আপনার মতামত         


লুঙ্গি সংক্রান্ত বিতর্ক অবসানের অকরুণ কাহিনী
বোধিসত্ত্ব দাশগুপ্ত


যদিও এ সম্পর্কে নতুন তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন ছিল না, তবু সম্প্রতি অপিমোড-পুরনারী জনমত সমীক্ষায় আবার প্রমাণিত হয়ে গেছে, পুরুষের চেক লুঙ্গি , বর্ডার সহ বা ছাড়া, নতুন যুগের ব্যস্ত মহিলাদের অথবা ব্যস্ত অথচ কিছুটা নির্বাক যুগের মহিলা দের জীবনেও, শ্রেণী নির্বিশেষে, বিবাহ ও প্রাক বিবাহ ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে গভীর বিতর্কের যন্ত্রনা ও তৎজাত মানসিক নি:সঙ্গতা ও অবসাদ বয়ে আনছে । প্রতিবাদ ও জমে উঠছে। এ প্রতিবাদ অনর্থক ট্রাফিক জ্যাম তৈরী করে না, পরীক্ষার্থীর ,রুগীর, আপিসেচ্ছুক কর্মীর হয়রানি করে না। মেয়েদের ঘুরে দাঁড়ানোর এই নতুন সময়ে এর শ্রেণী ব্যাপ্তি ও স্পষ্ট। আমার-আপনার যথার্থ সাথী, সংকট-সম্পদ সঙ্গিনী, একটি বা দুটি সোনার টুকরো আগলানো মায়েরা শুধু নন, জন্মদাত্রী, একটু ভারী, অথচ ঢাকাই কিংবা টাঙ্গাইল-ফুলিয়ায় অদ্ভুত উজ্জ্বল মা , মাসি, জেঠিমা, কাকিমা এমনকি নিম্নবিত্ত খেটে খাওয়া বা অন্তত খাটার সুযোগ পাওয়া আরতি, ফুলমণি, কুলসুম, সাকিনা, অতসী র মত মানবী রাও কিন্তু লুঙ্গি নয়, পাজামাই চাইছেন সঙ্গীর শরীরে।

ধুতি অবশ্য বঙ্গসন্তানসাধারণের জীবনে বিজয়সিংহের পরাক্রমের মত প্রশ্নাতীত। বিশেষ করে পলায়ন খ্যাত লক্ষ্মণ সেন ধুতি পড়তেন এমন কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। পাজামাতেও একটু সমস্যা আছে। এটা থাক।

দু-বেড-তিন-বেড বাড়ির সাংসারিক প্রিভেসি তে আলিগড়ি,পান্টুলুনেত্তোরবঙ্গে বুটকাট বা বেশি কাপড়ের নিদ্রা স্যুট যে কোনো প্রিন্টে বা শোবার ঘরের নরম বাতির আলোর মত প্লেন জমি। বাইরে শেরওয়ানি , সালোয়ার, ঠান্ডা হাওয়া খেলানো রং এ। শীতে একটু ভারী কাপড়ের। অথবা চির অভিজাত কোলাপুরী সহ সাদা কটন বা সাদাটে ঘিয়ে সিল্ক চুড়িদার। পশ্‌চিম ভারতীয় গ্রীষ্মে অবশ্য আগুন বা পাকা লংকা রং ও চলবে। রেব্যান তো থাকছেই। রুচি ভেদে পুরুষ দেহে পোষাকী ও ক্যাজুয়াল ট্রাউজার, খাকি শর্ট স, ব্যাগি, গরমে সাহসী ও খোলামেলা চিনো দেখতে চাইছেন মহিলারা ঘরে ও বাইরে । লুঙ্গি কিছুতেই নয়। মূলত শুধু পাজামা বা অন্যান্য, মনুষ্যত্ত্বের প্রমাণ হিসেবে, দুপেয়ে পোশাক। প্রাক ইন্দিরা দেশপ্রেমে, ব্রিগেডে ও অন্যান্য জনগণতন্ত্রে নিকেতনি ব্যাগ সহ পূর্বে ব্যবহৃ ত কোলবালিশ কাট, খাদি আদর্শের খাটো ঢোল কাট পাজামা অবিশ্যি ব্রাত্য, ফেলে আসা সময়ের মত। কারণ গ্রামোদ্যোগের ইতিহাস কে শ্রদ্ধা জানিয়েই বিশ্বপথিক হতে চাইছি সংখ্যাগরিষ্ঠ আমরা অর্থাৎ ৯%। সেরা সুপুরুষ কবিও তো 'ক্লাসিকাল' ধুতি ( এক্ষেত্রে 'নবজাগরিত' কথাটার ভুল মানে তৈরী হতে পারে ভেবে বদলানো হল - সম্পা:) ও রোমান-অটোমান-নবাবী মেশানো জোব্বার কথাই বলেছিলেন। লুঙ্গির বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে এই চাওয়া উঠে এসেছে ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সমাজে। যদিও কেউ কেউ তীর্যক হবেন, বোরখা তথা হিজাব-ও কিন্তু লুঙ্গির বিরুদ্ধে এই কালবৈশাখীর মত উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া গণরোষে পিছিয়ে নেই। কাপড়ের সঙ্গে কাপড়ের এই আন্ত কম্যুনিটি দ্বন্দ নিয়ে সমাজতাত্ত্বিক গবেষণা এই গতিময় সময়ই করবে।

প্রতিবেশী সবজে বা ক্যাটক্যাটে নীল চেক-লুঙ্গি যে শুধু পোষাক নয়, পুরোনো ঢাকার রিকসার মত একটা পশচাদমুখী , মধ্যযুগীয়, অন্ধকারাচ্ছন্ন মানসিক অবস্থা। সর্বস্তরের নতুন বাঙ্গালি নারী তাই পুরুষ কে সাথে নিয়েই আর পিছিয়ে থাকতে রাজি নন। দৈনন্দিনে , সামাজিক অনুষ্ঠানে,সদর্থে খেলানো বা হাতে নেওয়া কুচি ধুতি বা নানা কাট পাজামা রা তাই এগোচ্ছে।

কিছু কিছু প্রযুক্তি যেমন প্রগতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না, লুঙ্গিও পারলো না। দুটি সুবিধে কিন্তু ছিল। উত্থান সংক্রান্ত। প্রথমটি হল সম্প্রীতির আবহে খোলা আকাশের নীচে শিশিরে ভেজা গ্রাম বাংলায় প্রাত: কৃত্য। দ্বিতীয় টি হল ঘটনাচক্রে অনিচ্ছামৃত্যুর পূর্ব মুহুর্তে কোনো কোনো পুরুষের প্রাথমিক সামাজিক পরিচয় জেনে নেওয়ার সর্বজনীন সুবিধে। এই পদ্ধতি ১৯৪৬ নাগাদ মধ্য কলকাতায় আবিষ্কৃত হবার পর থেকেই জনপ্রিয়তার কারণে প্রায় জাতীয় ঐতিহ্য হয়ে উঠেছিল। অপিমোড-পুরনারীর বাচ্চা তথ্য সংগ্রাহক দের এতোটা জানার কথা নয়।

যাই হোক লুঙ্গির বিরুদ্ধে এই প্রবল জনমত প্রতিষ্ঠার পরের নয়, তার অল্প পূর্বের ঘটনা নিয়েই আমাদের সুশান্ত-অনিতার গল্প। তখনো সমাজে তর্ক চলছিল। বিবর্তনের গতি তখনো হয়তো কিছুটা সহমর্মী-শ্লথ ছিল।

অনিতা শেষ বর্ষায় ফোটা একটু মুখ নীচু মালতী ফুলের মত, একজন ধন্য ধন্য ভালো মেয়ে। আশ্‌চর্য্য সান্ধ্য স্নিগ্‌ধ। কুর্চি ফুল নয়, কুর্চি তে একটা গরমের দুপুর বেলার আমের সরবতের মত বা দুপুরে অংক না করে ছবিওয়ালা কৃত্তিবাসী রামায়ন পড়ার মত মিষ্টি মিষ্টি দুষ্টুমির ইচ্ছে টুকু আছে। অনিতা অসম্ভব ভালো মেয়ে ছিলেন, শিশু বয়সেও একটুও দুষ্টু ছিলেন না। ছোটোবেলা থেকে কোনো দিন কেউ তাকে একবারো গল্প শোনা নিয়ে জেদ করতে, বাণীর আরাধনার আগে কুল খেতে, পাপোশ নিয়ে খেলা করতে, কাঠালিচাঁপা গাছে বুলবুলি পাখির বাসায় উঁকি দিতে, বিয়ের আগে ভজন ছাড়া অন্যান্য হিন্দী গান গাইতে, মা দেওয়ার আগে শরৎ চ¿দ্র পড়তে, র ঙীন কাঠি আইস্ক্রীম বা বুড়ির চুল খেতে, আজকালকার পাকুবুড়ি গুলোর মত ঠোঁট ওলটাতে বা লোকের সামনে পা নাড়াতে বা হাঁটু চুলকোতে দেখে নি। মাছ নিজে বেছে খেতে, মাত্রা বা মার্জিন দিয়ে হাতের লেখা অভ্যাস করতে, বিজয়ার পরে বা আগে মায়ের ইশারা ছাড়াই সমস্ত বড়দের প্রণাম করতে, জল খেয়ে ইশকুলে যেতে, রান্নার মেয়েটিকে ভেতর থেকে মাসি বলতে, পা ধুয়ে এবং
মুছে ঘরে ঢুকতে,মীনা কাকিমার ছেলে প্রশান্ত ওরফে রাজা ভাইটি কে দিয়ে কটকটি খেতে,খাতায় মলাট দিতে ও সন্ধে প্রদীপ জ্বেলে দিতে দেখেছে। আবৃত্তি তে 'আমি যদি দুষ্টুমি করে' বলে ফার্স্ট হয়েও কোনোদিন তাঁর দুষ্টুমির কথা মনে হয় নি।

বাবা-মা-দাদু-দিদার আর মেজাজ ভালো থাকলেও একটু দাপুটে ঠাকুমার সোনা সোনা সোনা তিগুন সোনা আদরের মামণি ছিলেন তিনি। এরকম কিন্তু চট করে এ পাড়ায় দেখা যায় না। চারদিকে নানা বিধ খোট্টা, ঘট্টি পট্টি সাদা-লুঙ্গি মদ্র, ভুঁড়ি মেড়ো, রাতে ফেরা সন্দেহজনক কেরেস্তান নার্স দুটি, তিন চার ঘর বালে বালে ক্যাসেট প্রেমী, অনতিদূরে চেক-লুঙ্গি সম্প্রদায় আর যত আগডম বাগডম আনকালচারের বাস। পানের দোকানে সিলোন রেডিয়োর তারস্বর মালা-ডি র বিজ্ঞাপণ , গীতা দত্ত বা নির্লজ্জ কিশোর-আশা-রাহুল, মাইকের চিল চিৎকারে দিনে পাঁচবার সাংবিধানিক সর্বধর্ম সমন্বয়ের যন্ত্রনা আর গনেশ পান মশলার আনকুথ দাপট। সবচেয়ে কাছের বাঙ্গালি কালীর মন্দিরটি যেতেও লাগে পাক্কা কুড়ি মিনিট। শান্তি নেই। তবু অনিতা মালতীটি-ই থেকেছেন। অন্যথা হয় নি।

বাবা, দাদু ও বরাবর বাড়িতে ধুতি পড়েছেন কুচি দিয়ে অথচ পেছনে না টেনে সামনে একটু লুটোনো ক্যাজুয়াল রুচিসম্পন্ন ঘরোয়া শৈলী তে। সাদা লম্বা পাঞ্জাবি সহ। তাই লুঙ্গির ঘরোয়া-ভিতর বা সামাজিক-বাইরের বিতর্কিত সত্তাটি সম্পর্কে এই এত দিনেও অনিতা কোনো তাত্ত্বিক বা দৈনন্দিন ধারণা তৈরীর সুযোগ ই পান নি। রবিবারের রেডিয়োর শিশুমহল আর আদর্শ বন্যাহীন শরতের ভরা সবুজ ধান-ঢেউ এর মত সুন্দর বড় হওয়া অনিতার। সেসব ছবি-ক্ষেতে কোনো মনিষ্যি কাজ করে না। কোনো খোলামেলা সাহসী কাদা মাখা চেক-লুঙ্গি বা নেতানো নুনুগোঁজা প্রিন্ট-নেংটি নেই। শুধু দেখা যায় না এমন স্থান থেকে তারা অদ্ভুত মাতাল করা বাঁশি বাজায়। বাবার দেরী হলে জল টলটল চোখ দুটির বা নীরব মাকে ঠাকুমার বকুনির মুহুর্তে বুক একটু একটু কাঁপলেও বারান্দায় গিয়ে চুপটি করে একাই বৃষ্টি দেখার স্মৃতি ও আছে অনিতার। তবে তারা যেন শরতের সোনালী রোদের মধ্যে তুলো-সাদা মেঘের সরে সরে যাওয়া ছায়া। সরকাঠির অগোছালো ঝোপের পাশে ফুটে যাওয়া কাশফুলের মত ভরন্ত ছবির, চিরল-চিরল বাকি টুকু।

অনিতা বড় হতে লাগলেন এবং আরো ভালো হতে লাগলেন। তাঁর সুন্দর চেহারা, অদ্ভুত শান্ত স্বভাব, বেশ ভালো রেজাল্ট, এছাড়া কৃষ্ণকলির সংগে তাঁর চেহারার মিল কাজল কালো চোখ আর শ্রাবণের মেঘের মত
চুলে সীমাবদ্ধ থাকায়, তাঁর রবীন্দ্রসংগীতে পারদর্শিতা দেখেশুনে নানা পাজামা ও প্যান্টু পরা দীপ্যমানেরা টপাটপ প্রেমে পড়তে লাগলেন, তাঁদের মায়েরা তাৎপর্য্যপূর্ণ খবর নিতে আরম্ভ করলেন। তাও অনিতা ভালো মেয়েই থাকলেন। মা বাবাও খুশি থাকলেন। এবং অনিতা কারো প্রেমে পড়লেন না। ঈষৎ বুক কাঁপা কাঁপা কোনো অপরিচিত অথচ অজানা নয় এরকম শরচ্চন্দ্রিয় অনুভুতি হলেই তিনি গান গাইতেন। বাড়িতেই। তানপুরায়। 'যদি প্রেম দিলে না প্রাণে', 'না গো এই যে ধূলা আমার না এ' এই সব। কিন্তু যেহেতু দেহছন্দে সেলাইকল নিপুণা,সুশীলা, ফর্সা, গভ: আপিসারের কন্যেদের সুনাম খুব তাড়াতাড়ি ছড়ায় আর উচ্চশিক্ষিত, সহনশীল , আধুনিক মনষ্ক ও সদ্য প্রতিষ্ঠিত ছেলেদের মায়েরা, ভিপি সিংহের জমানাতেও তথ্যের পূর্ণ সামাজিক বন্টনের একটু আগে খবর পান, তাই সুশান্তর মা পিছিয়ে পড়েন নি। এগিয়ে থাকার কাগজের উপর তিনি মোটেও নির্ভর শীল ছিলেন না। তাঁর নিজের নানা যোগাযোগের মাধ্যম রয়েছে। আরেক টাঙ্গাইল প্রিয়া কাকীর শুভেচ্ছা ও জীবিত সমস্ত পরিচিত মানুষের আশীর্বাদ কে পাথেয় করে সুশান্ত ভাল চাকরির পরেই রেকর্ড গতিতে অনিতা কে বিবাহ করে ফেললেন ও বাসরে দরদ দিয়ে ভরা গলায় 'পুরানো সেই দিনের কথা' গাইলেন। সে গানের সঙ্গে আমৃত্যু মধুময়তার সুচনার মুহুর্তের বৈপরীত্য কেউ লক্ষ করলো না। বাঙ্গালী প্রাসঙ্গিকতার সৌভাগ্য ও সুরুচি, মৃত্যুর এত দিন পরেও বিশ্বকবির পিছু ছাড়েনি।
অনিতার বাল্য থেকে কৈশোরে উত্তরণে যে সূর্যোদয় রঙ এর গ্লানি ছিল, তা না থাকলেও বাইশ বছরের যৌবন থেকে ভরা যৌবনে উত্তরণের দিনটিতে কিছুটা একাকীত্ব থাকলো। সুর মিলিয়ে মিশিয়ে অনেক গুলো
রবীন্দসংগীত তাঁর মনে উথাল পাথাল হতে লাগলো অথচ একটিও শব্দের অবলম্বন পেলো না।

ব্যবহারিক পূণ্যার্জনের সমস্ত সামাজিক, সাংস্কৃতিক,পারিবারিক,প্রাতিষ্ঠানিক ও তদ বহির্ভুত প্রচেষ্টা, বাবাজীবনের নতুন আপিসে নানা স্নেহশীল চাপ সৃষ্টি সত্ত্বেও, আরো বড় গভ: আপিসারের আরো বড়
বাবাজীবনের আরো স্নেহশীল চাপ সেবার থাকায়, সিভিল সমাজের নির্মম নিয়মে, যাকে বলে অনিতার বাবা মাকে শোকসাগরে নিমজ্জিত করে, কলকাতা, দুগ্গাপুর, বর্ধমান, কোচবিহার, মায় ভোপাল, নাগপুর,
রায়পুর, পাটনা, দেওঘর বাদ দিয়ে সুশান্ত বাবুর বীরভুমের মহম্মদ বাজারে পোস্টিং হল।

অনিতার জীবনে, নীলাঞ্জন ঘন মেঘের মত , মধ্য থেকে নিম্ন বিত্ত বা বিত্তহীন লুঙ্গির ছায়া ঘনিয়ে এলো। সুশান্ত মহম্মদবাজার সম্পর্কে নিশ্‌চিত না হলেও, চাকুরিক্ষেত্রের ভবিতব্যের প্রভাব সম্পর্কে নীরব এবং ব্যাংকের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সত্ত্বা টি সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। জানতেন মহম্মদবাজার ও ঐ স্থানীয় লুঙ্গির সম্ভাব্য দৃশ্য- নান্দনিক সাংস্কৃতিক সংকট তাঁকে ছোঁবে না। ওদিকে অনিতা ভাগ্য চয়নের অধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও , টডকৃত পদ্মিনী প্রদর্শিত পথে পতিপ্রাণা রমণীদের ন্যায় স্টোয়িক মানসিক প্রস্তুতি নিলেন। মহম্মদবাজারে পৌঁছে দ্বিতীয় বিকেলে, বাসা বাড়ির পেছনে কাঁঠাল গাছের তলায় শাপলা পুকুরের একটু দূরে, মোড়ায় বসে সুশান্তর মুগ্‌ধ কর্ণে,নয়ানে, চেতনায় সুর নিবেদন করলেন, 'প্রতিদিন আমি হে জীবনস্বামী'। ঘেঁটু ঝোপ থেকে কুবো পাখি না শোনার দুষ্টুমি করে বলল 'কুবো কুবো'।

এর পরের ইতিহাস মূ:লত অনিতার জীবনে তথা সমস্ত প্রদেশে লুঙ্গির জনপ্রিয়তা ও গ্রহনযোগ্যতা হ্র আসের ইতিহাস।

মহম্মদ বাজারের বিভিন্ন অনিয়ন্ত্রিত লোকেরা তাদের লুঙ্গি সহ আস্তে আস্তে সুশান্ত আর অনিতার জীবনে কার্য সূত্রেই জড়িয়ে পড়তে লাগলেন। রফিক, নিয়ামত , সইফুদ্দিন দের সঙ্গে ক্রমাগত সামাজিক দেওয়া নেওয়া চলতে লাগলো। একটাই মানুষ অনিতা। একজনই সুশান্ত। তাঁদের জীবনের এক অংশের সঙ্গে আরেক অংশের কত পার্থক্য। এই জন্যেই কবি বলেছেন 'জয় তব বিচিত্র আনন্দ'।

রফিক ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। ভীষন আলসে এবং ফাঁকি বাজ অথচ মুখে দাদা বৌদি অন্ত প্রাণ। অথচ অনিতার অনুরোধ সত্ত্বেও দুদিন ধরে কুয়োতলার কাছের বাতিটি বদলে দেয় নি। দিনের বেলাতেই সব জল তুলে রাখতে হয়। তবে অনিতা তাকে সেই কবে চেতলা রোডে জেঠুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে রাস্তার পাশের হাবিজাবির দোকান থেকে কেনা, ঠাকুরের আসনের কাছে রাখা ইলেকট্রিক প্রদীপ টি সারানোর কথা বলেন নি।
সুশান্ত পইপই করে বলে দিয়েছেন নিজেই নিয়ে বসবেন কোনো রবিবার। ঠাকুরের জিনিস। রফিক বড় ছটফটে। সখের জিনিসটা ভেঙ্গে গেলে খুব খারাপ হবে।

নিয়ামত বড় অবস্থাপন্ন চাষী। ব্যাংকে বড় আমানত আছে। নবময়ূরাক্ষী কোঅপারেটিভ সোসাইটির মুরুব্বি গিরি তেও তিনি মাঝে মাঝে মন দেন। সব সময়ে লুঙ্গি পড়েন না। কলার দেওয়া পাঞ্জাবী আর আলিগড়ি পরেন প্রায় ই।অসংখ্য শ্যালো পাম্প আছে নিজের। সুশান্তদের ব্রাঞ্চ থেকেই লোনে কেনা বড় ডিজেল পাম্প ভাড়া দেন। সাঁইথিয়ার রাস্তা সারানোর কন ট্রাকটর দের অল্প সল্প কম পড় লে, মাটি কাটার লেবার-
মুনিশ ও দিয়ে থাকেন , তবে সে লাভের ব্যাবসা নয়, খাতিরের লেন দেন। সম্প্রতি রেডিয়োর বৈজ্ঞানিক পরামর্শ মেনে ধান, সর্ষে, আলু ছাড়াও বাড়ির কাছের জমিতে পেঁপে, পেয়ারা, আদা, লঙ্কা করে ভালো লাভ দেখেছেন। মহম্মদবাজার শুধু নয়, তাঁর জমি ছড়িয়ে আছে, পাঁড়ুই -পুরন্দরপুরে, বোলপুরে,লাভপুরে, কীর্ণাহারে,মহিদাপুরে। ইলামবাজারে বড় চালের আড়ত ও করেছেন সম্প্রতি। তবে সেটা বোধহয় বিয়ের পরে বড় ছেলে নফিজুল এর ভাগ্যে যাবে। নিয়ামত আধুনিক মনস্ক, ছেলে মেয়েদের মধ্যে জমি জায়গা সম্পত্তি নিয়ে সমস্যা হোক চান না। যদিও মাত্র দুটি সন্তান ওনার। এ দেখা যায় না। স্থানীয় বালিকা বিদ্যালয়ের বাড়িটি সংস্কার করে দিয়েছেন। নবপরিচিত রা একেক সময়ে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়। গোটা এলাকাতে একমাত্র সুশান্ত ই হয়তো জানেন নিয়ামত মনে মনে ঠিক করেছেন মেয়ে আয়েষা কে কিছুতেই বিয়ে দেবেন না যদ্দিন না সে এম এ পর্যন্ত না পড়ছে। আয়েষা কে একমাত্র স্কুল মাস্টারের সঙ্গেই বিয়ে দেবেন। লুঙ্গিপরিহিত মাতব্বর রা চুপ করে গেছেন নিয়ামত বাবু তৃতীয় ট্রাক টি কেনার পর থেকেই। কিশোরী আয়েষার প্রতি পিতৃস্নেহের আতিশয্য দেখে সুশান্ত বেশ অবাক ই হয়েছিলেন, অনিতা কেও বলেছিলেন। নিয়ামত ব্যতিক্রমী!

সম্ভবত আয়েষাও ছোটো বেলায় পাপোশ নিয়ে খেলে নি। আর কৈশোর থেকেই সে নানা চেনা অচেনা অনুভুতি কে বুকের মধ্যেই রেখেছিলো। স্কুল থেকে টিউশনে যাওয়ার হাঁপানো-জোর, পীর মেলা বা পরবের
খুশির মৃদুমন্দ, রাস্তায় ছাগল গরু এসে গেলে বা একটি বিশেষ রাজদূত বাইকে একটি বিশেষ নবযুবা চকিতে পেরিয়ে গেলে বার বার বেল বাজানোর অন্যমনস্ক অধৈর্য্য, নতুন বৃষ্টির মধ্যে ভেজার ইচ্ছে অথচ মায়ের
বকুনি খাওয়ার ভয়ে এলোমেলো দিক হীন গতি, সামনে ত্রস্ত মুর্গির বাচ্চা কে বাঁচাতে গিয়ে জোরে ব্রেক মারার সাবধানতা ইত্যাদি নানা ধরণের সাইকেল চালানো ছাড়া তার মানসিক অবস্থা বাইরে থেকে বোঝার উপায় ছিল না। তবে তার সুশিক্ষার , সচ্ছল প্রগতিশীল পরিবারের, ও পরবর্তি কালে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিবাহযোগ্যতার তথ্যটি, পিতৃস্নেহের অন্তরালে একটি লুঙ্গিময় জগতে এর পরেও অনেকদিন আবদ্ধ ছিলো। যথার্থ মুক্তির উপায় হয় নি। আতিথ্যের বিশিষ্টতা রক্ষার্থে অথবা স্বাস্থ্যসচেতন সুশান্তর আজ্ঞাক্রমে এদের সবার জন্য ই অনিতার বাড়িতে আলাদা করে রাখা খুব সুন্দর ছোট্ট নীল ফুল আঁকা বেশ দামী কাপ প্লেট ছিল। সূক্ষ্ম ডিটেলের অসামান্য চোখ ছিল অনিতার। তবে নিয়ামত বাবু বোধ হয় লোনের ঘরোয়া পর্যালোচনার কাজে এক দিন ই এসেছিলেন। আর রফিক চা খেতে চায় না।

অনাবাসী মহম্মদবাজারি সইফুদ্দিন একটু বিরক্তিকর চরিত্র। সন্ধের পাড়াতুতো মাতব্বরির আগে লুঙ্গি পড়েন তা নয়। সাঁইথিয়ায় সেচ বিভাগের ক্লার্ক তথা কর্মী সংগঠনের পুঁচকে নেতা। তার উপরে তার বউ চৈতালি সেখানে বাংলার দিদিমণি। ব্যাগ কাঁধে সপরিবারে দেশোদ্ধার করতে করতে নিজের ভিটে তে আসার সময় একমাত্র তার নানা নির্বাচন বা সম্মেলন এর সিজনে ই হয়। পীর মেলাতেও আসে না সব সময়ে।
সুশান্তর সমস্যা হল এরা দুজনেই অনিতার গুণ মুগ্‌ধ। গান শোনানোর ও শেখানোর অনুরোধের অত্যাচারের সংগে চাঁদা চাওয়ার নিবিড় সম্পর্ক। সুশান্ত আর কি করবেন। ঘর বাহির সব ই তাঁকে সামলাতে হয়। নিয়ামত সাহেব ও এই মাল টিকে একেবারে পছন্দ করেন বলে মনে হয় না। রফিকের মতামত নেওয়া হয় নি। নেহাত পূর্ব পরিচিত মৃত নুরুল বাবুর বেটা বলে নিয়ামত বাবু বেশি কিছু কন না। কোন টাউনে পার্টিবাজি করবে আর বাড়ি এলে বাস কন্ডাকটর থেকে আরম্ভ করে ভ্যান চালক, ট্রাক খালাসি,মুখ-চেনা-মাঠে-খাটা মুনিশ, মুদির দোকানের চাল বস্তা বওয়া লেবার ইত্যাদি লুঙ্গির নানা স্তরে বিন্যস্ত সবাই কে মাইনে বাড়ানোর বা সম্মেলন এ যাওয়ার কুবুদ্ধি দেবে এ কাঁহাতক সহ্য করা যায়। ওর বৌ টা অবিশ্যি খারাপ নয়। পয়সা না নিয়েই আয়েষা কে দেখিয়ে টেখিয়ে দেয়। জ্যেষ্ঠ দের সামনে বেশি কথা বলে না।

বোঝাই যাচ্ছে মোটেই ভালো লাগতো না অনিতার ঐ গাঁয়ে থাকতে। অসহ্য গাঁ। কাগজ আসে দুপুর আড়াইটের সময়। ইংরিজি কাগজ আসেই না। ভাজা বলতে ফুলুরি,বেগুনি আর পোড়া সিঙাড়া। ঘেমো, পুরোনো অতি ব্যবহৃত তেলের গন্ধে ম ম। মিষ্টির মধ্যে দানাদার আর পেঁড়া। রসগোল্লা যে শক্ত হয় এই প্রথম জানা গেল। আর প্রথম প্রথম প্রতি মাসে কলকাতা গেছেন রামপুরহাট বা সাঁইথিয়া হয়ে। পরে আর হত না। অনিতার মা এসে হপ্তা দুয়েক করে থেকে মেয়ের মন ভালো করে দিয়ে যেতেন। ঠাকুমা মারা যাওয়ার পরে অবিশ্যি। তবে কয়েক বার আনন্দ হয়েছে। নিয়ামতের চেনা ফণী বাবুর কাছ থেকে নেওয়া ভাড়া গাড়িতে, ড্রাইভার কাত্তিকের বুকুনি শুনতে শুনতে বক্রেশ্বর তারাপীঠ আর বোলপুরে বেড়ানো। তারাপীঠে দেওয়া স্পেশাল পুজোর ভোগ। একবার নিজেরা, একবার বাবা ঠাকুমা, আরেকবার মা,বাবা, দাদু দিদা কে নিয়ে, ঠাসাঠাসি করে বসেই। কিন্তু দারুণ মজা। আরেক বার শুধু মিঞা বিবি দুমকা মাসাঞ্জোর। নিয়ামতের মাধ্যমেই বাংলো বুকিং। শীতের জঙ্গলে বিহার বর্ডারের আলাদা মজা। সুশান্তর জিন্স টি শার্ট কর্ড জ্যাকেট। ছবিতে যার হাত ধরা সেই অনিতার কিছু অসাধারণ সালোয়ার কামিজ আর শাল । আর সেই অদ্ভুত চোখ দুটি। বাংলোর দারোয়ানের খাকি। কোনো লুঙ্গি নেই। অপূর্ব।

অতএব মহম্মদবাজার অনিতাকে কিছু দেয় নি । অনিতার ও মহম্মদবাজার কে দেওয়ার মত কিছু ছিল না। কিন্তু একথা আপনি আজ এম এ পাস, সালকিয়া ইশকুলে কর্মরতা দিদিমণি আয়েষা কে বলে দেখুন। উনি মানবেন না। অথচ পুরোটা বলবেন ও না। বেশি কিছু নয়। ঐ মাঝে মাঝে ভোর বেলায় সুশান্ত ওঠার আগে অনিতা সামনের ঘরে গান গাইতেন। 'গানের ডালি ভরে দেগো ঊষার কোলে', 'তুমি ডাক দিয়েছো কোন সকালে'। এই গান গুলো আয়েষার জীবনে একটা নতুন ধরণের সাইকেল চালানো নিয়ে আসে। চালানো বলা ভুল। সাইকেল হাতে ধরে ধীরে ধীরে অনিতা দের জানলার পাশ দিয়ে হাঁটা। এটাকে ঠিক প্রভাব বলা যায় না।

নিজের কাজে বিশেষত: হেডাপিসের নজরে আসায় দক্ষ সুশান্ত যদ্দিনে চার বছর মহম্মদবাজারের পরে চার বছর বালুরঘাট, আরো আড়াই বছর বহরমপুর, তিন বছর পাটনা করে অবশেষে বয়স্ক শুভাকাঙ্খী দের প্রার্থনা ও হেডাপিসে পুনরায় স্নেহশীল চাপ কাজে লাগিয়ে শেষ পর্যন্ত স্বপ্নের নতুন পুনে তে এসে পৌছোলেন তদ্দিনে ভারত বর্ষে পেশাদারের জগত স্বপ্নাচ্ছন্ন। আধো নিদ্রা মগ্ন কিনা জানা যায় না। এবং লজ্জার কতা আগেই বলা উচিত ছিল তদ্দিনে কুঁচবরণ এবং ভীষণ দুষ্টু পাকুবুড়ি কন্যা নন্দিতা জন্মেছে তো বটেই তার দশ এগারো বছর বয়স ও হয়ে গেছে। ছি ছি এ আগে জানানো উচিত ছিল। সে মাঝে মাঝেই বিচিত্র প্রশ্ন করে এক সময়ে মা বাবাকে খুব জ্বালিয়েছে। যেমন বাল্মিকী র পুরো নাম বাল্মিকী মাউস কিনা বা বাবার পেট থেকে কপি খেলে বেশি আওয়াজ বেরোয় কেন? একটা সময়ে অনিতা শুধু ভাবতেন হে ঠাকুর এত পাজি করলে কেন আমার মেয়েটাকে? সে এখন দেখতে তেরো চোদ্দো ও হয়ে গেল। ভীষণ পাকু বুড়ি হয়েছে, সারাদিন মা বাবাকে বকছে , ইশকুল যাচ্ছে, আসছে, অসংখ্য বন্ধুদের একাধিক জন্মদিনে বা শীতে স্কুল পিকনিকে , নাটক রিহার্সালে এগজিবিশানে বা সাঁতার কাটতে যাচ্ছে আর এরি মাঝে সময় করে একাকিত্ত্বে ভুগছে আর ইংরিজি তে গপ্পের বই পড় ছে।

নোতুন পুনের সূবিধে আছে একটা। সম্ভবত বাড়ি ভাড়া বা সে শহরের আবহাওয়া র সম্পর্কে গ্রাম বাংলায় ভুল ধারণা বা ট্রেন ভাড়া বা স্রেফ শহরভীতি ইত্যাদি বাহ্যিক কারণে সেখেনে পরিচিত বা অপরিচিত চেক
লুঙ্গি বা লুঙ্গিজাত বা তাদের পরিবার রা এসে পৌছয় নি। অন্তত সুশান্ত-অনিতাদের আপিসার পাড়ায়।

অনিতার বাবা মা ও ঘুরে গেলেন। আবার যাওয়ার সময় নাগপুর হয়ে ফিরলেন। সুশান্ত র বাবা মা এদ্দিনে নিশচিন্ত হয়ে আসতে পারলেন এবং লুঙ্গির ফাঁড়া কেটেছে বলে আশ্বস্ত করে গেলেন বউ কে। এই পাড়াটিও বেশ ভালো। প্রচুর বাঙালি। বাংলা দেশ থেকে ইউনিভার্সিটি তে আসা বিনিময় প্রোগ্রামের অধ্যাপক ডা: চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী মিসেস রোশনের সঙ্গেও আলাপ হয়ে গেছে। ভীষণ গান ভালো বাসেন ওঁরাও। চাঁদা নেন না। অনিতার ও ওঁদের ভালো লাগে। কত লোকের সঙ্গে আলাপ ও হয়ে গেছে, প্রায় ই দেখা হয় আর গল্প গুজব হয়। গান ও হয়। এই তো সেদিন আফগান দেশে বামিয়ান বুদ্ধের মুর্তিটির ভেঙে দেওয়ার বীভৎস খবর দেখা গেল সিএন এনে। চয়নে অনায়াস অনিতা তার ই কদিন পরে উইক এন্ডে মুক্তি দির বাড়িতে নটীর পূজার গান গাইলেন 'হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্‌বী'। অবিশ্যি গুজরাতে নানা উন্মত্ত ঘটনা যখন ঘটছিলো তখন অনিতা কে কলকাতায় ছোটো কাকিমার মেয়ের বিয়ের বাজারের জন্য কলকাতা চলে আসতে হয়। একা হাতে উনি কত করবেন। মুক্তি দি দের সঙ্গেও তখন দেখা হয় নি বহুদিন। যদিও ঐ জানুয়ারির শেষেই সুশান্ত র জন্মদিন। প্রতিবারের মত এবার গান গাওয়ার সুযোগ হয় নি। হলেই গাইতেন 'আমি রূপে তোমায় ভোলাবো না' । সবাই একটু মুখ টিপে হাসতো আর বলতো 'বাবা এখোনো!' সুশান্ত একটু লজ্জা পেতেন। কিন্তু একদিন খাওয়াতে নিয়ে যেতেন মেয়ে বৌ কে। অনিতা কলকাতায় চলে আসায় নন্দিতা কে একাই উৎসা দের বাড়িতে থেকে পরীক্ষা দিতে হয়। এবং তার হাতে আরো কিছু ইংরিজি বই আসে। যথা এটোনমেন্ট বা কলেরার সময়ে প্রেম নামক বিচিত্র বই। পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হয় নি। কিন্তু পাপোশ নয় বই নিয়ে একি খেলা।

এর পরে আর গপ্প তেমন কিছু নেই। আরো বছর পাঁচ-সাত পরের কথা। ভীষণ উজ্জল নন্দিতা দিল্লীতে এম এ পড় তে গিয়ে ধপাস করে আরো উজ্জ্বল কানডিয়ান পি এইচ ডি ছাত্র জাকের প্রেমে পড়েছে। জাক ও আশ্‌চর্য্য এই একদম অন্যরকম বিরাট সাহিত্য পড়া ক্ষুদে সমাজ বিজ্ঞানী কে দেখে। জাক ঘুরেও গেল , এই বার শীতে , পুনে থেকে। সব ই তার ইন্টেরেস্টিং লাগে। গান ও ভালো লাগে। আর নন্দিতা মুখে মুখে যে কি করে অমন রবীন্দ্র সংগীত অনুবাদ করে দেয় অমন অপূর্ব ইংরিজিতে কে জানে। এত সব শিখলো কোথায়। সুশান্ত মেয়ে কে দেখেন আর মহম্মদ বাজারের সেই কাঁঠাল গাছের ছায়ার কথা , নিয়ামত বাবুর কথা, লুঙ্গি পরিহিত চ্যাংড়া রফিকের কথা, হেডাপিসের স্নেহময় গাঙ্গুলি বাবুর কথা মনে পড়লে নিজের জীবনের বিচিত্র উন্নয়নশীল গতিতে নিজেই আশ্‌চর্য্য হন। কৃষ্ণা, গোদাবরী, ভাগীরথী, নর্মদা, গঙ্গা, পদ্মা, কোপাই, ময়ূরাক্ষী সব নদী দিয়েই অনেক জল বয়ে গেল। তদ্দিনে অপিমোড-পুরনারী জনমত সমীক্ষায় লুঙ্গির সঙ্গে গ্রাম্য বীরভূমী স্মৃতির সম্পর্কের মিথ টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে।

তবে যে সব পাঠক-পাঠিকা কেবল ই গপ্পের মোড়ে ঘটনা পছন্দ করেন তাদের জ্ঞাতার্থে দুটি লুঙ্গি বহির্ভূত ছোটো খবর জানাতে হচ্ছে। জাক এর লেখাপড়ার ইন্টারেস্ট এখন কবেকার কি সাম ভাসানি কে নিয়ে। নন্দিতা বলছিল। সেও লুঙ্গি বিতর্ক অবসান পরবর্তী দক্ষিন এশিয়া নিয়ে ভাবছে। পড়াই ভাবা। ভাবাই পড়া। তারা যাবে ঢাকা ও বাংলা দেশের অন্যান্য জায়গায় এই বছরের শেষে। ফিল্ডে নাকি যাওয়া জরুরী। এখন বিয়ের কথা ভাবছে না। ভোঁ নিবু-নিবু কল থেকে, প্রাগৈতিহাসিক সব রিক্সাস্ট্যান্ড নৌকাঘাট থেকে নতুন শতকের লজ্জা নিবারণে ক্লান্ত বা বাড়তি বা রিটায়ার্ড লুঙ্গি দের লাইন দিয়ে শীতল গবেষণামূলক যাদুঘরে ঢোকার শম্বুক প্রক্রিয়া টি প্রত্যক্ষণের কাজ কি অল্পে সারা যায়?

আর এবার বিজয়া সম্মিলনী তে দুটি গান গাইছেন অনিতা। 'নিদ্রাহারা রাতের এ গান' এবং 'আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়।' মুক্তিদি টুকে নিয়েছেন খাতায়। অন্য কেউ যাতে না গায়। প্রাসঙ্গিকতার ভুত এখনো ছাড়ে নি মৃত কবি কে। সবাই ভালই আছেন। মানসী বিসর্জন সোনার তরী অচলায়তন ছিন্নপত্র মুক্তধারা রক্তকরবী পুনশ্‌চ চণ্ডালিকা সভ্যতার সঙ্কটের বৃদ্ধ স্রষ্টার বিরাট বিপুল জোব্বা সহ সামান্য সোজা থেকে ধীরে ধীরে ঝুঁকে প্রায় কিছুটা সত্তর বছরের চলাটি, যদিও ঐ লেখার কাটাকুটি- আঁকিবুকি বা মুখ কাত করা লালকালো কালির পোঁচে নির্বাক মেয়েটির ছবির প্লেটের মতই, প্রকাশিত রচনাবলী তে আবদ্ধ।

একদিন রুমালের বেড়াল হবার ঐতিহাসিক উদাহরণ কে অনুসরণ করে সুশান্ত,অনিতা,নিয়ামত,রফিক,সইফুদ্দিন এবং সর্বোপরি নানা জাতের লুঙ্গির এই গল্প টিও অনতিকালে বিবর্তিত হয়ে স্মৃতির ধূসরতায় কিছু পেরেকদের অকরুণ গল্প হয়ে যাবে। কফিনের শেষ পেরেকের বংশ খুব ছোটো নয়। তবে শক্ত বেঁটে থেকে শুরু করে ধারালো লম্বাটে সমস্ত ধরণের কড়াধাতের পেরেক কখন কি বায়নাক্কা করে বলা যায় না। লুঙ্গি দের সংগে সস্তার চোস্তো পাজামা,ফুটো ফুটো চাঁদ টুপি ইত্যাদি সহমর্মী কাপড়ের টুকরোরা সেই সব কফিনে না ঢোকা পর্যন্ত হয়তো যতই হাতুড়ি মারা হোক এঁটে বসতেই চাইবে না। জেদী লোহা বলে কথা।