বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--1


           বিষয় : বৃষ্টি
          বিভাগ : অন্যান্য
          শুরু করেছেন : Tarun Naskar
          IP Address : 24.139.128.18 (*)          Date:28 Mar 2018 -- 07:05 PM




Name:   Tarun Naskar           

IP Address : 24.139.128.18 (*)          Date:28 Mar 2018 -- 07:06 PM

বৃষ্টি

আমি বৃষ্টি খুব ভালোবাসি, বিশেষ করে যখন তা আসে কালো গোমড়া মুখো আকাশের সাথে। সঙ্গে যদি একটু ঝড়ো হাওয়া থাকে তাহলে তো কথাই নেই, সোনায় সোহাগা। কিন্তু প্রথম প্রথম এরকম সখ্যতা ছিল না আমাদের। বৃষ্টি মানেই ছিল কাদা প্যাচপেচে রাস্তা, ইস্কুলে যাওয়ার পথে হাওয়াই চপ্পলের দৌলতে সে কাদা হাফ প্যান্ট ছাড়িয়ে সাদা জামা পর্যন্ত এসে পৌছাতো। আমাদের বাড়ির কাছেই বিশাল রথের মেলা বসতো যেটা ছিল তখন আমার জীবনের অন্যতম আনন্দের দিন। আমি ক্যালেন্ডারে প্রায় একমাস আগে থেকেই দাগ দিতে শুরু করতাম। আর ২৯ দিন বাকি, আর ২৫ দিন বাকি, আর ১২, আর ৬….. এই সব। রথের মেলার দিন বৃষ্টি হবেই হবে। যদি সোজা রথে নাহয় তবে উল্টো রথে। ভগবানের কাছে মনে মনে প্রার্থনা করতাম অন্তত বছরে এই দুদিন যেন বৃষ্টি না হয়। কারন বৃষ্টি হওয়া মানেই ছিল মেলা পন্ড.......ঘুঘনি খাওয়া হবে না, জিলিপি কেনা হবে না, ইলেকট্রিক দোলায় চড়া হবে না। বৃষ্টি মানেই আর ছিল, শ্যাওলা ধরা উঠোন, ভেজা পায়খানা এবং স্যাঁতস্যাঁতে বিছানা। কিন্তু এত সবের পরেও জানিনা কবে কেমন করে বৃষ্টি আমার বন্ধু ( বা বান্ধবী) হয়ে গেল।
আমাদের ছিল টালির চালের বাড়ি। বাবা মার মাঝে আমি শুতাম। চির কাল আমার খুব তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙ্গে ওই ভোর ৪:৩০ টা - ৫টা নাগাদ। বর্ষা কালে আমার ঘুম ভাঙ্গতো টালির চালে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার শব্দে। কবিতার টাপুর টুপুর নয়, চড়বড়িয়ে নামত সে বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির জন্য আমি আরো একটি কারণে অপেক্ষা করে থাকতাম......কই মাছ। ভোর বেলা বৃষ্টি হলে কই মাছ গুলো জলার এক ডোবা থেকে অন্য ডোবায় যাবার চেষ্টা করতো। খুব রাতে বৃষ্টি হলে তাদের ধরা যেত না। কিন্তু ভোর বেলা হলে তাদের মাঝ পথেই ধরা যেত। তাই এই সময় আমি একটা ছোট ব্যাগ হাতে খালি পায়ে জলার উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পরতাম। হলদে ডিম ভরতি সেই সব কইমাছের স্বাদের কাছে পাব্দা পার্শে নস্যি। যদি কই মাছ না পাওয়া যায় তাহলে সান্ত্বনা পুরস্কার হিসাবে থাকতো বড় বড় শামুক। ওরাও বৃষ্টি হলে পুকুর ডোবা ছেড়ে মাঠে উঠে আসতো। বন্ধুত্বের শুরুটা মনে হয় এখান থেকেই হয়ে ছিল।
যখন বর্ষা নিম্মচাপের রুপ নিত, তিন চার দিনের বৃষ্টিতে রাস্তা ঘাট ভাসিয়ে দিত......... তখন মা খিচুড়ি রাঁধতো। মাংসর কিমা, ডিমের খিচুড়ির মতো বিলাসিতার কথা তখন আমাদের জানা ছিল না। আমাদের কাছে খিচুড়ি মানে ছিল চাল, ডাল, ফুলকপি আর আলু। সাথে আবদার করলে মা বেগুন ভেজে দিত। সেই খিচুড়ি আমি দুপুর বেলা খেতাম, বিকাল বেলা খেতাম, রাতের বেলা খেতাম। পরের দিন সেই খিচুড়ি জমাট বেঁধে যেত, আমি সকাল বেলা হাঁড়ি ধরে সেটা শেষ করতাম। বাড়ির আর কেউ কেন পরের দিন সেই খিচুড়ি খেত না??? মনে হয় আমার জন্য তারা না খেয়ে রেখে দিত।
বয়ঃসন্ধিকালে যেমন ছেলে মেয়ের সম্পর্ক গুলো কিরকম পাল্টে যায়, একটু বড় হবার সাথে সাথে বৃষ্টির সাথে আমার সম্পর্কও একটু বদলে গেল। এখন বৃষ্টি মানেই কলেজ যাওয়া বন্ধ, তাই দুপুরে বাবার হোটেলে খাওয়া দাওয়ার পর আমরা ক্লাস ওয়ানের চার বন্ধু, মানে আমি, মন্টি, গজা কাকার ছেলে আর চিটকু সিং মিলে তাস খেলতে বসতাম। কখনো টোয়েন্টি নাইন, কখনো বা ব্রিজ। ব্রিজের সব নিয়ম আমারা জানতাম না, তাই কিছু সরলিকরন করে নিয়েছিলাম। যত গুলো পিঠ কম বা বেশি উঠবে ৫০ করে পয়েন্ট। ডবল বা রিডবল হলে যথাক্রমে দ্বিগুণ বা চার গুণ। ওত অনার্স ফনার্স কার্ডের ঝামেলায় যেতাম না। এক একটা স্যুইটের এক এক ভ্যালু ও রাখতাম না। মাঝে মাঝে এই তাস খেলার আসরে আসতো মুড়ি আর তেলে ভাজা, কখনো বা লোকাল কুরকুরে। এই সস্তার কুরকুরের গুলোর স্বাদ থাকতো আসল কুরকুরের কাছা কাছি কিন্তু কুড়ি টাকার প্যাকেটে এত কুরকুরে থাকতো যে কেউ একা খেলে তার রক্ত আমাশা হতে বাধ্য।
এখন আমার সাথে বৃষ্টির সম্পর্ক অনেকটাই পাল্টে গেছে, মনে হয় পরিণতি পেয়েছে। সেই টালির চালের বদলে সবাই ছাদ আঁটা বাড়ি করেছে। সেই মাছ ধরার জলায় এখন আর কেউ যায় না। চাষ আবাদ বহুদিন হল বন্ধ হয়েছে, বড় বড় কোম্পানি এসে সে জমি দখল করেছে। যে বাপ ঠাকুরদার জমি বিক্রি করতে চায় নি তাকে চারদিক ধরে ঘিরে ফেলে পাঁচিল তুলে দেওয়া হয়েছে। ক্ষেতের জল বেরোনোর খাল গুলি বুজিয়ে ফেলা হয়েছে ফলে এখন ১২ মাসেরর মধ্যে ৮ মাসই ওখানে বর্ষা কাল বলা ভাল বন্যা কাল। তাই হয়তো এখনও টিঁকে থাকা কই মাছ গুলোর আর মাঠ পেরোনোর দরকার হয় না। তাস খেলার বন্ধু গুলো আমার মতো অনেকেই ভিন রাজ্যে আছে। তাছাড়া তাদের অনেকেরই এখন সংসার হয়েছে, আগের মতো টো টো কোম্পানির মালিক হয়ে বসে থাকলে তাদের চলবে না। বৃষ্টি এখন আর আমার মনে বিরক্তি জাগায় না। আমি এখনো হাওয়াই চটিই পরি, তবে এখানের ঝকঝকে তকতকে রাস্তায় কেন জানিনা জামা প্যান্টে কাদা ওঠে না। হয়তো আমি সাদা জামা ছেড়ে কালো টি শাট পরা শুরু করেছি বলে এখন আর আমাকে রাগিয়ে মজা পায় না। রথের মেলায় প্রায় এক দশক হলো যেতে পারিনি। এখন হাতে কিছু টু পাইস আছে, এখন গেলেও মনে হয় আর ওই সস্তার ঘুগ্নির স্বাদ পাবো না বরং কিরকম টক টক লাগবে।
এখন বর্ষা আমার মন খারাপ করায়, সেই মন খারাপ করাটার মধ্যে কি রকম একটা ভালোবাসা, ভালো না লাগা দুটোই লুকিয়ে আছে। বর্ষা এখন আর ভোর বেলা আমার ঘুম ভাঙাতে আসে না , রাতের বেলা আমাকে জাগিয়ে রাখতে আসে। আমার মনে হয় আমি এখনও বর্ষাকে সমানে ভালোবাসি।

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--1