এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    দেখছে জনতা, বলছে সাবাস! - সুমন সেনগুপ্ত | অলংকরণ: রমিতনদীয়ার কালিগঞ্জে দলীয় বৈঠক চলাকালীন কৃষ্ণনগর লোকসভার সাংসদ মহুয়া মৈত্রকে লক্ষ্য করে বিজেপির গেরুয়া বাহিনী সংগঠিত সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে। সাংসদের সামাজিক মাধ্যমের হ্যান্ডেলে আমরা প্রায় ৪ ঘণ্টা ধরে এই তান্ডব প্রত্যক্ষ করলাম কীভাবে বিজেপির গুন্ডাবাহিনী দলীয় পতাকা নিয়ে সমবেতভাবে হামলা চালানোর বন্দোবস্ত করেছিল। পুলিশ প্রশাসনের একটি গাড়ি খবর দেওয়ার অনেক পর অকুস্থলে পৌঁছয়। উপস্থিত কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা ওই গুন্ডাদের উন্মত্ত ভীড়কে সরিয়ে দেওয়ার কোন চেষ্টা না করে কাঠের পুতুলের মতো আচরণ করে। যা স্পষ্ট করে দেয় যে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব ও পুলিশ প্রশাসনের নির্দেশ মেনেই কোনরকম হস্তক্ষেপ থেকে পুলিশকে বিরত রাখা হয়েছে। মহুয়া মৈত্রের সামাজিক মাধ্যমের পোষ্টগুলো এবং এক্স হ্যান্ডেলের পোস্টগুলো যদি পরপর দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে এই মহিলা সাংসদ চিৎকার করছেন, যে তিনি আক্রান্ত। তিনি যে জায়গায় তাঁর দলীয় কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলেন, সেই ঘরটা জাতীয় সড়কের ওপরে একটি বাড়ির তৃতীয় তলায়। তাঁর ফেসবুক লাইভ থেকে দেখা যাচ্ছিল, যে ঐ ঘরের জানলার বাইরে একদল মানুষ জড়ো হয়েছেন এবং তাঁরাই উস্কানি দিচ্ছে। তাঁদের মুখে সেই কুখ্যাত কিংবা বিখ্যাত ‘জয় শ্রী রাম’ শ্লোগান এবং কারো কারো হাতে বিজেপির পতাকা। তাঁরাই ঐ ৩ তলার ঘর লক্ষ্য করে ডিম এবং পচা সব্জি ছুঁড়ছেন, আর মহুয়া মৈত্র ঐ পরিস্থিতিতে ফেসবুক লাইভে নাম ধরে পুলিশের উচ্চ পদস্থ আধিকারিক, বিজেপির জাতীয় সভাপতি, লোকসভার স্পীকারের নাম ধরে ধরে বলছেন। প্রশ্ন করছেন একজন বিরোধী দলের মহিলা সাংসদের উদ্দেশ্যে কি এই ধরনের আচরণ করা যায়? প্রায় ৪ ঘণ্টা ধরে এই তান্ডব সারা দেশ শুধু নয়, সারা বিশ্ব দেখেছে অথচ আমাদের গোদী মিডিয়া এই ঘটনার বর্ণনা করার সময়ে শিরোনাম লিখেছে, ‘জনরোষের শিকার মহুয়া মৈত্র’। বিষয়টা এখানেই থামেনি। সেই গোদী মিডিয়ার চ্যানেলের পোষ্টে গিয়ে মহুয়া আবারও লিখেছেন, ‘আপনারা এটাকে জনরোষ বলে চালাতে চাইলেও, বিষয়টা পরিকল্পিত সন্ত্রাস’ তিনি আরও লিখেছেন যে এই পরিকল্পিত সন্ত্রাসের কাছে তিনি মাথা নোয়াবেন না। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন বিদেশী খবরের চ্যানেলগুলো যেমন বিবিসি, আলজাজিরা, নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং দি গার্ডিয়ানকে উদ্দেশ্য করে লেখেন, যে ভারতে একজন মহিলা বিরোধী দলের সাংসদকে কী করে হেনস্থা করা হচ্ছে, তাঁরা যেন দেখে এবং খবর করে। এই ঘটনা সারা বিশ্বের সামনে বাংলার মাথা আরো নীচু করে দিলেও, বিজেপির রাজ্য সভাপতি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ তাচ্ছিল্য সহকারে এই ঘটনাকে তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্ব বলে চালানোর চেষ্টা করেছেন। একজন মহিলা সাংসদ কে এইভাবে হেনস্থা করার চেষ্টা তার কাছে অসুবিধার মনে হয়নি। তাঁর কথা অনুযায়ী, কেউ পকেটে ডিম নিয়ে ঘুরছেন কি না, পুলিশের পক্ষে কি জানা সম্ভব? মেটাল ডিটেক্টর আবিষ্কৃত হলেও, কোনও ডিম ডিটেক্টর এখনও পাওয়া যায়নি, সেইজন্য নাকি এই ধরনের আক্রমণ বন্ধ করা যাচ্ছে না। যেখানে একটি ডিমের দাম বাজারে এখন ৮ টাকা, সেখানে মানুষের হাতে এত ডিম যদি থাকে ছোঁড়ার জন্য তাহলে তো বলতে হয়, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময়ে মানুষের আর্থিক অবস্থা বেশ সচল ছিল। কারণ এখনো তো এই সরকার ১.৩০ কোটি মহিলাকে সবে অন্নপূর্ণা যোজনার প্রতিশ্রুত ৩০০০ টাকা দিয়েছে। আগের সরকারের অসংখ্য মহিলাই নানান কারণে বাদ পড়েছেন। তাহলে মানুষ এত ডিম কিনছে কী করে? আবার যখন সেই মানুষদের হাতে আবার বিজেপির দলীয় পতাকা দেখা যাচ্ছে, সেই লোকগুলোও নিশ্চিত নতুন বিজেপি, তাহলে তাঁদের চিহ্নিত করাটা যেমন পুলিশের কাজ, তেমন তো সেটা বিজেপির রাজ্য সভাপতিরও কাজ। তা না করতে পারলে, তিনি তো ব্যর্থ হিসেবেই চিহ্নিত হবেন। বুঝতে হবে তিনি বিজেপির তৃণমূলীকরণ আটকাতে পারছেন না। নাকি সচেতনভাবেই এটা করা হচ্ছে, যাঁরা বিজেপির কাছে মাথা নোয়াবে না, তাঁদের হেনস্থা করা হবে আর কাকলি ঘোষ দস্তিদার, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, জুন মালিয়া বা সায়নি ঘোষদের মত যাঁরা মাথা নুইয়ে দিচ্ছেন, তাঁদের ওপর কোনও আক্রমণ হবে না। এই অলিখিত নির্দেশ দেওয়া আছে। আজকের সময়ে বিরোধী রাজনীতিবিদ বা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দিকে ডিম ছুড়ে মারা হলে, তাঁদের সহযোগীরা কখনও কখনও নাটকীয়ভাবে হামলাকারীদের নাৎসি আমলের সঙ্গে তুলনা করছেন। বক্তব্য বা বয়ানটি এমনভাবে সাজানো হচ্ছে যাতে এই ঘটনাকে নিছক দুর্বৃত্তপনা হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক ভীতি প্রদর্শন, রাজপথে সহিংসতা এবং ১৯৩০-এর দশকের জার্মানির কথা মনে করিয়ে দেয় এমন এক বাকস্বাধীনতা দমনের ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। যদিও আজকের বাংলার শাসকদল বিষয়টা মানতে রাজি নয়, তাঁরা বলছে এটা মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত জনরোষ, কিন্তু আদপে কি বিষয়টা তাই? বাংলার বিধানসভায় সদ্য পাশ হয়েছে বিজেপির আনা কুখ্যাত গুন্ডাদমন বিল। যেখানে যে কোনো কল্পিত 'গুন্ডামির' অভিযোগে যে কোন নাগরিককে গ্রেপ্তার করে বিনা বিচারে এক বছর জেলবন্দী করার আইনি স্বীকৃতি রাখা আছে। অন্যদিকে, পূর্বতন শাসক, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীকে ডিম ছুঁড়ে সামূহিকভাবে প্রকাশ্যে হেনস্থা ও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। আর বিজেপির সভাপতি এই ডিম্বাঘাত সংস্কৃতির প্রসঙ্গে মিঠে সুভাষিত প্রচার করে চলেছেন। এই ক্রমবর্ধমান গেরুয়া সন্ত্রাসের রাজনীতির প্রতিবাদ না জানালে আগামীদিনে কিন্তু এই আগুনে অনেককেই পুড়তে হতে পারে। যাঁরা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছেন তাঁরাও যে আক্রান্ত হবেন না, তা নিশ্চয়তা আছে কি? ঐ হামলাবাজদের ও তাদের সরাসরি উস্কানিদাতাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহনের জোরালো দাবি জ্জানানো উচিৎ সকল রাজনৈতিক দলের। তার জন্য তাঁকে তৃণমূলের সমর্থক হতে হবে না। গণতন্ত্রের স্বার্থেই এটা করা উচিৎ। সামাজিক মাধ্যমে হয়ত তা হচ্ছেও, কিন্তু শুধু বিবৃতি দিয়ে হবে না, এই বিষয়টা নিয়ে বেশী বেশী করে কথা বলার প্রয়োজন এবং তা কোনও ‘কিন্তু, এবং বা পর্যন্ত’ না ব্যবহার করেই বলতে হবে। ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের শ্লোগান ছিল ‘বদলা নয়, বদল চাই’, তা সত্ত্বেও নানান জায়গায় বামপন্থী কর্মীদের ওপর আক্রমণ হয়েছে এবং তা চূড়ান্ত সমালোচিতও হয়েছে। কিন্তু আজকে যখন কেন্দ্রে রাজ্যে একই দলের সরকার, তখন না কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা আসছে, না স্বরাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিনিধিরা আসছেন। বিষয়টা যেন ‘নিউ নরমাল’ বলে মেনে নেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে খারাপ প্রচলিত গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকা। তাঁরা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার বদলে বিরোধী দলের অন্তর্দ্বন্দ্ব নিয়েই ভাবিত বেশী মনে হচ্ছে। মনে পড়ে যাচ্ছে গুজরাটের কথা। ভারতের প্রাক্তন সংসদ সদস্য এহসান জাফরিকে উত্তেজিত হিন্দু জনতা তাঁর বাড়ি থেকে টেনে বের করে নৃশংসভাবে মারধর করে এবং পুড়িয়ে হত্যা করে। গুজরাটের আহমেদাবাদে গুলবার্গ সোসাইটি হত্যাকাণ্ডের সময় ২০০২ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি তাঁর এই মৃত্যু ঘটে। সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক গঠিত একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, বাড়ির বাইরে সমবেত ভিড়ের দিকে আত্মরক্ষার্থে জাফরি তাঁর রিভলবার থেকে গুলি চালানোর পরই সহিংসতা তীব্র আকার ধারণ করে এবং জনতা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। উদ্ধারের জন্য পুলিশ ও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে বারবার ফোন করা সত্ত্বেও কোনো সাহায্য না আসায় শেষ পর্যন্ত তাঁর এবং আরও ৬৮ জন বাসিন্দার মৃত্যু ঘটে। বাংলায় মহুয়া মৈত্রের সঙ্গে যা হয়েছে, তা যেন সেদিনের গুজরাটের ঐ নৃশংস ঘটনার একটা ছোট্ট অংশ। আগামীদিনে যে এই ঘটনা অন্য বিরোধী দলের ক্ষেত্রে বা যাঁরাই বিজেপি বিরোধী, তাঁদের বিরুদ্ধে হবে না, কে বলতে পারে? জনগণ তৃণমূলকে হারিয়েছে তাদের বহু সদস্যের বিপুল চুরি আর তোলাবাজির জন্য। অনেক বিধায়ক ও কাউন্সিলার এক শ্রেণীর সমাজ বিরোধীদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, সেই জন্যেই তাঁরা আজ পরাজিত। গত নির্বাচন যদি তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনরায় হয়ে থাকে, তাহলে ওই তৃণমূলের সবচেয়ে বড় বড় রাঘব বোয়ালরা ও মস্তানেরা এখনও কীভাবে দিব্যি তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে? এদের মধ্যে অনেকে বিশাল অঙ্কের টাকা নিয়ে অসাধু প্রমোটারদের প্রচুর বেআইনি বাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। কোনও শাস্তি তো হচ্ছে না। তাঁদের কাউকে কাউকে বর্তমান শাসকদলের বিধায়ক-মন্ত্রীদের আশেপাশে দেখা যাচ্ছে কেন? তাঁরা কি বিজেপির বি টিম গঠন করে হঠাৎ ধপধপে সাদা হয়ে গিয়েছেন? এর জন্যে কি কোনো অ্যাডমিশন ফিস দিতে হয়েছে? বাজারে কত রকমের কত কথা শোনা যাচ্ছে। বিজেপি কি বুঝতে পারছে না যে এঁদের সঙ্গে রফা করে তারা জনাদেশকে অপমান করছে ?তাঁদের রাজ্য সভাপতির কথা অনুযায়ী এরা সবাই তৃণমূল, যাঁরা মহুয়া মৈত্রকে আক্রমণ করতে গিয়েছিল, তাহলে তাঁদের গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশকে কিছু কেন বলছে না সরকার, সেটা তো রাজ্য সভাপতি বলতে পারেন। অবশ্য তাঁর একটা যুক্তি আছে, এই সরকারকে কোনও নির্দেশ দিতে তিনি পারেন না, তিনি তাঁর দলকে নির্দেশ দিতে পারেন। অবশ্যই ঠিক বলেছেন, তাহলে সেটাই তিনি করুন, না হলে তাঁর সুললিত গলায় গম্ভীর ভাষণের তো কোনও মূল্যই থাকছে না। অনেকেই উচ্ছসিত হচ্ছিলেন যখন তৃণমূলের নেতা মন্ত্রীদের ডিম ছুঁড়ে মারা হচ্ছিল। বহু সিপিআইএম কর্মী খুব উল্লাসিত হচ্ছিলেন। বেশিদিন হয়নি এখন দেখা যাচ্ছে মীনাক্ষী মুখার্জির দিকেও ওই ডিম এবং পাথর তেড়ে আসছে। আসলে জনরোষের নামে বিজেপির পরিকল্পিত মবতন্ত্র কখন যে বিরোধীদের মুখ বন্ধ করার জন্য ব্যবহৃত হবে তা বোঝা যাবে না। মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ তো সরাসরি হুমকি দিয়েছেন, এবার বুদ্ধিজীবি ও কমিউনিষ্টদের ওপর ডিম ছুঁড়তে হবে। সে তো হবেই, ওঁদের যে কোনও বুদ্ধিজীবি নেই, তা না বলে দিলেও চলত। তবে বিষয়টা মোটেও আর হাসি ঠাট্টার পর্যায়ে নেই। বিষয়টা ক্রমশ জটিল হচ্ছে। সেই জন্যই এই ডিম ছোড়ার এবং এই মবতন্ত্রের বিরোধিতা করতে হবে। কবীর সুমন এক সময়ে একটা গান লিখেছিলেন ‘একখানা ইঁট যদি পাওয়া যেত, নোংরা মুখখানা করতাম থেঁত, ভাবতে ভাবতে গেল একজন, ক্ষত বিক্ষত ছেলেটার কাছে, যেন দু’জনের শ্ত্রুতা আছে... দেখছে জনতা বলছে সাবাস। মাঝে মধ্যেই এখানে ওখানে পিটিয়ে মারার ব্যস্ত শ্মশানে পুড়ছে কে? প্রশ্ন অনেক উত্তর নেই এই অসহ্য সময়টাকেই কাঁদতে দে ’ গণপিটুনি এক সময়ে ভয়ঙ্কর বেড়ে গিয়েছিল, সেই সময়ে কবীর সুমন এই গানটা তৈরি করেছিলেন। আজকে বহু সরকার এসেছে এবং গেছে, কিন্তু অবাক হতে হয় যে অপরাধীরা কী সহজ ভাবে এক দল থেকে নতুন সরকারের দলে চলে যায়। অপরাধ তো চলতেই থাকে। শুধু পৃষ্ঠপোষক আর পোশাক পাল্টে যায়। সরকার কি বুঝছে না এই গুন্ডাশ্রেণীই তাদের ডোবাবে? শেষ করা যাক একটা আশার খবর দিয়ে। এখন বাংলায় সাধারণ মানুষ ডিম ছোড়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে! দীঘায় এক সরকারি কর্মীর মাথায় ডিম ভাঙা হলে, তাঁর পাশের সাধারণ মানুষজন বিরোধিতা করে।এই খবরটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত যাতে এই জনতা বুঝতে পারে যে সভ্য সমাজে ডিমতন্ত্র বলে কিছু হয় না! কোনো ডিম শনাক্তকারী যন্ত্রের প্রয়োজন নেই। বিজেপির রাজ্য সভাপতি বলছেন, পুলিশের কাছে ডিম শনাক্ত করার যন্ত্র নেই, আর ওদিকে বিজেপির নেতা বলছে, তার কাছে নাকি ডিম ছোড়ার নির্দেশ আছে। সরকার গুন্ডা দমন আইন আনছে, আর ওদিকে সরকারের মন্ত্রী গুন্ডাদের ভাষায় কথা বলছেন। দুটো তো একসঙ্গে চলতে পারে না। একমাত্র গণপ্রতিরোধই এই মব ভায়োলেন্স থামাতে পারে। ব্যস।
    ভোটাধিকার থেকে বাদ যাওয়া মানুষদের নিয়ে কথা কে বলবে? - সুমন সেনগুপ্ত | অলংকরণ: রমিতদ্যা টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রাক্তন মুখ্য সম্পাদক রাজাগোপালের বহুদিনের পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণ হয়নি, পুলিশ যে তথ্য যাচাই করে, সেই তথ্য যাচাইতে জানা গেছে যে তাঁর নাম যেহেতু ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় ছিল না, তাই তিনি ভারতীয় কি না, তার স্বপক্ষে তাঁরা কোনও প্রমাণ নাকি দাখিল করতে পারেনি, তাই তাঁরা বিরূপ রিপোর্ট দিয়েছে। যা বোঝা যাচ্ছে দেশের অন্যতম বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং সম্পাদক রাজাগোপালের নাম গত ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় না থাকার ফলে, তাঁর পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণ হবে কি না, তা প্রশ্নের মুখে।এই বিষয়ে তাঁর নিজস্ব একটি বয়ান সমাজমাধ্যমে ঘুরছে। সেই বক্তব্যের বেশ কিছুটা অনুবাদ করে পড়া প্রয়োজন। আমাদের মধ্যে অনেকেই হয়ত তৃণমূলের অপশাসন গিয়ে বিজেপির শাসন ব্যবস্থা আসাতে উল্লসিত, কিন্তু সেই ভোটে কি সত্যিই মানুষের রায় প্রতিফলিত হয়েছে, এই প্রশ্নও টুকটাক উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইভিএম পুড়ে যাওয়ার ঘটনা, সেই প্রশ্নে আরো ঘৃতাহুতি দিয়েছে। তিনি লিখেছেন - “এই বছরের মার্চ মাসে, কলকাতার বালিগঞ্জ নির্বাচনী এলাকার ভোটার তালিকা থেকে আমার নাম বাদ দেওয়া হয়। এর কারণ হিসেবে বলা হয় যে, ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়ায় ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আমার বা আমার প্রয়াত বাবার কারও নামই খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমার বাবা ছিলেন একজন গান্ধীবাদী ব্যক্তিত্ব, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং কেরালার ‘গান্ধী স্মারক নিধি’র প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদক। তিনি ২০১৬ সালে প্রয়াত হন। তাঁর মতো একজন সচেতন ও দায়িত্বশীল ভোটারের নাম কীভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে, তা আমার বোধগম্য নয়।পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২৭ লক্ষ বাসিন্দার মতোই, তথাকথিত ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’র (Logical Discrepancies) কারণে আমার নামও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। আমার ম্যাট্রিকুলেশন বা মাধ্যমিক পরীক্ষার নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি; বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী গঠিত ট্রাইব্যুনালগুলোর একটিতে আমার আপিলটি বিচারাধীন রয়েছে। এর ফলে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে আমি ভোট দিতে পারিনি।আরও হতাশাজনক হলো আমার পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণের আবেদনের বিষয়টি। যদিও ১৯ মার্চ, ২০২৬-এ আমি বায়োমেট্রিক সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছিলাম, তবুও পুলিশ ভেরিফিকেশন বা যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়নি কারণ ভোটার তালিকায় আমার নাম আর নেই। বেশ কিছু বিকল্প নথিপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও আমাকে জানানো হয়েছে যে সেগুলো অপর্যাপ্ত। বস্তুত, আজ (২৭ জুন, ২০২৬) পাসপোর্ট নবায়নের জন্য বায়োমেট্রিক দেওয়ার পর ১০০ দিন অতিক্রান্ত হলো। গত সপ্তাহে পাসপোর্ট প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে কলকাতা পুলিশ একটি ‘প্রতিকূল প্রতিবেদন (adverse report) পাঠিয়েছে। আমাকে অবিলম্বে কলকাতার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে (Regional Passport Office) হাজির হতে বলা হয়েছে; কিন্তু আমি যখন সাক্ষাতের জন্য সময় (অ্যাপয়েন্টমেন্ট) চাইলাম—যা ছাড়া সেখানে প্রবেশ করা কঠিন—তখন আমাকে ১৭ জুলাই, ২০২৬-এর তারিখ দেওয়া হলো।এরই মধ্যে, ক্যালিফোর্নিয়ায় কর্মরত সাংবাদিক আমাদের মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন হলো সান ফ্রান্সিসকোতে, ১৭ এপ্রিল। বলাই বাহুল্য, বৈধ দশ-বছরের মার্কিন ভিসা থাকা সত্ত্বেও, একটি সচল পাসপোর্ট ছাড়া সেই বিয়েতে আমার পক্ষে উপস্থিত হওয়া অসম্ভব ছিল।বাস্তব বিচারে, আমি এখন এক ধরণের নাগরিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি—যদিও সরকার সম্প্রতি পুনর্ব্যক্ত করেছে যে পাসপোর্ট নাগরিকত্বের কোনো প্রমাণ নয়। আমার সারাদিনের সময়ের বড় একটা অংশ এখন ব্যয় হচ্ছে পারিবারিক নথিপত্র পুনরুদ্ধার এবং কয়েক দশক আগের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জোগাড় করার প্রচেষ্টায়... আমার দিন শুরু হয় ভোটাধিকার সংক্রান্ত আবেদনের বর্তমান অবস্থা এবং পাসপোর্টের আবেদনের গতিবিধি (ট্র্যাকার) যাচাই করার মধ্য দিয়ে। এরপর আমি সেই কলেজে চিঠি লিখি যেখানে আমার মা ১৯৬৫ সালে শিক্ষকতা করেছিলেন এবং সেই স্কুলে যেখান থেকে তিনি ১৯৫৯ সালে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন; উদ্দেশ্য হলো এমন কোনো নথিপত্র জোগাড় করা যা তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়। স্কুলটি এ ব্যাপারে বেশ সহায়তা করেছে, কিন্তু কলেজটি তা করেনি। একইভাবে, আমি কেরালার মদ্যপান-বিরোধী প্রচারণায় যুক্ত কর্মীদের সাথে কথা বলি—একটি অনলাইন গ্রুপে ঘটনাক্রমে এক কর্মীর নাম পাওয়ার পর আমি যে তালিকা তৈরি করেছিলাম, তা ধরেই এগোচ্ছি। আমি তাঁদের কাছে এমন কোনো সংবাদপত্রের কাটিং বা ছবি চাইছি যাতে অবৈধ মদের দোকান ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আমার বাবার প্রচারণার প্রমাণ পাওয়া যায়।আমার এই সব প্রচেষ্টায় কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি সহায়তা করেছেন। তবে কোনো সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিক সংগঠন বা গিল্ড (যার আমি সদস্য নই) আমার এই পরিস্থিতির প্রতি কোনো আগ্রহ দেখিয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই। একজন প্রবীণ সাংবাদিক আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই ব্যতিক্রমী নয়; কারণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লক্ষ লক্ষ ভারতীয়কে নিত্যদিনের বাস্তবতা হিসেবে এই ‘প্রত্যাখ্যান’ এর মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমি সেই যুক্তি মেনে নিয়েছি।নিজেকে ভুক্তভোগী বা ‘ভিক্টিম’ হিসেবে তুলে ধরা আমার উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না। বরং আমি একটি বৃহত্তর বিষয়কে সামনে আনতে চেয়েছি: সাংবাদিকতায় পেশাগত জীবন কাটানো এবং মোটামুটি পরিচিত একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা কোনো ব্যক্তি যদি এমন সব সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন, তবে সমাজের প্রান্তিক মানুষগুলোকে কী ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা সহজেই অনুমেয়। আমি কি কোনো সংবাদপত্রের দ্বারস্থ হয়েছি? না, কারণ আমি চাই না বিষয়টি কেবল আমাকে কেন্দ্র করেই কোনো ইস্যু হয়ে উঠুক। সম্পাদক ও সাংবাদিকরা কি আমার এই সমস্যার কথা জানেন? অবশ্যই, তাঁদের অনেকেই জানেন। আর যদি না-ই জানেন, তবে তাঁদের এই পেশায় থাকা উচিত নয়—আপনারও কি তাই মনে হয় না?তবুও, এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্পূর্ণ নীরবতা আমার সেই সন্দেহকেই নিশ্চিত করেছে—যা এখন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে আরও জোরালো হয়েছে—যে তথাকথিত মূলধারার সাংবাদিকতার সাথে আমার জীবনের খুব একটা সম্পর্ক নেই। আমি এখন আর কোনো সংবাদপত্র ‘পড়ি’ না। কোনো কোনোটির ওপর হয়তো চোখ বুলিয়ে নিই, কিন্তু কদাচিৎ এমন কিছু খুঁজে পাই যা আমার আগ্রহ জাগিয়ে তোলে।’’রাজাগোপালের এই বয়ানটি হয়ত, অনেকেই পড়েছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও নির্লিপ্ত থেকেছেন, ঠিক যেমনটা ভোটের আগে, কিংবা আসামের এনআরসি’র সময়ে ছিলেন। তখন হয়ত বেশীরভাগ মানুষ ভেবেছিলেন, এই সমস্যা শুধু মুসলমানদের বা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’দের নিয়ে হবে, তাই তখন খুব বেশী শোরগোল করেননি। সেই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোও খুব বেশী সোচ্চার হয়নি, তারা সবাই ব্যস্ত ছিল নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারে। তৃণমূল কংগ্রেসের ধারণা ছিল, যে ঐ ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে বাদ গেলেও মানুষের সমর্থন তাঁদের দিকে থাকবে। সেই জন্যেই তাঁদের শ্লোগান ছিল, ‘যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা’। অথচ তাঁদের জনভিত্তি যে কমছিল, তা তাঁরা এঁচে উঠতে পারেনি। ওদিকে বামেদের একাংশ, বিশেষ করে সিপিআইএম ভেবেছিল এই প্রক্রিয়াতে তৃণমূলের ক্ষতি হবে, সুতরাং খুব বেশী হইচই না করলেও চলবে, তাই তাঁরা দায়সারা ভাবে বিরোধিতা করেছিল। এমনকি আইএসএফের পক্ষ থেকেও নৌশাদ সিদ্দিকি’র একটা বক্তব্য এসেছিল, ‘কোনও নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা নেই মুসলমানদের বেনাগরিক করার, প্রয়োজনে গোরের মাটি এনে প্রমাণ দেওয়া যাবে তাঁরা এই দেশের বাসিন্দা’।যদি ঘটনা পরম্পরা পরপর সাজানো যায়, তাহলে দেখা যাবে, প্রাথমিক যে খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়, সেখানে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ যায়, তার মধ্যে, মৃত, স্থানান্তরিত এবং অন্য ইনিউমারেশন ফর্ম জমা না দেওয়া ব্যক্তিদের নাম ছিল। যদিও সেই তালিকা নিয়েও অনেক প্রশ্ন ছিল তবুও অনেকে এই বিষয়টা মেনে নিয়েছিলেন। এরপর নির্বাচন কমিশন আসরে নামে তাঁদের ব্রহ্মাস্ত্র নিয়ে, নামের বানান, বাবার নাম বা মায়ের নাম বা পরিবারের অন্য কোনও ব্যক্তির নাম যদি ২০০২ সালের তালিকায় না থাকে, তাঁদের শুনানিতে ডাকা হয়। বলা হয়, এই ব্যক্তিদের ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ আছে, এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সামনে উপস্থিত হয়ে তাঁদের প্রমাণ করতে হবে, তাঁরা এই দেশের নাগরিক এবং ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে তবেই তাঁরা তাঁদের নাম তুলতে পারবেন।যদি খেয়াল করা যায়, এই শুনানিতে উপস্থিত হতে বলা হয়, সেই সংখ্যাটা ছিল প্রায় ১.৫ কোটি। বিভিন্ন শুনানি কেন্দ্রে তখন যাঁরা উপস্থিত হচ্ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রাদায়ের মানুষ ছিলেন। বৃদ্ধ থেকে আশীতিপর অসুস্থ মানুষজন ও ছিলেন। রাজ্যের প্রথম সারির প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রে প্রায় প্রতিদিন এই হয়রানির ছবি প্রথম পাতায় থাকলেও, একমাত্র গণশক্তি পত্রিকা প্রথম ৬ দিন সম্পূর্ণ নীরব ছিল। তাঁরা একটি কথাও বলেনি, বা একটি ছবিও প্রকাশ করেনি। শুধু তাই নয়, নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশও কোনও এক অজ্ঞাত কারণে চুপ থেকেছে। ততদিনে বিষয়টা আদালতে গেছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে শুনানি চলছে। এই প্রক্রিয়া আদৌ সাংবিধানিক কি না, তা নিয়ে নানান প্রশ্ন উঠে গেছে। এই হয়রানি নিয়েও কথা হয়েছে, কিন্তু প্রধান বিচারপতি বারংবার বলে গেছেন, কোনওভাবেই এই প্রক্রিয়া বন্ধ করা যাবে না। তিনি মেনে নিয়েছেন মানুষের হয়রানি হচ্ছে, তার জন্য তিনি বেশ কিছু পন্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেন, কিন্তু নির্বাচন কমিশন আদৌ কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব পরীক্ষা করতে পারে কি না সেই রায় তিনি স্থগিত রাখেন। অন্য আরো একজন যে বিচারপতি এই মামলা শুনছিলেন, ঘটনাচক্রে তিনি বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও এবং বাঙালির নামের পদবী সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী স্পষ্ট করলেও, এই ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ বা যৌক্তিক অসঙ্গতি যে একেবারেই অযৌক্তিক তা স্পষ্ট করে বলেননি।ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেছে চূড়ান্ত তালিকা থেকে, যাঁরা এবারের বাংলার নির্বাচনে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হল, প্রধান বিচারপতি এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেছেন, এইবার ভোট দিতে না পারলেও পরের বার দিতে পারবেন এই মানুষেরা। সঙ্গে আরো বলেছেন, যে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে নাগরিকত্বের কোনও যোগ নেই। এই ২৭ লক্ষ মানুষকে বলা হয়েছে ট্রাইবুনালে আবেদন করতে। ততদিনে কমিশন নির্বাচন ঘোষণা করে দিয়েছে। দেখা গেছে প্রায় ৩৪ লক্ষ মানুষ ঐ ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন। তারপরে নির্বাচন হয়েছে এবং বিজেপি ২০৫টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে।তারপরে আরো অনেক ঘটনা ঘটেছে। তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙেছে। যে মানুষটি নিজে একটা রাজনৈতিক দল তৈরি করেছিলেন, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দল ধরে রাখতে পারেননি। কিন্তু সেইসব বাদ দেওয়া গেলেও ঐ বাদ যাওয়া মানুষদের কথা সবাই ক্রমশ ভুলতে বসেছে। তারপরে নতুন করে আবার এই বিষয়টা এখন সামনে আসা শুরু হয়েছে। নতুন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বাদ যাওয়া মানুষদের আর কোনও সরকারি সুযোগ সুবিধা দেওয়া যাবে না। রেশন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সুবিধা কোনটাই যেন এই ভোটার তালিকা থেকে জোর করে বাদ দেওয়া মানুষেরা না পান, সেই নির্দেশিকা জারি হয়েছে। তার মধ্যে বিদেশ মন্ত্রক থেকে বলা হয়েছে, যে পাশপোর্ট থাকা মানেই সেই ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক তা প্রমাণিত হয় না। হয়ত এই আইন আগেও ছিল, কিন্তু এই সময়ে এই কথা বলা এবং টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদকের সাম্প্রতিক বার্তা দেখিয়ে দেয়, অলিখিত ভাবে হলেও দেশের সরকার ঐ ভোটার তালিকাকেই প্রামাণ্য নথি হিসেবে ধরছেন।হয়ত রাজাগোপাল তাঁর নিজের সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারবেন। তাঁর সেই সামাজিক সুবিধা আছে, কিন্তু যে অসংখ্য মানুষের নাম বাদ গেছে, তাঁদের কী হবে? তাঁদের সম্পর্কে সিপিআইএমএল এবং সিপিআইএম ছাড়া কংগ্রেসও এখনো কোনও জোরালো কিছু বলেনি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভোটার তালিকা থেকে যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের সব ধরনের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে। বাংলায় এই প্রক্রিয়াটি চলছে এবং এরপর হিন্দি-বলয়ের বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতেও এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এর ফলে কেবল মুসলিমরাই নয়, বরং বহু দরিদ্র পরিবারও মারাত্মক পরিণতির সম্মুখীন হচ্ছে। এটি কোনো সাম্প্রদায়িক সংঘাত নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি একটি শ্রেণি বা জাতিগত (বর্ণভিত্তিক) ইস্যু। তাছাড়া, রাষ্ট্র এবং তার মদতপুষ্ট শক্তিগুলো যখন সংখ্যালঘু ও সামাজিকভাবে বা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করে, তখন তাকে আর কেবল 'সংঘাত' বলা চলে না। জেনে রাখুন, বৈষম্যের মাত্রা আরও এক ধাপ বেড়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলো ছাড়া ভোটাধিকার থেকে বাদ যাওয়া মানুষদের নিয়ে কথা কে বলবে? সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতও এই বিষয়ে এখনো অবধি কোনও কথা বলেনি। তাহলে এই মানুষদের কী হবে, এই বাদ যাওয়া মানুষেরা তবে কি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়েই থেকে যাবেন? জনগণনা থেকে তাঁরা বাদ পড়বেন না তো? একটা ‘অযৈক্তিক’ যুক্তি এত মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে, আর রাজনৈতিক দলগুলো কিচ্ছু করবে না?
    মধুবাতা ঋতায়তে - শারদা মণ্ডল | ছবি - Imagen 3ছাঁচনপুরের আত্মবিশ্বাসের কথাই যদি উঠলো তবে আর একটা আত্মবিশ্বাসের গল্প শোনাই। ঘটনাটা আমার ভৌগোলিক জীবনে অনেক দিক থেকেই খুব স্পেশাল। প্রথম ব্যাপার হচ্ছে সেই প্রথম আমি নিজের কলেজের সঙ্গে না গিয়ে অন্য কলেজের ছাত্রীদের সঙ্গে ফিল্ডে গিয়েছিলাম ফিল্ড এক্সপার্ট হয়ে। দ্বিতীয়ত এই যাওয়াটার সঙ্গে আমার শৈশবের আশাপূরণের একটা যোগসূত্র ছিল। ব্যাপারটা একটু খুলেই বলি। আমি আসলে নিবেদিতা ইস্কুলের ছাত্রী ছিলাম। সেই কবে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হলাম - সনটা ১৯৭৭। শুধু তো আমি নই, আমার বোন, আমার মা, আমার মেজ মাসি, আমার ছোট মাসি - সব্বাই নিবেদিতা ইস্কুলে পড়েছিল। আমাকে ধরে মাতৃকুলে তা সে চার প্রজন্মের সম্পর্ক। আমরা যখন ছাত্রী, সেই সময়ে ক্লাস নাইনে মেয়েদের ইস্কুল থেকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হত। অঙ্কের শিক্ষিকা ছিলেন শুক্লাদি। তাঁর স্বামী বিখ্যাত পর্বতারোহী প্রাণেশ চক্রবর্তী। তিনি নিয়ে যেতেন পুরুলিয়ার মাঠাবুরু ক্যাম্পে। আজও আন্তর্জাল জুড়ে তাঁর অজস্র কীর্তি, বহু রোমহর্ষক পর্বতাভিযানের রিপোর্ট ছড়িয়ে আছে নানান ওয়েবসাইটে। ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজনে তাঁর লেখা একটি বইয়েরও হদিশ পেয়েছিলাম - আড়াইশো পাতার বাংলা বই - হিমালয় ভ্রমণ গাইড - পাবলিশার মিত্র ঘোষ। পড়ার খুব ইচ্ছেও হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দেশে যা হয় - প্রেজেন্টলি আনঅ্যাভেলেবল। জীবনে সব আশা পূরণ হয়না। আমারও হলনা। আমি যখন নাইনে উঠলাম, কীজানি হয়ত প্রাণেশ স্যার কোন কঠিন অভিযানে বাইরে ছিলেন। তাই আমরা গেলাম শান্তিনিকেতনে। বন্ধুদের সঙ্গে সেই প্রথম বেরোনো, আনন্দ খুবই হয়েছিল - সালটা ১৯৮৫। কিন্তু ৮৭ সালে আমার দুবছরের ছোট বোন মাঠা ক্যাম্পে গেলো। তাঁবুতে থাকল, খড়ের ওপর বাড়ির কম্বল পেতে। ক্লান্ত শরীরে একদিন ফিরে দেখল ওর বিছানায় ধেড়ে কুকুর শুয়ে আছে। তাকে বার করে দিয়ে বোন শুয়ে পড়ল। একটা মাত্র কলাই করা মগ - তাতেই চা খাওয়া, আবার তাতেই প্রাতকৃত্যের পর জল শৌচ। আসলে পাহাড়ে চড়তে গেলে ন্যূনতম লাগেজ দরকার - বাড়তি আরাম চলেনা - বোন সেটাই শিখে এলো। তার ওপরে দড়ি ধরে কেমন করে উঠলো, নামতে গিয়ে কেমন দড়িতে ঝুলে গেলো, বড় বড় চোখ নাচিয়ে তার বর্ণনা দিতে লাগলো ঘুরে ঘুরে। তার বাক্য - ঝর্নার গতি যত প্রবল হোল, তার চেয়ে দুর্বার গতিতে বেড়ে চলল আমার আফশোষ। শ্রুতির স্মৃতি আর আশার কুহক, দুইয়ে মিলে কুয়াশা ঘেরা মাঠাবুরু আমাকে কেবলই তার দিকে টেনে নিয়ে গেলো মনে মনে। সশরীরে যেতে না পারলেও, একবার প্রাণেশ স্যার ইস্কুলে পর্দা টাঙিয়ে পাহাড়ে চড়ার স্লাইড দেখিয়েছিলেন - সেদিন দেখেছিলাম। জল নেই, ইঁট সাজিয়ে তার মধ্যে শুকনো পাতা ভরে আগুন জ্বালিয়ে কেমন করে চট জলদি ডিম সেদ্ধ করা যায়। জল নেই তো কী! ডিমগুলো বালি কাদা ধুলো মাখিয়ে আগুনে ফেলে দিলেই হোল। সেই কবেকার কথা, স্মৃতি এখনও কেমন জ্বলজ্বলে। আসলে আমি এমন পাহাড় পাগল কখনোই হতাম না। দোষ আমার নয়। দুজন ভূগোলের দিদি ছিলেন, কাকলিদি আর মানসীদি। দুজনে মিলে ফাইভ থেকে টেন - ছ বছর ধরে হিমালয়, আল্পস, রকি, আন্দিজ করে করে আমার গোলা মাথা একেবারে তালগোল পাকিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর আর কী! কেরিয়ার, সংসার - নানা কাজের চাপে আর সময়ের খাপে মানাতে মানাতে মাঠাবুরুতে রক ক্লাইম্বিং ক্যাম্প আমার স্বপন থেকে অবচেতনে স্থান নিল। জীবনে কিছু প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি, গড়ন ভাঙনের গল্প না থাকলে জমেনা। ধীরে ধীরে চাকরি জীবন চলে গেলো কুড়ি কুড়ি বছরের পার, উঁহু, কুড়ি তো নয় পঁচিশ। মা বাবা গত হবার পর, আবার আমি শৈশবের স্বাদ পেতে ইস্কুলের দিকে ফিরলাম। প্রাক্তনী সভার সদস্য হলাম। নিবেদিতা হেরিটেজ মিউজিয়ামে যাতায়াত শুরু করলাম। আর সেখানেই ঘটে গেলো এক আশ্চর্য ঘটনা। অশেষপ্রাণা মাতাজী আমাকে বিবেকানন্দ বিদ্যাভবনের তিরিশজন ছাত্রীকে নিয়ে পুরুলিয়ার মাঠাবুরু ক্যাম্পে যাবার অনুরোধ করলেন। চমকে উঠলাম - এও কি সম্ভব? ১৯৮৫ সালে যা নিয়ে আফশোষ ছিল, সেই সুযোগ কি তবে চার দশক পরে মানে ২০২৫ এ সত্যি সত্যি এলো? সুযোগ ছাড়ার কোন প্রশ্নই ছিলনা। আমাদের নিবেদিতা হেরিটেজ মিউজিয়ামের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে ডানা মেলেছে একটি প্রতিষ্ঠান যা হয়তো একদিন মহীরুহ হয়ে উঠবে - নীহার - নিবেদিতা ইন্সটিটিউট অফ হিউম্যান অ্যাডভান্সড রিসার্চ। নীহার একটি প্রকল্প শুরু করেছে - লীডারশিপ কোর্স। আমাদের মেয়েগুলির মধ্যে কাদের সঠিক নেত্রী হয়ে ওঠার দক্ষতা বা মানসিকতা আছে তাদেরকে চিনে নিয়ে সঠিক ভাবে পথ দেখানোই নীহারের এই লীডারশিপ কোর্সের কাজ। এই কোর্সের কতটা সম্ভাবনা আছে, তা খতিয়ে দেখার পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু হয়েছে বিবেকানন্দ বিদ্যাভবন কলেজে। একদিন আমার মাও ঐ কলেজ থেকেই পাশ করেছিলেন। এই কলেজের পঞ্চম অর্ধবর্ষের তিরিশজন মেয়ে এই কোর্সের প্রথম ছাত্রী। দস্তুরমতো ইন্টারভিউ করে এদের বেছে নেওয়া হয়েছে। এই কোর্সের অঙ্গ হিসেবে মাঠা পাহাড়ে ক্যাম্প হোল দুদিনের। সেই ক্যাম্পেই সঙ্গে চললাম আমি। হাওড়া স্টেশন থেকে রাতে আদ্রা চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার ধরে ভোরে নামলাম বরাভূম স্টেশনে। সেখান থেকে গাড়ি করে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্যে। মাঠা পাহাড়ের পাদদেশে এই রিসর্টটির নাম হল পাতালঘর। মেয়েরা রইল তাঁবুতে। আধখানা চাঁদের মত চেনটানা তাঁবুর মধ্যে দুটি করে বিছানা পাতা। কলঘরের জায়গাটি পাশেই, একটুখানি হেঁটে যেতে হয়। আর আমরা দিদিমণিরা রইলাম তাঁবুর মুখোমুখি হবিট হাউসে। এগুলোও দেখতে আধখানা চাঁদেরই মত, তবে কিনা পাকা ঘর, লাগোয়া কলঘর। ঘরে যেটুকু না থাকলে নয়, ততটুকুই পরিকাঠামো রয়েছে। ঘরের চালে মাটির পরত, তার ওপরে ঘাসের চাষ করা হয়েছে। জনপ্রিয় পশ্চিমী শিশু সাহিত্যের কাল্পনিক চরিত্র এই হবিট, যারা মাটির তলায় গর্ত করে থাকে। বিশ্ব জুড়ে ন্যূনতম স্বাচ্ছন্দে গড়া পরিবেশ বান্ধব এই হবিট হাউসগুলি পর্যটনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ বহু মানুষই এখন প্রাচুর্য, বাহুল্য ছেড়ে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে সাধারণ ভাবে কয়েকটা দিন কাটাতে চায়। শুনলাম, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম হবিট হাউস এই পাতালঘর, বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে তৈরি করা হয়েছে। দরকার মত কম বেশি তাঁবু খাটিয়ে দেওয়া হয়, আর হবিট হাউস আছে সাতটা। সেখানেও দুজন বা তিনজন করে আরামসেই থাকা যায়। রান্নাঘর আর খাবার জায়গা আলাদা। কাউন্টার থেকে নিজেকে খাবার নিয়ে আসতে হয়। পরিবেশনের বন্দোবস্ত নেই। পানীয় জল কোন ফিল্টার ছাড়া অবিশ্বাস্য ভাবে স্বাস্থ্যকর, সমস্যা একটাই ঐ জলের গুণে খুব খিদে পেয়ে যায়। যাই হোক চারপাশের বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য ইত্যাদি দেখার সময় মিললোনা, কারণ ট্রেনিং শুরু হয়ে গেলো। মেয়েদের দেওয়া হোল পনের মিনিট সময়, যার মধ্যে যে যার তাঁবুতে ঢুকে, ব্যাগ রেখে, আর কিছু বন্দোবস্ত করে লাইনে দাঁড়াতে হবে। তবে জুতো থাকবে তাঁবুর বাইরে। কেবল রাতে জুতোজোড়া তাঁবুতে ঢুকিয়ে নিতে হবে। না না দুষ্টু মানুষের ভয় এখানে নেই, তবে কোন বন্য জন্তু ভালোবেসে যদি মুখে করে এক পাটি বা দুটো পাটিই নিয়ে যায়, তার দায় কর্তৃপক্ষের নয়। পাশে কলঘরে গিয়ে চোখেমুখে জল দিয়ে আসতেই পারে, তবে তাতে সময়ের ছাড় নেই, তাই অতটা ঝুঁকি না নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের মেয়েরা বুদ্ধিমতী, তারা ও পথ মাড়ালোনা। কিন্তু আমরা? মেয়েরা পনের মিনিট হলে তাদের ম্যামেরা কি পনের ঘন্টা সময় নিতে পারে? আমরাও ভুরু কুঁচকে তিরিশ মিনিটে মাঠে পৌঁছলাম। মাঠে ততক্ষণে খাটানো হয়েছে এক খাড়াই দড়ির জাল। নীচ থেকে প্রথমবার ওপরে তাকালে জ্যাকের বীনস্টক গাছে ওঠা মনে পড়ে যায় বটে। আমাদের মেয়েরা সারি দিয়ে দাঁড়িয়েছে একে একে সেই জাল বেয়ে আকাশের কাছে পাড়ি জমানোর জন্য। তাদের কারোর চোখে অভিযাত্রীর আহ্লাদ তো কারোর করুণ দৃষ্টিতে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচির আকুতি। দেখলাম পেল্লাই গাছেদের শরীর আর শক্ত শক্ত খুঁটির সঙ্গে বাঁধা ঐ জাল, দুপাশে দক্ষ ট্রেনারদের বজ্র মুঠি আর তীক্ষ্ণ নজরের আওতায় রয়েছে। পান থেকে চুন খসার জোটি নেই। দর্শক আমরা চারজন - বড় মাতাজী, ছোট মাতাজী, সঙ্গে বৈশাখী আর আমি দুই দিদিজী। বৈশাখীও আমার মতই আর একটি কলেজের ভূগোলের দিদিমণি। সেদিন মাঠা পাহাড়ের আকাশ বড় নীল, পাহাড় বড় সবুজ, কাঁচা হলুদ সর্ষে ফুলের মত রোদ বুঝি সবার কানেই বাঁশি বাজাচ্ছিল। একটা মিঠেকড়া ঠান্ডা বাতাস সোয়েটার চাদরের ভিতর দিয়ে খালি লুকোচুরি খেলছিল। বাতাসে বন তুলসীর ঝাঁজ - এমনি দিনে মানুষের মুখোশ খুলে মুখ বেরিয়ে পড়ে। পাকা চুলের পর্দা সরিয়ে মুখ বাড়ায় কিশোরী মন। ২০২৫ কে সরিয়ে রেখে এতদিন বাদে বেরিয়ে পড়ে ১৯৮৫। মাথার দুপাশে পুঁচু পুঁচু বেণী বেঁধে তাতে অপটু হাতে লাল ফিতে বাঁধা শারদা মেয়েদের লাইনে দাঁড়ায় জাল বাইবে বলে।হলদে রোদের মিশেল দেওয়া হলুদ রঙের মোটা আর শক্ত প্লাস্টিক দড়ির জাল। আমি প্রাণপণ চাইছিলাম সবটুকু শিখে নিতে, আসলে এমন সুযোগ আর কোনদিনও আসবে কিনা জানা নেই, তাই চাইছিলাম যা কিছু ঘটছে তার সব কিছু শুষে নিতে। তিনটি উপকরণ - হেলমেট, হারনেস আর ক্যারাবিনার। আমার মাথায় যখন লেডী ট্রেনার হেলমেট পরিয়ে দিলেন, আমার মনে মনে হাসি পেল। শিক্ষার্থীর পা পিছলে মাথা ছাতু হবার ভয় আছে ওঁদের। কিছু হয়ে গেলে জবাবদিহি করতে হবে যে। তবে নাঃ আমার একটুও ভয় করছেনা। চিরকালই পরীক্ষা সামনে এলে কেমন একটা উল্লাস হয় আমার। হেলমেটের পর হারনেস বাঁধা - মহিলা এতটাই কষে সেটি আমার কোমরে বাঁধলেন যে আমি একেবারে ককিয়ে উঠলাম। পেট - কোমরটি যে আর ১৯৮৫ র নেই, তার চারিদিকে তেল-ঘি-মাখন-চীজ - আরো কতকিছুর থাক থাক মেখলা। কোমর বন্ধনীটির একটি অংশ পাদুটোকে গোল গোল ফাঁসের মত আটকে রেখেছে। অর্থাৎ যদি কিছু ঐ পিছলানো টিছলানো (ভগবান না করুন) - তবে ওই ফাঁসে আটকে মোটামুটি পাখি হয়ে ডানা ঝাপটানো যাবে। তবে মেখলা - বন্ধনী যা কিছুই থাক, দড়ির জালের এপাশ ওপাশ টানা দড়িটি দুপাশের ট্রেনারদের হাতে বন্দী। ঐ দড়িটিই লাইফ লাইন - সেটা আবার আমার বন্ধনীটির সঙ্গে একটি মোক্ষম ক্লিপ দিয়ে আঁটা। আর এই ক্লিপটাই হল ক্যারাবিনার - যার ভরসায় আমি মেঘের দিকে মোর তনু - ক্যারাভান লয়ে পাড়ি দেব। আসলে ছাত্রীরা কেমন করে উঠছে, কী কী ভুল হচ্ছে, কোনভাবে ওঠাটা ঠিক, শিক্ষকরা কী নির্দেশ দিচ্ছেন, এগুলো আমি নিবিষ্ট মনে দেখছিলাম। কিন্তু দেখে শেখা এক, আর ঠেকে শেখা আরেক। দেখে শিখলাম যে, জালের দিকে মুখ করে দাঁড়াও, জালের ঠিক গ্রন্থিগুলোতে পা দিতে হবে, তা নইলে জোর পাবেনা। হাত দিয়ে জাল ধরবে, কিন্তু হাত থাকবে কাঁধের লেভেলের ওপরে - নইলে শরীরের ব্যালেন্স থাকেনা। এবারে উঠতে গিয়ে দেখি জাল থলথল, হাওয়া খলবল, পা টলটল, ঘাম গলগল, বুক ধকধক, হাঁটু ক্যাঁচকোচ, কাঁধ খিঁচমিচ - এমনতরো কত কী? কিন্তু নীচের ঢালু অংশটা পেরোনোর পর খাড়া অংশটায় যেতে যেতে ছন্দটা বুঝে গেলাম। একেবারে টিকটিকির মত - ডান হাত আর ডান হাঁটু তোলো, তারপর বাঁ হাত বাঁ হাটু ডানদিকের চেয়ে উঁচুতে তোল - কেল্লা ফতে। আবার উলটো দিকে একই নিয়মে নেমে এলাম কোন মতে। এদিকে হাঁফানো, ওদিকে আনন্দে লাফানো, সে আমার সসেমিরা অবস্থা। ট্রেন ধরার আগের দিন পর্যন্ত ধুঁকছিলাম - যেতে কী পারবো? এত বড় দায়িত্ব, নেওয়া কি উচিত হবে? এখন দেখছি, আমার শরীরে যত ব্যাথাবুথা সব উধাও। কতদিন পরে আমার আমিকে নিজের করে ফিরে পেলাম! সব চেয়ে বড় হল আমি পেরেছি - আমি পারি - পৃথিবীর যে কোন সমস্যা সামনে আসুক না - লড়কে লেঙ্গে মেরা খোয়াবিস্তান। মেয়েদের মোবাইল ফোন জমা দিয়ে দিতে হয়েছিল। আমরা টীচার বলে ছাড় ছিল। কিন্তু খানিকটা স্বেচ্ছাতেই দিনের বেশিরভাগ সময়ে ও জিনিসটিকে ত্যাগ দিয়েছিলাম। আর দিয়েছিলাম বলেই প্রতি মূহূর্তে ছবিছাপা দিয়ে আপডেট দেওয়া আর আপডেটেড হয়ে থাকার বালাই ছিলনা। প্রকৃতির কোলে সত্যি সত্যি শান্তি আর আরাম উপভোগ করছিলাম। শরীরে যতই পরিশ্রম হোক, এ হল “প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি”। একটা দিনে কত যে কাজ হল, আমরা নিজেরাই অবাক। এই ধরা যাক - দড়ির ব্রিজ পেরোনো। জিপ লাইনিঙের মত হারনেস ক্যারাবিনারের ভরসায় ঝুলে ঝুলে জলা পেরোনো - যার পোষাকী নাম - রিভার ক্রসিং। রাতে ঠান্ডা ঘন হয়ে আসে। অন্ধকারের হাত ধরে আকাশ মাটির সীমানা মুছে বন যেন কাছে আসে, হাওয়ার ঝোঁকে ফিসফিসিয়ে ও কী কিছু বলে যায়? শহরের মত লেট নাইটের সুযোগ এখানে নেই। ঘড়ি ধরে খেতে বসা, নিজেই কাউন্টার থেকে খাবার নিয়ে আসা, আবার খাওয়া শেষে থালা বাটি মেজে রাখা পরের দিনের ব্যবহারের জন্য। কোন দাও, লাও এর ব্যাপার নেই - “আপনা হাত জগন্নাথ, করবে ভাই বাজিমাৎ”। বিছানায় যাবার আগে অভ্যাস মত ডায়রি নিয়ে বসি। এই পাহাড়ে চড়ার ট্রেনিঙের সঙ্গে আমার জীবনে আর একটা জিনিস ঘটে গেছে। আসলে যে কলেজের সঙ্গে এসেছি সেটা তো আমার নিজের চেনা কলেজ নয়, তাই ছাত্রীদের ওপরে শিক্ষক হিসেবে সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ছিলনা। যেটা ফিল্ডে খুব দরকার। তাই আমি প্রথম পরিচয়েই বলে নিয়েছিলাম যে যেহেতু আমি এককালের রামকৃষ্ণ সারদা মিশনের ছাত্রী, তাই তোমাদের মত আমি এই ক্ল্যানেরই সন্তান। এটা বলেছিলাম যাতে ওরা আমাকে অ্যাকসেপ্ট করে নেয়। আসলে ওদের কাছে তো আমি বহিরাগত। তাই স্ট্র্যাটেজিক ইনসাইডার হয়ে ওঠার তাগিদে এই অস্ত্র প্রয়োগ করেছিলাম, আমার আর ছাত্রীদের মাঝখানের প্রাতিষ্ঠানিক ভয়ের আর অচেনার প্রাচীরটা যাতে ভেঙে যায়। দেখলাম এতে আশ্চর্য কাজ দিয়েছে। ওরা আমাকে আর ‘নজরদার’ বা নিয়ন্ত্রক ভাবছে না, বরং ভাবছে নিজেদেরই একজন। মাঠাবুরুতে দেখলাম ওরা আমাকে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর নয়, সিনিয়র দিদি ভেবে নিয়েছে। কাছে আসছে, টীচারদের কাছে যেকথা গোপন করতে হবে সেটারও সাহায্য চাইছে, তুমি তুমি করে কথা বলছে। এটা আমার কাছে একটা সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। আমার নিজের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মনের টান, তথ্য বিনিময় স্বাভাবিক ভাবেই অনেক বেশি। কিন্তু সেই সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ক্লাসরুম, যেখানে ক্ষমতার হায়ারারকি বা ধাপ আছে - শিক্ষক ওপরে, স্টুডেন্ট নিচে। ভূগোলের শিক্ষক হিসেবে আমি হয়তো এতদিন ফিল্ডে ‘কন্ট্রোল’ বা শাসনকেই সবচেয়ে জরুরি মনে করেছি। শাসনের দরকারও আছে। আজকাল যা দিন পড়েছে, ছেলেমেয়েরা প্রকৃতির কাছ থেকে কিছু শিখুক আর না শিখুক, পরিবার বা সমাজের কাছ থেকে একটা মোক্ষম কথা খুব ভালো করে শিখে যায়, যে প্রকৃতির কাছে গেলে মাদক নিয়ে নেশা করতে হয়। এই পিয়ার প্রেশার এতটাই যে যারা এর মধ্যে ছিলনা, তারাও ঢুকতে বাধ্য হয়। মুক্ত প্রকৃতি হয়ে ওঠে একধরণের লিমিনাল স্পেস' - বা ‘সীমান্তবর্তী মুক্ত অঞ্চল’ - যেখানে কেউ চেনেনা, যা খুশি করা যায় - এক ধরণের ছদ্ম স্বাধীনতার জায়গা। মিশনের এই ছাত্রীদের নিয়ে বিশেষ করে পাহাড় চড়া ক্যাম্পে এধরণের কোন আশংকা নেই। তাই ছাত্রীদের সঙ্গে শাসন নয় সখ্যতা - বেশ উপভোগ করছি। এইসব সময়ে মনে আরও আকাশ পাতাল সব চিন্তা আসে। আজকে শিখলাম দড়ির জাল বাওয়া, দড়িতে হাঁটা আর দড়িতে ঝুলে নদী পেরোনো। কোনো দুর্গম জায়গায় সার্ভে করতে গেলে অথবা কোন ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের সময়ে এইসব স্কিল খুব কাজে লাগে। একটা সময়ে খুব ভাবতাম যে আমি আমার স্যার মনতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাষ রঞ্জন বসু, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মত বা তাঁদের স্যার থর্নবারি, উলরিজ মরগ্যান বা ডেভিস, পেঙ্কের মত পাহাড় নদী চষে বেড়াতে পারিনি। নতুন কিছু আবিষ্কার করতে পারিনি। মনে খুব আফশোস হত। কিন্তু ধীরে ধীরে যতই ক্রিটিকাল বা তারও পরে পোস্ট মডার্ন ভূগোলের সংস্পর্শে এলাম তখন আবার ভাবনাটা খানিকটা বদলে গেল। অনুভব করলাম যে এবল বডিড মেল না হয়েও আমি আমার জীবনে এই পৃথিবীকে দেখেছি এক সংবেদনশীল নারীর চোখে। এটাই বা কম কী! আসলে উইলিয়াম মরিস ডেভিস, ওয়াল্টার পেঙ্ক, ডব্লিউ ডি থর্নবারি বা সি ডব্লিউ উলরিজদের মতো ভূবিজ্ঞানীরা—কিংবা আমাদের বাংলার শ্রদ্ধেয় মনতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাষ রঞ্জন বসু বা সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্যারেরা যে সময়ে ভূগোল চর্চা করেছেন, তখন বিষয়টার মূল ধারাটাই ছিল পজিটিভিসম (প্রত্যক্ষবাদ) এবং জিওমরফোলজি কেন্দ্রিক। তারও আগে উনিশ শতকে ভূগোল ছিল মূলত পুরুষালি অ্যাডভেঞ্চার এবং যেন একটা সাম্রাজ্য বিস্তারের হাতিয়ার। ধরে নেওয়া হতো, ভূগোল মানেই হলো একজন ‘এবল-বডিড মেল’ বা শারীরিকভাবে শক্তিশালী পুরুষ দুর্গম পাহাড়ে চড়বেন, নদী চষে বেড়াবেন, মানচিত্র আঁকবেন আর নতুন জায়গা ‘আবিষ্কার’ বা জয় করবেন। প্রকৃতি তখন যেন ছিল একটা জ্যামিতিক বস্তু। আর আমি যে আফশোষে ভুগছি, তা আসলে আমার ব্যক্তিগত খামতি নয়, শত বছরের তৈরি করা একটি পুরুষতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যার জন্য আমি নিজেই নিজেকে ‘অভিযাত্রী’ আইডেন্টিটি দিতে পারিনা, মানে কুণ্ঠাবোধ করি। হবিট হাউসের বাইরের আকাশ এখন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। আকাশে চাঁদ নেই, তাই হাজার তারার আলো। সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। চলবে...
  • হরিদাস পালেরা...
    এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজম, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও রাত আকাশ । - Somnath mukhopadhyay | এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজম, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও রাত আকাশ। ‘এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজম’ ব্যাপারটা কি একদম নতুন ? অন্তত আমাদের দেশে? মোটেই তেমন নয় – এমনটাই জানালেন আমার এক বিশিষ্ট জ্যোতির্বিদ বন্ধু। তবে রাত আকাশ পাঠের বহু পুরনো সাবেকি ব্যাপারটাকেই আপাদমস্তক বাণিজ্যিক মোড়কে মুড়ে পরিবেশনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে বিদেশের পাশাপাশি আমাদের দেশেও। একথা মানতেই হবে যে সারা দুনিয়া জুড়েই এখন পর্যটন শিল্পের রমরমা। এই ক্ষেত্রের উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিয়োগ ঘটছে দেশে দেশে। দেশের মানচিত্র ঢুঁড়ে খুঁজে আনা হচ্ছে নিরিবিলি এবং অপরিচিত কোনো ঠিকানা, আর তারপরেই তড়িঘড়ি করে পরিকাঠামোর উন্নয়ন ও সংস্কার করা হচ্ছে যাতে র‌ইসদার পর্যটকদের বেড়াতে বেরিয়ে সামান্যতম অসুবিধা না হয়, ঘরের বাইরে বেরিয়েও তাঁরা যেন নিয়ত অনুভব করেন নিজেদের বাড়িতে থাকার অখণ্ড নিরাপত্তা ও আনন্দ, সুখ ও বিলাস। এটা তো গেল এই শিল্পের সাম্প্রতিক বিকাশধারার একটা দিক। আরও একটা দিক এর‌ই পাশাপাশি আলোচ্য, তা হলো পর্যটনের উদ্দেশ্যগত ভাবনার পরিবর্তন। কেমন ব্যাপারটা? একটু খুলেই বলি। ধরুন আপনি দিল্লি যাচ্ছেন ঘুরতে। কেন যাবেন দিল্লি ? আপনার সামনে অনেক অনেক পছন্দের জানালা খুলে যাবে – দেশের রাজধানী, ঐতিহাসিক স্থাপত্য দর্শন, পাশাপাশি আপনি ঘুরে আসতে পারেন দিল্লির যমুনা পাড়ের ঘিঞ্জি বস্তিতে, দেখে আসতে পারেন সেখানে থাকা সমাজের একেবারে প্রান্তিক স্তরের মানুষজনের নিবিড় লড়াকু জীবন যাপনের অমলিন ছবি। অনুভব করতে পারেন তাঁদের আশা -আকাঙ্খা, স্বপ্ন - ভবিষ্যতের খণ্ডচিত্রকে। অনেক অপশনের মধ্য থেকে আপনি আপনার পছন্দের একটিকে বেছে নিতে পারেন। অনেক কাল আগে শুনেছিলাম টেলর মেড ট্যুরিজমের কথা। এটা বোধহয় তেমনি একটা ব্যবস্থা। এভাবেই সময়ের হাত ধরে বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে বদলে বদলে যাচ্ছে দর্শনীয় বস্তুর অভিমুখ। আমাদের নিয়মের ঘোরাঘুরির চেনা ছন্দ – গেলাম - ঘুরলাম - দেখলাম- খেলাম- মস্তি করলাম গোছের ট্যুরিজম এখন অনেক বেশি করে বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক হয়ে উঠছে। যেমন ধরুন আপনি খুব কাছ থেকে পাখিদের দেখতে পছন্দ করেন বা রাত আকাশের তারাদের সঙ্গে পরিচিত হতে চান – সেই অনুযায়ী বেছে নিতে পারেন আপনার বেড়ানোর জায়গাকে। আর এখান থেকেই উঠে আসছে পর্যটনের নতুন ধারনা বা কনসেপ্ট। এই পর্যন্ত করা আলোচনাকে এখানেই থুক করে রেখে, অন্য একটি বিষয় নিয়ে কথা কয়ে নিই। বছর কয়েক আগের কথা। খবরের শিরোনামে উঠে এলো এক নতুন ধারার খবর। লিওনয়েড মিটিওর শাওয়ার হবে ব্যাপক মাত্রায়। সহজ কথায় সিংহ রাশি থেকে উল্কা পাতের ঘটনা ঘটবে, প্রতি ঘন্টায় প্রায় পঁচিশটি করে। ব্যস্! লাগাতার প্রচারের ঠেলায় চেগে উঠলাম সকলে। অচিরেই টেলিভিশনের পর্দার দখল নিলেন এই ব্যাপারে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞেরা। এমন উল্কাপাতের ঘটনা আকাশমণ্ডলে নতুন নয়, তবে সেবার ছিল বিশেষ জো ! ধূলি ধূসরিত কলকাতার আকাশে সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার সুযোগ মিলবে না বুঝেই জনা কুড়ি ছাত্রকে বগলদাবা করে নিয়ে আমরা তিন মাস্টারমশাই ছুটলাম কলকাতা থেকে বেশ খানিকটা দূরে থাকা এক জনপদের উদ্দেশ্যে। সারারাত জেগে,সবাই আকাশের দিকে মাথা উঁচিয়ে থেকে ঘাড়ে ব্যাথা নিয়ে যখন ভোরের ট্রেনে বাড়ি ফিরে এলাম তখন সবার মুখেই ফ্লপ স্টার শো- এর কথা। সেবার সবথেকে হতাশার শিকার হয়েছিল টেলিমিডিয়ার মানুষজন। তবে রাত আকাশ পর্যবেক্ষণের একটা মানসিকতা রাতারাতি বেশ চাগিয়ে উঠেছিল আপামর জনসাধারণের মধ্যে। এটাও কিন্তু মোটেই কম পাওয়া নয়। যদিও সেই হুজুগ সুদূরপ্রসারী হয় নি। অথচ নিয়মিত রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণের অভ্যাস বহু প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের মধ্যে প্রচলিত আছে। রাতের আকাশে গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান দেখেই মানুষ এককালে ঠিক করেছে স্থানান্তরে গমনের সঠিক কাল, কৃষির পত্তনের পর ফসল বোনার উপযুক্ত সময় এই সব। প্রাচীন ভারতীয়দের সাথে সাথে গ্রীক, রোম, মিশর, চিন প্রভৃতি দেশের মানুষের ভেতরে রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণের এক আশ্চর্য পরম্পরা গড়ে উঠেছিল। অসীম নিষ্ঠায় ও অন্তহীন ধৈর্য্য নিয়ে সেইসব নাম গোত্রহীন মানুষেরা একটু একটু করে গড়ে তুলেছেন আকাশলিপির পরিচিতি। আজ‌ও সেই খোঁজার কাজ জারি রেখেছেন জ্যোতির্বিদরা।  আকাশচিত্র পাঠের কথাই যখন উঠে এলো তখন আমাদের ঠাকুর কবির বাল্য স্মৃতির কথা ভুলি কি করে? “ বয়স তখন হয়তো বারো হবে …. পিতৃদেবের সঙ্গে গিয়েছিলুম ড্যালহৌসি পাহাড়ে, সমস্ত দিন ঝাঁপানে করে গিয়ে সন্ধ্যাবেলায় পৌঁছুতুম ডাকবাংলায়। তিনি চৌকি আনিয়ে আঙিনায় বসতেন। দেখতে দেখতে, গিরি শৃঙ্গের বেড়া- দেওয়া নিবিড় নীল আকাশের স্বচ্ছ অন্ধকারে তারাগুলি যেন কাছে নেমে আসত। তিনি আমাকে নক্ষত্র চিনিয়ে দিতেন, গ্রহ চিনিয়ে দিতেন। শুধু চিনিয়ে দেওয়া নয়, সূর্য থেকে তাদের কক্ষচক্রের দূরত্বমাত্রা, প্রদক্ষিণের সময় এবং অন্যান্য বিবরণ আমাকে শুনিয়ে যেতেন।’’ জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সখেদে বলেন শহরের রাত আকাশ চুরি হয়ে গেছে আলোকাসুরের দাপটে। রাতের আঁধার দূর করতে শহরে শহরে বৈদ্যুতিক আলো জ্বালাবার ধূম যত বেড়েছে তত‌ই আমাদের দৃষ্টি সীমার আড়ালে চলে গেছে দূরলোকের গ্রহ নক্ষত্রেরদল। এই সমস্যার কথা জানাতে গিয়ে লেখা হয়েছিল একটি বিশেষ নিবন্ধ – আলোয় দূষণ ভরা। আমাদের দেশে শহরবাসী মানুষেরা এই ব্যাপারে খুব একটা সচেতন না হলেও, বিদেশের মানুষজন কিন্তু এই বিষয়ে বেশ সচেতন। আর হয়তো এই অভাববোধ থেকেই খুব দ্রুত প্রসার লাভ করছে এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজমের মতো পর্যটনের সম্পূর্ণ নতুন ধারনা। পকেটের পয়সা খরচ করে প্রাণ মন ভরে অপার বিস্ময়ে ভরা রাত আকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য ছুটছে দূরে আরও দূরে। আর এই সূত্রেই বেড়ে চলেছে এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজমের জনপ্রিয়তা। পর্যটনের এই বিশেষ ধারাটিকে ডার্ক স্কাই ট্যুরিজম বা আঁধার আকাশ পর্যটন নামেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে দুনিয়া জুড়েই। আমাদের মাথার ওপর থাকা আকাশপটের দৃশ্য ক্ষণে ক্ষণেই যায় বদলে; ফলে তা সবসময়ই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। সূর্য বা চন্দ্র গ্রহণের মতো মহাজাগতিক ঘটনা নিয়ে সচেতন, বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের চিরন্তন আগ্রহ ডার্ক স্কাই ট্যুরিজমকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে অতিমারির সময়ে মানসিক চাপ ও অবসন্নতাকে কাটাতে আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষজন এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজমের পথে হাঁটতে শুরু করেন অনেকটাই নিরুপায় হয়ে। ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে রাত আকাশ পর্যবেক্ষণের প্রতি নতুন করে অনুরাগ জন্মায়। এঁরাই এই ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হিসেবে মান্যতা পেয়েছেন পরবর্তীতে। এদেশে আকাশ পর্যবেক্ষণের পরম্পরা যে সুপ্রাচীন এবং গৌরবময় সে কথা আগেই বলেছি। যন্তর মন্তরের কথা চিন্তা করুন। সেই কবেই রীতিমতো রাজকীয় উদ্যোগে ‘খ’ শাস্ত্র চর্চার আয়োজন করা হয়েছিল আমাদের দেশে। রাজপুত রাজা সোয়াই জয় সিং ১৭৩৪ সালে এই মানমন্দির তৈরি করান। বর্তমানে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি প্রাপ্ত এই মানমন্দিরটি হলো পজিশনাল অ্যাস্ট্রোনমি চর্চার এক‌ বিশিষ্ট কেন্দ্র। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সূর্যঘড়ি এখানেই স্থাপন করা হয়েছিল। যন্তর মন্তরের প্রতিষ্ঠা ভারতের জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার এক‌ উজ্জ্বল স্মারক। ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার এক সুপ্রাচীন ও গৌরবময় পরম্পরা রয়েছে। দূরের আকাশকে নিয়ে ভারতীয়দের নিবিড় আগ্রহ ও চর্চার ইতিহাসতো সুপ্রাচীন। দলবেঁধে পর্যটনের সূত্রে আকাশ চর্চা নয়। নিজের ঘরে থেকেই খালি চোখে অথবা সামান্য কিছু উপকরণের সাহায্য নিয়ে চলেছে তাঁদের রাত আকাশ পাঠের নিমগ্ন সাধনা। এমনি একজন নিমগ্ন জ্যোতির্বিদ ছিলেন পাঠানি সামন্ত। আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশার এক প্রত্যন্ত গ্রামে বসে তিনি আকাশকে তাঁর একান্ত গবেষণার বিষয় করে তুলেছিলেন। জ্যামিতি ও ত্রিকোণমিতির প্রচলিত সূত্রকে কাজে লাগিয়ে তিনি জ্যোতিষ্কদের দূরত্ব নির্ণয় করেছেন নিখুঁত ভাবে। বাঁশ আর কাঠের সাহায্যে তিনি তৈরি করেছিলেন বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র যা ছিল তাঁর নিমগ্ন সাধনার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সময় গণনার কাজের জন্য তিনি তৈরি করেছিলেন এক বিশেষ ধরনের সূর্যঘড়ি। নিজের আবিষ্কার ও সিদ্ধান্তের কথা তিনি লিখে গেছেন তাঁর লেখা সিদ্ধান্ত দর্পণ নামের বিখ্যাত গ্রন্থে। দেশ বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এমন অগণিত সংখ্যক নিভৃত জ্যোতির্বিদদের কথা বলতে গেলে এই নিবন্ধটির পরিসর অনেকটাই বেড়ে যাবে। তাই মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। কথা শুরু করেছিলাম এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজমের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে। বিষয়টি এদেশে এখনও পর্যন্ত শৈশব অবস্থায় থাকলেও পশ্চিমি দেশগুলোতে এই নতুন নৈশ অভিযান রীতিমতো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ভারতে ট্যুর অপারেটররা ইতোমধ্যেই সম্ভাব্য কয়েকটি জায়গাকে বেছে নিয়েছেন রাত আকাশ পাঠের আসর বসানোর জন্য। যদিও এই তালিকা একেবারে সর্বসম্মত এমন নয়। পর্যটন শিল্পের মতো একটি লাভজনক বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করে তুলতে সকলেই চাইবেন নতুন নতুন নিরিবিলি পরিবেশে এই রাত আসর পাততে। পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পছন্দের জায়গা হিসেবে উঠে এসেছে বেশ কয়েকটি জায়গার নাম। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক এমন জায়গাগুলোর নাম। ১. স্পিতি উপত্যকা – এখানে পৌঁছনো বেশ কষ্টসাধ্য। তবে একবার এই আশ্চর্য উপত্যকায় পা রাখলে এক অপার্থিব অভিজ্ঞতা হবে রাত আকাশের সান্নিধ্যে। ২.চুমাথানজেরি – হিমালয়ের বুকে থাকা লাদাখের আরও এক আস্তানা যেখান থেকে রাত আকাশ দেখা এক অবিস্মরণীয় আনন্দের উৎস। ৩. সার্চু ক্যাম্প – একবার পৌঁছলে আর ফিরে দেখতে হবেনা। এটিও লাদাখে। ৪.ইয়েরকদ – দক্ষিণ ভারতের এখানে এলে রাত‌ আকাশকে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে ফেলবেন। ৫.লেহ্ – আবার সেই লাদাখেই ফিরতে হবে তারাদের তাড়নায়। ৬. মাহুলি – মহারাষ্ট্রের থানে জেলার অত্যন্ত পরিচিত এই জায়গায় বহু পর্যটকের নিয়মিত আনাগোনা হাইকিং এর উদ্দেশ্যে। ক্লান্ত শরীরে সন্ধ্যার পর ওপরের দিকে তাকালেই সব ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে যাবে। ৭. কুর্গ – কুর্গের খ্যাতি খুব সুস্বাদু খাবার আর গার্ডেন ফ্রেশ কফির জন্য। সন্ধের পর আরাম কেদারায় শরীর এলিয়ে দিয়ে উপভোগ করতে পারবেন রাত সামিয়ানার সৌন্দর্য। ৮.রাজস্থান – বর্ষার মেঘের চাদর যখন ঢেকে দেয় ভারতের বাকি অংশের আকাশ, তখন পৌঁছে যান রাজপুতানায়। রাতের আকাশ আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। ৯.গোয়া – রাত আকাশের টানে একবার ঘুরেই আসা যায়। ১০. ভূপাল – ইতিহাস প্রসিদ্ধ ভূপালে এসে রাত আকাশ না দেখে যাবেন না। এখানেই তালিকায় ইতি এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। আরও অনেক জায়গায়, যেখানে এখনও আলোর দাপট সেভাবে নেই, রাত আকাশের অপার ঐশ্বর্যের শরিক হতে পারবেন আপনারা। কেবল একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, আর তা হলো এই বিষয়ে জানার ইচ্ছে ও আগ্রহ। আজ থেকে সাড়ে পাঁচ দশক আগে এমন‌ই ইচ্ছে আর আগ্রহে ভর করে আমরা হাজির হয়েছিলাম এক রাতের ক্লাসে। তখন আমাদের সপ্তাহে পাঁচদিন করে ক্লাস হতো, শনি আর রবিবার ছিল ছুটির দিন। একদিন শুক্রবার ক্লাস শেষের আগে আমাদের শনিবার বিকেলে হাজির হতে হবে। উপলক্ষ রাতের ক্লাস। স্কুল ছুটির পর হাজারো জল্পনা করতে করতে দলবেঁধে বাড়ি ফিরলাম আমরা। ….. বাতাসে এখন হালকা শীতের আমেজ। জল ঝরানোর পর্ব শেষ করে বর্ষা বিদায় নিয়েছে। মেঘমুক্ত আকাশ এখন মখমলি কিংখাবের মতোই উজ্জ্বল। অসংখ্য জ্যোতিষ্কের দ্যুতিতে আকাশ এখন দীপ্যমান। জলদগম্ভীর কন্ঠে হেডমাস্টার মশাই তার কথকতা শুরু করেন – “রাতের আকাশে তারা দেখা একটা সুন্দর খেয়ালী অভ্যাস। তারাদের সাথে পরিচয় হতে হতে অবাক বিস্ময়ে মন চলে যায় লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে থাকা এক আশ্চর্য জগতে! ভাবতেও যেন কেমন শিহরণ জাগে শরীরে!...... আকাশে আমরা যে সব তারাদের খালি চোখে দেখতে পাই তাদের সংখ্যা দু- হাজারের মতো এবং সারা বছরে সব মিলিয়ে মোটামুটি পাঁচ থেকে ছয় হাজারের মতো তারা দেখা যায়।…. আজকে এই রাতের তারা দেখার আসরে তোমাদের ডেকে আনার উদ্দেশ্য‌ই হলো তোমাদের মধ্যে এই ইচ্ছে আর ভালোবাসাকে জাগিয়ে তোলা যাতে করে অনন্ত দূরত্বে থাকা ওই অগণিত জ্যোতিষ্কদের সাথে তোমরা আত্মার সম্পর্ক, আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তুলতে পার।”  গুটিসুটি মেরে আমরা সকলেই গায়ে গা লাগিয়ে ঘন হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। সকলেই উৎসুক হেডমাস্টার মশাই এরপর কী বলেন তা শোনার জন্য।……এমন অভিজ্ঞতা উপস্থিত সকলের কাছেই একেবারে নতুন। হেডমাস্টার মশাইয়ের কন্ঠ আবার সরব হয়ে ওঠে। হাতের লম্বা টর্চটা জ্বালিয়ে আকাশপটে নিক্ষেপ করে তিনি নতুন করে কথা শুরু করেন – “অক্টোবর মাসের আকাশের পূর্ব দক্ষিণ ভাগ জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সিটাস বা জলদানব। এর পশ্চিমে দেখা যাচ্ছে কুম্ভ রাশিকে। উত্তর পশ্চিম আকাশে দেখতে পাবে হারকিউলিস নক্ষত্র মণ্ডলীকে। ড্রাকো বা ড্রাগনের মাথায় পা দিয়ে মহা যোদ্ধা হারকিউলিস দাঁড়িয়ে আছেন বিজয়ীর উদ্ধত ভঙ্গিমায়।” কথা বলতে বলতে হেডমাস্টার মশাই টর্চ নেড়ে আকাশপট উজ্জ্বল করে উদ্ভাসিত নক্ষত্রমন্ডলীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন আমাদের। আমাদের নজর এখন উত্তর পূর্ব আকাশে। সেখানে দিগন্তের সামান্য উপরে একখণ্ড হীরের দ্যুতিতে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে ক্যাপিলা বা ব্রহ্মহৃদয়,অরিগা মণ্ডলীর সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার‌ই সামান্য কিছু দূরে আকাশের পূর্ব কোল ঘেঁষে একগুচ্ছ তারা ভিড় করে রয়েছে। এটিই হলো কৃত্তিকা নক্ষত্রমন্ডলী। ….. …… আমাদের কারো মুখে কোনো কথা নেই। অপলক দৃষ্টিতে ঘাড় উঁচিয়ে সুদূর জ্যোতিষ্কলোকের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে চলেছি আমরা। এতোদিন ব‌ইয়ের পড়ায় মন আটকে ছিল আমাদের। রাতের এই ক্লাসের হাতধরে আমরা পৌঁছে গেলাম সুদূর জ্যোতিষ্কলোকের আঙিনায়। তারকা লেখনি পাঠ আমাদের কাছে এক নতুন অজানা জগতের দুয়ার খুলে দিল। কথায় কথায় রাত বেড়েছে, কঠিন হয়েছে হিমের কামড়। তবে এইসব চলতি অনুভবের সীমানা এড়িয়ে আমাদের মন তখন পৌঁছে গিয়েছে অন্য এক অনির্বচনীয় আনন্দের অনুভূতির জগতে। হুঁশ ফিরে এলো হেডমাস্টার মশাইয়ের কথাতে – “ আজকের এই রাতক্লাসে তোমাদের ডেকে এনেছি কেবলমাত্র একটা অচেনা, অজানা জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব বলে। …. কেবল ব‌ইয়ের পাতাতে নয়, এই বিপুলা পৃথিবীর সবকিছুর মধ্যেই ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র বিস্ময়। মনের ক্ষুদ্র সীমাকে টপকে এই অসীম জ্ঞানের জগতে ঢুকে পড়াই হলো মানুষের জীবন সাধনার মহত্তম লক্ষ্য। তোমাদের মন যাতে সেই অসীমের সাধনায় মগ্ন হবার জন্য উন্মুখ হয় সে জন্যই আমরা তোমাদের এই রাতের আসরে ডেকে এনেছি।” হেডমাস্টার মশাই তাঁর কথা শেষ করেন। তারপর এক সময় উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে ওঠেন –  আকাশ ভরা, সূর্য তারা, বিশ্ব ভরা প্রাণ তাহার‌ই মাঝখানে, আমি পেয়েছি মোর স্থান বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান …….. হেডমাস্টার মশাইয়ের সুরে সুর মেলাই আমরা সকলে। আমাদের মিলিত কন্ঠের সুর চেনা জগতের ব্যস্ত সীমানা ছাড়িয়ে দূর থেকে দূরান্তরে সেই সুদূর জ্যোতিষ্কলোকের আঙিনায় ছড়িয়ে পড়ে। হেডমাস্টার মশাইয়ের হাত ধরে, রাতের তারা দেখার ক্লাসের মধ্যে দিয়ে,জানার মাঝে অজানাকে খুঁজতে খুঁজতে আমরা সকলেই সুরলোকের দিশারী, সুদূরের পিয়াসী হয়ে উঠি।   ** এই নিবন্ধটি বন্ধুবর জ্যোতির্বিদ শ্রী সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের করকমলে উৎসর্গ করা হলো। ** তথ্য সূত্রের জন্য ঋদ্ধি পত্রিকার “গ্রহ তারা” সংখ্যার সাহায্য নেওয়া হয়েছে। আমার ঋণ স্বীকার করছি বিনম্রতার সঙ্গে।   সোমনাথ মুখোপাধ্যায় জুলাই ১০.২০২৬.শুক্রবার।
    মেসি মোর্চা বনাম রোনালদো সমিতি  - সৈয়দ তৌশিফ আহমেদ | খ্রিষ্টাব্দ ৩৯৮৭। মহাশূন্যের আগন্তুকরা পৃথিবীর পূর্বাঞ্চলে পশ্চিমবঙ্গ নামক এক লুপ্ত প্রদেশের ধ্বংসাবশেষ খুঁড়ে বের করল। এখানে বাস করত এমনই এক বিচিত্র মানবগোষ্ঠী, যারা অবান্তর বিষয়ে দিবারাত্রি কোন্দল করাকে নিজেদের সাংস্কৃতিক চর্চা বলে মনে করত। এবং নানান বিষয়ে খোপবাজি করে অতিষ্ঠ করে তুলত অন্যের জীবন। জীবজগতে ছারপোকা যেমন অতি তুচ্ছ প্রাণী হয়েও বিছানায় সেঁধিয়ে থেকে মানুষের ঘুম ও রতিক্রিয়ার বারোটা বাজানোর ক্ষমতা রাখে, তেমনই এই অদ্ভুত জনগোষ্ঠীও তাদের অবিরাম নাকগলানো স্বভাব ও অনন্ত মতামত-উৎপাদনের মাধ্যমে গোটা পৃথিবীকে ক্লান্ত, বিরক্ত এবং ক্ষিপ্ত করে রাখত।ঠিক কী হেতুতে এই বিচিত্র জাতির বিদায়ঘণ্টা বাজে, তা নিয়ে ভিনগ্রহী গবেষকদের মনে ছিল উদগ্র কৌতূহল। তাঁরা আন্দাজ করেছিলেন, এত প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু এক সভ্যতার পতনের পিছনে নিশ্চয়ই মহামারি, খাদ্যসংকট কিংবা জলবায়ু-বিপর্যয়ের মতো কোনও অবশ্যম্ভাবী কারণ নিহিত থাকবে। কিন্তু বিস্তীর্ণ সমভূমির ছাতি বরাবর কোপাকুপি করতেই মাটির নিচ থেকে উঠে আসতে থাকে এমন সব নমুনা, যা দেখে ভিনগ্রহী প্রত্নতাত্ত্বিকদের চক্ষু চড়কগাছ।পলির আস্তরণ ভেদ করতেই মিলল: তিন কোটি ফর্দাফাঁই হওয়া আকাশি-সাদা জার্সি, দেড় কোটি শতচ্ছিন্ন লাল-সবুজ হেডব্যান্ড এবং কোটি কোটি স্মার্টফোনের কঙ্কাল। তবে সবচেয়ে বড় চমকটি অপেক্ষা করছিল মাটির আরেকটু গভীরে। গভীর পলি খুঁড়ে উদ্ধার হলো একটি অবিনশ্বর প্লাস্টিকের ঝান্ডা - যাতে লেখা, “মেসি মানে কাব্য, রোনালদো মানে মাংসপেশি”। তার ঠিক পাশেই, পুঁতে রাখা ছিল প্রতিপক্ষের পাল্টা ধ্বজা- “রোনালদো মানে শ্রম, মেসি মানে জোচ্চুরি”।লিপি উদ্ধার করা গেলেও, এই গূঢ় বাক্যের অর্থ বুঝতে গিয়ে এলিয়েন গবেষকদের রীতিমতো ল্যাজেগোবরে হওয়ার জোগাড়! এই 'মেসি' বা 'রোনালদো' বস্তুটি আসলে কী? এরা কি প্রাচীন কোনও দেবতা? ভয়ংকর কোনও দলপতি? নাকি কোনও প্রতাপশালী সামন্তপ্রভু?এতকিছু শুরুতেই বোধগম্য না হলেও, অন্তত এটুকু জলের মতো সাফ হয়ে গেল যে, এই লুপ্ত জাতিটি ছিল ঘোরতর 'প্লাস্টিক-পাগল'। তারা যেমন প্রতিবাদের প্যামপ্লেটে প্লাস্টিক ব্যবহার করত, তেমনই মুখেভাতের মেনুকার্ডেও। এত শতাব্দী পরেও মাটির নিচে অক্ষত ঝাণ্ডার মূল কারণ এই অবিনশ্বর পলিমার যৌগটি।ডিজিটাল ধ্বংসাবশেষ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গবেষকেরা প্রথম দিকটায় মুহুর্মুহু “GOAT” শব্দের ব্যাপক অভিঘাতে রীতিমতো ভিরমি খাচ্ছিলেন। তাঁদের স্থির বিশ্বাস জন্মেছিল, এই 'GOAT' নিশ্চয়ই মিশরীয় শেয়াল-দেবতা আনুবিসের মতোই ছাগল-মুখো প্রাচীন কোনও স্থানীয় উপাস্য। কারণ এত উত্তেজনা, এত খেয়োখেয়ি, এমন অনন্ত খিস্তি-খেউড়, প্রকাশ্য ল্যাং-মারামারি, এমনকি অনায়াস বন্ধুত্ব-বিয়োগ -এসব প্রলয়কাণ্ড যে স্রেফ চামড়ার একটি বল লাথানোর বিনোদন থেকে জন্মাতে পারে, সে কথা আকাশচারী গবেষকদের সুস্থ প্রত্ন-মস্তিষ্কে কিছুতেই ধরছিল না।পরবর্তী গবেষণায় অবশ্য আরও বিচিত্র সব তথ্যের হদিশ মেলে। ডিজিটাল ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার হয় “ফেসবুক” নামের এক প্রকাণ্ড ভার্চুয়াল খোঁয়াড়, যেখানে আক্ষরিক অর্থেই বাঁধা পড়েছিল গোটা জনজাতি। সেখানকার 'লাইক'-মুদ্রা অর্জন করে তারা খরিদ করত সামাজিক প্রভাব ও প্রতিপত্তি। হাসিল করত বন্ধু বান্ধবী। এছাড়া “হোয়াটসঅ্যাপ” নামের এক নর্দমা-সদৃশ গোপন পরিসরের শিলালেখ পরীক্ষা করে গবেষকেরা বুঝতে পারেন, এই ভয়ংকর গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আদপে মানুষের পায়ে লাথির নানারকম কৃৎকৌশল ও তার বিন্যাসকে ঘিরেই আবর্তিত। অর্থাৎ, বিষয়টি ‘ফুটবল’ নামক এক আদিম ক্রীড়া মাত্র!এই ফেসবুক-খোঁয়াড়ের সবচেয়ে মূল্যবান আবিষ্কার ছিল “কমেন্ট থ্রেড”। গবেষকেরা প্রথমে ভেবেছিলেন, এগুলি হয়ত এই জাতির প্রাচীন কোনও বংশলতিকা। পরে বোঝা যায়, এগুলি আদপে তাদের প্রাত্যহিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গৃহযুদ্ধের জ্বলন্ত প্রামাণ্য নথি। শান্তিকামী কোনও নির্বোধ দৈবাৎ সেখানে শান্তিপ্রস্তাব দিয়ে বসলে, পরবর্তী সাতশো বিয়াল্লিশটি মন্তব্যে অত্যন্ত সযত্নে তার চোদ্দো গুষ্টি উদ্ধার করে দেওয়া হত।তাঁরা আরও জানলেন, GOAT বলতে এই জাতি বুঝত “সর্বকালের শ্রেষ্ঠ”। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের জন্য খেলার নিরেট পরিসংখ্যানের বদলে তারা ঢের বেশি ব্যবহার করত মা-বোন-তোলা গালি এবং চোয়াল-ফাঁক-করা কুৎসিত হাসি, বা রাগে-জ্বলতে-থাকা ডিজিটাল মুখভঙ্গি!লাগাতার প্রত্নখনন এবং ফেসবুক-কমেন্টের ASCII কোড ভেঙে ইতিহাসবিদেরা যে-সব দাহ্য নথি উদ্ধার করেছেন, তা থেকে জানা যায়—ফুটবলের বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এক সন্ধ্যায়, এক অখ্যাত চায়ের দোকানেই বেজে উঠেছিল সর্বনাশের প্রথম ঘণ্টা। এক মেসিভক্ত ভাঁড়ের চা’এ সড়াৎ চুমুক মেরেই বলে ওঠে, “মেসির পায়ে বল থাকলে মনে হয় ঈশ্বর অলস বিকেলে ক্যালিগ্রাফি করছেন।” পাশের বেঞ্চ থেকে তক্ষুনি পাল্টা ঝাপট মারে এক রোনাল্ডোপ্রেমী, “ক্যালিগ্রাফি না হাতি, মনে হয় ক্যানভাসে কাদা লেবড়ে দিচ্ছে”। কথার পিঠে কথা তার পিঠে কথা থেকে শুরু হয় খণ্ডযুদ্ধ। পরের দিনই গঠিত হয় “আর্জেন্টিনীয় নন্দনরক্ষা মঞ্চ”। পাল্টা নির্মাণ হয় “রোনালদীয় আত্মনির্মাণ সংগ্রাম পরিষদ”। প্রথম দল হাঁকড়ায়, ফুটবল হল অনায়াসের শিল্প। দ্বিতীয় দল চেল্লায়, অনায়াস আসলে অলসের ষড়যন্ত্র। এইভাবে ফুটবল ক্রমে খেলা থেকে জীবনদর্শনে, জীবনদর্শন থেকে গৃহযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু বাঙালির জাতিগত দুর্ভাগ্য ছিল, সে একখানা খোপে স্থির থাকতে পারত না। একটিমাত্র সাদামাটা বিরুদ্ধ খোপে নিজেকে আটকে না থেকে এদের বিভাজনের জাল বিস্তৃত হত বহুদূর। যে কোনও বিষয়কে মুহূর্তে পক্ষ-বিপক্ষ, শুদ্ধ-অশুদ্ধ, দেবতা-দানব এইসব তুচ্ছ অথচ রক্তগরম করা খোপে সাজিয়ে ফেলতে তারা ছিল সিদ্ধহস্ত। দল, জোট, মোর্চা, টিম, ফ্রন্ট, লিগ, আঞ্জুমান, পরিষদ, সভা, ক্লাব, সংস্থা, সমিতি, বৃন্দ, মণ্ডলী – কী ছিল না সেখানে।মেসি-শিবিরের ভিতরেই দ্রুত বিভাজন দেখা দিল। একদল বলল, “মেসি আসলে রবীন্দ্রনাথীয়। আরেকদল বলল, অসম্ভব! তিনি জীবনানন্দীয়।” প্রত্যেকেই নিজেকে একমাত্র প্রকৃত মেসি-পন্থী বলে দাবড়ে ঘোষণা করল। রোনালদো শিবিরেও চলছিল ধারাবাহিক অশান্তি। কেউ বলল, রোনালদো পুঁজিবাদী আত্মনির্মাণের প্রতীক। অন্যরা রায় দিল, শ্রমিকশ্রেণির ঘামকে বিশ্বমঞ্চে তোলা যুগনায়ক তিনি। এই কলহরত দলগুলি মাঝে মধ্যেই কিন্তু খেই হারিয়ে ফেলত, কেউ হয়ত মেসিপন্থী, অথচ সে সত্যজিৎ ফ্রন্টের চেয়ারম্যান। তখন অন্য এক মেসিপন্থীর মাথায় সে মুগুর বসিয়ে দিতেই পারে। কারণ মুগুর খাওয়া যে আবার ঋত্বিক পরিষদের সভাপতিও বটে। এভাবেই একদিন শ্যামবাজার পাঁচমাথায় চলছিল ‘বিশ্ব মেসীয় সম্মেলন’। ঠিক তখনই পাশের রাস্তা দিয়ে ‘রোনালদীয় ইচ্ছাশক্তি যাত্রা’ কুচকাওয়াজ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিল। দুই শিবিরের সদস্যরা একে অন্যকে উপেক্ষা করলেই ল্যাঠা চুকে যেত। কিন্তু বাঙালি আরও অনেক কিছুর মতই উপেক্ষা করার বিদ্যেটি তেমন রপ্ত করতে পারেনি। রাজ্যজুড়ে শুরু হল গৃহযুদ্ধ ; অতঃপর প্রশাসনিক অচলাবস্থা। আগে বিষয়টি চায়ের দোকান, ফেসবুক, পাড়ার ক্লাব এবং জামাইষষ্ঠীর টেবিল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ক্রমে দেখা গেল, হাসপাতালের আউটডোরে ডাক্তার প্রেসক্রিপশন দেওয়ার আগে জিজ্ঞেস করছেন, আপনি মেসি না রোনালদো? স্কুলে ভর্তি হওয়ার ফর্মে নতুন ঘর: অভিভাবকের ফুটবল-আদর্শ। এমনকি পাড়ার মুদি বাকিতে চাল দেবে কি না, তা নির্ভর করছে ক্রেতা ৭ বলছে, না ১০।অতএব প্রশাসন বাধ্য হয়েই গঠন করল “GOAT নির্ধারণ কমিশন।” কমিশনের কাজ ছিল বৈজ্ঞানিক ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া - কে বড়। কমিটিতে রাখা হল এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, দুই প্রাক্তন ফুটবলার, চারজন কবি, চারজন জিম ট্রেনার, সাতজন পাড়ার ক্লাবসচিব, বারোজন ইউটিউব-বিশেষজ্ঞ, এবং একজন মানুষ যিনি জীবনে কোনোদিন ফুটবল দেখেননি - তাঁকেই নিরপেক্ষ সদস্য বলা হল। অনেক বিচার-বিশ্লেষণ, নথিপত্র, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও সাত কাপ লাল চা খরচের পর কমিশন শেষমেষ এক আপশ-প্রস্তাব দিল: মেসি শিল্প, রোনালদো শ্রম; দু’জনেই মহৎ। এই বিপজ্জনক নিরপেক্ষতা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যের নানা প্রান্তে আগুন জ্বলে ওঠে, এবং প্রশাসন বাধ্য হয় জরুরি অবস্থা জারি করতে।কারণ, এই জনজাতি ছিল জন্মগতভাবে আপোশহীন। “দু’জনেই বড়”—এই মধ্যপন্থা মেনে নেওয়ার অর্থ হলো এতদিনের জমানো খিস্তিখেউড়, সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্লক-আনফ্রেন্ড, শ্বশুরবাড়ি বর্জন, পাড়ার ক্লাব ভাগ, এমনকি বাপ-ব্যাটার বাক্যালাপ বন্ধ—সবই যে চূড়ান্ত বৃথা! তাদের চিরায়ত দর্শনই ছিল: একজনকে ভালোবাসলে অপরজনকে ঘৃণা করতেই হবে। সোশ্যাল মিডিয়ার ময়দানে এরা প্রত্যেকেই ছিল একেকটি ভয়ংকর কাগুজে বাঘ, যারা রক্তক্ষয়ী তর্কে ঝাঁপিয়ে পড়তে বিন্দুমাত্র পিছপা হতো না।তাই, আপোশ-প্রস্তাবের পরদিনই ওই লুপ্ত প্রদেশে নতুন আন্দোলনের বীজ রোপিত হলো—“আপোশ মানি না।” ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মেসি ও রোনালদো-পক্ষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে মিছিল করল শান্তি-কমিশনের বিরুদ্ধে। তাদের আকাশভেদী যৌথ স্লোগান ছিল: “শত্রু চাই, শান্তি নয়!” আসলে, শত্রু ছাড়া এই জাতিটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই মণিহারা ফণীর মতো দিশেহারা।এলিয়েন গবেষকদের অনুমান, সেই অভূতপূর্ব যৌথ মিছিলটি মোড়ের মাথায় গিয়ে বাঁয়ে ঘুরবে নাকি ডানদিকে—তা নিয়েই সম্ভবত নতুন করে অশান্তির সূত্রপাত হয়। ফলস্বরূপ, শুরু হয় গৃহযুদ্ধের অন্তিম পর্যায়। এই সমস্ত ডিজিটাল ও পারিপার্শ্বিক ঘটনাচক্র বিশ্লেষণ করে গবেষকরা এই অকাট্য সিদ্ধান্তেই উপনীত হন যে, নিছক এই 'খোপবাজি' বা আত্মঘাতী মেরূকরণের ফলেই আস্ত জাতিটি পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে নিকেশ হয়ে গেছে।ধ্বংসস্তূপের একেবারে তলদেশ থেকে উদ্ধার হওয়া সর্বশেষ প্রাসাশনিক বিজ্ঞপ্তিটিই ছিল এই ট্র্যাজেডির সর্বশেষ পুনরুদ্ধারিত নথি। তাতে জনস্বার্থে লেখা ছিল:"নাগরিকদের জানানো যাচ্ছে, প্রদেশের সার্বিক শান্তি রক্ষার স্বার্থে প্রত্যেকে আগামী সোমবারের মধ্যে নিজের জন্য অন্তত একজন স্থায়ী শত্রু নির্বাচন করুন। উল্লেখ্য, যাঁরা 'আমি কারোর সাতে-পাঁচে নেই' বা 'সবাই আমার বন্ধু' গোছের সমাজবিরোধী মনোভাব পোষণ করেন, তাঁদের অবিলম্বে মনোবিদদের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত্ব নেওয়া হয়েছে।” 
    ভাগবত পুরাণ - ১/৯ - Kishore Ghosal | এর আগে আমরা সত্যযুগের সূচনায় “সত্য” নামক কোন তেজস্বী সৎ-ব্রাহ্মণের পরিচয় পাইনি। “ত্রেতা” ও “দ্বাপর” যুগেও “ত্রেতা” বা “দ্বাপর” নামে কোন মহাবীর ক্ষত্রিয় অথবা মহাবণিক বৈশ্যর নাম পাইনি। অথচ কলিযুগের শুরুতেই পেয়ে গেলাম “কলি” নামের একজন রাজবেশধারী শূদ্রকে! শ্রীসূত কিন্তু কলিকে রাজবেশধারী শূদ্র বলেছিলেন, তাঁকে ললিতকান্তি অথবা কুৎসিত – এমন কোন কথাই বলেননি। কিন্তু ঋষি শৌণক গায়ে পড়েই বলে বসলেন, “অতি কুৎসিত শূদ্র”। "ভাগবত পুরাণ"-এর প্রথম স্কন্ধ - নবম পর্বভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৯
  • জনতার খেরোর খাতা...
    তৃতীয় ছায়া @  মাতুলালয়  - albert banerjee | আজ রাতে তৃতীয় ছায়া আমার সামনে দাঁড়িয়ে, তার মুখ অর্ধেক মোমবাতির আলোয়, অর্ধেক অন্ধকারে, তার হাতের আঙুলে একটি ছুরি ঘুরছে, সেই ছুরির ফলা থেকে বিন্দু বিন্দু রক্ত পড়ছে – কার রক্ত? জানি না, হয়তো তার নিজের, কারণ সে এতটাই হিসাবি যে নিজের মাংসও কেটে পরীক্ষা করে দেখে কতটা সহ্য করতে পারে। তৃতীয় ছায়া বলে, আমার দিকে না, শূন্যে, যেন কেউ তাকে প্রশ্ন করছে, আর সে উত্তর দিচ্ছে – “হয়তো বনে যাবার আগে রাজপুত্র তার পুত্রকে হত্যা করবে। হয়তো সে তার পুত্রকে বন্দী করবে, অপমান করবে, ব্যবহার করবে অস্ত্র হিসেবে, সেই অস্ত্র দিয়ে আঘাত করবে আমাদের, তার শত্রুদের, তার প্রাসাদ দখলকারীদের। যদি সে তা করে, তাহলে আমাদের পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে, কারণ পুত্রের রক্তে সে ফিরে আসবে, সিংহাসন দাবি করবে, তার অধিকার জানাবে, আর আমরা তখন কী করব? আমরা কি তাকে থামাতে পারব? আমরা কি তার ছুরি ঠেকাতে পারব? না, আমরা পারব না, কারণ ভাই ভাই রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন করা যায় না, শুধু ক্ষত তৈরি করা যায়, আর সেই ক্ষত থেকে বেরোয় প্রতিশোধের আগুন, যা আমাদের সবাইকে পুড়িয়ে মারে।” সে থামে, তার চোখ ঘোরে, তার জিভ ঠোঁট চাটে, যেন সে স্বাদ নিচ্ছে ভবিষ্যতের রক্তের, যে রক্ত হয়তো তার নিজের, হয়তো পুত্রের, হয়তোবা নির্বাসিত রাজপুত্রের। সে আবার বলে, “তাই আমাদের আগে থেকেই ব্যবস্থা করতে হবে। পুত্রকে সরিয়ে দিতে হবে, নিরাপদ জায়গায়, যেখানে তার কোনো কূট তাকে খুঁজে পাবে না, যেখানে তার ভ্রাতা তাকে হত্যা করতে পারবে না, যেখানে গূঢ় পুরুষ তাকে বন্দী করতে পারবে না। সেই জায়গা – মাতুলের গৃহ, যেখানে রাজার কোনো অধিকার নেই, যেখানে রাজার কোনো ক্ষমতা প্রবেশ করে না,মাতুল হলো রাজার চেয়েও বড়, মাতুল হলো রক্তের দ্বিতীয় সিংহাসন, যার ওপর বসে থাকে নিরাপত্তার প্রতীক।” আমি হাসি। আমার হাসি দেয়ালে ধাক্কা খায়, ফিরে আসে, আবার ধাক্কা খায়, শেষে মিলিয়ে যায় কার্পেটের নরম বুননে। আমি ফিসফিস করি, কিন্তু তারা শোনে না, কারণ তারা ব্যস্ত তাদের পরিকল্পনায়, তাদের হিসাবে, তাদের পুত্র সরানোর ব্যবস্থায়। তারা জানে না আমি এখানে, আমি শুনছি, আমি দেখছি, আমি হিসাব করছি – পুত্রকে মামাবাড়ি পাঠানোর অর্থ কী? অর্থাৎ পুত্র বাঁচবে, পুত্র ফিরে আসবে, পুত্র দাবি করবে তার অধিকার, পুত্র হবে নতুন অস্ত্র, নতুন যুদ্ধ, নতুন রক্তপাত। আমি তৃতীয় ছায়ার কাছে যাই, আমি তার পিছনে দাঁড়াই, আমার নিঃশ্বাস তার ঘাড়ে লাগে, সে চমকে ওঠে, ঘুরে তাকায়, কিন্তু দেখে না আমাকে, আমি অদৃশ্য, আমি ছায়ার ছায়া, সেই গন্ধ যা সে চেনে না, সেই স্পর্শ যা সে অনুভব করতে পারে না, শুধু তার মেরুদণ্ড বেয়ে একটি শীতল কম্পন চলে যায়, সে কাঁপে, কিন্তু বুঝতে পারে না কেন, সে আবার তার পরিকল্পনায় ডুবে যায়, তার পুত্র সরানোর তালিকা তৈরি করে, তার চিঠি লেখে ভ্রাতার উদ্দেশ্যে। হাতের লেখা কাঁপে, কিন্তু থামে না, কারণ থামলে ভয় পায়, থামলে তার মাথায় ঢুকে পড়ে প্রশ্ন – “যদি পুত্র মামাবাড়িতে গিয়েও নিরাপদ না হয়? যদি মামা তাকে হত্যা করে? যদি মামা তাকে ব্যবহার করে নিজের সিংহাসনের জন্য? তখন কী হবে? তখন আমরা কি আরেকটি পরিকল্পনা করব? আরেকটি পুত্র সরানোর ব্যবস্থা? সাথে আরো একজনের নির্বাসন? অন্য রানীর আরো এক পুত্র? ”  তৃতীয় ছায়া তার মুখে হাত দেয়, তার চোখের জল আটকাতে চায়, কিন্তু জল বেরোয়, গড়িয়ে পড়ে, চিঠির ওপর, কালি ছড়ায়, শব্দগুলো ভেজা হয়ে যায়, ঝাপসা হয়ে যায়, অর্থহীন হয়ে যায়। সে চিঠি ছিঁড়ে ফেলে, নতুন কাগজ নেয়, আবার লিখতে শুরু করে – “প্রিয় ভ্রাতা, এই পুত্রটি আমাদের কাছে বিপজ্জনক, কারণ তার ভ্রাতা নির্বাসিত হবে, তার ভ্রাতার আকাঙ্খীরা হয়তো তাকে ব্যবহার করবে আমাদের বিরুদ্ধে, তাই আমরা তাকে পাঠাচ্ছি আপনার কাছে, তাকে রাখবেন নিরাপদে, তাকে শেখাবেন আপনার রাজনীতি, আপনার যুদ্ধ, আপনার ধর্ম, কিন্তু তাকে এখন ফিরতে দেবেন না এই প্রাসাদে, কারণ ফিরলে সে হবে নতুন আগুন, নতুন ধ্বংস, নতুন রক্তপাত, যা আমরা চাই না, যা আমরা সহ্য করতে পারব না, তাই দয়া করে তাকে আটকে রাখুন, যতদিন না আমরা ব্যবস্থা করি, যতদিন না আমরা জানি তার পিতা মরে গেছে, তার ভ্রাতা চিরতরে বনে হারিয়ে গেছে, নাকি আমরা নিজেরাই তাকে শেষ করে দিয়েছি গোপনে, নিঃশব্দে, ছুরির আঘাতে, বিষের ফোঁটায়, বা শ্বাসরোধের দড়িতে।”তার পুত্র এখনও এখানে, সেই পুত্র যে তার গর্ভে জন্মেছিল, তার গর্ভে অন্য পুরুষের বীজও মিশে আছে, তাই পুত্রটি কার? রাজার নিয়োজিত পুরুষের ? নাকি অন্য পুরুষের? কেউ জানে না, কেউ জানতে চায় না, কিন্তু তৃতীয় ছায়া জানে, কারণ ছায়ারা সব জানে, তারা দেয়ালের ফাটলে, মেঝের ফাঁকে, ছাদের কাঠের বুকে জমা থাকে, তারা শোনে প্রতিটি ফিসফিস, প্রতিটি চিৎকার, প্রতিটি স্তব্ধতা।  আমি চিঠি পড়ি, তার কাঁধের ওপর থেকে, আমার চোখের আলো অদৃশ্য, কিন্তু আমি দেখতে পাই প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি দাগ, প্রতিটি সংশোধন, আমি মনে করি – এই চিঠি পৌঁছাবে মামার কাছে, মামা পড়বে, মামা ভাববে, মামা সিদ্ধান্ত নেবে, কিন্তু মামা কি জানবে যে এই চিঠির পেছনে আমি আছি?
    যে কথা না-বললেই নয় : ৪  - অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায় | মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ধর্ষণ করলে সকালে জমা বিকেল খরচ করা হবে। তেমনটা হোক বা না হোক, যদি অভিযুক্তকে খরচ করতে হয়, তাহলে খুন করতে হয়। পুলিশ চাইলে প্রকাশ্যে অভিযুক্তকে গুলি করে হত্যা করতে পারে, আইনের তোয়াক্কা না করে। যদি এইভাবে খরচ করার কথা ভাবা হয়, কখনই তাকে এনকাউন্টার বলা যায় না। সাধারণ অর্থে 'এনকাউন্টার' (Encounter) শব্দটির অর্থ হল কোনো কিছুর সঙ্গে আকস্মিকভাবে মুখোমুখি হওয়া বা কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়া। যাই হোক, আইনি ও অপরাধের প্রসঙ্গে, বিশেষ করে ভারতের প্রেক্ষাপটে 'এনকাউন্টার' বলতে সাধারণত পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে কোনো সশস্ত্র অপরাধী বা সন্ত্রাসবাদীর সরাসরি বন্দুকযুদ্ধ বা সংঘর্ষকে বোঝায়। ধৃত অভিযুক্তের সঙ্গে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। পুলিশ বাহিনীর মধ্যে থেকে কখনোই একজন অভিযুক্ত পুলিশের কাছ থেকে বন্দুক কেড়ে নিয়ে গুলি করতে উদ্যত হবে, এটা কষ্টকল্পনা। কারণ এটা করে সে পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে পারবে না, এটা বোঝার মতো বোকা অভিযুক্তরা নন। তাছাড়া ধর্ষণে অভিযুক্ত ব্যক্তির হাতে হাতকড়া কোমরে দড়ি বাঁধা থাকবে। এমতাবস্থায় কারোর পক্ষেই আক্রমণ করা সম্ভব নয়। হলে হিন্দি সিনেমায় হয়। অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে গিয়ে সংঘর্ষ হতে পারে। তখন এনকাউন্টার হওয়া সম্ভব। অতএব ধৃত ব্যক্তিকে ঠান্ডা মাথায় খুন করে প্লিজ এনকাউন্টার বলবেন না। বলুন "খুন করেছি, বেশ করেছি।" বাকিটা আদালত বুঝে নেবে।
    এনকাউন্টার  - Anjan Banerjee | আকাশে শশধর ও তারকাপুঞ্জ হয়ত ছিলঢাকা পড়েছে শেষ আষাঢ়ের গাম্ভারি নিশি মেঘে। নিশুত রাতে ছ্যাতরানো জল কাদা জঙ্গল ধরেঠেলা মেরে নিয়ে যায় লগবগে মাথার কোননেশাখোর আসামীকে হাফ ডজন শান্তির রক্ষী।কালো রাতের কম্বলে ঢাকা জল কাদার বাদায়যে বলেছিল গতদিন খানিকটা গল্প। আজ সে নাকি এঁকেবুঁকে ছবি লিখে তুলে দেবেসেদিনের নরকের নক্সা এই ঝুমকো আঁধারে। জানা গেল, ছবি আঁকা হয়নিকথা কেউ কয়নি,ঝুঁঝকো আঁধারে আচমকা সে নিজেই হয়ে গেছে ছ্যাতরানো ছবি আর রোমাঞ্চ গল্প। বেচারি প্রহরীরা ভয় পেয়ে বড্ড... গুলি মেরে ধরিয়ে দিয়েছে কর্দম ভরা ভূমিলগবগে লোকটাকে। তারপর ক'জনায় মিলেজুলে চুপিচুপি লেখা হল গভীর রাতের গল্প,না না না... প্রভাসের পেন্সিলে নয়, রাষ্ট্রের হীরের কলমে। আকাশে শশধর ও তারকাপুঞ্জ হয়ত ছিলঢাকা পড়েছে শেষ আষাঢ়ের গাম্ভারি নিশি মেঘে।ছোটদের চিড় খাওয়া খেলনা জোড় লাগিয়ে দেবার মতোসাজিয়ে রাখা হল ফেভিকল দিয়ে জোড় লাগানো একটা ভাঙাচোরা গল্পকেতাবটার মলাটের ভিতরে .... এনকাউন্টার ! ! ********************************************
  • ভাট...
    commentDhuttor | @ তরমুজ, কোন একটা স্টার্টআপে কাজ করে ব্যবসা শিখে নিলেই তো হয় ওই যেরকম ডট ম্যাডামের পরিচিত শিখেছিলেন কাজাখস্তান গিয়ে l স্টার্টআপে মাইনে হয়তো ভালো নয় কিন্তু ব্যবসা তো শেখাই যায় তাইনা ! এখন তো প্রচুর স্টার্টআপে work from home এর মাধ্যমে কাজ শেখবার সুযোগ আছে
    commentতরমুজ | আমি অনেক দিন আগে আমাদের গ্রামের বাড়ি গিয়ে গবাদি পশুপালনের উপর সুদে টাকা লাগাবার ব্যবসার কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু বাড়ি থেকে করতে দেয়নি। এখন পশ্চিমবঙ্গে গরুর কাটার যেসব আইন হয়েছে, তাতে ঐ ব্যবসা আর করা যাবে না। কিন্তু আগে এই ব্যবসাতে ভাল লাভ ছিল। এখন বড় বড় পুঁজিপতিরা গরু কাটবে সবজির ব্যবসা করবে।
    commentকৌতূহলী | ফল পাকলে মিঠে
    আর মানুষ পাকলে তেতো
    এখন দেখছি জলজ্যান্ত
    মিথ্যা কথা সেতো
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত