আপনার মতামত         


মরচের ধার
বিক্রম পাকড়াশী





যতবার পেছনে তাকাচ্ছি একটা বিরাট রেলগাড়ি ঝমঝম করে কলকাতা থেকে নাগপুর সারারাত ছুটছে। জানলার বাইরে অন্ধকার একদম স্থির, দমকা হাওয়া এসে নাড়িয়ে দিচ্ছে তপনের চুল। এ হাওয়া তো আর একভাবে বয় না। কখন সেই বেরোনোর আগে একবার চিরুনিতে হাত পড়েছিলো, তারপর এদিকে ওদিকে সরে গেছে - পশ্চিমবঙ্গের সীমা পেরোনোর অনেকটা আগে তপনের চুল এসে ছড়িয়ে পড়েছে ওর কপাল বেয়ে। দূরে কোথাও কখনো কোনো আলো এ নৈ:শব্দ ভেদ করে মুহ¨র্তের জন্য মাঝে মাঝে চশমার কাঁচে প্রতিফলিত, প্রতিসরিত হয়। এই কাঁচ সারাদিনের তাপে, তেলে, ধুলোয় এখন ঈষদচ্ছ। সেই তৈলাক্ত, ক্ষীণ পরত বরাবর আলো পড়লে একটি সরু লম্বা রেখা তৈরি হয়। মাথা হেলালে সেই সরলরেখা স্থ¨ল হয়ে আসে, আলোর গতিবেগ যেন কমে যায়, সমস্ত সমান্তরাল জ্যামিতি বেঁকেচুরে জায়গা নেয় চশমার কানায় কানায়। এই ছুটন্ত রেলগাড়িতে অন্ধকারের সূচীমুখ থেকে বেরিয়ে আসা সে সমস্ত আলোর বিন্দু আমি কিছু বেশিক্ষণ পাই অনেকের চেয়ে। চশমা খুললে সেই মুখগুলোই ঝাপসা, ভোঁতা, মৃত আকার ধারণ করে। আমাদের এই কামরায় যেমন একটি হলুদ জÆরগ্রস্ত মৃতপ্রায় আলোর উৎস তার চারপাশে ঘেরা ঘষা কাঁচের মধ্যে ক্রমাগত আপন শক্তি ক্ষয় করছে, বিচ্ছুরিত হবার বদলে পরজীবী উদ্ভিদের মতো এই দীর্ঘ বাহনের দীর্ঘ যাত্রার রসদের এক তিল পরিমাণ নিজের শরীরে নিয়ে অগৌরবের সাথে পাড়ি দিচ্ছে রাত।

আমি স্থির হয়ে আসি ঘুমে, তপনের চোখদুটো বোজা, ওর ঘুমন্ত শরীরের ভার আমার একটি কাঁধে দিয়ে নিরাপদে, নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে। একটা ফোঁটা ঘাম নেমে আসছে কপালের তীক্ষ্ণ ভাঁজ বরাবর, রেলের ঝাঁকুনিতে সে নদী মাঝে মাঝে গতিপথ বদল করে - ভ্রু এর ধার ধরে, চোখের কোল ধরে, কোন ধরে সেই নুন আর জলের একটি অবিচ্ছিন্ন ধারা ঠোঁটের খুব কাছে এসে শুকিয়ে যায়। কিছু মুছে যায়। কিছু ছিটকে পড়ে। তপনের মুখের মানচিত্রে সেই নদী জÆলজÆল করতে থাকে। তারপর মৃদু হয়ে আসে। আজ রাতে কি আর কেউ জেগে নেই? টের পাই একে একে ধানক্ষেত পেরিয়ে যাচ্ছে, অন্ধকারের ভেতরে আলপথ, জল, জমি, সবকিছু যারা আলোর সীমানার বাইরে, তাদেরকে নিয়েই এই রাত আরো ক ঘন্টা পোয়াতি থাকবে।

টেÊন বাঁক নিলো, ব্রিজের ওপারে আলোয় ধোঁয়ায় নিপুণ জলছবির মতো ফুটে উঠেছে নাগপুর। তপনের হাতটা একবার আলতো করে চেপে ফিসফিস করে বললাম 'নাগপুর'। সমস্ত শরীর থেকে সব গ্লানি, সমস্ত মিথ্যা, অপমান ধুয়ে যাচ্ছে, মুছে যাচ্ছে। বাতাস যেন অদ্ভুত হাল্কা, এই কামরার নি×প্রভ আলো আকস্মিকই অতি উজ্জÆল, এই ধুলো মাটি আমার নিজের, এ সমস্ত কিছুর মধ্যে যেন আমি আগে ছিলাম, আমি এখানে এর আগেও এসেছি এমনই কোন গোপন সফরে। রিক্সার চাকা ঘুরে যেতে থাকে, স্টেশন ফুরিয়ে যায় দৃষ্টির সীমানার শেষে, আমি তথাপি বহু আলোকবর্ষ দেখতে পাই। একটু দুটি নক্ষত্র যে কারণে আকাশে দৃশ্যমান হয়, যে কারণে কুয়াশার হাল্কা চাদর পরে নেয় নাগপুর শহর, অথচ হাওয়ায় বড় শীতল লাগে, বড় শান্ত লাগে যখন তপনের হৃৎপিণ্ডের শব্দ শুনতে পাই, তার শরীরের সান্নিধ্যে আমি পাখসাটে ঝেড়ে ফেলি সারারাত ধরে জমা সকল শিশির। এইসব শিশির কুড়োতে কুড়োতে, এইসব শিশির বিলোতে বিলোতে কঠিন ধাতুর ওপর দিয়ে আমাকে ওই রেলগাড়ি ভারতবর্ষ পার করে দিয়ে গেছে। আমি লোভীর মতন সে শিশির দিয়ে নকশা বুনেছি তপনের ঠোঁটের ওপর, চন্দনের ফোঁটার মতন নকশা আমি কাউকে দেই নি, আমি একা সারারাত অবাক হয়ে দেখেছি ঘুমোলে কি সু¤ন্দর মানুষ।

এখানে আমরা দু দুটি রাত পাবো, একেকজনে দুটি রাত পাবো, দুজনে মিলে দুটি রাত পাবো, এ রাত কখনো আমরা পাই নি। অথচ রাত কাটে, ধারালো ছুরির মত প্রতি রাত এসে ক্ষিপ্র গতিতে চামড়ায় বুলিয়ে দিয়ে যায় একটা মরচের ধার। যে ধারে আমি দাড়ি কাটি আজ, রক্তে, টিটেনাসের বীজে ভিজে যায় তোয়ালে। আমার এখন শুধু ক্ষুধা, শুধু লোভ, সমস্ত চামড়ার নীচে একটা চলমান সরীসৃপ, তার রক্ত এখন শীতলতম। তপনের পাশে শুয়ে ওকে জড়িয়ে ধরি, ওর ঠোঁটে একটা চুমু খাই শুধু। আজ নয়, কালকে। আজ ক্লান্ত। আজ থাক। ওকে জড়িয়ে ধরে থাকি। ওর উষ্ণ শরীরের কাছাকাছি নিজেকে সেঁকে নেই। তপনের উরুর রোমের চারিদিকে আমার পা বিশ্বস্ত লতার মতো জড়িয়ে থাকে, ওর বুকের ঘন ধানী জমিনে আমার হাত নেমে আসে রাখাল বালকের মতো, তার বুকের বৃন্তে আমি অভিযাত্রীর মতো পৌঁছে নিজেকে ভাঙিগড়ি। গরম নি:শ্বাস এসে গায়ে লাগে ছন্দের তালের মতো, যেন একটা অন্ধ সাপ ফণা তুলে দুলে চলেছে। এই বিষ এসে জমা হচ্ছে আমার তÆকের ঠিক নীচে। আজ হোক, কাল হোক এ বিষ আমার কোষে কোষে ছড়াবে, আমার মস্তিষ্কে এসে বাসা বেঁধে আমার সÀ¡য়ুতে পচন ধরাবে সে। ছড়াক। কিন্তু রাত কাটে, এভাবেই কাটে। ফালাফালা করে দিয়ে চলে যায়।

অথচ পৃথিবী ঠিকই নিজের অক্ষের চারিদিকে ঘুর্ণায়মান থাকে। আমাকে সে নিয়ে যায় মহাশূণ্যের মধ্যে উপবৃত্তের এক চাপ থেকে অপর চাপে। সে আমার অলক্ষ্যে আমাকে ঘোরায়, নাচায়, সূর্যের নানা দিকে মুখ করিয়ে রাখে। দূর থেকে বুঝি বা দেখাই যায় যে আমি নিরক্ষরেখার কাছাকাছি অস্থির হয়ে আছি, সেই কালকের রাত কখন আসবে তার জন্য। যেন এই পার্থিব বক্রতলে একটি অলৌকিক শয্যা পেতে রাখা আছে। দুটি ছায়ামূর্তি জেগে উঠছে সেই শয্যার সমগ্র শরীর জুড়ে। সেই বিস্তীর্ণ চাদরের ওপর তারা লতার ওপরে লতার মতো জড়িয়ে যেতে যেতে গাছ হয়ে বেড়ে উঠছে। বাতাসে হুহু করে রাতকী রানীর গন্ধ মাতোয়ারা করে দিচ্ছে। নীহারিকার মতো আমাদের আলিঙ্গন, বা×পপিণ্ডের আড়ালে এসে ভেসে যাচ্ছে কিছু তারকা, কিছু ধূমকেতু লেবুর ফুলের গন্ধে, লেবুর পাতার গন্ধে যেভাবে ফিরে যায়। আর এই সমস্ত মন্থনের মধ্য থেকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ছে দেওয়ালির রোশনাই। সেই আলোর উত্তাপ আঠার মতো সেঁটে লেপটে থাকে, সান্দÊ তরলের মতো অতি ধীর গতিতে সাড়া দেয় অভিকর্ষের কাছে, দু পায়ের মধ্য দিয়ে সেই দ্যুতি মাটির গভীরে প্রবেশ করে। আমাদের দুজনার পা যে কারণে নোঙরের মতো গেঁথে থাকে, মৃত্তিকার ওপর দুজনে পরস্পরের সামনে দাঁড়াই আমি আর অতনু যুযুধান।

এরা ক্ষণমাত্র থাকে আমাদের সাথে, যেমন আমরা থাকি নিজেদের সাথে এই একটি রাত। এই যেমন আমি আর অতনু এক হয়ে গেছি। শ্রোণীতে, জঙ্ঘায় ঢেউ উঠছে, যেন অতি শান্ত সরোবরে কেউ একটি পাথর নিক্ষেপ করেছে আর তার চক্রাকার তথ্য সেই জলের অনু-পরমাণুর মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়ে তীরে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। সরোবরে নিক্ষিপ্ত লোষ্টÊখণ্ডের মতই এ ঢেউ ক্ষয়িষ্ণু, সাময়িক। আমরা দুজনে সেই সরোবরে হাঁসের মতো সাঁতরে চলি, জল কেটে চলার পথে একই কোণ তৈরি করে দুটি রেখা। তারপর সেই জলছবি জলের মধ্যেই হারিয়ে যায়। পালকের ছায়ার নীচে বুদ্বুদ সৃষ্টি হয়। জলের মধ্যে জলঝাঁঝি, আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে, শ্বাস বন্ধ করে টেনে নিয়ে যেতে চায় তরল দেবতার কাছে। আমার চোখের সামনে তপনের পেশী সঙ্কুচিত হয়, প্রসারিত হয়। সেই পর্বতের গুহায়, উপত্যকায়, অরণ্যে, চ¨ড়ায় আমার সীৎকার।

অতনুর সারা শরীরে বিন্দু বিন্দু চন্দন মুক্তিলাভ করে সমস্ত চেতনা আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে। ওর তো সমস্ত চন্দন। আমার চামড়া থেকে ক্ষীণ ধারায় বিষ নি:সৃত হতে শুরু করেছে। যেভাবে চন্দনের গন্ধ শরীরে মিশে যায়, যেভাবে সে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, বিষ চলার পথ সেভাবে নয়। তার কাজ অন্যরকম। এই বিষ শরীর থেকে বেরিয়ে আসে পাতলা পর্দার মতো, তারপর সে নি:শব্দে আঁকড়ে ধরে বিছানার চাদরের ঘনবুনোট। সেই আড়াআড়ি সু¤তোয়, সেই সব লম্বালম্বি সু¤তোয়, সেই কার্পাসের বÙ»খণ্ডে নিজেকে সে ছড়িয়ে দেয় দুই অক্ষের মধ্যে। লেখচিত্রের আদলে সেই বিছানায় রোয়া হয়ে যায় অদৃশ্য নকশা। সেই নকশার উপর দিয়ে তপনের হাত রেশমের মত আমার সমস্ত শরীরে ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রথমে পথ ভুলে নাগপুরে চলে আসা দুই উনÈ¡দের মতো, কিন্তু এখন সে অনেক সাবালক, অনেক অভিজ্ঞ। আমাদের তÆকে রোমাঞ্চ সৃষ্টি হয়, শরীরের গোপন তরল যাওয়া আসা করে শান্ত নদীতটের মতো, ততক্ষণ, ততক্ষণই যতক্ষণ না এক দুরন্ত বিস্ফোরন ঘটাতে চেয়ে আমরা আরো কাছে এসে যেতে চেষ্টা করি। সে বিস্ফোরণে আমরা নিজেরাও ছিন্নভিন্ন হয়ে যাই, পা থেকে মাটি সরে যেতে থাকে। একটা বোবা চিৎকার সেই ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে যায়, উপগ্রহে প্রতিফলিত হয় বার বার, আর এই দূর সফরে নিজের সামান্য শক্তির রসদ বাতাসের কণায় জমা রেখে মধ্যপথে ফুরিয়ে যায়। বাতাসের গায়ে সব কিছু লেখা থাকে।


এই গোপন সফর সে রাতেই ফুরিয়ে গেছিলো। সরোবর আবার শান্ত ছিলো। সমস্ত বাতাস বয়ে গেছিলো পূবালী দ্বীপের দিকে। আমরা মৃত্যু দেখিনি, হত্যা দেখিনি, অসু¤খ দেখিনি কখনো। শুধু দু রাত, আমরা নাগপুর ছিলাম। আবার টেÊন ছুটে চলেছে ফেরৎ। একটি বাচ্চা মেয়ে ফুল বিক্রি করছে তার ভাই এর সাথে। তার éকের ঘেরে লাগানো জÆলজÆলে হলুদ রঙ, সমস্ত পাপড়ি উড়ে যায় চুষিকাঠি মুখে দিতে দিতে। আরো কতবার রঙ তুলি ফেলে দিতে হবে? শিশির কুড়োতে কুড়োতে কতবার ভাবতে হবে এক রাতে সবটা শেষ করে দেওয়া যায় সত্যি সত্যি? কি অপূর্ব পৌরুষের সাথে আমি তপনের চোখের পাতা আমার সরস ঠোঁটদুটিতে ছুঁই। আমরা কি অদ্ভুত সু¤ন্দর বাঁচি দুই রাত, কিভাবে চন্দন আমায় রক্ষা করে সমস্ত বিষের হাত থেকে। তারপর রাত কাটে। মরচের ধার এসে বসে যায় শরীরের গভীর ভেতরে। পচন শুরু হয়। আমি কি সত্যিই ওখানে ছিলাম ওই দুদিন? নাকি আমি থাকতে চেয়েছিলাম? কে জানে। আসলে আমি সত্যিই ছিলাম ওখানে, আমি সত্যিই ছিলাম দুটি রাত।