এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    ভোটাধিকার থেকে বাদ যাওয়া মানুষদের নিয়ে কথা কে বলবে? - সুমন সেনগুপ্ত | অলংকরণ: রমিতদ্যা টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রাক্তন মুখ্য সম্পাদক রাজাগোপালের বহুদিনের পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণ হয়নি, পুলিশ যে তথ্য যাচাই করে, সেই তথ্য যাচাইতে জানা গেছে যে তাঁর নাম যেহেতু ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় ছিল না, তাই তিনি ভারতীয় কি না, তার স্বপক্ষে তাঁরা কোনও প্রমাণ নাকি দাখিল করতে পারেনি, তাই তাঁরা বিরূপ রিপোর্ট দিয়েছে। যা বোঝা যাচ্ছে দেশের অন্যতম বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং সম্পাদক রাজাগোপালের নাম গত ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় না থাকার ফলে, তাঁর পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণ হবে কি না, তা প্রশ্নের মুখে।এই বিষয়ে তাঁর নিজস্ব একটি বয়ান সমাজমাধ্যমে ঘুরছে। সেই বক্তব্যের বেশ কিছুটা অনুবাদ করে পড়া প্রয়োজন। আমাদের মধ্যে অনেকেই হয়ত তৃণমূলের অপশাসন গিয়ে বিজেপির শাসন ব্যবস্থা আসাতে উল্লসিত, কিন্তু সেই ভোটে কি সত্যিই মানুষের রায় প্রতিফলিত হয়েছে, এই প্রশ্নও টুকটাক উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইভিএম পুড়ে যাওয়ার ঘটনা, সেই প্রশ্নে আরো ঘৃতাহুতি দিয়েছে। তিনি লিখেছেন - “এই বছরের মার্চ মাসে, কলকাতার বালিগঞ্জ নির্বাচনী এলাকার ভোটার তালিকা থেকে আমার নাম বাদ দেওয়া হয়। এর কারণ হিসেবে বলা হয় যে, ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়ায় ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আমার বা আমার প্রয়াত বাবার কারও নামই খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমার বাবা ছিলেন একজন গান্ধীবাদী ব্যক্তিত্ব, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং কেরালার ‘গান্ধী স্মারক নিধি’র প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদক। তিনি ২০১৬ সালে প্রয়াত হন। তাঁর মতো একজন সচেতন ও দায়িত্বশীল ভোটারের নাম কীভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে, তা আমার বোধগম্য নয়।পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২৭ লক্ষ বাসিন্দার মতোই, তথাকথিত ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’র (Logical Discrepancies) কারণে আমার নামও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। আমার ম্যাট্রিকুলেশন বা মাধ্যমিক পরীক্ষার নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি; বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী গঠিত ট্রাইব্যুনালগুলোর একটিতে আমার আপিলটি বিচারাধীন রয়েছে। এর ফলে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে আমি ভোট দিতে পারিনি।আরও হতাশাজনক হলো আমার পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণের আবেদনের বিষয়টি। যদিও ১৯ মার্চ, ২০২৬-এ আমি বায়োমেট্রিক সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছিলাম, তবুও পুলিশ ভেরিফিকেশন বা যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়নি কারণ ভোটার তালিকায় আমার নাম আর নেই। বেশ কিছু বিকল্প নথিপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও আমাকে জানানো হয়েছে যে সেগুলো অপর্যাপ্ত। বস্তুত, আজ (২৭ জুন, ২০২৬) পাসপোর্ট নবায়নের জন্য বায়োমেট্রিক দেওয়ার পর ১০০ দিন অতিক্রান্ত হলো। গত সপ্তাহে পাসপোর্ট প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে কলকাতা পুলিশ একটি ‘প্রতিকূল প্রতিবেদন (adverse report) পাঠিয়েছে। আমাকে অবিলম্বে কলকাতার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে (Regional Passport Office) হাজির হতে বলা হয়েছে; কিন্তু আমি যখন সাক্ষাতের জন্য সময় (অ্যাপয়েন্টমেন্ট) চাইলাম—যা ছাড়া সেখানে প্রবেশ করা কঠিন—তখন আমাকে ১৭ জুলাই, ২০২৬-এর তারিখ দেওয়া হলো।এরই মধ্যে, ক্যালিফোর্নিয়ায় কর্মরত সাংবাদিক আমাদের মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন হলো সান ফ্রান্সিসকোতে, ১৭ এপ্রিল। বলাই বাহুল্য, বৈধ দশ-বছরের মার্কিন ভিসা থাকা সত্ত্বেও, একটি সচল পাসপোর্ট ছাড়া সেই বিয়েতে আমার পক্ষে উপস্থিত হওয়া অসম্ভব ছিল।বাস্তব বিচারে, আমি এখন এক ধরণের নাগরিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি—যদিও সরকার সম্প্রতি পুনর্ব্যক্ত করেছে যে পাসপোর্ট নাগরিকত্বের কোনো প্রমাণ নয়। আমার সারাদিনের সময়ের বড় একটা অংশ এখন ব্যয় হচ্ছে পারিবারিক নথিপত্র পুনরুদ্ধার এবং কয়েক দশক আগের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জোগাড় করার প্রচেষ্টায়... আমার দিন শুরু হয় ভোটাধিকার সংক্রান্ত আবেদনের বর্তমান অবস্থা এবং পাসপোর্টের আবেদনের গতিবিধি (ট্র্যাকার) যাচাই করার মধ্য দিয়ে। এরপর আমি সেই কলেজে চিঠি লিখি যেখানে আমার মা ১৯৬৫ সালে শিক্ষকতা করেছিলেন এবং সেই স্কুলে যেখান থেকে তিনি ১৯৫৯ সালে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন; উদ্দেশ্য হলো এমন কোনো নথিপত্র জোগাড় করা যা তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়। স্কুলটি এ ব্যাপারে বেশ সহায়তা করেছে, কিন্তু কলেজটি তা করেনি। একইভাবে, আমি কেরালার মদ্যপান-বিরোধী প্রচারণায় যুক্ত কর্মীদের সাথে কথা বলি—একটি অনলাইন গ্রুপে ঘটনাক্রমে এক কর্মীর নাম পাওয়ার পর আমি যে তালিকা তৈরি করেছিলাম, তা ধরেই এগোচ্ছি। আমি তাঁদের কাছে এমন কোনো সংবাদপত্রের কাটিং বা ছবি চাইছি যাতে অবৈধ মদের দোকান ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আমার বাবার প্রচারণার প্রমাণ পাওয়া যায়।আমার এই সব প্রচেষ্টায় কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি সহায়তা করেছেন। তবে কোনো সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিক সংগঠন বা গিল্ড (যার আমি সদস্য নই) আমার এই পরিস্থিতির প্রতি কোনো আগ্রহ দেখিয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই। একজন প্রবীণ সাংবাদিক আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই ব্যতিক্রমী নয়; কারণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লক্ষ লক্ষ ভারতীয়কে নিত্যদিনের বাস্তবতা হিসেবে এই ‘প্রত্যাখ্যান’ এর মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমি সেই যুক্তি মেনে নিয়েছি।নিজেকে ভুক্তভোগী বা ‘ভিক্টিম’ হিসেবে তুলে ধরা আমার উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না। বরং আমি একটি বৃহত্তর বিষয়কে সামনে আনতে চেয়েছি: সাংবাদিকতায় পেশাগত জীবন কাটানো এবং মোটামুটি পরিচিত একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা কোনো ব্যক্তি যদি এমন সব সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন, তবে সমাজের প্রান্তিক মানুষগুলোকে কী ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা সহজেই অনুমেয়। আমি কি কোনো সংবাদপত্রের দ্বারস্থ হয়েছি? না, কারণ আমি চাই না বিষয়টি কেবল আমাকে কেন্দ্র করেই কোনো ইস্যু হয়ে উঠুক। সম্পাদক ও সাংবাদিকরা কি আমার এই সমস্যার কথা জানেন? অবশ্যই, তাঁদের অনেকেই জানেন। আর যদি না-ই জানেন, তবে তাঁদের এই পেশায় থাকা উচিত নয়—আপনারও কি তাই মনে হয় না?তবুও, এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্পূর্ণ নীরবতা আমার সেই সন্দেহকেই নিশ্চিত করেছে—যা এখন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে আরও জোরালো হয়েছে—যে তথাকথিত মূলধারার সাংবাদিকতার সাথে আমার জীবনের খুব একটা সম্পর্ক নেই। আমি এখন আর কোনো সংবাদপত্র ‘পড়ি’ না। কোনো কোনোটির ওপর হয়তো চোখ বুলিয়ে নিই, কিন্তু কদাচিৎ এমন কিছু খুঁজে পাই যা আমার আগ্রহ জাগিয়ে তোলে।’’রাজাগোপালের এই বয়ানটি হয়ত, অনেকেই পড়েছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও নির্লিপ্ত থেকেছেন, ঠিক যেমনটা ভোটের আগে, কিংবা আসামের এনআরসি’র সময়ে ছিলেন। তখন হয়ত বেশীরভাগ মানুষ ভেবেছিলেন, এই সমস্যা শুধু মুসলমানদের বা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’দের নিয়ে হবে, তাই তখন খুব বেশী শোরগোল করেননি। সেই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোও খুব বেশী সোচ্চার হয়নি, তারা সবাই ব্যস্ত ছিল নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারে। তৃণমূল কংগ্রেসের ধারণা ছিল, যে ঐ ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে বাদ গেলেও মানুষের সমর্থন তাঁদের দিকে থাকবে। সেই জন্যেই তাঁদের শ্লোগান ছিল, ‘যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা’। অথচ তাঁদের জনভিত্তি যে কমছিল, তা তাঁরা এঁচে উঠতে পারেনি। ওদিকে বামেদের একাংশ, বিশেষ করে সিপিআইএম ভেবেছিল এই প্রক্রিয়াতে তৃণমূলের ক্ষতি হবে, সুতরাং খুব বেশী হইচই না করলেও চলবে, তাই তাঁরা দায়সারা ভাবে বিরোধিতা করেছিল। এমনকি আইএসএফের পক্ষ থেকেও নৌশাদ সিদ্দিকি’র একটা বক্তব্য এসেছিল, ‘কোনও নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা নেই মুসলমানদের বেনাগরিক করার, প্রয়োজনে গোরের মাটি এনে প্রমাণ দেওয়া যাবে তাঁরা এই দেশের বাসিন্দা’।যদি ঘটনা পরম্পরা পরপর সাজানো যায়, তাহলে দেখা যাবে, প্রাথমিক যে খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়, সেখানে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ যায়, তার মধ্যে, মৃত, স্থানান্তরিত এবং অন্য ইনিউমারেশন ফর্ম জমা না দেওয়া ব্যক্তিদের নাম ছিল। যদিও সেই তালিকা নিয়েও অনেক প্রশ্ন ছিল তবুও অনেকে এই বিষয়টা মেনে নিয়েছিলেন। এরপর নির্বাচন কমিশন আসরে নামে তাঁদের ব্রহ্মাস্ত্র নিয়ে, নামের বানান, বাবার নাম বা মায়ের নাম বা পরিবারের অন্য কোনও ব্যক্তির নাম যদি ২০০২ সালের তালিকায় না থাকে, তাঁদের শুনানিতে ডাকা হয়। বলা হয়, এই ব্যক্তিদের ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ আছে, এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সামনে উপস্থিত হয়ে তাঁদের প্রমাণ করতে হবে, তাঁরা এই দেশের নাগরিক এবং ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে তবেই তাঁরা তাঁদের নাম তুলতে পারবেন।যদি খেয়াল করা যায়, এই শুনানিতে উপস্থিত হতে বলা হয়, সেই সংখ্যাটা ছিল প্রায় ১.৫ কোটি। বিভিন্ন শুনানি কেন্দ্রে তখন যাঁরা উপস্থিত হচ্ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রাদায়ের মানুষ ছিলেন। বৃদ্ধ থেকে আশীতিপর অসুস্থ মানুষজন ও ছিলেন। রাজ্যের প্রথম সারির প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রে প্রায় প্রতিদিন এই হয়রানির ছবি প্রথম পাতায় থাকলেও, একমাত্র গণশক্তি পত্রিকা প্রথম ৬ দিন সম্পূর্ণ নীরব ছিল। তাঁরা একটি কথাও বলেনি, বা একটি ছবিও প্রকাশ করেনি। শুধু তাই নয়, নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশও কোনও এক অজ্ঞাত কারণে চুপ থেকেছে। ততদিনে বিষয়টা আদালতে গেছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে শুনানি চলছে। এই প্রক্রিয়া আদৌ সাংবিধানিক কি না, তা নিয়ে নানান প্রশ্ন উঠে গেছে। এই হয়রানি নিয়েও কথা হয়েছে, কিন্তু প্রধান বিচারপতি বারংবার বলে গেছেন, কোনওভাবেই এই প্রক্রিয়া বন্ধ করা যাবে না। তিনি মেনে নিয়েছেন মানুষের হয়রানি হচ্ছে, তার জন্য তিনি বেশ কিছু পন্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেন, কিন্তু নির্বাচন কমিশন আদৌ কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব পরীক্ষা করতে পারে কি না সেই রায় তিনি স্থগিত রাখেন। অন্য আরো একজন যে বিচারপতি এই মামলা শুনছিলেন, ঘটনাচক্রে তিনি বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও এবং বাঙালির নামের পদবী সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী স্পষ্ট করলেও, এই ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ বা যৌক্তিক অসঙ্গতি যে একেবারেই অযৌক্তিক তা স্পষ্ট করে বলেননি।ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেছে চূড়ান্ত তালিকা থেকে, যাঁরা এবারের বাংলার নির্বাচনে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হল, প্রধান বিচারপতি এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেছেন, এইবার ভোট দিতে না পারলেও পরের বার দিতে পারবেন এই মানুষেরা। সঙ্গে আরো বলেছেন, যে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে নাগরিকত্বের কোনও যোগ নেই। এই ২৭ লক্ষ মানুষকে বলা হয়েছে ট্রাইবুনালে আবেদন করতে। ততদিনে কমিশন নির্বাচন ঘোষণা করে দিয়েছে। দেখা গেছে প্রায় ৩৪ লক্ষ মানুষ ঐ ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন। তারপরে নির্বাচন হয়েছে এবং বিজেপি ২০৫টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে।তারপরে আরো অনেক ঘটনা ঘটেছে। তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙেছে। যে মানুষটি নিজে একটা রাজনৈতিক দল তৈরি করেছিলেন, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দল ধরে রাখতে পারেননি। কিন্তু সেইসব বাদ দেওয়া গেলেও ঐ বাদ যাওয়া মানুষদের কথা সবাই ক্রমশ ভুলতে বসেছে। তারপরে নতুন করে আবার এই বিষয়টা এখন সামনে আসা শুরু হয়েছে। নতুন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বাদ যাওয়া মানুষদের আর কোনও সরকারি সুযোগ সুবিধা দেওয়া যাবে না। রেশন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সুবিধা কোনটাই যেন এই ভোটার তালিকা থেকে জোর করে বাদ দেওয়া মানুষেরা না পান, সেই নির্দেশিকা জারি হয়েছে। তার মধ্যে বিদেশ মন্ত্রক থেকে বলা হয়েছে, যে পাশপোর্ট থাকা মানেই সেই ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক তা প্রমাণিত হয় না। হয়ত এই আইন আগেও ছিল, কিন্তু এই সময়ে এই কথা বলা এবং টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদকের সাম্প্রতিক বার্তা দেখিয়ে দেয়, অলিখিত ভাবে হলেও দেশের সরকার ঐ ভোটার তালিকাকেই প্রামাণ্য নথি হিসেবে ধরছেন।হয়ত রাজাগোপাল তাঁর নিজের সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারবেন। তাঁর সেই সামাজিক সুবিধা আছে, কিন্তু যে অসংখ্য মানুষের নাম বাদ গেছে, তাঁদের কী হবে? তাঁদের সম্পর্কে সিপিআইএমএল এবং সিপিআইএম ছাড়া কংগ্রেসও এখনো কোনও জোরালো কিছু বলেনি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভোটার তালিকা থেকে যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের সব ধরনের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে। বাংলায় এই প্রক্রিয়াটি চলছে এবং এরপর হিন্দি-বলয়ের বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতেও এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এর ফলে কেবল মুসলিমরাই নয়, বরং বহু দরিদ্র পরিবারও মারাত্মক পরিণতির সম্মুখীন হচ্ছে। এটি কোনো সাম্প্রদায়িক সংঘাত নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি একটি শ্রেণি বা জাতিগত (বর্ণভিত্তিক) ইস্যু। তাছাড়া, রাষ্ট্র এবং তার মদতপুষ্ট শক্তিগুলো যখন সংখ্যালঘু ও সামাজিকভাবে বা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করে, তখন তাকে আর কেবল 'সংঘাত' বলা চলে না। জেনে রাখুন, বৈষম্যের মাত্রা আরও এক ধাপ বেড়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলো ছাড়া ভোটাধিকার থেকে বাদ যাওয়া মানুষদের নিয়ে কথা কে বলবে? সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতও এই বিষয়ে এখনো অবধি কোনও কথা বলেনি। তাহলে এই মানুষদের কী হবে, এই বাদ যাওয়া মানুষেরা তবে কি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়েই থেকে যাবেন? জনগণনা থেকে তাঁরা বাদ পড়বেন না তো? একটা ‘অযৈক্তিক’ যুক্তি এত মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে, আর রাজনৈতিক দলগুলো কিচ্ছু করবে না?
    মধুবাতা ঋতায়তে - শারদা মণ্ডল | ছবি - Imagen 3ছাঁচনপুরের আত্মবিশ্বাসের কথাই যদি উঠলো তবে আর একটা আত্মবিশ্বাসের গল্প শোনাই। ঘটনাটা আমার ভৌগোলিক জীবনে অনেক দিক থেকেই খুব স্পেশাল। প্রথম ব্যাপার হচ্ছে সেই প্রথম আমি নিজের কলেজের সঙ্গে না গিয়ে অন্য কলেজের ছাত্রীদের সঙ্গে ফিল্ডে গিয়েছিলাম ফিল্ড এক্সপার্ট হয়ে। দ্বিতীয়ত এই যাওয়াটার সঙ্গে আমার শৈশবের আশাপূরণের একটা যোগসূত্র ছিল। ব্যাপারটা একটু খুলেই বলি। আমি আসলে নিবেদিতা ইস্কুলের ছাত্রী ছিলাম। সেই কবে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হলাম - সনটা ১৯৭৭। শুধু তো আমি নই, আমার বোন, আমার মা, আমার মেজ মাসি, আমার ছোট মাসি - সব্বাই নিবেদিতা ইস্কুলে পড়েছিল। আমাকে ধরে মাতৃকুলে তা সে চার প্রজন্মের সম্পর্ক। আমরা যখন ছাত্রী, সেই সময়ে ক্লাস নাইনে মেয়েদের ইস্কুল থেকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হত। অঙ্কের শিক্ষিকা ছিলেন শুক্লাদি। তাঁর স্বামী বিখ্যাত পর্বতারোহী প্রাণেশ চক্রবর্তী। তিনি নিয়ে যেতেন পুরুলিয়ার মাঠাবুরু ক্যাম্পে। আজও আন্তর্জাল জুড়ে তাঁর অজস্র কীর্তি, বহু রোমহর্ষক পর্বতাভিযানের রিপোর্ট ছড়িয়ে আছে নানান ওয়েবসাইটে। ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজনে তাঁর লেখা একটি বইয়েরও হদিশ পেয়েছিলাম - আড়াইশো পাতার বাংলা বই - হিমালয় ভ্রমণ গাইড - পাবলিশার মিত্র ঘোষ। পড়ার খুব ইচ্ছেও হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দেশে যা হয় - প্রেজেন্টলি আনঅ্যাভেলেবল। জীবনে সব আশা পূরণ হয়না। আমারও হলনা। আমি যখন নাইনে উঠলাম, কীজানি হয়ত প্রাণেশ স্যার কোন কঠিন অভিযানে বাইরে ছিলেন। তাই আমরা গেলাম শান্তিনিকেতনে। বন্ধুদের সঙ্গে সেই প্রথম বেরোনো, আনন্দ খুবই হয়েছিল - সালটা ১৯৮৫। কিন্তু ৮৭ সালে আমার দুবছরের ছোট বোন মাঠা ক্যাম্পে গেলো। তাঁবুতে থাকল, খড়ের ওপর বাড়ির কম্বল পেতে। ক্লান্ত শরীরে একদিন ফিরে দেখল ওর বিছানায় ধেড়ে কুকুর শুয়ে আছে। তাকে বার করে দিয়ে বোন শুয়ে পড়ল। একটা মাত্র কলাই করা মগ - তাতেই চা খাওয়া, আবার তাতেই প্রাতকৃত্যের পর জল শৌচ। আসলে পাহাড়ে চড়তে গেলে ন্যূনতম লাগেজ দরকার - বাড়তি আরাম চলেনা - বোন সেটাই শিখে এলো। তার ওপরে দড়ি ধরে কেমন করে উঠলো, নামতে গিয়ে কেমন দড়িতে ঝুলে গেলো, বড় বড় চোখ নাচিয়ে তার বর্ণনা দিতে লাগলো ঘুরে ঘুরে। তার বাক্য - ঝর্নার গতি যত প্রবল হোল, তার চেয়ে দুর্বার গতিতে বেড়ে চলল আমার আফশোষ। শ্রুতির স্মৃতি আর আশার কুহক, দুইয়ে মিলে কুয়াশা ঘেরা মাঠাবুরু আমাকে কেবলই তার দিকে টেনে নিয়ে গেলো মনে মনে। সশরীরে যেতে না পারলেও, একবার প্রাণেশ স্যার ইস্কুলে পর্দা টাঙিয়ে পাহাড়ে চড়ার স্লাইড দেখিয়েছিলেন - সেদিন দেখেছিলাম। জল নেই, ইঁট সাজিয়ে তার মধ্যে শুকনো পাতা ভরে আগুন জ্বালিয়ে কেমন করে চট জলদি ডিম সেদ্ধ করা যায়। জল নেই তো কী! ডিমগুলো বালি কাদা ধুলো মাখিয়ে আগুনে ফেলে দিলেই হোল। সেই কবেকার কথা, স্মৃতি এখনও কেমন জ্বলজ্বলে। আসলে আমি এমন পাহাড় পাগল কখনোই হতাম না। দোষ আমার নয়। দুজন ভূগোলের দিদি ছিলেন, কাকলিদি আর মানসীদি। দুজনে মিলে ফাইভ থেকে টেন - ছ বছর ধরে হিমালয়, আল্পস, রকি, আন্দিজ করে করে আমার গোলা মাথা একেবারে তালগোল পাকিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর আর কী! কেরিয়ার, সংসার - নানা কাজের চাপে আর সময়ের খাপে মানাতে মানাতে মাঠাবুরুতে রক ক্লাইম্বিং ক্যাম্প আমার স্বপন থেকে অবচেতনে স্থান নিল। জীবনে কিছু প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি, গড়ন ভাঙনের গল্প না থাকলে জমেনা। ধীরে ধীরে চাকরি জীবন চলে গেলো কুড়ি কুড়ি বছরের পার, উঁহু, কুড়ি তো নয় পঁচিশ। মা বাবা গত হবার পর, আবার আমি শৈশবের স্বাদ পেতে ইস্কুলের দিকে ফিরলাম। প্রাক্তনী সভার সদস্য হলাম। নিবেদিতা হেরিটেজ মিউজিয়ামে যাতায়াত শুরু করলাম। আর সেখানেই ঘটে গেলো এক আশ্চর্য ঘটনা। অশেষপ্রাণা মাতাজী আমাকে বিবেকানন্দ বিদ্যাভবনের তিরিশজন ছাত্রীকে নিয়ে পুরুলিয়ার মাঠাবুরু ক্যাম্পে যাবার অনুরোধ করলেন। চমকে উঠলাম - এও কি সম্ভব? ১৯৮৫ সালে যা নিয়ে আফশোষ ছিল, সেই সুযোগ কি তবে চার দশক পরে মানে ২০২৫ এ সত্যি সত্যি এলো? সুযোগ ছাড়ার কোন প্রশ্নই ছিলনা। আমাদের নিবেদিতা হেরিটেজ মিউজিয়ামের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে ডানা মেলেছে একটি প্রতিষ্ঠান যা হয়তো একদিন মহীরুহ হয়ে উঠবে - নীহার - নিবেদিতা ইন্সটিটিউট অফ হিউম্যান অ্যাডভান্সড রিসার্চ। নীহার একটি প্রকল্প শুরু করেছে - লীডারশিপ কোর্স। আমাদের মেয়েগুলির মধ্যে কাদের সঠিক নেত্রী হয়ে ওঠার দক্ষতা বা মানসিকতা আছে তাদেরকে চিনে নিয়ে সঠিক ভাবে পথ দেখানোই নীহারের এই লীডারশিপ কোর্সের কাজ। এই কোর্সের কতটা সম্ভাবনা আছে, তা খতিয়ে দেখার পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু হয়েছে বিবেকানন্দ বিদ্যাভবন কলেজে। একদিন আমার মাও ঐ কলেজ থেকেই পাশ করেছিলেন। এই কলেজের পঞ্চম অর্ধবর্ষের তিরিশজন মেয়ে এই কোর্সের প্রথম ছাত্রী। দস্তুরমতো ইন্টারভিউ করে এদের বেছে নেওয়া হয়েছে। এই কোর্সের অঙ্গ হিসেবে মাঠা পাহাড়ে ক্যাম্প হোল দুদিনের। সেই ক্যাম্পেই সঙ্গে চললাম আমি। হাওড়া স্টেশন থেকে রাতে আদ্রা চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার ধরে ভোরে নামলাম বরাভূম স্টেশনে। সেখান থেকে গাড়ি করে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্যে। মাঠা পাহাড়ের পাদদেশে এই রিসর্টটির নাম হল পাতালঘর। মেয়েরা রইল তাঁবুতে। আধখানা চাঁদের মত চেনটানা তাঁবুর মধ্যে দুটি করে বিছানা পাতা। কলঘরের জায়গাটি পাশেই, একটুখানি হেঁটে যেতে হয়। আর আমরা দিদিমণিরা রইলাম তাঁবুর মুখোমুখি হবিট হাউসে। এগুলোও দেখতে আধখানা চাঁদেরই মত, তবে কিনা পাকা ঘর, লাগোয়া কলঘর। ঘরে যেটুকু না থাকলে নয়, ততটুকুই পরিকাঠামো রয়েছে। ঘরের চালে মাটির পরত, তার ওপরে ঘাসের চাষ করা হয়েছে। জনপ্রিয় পশ্চিমী শিশু সাহিত্যের কাল্পনিক চরিত্র এই হবিট, যারা মাটির তলায় গর্ত করে থাকে। বিশ্ব জুড়ে ন্যূনতম স্বাচ্ছন্দে গড়া পরিবেশ বান্ধব এই হবিট হাউসগুলি পর্যটনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ বহু মানুষই এখন প্রাচুর্য, বাহুল্য ছেড়ে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে সাধারণ ভাবে কয়েকটা দিন কাটাতে চায়। শুনলাম, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম হবিট হাউস এই পাতালঘর, বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে তৈরি করা হয়েছে। দরকার মত কম বেশি তাঁবু খাটিয়ে দেওয়া হয়, আর হবিট হাউস আছে সাতটা। সেখানেও দুজন বা তিনজন করে আরামসেই থাকা যায়। রান্নাঘর আর খাবার জায়গা আলাদা। কাউন্টার থেকে নিজেকে খাবার নিয়ে আসতে হয়। পরিবেশনের বন্দোবস্ত নেই। পানীয় জল কোন ফিল্টার ছাড়া অবিশ্বাস্য ভাবে স্বাস্থ্যকর, সমস্যা একটাই ঐ জলের গুণে খুব খিদে পেয়ে যায়। যাই হোক চারপাশের বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য ইত্যাদি দেখার সময় মিললোনা, কারণ ট্রেনিং শুরু হয়ে গেলো। মেয়েদের দেওয়া হোল পনের মিনিট সময়, যার মধ্যে যে যার তাঁবুতে ঢুকে, ব্যাগ রেখে, আর কিছু বন্দোবস্ত করে লাইনে দাঁড়াতে হবে। তবে জুতো থাকবে তাঁবুর বাইরে। কেবল রাতে জুতোজোড়া তাঁবুতে ঢুকিয়ে নিতে হবে। না না দুষ্টু মানুষের ভয় এখানে নেই, তবে কোন বন্য জন্তু ভালোবেসে যদি মুখে করে এক পাটি বা দুটো পাটিই নিয়ে যায়, তার দায় কর্তৃপক্ষের নয়। পাশে কলঘরে গিয়ে চোখেমুখে জল দিয়ে আসতেই পারে, তবে তাতে সময়ের ছাড় নেই, তাই অতটা ঝুঁকি না নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের মেয়েরা বুদ্ধিমতী, তারা ও পথ মাড়ালোনা। কিন্তু আমরা? মেয়েরা পনের মিনিট হলে তাদের ম্যামেরা কি পনের ঘন্টা সময় নিতে পারে? আমরাও ভুরু কুঁচকে তিরিশ মিনিটে মাঠে পৌঁছলাম। মাঠে ততক্ষণে খাটানো হয়েছে এক খাড়াই দড়ির জাল। নীচ থেকে প্রথমবার ওপরে তাকালে জ্যাকের বীনস্টক গাছে ওঠা মনে পড়ে যায় বটে। আমাদের মেয়েরা সারি দিয়ে দাঁড়িয়েছে একে একে সেই জাল বেয়ে আকাশের কাছে পাড়ি জমানোর জন্য। তাদের কারোর চোখে অভিযাত্রীর আহ্লাদ তো কারোর করুণ দৃষ্টিতে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচির আকুতি। দেখলাম পেল্লাই গাছেদের শরীর আর শক্ত শক্ত খুঁটির সঙ্গে বাঁধা ঐ জাল, দুপাশে দক্ষ ট্রেনারদের বজ্র মুঠি আর তীক্ষ্ণ নজরের আওতায় রয়েছে। পান থেকে চুন খসার জোটি নেই। দর্শক আমরা চারজন - বড় মাতাজী, ছোট মাতাজী, সঙ্গে বৈশাখী আর আমি দুই দিদিজী। বৈশাখীও আমার মতই আর একটি কলেজের ভূগোলের দিদিমণি। সেদিন মাঠা পাহাড়ের আকাশ বড় নীল, পাহাড় বড় সবুজ, কাঁচা হলুদ সর্ষে ফুলের মত রোদ বুঝি সবার কানেই বাঁশি বাজাচ্ছিল। একটা মিঠেকড়া ঠান্ডা বাতাস সোয়েটার চাদরের ভিতর দিয়ে খালি লুকোচুরি খেলছিল। বাতাসে বন তুলসীর ঝাঁজ - এমনি দিনে মানুষের মুখোশ খুলে মুখ বেরিয়ে পড়ে। পাকা চুলের পর্দা সরিয়ে মুখ বাড়ায় কিশোরী মন। ২০২৫ কে সরিয়ে রেখে এতদিন বাদে বেরিয়ে পড়ে ১৯৮৫। মাথার দুপাশে পুঁচু পুঁচু বেণী বেঁধে তাতে অপটু হাতে লাল ফিতে বাঁধা শারদা মেয়েদের লাইনে দাঁড়ায় জাল বাইবে বলে।হলদে রোদের মিশেল দেওয়া হলুদ রঙের মোটা আর শক্ত প্লাস্টিক দড়ির জাল। আমি প্রাণপণ চাইছিলাম সবটুকু শিখে নিতে, আসলে এমন সুযোগ আর কোনদিনও আসবে কিনা জানা নেই, তাই চাইছিলাম যা কিছু ঘটছে তার সব কিছু শুষে নিতে। তিনটি উপকরণ - হেলমেট, হারনেস আর ক্যারাবিনার। আমার মাথায় যখন লেডী ট্রেনার হেলমেট পরিয়ে দিলেন, আমার মনে মনে হাসি পেল। শিক্ষার্থীর পা পিছলে মাথা ছাতু হবার ভয় আছে ওঁদের। কিছু হয়ে গেলে জবাবদিহি করতে হবে যে। তবে নাঃ আমার একটুও ভয় করছেনা। চিরকালই পরীক্ষা সামনে এলে কেমন একটা উল্লাস হয় আমার। হেলমেটের পর হারনেস বাঁধা - মহিলা এতটাই কষে সেটি আমার কোমরে বাঁধলেন যে আমি একেবারে ককিয়ে উঠলাম। পেট - কোমরটি যে আর ১৯৮৫ র নেই, তার চারিদিকে তেল-ঘি-মাখন-চীজ - আরো কতকিছুর থাক থাক মেখলা। কোমর বন্ধনীটির একটি অংশ পাদুটোকে গোল গোল ফাঁসের মত আটকে রেখেছে। অর্থাৎ যদি কিছু ঐ পিছলানো টিছলানো (ভগবান না করুন) - তবে ওই ফাঁসে আটকে মোটামুটি পাখি হয়ে ডানা ঝাপটানো যাবে। তবে মেখলা - বন্ধনী যা কিছুই থাক, দড়ির জালের এপাশ ওপাশ টানা দড়িটি দুপাশের ট্রেনারদের হাতে বন্দী। ঐ দড়িটিই লাইফ লাইন - সেটা আবার আমার বন্ধনীটির সঙ্গে একটি মোক্ষম ক্লিপ দিয়ে আঁটা। আর এই ক্লিপটাই হল ক্যারাবিনার - যার ভরসায় আমি মেঘের দিকে মোর তনু - ক্যারাভান লয়ে পাড়ি দেব। আসলে ছাত্রীরা কেমন করে উঠছে, কী কী ভুল হচ্ছে, কোনভাবে ওঠাটা ঠিক, শিক্ষকরা কী নির্দেশ দিচ্ছেন, এগুলো আমি নিবিষ্ট মনে দেখছিলাম। কিন্তু দেখে শেখা এক, আর ঠেকে শেখা আরেক। দেখে শিখলাম যে, জালের দিকে মুখ করে দাঁড়াও, জালের ঠিক গ্রন্থিগুলোতে পা দিতে হবে, তা নইলে জোর পাবেনা। হাত দিয়ে জাল ধরবে, কিন্তু হাত থাকবে কাঁধের লেভেলের ওপরে - নইলে শরীরের ব্যালেন্স থাকেনা। এবারে উঠতে গিয়ে দেখি জাল থলথল, হাওয়া খলবল, পা টলটল, ঘাম গলগল, বুক ধকধক, হাঁটু ক্যাঁচকোচ, কাঁধ খিঁচমিচ - এমনতরো কত কী? কিন্তু নীচের ঢালু অংশটা পেরোনোর পর খাড়া অংশটায় যেতে যেতে ছন্দটা বুঝে গেলাম। একেবারে টিকটিকির মত - ডান হাত আর ডান হাঁটু তোলো, তারপর বাঁ হাত বাঁ হাটু ডানদিকের চেয়ে উঁচুতে তোল - কেল্লা ফতে। আবার উলটো দিকে একই নিয়মে নেমে এলাম কোন মতে। এদিকে হাঁফানো, ওদিকে আনন্দে লাফানো, সে আমার সসেমিরা অবস্থা। ট্রেন ধরার আগের দিন পর্যন্ত ধুঁকছিলাম - যেতে কী পারবো? এত বড় দায়িত্ব, নেওয়া কি উচিত হবে? এখন দেখছি, আমার শরীরে যত ব্যাথাবুথা সব উধাও। কতদিন পরে আমার আমিকে নিজের করে ফিরে পেলাম! সব চেয়ে বড় হল আমি পেরেছি - আমি পারি - পৃথিবীর যে কোন সমস্যা সামনে আসুক না - লড়কে লেঙ্গে মেরা খোয়াবিস্তান। মেয়েদের মোবাইল ফোন জমা দিয়ে দিতে হয়েছিল। আমরা টীচার বলে ছাড় ছিল। কিন্তু খানিকটা স্বেচ্ছাতেই দিনের বেশিরভাগ সময়ে ও জিনিসটিকে ত্যাগ দিয়েছিলাম। আর দিয়েছিলাম বলেই প্রতি মূহূর্তে ছবিছাপা দিয়ে আপডেট দেওয়া আর আপডেটেড হয়ে থাকার বালাই ছিলনা। প্রকৃতির কোলে সত্যি সত্যি শান্তি আর আরাম উপভোগ করছিলাম। শরীরে যতই পরিশ্রম হোক, এ হল “প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি”। একটা দিনে কত যে কাজ হল, আমরা নিজেরাই অবাক। এই ধরা যাক - দড়ির ব্রিজ পেরোনো। জিপ লাইনিঙের মত হারনেস ক্যারাবিনারের ভরসায় ঝুলে ঝুলে জলা পেরোনো - যার পোষাকী নাম - রিভার ক্রসিং। রাতে ঠান্ডা ঘন হয়ে আসে। অন্ধকারের হাত ধরে আকাশ মাটির সীমানা মুছে বন যেন কাছে আসে, হাওয়ার ঝোঁকে ফিসফিসিয়ে ও কী কিছু বলে যায়? শহরের মত লেট নাইটের সুযোগ এখানে নেই। ঘড়ি ধরে খেতে বসা, নিজেই কাউন্টার থেকে খাবার নিয়ে আসা, আবার খাওয়া শেষে থালা বাটি মেজে রাখা পরের দিনের ব্যবহারের জন্য। কোন দাও, লাও এর ব্যাপার নেই - “আপনা হাত জগন্নাথ, করবে ভাই বাজিমাৎ”। বিছানায় যাবার আগে অভ্যাস মত ডায়রি নিয়ে বসি। এই পাহাড়ে চড়ার ট্রেনিঙের সঙ্গে আমার জীবনে আর একটা জিনিস ঘটে গেছে। আসলে যে কলেজের সঙ্গে এসেছি সেটা তো আমার নিজের চেনা কলেজ নয়, তাই ছাত্রীদের ওপরে শিক্ষক হিসেবে সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ছিলনা। যেটা ফিল্ডে খুব দরকার। তাই আমি প্রথম পরিচয়েই বলে নিয়েছিলাম যে যেহেতু আমি এককালের রামকৃষ্ণ সারদা মিশনের ছাত্রী, তাই তোমাদের মত আমি এই ক্ল্যানেরই সন্তান। এটা বলেছিলাম যাতে ওরা আমাকে অ্যাকসেপ্ট করে নেয়। আসলে ওদের কাছে তো আমি বহিরাগত। তাই স্ট্র্যাটেজিক ইনসাইডার হয়ে ওঠার তাগিদে এই অস্ত্র প্রয়োগ করেছিলাম, আমার আর ছাত্রীদের মাঝখানের প্রাতিষ্ঠানিক ভয়ের আর অচেনার প্রাচীরটা যাতে ভেঙে যায়। দেখলাম এতে আশ্চর্য কাজ দিয়েছে। ওরা আমাকে আর ‘নজরদার’ বা নিয়ন্ত্রক ভাবছে না, বরং ভাবছে নিজেদেরই একজন। মাঠাবুরুতে দেখলাম ওরা আমাকে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর নয়, সিনিয়র দিদি ভেবে নিয়েছে। কাছে আসছে, টীচারদের কাছে যেকথা গোপন করতে হবে সেটারও সাহায্য চাইছে, তুমি তুমি করে কথা বলছে। এটা আমার কাছে একটা সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। আমার নিজের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মনের টান, তথ্য বিনিময় স্বাভাবিক ভাবেই অনেক বেশি। কিন্তু সেই সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ক্লাসরুম, যেখানে ক্ষমতার হায়ারারকি বা ধাপ আছে - শিক্ষক ওপরে, স্টুডেন্ট নিচে। ভূগোলের শিক্ষক হিসেবে আমি হয়তো এতদিন ফিল্ডে ‘কন্ট্রোল’ বা শাসনকেই সবচেয়ে জরুরি মনে করেছি। শাসনের দরকারও আছে। আজকাল যা দিন পড়েছে, ছেলেমেয়েরা প্রকৃতির কাছ থেকে কিছু শিখুক আর না শিখুক, পরিবার বা সমাজের কাছ থেকে একটা মোক্ষম কথা খুব ভালো করে শিখে যায়, যে প্রকৃতির কাছে গেলে মাদক নিয়ে নেশা করতে হয়। এই পিয়ার প্রেশার এতটাই যে যারা এর মধ্যে ছিলনা, তারাও ঢুকতে বাধ্য হয়। মুক্ত প্রকৃতি হয়ে ওঠে একধরণের লিমিনাল স্পেস' - বা ‘সীমান্তবর্তী মুক্ত অঞ্চল’ - যেখানে কেউ চেনেনা, যা খুশি করা যায় - এক ধরণের ছদ্ম স্বাধীনতার জায়গা। মিশনের এই ছাত্রীদের নিয়ে বিশেষ করে পাহাড় চড়া ক্যাম্পে এধরণের কোন আশংকা নেই। তাই ছাত্রীদের সঙ্গে শাসন নয় সখ্যতা - বেশ উপভোগ করছি। এইসব সময়ে মনে আরও আকাশ পাতাল সব চিন্তা আসে। আজকে শিখলাম দড়ির জাল বাওয়া, দড়িতে হাঁটা আর দড়িতে ঝুলে নদী পেরোনো। কোনো দুর্গম জায়গায় সার্ভে করতে গেলে অথবা কোন ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের সময়ে এইসব স্কিল খুব কাজে লাগে। একটা সময়ে খুব ভাবতাম যে আমি আমার স্যার মনতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাষ রঞ্জন বসু, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মত বা তাঁদের স্যার থর্নবারি, উলরিজ মরগ্যান বা ডেভিস, পেঙ্কের মত পাহাড় নদী চষে বেড়াতে পারিনি। নতুন কিছু আবিষ্কার করতে পারিনি। মনে খুব আফশোস হত। কিন্তু ধীরে ধীরে যতই ক্রিটিকাল বা তারও পরে পোস্ট মডার্ন ভূগোলের সংস্পর্শে এলাম তখন আবার ভাবনাটা খানিকটা বদলে গেল। অনুভব করলাম যে এবল বডিড মেল না হয়েও আমি আমার জীবনে এই পৃথিবীকে দেখেছি এক সংবেদনশীল নারীর চোখে। এটাই বা কম কী! আসলে উইলিয়াম মরিস ডেভিস, ওয়াল্টার পেঙ্ক, ডব্লিউ ডি থর্নবারি বা সি ডব্লিউ উলরিজদের মতো ভূবিজ্ঞানীরা—কিংবা আমাদের বাংলার শ্রদ্ধেয় মনতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাষ রঞ্জন বসু বা সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্যারেরা যে সময়ে ভূগোল চর্চা করেছেন, তখন বিষয়টার মূল ধারাটাই ছিল পজিটিভিসম (প্রত্যক্ষবাদ) এবং জিওমরফোলজি কেন্দ্রিক। তারও আগে উনিশ শতকে ভূগোল ছিল মূলত পুরুষালি অ্যাডভেঞ্চার এবং যেন একটা সাম্রাজ্য বিস্তারের হাতিয়ার। ধরে নেওয়া হতো, ভূগোল মানেই হলো একজন ‘এবল-বডিড মেল’ বা শারীরিকভাবে শক্তিশালী পুরুষ দুর্গম পাহাড়ে চড়বেন, নদী চষে বেড়াবেন, মানচিত্র আঁকবেন আর নতুন জায়গা ‘আবিষ্কার’ বা জয় করবেন। প্রকৃতি তখন যেন ছিল একটা জ্যামিতিক বস্তু। আর আমি যে আফশোষে ভুগছি, তা আসলে আমার ব্যক্তিগত খামতি নয়, শত বছরের তৈরি করা একটি পুরুষতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যার জন্য আমি নিজেই নিজেকে ‘অভিযাত্রী’ আইডেন্টিটি দিতে পারিনা, মানে কুণ্ঠাবোধ করি। হবিট হাউসের বাইরের আকাশ এখন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। আকাশে চাঁদ নেই, তাই হাজার তারার আলো। সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। চলবে...
    রুশ টি সেট আর পেয়ারাতলায় মেম বৌমা - স্মৃতি ভদ্র | অলংকরণ: রমিতছায়া দোলানো দুপুর হোক কিংবা নিহার জড়ানো সন্ধ্যা, বড়ঘরের লালবারান্দা আসলে কখনই বিরান হতো না। সাংসারিক কাজের অবসরে খানিক জিরিয়ে নেওয়ার অজুহাতে অথবা উনুনপাড়ের নুনতেলের গন্ধ গা থেকে মুছে নিজেকে একটু পরিপাটি করে তোলার ইচ্ছা---সেই লাল বারান্দাই হয়ে উঠতো সকলের একমাত্র গন্তব্য। নেহাতই লালমেঝের একহারা বারান্দা। তাতে ঐশ্বর্য বলতে দিনের নানাসময়ে নানারকম ছায়ার আল্পনা ছাড়া আর কীইবা ছিল। কখনও বাইরবাড়ির দেবদারু বাগানের নিছিদ্র ছায়া আবার কখনও প্রকান্ড বরইগাছের আড় পেরিয়ে পেয়ারাগাছের মাথাদোলানো ছায়া, ব্যস্ অতটুকুই। তবুও সে বারান্দা নিজ মহিমায় আমাদের বাড়ির সৌখিন স্থান হয়ে উঠেছিলো নির্দ্বিধায় তখন। কিন্তু সৌখিনতা শব্দটির সঙ্গে তখনও পরিচয় হয়নি আমার। সময়ের সরল রৈখিক পথ ধরে চলতে গিয়ে চারপাশে যা কিছু মিলতো সবই তখন আমার কাছে জীবনের নামান্তর। আর সে পাওয়ায় কখনও বাহুল্য ছিল না। তাই নকশা কাটা কাঠের দুটো থাম, দেয়ালে হেলান দিয়ে নির্ভার দাঁড়িয়ে থাকা ক'খানা পিঁড়ি আর পেতলের ঘটি ভরা জল। এতটুকুই। আমাদের বাড়ির লাল বারান্দার এক জীবনঘনিষ্ঠ ছবি। তবুও সেই সাধারণ বারান্দায় জ্বলজ্বল করতো বাড়ির সকল অন্তরঙ্গ আনন্দ। এজন্যই মনে হয় ঠাকুমা সে বারান্দার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিতেই নকশিকাটা কাঠের থামে ঝুলিয়ে দিয়েছিলো রাশিয়ান ডিম্বাকৃতির একটা আয়না।শুধু অতটুকুই সংযুক্তি। তাতেই সেই লাল বারান্দা সাজঘরের গৌরবটুকুও গায়ে জড়িয়ে নিয়েছিলো অক্লেশে। প্রতিদিন সকালে নিত্যপূজা শেষে নাকে-কপালে তিলক আঁকা ঠাকুমা উনুনের আগুনদিনে পা বাড়াবার আগে সে আয়নায় সামনে দঁড়িয়ে চুলের খোঁপায় আরেকপ্রস্ত চিরুনী বুলিয়ে নিতো বেশ যত্ন করেই। আবার আগুন ঘামে তিলক গলানো সময় ফুরালে কলঘর থেকে কসকো সাবানের ঘ্রাণ সারা উঠোন ছড়িয়ে যখন লাল বারান্দায় এসে দাঁড়াতো ঠাকুমা, তখনও ওই রাশিয়ান আয়নাই ঠাকুমার প্রতিচ্ছবি হয়ে হেসে উঠতো সারাদিনের প্রতীক্ষা শেষে। এরপর তিব্বত স্নো...তিব্বত ট্যালকম পাউডার…তর্জনীর ডগায় ভরিয়ে সিঁদুরের টিপ…উঠোনজুড়ে ঠাকুমার ঘ্রাণ। আর লাল বারান্দায় থামে ঝোলানো আয়নায় পরিমিত লাবণ্যময়তার এক টুকরো স্নিগ্ধ সময়। এরপর বারবেলার নিরালা দুপুর। লালবারান্দায় পশ্চিম আকাশের তেজ কমে আসা রোদ। বরইগাছের গায়ে উটকো বাতাস। ভুল করে উড়ে আসা ডালিমগাছের ঘরছাড়া ফুল। লো ভলিউমের রেডিওর অবিছিন্ন বার্তালাপ। আর আমাদের ভাতঘুমের অপরিবর্তনীয় রুটিন। কিন্তু কিছু কিছু দিনে গড়পড়তা হিসেবেও টান পড়তো। নিরালা দুপুরের শ্রান্ত সময়ও হয়ে উঠতো নির্বাক চালচিত্রের স্থির অবকাশ। সেসব দুপুর ঠিক অন্য দুপুরগুলোর থেকে আলাদা হতো। চিরায়ত দুপুর থেকে সময় চুরি করে ঠাকুমা কাঠের বাক্স থেকে টেনে বের করতো বেশ বড়সড় একটা এ্যালবাম। সাদাকালো ছবির এ্যালবাম। তার পাতা উল্টাতেই থেমে যেতো ঠাকুমার সময়। একদৃষ্টি। লুকোনো দীর্ঘশ্বাস। আর আড়ষ্ট আঙুলে ছুঁয়ে থাকা এ্যালবামের পাতা। দুপুরগুলো কেমন যেন নি:স্ব হয়ে উঠতো।সাহেব কাকু। সেই কবে রাশিয়ায় পড়তে গিয়েছিলেন। আর ফেরেননি। ফিরতো পোস্টাকার্ডের চিঠি, ফিরতো এ্যালবামের ছবি। সেই ছবিতে কতগুলো তরুণ তরুণী। কখনো তারা সমুদ্রের পাড়ে রৌদ্রস্নাত। কখনো পরিপাটি ঘরে আনন্দরত। প্রতিটি ছবিতেই সাহেবকাকুর পাশে পুতুলের মতো দেখতে এক তরুণী। আমার মেম বৌমা। সালটা আশির মধ্যভাগ হবে। হঠাৎ করেই পোস্টাকার্ডের কয়েকটা বাক্য আমাদের বাড়ির উৎসবের অজুহাত হয়ে উঠলো। উঠোনের অন্যপাশে সদ্য গড়ে ওঠা ঘরের দেয়াল বারবার ঝেড়েমুছে পরিস্কার রাখা, উপরের ঘর থেকে পেতলের বড় বড় হাঁড়িকুড়ি নামিয়ে সেসব ধুয়ে রোদে শুকিয়ে রাখা, ধুনুরি ডেকে শিমুল তুলায় বালিশ ভরা---সে এক মহাযজ্ঞ। কারো কথা বলার সময় নেই। দু-দন্ড বসে অবসর উৎযাপন নেই। শুধু আয়োজন আর আয়োজন। ঝুনো নারিকেলের তক্তি বয়ামে ওঠে, কুলের আচার রোদে পড়ে, তিলের কটকটি পাথরের থালে জুড়ায়---তবুও কাজ ফুরায় না।অবশেষে কিছু কাজ বাকী রেখেই বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালো সেই দিন। এসে দাঁড়ালো নীলচোখের রাশিয়ান মেম বৌমা। সৌখিনতা শব্দের সঙ্গে আমার পরিচয় ঠিক সেই মুহুর্ত থেকেই। ধানদূর্বায় বরণ আর লালঝালড়ের তালপাখায় আম্রপল্লব ছোঁয়ানো হাওয়ার আশীর্বাদ শেষে মেম বৌমা লাল বারান্দায় উঠতেই উঠোন ভরে গিয়েছিলো মানুষে। পাড়া পেরিয়ে, গ্রাম পেরিয়ে,, নদী পেরিয়ে সবাই দেখতে এসেছিলো মেম বৌকে। লম্বা জার্ণির ক্লান্তি জড়ানো চেহারায় জ্বলজ্বলে নীল চোখের মানুষটির হাসিমুখ বলে দিয়েছিলো অদ্ভুত সেই পরিস্থিতি আগে থেকেই অবগত করা হয়েছিলো তাঁকে। কেউ অকারণে হাসে, কেউ অবাক চোখে তাকায়, কেউ ছুঁয়ে দেখতে চায়, কেউ ইচ্ছে করেই টিপ্পনী কাটে---বুঝে কিংবা না বুঝেও মেম বৌমার সেই একই হাসিমাখা মুখ। কিন্তু তা আর কতক্ষণ! তাই মেম বৌ দেখার লৌকিকতা শেষে বাড়ির বৌ পা রাখলো বড় ঘরে। মধ্যবিত্ত বাঙালী ঘরে প্রবেশ হলো সীমানাহীন আন্তর্জাতিকতা। মিডি স্কার্ট পড়া মেম বৌ যখন নিত্যঠাকুরের সামনে দু'হাত কপালে ঠেকিয়ে অদ্ভুত বাংলায় উচ্চারণ করে,টাকুর...তখন হেসে গড়িয়ে পড়া নয়, আদর করে সামলে নেওয়া ঠাকুমা নিজের মাথায় ঘোমটা টেনে বলে ওঠে,রাধাগোবিন্দ...কাঁটাচামচ দিয়ে ইলিশমাছ খাবার বায়না দেখে চিতল মাছে কোরা এগিয়ে দিতে দিতে বলে ঠাকুমাই আবার ত্রাণকর্তা,নাতাশা বৌমা...ঝাল ছাড়া রান্না করেছি মিঠা করে...খাও...কিন্তু মেম বৌমা কি শুধুই বসে বসে এসব আপ্যায়ন নেবে? তা কীভাবে হয়। তাই সবার জন্য নিজে হাতে চা বানানোর বায়না ধরতেই মনিপিসি এগিয়ে এসেছিলো বন্ধু হয়ে। লালবারান্দায় কেরোসিনের স্টোভে নীল আঁচ উঠতেই তাতে বসেছিলো পেতলের খাবড়ি। জল ফুঁটে উঠতেই রাশিয়ান বিশেষ চা পাতা ঘ্রাণ ছড়িয়েছিলো বাড়ির সেই আনন্দময় দিনগুলোর গায়ে আরও একটু খুশি ছড়িয়ে দিয়ে।আর লাল বারান্দায় মহাসমারোহে বেরিয়ে এসেছিলো রাশিয়ান টি সেট। ফুলের ছবি আঁকা সেই টি সেট নাকি ছিল মেম বৌমার সৌখিন কালেকশনের একটি অংশ। বারানভকা নামের কোনো এক অচেনা জায়গা থেকে আগত সেই টি সেট আমাদের বাড়ির অন্যতন সৌখিন অনুসঙ্গ হয়ে উঠেছিলো সেদিন থেকে।তবে সত্যিকারের সৌখিনতা তো ছিল নীল চোখের রাশিয়ান মেম বৌ। কখনো লালপেড়ে গরদ শাড়ি আর কপালে সিঁদুরের টিপ পড়িয়ে বাঙালি বানিয়ে দেবার ইচ্ছা, আবার কখনো উঠোনের উনুনে আতপ চালের ঘি ভাতে কিশমিশ ছড়িয়ে দেবার অনুরোধ---সবকিছুতেই বাড়ির সকলের ছিল অন্য সংস্কৃতির মানুষটিকে বাঙালি বানিয়ে দেবার সুপ্ত আকাঙ্খা। আর মেম বৌ?নীল চোখের তারায় হাসি ভাসিয়ে ক'দিনেই হয়ে উঠেছিলো মধ্যবিত্ত বাড়ির সকলের সৌখিন আত্মীয়।
  • হরিদাস পালেরা...
    শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ঃ নিরপেক্ষ মূল্যায়নের সন্ধানে  - Sandipan Majumder | ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এক বিরাট ব্যক্তিত্ব। তার যথাযথ মূল্যায়ন করার প্রচেষ্টা যদি আগে না হয়ে থাকে তবে সেটা এখন করলে আপত্তির কিছু নেই। দেখতে হবে সেই মুল্যায়ন যেন যথাযথ ও বস্তুনিষ্ঠ হয়। স্তুতি আর প্রশংসার আড়ালে বড় মানুষদের সীমাবদ্ধতাগুলো লুকিয়ে ফেলা আমাদের জাতীয় প্রবণতা। যাঁরা ভোটের রাজনীতি করেন তাঁদের এই কাজটা বেশি করে করতে হয়।আবার উল্টোদিকের রাজনীতি যাঁরা করেন তাঁদের অকারণ নিন্দামন্দের আশ্রয় নিতে দেখা যায়। শ্যামাপ্রসাদ প্রসঙ্গেই একদল তথাকথিত বামপন্থী ফেসবুকার তাঁকে ব্রিটিশ অনুগত সাম্প্রদায়িক এক খলনায়ক সাজাবার চেষ্টা করে থাকেন যেটাও ভুল বলেই আমার মনে হয়েছে। মনে রাখতে হবে কংগ্রেস রাজনীতির বাইরে থেকে যে দুজন মানুষকে জওহরলাল নেহেরু তার মন্ত্রীসভায় স্থান দিয়েছিলেন তার মধ্যে একজন ছিলেন বি আর আম্বেদকার, আরেকজন শ্যামাপ্রসাদ ভট্টাচার্য। বাগ্মীতা,ব্যক্তিগত সততা, ব্যক্তিস্বার্থের উপরে উঠে কাজ করার দায়বদ্ধতা,, বিপরীত রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষদের সঙ্গে সংলাপ চালু রাখার ক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা--- শ্যামাপ্রসাদকে বাছার কারণ ছিল অনেক। আমি আমার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শ্যামাপ্রসাদের ডায়েরি যা তিনি অনিয়মিতভাবে লিখতেন এবং যা Leaves from a diary নামে প্রকাশিত সেটাকেই কেন্দ্রীয় ফোকাসে রেখেছি। কারণ একজন ব্যক্তির মতাদর্শ, পছন্দ অপছন্দ, স্ববিরোধিতা সবকিছু ডায়েরিতে অন্তরঙ্গভাবে ধরা পড়ে যা মানুষটিকে চিনতে সাহায্য করে। পাশাপাশি পরিপ্রেক্ষিত ব্যাখ্যা করার জন্য আমি জয়া চ্যাটার্জীর দুটি বই যা বামপন্থীদের কাছে প্রশংসিত এবং বিপরীত শিবিরের কাছে নিন্দিত – সেদুটির সাহায্য নিয়েছি। আমি যদিও জয়া চ্যাটার্জীর কোনো সিদ্ধান্ত এখানে সচেতনভাবেই গ্রহণ করিনি কিন্তু তথ্যগুলি নিয়েছি কারণ এটা সবাই স্বীকার করবেন যে এর চেয়ে বেশি তথ্যসমৃদ্ধ গবেষণা দেশভাগের ওপর আর হয় নি। পরিপ্রেক্ষিত----------------১৯১৯ সালে মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার অনুযায়ী ভারতে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা ( Diarchy) চালু করা হয় যেখানে ভারতীয়দের হাতে প্রাদেশিক আইনসভার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ১৯২৯ সালে লণ্ডনের নীতিনির্ধারকরা ঠিক করেন যে এই ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস দরকার,। ব্রিটিশরা ভারতীয়দের জাতপাত, ভাষা, ধর্ম এবং অন্যান্য আনুগত্যের অধীন সামাজিক নির্মাণের মধ্য দিয়েই দেখত, আধুনিক নাগরিকের সংজ্ঞার মধ্য দিয়ে নয়। তারা ঠিক করল যে আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব বিভিন্ন গোষ্ঠীস্বার্থ বিবেচনায় ভাগ করে দেওয়া হবে – মুসলিম, দলিত ( তখন Depressed class বলা হত ), শিখ, ইওরোপীয়, সাধারণ হিন্দু, জমিদার, শ্রমজীবী, মহিলা ইত্যাদি। এখানে মুসলিমরা মুসলিমদের নির্বাচিত করবে, হিন্দুরা হিন্দুদের, দলিতরা দলিতদের ইত্যাদি। এইজন্যই ১৯৩২ সালে ঘোষিত এই নীতির নাম সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা বা কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড। এই বাঁটোয়ারা কিন্তু কোন গোষ্ঠীর কত জনসংখ্যা তার দ্বারা কঠোরভাবে নির্ধারিত ছিল না। যেমন বাংলায় আইনসভার ২৫০ আসনের মধ্যে ইওরোপীয়রা পেয়েছিল ২৫ টা অর্থাৎ ১০ শতাংশ আসন যদিও তাদের জনসংখ্যা ছিল ১ শতাংশের কম। ১৯৩১ সালের জনগণনা অনুসারে হিন্দুরা ছিল জনসংখ্যার ৪৪ শতাংশ কিন্তু তাঁরা দলিত আসন সহ পেল মোটে আশিটি আসন অর্থাৎ মোট আসনের ৩২ শতাংশ। মুসলিমরা হিন্দুদের তুলনায় বেশি অনুপাতে পেল কিছুটা যদিও জনসংখ্যা অনুসারে তারাও কিছুটা কমই পেল। তাদের জনসংখ্যা ছিল বাংলার মোট জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশ কিন্তু আসন পেল ১১৯ টা অর্থাৎ ৪৭.৮ শতাংশ। এর আগে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থায় হিন্দুদের আসন ছিল ৪৬ এবং মুসলিমদের আসন ছিল ৩৯। এবার ব্যাপারটা উলটো তো হলই দলিতদের ১০ টি আসন বাদ দিলে সাবর্ণ হিন্দুদের আসন দাঁড়াল ৭০ অর্থাৎ ২৮ শতাংশ মাত্র। ফলে হিন্দু ভদ্রলোকশ্রেণী তখন থেকেই ক্ষমতা খর্ব হওয়ার ফলে বিক্ষুব্ধ হয়। কংগ্রেস দল কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড প্রসঙ্গে ‘ সমর্থনও নয়, বিরোধিতাও নয়’ – অবস্থান গ্রহণ করে। কংগ্রেস নিজেকে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি বলে দাবি করত। কমিউনাল অ্যাওয়ার্ডের বিরোধিতা করলে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে মুসলিমদের সমর্থন পুরোপুরি হারানোর ভয় ছিল কংগ্রেসের। কিন্তু বাংলা, পাঞ্জাব, সিন্ধ এবং উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে মুসলিমরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে অবিভক্ত বাংলার মত জায়গায় হিন্দু ভদ্রলোকশ্রেণীর মধ্যে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে যেটা বাংলার প্রদেশ কংগ্রেসের সংগঠনের অভ্যন্তরেও প্রতিফলিত হয়। এমনকি বাংলা কংগ্রেসের দুটি বিবদমান গোষ্ঠী ( যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত এবং সুভাষচন্দ্র বসু) একযোগে কমিউনাল অ্যাওয়ার্ডের বিরোধিতা শুরু করে। শ্যামাপ্রসাদ কলকাতা কর্পোরেশন এবং প্রাদেশিক বিধানসভায় নির্দল সদস্য হিসাবে হিন্দু স্বার্থবিরোধী বলে যে পদক্ষেপগুলি তাঁর মনে হত সেগুলির বিরোধিতা করতেন। কংগ্রেসকে এই বিষয়গুলিতে তিনি যতটা সোচ্চারভাবে পেতে চাইতেন সেভাবে পেতেন না। ফলে ২৭ শে ডিসেম্বর ১৯৩৯ তারিখে যখন বীর সাভারকার ওয়েলিংটন স্কোয়ারে গেরুয়া পতাকা তুলে বাংলায় হিন্দু মহাসভা প্রতিষ্ঠা করলেন শ্যামাপ্রসাদ বাংলায় সেই দলের নেতৃত্বভার গ্রহণ করলেন। দুই বাংলার বড় বড় জমিদারদের একটা বড় অংশ হিন্দু মহাসভার ছত্রছায়ায় এলেন। প্রদেশ কংগ্রেসের নেতৃত্বের একাংশ যার মধ্যে ছিলেন বৃহৎ বীমা ব্যবসায়ী, তীব্র সুভাষবিরোধী নলিনী রঞ্জন সরকার—তাঁরাও এই দাবিগুলিকে সামনে আনতে শুরু করলেন।সাম্প্রদায়িক বিভাজন উত্তোরত্তোর আরও তীব্র হওয়ার পর সাত বছর বাদে ১৯৪৫-৪৬ সালের কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে কংগ্রেস প্রায় অবিকল হিন্দু মহাসভার ঢংয়ে হিন্দু স্বার্থরক্ষার কথা বলে নির্বাচনী প্রচার করে। ফলে ছটি হিন্দু আসনেই হিন্দু মহাসভাকে টেক্কা দিয়ে কংগ্রেস জিতে যায়। তাই যখন সুরাবর্দীর পক্ষপাতিত্বমূলক শাসন বাংলা দেখে নিয়েছে, প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ও তার অব্যবহিত পরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বিধ্বস্ত হয়েছে কলকাতা, যখন মাউন্টব্যাটেন প্রস্তাব গৃহীত ও দেশভাগ অনিবার্য --- তখন বাংলা ভাগের দাবিতে শুধু শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু মহাসভা নয়, প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দল একযোগে দাঁড়িয়ে গেছে এবং কংগ্রেস সেখানে নেতৃত্বের আসনে। কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভার যৌথ উদ্যোগে এই দাবিতে পাঁচটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু একক দলীয় উদ্যোগে কংগ্রেস এই দাবিতে ৫৯ টি সভা করে আর হিন্দু মহাসভা করে ১২ টি। অবশ্যই কংগ্রেসের সাংগঠনিক ক্ষমতা অনেক বেশি ছিল। হিন্দু মহাসভার সংগঠন মূলত ছিল পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের মধ্যে। পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার বাইরে একমাত্র মুর্শিদাবাদ জেলায় তাদের সংগঠন ছিল। সেই সময় শ্যামাপ্রসাদের বিশ্বাস ছিল যে বাংলা ভাগ হলেও পাশে হিন্দুপ্রধান শক্তিশালী ভারত রাষ্ট্র থাকায় পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের ক্ষতি হবে না যদিও সে বিশ্বাস অমূলক প্রতিপন্ন হয়েছে। স্বাধীনতার পর গান্ধীহত্যার কারণে হিন্দু মহাসভার রাজনীতি বিপুল বাধার মুখে পড়ে। পরে শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভা ছেড়ে জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করলেও ১৯৫২ সালের নির্বাচনে তাদের ফলাফল খুব খারাপ হয়েছিল।শ্যামাপ্রসাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা অনেকটাই অক্ষুণ্ণ ছিল যদিও। বাংলা বিভাজনের ক্ষেত্রে যদি ‘কৃতিত্ব’ দিতে হয় কাউকে তাহলে সেটা অনেকটাই কংগ্রেসের দিকে যাবে কারণ কংগ্রেসের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে ব্রিটিশরা কোনো সিদ্ধান্ত সেই যুদ্ধোত্তর কালে গ্রহণ করতেন না। কিন্তু এ বিষয়ে শ্যামাপ্রসাদের প্রভাব শুধু হিন্দু মহাসভার একটি ভোটে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর ব্যক্তিত্ব, বাগ্মীতা এবং গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে এই বিষয়ে জনমত গঠনে তিনি যে ভূমিকা নিয়েছিলেন তার একটি আলাদা তাৎপর্য ছিল। বিশেষত হিন্দু ভদ্রমণ্ডলীর স্বার্থরক্ষায় তিনি যে বহুদিন ধরে অক্লান্ত প্রচারক সেটি প্রতিষ্ঠিত ছিল। ফলে একদিকে যেমন হিন্দু মহাসভার এজেন্ডা কংগ্রেস হাইজ্যাক করে নিয়েছিল সেটা সত্য, অন্যদিকে শ্যমাপ্রসাদের অনুগামীরা বলতেই পারেন যে তাদের এজেন্ডাকেই বাকিদের গ্রহণ করতে হয়েছে--- পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, দেশভাগ অনিবার্য হয়ে ওঠার পর।  শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ঃ একটি অন্তরঙ্গ দৃষ্টিকোণের সন্ধানে------------------------------------------------------------------------------ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ডায়েরি যেটা অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে ১৯৯৩ সালে Leaves from a Diary নামে প্রকাশিত হয় সেখানে মূলত দুটি ভাগে তার ইংরেজিতে লেখা এবং বাংলায় লেখা ডায়েরির লেখাগুলো প্রকাশিত হয়েছে। এটা শ্যামাপ্রসাদের নিজের শুধু নয়, গোটা বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের খুব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর মধ্যে ১৯৩৭ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত বাংলায় ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি এবং মুসলিম লীগের শাসন চলেছে। সেই সময় শ্যামাপ্রসাদ গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী নেতা। ১২ ই ডিসেম্বর ১৯৪১, শ্যামাপ্রসাদ ফজলুল হকের সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেন এবং তার অর্থমন্ত্রী হন। ২০শে নভেম্বর ১৯৪২ তারিখে তিনি পদত্যাগ করেন। বিরোধী থাকার সময় এবং মন্ত্রী থাকার কালে তিনি হিন্দুদের স্বার্থরক্ষার অগ্রণী কন্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত হন। শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভায় যোগদান করলেন কেন ? ১৯৩৭ থেকে ৪১ সাল পর্যন্ত মুসলিম লীগ এবং ফজলুল হকের মন্ত্রীসভা যে পদক্ষেপগুলি নিচ্ছিল তাতে হিন্দু ভদ্রমন্ডলীর স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হচ্ছিল। ১৯ ৪১ সালে ঢাকাতে বেশ বড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও হয়। এছাড়াও সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ, ইউনিয়ন বোর্ডগুলির নির্বাচনে মুসলিম লীগের গাজোয়ারি ইত্যাদি সাধারণ ঘটনা হয়ে উঠেছিল। কংগ্রেস হিন্দুদের স্বার্থরক্ষা্র কথা বলতে কিছুটা কুন্ঠিত থাকত পাছে তাদের সাম্প্রদায়িক বলা হয়। তাহলে কি শ্যামাপ্রসাদকে সাম্প্রদায়িক বলা যায় ? মনে রাখতে হবে শ্যামাপ্রসাদ স্বাধীনতার আগে যে বাংলায় হিন্দুদের স্বার্থরক্ষার কথা বলছেন সেখানে হিন্দুরা সংখ্যালঘু। আবার স্বাধীনতার পর জম্মু ও কাশ্মীরে গিয়ে তিনি যখন হিন্দুদের স্বার্থরক্ষার কথা বলছেন সেখানেও হিন্দুরা সংখ্যালঘু। সংখ্যাগুরুর আগ্রাসী সাম্প্রদায়িক পদক্ষেপ আর সংখ্যালঘুর প্রতিরোধমূলক সম্প্রদায়চেতনাকে এক মানদণ্ডে বিচার করা যায় না, বিশেষত সেই সময়ে যখন এই ধরণের বিভাজন তীব্র হয়ে ওঠে। অথচ ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর ফজলুল হক যখন কংগ্রেসকে মন্ত্রীসভা গঠনের প্রস্তাব দেন এবং কংগ্রেস তা প্রত্যাখ্যান করে সেই নিয়ে শ্যামাপ্রসাদের আক্ষেপটি দেখুন— তিনি লিখছেন ‘’,যদি এটা হত ( কংগ্রেস ও ফজলুল হকের যৌথ সরকার ফজলুল হকের নেতৃত্বে ) তাহলে বাংলা মুসলিম লীগ- ব্রিটিশ যৌথ চক্রান্তের খপ্পরে পড়ত না। রাজ্যটা হিন্দু এবং মুসলিম প্রতিনিধিদের যৌথ প্রচেষ্টায় একটা শক্তিশালী এবং স্বাস্থ্যবান রাজ্য হিসেবে চলত। “শ্যামাপ্রসাদের উপরোক্ত বক্তব্য কি কোনো সাম্প্রদায়িক মানুষের কথা ? বস্তুত তার গোটা ডায়েরিতে কোথাও সাধারণভাবে মুসলমানদের সম্পর্কে বা ইসলাম সম্পর্কে কোনো বিদ্বেষমূলক কথা নেই। তাঁর আপত্তি ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে। আবার কংগ্রেসের দলীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে তিনি এমনকি মুসলিম লীগের সঙ্গে সহযোগিতার কথাও বলেছেন। প্রথমে আইনসভা বয়কটের ডাক দিয়েও ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের তিনমাস পর কংগ্রেস অনেক হিন্দুপ্রধান প্রদেশেই সরকার গঠন করে। কিন্তু কোথাও তারা কোয়ালিশন রাজনীতিকে কোনো গুরুত্ব দেয় নি। উত্তর প্রদেশে মহম্মদ আলি জিন্নার অনুরোধ সত্ত্বেও তারা মুসলিম মন্ত্রী লীগ থেকে কাউকে নেয়নি, যা নিয়েছিল সব কংগ্রেস থেকে। শ্যামাপ্রসাদ লিখছেন, ‘১৯৩৭ সালে এই একগুঁয়েমি না দেখালে ১৯৪৪ সালে মুসলিম লীগকে সন্তুষ্ট করার জন্য দেশভাগের প্রস্তাবে গান্ধী আর রাজাগোপালাচারীকে সম্মত হতে হত না।‘’ এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু আর মুসলিমকে নিয়ে একসাথে চলার পক্ষপাতী ছিলেন। দেশভাগের অব্যবহিত আগের উত্তুঙ্গ সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সময় সেই উদার অবস্থান শুধু তিনি কেন, অনেকের পক্ষেই আর রক্ষা করা সম্ভব ছিল না। শ্যামাপ্রসাদ হিন্দুদের সংগঠিত করার কথা বলছেন। পাশাপাশি বলছেন, “ To establish co-operation with those Muslims who feel that Bengal’s hope lies in joint work between the two communities.” এতো তো সমন্বয়ের কথা, বিভাজনের কথা তো নয়। দেশভাগ, স্বাধীনতা লাভ এবং গান্ধী হত্যার পর এমন একটা অবস্থা তৈরি হয় যখন হিন্দু মহাসভাকে ঘোষণা করে তার রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ বন্ধ রাখার কথা বলতে হয়। এরকমও মত উঠে আসতে থাকে যে হিন্দু মহাসভা এরপর থেকে রাজনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধ রেখে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের মত সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে কাজ করবে কিনা। শ্যামাপ্রসাদ একথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন এবং চিরতরে এই পন্থা অনুসরণের পক্ষপাতী ছিলেন।শ্যামাপ্রসাদের নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভার উদারপন্থী অংশের বক্তব্য ছিল দেশভাগের পর হিন্দু সংখ্যাগুরু অংশকে নিয়ে গঠিত অংশে হিন্দুদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ার যেহেতু ভয় নাই, তাহলে শুধু হিন্দুদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক সংগঠন কোন কাজে লাগবে? বরাবরই শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভাকে বাংলায় প্রায় স্বাধীনভাবে চালাতেন। কিন্তু এবার ১৯৪৮ সালের ৮ ই আগস্ট দিল্লীতে হিন্দু মহাসভার সারা ভারত কার্যকরী কমিটি তীব্র বিতর্কের পর রাজনীতিতে ফেরার কথাই বলে। একই সময়ে আরেকটি বিতর্ক সামনে আসে যে হিন্দু মহাসভায় মুসলিমদের সদস্য করা হবে কিনা। শ্যামাপ্রসাদের বক্তব্য ছিল যে শুধু হিন্দু নয়--- সমস্ত ধর্মবিশ্বাসের মানুষকে নিতে হবে। এর একটা প্রত্যক্ষ কারণ ছিল পশ্চিমবঙ্গে দেশভাগের পরও মুসলিমদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। ৬ এবং ৭ই নভেম্বর ১৯৪৮ তারিখে কার্যকরী কমিটি ঘোষণা করে যে হিন্দু ছাড়া কাউকে হিন্দু মহাসভার সদস্য করা যাবে না। প্রতিবাদস্বরূপ ২৩ শে নভেম্বর শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভা থেকে পদত্যাগ করেন। কাজেই বোঝা যাচ্ছে বিশেষ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু স্বার্থ রক্ষার কথা বললেও সর্বকালে সব পরিস্থিতিতে সেকথা বলে চলার লোক ছিলেন না। এর প্রমাণ তিনি ফজলুল হক মন্ত্রিসভায় কাজ করার সময়তেও রেখেছিলেন। তাঁর জোটসঙ্গী কৃষক প্রজা পার্টির বহু মুসলিম বিধায়ক যাঁরা শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু স্বার্থরক্ষাকারী নীতির জন্য তাঁর উপর বিরূপ ছিলেন, তাঁদের অনেকের আস্থা অর্জনে তিনি সমর্থ হয়েছিলেন। তাঁর নিজের কথায়---“ আমার সহজ বিশ্বাস এই যে যদি উভয় সম্প্রদায়ের নেতারা ঠিকঠাক চলেন তাহলে সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না রাজ্যে। নেতৃত্বকে শুধু এরকম অবস্থায় থাকতে হবে যাতে তাঁরা নিজের নিজের সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করতে পারেন যে তাদের স্বার্থ ঠিকঠাক দেখভাল করা হচ্ছে। একবার মানুষের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা পেলে যে দুর্বৃত্ত্রা আগুন নিয়ে দিনরাত খেলতে চায় তারা হীনবল হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। “ এর প্রমাণ শ্যামাপ্রসাদ পেয়েছিলেন যখন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য প্রাদেশিক আইনসভায় অন্তত পঞ্চাশ জন মুসলিম বিধায়ককে তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৪৪ সালে যখন গান্ধী জিন্নার পাকিস্থান প্রস্তাব মেনে নিচ্ছেন তখন ঐ মুসলিম বিধায়করা বোঝেন যে মুসলিমদের একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন হিসেবে কংগ্রেস লীগকেই মেনে নিচ্ছে।ফলে তাঁরাও আস্তে আস্তে ঐ শিবিরে ভিড়ে যান।  অথচ অর্থমন্ত্রী হিসেবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উন্নতিকল্পে ফজলুক হক সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে শ্যামাপ্রসাদ বাজেটে এক লক্ষ টাকা মঞ্জুর করেছিলেন। কিন্তু শরিক দলের ব্যর্থতা এবং লোভের জন্য সেই টাকা দিয়ে কোনো প্রকল্প তৈরি করা যায় নি।শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক জীবন এমন একটা দলে শুরু হয়েছিল যার সাংগঠনিক এবং বর্ণভিত্তি খুব বড় ছিল না। বাংলার নিম্নবর্ণের মানুষ ও তাঁদের নেতারা হিন্দু মহাসভার পক্ষে ছিলেন না। তার ওপর যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি যখন চলছিল তার আগে পরে তিনি প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন। ফলে ব্রিটিশ বিরোধী কোনো বড় গণ আন্দোলন করার মত সময় ও সুযোগ তাঁর ছিল না। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে সাভারকরও সব সময় তাঁর মত মেনে নিয়েছেন এমনটা নয়। তাই বলে শ্যমাপ্রসাদ ব্রিটিশদের প্রতি অনুগত ছিলেন এমনটা বলা যায় না। ভারত ছাড় আন্দোলনের উপর দমন পীড়নের তীব্র নিন্দা করেছেন, জেলে আটক কংগ্রেস নেতাদের মুক্তির জন্য দাবি জানিয়েছেন সোচ্চারে। মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগের পর গভর্নরকে ১৯৪২ সালের ১৬ই নভেম্বর যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন সেখানে লিখছেন,” যদি নিজের দেশকে স্বাধীন এবং ব্রিটিশ সমেত যে কোনো বিদেশী শক্তির আধিপত্যমুক্ত দেখতে চাওয়া অপরাধ হয় সেক্ষেত্রে প্রত্যেক আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ভারতবাসীই অপরাধী।“ এটা কোনো ব্রিটিশ অনুগত মানুষের উক্তি বলে ভুল হচ্ছে না নিশ্চয় ?শ্যামাপ্রসাদ নিজের বিশ্বাসের প্রতি প্রচণ্ড দায়বদ্ধ ও আপোষহীন ছিলেন। ১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে জেহাদী গোষ্ঠীর উদ্যোগে এবং রাষ্ট্রীয় প্ররোচনায় হিন্দুবিরোধী খুন, ধর্ষণ, লুঠতরাজের প্রচুর ঘটনা ঘটে। পাকিস্তানের আইনমন্ত্রী এবং দলিত হিন্দু নেতা যোগেন মণ্ডল এই ঘটনার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন এবং হিন্দুদের দেশত্যাগের ঘটনা অনেক বৃদ্ধি পায়। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায়। তিনি দাবি জানাতে থাকেন যে উদবাস্তু সমস্যার সমাধানে হয় পাকিস্তানে সামরিক আক্রমণ করতে হবে নয়তো পাকিস্তানের সঙ্গে জন বিনিময় করতে হবে যেমনটা পাঞ্জাবে দেশভাগের সময় হয়েছিল। এই দাবির মধ্যে অন্তত প্রথমটি বাস্তবোচিত ছিল না সেকথা বলা যেতে পারে।যাই হোক নেহেরু-লিয়াকত চুক্তি সম্পাদনের পর প্রতিবাদস্বরূপ শ্যামাপ্রসাদ মন্ত্রীসভা থেকে বেরিয়ে আসেন। তিনি বুঝেছিলেন এই চুক্তি দিয়ে পাকিস্তানে সংখ্যালঘু হিন্দুর স্বার্থ রক্ষা হবে না। হয়ও নি। কিন্তু হিন্দু স্বার্থের রক্ষার প্রশ্নে শ্যামাপ্রসাদ যুক্তির চেয়েও আবেগকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন বলে মনে হয়। তাই কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা না দিয়ে তাকে ভারত রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করা যে সেই সময় যেত না সেকথা তিনি মানতে পারেন নি। ফলে কাশ্মীরে তাঁর সেই সময়ের যাত্রা, গ্রেপ্তার এবং বন্দী থাকাকালীন মৃত্যু এক বিরাট ট্র্যাজেডি। তথাগত রায় বিজেপির সভাপতি থাকাকালীন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের যে জীবনী লিখেছিলেন সেখানে এই প্রসঙ্গে রীতিমত ষড়যন্ত্রের ঈঙ্গিত দিয়েছেন এবং নেহেরুকে দায়ী করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রমাণ হিসেবে যা আছে সেসবই বিভিন্ন লোকের উক্তি অথবা তাঁদের মুখে অন্য লোকের শোনা কথা। এইরকম অপ্রমাণিত অভিযোগ নিয়ে তদন্ত হতে পারে কিন্তু কাউকে দোষী ঠাওরাতে গেলে আর সেটা সৎ ইতিহাস চর্চা হয় না। ভারতীয় জনসংঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বলরাজ মাধোক, যিনি কাশ্মীর সফরে শ্যামাপ্রসাদের সহযাত্রী ছিলেন এবং যাঁর কথা তথাগত রায় বারবার উল্লেখ করেছেন তিনি তার আত্মজীবনীতে ১৯৬৮ সালে মোগলসরাই স্টেশনে দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মৃত্যু নিয়ে যা অভিযোগ করেছেন সেসব মেনে নিলে তো সংঘপরিবারের ভাবমূর্তি নিয়েই প্রশ্ন উঠে যাবে। কিন্তু এগুলোকে আমরা সর্বজনস্বীকৃত ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে দেখতে চাই না।শ্যামাপ্রসাদের সীমাবদ্ধতার একটা বড় জায়গা ছিল যে তিনি ছিলেন উচ্চবর্ণের শিক্ষিত ভদ্রলোকদের প্রতিনিধি। ফলে হিন্দু সমাজের ঐক্যের জন্য ডাক দিলেও, অনেকটা আর্য সমাজের ছাঁচে নিম্ন বর্ণের এবং আদিবাসীদের হিন্দু সমাজের ’ মূল স্রোতে’ অন্তর্ভুক্ত করার জন্য শুদ্ধি, সংগঠন ইত্যাদির আয়োজন করলেও তাদের কাছে টানতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। বাংলার প্রাদেশিক আইনসভার দলিত সদস্যরা যোগেন মণ্ডলের নেতৃত্বে বরং মুসলিম লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছেন। নারী অধিকার আন্দোলনের প্রবক্তারা বলতে পারেন যে তিনি আম্বেদকর প্রস্তাবিত হিন্দু কোড বিলের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন যে বিলের মাধ্যমে আম্বেদকার হিন্দু মহিলাদের সম্পত্তিতে সমানাধিকার, বহুবিবাহ রদ, বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার প্রভৃতি আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে যে বহু বিশিষ্ট মানুষ এর বিরোধিতা করেছিলেন যেমন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদ স্বয়ং। শ্যামাপ্রসাদ তখনই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি আগে চালু করার দাবি করেছিলেন এবং হিন্দুদের এই বিল মানাকে অপশনাল করতে চেয়েছিলেন। আম্বেদকার শ্যামাপ্রসাদের এই দাবিকে অবাস্তব বলে উড়িয়ে দেন। শ্যামাপ্রসাদ, এন সি চ্যাটার্জী প্রমুখের বক্তব্য ছিল যে এতে হিন্দুদের যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে। আসলে শ্যামাপ্রসাদ সারাজীবন একটা সুন্দর যৌথ পরিবারে বড় হয়েছেন এবং তার সুবিধা পেয়েছিলেন। মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে স্ত্রীকে হারালেও তার সন্তানদের মানুষ করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন তার বৌদি। শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু কোড বিলের বিরোধী হলেও নারীবিদ্বেষী ছিলেন না। বরং যেভাবে তার ডায়েরিতে নিজের অকালপ্রয়াতা স্ত্রীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা উচ্ছসিতভাবে প্রকাশ করেছেন, তাঁর স্মৃতিকে উজ্জ্বল রাখার জন্য দ্বিতীয়বার বিয়ে করা থেকে বিরত থেকেছেন সেটা সেই যুগের পক্ষে ব্যতিক্রমী বইকি।শ্যামাপ্রসাদ যে সংগঠন করতেন তা সে হিন্দু মহাসভাই হোক বা জনসংঘ – তাদের মতাদর্শ নিয়ে আমি এখানে কোনো মন্তব্য করিনি। আমার ফোকাস এখানে ছিল পুরোটাই ব্যক্তি শ্যামাপ্রসাদের ওপর। অনেকে বলবেন এভাবে কি ব্যক্তিকে তাঁর সংগঠনের মতাদর্শ থেকে আলাদা করে বিচার করা যায় ? অন্তত শ্যামাপ্রসাদের ক্ষেত্রে যে অনেকটাই যায় সেটা উপরের আলোচনা থেকেই বোঝা যাবে। আমার মনে হয়েছে শ্যামাপ্রসাদের কাছে সংগঠন ছিল উপায় মাত্র, উদ্দেশ্য নয়। ফলে বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্তে তিনি নিজের আদর্শের সহায়ক হিসেবে যেটা ভালো মনে করেছেন সেই সংগঠনকেই বেছে নিয়েছেন। এটা একধরনের প্র্যাগম্যাটিজম, কোনোসুবিধাবাদ নয়। লক্ষ্য একটাই, আক্রান্ত হিন্দুর স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা। এই প্র্যাগমাটিজমের দৃষ্টিকোণ থেকেই ফজলুল হক বা নেহেরুর মন্ত্রীসভায় তিনি একসময় যোগ দিয়েছিলেন। আবার যখন মনে করেছেন তার উদ্দেশ্য(ব্যক্তিগত নয়) সাধিত হচ্ছে না তখনই পদত্যাগ করে বেরিয়ে এসেছেন। এই বর্ণময় রাজনৈতিক জীবনে তাঁর যাত্রাপথে তিনি নিঃসঙ্গতায় ভুগেছেন। এমনকি স্বার্থহীন, উচ্চ আদর্শযুক্ত মানুষ নিজের সংগঠনের মধ্যেও খুব বেশি পান নি একথা লিখে গেছেন। ভগ্ন স্বাস্থ্যের কথা, ক্লান্তির কথা, হার্টের অসুখের কথা এমনকি মৃত্যুচেতনার কথা তাঁর দিনলিপিতে উঠে এসেছে বারবার—কিন্তু হতাশা বা পরাজয়ের কথা আসে নি। এই বরেণ্য, আদর্শবাদী মানুষটিকে কোনো ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপ্রবণ শক্তি গ্রাস করতে যাতে না পারে সেটা দেখাই আমাদের সকলের দায়িত্ব। তথ্যসূত্রঃLeaves from a diary, Shyamaprasad Mukherjee, Oxford University Press,1993Bengal Divided Hindu Communalism and Partition 1932-1947, Joya Chatterji, Cambridge University Press 1994The Spoils of Partition, Joya Chatterjee, Cambridge University Press 2007Syamaprasad Mukherjee, Life and Times, Tathagata Roy, Penguin Books,2017
    বারুইপুর - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | অভিযোগ, বারুইপুরে একটি ১০ বছরের মেয়েকে গণধর্ষণ এবং খুন করা হয়। অভিযুক্তদের স্থানীয় লোকে সিসিটিভি দেখে স্থানীয় লোকে ধরে, পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পুলিশ কোনো তদন্ত করেনি। তারপর বিজেপির স্থানীয় নেতা অভিযুক্তদের ছাড়িয়ে আনেন। লোকে খবর পেয়ে গণপিটুনি দেয়। একজন অভিযুক্ত মৃত।এগুলো আমি স্থানীয়দের সাক্ষাৎকার দেখে লিখলাম, নিউজওয়ান বলে একটি চ্যানেলে। কারণ, যথারীতি বারুইপুরে ডিম্মিডিয়া পৌঁছতে পারেনি। মাসতিনেক আগে অবশ্য এরকম কিছু ঘটার আঁচ পেলেই হাজির হত। সেটা ঠিকই আছে, নইলে ডিম্মিডিয়া কেন। 'প্রতিবাদীরা'ও চুপ করে আছেন। এর আগে পুলিশ ধরে ফেললেও তাঁরা প্রতিবাদে নেমে পড়তেন। বড় বড় বাইট দিতেন। এখন ডিম্মিডিয় বাইট চাইছেওনা, কোন লাইনে বলতে হবে সেটাও বলে দিচ্ছেনা। তাছাড়া সরকারও হয়তো কপ করে ধরে ফেলল। ফলে সেটাও ঠিকই আছে। মন্ত্রী-সান্ত্রী নেতাদের বাইট দেখিনি। দুদিন আগে শমীক ভট্টাচার্য বলেছিলেন, পুলিশের তো ডিম-ডিটেক্টর নেই। এবার বলার সুযোগ আছে, পুলিশের তো ধর্ষক-ডিটেক্টর নেই। বললে, সঠিক কথাই হবে। অগ্নিমিত্রা পালকে দুদিন আগে বলতে শুনেছিলাম, আমাদের দল ডিম ছোঁড়া সমর্থন করেনা। এবার নিশ্চয়ই করুণ সুরে বলবেন, আমাদের দল ধর্ষণ সমর্থন করেনা। এখনও বলেননি, কিন্তু বললে সেও সত্যি কথা। কিন্তু ওঁদের লোক ​​​​​​​ডিম ​​​​​​​মারা ​​​​​​​থেকে ​​​​​​​শুরু ​​​​​​​করে, ধর্ষণের অভিযোগে জড়িয়ে ​​​​​​​যাচ্ছেন, ​​​​​​​ওঁরা ​​​​​​​ক্ষমতায় ​​​​​​​আছেন, ​​​​​​​স্রেফ ​​​​​​​সমর্থন ​​​​​​​করিনা ​​​​​​​বললেই ​​​​​​​তো ​​​​​​​ল্যাটা ​​​​​​​চুকে ​​​​​​​যায়না। ​​​​​​​সরকারে ​​​​​​​থাকলে ​​​​​​​দায় ​​​​​​​এবং ​​​​​​​দায়িত্ব ​​​​​​​নিতে ​​​​​​​হয়। ​​​​​​​ফলে ​​​​​​​এর ​​​​​​​দায়টা ​​​​​​​ওঁদের ​​​​​​​সরকারের ​​​​​​​এবং ​​​​​​​দলের। ব্যারিটোনে ​​​​​​​কিংবা ​​​​​​​করুণ ​​​​​​​সুরে ​​​​​​​বাণী ​​​​​​​দেবার ​​​​​​​কোনো ​​​​​​​মূল্যই ​​​​​​​নেই।এবং এটা শুধু একটা ধর্ষণ বা কয়েকটা ডিমে-ছোঁড়ার অভিযোগ না। রাজ্যজুড়ে নৈরাজ্য নেমে এসেছে। ব্যবসায়ী-ইশকুল মাস্টারকে ডিম মারা হচ্ছে। সাংসদদের ডিম মারা হচ্ছে। কোমরে দড়ি দিয়ে ঘোরানো হচ্ছে বিরোধী নেতাদের। পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীকে এইসব কাজে লাগানো হচ্ছে। এবং এখন গণপিটুনিতে খুনই হয়ে গেল। ডিম্মিডিয়া দেখাক বা না দেখাক, এই পুরো নৈরাজ্যের দায়িত্ব রাজ্য সরকারের। ডিম-ছোঁড়া, কোমরে-দড়ি, ইউটিউবারদের গ্রেপ্তার, এবং গণপিটুনি, কোনোটাই ন্যায়বিচার না, ঠিক উল্টো।অন্য সব রাজনীতি ছেড়ে দিন। এঁরা আসলে প্রশাসন চালানোর যোগ্য কিনা নিজেদেরই ভেবে দেখার সময় হয়েছে। দুদিন আগে এক বিধায়ককে দেখছিলাম, বললেন, আমার এলাকায় ​​​​​​​বিজেপি পরিচয় ​​​​​​​দিয়ে ​​​​​​​কারা ​​​​​​​মারল, ​​​​​​​তাদেরককে ​​​​​​​কেউ ​​​​​​​বিজেপি বলে চেনেই ​​​​​​​না। যদি এই কথা সত্যি হয়, অবস্থাটা ভাবুন। সংগঠনের এমনই অবস্থা, কোথায় কে বিজেপি বা বিজেপি পরিচয় দিয়ে রাজত্ব চালাচ্ছে, কোনো ট্রেস নেই। বুথে লোক নেই, সংগঠন নেই, এঁরা চালাবেন প্রশাসন। ঈশ্বর এঁদের, এবং বাংলার মানুষের মঙ্গল করুন। অনেকে এখনও জানতে চাইছেন, বারুইপুরে কী হয়েছে? কী অভিযোগ? তাঁদের জন্য সংক্ষেপে পুরোটা লিখে দিই। দয়া করে কপি করে লোকজনকে পাঠান, কারণ মিডিয়ায় তেমন কিছু নেই, ফলে অনেকেই পুরোটা জানেন না। বারুইপুরে একটি ছোট্টো বছর দশেকের মেয়ে, ধরা যাক তার নাম হাস্নুহানা, হঠাৎই "হারিয়ে" যায়। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, হাস্নুহানার নামে মিসিং কমপ্লেন্ট করার পরেও পুলিশ কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। নানা স্থানীয় চ্যানেলে তাঁরা বলেছেন, যে, পুলিশকে নিষ্ক্রিয় দেখার পরে স্থানীয় মানুষই সন্ধানের কাজে নেমে পড়েন। প্রথমে সারা রাত খোঁজা হয়। তারপর সকাল হলে, যে কাজ গোয়েন্দার, সেটাই তাঁরা করতে থাকেন। বিভিন্ন দোকানের সিসিটিভি খতিয়ে দেখে মেয়েটির অনুসন্ধানের কাজ শুরু হয়।অনুসন্ধানের কাজ খুব দ্রুতগতিতে এগোয়। দুপুরের দিকে এক বস্তার মধ্যে ছোট্ট মেয়েটার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ধর্ষণ ও খুন করে পুকুরে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। স্থানীয় মানুষ শুধু মৃতদেহ উদ্ধার করেন নয়, সম্ভাব্য অপরাধীদের চিহ্নিত করেন। তাদের জেরা করেন এবং ৪ জন অভিযুক্তকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। অভিযোগ, এই অনুসন্ধান এবং দেহ উদ্ধারের সময় থানার কোনো পুলিশকর্মীর টিকি দেখা যায়নি। শুধু স্থানীয় ক্যাম্পের এক কর্মী উপস্থিত ছিলেন।এর পর ঘটনা মারাত্মক দিকে ঘোরে। পুলিশ ওই ৪ জনকেই ছেড়ে দেয়। অভিযোগ, ওই ৪ জন অভিযুক্তই RSS কর্মী। এবং আরও অভিযোগ, যে, স্থানীয় বিজেপি নেতা শান্তনু মণ্ডল থানায় প্রভাব খাটিয়ে ওই ৪ অভিযুক্তদের ছাড়িয়ে আনেন। বলাবাহুল্য, জনরোষ এরপর বাড়তে থাকে। সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামে। পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়, এবং পুলিশের ওপর আস্থা না রেখে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় অভিযুক্তকে।পুরো ঘটনা সারাদিন ধরে দফায় দফায় ঘটতে থাকলেও, মূলধারার মিডিয়া, যাকে ডিম্মিডিয়া বলা হয়, সন্ধ্যের আগে এক লাইনও সম্প্রচারের সময় পায়নি। সন্ধ্যের পর থেকে যৎসামান্য দেখানো শুরু হয়। রিপাবলিকের ময়ূখরঞ্জন রাত থেকে অবস্থা সামাল দিতে সারারাত ফেসবুকে পোস্ট করতে থাকেন। "বারুইপুরে খরচা হোক", জাতীয় ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা লিখতে থাকেন। "বিজেপি-নেতার কথায় পুলিশ অভিযুক্তদের ছেড়ে দিয়েছে" - এই অভিযোগ নিয়ে একটি বাক্যও বলেননি।এর মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী হাস্নুহানার বাবাকেই পুলিশের বড় দপ্তর, ভবানীভবনে তলব করেন। আর কালীঘাটে নেমে যায় পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী যেন কিছুতেই বারুইপুরে পৌঁছতে না পারেন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, তাঁকে কার্যত গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। প্রসঙ্গত এর কয়েকদিন আগেই গোটা কলকাতার বিরাট অংশ জুড়ে মিটিং-মিছিলে নিষেধাজ্ঞা জারী হয়েছে।পুরো ঘটনা নিয়ে শমীক ভট্টাচার্য বা অগ্নিমিত্রা পাল, যাঁরা এই জমনার ব্যতিক্রমী 'ভব্য' মুখ বলে পরিচিত, তাঁদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। লকেট বলেছেন তিনি শোনেনই নি। বাকিরা কোথায় কেউ জানেনা, সম্ভবত ডিম্মিডিয়া তাঁদের বিব্রত করেনি। তবে গভীর রাতে শ্রদ্ধেয়া কাকীমা রত্না দেবনাথ একটি ফেসবুক পোস্ট করে জানিয়েছেন, মা-বাবার কোল খালি করল যারা তাদের কড়া শাস্তি পাওয়া উচিত। দলীয় নেতার হস্তক্ষেপেই অভিযুক্তদের ছাড়িয়ে আনার অভিযোগ নিয়ে তিনি রা কাড়েননি।এই নিয়ে এখনও কোনো আন্দোলনের ডাক পাওয়া যায়নি। রাত-দখলের কৃতিত্ব নিয়ে যাঁরা কাড়াকাড়ি করছিলেন, তাঁরা মোটের উপর নিশ্চুপ, কিংবা মৃদু সমীরণের মতো বক্তব্য রাখছেন। অভয়া মঞ্চের পক্ষ থেকে লাইভ করে সরকারের প্রতি আস্থাজ্ঞাপন করা হয়েছে। সুবিচারের জন্য আবেদন করেছেন শ্রী পুণ্যব্রত গুণ এবং মানুষকে আইন হাতে তুলে নিতে বারণ করেছেন।সব মিলিয়ে যা বোঝা যাচ্ছে, বিরোধীদের জন্য বারুইপুর অবরুদ্ধ। কিছু হলেও ডিম্মিডিয়া দেখাবেনা। মোটের উপর ব্ল্যাক আউট চলছে। পোস্ট মর্টেম কী হয়েছে কেউ জানেনা। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, যে বস্তায় দেহ ছিল, সেটা এখনও পড়ে। এভিডেন্স আদৌ সংগ্রহ করা হয়েছে কিনা জানা নেই। এবং ময়ূখের বক্তব্যের পর সন্দেহ হচ্ছে, একমাত্র সাক্ষী বলে যাঁর কথা শোনা যাচ্ছে, তাঁকেই "খরচা" করে দেওয়া হতে পারে। পরপর অনেকগুলো ধর্ষণ বা লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটল নতুন জমানায়। চন্দ্রনাথের খুনের কোনো কিনারা হয়নি। ইভিএম পুড়ে গেল এবং ডিম-ছোঁড়া জাতীয় গণহিংসায় কার্যত উৎসাহ দেওয়া চলছে।এই হল অবস্থা। এখানে দুটো কথা বলতে পারি। এক, ডিম্মিডিয়ার উপর কোনো আস্থা রাখবেন না। অনেকেই অভ্যাসবশত ওখানেই খবর খোঁজেন, দেখন, অভ্যাস কাটানো সহজ না। কিন্তু অভ্যাসটা ছাড়তে হবে। এমনকি শেয়ার করার অভ্যাসও। পরিবর্তে ছোটো মিডিয়া দেখুন। তাতে অনেক জল থাকে, কিন্তু শুধুই ভূষিমাল থাকেনা। আমি এই খবরগুলো পেলাম জি-আই, বেঙ্গল-নিউজ এবং নিউজ-ওয়ান বলে তিনটে চ্যানেল থেকে। যা যা চ্যানেল দেখি, ইউটিউবে এবং ফেসবুকে, তার একটা তালিকা বানিয়ে একটা পাতা বানাব ঠিক করেছি।আর দুই হল, ডিম্মিডিয়াকে মহিমান্বিত করার কাজটা এখনও বিজেমূল এবং রাম্বামরা করে চলবেন। বিজেমূলরা পরিদৃশ্যমান, রাম্বামরা অনেকেই গা ঢাকা দিয়ে আছেন। চিহ্নিত করুন। অন্য কোনো কারণে না, এঁদের কথা আর শুনবেন না বলে।আন্দোলন কে কবে করবেন, সেসব অ্যাকটিভিস্টরা বলবেন। সাধারণ মানুষ বলবেন। দলগুলো বলবে। কিন্তু এইটুকু আমরাই করতে পারি।
    অপাংক্তেয় - Amit Chatterjee | ছবি: রমিতকবিতাটি আগে লেখা, মনে হল সাম্প্রতিক সময়ে এটি যেন আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, জনগণ থেকে যেন সবার মানুষে উত্তরণ ঘটে, এটুকুই চাওয়া অপাংক্তেয়অমিত চট্টোপাধ্যায়মাঝরাতে ভয় জমে চুন খসা ইটের পাঁজরে,শ্যাওলায় মোড়া ভিত কেঁপে ওঠে আশঙ্কা মেখে।নয়া ইমারত হবে, মাথা তার মেঘ ছুঁয়ে থাকা।নির্মাণভারে কাঁপে সবেধন পৈত্রিক ভিটে!ছেড়ে যাও পিতৃস্মৃতি, মায়ায় জড়িয়ে থাকা খাটউঠোনের কোণে রাখা অভিমানী টগরের চারাসেই কবে উড়ে যাওয়া ময়নার ভাঙাচোরা খাঁচাপাথরের শিলনোড়া, বৈশাখী মেলা থেকে কেনা।লেখা হয় নির্বাসন, দিশাহীন রাত পার হলেযখন ভোরের আলো ঝিম ধরা কুয়াশায় ভেজা।নীরব রক্তপাতে জমে থাকে অসহায় ক্ষোভ,শিকড়ের টান ছিঁড়ে শুয়ে থাকে মৃত ডালপালা।গৃহস্থালি ভেসে যায় নিরুদ্দেশে বস্তায় মুড়ে,নির্জন দ্বীপে খোঁজে বিটপের ছায়ার আঁচল।পায়ের তলায় যদি পাওয়া যায় বসতের জমিহয়তো বা লেখা হবে আগামীর পরিচয়নামা।মায়ার নগরী ভাসে রাতজাগা নিয়ন আলোতে,রাতপরীদের মায়া মুছে দেয় সব শোকগাথা।চেনা ফুটপাথ বলে, বেমানান, অপাংক্তেয় তুমি,মেনে নাও নির্বাসন, ভেসে যাও পরিযায়ী হয়ে।
  • জনতার খেরোর খাতা...
    চতুর্থ ছায়া ও রাজপুত্তেরর আর্তনাদ  - albert banerjee | এই সিংহাসনের একটার যার ওপর বসে আছে সে – যে রাজা নয়, রাজপুত্র হওয়ার ভান করে, যে পুরুষ নয়, পুরুষের ছদ্মবেশ ধারণ করে, যে একটি ফাঁকা খোলস, যার ভিতর দিয়ে হাওয়া বয়ে যায়, শীতল হাওয়া, যা বহন করে আনে তার রানির আর্তনাদ, সেই আর্তনাদ যা তার জন্য নয়, অন্য পুরুষদের জন্য, যারা তার সামনেই তৃপ্ত করে তার রানিকে, প্রতিদিন, প্রতিরাতে, প্রতিপ্রভাতে, যখন সূর্য ওঠে আর সে দেখে তার শয্যা খালি, তার শয্যার ওপর অন্য পুরুষের ঘাম, অন্য পুরুষের লোম, অন্য পুরুষের বীর্যপাতের দাগ, যা সে চাটতে চায় না, কিন্তু চোখ বন্ধ করলেও তার নাকে লাগে সেই গন্ধ – নোনতা, মিষ্টি, পচা, সজীব। আমি দাঁড়িয়ে আছি। দেয়ালের আড়ালে নয়, এখন আমি দাঁড়িয়ে আছি তার পাশে, অদৃশ্য, অব্যক্ত, আমার হাত তার কাঁধে, কিন্তু সে টের পায় না, কারণ সে এখন শুধু তার চোখের সামনের দৃশ্যটাই দেখতে পায় – তার রানি, তার রানি, যাকে সে একদিন ভালোবেসেছিল, যাকে সে সিংহাসনের পাশে বসিয়েছিল, যাকে সে রাজ্ঞী করেছিল, যার পায়ে সে ফুল দিয়েছিল, যার কপালে সিঁদুর দিয়েছিল – সেই রানি আজ তার সামনে, তার রাজসভার মাঝখানে, একটি মঞ্চের ওপর, শুয়ে আছে, তার দেহ খোলা, তার হাত ছড়ানো, তার চোখ বন্ধ, কিন্তু তার ঠোঁটে হাসি, সেই হাসি আমি চিনি। উর্মি ও চেনে, কারণ সেই হাসি একদিন তার জন্য ছিল, এখন সে হাসি অন্য পুরুষদের জন্য, যারা তার ওপর চেপে বসে আছে, তাদের ঘাম ঝরছে, তাদের নিঃশ্বাস ফুঁসছে, তাদের মাংসের আঘাতে তার রানির দেহ কাঁপছে, আর সেই কাঁপুনির তালে তালে সে মাথা নেড়ে নাচছে, হাত তুলে ডাকছে, “আরও, আরও, আরও, যতক্ষণ না আমার হাড় ভাঙে, যতক্ষণ না আমার চামড়া ফাটে, যতক্ষণ না আমি শূন্য হয়ে যাই, যতক্ষণ না আমি পূর্ণ হই, যতক্ষণ না আমি সেই আগুন হয়ে যাই, যা আমি চাই, যা আমি চেয়েছিলাম তার কাছ থেকে, কিন্তু সে দিতে পারেনি, কারণ সে পুরুষ নয়, সে শুধু একটি ছায়া, একটি কম্পমান ছায়া, যে সিংহাসনে বসে দেখে, শুধু দেখে, কিছু বলে না, কিছু করে না, শুধু পাথর হয়ে যায়, পাথর হয়ে বসে থাকে।  কি বলবি উর্মি "আমি চাই জিহ্বার স্পর্শ, আমি চাই দাঁতের কামড়, যা সে দিতে পারে না, তাই আমি নিচ্ছি অন্য পুরুষদের থেকে, তাদের মাংস থেকে, তাদের রক্ত থেকে, তাদের নিঃশ্বাস থেকে, আমি পূর্ণ হচ্ছি, আমি জ্বলছি, আমি নিভছি, আবার জ্বলছি, আর সে দেখে, পাথরের মতো দেখে, তার চোখের পাতা জ্বলে, তার গলা শুকিয়ে যায়, তার হাতের মুঠো শক্ত হয়, কিন্তু মুঠো খুললে কি হয়? শুধু ঘাম, শুধু শূন্যতা, শুধু সেই চিহ্ন, যে সে কিছুই না, পুরুষ নয়, পিতা নয়, স্বামী নয়, শুধু একটি আসবাব, একটি প্রদীপ, একটি কাঠের মূর্তি, যাকে সাজিয়ে রাখা হয়েছে সিংহাসনে, যাতে লোকেরা ভাবে এখানে রাজপুত্র আছে, কিন্তু আসলে রাজপুত্র নেই, আছে শুধু রানি। " আছে শুধু উর্মির ক্ষুধা, আছে শুধু তার লোলুপতা, যা সে মেটায় তার সামনেই, অন্য পুরুষদের দিয়ে, তাদের শরীর দিয়ে, তাদের গলা থেকে নির্গত গর্জন দিয়ে, যা দেয়ালে ধাক্কা খায়, ফিরে আসে, আবার ধাক্কা খায়, যতক্ষণ না সে পাগল হয়, যতক্ষণ না সে ওঠে দাঁড়ায়, দরজার দিকে হাঁটে, বাইরে যায়, খোলা মাঠে, দূরের বনের দিকে, যেখানে কেউ তাকে দেখবে না, কেউ তাকে চিনবে না," কেউ তাকে বলবে না, “ তুমি কোথায় যাও?” সে এখন পথিক, সে এখন নির্বাসিত, সে এখন সেই মানুষ যে নিজের ঘর ছেড়ে চলে যায়, কারণ ঘর আর ঘর নেই, ঘর হয়ে গেছে পতিতালয়, শয্যা হয়ে গেছে রক্তের স্টেডিয়াম, রানি হয়ে গেছে সেই পতিতা যে তার সামনেই অন্য পুরুষদের ডাকে, আহ্বান করে, তৃপ্ত হয়, আর সে বসে দেখে, পাথর হয়ে, তার চোখের জল শুকিয়ে যায়, তার কণ্ঠস্বর মরে যায়, তার অস্তিত্ব দ্রবীভূত হয় সেই নারকীয় দৃশ্যে, যা সে প্রতিদিন দেখে, প্রতিরাতে শোনে, প্রতিপ্রভাতে স্বপ্নে দেখে, আর স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠে শুধু এই বুঝতে যে স্বপ্নই বাস্তব, আর বাস্তবতা হলো তার রানির খোলা দেহ, তার রানির দোলানো নিতম্ব, তার রানির চিৎকার, যা অন্য পুরুষের কামের জোয়ারে ভেসে যায়, আর সে ডুবে যায় সেই জোয়ারের তলায়, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে, মৃত্যুর অপেক্ষায়।  আমি দেখি তার কাঁধ কাঁপছে, তার পা দুর্বল, তার গতি ধীর, কিন্তু থামে না, কারণ থামলে আবার সেই দৃশ্য, আবার সেই রানি, আবার সেই পুরুষ, আবার সেই নারকীয় ক্রীড়া, যা সে সহ্য করতে পারে না, তাই সে চলে যায়, সে চলে যায় বনের দিকে, যেখানে গাছেরা চুপ, যেখানে পশুরা ডাকে, যেখানে নদী বয়ে চলে, যেখানে সে হয়তো শান্তি পাবে, হয়তো নতুন জীবন, হয়তো নতুন মৃত্যু, কিন্তু এখানে থাকলে সে নিশ্চিত মৃত্যু, ধীর মৃত্যু, প্রতিদিনের মৃত্যু, যা মরে না, শুধু পচে, শুধু গলে, শুধু মিশে যায় উর্মির লালসার ফেনার সাথে, সেই ফেনা আমি চাটতে চাই, আমি সেই ফেনার স্বাদ নিতে চাই, গ্যাঁজলা তাড়ির মত করে তারিয়ে তারিয়ে, আমি বাপের বাড়ির লাঙলের ফলার মেয়ে।  সে, পিছনে ফিরে তাকায়, শূন্য চোখে, ফাঁকা মুখে, কম্পমান হাতে, আর বলে, “কে তুমি? কেন তুমি আমাকে অনুসরণ করছ? তুমি কি তার পাঠানো? তার কি আরও অপমান বাকি আছে? তার কি আরও দৃশ্য বাকি আছে যা দেখাতে চায় আমাকে? তাহলে এসো, দেখাও, আমি প্রস্তুত, আমি আর কিছু ভয় পাই না, কারণ সবচেয়ে বড় ভয় আমি ইতিমধ্যে দেখেছি, আমার সামনে, আমার শয্যায়, আমার রানির দেহের খোলা যোনির ওপর অন্য পুরুষের দেহ, তাদের লিঙ্গের আঘাত। তাদের নিঃশ্বাসের গর্জন, তাদের বীর্যের স্বাদ, যা আমি চেটেছি নীরবে, যা আমি গিলেছি নীরবে, যা আমি হজম করেছি নীরবে, এখন আর কিছু বাকি নেই, শুধু এই বন, এই নদী, এই শূন্যতা, আর তুমি, যে আমার পিছনে দাঁড়িয়ে, নিঃশব্দ, অদৃশ্য, কিন্তু আমি টের পাচ্ছি তোমার গন্ধ, তোমার ক্ষুধা, তোমার দাঁতের ধার, এসো, এসো, আমি আর পালাব না, আমি থেমে যাব, আমি তোমার শিকার হব, আমি তোমার খাবার হব, আমি তোমার রক্ত হব, আমি তোমার হাড় হব, আমি তোমার আত্মা হব, কারণ আত্মা তো আর আমার নেই, আত্মা বিক্রি হয়ে গেছে অনেক আগে, সেই সভায়, যখন আমি নীরব ছিলাম, যখন আমি দেখেছিলাম আমার রানিকে অন্য পুরুষের সাথে, যখন আমি কিছু বলিনি, কিছু করিনি, শুধু বসেছিলাম, পাথর হয়ে, এখন আমি পাথর সরাতে চাই, আমি হাঁটতে চাই, আমি দৌড়াতে চাই, আমি ছুটে যেতে চাই। " "এই অপমানের চেয়ে রক্তপাত ভালো, এই শূন্যতার চেয়ে পূর্ণতা ভালো, আর সেই পূর্ণতা তুমি, তুমি যে আমার পিছনে দাঁড়িয়ে, তুমি যে আমার অপেক্ষায়, তুমি যে আমার জন্য এসেছ, এই বনের পথে, এই অন্ধকার রাতে, এই শেষ প্রহরে, এসো, এসো, আর দেরি করো না, কারণ আমি ক্লান্ত, আমি ক্ষুধার্ত, আমি তৃষ্ণার্ত, সেই ক্ষত, যা থেকে রক্ত ঝরে প্রতিটি মুহূর্তে, আর তুমি সেই নারী, যে ক্ষত চাটতে জানে, রক্ত চুষতে জানে, পুঁজ পান করতে জানে, বেদনাকে আলিঙ্গন করতে জানে, এসো, এসো, আমার শেষ আশ্রয়, আমার শেষ গন্তব্য, আমার শেষ ভালোবাসা, যা আমি কখনো পাইনি, যা আমি কখনো চাইনি, কিন্তু যা এখন আমার প্রয়োজন, মুক্তি, মুক্তি মানে তুমি, তুমি, তুমি, চিরকাল, অনন্তকাল, এক মুহূর্তের জন্য, যে মুহূর্তে আমি তোমার দাঁতের নিচে, আমি তোমার জিভের নিচে, আমি তোমার গলার নিচে, আমি তোমার রক্তে, আমি তোমার শূন্যতায়, আমি তোমার পূর্ণতায়, মিশে যাই, একাকার, চিরন্তন, শান্ত, নিঃশব্দ, যেখানে আর কোনো রানি নেই, কোনো পুরুষ নেই, কোনো অপমান নেই, কোনো সিংহাসন নেই, শুধু আছে আমরা, দুই অভিশপ্ত।  সে, রাজপুরুষ, যে রাজা নয়, যে পুরুষ নয়, যে শুধু একটি খোলস, যা আমি পূর্ণ করব, আমার রক্তে, আমার দাঁতে, আমার ক্ষুধায়, আমার ভালোবাসায়, যা তার রানি তাকে দিতে পারেনি, তাই আমি দেব, আমি দেব শান্তি, আমি দেব মুক্তি, আর মুক্তির নাম ভালোবাসা, আমি সেই নারী, যে দেবী, যে শূন্যতা ও পূর্ণতা, যে ক্ষত, যে রক্ত, যে আগুন, যে বরফ, যে সে, যে চিরকালই এক মুহূর্তের জন্য, এই বনের পথে, এই অন্ধকার রাতে, এই শেষ প্রহরে, যেখানে সে আমার পিছনে দাঁড়িয়ে, অপেক্ষায়, প্রতীক্ষায়, অনন্ত, যতক্ষণ না আমি থামি, ফিরে তাকাই, যতক্ষণ না সে আমার চোখে দেখে তার মৃত্যু, তার মুক্তি, তার ভালোবাসা, তার শেষ, তার শুরু, তার সবকিছু, দেখতে পায়। যতক্ষণ না আমি তাকে বনে ডাকি।
    ডিম্মিডিয়া - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | কিছু জিনিস ​​​​​​​আপনি ​​​​​​​হাড়ে-হাড়ে ​​​​​​​টের ​​​​​​​পাচ্ছেন, কিন্তু ​​​​​​​ডিম্মিডিয়ায় ​​​​​​​পাবেন ​​​​​​​না। ডিম্মিডিয়া দেখলে মনে হয়, পৃথিবীতে রামরাজ্য নেমে নেমে এসেছে, কিন্তু আসলে যেটা হচ্ছে, সেটা হল হিন্দুত্বের জিগির তুলে দিনে-ডাকাতি। খোদ রাম মন্দিরে সিসিটিভি বন্ধ করে সোনা-দানা-টাকা সরানো হত। বদ্রীনাথেও একই অভিযোগ এসেছে। আর পানিহাটির খ্যাতনামা কাকুর বিরুদ্ধে অভিযোগ তো সকলেই জানেন, কিন্তু সেসব ডিম্ম্মিডিয়ায় পাবেন না। যেমন ​​​​​​​পাবেন ​​​​​​​না, ​​​​​​​শিল্পপতিদের ​​​​​​​কত ​​​​​​​টাকায় ​​​​​​​জনতার ​​​​​​​সম্পত্তি ​​​​​​​তুলে ​​​​​​​দেওয়া ​​​​​​​হচ্ছে। ​​​​​​​পাবেন ​​​​​​​না ​​​​​​​কত ​​​​​​​টাকা ​​​​​​​মকুব ​​​​​​​করে ​​​​​​​দেওয়া ​​​​​​​হল, ​​​​​​​আর ​​​​​​​কতজন ​​​​​​​কত ​​​​​​​টাকা ​​​​​​​মেরে ​​​​​​​আনন্দে ​​​​​​​বিদেশে পালালেন। অন্নপূর্ণা যোজনায় টাকা পাচ্ছেন না, নানা জায়গায় মহিলারা হাড়ে-হাড়ে টের পেয়ে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। সে খবর ডিম্মিডিয়ায় পাবেন না। বাজেটে যা বরাদ্দ, তাতে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রাপকদের অন্তত ৬০% বাদ যাবারই কথা, কিন্তু ডিম্মিডিয়া সেখবর দেয়নি। দোষের কিছু নেই। ওদের যা আইকিউ, তাতে তারা অঙ্ক পারে, এ অপবাদ কেউ দেবেনা। নিট বা কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরির পরীক্ষা যাঁরা দেন, তাঁরা হাড়ে-হাড়ে জানেন, কেলোর কীর্তি কতদূর বিস্তৃত। কিন্তু সেসবও ডিম্মিডায় পাবেন না। নিট বা অন্যান্য সরকারী পরীক্ষা মনে হয় পশ্চিমবঙ্গে হয়না, আর কেন্দ্রীয় বোর্ডে মনে হয় মঙ্গলগ্রহের ছেলেমেয়েরা পড়ে। খড়গপুর আইআইটির কনভোকেশনে দেখলাম, প্রায় গোটা রাজ্য মন্ত্রীসভাকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ওঁরা নিশ্চয়ই উত্তরীয় বাগিয়ে যাবেন। সে খবরও পাবেন। আগে কখনও এ জিনিস শুনিনি। শিক্ষায় ডবল-ইঞ্জিন বলতে এইটুকুই। এগুলো আপনি হাড়ে-হাড়ে ইথানলের মতো টের পাচ্ছেন। তবুও মিডিয়ায় নেই। জনতা যে ক্ষোভে ফুঁসছে, এ খবর তো পাবেনই না। দিল্লির যন্তরমন্তরে চলছে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং অন্যান্য দাবীতে টানা ধর্ণা। অনশন করছেন সোনম ওয়াংচুক, আইসার জনাসাতেক নেতৃস্থানীয় কর্মী এবং আরও কেউ কেউ, যাঁদের পরিচয় আমি জানিনা। অনশন ৭ দিনে পড়ল। সকলেরই অবস্থার অবনতি হয়েছে। একটি মেয়েকে কাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সর্বদলীয় ঐক্য গড়ে উঠেছে একরকম করে। বামরা গেছেন মঞ্চে, মহুয়া মৈত্র গেছেন। বক্তব্য রেখেছেন। আপাতত ডিম্মিডিয়া না দেখালেও, যশস্বী মোদির অবস্থা মোটেও ভালো না। বিরোধীদের ঐক্যের এই চিত্র পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরের আগে দেখা গেলে কাজ দিত। অন্তত ৩৫ লাখ মানুষকে বাদ দিয়ে এই প্রহসনটা অন্তত হতনা। সে ঐক্য হয়নি, মূলত গোদি-মিডিয়ার লাগাতার প্রচারে, আর শাইনিং মধ্যবিত্তের চাপে। ডিম্মিডিয়াকে আর পাত্তা দেবেন না, কোনোভাবেই। ডিম্মধ্যবিত্তকেও। দুইই একসঙ্গে গোল্লায় যাক।
    কালবেলার রৌদ্রছায়া - ২৫  - Anjan Banerjee | ( ২৫ ) সাজিদা চ্যাটার্জী বাড়ি কাজ করতে এল। আজ মুখে কেন কথা নেই। বাসন মাজা, কাপড় কাচা শেষ হলে বালতির জলে ফিনাইল ফেলে ঘর মুছতে লাগল। মুখে কোন কথা নেই। অন্যদিন অনেক বকবক করে। এর বাড়ির, ওর বাড়ির নানাজনের কূটকচালি শোনায়। আজ একদম চুপচাপ। কী যেন চিন্তা করতে করতে ঘরের মেঝেতে ন্যাতা টেনে চলেছে। ঘরের গিন্নী দেবশ্রী বললেন, ' কিরে সাজিদা... আজ এত চুপচাপ ? বরের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে নাকি ? 'সাজিদা একটু সময় নিল, তারপর মাথা নীচু করে ঘর মুছতে মুছতে বলল, ' আলি কাল ব্যাঙ্গালোর চলে গেছে.... ননদের বাড়ি... '----- ' সেকি... কেন রে! ' ----- ' ছেলেগুলো খুব ঝামেলা করছিল... আমাদের তো কাগজপত্র কিছু নেই। মার কোলে চড়ে বর্ডার পেরিয়ে একবছর বয়সে ইন্ডিয়ায় এসেছিলাম। আমাদের পাড়ায় আমরা শুধু তিনঘর মুসলিম। আগে সি পি এম, পরে টি এম সি করতাম আমরা। আলি পার্টি ওয়ার্কার হয়ে গেল। কী করবে.... বাঁচতে তো হবে। এখন কী যে করি .... মেয়েটাকে কলেজে ভর্তি করতে হবে। আমি চলে গেলে মেয়েকে তো একলা রেখে যেতে হবে। কোথায়, কার কাছে যে রাখি... খুব চিন্তায় পড়েছি... নাকি ওকে ব্যাঙ্গালোরে পাঠিয়ে দেব, কিছু বুঝতে পারছি না.... ' দেবশ্রী গালে হাত দিয়ে বললেন, ' ওমা... এ ক'দিনের মধ্যে এত কান্ড ! এসব কারা করছে ? '----- ' ওই যে বলছে আমরা অনুপ্রবেশকারি... মানে বিদেশী। পঁচাশি সালের আগের কাগজ চাই। ওসব কিছু আছে নাকি আমাদের দূ...র। আমার ছেলেমেয়ের অবশ্য সব কিছু আছে। কিন্তু তাতে কী হবে দূ..র... আমরা তো অন্নপূর্ণা ভান্ডারও পাব না... ' ------ ' এসব কী কথা গো ... অনুপ্রবেশকারি আবার কী ? কথাটা শুনছি বটে খুব। তোকে সেই কবে থেকে দেখছি, তুই কিনা অনুপ্রবেশকারি না কী বলে, তাই ! এ তো আচ্ছা গেরো.... 'বলে, দেবশ্রীদেবী হাঁক পাড়লেন, ' ওগো শুনছ... সাদিজা কী সব বলছে... '----- ' কী হলটা কী ? ', বিমলানন্দবাবু ঘরে এসে ঢুকলেন। ---- ' সাজিদা বলছে ওদের নাকি এদেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে, ওরা নাকি অনুপ্রবেশকারি, মানে বিদেশী... ' বিমলবাবু সব শুনলেন। তাকে তেমন বিচলিত মনে হল না। হাবভাব দেখে মনে হল, এমন তো হওয়ারই কথা ছিল। ভাবলেশহীনভাবে বললেন, ' অ... খুব মুশ্কিলের ব্যাপার। তা কী করবি ভাবছিস ? ' সাজিদা ঘর মুছতে মুছতে বলল, ' ভাবছি মেয়েটাকে কলেজে ভর্তি করে এখানে একটা হোস্টেলে রেখে আমি আর আলি ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে থাকব। আর কী উপায়। লিমার তো কাগজ আছে... 'বিমলবাবু নির্বিকারভাবে সংক্ষেপে বললেন, ' গুড ডিসিশান। এটাই ঠিক হবে... ' দেবশ্রীদেবী বিভ্রান্ত এবং উৎকন্ঠিত মুখে তাকিয়ে রইলেন সাজিদার মুখে। তার চিন্তা শুধু সাজিদার বিপাকে পড়া নিয়ে না। আর একটা গুরুতর দুশ্চিন্তা হল, সাজিদা চলে গেলে তার ফাঁক ভরাবেন কাকে দিয়ে। সংসার অভিজ্ঞা গৃহিনী দেবশ্রীদেবী বিলক্ষণ জানেন যে সাজিদার মতো মেয়ে হাজারে একটা মেলে, শুধু কাজকর্ম নয়, কথাবার্তা, আচার ব্যবহার সবদিক দিয়ে। এ ঠিক মালতি, শেফালি, বাসন্তীর মতো নয়। বেশ একটু অন্যরকম। তিনি হতাশ গলায় বললেন, ' কী হবে তা'লে... 'তার স্বামী তার উদ্বেগের উৎস আদৌ আন্দাজ করতে পারলেন না। তিনি বললেন, ' কী আর হবে... দেখা যাক না, এ তো আর ওর তো একার হচ্ছে না। কিছু একটা ব্যবস্থা হবে নিশ্চয়ই .... চিন্তা করিস না... 'বলে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। সাজিদা কিন্তু দেবশ্রীর মনের কথা পড়তে পারল। সে বলে উঠল, ' আরে... তুমি অত চিন্তা ক'র না ... আমি গেলে তোমাকে ভাল লোক দিয়ে যাব মাইমা.... 'দেবশ্রীর হতাশা অবশ্য তাতে কাটল না। সে বলল, ' তা তো দিবি... কিন্তু সে কি আর তোর মতো হবে ? 'সাজিদা নিজের এত দুশ্চিন্তার মধ্যেও দেবশ্রীদেবীকে সান্ত্বনা দিতে থাকে, ' দূ..র... তুমি এত চিন্তা ক'র না তো... এক্ষুণি তো যাচ্ছি না... দেখি কী হয়। এখন মনে হচ্ছে আগের ওরাই ভাল ছিল। এরা শুধু হিন্দু মুসলমান করে, যেন আর কোন চিন্তা নেই... শুধু এটাই আছে ... 'দেবশ্রীদেবী একটা ছোট শ্বাস ফেলে বললেন, ' কী জানি বাবা, বুঝি না কিছু... দেখ কী করবি... ' অনুমিত মনোমিতার দিকে তাকিয়ে রইল মোবাইল স্ক্রিনে। ভাবল, মেয়েটার বেশ দম আছেতো। ঠিক কী চাইছে বোঝা মুশ্কিল তার পক্ষে। সে তো এ সব নিয়ে চিন্তা করেনি কোনদিন। কিন্তু এখন একটু চিন্তা করতে ইচ্ছা করছে। সেও ত জেন জি-র মধ্যে পড়ে। বোঝা দরকার। এসব বোঝাটা জরুরি ব্যাপার। কেই বা বোঝাবে কেই বা জানাবে তাকে। তার বন্ধুরা, যেমন পবন বা সঞ্জীব তো এসব নিয়ে মাথা ঘামাবে না। তারা জেন এক্স ওয়াই জেড এসব কিছু না। তারা কোন জেনারেশান অফ মাস নয়, বোঝে শুধু জেনারেশান অফ ক্যাপিটাল। এসব পবন, সঞ্জীব, রাকেশের জিনিস নয়, এটা অনুমিত ভালমতো বুঝতে পারল। এটা ওই মেয়েটার জিনিস। ও আবার থিয়েটারও করে। মায়ের সঙ্গে একদিন বাড়িতে এসেছিল। ওর দেখা আবার কিভাবে পাওয়া যাবে ভাবতে লাগল অনুমিত। তার মনে হল, আগের মতো ওভাবে আর যাওয়া যায় না। কেন যাওয়া যায় না সেটা ঠিক মাথায় এল না এই মুহুর্তে। তারপর ভাবল, অসুবিধের কী আছে মায়ের সঙ্গে তো পরিচয় আছে। অনুমিত মোবাইল বন্ধ করে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। ঘুরন্ত সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে নানা কথা ভাবতে লাগল। বাঁধন পাল নানারকম মালপত্তর নিয়ে সুভাষ গিরি, বিজয়দের তল্লাটে এসে পৌঁছল। এখানে সে বছরে তিন চারবার আসে। একটা মুদিখানার দোকানে তার জানা শোনা হয়েছে। সেখানে সে মালপত্তর রাখে কিছুক্ষণের জন্য। আর একটু বেলা পড়লে ওই দোকান থেকে একটা ভাঁজ করা টেবিল বার করে পাতে রাস্তার একধারে। তার ওপর জিনিসপত্র সাজায়। হাতা, খুন্তি, সাঁড়াসি, বেলন চাকি ধরনের সব রান্নাঘরের জিনিসপত্র। পথের ধারে দোকান সাজিয়ে বসে থাকে খরিদ্দারের আশায়। বিজয় গিয়েছিল জঙ্গলের দিকে। সুখিরামদের খবর নিতে। লিপ্পা বলে একটা মেয়ের শরীর খুব খারাপ হয়েছে। কোন মেয়েলি রোগ বলে মনে হচ্ছে। ক'দিন ধরে পেটে ব্যথা। মাঝে মাঝে রক্তস্রাব হচ্ছে। সদরে নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখানো দরকার। কাল সকালে লিপ্পাকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যাবে বলে ঠিক করেছে। গনেশ আর মাদলকে বলে রেখেছে। সুখি এখন বেশ সুস্থ হয়ে উঠেছে। সেও যেতে চাইছিল লিপ্পার সঙ্গে। বিজয় বারণ করল। সারাদিনের ঝক্কি নেওয়ার মতো অবস্থায় এখনও আসেনি। না যাওয়াই ভাল। বিজয় খবর পেয়েছে কলকাতায় বুলডোজার চালিয়ে হকার তোলা চলছে। পার্টির প্রতিরোধ ও আন্দোলন চলছে। তার কাছে শীতলদার ফোন এসেছিল উত্তর কলকাতা জেলা কমিটি থেকে। পরশুদিন দমদম স্টেশনে কর্মসূচী আছে। তাকে যাবার জন্য বলেছে। বিজয় এখন চায়ের দোকানে একটু বসবে, ওই যেখানে দেবাশিসের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। বিকেল পাঁচটা বাজে। বাঁধনের পশরার সামনে দুজন মহিলা দাঁড়িয়ে বেলন চাকি,সাঁড়াশি বাছাবাছি করছে। বিজয় উল্টোদিকে রাস্তায় পা ঠেকিয়ে সাইকেলে বসে বাঁধন পালের দোকানের দিকে তাকিয়ে রইল। এই বাঁধন পাল লোকটাকে তার বেশ লাগে। মাঝে মাঝেই এখানে আসে। ভ্রাম্যমান ব্যবসায়ী। আরও কত জায়গায় যায়। শুনেছে ওর পরিবার পরিজন বলতে তেমন কেউ নেই। ওর দোকানের বেচাকেনার দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ একটা শোরগোল ভেসে উঠল মাছের বাজারের দিক থেকে। বিজয় ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল ত্রিশ চল্লিশ জনের একটা দল চলন্ত ঘূর্ণি স্রোতের মতো এদিকে এগিয়ে আসছে। গোলমালের আওয়াজটা ওখান থেকেই উঠে আসছে। দঙ্গলটা এদিকেই এগোচ্ছে। হঠাৎ প্রশান্ত দাসকে দেখতে পেল। অবাক কান্ড গেরুয়া একফালি কাপড় জড়িয়ে রেখেছে গলায়। কোন পদ্মফুল আঁকা আছে কিনা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। হয়ত কাপড়ের ভাঁজে ঢাকা পড়ে গেছে। অঞ্চল কমিটির মেম্বার চঞ্চল প্রধানকে পুলিশ কলার পাকড়ে থানার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। চারপাশ থেকে অনেকে চোর চোর বলছে। খিস্তি খেউড় উঠে আসছে জোর গলায় । বিজয় দেখল প্রশান্ত দাসও চোখ মুখ খিচিয়ে তেড়ে গালাগালি করছে। তিন তারিখ রাত্রেও যে চঞ্চলের এক গ্লাসের ইয়ার ছিল তাকে গালাগালি দিয়ে ভূত ভাগিয়ে দিচ্ছে। বলল, ' আরে তোরা কেউ ডিম আনিসনি ডিম... '। দুটো ডিম এসে পড়ল। একটা চঞ্চলের মাথায়, একটা কাঁধের কাছে। সে দুহাত দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করতে লাগল। প্রশান্ত দু হাত নেড়ে নেড়ে কাকে কী সব বলছে, যেন কস্মিনকালেও চঞ্চলের পার্টিতুতো ভাই ছিল না সে। বিজয় তাকিয়ে রইল দূর থেকে। ভাবতে লাগল, বাঙলার মাটিতে কোন ফসলের চাষ শুরু হল এবার। প্রশান্তরা তো সেই একই গাছের একই ফলের বীজ। তাহলে আর নতুন ফসল ফলবে কী করে। এ মাটি বিষাক্ত হয়ে গেছে। এ শুধু বিষফলই ফলাতে পারে। পোকা ধরে গেছে এ জমিতে। যারা ছিল শুধু তারাই বাঁচতে পারে এ দূষিত জমিতে রঙ বদলে বদলে। আর কেউ নয়। আগপর পার্টি হল পাটগাছের বীজ। যে জমিতে পাট চাষ করা হয়, সেখানে অন্য কোন ফসলের চাষ করা যায় না। একটা চলিত শাস্ত্রীয় কথা আছে। সেই কথাটা মনে পড়ে গেল বিজয়ের। একটা দেহের মৃত্যুর পর আত্মা নাকি শুধু দেহটা পাল্টে নেয়। যেটা চলছে ক'দিন ধরে সেটা ঠিক এরকমই গল্প। তারা চলে গেছে, তবু তারাই রয়ে গেল। আত্মা নাকি অবিনশ্বর। পাটের জমিতে অন্য ফসলের চাষ হয় না। চাষী যতই চেষ্টা করুক পাটের যে গুণাগুণ তা মাটিতে মিশে যায়। বাঁধন পাল গরীব ফেরিওয়ালা। সে গোলমাল দেখে তাড়াতাড়ি মালপত্র গোছাতে শুরু করল। বলা তো যায় না, কখন আচমকা লুটপাট শুরু হয়ে যাবে। সে গরীব মানুষ। ক্ষতি হলে সামলাবে কী করে। সে ভুক্তভোগী। একবার এরকম এক চক্করে পড়েছিল বর্ধমান স্টেশনের কাছে। রাস্তার ওদিকে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে বিজয় হাত নাড়িয়ে বলল, ' কিছু হবে না, কিছু হবে না.... যাবার দরকার নেই ... 'বিজয়ের আওয়াজ শুনে বাঁধন একটু থমকে গেল। মাল গোটানো থেমে গেল। বিজয়ের সঙ্গে বাঁধনের তেমন পরিচয় নেই। তবে শুনেছে ও কমুনিস্ট করে। বাঁধন রাজনীতির খবর একেবারেই রাখে না। তবে এখানে দু একজনের মুখে শুনেছে বিজয়বাবুর নাকি বুকে দম আছে। সে যাই হোক, বাঁধন আপাতত তার মত পরিবর্তন করল। ওখান থেকে উঠল না। চঞ্চল সমেত জটলাটা থানার দিকে এগিয়ে গেল। প্রশান্তও চলল গলায় হলদে মতো একটা চাদর জড়িয়ে হাত পা ঝঁকিয়ে তোড়ে গালাগালি দিতে দিতে। ও হরি... বিজয়ের চোখে পড়ে গেল হঠাৎ। ভিড়ের মধ্যে মিশে আছে প্রসূন প্রামাণিক আর ওই যে... দেবাশিস। দেবাশিস অবশ্য 'বেইমান ' নয়। বিজয়কে দেখে ভিড় থেকে খসে গিয়ে একগাল হেসে বিজয়ের দিকে এগিয়ে এল। কাছে এসে কী জানি কেন জবাবদিহির সুরে বলল, ' এ...ই এমনি... দেখছিলাম... ওদিকে চা খাচ্ছিলাম ... দেখলাম যাচ্ছে... ফালতু বাওয়াল... হ্যাঃ 'দেবাশিস বলল, ' কী মনে হচ্ছে দাদা ? '----- ' অ্যাঁ কী... কী ব্যাপারে বল তো ? ' ---- ' এই যে বদলটা হল ? '----- ' ও আচ্ছা ... ওটা তো এক্ষুণি বলা মুশ্কিল। ক'টা দিন গেলে বোঝা যাবে। তোমার কী মনে হয় ? '----- ' কি জানি... কী করে বলব ... ক'টা দিন যাক... ' বিজয় আর কথা না বাড়িয়ে বলল, ' কলকাতায় আমাদের ডেকেছে পার্টির উত্তর কলকাতা কমিটি থেকে... '----- 'কেন ? ' ---- ' হকার উচ্ছেদ নিয়ে প্রোটেস্ট চলছে। দমদম আর যাদবপুরে। সেই নিয়ে কিছু বলবে বোধহয়...'----- ' ও... তা ভাল... আমার মতোই তো গরীব ওরা... ওদের দিকটাও... মানে ইয়ে, একটু দেখতে হবে... ' দেবাশিস জামার হাতায় ঘাম মোছে। ----- ' হমম্, তাই তো... কিন্তু সময়টা যে খুব ভয়ঙ্কর। জোট বাঁধার দরকার... ' শিঞ্জিনীদের গ্রুপের আজকে একটা মিটিং আছে বিকেল পাঁচটা থেকে। তৈরি হয়ে সাড়ে চারটে নাগাদ ঘর থেকে বেরল সে। গাড়ি বের করল না। রাস্তা থেকে ক্যাব ধরে নেবে ঠিক করল। সিঁড়ি দিয়ে নামার মুখে অনুমিতের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। অনুমিত বলল, ' বেরচ্ছ ? '----- ' হ্যাঁরে... গ্রুপের মিটিং আছে ... 'অনুমিত একটু চুপ করে থেকে বলল, ' থিয়েটারের সেই মেয়েটা আসবে ? ' ----- ' কোন মেয়েটা বলতো ... ' ----- ' ওই যে তুমি যাকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলে... '----- ' ও আচ্ছা, মনোমিতা... না না সে কেন আসবে? ও তো আমাদের মেম্বার না। তাছাড়া ও বোধহয় দিল্লী গেছে... 'অনুমিত বলে ফেলল, ' কেন... কক্রোচ পার্টির ব্যাপারে... যন্তর মন্তরে ? 'শিঞ্জিনী একবার হাতঘড়িতে তাকিয়ে নিয়ে বলল, ' তাই হবে হয়ত। জানি না ঠিক। আচ্ছা আমি আসছি এখন, দেরি হয়ে যাচ্ছে... পরে কথা বলব ... 'শিঞ্জিনী বেরিয়ে গেল। অনুমিতের মনে হল, বাবা তো বেশ কিছুদিন হল কাজকর্মের ব্যাপারে কিছু বলে না ! বোধহয় পলিটিক্স নিয়ে চিন্তায় ডুবে আছে। সে ভাবতে লাগল, তার এখন কী করা উচিৎ। বসে বসে ভাবতে লাগল। এই সময়ে সঞ্জীবের, মানে সঞ্জীব খান্নার একটা ফোন এল। ----- ' হ্যাঁ সঞ্জু বল... ' ---- ' হ্যাঁ, শোন... সাতটার মধ্যে একবার আসতে পারবি। আমাদের এক স্টেক হোল্ডার আসবে। একটা বড় প্রোজেক্ট লঞ্চ করবে শর্টলি। তোর সঙ্গে কথা বলিয়ে দিতাম। তোর জন্য বিফিটিং হবে মনে হয় .... 'এ সব সিরিয়াস কাজের কথা শুনে অনুমিতের ঘুম ঘুম পেতে লাগল। কী যে সব বলে সঞ্জীব। এসব কি তার কাজ নাকি। সঞ্জীবকে সেদিন কাজ টাজের ব্যাপারে কিছু বলেছিল, তখন একটু অন্য মুডে ছিল বলে আবেগবশত বলে ফেলেছিল। ওসব আঁটোসাটো ব্যাপার কি তার জিনিস নাকি? সঞ্জীবও যেমন। অনুমিত বলল, ' হ্যাঁ... ট্রাই করব যেতে। আসলে শরীরটা তেমন ঠিক নেই... আচ্ছা দেখছি দেখছি... ' সঞ্জীব কাজের মানুষ। তার হাতে সময় কম। বলল, ' ঠিক আছে, দেখ... যদি আসিস কথা হবে... ' ( ক্রমশ ) ********************************************
  • ভাট...
    commentতরমুজ | //ভেজ খাওয়ার সাথে যৌন অক্ষমতার সম্পর্ক অবশ্যই আছে। //
     
    সরাসরি যৌন অক্ষমতা বলা ভুল হবে। বিষয়টি হল যৌন সক্রিয়তা কমে যাওয়া। যা পরবর্তী কালে যৌন অক্ষমতার পথে নিয়ে যায়।
    commentতরমুজ | শুধু আর্থ-সামাজিক নয়। যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসাম্য রেপের কারন। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক, বন্ধুত্ব এগুলো কমে গেলে। অর্থাৎ সেই সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সমাজিক অসাম্য বৃদ্ধি পেলে, রেপ সমস্যা বেড়ে যায়। রেপ সমস্যা সমাধানের জন্য ভিন্ন সংস্কৃতি, সমাজ ও আর্থ-সামাজিক সম্প্রদায়ের মধ্যে মেলবন্ধন জরুরি।
    commentতরমুজ | আর যৌন লালসা মেটানোর জন্য কেউ কোনোদিন রেপ করে না। রেপের দুটো বড় কারন হল সামাজিক প্রতিহিংসা বা শক্তি/ক্ষমতা প্রদর্শন, এবং বাড়তে থাকা আর্থ-সামাজিক অসাম্য।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত