বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--1


           বিষয় : আরশীতে দুই কিংবদন্তীঃ পর্ব-২
          বিভাগ : অন্যান্য
          শুরু করেছেন :অর্জুন অভিষেক রায়
          IP Address : 113.219.44.236 (*)          Date:05 Apr 2018 -- 09:16 PM




Name:  অর্জুন অভিষেক রায়           

IP Address : 113.219.44.236 (*)          Date:05 Apr 2018 -- 09:19 PM


পূর্ববঙ্গের এক বর্ধিষ্ণু জমিদারের একমাত্র পুত্র হিমাংশু। শোনা যায় বোলপুর শান্তিনিকেতনে ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ এর প্রথম দিককার ছাত্র ছিলেন তিনি (সঠিক তথ্য অজানা)। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে তখনকার নিয়ম অনুসারে ইংল্যান্ডে পাড়ি দিলেন তিনি। হতে চান ‘বার-অ্যাট- ল’। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজধানী লন্ডন তখন সাংস্কৃতিক পীঠস্থান। নাটকে মজে গেলেন হিমাংশু। বন্ধুত্ব হল আরেক বাঙালি তরুণের সঙ্গে, তার নাম নিরঞ্জন পাল, স্বাধীনতা সংগ্রামে এক নামে উচ্চারিত ‘লাল-বাল-পাল’ এর সেই বিপিন চন্দ্র পালের পুত্র। সেও লন্ডনে ছাত্র তখন। দেশে থাকতে স্বাভাবিক নিয়মেই স্বাধীনতা আন্দোলনে গা ভাসিয়েছিলেন এই যুবা কিন্তু ব্রিটিশের নেক নজরে পরবার আগেই তাকে রাতারাতি বিলেতে প্রেরণ। সাভারকার ও মদনলাল ধিংড়ার সঙ্গে কিছুদিন ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল কিন্তু স্টেজের মায়ায় আচ্ছন্ন হলেন শিগগিরি। নাটক দেখছেন দুই বন্ধু। নিরঞ্জন নাটক লেখায় উদ্বুদ্ধ হলেন। লিখে ফেললেন ‘দ্য লাইট অব এশিয়া’, ‘সিরাজ’, ‘গডেস’। দুই বন্ধু মিলে মঞ্চস্থ করলেন ‘লাইট অব এশিয়া’। তা দেখতে এলেন জার্মান ফিল্মমেকার ফ্রাঞ্জ অস্টেন। মুগ্ধ অস্টেন এই প্রোডাকশন দেখে। তিনজনে প্ল্যান করলেন মহাভারতের ওপর গল্প ‘থ্রো অব ডাইস’ নিয়ে একটি ফিল্ম পরিচালনা। এই সময়েই দেবিকারানীর এই টিমে প্রবেশ। তিনি একা হাতে সামলালেন কস্টিউম, সেট ডিজাইন এবং আর্ট ডিরেকশন।

‘লাইট অব এশিয়া’ র গোটা ইউনিটে শুধু দুজন মহিলা। অভিনেত্রী সীতা দেবী (তাকে নিয়েও আমি বিশেষ কৌতূহলী) এবং দেবিকারানী। সীতা দেবী অবশ্য কো-অ্যাক্টর আর দেবিকারানীর হাতে ছিল বেশ অনেকগুলো ডিপার্টমেন্ট। কাজটা এযুগেও যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। মনে রাখতে হবে, ছবিটার প্রযোজক ও পরিচালক বিদেশী। এবং চ্যালেঞ্জিং এই কারণেই যে ঐ বিশের দশকে তাদের আরেকটা কাজ অনুসরণ করার মত কোনো উদাহরণ ছিল না। প্রথাগত বৃত্তির বাইরেও সম্পূর্ণ এক নতুন বৃত্তির জগতে মেয়েদের যাত্রা শুরু করেছিলেন। অভিনয় জগতে নাট্য বা ফিল্মে সেই সময়ে যেসব অভিনেত্রীরা আসতেন, সকলেই আসতেন একটি বিশেষ সামাজিক স্তর থেকে। যে সমাজটাকে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজ ‘নিষিদ্ধ’ আখ্যা দিত। ’৩০ এর গোঁড়ায় লেখিকা লীলা মজুমদারের বাড়িতে দিলীপ কুমার রায় গানের আসর বসাতেন এবং বিভিন্ন সংগীত রথী মহারথীদের সঙ্গে নৃত্যশিল্পীরাও আসতেন। উচ্চশিক্ষিতা, ইন্টেলেকচ্যুয়াল, কস্মোপলিটন দেবিকারানীর সমবয়সী লীলা মজুমদারের চোখেও তাদেরকে ‘অসামাজিক’ মনে হয়েছে। দাদাসাহেব ফালকে এর দু দশক আগে যখন প্রথম ভারতীয় ফিল্ম ‘হরিশচন্দ্র’ তৈরি করলেন তখন তার অভিনেত্রীরাও এসেছিলেন আঞ্চলিক নাট্যদলের। তাই তথাকথিত মধ্যবিত্ত সমাজে মেয়েদের এই প্রফেশনে অনেকটা দরজা খুলেছিলেন দেবিকারাণী। শ্রীরামকৃষ্ণ কথিত ‘লোকশিক্ষার আঙিনা’ য় সমগ্র সমাজের মেয়েদের অংশগ্রহণ নিষেধ ছিল। বাংলায় কানন দেবীর ভূমিকা যেমন এক ঐতিহাসিক ঘটনা, তেমনি দেবিকারানীর জাতীয় চলচ্চিত্রে। তাই হয়ত The first lady of Indian cinema আখ্যাটি যথার্থই।

‘থ্রো অব ডাইস’ এর শুটিং হল রাজস্থানে উদয়পুর, জয়পুর শহরে, মহীশূরেও। ওই ইউনিটে ছিলেন বিখ্যাত চিত্র পরিচালক মধু বসু। তার আত্মজীবনী ‘আমার জীবন’ এ একটা সুন্দর স্মৃতিচারণ আছে। দিল্লীতে তখন শুটিং চলছে, দেবিকারানী আসবেন, হিমাংশু রাই, জুনিয়র সহকারী মধু বসুকে স্টেশনে পাঠিয়েছেন তাকে আনার জন্যে। মধু বসু দেবিকারানীর অনেক গল্প শুনেছেন কিন্তু তখনও তাকে চোখে দেখেননি। তাহলে ষ্টেশনে তাকে চিনবেন কি ভাবে! হিমাংশু রাইয়ের উত্তর ‘It is impossible to miss her.’ দিল্লী ষ্টেশনে দেবিকারানীকে দেখে মধু বসুর মনে হল ‘এরকম একজন অসাধারণ মহিলাকে দেখেই চিনে নিলাম।‘

‘থ্রো অব ডাইস’ প্রভূত সাড়া পেল। এবং এই ফিল্মের পোস্ট প্রডাকশনের জন্যেই দুজনে গেলেন বার্লিন। জার্মানিতে তখন ফিল্ম তৈরিতে নূতন সব গবেষণা মূলক অসাধারণ চলছে। G W Pabst এবং Fritz Lang র UFA studio তখন জগত বিখ্যাত। দেবিকারানী হাতে কলমে সেই স্টুডিওতে শিক্ষানবিশ করলেন এবং কোর্স শেষে UFA তে একটা চাকরীও পেয়ে গেলেন, যে স্টুডিওতে কাজ করা যে কোনো ফিল্মমেকারের তখন একটি স্বপ্ন। অস্ট্রিয়ান নাট্যকার Max Reindhart এর কাছেও অভিনয়ের তালিম নেন। শুধু ফিল্মকে কেরিয়ার হিসেবেই নয়, অভিনয় ও ফিল্মের নানা কারিগরি প্রশিক্ষণও বেশ অভিনব। কেরিয়ার গড়ার আগে নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে তৈরি করে নিয়েছিলেন।

নাহ! UFA য় কাজ করা হয়নি দেবিকারানীর । এই আকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাব তাঁকে ফিরিয়ে দিতে হয়। ‘থ্রো অব ডাইস’ এর সাফল্যের পরেই হিমাংশু- দেবিকারানী সিধান্ত নেন তাদের দেশে ফিরতে হবে, বানাতে হবে ভারতীয় চলচ্চিত্র, গড়তে হবে নিজেদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এবং এর সঙ্গে দুজনেই বিবাহের সিধান্তও নিয়ে ফেললেন।



এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--1