রাত্যহিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গৃহযুদ্ধের জ্বলন্ত প্রামাণ্য নথি। শান্তিকামী কোনও নির্বোধ দৈবাৎ সেখানে শান্তিপ্রস্তাব দিয়ে বসলে, পরবর্তী সাতশো বিয়াল্লিশটি মন্তব্যে অত্যন্ত সযত্নে তার চোদ্দো গুষ্টি উদ্ধার করে দেওয়া হত।তাঁরা আরও জানলেন, GOAT বলতে এই জাতি বুঝত “সর্বকালের শ্রেষ্ঠ”। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের জন্য খেলার নিরেট পরিসংখ্যানের বদলে তারা ঢের বেশি ব্যবহার করত মা-বোন-তোলা গালি এবং চোয়াল-ফাঁক-করা কুৎসিত হাসি, বা রাগে-জ্বলতে-থাকা ডিজিটাল মুখভঙ্গি!লাগাতার প্রত্নখনন এবং ফেসবুক-কমেন্টের ASCII কোড ভেঙে ইতিহাসবিদেরা যে-সব দাহ্য নথি উদ্ধার করেছেন, তা থেকে জানা যায়—ফুটবলের বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এক সন্ধ্যায়, এক অখ্যাত চায়ের দোকানেই বেজে উঠেছিল সর্বনাশের প্রথম ঘণ্টা। এক মেসিভক্ত ভাঁড়ের চা’এ সড়াৎ চুমুক মেরেই বলে ওঠে, “মেসির পায়ে বল থাকলে মনে হয় ঈশ্বর অলস বিকেলে ক্যালিগ্রাফি করছেন।” পাশের বেঞ্চ থেকে তক্ষুনি পাল্টা ঝাপট মারে এক রোনাল্ডোপ্রেমী, “ক্যালিগ্রাফি না হাতি, মনে হয় ক্যানভাসে কাদা লেবড়ে দিচ্ছে”। কথার পিঠে কথা তার পিঠে কথা থেকে শুরু হয় খণ্ডযুদ্ধ। পরের দিনই গঠিত হয় “আর্জেন্টিনীয় নন্দনরক্ষা মঞ্চ”। পাল্টা নির্মাণ হয় “রোনালদীয় আত্মনির্মাণ সংগ্রাম পরিষদ”। প্রথম দল হাঁকড়ায়, ফুটবল হল অনায়াসের শিল্প। দ্বিতীয় দল চেল্লায়, অনায়াস আসলে অলসের ষড়যন্ত্র। এইভাবে ফুটবল ক্রমে খেলা থেকে জীবনদর্শনে, জীবনদর্শন থেকে গৃহযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু বাঙালির জাতিগত দুর্ভাগ্য ছিল, সে একখানা খোপে স্থির থাকতে পারত না। একটিমাত্র সাদামাটা বিরুদ্ধ খোপে নিজেকে আটকে না থেকে এদের বিভাজনের জাল বিস্তৃত হত বহুদূর। যে কোনও বিষয়কে মুহূর্তে পক্ষ-বিপক্ষ, শুদ্ধ-অশুদ্ধ, দেবতা-দানব এইসব তুচ্ছ অথচ রক্তগরম করা খোপে সাজিয়ে ফেলতে তারা ছিল সিদ্ধহস্ত। দল, জোট, মোর্চা, টিম, ফ্রন্ট, লিগ, আঞ্জুমান, পরিষদ, সভা, ক্লাব, সংস্থা, সমিতি, বৃন্দ, মণ্ডলী – কী ছিল না সেখানে।মেসি-শিবিরের ভিতরেই দ্রুত বিভাজন দেখা দিল। একদল বলল, “মেসি আসলে রবীন্দ্রনাথীয়। আরেকদল বলল, অসম্ভব! তিনি জীবনানন্দীয়।” প্রত্যেকেই নিজেকে একমাত্র প্রকৃত মেসি-পন্থী বলে দাবড়ে ঘোষণা করল। রোনালদো শিবিরেও চলছিল ধারাবাহিক অশান্তি। কেউ বলল, রোনালদো পুঁজিবাদী আত্মনির্মাণের প্রতীক। অন্যরা রায় দিল, শ্রমিকশ্রেণির ঘামকে বিশ্বমঞ্চে তোলা যুগনায়ক তিনি। এই কলহরত দলগুলি মাঝে মধ্যেই কিন্তু খেই হারিয়ে ফেলত, কেউ হয়ত মেসিপন্থী, অথচ সে সত্যজিৎ ফ্রন্টের চেয়ারম্যান। তখন অন্য এক মেসিপন্থীর মাথায় সে মুগুর বসিয়ে দিতেই পারে। কারণ মুগুর খাওয়া যে আবার ঋত্বিক পরিষদের সভাপতিও বটে। এভাবেই একদিন শ্যামবাজার পাঁচমাথায় চলছিল ‘বিশ্ব মেসীয় সম্মেলন’। ঠিক তখনই পাশের রাস্তা দিয়ে ‘রোনালদীয় ইচ্ছাশক্তি যাত্রা’ কুচকাওয়াজ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিল। দুই শিবিরের সদস্যরা একে অন্যকে উপেক্ষা করলেই ল্যাঠা চুকে যেত। কিন্তু বাঙালি আরও অনেক কিছুর মতই উপেক্ষা করার বিদ্যেটি তেমন রপ্ত করতে পারেনি। রাজ্যজুড়ে শুরু হল গৃহযুদ্ধ ; অতঃপর প্রশাসনিক অচলাবস্থা। আগে বিষয়টি চায়ের দোকান, ফেসবুক, পাড়ার ক্লাব এবং জামাইষষ্ঠীর টেবিল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ক্রমে দেখা গেল, হাসপাতালের আউটডোরে ডাক্তার প্রেসক্রিপশন দেওয়ার আগে জিজ্ঞেস করছেন, আপনি মেসি না রোনালদো? স্কুলে ভর্তি হওয়ার ফর্মে নতুন ঘর: অভিভাবকের ফুটবল-আদর্শ। এমনকি পাড়ার মুদি বাকিতে চাল দেবে কি না, তা নির্ভর করছে ক্রেতা ৭ বলছে, না ১০।অতএব প্রশাসন বাধ্য হয়েই গঠন করল “GOAT নির্ধারণ কমিশন।” কমিশনের কাজ ছিল বৈজ্ঞানিক ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া - কে বড়। কমিটিতে রাখা হল এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, দুই প্রাক্তন ফুটবলার, চারজন কবি, চারজন জিম ট্রেনার, সাতজন পাড়ার ক্লাবসচিব, বারোজন ইউটিউব-বিশেষজ্ঞ, এবং একজন মানুষ যিনি জীবনে কোনোদিন ফুটবল দেখেননি - তাঁকেই নিরপেক্ষ সদস্য বলা হল। অনেক বিচার-বিশ্লেষণ, নথিপত্র, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও সাত কাপ লাল চা খরচের পর কমিশন শেষমেষ এক আপশ-প্রস্তাব দিল: মেসি শিল্প, রোনালদো শ্রম; দু’জনেই মহৎ। এই বিপজ্জনক নিরপেক্ষতা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যের নানা প্রান্তে আগুন জ্বলে ওঠে, এবং প্রশাসন বাধ্য হয় জরুরি অবস্থা জারি করতে।কারণ, এই জনজাতি ছিল জন্মগতভাবে আপোশহীন। “দু’জনেই বড়”—এই মধ্যপন্থা মেনে নেওয়ার অর্থ হলো এতদিনের জমানো খিস্তিখেউড়, সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্লক-আনফ্রেন্ড, শ্বশুরবাড়ি বর্জন, পাড়ার ক্লাব ভাগ, এমনকি বাপ-ব্যাটার বাক্যালাপ বন্ধ—সবই যে চূড়ান্ত বৃথা! তাদের চিরায়ত দর্শনই ছিল: একজনকে ভালোবাসলে অপরজনকে ঘৃণা করতেই হবে। সোশ্যাল মিডিয়ার ময়দানে এরা প্রত্যেকেই ছিল একেকটি ভয়ংকর কাগুজে বাঘ, যারা রক্তক্ষয়ী তর্কে ঝাঁপিয়ে পড়তে বিন্দুমাত্র পিছপা হতো না।তাই, আপোশ-প্রস্তাবের পরদিনই ওই লুপ্ত প্রদেশে নতুন আন্দোলনের বীজ রোপিত হলো—“আপোশ মানি না।” ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মেসি ও রোনালদো-পক্ষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে মিছিল করল শান্তি-কমিশনের বিরুদ্ধে। তাদের আকাশভেদী যৌথ স্লোগান ছিল: “শত্রু চাই, শান্তি নয়!” আসলে, শত্রু ছাড়া এই জাতিটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই মণিহারা ফণীর মতো দিশেহারা।এলিয়েন গবেষকদের অনুমান, সেই অভূতপূর্ব যৌথ মিছিলটি মোড়ের মাথায় গিয়ে বাঁয়ে ঘুরবে নাকি ডানদিকে—তা নিয়েই সম্ভবত নতুন করে অশান্তির সূত্রপাত হয়। ফলস্বরূপ, শুরু হয় গৃহযুদ্ধের অন্তিম পর্যায়। এই সমস্ত ডিজিটাল ও পারিপার্শ্বিক ঘটনাচক্র বিশ্লেষণ করে গবেষকরা এই অকাট্য সিদ্ধান্তেই উপনীত হন যে, নিছক এই 'খোপবাজি' বা আত্মঘাতী মেরূকরণের ফলেই আস্ত জাতিটি পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে নিকেশ হয়ে গেছে।ধ্বংসস্তূপের একেবারে তলদেশ থেকে উদ্ধার হওয়া সর্বশেষ প্রাসাশনিক বিজ্ঞপ্তিটিই ছিল এই ট্র্যাজেডির সর্বশেষ পুনরুদ্ধারিত নথি। তাতে জনস্বার্থে লেখা ছিল:"নাগরিকদের জানানো যাচ্ছে, প্রদেশের সার্বিক শান্তি রক্ষার স্বার্থে প্রত্যেকে আগামী সোমবারের মধ্যে নিজের জন্য অন্তত একজন স্থায়ী শত্রু নির্বাচন করুন। উল্লেখ্য, যাঁরা 'আমি কারোর সাতে-পাঁচে নেই' বা 'সবাই আমার বন্ধু' গোছের সমাজবিরোধী মনোভাব পোষণ করেন, তাঁদের অবিলম্বে মনোবিদদের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত্ব নেওয়া হয়েছে।” 
    ভাগবত পুরাণ - ১/৯ - Kishore Ghosal | এর আগে আমরা সত্যযুগের সূচনায় “সত্য” নামক কোন তেজস্বী সৎ-ব্রাহ্মণের পরিচয় পাইনি। “ত্রেতা” ও “দ্বাপর” যুগেও “ত্রেতা” বা “দ্বাপর” নামে কোন মহাবীর ক্ষত্রিয় অথবা মহাবণিক বৈশ্যর নাম পাইনি। অথচ কলিযুগের শুরুতেই পেয়ে গেলাম “কলি” নামের একজন রাজবেশধারী শূদ্রকে! শ্রীসূত কিন্তু কলিকে রাজবেশধারী শূদ্র বলেছিলেন, তাঁকে ললিতকান্তি অথবা কুৎসিত – এমন কোন কথাই বলেননি। কিন্তু ঋষি শৌণক গায়ে পড়েই বলে বসলেন, “অতি কুৎসিত শূদ্র”। "ভাগবত পুরাণ"-এর প্রথম স্কন্ধ - নবম পর্বভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৯
    শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ঃ নিরপেক্ষ মূল্যায়নের সন্ধানে - Sandipan Majumder | ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এক বিরাট ব্যক্তিত্ব। তার যথাযথ মূল্যায়ন করার প্রচেষ্টা যদি আগে না হয়ে থাকে তবে সেটা এখন করলে আপত্তির কিছু নেই। দেখতে হবে সেই মুল্যায়ন যেন যথাযথ ও বস্তুনিষ্ঠ হয়। স্তুতি আর প্রশংসার আড়ালে বড় মানুষদের সীমাবদ্ধতাগুলো লুকিয়ে ফেলা আমাদের জাতীয় প্রবণতা। যাঁরা ভোটের রাজনীতি করেন তাঁদের এই কাজটা বেশি করে করতে হয়। আবার উল্টোদিকের রাজনীতি যাঁরা করেন তাঁদের অকারণ নিন্দামন্দের আশ্রয় নিতে দেখা যায়। শ্যামাপ্রসাদ প্রসঙ্গেই একদল তথাকথিত বামপন্থী ফেসবুকার তাঁকে ব্রিটিশ অনুগত সাম্প্রদায়িক এক খলনায়ক সাজাবার চেষ্টা করে থাকেন যেটাও ভুল বলেই আমার মনে হয়েছে। মনে রাখতে হবে কংগ্রেস রাজনীতির বাইরে থেকে যে দুজন মানুষকে জওহরলাল নেহেরু তার মন্ত্রীসভায় স্থান দিয়েছিলেন তার মধ্যে একজন ছিলেন বি আর আম্বেদকার, আরেকজন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। বাগ্মীতা, ব্যক্তিগত সততা, ব্যক্তিস্বার্থের উপরে উঠে কাজ করার দায়বদ্ধতা, বিপরীত রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষদের সঙ্গে সংলাপ চালু রাখার ক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা --- শ্যামাপ্রসাদকে বাছার কারণ ছিল অনেক। আমি আমার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শ্যামাপ্রসাদের ডায়েরি যা তিনি অনিয়মিতভাবে লিখতেন এবং যা Leaves from a diary নামে প্রকাশিত সেটাকেই কেন্দ্রীয় ফোকাসে রেখেছি। কারণ একজন ব্যক্তির মতাদর্শ, পছন্দ অপছন্দ, স্ববিরোধিতা সবকিছু ডায়েরিতে অন্তরঙ্গভাবে ধরা পড়ে যা মানুষটিকে চিনতে সাহায্য করে। পাশাপাশি পরিপ্রেক্ষিত ব্যাখ্যা করার জন্য আমি জয়া চ্যাটার্জীর দুটি বই যা বামপন্থীদের কাছে প্রশংসিত এবং বিপরীত শিবিরের কাছে নিন্দিত – সে দুটির সাহায্য নিয়েছি। আমি যদিও জয়া চ্যাটার্জীর কোনো সিদ্ধান্ত এখানে সচেতনভাবেই গ্রহণ করি নি কিন্তু তথ্যগুলি নিয়েছি কারণ এটা সবাই স্বীকার করবেন যে এর চেয়ে বেশি তথ্যসমৃদ্ধ গবেষণা দেশভাগের ওপর আর হয় নি। পরিপ্রেক্ষিত------------১৯১৯ সালে মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার অনুযায়ী ভারতে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা (Diarchy) চালু করা হয় যেখানে ভারতীয়দের হাতে প্রাদেশিক আইনসভার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ১৯২৯ সালে লণ্ডনের নীতিনির্ধারকরা ঠিক করেন যে এই ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস দরকার। ব্রিটিশরা ভারতীয়দের জাতপাত, ভাষা, ধর্ম এবং অন্যান্য আনুগত্যের অধীন সামাজিক নির্মাণের মধ্য দিয়েই দেখত, আধুনিক নাগরিকের সংজ্ঞার মধ্য দিয়ে নয়। তারা ঠিক করল যে আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব বিভিন্ন গোষ্ঠীস্বার্থ বিবেচনায় ভাগ করে দেওয়া হবে – মুসলিম, দলিত (তখন Depressed class বলা হত), শিখ, ইওরোপীয়, সাধারণ হিন্দু, জমিদার, শ্রমজীবী, মহিলা ইত্যাদি। এখানে মুসলিমরা মুসলিমদের নির্বাচিত করবে, হিন্দুরা হিন্দুদের, দলিতরা দলিতদের ইত্যাদি। এইজন্যই ১৯৩২ সালে ঘোষিত এই নীতির নাম সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা বা কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড। এই বাঁটোয়ারা কিন্তু কোন গোষ্ঠীর কত জনসংখ্যা তার দ্বারা কঠোরভাবে নির্ধারিত ছিল না। যেমন বাংলায় আইনসভার ২৫০ আসনের মধ্যে ইওরোপীয়রা পেয়েছিল ২৫ টা অর্থাৎ ১০ শতাংশ আসন যদিও তাদের জনসংখ্যা ছিল ১ শতাংশের কম। ১৯৩১ সালের জনগণনা অনুসারে হিন্দুরা ছিল জনসংখ্যার ৪৪ শতাংশ কিন্তু তাঁরা দলিত আসন সহ পেল মোটে আশিটি আসন অর্থাৎ মোট আসনের ৩২ শতাংশ। মুসলিমরা হিন্দুদের তুলনায় বেশি অনুপাতে পেল কিছুটা যদিও জনসংখ্যা অনুসারে তারাও কিছুটা কমই পেল। তাদের জনসংখ্যা ছিল বাংলার মোট জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশ কিন্তু আসন পেল ১১৯ টা অর্থাৎ ৪৭.৮ শতাংশ। এর আগে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থায় হিন্দুদের আসন ছিল ৪৬ এবং মুসলিমদের আসন ছিল ৩৯। এবার ব্যাপারটা উলটো তো হলই দলিতদের ১০ টি আসন বাদ দিলে সাবর্ণ হিন্দুদের আসন দাঁড়াল ৭০ অর্থাৎ ২৮ শতাংশ মাত্র। ফলে হিন্দু ভদ্রলোকশ্রেণী তখন থেকেই ক্ষমতা খর্ব হওয়ার ফলে বিক্ষুব্ধ হয়। কংগ্রেস দল কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড প্রসঙ্গে ‘সমর্থনও নয়, বিরোধিতাও নয়’ – অবস্থান গ্রহণ করে। কংগ্রেস নিজেকে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি বলে দাবি করত। কমিউনাল অ্যাওয়ার্ডের বিরোধিতা করলে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে মুসলিমদের সমর্থন পুরোপুরি হারানোর ভয় ছিল কংগ্রেসের। কিন্তু বাংলা, পাঞ্জাব, সিন্ধ এবং উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে মুসলিমরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে অবিভক্ত বাংলার মত জায়গায় হিন্দু ভদ্রলোকশ্রেণীর মধ্যে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে যেটা বাংলার প্রদেশ কংগ্রেসের সংগঠনের অভ্যন্তরেও প্রতিফলিত হয়। এমনকি বাংলা কংগ্রেসের দুটি বিবদমান গোষ্ঠী (যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত এবং সুভাষচন্দ্র বসু) একযোগে কমিউনাল অ্যাওয়ার্ডের বিরোধিতা শুরু করে। শ্যামাপ্রসাদ কলকাতা কর্পোরেশন এবং প্রাদেশিক বিধানসভায় নির্দল সদস্য হিসাবে হিন্দু স্বার্থবিরোধী বলে যে পদক্ষেপগুলি তাঁর মনে হত সেগুলির বিরোধিতা করতেন। কংগ্রেসকে এই বিষয়গুলিতে তিনি যতটা সোচ্চারভাবে পেতে চাইতেন সেভাবে পেতেন না। ফলে ২৭ শে ডিসেম্বর ১৯৩৯ তারিখে যখন বীর সাভারকার ওয়েলিংটন স্কোয়ারে গেরুয়া পতাকা তুলে বাংলায় হিন্দু মহাসভা প্রতিষ্ঠা করলেন শ্যামাপ্রসাদ বাংলায় সেই দলের নেতৃত্বভার গ্রহণ করলেন। দুই বাংলার বড় বড় জমিদারদের একটা বড় অংশ হিন্দু মহাসভার ছত্রছায়ায় এলেন। প্রদেশ কংগ্রেসের নেতৃত্বের একাংশ যার মধ্যে ছিলেন বৃহৎ বীমা ব্যবসায়ী,তীব্র সুভাষবিরোধী নলিনী রঞ্জন সরকার — তাঁরাও এই দাবিগুলিকে সামনে আনতে শুরু করলেন। সাম্প্রদায়িক বিভাজন উত্তোরত্তোর আরও তীব্র হওয়ার পর সাত বছর বাদে ১৯৪৫-৪৬ সালের কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে কংগ্রেস প্রায় অবিকল হিন্দু মহাসভার ঢংয়ে হিন্দু স্বার্থরক্ষার কথা বলে নির্বাচনী প্রচার করে। ফলে ছটি হিন্দু আসনেই হিন্দু মহাসভাকে টেক্কা দিয়ে কংগ্রেস জিতে যায়। তাই যখন সুরাবর্দীর পক্ষপাতিত্বমূলক শাসন বাংলা দেখে নিয়েছে, প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ও তার অব্যবহিত পরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বিধ্বস্ত হয়েছে কলকাতা, যখন মাউন্টব্যাটেন প্রস্তাব গৃহীত ও দেশভাগ অনিবার্য --- তখন বাংলা ভাগের দাবিতে শুধু শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু মহাসভা নয়, প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দল একযোগে দাঁড়িয়ে গেছে এবং কংগ্রেস সেখানে নেতৃত্বের আসনে। কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভার যৌথ উদ্যোগে এই দাবিতে পাঁচটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু একক দলীয় উদ্যোগে কংগ্রেস এই দাবিতে ৫৯ টি সভা করে আর হিন্দু মহাসভা করে ১২ টি। অবশ্যই কংগ্রেসের সাংগঠনিক ক্ষমতা অনেক বেশি ছিল। হিন্দু মহাসভার সংগঠন মূলত ছিল পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের মধ্যে। পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার বাইরে একমাত্র মুর্শিদাবাদ জেলায় তাদের সংগঠন ছিল। সেই সময় শ্যামাপ্রসাদের বিশ্বাস ছিল যে বাংলা ভাগ হলেও পাশে হিন্দুপ্রধান শক্তিশালী ভারত রাষ্ট্র থাকায় পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের ক্ষতি হবে না যদিও সে বিশ্বাস অমূলক প্রতিপন্ন হয়েছে। স্বাধীনতার পর গান্ধীহত্যার কারণে হিন্দু মহাসভার রাজনীতি বিপুল বাধার মুখে পড়ে। পরে শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভা ছেড়ে জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করলেও ১৯৫২ সালের নির্বাচনে তাদের ফলাফল খুব খারাপ হয়েছিল। শ্যামাপ্রসাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা অনেকটাই অক্ষুণ্ণ ছিল যদিও। বাংলা বিভাজনের ক্ষেত্রে যদি ‘কৃতিত্ব’ দিতে হয় কাউকে তাহলে সেটা অনেকটাই কংগ্রেসের দিকে যাবে কারণ কংগ্রেসের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে ব্রিটিশরা কোনো সিদ্ধান্ত সেই যুদ্ধোত্তর কালে গ্রহণ করতেন না। কিন্তু এ বিষয়ে শ্যামাপ্রসাদের প্রভাব শুধু হিন্দু মহাসভার একটি ভোটে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর ব্যক্তিত্ব, বাগ্মীতা এবং গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে এই বিষয়ে জনমত গঠনে তিনি যে ভূমিকা নিয়েছিলেন তার একটি আলাদা তাৎপর্য ছিল। বিশেষত হিন্দু ভদ্রমণ্ডলীর স্বার্থরক্ষায় তিনি যে বহুদিন ধরে অক্লান্ত প্রচারক সেটি প্রতিষ্ঠিত ছিল। ফলে একদিকে যেমন হিন্দু মহাসভার এজেন্ডা কংগ্রেস হাইজ্যাক করে নিয়েছিল সেটা সত্য, অন্যদিকে শ্যামাপ্রসাদের অনুগামীরা বলতেই পারেন যে তাদের এজেন্ডাকেই বাকিদের গ্রহণ করতে হয়েছে --- পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, দেশভাগ অনিবার্য হয়ে ওঠার পর। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ঃ একটি অন্তরঙ্গ দৃষ্টিকোণের সন্ধানে-------------------------------------শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ডায়েরি যেটা অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে ১৯৯৩ সালে Leaves from a Diary নামে প্রকাশিত হয় সেখানে মূলত দুটি ভাগে তার ইংরেজিতে লেখা এবং বাংলায় লেখা ডায়েরির লেখাগুলো প্রকাশিত হয়েছে। এটা শ্যামাপ্রসাদের নিজের শুধু নয়, গোটা বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের খুব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর মধ্যে ১৯৩৭ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত বাংলায় ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি এবং মুসলিম লীগের শাসন চলেছে। সেই সময় শ্যামাপ্রসাদ গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী নেতা। ১২ ই ডিসেম্বর ১৯৪১, শ্যামাপ্রসাদ ফজলুল হকের সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেন এবং তার অর্থমন্ত্রী হন। ২০শে নভেম্বর ১৯৪২ তারিখে তিনি পদত্যাগ করেন। বিরোধী থাকার সময় এবং মন্ত্রী থাকার কালে তিনি হিন্দুদের স্বার্থরক্ষার অগ্রণী কন্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত হন। শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভায় যোগদান করলেন কেন? ১৯৩৭ থেকে ৪১ সাল পর্যন্ত মুসলিম লীগ এবং ফজলুল হকের মন্ত্রীসভা যে পদক্ষেপগুলি নিচ্ছিল তাতে হিন্দু ভদ্রমন্ডলীর স্বার্থ ক্ষুণ্ন হচ্ছিল। ১৯ ৪১ সালে ঢাকাতে বেশ বড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও হয়। এছাড়াও সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ, ইউনিয়ন বোর্ডগুলির নির্বাচনে মুসলিম লীগের গাজোয়ারি ইত্যাদি সাধারণ ঘটনা হয়ে উঠেছিল। কংগ্রেস হিন্দুদের স্বার্থরক্ষা্র কথা বলতে কিছুটা কুন্ঠিত থাকত পাছে তাদের সাম্প্রদায়িক বলা হয়। তাহলে কি শ্যামাপ্রসাদকে সাম্প্রদায়িক বলা যায়? মনে রাখতে হবে শ্যামাপ্রসাদ স্বাধীনতার আগে যে বাংলায় হিন্দুদের স্বার্থরক্ষার কথা বলছেন সেখানে হিন্দুরা সংখ্যালঘু। আবার স্বাধীনতার পর জম্মু ও কাশ্মীরে গিয়ে তিনি যখন হিন্দুদের স্বার্থরক্ষার কথা বলছেন সেখানেও হিন্দুরা সংখ্যালঘু। সংখ্যাগুরুর আগ্রাসী সাম্প্রদায়িক পদক্ষেপ আর সংখ্যালঘুর প্রতিরোধমূলক সম্প্রদায়চেতনাকে এক মানদণ্ডে বিচার করা যায় না, বিশেষত সেই সময়ে যখন এই ধরণের বিভাজন তীব্র হয়ে ওঠে। অথচ ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর ফজলুল হক যখন কংগ্রেসকে মন্ত্রীসভা গঠনের প্রস্তাব দেন এবং কংগ্রেস তা প্রত্যাখ্যান করে সেই নিয়ে শ্যামাপ্রসাদের আক্ষেপটি দেখুন — তিনি লিখছেন, “যদি এটা হত (কংগ্রেস ও ফজলুল হকের যৌথ সরকার ফজলুল হকের নেতৃত্বে) তাহলে বাংলা মুসলিমলীগ-ব্রিটিশ যৌথ চক্রান্তের খপ্পরে পড়ত না। রাজ্যটা হিন্দু এবং মুসলিম প্রতিনিধিদের যৌথ প্রচেষ্টায় একটা শক্তিশালী এবং স্বাস্থ্যবান রাজ্য হিসেবে চলত।”শ্যামাপ্রসাদের উপরোক্ত বক্তব্য কি কোনো সাম্প্রদায়িক মানুষের কথা? বস্তুত তার গোটা ডায়েরিতে কোথাও সাধারণভাবে মুসলমানদের সম্পর্কে বা ইসলাম সম্পর্কে কোনো বিদ্বেষমূলক কথা নেই। তাঁর আপত্তি ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে। আবার কংগ্রেসের দলীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে তিনি এমনকি মুসলিম লীগের সঙ্গে সহযোগিতার কথাও বলেছেন। প্রথমে আইনসভা বয়কটের ডাক দিয়েও ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের তিনমাস পর কংগ্রেস অনেক হিন্দুপ্রধান প্রদেশেই সরকার গঠন করে। কিন্তু কোথাও তারা কোয়ালিশন রাজনীতিকে কোনো গুরুত্ব দেয় নি। উত্তর প্রদেশে মহম্মদ আলি জিন্নার অনুরোধ সত্ত্বেও তারা মুসলিম মন্ত্রী লীগ থেকে কাউকে নেয়নি, যা নিয়েছিল সব কংগ্রেস থেকে। শ্যামাপ্রসাদ লিখছেন, “১৯৩৭ সালে এই একগুঁয়েমি না দেখালে ১৯৪৪ সালে মুসলিম লীগকে সন্তুষ্ট করার জন্য দেশভাগের প্রস্তাবে গান্ধী আর রাজাগোপালাচারীকে সম্মত হতে হত না।”এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু আর মুসলিমকে নিয়ে একসাথে চলার পক্ষপাতী ছিলেন। দেশভাগের অব্যবহিত আগের উত্তুঙ্গ সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সময় সেই উদার অবস্থান শুধু তিনি কেন, অনেকের পক্ষেই আর রক্ষা করা সম্ভব ছিল না। শ্যামাপ্রসাদ হিন্দুদের সংগঠিত করার কথা বলছেন। পাশাপাশি বলছেন, “To establish co-operation with those Muslims who feel that Bengal’s hope lies in joint work between the two communities.” এতো তো সমন্বয়ের কথা, বিভাজনের কথা তো নয়। দেশভাগ, স্বাধীনতা লাভ এবং গান্ধী হত্যার পর এমন একটা অবস্থা তৈরি হয় যখন হিন্দু মহাসভাকে ঘোষণা করে তার রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ বন্ধ রাখার কথা বলতে হয়। এরকমও মত উঠে আসতে থাকে যে হিন্দু মহাসভা এরপর থেকে রাজনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধ রেখে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের মত সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে কাজ করবে কিনা। শ্যামাপ্রসাদ একথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন এবং চিরতরে এই পন্থা অনুসরণের পক্ষপাতী ছিলেন। শ্যামাপ্রসাদের নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভার উদারপন্থী অংশের বক্তব্য ছিল দেশভাগের পর হিন্দু সংখ্যাগুরু অংশকে নিয়ে গঠিত অংশে হিন্দুদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ার যেহেতু ভয় নাই, তাহলে শুধু হিন্দুদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক সংগঠন কোন কাজে লাগবে? বরাবরই শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভাকে বাংলায় প্রায় স্বাধীনভাবে চালাতেন। কিন্তু এবার ১৯৪৮ সালের ৮ই আগস্ট দিল্লীতে হিন্দু মহাসভার সারা ভারত কার্যকরী কমিটি তীব্র বিতর্কের পর রাজনীতিতে ফেরার কথাই বলে। একই সময়ে আরেকটি বিতর্ক সামনে আসে যে হিন্দু মহাসভায় মুসলিমদের সদস্য করা হবে কিনা। শ্যামাপ্রসাদের বক্তব্য ছিল যে শুধু হিন্দু নয় --- সমস্ত ধর্মবিশ্বাসের মানুষকে নিতে হবে। এর একটা প্রত্যক্ষ কারণ ছিল পশ্চিমবঙ্গে দেশভাগের পরও মুসলিমদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। ৬ এবং ৭ই নভেম্বর ১৯৪৮ তারিখে কার্যকরী কমিটি ঘোষণা করে যে হিন্দু ছাড়া কাউকে হিন্দু মহাসভার সদস্য করা যাবে না। প্রতিবাদস্বরূপ ২৩ শে নভেম্বর শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভা থেকে পদত্যাগ করেন। কাজেই বোঝা যাচ্ছে বিশেষ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু স্বার্থ রক্ষার কথা বললেও সর্বকালে সব পরিস্থিতিতে সেকথা বলে চলার লোক ছিলেন না। এর প্রমাণ তিনি ফজলুল হক মন্ত্রিসভায় কাজ করার সময়তেও রেখেছিলেন। তাঁর জোটসঙ্গী কৃষক প্রজা পার্টির বহু মুসলিম বিধায়ক যাঁরা শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু স্বার্থরক্ষাকারী নীতির জন্য তাঁর উপর বিরূপ ছিলেন, তাঁদের অনেকের আস্থা অর্জনে তিনি সমর্থ হয়েছিলেন। তাঁর নিজের কথায় --- “আমার সহজ বিশ্বাস এই যে যদি উভয় সম্প্রদায়ের নেতারা ঠিকঠাক চলেন তাহলে সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না রাজ্যে। নেতৃত্বকে শুধু এরকম অবস্থায় থাকতে হবে যাতে তাঁরা নিজের নিজের সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করতে পারেন যে তাদের স্বার্থ ঠিকঠাক দেখভাল করা হচ্ছে। একবার মানুষের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা পেলে যে দুর্বৃত্তরা আগুন নিয়ে দিনরাত খেলতে চায় তারা হীনবল হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে।” এর প্রমাণ শ্যামাপ্রসাদ পেয়েছিলেন যখন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য প্রাদেশিক আইনসভায় অন্তত পঞ্চাশ জন মুসলিম বিধায়ককে তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৪৪ সালে যখন গান্ধী জিন্নার পাকিস্থান প্রস্তাব মেনে নিচ্ছেন তখন ঐ মুসলিম বিধায়করা বোঝেন যে মুসলিমদের একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন হিসেবে কংগ্রেস লীগকেই মেনে নিচ্ছে। ফলে তাঁরাও আস্তে আস্তে ঐ শিবিরে ভিড়ে যান। অথচ অর্থমন্ত্রী হিসেবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উন্নতিকল্পে ফজলুক হক সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে শ্যামাপ্রসাদ বাজেটে এক লক্ষ টাকা মঞ্জুর করেছিলেন। কিন্তু শরিক দলের ব্যর্থতা এবং লোভের জন্য সেই টাকা দিয়ে কোনো প্রকল্প তৈরি করা যায় নি। শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক জীবন এমন একটা দলে শুরু হয়েছিল যার সাংগঠনিক এবং বর্ণভিত্তি খুব বড় ছিল না। বাংলার নিম্নবর্ণের মানুষ ও তাঁদের নেতারা হিন্দু মহাসভার পক্ষে ছিলেন না। তার ওপর যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি যখন চলছিল তার আগে পরে তিনি প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন। ফলে ব্রিটিশ বিরোধী কোনো বড় গণ আন্দোলন করার মত সময় ও সুযোগ তাঁর ছিল না। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে সাভারকরও সব সময় তাঁর মত মেনে নিয়েছেন এমনটা নয়। তাই বলে শ্যামাপ্রসাদ ব্রিটিশদের প্রতি অনুগত ছিলেন এমনটা বলা যায় না। ভারত ছাড় আন্দোলনের উপর দমন পীড়নের তীব্র নিন্দা করেছেন, জেলে আটক কংগ্রেস নেতাদের মুক্তির জন্য দাবি জানিয়েছেন সোচ্চারে। মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগের পর গভর্নরকে ১৯৪২ সালের ১৬ই নভেম্বর যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন সেখানে লিখছেন, “যদি নিজের দেশকে স্বাধীন এবং ব্রিটিশ সমেত যে কোনো বিদেশী শক্তির আধিপত্যমুক্ত দেখতে চাওয়া অপরাধ হয় সেক্ষেত্রে প্রত্যেক আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ভারতবাসীই অপরাধী।”এটা কোনো ব্রিটিশ অনুগত মানুষের উক্তি বলে ভুল হচ্ছে না নিশ্চয়?শ্যামাপ্রসাদ নিজের বিশ্বাসের প্রতি প্রচণ্ড দায়বদ্ধ ও আপোষহীন ছিলেন। ১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে জেহাদী গোষ্ঠীর উদ্যোগে এবং রাষ্ট্রীয় প্ররোচনায় হিন্দুবিরোধী খুন, ধর্ষণ, লুঠতরাজের প্রচুর ঘটনা ঘটে। পাকিস্তানের আইনমন্ত্রী এবং দলিত হিন্দু নেতা যোগেন মণ্ডল এই ঘটনার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন এবং হিন্দুদের দেশত্যাগের ঘটনা অনেক বৃদ্ধি পায়। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায়। তিনি দাবি জানাতে থাকেন যে উদবাস্তু সমস্যার সমাধানে হয় পাকিস্তানে সামরিক আক্রমণ করতে হবে নয়তো পাকিস্তানের সঙ্গে জন বিনিময় করতে হবে যেমনটা পাঞ্জাবে দেশভাগের সময় হয়েছিল। এই দাবির মধ্যে অন্তত প্রথমটি বাস্তবোচিত ছিল না সেকথা বলা যেতে পারে। যাই হোক নেহেরু-লিয়াকত চুক্তি সম্পাদনের পর প্রতিবাদস্বরূপ শ্যামাপ্রসাদ মন্ত্রীসভা থেকে বেরিয়ে আসেন। তিনি বুঝেছিলেন এই চুক্তি দিয়ে পাকিস্তানে সংখ্যালঘু হিন্দুর স্বার্থ রক্ষা হবে না। হয়ও নি। কিন্তু হিন্দু স্বার্থের রক্ষার প্রশ্নে শ্যামাপ্রসাদ যুক্তির চেয়েও আবেগকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন বলে মনে হয়। তাই কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা না দিয়ে তাকে ভারত রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করা যে সেই সময় যেত না সেকথা তিনি মানতে পারেন নি। ফলে কাশ্মীরে তাঁর সেই সময়ের যাত্রা, গ্রেপ্তার এবং বন্দী থাকাকালীন মৃত্যু এক বিরাট ট্র্যাজেডি। তথাগত রায় বিজেপির সভাপতি থাকাকালীন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের যে জীবনী লিখেছিলেন সেখানে এই প্রসঙ্গে রীতিমত ষড়যন্ত্রের ঈঙ্গিত দিয়েছেন এবং নেহেরুকে দায়ী করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রমাণ হিসেবে যা আছে সেসবই বিভিন্ন লোকের উক্তি অথবা তাঁদের মুখে অন্য লোকের শোনা কথা। এইরকম অপ্রমাণিত অভিযোগ নিয়ে তদন্ত হতে পারে কিন্তু কাউকে দোষী ঠাওরাতে গেলে আর সেটা সৎ ইতিহাস চর্চা হয় না। ভারতীয় জনসংঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বলরাজ মাধোক, যিনি কাশ্মীর সফরে শ্যামাপ্রসাদের সহযাত্রী ছিলেন এবং যাঁর কথা তথাগত রায় বারবার উল্লেখ করেছেন তিনি তার আত্মজীবনীতে ১৯৬৮ সালে মোগলসরাই স্টেশনে দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মৃত্যু নিয়ে যা অভিযোগ করেছেন সেসব মেনে নিলে তো সংঘপরিবারের ভাবমূর্তি নিয়েই প্রশ্ন উঠে যাবে। কিন্তু এগুলোকে আমরা সর্বজনস্বীকৃত ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে দেখতে চাই না। শ্যামাপ্রসাদের সীমাবদ্ধতার একটা বড় জায়গা ছিল যে তিনি ছিলেন উচ্চবর্ণের শিক্ষিত ভদ্রলোকদের প্রতিনিধি। ফলে হিন্দু সমাজের ঐক্যের জন্য ডাক দিলেও, অনেকটা আর্য সমাজের ছাঁচে নিম্ন বর্ণের এবং আদিবাসীদের হিন্দু সমাজের ‘মূল স্রোতে’ অন্তর্ভুক্ত করার জন্য শুদ্ধি, সংগঠন ইত্যাদির আয়োজন করলেও তাদের কাছে টানতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। বাংলার প্রাদেশিক আইনসভার দলিত সদস্যরা যোগেন মণ্ডলের নেতৃত্বে বরং মুসলিম লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছেন। নারী অধিকার আন্দোলনের প্রবক্তারা বলতে পারেন যে তিনি আম্বেদকর প্রস্তাবিত হিন্দু কোড বিলের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন যে বিলের মাধ্যমে আম্বেদকার হিন্দু মহিলাদের সম্পত্তিতে সমানাধিকার, বহুবিবাহ রদ, বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার প্রভৃতি আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে যে বহু বিশিষ্ট মানুষ এর বিরোধিতা করেছিলেন যেমন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদ স্বয়ং। শ্যামাপ্রসাদ তখনই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি আগে চালু করার দাবি করেছিলেন এবং হিন্দুদের এই বিল মানাকে অপশনাল করতে চেয়েছিলেন। আম্বেদকার শ্যামাপ্রসাদের এই দাবিকে অবাস্তব বলে উড়িয়ে দেন। শ্যামাপ্রসাদ, এন সি চ্যাটার্জী প্রমুখের বক্তব্য ছিল যে এতে হিন্দুদের যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে। আসলে শ্যামাপ্রসাদ সারাজীবন একটা সুন্দর যৌথ পরিবারে বড় হয়েছেন এবং তার সুবিধা পেয়েছিলেন। মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে স্ত্রীকে হারালেও তার সন্তানদের মানুষ করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন তার বৌদি। শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু কোড বিলের বিরোধী হলেও নারীবিদ্বেষী ছিলেন না। বরং যেভাবে তার ডায়েরিতে নিজের অকালপ্রয়াতা স্ত্রীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা উচ্ছসিতভাবে প্রকাশ করেছেন, তাঁর স্মৃতিকে উজ্জ্বল রাখার জন্য দ্বিতীয়বার বিয়ে করা থেকে বিরত থেকেছেন সেটা সেই যুগের পক্ষে ব্যতিক্রমী বইকি। শ্যামাপ্রসাদ যে সংগঠন করতেন তা সে হিন্দু মহাসভাই হোক বা জনসংঘ – তাদের মতাদর্শ নিয়ে আমি এখানে কোনো মন্তব্য করি নি। আমার ফোকাস এখানে ছিল পুরোটাই ব্যক্তি শ্যামাপ্রসাদের ওপর। অনেকে বলবেন এভাবে কি ব্যক্তিকে তাঁর সংগঠনের মতাদর্শ থেকে আলাদা করে বিচার করা যায়? অন্তত শ্যামাপ্রসাদের ক্ষেত্রে যে অনেকটাই যায় সেটা উপরের আলোচনা থেকেই বোঝা যাবে। আমার মনে হয়েছে শ্যামাপ্রসাদের কাছে সংগঠন ছিল উপায় মাত্র, উদ্দেশ্য নয়। ফলে বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্তে তিনি নিজের আদর্শের সহায়ক হিসেবে যেটা ভালো মনে করেছেন সেই সংগঠনকেই বেছে নিয়েছেন। এটা একধরনের প্র্যাগম্যাটিজম, কোনো সুবিধাবাদ নয়। লক্ষ্য একটাই, আক্রান্ত হিন্দুর স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা। এই প্র্যাগমাটিজমের দৃষ্টিকোণ থেকেই ফজলুল হক বা নেহেরুর মন্ত্রীসভায় তিনি একসময় যোগ দিয়েছিলেন। আবার যখন মনে করেছেন তার উদ্দেশ্য (ব্যক্তিগত নয়) সাধিত হচ্ছে না তখনই পদত্যাগ করে বেরিয়ে এসেছেন। এই বর্ণময় রাজনৈতিক জীবনে তাঁর যাত্রাপথে তিনি নিঃসঙ্গতায় ভুগেছেন। এমনকি স্বার্থহীন, উচ্চ আদর্শযুক্ত মানুষ নিজের সংগঠনের মধ্যেও খুব বেশি পান নি একথা লিখে গেছেন। ভগ্ন স্বাস্থ্যের কথা, ক্লান্তির কথা, হার্টের অসুখের কথা এমনকি মৃত্যুচেতনার কথা তাঁর দিনলিপিতে উঠে এসেছে বারবার — কিন্তু হতাশা বা পরাজয়ের কথা আসে নি। এই বরেণ্য, আদর্শবাদী মানুষটিকে কোনো ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপ্রবণ শক্তি গ্রাস করতে যাতে না পারে সেটা দেখাই আমাদের সকলের দায়িত্ব। তথ্যসূত্রঃLeaves from a diary, Shyamaprasad Mukherjee, Oxford University Press,1993Bengal Divided Hindu Communalism and Partition 1932-1947, Joya Chatterji, Cambridge University Press 1994The Spoils of Partition, Joya Chatterjee, Cambridge University Press 2007Syamaprasad Mukherjee, Life and Times, Tathagata Roy, Penguin Books, 2017
  • জনতার খেরোর খাতা...
    যে কথা না-বললেই নয় : ৪  - অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায় | মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ধর্ষণ করলে সকালে জমা বিকেল খরচ করা হবে। তেমনটা হোক বা না হোক, যদি অভিযুক্তকে খরচ করতে হয়, তাহলে খুন করতে হয়। পুলিশ চাইলে প্রকাশ্যে অভিযুক্তকে গুলি করে হত্যা করতে পারে, আইনের তোয়াক্কা না করে। যদি এইভাবে খরচ করার কথা ভাবা হয়, কখনই তাকে এনকাউন্টার বলা যায় না। সাধারণ অর্থে 'এনকাউন্টার' (Encounter) শব্দটির অর্থ হল কোনো কিছুর সঙ্গে আকস্মিকভাবে মুখোমুখি হওয়া বা কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়া। যাই হোক, আইনি ও অপরাধের প্রসঙ্গে, বিশেষ করে ভারতের প্রেক্ষাপটে 'এনকাউন্টার' বলতে সাধারণত পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে কোনো সশস্ত্র অপরাধী বা সন্ত্রাসবাদীর সরাসরি বন্দুকযুদ্ধ বা সংঘর্ষকে বোঝায়। ধৃত অভিযুক্তের সঙ্গে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। পুলিশ বাহিনীর মধ্যে থেকে কখনোই একজন অভিযুক্ত পুলিশের কাছ থেকে বন্দুক কেড়ে নিয়ে গুলি করতে উদ্যত হবে, এটা কষ্টকল্পনা। কারণ এটা করে সে পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে পারবে না, এটা বোঝার মতো বোকা অভিযুক্তরা নন। তাছাড়া ধর্ষণে অভিযুক্ত ব্যক্তির হাতে হাতকড়া কোমরে দড়ি বাঁধা থাকবে। এমতাবস্থায় কারোর পক্ষেই আক্রমণ করা সম্ভব নয়। হলে হিন্দি সিনেমায় হয়। অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে গিয়ে সংঘর্ষ হতে পারে। তখন এনকাউন্টার হওয়া সম্ভব। অতএব ধৃত ব্যক্তিকে ঠান্ডা মাথায় খুন করে প্লিজ এনকাউন্টার বলবেন না। বলুন "খুন করেছি, বেশ করেছি।" বাকিটা আদালত বুঝে নেবে।
    এনকাউন্টার  - Anjan Banerjee | আকাশে শশধর ও তারকাপুঞ্জ হয়ত ছিলঢাকা পড়েছে শেষ আষাঢ়ের গাম্ভারি নিশি মেঘে। নিশুত রাতে ছ্যাতরানো জল কাদা জঙ্গল ধরেঠেলা মেরে নিয়ে যায় লগবগে মাথার কোননেশাখোর আসামীকে হাফ ডজন শান্তির রক্ষী।কালো রাতের কম্বলে ঢাকা জল কাদার বাদায়যে বলেছিল গতদিন খানিকটা গল্প। আজ সে নাকি এঁকেবুঁকে ছবি লিখে তুলে দেবেসেদিনের নরকের নক্সা এই ঝুমকো আঁধারে। জানা গেল, ছবি আঁকা হয়নিকথা কেউ কয়নি,ঝুঁঝকো আঁধারে আচমকা সে নিজেই হয়ে গেছে ছ্যাতরানো ছবি আর রোমাঞ্চ গল্প। বেচারি প্রহরীরা ভয় পেয়ে বড্ড... গুলি মেরে ধরিয়ে দিয়েছে কর্দম ভরা ভূমিলগবগে লোকটাকে। তারপর ক'জনায় মিলেজুলে চুপিচুপি লেখা হল গভীর রাতের গল্প,না না না... প্রভাসের পেন্সিলে নয়, রাষ্ট্রের হীরের কলমে। আকাশে শশধর ও তারকাপুঞ্জ হয়ত ছিলঢাকা পড়েছে শেষ আষাঢ়ের গাম্ভারি নিশি মেঘে।ছোটদের চিড় খাওয়া খেলনা জোড় লাগিয়ে দেবার মতোসাজিয়ে রাখা হল ফেভিকল দিয়ে জোড় লাগানো একটা ভাঙাচোরা গল্পকেতাবটার মলাটের ভিতরে .... এনকাউন্টার ! ! ********************************************
    ফুটবল নয়, ফিফা ২০২৬-এর অন্ধকূপ: আর্জেন্টিনা কি এবার বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়বে? - হারামির হাতবাক্স | আধুনিক ফুটবল এখন খেলা নয়—একটা অনিয়ন্ত্রিত কর্পোরেট উৎসব, যেখানে মাঠের ঘাসের চেয়ে বেশি দামী ব্যাঙ্কের লেনদেনের খাতা। আর তারই মাঝখানে আর্জেন্টিনা ফুটবল দুর্নীতির নতুন অধ্যায় লিখছে ২০২৬-এর বিশ্বকাপের পটভূমিকে। AFA Gate: যখন ট্যাপিয়ার নাম শুনলেই কেঁপে ওঠে বুয়েনস আইরেস ক্লাউদিও "চিকি" ট্যাপিয়া—আর্জেন্টিনীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (AFA)-র সভাপতি, যার নাম এখন যুক্ত ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির সাথে। ২০২৫-এর ডিসেম্বরে আর্জেন্টিনীয় পুলিশের অভিযান AFA-র সদরদফতর ও ১৮টি ক্লাবে—টাকা পাচার, কর ফাঁকি, আর ভুয়া চুক্তির অভিযোগ। লা নাসিওঁ-র তথ্য অনুযায়ী, ফ্লোরিডাভিত্তিক TourProdEnter LLC-র মাধ্যমে AFA অন্তত ২৬০ মিলিয়ন ডলার ঘুরিয়েছে মার্কিন ব্যাঙ্কিং সিস্টেমে—সিটিব্যাঙ্ক, জেপি মর্গান, ব্যাঙ্ক অফ আমেরিকা। সমস্যাটা কোথায়? এই টাকা ক'টা সরাসরি AFA-র পরিচালন খরচের সাথে মেলানো যায়—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস। Sur Finanzas: যে কোম্পানি AFA-কে "ঋণ" দিয়ে কিনেছে টিভি রাইটস? আরিয়ান ভালেহোর মালিকানাধীন Sur Finanzas-এর নাম এখন দুর্নীতির তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু। এই কোম্পানি ক্লাবগুলোকে ঋণ দিয়েছে, বদলে নিয়েছে টেলিভিশন ও মার্কেটিং রাইটস—এমনটাই অভিযোগ। শুধু তাই নয়, AFA এবং জাতীয় দলের জন্য একমাত্র স্পন্সর হিসেবে কাজ করেছে Sur Finanzas—অন্য কোনও বিকল্প ছাড়াই। সূত্রের দাবি, ভালেহো ট্যাপিয়াকে একটি ক্রেডিট কার্ড দিয়েছিলেন, যা ব্যবহার করে AFA সভাপতি শত শত হাজার ডলার খরচ করেছেন একাধিকবার। ২০২৪-এ কার্লোস টেভেজের টুইট—ট্যাপিয়ার ট্রেজারার পিলারে বারবার যাচ্ছেন, সেখানে নাকি টাকা ভরা ব্যাগ মাটিতে পোঁতা, আর প্রাচীন গাড়ির সংগ্রহ। FBI-র নজরদারি: ২৬০ মিলিয়ন ডলারের রহস্যময় লেনদেন FBI এখন AFA-র আর্থিক লেনদেনের উপর প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে—মার্কিন আইনে টাকা পাচার বা প্রতারণার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে। TourProdEnter LLC অন্তত ২৬০ মিলিয়ন ডলারের রাজস্ব পরিচালনা করেছে AFA-র হয়ে, কিন্তু তার শুধু অংশই সরাসরি AFA-র পরিচালন খরচের সাথে যুক্ত। বাকি টাকা কোথায় গেল? ট্যাপিয়ার পরিবারের কোম্পানিতে? নাকি ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হয়েছে? আর্জেন্টিনীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, ২০২৩ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে ভুয়া চুক্তি ও ইনভয়েসের মাধ্যমে ৩৭৬ মিলিয়ন পেসো আত্মসাতের অভিযোগ ট্যাপিয়ার বিরুদ্ধে। FIFA-র হুমকি: আর্জেন্টিনা কি ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়বে? ফিফা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা প্রাতিষ্ঠানিক অসঙ্গতির ব্যাপারে সহনশীল নয়—এবং যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে আর্জেন্টিনাকে ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে শিরোপা রক্ষার প্রস্তুতির মাঝেই এই ফিফা ২০২৬ কেলেঙ্কারি আলোর মুখ দেখেছে। ARCA—আর্জেন্টিনার নতুন অডিট ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ—AFA এবং ট্যাপিয়ার বিরুদ্ধে ৭ মিলিয়ন ডলার আত্মসাত ও কর না দেওয়ার অভিযোগ এনেছে। পুলিশি তল্লাশি চলছে, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে ট্যাপিয়ার বিরুদ্ধে এখনও কোনও চার্জশিট দাখিল হয়নি। টেলিভিশন রাইটস, স্পন্সরশিপ, আর অদৃশ্য টাকা: ফুটবলের নতুন অর্থনীতি ২০১৬ সালে তখনকার FIFA কেলেঙ্কারিতে আর্জেন্টিনীয় মার্কেটিং ফার্ম Torneos y Competencias ১১২ মিলিয়ন ডলার জরিমানা ও জব্দ দিয়েছিল—২০১৮, ২০২২, ২০২৬, ২০৩০ বিশ্বকাপের ব্রডকাস্টিং রাইটস নিশ্চিত করতে ঘুষ দেওয়ার অপরাধে। ইতিহাস কি আবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করছে? ২০২৬-এর বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচগুলো দুর্বল দলের বিরুদ্ধে—লাভের জন্য, না খেলার উন্নতির জন্য? আর্জেন্টিনীয় ফুটবলের এই অন্ধকূপে মেসির জাদু কি আরও কয়েক মাস টিকবে, নাকি ফিফা হস্তক্ষেপ করবে? ফুটবল মরল, কর্পোরেশন বাঁচল: প্রশ্ন থেকে যায় যখন একটা দেশের জাতীয় দলের ভাগ্য নির্ধারণ হয় ব্যাঙ্কের লেনদেনের খাতায়, তখন ফুটবল কি আর ফুটবল থাকে? আর্জেন্টিনা ফুটবল দুর্নীতির এই অধ্যায় কি শেষ অধ্যায়, নাকি শুধু একটা পর্বের সমাপ্তি? আপনি কি মনে করেন, লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপস্বপ্ন ভাঙবে AFA-র দুর্নীতির ভারে? কমেন্টে জানান—আর শেয়ার করুন, যদি মনে হয় ফুটবল এখন আর খেলা নয়, ব্যবসা। সূত্র: 1. [sports.yahoo](https://sports.yahoo.com/articles/fbi-probe-casts-shadow-over-141009778.html) 2. [economictimes.indiatimes](https://economictimes.indiatimes.com/news/international/us/lionel-messi-led-argentinas-fifa-world-cup-2026-title-defense-under-shadow-as-argentina-fa-corruption-shocks-latin-american-country/articleshow/126536461.cms) 3. [sports.ndtv](https://sports.ndtv.com/fifa-world-cup-2026/argentina-football-association-faces-fbi-probe-over-alleged-money-laundering-report-11744293?pfrom=home-ndtv_fifa) 4. [msn](https://www.msn.com/en-za/news/other/argentina-messi-excluded-from-the-2026-world-cup/ar-AA1SmJ26) 5. [reuters](https://www.reuters.com/sports/soccer/argentine-soccer-body-turmoil-ahead-world-cup-over-mystery-villa-dirty-money-2026-01-01/) 6. [punchng](https://punchng.com/world-cup-fbi-probes-argentine-fa-for-money-laundering-fraud/) 7. [chosun](https://www.chosun.com/english/sports-en/2026/04/18/T6BXKLZIDFEUFNSTPDXVFB7F5Q/) 8. [footyroom](https://footyroom.co/articles/could-argentina-really-be-banned-from-the-2026-world-cup-inside-the-corruption-scandal-rocking-the-afa-69408b6bf6cd5070ad3fa852) 9. [footyroom](https://footyroom.co/articles/could-argentina-really-be-banned-from-the-2026-world-cup-inside-the-corruption-scandal-rocking-the-afa-69408b6bf6cd5070ad3fa852) 10. [espn](https://www.espn.com/soccer/story/_/id/37505852/argentine-marketing-firm-pay-112-million-fifa-scandal) 11. [chosun](https://www.chosun.com/english/sports-en/2026/04/18/T6BXKLZIDFEUFNSTPDXVFB7F5Q/) 12. [sports.yahoo](https://sports.yahoo.com/articles/fbi-probe-casts-shadow-over-141009778.html)
  • ভাট...
    commentManali Moulik | অন‍্যজনের সম্পর্কে জানতে চাইলেও জানাবো।
     
    বাহ ডটদি। বলুন। ব‍্যাপার হলো এটাই যে এই কান্ট্রিতে কিনু হয়নি। বাইরে বেরিয়ে তবেই। এখানটা আমি কৌতুহলীর সঙ্গে একমত। এদেশে ব‍্যবসা নিয়ে এই ভাইন্ডসেট নেগেটিভ হবার কারণই হলো এটা যে মানুষকে এক্সপ্লয়েট করেই সবটা করতে হয়। তো যারা সাব অল্টার্ণ বা শোষিত তাদের ও অ‍্যাকাডেমিক পারস্পেক্টিভ থেকে এটা মনে হবেই। তবে কী বলুন তো, সবের মূলেই তো ওই রজতখন্ড। তাই বললাম। ওই সেই মানিকগঞ্জের জমিদারের মতো আর কি! নন্দী-ভৃঙ্গীর কাছে লাথি খাওয়া লাষ্টে
    comment. | এই ফোটো ও তুলেছিলো
     
    comment. | In Russia, LLC Stynergy (Стинержи), a major manufacturer of steel roofing and metal construction products, is primarily owned by Russian businessman Grigoriy Aleksandrovich Nosikov. [1, 2] Nosikov serves as the General Director and holds a controlling stake in the company directly as an individual, alongside an ownership share held by his affiliated corporate entity, LLC PKP Evroprofil. [1, 2, 3, 4, 5]
     
    এইটের কো ওনার ওর বৌ। তবে বৌ কোনও কাজই দেক্‌ে না।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত