আপনার মতামত         


এটি লম্বা গল্প না উপন্যাস, এখনও জানা যায়নি। আপাতত: লম্বা গল্প হয়েই বাঁচুক, মাঝরাস্তায় যদিও বদলে যেতে পারে ফুটপাথ। -- সম্পাদক


দিন আনি দিন খাই
সুমেরু মুখোপাধ্যায়





          (১)

      ই রাস্তায় কিছুদিন না যাওয়াই ভাল। রাত যত বাড়ছে কুকুরেরা তত প্রবল হয়ে পড়ছে। ইতস্তত ভাবে ইঁটগুলোও ছড়িয়ে থাকবে। ঠোক্কর খেতে খেতে আমিও লাট খাওয়া ঘুড়ির মত এদিক-সেদিক। ঘুম অনেক স্মুথ আসে। নলেন গুড়ের মত। তারপর যা হয়, ইচ্ছেকে আটকাতে নেই। দুধে আম দাও, ব্যস সব ছানাকাটা। সূর্য ভীষণ স্টেডি উঠছে, তো উঠছে। মুখের চারপাশে ক্ষুর-ব্লেড টের পাই। এই ভাবে খতরা হয়ে যে দিনগুলো আসে তারা কখনই খুব সুবিধের হয় না। হ্যাং হয়ে থাকা, ভয়ানক। গিলতে গিলতে সুইটড্রিম, কাফি মোলায়েম। পেঁচা পেঁচা এসেন্সটা কিছুতেই পিছু ছাড়ে না। সে আরেক কেলো। মাথায় জল ঢালো। অ্যা¾থ্রপলজিক্যল সার্ভের জার্নালে নিশচয়ই ছাপা হয়, সুস্মিতা সেনদের কথা। এক্সচেঞ্জ অফারে আমার ঘরে বৌটি আর বৌ থাকে না। সারাদিনে তার কাজ মোড়ের কল থেকে কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে জল এনে ঘটি বাটি মগ কলসি হাঁড়ি ডেকচি জামবাটি সব কিছু ভরে রাখা। ভোর বেলায় যেই বাড়ি ঢুকলুম , অমনি ঢালা শুরু হল। কি দিলি মা? কেবল জল? কিস্যু বলা যাবে না তাকে,সে তখন আর আমার বৌ নয়, ফুলটুস পরী। ইয়া ইয়া ডানা। সে নরম পালকে করে আমার গা হাত পা নাক মুখ লোম উরু বুক সব মুছিয়ে দেয়। উঠোন থেকে বেডরুম ড্রইংরুম ব্যালকনী কিচেন স্টাডি কম্বো রুমটায় যেতে যেতে সুস্মিতা সেনকে মনে হয় এয়ারহোষ্টেস, কী সেবা মাইরি। পরী যদি এই হয় তবে মাদার টেরেজা কি মাল ছিল? মালটা বড্ড তাড়াতাড়ি মরে গেল না? গীতায় সেই জন্যি তো লেখা আছে, ভাল মানুষেরা বেশী দিন বাঁচে না। সুস্মিতা পরীটার জন্য হেব্বী দু:খ হয়, আমার দু'চোখ দিয়ে জল গড়াতে থাকে। বৌটা যদি মরে যায়। কি হবে কে জানে? এক ঝলক করে আমার অনিল কাপুর শাহরুখ খান অক্ষয় কুমার সলমন খান অজয় দেবগন আমির খানের মুখ ভেসে ওঠে। সুস্মিতার মারা যাওয়া আমি কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারব না। পরী তোকে ভাল হতে হবে না, আমি তার পা ধরে রিকোয়েস্ট করতে যাই। সে সরে সরে যায়। এই ভাবে আমরা গড়াগড়ি খেতে খেতে খাটের তলায় ঢুকে যাই।


      খাটের তলাটা হেব্বী জায়গা, আমি সব দু:খ কষ্ট ভুলে যাই। আমার কালিদাসের কথা মনে পড়ে, আঁধার আমার ভাল লাগে, তারা দিয়া সাজাইয়ো না আমার আকাশ। আমি দেখতে পাই কালিদাস পেরেক দিয়ে ইউক্যালিপটাস গাছের গায়ে লিখছেন। হেব্বী জ্ঞান। মাথায় ঝকঝক করছে টাক। পুরো বিদ্যাসাগর। চারপাশে মাইলষ্টোন পোতা। কাতারে কাতারে বিধবা মেয়েছেলেরা তার উপর বসে। পার হেড একটা। শিব লিঙ্গের মাথায় একটা করে টগর ফুল। সব যেন জয়া ভাদুড়ি। মিনমিন করছে মাউথ অর্গ্যানের আওয়াজ। বুকের পাটা থাকে তো এগিয়ে আয়। তা না মাছির মত মিনমিনাচ্ছে। স্কুল খুল্লেন বিদ্যাসাগর। জয়া ভাদুড়ি কালো কাপড়ে সেলাই ফোটাচ্ছে, সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে। সব কটা সংসার-পোড়া বিধবা। আমি বৌকে বোল্লাম যা থান পরে আয়। বেশ চেঁচিয়েই বলে ছিলাম কেননা আমার পা গিয়ে খাটের পায়ায় লাগলো। বৌ দৌড়ে সুলেমানদের ঘর থেকে বরফ নিয়ে এলো। ওহ, এত সেবা করলে তুই তো আরো আগে যাবি রে। আমি যত কাঁদি, বৌ আঁচলের খুটে করে আমার চোখ মুছিয়ে দেয়। বৌটা দিনদিন মাদার টেরেজা হয়ে যাচ্ছে। যেদিন ও পুরোপুরি মাদার টেরেজা হবে সেদিন আর কাজে বেরোব না। আমার বৌ নোবেল প্রাইজ পাবে। আমি ঘরে শুয়ে রোকড়া গুনব। আলিবাবা ষ্টাইলে মাপব জামবাটিটা দিয়ে। এই সময়টা ভীষণ কনসাস থাকা দরকার। আমি একদম নড়া-চড়া করি না। মটকা মেরে পড়ে থাকি।


      বিকেল বেলা আমি কাজে বেরোই । রাস্তায় কোনো ইঁট পাইনা। কোন কুত্তা দেখিনা। আমি ফুরফুরে মেজাজে আপিসের দিকে যাই। আমি পৃথিবীতে মাত্তর দুটো রাস্তা চিনি। একটা বাড়ি থেকে অফিস আর একটা ভাটি থেকে বাড়ি। একটার নাম দিয়েছি এন এস বোস রোড আর অন্যটার নাম মহাত্মা গান্ধী রোড, রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন পৃথিবীর প্রতেক শহরে এই দুটো রাস্তা থাকবেই। রবীন্দ্রনাথকে ভুললে চলবে না, আমি এই রাস্তা দুটোর নাম দিয়ে গেলাম। রোজ রাতে বাড়ি ফেরার সময় আমি কুত্তাগুলোকে বলি, ওরা ঠিক মনে রাখবে। ওদের কান হেবি শার্প। রাস্তায় আমি দম বন্ধ করে হাঁটি। আজ আসলে আমি একটা রবীন্দ্রসংগীত গাইছি , মনে মনে। একলা চল রে। আজকে আমার হেব্বী তার কথা মনে পড়ছে, ট্রাডিশন সমানে চলছে। তার মানে আজ রবিবার। আচ্ছা আজ আপিস যাচ্ছি কেন? কাউকে জিজ্ঞাসা করলে ঠাকুর চটে যেতে পারে। আমি আজ আর আপিস যাব না, সোজা ভাটিখানা। আমি রবীন্দ্রনাথকে হেব্বী ভালোবাসি। আমার বৌ বলে আমারো প্রথম প্রেম বৌদির সাথে। অমর চিত্রকথা মহাভারতে পড়েছি, মহাজনেরা সব এক পথেই হাঁটে। আমি ভাটি খানায় ঢোকার মুখটায় রবীন্দ্রনাথের মতন কুঁজো হয়ে হাঁটি।

      এখনো লোকজন সেভাবে আসতে শুরু করেনি। আমি একটা পাঁইট খেয়ে একটু ধাতস্ত হলাম। দূরে রাস্তা খা খা করছে, যতদূর চোখ যায়। শেষ বিকেলের রোদে সব ঝলসে যাচ্ছে। এখন স্কুল থেকে মেয়েদের ফেরার কথা, সব পাখি ঘরে ফেরে, ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন। আমি কবিতা মিলিয়ে জগৎটা দেখি। এই যেমন মেয়েগুলো এখন ফিরছে মালতীলতা বালিকা বিদ্যালয় থেকে। খসে পড়া টিপ, শক্ত বিনুনিতে বাঁধা লাল সবুজ নীল খয়েরী ফিতে, ঘামগন্ধ,কিড়িং কিড়িং সাইকেল, গাছতলায় ছিঁড়ে কুটিকুটি চিঠিখানি। এই নামটাও আমার দেওয়া, মালতীলতা। এই রাস্তাটা; এটার নাম ও তো আমার দেওয়া, এন এস বোস রোড। নেতাজী হেব্বী মানুষ ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা লড়াকু শিখ নিয়ে গেছে জাপানে। তিন হাজার পিস শিখ সেনা শুকিয়ে তিনশ। নেতাজী তাদের বল্লেন করেঙ্গে আউর মরেঙ্গে। শেল্টারের জন্য জাপানী বিয়ে করলেন, হেব্বী ব্রেন। আজাদ হিন্দ ফৌজ তৈরী হল। এমিলি শেঙ্কেল জাপানীদের বল্ল, অ্যাটাক। কি বল্ল তা আমার জানা নেই। মিথ্যে বলে লাভ নেই; আমি জাপানি ভাষা জানি না। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন , মিথ্যে বলা মহা পাপ। এক বোতলে আমার চৈতন্য লোব পায়নি। আমি একবার চোখবুজে নম করে নিলাম। ছি ছি। নেতাজী বিয়ে করেন নি তো। তার বিয়ে আর ডেথ দুটোই ঝুলে আছে, এখন এই নিয়ে আমি কমেন্টস করতে পারিনা। নিজেকে সমস্ত প্রলোভন থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে,কবি বলেছেন। সত্যি বলছি নেতাজী জীবনে কোন মেয়ে মানুষ দেখেছেন কি না তাই আমি জানি না। শেতলার দিব্যি। মিথ্যে বল্লে আমার যেন জীভ খসে পড়ে যায়। যে রাস্তা দিয়ে মেয়েগুলো কিড়িং কিড়িং করে যায় তার নাম নেতাজী সুভাষ রোড হতে পারে না। সরি সরি। যাহ নাম চেঞ্জ করে দিলাম।


      ফিরতে রাত হল। কেননা আমার কুকুরগুলোকে নাম চেঞ্জ করার কথাটা জানানোর দরকার। কি নাম দেব তা অবশ্য মাথায় আসেনি । দশ-পাঁচ জন থাকলে আপনিই একটা নাম বেরিয়ে আসবে। এটা ডিসাইডেড রাস্তার নামটা চেঞ্জ হচ্ছে। নেতাজীর সঙ্গে মাটির যোগ কম, নিঁখোজ হয়েছেন তাও হাওয়াই জাহাজ চড়ে, নেতাজী রাস্তার নাম রাখা যায় না। বাতাসের নাম হতে পারে। মেঘের নাম হতে পারে। রাস্তার নাম নয়। এই জন্যে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ভাবিয়া করিয়ো কাজ, করিয়া ভাবিয়ো না। আমি অবশ্য তার কথা মেনে চলিনি। রাস্তার নাম পল্টে দিচ্ছি। রবীবাবুর নামে রাস্তার নামটা রাখলে কেমন হয়? রবীন্দ্র সরণী। একটু অন্য মনস্ক ছিলাম,ওফ , ঠোক্কর। কে যে রাস্তায় খুঁড়ে খুঁড়ে ইঁট বার করে রাখে। এই তো কিছুক্ষণ আগে গেলাম এই রাস্তায়। দিব্যি। টেলিফোন বিজলী জল কোম্পানী খুঁড়ে খুঁড়ে দেশটার বারোটা বাজিয়ে দিল। বারোটা মনে আসতেই মনে হল আজ তবে সোম বার। এই রাস্তার নাম আর রবীন্দ্র সরণী রাখার কোন মানে হয় না। লোকে ব্যাকডেটেড বলবে। রোজ নাম পাল্টে দিলে কেমন হয়। সোম বারের রাস্তার নাম শমীন্দ্র সরণী। এই রাস্তা কারোর বাপের নয়। রোজ এর নাম পাল্টে দেব। রোজ একই রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরা একঘেয়ে, রোজ নতুন নতুন রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরব। ভাবতেই মনটা উৎফুল্ল হয়ে উঠল।


      কুত্তাগুলো কেন জানি না আমার গাওয়া গান একেবারেই বরদাস্ত করে না। সবাই সমবেত কন্ঠে মাস প্রোডাকশনে ব্যস্ত। যাহ কার্ল মার্কসের চেলা দুর হ। তোরা কোনদিন হিউম্যান এক্সিলেন্সির দাম দিবি না। খালি মিডিওক্রিটির জন্ম দিবি। আমি যত জোরে চেল্লাই তারাও তত্ত জোরেই চেল্লায়। আমার জেদ চেপে গেছে, জানি মোড অব প্রোডাকশন আমাকেও খেয়ে নেবে, আমি কিছুতেই ওদের সাথে গলা মেলাব না। এই সময় আমার মমতাদিদির কথা খুব মনে পড়ে। উল্টে দাও, পাল্টে দাও। আহা এটা রবীন্দ্ররচনাবলীতে ঢুকিয়ে নেওয়া উচিত। কি বলিষ্ঠ লেখা! গীতায় ঢুকিয়ে নেওয়া উচিত। আমি এক ঝলক দেখতে পেলুম নীতিশ ভরদ্বাজ জ্ঞান দিচ্ছে কুরুক্ষেত্রে দাড়িয়ে। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম , উল্টে দাও পাল্টে দাও। নিজেকে ভীষণ শক্তিশালী মনে হচ্ছে। আরো তিনবার গলার শিরা ফুলিয়ে দম বন্ধ করে চোখ বুজে চেঁচিয়ে উঠলাম। কুত্তারা ভয় পেয়ে দৌড় , পোঁ পা। আমি দেখলাম চেঁচিয়ে আর লাভ নেই। কে শুনবে? শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন নিজের চরকায় তেল দাও, আমি মাটিতে উল্টি-পাল্টি দিতে লাগলাম।

      যেমন সকাল হওয়ার তেমনই হল। সূর্যটা খ্যাক খ্যাক করে চোখের উপর চোখ মারছে। কোন সহবত নেই, লোকে ঘুমন্ত মানুষকে এমন ধাক্কা দেয়? মেজাজটা খিঁচড়ে গেল। চোখ খুলতে ইচ্ছা হয়না। চোখ বুজেই হাঁটতে লাগলাম। অলি গলি তস্য অলি তস্য গলি এ দেওয়াল ও দেওয়াল ধাক্কিয়ে সোজা বাড়িতে। এইবার চোখ খোলার পালা। চোখ খুললুম। কোথায় পরী? দুবার টেঁপি টেঁপি চারবার সুস্মিতা সুস্মিতা করে চিল্লালাম ,কোথায় সে। বেডরুম ড্রয়িংরুম কিচেন ব্যালকনি রিডিং কম্বো রুমটায় তার টিকিটি নেই। পরী নেই এ হতেই পারেনা। নেশাটা একটু ভিজিয়ে নেওয়া দরকার। মাথায় জল ঢালা প্রয়োজন। কে ঢালবে? পরী তো নেই। আছে, আছে। জল কোথায়? আম জামবাটি ঘটি বালতি কড়াই ডেচকি সব জলশূণ্য। জল চাই জল। স্পিডবোটের মত হা হা করে দৌড়ালাম কলতলার দিকে। কলতলায় লম্বা লাইন? খাজুরাহো ষ্টাইলে একটা কেউও দাঁড়িয়ে নেই যেমনটা আমি স্বপ্নে রোজ দেখি। জল নেই, পরী নেই, এমনকি কলের মুখটাও কেউ ছোঁ মেরে খুলে নিয়ে গেছে। একটা বাংলা কাক পাইপ লাইনে বসে খুটুর খুটুর করছে। কাকটাকে গিয়ে বললাম, জল দে। জাতকে পড়েছি কাকেদের হেবি বুদ্ধি, নুড়ি ফেলে ফেলে পি সি সরকারের ষ্টাইলে জল উঠিয়ে এনেছিল একবার। কাকটাকে বললাম, জল দে, জলদি। হনুমান যেন বিশল্যকরনী আনতে যাচ্ছে, হুঁশ করে উড়ে গেল কাকটা। আমার ইচ্ছে হল ওর জায়গাটাও আমার রাখা দরকার, পাইপটার উপর বসি গিয়ে, যতক্ষণ না সে জল নিয়ে ফেরে। প্রতিদানে আমারও তো কিছু করা উচিত। কবিগুরু বলেছেন, জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ইশ্বর।

      এই আলোতে বেশিক্ষণ তাকানো যায়না। চোখের পাতা সিন্দুকের দরজার মত বন্ধ হয়ে আসে। চোখে পড়ল সারসার আইস্ক্রি²মের গাড়ি দাঁড়িয়ে। মিছে জলের জন্যে বসে আছি। আইস্ক্রিম পেলেও তো চলবে। সুলেমান, সুলেমানের বাড়িটা যেন কোনটা? এই সময় বউটাকে ভীষণ দরকার। চোখের পাতা বুঁজিয়ে রাখলেও কানের ফুটো তো আর বুঁজিয়ে রাখিনে। সুলেমানের সঙ্গে ওর ঢলাঢলির সব খবরই আমার নজরে আছে। সুলেমানের কি দোষ? সে যখন তখন সুস্মিতা হয়ে ঘুরে বেড়াবে। তাছাড়া সুলেমান লোকটা ভালো। সক্কালবেলা ঠোক্কর ফোক্কর খেয়ে ফিরলে সেই তো বরফ যোগায়। এই মুহুর্তে আমার বউকে চাই না সুলেমানকে চাই আমি ঠিক করতে পারলামনা। জলশূণ্য বাড়িতেও যাওয়ার কোন ইচ্ছে নেই। আমি হনহনিয়ে মহাত্মা গান্ধী রোড দিয়ে হাঁটতে শুরু করে দিলাম। সাধারণত এই রাস্তায় আমি ফিরি। দিনের আলোয় সব অচেনা লাগতে লাগল। এক পা করে হাঁটি আর থমকে দাঁড়াই, কেবলই মনে হচ্ছে ভুল রাস্তা, এরাস্তায় কক্ষনো আসিনি। একবার সামনে যাই আরেকবার পেছনে। ভীষণ অস্থির লাগতে থাকে। বিবেকানন্দ বলেছেন , দু নৌকায় পা দিতে নেই। আমার স্থির হওয়ার এখন আশু প্রয়োজন। ভাটিখানায় ফিরে যাওয়ার ভীষণ দরকার কিন্তু সেখানে তো যেতে হবে। কোন পথেই বা যাব? সামনে দিয়ে বিনুনী দুলিয়ে ফ্রক শাড়ি স্কার্ট পরে মেয়েরা সব আমার মালতীলতা বিদ্যালয়ের দিকে চলে যাচ্ছে। আমি সেটাকেই কম্পাসের কাঁটা হিসাবে ধরে নিই। নিজেকে বেশ কলম্বাস কলম্বাস মনে হয়। এইভাবে আমি অ্যামেরিকা পৌছে যাই।

      অ্যামেরিকায় কেউ বাংলা বলেনা আমার জানা আছে। আমিও সব ইংরাজীতে কথা বলি। এক বোতলের পর অবশ্য বাংলায় হুকুম করা চলে। আমি জানি বঙ্কিমচন্দর, মাইকেল মধুসূদন সক্কলে ইংলিশ দিয়ে শুরু করে বাংলায় গিয়ে ঠেকেছে। আর চাণক্য তো বলেই গেছে, মহাজন গত: স পন্থা: । বেশ কিছুটা মাল টানার পরে আমার বাংলা ভাষা নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করে। এই যে আমার মাথায় এলো শব্দটা- মালটানা , আমি মাল টানছি সুতরাং আমি কুলি। কুলি শব্দটা মাথায় আসতেই আমি মুখের ভেতর মাল নিয়ে কুলি করতে থাকি। ভাটিখানর সমস্ত লোকজন হা করে আমার মুখের দিকে তাকায়। ওদের বোঝার কথা নয় যে আমি এখন বাংলা ভাষা নিয়ে ভাবছি। ইচ্ছে করলে নতুন করে বর্ণপরিচয় লিখে ফেলতে পারি। আমার মনে হয় রোজ রোজ প্রতিদিন প্রতিমিনিটে প্রতি সেকেন্ডে নতুন করে সবকিছু লিখে ফেলা উচিত। ঠিক এই কারনটার জন্যেই আমি কিসসু লিখিনা। কেননা যা লিখব পরক্ষণেই তা বাতিল। সেইজন্যেই আমার রোজ রোজ নতুন নতুন রাস্তা দিয়ে ফিরতে ইচ্ছা করে। এই রাস্তাময় ছড়ানো ঢিল খুঁজে পাই, এই ভ্যানিশ। এই বাল্ব জ্বলে তো এই সূর্য ওঠে। এরপরেই মনের মধ্যে খচ করে উঠল, আমার ঘর? আমার বউ? পরীটা কি কেটে পড়ল সেই আইস্ক্রিমওয়ালার সাথে? যা: ভাগ। কি হারালি তা তুই নিজেই জানিসনা। তুই আর জীবনে সুস্মিতা সেন হতে পারবি? মাদার টেরেজা? নোবেল পাবি? গেল তো তোর! আমার ঘেঁচু।




            (২)


      ছোট্টখাট্টো টুকরো টাকরা সুখ-দু:খ আমাকে কোনদিনই ঘাটায়না। এটা আমি গ্যামা গ্যামা কবি সাহিত্যিক হোমার কিটস বায়রন রবীন্দ্রনাথদের দেখে শিখেছি। এই ঘরে রবীন্দ্রনাথের ছেলে মারা যাচ্ছে, অন্যঘরে বউ, রবীন্দ্রনাথ তার মধ্যে বসে লিখে চলেছেন কাটাকুটি, হিজিবিজি, ছবি আঁকছেন, ভাইঝিকে চিঠি মারছেন; সাধে কি আমরা তাকে গুরুদেব বলি? আমার গুরুর মতন গুরু যায়না কোথাও পাওয়া। এখন গুরুদেবের খোমা বলতে লোকে বোঝে মিঠুন চক্কোত্তি। ডিস্কো ড্যান্সার। আরে ছবি পাল্টালেই কি গুরুদেব পাল্টে যায়? তুমি যে নামেই ডাকো মাল একটাই। আরে আমি তো সব কিছুই পাল্টে যেতে দেখলাম। যেখানে ফ্লাইওভার ছিলনা ,সেখানে ফ্লাইওভার,যেখানে ছিল হারানের নাতজামাইএর টিমটিমে চোলাইএর ঠেক সেখানে এখন ম ম শপিং কমপ্লেক্স, সবসময় আলো ঝলমল করছে,হেলেনের ঝালরের মত, মেহেবুবা মেহেবুবা। আসলে কেউ ভাত খাচ্ছে কেউ রুটি খাচ্ছে, পেটটা ভরা নিয়ে কথা। কবিগুরু ইজ কবিগুরু, জিনিয়াস। ঘ্যামচ্যাক। কোথাও বাইশ বছরের ছবি কোথাও বিরাশি। গুরুদেব আমার একটাই। এই যে দুমুঠো খেয়ে পরে বেঁচে আছি সব গুরুদেবের ক্যালি।

      কত হাজার হাজার শব্দ আমার গুরুদেব ডেলিভারি করে গেছে, সেইজন্যে আমরা করেকম্মে খাচ্ছি ডিকশনারিগুলো ক্রমশ জিরাফের মত ফুলে-ফেঁপে উঠছে। আগে ছিল স্রেফ ধর্মপুস্তক। কবি বললেন ধর্মেও থাকো জিরাফেও থাকো। বাল্মিকী , বিদ্যাসাগর মুশকো মুশকো ইয়া ইয়া বই লিখে ফেলল সাইজে সব দারা সিং। চারদিকে পেপারমিল গজিয়ে উঠল। সারা চিৎপুরে ছাপাখানা বানিয়ে দিলেন, যাদবপুর-কৃষ্ণা গ্লাস-সুলেখায় ছাপার কালি; সে মালের এমন ডোজ লেগে গেল যাদব আর কৃষ্ণায়, কৃষ্ণা কৃষ্ণা হরে হরে, মর তুই বেঘোরে। কলেজস্ট্রিটে বইয়ের দোকান লাগিয়ে দিলেন। আমরাও সব কবি সাহিত্যিক প্রিন্টার ব্যবসায়ী বুকবাইন্ডার আর প্রুফরিডার হয়ে গেলাম। প্রভুর কি অসীম লীলা। আমি কাজে বসার আগে ইষ্টনাম জপের মত প্রভুর নাম জপ করি। আমার যেটা অফিসঘর সেই জায়গাটায় বসলে আমার কবির কথা মনে পড়ে, সমাজ সংসার মিছে সব, মিছে এ জীবনের কলরব। আহা আহা । কি ঘ্যাম কথা। নিচের ঠ্যালা রিক্সা,পাল বস্ত্রালয়ের দরদাম, পাল পাল বৌদি, দোতলার ইউনিয়ন ড্রাগ হাউসে স্কুল মেয়েদের ভিড় আমি কিসসু পাত্তা দিই না। আমি যখন একটা তক্তপোষের উপর বসে প্রুফগুলো ঘ্যাচ ঘ্যাচ করে দেখতে থাকি তখন এই সমাজের কোন কিছুই আমাকে স্পর্শ করেনা। বি আর চোপড়া ফুলঝুরির মত তীর ছুড়ে মারছেন, আমি যে কে সেই। সামনের লেখা মিলিয়ে শুধু প্রুফ দেখে যাওয়া। কোথায় পাল বস্ত্রালয়ের ছোঁড়াটা কনুই ছুঁড়ল, রিক্সাওয়ালাটা বিহারী বলে কে দুটাকা কম দিল আমার তাতে কোন ইন্টারেষ্ট নেই। আমি সমাজ সংস্কারক নই, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বিনয় বাদল দীনেশ ক্ষুদিরাম হওয়া যায়না। সো মায়া।

      আমি তিনতলায় থাকলে নিচে অনেক কিছুই দেখা যায়। আমার ধারণা আমার নিচের তিনটে তলা হচ্চে, সগ্গ্য মত্ত পাতাল। নিজেকে শ্রীভুবনেশ্বর বলে ভাবতে হেভি লাগে। শিবের ফেসটা চোখের সামনে চলকে ওঠে। সামনে রম্ভা উর্বশী মেনকা নেত্য কচ্ছে, তার কোন হুঁশই নেই। আমি একমনে প্রুফ দেখতে থাকি। কখনো কখনো প্রুফ দেখতে দেখতে একটু হাল্কা শুনি, এটাও আসলে একটা আর্ট বলে আমর মনে হয়, ছোটবেলায় সর্কাসে দেখেছি সাইকেল চালাতে চালাতে লোকে বল লোপালুপি করছে। কপ কপা-কপ। এই তো শুনি নি:শব্দ বিপ্লবের কথা। জিমন্যাসিয়ামে লোকে নাকি দৌড়ায়না নিচের রাস্তাই দৌড়ায়। আমার মাথায় একটা আইডিয়া আসে। আমার মনে হল আমিও লোপালুপি করতে পারি, পাতাগুলো এক জায়গায় রেখেই, একটুও নড়বেনা! বেশ খানিকক্ষণ লোপালুপি করলাম, এটা বেশ ভালো প্র্যাকটিস,হাতও নড়বেনা, কাগজও নড়বেনা,তখনই মাথায় এল আচ্ছা কাগজের কি দরকার? আমি তো ট্রেন নিয়ে লোপালুপি করতে পারি। স্যাটাস্যট আমি শিয়ালদা ষ্টেশনে চলে গেলাম। শেয়ালদা সাউথ আমার পরিচিত; আঠারো নম্বরের সামনে দাঁড়ালাম, শুনেছি বড় কেউ ছুঁলে আঠারোর ঘা পড়ে। দৌড়ালাম কিন্তু আমার হাঁটু ঠক্‌ঠক করে কাঁপছে। নজরুল কি একটা বলেছেন এক্সাট মনে পড়ল না মোদ্দা কথাটা হল,তোমার হ্যাপা যারে দাও, তারে দাও বহিবার শকতি। আমি সমস্ত শক্তি হাতে ঠেলে দিলাম। সারা শরীরে কোন বল পেলাম না, কাটা কলাগাছের মত প্ল্যাটফর্মে পড়ে গেলাম। আমি পড়ে যেতেই লোকে আমাকে ঘিরে ধরল, অমি চোখ বুজে তিনবার গুরুদেব গুরুদেব গুরুদেব বলে ম্যাজিক ষ্টার্ট করে দিলাম। আধঘন্টা চোখ বুঁজে অনেক কসরতের পরে তিনটা ট্রেন প্লাটফরম ছাড়া করালাম, তিনটে ট্রেন টেনে প্লাটফরমে আটকে দিলাম। কিন্তু গোটা প্রসেসটা বড্ড স্লো, এরমধ্যে সন্ধ্যে হয়ে এসেছে,হার্ড জব করেছি, শরীরটা একটু ভেজানো দরকার। আমি বুঝলাম রেগুলার প্র্যাকটিস করলে তবে মালটা ফাষ্ট হবে।

      আমার ভীষণ টায়ার্ড লাগছিল। এন এস বোস রোড অব্দি শরীরটা টেনে নিয়ে যাওয়ার মত শক্তি আমার দেহে অবশিষ্ট ছিল না , আমি রেল লাইনের ধারেই বসে পড়লাম। মাল টানার পর যেটা হবে, আমার হয়ত চেনা রাস্তা ছাড়া ঘরে ফিরতে অসুবিধে হবে, পকেটে খড়িমাটি থাকলে মর্জিনার ষ্টাইলে ঢেড়া দিয়ে দিয়ে এগো¡তুম। মালটানার আগে এইসব ফালতু টেনশন নিতে নেই। কিছুই কি চিনি এই জগৎএর? আমার লালনের গানটার কথা মনে পড়ল, চেনা দু:খ চেনা মুখ, চেনা চেনা হাসিমুখ। ঢপ সব ঢপ! রাত্রে আমি কিছুই চিনিনা, সব কানামাছি। যা: শালা। বৌ ই নেই যখন তখন আর বাড়ি। কি দরকার বাড়ি গিয়ে? লাইনের ধারেই বসেই একটা বোতল টেনে দিলাম। আমি নিজের হাতটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিলাম, শরীরের নাম মহাশয়, যা সওয়াবে তাই সয়। আমি আরেক বোতল অর্ডার দিয়ে দিলাম।

      প্রব্লেমটা শুরু হল রাত্রে। মাল টানার পর আমার একটু ভাষাচর্চা করতে ইচ্ছা করে। সারাদিন প্রুফের মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দিই, কিন্তু কি বিলাব? রোজ কিছু কিছু শেখা দরকার। কোনদিন রাতে আমি রাস্তার হোর্ডিং পড়ি শ্যামবাজার টু গড়িয়াহাট, কোনদিন পাড়া কে পাড়া বাড়ির নাম, কোনদিন লরি টেম্পু অটোর পিছন। লরি বাস দ্রুত চলে যায়, অন্ধকারে সব পড়া হয়ে ওঠে না, পিছনের বাম্পারে উঠে পড়, রানিং অ্যান্ড রিডিং। ল্যাম্প পোষ্টের আলোয় সেগুলো পড়তে পড়তে আমার নিজেকে বিধ্যাসাগর বলে মনে হয়। ট্রেনের ভেতর থাকলে নিশ্‌চিত কারোর জুতো টান মেরে নিচে ফেলে দিতাম। আ:। আমি রেললাইন দিয়ে ঠোক্কর খেতে খেতে হাঁটছিলাম। উ:। পুলিশ এসে আমায় ধরল। জিজ্ঞাসা করল, এখানে কি করছিস? আমি মনে করে করে সব বললাম, আ, ই, উ, ঔ..... সব। পুলিশগুলো হাঁদার মত তাকিয়ে। মালগুলো কিসসু জানেনা, চেঁচিয়ে বললাম, বর্ণপরিচয় জানিস, স্বরবর্ণ? মালগুলো ফ্যাল্ফেলিয়ে আমায় দেখে। আমি ওদের মায়া করে দিলাম। যিশুর কথামত।

      থানায় আমায় নিয়ে হেভি রগড় শুরু হল। সব অশিক্ষিতের দল। বড়কর্তা এসে ভেরিফাই করে গেল, আমার নাম শক্তি চট্টোপাধ্যায় কিনা? বুঝলাম এরা শক্তি বলে কারোর বদলে আমাকে তুলে এনেছে। এরকম এরা আকছার করে বলে শুনেছি। কাল নিশ্‌চয়ই শক্তি বলে কোর্টে চালান করে দেবে! সর্বনাশ আমর বাকি জীবনটা তাহলে অন্য মানুষের নাম, পরিচয় কর্মফল টেনে বেড়াতে হবে? আমার অর্জুনের কথা মনে পড়ল। সারাজীবন বৃহন্নলা সেজে ঘুরে বেড়ালে কি আর ওর কপালে সুন্দরী মহিলারা জুটত? হোল গীতাটাই ফরম্যাটেড হয়ে যেত, ফলের কথা ছিন্তা করো না, গাছ-বীজ পুঁতে যাও। আমি বড়বাবুকে বললাম, শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে আমি চিনি। আমি আপনাদের ধরিয়ে দিতে যথাসাধ্য সাহায্য করব। লাইন বাই লাইন। বড়বাবু আমার কোন কথা শুনলেননা, সদ্য তুলে আনা এক মহিলার দিকে তখন তর মন। হাবিলদারগুলোকে শুধু বললেন, ভরে দে।

      হাবিলদার আমাকে ভারিক্কিপানা লোহার দরজা খুলে একটা নোংরা জায়গায় ঢুকিয়ে দিল।সেন্টু দিতে গিয়ে গুচ্ছ সেন্ট। বুঝলাম এটাই লক আপ। ওর ভেতর আরও বিভিন্ন শেপ বয়েস সাইজ চেহারার লোক গুম মেরে ছিল। আমি যেতেই সবাই এগিয়ে এল। হাবিলদার বল্লো, এই নে, শক্তিকে দিয়ে গেলাম। বলার সাথে সাথেই সবাই আমার উপর হামলে পড়ল, সবাই বলল, কি মাল এনেছিস বের কর। আমার ইচ্ছে ছিল সৌরভের মত মাথার ওপর জামা দুপাক নাচিয়ে রোয়াব নি , দ্যাখ কিছু আছে কী না , আবার এও মনে হল মালগুলোকে সৌরভ বানিয়ে দি,সবকটা বল গলাবে , সিওর শট। কেলোটা হল সবাই এক হয়ে যাওয়ায়। মহত্মা গান্ধী বলেছেন এক আকাশে দুই সুর্য থাকতে পারে না, তাই লেগে গেল। ওরা সব রাশিয়ার কুত্তা, কাসপারাভ যেন সমস্ত আনন্দ ধুলোয় মিশিয়ে দিল। আমি ধরাশায়ী। সকলের হাত আমার সারা দেহে ঘুরে বেড়াতে লাগলো। আমি সাধারণত একতাড়া প্রুফ দিয়ে প্যান্টের কোমরটা টাইট করে রাখি। সেটাই একজন খামচে বের করল। লুজ পাতা, সকলের হাতে হাতে ছড়িয়ে গেল এবং তৎক্ষনাৎ সকলে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পড়তে শুরু করে দিল। যেন লোকসভা চলছে! একটু পড়ার পর পান্ডামত একটা লোক আমার পাছায় একটা লথি মেরে রায় দিল, মালটা জালি; ডুবলি!




            (৩)

      এরপর যা মনে এল, একটা গঙ্গার তীর, তেড়ে কচুরীপানা ভেসে ভেসে আসছে। প্যাচপ্যাচে কাদার মধ্যে আমি পড়ে আছি। অনেকটা রাবড়িতে মাছি পড়ার মত। হেব্বী বড় একটা সুর্য ঠুকুস ঠুকুস করে উঠছে, পুরো সুনীল মনোহর। শুনেছি রবীন্দ্রনাথের নাকি গঙ্গার ধারে সুর্য ওঠা দেখে কি একটা ভঙ্গ হয়েছিল। বজরায় শুয়ে ঐশ্বর্য রাই না কাদম্বরী বিনোদিনী সেজে ডাকছে, ওঠো ওঠো সুর্যাই রে, ঝিকিমিকি দিয়া। রবীন্দ্রনাথ ফিরেও দেখছেন না। আমারও ইচ্ছে করছে সমস্ত কিছু নতুন ভাবে ভাবতে, নতুন করে শুরু করা উচিত। কোন একটা সিনেমার গানে ছিল না, তোমায় নতুন করে পাব বলে হারাই ক্ষণে ক্ষণে । আমি দু-চার বার চোখ খুল্লাম, বুজলাম। এই সুর্য আছে এই নেই। গানটা মনে হচ্ছে আমারই লেখা। প্রুফ দেখতে দেখতে অনেক সময়ই আমার মনে হই বইটা আমারই লেখা। সেই জন্য আলাদা করে কিছু লিখতে মন চায়না আর। লিখব আমি মাল্লু তোদের, নাম ও তোদের! লেখনা তোরা কত লিখতে পারিস। এই শর্মা রামায়ন কেন গীতাঞ্জলীর উপরেও কলম চালিয়েছে। সে সব কথা থাক। কিন্তু এই গানটা আমারি লেখা, আমি যদি ডাইরি মেন্টেন করতাম, খুলে দেখিয়ে দিতাম তোদের। আথবা অন্যকিছুও হতে পারে যেমন সেক্সপীয়ার না শার্লক হোমস কে যেন বেশ বলেছিলেন না ? গ্রেট মেন থিঙ্কস এলাইক? নিজেকে গ্রেট ভাবতেই ফিলগুড হয়। চার দিকে তো গ্রেট ম্যানের ছড়াছড়ি, কেউ ভাল বিড়ি বাঁধে, কেউ ভাল আইস্ক্রিম বানায়, কেউ ভাল নেতা, কেউ অভিনেতা , কটা মালের আর নাম জানি? কিন্তু আমি কার মত ভাবছি? সেইটে জানা জরুরী।

      আমি এখন যে ভাবে রয়েছি তাতে কিমি কাতকার থেকে জর্জ বুশ যা কিছু বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। পুরোটা কাদা লেবড়ে ঋ হয়ে রয়েছি। নিজেকেই নিজে ঠিকমত চিনতে পরছি না দেখে ঠিক করলাম সমস্ত কাদা আগে ধুয়ে ফেলা উচিত। টেঁপি থাকলে পাছা দুলিয়ে ঘড়া গেলাস বাটি করে জল তুলে এনে এনে মাথয় ঢালত, হায় কবি বলেছেন, সে রামও নেই সে অযোদ্ধাও নেই( কে জানে এই কথাটার মানে কী? রাম আর যুদ্ধ করল কবে?) সুতরাং নিজের চরকাই ভরসা। গঙ্গায় বেশ কয়েকটা ডুব দিয়ে নিলাম। বেশ বুঝতে পারছি আমি একটা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। পরী শব্দটার সাথে আমার বৌ জড়িয়ে, কাঁঠালের আঠার মত। আমি টেঁপিকে পরী বলে ডাকতুম। ইন্দিরা মমতা সুস্মিতা বলে ডাকতুম। ১০৮ পীস নাম নিয়ে মালটা ভেগেছে। সামলা এখন একা একা। পরিবর্তন শব্দটায় আমি আমার বৌএর মুখ আর জামবাটি একসংগে দেখতে পেলাম। বুকের ভেতরটা চিনচিন করে ওঠে। বৌটা কি চিনে পালাল না জাপানে? চিনচিন করে কেন? পরিবর্তন শব্দটাই পাজী। এই মুহুর্তে আমার ইচ্ছে করছে শব্দটাকে ডিকশনারী থেকে বাদ দিয়ে দিতে। অ্যাপেন্ডিসাইটিস, যা ভাগ। গত সাতদিন হল আমি ডিকশনারীর প্রুফই দেখছি, কাজেই একপীস মাল কেটে উড়িয়ে দেওয়া আমার কাছে নস্যি। পরিবর্তন শব্দটায় যখন আমার বুকে ব্যথা করছে, পৃথিবীতে অন্য যে সকল গ্রেট ম্যানেরা রয়েছে তাদেরও সকলের এখন বুকে ব্যথা করছে কেননা আমরা ক'জন একই রকম ভাবে ভাবি!

      বাদ ইজ বাদ। এত ভাবার কি আছে। এত ক্ষতিকর একটা শব্দ আমি অ্যালাউ করতেই পারি না। চিত্রগুপ্তের কাছে মুখ দেখাতে হবে তো? আর গ্রেট মেনদের ভেতর কবিগুরুও থাকবেন, তার বুকে ব্যথা? ধম্মে সইবে? তার থেকে একটা শব্দ কেটে উড়িয়ে দিতে কতক্ষণ। কবিগুরু তো বলেইছেন,যে ভাষাকে আক্রমণ করে সেই ভাষাকে বাঁচায়। এটা ভাবতে ভাবতেই খেয়াল পড়ল আমার পেটের কাছটা খালি-খালি। প্রুফগুলো? গাছের ডালে পাখি থাকলে না তবে সেটা ওড়ানোর প্রশ্ন? সর্বনাশ। দেখলাম প্যান্টটাই গায়েব। গিলি গিলি গে। জেনারেলি প্রুফগুলো দিয়েই টাইট করে রাখি কোমরের ঘুনসি। একটাই বাঁচোয়া যে আমি এখন গলা জলে দাঁড়িয়ে। এখন ওঠার কোন সিনই নেই। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম যতক্ষণ না অন্ধকার হয়।

      (চলবে)