বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2] [3] [4]     এই পাতায় আছে72--102


           বিষয় : নিমো গ্রামের গল্প
          বিভাগ : অন্যান্য
          শুরু করেছেন :সুকান্ত ঘোষ
          IP Address : 90045.205.012323.46 (*)          Date:14 Feb 2019 -- 08:24 PM




Name:  সুকি           

IP Address : 90045.205.232323.195 (*)          Date:10 May 2019 -- 09:45 PM

যাত্রা
----------------

সেবারে আমরা সব নিমো ভারত সমাজ ক্লাবে বসে গুলতানি মারছি এমন সময় রেজাক-কাকা হন্তদন্ত হয়ে ক্লাবে ঢুকে খুব টেনশন মাখা মুখে প্রায় কাঁদোকাঁদো মুখে বলল,

“তোদের কাছে হাত জোড় করছি, তোরা সেলিম-কে যাত্রা থেকে বাদ দে। আমি তোদের এবার ডবল চাঁদা দেব আর সাথে দু-টিন ধান বাড়তি। সেলিমের কাছ থেকে তোরা রোল কেড়ে নে”।

আমরা অবাক হয়ে থতমত খেয়ে গেলাম একটু – রেজাক কাকা নিতান্তই ভালোমানুষ এবং কারো সাথে পাচে থাকে না। রেজাক কাকা আমার বাবার খুব কাছের বন্ধু – কাকার তিন ছেলে, বড় ছেলে সেলিমদা, মেজো রফিক এবং ছোট ছেলে সফিক ওরফে চাঁদু। চাঁদু আমার বয়সী এবং বাল্য বন্ধু। আমরা সবাই বাড়ির বাইরে মোটামুটি গালাগাল দিলেও, চাঁদুই একমাত্র ছেলে ছিল যে বাড়িতেও সেটা কন্টিনিউ করত। খেলতে আসার জন্য ডাকতে গেছি চাঁদুকে, কাকিমা বলছে, “খেয়ে যা রে চাঁদু”, চাঁদু উত্তর দিল, “কতবার বাঁড়া বলব যে খাব না! সেই বালের এক কথা”। সেলিমদা ছিল বেশ ভালো তোতলা, সেই জন্য সেলিমদার অনেক দিনের যাত্রা করার ইচ্ছে থাকলেও নিমো ভারত সেবক সমাজ থেকে কেউ রিক্স নিয়ে ওকে কোন রোল অফার করা হয় নি আগের বছর পর্যন্ত। সেই বছর অনেক কাকুতি মিনতির পর সেলিমদা একটা ছোট্ট রোল পেয়েছিল। রেজাক-কার কথা শুনে আমরা ঘাবড়ালাম যে সেলিম-দা ওতো ছোট রোল নিয়ে আবার কি ছড়ালো!

রেজাক-কার কথা শুনে যা বোঝা গেল যে আগের দিন অনের রাতের বেলায়, প্রায় দু-টো নাগাদ পেচ্ছাপ বসতে যেতে বাইরে ওঠে কাকা। উঠে বাথরুমের দিকে এগুতে গিয়ে দেখে যে সেলিমদার ঘরে অত রাতেও আলো জ্বলছে এবং ঘরের ভিতর থেকে গুনগুন করে আওয়াজ আসছে। এতো রাতেই সেলিম কি করছে ভেবে ঘরের আলো কাছে কি দ্যাখে পুরো ঘর ধোঁয়ায় ভরে গ্যাছে। রেজাক-কা ভয় খেয়ে যায় আগুন –টাগুন লেগে গেল নাকি ভেবে। ঘরের কাছা কাছি গিয়ে ডাকা ডাকি করলে সেলিম-দা বিরক্ত হয়ে দরজা খোলে, কাকা দ্যাখে যে সারা ঘরে বিড়ির টুকরো ছড়ানো – ওই ধোঁয়া সব বিড়ি থেকে এসেছে। সেলিম-দার ডায়লগ বলতে ছিল, “বাবু আপনার টেলিগ্রাম”। সেলিমদার যে বাড়িতে চাকরের কাজ করে সেই কর্তাকে পুলিশ ধরতে আসবে, সেই সময় সেলিম-দাকে গিয়ে টেলিগ্রাম-টা দিয়ে আসতে হবে। ব্যাস, ডায়লগ বলতে এই – এটাই নাকি বার বার বলে বলে “বাবু আপনা টেলিগ্রাম”, “বাবু আপনার টেলিগ্রাম” ঘরেতে সারারাত বিড়ি খেতে খেতে মুখস্ত করছিল। আর ফলত গুণগুণ আওয়াজ।

আমরা যত বড় হতে লাগলাম, নিমোতে ঐতিহাসিক যাত্রা পালা তত কমে আস্তে লাগল – তার জায়গা নিতে থাকল সামাজিক পালা বা অনেক সময় যাত্রার বদলে নাটক হতে থাকল। আসলে ঐতিহাসিক যাত্রা করতে গেলে এলেম চাই, ভারিক্কি চেহারা চাই, সঙ্গে একটু ভুঁড়ি থাকলে ভালো হয় এবং একটু বয়স্ক না হলে অনেক রোল ঠিক মানায় না। আর কি সব ডায়লগ ছিল তখন! নীচে কিছুটা উদ্ধৃত করা যাকঃ

সম্রাটঃ খোদা বান্দার মনের কথা ঠিকই জানেন। আমি তোমাকেই ভাবছিলাম সখিনা। তোমাকেই! আমার খোয়াবের গুলিস্তানে তুমি তো রোজ আস তোফা-ই-উলফত হাতে নিয়ে, গুলশানের গোলাপ নিয়ে। আমি তোমাকে দেখি। তুমি লহর লহর হেসে যাও। বিজুরি চমকে তোমার নজরে। যখনই হাত বাড়াই খোয়াব ঠুটে যায়। ছটফট করি। পেয়ালার পর পেয়ালা শরাবে বুঁদ হয়ে থাকি। আর ভাবি, যদি রসম-ই-উলফত পালন করতে এসে তোমার গোলাবী অধরের স্বাদ পেত আমার পিয়াসী অধরের জমিন। তুমিই তো দিল-ই-বাহার, তুমিই তো খোশনসিবি। তুমি বললে এই সুলতানাত তোমার নামে করে দেব!

সখিনাঃ না! না জাঁহাপনা। ঐ কথা বলে আমার মোহাব্বতের গায়ে ইলজাম লাগাবেন না। মাসুম এই মোহাব্বতের শুরু আপনার থেকে, আপনার মাঝেই এর শেষ। এই কানিজ কানিজই থাকবে, এই বান্দী আপনার সেবা করে যাবে। নইলে জমানা ইলজাম লাগাবে, মালকিন-ই-সুলতানাত হতে আপনাকে ভুলিয়েছি। আপনার পদতলে থাকব, তবু ইলজামের গরল-আনজাম মোহাব্বতের গায়ে লাগতে দেব না। রুসবা হতে দেব না। কথা দিন আলমপানা!

আহা কি ছন্দ, কি ভাষা, কি আবেগ – মনে হয় প্রেম নিবেদন করতে হলে এমন জবানে করাই ভালো, একটা ইম্প্যাক্ট টাইপের আছে। জানি না জাঁহাপনা কথা রেখেছিলেন কিনা! আজকাল চারিদিকে “কেউ কথা রাখে নি” – এর ঢেউ উঠে পড়ে লেগেছে। এর আগে সবাই কথা রাখত, সেই রামায়ণের যুগ থেকে আমরা কথা রাখতে ভালোবাসি। বিশেষ করে যদি সেটা বাবার কথা হয়।

তবে কথা হল আমাদের গ্রামে এই ‘সম্রাট’ রোল করার লোক জন কমে আসছিল। যা বুঝেছিলাম মেজো জ্যেঠুর সাথে কথা বলে তা হল, সম্রাটের কাজ ঐ ডায়লগ দেওয়া ছাড়া আর ছিল একটা গোলাপ ফুল হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো। মেজো জ্যেঠুর কথা অনুযায়ী সমাটের রোলে একছত্র অধিপতি ছিল জেলেদের অজিত জ্যেঠু। আমাকে মেজো জ্যেঠু বলত, “বুঝলি সুকান, অজিতদা রিটায়ার হয়ে যাবার পর আমিও তো ওই গোলাপ ফুলের ভারটা নিয়েছিলাম”। অজিত জ্যেঠু বা আমার নিজের মেজো জ্যেঠুর সম্রাট রোলের প্রতি আমার বিশেষ শ্রদ্ধা ছিল – কারণ সম্রাট পাওয়া গেলেও সেকালে ‘সখিনা’ পাওয়া সোজা ব্যাপার ছিল না। মেয়েরা যাত্রা করছে – সে নিজের গ্রামের মেয়ে বা ফিমেল ভাড়া করা – এর কোনটাই তেমন সেই যুগে তেমন নরম্যাল ছিল না গ্রামে গঞ্জে। ফলে সেই মেয়ের রোল মানে ‘সখিনা’ ইত্যাদি সাজতে হত আমার সেজো জ্যেঠু, গুরুপদ মাষ্টার এবং আরো দু-এক জনকে। এবং সেই মেয়ে রুপী ছেলে দেখে সম্রাট-রা যে ফিলিংস আনতে পারত, সেটাই এক বিশাল ব্যাপার – প্রফোশন্যালিজমের চূড়ান্ত যাকে বলে।

আমাদের ঘোষ পরিবার এত বড় ছিল যে আমাদের বাড়ি থেকেই পুরো একটা যাত্রাদল নেমে যেত – ইনফ্যাক্ট আমাদের বাড়ির প্রায় সবাই সে কালে যাত্রা করত, ইনক্লুডিং বড় জ্যাঠা। বেশ কতকগুলো যাত্রা পোষাক বা জিনিসপত্রের বাক্স ছিল আমাদের বাড়িতে – সেগুলো কালে কালে আমার খেলার সামগ্রী হয়ে উঠেছিল। একদিন ছোটকাকা আমার কাছে গল্প করছে, “বুঝলি, সেবার তো আমি ছোট ছেলের রোল করছি – আর দাদা করছে বাপের রোল। তা একটা সীনে আমাকে চাবুক দিয়ে মারবে – আর আমি হাউ হাউ করে কাঁদব এমন ব্যাপার আছে। আমি রিহার্সালের সময় প্রতি দিনই দাদাকে বলছি যে সেই চাবুক মারার সীনটা একটু প্র্যাকটিস করে নিতে। কিন্তু দাদা খালি বলছে – ও হয়ে যাবে চিন্তা করিস না। তুই বললে বিশ্বাস করবি না সুকান, যাত্রার দিন আমাকে সত্যি সত্যি দাদা শঙ্কর মাছের চাবুক দিয়ে কে মার টাই না মারল। আমার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে, বিশাল হাউ মাউ করছি আমি – আর কি হাততালি! সীনের শেষে গ্রীনরুমে আমাকে অনেকে বলতে এল কি অভিনয়ই না করলি তুই ও মার খাবার সীনটায় – একদম জীবন্ত। আমি আর কি বলে, জামাটা খুলে সোঁটা সোঁটা দাগ গুলো আর দেখালাম না”!

যাত্রার গল্প অনেক আছে – আমরা ক্লাস সেভেন-এইটে উঠলে মনে পড়ে গেল যাত্রা ছেড়ে নাটকের হুজুগ বেড়ে যাবার কথা নিমোতে। সে কি যুগ ছিল – নিমোর কাছের শহর মেমারী পুরো কাঁপছে কালচারে কালচারে। তখন প্রবল সিপিএম এর জামানা। ললিত স্যার গ্যাট চুক্তি নিয়ে একক অভিনয় করে ফেলল মেমারী বাসস্ট্যান্ডে – প্রবল গরমের মধ্যে ইস্কুল থেকে পদযাত্রা করে আমাদের গোটা মেমারী ঘোরানো হল সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে। রাতের বেলায় আবার নানা একাঙ্ক নাটক বা পূর্ণ নাটকের প্রতিযোগীতা – রেল গেটের এপারে অভিযান সংঘ তো ওপারে ফারবিড ক্লাব। এদিকের রামপুরহাট-বোলপুর থেকে শুরু করে ওদিকে বাঁশদ্রোণী-হুগলীর ভালো ভালো নাটকের দল আসত। সি পি এম আমলে আর যাই হোক কোনদিন দর্শকের অভাব হয় নি নাটকের, স্পেশালি তা যদি কালীতলা পাড়ার পার্টি অফিসের আশীর্বাদধন্য হত।

মেমারী থেকে দুই কিলোমিটার দূরে আমাদের নিমোতে একাঙ্ক নাটক হত না – যা হত তাকে বলা হত থিয়েটার, যাত্রা এবং ফাংশান। সারাদিন মাঠের কাজ করে এসে সন্ধ্যেবেলা আঁতলামো মারানোতে কারো ইচ্ছা বা সায় কিছুই ছিল না। যাত্রা পুরানো দিন হতে আমাদের রক্ত মিশে গেলেও, থিয়েটারের জোয়ার আমাদের গ্রামে আনল ঘোষ পাড়ার মেজোদের অরুণদা। বার্ণপুর থেকে অরুণ বরুণ দুইভাই গ্রামে ফিরে আসার মত ইমপ্যাক্টফুল রিটার্ণ আমরা তখনও ইতিহাস বইতে পড়ি নি। নিমো ভারত সেবক সমাজে সেই প্রথম গাঁজা ঢুকল। মদের প্রচলন কমে গিয়ে গ্রামের যৌবন বরণ করে নিল গাঁজা। মদের খালি বোতলে ভরা ক্লাব ঘরে আমাদের ছোটদের প্রবেশ মোটামুটি প্রচলিত থাকলেও, গাঁজার গন্ধ আর ধোঁয়ায় ভরা ঘরে প্রবেশ ক্রমশঃ ট্যাবু-র মত হয়ে উঠল।
অরুণদার নাটকে বরুণদা জাদু বিস্তার করতে লাগল তার অভিনয়ে। ভাইয়ের জন্য চমকপ্রদ সব ডায়লগ লিখতে তোলপাড় ফেলে দিল অরুনদা। একদিন পরে স্বীকার করতে বাধা নেই যে বরুনদা অভিনয় ভালোই করত – কিন্তু তার চেহারা তাকে সহযোগিতা দেয় নি। একে তো রোগা, তার পরে গাঁজা খেয়ে খেয়ে শরীরে আর কিছু নেই। কথায় বলে গাঁজাখোর – কিন্তু আপনাদের যাদের গাঁজা নিয়ে ডিল করার অভিজ্ঞতা আছে তারা নিশ্চয়ই জানেন যে যদি সে অ্যাডিক্ট না হয়ে যায়, তা হলে গাঁজা খায় বলে গায়ে আলাদা করে কোন ছাপ থাকে না – যেমন থাকে না টেররিষ্ট বলে আলাদা কোন অ্যাপিয়ারেন্স। সেই সময়ে নিমো ভারতে সেবক সমাজের অন্তর্ভূক্ত সব নওজোয়ানই গাঁজার কম বেশী সরগর থাকলেও যে দুজন ‘গাঁজাখোর’ তকমা বহন করতে অ্যাপিয়ারেন্সে তারা হল – বরুণ এবং সুবান। ওই যে বরুণ নিজের বাড়ি থেকে মাথা নীচু করে বাড়ি থেকে বেরুল, ছিলিমে দম দেবার আগে তাকে কেউ মুখ তুলে তাকাতেই দেখে নি প্রায়। থিয়েটারের প্রত্যেক দৃশ্যের শেষ হত বরুণের এক চমকপ্রদ ডায়লগে – সে ডায়াসে উঠে আঙ-বাঙ ডায়লগ গলা কাঁপিয়ে বলবে, সেই উত্তেজনায় গ্রাম কাঁপত এমনকি গ্রামের বউদিরাও। সেবার লাইটম্যান উদয় ক্যালানি খেয়ে গেল – লাইট কণ্ট্রোলে নতুন লোক রেখে – দৃশ্য শেষ হয়ে আছে, বরুণ আস্তে আস্তে ডায়াসের দিকে এগুচ্ছে – গ্রাম বাসী বৃন্দ উত্তেজনায় উঠে বসেছে প্রায়, এমন সময়ে উদয়ের লাইটম্যান দিয়েছে স্টেজের লাইট অফ করে! সে এক মার মার কাট কাট সিচ্যুয়েশন। পাবলিক ডিম্যান্ডে বরুণকে পরের দৃশ্যে গলা কাঁপিয়ে এমন ডায়লগ দুবার দিতে হল পর পর।

অরুণদা নাটক লিখলেও, নাটক পরিচলনার জন্য তখনো বাইরের মাষ্টার ভাড়া করে আনাটাই দস্তুর ছিল। কখনও তপন মাষ্টার, নদ-মাষ্টার, মধু-মাষ্টার ইত্যাদি ইত্যাদি। আর সেই থিয়েটারে ফিমেল ভাড়াদের আর আলাদা করে কি বলব। ফিমেল আসত বাইরে থেকে – ট্রেন থেকে নেমে স্টেশনের পাশেই নিমো ভারত সেবক সমাজের ঘরে রিহার্সেল দিয়ে আবার তারা ফিরত। মেয়েগুলোর নামও মনে নেই আর – তাদের অভিনীত চরিত্র দিয়েই তাদের নামকরণ হত গ্রামে। এইভাবেই শেফালী ফেমাস হয়ে গেল আমাদের মনে “ভোরের শিউলি” নাটকে অভিনয় করে।

ক্লাবে নাটকের রিহার্সেল চলছে – মধু মাষ্টার টর্চ জ্বেলে নাটকের ডায়লয় পড়ে নিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে। ঘরের সিলিং থেকে ঝুলছে খালি কোলগেট বা পেপ্সোডেন্টের কাগজের প্যাকেট গুলো – ওগুলো নাকি সিম্বলিক স্পীকার। স্টেজে কে কিভাবে পজিশনিং করে মাইক নেবে সেই প্র্যাক্টিস হচ্ছে। সমস্যা হত যখন নাটকের থেকে ক্যারাম বেশী ভালোবাসে এমন পাবলিক দলভারী করে ক্লাবে আসত রিহার্সেলের সময়। ক্লাবের এক কোনে থাকত ক্যারাম – ক্যারাম খেলা আর রিহার্সাল এই দুয়ের মধ্যে স্পেসের দখল ছাড়া আর যা নিয়ে কনফ্লিক্ট ছিল তা হল স্ট্রাইকারের আওয়াজ। মাষ্টার যেত রেগে – এই ভাবে রিসার্সেল হয়!

একদিন ডায়লগ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, অরুণদার লেখা ঠিক জামছে না থ্রো করতে গিয়ে। বিড়ি মুখ থেকে নামিয়ে কে একজন ক্যারাম খেলেতে খেলতে প্রস্তাব দিল, মাষ্টার, লিখে দাও “কুহু কেকা ডাকে”! বরুণ তখন সবে সোনাগাছি থেকে শিউলিকে উদ্ধার করে নিয়ে ফিরে আসবে বলছে, সেই শিউলিকে যে নাকি তার বাবার অসুখের টাকা জোগাড় করার জন্য সোনাগাছিতে ঢুকতে বাধ্য হয়েছে। বরুণ সেই দৃশ্যের শেষে ডায়াসে উঠে কি ডায়লগ দেবে সেই নিয়ে মাষ্টার ভাবছে, ঠিক তখনই “কুহু কেকা ডাকে” ব্যবহারের প্রস্তাব। মাষ্টার গেল বিশাল রেগে – উঠে লাইটটা নিয়ে ক্লাব থেকে বেরিয়ে ট্রেন ধরার জন্য পা বাড়ালো “এটা ফাজলামো হচ্ছে”। বেগতিক দেখে পাবলিক বলল, ও মাষ্টার রাগছ কেন, আচ্ছা ব্যাথার কথা লিখে দাও – “হু হু করে উঠছে”। সাধাসাধির পর মাষ্টার ফিরে এল – রিহার্সাল শুরু হতে যাচ্ছে, কেউ জিজ্ঞেস করল, “মাষ্টার, শিউলির ব্যাথা কোথায় হচ্ছে লিখলে”? আবহাওয়া আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠল – আমরা ছোটরা ঘাবড়ে গেলাম – এত সহজ প্রশ্নে মাষ্টারের রেগে যাওয়া উচিত হয় নি বলে আমরা রায় দিলাম জানালার এপাশ থেকে।

মোবাইল জামানা চলে আসার পর পাবলিক এত ব্যস্ত হয়ে পড়ল যে অ্যামেচার যাত্রা/থিয়েটার উঠে গেল আমাদের গ্রাম থেকে। এখন শুধু ফাংশন এবং বুগি বুগি ড্যান্স। পরের বার এই বুগি বুগি ড্যান্স নিয়ে আলোচনা।

সাথের ছবি নিমো ভারত সমাজের।


https://i.postimg.cc/zB5ygrXS/IMG-1309.jpg


https://i.postimg.cc/br5Y3c85/IMG-1310.jpg


https://i.postimg.cc/HLmYStDT/IMG-1311.jpg



Name:  রঞ্জন          

IP Address : 232312.180.6790012.243 (*)          Date:10 May 2019 -- 11:41 PM

কী লেখা! আহা,
কাছের মেমারিতে আমার বন্ধু সুব্রত সাঁইয়ের বাড়ী। ওদের বিশাল একান্নবর্তী পরিবারেও অনেকেই যাত্রা করত সেকালে। বিয়ের সময় (হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে) অনেকেই বিবাহবাজার পত্রিকা ছাপিয়ে তাতে পদ্য লিখত।
সুকির লেখায় সময় বদলে যাওয়ার ছবি দারুণ ফুটেছে।


Name:  aranya          

IP Address : 3478.160.342312.238 (*)          Date:11 May 2019 -- 08:38 AM

ন্যাড়া যে কি কয়, অ্যাক্টিভিজম-এর সাথে ক্যাওড়ামির কোন বিরোধ নাই


Name:   শিবাংশু           

IP Address : 5645.249.2378.222 (*)          Date:11 May 2019 -- 11:17 PM

এই সিরিজটাতে সুকি একেবারে সের্গেই বুবকা। নিজেই নিজের রেকর্ড ভেঙে যাচ্ছে একের পর এক.....


Name:  সুকি           

IP Address : 90045.205.232323.195 (*)          Date:12 May 2019 -- 11:34 AM

রঞ্জনদা,
তাই নাকি? মেমারীর কোথায়? প্রপার মেমারী হলে আমি চিনব হয়ত - আর আশে পাশের হলে আমার কাকা-জ্যাঠারা চিনবে অবশ্যই। আর হ্যাঁ, পদ্য লেখা ব্যাপারটা এখনো কিছু কিছু জায়গায় আছে, তবে খুব কম।

অরণ্যদা, শিবাংশুদাকেও ধন্যবাদ লেখা পড়ার জন্য। শিবাংশু-দার স্নেহ বরাবরই একটু বেশী অনুজদের জন্য :)




Name:  সুকি           

IP Address : 90045.205.232323.195 (*)          Date:12 May 2019 -- 11:35 AM

বিষ্ণুপুর ঘরানা
--------------------

গতকাল সন্ধ্যেবেলা ইদানিং কালের বাংলা চলচিত্র, টিভি, নাটক এবং সংগীত জগতের আভ্যন্তরীন খবরাখবরে আমি যেভাবে আলোকপ্রাপ্ত হলাম, তাতে করে আগামী বছর খানেক আর আনন্দলোক না পড়লেও চলবে।

এমনিতে আজকাল বাড়িতে বেশী থাকাও হয় না, আর থাকলেও কোথাও বিশেষ যাওয়া হয় না আড্ডা মারতে। কিন্তু তাবলে তো আর তারকদার আহ্বান উপেক্ষা করা যায় না! একে তো তারকদা আমার অনেক দিনের চেনাশুনা মাইডিয়ার টাইপের প্রিয় দাদা – তার উপরে আমাদের বর্ধমানে শ্বশুর বাড়ি করেছে পৌষালি বৌদিকে বিয়ে করে। তাই কাল গিয়েছিলাম তারকদার বাড়ি – শ্বাশুড়ি এসেছেন বর্ধমান থেকে, আমাকে পোস্ত খাবার লোভ দেখালো। এই সব ডেডলি লোভনীয় কম্বিনেশনের জন্য আমি গিয়ে হাজির হলাম সন্ধ্যেবেলা।

গিয়ে দেখলাম তারকদার থেকেও তারকদার শ্বাশুড়ি-মা আরো বেশী মাইডিয়ার। ঘরে ঢুকতেই প্রশ্ন চলে এল, “কি পোস্ত খাবে সুকান্ত? আলু-পোস্ত, ঝিঙে-পোস্ত, পোস্ত ভাজা, পেঁয়াজ পোস্ত, ট্যমেটো পোস্ত?” – আমি ঘাবড়ে গেলাম, চাপাচাপির ফলে জানালাম যে, যেহেতু চয়েস দেওয়া হচ্ছে, তাহলে পেঁয়াজ পোস্ত-ই হোক। এবার বর্ধমানের পাবলিক বলে, মুড়ি খাওয়ার প্রস্তাব উঠবে না এটা তো আর হতে পারে না! তারক-দা কলকাতার কাছে বালি-বেলুড়ে বড় হয়েছে, তাই মুড়ির মর্যাদা নিয়ে দোটানায় থাকে বরাবর। খালি বারবার বলছে, “মুড়ি তো ইউরিয়া দেওয়া!” শ্বাশুড়ি-মা প্রতিবাদ করলেন, “আরে বাবা ইউরিয়া দেওয়া নয়, আমি বাড়ি থেকে ভাজিয়ে এনেছি। বৌদি বলল, “সুকান্ত তুমি একে একটু বুঝিয়ে বল তো যে তরকারী দিয়ে মুড়ি খাওয়া কেমন লোভনীয় জিনিস”। আমি তারকদার মুড়ি বিষয়ক ট্যাবু ভাঙাতে উদাহরণ দিলাম আমাদের বর্ধমানে জলখাবার বেলা মুড়ি কেমন আলুর দম, বা কুমড়োর তরকারী দিয়ে খাওয়া হয়।

তো এই বিষয়ে, আর এক অন্য তারকের গল্প উঠে এল – এই তারক হল গিয়ে আমার অনেক দিনের চেনাশুনা যে নিমো গ্রামে গ্রীষ্মকালে আইসক্রীম এবং শীতকালে ঘুগনী বিক্রী করে সাইকেলে করে। তারক আগে ঘুগনীর সাথে রুটি বিক্রী করত – রুটি মানে পাউরুটি, যেগুলো পা দিয়ে ময়দা চটকে বানাতো সেলিমদা পান্ডুয়াতে। কিন্তু বাঙালী রুটি খেয়ে আর কতদিন কাটাবে! ফলে কিছুদিন পরে দেখা গেল তারক স্টীলের থালা এবং মুড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘুগনী-মুড়ি খাও তারকের কাছ থেকেই থালা নিয়ে এবং তারপর সেই থালা ধুয়ে আবার তারকের কাছে জমা। তো যাই হোক এই সব উদাহরণ শুনে দেখলাম আর তারক-দা মুড়ির উপকারীতা এবং জনপ্রিয়তা নিয়ে আর সন্দেহ প্রকাশ করল না।

মুড়ির মিমাংসা হলে – চায়ের গল্প এল। দুধচা এল সঙ্গে আবার বর্ধমানের চানাচুর - শ্বাশুড়ি-মা আবার মনে করিয়ে দিলেন, “সব প্লেনে করে নিয়ে এনেছি সুকান্ত – মুড়ি, পটল, ডাঁটা- দেশের জিনিসের স্বাদই আলাদা”। কেবল টাটকা মাছটা আনতে পারেন-নি। চা খেতে খেতে ভূতের গল্প হল – তারকদারা সপরিবারে বেড়াতে গিয়েছিল বম্বের কাছে ‘মাথেরণ’ বলে একটা জায়গায়। সেখানে একটা রিসর্টে ছিল ওরা – ২০৩ এবং ২০৫ নম্বরে ঘরে। আমাকে বললেন, “ভুত তো আমার চিনতে আসুবিধা হয় না। সেই কবে থেকে ওদের নিয়ে কারবার করছি। কোল ইন্ডিয়াতে কাজ করত – বাংলো বাড়ি বা কোয়ার্টারে যখন থাকতাম সেগুলো তো ব্রিটিশ পিরিওডের সিলিং উঁচু ঘর। এই হোটেলটা তেও তাই। রাতের বেলা ভুতো-কে (নাতি, তারকদার ছেলে) পাশে নিয়ে ঘুমাচ্ছি, ও তো ঘুমিয়ে কাদা – আমি শুনি ছমছম নূপুরের শব্দ ঘরের মধ্যে এবং বাইরের বারান্দায়। একটু ভয়ও যে হচ্ছে না তা নয় – আমি তো এতদিন বাঙালী ভূত নিয়ে কাটিয়েছি। এই বিদেশে হিন্দুস্তানী ভূত কেমন হবে কে জানে! আমি তো ভূতোর আঙুলটা পাকড়ে শুয়ে রইলাম। খানিক পর নুপুরের সাথে যোগ হল একটা পাতলা শীষ দেবার মত শব্দ। কেমন যেন মিলিয়ে যাচ্ছে – আবার বারান্দায় ঘুরপাক খাচ্ছে সেই শব্দ”। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “মনে হচ্ছে অপঘাতে মরা ভূত”। শ্বাশুড়ি-মা বললেন, “তুমি কি করে জানলে? তারক তো পরের দিন খোঁজ নিল – সেই বাড়িতে নাকি কোন নাচলেওয়ালীকে মেরে দেওয়া হয়েছিল। তারই আত্মা এদিক ওদিকে ঘুরে বেড়ায়”। আবার যোগ করলেন, “পাহাড়ি হোটেল তো – মাঝে মাঝে কারেন্ট অফ হয়ে যায়, জেনারেটর চালায়। কিন্তু ঘরের এ্যাতো বড় টিভিটা জেনারেটরে চলে না। আমার মেয়ে আর জামাই তো মুখচোরা – যাবে না, আমি নিজেই গিয়ে বলে এলাম ওদের, টিভি নেহী চলেগা তো পয়সা কাটকে দেগা”।

অন্য একটা গেষ্ট ছিল তখন ঘরে, তিনি আবার চা খেতে খেতে বললেন, “আমার সাথে ঘরে একটা ভূত প্রায় ১৫ বছর ছিল বিয়ের আগে পর্যন্ত। এই ধর প্রচুর গরম করছে, কিন্তু ফ্যানের সুইচটা দূরে – আমি মনে মনে ভাবলাম ফ্যান চালাবার কথা, দেখলাম ভুতটা সেই ফ্যানটা অন করে দিল। ভালো ভুত”। আমি ভাবলাম জিজ্ঞেস করি যে ভাত খাবার পর একটা মিষ্টি পান খেতে ইচ্ছে হলে ভুতটা নীচে থেকে পান এনে দিত কিনা। কিন্তু ভদ্রলোকের সাথে আগে আলাপ নেই – কি ভাববেন সেই জন্য আর জিজ্ঞেস করলাম না। এবার তারকদার পালা এলে তারকদা একশো পঞ্চান্ন বারের মত তার সেই ইংল্যান্ডের চেষ্টার শহরের হোটেলের ঘরে ভুতের গল্পটা করল। তারকদা সেবারে কোম্পানীর কাজে চেষ্টার গ্যাছে। হোটেলের ২২ নম্বর ঘরটা দেওয়া হয়েছে – রাতের বেলা তারকদা শুনছে টয়লেটে ছড়ছড় জল পরার শব্দ। উঠে গিয়ে ট্যাপটা বন্ধ করে দিল রাত সাড়ে বারোটায় – ভোর তিনটেয় আবার জল পরা শুরু, আবার ট্যাপ বন্ধ করা – সকাল চারটেয় আবার এক কেস। পরের দিন রিশেপস্যানে গিয়ে অভিযোগ জানাতে তারা ঘর বদলে দেয় কোন প্রশ্ন ছাড়াই – এর পরে নাকি আর এক কলিগেরও একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেই ঘরে থেকে। সেই গল্প শুনে শ্বাশুড়ি-মা পেঁয়াজপোস্ত রাঁধতে রাঁধতে বললেন, “তুমি তারক ভীতু মানুষ – ওটা কিছুই নয়, পুরানো হোটেল তাই ট্যাপটা লুজ ছিল”।

আমার পালা এলে বললাম নিমোতে তেমন ভূতের কেস নেই। ঘটনা কিন্তু পুরোপুরি সত্য নয় – সব গ্রামের মত নিমোতেও ভালোই ভূত আছে। সময় বেশী ছিল না বলে আমি আর ঘাঁটলাম না, নাহলে রায়েদের বাড়ির জামগাছের ব্রহ্মদত্যিটা যে পরে ওদের বাড়িরই বড় ছেলে বাচ্চুর উপর ভর করে তাকে গণৎকার এবং বাবাজী টাইপের বানিয়ে দেয়; তার পর নিমো গ্রামের পাশে সেই পঞ্চমুন্ডি আসনটা যেখানে আমাকে ছোটবেলায় যেতে হত যজ্ঞডুমুর গাছের ডাল পারতে (দুর্গা পুজোতে নবমীর হোমে যে পাঁচটা গাছের ডাল লাগত তার মধ্যে যজ্ঞডুমুর একটি), সেখানে গিয়ে কি দেখেছিলাম; বা নিমোর একমাত্র শ্মশান গরাঙ্গের পারে সেই বটগাছটা যার তলায় ছড়িয়ে আছে কালো কাঠকয়লা, ভাঙা ঘট, কিছু টুকরো কাঠ – ভর দুপুরেও সেই বটগাছের তলায় বসলে কি ফিসফাস ভেসে আসত; বা বাঁকুর বউ চাঁপি গলায় দড়ি দিয়ে মরার পর একদিন আমাদের পড়ার তপুদাকে কেমন করে সাইকেল থেকে ঠ্যেলে ফেলে দিয়েছিল – সেই সব গল্প না হয় পরে একদিন লিখব।

গল্প করতে করতে খাবার সময় হয়ে গেল – বলতে নেই দারুণ খেলাম, এবং যা খাই তার থেকে অনেক বেশী খেয়ে ফেললাম – বাঁশকাঠি চালের ভাত, ডাল, পালংশাকের ঘন্ট, পেঁয়াজপোস্ত, ঝিঙে-চিঙড়ি, দই-মাছ। জম্পেস হল – তারদার শ্বাশুড়ি ভাগ্য ভালো, কিন্তু তারকদাকে খাইয়ে কি আর শ্বাশুড়ি-মা সুখ পান? কে জানে! তারকদা খায় তো এই টুকু। খেতে খেতে চাল নিয়ে একটু আলোচনা – বাই দি ওয়ে শ্বাশুড়ি-মা এখন বর্ধমানে সেটেল করলেও আদপে বাঁকুড়ার মেয়ে, সেখানেই বড় হয়ে ওঠা। আমি বললাম এই চাল ঠিক বাঁশকাঠি নয়, ব্যাঙ্গালোরের দোকান ঠকাচ্ছে – আলোচনার পর স্থির হল যে এ চাল প্রপার বাঁশকাঠি না হলেও, খেতে বেশ মিষ্টি। বাঁশকাঠি চাল দেশের দিকে কত করে কিলো সে নিয়ে খানিকক্ষন টানাপোড়েন – আমি বললাম ৪২ টাকা কিলো, উনি বললেন ৫০ টাকা।

খাওয়া যাওয়ার পর আসল জিনিস শুরু – সাড়ে নটায় জি টিভির ‘সা রে গা মা পা’। পৌষালি তো খুবই ভালো গান গায় – ট্রেনড ক্লাসিক্যাল গায়িকা, এখন ব্যাঙ্গালোরে গান শেখায়। শ্বাশুড়ি-মার সাথে কথা বলে যা বুঝলাম তা হল, উনাদের পরিবারে গানের চল আছে, এবং তা বিষ্ণুপুর ঘরানা। পৌষালি গান ছাড়াও আবার ফেঞ্চ শেখায় – আর তারকদা তো ফ্রান্সে পোষ্ট ডক করেছে। তাই বাড়িতে মাঝে মাঝেই ফেঞ্চে কি সব কথা বার্তা চলে – গেষ্ট যদি ফ্যামিলিয়ার না হয়, তাহলে হয়ত ভাববে তাকে না জানানোর জন্য তাকে সামনা সামনি ফরাসী ভাষায় গালাগাল দেওয়া হচ্ছে। কাল যেমন শুনলাম তারকদা মাঝখানে বলল, “ক্যুই আ ওভ্র্যাত লা ফেনত্রে ...” বা এই ধরণের কিছু, যার মোদ্দা কথা জানালাটা কে খুলে রেখেছে, মশা আসছে।

প্রোগ্রাম শুরু হল – আমি অবাক হয়ে দেখলাম শ্বাশুড়ি-মার জ্ঞানের বহর। প্রথমে গৌরব গাইতে এল – ভারডিক্ট হল, এর বয়সের গাছপাথার নেই, সেই কবে থেকে গেয়ে যাচ্ছে – তবে ভালো গায় – এর ঠাকুরদা না কে যেন কবে বাংলা সিনেমায় গান গেয়েছিল। আর যা জানতে পারলাম তার সামারি করে দিচ্ছি নীচেঃ

১। মোনালীর নাকি পরচুল পরে থাকে। এমনিতে ওর চুলে কোয়ালিটি ভালো নয় খুব একটা – প্রায় ঝাঁটার কাঠির মতই বলা যায়। শ্রীকান্ত আচার্যর থেকে আর একটু বড় চুল মোনালীর। তবে গায় ভালো – বাপ শক্তি ঠাকুরের থেকে সুরটা পেয়েছে। রবীন্দ্র সংগীতটা ভালোই গায় – ছাড়া “সওয়ার লু …” এবং “মোহ মোহ কি ধাগে…” গান দুটিও চমৎকার গেয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম মোনালীর বিয়ে হয়ে গ্যাছে কিনা ----- শ্বাশুড়ি-মা বললেন, “ওই তো চ্যাং-চুংয়ের সাথে বিয়ে হয়েছিল – মাঝে মনে হয় ডিভোর্সও হয়ে গিয়েছিল, এখন তো আবার একসাথে থাকছে”। তবে একটু বেশী পাকামী করে মেয়েটা সা রে গা মা পা-তে, ওকে পাকামীর জন্যই রেখেছে।

২। অঙ্কিতা মেয়েটা কি ভালো গায় – সেই চ্যাম্পিয়ান হবে। তবে ফাইন্যালের দিন কি হবে কিছুই বলা যায় না – সুর একটু ওদিক এদিক হয়ে গেলেই গেল! অঙ্কিতার মা-ও এতো ভালো গায় – আর বাপটাও খুব সাপোর্ট দেয়। ছেলেদের মধ্যে প্রীতম – ওই তো রাঘবের কাছে গান শেখে সেই ছোটবেলা থেকে, তৈরী গলা। জানালেন, এই স্নিগ্ধজিতের গান একদম ভালো লাগে না তাঁর, বিদেয় হলে বাঁচি। আমি জানতে চাইলাম, আর নোবেল-কে কেমন লাগে? উত্তর এল, “দাঁড়াও না, এরও সময় হয়ে এসেছে – এদের পলিটিক্স নিয়ে সেদিন ফেসবুকে লিখেছিল তো কে। তুমি চিন্তা কোরো না, খুব শিগগিরি এর টাইম খতম হয়ে যাবে”।

৩। আমি বললাম শান্তনু মৈত্র মনে হয় একটু বেশী বাজে বকে। শ্বাশুড়ি-মা বললেন, “ওর স্বভাব চরিত্রও খুব একটা সুবিধার নয়”। আমি বললাম, ও তো বিবাহিত। উত্তর এল, “তাতে কি হয়েছে – অজয়ের মেয়েটার সাথে কি একটা ছিল। মেয়েটা ভালো গায়, বাপের কাছ থেকে পেয়েছে। ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল তো – এখন বেলুড়ের দিকে কোথায় থাকে”। আমার অবিশ্বাস হল, ধুর তেমন কিছু হয় নাকি? আমাকে বলা হল, “সুকান্ত তুমি অনেক পিছিয়ে আছ দেখছি – এতো দিন বিদেশে থেকে দেশের খবর তো দেখছি কিছুই রাখো নি!”

৪। শ্রীকান্ত আচার্যের ব্যাপার আলাদা। নিজের মা-কে খুব ভালোবাসে জান? আচ্ছা, ওর বউয়ের নাম কি বলত? অর্ণা শীল – ভালো মেয়ে।

৫। এবার এল স্নিগ্ধজিত গান গাইতে – সঙ্গে গৌতম হালদার। সত্যি বলতে কি যেভাবে কাল কবিতা আবৃত্তি করছিল গৌতম হালদার তা আমার কাছে অত্যন্ত অতিনাটকীয় মনে হচ্ছিল। শ্বাশুড়ি-মা বলে দিলেন, “ন্যাকা!” কবিতা আবৃত্তি করতে করতে গৌতম হালদারের চোখে জল দেখা গেল – তারকদা কালকেই চোখের ডাক্তার দেখিয়ে ঠিক দূর থেকে ঠাওর করতে পারছিল না সেটা আদপেই চোখের জল কিনা। উনি জানালেন, “ওটা চোখের জলই তারক, এই করে খাচ্ছে – চোখে জল আনা কি এমন ব্যাপার”। আবার নিজের মনেই যোগ করলেন, “সোহিনীকে ছাড়ার সময় কান্না আসে নি?”। আমি কমেন্টটা বুঝতে না পারলে, আমাকে জানানো হল সব ব্যাকগ্রাউন্ডের খবর – ‘তুমি যে আমার’ বা এই ধরণের কি একটা প্রোগ্রাম আছে টিভিতে সেখান থেকে তিনি আপডেটিত হয়েছেন। গানের শেষে একটা সোলো আবৃত্তি করতে এগুলো গৌতম হালদার, আমাকে উনি বললেন, “দ্যাখো সুকান্ত এবার পা তুলে তুলে কেমন নেচে নেচে আবৃত্তি করবে। আমি গৌতমের দু-তিনটি নাটক দেখেছি, সেই নেচে বেড়ায়। তবে একটু চুপ কর এবার, ভালোই লাগে কিন্তু শুনতে”। সত্যি দেখলাম গৌতম বাবু পা তুলে তুলেই নেচে নেচে রবি ঠাকুর আওড়ালেন।

সা রে গা মা পা শেষ হয়ে গেল। রাত হয়ে যাচ্ছিল – আমি উঠলাম ইনফরমেশন ওভারলোডেড হয়ে। একে তো প্রচুর খেয়েছি, তার উপর এই তথ্যভার। ভাবছিলাম কেউ যদি হুইলচেয়ারে করে উবেরে উঠিয়ে দেয় তো খুব ভালো হয়।

আমাকে বললেন তুমি কিন্তু বর্ধমান এলে আমাদের বাড়ি আসবে। ভালো মিষ্টির দোকান হয়েছে আজকাল ওদিকে। মিষ্টির আহবান কি আর না করা যায়! পরের বার গেলে দ্যাখা হবে আর ইন্ডাষ্ট্রির আপডেট-টাও একটু নিয়ে আসব, ফালতু আনন্দলোক কিনতে হবে না!

একটাই আফসোস রয়ে গেল কালকে, শ্রাবন্তীর বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে ভিতরের খবরটা জানা হল না!


Name:  Amit           

IP Address : 9003412.218.7812.41 (*)          Date:12 May 2019 -- 11:51 AM

ইয়ে মানে ভূত টুত নিয়ে মায়া পাতায় কুসংস্কার বলে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দি বটে, কিন্তু একা থাকলে এখনো মাইরি আমি টিভি ছেড়ে ঘুমোই, ওটা চললে মনে হয় সঙ্গে এক দুজন আছে । নাহলে আমার সাহস একদম ফুড়ুৎ।


Name:  রঞ্জন          

IP Address : 232312.162.127812.195 (*)          Date:12 May 2019 -- 10:18 PM

সুকি,
আমার বন্ধুর নাম সুব্রত সাঁই। ওরা বেশ বড় সাঁই পরিবার।


Name:  dd          

IP Address : 670112.51.6712.239 (*)          Date:13 May 2019 -- 07:10 AM

এই যে সুকি লেখে, সব তো রোজকার মানুষ জন। কিন্তু কেমন ভাবে কতো গল্প খুঁজে পায় প্রতিটি মানুষের মধ্যে। এটা একটা ট্যালেন্ট। আরেকজন লিখতেন - tkn নামে, সেও দেখতাম প্রতিদিনের মানুষজন, নিত্তি দ্যাখা হয়, সবার মধ্যেই কতো গল্পো খুঁজে পান।

আমি অনেক ভেবেও এই দীর্ঘ জীবনে সেরকম কোনো স্টোরি পাই না। তা হলে আর আত্মজীবনী লিখিবো কী করিয়া?

খ বাবুকেও দেখলাম, (অন্য এক টইতে) নিজের আত্মজীবনী দেড় প্যারায় শেষ করলেন। অনুপ্ররিত হয়ে আমিও আমার অটোবায়োগ্রাপি প্রায় দুই প্যারা লিখেই হাঁপিয়ে গ্যালাম।




Name:  রঞ্জন          

IP Address : 232312.176.78.233 (*)          Date:13 May 2019 -- 11:40 AM

্ডিডি,
নো ইয়ার্কি! 'আমার সত্তর' কেমন নামিয়েছিলেন!
আসলে আপনি মহা আলসে, খালি ল্যাদখেয়ে গড়িয়ে প্রচুর বই পড়েন, রাম খান আর ছবি আঁকেন। শুক্কুরবারের পদ্য লেখাও বন্ধ হওয়ায় বাংলা কবিতা শক্তি চাটুজ্জের পরবর্তী অবতারকে হারালো।
কখনও সখনও গা ঝাড়া দিয়ে উঠে কলম হাতে নিলেই ----!


Name:  সুকি          

IP Address : 90045.205.232323.195 (*)          Date:13 May 2019 -- 08:53 PM

অমিতাভদা, ডিডিদা এবং রঞ্জনদা ধন্যবাদ।

ডিডি-দা পদ্য আমি পড়ি নি - কোথায় পাওয়া যাবে?



Name:  গবু          

IP Address : 342323.191.1256.76 (*)          Date:13 May 2019 -- 09:10 PM

সুকি, পড়ছি কিন্তু। জব্বর হচ্ছে।

ডিডি, দুটো পার্ট ছিল কি আমার সত্তরের? অন্য পার্ট থাকলে লিংক দেবেন প্লিজ?

যে দুটো খুঁজে পেলাম তার লিংক নীচে:

http://www.guruchandali.com/guruchandali.Controller?portletId=1&pid=co
ntent/guruchandali/guruchandali4/1188426642091.htm


http://www.guruchandali.com/guruchandali.Controller?portletId=1&pid=co
ntent/guruchandali/guruchandali5/1188426644689.htm



Name:  dd          

IP Address : 670112.51.1223.171 (*)          Date:13 May 2019 -- 10:08 PM

নাঃ, অন্য কোনো পার্ট নেই। ঐ দুটোই।

সত্তরের দশকও তো শেষ হয়ে গেলো।


Name:  রঞ্জন          

IP Address : 238912.69.5678.131 (*)          Date:13 May 2019 -- 10:33 PM

গবু,
অনেক ধন্যবাদ। আমি দুবারে আট কপি কিনেছিলাম, বিলিয়েছিলাম অনেক বন্ধুকে। সেও সাত-আট বছর হয়ে গেল। আজ আপনার সৌজন্যে আবার একটানা পড়লাম।

দীপ্তেন,
দম আটকানো ভাব। অমোঘ শেষ লাইনটা --রক্তের গন্ধ।
তবু বেঁচে আছি, এই অনেক মনে হয়।



Name:   ন্যাড়া           

IP Address : 1278.202.5634.85 (*)          Date:14 May 2019 -- 10:54 AM

এই মাসিমাদের আমি চিনি। আমার কচি বয়েসে একবার আমি এরকম এক মাসিমার সঙ্গী হয়ে দেশে ফিরছিলাম। আলাপ হবার পরে চতুর্থ বাক্যে জিগেস করেছিলেন, "ব্যাতন কত?"


Name:  রঞ্জন          

IP Address : 238912.69.5678.131 (*)          Date:14 May 2019 -- 11:04 AM

@ন্যাড়া,
ঃ)))।

সুকি,
বেশ কয়েকবছর আগের কবিতার টইয়ে (১) ডিডির নিয়মিত শুক্রবারের কবিতা/ছড়া পাওয়া যাবে।


Name:  Titir          

IP Address : 892312.210.780112.27 (*)          Date:15 May 2019 -- 12:23 AM

সেদিন এই নিমো নামটা কিছুতেই মনে পড়ছিল না। তারপরে মনে করার চেষ্টা করলাম ডিজনির মুভি দিয়ে। পেয়ে গেলাম ফাইন্ডিং নিমো। বেঁচে থাক নিমো গ্রাম তার সব কিছু নিয়ে।


Name:  সুকি           

IP Address : 90045.205.232323.195 (*)          Date:19 May 2019 -- 08:20 AM

ইউ টেল মি
--------------------

কিছুদিন আগে লিখেছিলাম যে আমাদের নিমো গ্রামের ঘোষ পাড়ার শিবে জ্যাঠা আমার মেমারী ইস্কুলে ফার্ষ্ট হবার কথা শুনে কি কষ্ট পেয়েছিল। মানে কষ্ট ঠিক আমার ফার্ষ্ট হবার জন্য নয়, বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নীচে নামতে নামতে কোথায় গ্যাছে যে আমি পর্যন্ত ফার্ষ্ট হচ্ছি – এই ভাবনাতেই যা কষ্ট আর কি। আমি এও বলেছিলাম যে আমার ইংল্যান্ডে পড়তে যাওয়া দেখে সাহেবদের দেশেও শিক্ষা ব্যবস্থার কি হাল হয়েছে তা অনুভবের আগেই জ্যাঠা পরলোক গমন করে। তাই ভাবলাম যে জ্যাঠা বেঁচে থাকলে কি কি কারণে আরো বেশী কষ্ট পেত আমার পি এইচ ডি করা দেখে সেটাও লিখে রাখি। অনেকে ভাবতে পারেন যে আমি নিজেই নিজেকে গ্যাস দেবার জন্য এবং বার খাওয়াবার জন্য এই সব লিখছি। তবে এতদিনে নিশ্চয়ই আমার অ্যাকাডেমিক এলেম নিয়ে আপনাদের একটা হালকা ধরণা হয়ে গ্যাছে – সেই অনুযায়ী আপনারা এক চিমটি গন্ধক লবণ সহকারে আমার বিলেতের বাতেলায় ডুবে যান।

প্রচুর পাবলিক যেমন দাবি করে রবি ঠাকুর নাকি বাঙালীর জন্য সবকিছুই লিখে রেখে গ্যাছে – তেমনি আমি ভেবে দেখলাম, আমার নিজের কথা আমি নিজেই অনেক আগে ভাগে এদিক ওদিক বলে ফেলেছি। যেমন বলেছি যে সাবজেক্ট হিসাবে মেটালার্জি জিনিসটা অনেকটা হোমিওপ্যাথির মত – ওই বিশ্বাস, ঘোড়ার ল্যাজের চুল, তিনবার ঝাঁকানো, শনিবারে টক না খাওয়া, এই সব মিলিয়ে মিশিয়ে তৈরী। এই ব্যাপারটা ধরতে আমার ফার্ষ্ট এবং সেকেন্ড ইয়ার লেগেছিল – এবং ধরতে পাবার পর বললে বিশ্বাস করবেন না থার্ড-ফোর্থ ইয়ার, মাষ্টার্স এবং পি এইচ ডি করাকালীন আমার থেকে বেশী নাম্বার পেয়েছে কোন সাবজেক্টে আমার ক্লাসের অন্য কেউ, সেটা প্রায় হয় নি বললেই চলে। ইংল্যান্ডে গিয়ে বুঝতে পারলুম ইঞ্জিনিয়ারিং পি এইচ ডি জিনিসটা অনেকটা মেটালার্জীর মত। মানে একটা ডিপারমেন্ট থাকবে, প্রোফেসর থাকবে, একটা ল্যাব, কিছু মেশিনপত্র – মাঝে মাঝে কনফারেন্স ইত্যাদি মিলিয়ে মিশিয়ে। কিন্তু সবার উপরে থাকতে হবে বিশ্বাস!

শুরু করার দুই-তিন মাসের মধ্যে একটা রিসার্চ পরিকল্পনা খাড়া করে সুপারভাইজারের কাছে গেলাম – সব শুনিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কি বলেন”? তিনি মুচকি হেসে বললেন, “ইউ টেল মি”! আমি যা বলার বললাম – তিনি বললেন আরো একটু ভাবো। আমি রসিকতা করলাম, “ভাবা প্র্যাক্টিস শুরু করব কি”? তিনি বললেন, “হোয়াট”? আমি বললাম, “কিছু না – দেশীয় প্রবাদ বাক্য”। কিছু দিন পরে আবার দুই একটা এক্সট্রা জিনিস যোগ করে নিয়ে গিয়ে বললাম, “এবার কেমন লাগছে?” তিনি আবার চেয়ারের পিছনের দিকে হেলে গিয়ে বললেন, “ইউ টেল মি”! আমার তো এবার নিমোর বাড়িতে বাঁকুর বউয়ের কুমড়ো কিনতে আসার কথা মনে পড়ে গেল। বাবা দাম কত দেবে জিজ্ঞেস করলেই যে বলত, “দাদা, আপনি বলেন”। আমার সুপারভাইজার আবার কেমব্রীজে আগাগোড়া পড়াশুনা করা – সাবজেক্ট জগতে নাম আছে, ফান্ডাও আছে বেসিক জিনিসপত্রে – তবে কিনা সেই কবে ঘি খেয়েছে,আর এখনো আঙুল শুঁকছে এমন টাইপের। যা বোঝার বুঝে গেলাম – নিমো বটতলায় হোমিওপ্যাথির বিখ্যাত নারাণ ডাক্তার কি করত এমন অবস্থায় আমি ভেবে নিলাম। সুপারভাইজারকে বললাম, “নো ওরি, আই উইল টেল ইউ লেটার”। সেই ‘লেটার’ জিনিসটা আমি খুব কম এনেছিলাম পি এইচ ডি-র বাকি সময়টায়। নিজের মনেই এটা সেটা করতে লাগলাম। আমাদের পাড়ার হাজরাদের বদে-কাকা যেমন তার ভাইপো বাণীব্রত সমন্ধে বলেছিল, “এ ছেলে কিছু একটা হবে বুঝলি – এই সাপ কাটছে, এই ব্যাঙ কাটছে ঘরে”। আমার অবস্থা তখন সেই বাণীব্রত-র মত – এটা মেশাচ্ছি, সেটা মেশাচ্ছি। বাণীব্রত যেমন পরে কিছু একটা হয়েছিল, মানে মেমারী-তে ‘আবাকাস’ ইস্কুলের ফ্র্যাঞ্চাইজ নিয়ে ছিল – তেমনি আমি বছর খানেক পরে একটা রিসার্চ রিপোর্ট জমা দিলাম স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং-এ।

রিসার্চ রিপোর্ট জমা দিয়ে আবার এটা সেটা মিশিয়ে, এর সাথে সেটা জুড়ে এক্সপেরিমেন্ট করে, বাচ্ছা গুলোর মাঝে মাঝে ল্যাব ক্লাস নিয়ে বেশ কাটাচ্ছিলাম। একদিন দেখলাম মেল এসেছে একটা ডিপারমেন্ট সেক্রেটারী অ্যান-এর কাছ থেকে যে অমুক দিনে সন্ধ্যাবেলা পুরষ্কার প্রদান, চলে এসো। আমি উত্তর দিলাম যে, মনে হচ্ছে অ্যান তুমি ভুল করে আমাকে মেল পাঠিয়েছো, এটা অন্য কেউ হবে। অ্যান বলল, না ওটা তোমারই পুরষ্কার! অবাক হয়ে এবার অ্যান-কে ফোন – যা বুঝতে পারলাম যে সেই বছরে গোটা ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টিতে আমার রিসার্চ রিপোর্ট নাকি আউটস্ট্যান্ডিং হয়েছে এবং তাই আমি একটা পুরষ্কার পাব কোন এক প্রাক্তনীর স্মরণে! খবরটা বুঝতে পারার পরেই আমার চোখের সামনে শিবে জ্যাঠার মুখটা ভেসে উঠল। টয়লেটে গিয়ে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে নিজের মনেই বললাম, “বিশ্বাস কর জ্যাঠা, এতটা কষ্ট তোমায় আমি দিতে চাই নি!”

ফার্ষ্ট ফরোয়ার্ড প্রাইজ নেবার দিন – কলেজের অডিটোরিয়ামে পুরষ্কার দেওয়া হবে, সঙ্গে দুজন গেষ্ট নিয়ে যাওয়া যাবে, ডিনার আছে। আমার সাথে আর কে যাবে! যাকেই জিজ্ঞেস করি, সেই বিজি – আর কেই বা বন্ধুর পুরষ্কার নেওয়া দেখতে যেতে চায়! সে যতই ডিনারের লোভ দেখানো যায়। শেষ পর্যন্ত মনে হয় যোসেফ আমার সাথে যেতে রাজী হল। আমরা ল্যাব শেষে ময়লা জিন্স, জামায় স্যাম্পেল পলিশের দাগ, হাতের নখের ফাঁকে ল্যাব জাত ময়লা নিয়ে গিয়ে হাজির হলাম পুরষ্কার প্রদানে। গিয়ে তো আমাদের ইয়ে ট্যাঁকে উঠে গেল। ইংরেজ জাত – সব টাই-ফাই পরে চলে এসেছে। যারা পুরষ্কার পাবে তাদের বাপ মা-ও জম্পেস ড্রেস লাগিয়ে এসেছে। আমাদের দেখে সবাই কেমন আড়চোখে তাকাচ্ছে – ভাবছে সিওর এরা ফ্রী ডিনারের লোভে এসেছে। আমি আর কি করি, চুপিচুপি গিয়ে পিছনের বেঞ্চে বসলাম। এক সময় ডাক এল স্টেজে, পারলে প্রায় বুকে হেঁটে গিয়ে নিই এমন ভাবে নিশ্চুপে গেলাম। সার্টিফিকেট নিয়ে চলে আসছি, বলল, “আরে দাঁড়াও চেকটা নিয়ে যাও!” আমি তো ফ্রী খাবার আর সার্টিফিকেট পেয়েই খুশী – তার উপর আবার চেক দিচ্ছে! বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটি এবং আরো একবার মেটালার্জী-কে ভালোবেসে ফেললাম। সীটে ফিরে টুক করে চেক-এর অঙ্কটা দেখে মন আরো খুশ! আমার মাসিক স্কলারশিপের প্রায় চারগুণ! বেশ কিছুদিন ধরে ল্যাপটপ কেনার জন্য টাকা জমাচ্ছিলুম – দুঃখ ছিল যে পি এইচ ডি শেষ হবার আগে সেই ল্যাপটপের টাকা জমবে না বলে। এবার সব সুরাহা হয়ে গেল – এতো আনন্দ পেলাম যে ওই পোষাক পরেই সাহেবদের গা ঘেঁষাঘেঁষি করে প্রচুর ডিনারে খাওয়া হয়ে গেল। দু একবার তো একটা সাহেবকে হালকা পুস-ও করে দিলাম ডেজার্টের জায়গা থেকে। তার পরের দিনই আহসান-কে সঙ্গে নিয়ে ‘জন লুইস’ ডিপারমেন্ট স্টোরে গিয়ে সোনি ল্যাপটপ কেনা – সেই সোনি আমাকে অনেক দিন বিশ্বস্ত ভাবে সঙ্গ দিয়ে গ্যাছে।

এই ভাবেই চলছিল – আমার সুপারভাইজার দুই জন প্রায় সব ব্যাপারেই মাইডিয়ার টাইপের লোক। আমিও আজ আমেরিকা, কাল সুইজারল্যান্ড, পরশু ফ্রান্স – নানা ল্যাব ঘুরে এক্সপেরিমেন্ট এবং কনফারেন্স করে সময় কাটাচ্ছিলুম। খুব রেয়ার সুপারভাইজারের ঘরে গিয়ে আলোচনা এবং “ইউ টেল মি” শোনা। সে এক বিশাল মস্তির টাইম। দেখতে দেখতে বছর দুই হয়ে গেল – এবার একটা রিসার্চ রিপোর্ট জমা দিলাম “ইউ কে ইন্সটিটিউট অব করোশন” অথোরিটি কে। আবার একবার শিবেজ্যাঠাকে দুঃখ দিলাম – সেবার পুরষ্কার নিতে ডাকল ম্যানচেষ্টারে। হোটেল, ভালো খাওয়া দাওয়া সবই দিল। পুরষ্কার নিতে উঠে শুধু একটা সার্টিফিকেট পেলাম। ততদিনে আমার লোভ বেড়ে গ্যাছে – শালা চেক নেই কেন? আমি গিয়ে ধরলাম চেয়ারম্যান প্রোফেসর স্টুয়ার্ট-কে – বললাম, “পয়সা দেবেন না”? বলল, “আরে আমাদের ফাইন্যান্সে কি একটা হালকা ইস্যু হয়েছে, তুমি চিন্তা করো না, আমি পাঠিয়ে দেব চেক তোমার ইউনিভার্সিটি ঠিকানায়”। আমি সাহেবের কথায় বিশ্বাস করে চলে এলাম – বেশ কিছু সপ্তাহ হয়ে গেল চেক আর আসে না। আমি তখন মাঝে মাঝেই স্টুয়ার্ট-কে মেল করা শুরু করলাম, চেক কোথায় বলে। শুক্রবার বিকেল – বুধবার সকাল – কোন টাইমের ঠিক নেই। হাতে বেশী কাজ না থাকলেই আমি মেল করতাম। এক সময় বিরক্ত হয়েই মনে হয় প্রোফেসর স্টুয়ার্ট বলল, “আমি তোমাকে আমার নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে চেক দিচ্ছি, পরে ইনস্টিটিউটের সিষ্টেম ঠিক হলে আমি অ্যাডজাষ্ট করে নেব”। এই ভাবে সেই বছরের দূর্গাপুজায় বাড়ি ফেরার প্লেন ভাড়াটা ম্যানেজ হয়ে গেল!

পি এইচ ডি শেষের দিকে এগুলে চাকুরী খুঁজতে শুরু করা। আমার কাজ তো করোশন নিয়ে, আমাদের রোল সেই ডাক্তারদের মত। রোগ বাড়লে চাহিদা বেশী। সেই বছরে বলতে নেই এদিক ওদিক পাইপ লাইন, ভেসেল ফাটল নানা কোম্পানীর – আমাদের চাহিদা হয়ে গেল বেশ ভালো। খুব কম সময়ের মধ্যে গোটা পাঁচেক চাকুরীর অফার পাওয়া গেল – আমষ্টারডামে আমার এখনকার কোম্পানীতে জয়েন করব ঠিক করলাম। পি এইচ ডি মোটামুটি আমাদের গ্রুপ থেকে রেকর্ড সময়ে জমা দিয়ে নিমো ফিরে মাস খানেক সময় কাটিয়ে চাকুরী জয়েন করলাম।

চাকুরী করার কিছুদিন পর ভাইভার ডেট পেলাম – আমষ্টারডাম থেকে বন্ধুদের জন্য একগুচ্ছ স্ত্রুপওয়াফেল এবং ডাচ বিস্কুট নিয়ে বার্মিংহাম এয়ারপোর্টে নামলাম। এমন নয় যে বার্মিংহাম এয়ার পোর্ট থেকে এই প্রথম – কিন্তু এই বার আমার হাতে একগাদা স্ত্রুপওয়াফেল, কেক, পেষ্ট্রি দেখে এবং তদোপরি আমষ্টারডাম থেকে এসেছি বলে ইমিগ্রেশন এবং কাষ্টমস বাবুদের চোখ টেরিয়ে গেল। একটা কুত্তা লেলিয়ে দিল – সেই কুত্তা এসে আমার ব্যাগ, গা, পোঁদের ফাঁক সব শুঁকলো মন দিয়ে – তারপর আমি কুত্তার ক্লিয়ারেন্স পেলাম। কিন্তু মানুষ কাষ্টমস তখনো বাকি, তেনার বদ্ধ ধারণা হয়েছে যে আমার কেস পেষ্ট্রিতে গাঁজা ভরা আছে। আমি বলছি, দেখুন এগুলো আমার বন্ধুদের জন্য নিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু কে শোনে! দেখলাম, ব্যাটা অফিসারটা হাতে গ্লাভস পড়ছে। আমার দেখে হয়ে গেল – একটা টিভি সিরিজ দেখতাম যেখানে কাষ্টমস অফিসাররা হাতে গ্লাভস পরে পোঁদের ভিতর চেক করত। ওখানে ড্রাগস নাকি অনেক পাবলিক লুকিয়ে চালান করত! আমার তো হয়ে গেল দেখে – কাল বাদে পরশু ভাইভা, অন্তত সোজা হয়ে হেঁটে ঘরে ঢুকতে হবে তো! তারপর আমাকে মানসিক শান্তি দিয়ে দেখলাম সেই অফিসার হাতে গ্লাভস দিয়ে কেক-পেষ্ট্রি থেকে কি যেন স্যাম্পেল করে একটা মেশিনে ঢোকালো। আমার তখন পেছন মারা যাবার ভয় থেকে মুক্তি পেয়ে প্রবল উচ্ছলতা হয়েছে – আমি কায়দা করে অফিসারকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, এটা কি আপনি রামন স্পেক্টোস্ক্রোস্পি করছেন”? অফিসার বলল, “তুমি চুপচাপ বস, তা না হলে পিছনে ওই রামন না কি বলছ, সেটা ঢুকবে”।

তো যাই হোক কেক-পেষ্ট্রি নিয়ে বন্ধুদের কাছে পোঁছলাম। যা হয় আর কি, কয়েক মাস পর দেখা হলে রাত ভর পার্টির আয়োজন। ভোর চারটের সময় ওলা বলল, “সুকি, তুই শুতে যা এবার – আমাদেরই টেনশন হচ্ছে তোর জন্য, কাল সকাল আটটায় তোর ভাইভা”। আমি আর মাতাল ওলাকে মেটালার্জী এবং হোমিওপ্যাথির ব্যাখা দিলুম না – কেবল কেত নিয়ে বললাম, “ও আমি ম্যানেজ করে নেব – এত বছর জিনিসটা রগরেছি, কিছু তো ডিফিউশন হয়েছে”।

পরের দিন ভাইভা দিতে গেলাম – এক্সটারনাল এক্সজামিনার দেখলাম স্যুট পড়ে এসেছেন আর আমার টাই পর্যন্ত নেই! মুখ দেখে মনে হল এমন চীজ তিনি এক্সপেক্ট করেন নি। আমি দেখলাম তাঁর হাতে আমার থিসিস এর জমা দেওয়া এক কপি – প্রচুর পাতায় স্টিকি দিয়ে মার্ক করা রয়েছে। তবে মেটালার্জী নিয়ে ঘাবড়াবার ছেলে আমি নই – তিনি প্রশ্ন শুরু করলেন, আমি জবাব দিচ্ছি। খানিক পরে তিনি প্রায় কনফিউজড চোখে আমার সুপারভাইজারকে বললেন, “যাই জিজ্ঞেস করছি তাই তো দেখছি এ জবাব দিচ্ছে! এতো ‘জন লুইসের’ সেলসম্যান-গুলোর উপর দিয়ে যায়! কি বলছে আমি অবশ্য সব ঠিক বুঝতে পারছি না – যেভাবে বলছে তাতে করে মনে হচ্ছে পুরোপুরি ভুল নয়। কিন্তু ঠিক কিনা সেটাই এক্ষুণি যাচাই করা শক্ত”। এবার আমার দিকে তাকালেন, “চাকরি পেয়েছ”? আমি হ্যাঁ বললাম। তিনি আমার সুপারভাইজারকে বললেন, “বেচারী অনেক দূর দেশ থেকে পড়তে এসেছে, তার উপর কষ্ট করে একটা চাকুরীও জোগাড় করেছে। একে ফেল করিয়ে আর কি হবে। আর তা ছাড়া এ তোমার গ্রুপে বেশী দিন থাকলে করোশন কতটা শিখবে তোমার স্কলাররা সেটা বলতে পারব না, কিন্তু সুপার মার্কেটের সেলসম্যান হবার ট্রেনিং পেতে থাকবে এর কাছ থেকে”। আমার সুপারভাইজার দেখলাম স্পষ্ট ভয় খেয়ে গেল – ফট করে অ্যাসেসমেন্ট শীট-টা কাছে টেনে নিয়ে চট করে সাইন করে দিয়ে বলল, “কনগ্রাটস ডঃ”।

তো এই হল গিয়ে পি এইচ ডি লাভের গল্প। শিবে জ্যাঠা বেঁচে থাকলে সেলসম্যানের উপমা শুনে খুশী হত – কারণ জ্যাঠা আমাকে সেই কবেই ফ্যামিলি ব্যবসায় নেমে যেতে বলেছিল পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে! জ্যাঠার অ্যাসেসমেন্ট আফটার অল খুব একটা খারাপ ছিল না আমার স্ট্রেন্থ নিয়ে!

মেমারী ইস্কুলের বাঙলার স্যার দূর্গা কুন্ডু বলেছিল আমায়, “যা লেখার লিখবি, কিন্তু শেষে একটা সামারি দিবি”। তা এই লেখার সামারি হলঃ

১। ইঞ্জিনিয়ারিং পি এইচ ডি বিষয়টা অনেকটা মেটালার্জীর মত – আর মেটালার্জী বিষয়টা প্রায় হোমিওপ্যাথির মত।

২। মেটালার্জী পড়ার জন্য কোন পূর্ব বিদ্যা আবশ্যক নয়। যে কোন ব্যাকগ্রাউন্ড (হয়ত কেবল মাত্র সংস্কৃত বা পালি ছাড়া) থেকে গিয়ে মেটালার্জী পড়া যায়।

৩। হাত পা ছড়িয়ে এবং নরম ভাবে টেনশন না নিয়ে পি এইচ ডি করতে চাইলে আপনার একমাত্র গন্তব্য স্থান হল ইংল্যান্ড।

৪। অ্যাকাডেমিক্যালি পুরো অকুতভয় থাকুন। আজকের যুগে যেটাকে ম্যানেজমেন্টিয় ভাষায় ‘সেলফ কনফিডেন্স’ বলা হয়, সেটা আমাদের বিহার, ইউ পি তে বহুযুগ থেকে চলে আসছে “তো কেয়া হুয়া” স্বরূপ। [এটা আমাকে সেদিন আমার শ্রদ্ধেয় ভারত বিষয়ক পণ্ডিত শিবাংশু-দা প্রাঞ্জল করে বুঝিয়ে দিলেন]। পি এইচ ডি ভাইভায় যদি আপনার কাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলে এক্সজামিনার, তাহলে ‘তো কেয়া হুয়া’ ব্যবহার করুন। দেখবেন আর কোনো প্রবলেমই হবে না ভাইভায় উতরোতে।


Name:   ন্যাড়া           

IP Address : 1278.202.5634.85 (*)          Date:19 May 2019 -- 08:54 AM

মেটালার্জির কথায় মনে পড়ল, আমাদের মেটিরিয়াল সায়েন্স পড়তে হত দু সেমেস্টার, থার্ড ইয়ারে বোধহয়। ফার্স্ট সেমেস্টারে ডঃ বোস পড়িয়েছিলেন। অসাধারণ। মানে আমিও বুঝতে পেরেছিলাম। পরের সেমেস্টারে বিই কলেজের ডাকসাইটে প্রফেসর ডঃ শীল পড়িয়েছিলেন ভিজিটিং হিসেবে। সেরকম জমেনি।

যাকগে যে কারণে মেটেরিয়াল সায়েন্সের কথা মনে পড়ল - মেটেরিয়াল সায়েন্স বললেই টেন্সাইল স্ট্রেংথ-ফেংথের কথা মনে পড়ে। সেই থেকে মনে আসে হুকস ল'র কথাঃ স্ট্রেন ইজ ডাইরেক্টলি প্রোপোরশনাল টু দা স্ট্রেস অ্যাপ্লায়েড। ফার্স্ট ইয়ার ফিজিক্স পড়াতে এসেছিলেন সদ্য এমএ পাশ সুন্দরী অমুকদি। প্রথম দিনই, নার্ভাসনেসে কাঁপতে কাঁপতে, সবে হুকস ল'টি বোর্ডে লিখেছেন কি লেখেন নি, পেছনের বেঞ্চি থেকে আওয়াজ এল, "ম্যাডাম, একটু স্ট্রেস দিয়ে লিখুন, চোখে খুব স্ট্রেন পড়ছে।"


Name:  সুকি          

IP Address : 90045.205.232323.195 (*)          Date:19 May 2019 -- 08:59 AM

ন্যাড়দা,
আহা কি সব দিন ছিল সব। এখন ওসব করলে হ্যারাসমেন্ট হিসাবে নেওয়া হবে এবং তত সহ আরো অনেক কিছু। ভালোই করেছ মেটারিয়াল সায়েন্স মাত্র দু-সেমিষ্টারের মধ্যেই আবদ্ধ রেখে।


Name:  সুকি          

IP Address : 90045.205.232323.195 (*)          Date:19 May 2019 -- 09:00 AM

এই রে - ন্যাড়াদার নামের 'আ' গেল কোথায় আগের পোষ্টে!


Name:   ন্যাড়া           

IP Address : 1278.202.5634.85 (*)          Date:19 May 2019 -- 09:03 AM

তব, সুকিভাই, তুম তো ছুপা রুস্তম নিকলা পড়াশুনো কি বারে মে।

নিমোগ্রামের কন্টেন্ট আমি বুক করলাম। বই করব।


Name:  সুকি          

IP Address : 348912.82.3423.63 (*)          Date:28 Jun 2019 -- 06:48 AM

বাবুর বিয়ে, বরযাত্রী এবং
---------------------------------

আমার ভাই, মানে কাকার ছেলে বাবু-র বিয়ে দিয়ে এই ফিরলাম নিমো থেকে। সেই নিজের বিয়ে খাবার পর আর বাঙালী বিয়ে, বিশেষ করে নিমো গ্রামে কারো বিয়ে খাওয়া হয়ে ওঠে নি। আর কত দিন পর যে বরযাত্রী গেলাম সেকথা আর কি বলব! বিয়ের দিন বিকেল বেলা থেকে টেনশন – ঠিক সময়ে বরযাত্রী বেরোতে পারব তো? আমাদের ঘোষ পরিবার লতায় পাতায় এতই বড় যে সবাইকে ডেকে ডুকে গাড়িতে তোলাই ইটসেলফ একটা মেজর প্রোজেক্ট। দেরী করে বরযাত্রী পৌঁছবার মূল প্রবলেম হল মেয়ের বাড়িতে দেওয়া টিফিনটা ঠিকমত এনজয় করা হয় না। টিফিন শেষ হবার কিছু পর থেকেই রাতের মূল খাবার খেতে যাবার ডাক পড়তে থাকে।

তো এই সব পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকার জন্য আমি বাড়িতে সবাইকে তাড়া দিতে থাকি বেরোবার জন্য। বিয়ে হচ্ছে হাওড়া-বর্ধমান মেন লাইনের দেবীপুর স্টেশনে নেমে আরো খানিকটা ভিতরের গ্রামে। টাটা সুমো করে রওনা দেওয়া গেল – বর্ষাকাল বলে বৃষ্টি চলে এল বিকেলের দিকে, আর সেই বৃষ্টিতে বিয়ে করতে যাবার ফুল দিয়ে সাজানো গাড়ির ফুলের কারুকাজ গেল কিছু খুলে। ঠিক হল যে মেমারীর উপর দিয়ে যাবার সময় ফুলের দোকানে দাঁড়িয়ে সেই কারুকাজ আবার ঠিক করে নিলেই হবে। আমার এই প্রস্তাব একদম পছন্দ হল না – রাস্তায় দাঁড়ানো মানেই আবার সেই সময় নষ্ট, আবার সেই টিফিন খাওয়া পিছিয়ে যাওয়া। কিন্তু বাবু বলল ফুল দিয়ে গাড়ি না সাজিয়ে সে বিয়ে করতে যাবার কথা ভাবতেই পারছে না। ফলে কি আর করা, দাঁড়াতে হল মেমারীতে ফুলের দোকানে। আমি এদিকে টিফিনের জন্য উসখুশ করছি, পাশে বসা ডাক্তারদের গৌরদা বলল, “তুই যে এত টিফিন খাব খাব করছিস, তোর মনে আছে টিফিনে কি দেয়? আর তা ছাড়া আদৌ টিফিন দেবে কিনা?” আমি বললাম, “বল কি গো, কি বাড়িতে বিয়ের ঠিক করেছ যে টিফিন দেবে না খাবার আগে?” গৌরদা আবার জিজ্ঞেস করল, “কি দেবে টিফিনে মনে হয়”? বললাম, “কি আবার দেবে, আমাদের সময়ে যা দিত তাই দেবে – নিদেন পক্ষে গুটকে কচুরী আর বালুসাই বা খাস্তা গজা তো থাকবেই”।

বললে বিশ্বাস করবেন না গিয়ে দেখলাম টিফিনে দেওয়া চারটে আইটেমের মধ্যে আমার প্রেডিক্ট করা দুটো আইটেম মিলে গেল! বুঝলাম, পরিবর্তন যা কিছু হয়েছে তা কেবল ওই নীল-সাদা রঙে – বিয়ের জগতে তেমন কিছু পরিবর্তন হয় নি। গুটকে কচুরী আর বাসি খাস্তা গজা খেয়ে এক পেট জল খেয়ে নিলাম – দিয়েই খানিক পরে এক বিশাল চোঁয়া ঢেঁকুর। গ্রামের ভিতরের দিকে বিয়ে – রাস্তায় জেনারেটরের আলোয় কিছু কিছু জায়গা আলোকিত – এক আলো – আঁধারি পরিবেশের সৃষ্টি হয়ে বেশ এক রোমান্স এবং ভৌতিক ব্যাপার দাঁড়িয়েছে। আমি আর পিন্টু রাস্তা দিয়ে এদিক ওদিক হাঁটতে লাগলাম – আমি খিদে বাড়াবার জন্য আর পিন্টু আমাকে সঙ্গ দেবার জন্য। ওদিকে বাবু বরের বসার সে বরাসন টাইপের হয়েছে সেটা আলো করে বসে আছে। আমি আর পিন্টু হাঁটতে হাঁটতে বাবুর শ্বশুরবাড়ির একটু পাশেই দেখলাম এক বিশাল আমড়া গাছ – ভাই কি বলব, এতো আমড়া গাছে ধরেছে যে চোখ ফেরানো যায় না। ডাল প্রায় নুয়ে ভেঙে যাবার মতন হয়েছে আমড়ার ভারে – কিন্তু সবই হাতের নাগালের বাইরে। মানে পারতে গেলে একটু গাছে উঠতে হবে।

পায়চারী করতে করতে ভাবছি কি করে আমড়া গাছ থেকে পাড়া যায়। এমনটা নয় যে আমড়া খুব মহার্ঘ্য কিছু এবং তার জন্য রাতের বেলা গাছে উঠতে হবে – কিন্তু ব্যাপারটা অর্থিক নয়, আদপে মনস্তাত্ত্বিক। যারা এর ওর গাছে উঠে মাল সটকেছেন তারাই জানে যে হাতের গোড়ায় পেড়ে নেবার মতন লকলকে ফল দেখে নিজেকে সামলানো খুব মুশকিল। আমি দোটানায় পড়লাম – না, সেটা বিবেকের দংশনের জন্য নয়, বরং নিজের ডিজাইনার পাঞ্জাবীর জন্য। অমৃতা নিজের শাড়ির সাথে ম্যাচিং করে ট্র্যাঙ্গুলার পার্কের পিছনে গলি তস্য গলি দিয়ে গিয়ে কোন এক ডিজাইনারের কাছ থেকে অর্ডার দিয়ে বানিয়ে ছিল। সে বোকাচোদা পাঞ্জাবীর ঝুল এত দিয়েছিল যে আর দুই মিলিমিটার লম্বা এবং সাদা রঙের হলে আরবদেশের শেখ বলে চালিয়ে দেওয়া যেত আমাকে। আর সেই গরমে আমাকে তার তলায় কিছু পরতেও হত না! সেই সব কিছু সামলে সবে মাত্র গাছে উঠেছি এমন সময় হই হই করতে তিন চার জন ওই গ্রামের লোক ছুটে এল – কোথায় ছিল মালগুলো কে জানে! একজন বলল,

“এ্যাই বাঁড়া, আবার গাছে উঠেছিস মাল সরাতে এত সাহস, তাও আবার দেখছিস পাশের বাড়িতেই বিয়ে হচ্ছে, লোকজনের আনাগোণা”।

আমি ভাবছি ‘আবার’ এখানে কি অর্থে ব্যবহার হয়েছে। তখনি পাশের একজন বলে উঠল,

“তোদের অবস্থা এত খারাপ আজকাল? আগে তাও না হয় রাতের বেলা বাইরের উঠোনে পড়ে থাকা অ্যালুমিনিয়ামের থালা বাটি সরাতিস ছিঁচকে চুরি করে। কিন্তু তা বলে আমড়া চুরি করতে শুরু করেছিস?”

আমি কেস বুঝতে পারলাম – এবং প্রতিবাদ জানালাম, “দেখুন, আমরা ছিঁচকে চোর নই”।

তারা বলল, “ধরা পড়লে সবাই ওমন বলে, তা এই গ্রামের ছেলে তো তুই নয়, এত রাতে এখানে কি করছিস?”।

আমার মাথায় তখনো প্রবল ঝোলা পাঞ্জাবীর কথা মাথায় ঘুরছে – বললাম,

“আরে আপনার কোনদিন পাঞ্জাবী পরা ছিঁচকে চোর দেখেছেন? তাও আবার এতো ঝুল দেওয়া? আমি ছুটতে পারব তাড়া করলে?”

আমার কথার এফেক্ট পড়তে দেখলাম ওদের মুখে – এর ওর দিকে চাইতে লাগল – কথায় বিশাল যুক্তি ছিল আমার। সিচ্যুয়েশন পুরো নিজের কন্ট্রোলে নেবার জন্য বললাম, “আমরা বরযাত্রী এসেছি এই পাশের বিয়ে বাড়িতে”।

ওদের চোখে সন্দেহ ঘন হচ্ছে – একজন বিজবিজ করল, “বরযাত্রী এসে কেউ আমড়া পাড়তে উঠেছে গাছে রাতের বেলা এমন তো বাপের জন্মে শুনি নি”!

আমি আর কি বলি! মনে মনে ভাবলাম, সেই যে সেলিমদার বিয়েতে বরযাত্রী গিয়ে যে আলমের পিসির ছেলের পোঁদ মেরে দিল দিনের বেলা গামা ভুঁয়ে নিয়ে গিয়ে গ্রামের জনা তিনেক ছেলে জমিতে জল দেবার পাম্পের পোড়া মোবিল দিয়ে – সেই বা কে শুনেছিল আগে! আমি তাদের উদ্দেশ্যে বললাম,

“দেখুন আপনাদের হোনেবালা জামাই বসে আছে বর বসার জায়গায়, আপনার কেউ একজন গিয়ে জিজ্ঞেস করে আসুন যে নীল পাঞ্জাবী পরা একজন রাতের বেলা আমড়া গাছে উঠতে যাচ্ছে সেটা তার দাদা কিনা”।

একজন প্রায় ছুটে গিয়ে বাবু-কে জিজ্ঞেস করে এসে কনফার্ম করল যে আমিই তার দাদা। আমরা ছাড়া পেয়ে সেখান থেকে গুটি গুটি পায়ে এগুচ্ছি এমন ভাব নিয়ে যেন কিছুই হয় নি। শুনতে পেলাম কে যেন বলছে,

“কি গো নবাদা, বিয়ে ঠিক করে এসে খুব যে বললে ছেলের ফ্যামিলি নাকি খুব ভালো, ছেলের দাদা বিদেশে থাকে – ডক্টর না কি যেন! ঠিক ঠাক খোঁজ নিয়ে বিয়ে দিচ্ছ তো, নাকি পলু-কে জলে ফেলে দিলে”।

তার পর জানি না কি আলোচনা করল তারা। তবে ফুলশয্যার দিন দেখলাম মিষ্টি ইত্যাদি তত্ত্বের সাথে এক ডাল ভরা আমড়া পাঠিয়েছে মেয়ের বাড়ির লোকেরা। তার পরের দিন গেঁজে যাওয়া রসগোল্লার রস দিয়ে সেই আমড়ার চাটনী আর বেঁচে যাওয়া খাসির মাংস সহযোগে দুপুরের লাঞ্চ করে বিকেলের ফ্লাইট ধরলাম ঢেঁকুর তুলতে তুলতে।


Name:  Amit          

IP Address : 340123.0.34.2 (*)          Date:28 Jun 2019 -- 07:23 AM

এটা প্রায় বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের "বরযাত্রী ও বাসর" এর কাছাকাছি চলে গেছে। তবে শেষে ভোগান্তি টা ওই লেভেল এর হয়নি ভাগ্যিস। তবে পাকা আমড়ার চাটনি দুর্দান্ত খেতে। পুরো জিভে জল আনা।

:) :)


Name:  রঞ্জন          

IP Address : 124512.101.6778.225 (*)          Date:30 Jun 2019 -- 12:17 AM

সুকিভাই,
তুমি নিমো গ্রামকে বাংলা সাহিত্যে অমর করে দিলে। ন্যাড়াবাবু এটা বই করলে অন্ততঃ এক প্রজন্ম বাংলার গ্রাম বলতে নিশ্চিন্দিপুরের পরে নিমোর কথাই ভাববে।
আচ্ছা, মেমারিতে দিলীপ দাস বলে সম্পন্ন ভূস্বামী পরিবারের কাউকে চিনতে কি ? ফর্সা, বেঁটে আজকে সত্তর বছর বয়েস হবে? এমনই কৌতুহল্‌ ।া
আর 'সেলিমদার বিয়েতে---' লাইনটা পড়ে খুক খুক করে হেসেই যাচ্ছি। গিন্নি কারণ জিগাইলে বলতেও পারছি না । কি গেরো!


Name:  একক          

IP Address : 236712.158.015612.123 (*)          Date:30 Jun 2019 -- 06:41 AM

উফফ -খাসা হৈছে !!:)

কলেজ লাইফের পর ফল পারতে গাছে চড়িনি , কারণ বছরে দুমাস মামাবাড়িতে কাটানোর সুযোগ আর ছিল না । কিন্তু যারা রেগুলার গাছের ফল পেরেছে তার নিকটতম নিদর্শন আমার খুব কাছেই আছেন : আমার মা । কীরকম একটা ইনস্টিংক্টের ভেতর ঢুকে যাওয়া চুলকানি । ডিএনে লেভেলে , কিছু হয় ফয় বোধয় :))

লুরুতে একদিন পাড়ায় হাঁটছি , একটা সজনে গাছ রাস্তার ধারে । মায়ের হাঁটার গতি শ্লথ হয়ে এলো , কীরকম চকচকে চোখে তাকিয়ে বললেন : দেখো কত কচি কচি সজনে হয়েছে !! আমি শক্ত করে হাত ধরে বললুম : সজনে তো প্রায়ই আনি বাজার থেকে ? !

- ওগুলো সজনে নাকি ? দারোগার লাঠি তো ! নাজনে ওগুলো -সজনে বলে বেচে দেয় তোমাকে !!

বলে আবার দাঁড়িয়ে , সজনে গাছের দিকে লোলুপ দৃষ্টি । "একটা আঁকশি থাকলে .........."

আমি আর কথা বাড়ালুম না । নাজনে ও সজনের পেডিগ্রির পার্থক্য নিয়েও না । অভিজ্ঞতা বলে এ বড় বিপদকাল । একরকম টেনে টুনে বাড়ি চলে এলুম । পঁয়ষট্টি-উর্ধ মানুষটিও সঙ্গ নিলেন; যেভাবে নার্সারির বাচ্ছাকে ঝাল লজেন্স কিনে না দিলে বিরস বদনে , অনিচ্ছায় ।




Name:  Du          

IP Address : 237812.69.90067.69 (*)          Date:30 Jun 2019 -- 07:52 AM

গল্প ও এককের কমেন্ট ঃ)))))


Name:  সুকি          

IP Address : 237812.68.786712.75 (*)          Date:30 Jun 2019 -- 09:56 AM

অমিতাভদা,
অনেকদিন বাদ বিভূতি মুখো-র কথা মনে পড়িয়ে দিলে! সেই মনে পড়ে গেল যে মেমারী গ্রামীণ লাইব্রেরীতে ক্লাস সেভেনে নিজের কার্ড করার পর প্রথম পড়া রচনাবলী এই এনারই!

রঞ্জনদা,
ধন্যবাদ - মেমারী তো আসলে অনেক বড় আর তারপর অনেক দিন বাইরে। দিলীপ দাস বলে এই মুহুর্তে আমার নিজের কাউকে মনে পড়ছে না। জ্যাঠারা হয়ত চিনতে পারে।

একক,
ঠিক বলেছ - বললাম না যে যারা গাছে ওঠে তাদের মধ্যে একটা রিফ্লেক্স এর ব্যাপার থাকে গাছ দেখলেই। তোমার গলপটা খুব এনজয় করলাম, মাসিমাকে প্রণাম।

দু- ধন্যবাদ।




Name:  সুকি           

IP Address : 237812.68.786712.75 (*)          Date:30 Jun 2019 -- 10:01 AM

বাবুর বিয়ে, রান্না-বান্না, মিষ্টির ভিয়েন এবং
----------------------------------------------------

বাবুর বিয়েতে আমি বাড়িতে সাকুল্যে পাঁচদিন ছিলাম – বিয়ের তিন দিন আর আগু-পিছু একদিন করে। এই পাঁচদিনে এত মিষ্টি খেয়েছি যে ফিরে এসে দেখলাম আমার ওজন ৬৫৩ গ্রাম বেড়ে গ্যাছে! ভাই আমার বিষয়ী ছেলে। বলল, “বুঝলি দাদা, ফুল ক্যাটারিং এ ফালতু বেশী খরচা হয়, তার থেকে বাড়িতে রাঁধুনি এনে রান্না হবে এবং বাড়িতে মিষ্টির ভিয়েনও বসানো হবে”। আমি ভাবলাম অতি উত্তম, অনেক দিন গরম গরম রসগোল্লা কড়াই থেকে নামছে এমন খাওয়া হয় না, তা এই বিয়ে উপলক্ষ্যে সাঁটাবো। আর সেই সাঁটাতে গিয়েই আমার ৬৫৩ গ্রাম প্রাপ্তি।

আসলে ফুল ক্যাটারিং না দেবার বাহানা খরচ নয়, তার কারন অন্য। যদি রাঁধা এবং খাওয়ানোর সব দায়িত্ব ক্যাটারিং-এর হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তা হলে আমাদের ঘোষ গুষ্টির বিশাল সিনিয়ার সিটিজেন সম্প্রদায় বিয়ে বাড়িতে কি করবে সেটা ঠাওড় করে উঠতে পারে না। সাধারণত বিয়ের তিনদিন রাঁধুনির পোঁদের গোড়ায় বসে থেকে বকবক করতে করতে এবং তাকে যাচিত-অযাচিত উপদেশ প্রদান করে আমার গোটা চারেক কাকা-জ্যাঠা টাইম পাস করে। আর তা ছাড়া যুবক সম্প্রদায়ের কাজও থাকে – সকালে মাছ, কাঁচা বাজার শেওড়াফুলি থেকে, মাংসের ব্যবস্থা করা – এই সব নিয়েও বেশ কিছু দাদা-ভাই আমার ব্যস্ত থাকে। আর এদের কাজে ব্যস্ত না রাখলে পুরো বাড়ি সিপিএম কংগ্রেস তৃণমূল (এবারে আবার বিজেপি ঢুকেছে আলোচনায়) গুলতানি করে চিৎকারে বাড়ি ভর্তি করে রাখবে।

আমাদের ঘোষ বাড়ির ক্লাসিক বাঁধা রাঁধুনি ছিল বিশে ঠাকুর – সে মারা যাবার পর তার যে চেলা ছিল, সেই ঈশ্বর-দা আমাদের উদ্ধার কর্তা হয়েছে। এবার ব্যাপার হল ঈশ্বরদা অফসিজেনে মেমারী জিটি রোডের ধারে চকদিঘী মোড়ে লজেন্স বিক্রী করে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে। আর ছোট বেলা থেকে তাকে আমাদের বাড়ির সিনিয়ররা বিশে ঠাকুরের জোগাড়ে হিসাবে দেখছে বলে, সে ঠিক ঠাক রাঁধুনির মর্যাদা আর আমাদের বাড়িতে পেল না। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আমাকে আপনারা অথেন্টিক এক্সপার্ট ধরে নিতে পারেন। সেই আমি বলছি, ঈশ্বর-দা কিছু রান্না খারাপ করে না, মানে রীতিমত ভালো রান্না করে। কিন্তু শুধু ঈশ্বরদার উপর বাবুও ঠিক ভারসা করতে পারল না – বিয়ের আগের দিন থেকে বিয়ের পরের দিন পর্যন্ত ঈশ্বর-দা রান্না করল, শুধু রিসেপশনের দিন (আমাদের দিকে ওটা ফুলশয্যা বলে) রাতের মূল খাবারটা রাঁধল চন্দননগরের রাঁধুনি। কেন জানি না আমাদের দিকে চন্দননগরের রাঁধুনি নিয়ে একটা ফ্যাসিনেশনের ব্যাপার আছে। তবে বাবুর বিয়েতে যে চন্দননগরের রাঁধুনি গুলো এসেছিল, তারা পুরো ঝুল মাল – প্রায় বর্ডার লাইন ঘেঁষা বালের রাঁধুনি। তাদের থেকে ঈশ্বর-দা অনেক ভালো রাঁধে। বাবু-কে সামনা সামনি ফীডব্যাক দেওয়া হয় নি মনে কষ্ট পাবে বলে, এখন এই ফেসবুক পড়ে জেনে নেবে। তবে সেই ঝুলত্ব নিয়ে পরে আসছি।

রাঁধুনির সাথে আমার মেজো জ্যাঠার চিরকালীন ফাইটের বিষয় ছিল মূলত পাঁচটা – ১) ফ্রায়েড রাইসের চাল কত নেওয়া হবে (কত কিলো চাল লোক অনুযায়ী), ২) সেই রাইসে চিনি কি পরিমাণ দেওয়া হবে, ৩) এক কিলো ছানায় কতপিস রসগোল্লা বানানো হবে, ৪) এক কিলো ছানায় চিনি কত দেওয়া হবে এবং ৫) রসগোল্লা পাতলা নাকি মোটা রসে বানানো হবে। এই দৃশ্য প্রায়ই দেখা গ্যাছে অতীতে যে বিশে-ঠাকুর বলছে, “তা হলে তুমিই রাঁধো মেজদা, আমাকে আর দরকার নেই” – দিয়ে বিশে ঠাকুর রাগ মাগ করে বাড়ি থেকে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে চলে গেল – নিমো শিবতলা থেকে তাকে আবার ধরে আনা। আবার ধরুণ বিশে ঠাকুর বলল, “বুঝলে মেজদা, তাহলে তিরিশ কিলো চাল-ই নিই ফ্রায়েড রাইসে, কি বলো?” জ্যাঠু হাঁ হাঁ করে উঠল, “তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গ্যাছে নাকি বিশে? আর্ধেক লোক তো না খেতে পেয়ে বাড়ি যাবে! আমাদের গোপাল-ই তো পৌনে এক বালতি ফ্রায়েড রাইস খাবে, তুই কি সেটা ভুলে গেলি নাকি” – তো চাল আবার বাড়লো! রাইসে মিষ্টিত্ব দেওয়া নিয়েও তেমন মান-অভিমান, শেষ পর্যন্ত বিশে ঠাকুর আর মেজো জ্যাঠার মাঝামাঝি পরিমাণে রফা হত। গোপালদার কথায় পরের পর্বে।

তো তৃতীয় বিষয়টা নিয়ে আমিও এবার মাথা ঘামালাম – কিলো প্রতি ছানায় কত পিস রসগোল্লা নামানো হবে। আমি ছেলের দাদা বলে কথা – কিছু একটা দায়িত্ব তো নিতে হবে, তা না হলে খারাপ দেখায়। বিয়ে বাড়িতে সবাই কাজ করছে আর ছেলের দাদা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াচ্ছে, জিনিসটা দৃশ্যত সুখপ্রদ নয়। তবে ভাই আমার একাই একশো – নিজের বিয়েতে নিজেই সব করেছে। আমার কাকা ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত – এই সব বিয়ের ঝামেলাতে তিনি নেই – গোটা বিয়েতে তিনি কাজ বলতে একটাই করেছেন – ছোট পিসির বাড়ি গিয়ে পিসিকে নিয়ে আসা। এমনকি বিয়ের দিন সকালেও দোকান খুলতে যাচ্ছিল – বলল, “বরযাত্রী যাওয়া তো সেই বিকেলে, এতক্ষণ বাড়িতে থাকে আর কি করব”। কাকিমা রাগারাগি করলে তবে থামল। আর ওদিকে বাবুর ব্যস্ততা চরমে – সকালে গায়ে হলুদ হচ্ছে – বাবু গায়ে গামছা দিয়ে মাদুরে বসেছে সোনা মুখ করে। আমাদের পারিবারিক কুলপুরোহিত বড়বামুন কি সব মন্ত্র-তন্ত্র বলছে। বড়বামুনের বয়সের গাছ পাথর নেই – কানেও শুনতে পায় না। আর কি কাজে কি মন্ত্র বলে সেটাও কেউ জানে না! সরস্বতী পুজোয় দূর্গা পুজোর মন্ত্র, অন্নপ্রাশনের সময় বিয়ের মন্ত্র – এমন কনফিউশন মাঝে মাঝেই হয়।

বড় বামুন অং-বং মন্ত্র বলছে – এতো সকালে এসেছে যে তখনো ক্যামেরা ম্যান হাজির হয় নি – আমিই দায়িত্ব নিলাম ছবি তোলার। আমি কাছে গিয়ে বলছি, “দাদু, একটু মুখ তুলুন, ছবি তুলব”, “দাদু, ফুলটা বাবুর মাথায় ধরে একটু পজ দিন, ছবি তুলব একটা” – কিন্তু কে শোনে কার কথা! অগত্যা আমাকেই ঘুরে ঘুরে ছবি তুলতে হল দাদুর বগলের ফাঁক দিয়ে – যেমন ছবি ওঠার তেমনি উঠেছে ফলে! গায়ে হলুদের মন্ত্র পড়ার মাঝ খানে সুবল-কাকার ফোন চলে এল। সুবল-কাকা সেই ভোর ভোর গ্যাছে কমল-দাকে নিয়ে কাঁচা সব্জি বাজার করতে। দুপুরে হবার কথা ছিল এঁচোড় চিংড়ি – চিঙড়ি তো পাওয়া গ্যাছে, কিন্তু বাজারে এঁচোড় নেই! বাবুর হয়ে গেল টেনশন – বলল, “দাদু এখন মন্ত্র থামান, বিশাল সমস্যা – কুইক ডিসিশন নিয়ে হবে”। বাবু ডান হাত দিয়ে বামুন-দাদুর হাত আটকে বাঁহাতে মোবাইলে ডিসিশন নিচ্ছে – বাজারে আর কি আছে? ভালো পটল উঠেছে শোনা গেল – ডিসিশন হয়ে গেল বাবুর, এঁচোড় চিঙড়ির বদলে পটল চিঙড়ি। দিয়ে বলল, “নিন দাদু, শুরু করুন কি বাকি আছে”।

আমি দাদা হিসাবে বাবুকে জিজ্ঞেস করলাম কত ছানা বলেছিস – বলল ৬০ কেজি বলেছি। সাত কেজি বিয়ের আগের দিন রসগোল্লা বানানো হবে শুধু বাড়িতে জলখেতে দেবার জন্য – আর ফুলশয্যার আগের দিন রাতে দশ কেজি ছানার সন্দেশ, আর বাকি ছানার (৪৩ কেজি) রসগোল্লা। খাসির মাংস আছে ১৪০ কিলো, মুরগী ৩৫ কিলো। আমি একটু জ্ঞান ফলালাম যদিও মাংসের ডিপারমেন্ট নেপাল-দার। বললাম, “দেখ ৭০০ লোকে ১৪০ কিলো মাংস খেতে পারবে না আজকের দিনে। এখন পাবলিক অনেক কম খায়। ফালতু নষ্ট হবে”। মাংস দেবে গফুর – যেখানে রান্না হচ্ছে প্যান্ডেলে মোড়লদের বাগানে সেই বাগানেরই এক কোনে ছাগল কাটা হবে। নেপাল-দা দেখে নেবে যে মাংস যেন খাসিরই হয় – ধাড়ির মাংস একদম নো নো। আর ছাগলের ওজন দশ কিলোর বেশী হলে হবে না। তবে দেখলাম বাবু আমার কথা শুনলো, মাংস কমিয়ে ১২০ কিলো করে দিল – মাথা, ভুঁড়ি বাদে। ব্যাস মাংসের ব্যাপারে আমার ইনপুট শেষ। মাংসের ব্যাপারে ধাড়ি/খাসি ফাইট ছাড়াও আর একটা ফাইট আছে যে কিলো প্রতি মাংসেয় ওরা কর করে জল ঢোকাবে। না দেখে নিলে আপনাকে কিলোতে ২৫০ গ্রাম জল ঢুকিয়ে দেবে মাংসে। নেপালদার মূল লক্ষ্য সেই জল যেন কিলো প্রতি ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম এর বেশী না হয়।

আমি দেখলাম ভিয়েনের দিকটা – মেজো জ্যাঠার শরীর খারাপ বলে সেদিন ভিয়েনের কাছে ছিল না। আমিই গিয়ে ঈশ্বর-দা জিজ্ঞেস করলাম – “কিলোয় কটা করে পিস করছ গো”? আমাকে বলল কিলোয় ৮০ টা! আমার শুনে বিচী ট্যাঁকে উঠে গেল – কিলোয় আশিটা পিস মানে সেতো ঘুঘুর ডিম! আমাদের ছোটবেলায় কিলোয় ৬৫টা করে হত। আমাকে বলা হল যে আজকাল গ্রামের দিকের পাবলিকও মিষ্টী তেমন খায় না। ছোট কাকু দেখলাম আমাকে সমর্থন করল – বলল, “আরে বাবা লোকের পাতে দিতে হবে তো নাকি মিষ্টিটা? এত ছোট করলে কি করে হবে”? দরাদরির পর মোটামুটি ৭০ পিস করে হবে ধার্য হল। এর পর আলোচনা মিষ্টী মোটা নাকি পাতলা রসে হবে – আমি পাতলা রসের দলে। ঈশ্বর-দা বলল, “দ্যাখো, বিয়ের আগের দিনের মিষ্টিটা আমি মোটা রসে করছি, কারণ বিয়ের তিনদিন তো থাকতে হবে তো মালটাকে! আর ফুলশয্যার আগের দিন মালগুলো আমি পাতল রসের করছি”। ভালো কথা – মিষ্টি হচ্ছে, আর ঈশ্বর-দা বলছে, “ভাই, খেয়ে দেখ গরম গরম কেমন হচ্ছে। আর একটু ঠান্ডা হলে কচকচে ভাবটা আসবে”। আমি গরম ঠান্ডা রসগোল্লা দেদার খাচ্ছি – যার ফলত ওই ৬৫৩ গ্রাম প্রাপ্তি।

শেষে বলি ওই চন্দননগরের রাঁধুনি-র কথা। বাবু মনে কষ্ট পেলেও আমাকে সত্যের খাতিরে লিখতে হবেই। ওই যে রাঁধুনি-গুলো এসেছিল সেগুলো পুরো ক্ষ্যাপাচোদা। আমার মনে হচ্ছে যে মেন রাঁধুনি, মানে যার সাথে মেন কনট্রাক্ট হয়েছিল এবং যে ফর্দ করেছিল, সে ওই দিন অন্য বিয়ে বাড়িতে রাঁধতে চলে গিয়েছিল। আর আমাদের বাড়িতে এসেছিল কল্পিত চন্দননগরের রাঁধুনি। আজকাল বলছে নাকি চিকেন এবং পনীর ‘স্যাতে’ বলে কি জিনিস চালু হয়েছে। তা যা ব্যবস্থা দেখলাম, মূল চিকেন স্যাতে যেখানে হয় সেই ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার পাবলিক চিকেন স্যাতের এই ইজ্জতহানী দেখলে সরমে মুখ লুকোবে। ক্ষ্যাপাচোদা রাঁধুনি গুলো এমন পনীরের এষ্টিমেট দিয়েছে যে প্রায় ১৩ কিলো পনীর বেড়ে গেল। আমি বসে বসে দেখছি কি বানায় ওরা পনীর স্যাতে। দেখলাম ওরা কিউব করে কাটল, মাঝে পেঁয়াজ এবং ক্যাপ্সিকাম দিয়ে কাঠিতে গাঁথল – বাঃ খুব ভালো ব্যাপার – ঠিক ঠাক দিকেই এগুচ্ছে। তার পর দেখলাম একি পাগলামো – সেই কাঠিতে গাঁথা মালগুলো বেসনে ডুবিয়ে ভাজছে! আমার কান্না পাচ্ছে দেখে – কিন্তু কি আর বলি! আমাকে জানানো হল একেই বলে পনীর স্যাতে! তার পর আসি গিয়ে ‘নান-পুরী’ – এ যে কি হাইব্রীড জিনিস বুঝতে পারলাম না। এ তো যাকে বলে সোনার পাথর বাটির মত অবস্থা। মূল রাঁধুনি দেখলাম ফর্দ-য় লিখেছে দু-ট্রে ডিম। ভালো কথা – সেই ডিম নিয়ে নান-পুরীর ময়দা মাখা হবে বুঝলাম। কিন্তু এই পাদের রাঁধুনি গুলো জানেই না সেই ব্যাপার! ডিম পরে রইল যেমন কে তেমন! দেখলাম কৌসুরি মেথির প্যাকেট গুলোয় পড়ে রয়েছে – মালগুলো জানে না কিসে দিতে হবে – মনে হয় চিলি চিকেনে কৌসুরি মেথি দিতে গিয়েছিল, কেউ আটকেছে।

চন্দননগরের রাঁধুনিরা রাঁধছে – ডাক্তারদের গৌরদা তত্ত্বাবধানে। গৌরদা দেখি এক রাঁধুনিকে বলছে, “এ্যাই তোকে চেনা চেনা লাগছে না! তোর বাড়ির ছিনুই না? (ছিনুই আমাদের নিমোর পাশের গ্রাম) তুই আবার কবে থেকে চন্দননগরের রাঁধুনি হলি”! যা বুঝলুম এই এই ক্ষেত্রে চন্দননগরের রাঁধুনি হচ্ছে ওই ইংল্যান্ডের ইন্ডিয়ান রেষ্টুরান্টের মত – নাম কার আর রাঁধছে কে!

তবে চন্দননগরের রাঁধুনির নাম শুনে সামনা সামনি আর কেউ সমালোচনা করল না। সবাই খুব ভালো খুব ভালো বলতে বলতে খেয়ে দেয়ে বাড়ি ফিরল – নিমোর পাবলিক খেলেও বটে! তেমন কিছু মাল বাড়ল না – কেবল এক ডেক রসগোল্লা ছাড়া – এখনো সেই রসগোল্লা ফ্রীজে আছে!

সঙ্গের ছবি গুলো ভিয়েনের সময় –ঈশ্বর-দা রসগোল্লা আর ঈশ্বরদার ছেলে সন্দেশ বানাচ্ছে।


https://i.postimg.cc/fL1bhmBk/IMG-3341.jpg


https://i.postimg.cc/C5DxM5Q7/IMG-3344.jpg


https://i.postimg.cc/zXCG9LWX/IMG-3349.jpg


https://i.postimg.cc/vmB8g3Kc/IMG-3346.jpg


https://i.postimg.cc/zvnqZMyP/IMG-3347.jpg




Name:  Ela          

IP Address : 237812.69.453412.38 (*)          Date:30 Jun 2019 -- 04:22 PM

ইসসস, এইরকম একটা ভিয়েনওলা বিয়েবাড়ি সদ্য মিস করেছি ছাতার চাকরির চোটে। সুকির পেটখারাপ হোক।

তবে লেখা বরাবরের মতো সুস্বাদু ও দারুণ!


Name:  Amit          

IP Address : 237812.68.6789.27 (*)          Date:01 Jul 2019 -- 05:27 AM

বাপরে, ওজন কি ল্যাব স্কেল বা সোনার দোকানে নিয়েছিলে ? একেবারে ৬৫৩ গ্রাম ? ডেসিমাল ছিল কোনো ?

এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2] [3] [4]     এই পাতায় আছে72--102