আপনার মতামত         


রাবণ মার্ডি ও তৎকালীন সংবেদনশীল ছাত্রসমাজ - একটি পক্ষপাতদুষ্ট আলোকপাত
বোধিসত্ত্ব দাশগুপ্ত





প্রিয় দের তখন ফুল খেলবার ই দিন এমনিতে। সবই বেশ সুডৌল দেখাচ্ছে। ক্লাবমোড়ে নতুন বই য়ের দোকানে মনে আর মানে দুজনের ই ছবির বই এসেছে। এঁড়ে গুপ্ত সেইটে বা সোমনাথ হোড়ের তেভাগার ডাইরীর নতুন সংস্করণ দেখতে দেখতে কান খাড়া করে দিল্লী-কাকুর প্রাগ পোস্টিং এর গল্প শুনছে। নতুন করে বিসর্জন এর রিহার্সালে নতুন অপর্ণা র প্রেমে পড়ে কোনো নতুন রঘুপতি, কিশোর জয়সিংহ র ঈর্ষা কুড়ুচ্ছে, বালিশ এবং ক্ষণভেদে পাজামা ভিজোচ্ছে। পার্থদা দাবার বই পড়ে পড়ে নানা লোককে চমকাচ্ছে। জে¿ট্রিরুপী প্রাচীন আশ্রমিক, অধ্যাপক,উচ্চ পদস্থ কর্মী গণের বাগানের দোলনচাঁপা, কুর্চি , বেগনভেলিয়া বা কোড়ানো শাল ফুল - সমর, কুন্তল, কৈলাস, আপ্পান, বলরাম, অমিত দের পরাক্রমে পারমিতা, পাপিয়া, জয়তি দের খোঁপায় উঠছে। প্রভাতের দোকানে গরম ল্যাংচার জন্যে বিকেলে লাইন পড়ছে। প্রভাতের দিদি বুড়ি র বর এসে বলে কয়ে বুড়ি কে রামপুরহাটের রেল এর লেবার কোয়ার্টার এ নিয়ে গেছে। ছেলেদের হস্টেলের পাইখানায় ফ্লাশ কাজ করছে। স্থিতি উপচে পড়ছে।

বলতে নেই আদুড়ি র বর মুর্শিদাবাদী রাজমিস্ত্রি দের কাছে কাজ শিখতে শিখতে পাকা হয়েই দিনে পঁয়তাল্লিশ টাকা রোজগার করে সন্তোষ রেডিয়ো কিনে, বিবিধ ভারতী তে উদিত নারাণের খড়খড়ে ঝিন্‌কা চিকা শুনতে গিয়ে, আদুড়ি কে ক্যালানোর টাইম পাচ্ছে না। সুকল মুর্মুর বউ সেলাই কল পেয়েছে। সুচেতন দুবরাজপুরে মাষ্টারি পাওয়ায় রোজ শ্রীহরি তেল ও আটা কলের দোকান বা শ্রীযদুনাথ মিষ্টান্ন ভান্ডার এর কোনোটাতেই বসতে পারছে না। তবু ছাত্র ইউনিয়ন ও দোকান দুটো ই দিব্য চলছে। অন্য গম্ভীর লোকেরা সুচিন্তিত দায়িত্ত্ব পালন করছেন।

ওদিকে স্বপন বহরমপুর কলেজে জয়েন করে ওখানেই আছে আর বিয়েতে হিরো হোন্ডা বাইক পেয়েছে। শুধু গেল হফতায়, কমল মামুর চায়ের দোকান থেকে গাঁজার গন্ধ পাওয়া গেছে বলে, হস্টেলের মেয়েরা রাস্তার ওপাশে বাবলু দার দোকানে চা খাচ্ছে, মামু খচে গিয়ে পাব্লিক কে প্রতিক্রিয়াশীল বরাহনন্দন বলেছে, কুড়ি বছর আগেকার লকাপের প্যাঁদানির স্মৃতি নিশচয় - ই তার ফিকে হয়ে এসেছে। এঁড়ে গুপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো হোস্টেল, প্রতি বিভাগে ওয়াটার কুলার এবং সর্বজনীন শিক্ষার দাবীতে ছাত্র ইউনিট সম্মেলন এর পোস্টার শাঁটার ফাকে ফাকে সময় পেলে মামু কে স্বান্তনা দিচ্ছে। শ্যাম দার ছেলের মাসিক দশ পার্সেন্ট এর মহাজনিতে একটু ভাটা পড়েছে। রাবণ মার্ডি র দাদা জামাই মার্ডি রিক্সা নিয়ে এখন আর বেরোয় না। তার কাশি সারে না। রাবণের ছেলে পল্টন তাকে ভাত দিয়ে আসে দু বেলা, কিন্তু পচুই দেয় না। বালিপাড়ায় আলো এসেছে। প্রতি বাড়ি, দুটি করে হলদে চল্লিশ ওয়াট। লোপাদিদি নিজের পরীক্ষা সত্ত্বেও সন্ধের লুক্ষ্মি আর ফুলমণি দের ক্লাসে পড়ানো কামাই করেন না। বাদল বাউল আসতে তখনো অনেকটাই দেরী।

ইত:প্রকার শান্তি পূর্ণ সময়ে ক্রিকেট মাঠ, ক্যান্টিন ও যথাক্রমে ছেলেদের আবাসনের করিডোর দাপানো, মেয়েদের হস্টেলের জানালার পর্দা বা গোপন অনুচ্চারিত কোনো কোনো হৃ দয়কোণ ইতি উতি কাঁপানো মনোজ মারা গেল। সকালে পেট ব্যথা। বিকেলে মৃত্যু। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত একাংক। নবীনবরণ নয়, রেডিয়োর প্রযোজক দের মত নিক্তি।

ইংরিজি বিভাগের বি এ দ্বিতীয় বর্ষীয় মনোজের সঙ্গে এমনিতে অবিশ্যি গেঁয়ো রফিক বা অনন্তর আর কোনো মিল নেই। তবে তিনজনেই কুড়ি র কম আর তিনজনেই অধুনা মৃত। তিনটি কাছাকাছি অথচ বিভিন্ন সময়ে মৃত্যু, সঠিক নিহিতি নির্ণয় টাই মুল সমস্যা । তিনটে কাছাকাছি কিন্তু আলাদা হাসপাতালে। মৃত্যু তো হয়েই থাকে। মনোজের ক্ষেত্রে, জটিল রোগ, খুব তাড়া তাড়ি জীবন সংশয়ের অবস্থা, ওষুধ এর অভাব, অচিকিৎসা, চিকিৎসা বিভ্রাট, চিকিৎসকের বা স্বাস্থ্য কর্মী দের গাফিলতি বা সৎ অজ্ঞানতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বা জেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অনুন্নত পরিকাঠামো, কলকাতা ও সদর কেন্দ্রিক নাগরিক পরিষেবা বা জেলা শাসকের নাতনির মুখেভাতের সম্ভবনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে 'শ' বা 'ষ' কে 'স' বলা বা স্ট্রিং থিয়োরী না জানা লোকের ভীতিপ্রদ সংখ্যাবৃদ্ধি ,স্বাস্থ্য পরিষেবায় স্থানীয় তথা জাতীয় তথা আন্তর্জাতিক ব্যক্তি পুঁজি,উৎকর্ষের, পারদর্শিতার অভাব বা বিলিতি শাসক তথা দীপ্যমান তরুন প্রজন্মের দেশত্যাগ বা রাজ্য নেতৃত্ত্বের প্রথমে অনুপ্রবেশকারী ও পরে সংখ্যালঘু তোষণ এর রাজনীতি বা ঘন ঘন পঞ্চায়েত নির্বাচন - কোনটা যে ঠিক দায়ী বলা মুশকিল! নানা মুনি, নানা গণতন্ত্র। এঁড়ে গুপ্ত বিভ্রান্ত। ইষ্পাতেও, সরাসরি কিছুই বলা নেই।

রাবণ মার্ডির ও খারাপ লাগছে। মনোজ হাসিখুশি ছিল, সুন্দর একটা সাইকেল ছিল তার, গোমড়া নয় রফিক এর মত, মাটিমেশা লাজুক নয় অনন্তর মত। মনোজ খেলার মাঠে খেললে, চার ছক্কা দেখাও যেত আর মাঠ থেকে রিক্সা স্ট্যান্ড এর দিক দিয়ে সন্ধেয় যদি টপকে বেরুত, সবুজ-সালোয়ার-কুর্তার জানালার অদূরে দাঁড়াবে বলে, রাবণ মার্ডি র সঙ্গে সে হেসে কথা বলত দেখা হলে, সিগ্রেট ও দিত কখনো কখনো। এঁড়ে গুপ্ত অবিশ্যি শ্রমজীবী দের সঙ্গে ডন হুয়ান দের মাখামাখি পছন্দ করতো না। তবে হাসতো দেখা হলে। হাসি,পছন্দ,অপছন্দ, সিগ্রেট, বিড়ি দেওয়া নেওয়া শেষ, কারণ ডন হুয়ান মনোজ গত বিকেল থেকে মৃত।

গোটা পাঁচেক ন্যাকা ছেলে মেয়ে র কষ্ট হয়েছে এট্টু বেশি। ক্লাসের ছেলেটা মরে গেল কেন জিগ্যেস করতে তারা হাসপাতালে না গিয়ে পারেনি পরদিন। বেশি পাকা বা রাগী ছেলে মেয়ে যে গুলো তাদের আর মরণ হয় না, আন্দোলন করবে তদন্তের দাবী তে। উত্তর কেন সমবেদনাও জুটছে না আপিসার আর ডাকতার বাবু দের কাছে,তাঁদের সময় কম, প্রচুর কাজের চাপ, এদের কষ্ট টা বাড়ছে, পারা টা চড়ছে। স্যালাইন দেওয়ার পরেই তো ওর ব্যথা বাড়লো, কেঁদে বলছে বন্ধু। স্যালাইন টা কি ঠিক ছিল? অগ্নিগর্ভ প্রশ্ন।

পাকা এবং রাগী রা নিশ্‌চয় প্রতিবাদী। ডাকতার দের ঘেরাও করছে? কর্মী দের গাল দিচ্ছে? সি আই ডি / সি বি আই তদন্ত চাইছে? ছোট বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ঘটনায় স্থানীয় জনমানস উদ্বেলিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য আপিসের কর্মীরা অপমানিত। কী, সহ কর্মী দের খিস্তি করেছে? কেলাবো না, উদুম কেলান, চাকরী তে বাওয়াল দিচ্ছো স্টুডেন্টের বাচ্চা? চিকিৎসা সমস্যা নিয়ে লাল-রাজনীতি করছো, ইনিভার্সিটির মদ্যে? মরেছে তো কি হয়েছে, শুধু স্টুডেন্ট মরে? লবাবের বেটা। কেলাও শালা দের। বাপ মা পাঠিয়েছে পড়তে , তা নয় লাইন মারবে সারাদিন আর এখন আবার মেয়ে-দেকানি মুভমেন্ট করছে। মার বেটাদের। হই হই রবে উদুম ছাত্রছাত্রী পিটুনি পর্ব সমাপ্ত। দুটি ছাত্রী সিরিয়াস আহত, লাথি খেয়েছে, যেখানে খাওয়াটা ভয়ের, লজ্জার। একটি ছাত্র পিটুনি তে অজ্ঞান, আদলায় রক্তাক্ত। অশান্ত অঙ্গন।

এইবার ডাকাবুকো ছাত্রগণের কাউন্টার কেলানি প্ল্যানিং ও একজিক্যুশন। মতাদর্শগত প্রভাব সমূহের মধ্যে সবাই আছেন। নানা পাটেকার, অমিতাভ, মামুথি, নবজাগরণী মিলন সংঘ (উত্তরভারতগামী ইঁট খ্যাত) , সিধু কান হু , চে, নানা ধরণের ঐতিহাসিক জনগণের নানা ধরণের সমরসজ্জা ,যেমন মারশাল ভদি র বাহিনী, বি পি এস এফের রশীদ আলি স্মৃতি, জঙ্গল সাঁওতাল, মায় এলাকার ঝন্টু, কুনি, গণেশ, হস্টেলের কারাটে বা হুইস্কি বিশারদ কিটটু, রজত, প্রদীপ, পিটার। গণ আন্দোলনের ব্যাপ্তি।

কর্মীরা ততক্ষণে বেগতিক দেকে পলাতক। রোগা কাউকে হাতের কাছে না পেয়ে ছাত্র নেতৃত্ত্বের সামান্য থমকানো, পরক্ষণেই কাচ ভাঙ্গা ও পোড়ানো চালু। অসংখ্য জানালা, স্কুটার এর আয়না, হেডলাইট, বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ির কাচ চুরমার, সিট কাটা, জীপে অগ্নিসংযোগ প্রচেষ্টা তথা অভিজ্ঞতার অভাবে ব্যর্থতা। বেশ কিছুক্ষন পরে বস্তুত একজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপকের চেষ্টায় আর হস্তক্ষেপে এই সব থামলো।

ছাত্রী আহত একজন, তাকে নিয়ে এঁড়ে গুপ্ত অন্য জেলার হাসপাতালে গেল। ভাগ্যিস ছাত্রীটি আহত। কারণ ছাত্র রা আহত হলে খবর হয় না ভালো। পরের দিন ভালো খবর হবে, শ্লীলতা কেন্দ্রিক, দিব্য মুচমুচে, সংবেদনশীল সাংবাদিকতা।

দুপুরে রাবণ মার্ডি জেনেছে সব, একই রিক্সা Ùট্যান্ডের শিশির খুব স্বাভাবিক ভাবেই পুরোটাই দেখেছে বা শুনেছে, কি করেছে সেটা বড় কথা নয়। আর ভেবেছে স্কুল বন্ধ হলে সকালে স্টেশান বা বাসস্ট্যান্ড যেতে হবে ভাড়ার জন্য। আপত্তি নেই, মনোজ ছেলেটা কে বেটা রা ওষুধ ই দেয় নি, বেশ করেছে কাচ ভেঙ্গেছে ছেলেরা। কারোর চাকরী হয়না , কিসের জন্য আপিস কাছারি। বাবুই মার্ডি একটু টেন্সড। বড়লোক বা বড়লোকের বউ হলে হার্ট চেকাপ করাতো। পয়সা না থাকায় হার্ট নেই। পচুই আছে। জায়গাটাও ছোটো, স্বাস্থ্য পরিষেবার সমস্যার কথা আগেই বলা হয়েছে।

বিকেলে মিটিং। ছাত্র দের সাধারণ সভা। রামকিংকরের গান্ধী আর কলের ডাকের সেই অবিস্মরণীয় মুর্তি দুটির মাঝামাঝি, সমদূরত্ত্বে। লাগাতার আন্দোলনের সিদ্ধান্ত সর্বান্ত:করণে গৃহীত হতে দু মিনিট লাগলো। দাবী ইত্যাদি ক্ষুদ্র কত গুলো বিষয়ে অবশ্য নেতৃত্বের মধ্যে সংশয় ছিল। এঁড়ে র শ্রদ্ধাস্পদ রা চাইলেন, মনোজের মৃত্যুর
পূর্ণাঙ্গ ডাক্তারি তদন্ত এবং আক্রমণকারী কর্মী দের শাস্তি আর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্ত বিষয়ে স্বচ্ছতা। আরো বিপ্লবী রা চাইলেন তদন্তকারী কমিটি ও হাসপাতাল পরিচালনায় দীর্ঘকালীন ছাত্র প্রতিনিধিত্ত্ব, প্রয়োজনে ব্যারিকেডে উত্তরণ। লী জিনস, রুপোলি চশমা, স্কলারশিপ আর ভালো রেজাল্ট ওয়ালা অরাজনৈতিক রা চাইলেন মেডিকাল কার্ড এর প্রবর্তন ও কম্পুটার এ ছাত্র দের মেডিকেল রেকর্ড এর সংগ্রহ এবং আহত ছাত্রী দের জন্য সাইকোলোজিকাল কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা । দেশপ্রেমিক রা চাইলেন, ডাকতার দের জেরা, হারিয়ে যাওয়া বা বাইরে থেকে আসা দোষী দের শাস্তি আর কর্মী, অধ্যাপক, ছাত্র ছাত্রী দের সুসম্পর্ক ফিরিয়ে আনার দাবীতে ও গন্ডগোল এড়াতে পুলিশি ব্যর্থতার প্রতিবাদে শান্তিপুর্ণ অনশন। বাকি দের চাওয়া গুলি অবশ্য এত টা সংহত নয়। ন্যাকা ও রাগী রা জানতে চায় মনোজের ঠিক কি হয়েছিল। স্যালাইনে কি ছিল? কেউ জানতে চায় ছাত্রী দের আন্দোলন এ যোগদানের এর স্বার্থে সারারাত অনশন এর সময়ে ছাত্রীনিবাস গুলি খোলা থাকবে কিনা, অধ্যাপকেরা সমর্থন করছেন কিনা বা বিশেষ বিশেষ অধ্যাপকেরা রেগে যাচ্ছেন না তো, ক্লাস হয়নি বলে বা কাউকে কোনো নোট দিয়ে দেন নি তো কেউ? কেউ জানতে চায় পোস্টারে হাতের লেখা চেনা যায় কিনা! কেউ জানতে চায় প্রেস আসছে কিনা, এলে কোন সাংবাদিক আসছেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পরিচালনা সমিতির সদস্য প্রখ্যাত মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আসছেন কিনা, এলে সমর্থন দেবেন কিনা? কেউ জানতে চায় অনশনে অরেন্‌জ ড্রিঙ্ক চলে কিনা। রাবণ মার্ডি জানতে চায় হস্টেল কি বন্ধ হয়ে যাবে, গেলে তাকে ভাড়ার জন্য যেতে হবে জাম্বুনি বাস Ùট্যান্ড। পল্টন মার্ডি জানতে চায় মনোজ বা এঁড়ে কে রাবণ মার্ডি চিনলো কি করে?
কমল মামু জনগণ সম্পর্কে তার মন্তব্য প্রত্যাহার করেছে, ছাত্র ছাত্রী রা আন্দোলন সংগঠনের ব্যস্ততায় চায়ের পয়সা না দিলে খিØতি করছে না। কিন্তু বেশি জানতেও চাইছে না।

এর পরের ঘটনাবলী সরলগতি। অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে। বাইরে সামান্য জটিল।

এঁড়ের শব্দসংগ্রহে দুটি নতুন শব্দের প্রবেশ। সাইনে ডাই। ব্রাহ্মোপাসনা র অঙ্গনে শান্তি পূর্ণ দু দিন দু রাত্রি ব্যাপী অনশন। দু মাইল দূরে ডাকবাংলো ময়দানে আগের শীতের যাত্রানুষ্ঠানের মত। নিদ্রামুক্তির জন্য মাঝে মাঝে গীতি ও বক্তব্য পরিবেশন। পুলিশ প্রতিরক্ষা। এদিক উদিক দু চারিটি নব্য হৃ দয় দেওয়া নেওয়া বা বলে-না-ওঠা অথবা পরিবর্তিত পরিস্থিতি তে প্রত্যাখ্যান সহ অশ্রু। এঁড়ের অন্তহীন উৎসাহে এলাকার মানুষের কাছে একটি দুটি ঘনিষ্ঠ বন্ধু দের সাহায্যে ছাত্র দের দাবী ব্যাখ্যা ও প্রচার। এঁড়ে কথকতা প্রেমী। অতিউৎসাহে পার্শ্ববর্তী বিশ্ববিদ্যালয়ে, রাস্তায় রাস্তায়, স্টেশনে, বাস স্ট্যান্ড এ প্রচার ও কিছু উৎসুক ভিড়। ভিন্ন ভিন্ন রাজনীতির ছেলে মেয়েরা এক সূত্রে গ্রথিত দেখে অবয়বহীন জনতার পক্ষ থেকে কিছু প্রকাশিত বিস্ময়। ছোটো গ্রাম্য জায়গা। সবাই সবাই কে চেনে।

এরি মাঝে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও বিবদমান ছাত্র ও কর্মী নেতৃত্ত্বের দফায় দফায় আলোচনা ও তদন্ত কমিটি গঠন। সবধরণের প্রাচীন দাবী র সঙ্গে কোনো রকম ঘনিষ্ঠ সম্পর্কহীন অবশ্য। তবে একটা ছেলে মরে গেছে এইটা কারো কারো এত ঝামেলার মধ্যে যদি মনে না থাকে সেটা তেমন দোষের কী? ইন ফ্যাক্ট বাকি দুটোর মধ্যে যেটা হাসপাতালে মরেছিল তাকে নিয়ে তো এত ঝামেলা বা আলোচনাই হয় নি। অন্যটা তো গাঁয়েই অক্কা। যাই হোক গঠনমূলক কাজের বিবরণীর সময়ে এত বাজে কথা কইতে নেই। গঠন চলছেই। প্রচুর শুভাকাঙ্খী অধ্যাপক অধ্যাপিকা রা, শ্রদ্ধেয় আশ্রমিকরা বোঝাচ্ছেন ছাত্র ছাত্রী দের, আলোচনা কর, অনশন কোরো না, শরীর খারাপ হবে। ক্লান্ত লক্ষ্মী বাচ্চারা শুনছে।সত্যি তো। কেউ কেউ একটু ঠ্যাঁটা, কিন্তু শোনারাই বাড়ছে সংখ্যায় ।

রাবণ মার্ডির ক্ষেত্রে তাছাড়া এই খান থেকেই সামান্য অনধিকার সহমর্মীতার উপাখ্যানাংশটির শুরু। অনতিকালে যার নটেমুড়ুনি-দশা প্রাপ্তি ঘটেছিল।

অনশন যেদিন শুরু হয়, সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আশে পাশে র কাকিমা জেঠিমা , যাদের ঘরের ভুতোর-বাপ-বা-ওগোহ্যাঁগাগণ আক্রমণকারী বা আক্রান্ত কর্মী নন, তারা রেগে যান। ছাত্র ছাত্রীর মা মাসি না হলে এতে দু:খ হওয়া কঠিন। একেতো ছেলে গুলো বাড়ি আসছে না, তায় ওদের কর্মী রা পিটিয়েছে , তার উপুরে অনশন, হস্টেলের মেয়ে গুলো ও নাকি রাতে ফেরে নি কাল রাত্রে। বিপদ চারিদিকে। এই গরমে মারা যাবে বাচ্চা গুলো। কনফিউশন ও ছিল। ছেলে ক্যালানি খেয়েছে-দিয়েছে, স্বামী কেলানি দিয়েছে-খেয়েছে, সেমসাইড আশংকা। তাঁরা গৃহদাহে চুপ। কিন্তু তবু মোটের উপুর আস্তে আস্তে অনশনের কারণে, আন্দোলন, এলাকায় জনসমর্থন পেতে আরম্ভ করলো। কিছু সই সংগ্রহ হোলো, কিছু বেকার যু¤বক ও মহিলা সংগঠন এগিয়ে এলেন। সমর্থন এর জন্য প্রস্তুত নয় গণআন্দোলন। তবু সমর্থন আসছেই।

একই সঙ্গে কিন্তু আন্দোলনের ধার ও কমছে, নেবু জল বা রসনা খেয়ে হিসি পেয়ে যাচ্ছে, ছাত্রছাত্রী রা মাঝে মাঝে ই হস্টেল ফিরে যাচ্ছে। কেউ ফেইন্ট হয়ে যাওয়ায় নতুন করে হাসপাতাল যাচ্ছে। সংবেদনশীল ও ঐক্যবদ্ধ ছাত্র নেতৃত্ত্ব সবটাই বুঝছেন,বিরাম দিচ্ছেন, নিচ্ছেন, ভাবছেন। কি বিচিত্র দোটানা পরিস্থিতি। মাইরী। বাপন দার দোকানে শক্তি বিড়ি ও এর ই মাঝে হঠাৎ শেষ। উফফ। পরশু রাতে যে বড় সড় চেহারার মেয়েটি আর ব্যাঁকা রোগা ছেলেটি 'জীবনের জন্যে' গেয়েছে আজ তারাই 'হেথায় আমায় মানায় নাগো' গাইছে। শালারা সিনিকাল।

কাকিমা, জেঠিমা , মাসিমা দের মত দ্বন্দে দীর্ণ না হলেও এলাকার অন্যান্য মানবকুল কোনো কোনো ভাবে এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত। যেমন রাবণ মার্ডি র নতুন (পচুই জনিত?) আবেগ। এঁড়ে টা খুব দৌড়চ্ছে, সারা রাত পোস্টার লাগাচ্ছে, শিশির এঁড়ে কে কাল স্টেশনেও দেখেছে। বাচ্চা থেকে চিনি। মনোজ টাকেও চিনতাম, ভাবে রাবণ, এট্টু কিছু করি। রিক্সা স্ট্যান্ডের ভুটে দা, উত্তম, রাজু দা, শিশির,নবীন রাজি। এগারো জন সব মিলিয়ে। বারো টা টাকা চাঁদা উঠলো, রাবণ নিজে দিলো দু টাকা। অন্তত অনশন ভাঙলে প্যাড়া জল খাবে ছাত্র রা। কাল রাতে এঁড়ে কে খুঁজে পায় নি রাবণ। আজ সকালে যখন পেলো, বারো টা টাকা, কিসসু নয়, মাত্র বারো টা টাকা র জন্য তো আর ইতিহাস দাড়িয়ে থাকবে না, ততক্ষণে আন্দোলন শেষ। না শেষ নয়, ভুল রিপোর্ট, শেষ হবে এক ঘন্টা পরে। তদন্ত কমিটি গঠিত। স্বাভাবিকতার আবেদন করছেন প্রশাসন। এঁড়েও ভাবছে হ্যাঁ তদন্ত ই সঠিক পথ, নইলে ঐ পাকা ও রাগী রা বা এঁড়ে নিজে জানবে কি করে কি হয়েছিলো মনোজের। অনন্তের। রফিকের। ও না শেষের দুজন তো নয়। গুলিয়ে যায় ক্লান্তি তে। কিন্তু বারো টাকা সহ রাবণ মার্ডির সাহায্যের হাত আর ঈষৎ হলদে হয়ে যাওয়া চোখ কে প্রত্যাখ্যান করার মত শক্তি পায় না। পল্টনের বাপ কে তো ছোট্ট থেকেই রিক্সা চালাতে দেখছে এঁড়ে।

কিন্তু গণ আন্দোলন আপাত নির্বাপিত বা জনগণে র মধ্যেই আবার ফিরে গেছে।

আজ এই ষোলো বছর পরে গঠনমূলক ইতিহাস এর ধারা অব্যাহত রয়েছে। এই ইতিহাস সেদিনের ছাত্রছাত্রী দের উল্টে পাল্টে সৃষ্টিশীলতার সম্ভবনা প্রভূত বাড়িয়ে দিয়েছে। সেদিনের সংবেদনশীল ছাত্র ছাত্রী রা , মানে জীবিত রা, প্রত্যেকেই নানা ভাবে সাফল্যের অথবা কোনো না কোনো শপিং মলের সিঁড়ির নানা ধাপে। মূলত: উঠছেন। তাঁদের ছেলে মেয়েরা যাতে অকারণে গণআন্দোলনে জড়িয়ে না পড়ে, খেয়াল রাখছেন কেউ কেউ। এঁড়ে স্বাভাবিক ভাবেই এই ঢলে নিশ্‌চিহ্ন। কোনো না কোনো ইতিবাচক কাজে সবাই ব্যস্ত। স্নেহশীল অধ্যাপকেরা অবসরের পথে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ও অন্যত্র অপুর্ব বিস্মৃতি ও ভবিষ্যত চর্চা। কর্মী রা ছাত্রদের ক্ষমা করেছেন। আমাদের ই সন্তান সন্ততি। ছাত্রী রা চেপে গেছেন, কোথায় কে মেরেছিলো বাচ্চা কাচ্চা দের জানার দরকার নেই। তেল ও আটা কল টি ভাল চলছে এবং মিষ্টান্ন ভা¾ডার এখন নতুন পানাগড়ের রাস্তা তৈরী করতে আসা ইঞ্জিনীয়ার দের ভাত মাছের ঝোল খাওয়ানোর একটি আলাদা পাকা হোটেল এ পরিণত। মিষ্টিও চলে খুব। পেশাদারী ভারতীয় বিপুল শক্তি তে জাগরুক। কৃষির সাফল্য সংহত করে বালিপাড়ার অনেকেই ভাগচাষী আর নন, অন্য ধরণের শ্রমজীবী। পল্টন যেমন ব্যস্ত জলের মিস্ত্রি। জামাই মার্ডি মৃত। রাবণ মার্ডি রিক্সা চালায় না। বাপ বাবুলাল মার্ডি রাবণের স্বপ্নে এলেও ক্ষুধা বা তার বাপ অর্ধোন্মাদ নসুই মার্ডি কে নিয়ে আসে না। রাবণ কিছুই ভোলে না। কিন্তু জানে না বোধ হয় ঐ বারো টাকা আন্দোলনের কাজে লাগে নি। কিন্তু খোঁজ ও নেয় নি। নৈর্বক্তি। পল্টন ই রাবণ কে দেখা শুনো করে। অন্য পারমিতা, পাপিয়া, জয়তি দের মাথার দোলনচাঁপা,কুর্চি র বদলে আসা শিরীষ ফুল,মুচকুন্দ, অন্য কোনো কিশোরের স্বপ্নে লীন। পার্থ দা হয়তো মূল স্প্যানিশ এ কিছু পড়ছে। এক বা অন্য লোপাদিদি অন্য কোনো কোথাও পড়াচ্ছেন অদ্ভুত একইরকম যত্নে। বাদল বাউল এলেও আসতে পারে কিছুদিন পরে। শেষ শিমুল টি মাটিতে পড়ে নি যদিও এখনো।

মনোজ এর চার ছক্কা তাও মাঝে মাঝে আলোচিত হয় বুড়ো ক্রিকেট কোচের গালগল্পে। কমল মামু গাঁজা ছাড়ে নি। খেলার মাঠের বাইরে শুধু পনেরো জনের কথা জানা যায় না। খুব স্বাভাবিক অথচ ভিন্ন ভিন্ন কারণে। তিনটি মৃত ছাত্র। দুটি পাতি ও একটি উপরের গুরুত্ত্বের দিক দিয়ে আলাদা। কারণ তারা মৃত। আর বারো টি ঘর্মাক্ত,নোংরা, অজৈব, কুঁচকানো এক টাকার নোট। এঁড়ে সেদিন ক্লান্ত ছিল এবং এঁড়ের বুক পকেট তখনো ইতিহাস সচেতন ছিলো না আলাদা করে। তবে রাবণ মার্ডি বা পল্টন মার্ডি এবং অন্য কোনো দুটো টাকা হয়তো কিছুটা একলা হলেও, হয়তো সম্ভবনা খুব কম, তবু অন্য কোনো দিন, কাজে লাগার অন্য সুযোগ পেলেও পেতে পারে।



শব্দ :
পচুই - বাড়িতে তৈরী ভাত পচানো মদ।