আপনার মতামত         



আমার উন্মন বাদ্যকর...

ইন্দ্রনীল ঘোষদস্তিদার



""পূবেতে বন্দনা করলাম পূবের ভানুশ্বর।
একদিকে উদয় রে ভানু চৌদিকে পশর।।
দক্ষিণে বন্দনা গো করলাম ক্ষীর নদী সাগর।
যেখানে বানিজ্জি করে চান্দ সদাগর।।
উত্তরে বন্দনা গো করলাম কৈলাস পর্বত।
যেখানে পড়িয়া গো আছে আলীর মালামের পাত্থর।।
পশ্চিমে বন্দনা গো করলাম মক্কা এন স্থান।
উরদিশে বাড়ায় ছেলাম মমিন মুসলমান।।
সভা কইর‌্যা বইছ ভাইরে ইন্দু মুসলমান।
সভার চরণে আমি জানাইলাম ছেলাম।।
চাইর কুনা পিরথিমি গো বইন্ধ্যা মন করলাম স্থির।
সুন্দরবন মুকামে বন্দলাম গাজী জিন্দাপির।।
আসমানে জমিনে বন্দলাম চান্দে আর সূরুয।
আলাম-কালাম বন্দুম কিতাব আর কুরাণ।।
কিবা গান গাইবাম আমি বন্দনা করলাম ইতি।
উস্তাদের চরণে বন্দলাম করিয়া মিন্নতি।।''

-------
আমাদের একটা ছোট মফ:স্বল ছিল। গঙ্গার তীরে তীরে পাটকল আর স্টিলের বার,টায়ার আর লেদ-মেশিনের কারখানা দিয়ে সাজানো মফ:স্বল এরকম অনেকই তো থাকে। ভূগোল বইতে বলে হুগলী শিল্পাঞ্চল। গঙ্গাকে হুগলী নদী বলে, বই পড়ে জানছিলাম।
মফ:স্বলে কি থাকে, ঘেমো জামার মানুষ আর রেলগেটের ধারে ধারে সার সার হ্যারিকেন ফ্যাক্টরী ছাড়া? রেললাইনের ধার ধরে সরু ইঁটের রাস্তা,মাঝখানে শাপলা-বিল। লাল লাল শাপলা ফুটে আছে, মেলট্রেন গেলে ফড়িং উড়ে যায়। ভাদ্র মাস পড়তে না পড়তে শিউলি ফোটে। আমরা তো শীত পেরিয়ে বৈশাখমাস পড়বার আগে, নামজাদা সেই নিরক্ষীয় নিদাঘের আগের দেড়-দুমাসে এমনকি বসন্তকালও টের পেতাম। বিকেল হলে টুকরো টুকরো অজস্র জলের শরীরে থিরথিরে সেই সব বাসন্তী হাওয়ার কথা ভাবি। তেমন হাওয়া আর হবে না।

এই সব জলের শরীর, কতকাল ধরে মানুষ এদের টুকরো করে। মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখলে, পাথরে পাথর ঘষে ছুঁচলো করলে, লোহা গলাতে জানলে আগেভাগে গিয়ে জলকে কাটে। জল ছেঁড়ে। আমরা, মফ:স্বলের ঘেমো মানুষেরা সব দা-কোদাল-শাবল-খন্তা-নিড়ানি দিয়ে মাটি কেটে, জল কেটে বসত করলাম। মন বসত। আটচালা করলাম, চ্যাঁচার বেড়া দেওয়া ঘর, ঘ্যাসের, সুড়কির গাঁথনি দেওয়া একঘর-দুঘরের বাড়ি। পায়খানা দূরে। রাতে শিয়াল ডাকত। পরে তো সিমেন্ট এল। কারো কারো দোতলা হয়। পায়খানা-বাথরুম বাড়ির লাগোয়া হয়। নরেশবাবু মাস্টারমশায় বললেন- 'ঘেন্না লাগে রে! গাঁয়ের মানুষ বাবু।'
সাইকেল চড়ে আসতেন নরেশবাবু। ধুতি-ফতুয়া। সেকালে মানুষ সাইকেল চড়ত খুব। পুরুষ মানুষের কালো মুখে বসন্তের দাগ থাকত। মেয়েমানুষের কালো মুখে বসন্তের দাগ থাকত। তেমন বসন্ত আর হবে না।
এই সব কাটা-ছাঁটা জলের হাত-পা-জিভ-যোনি একত্তর করলে সোনাই নদী হয়। সোনাই নদী ইছামতীতে গিয়ে মেশে। আমাদের মফ:স্বলের সব জল, আমাদের জলের মাসের সব জল সোনাই নদী বয়ে নিয়ে যেত ইছামতীতে। তা হতে মোহনায়, বড় জলে। নদীটিকে কাটলাম। ইছামতীতেও পানা, শ্যাওলা-ঝাঁঝি। আমাদের মন-জল কে বইবে।
তাই নিদাঘে শুকনো দাঁড়িয়ে থাকি। সেই জলের হাওয়া নেই। বসন্তে কৃষ্ণ আর রাধাচূড়া-দুই গাছের দুরঙা ফুল, জারুলের বেগুনী ফুল,-আর পাতাদের কথাও বলতে হবে, সবুজ সবুজ পাতা সব-জলে উড়ে এসে পড়ত। এখনো পড়ে কি? আমি তো কিছু মনে রাখতে পারি না।
কথারা সব এলোমেলো হয়ে গেছে। অনেক কথা ছিল। ভালুকওয়ালার কথা, বাঁদরনাচের ডুগডুগির কথা, বেদে-বাজীকর-সাপুড়ের বাঁশীর কথা ,কৃষ্ণকথা। নিঝুম দুপুরে কাঁসারী-বাসনওলার কথা। রোজ ভোরবেলা শান্ত বোষ্টমের 'জয় জয় রাধে মধু-উ-সূদনো' কথা। কে কার আগে-পরে? আমার কিছু মনে থাকে না।
শুধু বসতি দেখি। মানুষ বাড়ি বানায়, তার ওপরে টালির ছাদ রাখে। অ্যাসবেস্টসের ছাদ রাখে। মা লক্ষ্মী এলে ঢালাই দেয়। লিন্টেন ঢালাই, ছাদ ঢালাই। বড়মা বলতেন লিন্টিন।
ছাদ হলে একটি নিমগাছকেও রেখো। নিমের হাওয়া ভালো। নিমের দাঁতন। আর ঐ ঝিরিঝিরি পাতাগুলি, ছিলকা ছিলকা সাদা ফুলগুলি। আমরা মফ:স্বলের মানুষজন, আমাদের জানালার পাশে নিমের ডালপালা থাকবেই। টিনের জানলা হোক কি কাঠের। কাক-চড়াই-শালিখ থাকবে, বসন্তে কিছু না হোক দুটি কোকিল। এর বেশী পাখপাখালী যোগাড় হল না।
আমরা স্বচ্ছল হতে থাকলে ঘুম ভালো হয়। গরমকালে জানলা খোলা থাকলে ঘুম ভালো হয়। নিমের হাওয়ায় স্বপ্ন আসে। স্বপ্নে সোনাই নদীর শ্যাওলা লেগে থাকে। আমাদের বসতভিটায় ইঁটের খাঁজে খাঁজে, ভাঙা কার্নিশে শ্যাওলা লেগে থাকে। আঁশটে গন্ধ লেগে থাকে। আমাদের নিত্যিকাজের বেড়ালেরা বেভুল হয়ে গন্ধের খোঁজে ঘুরে বেড়ায়। অশরীরী গন্ধের মানে বোঝো না, এ আবার কেমন বেড়াল?
জলের পথটি আটকে দিলেন সরকার। আমি তেমন সরকার চিনি না। লোকে বলে প্রোমোটার। পার্টি, বলে। হবে। কিন্তু কাজটি তেমন ভালো হল না। ঠাঠা পোড়া রোদে জলের হাওয়া নেই, আবার বর্ষাকালে জল সরে না। আমরা এক হাঁটু জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকি। এই সবই আমাদের দু:খের জল। আমাদের ঘোলাটে চোখ বেয়ে , আমাদের ঘোলা আকাশ বেয়ে নেমেছে ঘোলা জলের ধারা, এইসব গান্ধীকলোনী, লেনিননগরে। এখন আর সরছে না। জলের মধ্যে ফ্যাকসা কেঁচো গজাচ্ছে, তেচোকো মাছ, শামুকের ভাঙা খোল গজাচ্ছে। মাছমেয়েদের আঁশবাকল,সন্ধ্যের রেয়াজ, ব্লাউজে গুঁজে রাখা চিঠি গজাচ্ছে। অনেককাল আগের মরে- যাওয়া সোনাই নদীর শ্যাওলা গজাচ্ছে। বাচ্চারা হিসি করছে। জল আরো ঘোলাটে হচ্ছে।


এইসব দিনে আমাদের আধাগেঁয়ো মেয়েরা সব রয়াণী গান গায়। ভেজা কচুবন থেকে, সাদা কচুফুলের জলে-ধোয়া হলদে পুরুষলাঠি থেকে তখন হয়তো অস্থির গন্ধ বেরোচ্ছে। কলোনীর মাঠ কোণাকুণি পেরোতে গেলে শ্রাবণের মেঘেরা একলা পেয়ে গা ছুঁয়ে দেয়। দল দল মেঘ। মেঘেরা ইস্কুল থেকে ফেরে। অকারণ হাসাহাসি করে। শরীরের ভাব জাগে, অভিমান হয়। যখন ভেজা খড়ের গন্ধ উঠছে। খড়কাটা মেশিনের একঘেঁয়ে ক্যাঁচক্যাঁচ। দুপুরের মেয়েদের রয়াণী গান। বন্দিলাম বন্দিলাম আমি যন্ত্রে দিয়া ঘা/ স্বর্গ ছাড়ি ওলা ওগো জগৎগৌরী মা।
আমাদের জমি-জিরেতে আসলে বড় বড় গর্ত। গর্তে সাপ থাকে। কতপ্রকার সাপ-লাউডগা, হেলে , চিতি, শাঁখামুটি, পদ্মগোখরো। উড়িয়াল মহারাজ। উড়িয়াল মহারাজ এক গাছ থেকে আরেক গাছে উড়ে উড়ে যায়। চৌকাঠ বেয়ে উঠে পড়ল সাপ। মাটির দাওয়ায় সাপটি মাটির মালসায় দুধ-কলা খেল, সে হতে পারে বাস্তু সাপ। কিন্তু কালোকোলো ন্যাংটো কোলের ছেলেটা যে দাওয়ায় শুয়ে থাকে। ছেলের কোমরে তাবিজ দিলাম। রয়াণী গান দিলাম। আমাদের ছেলে-পিলেরা সব গর্তের বিপজ্জনক কাছে শুয়ে থাকে। এদিকে আমরা গর্ত চিনি না ভেজা -পোড়া মানুষরা , তামাটে রং, রুখা দাড়ি, গাল তোবড়ানো। সাপ চিনি না। শুধু সন্ধের শাঁখ বাজবার আগে-পরে, তুলসীপিদিমের আগে-পরে ব্যাঙ ধরার খর শব্দ হয়।
কথাগুলো সব এলিয়ে যায়। গঙ্গানদীর কথা বলব ভাবছিলাম যেন। সে কথা কি বলা হল? আমার ইদানীং বড় বিস্মরণ। নতুন সব কথা, শিশু-কথায় ভরে আছে বসতখানি। যেন এই গেরস্থালীর কেউ না, আমি পশ্চিমের বারান্দায় টিনের চেয়ারে বসে আছি-সে আজ কত বচ্ছর হল। পুরনো কথারা এতোল-বেতোল ঘুরে বেড়ায় পা-মুখ-মাথা বেয়ে। নানান বেশ ধরে আসে। কুমোরে পোকা যেন, মুখে একটুকরো শান্ত মাটি লেগে আছে। ঘরের সাধ লেগে আছে। কখনো আবার আমের মুকুলের হাওয়া হয়ে এল। আর মৌমাছি। কানা বেড়ালটা। ছদ্মবেশ ধরে আসে। দুখিরাম রুইয়ের ছদ্মবেশ। নইলে ঢুকতে দেবে না।

শেষের কথাটি ঠিক হল না। কে কাকে আটকায় এ ভুবনহাটে? মানুষটি আসলে বাতিকগ্রস্ত। স্মৃতিতে গোলমাল। সকালের কথা বিকেলে মনে রাখতে পারে না। অথচ বিশ বচ্ছর আগেকার কথা ঠোঁটস্থ। কিঞ্চিৎ যেন বা জবুথবুও। কাছের লোকজনের মুখ সর্বদা মনে থাকে না। মাঝরাত্তিরে ঘুম ভেঙে উঠে ঘরের দেয়াল, জানলাকপাট হাতড়ে বেড়ায়। মাঝরাত্তিরে হঠাৎ অচেনা লাগছে এক জীবনের ঘর-গেরস্থালী। অ্যালঝাইমার্স- বললেন স্নায়ুবিদ। আমার কপাল। গল্পের মধ্যে এমন আউলাঝাউলা মানুষ উড়ে এসে জুড়ে বসল।

বড় নদীটি গঙ্গা। কবেকার জল। ইঁটের বাড়িগুলি কিছু না হোক শ-দেড়শো বছরের পুরনো। ঘাটে ঘাটে ঘুরে বেড়াই। ফেরিঘাট, বারো মন্দির ঘাট, শ্যামের মন্দিরের ঘাট। নিত্যানন্দের মন্দির। নিত্যানন্দ প্রভু মাথা নুয়ে জমিদারের কাছে দুটিখানেক জমি ভিক্ষা চাইলেন। মন্দির বসবে শ্যামরায়ের। মূর্তি ভেসে এসেছে নদী বেয়ে, কালো কষ্টিপাথরের মূর্তি। জমিদার মস্করাচ্ছলে , কিছু বা অবজ্ঞাও ছিল, জ্বলন্ত খড়ের আঁটি ছুঁড়ে দিলেন গঙ্গায়। বললেন- ঐ আঁটিটি যেখানে পড়ল, সেখানে যদি চর জাগে, তবে তা শ্যামের হোক। নিত্যানন্দ বিনয়ী হেসে বললেন- তাই হোক।
হলও। এ সেই অলৌকিক চর। সেই থেকে আমাদের সহজিয়া ভাব। গরমের দিনগুলি তপ্ত, রোদে ঝামা। বিকেলবেলা রোদ মরে এলে আবার হাওয়া বইবে সহজিয়া। ছেলেরা ঘুরবে সাইকেল চরে।
আমি আর অনঙ্গ এই সব ঘাটে ঘাটে ঘুরে বেড়াই। জল ছুঁয়ে থাকতে হয়। নদীটিকে টুকরো করে দিলাম। সে ছিল স্বপ্নের নদী সোনাই। এখন এই বড় গাঙে জল ছুঁতে আসা। ঘোলা জল মুঠো করলে গলে যায়। কারখানার কালো গাদ এসে মিশেছে, আর দস্তা , সীসে ও ফ্লাই অ্যাশ। মানুষ ও মহিষ মাঝনদী পেরিয়ে যায় অনায়াসে। শুশুকরা কয়েক বছর আগেও তো ছিল।

আমিও একজন অনঙ্গকে চিনতাম। সে অবশ্য এই বুড়োর বন্ধু না-ও হতে পারে, না হওয়াই স্বাভাবিক। সেই অনঙ্গ খুব শুদ্ধস্বভাব ছিল। প্রথম যৌবনে একটি মেয়েকে ভালবেসে মুখচোরা অনঙ্গ কিছুই বলে উঠতে পারে নি, কিন্তু তার দাগ বয়ে বেড়ায় গোটা জীবন। এ সেই দেশের জিনিষ যেখানে শরীর নেই, ছায়া ছায়া আত্মারা একজীবন বালি খুঁড়ে খুঁড়ে এক-আধ আঁজলা বরফজল ছেঁচে তুললেও তুলতে পারে। কিন্তু সে দেশ অনঙ্গ কোথায় পাবে। তার চারদিকে দেহ, শুধু দেহ যেন গরম তাওয়ায় কালীপূজার রাত্তিরের শ্যামাপোকার মত ঝাঁপিয়ে পড়ছে। শেষ গোলমালটা হল যেদিন পি. জি হাসপাতাল থেকে পিসিমাকে দেখে ফেরার পথে নটা-দশটা রাতে বাস-টাস কিচ্ছু না পেয়ে এক্সাইডের কাছটায় ভ্যাবলা দাঁড়িয়েছিল। ঝুপসিমত অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে একটি ট্যাক্সি এসে দাঁড়ায় এবং একটি ছিবড়ে বেশ্যা অনঙ্গকে লাইনের লোক ভেবে হাত ধরে টানাটানি জোড়ে, সে রাতে সে তখনো কোনো খরিদ্দার জুটিয়ে উঠতে পারেনি-এমনটা হবে। কিছু পুলিশি হুজ্জোত পেছন-পেছন এলে সীসের গুলির মত দেহবাদী শব্দগুলি অনঙ্গকে মাটিতে দেবে ফেলে, যেসব ছন্ন শব্দমালা সে তার বাকি পাগলজীবনে বহুবার উচ্চারণ করবে।
তারপর থেকে অনঙ্গ একটি সময়গর্তে পড়ে যায়, যার অমসৃণ গোলালো মুখের আশপাশ দিয়ে তীব্রবেগে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত -এই তিন কাল বেঁকেচুরে বয়ে যেতে থাকলেও গর্তের মধ্যের অন্ধকারে একটিবারের জন্যেও উঁকি পর্যন্ত মারে না। অনঙ্গকে দেখতে তাদের বয়ে গেছে। নিজসুখী সেই সময়গর্ত, তাকে সাবানবুদ্বুদ বললেই বা কি ক্ষতি হবে, অনঙ্গকে নিজের জঠরে নিয়ে দিব্য থাকে। গুটিসুটি অনঙ্গও, যেন শিশুভ্রুণ, তখনো চোখ ফোটেনি, ফিটাল পজিশনে শুয়ে থাকে । অন্তত: সেরকমটাই চেয়েছিল। কিন্তু সেই রামধনুবিলাসী স্বয়ংসিদ্ধ ক্ষুদে বুদ্বুদশহরেও শরীরঝড় তাকে তাড়া করে এসে ঢোকে।এই শহরের উপর দিয়ে ঘন্টায় আশি থেকে একশ মাইল বেগে বয়ে যাবে ঝড়, সার সার রাস্তাঘাট আলোটালো নিভিয়ে তৈরী -এমনটা হলে পরে ভ্রুণটি অসময়ে কাঁদে। দরবেশ -পতঙ্গ যেন, কুসুমে মনপ্রত্যাশী।

শ্যামের মন্দির থেকে বেশীদূরে না ছাতুবাবুদের বাগানবাড়ি। বাবু দ্বারকানাথের ছোট নাতিটি মনমৌজি কাটিয়ে গেল কয়েকমাস।এখন অনাথ মেয়েদের বসতভিটা হয়েছে। কড়িবরগা,থাম-খিলান ধসে পড়ছে। রাতে মুখে রুমালচাপা দিয়ে কালো রংয়ের প্রাণীরা ঢোকে। এরা কেউ চাঁদের বাঁধভাঙা হাসি না।
বারো মন্দির ঘাটে দুদিকে ছটি ছটি করে মন্দির। শিবের। মাঝখানে ঘাটখানি। খাড়া সিঁড়ি নেমে গেছে জলে। ঘাটের পাশের কাদায় কলমীর ঝাড়, কচুবন, প্রতিমার খড় ও বাঁশের কাঠামো, ভাঙা কলকে, ধুনুচি। জল এসে চলকে লাগে ভাঙা ইঁটে। কতকালের সব ইঁট।
এইখানে দ্বিজ ঈশানের সঙ্গে দেখা হল। মানুষটি বৃদ্ধ। কালো। একটি উড়নি গায়ে দিয়ে নীচের সিঁড়িতে বসে বিড়ি খাচ্ছিল। হাওয়া এসে ওর উড়নি ও পাতলা সাদা দাড়ি লন্ডভন্ড করে। ফলে মানুষটিকে ফেরেস্তার মত দেখায়।
সেসময় অন্য অন্য বুড়োমানুষেরা যে যার নিজের নিজের বাণমারা-ঘটিচালানিতে মজে আছে। নিরুত্তাপ লাঠিগুলি পাশে শোয়ানো। এই নদী পেরোলে কোন্নগরের ঘাট, সেখান থেকে ভটভটি ছাড়ল। সূর্য ডুবে এলে মিটমিট করে হলদে আলো জ্বলে ওঠে কারখানা, ইঁট-ভাটায়, আশেপাশের প্রসন্ন/ক্লিষ্ট ঘর-গেরস্থালীতে। কিছু গাড়িঘোড়াও চলে। স্নান সেরে বুড়ীমানুষ ভিজে থানে উঠে গেলে সিঁড়ির ধাপে ধাপে লম্বা একটি জলের ধারা টানা হয়ে যায়। হাওয়ার কারণে কিছু বাঁকা।
এইসময় অনঙ্গর বিড়ির তেষ্টা পায়। আমরা আগুন চাইতে গেলে বৃদ্ধ হাসে। হাত দিয়ে দেশলাই বাক্স ও কাঠি আড়াল করে তিনবারের চেষ্টায় অনঙ্গ বিড়ি ধরায়। ছেনাল হাওয়াটি হেরো হল বলে দেশলাইয়ের খোল, খবরের কাগজের ফালি, বটপাতা উড়িয়ে নিয়ে গঙ্গায় ফেলে। বটপাতাটি কিঞ্চিৎ মোড়া, ওতে পিঁপড়ের বাসা ছিল, সাদা সুতলির ছুতোনাতায় জড়ানো দু:খ ও সাধ।
"" জল দেইখ্যা হাওড়ডির কথা মোনে আইল''-দ্বিজ ঈশান বলে। "" হাওড়ডি এমুন ঘোলা আছিল না। আমরা কইত্যাম তলার হাওড়।''
"" নিবাস মৈমনসিঙ্গ''-দ্বিজ ঈশান বলে। ""নীচজাতি গো বাপ। শুদ্র-চাঁড়ালের ব্রাহ্মণ। যৌবনে বড়ই কষ্ট পাইলাম। প্রেমজনিত। তা বাদে ল্যাখলাম মহুয়ার পালা।''
মহুয়াকে হুমরা বেদে চুরি করে পায়। ছয়মাসের শিশুকন্যা, সে ছিল বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের নাড়ি-ছেঁড়া ধন। বাইদ্যা হুমরা বনবাসী। গারো পাহাড়, তার উত্তরে হিম পর্বত। তারো ঐপারে আন্ধার বন। তথায় বসত করে বেদের দল। বাইদ্যাগণ তামাসা করে, ডাকাইতি করে, বাঁশবাজি করে। কর্তাল ঠুনুঠুনু বাজলে বেদের কন্যা ঢোলে চাঁটিম তালি দিবেন। এইরূপে মহুয়া বাড়ে। লাজরক্ত যৈবন হয়, কনকচম্পা ফুল যেইরূপ। তুমি কনকচাঁপা ফুল চেনো, অনঙ্গ?
মন্দিরের লাগোয়া একটেরে জংলাবাগান। বেল ও আকন্দ, ভাটফুল-বনকুলের আবাদ হয়েছে, একদা আদর ছিল। শ্মশানে-মশানে ঘোরো , আর কি আবাহন বা হবে ভোলানাথ? দেয়াল -ছাদ ফাটিয়ে মাথা উঁচিয়েছে বটের চারা,এখন ইতিউতি ঝুড়ি নামিয়ে বৃক্ষ একপ্রকার। জলেশ্বর শিবের মাথায় ছাদের ফাটল বেয়ে ঝরঝর বর্ষার বারিধারা ঝরে। এমন ঘরে, মা, উমায় দিলা।
মহুয়াকইন্যার পিরীতে জরোজরো নদের চান ঠাকুর। নদীর ঘাটে লুকিয়ে অসম দেখা হল, হা কি যে লীলা ! "" কইন্যা আইছিল বাইদ্যাগো দলে মিশিয়া তামশা দেহাইতে নইদ্যা ঠাহুরের ধামে।''
এই প্রেমে পাহাড়িয়া তক্ষকের বিষ থাকে। "পালাও, পালাও চাঁদ , চাঁদ ও চাঁদ-জিপসিরা এসে পড়লে ঐ তোমার বুক চিরে তারা মালা গাঁথবে, ঐ তোমার বুক চিরে তারা আংটি বানাবে।' বিষপাথরের ছুরি বিষলক্ষের, তাতে মাখনের মত চাঁদ লেগে আছে। আঙুরলতার মধ্য দিয়ে কারা আসে আর, গাঁটরিবোঁচকা কাঁধে নিয়ে জিপসি-রোমানিরা ছাড়া? বাঁশ-তাঁবু -দড়ি-কাছি আর তোতা-ময়না, সোনামুখী দোয়েল নিয়ে আসে। শিকারি কুকুরাদি আসে। রাও চন্ডালের হাড়খানি।
শয়ে শয়ে বছর ধরে এইভাবে চলি আমরা। আমি, অনঙ্গ, হুমরা, দ্বিজ ঈশান, নদের চান ঠাকুর। মানকিয়া। রক্ত ঝেড়ে ফেলে মহুয়া কইন্যা। আমরা সব জিপসি-রোমানি, ডোম, বেদে, মানুশ, কালদেরাশ। সে কবে ভারতদেশের পশ্চিমদিক থেকে বেরিয়ে পড়লাম দলে দলে, আর ফেরা হল না। এশিয়ার দেশে দেশে গেলাম। ইউরোপে-ইউরোপে। কুকুর-ছাগলের খেলা দেখাই, ভানমতী খেলা, যাদু-গোলকের খেলা। চাষবাস ভুলে গেছি। তবে ছুরি-কাঁচি-লাঙল বানাই, কামারশালার কাজ জানি। দড়ির ওপরে হাঁটতে জানি। কোথায় বা ঘর ছিল। বিস্মরণ হয়ে গেল। শিবের ত্রিশূলখানি মনে আছে, যীশুর ক্রুশকাঠটিকে ত্রুশূল বলে ডাকি। যে যার নিজের ত্রিশূল, নিজের ক্রুশকাঠ বয়ে নিয়ে যাচ্ছি। এমন ঘরে, মা, উমায় দিলা। ঘর বা কোথা !
আমরা কেউই এইসব যাতায়ত, পথের বেদনা মনে রাখিনি। হুমরার হাতে নদেরচাঁদ খুন হল। মহুয়া বুকে ছুরি দিল। নাজিরা আটলাখ জিপসি মেরে ফেলে। ইউরোপের দেশে দেশে জিপসি মারে গেরস্থ মানুষ। চোর জিপসি, ভবঘুরে জিপসি। ঝুঁটি কেটে, দাড়ি ছিঁড়ে বাউল-মারফতি ফকির তাড়ায় গাঁ থেকে গাঁয়ে। আমরা কেউই এইসব মরে যাওয়া, ছিঁড়ে যাওয়া মনে রাখি নি। এখন জল থেকে উঠে এসে, বিকেলের গা-ধোয়া সেরে গরমকালের ঘাটে এসে বসেছি। আমি ও অনঙ্গ, হুমরা কিংবা দ্বিজ ঈশান অথবা নদের চাঁদ। আমরা সব আউলচাঁদী, বলাহাঁড়ি, সাহেবধনী, খুশিবিশ্বাসী। বাপহারা মহুয়াকন্যা। মহুয়ার না-জন্মানো মেয়ে। ছেলেবেলার গল্প করছি। আমাদের কালো রং, বুড়ো চামড়া, গায়ে উড়নি। সাদা দাড়ি ফেরেস্তার মত ওড়ে।
মনে আছে-দ্বিজ ঈশান বলে-সেই যে সেবার বড়ঝিলে সাদা কুমীর এল !
-আর ভোরবেলায় হেঁটে ফিরবার সময় নালার মধ্যে কচ্ছপ দেখতে পেলাম !
- কাছিমের ডিমে কেমন টক টক স্বাদ।
-সেবার চোর ধরা পড়ল। সারা পাড়া ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মারল। কি মার, কি মার ! মারতে মারতে মেরেই ফেলল।
-আর কি সাপ ছিল আমাদের ছোটবেলায় ! উড়িয়াল মহারাজ উড়ে উড়ে এসে পড়ত। দাওয়ায় সাপ উঠে আসত।
-রয়াণী গান শুনতে যেতাম।
-রেলগেটের ধারে হ্যারিকেন ফ্যাক্টরি, আইসক্রিমের কারখানা ছিল। নারকোল দেয়া আইসক্রিম বানাত।
-কত ছোট ছোট কারখানা। সাইকেল সারাইয়ের দোকান। চটকল।
-বন্ধ হয়ে গেল।
-ছোট্ট একটা মফ:স্বল ছিল।
-কোথায় চলে যায় লোকজন।
- একদিন ভোরবেলা তাঁবু-গাঁটরি বেঁধে, মাথা -গরম কুকুরটাকে হাঁটাতে হাঁটাতে বাচ্চাকাচ্চাসমেত কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গেল।
-মফ:স্বলটা।
-হ্যা, আর মানুষগুলি। ঝাঁকড়া চুল ছিল, তামাটে রং। হাতে তাগা বাঁধা ছিল। গেঞ্জি বেচত, বিষহরি তেল বেচত। টায়ারের ফুটো সারাত।
-শজারুরা চলে গেল। কলাবাগান চলে গেল।
-নিমের হাওয়া।
-সোনাই নদী।
আর কিছু মনে নেই। বিস্মরণ। স্নায়ুতন্ত্রীতে-তন্ত্রীতে জটিল, অবোধ্য পাক। নিউরোফিব্রিলারি ট্যাঙ্গল। এখনকালের কথা কিছুই মনে থাকে না। কার সঙ্গে কবে কার কি কথা হল। উঁচু উঁচু বাড়ি উঠছে, শহর বাড়ছে। মনে নেই।

শুধু ঘুমের মধ্যে নিমগাছের ছিলকা ছিলকা ফুল। একটা নদী। হারিয়ে যাওয়া দেশ।


------------------------------------
[এই গদ্যে ব্যবহৃত তিনটি পদ্যাংশ যথাক্রমে দ্বিজ ঈশান বিরচিত ""মহুয়া'' গীতিকা, বিজয়গুপ্তের ""মনসামঙ্গল কাব্য'' ও ফেদেরিকো গার্থিয়া লোরকার ""চাঁদ আর চাঁদের গাথা'' কবিতা (অনু : অমিতাভ দাশগুপ্ত ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়) থেকে উদ্ধৃত।]