বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2]     এই পাতায় আছে7--37


           বিষয় : প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের কাহিনিগুলো
          বিভাগ : অন্যান্য
          শুরু করেছেন :সৈকত
          IP Address : 236712.158.782323.47 (*)          Date:28 Jun 2019 -- 01:13 PM




Name:  সৈকত          

IP Address : 890112.162.561223.51 (*)          Date:09 Jul 2019 -- 12:28 AM

কাহিনিটির পুরোটাই পুর্ণানন্দের বয়ানে, শেষ বারের জুয়াচুরির পরে য্খন সে ধরা পরে (১৮৯০-র আগে বা সমসময়ে), এবং প্রিয়নাথকে তার কাজের কথা জানায়, তারই বিবরণ। প্রথম পরিচ্ছেদে আছে তার রেজেস্ট্রারী আফিসের সাথে জালিয়াতির ঘটনার বিবরন, যেটি তার শেষ লোক ঠকানোর(গবর্ণমেন্টকে ঠকানো যদিও) কীর্তি। পুর্ণানন্দের কথামত, সে যখন তার সংসার নির্বাহের আর উপায় করতে পারছে না তখন সে "নূতন জুয়াচুরির এক অপুর্ব্ব উপায় বাহির' করল যেহেতু সে পুস্তক জমা দেওয়ার নিয়মগুলো জানত। টাকাপয়সা শূন্য অব্স্থায় কলকাতার রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর সময়ে, সে নিমতলা স্ট্রীটে রেপার বিক্রেতা এক কাবুলির দেখা পায়, যার কাছ থেকে সে দু-তিনটি রেপার নেয় এই বলে যে কাছের বড়মানুষের বাড়ীতে সেগুলি বিক্রীর জন্য দেখিয়ে আসবে। কিন্তু শরিকবিভক্ত সেই বাড়ীতে ঢুকে, অনেক লোকের আনাগোনার মধ্যে, বৈঠকখানা-বারান্দা পেরিয়ে পাসের গলিতে পৌছয় এবং কাবুলিকে বাড়ীর সামনে বসিয়ে রেখেই এক বাজারে গিয়ে রেপারগুলিকে সাড়ে চার টাকায় বিক্রি করে সে নতুন ব্যবসার মূলধন যোগাড় করে। পরের দিন বটতলায় গিয়ে, 'বটতলার দরে' পাঁচ টাকার দামের তিনটি বড় বই পাঁচ আনায় খরিদ করে, অর্থাৎ সর্বসমেত তার পনেরো আনা খরচ হয়। পরের দিন ছাপাখানায় গিয়ে নতুন মলাট ছাপায় দেড় টাকা দিয়ে, বইয়ের নাম হিসেবে নতুন নাম দেয় ও গ্রন্থকার হিসেবে নিজের নাম দিয়ে পনেরো আনা মূল্যে কেনা বটতলার বই তিনটের মলাট ছিঁড়ে, নতুন মলাট লাগিয়ে প্রত্যেক পুস্তকের দাম ধার্য করে দশ টাকা। এই তিনটি বই সে রেজিস্ট্রী আফিসে গিয়ে জমা দেয়, এবং তার ফলে দেড় টাকা খরচ করে সে 'অসৎ' উপায়ে তিরিশ টাকা লাভ করে !!

বহুদিন সে এই উপায়ে টাকার ব্যবস্থা করতে থাকে, মাস গেলে তিরিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা অন্তত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে ধরা পড়ে। কার অভিযোগের ফলে সে ধৃত হয় সে সেটা বোঝেনি কিন্তু এই কথাটি পুর্ণানন্দ প্রিয়নাথকে বলেছিল যে তদন্তকার্যে প্রিয়নাথের বিশেষ কষ্ট হয়নি, কারণ সব বইতেই পুর্ণানান্দের নাম ও ছাপাখানার নাম ছিল !

তো এই ছিল পুর্ণানন্দের কীর্তি যা প্রিয়নাথের কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার পরে, ইংরেজ সরকার তার বই জমা দেওয়ার আইনটি কিছুটা বদলে ফেলে, ১৮৯০-তে !!















Name:  সৈকত          

IP Address : 237812.69.3434.136 (*)          Date:09 Jul 2019 -- 01:17 AM

কিন্তু পুর্ণানন্দ চেয়েছিল লেখক হ'তে, সাহিত্য সমাজে প্রবেশ করে সে অনেকদিন সেখানে 'বিচরণ' করে, বঙ্গভাষার সেবা করেই সে জীবন কাটাবে ভেবেছিল কিন্তু অনটন তার মেটেনা। ইতিমধ্যে সে চিরণ্মদা নামে একটি উপন্যাস লিখেছে, সেখানে বন, উপবন, নদ, নদী, পদ্ম,উদ্যান, দেবস্থান, পাপিয়া, কোকিল, যুবক-যূবতীর প্রণয় সবই আছে কিন্তু সেই উপন্যাসের পাঠক জোটেনা, ফলে বইগুলি বিক্রী হয়না। উপায় হিসেবে, সে 'চিরণ্মদা' উপন্যাসের বিজ্ঞাপন দেয় মাসাধিক কাল ধরে, এবং তার পরে কর্ণওয়ালিস স্ট্রীটের এক প্রসিদ্ধ পুস্তক বিক্রেতার কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দেয় ঢাকা থেকে আগত এক পুস্তক বিক্রেতা হিসেবে যে কিছু বই কেনার জন্য কলকাতায় এসেছে। বইয়ের তালিকাটি আকর্ষণীয়, সমসময়ের পাঠকরা, বাঙালী পাঠকরা যা পড়ছে, উঁচু দরের সাহিত্য বলে যেসব বই গন্য হচ্ছে তার সংকলন, একটি বই বাদে। সেখানে ছিলঃ

বিদ্যাসাগরের প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ (১০০ ও ৫০ খন্ড),
বঙ্কিমের দুর্গেশনন্দিনী ও বিষবৃক্ষ (৫ খণ্ড),
রমেশচন্দ্র দত্তের মাধবী-কঙ্কন (৮ খন্ড),
মধুসূদনের মেঘনাদ-বধ (৩ খন্ড),
রবীন্দ্রনাথের মালিনী (৩ খন্ড),
তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের স্বর্ণলতা (২ খন্ড),
প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যয়ের তান্তিয়া-ভীল (২ খণ্ড) (!!)
দামোদর মুখোপাধ্যায়ের মৃন্ময়ী (৩ খন্ড)
ইন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের ভারত-উদ্ধার(৩ খন্ড)
এবং
পূর্ণানন্দ ভক্ত প্রনীত চিরণ্মদা (১০০ খন্ড) !!!

দোকানদার সব বইই দিতে পারে কিন্তু অবশ্যই চিরণ্মদা বাদে কারণ স্বভাবতই সে বইটির নাম শোনেনি। পুর্ণানন্দ তার বিজ্ঞাপনটি ব্যবহার ক'রে বইটির কাটতি সম্বন্ধে দোকানদারকে নিঃসন্দেহ করে এবং সে পুর্ণানন্দের বাড়ী থেকেই নিজেই বইটি সংগ্রহ করবে বললে, দোকানাদার না জানি বইটি কত বিখ্যাত ভেবে নিজেই জোগাড় করে রাখবে বলে। পুর্ণানন্দ নিজের বাড়িতে ফিরে যায়, দোকানদার লোক পাঠালে সে নিজে লুকিয়ে থেকে অন্য এক পরিচিতের মাধ্যমে চিরণ্মদার সব খন্ডই বিক্রী করে দেয়। যথারীতি সে দোকানদারের কাছে আর যায়ই না, দোকানদার অন্য বইগুলি বিক্রী করতে পারে কিন্তু অত কপি চিরন্মদা যথারীতি বিক্রী হয় না। পুর্নানন্দ হিসেব করে দেখেছিল যে ২০০০ খণ্ড বই ছাপাতে তার খরচ হয়েছিল ১৭৫ টাকা আর এই জুয়াচুরিটি করে সব বইই বিক্রী করে দেওয়ার পরে সে লাভ করেছিল ১৫০০ টাকা। তো মনে করি, পুর্ণানন্দর এই কীর্তিটির মধ্যে লুকিয়ে আছে উনবিংশ শতকের বাংলা সাহিত্য গ'ড়ে ওঠার কাহিনি - পাঠকরা কীরকম বই পছন্দ করছে, সেসব বই কিভাবে ছড়িয়ে পড়ত কলকাতা থেকে ঢাকা অবধি কলকাতার বড় পুস্তক বিক্রেতা আর অন্য শহরের পুস্তক বিক্রেতাদের চুক্তি মারফৎ, বিজ্ঞাপন কীভাবে বইয়ের প্রসার ঘটাচ্ছে বা প্রভাবিত করছে পাঠক ও বিক্রেতাদের, আর কীভাবেই বা একজন লেখক হয়ে উঠতে চাইছে, কিন্তু সৃষ্টির ক্ষমতাহীন সে অসফল হয়ে কীভাবেই বা এই সব কিছুকেই ব্যবহার করছে অর্থ রোজগারের জন্য - তার বিবরণ !

আর, উচ্চ ভাবের সাহিত্য রচনার সাথে সাথে উনবিংশ শতকে তো আরও অন্তত তিন রকমের লেখা প্রচুর ছাপা হয়েছে - সংবাদপত্র, জীবনচরিত আর অশ্লীল সাহিত্য - এবং শিক্ষিত পাঠকেরা এর সবগুলিরই উপভোক্তা হয়ে উঠেছে, পুর্ণানন্দ তার জীবনে জুয়াচুরির জন্যই এইসবের প্রসারকেও ব্যবহার করেছিল !!








Name:  সৈকত          

IP Address : 237812.68.6745.10 (*)          Date:09 Jul 2019 -- 01:24 AM

১১ঃ৩৯-এর পোস্টে,

* ১৯৮৪ নয়, ১৮৯৪

বাক্যটি,

* তো দারোগার দপ্তরে দেখছি, আষাঢ়, ১৩০১, অর্থাৎ ১৮৯৪ সাল নাগাদ একটি কাহিনি প্রকাশ হচ্ছে, নামঃ




Name:  সৈকত          

IP Address : 236712.158.782323.33 (*)          Date:12 Jul 2019 -- 05:34 PM

পূর্ণানন্দ ভক্তর বাকি কীর্তিগুলিতে যাওয়ার আগে, ঢাকার বই বিক্রেতা সেজে বই কেনার জন্য যে তালিকাটি সে বানিয়েছিল, সেটি আর একবার লক্ষ্য করি। তালিকাটিতে, প্রিয়নাথ নিজেই উপস্থিত ! একে নিয়তির কৌতুকই বলব যে পূর্নানন্দ পরবর্তীতে প্রিয়নাথের হাতেই ধরা পড়বে, তদুপরি প্রিয়নাথ তাকে নিয়েই একটি কাহিনি লিখে ফেলবেন, ঐ তালিকাটি সমেত ! প্রিয়নাথ ঠিক কখন জানতে পেরেছিলেন তাঁর নিজের নামের উল্লেখ, পূর্নানন্দের কীর্তিতে ? জেরা করার সময়ে ? তখন কি তাদের মধ্যে এই অদ্ভুত সমাপতন নিয়ে কথা হয়েছিল ? অথবা সেরকম কিছুই ঘটেনি, বিশেষ কারণেই।

তো তালিকাটিতে প্রিয়নাথের উল্লেখ নিয়ে কয়েকটি কথা বলার থাকে, তান্তিয়া ভীল বইটির সূত্র ধরেই।

'দারোগার দপ্তর' ছাড়াও, প্রিয়নাথ ১৮৮০ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে আরও কয়েকটি বই লিখেছিলেন - ১৩০৭ (১৯০০) সাল নাগাদ প্রকাশ হয়েছিল 'বুয়র ইতিহাস' যে সময়টায় দক্ষিণ আফ্রিকায় দ্বিতীয় বুয়র যুদ্ধ চলছিল; ১৩০২ (১৮৯৫) সাল নাগাদ 'পারসিক গল্প' নামে একটি বই যেখানে পারস্যে প্রচলিত কিছু গল্পকে নেওয়া হয়েছিল যদিও এটি এই প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়েরই লেখা কিনা একটু সন্দেহ থাকে, হলেও অনুমান করা যায় এটি অনুবাদকর্ম; ১৮৮৭ সাল নাগাদ 'আদরিণী' নামে সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখিত একটি উপন্যাস। ঠগী কাহিনি নামেও একটি বই প্রিয়নাথই লিখেছিলেন এরকমই জানা থাকলেও
তান্তিয়া ভীল বইটির সম্বন্ধে ইন্টার্নেটেই গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়ে শ্রাবণ, ১৩০১ সালে চুঁচুড়া থেকে প্রকাশিত 'বাসনা' নামে পত্রিকাতে 'ঠগী কাহিনি' বইটির উল্লেখ পাই। পত্রিকা সংখ্যাটিতে ' দারোগার দপ্তর'-এর এক অনুচ্ছেদের এক বিজ্ঞাপন আছে; বলা হয়েছে যে 'দারোগার দপ্তরের তৃতীয় বৎসর আরম্ভ হয়েছে, ডাকমাশুল বার্ষিক ১৪০ টাকা (খুবই অন্তর্দৃষ্টিমূলক ভাবে বইটিকে মহাভারতের সাথেও তুলনা করা হয়েছে ) এবং সেই সময়ে দারোগার দপ্তরের গ্রাহকেরা আরও দুইটাকা দিলেই সারবান ও মূল্যবান তিনটি বই উপহার হিসেবে দেওয়া হবে তাও বলা হয়েছে। এই উপহারের মধ্যে দু'খণ্ড ঠগী কাহিনি আছে যা ঠগী সর্দার মহম্মদ আলির জীবন চরিত যে ৭৯১-টি নরহত্যায় লিপ্ত ছিল। বিজ্ঞাপনটি থেকে স্পষ্ট হয়না যে এই 'ঠগী কাহিনি' প্রিয়নাথেরই লেখা কিনা, অনুমান করা যেতে পারে যে সেরকমই, সেই জন্যই হয়ত দারোগার দপ্তরের সাথে এই বইটিও দেওয়া হচ্ছে যা দেড় টাকা মুল্যের। (প্রিয়নাথের 'ঠগী কহিনি' ফিলিপ টেলরের ১৮৩৯ সালের উপন্যাসকে ভিত্তি করে লিখিত নাকি স্লিম্যানের মূল রিপোর্ট বা লেখার ওপর ভিত্তি করে রচিত, সেটা জানিনা। টেলরের লেখাও স্লিম্যানের লেখা থেকে অনেক কিছুই নিয়েছিল এবং খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল আবার অন্যদিকে এও হতে পারে প্রিয়নাথ তাঁর পুলিশে চাকরি সূত্রে হয়ত স্লিম্যানের লেখার সাথে সরাসরি পরিচিত ছিলেন এবং নিজের বইয়ের জন্য স্লিম্যানের লেখাকেই ভিত্তি করেছিলেন যদিও স্লিম্যানের লেখায় ঠগী সর্দার হিসেবে বেহরামের নাম ছিল যে ৯০০-র ওপর খুনের সাথে যুক্ত ছিল, নিজের হাতে খুন করেছিল অন্তত শ'দেড়েক।) বিজ্ঞাপনটিতে তিনটি বই উপহার হিসেবে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। 'ঠগী কাহিনি' ছাড়াও অন্য বইটি ছিল 'পঞ্চস্ত্রোত্র' যা শঙ্করাচার্য্য লিখিত পাঁচটি স্তবের মূল ও বাংলা অনুবাদ, আরও আট আনা দিলে, এই বইটিও গ্রাহকেরা পেয়ে যাবেন। এই বইটিও কি প্রিয়নাথেরই লেখা ? স্পষ্ট নয়।

'বাসনা' পত্রিকাটির সূত্রে 'ঠগী কাহিনি'-র প্রসঙ্গ যেমন আসে, তেমনি এও দেখি যে এই পত্রিকা সংখ্যাটিতেই, বাবু তুলসীদাস মুখোপাধ্যায় বি.এ দ্বারা ইংরেজীতে লিখিত 'তান্তিয়া ভিল' নামে একটি বইয়ের ছোট সমালোচনা আছে। বলা হয়েছে যে তান্তিয়া ছিল মধ্য ভারতের রবিনহুড সদৃশ চরিত্র এবং 'আমাদের জাতীয় গৌরবের কারণ'। সুতরাং ১৩০১/১৮৯৪ সাল নাগাদ প্রকাশিত পত্রিকায় যে এই ইংরেজী 'তান্তিয়া ভিল' বইয়ের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে, হতে পারে প্রিয়নাথ তার অনুবাদ করেছিলেন অথবা নিজেই তথ্য সংগ্রহ ক'রে নিজের বইটি লিখেছিলেন। কিন্তু যাই হোক না কেন, প্রিয়নাথের বইটি অন্তত ১৮৯০-র আগেই তো প্রকাশিত হতে হবে কারণ পুর্ণানন্দ ভক্ত ধরাই পড়ছে অন্তত ১৮৯০-র আগে তার শেষ অপরাধের ফলবশতঃ এবং যে কারণে ইংরেজ শাসনের একটি আইনের বদল ঘটছে, ১৮৯০-তে। সেরকম হলে আমি একটু ধন্দে পড়ি যে প্রিয়নাথ কি ১৮৯০ র আগেই অতখানি জনপ্রিয় যে তাঁর বই বঙ্কিম, বিদ্যাসাগর বা মধুসূদনের সাথে একই তালিকাভুক্ত হয়ে যেতে পারে ? এটা বক্তব্য নয় যে প্রিয়নাথের লেখা এঁদের লেখার সাহিত্যমূল্যের সাথে তুলনীয় কিনা, তুলনাটা মূলতঃ জনপ্রিয়তার। কারণ এই তালিকাটি শেষ পর্যন্ত ঐ সময়ে প্রচলিত 'জনপ্রিয়' আর পাঠকপ্রিয় লেখারই একটি তালিকা, গল্প-উপন্যাস-কাব্য মিলিয়ে। বঙ্কিম তো বাংলা ভাষার প্রথম ও প্রধান ঔপন্যাসিকই শুধু নন, তিনি প্রথম 'জনপ্রিয়' ঔপন্যাসিকও , তদুপরি 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকাও সাড়া ফেলে দেওয়া। মধুসূদনের কাব্যও সম্পূর্ন অন্য ধারার হয়েও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে কিংবা তাঁর নাটকগুলোও, কিন্তু এঁদের সাথে প্রিয়নাথ কি তুলনীয় ? প্রিয়নাথের 'দারোগার দপ্তর' প্রকাশিত হওয়া শুরু হচ্ছে ১৮৯১-৯২ সাল নাগাদ, চলবে পরবর্তী বারো-তের বছর, ১৮৯০-র সময় প্রিয়নাথ তাহলে সেরকম জনপ্রিয়তা পেয়েছেন কি যে পূর্ণানন্দ ঐ তালিকায় প্রিয়নাথের বইকে রাখছে, দুই খণ্ড হলেও ?

নাকি এই সম্ভাব্যতাটি ঠিক যে হয়ত পূর্ণানন্দর তালিকায় প্রিয়নাথ ছিলেনই না এবং 'তান্তিয়া ভিল' বইটি লিখছেন ১৮৯০-র পরেই (অনুবাদ বা নিজকৃতি)। কিন্তু 'দারোগার দপ্তর'-এ ১৮৯৩-৯৪ সাল নাগাদ যখন পূর্নানন্দের কাহিনিটি লিখছেন - পুর্ণানন্দকে গ্রেপ্তারের তিন-চার বছর পরে - যখ্ন তাঁর 'দারোগার দপ্তর' জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তখন তাঁর ইচ্ছে হয়েছিল অন্য জনপ্রিয় ও সৃষ্টিশীল লেখকদের সাথে - যারা বাংলা ভাষা আর বাঙালীর রুচি গড়ে তুলছেন, লেখায় নতুন যুগ এনেছেন - সাহিত্যসভায় সমান আসন অধিকার করার ? ফলতঃ নিজেকে এবং নিজের বইকে ঐসব লেখকদের সাথে - পূর্নানন্দরই মারফৎ - একই তালিকাভুক্ত করার ? এটা পুরোটাই অনুমান, তথ্য জোগাড় করতে পারলে এই সম্ভাব্যতাটি ভেঙে পড়তে পারে কিন্তু অবাক না হয়ে যদি মেনে নিই এরকমই ঘটেছিল, তাহলে প্রিয়নাথ (পুলিশ) একভাবে পুর্ণানন্দেরই (অপরাধী) দোসর হয়ে ওঠেন কারণ পুর্ণানন্দও চেয়েছিল সাহিত্য সমাজে জনপ্রিয়তা পেতে, ঐসব লেখকদের মতই বড় লেখক হয়ে উঠতে এবং তাঁদের সাথেই গণ্য হতে !!















Name:  ইন্টার্নেটে গোয়েন্দাগিরি          

IP Address : 236712.158.897812.124 (*)          Date:12 Jul 2019 -- 07:48 PM


https://i.imgur.com/SfrKCmI.jpg


Name:  Reference          

IP Address : 237812.68.345623.178 (*)          Date:12 Jul 2019 -- 07:58 PM


https://i.imgur.com/CZcdtJH.jpg


Name:  সৈকত          

IP Address : 236712.158.566712.143 (*)          Date:12 Jul 2019 -- 08:42 PM

গোয়েন্দা মশাই, প্রথম বিজ্ঞাপনটি কোন সালের জানা আছে ? আমার ধারণা, অন্তত ১৩০৫/১৮৯৮-৯৯ এর, কারণ ৬ সংখ্যা দপ্তরের উল্লেখ করা হয়েছে। এর এক-দু বছরের মধ্যেই বাণীনাথ নন্দী বদলে গিয়ে নতুন প্রকাশক আসেন।


* বাজে ভুল করেছি, আগের লেখায়, ডাকমাশুল ১৪০ টাকা লিখে, ওটা দেড় টাকা।




Name:  dc          

IP Address : 236712.158.895612.210 (*)          Date:12 Jul 2019 -- 09:02 PM

আমার একটা কৌতূহল আছে, সেটা ঠিক লেখা নিয়ে নয়, সৈকতবাবুর লেখার স্টাইল নিয়ে। প্রসঙ্গের বাইরে মন্তব্য করার জন্য আগেই সরি চেয়ে নিলাম।

অনেক জাগাতেই দেখছি অতীত আর বর্তমান কাল মেশানো হয়েছে, যেমন "গল্পটি প্রকাশের কয়েক বছরের মধ্যেই লেখাটি নিস্চয় প্রিয়নাথবাবু পড়ে ফেলতে পারছেন" আর "শার্লক হোমসের গল্পটি বইতে সংকলিত হচ্ছে ১৯০২-০৩ সাল নাগাদ"। যেহেতু এগুলো অতীতের ঘটনা, তাই এমনিতে লেখা উচিত "গল্পটি প্রকাশের কয়েক বছরের মধ্যেই লেখাটি নিস্চয় প্রিয়নাথবাবু পড়ে ফেলতে ফেলেছিলেন" আর "শার্লক হোমসের গল্পটি বইতে সংকলিত হয়েছিল ১৯০২-০৩ সাল নাগাদ"।

এরকম লেখার স্টাইল আরও দুয়েকজনের লেখায় দেখেছি, যেমন খ দা। কিন্তু মাইরি বলছি খ দার লেখার একটা সেনটেন্সও ঠিকমতো বুঝতে পারিনা, তাও খ দা কে একবার জিগ্যেস করেছিলাম, বোধায় খ দা দেখতে পায়নি বা ইগনোর করে গেছে। আমার কৌতূহল যে আপনারা এভাবে অতীত আর বর্তমান মিশিয়ে দেন কেন? এটা কি গুরুর নিজস্ব স্টাইল, যেমন কিনা আবাপর নিজস্ব বানান? আমার এরকম লেখার স্টাইল বেশ উদ্ভট লাগে, পড়তে গিয়ে হোঁচট খাই। তবে এটা একেবারেই আমার নিজস্ব অবসার্ভেশান, প্রত্যেকের নিজের মতো করে লেখার স্বাধীনতা আছে, সে নিয়ে কোন মন্তব্য নেই ঃ-)


Name:  গোয়েন্দা          

IP Address : 237812.68.565623.145 (*)          Date:12 Jul 2019 -- 09:12 PM

ডিসি,
পাস্ট পারফেক্ট কন্টিনিউয়াস টেন্স জানা আছে?

ঠগী কাহিনী
সংকলক: প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
৩০০.০০
অরুণা প্রকাশন
১৮৩৫-এ উইলিয়াম হেনরি স্লিম্যান এক কুখ্যাত ঠগিকে গ্রেফতার করেন এবং তাকে রাজসাক্ষী হতে রাজি করান। তার সাক্ষ্যের সূত্র ধরেই ঠগিদের নির্মূল করা সম্ভব হয়। ১৮৩৯-এ স্লিম্যান যখন ‘কমিশনার ফর দ্য সাপ্রেশন অব ঠগি অ্যান্ড ডেকয়টি’ পদে নিযুক্ত হচ্ছেন, সেই বছরেই ইংল্যান্ডে প্রকাশিত হল ঠগিদের নিয়ে ফিলিপ মেডোজ টেলরের লেখা উপন্যাস কনফেশনস অব আ ঠগ। এ কাহিনিতে আমির আলি নামে এক ঠগি লেখকের কাছে তার জীবনবৃত্তান্ত বর্ণনা করে এবং ঠগিদের নানা ভয়ংকর অভিযানের খুঁটিনাটি বিবরণ দেয়। প্রকাশিত হওয়ার পরই টেলরের উপন্যাস অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং সত্যি ঘটনার মতোই গুরুত্ব পায়। বাংলায় গোয়েন্দা গল্প রচনার অন্যতম পথিকৃৎ প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৫৫-১৯১৭) যিনি নিজে পুলিশে চাকরি করতেন এবং ‘দারোগার দপ্তর’ নামে মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন, তিনি টেলরের বইটি থেকে সংকলন করে প্রকাশ করেন ঠগী কাহিনী। তাঁর মতে, ‘ঠিক অনুবাদ নহে, তথাপি তদবলম্বনে লিখিত’। পুনর্মুদ্রিত বইটির নতুন ভূমিকার প্রয়োজন ছিল।

--- পুস্তক পরিচয়
আবাপ
২৬ নভেম্বর, ২০১৭


Name:  গোয়েন্দা          

IP Address : 237812.68.565623.145 (*)          Date:12 Jul 2019 -- 09:19 PM

এটা পিডিএফের ওসিয়ার তাই কিছু গন্ডোগোল আছে, যেমন, Bengahs = Bengalis ইত্যাদি। তবু এত ছবিপত্র দেওয়ার সময় নেই, তাই টেকস্ট কপি করলাম, মোদ্দা বিষয় প্রিয়নাথের জনপ্রিয়তা।


Though Nagendranath Gupta (1861-1940) wrote "Churi Na
Bahaduri" ("Theft or an Act of Bravado?") in the April 1886-edition of Bharati, a monthly
literary magazine edited by Swamakumari Debi (1855-1932), the history of Bengali detective
ficfion formally began in April 1892, with the publication of "Banomah Daser Hatya" ("The
Murder of Banomali Das"), the first story of the 206-tale-strong Darogar Daftor ('The Office
of the Officer-in-Charge">-series written by Priyanath Chattopadhyay (1855-1947), an
employee with the detective department of Calcutta Police (started in 1868) between 1878 and
1911. In Sangshad Bangla Sahityasangi. Sisir Kumar Das observes, "Priyanath Mukhopadhyay
first started [the] trend [of detective fiction] in BengaU literature" (96). In its review of the
thirteenth, fourteenth and fifteenth volumes of Darogar Daftor. the June 1893-issue of Bharati
wrote, "What Mukhopadhyay is trying to do is noble to us" that echoed Damodar Debshanna's
observation, "We can easily count Babu Priyanath Mukhopadhyay's detective narratives as
highly original sensational novels" (Mukhopadhyay, Darogar 5-7). The first book of the series,
which ran for twelve years, was pubUshed by Baninath Nandi on behalf of M/s. Sikdarhagan
Bandhob Pustakalaya O Sadharan Pathagar, Calcutta, though he was later succeeded by
Upendrakishore Choudhury.
The first formal Bengali detective fiction introduced a
police officer-in-charge working under the British administration against the colonised
members of his own community, and Mukhopadhyay's very conception of the protagonist
pointed to an overwhelming influence of the imperial canon. The stories were based on the
real-life experiences of the author, who, being an administrator and the receiver of British titles
and honours, regarded the Indians as dangerous thieves and necessarily malignant. In his other
novels, Tantia Bhil. Detective Police. Thagi Kahmi ("The Thagis"), Boer Yuddher Itjfaash
("The History of the Boer War") and the autobiographical Tetrish Bathshorer Pohce Kahini.
ba, Priyanath Jeevani ("Police Tales of Thirty-three Years, or, Priyanath's Autobiography"),
Mukhopadhyay points out to the various aspects of "superb governance" by the English
colonisers. Ranojit Chattopadhyay and Siddhartha Ghosh write, "Priyanath was just a story
teller, not a litterateur per se. He simply chronicled his experiences in contemporary Bengali
language." (748). But his anti-colonised ideology received a wide readership "among the
Bengahs, the Assamese, the Hindustanis, the Oriyas, the Maharastrians, the Sikhs and the
EngUshmen" (Mukhopadhyay 8). The 30 April 1893-issue of Hope commented, "Babu
Priyanath Mukherjee is well-known to the public as a writer of popular detective fiction, and
his latest volume, Kulsam, sustains his previous reputation" (Mukhopadhyay, Darogar 6). It
was only in Ingrej Dakat ('The Englishman Dacoit") that he obliquely hinted at the evil in the
colonisers' psyche. That Mukhopadhyay was an employee of the Calcutta Police, an institute
founded in 1856 to control and obliterate the Bengali nationalists, was itself an assertion of his
ignoble collaboration with the imperialists. In "About KoUcata Police: the Empire at its
Zenith", the official website of the police branch informs:
"In 1856 the Govemor-General promulgated an Act treating Calcutta Police as
a separate organization and S. Wauchope, who was then the chief magistrate
of Calcutta, was appointed as the first commissioner of police. He had to face
difficult days because of the Sepoy Mutiny of 1857, the first upsurge against
British rule. He handled the situation ably (italics mine) and was knighted for
his achievement. During the incumbency of his successor V.H. Schalch the
Calcutta Police Act and the Calcutta Suburban Police Act, which are still in
force, were enacted in 1866. Two years earlier (1864) the Commissioner of
Police had become the Chairman of the Justices as well and a Deputy
Commissioner was appointed to look after the executive police. It was Sir
Stuart Hogg who first set up the Detective Department in Calcutta Police in
November 1868 with A. Younan as the superintendent and R. Lamb as the
first-class inspector..." ^^.

প্রথম বিজ্ঞাপনের সাল জানা নেই, কারণ DSPACE এত বাজে ভাবে সার্চ রেজাল্ট দেয়, আরেকটু ঢুকে খুঁজলে পাওয়া যাবে হয়তো। এটা থেকে --
http://dspace.wbpublibnet.gov.in:8080/jspui/bitstream/10689/22657/8/Ap
pendix.pdf



Name:  গোয়েন্দা          

IP Address : 236712.158.9007812.111 (*)          Date:12 Jul 2019 -- 09:28 PM

শরৎচন্দ্র ভট্টাচার্যের ১৩৬ পাতা-র তান্তিয়া ভিল নাটক ছাপা হচ্ছে ১৮৯৩ সালে।
উইকিসোর্স বলছে প্রিয়নাথের আদরিনী ১৮৮৭ তে প্রকাশিত।
বুয়র ইতিহাস ১৩০৭

প্রথম বিজ্ঞাপনের লিস্টের ক্রম যদি কালানুসারে হয়, তাহলে ১৮৮৭-১৮৮৮ সালেই "তান্তিয়া ভিল" বই প্রকাশের সময় হওয়া উচিত। পরে আরেকটু খুঁজব।


Name:  dc          

IP Address : 236712.158.565612.163 (*)          Date:12 Jul 2019 -- 10:37 PM

গোয়েন্দাকে ধন্যবাদ, কিন্তু এটা কি ঠিক পাস্ট পারফেক্ট কন্টিনিউয়াস টেন্স এর উদাহরন? সেরকম হলে তো লেখা হয় was being compiled বা এক্ষেত্রে হয়তো "শার্লক হোমসের গল্পটি বইতে সংকলিত হচ্ছিল ১৯০২-০৩ সাল নাগাদ"। তার বদলে "সংকলিত হচ্ছে" তো একেবারে প্রেসেন্ট টেন্স! অবশ্য জানিনা ঠিক লিখলাম কিনা, গ্রামারে আমি ভয়ানক কাঁচা ছিলাম। আরেকটা কথা হলো, এক্ষেত্রে পাস্ট পারফেক্ট কন্টিনিউয়াস টেন্স ব্যবহার করা হবেই বা কেন, যখন "হয়েছিল" লিখলে বা অতীত কাল ব্যবহার করলে আরও সহজে বোঝানো যায়? (আরও একবার ডিসক্লেমার দিয়ে দি, সৈকত কিভাবে লিখবেন সেটা একেবারেই তাঁর ব্যপার। আমিই বোধায় বাজে হ্যাজ দিচ্ছি।)


Name:  b          

IP Address : 236712.158.9007812.111 (*)          Date:12 Jul 2019 -- 11:27 PM

ডিসির শেষ সেন্টেন্সে বড় করে ক দিলাম।



Name:  dc          

IP Address : 236712.158.676712.162 (*)          Date:12 Jul 2019 -- 11:33 PM

বুঝেছি :d এই আলোচনা তাহলে আর না।


Name:  সৈকত          

IP Address : 237812.69.3434.136 (*)          Date:12 Jul 2019 -- 11:53 PM

গোয়েন্দা - সূচীটা কালামুক্রমিক নয় মনে হয়। ডাক্তারবাবু গল্পটি ১৩০৪-এর, রাজাসাহেব আর টিকেন্দ্রজিৎকে গল্পগুলি ১৩১১ সালের। অর্থাৎ এই তিনটে লেখা ১৮৯৭ থেকে ১৯০৪-এর মধ্যে। এর মধ্যে আদরিণী ১৮৮৭ সালের ! খুঁজে পেলে জানিও।

ডিসি - আপনি লেখার যে জায়্গাটা উল্লেখ করেছেন, সেখানে এইভাবে লেখাই যেত - প্রিয়নাথবাবু কাহিনিটি লিখেছিলেন ১৩১৩ সালে অথবা শার্লক হোমসের গল্পটি বইতে সংকলিত হয়েছিল ১৯০২-০৩ সাল বা কয়েক বছরের মধ্যেই লেখাটি নিস্চয় প্রিয়নাথবাবু পড়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু আমি ঐ সময়টা জুড়ে একটা কন্টিনিউটি আনতে চাইছি, কয়েক বছরের ব্যবধানে বিলেতে বা এখানে যা ঘটছে, সেসবের মধ্যে। ক্রিয়ার কালগুলোকে অতীতেই রেখে দিলে বা শেষ করে দিলে সেটা ঘটেনা বলে মনে করি।




Name:  সৈকত          

IP Address : 237812.68.121223.51 (*)          Date:13 Jul 2019 -- 01:34 AM

সব অপরাধীই তার সমসময়ের পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে, সেই সময়ের ফা`ক ও ফাঁকিগুলিকে, পুর্ণানন্দও তাই করেছিল। বার বারই ঘুরে ফিরে আসে এই কথাটিই এবং যার জন্য এই কাহিনিটি অত্যন্ত স্বাদু হয়ে ওঠে, যে সে একজন উনলেখ হিসেবে বইয়ের হগত আর বই ব্যবসাকে, যা তার চেনা, তাকেই ব্যবহার করেছিল। বই ব্যবসার তো দুটি দিক, ক্রেতা আর বিক্রেতা। নিজের লেখা চিরন্মদা বই নিয়ে সে যা করেছিল অথবা জীবনীচরিতটি লিখে, তার মধ্যমে সে বিক্রেতাদের ঠকিয়েছিল, তারা যেভাবে ব্যবসা করত অথবা তাদের যা আকর্ষণ করত,সেগুলিকে ব্যবহার করে। আর সংবাদপত্র প্রকাশের কথা বলে অথবা আদিরসাত্মক বইয়ের সুত্রে সে ব্যবহার করেছিল ক্রেতা অর্থাৎ পাঠকদের ইচ্ছেকে। যতদিন পর্যন্ত সেই ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে তার লোক-ঠকানো কারবারকে সীমিত রেখেছিল ততদিন সে তার 'ব্যবসা' চালিয়ে যেতে পেরেছিল, পুস্তক বিক্রেতারা ঠকে গিয়েও বেশী ঝামেলা করেনি অথবা পাঠকেরাও বিশেষ করে মফস্বলের পাঠকরা যাদের সে নিশানা করেছিল। আইনের আওতায় সে বিশেষ আসেনি যদিও আদিরসাত্মক বইয়ের ক্ষেত্রে কিছু কোর্ট-কাছরি হয়েছিল, কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে এই কাজগুলি করতে করতেই যখন তার সুযোগের ক্রমশঃ অভাব ঘটছিল, জুয়াচুরি আর চালানো যাচ্ছিল না আবার সাহসও বেড়ে যাচ্ছিল, ফলতঃ সরকারী ব্যবস্থার ফাঁককে ব্যবহার করা শুরু করে, তখনই সে ধরা পড়ে এবং শাস্তিপ্রাপ্ত হয়।

চার-পাঁচদিন পরিশ্রম করে সে 'চতুর্দ্দশরত্ন' নামে একটি পুস্তক সংকলন করে জাতে ১৪ জন প্রসিদ্ধ ব্যক্তির জীবনীচরিত বর্ণিত হয়। সে নিজে কিছু লেখেনা বা তথ্য জোগাড় করে না, '১৪ খানি ভিন্ন ভিন্ন গ্রন্থ হইতে' সে এই বইটি তৈরী করেছিল। ছাপাখানার অভাব ছিল না, সে যে জায়গায় কারবার চালাচ্ছে সেটা তো উত্তর কলকাতা, বটতলারই কাছকাছি জায়্গাগুলো, যেখানে সেই উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে তার সময়কাল পর্যন্ত ছাপাখানার অভাব নেই। অতএব কিছু বই ছাপিয়ে সে এক পুস্ত্ক বিক্রেতাকে তার এই বইয়ের কথা জানায় এবং ধার্য হয় যে ঐ বিক্রেতার দোকান থেকেই বইগুলি বিক্রে হবে, পরিবর্তে বিক্রেতাটি শতকরা ২৫ তাকা কমিশন পাবেন। এই সিদ্ধান্ত হয় যে ঐ বিক্রেতার নামে বইটির বিজ্ঞাপন হবে এবং সেটা হলে ঐ বিক্রেতাটি জে অন্য দোকানদারের থেকে বেশী বিক্রী করতে পারবে সে ব্যাপারে পুর্ণানন্দের সন্দেহ নেই। দোকাননদার সম্মত হয়, কারন সে খোস্সমোদপ্রিয় তদুপরি কোন কমিশন সেলে বই বিক্রে করলে কোন দোকানদারেরই ক্ষতি হয়না। পুর্ণানন্দ অতএব যেভাবে এই ক্ষেত্রে ঠকানোর কাজটি করেছিল সেটি বই ব্যবসার এই বিশেষ দিকটি, অর্থাৎ কমিশন সেলের লোভ। এর পর থেকে পূর্নানন্দ করে সে সবই মিথ্যে, বিজ্ঞাপন বেরোয়, নিজেই বিভিন্ন ভুয়ো ঠিকানা থেকে দোকানদারের ঠিকানায় গ্রাহক হওয়ার চিঠি পাঠাতে থাকে; কিছুদিন পরে দোকানদারের কাছে গিয়ে চিঠিগুলি দেখে কিন্তু গল্প ফাঁদে যে তার অতি শীঘ্রই টাকার দরকার হয়ে পড়েছে, বই বিক্রীর জন্য অপেক্ষা করলে তার অসুবিধেই হবে, অতএব আর একজন বিক্রেতার সাথে কথা হয়েছে যে তখনই সব বইগুলি কিনে নিতে চায়। প্রথম দোকানদারটি চিঠির পরিমাণ দেখে লোভে পড়ে গেছে, অন্য কেউ টাকা দিয়ে পুর্ণানন্দের বইগুলি কিনে নিলে তার ক্ষতিই হবে ভেবে, সে পুর্ণানন্দের কথামত পাঁচশো পঞ্চাশ টাকায় প্রথম দুশো কপি বই কিনে নেয় এবং ছাপাখানা থেকে বাকি বইগুলিও আনিয়ে নেবে, এরকমই বলে। এর পরে স্বাভাবিকভাবেই যা হওয়ার তাই হয়, গ্রাহকের ভুয়ো ঠিকানায় দোকানদারটি বই পাঠাতে থাকে পরিবর্তে টাকা পাবে ভেবে কিন্তু সব বইই ফিরে আসতে থাকে, দোকানাদারটি সাড়ে পাঁচশো টাকা ঠকে যায়। ক্রমশঃ দোকানদারটি এক বন্ধুর সাহায্যে পুরো ব্যাপরটি বুঝতেও পারেম যে বইয়ের কাটতির লোভ আর কমিশন সেলের লোভ দেখিয়েই পূর্নানন্দ জুয়াচুরিটি করেছে, পুর্নানন্দকে উকিলের ভয়ও দেখায় কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই করে উঠতে পারে না ও চুপ করে যায়।

সংবাদপত্র ছাপা নিয়ে সে যা করেছিল সেই পুরো ব্যবস্থাটি আরো একটু জটিল। মনে হয়, ক্রমশঃ পুর্নানন্দের লোভ বেড়ে যাচ্ছিল অথবা ছোটখাটো জুয়াচুরির উপায়টি কমে আসছিল, বড় দাও মারতে চেয়েছিল সে। এখানে সে কিছুই ছাপায়নি পর্যন্ত, বিজ্ঞাপন দেয় এই মর্মে যে একটি নতুন সাপ্তাহিক সংবাদ্পত্র প্রকাশিত হবে যেখানে রাজনীতি, সমাজনীতি, সাহিত্য, সংবাদ প্রভৃতি বিষয় নিয়ে লেখা থাকবে, উপরন্তু যে লেখক যে বিষয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ তাঁরাই সেখানে লিখবেন। উপরন্তু গবর্নমেন্টে কর্মরত 'বর্তমানের সুপ্রসিদ্ধ লেখকদিগের' মধ্যে অনেকেই লিখবেন যদিও সংবাদপত্রে তাদের লেখা নিষিদ্ধ। কিন্তু এইটি সামান্য। বিজ্ঞাপনে বলা হয় যে এই সংবাদপত্রটি চালানোর জন্য বিভিন্ন রাজা-রাজড়ারা পঞ্চাশ হাজার টাকা শহরের প্রধান ও বিশ্বস্ত ব্যাঙ্কে জমা রেখেছেন এবং উৎসাহী গ্রাহকরা ডাকমাশুল বাবদ পাঁচ টাকা করে পাঠালে, তারা ঐ টাকাটি পেতে পারেন; আগে গ্রাহক হওয়ার ভিত্তিতে কোন গ্রাহক দশ হাজার টাকা পর্যন্ত পেতে পারে। টাকা বিলি করার প্রক্রিয়াটি হবে লটারী মারফৎ এইরকম বলেও আসলে পুর্ণানদের ইচ্ছে ছিল, যারা টাকা পাঠাবে তাদের টাকা সে সরাতে থাকবে, বিশেষ করে মফস্বলের গ্রাহকদের টাকা, লটারী বা সুরতি খেলাটি সে আর করবে না। কিন্তু লোক জানাজানি হওয়া শুরু হলে সে খেলাটি সংগঠিত করে, কিন্তু ভুয়ো কিছু গ্রাহকদের নামে টাকা পাঠাচ্ছে বলে সে আসল গ্রাহকদের প্রতারণা করে এবং শেষ পর্যন্ত কোন সংবাদ্পত্রই না ছাপিয়ে সে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করে। প্রতারনাটি শেষ করে এই বলে যে গবর্নমেন্ট চৈত্র মাস অবশি লটারী খেলার অনুমতি দিয়েছিল এবং সেই সময় শেষ হয়ে যাওয়াতে কাগজটিই আর বেরোবে না !


দুটি ঘটনার ক্ষেত্রেই সে বিজ্ঞাপনকে যারপারনাই ব্যবহার করেছিল। উনিশ শতকের বিজ্ঞাপনের প্রসার, বৈচিত্র আর চীৎকৃত মন্তব্য মারফৎ লোক আকর্ষণের যে উপায়টি চলত, পেছনে থাকত নিত্যনতুন সামাজিক ঘটনা আর উদ্ভাবনের মদত, ব্যবসাবৃত্তির এই দিকের সাথেই সে যোগ করেছিল ভাল লেখা পড়ার বা বড় লেখকদের লেখা পড়ার লোভ, বিশেষ করে মফস্বলের মানুষরা যারা কলকাতা থেকে দূরে থাকার জন্যই এইসব থেকে বঞ্চিত অথচ অন্যদিকে এইসব জুয়াচুরিও তাদের অজানা, তাদের সে আকৃষ্ট করতে পেরেছিল। এবং সবকিছুর ওপরে সে রেখেছিল টাকার লোভকে; কিছু না করেই বিনা আয়াসে টাকা রোজগার করে ফেলা যাবে, তার বুদ্ধির উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে সে এই ইচ্ছেটিকেও ব্যবহার করেছিল।

মনে হয়, পূর্ণানন্দ শুধু তার সময়কে শুষে নিয়েছিল।




















Name:  গোয়েন্দা          

IP Address : 236712.158.895612.132 (*)          Date:13 Jul 2019 -- 03:21 AM

তাঁতিয়া ভিল প্রকাশিত হয় ১৮৮৯ সালের ২২শে নভেম্বর। নিচের ছবিটার লাস্ট বাট ওয়ান এন্ট্রি।
ছবি অস্পষ্ট মনে হলে গুগুল ড্রাইভের লিংক দিলাম সেখান থেকে পিডিএফ নামিয়ে নিন।

এবার বলুন এই সাড়েতিনঘন্টা ব্যাপী ঘুম নষ্ট করা বেগার খাটুনির রিটার্ন কি?


https://i.imgur.com/x0uqZE4.jpg

https://drive.google.com/open?id=1DTSaKj9MOYrWCxjyZykaCBdlDs8cw-Tp


Name:  dc          

IP Address : 124512.101.89900.213 (*)          Date:13 Jul 2019 -- 07:38 AM

সৈকতকে ধন্যবাদ, কিছুটা বুঝলাম।


Name:  -          

IP Address : 236712.158.895612.132 (*)          Date:13 Jul 2019 -- 09:22 AM

পুনশ্চ কি ২০৬ টি গল্পই রিপ্রিন্ট করতে পেরেছে? সূচীপত্রগুলোর ছবি তুলে এখানে পোস্ট করা যাবে?


Name:  lcm          

IP Address : 237812.68.344512.125 (*)          Date:13 Jul 2019 -- 09:56 AM

দুরন্ত! পূর্ণানন্দ তো নাইজেরিয়া স্ক্যাম (ইমেইল) ইন্টারনেট/ইমেইল যুগের অনেক আগেই করেছে !


Name:  সৈকত          

IP Address : 236712.158.566712.61 (*)          Date:13 Jul 2019 -- 10:12 AM

ডার্ক ওয়েব থেকে ক্যাটালগটি তুলে আনার জন্য গোয়েন্দাকে নেটবাহাদুর উপাধি দেওয়া হল। প্রিয়নাথ যেমন রায়বাহাদুর উপাধি পেয়েছিলেন 😀

- কে ঃ পুনশ্চ সবকটা গল্প ছাপায়নি, দুই খণ্ড মিলিয়ে শ'খানেক কাহিনি আছে।

ছবি দিতে সন্ধ্যে-রাত হবে।




Name:  সৈকত          

IP Address : 237812.69.3434.136 (*)          Date:13 Jul 2019 -- 10:55 PM

পুনশ্চ-র বইয়ের সূচীপত্র।

১ম খন্ড, এপিঠ-ওপিঠ।


https://i.postimg.cc/B6Zqd6xC/20190628-075237.jpg


https://i.postimg.cc/xjwdd0Y9/20190713-214340.jpg

২য় খন্ড, এপিঠ-ওপিঠ।


https://i.postimg.cc/s2xzc8yn/20190628-075256.jpg


https://i.postimg.cc/QCrvRnGZ/20190628-075303.jpg




Name:  সুকি           

IP Address : 237812.68.786712.15 (*)          Date:14 Jul 2019 -- 10:15 AM

খুব ভালো হচ্ছে এটা।

আচ্ছা, ঠগী কাহিনী কি প্রিন্টে পাওয়া আচ্ছে? আমি এই নিয়ে এখন কিছু পড়ছি - অভিযান থেকে বেরোনো 'সপ্তরিপু' বলে বইটি শেষ করলাম। এখন পড়ছি Mike Dash এর লেখা "THUG - The True Story of India's Murderous Thug". বাংলায় এই নিয়ে কি কি ভালো বই আছে খোঁজা হয় নি, আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে ভালো বই নেই, এখন এটার খোঁজে পেয়ে ভালো লাগল।


Name:  b          

IP Address : 236712.158.891212.97 (*)          Date:14 Jul 2019 -- 01:05 PM

ইয়ে, ঠগী/পিন্ডারী সম্পর্কে পড়তে হলে সিপাহি থেকে সুবাদার পড়ে ফেলুন।


Name:  ~          

IP Address : 236712.158.455612.186 (*)          Date:14 Jul 2019 -- 10:17 PM

বাঃ সূচিপত্র কাজের হয়েছে। এবার জানার, কোন গল্প দারোগার দপ্তরের কোন সংখ্যায় বেরিয়েছিল, এবং প্রকশের সাল মাস দেওয়া আছে কিনা। archive এ রয়েছে এমন বহু গল্পই এই দুই সংকলনে নেই দেখছি।


Name:  সৈকত          

IP Address : 236712.158.782323.33 (*)          Date:15 Jul 2019 -- 10:13 AM

পুনশ্চর বইদুটোতে, প্রতি লেখার সাথে বাংলা মাস আর বছর দেওয়া আছে। নির্দিষ্ট ক'রে কোন বছরের দপ্তরে প্রকাশিত সেটা দেওয়া নেই, তবে মোটামুটি হিসেব করে নেওয়া যায়, ১২৯৯ কে দপ্তর শুরুর সাল ধরে।

নেটে archive ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় আরো কিছু লেখা আছে, সেটা দেখেছি।






Name:  সৈকত          

IP Address : 236712.158.782323.47 (*)          Date:15 Jul 2019 -- 04:52 PM

পূর্ণানন্দ ভক্ত এরকম একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছিল যে সে অনেক কষ্ট করে চারটি বই ছাপাতে পেরেছে কিন্তু বিক্রী করতে পারবে কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত নয় কারণ গবর্ণমেন্ট চেষ্টা করছে তাকে বিপদাপন্ন করতে। তাই কোন পাঠক বইগুলি পেতে চাইলে উপযুক্ত মূল্য দিয়ে তাদের শীঘ্রই গ্রাহক হতে হবে। বইগুলি ছিলঃ

১। রতিশাস্ত্র - মূল্য, ২ দুই টাকা
২। সম্ভোগ রত্নাকার - মূল্য, ৫ পাঁচ টাকা
৩। কামরত্ন - মূল্য, ২।।০ আড়াই টাকা
৪। লজ্জাতন্নেসা - মূল্য, ৮ আট টাকা

এই পুস্তকগুলি নিতান্ত অশ্লীল এবং যে প্রকাশ করবে সে আইন অনুযায়ী দন্ডিত হবে কিন্তু তাও পূর্ণানন্দ এগুলো ছাপিয়ে বিক্রী চায় তার একটি পরিপ্রেক্ষিত আছে, যেটি এরকমঃ


রেভারেন্ড জেমস লং - মিশনারী, শিক্ষাব্রতী, ভারত হিতৈষী - প্রথমে ১৮৫২ সালে শ্রীরামপুর প্রেস থেকে, পরে আরো বড় আকারে ১৮৫৫ সালে কলকাতার একটি প্রেস থেকে গত পঞ্চাশ বছরে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বইয়ের একটি তালিকা প্রকাশ করেছিলেন (A Descriptive Catalogue of Bangali Works Containing a Classified List of Fourteen Hundred Bengali Books and Pamphlet ) । এদেশে ছাপাখানা আসার পর - ইংরেজরা যেমন ভেবেছিল - যে তার মাধ্যমে এদেশীয় মানুষের মধ্যে জ্ঞান বৃদ্ধি ঘটবে, সত্যি সেরকম ঘটছে কিনা, কিরকম বই ছাপা হচ্ছে সেটা জানা থাকলে ঐ ধারণাটি স্পষ্ট করে নেওয়া যাবে, বইয়ের জনপ্রিয়তা দিয়ে বুঝে নেওয়া যাবে সাধারণ লোকের চিন্তাভাবনাগুলো, তালিকাটি তৈরীর এটি একটি কারণ ছিল। আরও একটি কারণ ছিল যে জেমস লং মনে করতেন ইংরেজী শিক্ষা প্রচলিত হয়ে সেই শিক্ষায় শিক্ষিত নব্যশিক্ষিতরা যথেষ্ট পরিমানে বাংলায় লিখিত বইপত্র পড়ছে না; না পড়ার একটি কারণ তিনি মনে করেছিলেন যে বাঙালী শিক্ষিতরা জানেনা ঐসব বই কোথায় ছাপা হয়েছে বা কোথা থেকে পাওয়া যাবে, ফলতঃ এরকম একটি তালিকা প্রস্তুত করলে বইয়ের খোঁজ আরো সহজলভ্য হবে। ১৮৫৫ র তালিকাটিতে - যাতে প্রায় ১৪০০ টি বইয়ের খবর ছিল যা ভাগ করা হয়েছিল পঞ্জিকা, গণিত, জীবনী, ব্যকরণ, আইন, ইতিহাস, মুসলমান-বাংলা সাহিত্য, কাব্য ও নাটক প্রভৃতি নিয়ে তিতিশটির মতো বিভাগে - পরবর্তীকালে অতীব ঐতিহাসিক মূল্য পেয়েছে কারণ তালিকাটি থেকে জানা যেত উনিশ শতকের প্রথম পঞ্চাশ বছরের বইয়ের হিসেব এবং আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে যে এই তালিকাটি থেকে পাওয়া যেত কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত প্রেস সম্বন্ধীয় তথ্য যেখানে vernacular বা বাংলায় বই ছাপা হত। গঙ্গাকিশোর ভটাচার্য ১৮১৫ নাগাদ বটতলা অঞ্চলে যে প্রেসকার্যের শুরু করেছিলেন, রামমোহনও যার সাথে যুক্ত ছিলেন, সেই কাজের পূর্নতা দিয়েছিল জেমস লঙের এই তালিকাটি; কারণ আদত বটতলা অঞ্চল থেকে শুরু হয়েও প্রেসের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে প্রেসগুলি ছড়িয়ে পড়েছিল কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিন, বেশী করে যদিও উত্তর দিকেই এবং এই তালিকাটিকে ভিত্তি করে ঐসকল প্রেসের হদিশ পাওয়া যেত, তখনও এবং পরবর্তীতেও।

তো, এই তালিকাটিতে জেমস লঙ অন্তত তিরিশটি মতো আদিরসাত্মক বইয়ের উল্লেখ করেছিলেন (যেমন, আদি রস, বেশ্যা রহস্য, হেমলতা রতিকান্ত, প্রেম বিলাস, রতি বিলাস, রসতরঙ্গিনী, শৃঙ্গার বিলাস ইত্যাদি) যেগুলো তাঁর মতে গদ্য বা পদ্যে লিখিত এবং ছাপাখানার দৌলতে যাদের একাধিক সংস্করণ বহুল প্রচারিত, কিন্তু এগুলি বিশেষরকমের ফরাসী বইয়ের মতই খুবই খারাপ (beastly equal to the worst of the French School)। মোটের ওপর কিন্তু বাংলা বইয়ের ছাপা নিয়ে, বিভিন্ন বিষয়ে বাংলা বইয়ের প্রসার নিয়ে জেমস লং সন্তুষ্টই হয়েছিলেন, ফলে আরো একটু পরে গিয়ে ১৮৫৯র রিপোর্টে দেশীয় ভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা নিয়ে তিনি জোরের সাথে সওয়াল করেন, যা নিয়ে কোম্পানী আমল থেকেই প্রশাসনের মধ্যে দ্বন্দ ছিল। কিন্তু জেমস লঙকে কিছু পরিমাণে যা বিরক্ত করেছিল - মিশনারী হিসেবে আরোই - সেটি ঐসকল অশ্লীল বইয়ের ছাপা ও প্রচুর প্রচার, জেমস লঙের তথ্য মতে ঐরকম কিছু বই অন্তত দশ-বিশ হাজার ছাপা ছিল, সবচেয়ে প্রচারিত বইটি যাতে 'নোংরা ছবি"-ও ছিল তার প্রচারসংখ্যা ছিল অন্তত তিরিশ হাজার ! সাধারণভাবে প্রেসকে নিয়ন্ত্রন করার ব্যাপারে জেমস লঙের কোনো ইচ্ছে ছিল না কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন যে গবর্ণমেন্ট নিয়ম করে অশ্লীল পুস্তক, ছবি ইত্যাদি ছাপা ও বিক্রী বন্ধ করুক। ফলতঃ ১৮৫৬ সালে নতুন আইন জারি হচ্ছে সেরকমের লেখাপত্র নিয়ন্ত্রনের জন্য (Obscene Books and Pictures Act,1856), সময়কালের হিসেবে যা মিলে যাচ্ছে ১৮৫৭-তে ইংল্যন্ডে চালু হওয়া একই উদ্দেশ্যসাধনের আইনের সাথে। লং জানতেন যে আইনের ভয় দেখিয়ে (১০০ টাকা জরিমানা এবং/অথবা তিন মাসের জেল) অশ্লীল বইয়ের প্রচার সম্পুর্ন বন্ধ করা যাবে না কিন্তু অন্য বিষয় সংক্রান্ত বইয়ের বৃদ্ধি এবং শাস্তির ভয়, এই দুইই মিলিয়েই হয়ত ঐরকম অশ্লীল লেখার প্রসারকে নিয়ন্ত্রন করবে।

শ্লীল-অশ্লীল পাঠ্যবস্তু নিয়ে এই তর্কটি কিন্তু চলতেই থাকে লঙের কাজ পরবর্তী অন্তত বিশ-তিরিশ বছর ধরে খুব বেশী করে, ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যের বিদ্যাসুন্দর অংশটি নিয়েও; জেমস লং ভারতচন্দ্রের কবিপ্রতিভার প্রশংসই করেছিলেন, বিদ্যাসুন্দরকে প্রেমের কাহিনি হিসেবে গণ্য করেও মন্তব্য করেছিলেন শরীরী ও যৌনগন্ধী বর্ণনার ব্যাপারে, একই রকমের মন্তব্য ছিল সমসাময়িক আরও কিছু মিশনারীদের মধ্যে (ব্যপটিস্ট মিশনের্রেভারেন্ড জে ওয়েঙ্গার) এবং শুধু মিশনারীরাই নয়, নব্যবঙ্গের তরুন বা ভাবুকরাও ঐ কাব্যটি নিয়ে ঠিক সমঝোতায় আসতে পারছিল না, প্যারীচাঁদ মিত্রর ভাই 'ইন্ডিয়ান মিরর' কাগজের প্রতিষ্ঠাতা কিশোরীচাঁদ মিত্র রামমোহনের জীবনী লিখতে উষ্মা প্রকাশ করছেন রামমোহন যে বিদ্যাসুন্দর পছন্দ করতেন সেই ব্যাপারে, বিদ্যাসাগরও ভারতচন্দ্রর লেখাকে পছন্দই করতেন, বিদ্যাসুন্দর সম্বন্ধে একটু পাশ কাটানো ভাব নিয়েই, আরও একটু এগিয়ে এসে কেশবচন্দ্র, রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন এবং আরো অন্যরা মিলে যখন ১৮৭০ সালী অশ্লীলতা নিবারণে সোসাইটি তৈরী করবেন তখনও অশ্লীল পুস্তকের ছাপা ও প্রসার নিয়ে মন্তব্য থাকবে, তেমনি বিদ্যাসুন্দরের প্রসঙ্গও এসে যাবে, মোটামুটি একই সময়ে ব্যঙ্গ পত্রিকা 'বসন্তক' এই শ্লীল-অশ্লীল বিতর্ক নিয়ে উদারপন্থীদের ব্যঙ্গই করবে 'অশ্লীলতা কথা আমরা আগে শুনি নাই' মন্তব্যর মাধ্যমে, বা বঙ্কিমচন্দ্রও দেশীয় সাহিত্য কিরকম হবে, তার গুণাগুণ ইত্যাদি নিয়ে যখন তুলনামূলক সাহিত্য সমালোচনার ধারাটি তৈরী করছেন তখনও বিদ্যাসুন্দর/ভারতচন্দ্রকে সরিয়ে রাখছেন না। তো অশ্লীল সাহিত্যের সূত্র ধরেই সমসাময়িক 'আধুনিক' সমাজ গড়ে ওঠার বা সেটি কীরকম হওয়া উচিত সেইসব সামাজিক 'আন্দোলন' চলতে থাকছে এবং একই সাথে বিবিধ বিধি-নিষেধ যে বাঙালী/দেশীয় রীতি ও ভাবের ওপর গবর্ণমেন্টের হস্তক্ষেপ সেই বক্তব্যও থাকছে।

যদি অনুমান করি, পাঠককে 'অশ্লীল' পুস্তকের লোভ দেখিয়ে ঠকানোর কীর্তিটি পূর্ণানন্দ ১৮৮০ থেকে ১৮৯০ র মধ্যে কোনো সময়ে করছে, তাহলে তার পরিপ্রেক্ষিত হিসেবে জেমস লং-কৃত বইয়ের তালিকাটি, তৎপরবর্তী ১৮৫৬-র আইনটি এবং ঘোরতর সামাজিক আন্দোলন ও ঐরকমের লেখা নিয়ে সমাজের মনোভাব, সবই থেকে যায়। মজার কথা হল, পূর্নানন্দর লেখা চারটি বইয়ের মধ্যে দুটি বইয়ের নাম - রতিশাস্ত্র ও সম্ভোগ রত্নাকর - লং সাহেবের তালিকাতেও ছিল যার থেকে হয়ত অনুমান হয় যে পুর্ণানন্দ হয় ঐ তালিকাটি পড়েছিল অথবা ঐ বইদুটিও পড়েছিল এবং নামগুলিকে ব্যবহার করেছিল অথবা কিছুইনা, সম্পুর্ণ নিজের কল্পনা থেকে বইদুটির নাম বানিয়েছিল, প্রচলিত আরো বইয়ের অনুকরণে। পুর্ণানন্দ মন্তব্য করেছিল যে দেশীয় পাঠক শ্রেণীর এটাই দোষ যে তারা অশ্লীল পুস্তকের নামে শুনলে কান চাপা দেয় অথচ সুযোগ পেলে চারগুণ দাম দিয়ে সেই সব বই কিনে দরজা বন্ধ করে পড়তে তাদের আপত্তি থাকে না ! পুর্ণানন্দ, পাঠক আর সময়টাকে চিনত, নানারকম বিধি-নিষেধ চাপিয়েও যে যৌনগন্ধী বইয়ের ছাপা ও পড়া যে একেবারে নির্মূল করা যায়নি সে সেটা জানত বলেই সমসাময়িক পরিস্থিতি ও সমাজচলতি ইচ্ছেকে ব্যবহার করেছিল। কিন্তু এও কৌতুকের যে সে প্রথমেই বইগুলি লিখে ফেলেনি, শুধু বিঞ্জাপনটি তৈরী করেছিল এবং প্রধান একটি সংবাদ্পত্রে সেটি ছাপাতে চেয়েছিল। কিন্তু বিষয়বস্তু দেখে কাগজটি সেটি ছাপাতে না চাইলে সে আর একটি উপায় নেয়। হ্যান্ডবিল ছাপায়, কিছু হ্যন্ডবিলে এই চারটি বইয়ের নাম দেয় ও অন্য হ্যাণ্ডবিলে আইনমাফিক বইয়ের নাম, প্রথমভাগের হ্যান্ডবিলগুলোকে দেখালে কাগজের সম্পাদক রাজী হন সেগুলি তার কাগজের মধ্যে দিয়ে বিলি করতে, সেই মতো এক কর্মচারীকে নির্দেশও দেন। কিন্তু কাগজ ছাপিয়ে বিলি করার ব্যবস্থার সময়ে পুর্ণানন্দ কর্মচারীটিকে হ্যণ্ডবিলের যে বান্ডিলগুলি দেয় তার ওপরের দিকে অল্প কিছু 'ঠিক' হ্যণ্ডবিল রাখে এবং নী্চের দিকে ঐ চারটি বইয়ের বিজ্ঞাপনওয়ালা হ্যন্ডবিলগুলি। কর্মচারীটি নজর না দেওয়ায় পুর্ণানন্দের 'কাজের' বিজ্ঞাপনগুলি সংবাদপত্রের সাথে মফস্বলের দিকে বিলি হয়ে যায় !


গ্রাহক হওয়ার প্রলোভন তৈরী করেছিল বলেই ক্রমশঃ তার নামে টাকা আসতে থাকে এবং সে সেই টাকা খরচ করতে থাকে অব্যশ্যই কোনরকমের বই না পাঠিয়ে কারণ কোনো বই তার কাছে ছিলই না। প্রথমে ভেবেছিল যে অশ্লীল বই সংক্রান্ত বিষয়টির কারণেই ঠকে গিয়েও কেউই সে ব্যাপারে নালিশ করবে না কিন্তু কিছু গ্রাহক অভিযোগ জানায় বই না পাওয়ার জন্য। মামলার তারিখ আসার আগে পুর্ণানন্দ অদ্ভুত উপায় অবলম্বন করে, সে চারটি গল্প লেখে যার মধ্যে অশ্লীলতার নামগন্ধও ছিল না এবং গল্পগুলিকে ঐ চারটি নামের মলাতের মধ্যে ঢুকিয়ে বই ছাপিয়ে গ্রাহকদের পাঠিয়ে দেয়। তারা বিশেষ কিছু করে উঠতে পারে না, শুধু পত্র মারফৎ তাকে গালি দিয়েছিল মাত্র ! ইতিমধ্যে পুলিশও বিজ্ঞাপনটির খোঁজ পেয়ে এবং এইরকম খবর পেয়েও যে পূর্নানন্দের বাড়ীতেই বইগুলি আছে, অশ্লীল বই প্রকাশ বিরুদ্ধ আইনটি ভাঙার জন্য তার নামে আদালতে মামলা করে। পূর্নানন্দ যথারীতি কোর্টে গিয়েও তার ঐ চারটি বইই দেখায়, যার নাম আর গল্পের মধ্যে কোনই মিল ছিল না। কোর্ট আইনতঃ কিছুই করে উঠতে পারে না এবং পূর্ণানন্দ সেযাত্রা মফস্বলের গ্রাহক আর ইংরেজ গবর্ণমেন্টের কোর্ট, দুইয়ের সাথেই জালিয়াতি করেও বিশেষ বিপদে পড়ে না !

তো সব মিলিয়ে এইরকমই ঘটেছিল। সমাজিক সংঘ্টন আর আলোকপ্রাপ্তি ও তজ্জনিত দ্বন্দ, ইংরেজের আইন ও তার ব্যবহার, প্রচলিত ব্যবসা ও কাজ কারবার, সেইসবের তলায় তলায় পুর্ণানন্দের মত কোনো মানুষ - বাধ্যতঃই বা হয়ত অভাসবশেই - অর্থ রোজগারের উপায় হিসেবে অপরাধকেই ব্যবহার করে, খুব বেশী সেটি বাড়াতে থাকলে আইনের ছোঁয়া পেতে পেতে শেষ পর্যন্ত আইনের হাতেই বাঁধা পড়ে।


Name:  গোয়েন্দা          

IP Address : 236712.158.565612.163 (*)          Date:16 Jul 2019 -- 07:01 AM

এই নিন প্রিয়নাথবাবুর লেখা তান্তিয়া ভীল
https://archive.org/details/in.ernet.dli.2015.336654


Name:  গোয়েন্দা          

IP Address : 236712.158.895612.210 (*)          Date:17 Jul 2019 -- 01:34 AM

সি.সৈকত জানতে চেয়েছিলেন - "গোয়েন্দা মশাই, প্রথম বিজ্ঞাপনটি কোন সালের জানা আছে ? আমার ধারণা, অন্তত ১৩০৫/১৮৯৮-৯৯ এর, কারণ ৬ সংখ্যা দপ্তরের উল্লেখ করা হয়েছে। এর এক-দু বছরের মধ্যেই বাণীনাথ নন্দী বদলে গিয়ে নতুন প্রকাশক আসেন।"

এর উত্তরে DSpace এর সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক একটা লিংক কপি হয়ে গেছিল কি করে কে জানে। যে বইটার পিছনে বিজ্ঞাপনটি ছিল, সেটা খুঁজে পাওয়া গেল।

http://dspace.wbpublibnet.gov.in:8080/jspui/handle/10689/8230

হ্যাঁ ১৩০৫।

কিন্তু এইটে খুঁজতে গিয়ে অদ্ভুত একটা নতুন জিনিস চোখে পড়ল। যে বইয়ের পিছনে প্রিয়নাথ মুখুজ্জের বইয়ের এত ডিটেল অ্যাড রয়েছে সেটা সেই একই প্রকাশনার, অর্থাৎ বাণীনাথ নন্দীর সিকদারবাগান বান্ধব পুস্তকালয় ও সাধারণ পাঠাগার থেকে ১৩০৫ সালে প্রকাশিত কালীপদ মুখোপাধ্যায়ের সামাজিক উপন্যাস - "গৃহচিত্র"।

কিন্তু কে এই কালীপদ মুখোপাধ্যায়?
১২৮১ সালে বাহুলীন তত্ত্ব নামে - A Treatise On Violin লেখেন ইনি।
১২৮৬ তে লিখেছেন 'ধনুর্ভঙ্গ পণ"
১২৯৭ সালে এঁর "লহরী' নামে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হয়। বিডন স্ত্রীট থেকে গিরিশচন্দ্র চক্রবর্তী কর্তৃক।
১৩০২ সালে কামিনী-কুমার বা প্রেমলীলা নামক বই বেরোয় আপার চিৎপুর রোড এর শান্তিরাম দে হাত দিয়ে।
১৩১০ সালে "বিদায়" - উপন্যাস প্রকাশ হয় বেঙ্গল মেডিকাল লাইব্রেরি থেকে গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক।

এবার এই সবগুলির লেখক কালীপদ মুখুজ্জে একই লোক কিনা সে আর আমাকে জিগাবেন না।

সিকদারবাগান ইত্যাদি দেখে খুব ভাবতে ইচ্ছা করছিল প্রিয়নাথ বাবু এই নামে গোয়েন্দা কাহিনী ব্যতীত অন্য রকম লেখা ছাপাতেন। কারণ প্রিয়নাথবাবু (১৮৫৫-১৯১৭) "অভয়া' নামে একটি সামাজিক উপন্যাস লিখেছিলেন বলেও জানা গেছে ওই বিজ্ঞাপনেই। তবে সেটা একটু বেশিই কষ্ট কল্পিত হয়ে যাবে, কারণ প্রকাশকও এত বিভিন্ন। আর ১৯ বছর বয়সে ভায়োলিনের থিয়োরি বই লেখাও একটু শক্ত মতো ব্যাপার। তাইই ...

যাইহোক অন্য প্রসঙ্গ ছেড়ে সি.সৈকত-এর দারোগার দপ্তরের পাঠপ্রতিক্রিয়ায় ফেরা যাক।


Name:  সৈকত          

IP Address : 236712.158.782323.33 (*)          Date:17 Jul 2019 -- 03:58 PM

জুয়াচোরদের কার্যপদ্ধতি নিয়ে প্রিয়্নাথ মুখোপাধ্যায়ের অন্তত দুটি কাহিনি আছে - একটি ১৩০৩/১৮৯৬-৯৭ সালে লেখা 'জুয়াচুরি (অর্থাৎ জুয়াচোরদিগের অত্যাশ্চর্য্য অভেদ্য কতিপয় কার্য্য-কৌশল !)' এবং পরেরটি ১৩০৫/১৮৯৮-৯৯ সালে লেখা 'চেনা দায় (অর্থাৎ কলিকাতার জুয়াচোরগণকে চেনা ভার !)। আগে মন্তব্য করেছিলাম যে প্রিয়নাথের এইসব কাহিনিগুলি লেখার একটি উদ্দেশ্য ছিল যে কলকাতায় বসবাসরত মানুষকে অথবা মফস্বল থেকে কর্মসূত্রে আগত লোকজনকে কলকাতায় অপরাধের ধরণ সম্বন্ধে জানিয়ে দেওয়া যাতে তারা সাবধান থাকে ও ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এই দুটি লেখার উদ্দেশ্যও সেই ধরণের, জুয়াচুরির বিবিধ ঘটনার বর্গীকরণ ও তাদের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যেমন ব্যবসার মাধ্যমে জুয়াচুরি, বিজ্ঞাপনে জুয়াচুরি, চাকরিতে জুয়াচুরি, বাড়ি মেরামতে জুয়াচুরি, বন্ধকে জুয়াচোর, বিক্রয়ে জুয়াচোর ইত্যাদি। এই ভাগগুলির মাধ্যমে কলকাতা শহরে প্রচলিত কিছু কারবার-ব্যবসার ধারণা যেমন করা যায় তেমনি এও বোঝা যায় যে ঐ কাজগুলির সাথেই কীভাবে বা লোক ঠকানো যুক্ত হয়ে যেত।

কিন্তু কাহিনিদুটি শুধু এই কারণেই উল্লেখযোগ্য নয়, এই জন্যই আলাদা করে মনে থাকে যে যে ঘটনার ঠকানোর বর্ণনার বাইরে গিয়ে প্রিয়নাথ জুয়াচুরি সম্বন্ধে, বিশেষ করে সেটি কেন ঘটে বা তার বাড়বৃদ্ধি কেন হতো সে ব্যাপারে মন্তব্য করছেন, মন্তব্যগুলির মধ্যে সমসাময়িক লোক মতামতও মিশে থাকছে। প্রথম কাহিনিটিতে লিখছেন যে কলকাতা শহর 'ধনী, দরিদ্র, পন্ডিত, মূর্খ, সৎ, অসৎ, ধার্মিক, অধার্মিক' প্রভৃতি লোক দ্বারা পুর্ণ থাকলেও জুয়াচোরদের অত্যাচার ক্রমশঃই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কারণ পাশ্চাত্য সভ্যতা, কারণ সেই সভ্যতা অধিক পরিমাণে বিস্তৃতি পাওয়ার সাথে সাথেই মানুষজন নানা বিষয়ে বেশী করে মস্তিষ্ক পরিচালনায় সমর্থ হচ্ছে, ফলে যে যা কাজ করত সেই ব্যাপারেই নতুন বিষয়ের উদ্ভাবন ঘ্টাচ্ছেন - 'যিনি সাহিত্য লইয়া আছেন, তিনি সাহিত্যের উন্নতি করিতেছেন, যিনি বিজ্ঞান লইয়া আছেন তিনি সেই বিষয়ের নূতন কাণ্ড উদ্ভাবন করিতেছেন'। সেই রকমই 'যে সকল ব্যক্তি কেবল অসৎ উপায় অবলম্বনেই দিন যাপন করিয়া থাকে, তাহারা কি প্রকারে সেইসকল অসৎ কার্য্যের উন্নতি সাধন করিতে সমর্থ হয়, কেবল তাহারই চিন্তা করিতেছে'। এর সাথে এই কথা যুক্ত করছেন যে লোকজনের মত এটাই যে জুয়াচুরিজনিত অপরাধের জন্য ইংরেজ শাসনে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা থাকলেও, পুলিশ ঠিক করে সেইসব ঘটনার অনুসন্ধান করে না, ফলে অপরাধীরা শাস্তির ভয় পায় না এবং ঘটনাগুলি ঘটতে থাকে। এই মন্তব্যগুলির মধ্যে আমি একটু আইরনি খুঁজে পাই; অপরাধের কারণ সম্বন্ধে পুলিশ বিভাগের একজন কর্মচারী হয়ে যতখানি মন্তব্য করা যায় অথচ ইংরেজ সভ্যতা আর শাসনকেও এর সাথে যতখানি যুক্ত করা যায়, সেই ভারসাম্য রাখতে গিয়ে প্রিয়নাথকে একটু আইরনি বা স্বল্প শ্লেষের ব্যবহার করতে হচ্ছে, উপরন্তু সেগুলিও আবার লোক মতামতের আশ্রয় নিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে পরের লেখাটিতে, ১৩০৫-এর কাহিনিটিতে ইংরেজ সভ্যতাকে প্রায় সরাসরিই অপরাধের সাথে যুক্ত করছেন; লিখছেন যে দেশে যেভাবে চাকরির অবস্থা 'শোচনীয়' হয়ে উঠছে তার মধ্যে সহজে চাকরি লাভ সম্ভব নয়, কিছুটা যেন উৎকন্ঠিত যে পাশ্চাত্য সভ্যতা যেভাবে 'আমাদের' মধ্যে প্রবেশ করছে তার ফলে ক্রমে বিপর্যয়ও ঘটে যেতে পারে, কারণ হিসেবে বলছেন যে পাশ্চাত্য সভ্যতার ফলে কেউই আর অশিক্ষিত থাকতে চাইছে না কিন্তু লেখাপড়া পুরোপুরি শিখতে না পারুক ছোটবেলা থেকে অন্তত ইংরেজী স্কুলে ঢুকতে হচ্ছেই, যার ফলে তারা ক্রমশঃ জাতি ব্যবসা ত্যাগ করছে বা অন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকেও যাচ্ছে না, সৌভাগ্যক্রমে যারা চাকরি পেয়ে যাচ্ছে তারা সংসার নির্বাহ করতে পারছে আর অন্যদের ক্রমশঃ অসৎ পথে যেতে হচ্ছে কারণ উদর-পুর্তি করতে হবে ! প্রিয়নাথ নিশ্চয় ইংরেজ শাসনের সমালোচক নন, কিন্তু মন্তব্যগুলির মধ্যে ঐ শাসনের মূল দিকগুলি ফুটে উঠছে যা নিয়ে সেই সময়ে বা পরেও অনেক কথাবার্তা হয়েছে, সমালোচনা বা সমাজবিবরণী হয়েছে - শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন, ফলতঃ মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন, পুরোন সমাজের পরিবর্তন বা ভেঙে যাওয়া অথচ সেসবই যে সবার কাছে খুব সুখকর হয়ে উঠছে না ইত্যাদি এবং সব মিলিয়ে অপরাধের সামাজিক কারণের ইঙ্গিত প্রিয়নাথের এই কাহিনিদুটির মধ্যে থেকে যাচ্ছে। উপরন্তু কাছেই 'তান্তিয়া ভীল' বইটি আছে বলেই লক্ষ্য করি যে প্রথমেই যে কবিতা উদ্ধৃত করা হয়েছে সেখানে মুক্ত জীবনকেই মূল্য দেওয়া হয়েছে, রাজসভা বা দেবালয়কে নস্যাৎ করা হয়েছে, এ যেন তান্তিয়ারই কথা; শেষে গিয়েও তান্তিয়ার বীরত্ব আর ক্ষমতার জন্যই তার জন্য অশ্রুপাত করা হয়েছে, যদিও সে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েছে। চরিত্রটিকে শুধু অপরাধীই হিসেবে দেখা হচ্ছে না বরং জীবনীটি লেখার মধ্যে দিয়ে যেন তান্তিয়ার বীরত্বর প্রতি সম্মানই দেওয়া হয়েছে, প্রিয়নাথ ইংরেজ শাসনের এক মূল স্তম্ভ পুলিশ বিভাগে দীর্ঘদিন চাকরি করেও, পরবর্তী কালে কাজের প্রশংসাস্বরূপ রায়বাহাদুর হয়েও সম্পূর্ন কলোনিয়ালিস্ট হয়ে যাচ্ছেন না, দীর্ঘদিন ধ'রে যারা অপরাধ করছে সেইসব 'দুর্ধর্ষ দস্যুদের' বোঝার জন্যই যেন তাদের জীবনী লিখে রাখছেন (অথবা মণিপুরের রাজা টিকেন্দ্রজিতের সাথে ইংরেজদের সংঘাতের বিবরণ), সব মিলিয়ে সসমসাময়িক আরও শিক্ষিত বাঙালীর মতই হয়ত বা তাঁর মধ্যেও একটা দ্বন্দ আর কনফিউশন থেকে যাচ্ছে। ফলে, দারোগার দপ্তরের কাহিনিগুলোতে অপরাধকে প্রিয়নাথ কীভাবে দেখছেন তার একটা আন্দাজ করা যায়; তিনটি ধরণ উঠে আসে, অপরাধের সামাজিক কারণের দিকে ইঙ্গিত বিশেষ করে বহুল প্রচলিত অপরাধ যেগুলো অনটনের জন্য ঘটে থাকে সেই সম্বন্ধয়ীয়, বিশেষ কিছু অপরাধীর অপরাধের কার্য-কারণ-পদ্ধতি ও তাদের মনকে জানার উদ্দেশ্য আর বেশ কিছু কাহিনিতে অপরাধ ও তদন্তের বিবরণ। কিন্তু এই সব বিষয়গুলি নিয়ে যখন কাহিনিগুলি লিখছেন তখন কিন্তু লেখা মারফৎ রোমাঞ্চ বা উত্তেজনা তৈরীর ইচ্ছেও একটা থাকছে, যেটা লেখার সূচনা থেকেই ঘটছে যেমন কাহিনিগুলির নামকরণের মধ্যে। লেখাগুলির শুধু শিরোনাম দিয়েই থেমে যাচ্ছেন না, অধিকাংশ গল্পেই শিরোনামের সাথে একটা বিস্ময়চিহ্নিত উপনামও যোগ করছেন, যেন তাঁর অভিজ্ঞতার রোমাঞ্চটা প্রথম থেকেই পাঠকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাইছেন ও কাহিনিগুলির দিকে প্রথম থেকেই পাঠকদের টেনে রাখতে চাইছেন। এটা শুধু ওনারই স্টাইল নিস্চয় নয়, সমসময়ে প্রচলিত লেখাপত্রে বা বেশ আগে থেকেই বটতলার বইতে, কেচ্ছা, প্রহসন ইত্যাদি ধরণের বইগুলিতেও কমবেশী একই পদ্ধতি থাকত।

আরো একটি ব্যপার থাকে, যেটি কিছুটা জটিল কিন্তু সমসাময়িক সমাজের মনোভাবের সাথে মিলে যায়। বেশ কিছু কাহিনি আছে যেখানে নারীচরিত্ররাই প্রধান, হয় অপরাধী হিসেবে অথবা অপরাধের ভুক্তভোগী হিসেবে এবং যে কাহিনিগুলি প্রায় সবই অবৈধ সম্পর্ক অথবা বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক এবং অবশ্যই যা শরীর ও কামনা কেন্দ্রিক, পতিতা হয়ে যাওয়া বা 'ভদ্র' ঘরের মেয়েদের কেন্দ্রে রেখেই কাহিনির ঘটনাগুলি ঘটছে এবং এই রকমের কাহিনিগুলিতে অপরাধ বিষয়ে প্রিয়নাথ 'পাপের' প্রসঙ্গ আনছেন। অন্য অনেক কাহিনি অপরাধের দিক দিয়ে অদ্ভুত বা দুঃখেরও হতে পারে, কিন্তু পাপের প্রসঙ্গ নারীঘটিত কাহিনিগুলোর ক্ষেত্রেই সব থেকে বেশী করে আনা হচ্ছে। অথচ এইসব ঘটনারও যে একটা সামাজিক দিক থাকতে পারে, সেই দৃষ্টি বা বিশ্লেষন প্রিয়নাথের দিক দিয়ে কাহিনিগুলির মধ্যে থাকছে না (বরং অল্প কিছু ক্ষেত্রে রাগও প্রকাশ পাচ্ছে) আর না থাকার ফলে উনিশ শতকের পরিবার বা সমাজের যে অ্যাংজাইটি - মেয়েদের নিয়ে, তাদের আচরণকে নিয়ন্ত্রন করা নিয়ে - সেসবের চিহ্ন কাহিনিগুলিতে থাকছে। অপিচ, অপরাধীর মনকে জানা যে প্রিয়নাথের উদ্দেশ্য ছিল বলে মন্তব্য করেছিলাম যার আরও একটি উদাহরণ হল 'ডাক্তারবাবু' নামে দুই খন্ডের কাহিনিটি - যা প্রধান চরিত্রের বয়ানেই লেখা, অতএব তদন্তের কোন বিবরণ নেই এবং চরিত্রটির কথামতো এই বয়ানের উদ্দেশ্য হল 'যাঁহারা মানব-জীবন অধ্যয়ন করিতে চাহেন', তারা বয়ানটি পড়ে জানতে পারবেন কুচক্রে বা প্রলোভনে পড়ে কীভাবে কেউ এক্জন ভয়ানক অবস্থায় এসে পড়ে - যেটি অপরাধের পরিমাণে আর ঘটনাক্রমের কারণে আমার কাছে সবচেয়ে অ-বাস্তব ও অ-সম্ভব ঘটনার বিবরণ বলে মনে হয়েছে সেটিও যেন পাপের আওতায় পড়ে না, দুঃখরাশিরই কাহিনি শুধু।


Name:  সৈকত          

IP Address : 236712.158.782323.31 (*)          Date:17 Jul 2019 -- 05:00 PM

* দ্বিতীয় প্যারার প্রথম বাক্যঃ এই জন্যই আলাদা করে মনে থাকে যে বিবরণের বাইরে গিয়ে প্রিয়নাথ জুয়াচুরি সম্বন্ধে

আরোও কিছু বানান ভুল ইত্যাদি থাকতে পারে।



এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2]     এই পাতায় আছে7--37