আপনার মতামত         


মন খারাপ- মন ভালো
কৃষ্ণকলি রায়



মন খারাপের সাথে মন ভালোর কোনদিন আলাপ হয়নি । নাকি হয়েছিলো? কে জানে, আমাকে বলে টলে নি কেউই। এসব আলাপ হয়েছিলো - হয়নি - হতে পারতো ব্যপার গুলো বড্ডই গোলমেলে। কি দরকার?
কাউকে বলেনি, তবে ওর নিজেরও মনে আছে নাকি? মন খারাপের? পুরোনো গোরস্থানের চত্বরে ওর অনেক ভুলে যাওয়া কথা জমানো আছে। এ ফাটলে, ও ফাটলে, আলি বুড়োর চোখে না দেখা-খেতে না পাওয়া কবরের ওপরে শীত লাগা মাঘী সন্ধ্যে রঙের ধুলোতে, ও-ই যে পূব কোণে কামিনী গছের ঝাড়টায় , সব গুছিয়ে গাছিয়ে পরতের পর পরত জমিয়ে, মুখ বন্ধ দিনের সরায় তোলা আছে। তবে তার মধ্যে মন ভালোর তত্ত্ব তালাশ....... আ:, কে আবার সব সরিয়ে খুঁজতে বসে এখন? সরাতে গেলে পুরোনো কথা গুলো মিহিন ঝুরঝুর হয়ে যাবে কিনা তাই বা কে জানে?
তবে সম্ভাবনা কমই। সরা গুলোর ঢাকনার ওপরে কত যত্ন করে আল্পনা-কল্পনা আঁকিবুঁকি করেছিলো দাদী। ঐ হাতের টান কবকে ঝাপসা, অনেক মাটি দাদীর চোখের ওপরে, অনেক মাটি ওর শুকনো শিকড়ের মত আঙুলের তলায়। মন ভালো, বাতুল ছোঁড়াটা একবারও ভাবলে তো পারতো এসব?অবশ্য যদি ওর হাল হদিশ থাকতো এখানে। নেই; না? নিশ্চয়ই নেই। নইলে হয়তো এই বর্ষায় কামিনী গুলোর চোখের জলের গন্ধটা একটু কম তীব্র লাগতো । চারাটা লাগিয়ে দিয়েই মরে গেছিলো মহুল হতভাগা। একবার ভাবলিও না যে ঐ লাজুক মেয়েটার এর পর কি হবে? কি রকম বে-আক্কেলে ছোকরা তাই ভাবো?
কেমন যেন একটা শিরশিরে হাওয়া দেয়। পাকা মহুয়ার গন্ধ, পোড়া দিনের , স্যাঁৎসেঁতে রাতের । আধো ঘুমে বাচ্চা ব্যথারা, না ঘুমে বুড়ো বেতো ব্যথারা গা মোড়ামুড়ি দেয়। পুরো ঘুম ফুলবাবুকে ওরা কেউ দেখেনি। কোথায় থাকে লোকটা? ঝিঁঝি পোকারা যখন ধামসা বাজায়, কিম্বা সুখ খোঁটা পায়রা গুলো গোল গোল নিটোল দুপুরের ফোঁটা ফেলে ফেলে সব পেয়ে নেওয়ার হিসেব লিখে টিখে রেখে দেয়, তখন অনেক বার ঘটি ডুবিয়ে দেখেছে মন খারাপ ,অনে-এ- কবার........ডোবেনা, ডোবে না। ঝিমকিনির কলসীটে সিকি খানাও ভর্তি হলো না আজ অব্দি । পুরো ঘুম? ফু:। লোকটা উপকথা হবেও বা। ভাঙা মন্দিরে একলা রাত্তির থাকে, ওর পুঁটলি তে এক কুচি হাতড়ানোর পাশ নেই যে একটু সেঁকেসুঁকে খাবে, কোন কান্ধাও নেই যে নোনতা জল শুকনো দিনের জন্য একটু তুলে রাখে। তা ভুখা-পেয়াসা জিভে 'লোকটা উপকথা হবেও বা', ও ও বলে।
বোলতলার ঝিলে অ-নে-ক জল। টুপ করে তাতে একটা নুড়ি ফেলে দিয়ে দেখেছে মন খারাপ। ঠিক থির মনে ব্যথার মত চাপান-উতোর চাপান-উতোর খেলে চলে যায়। চাপান-উতোর খেলার দিন হারায়না কখনো, এতো আর এক্ক দোক্কা নয় যে বেলা চলে যাবে? এক্কা দোক্কারা ভীষণ পাজি, বড্ড হারিয়ে যায়। আম ছাড়ানোর ঝিনুকের ছুরি, মা থাকা দিন, গোপনের খোলস ছাড়া ঠান্ডা গায়ে আচমকা পা পড়ে যাবার দম বন্ধ করা শিরশির, কয়েকজন এক্কা , কতক গুলো দোক্কা স-ব ঐ দিনবেলার আগুনে গোলাটার সাথে বোলতলার ঝিলে ডুব দিয়ে মরেছে। এখন আর জানার উপায় নেই যে ঐ সব এক্কাদের কোনদিন কোন দোক্কার সাথে আলাপ হয়েছিলো কিনা। হুম, এসব আলাপ হয়েছিলো -হয়নি-হতে পারতো বড়ই গন্ডোগোলের ব্যপার।
ওর সাথে আমার আলাপ হয়েছিলো? ..... হয়েছিলো নাকি? কে বললো বল তো? আমি তো তোকে এসব বলি টলি নি। আরে না:, ঐ পুরিয়াটের মধ্যে খুঁজে আর লাভ নেই রে। স্মৃতির ধোঁয়া ...... চমৎকার নেশা হয়। কি করে আবার? যত সব পুরোনো মনে রাখা, মানে যাবতীয় আর কি, মানে, যেখানে যত আছে সব কিন্তু, বেশ ডলে নিয়ে কল্কেতে চালান। তখন অহম মহম্মদ। সেই পাহাড়গুলো। শুনেছিস? হুইস্কী ঝোরা, সমুদ্দুর রঙ পাখিটার উড়ালফিরাল? এটা স্বর্গের আগের স্টেশনে, ঠিক গুস্তাভো সান্তাওলাল্লার ডানায় ধুকপুকি পিষে যাবার মত।
বাদ দে, আর মনে করতে পারিনা, আলাপ হয়েছিলো কি না। তার চে বরং, বসন্তের ডানাটা দেখেছিস? কোথায় কি? এই তো, ধুলোর মধ্যে মিশে মিশে আছে। কে যেন সেদিন বললো জানিস, সাদা আলোর মধ্যে নাকি সব রঙদের থাকতে দিয়েছে। ঠিক নয়, বুঝলি? আসলে ধুলো রঙে। একটুক্ষণ তাকিয়ে থাক, ঐ দেখ, দেখতে পাচ্ছিস ? আবীর ধুলো, বছর ভরই ......প্রহর শেষের আলোর মত রে ।
হ্যাঁ, দেখা যায় বৈকি? সেই মেয়েটার চোখের এক্কেবারে মধ্যিখানে দেখেছিলাম। চিনিস। সবাইই চেনে, ওর নাম দু:খ। উ:,ভুলবো না রে। সমুদ্র যেখানটায় সব চেয়ে গভীর, তার ওপরে মেঘ মেঘ মেঘ ব্যথায় চুপচুপ। আমার জিভে ঐ সবটুকু নুন ভারী মিষ্টি লেগেছিলো। খুউব মিষ্টি, বড্ড নোনা সব অভিমান হয়তো । কোনদিন ভীষন দু:খের ভেতরের সব থেকে ভেতরকুঠিটায় ঢুকেছিস আমূল ? ভালোলাগায় মানুষ একদম মরে যায়না কেন বল তো?
বুনো হাঁসরা উড়ে যাচ্ছে, সবাই ওম খোঁজে কোথাও না কোথাও। পাতাগুলো যেমন আনকোরা রং শেষ করে ফুরিয়ে ফেলে কেউ হোলি, কেউ উত্তাপ ছিটের জামা পরেছিলো, তবু মাটির বুকে গিয়ে শোয়। ওরা সেই সময় একটা গন্ধ পায়, জানে মন খারাপ। কমলা রঙের গন্ধ , কিম্বা বাদামী, আগুনের, কিম্বা ওমশ বুকের। জানলো কি করে? গন্ধর কাছে কিছু রাখতে দেয় নি তো ও কোনদিন। ঢেউ একটা মনের মধ্যে, ওঠে ওঠে ওঠে, পড়ে। গন্ধ কি একটা বলতে চায়। ভাষা নেই,ভাষা নেই। কি একটা বলতে চায়। কোনো ছবি? কে? কে? আগুন গন্ধ, কিম্বা ওমশ বুক। মন ভালো? ওই কি? মনখারাপ কোনদিন পাতা হয়ে গেছিলো, ছবি। মাটি মাটি মনভালো,ছবি। গন্ধ কিছু মনে পড়াতে চায়?
অনেক খানি মাঠ একলা শুয়ে থাকে আজকাল এই খানটায়। ফসল সব ঘরে চলে গেছে, কিম্বা হয়তো ছিলোনা এ বছর। মন খারাপ শুনতে পাচ্ছিলো ফেলে দেওয়া কাকতাড়ুয়াটাকে । নিজের জন্যই গান গায় ও, কেউ কোনদিন না শুনতে চাইলেও সেসব গানই। বালালাইকার সুর, স্বরলিপি লেখা আছে, হয়তো অ এর পরে ব, তারপর হে,তারপর একটা লা না বসালে কেটে যেতেও পারে , কিন্তু সুরই। কোথায় যেন চারটে কুঠরী আছে, দিনরাত নড়ে চড়ে, সেখানে শোনা যায়, চারপাশ ঝেঁপে ততক্ষণে সাতটা তারা অনেক অন্ধকার নামিয়ে দিলেও।

আকাশ জুড়ে ডালপালারা ক্রমশ কেউ মাতিস, কেউ এশার। পাতাছুটির এক দুই ডাবল জিরো নম্বর তুলি। তবু কি প্রচন্ড পলিক্রোমিক। ঘুমবেলাকার অবচেতনদের মত, অবিকল। চোখের পাতার নীচে অনেক ক্ষণ ধরে শুয়েবসে থাকে, ফুটোফাটা দিয়ে চুঁইয়ে নেমেও যায় কখনো সখনো,অনেক ভেতরে। চেনা গন্ধটা আবার পায় মনখারাপ। গন্ধ লুকোচুরি খেলে, রে-এ-এ-ডি। কোথায়? কোথায়? গন্ধ শিকড়ের শিকড়ে, পাতার পাতায়, কুঁড়ির কুঁড়িতে। পথ ভুল হয়ে যায়, দুর মনে কোন টুপকথা ডাকছে ওকে।
উঁহু, কাউকে ডাকিনি। কোন কোন গেলাস একলাপনেই গলা ভেজাতে পারে রে। হয়তো,কিম্বা একমাত্র। সেদিন আমি রাত খাচ্ছিলাম, এইখানে মাটির ভাঁড়ে ,চাঁদের কুচি দিয়ে। একলা একলা। কিম্বা একলা কোথায়? আমি জানিনা। ছুঁয়ন ছিলো কোনো। আমার ভিজে ঠোঁটে। খুউব ফিসফিসে। নরম। নীল হয়ে যায় রে পুরোটা চাঁদ। ঠান্ডা রূপোলীতে ভীষণ ব্যথা , গাঢ়, ফোঁটায় ফোঁটায় চারিয়ে গেলে। একলা একলা, আর কারুক্কে চাইনা। সেই কি? মনখারাপ? কামিনী ফুল স্বাদ নাভি । শিখরী দশনা, নোন্তা ব্যথা আমার নীচের ঠোঁট। ওই কি?
ল্যাভেন্ডার ফুটছে দেখেছিস? গন্ধ, আ:, রাত নেভার মত? সে-ই যে কতক গুলো দিন মুঠো আল্গা হয়ে কোথায় যেন পড়ে গেছিলো, এই গন্ধ নয়? এখানটায় রোদ্দুরের পিচারটা চলকে পড়েছে দেখ। তাই এর'ম বিকেলকে মন খারাপ করা হতে নেই,না ? ওগুলো? সোয়ালো পাখী হবে বা। ওরা অঙ্গুলিনাদের সুখী বারান্দায় রেখে ফিরে আসে,বরাবর, একা একা। ধুৎ, হ্যাপিলি এভার আফটারে লিখতে নেই। আরো কত এভার আফটার। ভাঙা ডানার চাওয়া , রঙ ধোয়া ঝাপসা ওম, রাঙা ভাঙা শেষ রাত্তির ...... লিখতে নেই।
এখন বরং বৃষ্টি আসুক। সব এলোমেলো, এলোমেলো। এরকম লন্ডভন্ড দিনে মালবিকাদের রাস্তা চাওয়া ফুরিয়ে যায়। উথালপাথাল ঝাপটা , কেয়া ফুল তীব্র গন্ধে সাপ ডাকে। কাঁটা, বিষ কাঁটা ঠান্ডা রক্তের সারা শরীরময় ছেঁড়াখোঁড়া। সব পায়ে দলা ঘাস চুপচুপ। বৃষ্টি, জিভে সোঁদা স্বাদ। কামিনী ফুল, আ:। ভীষণ নোন্তা ব্যথা আমার নীচের ঠোঁট। বাকি সব সব সব, ধুয়ে ,মুছে একেবারে শেষ হয়ে যাক।
.....আচ্ছা, সত্যি সত্যি কি আলাপ হয়েছিলো শেষ অব্দি? মনভালোর সাথে মনখারাপের? হয়নি। হয়েছিলো কিম্বা। অথবা হতে পারতো। কেউ স্পষ্ট করে বলে নি। .......থাক, কি দরকার?