বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--4


           বিষয় : রক্তদানের গল্প
          বিভাগ : অন্যান্য
          শুরু করেছেন :অনুপম ভট্টাচার্য
          IP Address : 57.15.121.147 (*)          Date:03 Jun 2018 -- 10:08 PM




Name:  অনুপম ভট্টাচার্য           

IP Address : 57.15.121.147 (*)          Date:03 Jun 2018 -- 10:08 PM

রক্ত দেওয়ার গল্প
অনুপম ভট্টাচার্য
============
তখন ১১ কিংবা ১২ ক্লাসে পড়ি। পাড়ায় ক্লাব করার সুবাদে পরিচিতিও মন্দ নয়। আড্ডা মারার সময়ে একজন বললো তারা তাদের এলাকায় রক্তদান শিবির করে, এবং সেখানে নাকি ১৫০ লোক রক্তদান করেছে। কিন্তু আমাদের ক্লাবের নাকি সেই দম নেই। পুরো ইজ্জতের চোদ্দটা বেজে গেলো। আমরা ওদের পাড়াকে ক্রিকেট বা ফুটবলে বলে বলে হারাই, তাদের কাছ থেকে এরকম প্যাঁক খেয়ে আমাদের তখন ইজ্জৎ কা ফালুদা কেস।

What is to be done নামের বইটি পড়া থাকলেও সেখানে কোথাও লেখা নেই রক্তদান শিবির কিভাবে সংগঠিত করতে হয়। বিপদভঞ্জন পাড়ার বামপন্থী আন্দোলনের সাথে যুক্ত দাদারা। তারা ভরসা দিলেন সাহায্য করার। ব্যাস, কেল্লা ফতে! শুরু হয়ে গেলো আয়োজনের। তখন তো আর ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ বা স্মার্টফোন নেই। তাই হাতে লেখা পোস্টার আর দেওয়াল লেখা চলতে লাগলো।

অচিরেই এলাকার সমস্ত দেওয়াল ছেয়ে গেল পোস্টারে আর দেওয়াল লেখায়। নির্ভুল বানানে আর আঁকাবাঁকা হরফে লেখা হলো রক্তদানের আবেদন। মাঝের "বিরাট রক্তদান শিবির" এবং একটি রক্তের ফোঁটা বেশ বড় করে লাল রঙ দিয়ে লেখা হলো আবশ্যিকভাবেই।

রক্তদান শিবিরের দিন তিনেক আগে থেকেই শুরু হলো মাইকে প্রচার। একটা রিক্সা ভাড়া করে তাতে মাইক লাগিয়ে দুজনে মিলে বেরিয়ে পড়তাম পাড়ায় পাড়ায় চোঙা ফুঁকতে। নানা রকমের কোটেশন, কবিতার লাইন জোগাড় করা হয়েছিল। সব থেকে পপুলার ছিল সুকান্তর "এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য"। প্রতিদিন দুবেলাই প্রচার শুরু হত পাড়ার স্কুলের সামনে থেকে। আর সেই প্রচার তুঙ্গে উঠত প্রতিদ্বন্দ্বী পাড়ায় গিয়ে। মাইক ফুঁকে ফুঁকে গলা চোক হয়ে যাবার দশা। তবু ইজ্জৎ কা সওয়াল, তাই চালিয়েই যেতে লাগলাম লাগাতার প্রচার।

এর পাশাপাশি চলছিলো টাকা কালেকশন। একটা বঙ্গলিপি খাতায় পরপর লেখা হচ্ছিলো কার থেকে কতো পাওয়া গেলো। সকলকেই বলা হতো, "মুক্ত হস্তে দান করুন"। কিন্তু খুব কম লোকেরই মুক্ত হস্ত হতো। যাই হোক, শিবিরের আগের দিন দেখা গেলো হাজার দুই কালেকশন হয়েছে। পাড়াতুতো ডেকরেটার ছিলো কানে খাটো। তার ইউনিভারসাল নাম ছিলো "বয়রা ডেকরেটার"। বয়সে বড় বলে আমরা বয়রা কাকা বলতাম। এবারে যাওয়া হলো সেই ডেকরেটারের কাছে।

সরস্বতীপূজা হোক বা কালী পূজা, টার্গেট থাকতো সব সময়েই ডেকরেটার কে সব থেকে কম টাকা দেওয়ার। প্রতিবারেই এই নিয়ে ঝামেলা হওয়া ছিল বাঁধাধরা। আর এইসব ক্ষেত্রে আমাদের এক বন্ধু কার্তিক ছিল গুরুদেব। আমরা যখন ঝামেলা করতাম আর কিছুতেই টাকা কম করা যেত না, তখনই কার্তিক আসরে নামতো। এবং প্রতিবারেই কোন না কোনও ভাবে বয়রা কাকাকে ঠিক পটিয়ে ফেলতো।

এবারে সবাই শুরুতেই কার্তিককে বললো ময়দানে নামতে। কার্তিকও মুচকি হেসে রাজি হয়ে গেলো একবারেই। অপারেশন ডেকরেটারের দিনে কার্তিক কোথা থেকে আলাদা একটা বঙ্গলিপি খাতা নিয়ে হাজির। আর তাতে যারা আগেই টাকা দিয়েছিলো, তাদের সকলের নামের পাশেই খুব কম কম অ্যামাউন্ট লেখা। এবং যোগ করে দেখানো আছে মোট সংগ্রহ ২৫০ টাকা। কার্তিক গিয়ে শুরুতেই বয়রা কাকার হাতে পায়ে ধরে কান্নাকাটি শুরু করে দিলো। বয়রা কাকা পুরো হতবাক। শেষে ঢোঁক গিলে, কান্না থামিয়ে কার্তিক বললো, " কাকা, একমাত্র তুমি আমাদের জেলে যাওয়া আটকাতে পারো। কারণ সব টাকা দিলেও তোমার টাকা শোধ করতে পারবোনা। আর কাল যারা রক্ত দেবে তাদের যদি কিছু খেতে দিতে না পারি, তাহলে তাদের মধ্যে যদি কেউ মরে যায়, খুনের দায়ে আমাদের জেলে যেতে হবে।" আমরা বাকি সকলে পুরো স্তম্ভিত। হাসবো নাকি কাঁদবো, কিছুই বুঝতে পারছিনা।

কিন্তু নাটক পুরো সফল। বয়রা কাকাকে ফুল খাইয়ে দেওয়া গেলো যে রক্তদান শিবির করা পাড়ার জন্য কতটা জরুরি। এবং সেখানে ফ্রি তে ডেকরেটিং করার জন্য কাকার ফ্যামিলির রক্ত লাগলেই পাওয়া যাবে। আমরা বিজয়গর্বে চললাম টিফিন প্যাকেট বানাতে। পাড়ার মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টি, দুধ, মুদিখানা থেকে ডিম, ফলওয়ালার থেকে কলা সব জোগাড় করা হলো। এবং বলাই বাহুল্য তা হয় ফোকটে অথবা খুব কম দামে।

পরদিন সকাল থেকেই সাজো সাজো রবে কাজ শুরু। পাড়ার স্কুলের হেড স্যার, কাউন্সিলার ভাষণ দিয়ে বোঝালেন রক্তদানের গুরুত্ব। ব্লাড ব্যাংকও হাজির। শুরু হয়ে গেলো রক্তদান। প্রচুর লোক, সবাই রক্ত দেবে। এম আর বাঙ্গুর হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকের কর্মীরা এসেছিলেন রক্ত নিতে। স্কুল বিল্ডিংয়ে খান দশেক বেড পাতা হয়েছে। সেটা ছিল বৈশাখ কিংবা জৈষ্ঠ মাস। ঠাঠা রোদ্দুরেও ডোনারের কমতি নেই। বেলা বারোটা বাজার আগেই ব্লাডের কিট শেষ। সংখ্যা তখন ১০০ ছাড়িয়ে গেছে।

কিন্তু তা বললে শুনছে কে। প্রতিদ্বন্দ্বী পাড়ায় ১৫০ জন রক্ত দিয়েছে। আমাদের যে করে হোক সেই রেকর্ড ব্রেক করতেই হবে। পাড়ার কাউন্সিলার কাকুকে দিয়ে বাঙ্গুরের সুপার কে ফোন করানো হলো। সুপারকে অনুরোধ করে আবার নতুন টিম পাঠাতে বলা হলো। অবশেষে সুপার রাজি হলেন টিম পাঠাতে। আর আমরাও বেরোলাম ডোনার জোগাড় করতে।

মাইকে ক্রমাগত ধারাবিবরণী দেওয়া হচ্ছে, "এই মাত্র রক্ত দিলেন অমুক চন্দ্র। এই পর্যন্ত আমাদের মোট রক্তদাতার সংখ্যা ১০৫"। বলাই বাহুল্য সংখ্যাতে অল্পস্বল্প জল দেওয়াই হচ্ছিল। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডোনার পাকড়াও করে শিবিরে ধরে আনা চলছিলোই। দ্বিতীয় টিম চলে আসায় সেই কাজে আরো গতি এলো।

এদিকে বেলা গড়িয়ে সূর্য ঢলার মুখে। দেখা গেলো সত্যি সত্যি ১৯৮ জন রক্ত দিয়েছে। সবাই বলছে, ইসস আর দুজন হলেই ডাবল সেঞ্চুরি হয়ে যায়। যতই ক্যাম্প অর্গানাইজ করি না কেন, আমার আর কার্তিকের কারোই বয়সই তখনো ১৮ বছর হয়নি। তাই আমরা দুজন রক্ত দেবোনা, এটাই স্থির হয়েছিল। এবারে আর আমাদের দমিয়ে রাখা গেলোনা। বললাম, আমাদের রক্ত দিতে দিতেই হবে। আমাদের দুজনেরই তখন কমবেশি ১৬+। কিন্তু গোঁফ দাড়ি বেশ ভালোই উঠে গেছে। ফলে ব্লাড ব্যাংকের লোকেদের কাছে বয়স ভাঁড়াতে খুব বেশি সমস্যা হলোনা।

দুজনেই বুক ফুলিয়ে শুয়ে পড়লাম বেডে। এদিকে কাজের চাপে সারাদিন যে পেটে দানাপানি পড়েনি, সেটা আর মনে নেই। ডাক্তারবাবু যিনি ছিলেন, সারাদিনের ঠেলা গুঁতোয় তিনি তখন ক্যাম্প গুটিয়ে যেতে পারলে বাঁচেন। রক্ত দেওয়া শেষ হতেই তারা তল্পিতল্পা গোটাতে শুরু করলো। আমি আর কার্তিক উঠে গিয়ে বসলাম খেতে। সবে প্যাকেট খুলেছি, ব্যাস... তারপর আর কিচ্ছু মনে নেই, সব অন্ধকার।

জ্ঞান ফিরতে দেখি আমাকে শুইয়ে রাখা রয়েছে। হাতে প্রেশারের যন্ত্র বাঁধা। ডাক্তার পালস ধরে বসে আছেন। জ্ঞান ফিরতে সকলে মিলে "জ্ঞান ফিরেছে, জ্ঞান ফিরেছে" বলে যখন চ্যাঁচাচ্ছে, তখন শুরু হলো ডাক্তারের গালাগালি। বয়স ভাঁড়িয়ে আর খালি পেটে রক্ত দেওয়ার জন্য যা তা করে ঝাড়লেন আমাদের। কাউন্সিলার কাকুও খুব ঝাড়লেন সব শুনে। আর সব থেকে দুঃখের খবরটা পেলাম তার পরে। আমি যখন অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম, ওই বেইমান কার্তিক ব্যাটা নিজের প্যাকেট শেষ করে আমারটাও খালি করে দিয়েছে। আমার কপালে জুটেছিল কেবল এক গ্লাস দুধ আর বাড়ি ফিরে বাবা মায়ের কাছে আর এক প্রস্থ ঝাড়। তবে চুপিচুপি একটা কথা বলেই আজকের গল্প শেষ করি... ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্পের খরচখরচা বাদ দিয়ে যে টাকা বেঁচেছিলো, তা দিয়ে একটা জম্পেশ পিকনিক করেছিলাম আমরা।






Name:             

IP Address : 670112.193.898912.155 (*)          Date:10 Jun 2018 -- 07:59 PM

আচ্ছা এই লোকের টাকা মেরে দেওয়াটা নিয়ে এখন অনুশোচনা বা দুঃখ হয় না? এই যে ডেকোরেটরের টাকা মেরে দিয়ে বেশ হসিখুশী এইটার কথা জিগ্যেস করছি আর কি।


Name:  গবু          

IP Address : 2345.110.783412.112 (*)          Date:10 Jun 2018 -- 09:55 PM

জনগণের স্বার্থে টাকা মারলে ওটা চিরকালই হিরোগিরি হয়। উদাহরন রবিনহুড।



Name:  Atoz          

IP Address : 125612.141.5689.8 (*)          Date:11 Jun 2018 -- 04:31 AM

অ্যাঁ? রবিনহুডও টাকা মেরে পিকনিক করতো নাকি? বলা যায় না, করতেও পরে। আরে বাবা দুটো ভালোমন্দ খাবে না? নইলে এত লড়বে কী করে?
ঃ-)

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--4