বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--7


           বিষয় : চিত্তপ্রসাদের ছবি
          বিভাগ : ছবি
          বিষয়টি শুরু করেছেন : saikat
          IP Address : 202.54.74.119          Date:01 Sep 2011 -- 11:41 AM




Name:  saikat           Mail:             Country:  

IP Address : 202.54.74.119          Date:01 Sep 2011 -- 11:45 AM

পাঠক মাত্রেই জানেন, বাংলাদেশের ১৩৫০-র মন্বন্তর বেশ কিছু গল্প-উপন্যাসের জন্ম দিয়েছিল। মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের "চিন্তামণি", তারাশংকরের "মন্বন্তর", বিভূতিভূষণের "অশনি সংকেত" উপন্যাসের সাথে সাথে একাধিক লেখক গল্প রচনা করেছিলেন যার মধ্যে শুধু মাণিকবাবুর গল্প নিয়েই আলাদা একটা সংকলন করা যায়।

একই সময়ে সোমনাথ হোড়, চিত্তপ্রসাদ, গোবর্ধন আশ দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা রচনা করছিলেন। সোমনাথ হোড় আর চিত্তপ্রসাদকে তো "ক্ষুধার শিল্পী" আখ্যা দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে সোমনাথ হোড়, ক্ষুধাকে ক্ষত-র অন্তর্ভুক্ত করেন। বিশ শতকীয় মানুষের সাফারিংস-কে (দেশে দেশে যা মানুষের ওপর ক্ষত সৃষ্টি করে চলে)ছবিতে আর ভাস্কর্যে ধরতে গিয়ে তিনি ক্ষত-র শিল্পীও হয়ে ওঠেন।

মনে পড়ে, নন্দনের ভেতরে, ঢোকার মুখে, সিঁড়ির তলায় দীর্ঘদিন ধরে রাখা থাকত সোমনাথ হোড়ের একটা কাজ, যা এখন বাইরে গাছের তলায় আকাশের নীচে, জল-হাওয়ার মধ্যে রাখা আছে। দেখে মনে হয় কিছু লাঠি, কিছু গোলাকার মাটির পাত্র মাটিতে ছড়ান রয়েছে। আসলে ঐগুলি মানুষের হাড়-মাথা-মুন্ড-দেহাবশেষ। দুর্ভিক্ষের সময়ে ঐ রকম ঘটে।

সোমনাথ হোড় মারা যাওয়ার অব্যবহিত আগে বা পরে সীগাল ওনার কাজ নিয়ে একটা প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। যাওয়া হয়নি। দিন কয়েক আগে যখন কাগজে দেখলাম বিড়লা আকাডেমীতে চিত্তপ্রসাদের রেট্রোস্পেক্টিভ আয়োজিত হবে, ঠিকই করে নিয়েছিলাম এ সুযোগ হাতছাড়া করব না।

গতকাল দেখতে গেছিলাম। সেই দেখা নিয়েই এই লেখা।

উৎসাহীরা দেখে আসতে পারেন। ঠকবেন না।



Name:  pi           Mail:             Country:  

IP Address : 128.231.22.133          Date:08 Sep 2011 -- 04:56 AM

লেখা কই ?



Name:  saikat           Mail:             Country:  

IP Address : 202.54.74.119          Date:09 Sep 2011 -- 11:28 AM

হাংরি বেঙ্গল
===============

ছবিগুলো দেখতে দেখতে একটা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ি। একটা গ্রামের বাড়ীর লম্বা মাটির দাওয়া। ইতস্তত ছড়ান মাটির হাঁড়ি-কলসি-পাত্র। গাছের পাতা পড়ে আছে, গাছের ছায়া। কালো কালিতে আঁকা। স্কেচ। কিন্তু মনুষ্যবিহীন ঐ ছবি। ছবিটার নাম পড়ে বুঝি কোন এক তাঁতীপাড়ার ছবি। বুঝি ঐ তাঁতিপাড়া থেকে লোকেরা চলে গেছে, তাই শূন্য ঐ বাড়ী। কোন একসময়ে লোকজন ছিল, কাজকর্ম হত, কিন্তু আজ কেউ নেই। কোথায় গেল? জানি না তো। হয়ত বা লঙ্গরখানায়, কিংবা রিলিফ কমিটির আপিসে, অথবা হাসপাতালে। অথবা হয়ত ফ্যানের খোঁজে শহরে। ক্ষুধা মেটানোর জন্য।

এই ছবিটি চিত্তপ্রসাদের আঁকা দুর্ভিক্ষের চিত্রমালার একটি। ঐ চিত্রমালা জুড়ে থাকে কংকালসার মানুষের মিছিল। হাড়-পাঁজর বার করা মানুষ, হাসপাতাল আর লঙ্গরখানায় ছড়িয়ে যাওয়া মানুষ, সরু সরু পাঅলা মানুষ, সামনে খাবারের বাটি নিয়ে বসে থাকা মানুষ। উলঙ্গ, অর্ধউলঙ্গ । ছোট ছেলেদের ছবি, দর্শকের দিকে তাকিয়ে আছে, পরণে একরত্তি কাপড়। অথবা একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, পেছন থেকে দেখা যাচ্ছে, তার সামনে খাটে শুয়ে আছে সরু একটা মানুষ। ছেলেটিরই কেউ হবে, মরে যাচ্ছে হয়ত।

এইসব ছবি আর কিছুই নয়, ডকুমেন্টশন বলে মনে করি, বাঙালীর, বাংলাদেশের অতীতের এক বিশেষ সময়ের। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের। সব ছবিগুলোই আঁকা হয়েছে কালো কালিতে, পেন অথবা ব্রাশে, কাগজে। কিছু ছবি আছে, চারকোল দিয়ে আঁকা। অর্থাৎ সব কিছুই ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট, স্টার্ক। কিন্তু একেবারেই কী সবই গেছে ঐ মানুষগুলোর? কিছু যেন তখনও আছে। যা বেরিয়ে আসে চিত্তপ্রসাদের পেনের স্ট্রোকে, ছবির লাইনগুলোতে। একটা লোক মুখটা ঘুরিয়ে আছে, তীক্ষ্ণ হয়ে বেরিয়ে আছে চিবুকটা, অল্প দাড়ি। একটা কিছু সেই অবস্থাতেও রয়ে গেছে মানুষগুলোতে।
যেন, আমরা যাইনি মরে আজও।

এইসব ছবিগুলো চিত্তপ্রসাদের শিল্পী জীবনের এক বিশেষ পর্বের। চিত্তপ্রসাদের জন্ম নৈহাটিতে, ১৯১৫-তে। ৪০-এর দশকের প্রথমে যুক্ত হন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সাথে। হোলটাইমার হন। ৪৩-এর মন্বন্তরের সময়ে পার্টির নির্দেশে যান মেদিনীপুর। কালি, কলম আর খাতা নিয়ে। সঙ্গে সুনীল জানা, ফটোগ্রাফার। সুনীল জানার তোলা ফটোগ্রাফ, চিত্তপ্রসাদের আঁকা ছবি ও রিপোর্টাজ ছাপা হত পার্টির মুখপত্র People's war -এ, মন্বন্তরের বিবরণী। কিছুদিনের মধ্যে ঐ সব রিপোর্টাজ ও স্কেচ নিয়ে বম্বে থেকে প্রকাশিত হয় Hungry Bengal - A Tour Through Midnapur District, By Chittaprosad, In November 1943 নামে বইটি। ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক সমস্ত কপিই বাজেয়াপ্ত ও নষ্ট করা হয়। একটি কপি রয়ে যায় চিত্তপ্রসাদের বোনের কাছে, যেটি থেকে এই প্রদর্শনী উপলক্ষে বইটির প্রতিলিপি সংস্করণ ছাপান হয়েছে।

একটা বিশেষ সময়ের দলিল এই সব ছবি ঐ বইটি।



Name:  dd           Mail:             Country:  

IP Address : 124.247.203.12          Date:09 Sep 2011 -- 03:52 PM

জইনুল আবেদিন ও ঐ সময়ের ছবি এঁকে নাম করেছিলেন।

চিত্তপ্রসাদের পরবর্তী সময়ের ছবিও দেখেছিলাম কিন্তু কোথাও একটা তাল কেটে গেছিলো। একবার প্রতিবাদী ব্র্যান্ড হয়ে গেলে সেটার থেকে বেড়িয়ে আসা মুষ্কিল।



Name:  dd           Mail:             Country:  

IP Address : 124.247.203.12          Date:09 Sep 2011 -- 04:18 PM

এই প্রসংগে মনে পরলো, আপুনেরা যামিনী রায়ের পটচিত্র ছাড়া আর অন্য ছবি দেখেছেন ? উনি কিন্তু দুরদান্ত পাশ্চাত্য স্কুলের ছবিও এঁকেছিলেন।

বছর চল্লিশ আগে অতুল বোস, অমৃত পত্রিকায় তিন চার কিস্তিতে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন । যদ্দুর মনে আছে তাঁর খুব দু:খ ছিলো যামিনী রায় ছবি আঁকা ছেড়ে একটি মতবাদ প্রতিষ্ঠাতেই মন দিয়েছিলেন, যে কোনো কারনেই হোক তিনি কিংবদন্তী হয়ে ওঠেন, কিন্তু পটচিত্র বা বাংলা ঘরানা সেই আঁধারেই পরে থাকলো।

যামিনী রায়ের,সেই ফ্ল্যাট তাসের মতন ছবি আমারো কোনোদিন ভাল্লগে নি। কি কোরবো ?



Name:  saikat           Mail:             Country:  

IP Address : 202.54.74.119          Date:09 Sep 2011 -- 04:54 PM

ভারতীয় চিত্রকলায় চিত্তপ্রসাদ একটি ভুলে যাওয়া নাম। ১৯৬৫ সাল নাগাদ কলকাতায় আকাদেমীতে একটি প্রদর্শনী ছাড়া আর মনে হয় ওনার কাজ নিয়ে কোন প্রদর্শনী হয়নি। এতদিন পরে Delhi Art Gallery -র উদ্যোগে কলকাতায় এই প্রদর্শনী। বলে রাখা ভাল, ৫০-এর দশকে কিন্তু চিত্তপ্রসাদের কাজ নিয়ে বিদেশে কিছু প্রদর্শনী হয়েছিল। ১৯৫৫-তে , নিউ ইয়র্কের ইন্ডিয়া হাউসে চিত্তপ্রসাদের করা ৪০-টি সাদা-কালো প্রিন্টের প্রদর্শনী হয়, ঐ বছরেই ওনার লিনোকাট নিয়ে নিউ ইয়র্ক থেকে Contemporary Woodcuts নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। ১৯৫৬ সালে প্রাগ শহরে এবং ইউরোপের আরও কিছু জায়গাতেও (ডেনমার্ক, হল্যান্ড,জার্মানী) চিত্তপ্রসাদের কাজের প্রদর্শনী হয়। দেশে ওনার কাজের অনাদর নিয়ে ক্ষোভ ছিল নিশ্চয়ই। ১৯৬৫-তে মা-কে একটি চিঠিতে লেখেন - "কলকাতায় প্রদর্শনীর পরে কাগজে আমার কাজ নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে। কিন্তু আমার ছবি কেনার জন্য কেউই এক পয়সাও খরচ করে না। বিদেশীরা কিছু ছবি কেনাতেই আমি এখনও বেঁচে আছি। নিজের দেশের লোকের ওপর ভরসা করতে হলে, এতদিনে মরে ভূত হয়ে যেতাম।"

এই যে বিস্মরণ, এর কারণ কী?

কয়েকটা কারণ অনুমান করা যায়। প্রথমত, ৫০-এর দশকের পর থেকে ভারতীয় চিত্রকলায় যে প্রবল বাঁক ও বদল, সে সবের থেকে চিত্রপ্রসাদের কাজ একটু দূরে ছিল। দ্বিতীয়ত, হয়ত বা ওনার জীবনাচরণ। ৫০-এর দশকের শুরু থেকে বম্বে শহরে এক কামরার একটা ঘরে কিছু বইপত্র, একটা কুকুর, একটা বেড়াল আর নিজের কাজকর্ম নিয়ে মূলত: একা জীবন কাটিয়েছেন। সেই সময়ে চেক দূতাবাসের এক কর্মী Ing Frantisek Salaba -র সাথে পুতুল নাচের সূত্রে সখ্যতা গড়ে ওঠে। Salaba পরে লেখেন - But his pride did not allow him to show it or to even try to sell some of his art works to me. When I understood his situation, I tried to help by purchasing his drawings and linocuts. The difficulty was that he was never able to state his price and I was force to offer him a valye myself, or to think of ingenious ways of puting money in his pocket. তৃতীয় কারণ, চিত্তপ্রসাদের ছবির প্রতিবাদী রূপ। হাংরী বেঙ্গল পর্বে এই প্রতিবাদী রূপ না থাকলেও, ৪৭ থেকে ৫০ সালের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী হিসেবে অসংখ্য পোস্টারে এই প্রতিবাদী ধারাটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নৌ-বিদ্রোহ, তেলেঙ্গানা আন্দোলন, কালোবাজারী, দুর্নীতি, কাশ্মীর সমস্যা, বিভিন্ন দেশের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি নিয়ে আঁকা প্রোপাগান্ডামূলক পোস্টার আজকেও চমকে দেয়, এবং এর মধ্যে অনেক পোস্টারই আজকেও, এতদিন পরেও প্রাসঙ্গিক! ফলে ৫০-এর দশকের শুরু থেকেই চিত্তপ্রসাদ হয়ত বাঁধা পড়ে যাচ্ছিলেন ওনার ৪৩-এর মন্বন্তরের ছবি ও প্রতিবাদী পোস্টারের সাথে।

কিন্তু একটা কারণে, অন্তত একটা কারণেই চিত্তপ্রসাদকে আজকেও নতুন করে আবিষ্কার করা যায়। সেটা ওনার লিনোকাটের কাজের জন্য।



Name:  saikat           Mail:             Country:  

IP Address : 202.54.74.119          Date:09 Sep 2011 -- 06:12 PM

(ডিডিদা ঠিক মনে করিয়েছেন। জইনুল আবেদিন-ও মন্বন্তরের ছবি এঁকেছিলেন। কিন্তু সেই ছবি দেখিনি বলে, নাম উল্লেখ করতে ভুলে গেছি।)

ডিডিদা যামিনী রায়ের ছবি প্রসঙ্গে ওনার আঁকা পাশ্চাত্য স্কুলের ছবির কথা বলেছেন। এই প্রসঙ্গেই চিত্তপ্রসাদের কথাও বলা যায়। চিত্তপ্রসাদের কাজের মাধ্যম মূলত তিন রকমের - কালো কালিতে আঁকা ড্রয়িং, লিনোকাট ও স্ক্র্যাপার বোর্ড ব্যবহার করে প্রিন্ট ও রঙীন ছবি।

ছোট করে রঙীন ছবি নিয়ে কটা কথা।

প্রদর্শনীটাতে প্রায় গোটা দশেক রঙীন ছবি ছিল। অয়েল অন পেপার। স্টীল লাইফ, ফুল-পাতা, নরনারীর যুগল মূর্তি, ল্যান্ডস্কেপ, আয়নার সামনে প্রসাধনরতা নারী ইত্যাদি। ছবিগুলো দেখতে ভাল লাগে, রঙের ব্যবহারে ও প্রকরনে এক্সপ্রেশনিস্ট অথবা fauvist -দের প্রভাব আছে। প্রসাধনরতা মেয়েটির যে ছবি, সেটিকে দূর থেকে দেখে প্রথমে ভাবলাম, এখানে গঁগ্যার ছবি এল কোথা থেকে! একটি মেয়ের মুখে ছবি ছিল যেটাতে কিউবিজমের প্রভাব স্পষ্ট। ছবির তলকে একাধিক রঙের সাহায্যে ভাঙা হয়েছে, যদিও সেই ভাঙার মধ্যে কোন রকম ডিস্টর্শন নেই, বরং এক রকমের শান্ত ভাবই আছে।

বলার কথা এই, ছবিগুলো দেখে মনে হল, শিল্পীর স্বকীয়তা এই সব ছবিতে অনুপস্থিত (বাংলাদেশ যুদ্ধের সময়ে আঁকা ছবিতেও কোরিয়ার যুদ্ধের সময়ে আঁকা পিকাসোর ছবির প্রভাব লক্ষ্য করি। অবশ্য পিকাসোর ছবির মডেল হিসেবেও ছিল উনিশ শতকের স্পেনীয় শিল্পী গইয়ার আঁকা ছবি)। পাশ্চাত্য রীতিকে আত্মস্থ করেই এই সব ছবি আঁকা হলেও, বিশেষ নতুন কিছু নেই। অবশ্য সম্পূর্ণ স্বশিক্ষিত এক শিল্পী, যাঁর কোন প্রথাগত অঙ্কনশিক্ষা নেই, তার আঁকা এইসব ছবিও অমূল্য।

কিন্তু, তাও মনে করি, চিত্তপ্রসাদের প্রধাণ কাজ সাদা-কালো ড্রয়িং ও প্রিন্ট।


এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--7