বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--1


           বিষয় : গল্পের মত
          বিভাগ : অন্যান্য
          শুরু করেছেন :মঞ্জিস রায়
          IP Address : 237812.68.674512.103 (*)          Date:12 Nov 2019 -- 11:53 AM




Name:  মঞ্জিস রায়           

IP Address : 237812.68.674512.103 (*)          Date:12 Nov 2019 -- 11:54 AM

হেমন্তের সন্ধ্যায় রঙ্গীতের ধারে
মঞ্জিস রায়



এখানে এখন সন্ধে নেমে আসে নিঃশব্দে l রোদ ডুবে যায় রঙ্গীতের ঢেউয়ে l একা বসে থাকি রিসর্টের বাইরে l দূর থেকে টিমটিম করে পাহাড়ি আলো l কখনো কুয়াশা এসে আচ্ছন্ন করে তোলে l গাছেরা এখনই ঘুমিয়ে পড়েছে l রঙ্গীতের গানের সুরে চারদিকটা যেন মেতে উঠেছে lও পাশের জঙ্গলের ভেতরে অন্ধকার গাঢ় হয়ে উঠেছে l ওখানে কি আছে কে জানে !

এমন নির্জন সন্ধ্যায় মনে পড়ে যায় অনেক পুরোনো কথা l হেমন্তকাল এলেই আমার এই বদভ্যাস যেন আরও জাঁকিয়ে বসে l মনে পড়ে ছোটবেলার সন্ধ্যাগুলোতে মায়ের কাছে The little Mermaid , Alice in Wonderland , শিশু ভোলানাথ, টুনটুনির বই, হ য ব র ল, আবোল তাবোল কিংবা কাগ নয় পড়া l সে ছিল এক অনামা হ্যামলেট l সেখানেও সন্ধে হলে চারদিক নির্জন হয়ে যেত l সেখানে অবশ্য কোনও নদী ছিল না l রুখা, শুখা সে এক দেশ l
রিসর্টের ঘরে ফিরে এসে হাত পা ছড়িয়ে বসতে না বসতেই ওখানের কর্মচারী করণ চা নিয়ে এল l ছেলেটিকে আমার বেশ লাগছে l 19- 20 বয়স হবে l রোগা, ছোটোখাটো করণের সবসময় মুখে একগাল হাসি l রঙ্গীত নদীর মতই ঝরঝরে ছেলেটি l আজ পূর্ণিমা l নিখুঁত চাঁদ উঠেছে আকাশে l চারদিকের এই আলো আঁধারির রোমাঞ্চ উপভোগ করার জন্য আবার বাইরে এলাম l ঝিঁঝির ডাক, রঙ্গীতের কলতানের মধ্যেও আমার কানে এল দূর থেকে ভেসে আসা এক হালকা অস্পষ্ট সুর l কখনো একটু স্পষ্ট হয় কখনও আবার মিলিয়ে যায় l এই লুকোচুরির মধ্যেই প্রায় হিংস্র ভাবে ধেয়ে আসে একটা তাগড়া চেহারার কুকুর l আমি ছুটে পালাতে যাব এমন সময় করণ ছুটে এসে ওকে ধরে নিয়ে গিয়ে চেন দিয়ে বেঁধে রাখল l বলল ভয় পাবেন না দাদা, ও এখানকার পোষা l আসলে আপনাকে নতুন দেখছে তো l বললাম , ও কিচ্ছু নয় l আসলে হঠাৎ চলে এসেছে তাই l

আমার পাশের ঘরে আজকে কয়েকজন এসেছে কিন্ত তারা নিজেদের উপস্থিতি খুব একটা জানান দিচ্ছে না l লাঞ্চ করার সময় কমন স্পেসেও দেখেছি তারা কথা বলছে চাপা গলায় l আমিও আর যেচে আলাপ জমাতে গেলাম না l তবুও ওরা বারবার আমার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে l
এরপর আস্তে আস্তে ঘরে ঢুকে পড়লাম l ঠান্ডা তেমন নেই ঠিকই তবে বাইরে কিছুটা হলেও হেমন্তের হিমেল হাওয়া দিচ্ছে l ঘরে এসে আলোটা বন্ধ করে ইউটিউবে আমার অনেক অবেলার বন্ধু বিক্রম সিং এর গানে ডুব দিলাম l চোখ বুজে শুয়ে রইলাম l বিজনবাড়ির কাছাকাছি রঙ্গীতঘেরা এই সবুজ গ্রামটার কথা আমি আগে একজনের কাছে শুনেছিলাম l তাইতো এখানে তিনদিনের জন্য আসা l আসলে ছবি তোলা আর লেখালিখি হল আমার শখ l চাকরি একটা আছে বটে তবে সে তো শুধু পেট চালানোর তাগিদে l আর আমার আর একটা শখ বলা নেই কওয়া নেই, তল্পি-তল্পা গুটিয়ে হুটহাট বেরিয়ে পড়া l শান্তিনিকেতনের লালমাটির রাস্তা আর আদিবাসী গ্রাম যে আমার কত বিষাদময় ভালোলাগার সঙ্গী, তা আমিই জানি l বিক্রম সিং আমাকে সবসময়েই কোথাও একটা নিয়ে যান l মনে হয় এই সময় অনন্তকাল ধরে বয়ে চলেছে l মনে হচ্ছে হয়ত এখানেই সে আছে, রঙ্গীতের কাছে l নিজের সমস্ত বিষাদ ভাগ করে নিচ্ছে নদীর সাথে " আরও আঘাত সইবে আমার ..." l রাত অনেক হল l একটু পরেই হয়ত রাতের খাবার খেতে যেতে হবে l করণকে অনেকক্ষণ দেখিনি l এখানকার আরেক কর্মচারী পাশের ঘরের বাসিন্দাদের একজনকে সঙ্গে নিয়ে রিসর্টের পেছনের রাস্তা দিয়ে বারবার আসছে- যাচ্ছে l আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না l করণ ছাড়া কোনও কর্মচারীর সাথেই আমার হ্যাঁ হুম বাদে আর কোনও কথাই হয়নি l তাদের এই অস্বাভাবিক নির্লিপ্ততা দেখে আমার মনে খটকা লাগছে l এখানে দুটো খরগোশ একটা ঘেরা জায়গায় রয়েছে l শুয়ে শুয়ে ওই ছানাদুটোর কথা খুব মনে পড়ছে l করণ এসে বলল- খাবার তৈরী আছে, খেয়ে নিন l নদীর শব্দ, দুরে কোথাও কোনও কুকুরের কান্না, সব মিলিয়ে একটা অন্যরকম সংকেত l
ডাইনিং স্পেসে আমিই একা খেলাম l পাশের ঘরের লোকজন কি শুয়ে পড়েছে? জানিনা l রিসর্টে এই দুটো ঘর বাদেও অনেক ঘর আছে l কিন্তু কেউ নেই l কি অদ্ভূত, না? অথচ কত সুন্দর এই জায়গা l রাতে ঘুম হল না l একটা বন্য প্রাণীর ঝটপটানি শুনতে পেলাম l কিন্তু বাইরে বেরোনোর সাহস হয়ে উঠল না l
ভোরে উঠে পড়লাম l বাইরে হাঁটছিলাম l করণকে দেখলাম চায়ের বন্দোবস্ত করছে l রিসর্ট থেকে বাইরে রঙ্গীতের ধারে যেতে গিয়ে দেখলাম খাঁচা দুটো শূন্য, এখানে ওখানে রক্ত, পালক পড়ে রয়েছে l আমার ওই ছোট্ট আদুরে খরগোশ দুটোর কথা ভেবে অসুস্থ লাগছিল l রঙ্গীতের পারে একটা বোল্ডারের ওপর বসে জিরোলাম l কিছুক্ষন পরে করণ চুপি চুপি এখানে এসে দাঁড়ালো l আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বলল দাদা, এরা সুবিধের লোক নয় l এখান থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাওয়া ভালো l বললাম, কেন গো ? ও বলল, এখন এখানে বলা যাবে না l ওরা নজর রাখে l
আমি চা জলখাবার খেতে যাবার সময় একজন যুবক কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে এলেন l ওরা একটা টেবিলে বসে চা খাচ্ছিল l করণ খাবার নিয়ে এসে চুপিচুপি বলল- উনিই এখানকার মালিক l
লোকটা আমার দিকে বারবার তাকাচ্ছে l ওর গায়ে টি শার্ট, হাতে দামি ঘড়ি, গলায় চেন l ওরা টেবিল থেকে উঠে চারদিক দেখতে দেখতে যখন ওপাশের কোনও একটা ফাঁকা ঘরে ঢুকে পড়ল, তখন করণ আমাকে ওর মালিকের ব্যাপারে অনেক কিছুই বলল l এই রিসর্ট চালু হয়েছে মাত্র বছর দুয়েক l মালিকের বাবা বিজনবাড়ি এলাকার বড় নেতা l এদের অনেক কীর্তি কাহিনী আছে l এমন কি খুনখারাপির মামলাও এদের নামে আছে l আমি অবাক হলাম l মালিকের বয়স বড়োজোর ছাব্বিশ - সাতাশ হবে l এখনই এই বিপুল সম্পত্তির মালিক ! করণকে বললামও সে কথা l করণ বলল- সৎপথে থেকে কি আর এসব হয় দাদা ?

এমন সময় ওরা আবার বেরিয়ে এল l করণ মুখে আঙুল দিয়ে আমাকে চুপ করিয়ে দিল l ওরা করণ কে ডাকল l মনে হল ওরা হয়ত ওকে সন্দেহের বশে কিছু জিজ্ঞেস করছে l
আমি বসে রইলাম l মনে হল- এ কোথায় এলাম ? কাদের পাল্লায় পড়লাম l ওরা কিচেনের দিকে চলে গেল l কিচেনের পেছনের ঘর থেকে একজন বয়স্কা মহিলার কাশির শব্দ শুনলাম l তারপর শুনলাম চেঁচামেচি l একটি বাচ্চা মেয়ে চিৎকার করে কাঁদছে l আর তাকে অশ্লীল গালাগালি দিয়ে থামানো হচ্ছে l একটু পরে কানে এল মারধর আর কান্নার শব্দ lআমার গলা দিয়ে খাবার আর নামতে চাইছে না l
বেশ কিছুক্ষণ পর করণ এসে উদ্বিগ্ন মুখে বলল - আপনি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ুন l এখন ওরা ওই দিকে গেছে l যে কোনও সময় আবার আসতে পারে l বললাম- কিন্তু তোমার? তোমার কি হবে? ও বলল- আমার কি দাদা? এরা আমার পেটের ভাত যোগায় l আমি থাকতে বাধ্য l আমার মুখ চেয়ে আমার মা আর ছোট্ট বোন বাড়িতে আছে l কে আর কাজ দেবে আমাদের? প্রাণের মায়া ভুলে যেতে হয় দাদা l

অনেক জায়গাতেই এরকম ছেলেদের দেখা পেয়েছি l হায় আমার দেশ ! আমি কোনোমতে খাবার শেষ করে উঠে পড়লাম l ঘরে এসে ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম l করণ আমাকে পেছনের দিকের গেট দিয়ে বের করে দিল l পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছে করণ l আমি হতবাক l এখন নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনই বা কিভাবে পৌছাবো l হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছু দুর যাবার পরে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম l এগিয়ে দেখি একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক আর তাঁর স্ত্রী গাড়িতে বসে আছেন l ড্রাইভার কোনও কারণে বাইরে গেছে l জানি এখনকার দিনে অচেনা লোককে কেউ গাড়িতে নেবে না l ভদ্রলোকের সাথে আলাপ করে জানলাম ওনারা এখন দার্জিলিং যাচ্ছেন l আমি খুব বিনয় করে একটা লিফ্ট চাইলাম l জানিনা কেন ওনারা রাজি হলেন l দার্জিলিংয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু কেন করণের মুখ আমাকে বারবার ভাবাচ্ছে l নিজেকে জিজ্ঞেস করছি, আমি কি পালিয়ে এলাম ?
যেতে যেতে বহুদিন আগে পড়া T S Eliot এর Murder in the Cathedral এর একটা লাইন মাথায় ঘুরছিল -
" However certain our expectations
The moment foreseen may be unexpected
When it arrives."
সত্যিই যেমন আশা করা হয়, ঠিক তেমনটা হয়ে ওঠে না l

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--1