আপনার মতামত         


একটি অপ্রতিবেদনিক বইমেলার কাউন্টডাউন
শমিত রায়





প্রথম পরিচ্ছেদ


"প্রথম যেবার স্টল করি সে কি মজা সারা রাত জেগে রঙ করছি নিজেরাই তখন তো নিজেরাই সব কিছু এমন কি পেরেক দড়িও নিজেরাই বুঝলে আলম সে ভারি মজার সব কেস সারা রাত সবাই মিলে মাঠময় তারপর রঙ খুঁজতে বেরোতাম বড় বড় স্টল বালতিতে ........'

মাঠ জুড়ে অলরেডী জড়ো হয় প্লাইপেরেকে ঠাসা ময়দানভঙ্গিতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন ব্রতীন(১) । সেই রোদ থেকে স্টল নং , প্রুফবিধি লিখছেন রসিদ ও ফ্লোরপ্ল্যান , সরু সরু যোগ ও গুণ তাঁর কবিতাকাগজে । এ কয়েকদিন সন্ধ্যার নিবিঢ় পাঠহেতু তাঁর ঠোঁটে বার বার ডেকরেটার্সের আলমের নাম । সকলেই জানে প্রতিবার ঠিক এই বইমেলা এলে তাঁর ব্যক্তিগত লিখনভঙ্গিমা খোলা হাওয়াই চটির বদলে হয়ে যায় এ বাবদ অতিরিক্ত ঘাম ও ভালোবাসা মুছে ফেলার একটি অন্য রুমাল । আর তাঁর আরক্ত মুখ তুলে তাকাতেই চোখের পাতায় ভ্রূরোমে ধুলোয় ধুলো মাঠময়দানের শান । বই কিছু এসে গেছে নতুন ও পুরনো মেশানো কিছু কীটদষ্ট রেয়ার কপি এখানে তাঁর কাঁধ বাহু কব্জি বেয়ে টন টন নেমেছে ঘাসজমিতে । বিশাল থলেদের মতো পড়ে আছে সোজা ও কোনোটি কাৎ , দড়িবাঁধা , কিছুটা অস্থির কিছুটা অসহায় চিতানো কাছিমগুলি(২) ব্রতীনের সামনে ও পেছনে এ মুহ¨র্তে ডাঁই । গেট লেগে যাচ্ছে আজ স্টল মহল্লায় অতএব বইগুলি সু¤রক্ষিত থাকবে দু'চারটি রুপোলী বইপোকাও এ ভেবে খুশিয়াল সিগারেটে অপেক্ষা পোড়াতে থাকেন তিনি । আলমের লোকজন প্লাই গাঁথে রঙ আর পেরেকবাটামে(৩) তাঁর আগাম ক'দিনের হোয়্যারাবাউটস তৈরী হতে থাকলে মনে পড়ে জুতো থেকে ধুলো ঝাড়ার প্রয়োজন থাকবে না বেশ ক'দিনের জন্য জুতোর রঙই যেন ময়দানজোড়া বিকেল । তখনি তাঁর চোখ জুতোয় পা টেনে বের করতেই এ হেন চ্যুতিফলে হেলে ওঠে বইপিসার টাওয়ার । খেয়াল হয় জুতো বা যেকোনো কারনেই ক'দিন পা নড়ানো প্রায় নিস্ফল ভালোবাসায় তাঁর এই উপত্যকাবলে । কিন্তু ডাক আছে চত্বরে তাঁকে আজ প্রেসে যেতে হবে কেননা কথা আছে বাইন্ডিঙে যাবে তাঁর এবারের কবিতাশরীর আর কাল বাদ পরশু তারা কি চমৎকার বাঁধানো মলাটে ঘুরে ফিরবে ময়দান মাঝারে , নত হবে পাখিপাঠকের ঠোঁট । এ ছবি দেখতেই ব্রতীন পুনরায় প্রস্তুতিপাটে আর ৯১০ নম্বর গেট কোলাপসিবলে তালা লাগে আজ রাত্রেই । তবে সিলিং লাগে না ও বাকী থাকে নাম লেখা , রঙের প্রলেপ । ব্রতীন হাঁটতে থাকেন প্রেসফর্মায় তাঁর কিছু শঙ্কা ও উত্তেজনা জমলে ছাপাখানার রাস্তা তিনি দ্রুত গুটিয়ে ফেলেন ট্যাক্সি হলুদের সস্তা এফ.এম.।



(১) প্রকৃতপক্ষে ব্রতীন নামের কাউকে চিনি না কোনোদিন তবু শুরুতেই সেÀহভরে ওর নাম রাখি ব্রতীন যেন ব্রতীন নামের কারোর সাথে আমার বহুদিনের পরিচয় । ভালোনাম দিই ব্রতীন্দ্র । পদবী রাখি না কারণ ওর বাবার নাম ভাবা এ মুহ¨র্তে খুব অবান্তর মনে হয় । নিজেই ঠিক করি ব্রতীনকে একাধারে বইমেলা ও কবি ভাবি - ফলে ব্রতীন লটারী বা কোনো ধরাধরি ছাড়াই ৯১০ নং স্টল পায় বইমেলায় কোনা ঘেঁষে , তার এবারের কবিতার বই বেরোবে ঠিক হয় ২-১ দিনের মধ্যে আর এত কিছু এত সহজে ঘটিয়ে ফেলে একরকমের আত্মপ্রসাদ অনুভব করলেও এসবে ব্রতীন খুশী হয় কিনা বুঝে উঠতে পারি না ঠিক , হয়তো এ প্রথম পরিচয়ে ব্রতীনকে আগে কোনো দিন না চেনার কারণে ।

(২) চিৎ করা কাছিম দেখেছিলাম ভারী অসহায় ও চলচ্ছক্তিহীন - একবার বনগাঁর বাজারে সে খুব বিচ্ছিরী রক্ত-টক্ত আর অন্যবার সু¤র্য ডুবছিলো বিষণ্ন চোখে শংকরপুরের বীচ দেখছিলো সে ।

অলিভ ব্লু রিভার টার্টল (গ্যালানোমাস সেলিকোপোলাস): এই বিশেষ প্রজাতির মিষ্টজলের কচ্ছপটি প্রানীবি¡নীদের সবিশেষ কৌতুহলের কারণ । পৃষ্ঠদেশবর্তী খোলের উপরিভাগের নীলাভ সবুজ রং গ্যা. সেলিকোপোলাস প্রজাতির সহজ সনাক্তকরন ও তালিকাভুক্তির সহায়ক (সূত্র: অ্যাশ অÉন্ড বার্নার ; ১৯৬৮) । খাদ্য মূলত: ছোটো মাছ , জলজ ইঁদুর , ফল ও শামুক । বিচরণ মূলত: ভারত, বর্মা, বাংলাদেশ, বরানগর, আলমবাজার, মায়ের আসীর্বাদ ট্রলার ও ইন্দোনেশিয়া, দারুচিনি দ্বীপ ও সু¤মাত্রার নদীমোহনাবর্তী জলে ও উপকুল বাজারে , স্বাদ গ্রন্থিতে ।

লং-নোজ্‌ড সী টার্টল বা গ্রেট বেংগল সী টার্টল (একটোসেফালিস বেঙ্গলিয়েনসিস): লম্বা নাক ও অতিরিক্ত কৌতুহলপ্রবণতার কারণে ইহাদের লং-নোজ্‌ড বা গ্রেট বেংগল সী টার্টল বলা হয়ে থাকে । কিয়ৎবর্ষ পূর্বেও এই বিশেষ প্রজাতির কচ্ছপ হাজারে হাজারে উঠে আসত শেয়ালমারি , মাথাভাঙ্গা থেকে শুরু করে দক্ষিণ মায়নামারের রিমপোম অঞ্চলের সমুদ্রতটবর্তী গ্রাম ও বিবিধ তৈজসপত্রে । বর্তমানে এ. বেঙ্গলিয়েনসিস প্রজাতির কচ্ছপের সংখ্যা সর্বসাক¨ল্যে ১৩০০ (সূত্র: মেয়ার্স , গ্রিফিথ অ্যান্ড রবিনসন ; ২০০৪)

(৩) বাটাম (বি:) - ১. কাঠের সরু ও দীর্ঘ টুকরো বিশেষ - হালকা কাঠামো আদি প্রস্তুতিতে ইহার ব্যবহার হইয়া থাকে । (উদা: &হয়ষঢ়;&হয়ষঢ়;...... এইখানে আর দুটো বাটাম মারো হে মিস্তিরি - ফুঁ দিলে খুলে পড়বে যে .... '' - শহরমিস্তিরির উপকথা , অসীম গঙ্গোপাধ্যায় , ১৯৫৮ , ১৩শ সং, পৃ: ১৩২) ; ২. &হয়ষঢ়;ঐ' দেওয়া - (প্রচ:) বিশেষত: অপছন্দের কোনো ব্যক্তিকে হুড়্‌কো (হুড়্‌কা - পৃ: ৪৬৭ দ্র:) দেওয়া ; গূহ্যদেশে অসাধু¤ উদ্দেশ্যে আঘাতপ্রদান । (উদা: &হয়ষঢ়;&হয়ষঢ়;......ঘ্যাঁটারিকে ঘাঁটিয়েচো কি শালা দেবো বাটাম বোঁদাগঙ্গায় শুইয়ে ....... '' - আবাল আবডাল , দিবাকর ভাচার্য , ১৯৯২ , ২.৫ সং , পৃ ৪৯)




দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ


""এটা কি হচ্ছে গৌরাঙ্গদা সবে বলছেন দু ফর্মা নেমেছে অ্যাদ্দিনে কি ব্যাপার বলুন তো মেশিনে কি অন্য কিছু তুললেন নাকি দেখি দেখি যা ভেবেছি কি ব্যাপার গৌরাঙ্গদা আমি কি কম দিয়েছি ওদের থেকে বাঁধা পার্টি আমি আজ দশ বছর আপনার প্রেসে তবু আপনি আমারটা নামিয়ে ওদেরটা তুললেন এদিকে পরশু উদ্বোধন উফ আপনি এবারে ডুবিয়ে দেবেন মনে হয় ....'

লোহাটে আওয়াজের একঘেয়ে প্রেস দপ্তর ও ছাঁটকাগজ কালির মাঝে নিজেই একটি অসমাপ্ত বই হয়ে পা ঠোকেন ব্রতীন(১) , ফলে মেঝেতে তীব্রক্ষুর নালের শব্দ ওঠে অস্থির । একটি ঘোড়ার মতো তেজী ও তুর্কী যেন লাগামবশে আটকে আছেন আর ঘন ঘন নি:শ্বাসে ফুলে উঠছেন ছোটার আগে যেন দম নিচ্ছেন প্রস্তুতির শর্তে । গৌরাঙ্গদার প্রেস ঘষাওঠা , ঢিলে আর সেই কবে গৌরাঙ্গদা লেখালিখির কথা ভাবতেন বলে এসব কবিতা ও পান্ডুলিপি বইমেলার মরসু¤ম এলে জেগে ওঠে বিয়েকার্ড , বিলবই , লিফলেটের ভীড়ে । ব্রতীনও জানেন এসব কবিতা ও পত্রিকা ছেপে দেওয়া কম রেটে ধার বাকি জোরাজুরি গচ্ছিত অধিকারবোধ - সব-ই প্রকৃতপক্ষে গৌরাঙ্গের যৌবনের প্রেম ও স্মৃতির উসকানিমাত্র যার প্রভাবে গৌরাঙ্গদা কখনো সখনো রামে ভেজা সন্ধ্যারাত্রে চুপি চুপি দেরাজ থেকে বের করে আনেন একটি রুলটানা খাতা ও নীল ডটপেনের মিহি আলো । ব্রতীনের সামনে বশংবদ গেলাসের লালচে রঙে ছায়া ধ'রে গৌরাঙ্গদার বিষন্ন মুখ তখন ফুঁপিয়ে ওঠে ব্যর্থ কবিতায় । ফলত: এ মুহ¨র্তের অসহিষ্ণুতায় জোরালো হলে ব্রতীনের অভিমানী ক্ষুরের শব্দে কেঁপে ওঠে প্রেসবাড়ি , আঠার (২) বাঁধাই । চায়ের বদলে আজ আবার রাম আসে রাতভর কাঁচের গেলাসে লেখা হয় রুলটানা খাতার আদল আর গৌরাঙ্গদার ঢিলেঢালা ইস্ক্রুপ প্রেসযন্ত্রে সীসা ও ফর্মার আদলে ছাপা হতে থাকে মাপাজোকা ব্রতীনের এবারের কবিতাশরীর । ব্রতীন দেখতে পান যেন তারা অহংকারী হবে এ বছরে হার্ডবাউন্ড কভার অফসেটে হালকা দেমাক লেগে থাকবে তাদের গ্রীবায় । এসব ছবি খুব স্পষ্ট হয়ে উঠলে মাঝরাত নাগাদ গৌরাঙ্গদার চোখে ঈর্ষণীয় হন ব্রতীন ও তাঁর ঘুমচেয়ারের অ্যাঙ্গেল । ফলত: প্রেস(৩) যন্ত্রে দ্বিধা আসলেই ঢিল পড়ে টান টান ছাপে ও এক সময়ে সব শব্দ থেমে গেলেও লেই আঠার গামলায় জড়ো আরশোলার দলে কিছুমাত্র চাঞ্চল্য দেখা যায় না । বরং ফর্টি ওয়াট বাল্‌ব আলোর নোংরা হলুদে কতগুলি অসমাপ্ত বইপাতার সাদা-কালোতে লুটোপুটি ব্রতীনের কবিতাশরীর খুব কাছ থেকে মেপে নিতে পারে সে রাতে একমাত্র তারাই ।



(১) অথচ ব্রতীনকে না চিনলেও তার এই আচমকা অসহিষ্ণুতা দেখতে ভালো লাগে তার এই গড়ে ওঠা । আমারি হাতে বলে কিছুটা স্বচ্ছন্দ হলে জিগ্গেস করি মদ চলে ? - রাম । বুঝি ব্রতীনের বয়স ষোলো পেরিয়ে অনেক তাই ঠিক করি এবার থেকে একদম মাই ডিয়ার - বন্ধুবৎ পিতার মতো । ফলে সেদিন ব্রতীন মদ খায় ঢের রাত , ভোরের দিকে উদুম বাওয়ালী করে আমার কী-বোর্ডময় আর শেষরাতে ঘুমিয়ে পড়ে আমাকে &হয়ষঢ়;তুমি বাঁরা রাম হারামি' বোলে । এ হেন মেগালোমনে পাকা লেখকের মতো চরিত্রটির ট্র্যাজিক সম্ভাবনাময়তায় আমি বড় পুলকিত হই ও ব্রতীনকে পরের পরিচ্ছেদেরও কেন্দ্রীয় চরিত্র করবো বলে মন:স্থির করে ফেলি তৎক্ষণাৎ । পুনরায় আত্মপ্রসাদ ফিরে ।

(২) আঠা একপ্রকার যৌগিক মিশ্রণ যা দুই বা ততোধিক পৃথক বস্তু , ঘটনা , কাগজ , মানুষ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক বিষয়কে একসঙ্গে জুড়ে দেয় বা দিতে পারে । উৎপত্তি ও গঠন অনুযায়ী আঠা মূলত: চার প্রকার - উদ্ভিদ্‌জ , প্রাণীজ , মনজ ও খনিজ । সমগ্র মানবসভ্যতার ইতিহাসে আঠার ব্যবহার ও ভ¨মিকা সু¤প্রাচীন । আঠার আবিস্কার কোথায় হয় সে নিয়ে বিতর্কের শেষ না থাকলেও উত্তর চীনের সিলাং শহর থেকে ৩৩ কিমি দূরে ঝিয়াং রাজতেÆর সমসাময়িক পুরাতাতিÆক নিদর্শনগুলির মধ্যে যে চীনামাটির বাসনগুলি পাওয়া যায় তার একটির গায়ে লেখা দেখা যায় &হয়ষঢ়;আহা এমন আঠা আমি কোথায় পাই যা আমার বাসনগুলির মতো আমার ভাঙা হৃদয়কেও জুড়ে দিতে পারবে' । কবির ব্যর্থ প্রেম ও সাড়ে আট হাজার বছর আগে আঠার ব্যবহার নিয়ে ব্রিটিশ ঐতিহাসিক উইলিয়াম লিন্ডসের বিখ্যাত গবেষণা (আঠা - একটি সামাজিক মলম : প্রাচ্য সূর্যের আবিস্কার আবির্ভাব উত্থান ও পতনের আর্থ-সামাজিক ইতিহাস বিষয়ক পত্রাবলী ; স্যার উইলিয়াম লিন্ডসে ; নোবেল স্মারক সমিতি ; ১৯৬৫ ; ১ম সং , পৃ: ৪৫৬ , ৫৬৮-৫৮২) থেকেই বিশ্ববাসী প্রথম আঠার অপরিসীম গুরুতÆ সম্পর্কে সম্যক সচেতন হতে শুরু করে । এ কারণেই স্যার উইলিয়াম লিন্ডসেকে &হয়ষঢ়;আধুনিক আঠার জনক' ও তাঁর জনÈদিন ২৮শে নভেম্বর আজো সারা বিশ্বজুড়ে &হয়ষঢ়;বিশ্ব আঠা দিবস' পালিত হয় । ভারতবর্ষেও আঠার ব্যবহার সু¤প্রাচীন । খ্রীষ্টজনেÈর প্রায় ২৫০০ বছর আগে বর্বর বৌদ্ধ যুগে পরÙ»£ অপহারককে শাস্তিস্বরূপ হাতে যবচ¨র্ণ ; গন্ধক , ইঙ্গুদী ও নানাবিধ রসায়নের আঠালো মিশ্রণ মাখিয়ে বৃহৎ প্রস্তরখন্ড বা প্রাসাদের দেওয়াল ধরে দাঁড়াতে বাধ্য করা হতো । উক্ত মিশ্রণ কিছুক্ষণের মধ্যেই শুকিয়ে গেলে শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তির নড়বার উপায় থাকিত না । সে ঐ স্থানে দেওয়াল ধরেই অনাহার ক্ষুধা তেষ্টায় প্রাণত্যাগ করত । (সূত্র: প্রাচীন ভারতবর্ষের সংশোধনাগার ও উৎপীড়নপদ্ধতির বিবর্তন ও সামাজিক প্রভাব ; আচার্য হরনাথ সেনশাÙ»£ ; কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ; ১৮৯৮ ;১ম ও শেষ সং ; ৩য় পরিচ্ছেদ ; পৃ: ১১২-১২৩ )

(৩) ইং press এর আক্ষরিক ও সামাজিক লিপ্যন্তর ; বি. - ১. মুদ্রণযন্ত্র ; যে যন্ত্রে পেজ ও কভার , মিষ্টির বাক্স , মানেবই , আনন্দবাজার ও অন্যান্য পুস্তকাদি ছাপা হয় ; বড় ও পুরনো যেকোনো যন্ত্র যার রাজনীতি ও সংস্কৃতি উভয়েই বক্তব্য আছে ; ২. ছাপাখানা ; মুদ্রণযন্ত্রালয় ; পুরনো বাড়ির একতলার ঘরবিশেষ ; ৩. গাড়ি , স্কুটার , জামা বা গলায় বাঁধিবার প্লাস্টিকে বাঁধানো এক প্রকার নামপত্র , ট্যাগ বা ঘন্টা বিশেষ (বিড়ালের ক্ষেত্রে) যা লাগালে গাছ ও তলা - দুটিরই খাওয়া যায় বলে প্রচলিত বিশ্বাস ; ৪. চাপ ; ক্রি. - ৫; চাপ দেওয়া বা চেপে ছাপ দেওয়া । অলংকারার্থে প্রয়োগ : যন্ত্রচালিত বৃহৎ গোষ্ঠী যারা ছাপাখানায় বসে জনমানসে চাপ সৃষ্টি করতে পারে ।




তৃতীয় পরিচ্ছেদ


"প্লীজ আজ যেন মিস না হয় গৌরাঙ্গদা একটু দেখবেন আমি সেই সন্ধ্যের আগে গাদা কাজ পড়ে আছে ওদিকে রং ও বাড়তি খাতা জানেনই তো একা হাতে আরে হ্যাঁ হ্যাঁ সব হবে সে আর বলতে আগে নামুক তো আমি নিজে গিয়ে নিয়াসবো সঙ্গে ডিম-তড়কা রুটি আর নিতাই তুইও নাহয় থাকিস বাপ ...'

প্রেসবাড়ির ঝুলন্ত আওয়াজে সকাল গড়িয়ে গেলেও ব্রতীনের(১) ঘুমগুলিতে তখনো রামের রেশ আঠার মতো চোখে ও চেতনায় তখনো গত রাতের স্বপ্নগুলি থেকে তন্বী কবিতাশরীরের খাপে আঁটা অহংকারী গ্রীবাভঙ্গী । এ হেন চিত্রকল্পে পাতলা সরের মতো ভাসা ভাসা টেবিলদৃশ্যে ঢাকা দেওয়া কাপ জুড়িয়ে ঠান্ডা চা (২) বরাদ্দের আতিথেয়তা তিন ফুটে আবার গরম । অথচ সকাল হতেই গৌরাঙ্গ যথারীতি ছাপাকালিতে ডুব ফলত: পুনরায় ঈর্ষাহীন এক মুদ্রকের ভুমিকায় অভ্যস্ত পরিচিতি ও উৎসর্গ নেমে আসতে দেখে কিছুটা নিশ্চিন্ত হন ব্রতীন । আজ রাতের আগেই সব নেমে যাবে টোটাল হাজার কপি দেখবেন ঘ্যাম লাগবে দাদা , গামছার(৩) ভিতর থেকে একথা বলেই চোখ কোঁচকায় আজ বারো বচ্ছর এই প্রেসে নিতাই । তার গলা নেমে আসে ইশারার পর্যায়ে প্রায় গোপন রসিকতার সু¤রে ব্রতীনের খাতায় আবদার হয় - আজ নেমে গেলে আমাদেরও এক ঢোঁক ব্রতীনদা , কাল তো বোতল উপুড় আপনারাই শুধু মায় খালি বোতলও চেটে খাচ্ছিলো আরশোলা । শেষ অংশের আহত ও আশাহত ফালা ফালা বাক্যগুলির ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরেন গৌরাঙ্গ আর প্রেসযন্ত্রের তালে ব্রতীনের তাড়াহুড়ো জুতোবাকলে স্টলচিন্তা ঘনালে রং ও সিলিঙের অঙ্কে আলমের প্যান্ডেলকথা ছাড়িয়েও চোখে পড়ে , এক্ষণে রাতের থেকে আবছা , গর্বগ্রীব , ব্রতীনের কবিতাশরীরগুলি নির্দিষ্ট ছাপমাপে জমা হচ্ছে মেশিনে উঠানে । অত:পর এবিধ ছবিতে ব্রতীনের অন্যমনষ্কতা প্রায়শই দখলে এলে একসময় অসমাপ্ত স্টলবারান্দায় এক প্রকার স্বাচ্ছন্দ্য ভর করে ভর দুপুরে যেন সত্যই তাক জুড়ে তাক থেকে নেমে আসে কেমন দৃপ্ত অফসেটে চমৎকার মোড়া কবিতাগুলি ব্রতীনের এ বছর এই গত বছরে । সেগুলি প্রকৃত ও প্রায় ছুঁয়ে দেখা যায় এমত দূরতেÆ এলে ব্রতীনের তৃপ্তি আসে থম্‌ দুপুরে চোখ বুঁজতেই যেন দেখতে পান এতক্ষণে বেশ কয়েক শ' কপি নেমে গেছে কি সু¤ন্দর প্রেস দাওয়ায় ডাঁইসারি শুয়ে দাঁড়িয়ে আঠাকালির গন্ধ শুকুচ্ছে তারা তক্তামেঝের টেবিলে । ফলত: কাঁচ জানালায় তাকগুলি কমপ্লিট ব'লে আলমের ছেলেরা রং কাঠামোয় নজর বোলালে ব্রতীন সহজেই দেখতে পান এ সাদা প্লাইখাপে গোছ করা নতুন কবিতা শরীরগুলি এবারেও কি চমৎকার মানাবে আর তাদের মলাট মুখশ্রী । এত অব্দি দেখে ফেললে দূর প্রেসবাড়ির ঘট-ঘটাং আওয়াজ ছাপিয়ে ব্রতীনের কানে আসে আলম প্রায় সামনাসামনি মুখোমুখি ভাবেন না সার আপনের কাজ ঠিক নামায়ে দেব সনঝের মদ্যে আপনি বরং প্রেস না কনে এট্টু ঘুরেই আসেন দাদা বইফই সব নিয়া এক্কেরে ......



(১) এ পর্যায়ে ব্রতীন আমাকে যেন বেশ চমকে দিয়েই আত্মীয়তা পাতায় নিজে নিজেই নিতাইকে মদ খেতে ডাকে , যাতে আমি , তাই গৌরাঙ্গও , দু'জনেই বেশ অবাক হই । একটা পরিচ্ছেদে বয়স বেড়েছে বলে গৌরাঙ্গ আমার কথায় বেশ কর্তৃতÆ ফলাতে শিখে নিতাইকে চুপ করানোর মতো একটি স্পষ্ট ও বাস্তবমুখি চরিত্র হয়ে ওঠে । ব্রতীনের এই খামখেয়ালে আমি , তাই গৌরাঙ্গও , হতবাক খানিক্ষণ চুপ থেকে দেখি ব্রতীন কোথায় যেন বেরিয়ে যায় অন্য চরিত্র আলমের কথার ঢিল ঢিল আমেজের সু¤যোগে । এবারে আমার , তাই গৌরাঙ্গ ও আলমেরও , কুচুটে একটা ভয় শুরু হয় ব্রতীনকে ঘিরে ।

(২) চা - চা শব্দটি মূল মান্দারিন মতভেদে ভোটচীনীয় চা-হুয়া-চাং-লেই-ই (মূল অনুবাদে চা-হুয়া প্রদেশের চাং-লেই-ই অর্থাৎ নীল গুলেÈর পূত পানীয়) সংক্ষেপে চা-হুয়া-চাং আরও সংক্ষেপে চা-হুয়া বা চা । কথিত আছে গিরিসঙ্কুল চা-হুয়া প্রদেশের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে অহিফেন সেবননিমিত্ত আলস্য দূর করার নিমিত্ত বন্য চা (tea) পাতা জলে সিদ্ধ করে খাওয়ার প্রচলন ছিলো । প্রকৃতপক্ষে বলিতে গেলে, সেই চা-হুয়া-চাং-লেই-ই অর্থাৎ সেই চা-হুয়া প্রদেশের চাং-লেই-ই (নীল গুলেÈর পূত পানীয়) থেকেই এযুগের দুধ চা , কালো চা , লেবু চা , লিকার চা , টী-ব্যাগ , আর্ল গ্রে , পাঞ্জাবী মসালা , পাতা চা , আইস টি , আদা চা , খুরির চা , টেশনের চা প্রমূখ যাবতীয় চায়ের উৎপত্তি বলা যায় । ভারতে চায়ের আগমন ইউরোপীয় বণিকদের সাথে মাথা ধরা , ছেলে ভুলানো প্রভৃতি ছোটোখাটো অসু¤খের দাওয়াই হিসেবে । মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পরে চায়ের প্রসার আরো বিস্তৃত হয় ও তার যুগপৎ অর্থপ্রসার ও অর্থনৈতিক প্রসার ঘটে । এর পর থেকে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্থান পতনের সঙ্গে সঙ্গে যুগে যুগে বদলেছে চায়ের চেতনা ও চরিত্র । বর্তমানে শুধুমাত্র ভারতবর্ষ ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলেই ন্য¨নতম ৪৫০ রকম চা দেখতে পাওয়া যায় । (সূত্র: গ্রীয়ার্সন অ্যান্ড মেন্ডেস - দক্ষিন এশিয়ার পানীয় - একটি পুনর্ম¨ল্যায়ন - শ্রেণীবিভাগ ও শ্রেণীবিন্যাসসহ , ১৯৮৭ - অনু: জানকীরঞ্জন মিত্র) ।

(৩) ১. গামছা - গামোছা &ফঢ়; গা (গাত্র) মোছা (মোছন) - গাত্র &ফঢ়; গাঅ (প্রাকৃত) &ফঢ়; গা ; মুন &ফঢ়; মুঅচ্ছন (প্রাকৃত অপভ্র:) &ফঢ়; মোছন &ফঢ়; মোছঅ (অতিপ্রাকৃত) &ফঢ়; মোছা (বাং) = মুন , মুঞ্ছায়ন &ফঢ়; মুচ্ছআ - মুছা বা গামুছা (প্রাদেশিক) । (উদা: &হয়ষঢ়;পিন্ধাইবার কানি নাই কান্ধে বাঁধে গামুছা' - বৃহত্তর রাঢ় -বহির্ভ¨ত বাংলার প্রচলিত প্রবচন ও গ্রাম্য ছড়ার আভিধানিক সংকলনমালা , স্বাস্থ্য দপ্তর , সামাজিক গবেষণা বিভাগ , ১৯৭৫ - ৮৮ , অসমাপ্ত) ; গাত্র মার্জনী ; অঙ্গমোছা বা অঙ্গমছা ; অংগামছা (উচ্চারণভেদ) ; ২. বাংলার গ্রামদেশে উদ্ভ¨ত এক প্রকার কাপড় যাহা পুরুষ জাতির অলংকার (পাগড়িরূপে মাথায় - উদা: &হয়ষঢ়;..... হুলো মোদের রাজার মাফিক পাগড়ি বেঁদেচেন / গামছা মাথে বিলাই হুলো নাচতে নেগেচেন ....' কথা ও সু¤র প্রচলিত - &হয়ষঢ়;ঐ' সংকলন , স্বা.দ.সা.গ.বি -৭৫-৮৮) মহিলাদিগের হাতিয়ারবিশেষ (উদা: &হয়ষঢ়;..... গলায় গামছা দে বেঁদে নে যাবো মুখপোড়া মিনসেকে !!' - নিশিপদ্মিনী : প্রথম ভাগ, ব্রজেন সরকার , ক্ষমা প্রকাশনী ,১৯৭৮ , ২য় সং , পৃ: ২৩৭)




চতুর্থ পরিচ্ছেদ


এর থেকে তোদের মতো টেবিল ভালো ছিলো সু¤বিনয় মনে আছে তোর নির্ঝঞ্ঝাট কি র'ম এক ঘন্টায় আমাদের টেবিল সাজানো শেষ হলেই পায়ের নীচে ব্যাগেবোতলে একাকার আর তা দেখে সু¤মিতা কেমন দিশেহারা সু¤মিতা কে মনে পড়ে তো তোর ফোট্‌ আমি কোথায় সে তো তুই আর অমল ...'

সন্ধ্যে নাগাদ বেশ স্যাটিসফায়েড ব্রতীনের(১) সাইডব্যাগে স্যাম্পল কপিগুলি আনকোড়া বান্ডিলে খানিক ওজনদার ঠেকলে ব্যাগসহ বইচেহারার কবিতাগুলি টেবিলের পায়া বেয়ে পালিশে নেমে যায় গেলাসের পাশ দিয়ে । ব্রতীন সু¤বিনয়কে দেখেন সু¤বিনয়ও দেখেন নম্র জলের মধ্যে ঠাস্‌ করে কেমন বরফচাকতি আর লেবুদানার মসৃণ ও ঘোলাটে চশমার ফাঁকে তাঁর মনে হয় আচ্ছা সু¤বিনয় তুই কি আমার থেকে বড় আচ্ছা ব্রতীন তুই কি ছোটো থেকেই এমনি হারামি ? এরকম আরো প্রশ্নে উভয়েরই উত্তর দিতে দেরী হয় বারোয়ারী অ্যাশট্রেতে এতদিন ধরে নানাকিছু জমে নানা ব্র্যান্ডের বেওয়ারিশ বছরগুলি দুজনের দুটো গেলাসে আলাদা । ধোঁয়া বোতলে গেলাস ও বাদামের নুন দানায় সু¤বিনয়ের আঙুল এঁকে ব্রতীনের চোখ মোমটিউবের আলোয় টেবিলের নিচে ও নিচে থেকে টেবিলের উপরে উঠে আসে তাঁর এবারের বই কভারের কবিতাশরীর - মলাটেও (২) তারা এবার সু¤ন্দর ও সে দেমাকে ঘাড় বাঁকিয়ে । ফলত: পার্কস্ট্রীটে চুমকি সন্ধ্যায় ফুটপাথ দিয়ে আগে ব্রতীনের পেছনে বইকবিতার পষ্ট শরীরগুলি আর সব শেষে সু¤বিনয় যে কিনা একাই হঠাৎ এভাবে বহুদিন ডানদিকে চলে যায় বলে ব্রতীন ও তাঁর স্যাম্পল কপিগুলির এ গমনের কোনো পথচলতি ছাড়া আর কিছু পরিচয় থাকে না । ব্রতীনের স্রোত ট্রাফিকে ফ্লাইওভার গাঁথে কংক্রীট লোহার আওয়াজগুলি আর শেষ হলে বালিকারা গান গায় ব্রতীনের ব্যাগপরিধি ওজনের কাঁধ থেকে বাঁধানো মলাট জমা করে খুলে বিলি করে ছুট রাস্তায় । সাঁঝবাগে গেট ময়দানে চা-চানা ঢোকে এমনকি ৯১০ বললে ব্রতীনের মুখচেনা মাঠম্যাপে এবারে দুর থেকেই নাম নিশানে খুশিয়াঁ আনে ব্রতীন গতি বাড়িয়ে একদম স্টল । হাসি পুঁছে আলম দেখা যায় সামনেই কেমন কতা দ্যাখলেন সার বলে হুই উঁচুতে আজ ফাঁকায় ভেপার আলো ছড়ায় তার শীর্ণ হলুদ । ব্রতীন হাত রাখেন তাক ব্র্যাকেটে মানিয়ে যায় নতুন শরীর পাশাপাশি কখনোবা একসাথে তাদের বায়না হয় টেবিলেও কয়েক কপি এবারে বাকিগুলি কিছু পুরনো ভেবে ব্রতীন প্রকৃতই এক খুশপুরাতনী গুন গুন যা কিনা সেদিনই ট্যাক্সি থেকে এফ. এমে । স্টলপ্রান্তর গুছিয়ে উঠলে এভাবেই ব্রতীন তখন আর একটি কোনো কথা ও সু¤র প্রচলিত মায়াবাড়ি গলায় বড় শান্ত হয়ে উদারা । মাঠফাঁকাতে ৯১০ ব্রতীন ও ব্রতীনের প্রচলিত সু¤রে তাঁর নানাবিধ বই শরীরি ঘুরে ঘুরে তাল দেয় অনেক রাত অবদি মাঝে মাঝে ধুয়োও তোলে যেন শোনা যায় । নাইট ডিপ্‌টির মুচোয়া সিকিউরিটি মাঝরাত বরাবর হালকা হর্‌রায় লাঠি ঠোকে দু'য়েক বার ভুল ঝোঁকে টর্চ মারলে নতুন বইগুলির(৩) মলাট ঝক ঝক করে ও পুরনোরাও যে যার নিজের মতো করে ।



১. ব্রতীনের আচম্বিত প্রস্থানে আমার যে অসহায়তা ও শঙ্কা সে সু¤বাদে এ পরিচ্ছেদে আলম বা গৌরাঙ্গ এমনকি নিতাই কেউ থাকে না বরং ব্রতীন না বলেই একটি অচেনা চরিত্র নিয়ে দুজনে মদ ও হাওয়া খায় বাদাম দিয়ে পুরনো বারের আমারও চেনা ফ্যানে আর ওঠার সময় আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে বলে এ আমার ছোটোবেলার বন্ধু - সু¤বিনয় আর সু¤বিনয় , এই সেই মালটা হিহি আরে বলছিলাম না ! এরপর ব্রতীন হাওয়া কেসের মতোই ছোটো ও অস্পষ্ট হয়ে যেতে চাইলে আমার বাদাম ভালো লাগে না মদের সঙ্গে কোনো দিন একথা এমনকি ব্রতীনকেও জানিয়ে দেওয়ার দরকার মনে হলে ব্রতীন তখন প্রায় শেষটানে কোম্পানী পুড়ে যায় এবং আমার এ কথা সে কথাও আর পাঁচটা কথা প্রসঙ্গে হারিয়ে আমরা পরস্পরের কাছ থেকে রীতিমাফিক বিদায় নিই , যেন টুপি খুলে বিদায়ে বিদেশী গল্পের লোক জন । এরপর ব্রতীনকে দেখিনি আর ।

২. মলাট - বইয়ের মলাট লাগানোর প্রচলন প্রথম হয় বিপ্লবকালীন রাশিয়ায় । বিপ্লবী শ্রমজীবি মানুষ প্রচ্ছদে কাস্তে হাতুরি ছবি ছাপা পার্টি ইস্তাহার হাতে বাইরে বেরোনোর সময় বইয়ের গায়ে রুটি মোড়ার কাগজ জড়িয়ে নিতো যাতে জারের সৈন্যরা টের না পায় । বিপ্লব শেষে গোটা রাশিয়া জুড়ে দেখা যায় মলাটের নীচে থাকার ফলে পুরাতন পার্টি ইস্তাহারগুলির প্রচ্ছদের ছবিগুলি তখনো এতই অমলিন যে তা দিয়ে কম খরচে আরেকটি নতুন বিপ্লব করে ফেলা যায় ছোটোমাপে । মলাটের এই আশ্চর্য গুণ বিপ্লবোত্তর রাশিয়া থেকে চীন , কিউবা , পূর্ব ইউরোপ হয়ে ধীরে ধীরে হুগলী , বাঁশবেড়িয়া ও সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে । আজও ভবিষ্যৎ বিপ্লবের কথা মাথায় রেখে প্রায় সব দেশেই বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের বইয়ের মলাট দেওয়ায় সবিশেষ উৎসাহ দেওয়া হয়।

৩. বই১ (.) - বহি, বহী (ধর্ম্মপুস্তক , ঈশ্বরের বাণী , অতীব বুদ্ধিমান ঈশ্বরপ্রতিম মানুষ যথা লেখক, কবি, সাহিত্যিক, হিসাবরক্ষক, প্রাবন্ধিক, মুদি, ধোপা ও বুকি প্রমুখের বাণী) &ফঢ়; বই - কিতাব, পুস্তক, গ্রন্থ ; (উদা: &হয়ষঢ়;....মোক্তার বলিল, বই ! বই ! বই ! তোমার খাতা নাই কুসু¤ম ??.........' - গড় শিবানন্দপুরের ইতিকথা, কালীশঙ্কর মুখোপাধ্যায় ১৯৫৬ গুঁই অ্যান্ড গুঁই ) । বই পড়া - গ্রন্থ পাঠ করা । বই পড়ান - শিক্ষাদান করা , ক্যালানো ; ধমক দেওয়া বা প্রহার করা । বই লেখা - গ্রন্থ রচনা করা ; কিছুই না করিয়া কেবল কাগজ-কলম লইয়া বসিয়া থাকা । বই বাহির করা / বই বের করা - পুস্তক, গ্রন্থ, মানেবই, গুচ্ছ কবিতা ছাপিয়া বা ছাপাইয়া প্রকাশ করা ও জবরদস্তিপূর্বক পরিচিতবর্গকে বিক্রি করা । বই বের হওয়া - পুস্তক, বিশেষত: কবিতা ও প্রশ্নপত্র সংকলন বা টেস্ট পেপার ছাপাখানা হইতে বাহির হইয়া জনসাধারণের মধ্যে প্রচলিত ও প্রচারিত হওয়া ।

বই২ - বাঙালিজাতির জন্য নির্মিত একপ্রকার সিনেমা বিশেষ যাহা দর্শক, লাইটম্যান, প্রোজেকশনিস্ট , রিভিউলেখক ও বাদামওলা নির্বিশেষে সকলকেই কাঁদাইয়া ছাড়ে ; যেকোনো সিনেমা যাহা বজÊবিদ্যুতের শব্দে শুরু হইয়া প্রভ¨ত কান্নাকাটির মধ্য দিয়া শেষে সানাইয়ের শব্দে সমাপ্ত হয় ; লোকেন দাসের সিনেমা (উদা: &হয়ষঢ়;নাগর হামার পাড়ার হলে বই দিখাবে কাল / পাড়ার হলে শরম লাগে এমনি হামার হাল' - আদিরসাশ্রিত নৌটঙ্কীর গান , কথা ও সু¤র প্রচলিত , সূত্র: বৃহত্তর কলিকাতার মিলশ্রমিকদের ভাষা ও সংস্কৃতি - একটি আর্থ-সামাজিক পাঠ - রাধারমণ ব্যানার্জী , ১৯৯৭ , দত্ত'জ )

বই৩ - (সং বহনার্থক বহ্‌ ধাতু) &ফঢ়; বহন করি ; বহি (উদা: &হয়ষঢ়;(আমি যে) পাগলা খাজা / ভ¨তের রাজা / ভ¨তের বোঝা বই' - খাজা আইনুদ্দিনের গান - সংকলক প্রো: আবুল বশীর , ঢাকা Ïবিশ্ববিদ্যালয় , ১৯৭৩)

বই৪ - বৈ। সং ব্যতীত , হি. বিনা , বাং-য় বিনা (দ্র:)। - অ, ব্যতীত , অতিবাহিত হ'লে , বাদে (উদা: &হয়ষঢ়;চৌ। যুগ বই প্রভু তুলিলেন হাই ।' - শুন্ডপুরাণ, ১২শ সর্গ) । ভিন্ন , ছাড়া (উদা: - &হয়ষঢ়;মোরে তবে কৃপা কর কৃপাময়ী মাঈ / তোমা বই কেহ আজ মোর পাশে নাই' - রা: ঠা: অনুরূপ ঠাকুরের শ্যামাসঙ্গীত ও আগমনী গান - অনুরূপ ঠাকুর দ্বিশততম জনÈতিথি উদযাপন কমিটি , পৃ: ৯৮)




পঞ্চম ও শেষ পরিচ্ছেদ


শুরুর দিনেও মানুষের ঢল বইমেলায়


(বইমেলায় সাহিত্য বাংলা প্রকাশনি ও সাহিত্য পাক্ষিক আয়োজিত বিতর্ক সভায় বাঁ দিক থেকে চারুপর্ণ বসু¤ , রুচিকা মজুমদার , মোটামোতো এপাসে , কাবেরী দে , ব্রহ্মবিকাশ সেন , মিতা হিমানি - উদ্বোধনবার বিকালবেলা , নিজস্ব চিত্রকলাপটুতÆ , সা.বা.প্র)

নিজস্ব প্রতিনিধিগিরি ৮ই ফেব্রুয়ারি : &হয়ষঢ়;বাংলা সিনেমায় পত্র সাহিত্য কি মরে যাচ্ছে' - এই ছিল শুরুর দিনের সাহিত্য পাক্ষিক আয়োজিত বইমেলার বিতর্ক মঞ্চের প্রশ্ন । এবারের বইমেলার উদ্বোধনী ভাষণের পর এই প্রশ্নটি কলকাতার বইপ্রেমী জনতার উদ্দেশ্যে উত্তরের জন্য সাম্মানিক স্বরূপ প্রথম ছুঁড়ে দেন মাননীয় সভাপতি মহোদয় ভোলানাথ সেন । উত্তর যদি হ্যাঁ হয় তাহলে সঠিক উত্তরদাতার জন্য আরো দুটি প্রশ্ন নিবেদনের আয়োজন করেন আয়োজকরা - কেন ও কবে ? কলকাতার সাহিত্যপ্রেমী মানুষেরা এ প্রশ্নের জবাব দিতে স্বত:স্ফ¨র্তভাবে এগিয়ে এলে তুমুল করতালির মধ্যে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এ বছরের এততমকতযেনতম বইমেলা । প্রতিবারের মতোই এবারের বইমেলাতেও এতগুলিকতগুলিযেন ভাল খারাপ দেশী বিলাতি স্টলের ছড়াছড়ি হলেও সকলের নজর কাড়ে সাহিত্য পাক্ষিকের স্টল (ইউসিআইয়ের উল্টোদিকেই ডানহাতে স্টল নং ৯০৮) ও সাহিত্য পাক্ষিকের বিতর্কসভা । এছাড়াও সাহিত্য মাসিকের স্টলে এ মেলাতেই আজ প্রকাশ পেলো শহবাগ গাঁধির &হয়ষঢ়;আমার জিবন আমার তির' (সা.মা. স্টল নং ৯১১ - দাম ২২৫ ্‌ ) । বইটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশ উপলক্ষে শহবাগ গাঁধি আজ বৈকাল চার ঘটিকায় সাহিত্য মাসিকের স্টলে এলে উৎসাহী মানুষের ভিড়ে আজ অল্পক্ষণের জন্য সাহিত্য মাসিকের স্টল সাধারণ অসাধারণ সকলের জন্যই বন্ধ রাখতে হয় । সাহিত্য বাংলা প্রকাশনির মুখ্য সম্পাদক ও স্বনামধন্য সাংবাদিক অখিল সরখেল তাঁর নিজস্ব প্রতিনিধিদের আজ এও জানান , তিনি ও তাঁর প্রতিনিধিগণ তাঁর সংস্থাগত সবকটি প্রকাশনির সবকটি প্রকাশনাই এবছর বাঙালি পাঠকের জনমানসে বেশ ভাল সারা ফেলবে বলে মনে করছেন ।

(বি: দ্র: বইমেলায় সাহিত্য বাংলা প্রকাশনির স্টলগুলিতে আসু¤ন - ৯০৭ সাহিত্য বাংলা মূল প্যাভিলিয়ন , ৯০৮ সাহিত্য পাক্ষিক , ৯০৯ সাহিত্য সাপ্তাহিক , ৯১১ সাহিত্য মাসিক !! বইমেলা উপলক্ষে প্রতিটি স্টলেই রোজ নতুন প্রশ্ন রোজ নতুন উত্তর !! এই অংশটি কেটে আপনার সঙ্গে নিয়ে আসু¤ন ও সবকিছুর উপর ২০% ছাড় উপভোগ করুন !!)